নিষুপ্তি – সৈয়দ অনির্বাণ
নিষুপ্তি
এক
ট্রেন থেকে নেমেই মনটা ভাল হয়ে গেল শারমিনের। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের খেত, একপাশ দিয়ে কুলকুল করে বয়ে চলেছে নদী। নীল আকাশে ভাসছে পেঁজা তুলোর মত মেঘমালা, যেন পটে আঁকা ছবি। এমন পরিবেশে আপনা থেকেই একটা ফূর্তি চলে আসে মনে। যদিও মন খারাপ করার যথেষ্টই কারণ ছিল। মাস দুয়েক আগে বিয়ে হয়েছে শারমিনের। আজীবন শহরে বড় হওয়া মেয়ে ও, ঈদের সময় ছাড়া সাধারণত গ্রামে যাওয়া হয় না বললেই চলে, আর এখন কি না প্রত্যন্ত এই হাওর অঞ্চলে পড়ে থাকতে হবে ওকে!
বিয়েটা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ, ছেলের নাম আশরাফ আহমেদ। উচ্চ শিক্ষিত, ফিনল্যাণ্ড থেকে মেরিন বায়োলজিতে মাস্টার্স করেছে, তারপর বছর দুই চাকরিও করেছে সেখানে। কিন্তু হঠাৎ কী ভূত চাপল মাথায়, সব ছেড়েছুড়ে দেশে এসে আধুনিক একটা কৃষি-খামার দিয়ে বসল! সিলেটের হাওর অঞ্চলে বিশাল এলাকা লিজ নিয়ে সেখানে এক অভিনব খামার গড়ে তুলেছে সে। চারপাশে বাঁধ দিয়ে সেই বাঁধের ওপর তৈরি করেছে বসত বাড়ি এবং ডেয়ারি ফার্ম। চারপাশের জলে চলছে মাছ চাষ। প্রথম-প্রথম আত্মীয়স্বজনেরা ভ্রূকুটি করলেও পরে প্রকল্প থেকে ভাল আয় হচ্ছে বলে তাদের কোঁচকানো ভুরু সোজা হয়ে যেতে দেরি হয়নি।
প্রথমে অবশ্য সামান্য আপত্তি তুলেছিল শারমিন। ছেলে ঢাকাতে থাকে না, এটা ওর জন্যে বড় সমস্যাই বটে। কিন্তু আশরাফকে দেখে আর কথা বলে ভাল লেগে যায়। বুঝতে পারে ছেলেটাও পছন্দ করেছে ওকে। তা ছাড়া, বাসস্থান ছাড়া আর সবদিক থেকে আদর্শ পাত্র আশরাফ। চাঁদেরও তো কলঙ্ক থাকে, তাই ওটুকু নিয়ে আর মাথা ঘামায়নি। কিন্তু বিয়েটা হয়ে যাবার পর থেকেই মনটা খচখচ করছে ওর।
ঢাকায় আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সব রেখে যেতে হচ্ছে তা একটা কারণ, কিন্তু তার থেকেও বড় সমস্যা গ্রাম্য পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়া। চিন্তাটা ক্রমশ কুরে কুরে খাচ্ছে ওকে। অবশ্য ওদের বাড়িটাতে শহরের সব সুযোগ- সুবিধাই আছে-জেনারেটরের বিদ্যুৎ থেকে শুরু করে স্যাটেলাইট চ্যানেল এমন কী ইন্টারনেট পর্যন্ত সবকিছুর ব্যবস্থাই রেখেছে আশরাফ। তবুও, বিকেলবেলা রিকশা চেপে ঘোরা, বা কোন মার্কেটে শপিং করতে যাওয়া এসব সে কই পাবে ওই হাওরে?
বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রচুর কাজ জমে গিয়েছিল আশরাফের। তাই সপ্তাহ দুয়েক আগেই ফিরেছে খামারে। তা ছাড়া, জায়গাটাকে নতুন বউয়ের বাস উপযোগীও তো করে তুলতে হবে!
নতুন বউ একা যাবে, ব্যাপারটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। কিন্তু আশরাফের এই মুহূর্তে খুব চাপ থাকায় শারমিনই গোঁ ধরেছে, নিদেন পক্ষে ট্রেনের পথটুকু কোন সঙ্গী লাগবে না ওর। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সিলেটের কাছাকাছি এক অখ্যাত স্টেশনে চলে এসেছে কথামত। এখানে ওকে নিতে স্পিড বোটে করে আসবে আশরাফ।
নদীর ঘাটে অপেক্ষা করল শারমিন, পরনের নীল শাড়িটার আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়ে রেখেছে-যদিও এতে অভ্যস্ত নয়, তবু নতুন বউ বলে কথা! নীল রঙটা শারমিনের খুব পছন্দ, পারলে তো বিয়ের দিনও নীল শাড়ি পরত!
‘আমার নীলপদ্ম!’ ডাকটা কানে যেতেই চমকে ফিরে তাকাল শারমিন। ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে আশরাফ। গম্ভীর চেহারার যুবক, মুখে ফেঞ্চকাট দাড়ি, চোখে ভারী চশমা-কিন্তু কথাবার্তায় রোমান্টিকতার কমতি নেই। এগিয়ে এসে শারমিনের হাত ধরল সে, তারপর গিয়ে স্পিড বোটে উঠে পড়ল দু’জনে।
.
প্রথম কয়েক দিন বেশ ভালই কাটল শারমিনের। নতুন জায়গা, বিশাল খামারে মাছ ধরা দেখে, আশপাশে নৌকো ভ্রমণ আর স্বামীর সঙ্গে খুনসুটি করে সময় কোনদিক দিয়ে পেরিয়ে গেল, টেরও পেল না ও।
কিন্তু ওই শুরুটাই যা, দিন দশেক যেতে না যেতেই সব একঘেয়ে লাগল। আশরাফকে সারাদিনই খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। এত বড় খামার সামলানো সোজা কথা নয়। সকালে সূর্য ওঠার আগে বেরিয়ে যায় বেচারা। নাস্তার সময় কখনও তার দেখা মেলে, আবার কখনও মেলে না। দুপুরে ঘণ্টা দুয়েকের জন্যে যদিও বা ফেরে, কিন্তু গোসল, খাওয়া আর সামান্য বিশ্রাম নিতেই ফুরিয়ে যায় সে সময়। রাত ছাড়া তাই শারমিনকে মোটেও সঙ্গ দিতে পারে না সে। আর রাতেও প্রায়শ আগেভাগে ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্তির কারণে।
সারাটা দিন একাই কাটে শারমিনের-বই পড়ে, টিভি দেখে আর কতক্ষণ? যদিও বর্ষা গত হয়েছে, কিন্তু এখনও হাওর অঞ্চলের বেশির ভাগই পানির নিচে বাইরে যে একটু হাঁটতে যাবে, সে উপায়ও নেই। দীর্ঘদিন কী করে এখানে বসবাস করবে ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। আশরাফ অবশ্য বলেছে, এই মৌসুমটা পেরিয়ে গেলেই চাপ কমবে ওর। কিন্তু ঠিক ভরসা পায় না শারমিন। বড্ড একা লাগে ওর, টেলিফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে, কিন্তু তা-ও আর কত? তা ছাড়া, বন্ধু-বান্ধব সবাই তো আর ওর মত অকাজে বসে নেই, কথা বলার মানুষও তো লাগবে।
তাই যেদিন দেখল পানি কমে আসছে, হাঁটা সম্ভব, বেরিয়ে পড়তে দেরি করল না ও। আশরাফ অবশ্য প্রথমে একা বেড়াতে যাবার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছিল-পথ ঠিকমত চিনবে কি না তাই ভেবে। সঙ্গে একজন লোক দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ওকে আশ্বস্ত করল শারমিন। যেরকম ফাঁকা অঞ্চল, বহুদূর থেকেও ঠিক চোখে পড়বে খামারটা। খামারে আশরাফ আর ওর এক বয়স্ক সহকারী বাদে আর সবাই মজুর শ্রেণীর, ওরকম কারও সঙ্গে ঘুরতে ঠিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না শারমিন। আর দিনের বেলায় চোর-ডাকাতের খপ্পরে পড়ার ভয়ও নেই।
বেলা দুপুর, রোদ আছে, তবে তেজ তেমন প্রখর নয়, বরং একটা মিঠে কড়া আমেজ টের পাওয়া যায়। হাওর অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-এর ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্য। বর্ষায় হাওর সমুদ্রের রূপ নেয়, তখন চারদিকে শুধুই অথৈ পানি। শীতে পানি কমে গিয়ে কিছু স্থায়ী বিল জেগে ওঠে আর গ্রীষ্মের শুরুতে হাওরের চেহারা হয় বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মত।
এখন শীতের শুরু, কোথাও কোথাও হাঁটার মত আইল থাকলেও বেশিরভাগ জায়গাই এখনও ডুবে আছে পানিতে। অতিথি পাখির আনাগোনা শুরু হয়েছে, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। দেখতে-দেখতে ক্ষণিকের জন্যে নিজের একঘেয়ে জীবনের কথা ভুলে গেল শারমিন। ভুলে গেল স্থান-কাল। মনে ফূর্তি বোধ করছে, হেঁটে চলেছে উদ্দেশ্যহীনভাবে।
খামার থেকে খুব বেশি দূরে আসেনি, কিন্তু নতুন বলেই সবকিছুই খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে সময় অনেকটাই পার হয়ে গেছে; সেদিকে খেয়াল নেই। মাইলখানেক আসার পর হঠাৎ একটা দ্বীপ মত চোখে পড়ল।
বেশ উঁচু, বড় বড় গাছে ছাওয়া, মাঝে ফাঁকা জায়গাও আছে। একটা পুরানো বাড়ি মত কী যেন চোখে পড়ছে, কিন্তু দূর থেকে ভাল বোঝা যাচ্ছে না। খুব ইচ্ছে হলো কাছে গিয়ে দেখবে, কিন্তু উপায় নেই। ওখানে যাবার কোন পথ নেই। জায়গাটার চারপাশ এখনও পানির নিচে।
আকাশের দিকে তাকাতে সংবিৎ ফিরল শারমিনের, দুপুর গড়িয়ে গেছে। ঘড়ি দেখল-চারটা বাজে। নাহ্, ফিরতে হচ্ছে। আরও কিছুক্ষণ থাকা যায়, কিন্তু এতটা সময় বাইরে থাকলে দুশ্চিন্তা করবে আশরাফ। সঙ্গে অবশ্য মোবাইল ফোন রয়েছে। কিন্তু হাওরের মাঝে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। খামারে বাড়তি একটা অ্যান্টেনা লাগানো হয়েছে, কিন্তু সেটার রেঞ্জ ওই খামার পর্যন্তই।
ফিরতি পথ ধরল শারমিন, তবে মনে-মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, সময় সুযোগ মত জায়গাটা দেখতে আসবে। কেন যেন ওকে টানছে ওটা
ফিরতে-ফিরতে বেলা পড়ে এল। বেশ ক্লান্ত বোধ করছে শারমিন। কিন্তু বাড়িতে ঢোকার পর পরই আশরাফ যা বলল, তাতে সব ক্লান্তি যেন ধুয়ে মুছে গেল ওর।
‘কাল ঢাকা গেলে কেমন হয়?’ মিটিমিটি হাসতে-হাসতে জানতে চাইল আশরাফ।
এর চেয়ে সুখবর ওই মুহূর্তে আর কী হতে পারে ওর জন্যে? কিন্তু খুশিটা জোর করে চেপে রাখল শারমিন। ‘হঠাৎ? কেন, কিছু হয়েছে নাকি ওদিকে?’
‘আরে না, কী আর হবে? আমার এক বন্ধুর ছেলের আকিকা, ব্যাটা এমন করে ধরল-না বলতে পারলাম না। তা ছাড়া, এখানে একা-একা থেকে হাঁপিয়ে গেছ, মনে হলো কয়েক দিন বাবা-মার সঙ্গে কাটিয়ে এলে ভাল লাগবে তোমার।’
‘কিন্তু এখানকার কাজকর্ম সব ফেলে…’
‘আমি শুধু একদিনের জন্যে যাব,’ ওকে থামিয়ে দিল আশরাফ, ‘অনুষ্ঠান কাল রাতে, আমি পরশু ভোরের ট্রেনেই ফিরব, তুমি থেকে যেয়ো। আমার এদিকের ঝামেলা কমতে বেশ কিছু দিন লাগবে-সে ক’দিন তোমাকে তেমন সময় দিতে পারব না। তাই এখানে একা পচে মরার চেয়ে ঢাকায় বেড়াও, আমি একটু গুছিয়ে নিলে পরে চলে এলে, কী বল?’
শারমিনকে আর পায় কে? আশপাশে কেউ নেই দেখে চট্ করে স্বামীকে চুমু খেয়ে ফেলল ও, গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলল, ‘বাবু সাহেব আমার মনের কথাটা ঠিক বুঝতে পারেন!’
হেসে ফেলল আশরাফ।
.
ঢাকায় ছয়টা সপ্তাহ কোনদিক দিয়ে কেটে গেল, বলতে পারবে না শারমিন। তাই একদিন সন্ধ্যায়, যখন আগেভাগে কোন খবর না দিয়ে আশরাফ এসে হাজির, মনে-মনে একটু হতাশই হলো ও। তবে এত দিন বাদে স্বামীকে আবার কাছে পেয়ে খুশিও লাগছে। যাই হোক, দিন দুই পর আবার খামারের উদ্দেশে রওনা দিল ওরা।
‘এখন কয়েক মাস হাতে কাজকর্ম নেই বললেই চলে,’ খুশি-খুশি গলায় ঘোষণা দিল আশরাফ, ‘এখন শুধু বউকে নিয়ে ঘুরব আর জড়িয়ে ধরে ঘুমাব!’
‘যাও! তোমার শুধু অসভ্য কথা!’ কপট বিরক্তিতে ঝামটে উঠল শারমিন।
খামারে ফিরে বেশ অবাক হতে হলো ওকে, এই ক’দিনেই অনেক বদলে গেছে চারপাশের প্রকৃতি। শীতের মাঝামাঝি, পানি নেমে গেছে, জায়গায়-জায়গায় ছোট কিছু বিল, কিন্তু তা ছাড়া বেশ অনেকটা মাঠের মতই দেখায়-তেপান্তরের মাঠ! কিছু কিছু জায়গাতে রবি শস্যের চাষ হচ্ছে। ওদের বসত বাড়িটার চেহারাও পাল্টেছে কিছুটা, বেশ কিছু নতুন ফার্নিচার এসেছে—মূল দালানের পাশে নতুন একটা টিনের ঘরও তোলা হয়েছে। ‘সার্ভেন্ট’স্ কোয়ার্টার’ ওকে বুঝিয়ে দিল আশরাফ। মনে-মনে স্বামীর কর্মক্ষমতার প্রশংসা না করে পারল না শারমিন।
কয়েক দিন পরের কথা, এখন আর তেমন একঘেয়ে লাগে না শারমিনের- বরং বেশ কিছু দিন ঢাকার ব্যস্ত জীবন কাটিয়ে এই নির্জনবাসের মাঝে যেন একটা আলাদা সুখ খুঁজে পেয়েছে। তা ছাড়া, এখন ওকে নিয়মিত সময় দিচ্ছে আশরাফ। প্রতিদিন বিকেলে একসঙ্গে ঘুরতে বেরোয় ওরা। সেদিনও হাঁটতে- হাঁটতে হঠাৎ কী মনে করে থমকে দাঁড়াল শারমিন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দূরের এক উঁচু জায়গার দিকে। ‘কী হলো?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল আশরাফ।
‘ওই যে গাছে ঘেরা জায়গাটা, ওখানে পুরানো একটা বাড়ি আছে, তাই না?’ জানতে চাইল শারমিন।
‘তুমি কী করে জানলে?’ আশরাফের গলায় কৌতূহল।
‘ঢাকা যাবার আগের দিন, হাঁটতে-হাঁটতে এদিকে এসেছিলাম—তখন চোখে পড়েছে। ওটা আসলে কী, জানো?’
‘জানব না কেন, আগে শ্মশান ছিল-সঙ্গে একটা কালী মন্দিরও আছে। তবে ইদানীং এই এলাকাতে আগের মত অত হিন্দু থাকে না বলে আর ব্যবহার করা হয় না জায়গাটা।’
‘হাওরের মাঝে শ্মশান? আবার মন্দির?’ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল শারমিন।
‘আসলে ওদিকটা হাওরের শেষ, বুঝিয়ে দিল ওকে আশরাফ। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ওপাশে একটা গ্রাম আছে। বেশ উঁচু একটা আইল দিয়ে সেই গ্রামের সঙ্গে যুক্ত শ্মশানটা।’
‘চলো না দেখতে যাই!’ বায়না ধরল শারমিন।
‘দেখার মত কী আছে ওখানে?’ বিরক্তির ভঙ্গি করল আশরাফ, ‘একটা পুরানো ভাঙা দালান আর কয়েকটা গাছ। খুঁজলে হয়তো দু’চারটা আধপোড়া নরমুণ্ডও পাওয়া যেতে পারে। দর্শনীয় কিছু তো নয়ই, বরং খামোকা ভয় পাবে!’
‘ইশ্! কী ভাব তুমি আমাকে? ভীতুর ডিম?’ খেপে উঠল শারমিন, ‘না, আমি দেখবই! চলো-চলো, আজই চলো!’
বিপদে পড়ে গেল আশরাফ, বউয়ের জেদ সম্পর্কে ভালই ধারণা পেয়েছে গত কয়েক মাসের বিবাহিত জীবনে। এমনিতে শারমিন লক্ষ্মী মেয়ে, কিন্তু একবার গোঁ ধরে বসলে আর ওকে ফেরানো যায় না। চিন্তিত ভঙ্গিতে ঘড়ি দেখল আশরাফ, ‘সন্ধ্যা হয়ে যাবে একটু পরেই, এখন পাগলামি করে না, সোনা!’ বোঝানোর চেষ্টা করল ওকে, ‘আরেকদিন আসব, এখন সাপ-খোপ থাকতে পারে।’
‘আমি কি কচি খুকি, যে কিছু গোঁজামিল বুঝিয়ে দিলেই মেনে নেব? এবার কোমরে হাত রেখে মারমুখী ভঙ্গি নিল শারমিন, ‘শীতকালে যে সাপ বের হয় না, তা বেশ জানা আছে আমার! বুঝেছি, বাবু ভয় পাচ্ছেন সন্ধ্যাবেলা শ্মশানে যেতে!’ খোঁচা মারার ঢঙে বলল ও।
এবার আশরাফের আঁতে ঘা লাগল, বউয়ের কাছে ভীতু প্রমাণিত হতে কোন পুরুষই চায় না-সে-ও তার ব্যতিক্রম নয়। ‘দেখ,’ রাগী গলায় বলল ও, ‘ভাল হচ্ছে না বলে দিচ্ছি, জংলা একটা জায়গা, তাই সন্ধ্যাবেলা যেতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু তুমি এভাবে বললে যখন, চলো তা হলে, পরে ভয় পেলে কিন্তু আমার দোষ নেই।’
ওর উদ্দেশ্য সফল হয়েছে দেখে বাচ্চা মেয়ের মত হাততালি দিয়ে উঠল শারমিন।
.
দুই
দেখে যতটা মনে হয়েছিল, বাস্তবে তত কাছে নয় জায়গাটা। ওখানে পৌঁছতে পৌঁছতে রীতিমত হাঁপ ধরে গেল শারমিনের। কম করে হলেও দুই মাইল রাস্তা হবে। একবার ভেবেছিল ফিরে যাবার কথা বলবে, কিন্তু একটু আগেই অমন জেদ ধরেছে আসার জন্যে, এখন কথা ঘোরাতে যাবে কোন্ মুখে?
ওরা যখন গাছপালায় ঘেরা ছোট মাঠের মত জায়গাটাতে এসে দাঁড়াল, তখন হয়ে গেছে প্রায় সন্ধ্যা। পশ্চিম আকাশ রাঙিয়ে দিয়ে বিদায় নিচ্ছে সূর্য, নীড়ে ফিরছে পাখির ঝাঁক-তাদের কলকাকলিতে মুখরিত চরাচর, সব মিলে বেশ স্নিগ্ধ পরিবেশ। কিন্তু জায়গাটার ভেতরে কী যেন একটা আছে, মনে শঙ্কা জাগায়। কেমন সূক্ষ্ম অশুভ অনুভূতি, ভাল লাগল না আশরাফের। তবে মুখ ফুটে কিছু বলল না, পাছে আবার খোঁচা মেরে বসে শারমিন!
ওদিকে শারমিন মুগ্ধ জায়গাটা দেখে। বিরাট গাছগুলো গোল হয়ে জন্মেছে মাঠটাকে ঘিরে-সেগুলোর আশপাশে বেড়ে উঠেছে নাম না জানা বুনো ফুলের গাছ। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরটা। পুরানো, ভেঙে পড়েছে জায়গায়- জায়গায়। ছোট থাকতে পুরাতত্ত্ব নিয়ে পড়ার খুব শখ ছিল শারমিনের, যদিও পরে হয়ে ওঠেনি, কিন্তু এখনও এসব পুরানো স্থাপত্যের প্রতি বেশ ঝোঁক রয়েছে ওর। আসার জন্য অমন গোঁ ধরার সেটাও একটা কারণ। হালকা পায়ে মন্দিরটার দিকে এগিয়ে গেল ও। বিরস বদনে পিছু নিল আশরাফ, কেন যেন পুরো ব্যাপারটা মোটেও ভাল ঠেকছে না ওর কাছে। মন্দিরটা দূর থেকে যা মনে হয়েছিল, সে তুলনায় বেশ বড়। কালের প্রবাহে দেয়ালগুলো ক্ষয়ে গেছে, জায়গায় জায়গায় ভাঙা ইটের স্তূপ। সেসবকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে যথেষ্ট বেগ পেতে হলো ওদের।
‘ছাদটা যে-কোন সময় ধসে পড়তে পারে,’ চিন্তিত কণ্ঠে মন্তব্য করল আশরাফ। কিন্তু পাত্তা দিল না ওকে শারমিন। কেমন একটা ঘোরের ভেতর চলে গেছে যেন। মন্দিরের পেছনে এখনও রয়েছে কালী মূর্তিটা। প্রমাণ আকৃতির কুচকুচে কালো রঙের পাথরে গড়া মূর্তিটা দেখে একটু খটকা লাগল আশরাফের। কষ্টি পাথরের তৈরি হলে এত বড় মূর্তির দাম হবার কথা অনেক। সেটা এরকম খোলা জায়গাতে পড়ে থাকবে আর চোর-ডাকাতে নেবে না, তা হয় কী করে?
শারমিনও ব্যাপারটা লক্ষ করেছে-ও আবার আরেক কাঠি সরেস, কাছে গিয়ে মূর্তিটা যাচাই করে দেখতে চাইল। বাধা দিতে গিয়েও কিছু বলল না আশরাফ, চাইছে যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে কেটে পড়তে-আলো কমে আসছে, ভেতরে এখনই বেশ অন্ধকার। এমনিতেই একটু পর বেরিয়ে যেতে হবে শারমিনকে।
মূর্তিটার কাছে পৌঁছে গেছে শারমিন, এখন আর ভাল করে দেখাও যাচ্ছে না ওটাকে। হাত দিয়ে জিনিসটা ছুঁয়ে দেখার জন্যে সামনে ঝুঁকল ও। এমনি সময় হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল।
এমনিতেই শীত বেশ জাঁকিয়ে বসেছে, তার উপর বাতাসটা যেন কেমন- বদ্ধ ঘর হঠাৎ খুলে দিলে যেমন বাসী গন্ধ পাওয়া যায়, অনেকটা তেমনি। গায়ে কাঁটা দিল আশরাফের, ওদিকে অস্পষ্ট একটা শব্দ করে উঠেছে শারমিন। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল আশরাফ ব্যাপার কী দেখার জন্যে। অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে-এখন আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। প্রায় হাতড়ে হাতড়ে গিয়ে শারমিনকে পেল আশরাফ।
কিন্তু এ কী!
মেঝেতে এলিয়ে পড়েছে কেন ওর বউ? পকেট থেকে মোবাইল বের করে ওটার ম্লান আলোয় স্ত্রীকে দেখার চেষ্টা করল সে।
‘শারমিন, অ্যাই, শারমিন?’
উত্তর নেই!
‘শারমিন?’ এবার জোরে ঝাঁকুনি দিল ওকে আশরাফ, বুকের মাঝে ধড়াস- ধড়াস করে লাফাচ্ছে ওর হৃৎপিণ্ডটা।
দ্বিতীয়বার ঝাঁকি দিতে নড়ে উঠল শারমিন, সাড়া পাওয়া গেল, ‘উঁ!’
‘কী হয়েছে তোমার?’ আশরাফের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা।
‘আমি কোথায়?’ শারমিনের গলাটা দুর্বল শোনাল।
কোনমতে ওকে টেনে তুলল আশরাফ। ‘চলো! এখানে আর এক মুহূর্ত নয়!’ প্রায় হিঁচড়ে শারমিনকে মন্দির থেকে বের করে আনল ও। অবশ্য শারমিনও সামলে নিয়েছে কিছুটা, বাইরে এসে ঠিকঠাক মতই পা ফেলতে পারল। ‘কী হয়েছিল?’ গাছগাছালি পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এসে জানতে চাইল আশরাফ।
‘ঠিক জানি না,’ দুর্বল গলায় জবাব দিল শারমিন, ‘হঠাৎ কেমন একটা বাতাস এল, তারপর আর কিছুই মনে নেই। পরে দেখি তুমি আমাকে ঝাঁকাচ্ছ!’ একটু থেমে যোগ করল, ‘মাথাটা কেমন যেন করছে এখন।’
‘আগেই বলেছিলাম, রাত-বিরাতে এরকম জংলা জায়গায় এসে কাজ নেই। শুনলে না তো।’ আশরাফ আশঙ্কা করেছিল রেগে গিয়ে ঠোঁটকাটা কোন জবাব দেবে শারমিন, কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে চুপ রইল সে। নীরবে খামারে ফিরে চলল ওরা। শারমিন বেশ দ্রুত হাঁটছে, ওর সঙ্গে তাল মেলাতে কষ্টই হচ্ছে আশরাফের-কিন্তু কিছু বলল না। শত হলেও মেয়েমানুষ, তার ওপর নিজের স্ত্রী, তার কাছে দুর্বলতা প্রকাশ করতে কিছুতেই রাজি নয় আশরাফ।
বাড়ি ফিরে দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল শারমিন, তারপর শুতে চলে গেল। খাবার জন্যে ওকে বলেছিল আশরাফ, কিন্তু শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে মানা করে দিয়েছে শারমিন।
পরদিন সব স্বাভাবিক, মানে আপাত দৃষ্টিতে তাই মনে হলো আর কী। কিন্তু কোথায় যেন সক্ষ্ম খটকা অনুভব করল আশরাফ। শারমিনের চালচলনে কেমন যেন একটা ঘোর লেগে আছে। আগের সদা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবটা অনুপস্থিত। তবে পাত্তা দিল না সে, বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে ওর বউ, কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক
তিন-চার দিন পেরিয়ে গেল। সেদিন সন্ধ্যার ঘটনা প্রায় ভুলতে বসেছে ওরা। এর মাঝে বেড়াতেও বের হয়েছে, কিন্তু ওই মন্দির-মুখো হয়নি আর, শারমিনও তোলেনি প্রসঙ্গটা। একরকম হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে আশরাফ।
.
ঘটনার দিন পাঁচেক পর, গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙল আশরাফের। দীর্ঘদিনের অভ্যাস, রাতে ঘুম ভাঙলে প্রথমেই দেয়ালে রেডিয়াম দেয়া ঘড়ির দিকে চোখ যায় ওর। আজও ব্যতিক্রম হলো না, তিনটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। পাশে তাকিয়েই চমকে উঠল। আরে! শারমিন কোথায়? হয়তো বাথরুমে গেছে, ভেবে আবার চোখ বুজল ও। কিন্তু ঘরের অ্যাটাচ্ড্ বাথরুমে কেউ গিয়ে থাকলে বোঝা যায়।
না, ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে!
ভেবে বিছানা থেকে নেমে পড়ল আশরাফ।
প্রথমে বাথরুম, তারপর একে-একে পাশের ঘরগুলো দেখল—কেউ নেই। ওদের বাড়িটা দোতলা, ওপরে শুধু ওরা স্বামী-স্ত্রী থাকে, নিচতলায় কাজের লোক রয়েছে দু’জন। খামারের বাকি সব কর্মচারী থাকে লাগোয়া সার্ভেন্ট’স কোয়ার্টারে। আঁতিপাঁতি করে একে-একে বাড়ির সবক’টা ঘর খুঁজল আশরাফ, কিন্তু শারমিনের ছায়ারও দেখা নেই! গেল কোথায়? জামশেদকে ডেকে তুলল ও। বুড়ো জামশেদ বাবুর্চি, তবে টুকটাক আরও নানা কাজ করে সে, পুরানো এবং বিশ্বাসী লোক। রাত দুপুরে সাহেবকে দেখে একটু চমকে গেল বেচারা। পরে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা শুনে রীতিমত ঘাবড়ে গেল। দু’জনে মিলে খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করল সদর দরজা খোলা। তবে সুন্দর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, বলে প্রথমে আশরাফের নজরে পড়েনি।
তা হলে বাইরে গিয়েছে শারমিন! কিন্তু এত রাতে কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় যেতে পারে? একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল আশরাফ, পেছনে ভীত-সন্ত্রস্ত জামশেদ। কাজের বুয়া মতির মা-ও উঠে পড়েছে- মহিলামানুষ, অল্পতেই দুর্বল হয়ে পড়ে, এই মুহূর্তে উচ্চ স্বরে দোয়া দরুদ পড়ছে সে।
টিনশেডে গিয়ে খামার কর্মীদের জাগাল আশরাফ। খুলে বলল পরিস্থিতি। তারপর ওদের নির্দেশ দিল চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে খুঁজে দেখতে। দ্রুত বেরিয়ে গেল সবাই। মনিব হিসেবে আশরাফ খুব ভাল, সব কর্মচারী ওকে সম্মান করে, ভালওবাসে। তাই এরকম বিপদের সময় সবাই এগিয়ে এল। কিন্তু অনেক খুঁজেও কোন চিহ্নই চোখে পড়ল না কারও, হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে যেন শারমিন! থানায় ফোন করল আশরাফ। ডিউটি অফিসার ওর কথা শুনে বললেন, তাঁদের আসতে কয়েক ঘণ্টা লাগবে। হাওর অঞ্চলে যোগাযোগের সুব্যবস্থা নেই। চিন্তিত মুখে দরজার সামনে বসে রইল আশরাফ, এই শীতের মধ্যেও কুলকুল করে ঘামছে। যদিও অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ-কিন্তু শারমিনকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেছে সে এরই মধ্যে। আর হঠাৎ এই বিপদের কারণেই হয়তো কতটা তা আবারও উপলব্ধি করতে পারল।
দূর গ্রামের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজান। আশরাফের চোখদুটো রক্ত বর্ণ, কোটরে ঢুকে গেছে, শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে মুখ। এখনও কোন খোঁজ নেই শারমিনের।
ধীরে-ধীরে আলো ফুটছে, ডাকতে শুরু করেছে ভোরের পাখিরা। অপূর্ব দৃশ্য, কিন্তু আশরাফের কাছে সবকিছুই তিক্ত ঠেকছে। হঠাৎ দূরে, খামারের মূল গেটের কাছে আবছা মত কী যেন দেখা গেল। তাড়াতাড়ি উঠে সেদিকে ছুটে গেল ও।
শারমিন!
কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে ওর!
পরনের শাড়ি অবিন্যস্ত, চুল এলোমেলো, কেটে ছিঁড়ে গেছে শরীরের এখানে- সেখানে। অথচ কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার, নিশিতে পাওয়া মানুষের মত হনহন করে হাঁটছে! মাথাটা ঝুলে পড়েছে বুকের ওপর, দৃষ্টি মাটির দিকে।
‘শারমিন! কী হয়েছে তোমার, কোথায় গিয়েছিলে?’ এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধ চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল আশরাফ।
আস্তে করে মুখ তুলে ওর দিকে তাকাল শারমিন। বুকে একটা ধাক্কার মত খেল আশরাফ। কোন মানুষের চোখে অমন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি আগে কখনও দেখেনি। পরমুহূর্তেই ওর বুকের ওপর এলিয়ে পড়ল মেয়েটা। জ্ঞান হারিয়েছে!
.
তিন
পুলিশকে আসতে মানা করে ডাক্তারকে ফোন করল আশরাফ। প্রাথমিক চিকিৎসা ভালই জানা আছে ওর, সে পর্ব শেষ করে শারমিনকে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়েছে। জ্ঞান ফিরেছে ওর, কিন্তু প্রলাপ বকছে। জ্বরও এসেছে গা কাঁপিয়ে।
চিন্তিত মুখে বিছানার পাশে বসে আছে আশরাফ, দৃষ্টি স্ত্রীর মুখে স্থির। এক রাতেই ধসে গেছে শারমিনের অনিন্দ্যসুন্দর মুখশ্রী। জায়গায় জায়গায় ছড়ে যাওয়ার দাগ, আলুথালু চুল; আর ফাটা ঠোঁট দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘ দিন ক্লেশের জীবন কাটানো কোন অতি অসুস্থ ব্যক্তি সে।
ডাক্তার এসে পৌঁছলেন সকাল এগারোটার দিকে। রোগিণীকে পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে বললেন, জ্বর ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। তবে কোন কারণে বড় রকমের মানসিক ধাক্কা খেয়েছে মেয়েটা, তাই আপাতত কিছু ঘুমের ওষুধ দিয়ে যাচ্ছেন, পরে রোগিণী একটু প্রকৃতিস্থ হলে আবার আসবেন।
বিকাল তিনটার দিকে শারমিনের জ্বর ছেড়ে গেল। চোখ মেলল ও। শিয়রে বসা আশরাফের দিকে তাকিয়ে দুর্বল কণ্ঠে শুধাল, ‘কী হয়েছে আমার?’
চমকে উঠল আশরাফ, সারারাত ঘুমায়নি-তার উপর রয়েছে প্রচণ্ড মানসিক চাপ। বসে থাকতে-থাকতে তাই একটু ঝিমুনি এসেছিল ওর। তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে শারমিনের হাতদুটো নিজের হাতে তুলে নিল ও, বলল, ‘কিছু হয়নি তোমার, সোনা। এখন ঘুমাও, পরে এ নিয়ে কথা বলব।’
কিন্তু শুনল না শারমিন, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসল। ‘রাতে পানি খাবার জন্যে উঠেছিলাম,’ ভাঙা গলায় বলল ও, ‘তারপর আর কিছুই মনে করতে পারছি না। অথচ শরীর এত ক্লান্ত লাগছে, যেন কঠিন কোন অসুখ থেকে উঠেছি!’
আশরাফ ভেবেছিল আলাপ করার অবস্থা নেই শারমিনের, তাই ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়াই ভাল, কিন্তু যখন দেখল মোটামুটি স্বাভাবিক গলায় কথা বলতে পারছে, তখন ভাবল গতরাতের ব্যাপারটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চুকিয়ে ফেলাই ভাল। একটু ইতস্তত করে তাই শুরু করল, একে-একে বলে গেল ওর ঘুম ভাঙার পর থেকে শারমিনের ফিরে আসা পর্যন্ত যা-যা ঘটেছে সব। শুনতে-শুনতে ক্রমশ পাংশু আকার ধারণ করল শারমিনের মুখ। দু’একবার শিউরেও উঠল
‘এখন বলো আসলে কী হয়েছিল?’ কথা শেষ করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল আশরাফ।
‘আমি তো কিছুই মনে করতে পারছি না!’ কেঁদে ফেলবে যেন শারমিন, ‘আমি, আমি…’ ভাষা হারিয়ে ফেলল সে।
‘আচ্ছা, আচ্ছা, এখন মনে করতে হবে না।’ ডাক্তারের দেয়া ঘুমের ওষুধ এগিয়ে দিল আশরাফ, ‘তুমি অসুস্থ। আপাতত সেঁটে ঘুম দাও, পরে দেখা যাবে।’
বাধ্য মেয়ের মত হাত বাড়িয়ে ওষুধ নিল শারমিন।
তারপর কেটে গেছে বেশ কয়েকদিন। শারমিন এখন সুস্থ, কিন্তু সেরাতে কী হয়েছিল মনে করতে পারেনি অনেক চেষ্টা করেও। ডাক্তার এসে বারকয়েক দেখে গেছেন এর মাঝে। তিনি বলেছেন হয়তো স্লিপ ওয়াকিং-এর অভ্যাস আছে ওর, ঘুমের ঘোরে বেরিয়ে গিয়েছিল। যদিও আগে কখনওই এমন কিছু ঘটেনি, তবু আর কোন কারণ বের করতে না পেরে যুক্তিটা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে তরুণ দম্পতি এর মাঝে আর অস্বাভাবিক কিছু করেনি শারমিন অবশ্য আশরাফও সাবধান হয়ে গেছে। ঘুমানোর সময় এখন দরজার সামনে একটা চেয়ার রেখে দেয়, যাতে শারমিন বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করলে শব্দ পাওয়া যায়।
সপ্তাহখানেক নির্বিঘ্নেই কাটল, তারপর এক রাতে আবার ঘুম ভেঙে গেল আশরাফের। চেয়ারটা সরাচ্ছে শারমিন, সেই শব্দেই ব্যাঘাত ঘটেছে ওর ঘুমের। ‘শারমিন!’ ডাকল ও, উত্তর নেই। ওদিকে চেয়ার সরিয়ে দরজা খুলে ফেলেছে মেয়েটা।
লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে ওকে আটকাতে চাইল আশরাফ, কিন্তু ধরতে পারার আগেই তীব্র বেগে ছুটে বেরিয়ে গেল শারমিন। স্বাভাবিক অবস্থায় একটা মেয়ের পক্ষে অত দ্রুত ছোটা এক কথায় অসম্ভব। পিছু নিল আশরাফ, কিন্তু নিচে নেমে দেখল সদর দরজা হাট করে খোলা। বাইরে ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে শারমিন। চেঁচিয়ে লোকজন ডাকতে ডাকতে পিছু নেবার চেষ্টা করল আশরাফ, কিন্তু লাভ হলো না।
অন্ধকারে জোরে ছোটা সহজ কথা নয়। শারমিন কী করে পারছে সেটা এক রহস্য। আশরাফ গেটের কাছে পৌঁছতে-পৌঁছতেই দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল সে।
মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল আশরাফ। কিছু একটা ঘটতে পারে ভেবেছিল বটে, তাই বলে এমন কিছু আশা করেনি। আবার খোঁজাখুঁজির চেষ্টা নেয়া হলো, কিন্তু সেই একই অবস্থা।
এবারও আজানের কিছুক্ষণ পর ফিরল শারমিন এবং এসেই লুটিয়ে পড়ল জ্ঞান হারিয়ে।
আর হেলাফেলা করা যায় না!
পরদিনই বউকে নিয়ে ঢাকা চলে এল আশরাফ। ওকে নিয়ে গেল বড় এক সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। কিন্তু অনেকভাবে পরীক্ষা করে, বেশ কয়েকবার ডাক্তার পাল্টেও কোন রোগ ধরা পড়ল না। এমনিতে সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক শারমিনের আচরণ, কোন অসঙ্গতি নেই। শেষে সবাই একই রায় দিলেন-ঘুমের ঘোরে হাঁটে ও। তাঁদের মতে ও একজন স্লিপ ওয়াকার, যার কি না হঠাৎ-হঠাৎ আউটবাস্ট হয়।
ঢাকায় সপ্তাহ দুয়েক থাকল ওরা, এর মাঝে কোন সমস্যা হলো না। তখন নতুন কিছু ওষুধপত্র নিয়ে আবার খামারে ফিরে চলল দু’জনে। এমনিতে সুস্থ রইলেও বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে শারমিনের আচার-আচরণে। প্রথমত, নিয়মিত কড়া ঘুমের ওষুধ খেতে হচ্ছে বলে বেশ নির্জীব ইদানীং, আর সার্বক্ষণিক একটা দুশ্চিন্তা যেন কুরে-কুরে খায় ওকে। ওর এই অবস্থা দেখে আশরাফও খুব মুষড়ে পড়েছে।
যাই হোক, খামারে ফিরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আশরাফ। বেশ ক’দিন অনুপস্থিত থাকায় অনেক কাজ জমে গেছে। ভালয় ভালয় কেটে গেল বেশ ক’টা দিন। শারমিনও সামলে নিয়েছে। আশা করছে নিয়ম করে ওষুধ খেলে ওই বিশ্রী ব্যাপারটা ঘটবে না আর।
শীত এখন প্রায় শেষের দিকে। মৌসুম পরিবর্তন মানেই আশরাফের কাজের চাপ বেড়ে যাওয়া। সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে মড়ার মত ঘুমায় বেচারা। সেকারণেই হয়তো সেরাতে সময় মত জাগতে পারল না। ও যখন টের পেয়েছে-চেয়ার সরিয়ে ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে শারমিন। ধড়মড় করে উঠে বসে কী করবে ভাবার চেষ্টা করল আশরাফ। থামানোর চেষ্টা করে যে লাভ হবে না, সেটা আগের বার বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছে-তাই সে চিন্তা বাদ দিল। ভাবল, বরং পিছু নিয়ে দেখা যাক কোথায় যায় ও, আর কী-ই বা করে? আগের বার ওর হস্তক্ষেপের কারণেই অমন পাগলের মত ছুট লাগিয়েছিল শারমিন, তাই এবার আর সেই ভুল করল না। পা টিপে-টিপে বেরিয়ে এল বউয়ের পিছু-পিছু।
আজ স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটছে শারমিন, বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরণ করে চলল আশরাফ। একে অন্ধকার, তাই জুতো ছাড়া পথ চলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ওকে। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেল। আজকে ওর জানতেই হবে রহস্যটা আসলে কোথায়। ইন্টারনেটে স্লিপ ওয়াকিং নিয়ে অনেক ঘেঁটেছে গত কয়েক দিনে, বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথাও বলেছে, কিন্তু এমন অদ্ভুত কেসের কোন উল্লেখ পায়নি কোথাও-আরও গূঢ় কোন ব্যাপার আছে এর মধ্যে!
হাঁটতে-হাঁটতে বেশ অনেক দূর চলে এসেছে শারমিন, কিন্তু থামার কোন লক্ষণ দেখা গেল না ওর মাঝে। অবাক হয়ে আবিষ্কার করল আশরাফ, ওরা এখন অবস্থান করছে সেই শ্মশানটার কাছে। যেখানে রয়েছে সেই কালী মন্দির। অবচেতন মনের কোন গহীন কোণে যেন এই আশঙ্কাটাই লুকিয়ে ছিল ওর। এমনিতে সে শিক্ষিত মানুষ, কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না; কিন্তু এই মুহূর্তে ব্যাপারটাকে হেলাফেলা করছে না মোটেও। সেদিনের সেই অদ্ভুত বাতাসের ঝাপ্টার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল তার।
শ্মশানে পৌঁছে গেছে ওরা। নিঝুম রাত, খোলা মাঠে চাঁদের আলো ছিল, কিন্তু এখানে গাছপালার ভিড়ে সেই আলো পৌঁছতে পারছে না। খুব আবছাভাবে শারমিনের অবয়বটা দেখছে আশরাফ। তা-ও দেখত না, যদি ওর পরনে উজ্জ্বল রঙের কাপড় না থাকত।
ধীর পায়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল শারমিন। দুরুদুরু বুকে পিছু নিল আশরাফ। কিন্তু কাছে গিয়ে আর ভেতরে ঢুকল না শারমিন, বরং ঘুরে চলে গেল পেছন দিকে। তারপর সে যা করল, তার জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না আশরাফ। হ্যাঁ, অনেকগুলো চমক সে ইতিমধ্যে পেয়েছে, তবু এমনটা আশা করেনি।
মন্দিরের পেছনে রয়েছে অতি প্রাচীন এক বটগাছ। বিশাল সেই মহীরুহ অনাদিকাল থেকে মন্দিরের গায়ে তার শেকড় বাকড় প্রবেশ করিয়ে আসছে। জায়গায় জায়গায় দেয়াল ধসে পড়ার পেছনে এটা একটা প্রধান কারণ। সেই গাছের সামনে গিয়ে মুহূর্তের জন্যে থেমে দাঁড়াল শারমিন। তারপর আশরাফের পিলে চমকে দিয়ে ঠিক বানরের মত তরতর করে উঠে পড়ল গাছটাতে! দেখতে- দেখতে মগডালে পৌঁছে গেল সে।
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না আশরাফ। এটা কী করে সম্ভব? শারমিন, যে কি না আজীবন শহরে বড় হয়েছে, তার পক্ষে ওভাবে এত বড় গাছের চূড়ায় উঠে যাওয়া কল্পনাতীত। তা-ও আবার এমন তরতরিয়ে! কিন্তু সেটাই ঘটেছে। আশরাফ একবার ভাবল ডাকবে স্ত্রীকে, কিন্তু এমন অবস্থায় ওকে চমকে দিলে পড়ে গিয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। অবশ্য ইতিমধ্যেই যা ঘটেছে, তারপর আর বাকি থাকে কী?
প্রায় ঘণ্টাখানেক গাছের মগডালে পা ঝুলিয়ে বসে রইল শারমিন, এর মাঝে বার দুয়েক উচ্চ স্বরে কী যেন বলেছে, কিন্তু অর্থ বুঝতে পারেনি আশরাফ। আজানের মিনিট বিশেক আগে গাছ থেকে নেমে এল মেয়েটা, তারপর হনহন করে ফিরে চলল খামার অভিমুখে। পেছনে এক রাশ ভয় মিশ্রিত বিস্ময় নিয়ে অনুসরণ করল তার স্বামী।
পরদিন ভোরে শারমিন যখন গভীর ঘুমে অচেতন, স্থানীয় এক হুজুরের সঙ্গে দেখা করতে গেল আশরাফ। ওকে এই ঠিকানা এবং পরামর্শ দিয়েছে জামশেদ। এমনিতে আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় ভরসা নেই আশরাফের। আজীবন বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছে সে, কুসংস্কারকে মনে-প্রাণে ঘৃণা করে। কিন্তু কাল রাতে ওর ভিত নড়ে গেছে। সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন হুজুর, ‘দেখুন, বাবা, ওই কালী মন্দির জায়গাটা ভাল না। ওইখানে যাওয়াই ঠিক হয়নি আপনাদের।’
‘যা হবার তা তো হয়েই গেছে, মাওলানা সাহেব। এখন কী করা যায়, সেটাই বলুন দয়া করে।’ মিনতি ঝরে পড়ল আশরাফের কণ্ঠে।
‘অত্যন্ত খারাপ কোন কিছুর নজর পড়েছে আপনার স্ত্রীর ওপর,’ বললেন হুজুর, ‘আমার বিদ্যায় কুলাবে না। তবে আরেকজন বড় হুজুর আছেন, তাঁর কাছে গিয়ে দেখতে পারেন। আপনার স্ত্রীকেও সঙ্গে নিয়ে যাবেন।’
ভগ্ন মনে খামারে ফিরল আশরাফ। শারমিনের জ্ঞান ফিরেছে। যথারীতি বিমর্ষ। কিন্তু মোটেও বিলম্ব করল না আশরাফ। সেদিনই বিকেলে বউকে নিয়ে হাজির হলো সেই বড় হুজুরের দরবারে। শারমিনকে দেখেই চমকে উঠলেন বৃদ্ধ হুজুর, গম্ভীর হয়ে গেল তাঁর মুখ। সময় নিয়ে ওদের বক্তব্য শুনলেন তিনি, তারপর আশরাফের সঙ্গে একান্তে কিছুক্ষণ কথা বলতে চাইলেন।
শারমিন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে নিচু গলায় শুরু করলেন হুজুর, ‘তোমার কপাল বড় খারাপ। যে জিনিসের প্রভাব তোমার স্ত্রীর ওপর পড়েছে, তা অতি ভয়ানক। ওকে বাঁচানো যাবে কি না আমি সে নিশ্চয়তা দিতে পারছি না।’
ঢোক গিলল আশরাফ, ‘কোন একটা উপায় নিশ্চয়ই আছে, হুজুর? কী করতে হবে একবার শুধু বলুন।’
এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লেন হুজুর, ‘দেখো, যে উপায় আছে, তাতে কাজ হবে কি না জানি না। কিন্তু সেই উপায় না হলে তুমিও মারা যেতে পারো। নেবে এত বড় ঝুঁকি?’
‘হ্যাঁ, নেব!’ বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে জবাব দিল আশরাফ।
‘ঠিক আছে, আগামী কাল আসবে, আমি একটা পানি পড়া দেব, গলা নামিয়ে আনলেন হুজুর, যেন কেউ শুনে ফেলবে এমন ভাবছেন। ‘আগামী পূর্ণিমার রাতে, ওই শ্মশানে যাবে তুমি, একা!’
‘গিয়ে?’ আশরাফের গলা কাঁপছে।
ওর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন হুজুর, ‘তোমাকে মনে হয় মৃত্যুর মুখেই ঠেলে দিচ্ছি, কিন্তু বুঝতে পারছি তুমি হাল ছাড়ার বান্দা নও। যাই হোক, শ্মশান থেকে গ্রামে যাবার আইলের ওপর দাঁড়াবে তুমি। খবরদার মনে কোন প্রকার ভয়কে স্থান দেবে না। তা হলে মৃত্যু নিশ্চিত! মাঝরাতে, চাঁদ যখন ঠিক মাথার ওপর থাকবে, তখন কাউকে ওই গ্রাম থেকে মন্দিরের দিকে আসতে দেখবে তুমি। ঠিক কী রূপে সে আসবে, আমি জানি না, তবে কোন একটা জন্তুর পিঠে সওয়ার থাকবে সে।’ একটু বিরতি দিলেন তিনি। তারপর বললেন, ‘তার গায়ে পানি পড়া ছিটিয়ে দিতে হবে তোমাকে। তবে আবারও বলছি-মনে ভয় থাকা চলবে না। তা হলে কাজ তো হবেই না, বরং তোমাকে শেষ করে দেবে ওটা। পানি পড়া ছিটিয়ে দেবার পর এক দমে তিনবার আল্লার নাম নিয়ে ওর মুখের সামনে জোরে হাততালি দেবে একবার। তারপর ঘুরে চলে আসবে। খবরদার! পেছনে তাকাবে না! তা হলে মৃত্যু নিশ্চিত! ফেরার পথে একমনে আল্লার কাছে তোমার বউয়ের রোগমুক্তি চাইবে। যদি এই সবকিছু ঠিকঠাক মত করতে পারো, তো আর বিপদ হবে না ইনশাল্লাহ্। কিন্তু যদি কোথাও একটুও ভুল হয়…’ হাত দিয়ে নিজের গলা কাটার ভঙ্গি করলেন তিনি।
.
চার
পূর্ণিমার রাত, রুপোর থালার মত চাঁদ হাসছে আকাশে। চারদিকে থৈ-থৈ ভরা জ্যোৎস্না। মাঝরাত হতে মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। শ্মশানের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আশরাফ। ওর এক হাতে ছোট্ট একটা শিশি, অন্য হাত পকেটে
আপ্রাণ চেষ্টা করছে মাথায় কোন ভয় উদ্রেককারী চিন্তা ঠাঁই না দিতে। কিন্তু ঘুরেফিরে শুধু সেসবই আসছে মনের পর্দায়। কখনও মনে হচ্ছে কী করে শবদাহ করা হত এই শ্মশানে, আবার কখনও অনিচ্ছা সত্ত্বেও খেয়ালে পড়ে যাচ্ছে সেরাতে শারমিনের গাছ বেয়ে উঠে যাবার দৃশ্যটা।
ওর পকেটে একটা রিভলভার। লাইসেন্স করা .৩২, শহর থেকে দূরে একা- একা থাকে, তাই চোর-ডাকাতের হাত থেকে নিরাপত্তার জন্য কিনেছিল। অবশ্য আজ যে জিনিসের মুখোমুখি হতে চলেছে-ওটা কোন কাজে আসবে বলে মনে হয় না। তবু সঙ্গে রাখা।
আকাশের দিকে তাকাল সে, চাঁদ প্রায় মধ্য গগনে। উত্তেজনায় ঠিকমত ভাবতেও পারছে না। আসলে কী আসবে? কীসে সওয়ার হয়ে? গত কয়েকটা দিন অবিরাম এই প্রশ্নগুলো বারবার ঘুরপাক খেয়েছে ওর মনে। আবার কখনও মনে হয়েছে, আদৌ কিছু আসবে কি? নাকি পুরো ব্যাপারটাই ওই হুজুরের বুজরুকি- হয়তো কোন বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আছে শারমিনের কার্যকলাপের।
ওর ঘড়িতে ক্রিং করে একটা শব্দ হলো- অ্যালার্ম।
তার মানে, আর এক মিনিট বাকি। শক্ত করে শিশিটা আঁকড়ে ধরল আশরাফ। কিন্তু পরমুহূর্তেই চমকে উঠল। নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিল কোন অবস্থাতেই ভয় পাবে না। কিন্তু তাই বলে এই রকম কিছু দেখে ভয় না পেয়ে থাকা যায় কীভাবে?
ওর থেকে গজ পঞ্চাশেক সামনে হঠাৎ উদয় হয়েছে ভয়ঙ্কর দর্শন এক মূর্তি। উত্তপ্ত মস্তিষ্কের সবচেয়ে ভয়াল দুঃস্বপ্নেও এমন কিছু কল্পনা করেনি কখনও আশরাফ। হুজুর যখন বলেছিলেন, কোন কিছুতে সওয়ার হয়ে আসবে ওটা, ও ভেবেছিল হয়তো ঘোড়া বা ওই জাতীয় কিছু হবে বাহনটা। কিন্তু যা এসেছে, সেটা বসে আছে একটা বাঘের পিঠে! বাঘটাও সাধারণ কোন বাঘ নয়। ওটার গায়ের রঙ ধবধবে সাদা, চাঁদের আলোয় চকচক করছে কালো ডোরাগুলো। হাঁ করে থাকা মুখে ঝকঝক করছে তীক্ষ্ণধার শ্বদন্ত! কিন্তু বাঘটাকে যতটা না ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিভীষিকাময় লাগছে তার সওয়ারকে।
মানুষের মতই আকৃতি, কিন্তু মাথায় সূচালো একটা শিং! সারা গা মাছের আঁশের মত কিছুতে ঢাকা। চোখদুটোতে উজ্জ্বল সবুজ আলো জ্বল জ্বল করছে। অবয়বটার ভেতর এমন অশুভ কিছু আছে, যে হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হলো আশরাফের, মনেই রইল না হুজুরের সাবধান বাণী। ভয়ের শীতল স্রোত নেমে গেল ওর শিরদাঁড়া বেয়ে। ভুলে গেল প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা, বিস্মৃত হলো প্রতিজ্ঞা। কখন যে ঘুরে দৌড় দিয়েছে নিজেও বলতে পারবে না। কয়েক কদম গিয়েছে কি যায়নি, এমন সময় পেছন থেকে শোনা গেল বাঘের ক্রুদ্ধ গর্জন। হোঁচট খেয়ে পড়তে-পড়তে কোনমতে সামলে নিল আশরাফ, ভয়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে গেছে। পাঁই করে ঘুরল ও। পানি পড়ার আর কোন মূল্য নেই-হুজুর বারবার বলে দিয়েছেন ভয় পাওয়া চলবে না, তা হলে নষ্ট হবে ওটার গুণ; কিন্তু এখন ভয়ের সাগরে ডুবে গেছে ও। মৃত্যু এখন সামান্য সময়ের ব্যাপার-শেষ চেষ্টা হিসেবে পকেট থেকে রিভলভারটা বের করল ও।
ছুটে আসছে বাঘটা, অবিশ্বাস্য তার গতিবেগ। লক্ষ্যস্থির করার সময় নেই, কোনমতে বাগিয়ে ধরেই রিভলভারের ট্রিগার টেনে দিল আশরাফ।
গুলির বিকট আওয়াজ চাপা পড়ে গেল বাঘের কান ফাটানো গর্জনে। গুলি লেগেছে! কিন্তু .৩২ ক্যালিবারের রিভলভারের গুলি ছুটে আসা বাঘকে থামাতে পারে না। গতি কিছুটা মন্থর হলো, কিন্তু তারপরও প্রায় উড়ে এসে আশরাফের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ওটা। ধাক্কার চোটে চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল আশরাফ, হাত থেকে ছিটকে গেল রিভলভার। চোখ বন্ধ করে ফেলল ও, সময় উপস্থিত-মনের পর্দায় ভেসে উঠল শারমিনের সুন্দর মুখটা। ‘বিদায়, প্রিয়তমা! পারলাম না তোমাকে বাঁচাতে!’ অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল ও।
কিন্তু গলায় দাঁত বিঁধে যাওয়ার বদলে যেন বিস্ফোরিত হলো ওর কানের পর্দা। আশরাফের মনে হলো কেউ যেন কামান দেগেছে আশপাশে। তরল, গরম কী যেন এসে পড়ল ওর মুখের ওপর। চোখ মেলল ও, ওর বুকের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বাঘটার ভারী শরীর, নড়তে দিচ্ছে না ওকে। মাথার প্রায় অর্ধেকটা উড়ে গেছে বাঘের-ওটার রক্ত আর মগজই এসে পড়েছে ওর চোখে- মুখে। শিউরে উঠল আশরাফ। তারপর এদিক-সেদিকে তাকাল বোকার মত। কী ঘটেছে বোঝার চেষ্টা করছে।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে অচেনা এক লোক। পরনে আপাদমস্তক কালো পোশাক। ট্রেঞ্চ কোট আর বুট দেখে মনে হচ্ছে হলিউডের কোন সিনেমা থেকে উঠে এসেছে যেন! একহাতে সে বাগিয়ে ধরে আছে একটা পিস্তল। কিন্তু জীবনে এত বড় আকারের পিস্তল আর দেখেনি আশরাফ।
লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে একটু আগে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে থাকা দানবটা। নিজের পায়ে দাঁড়ানোতে বোঝা যাচ্ছে মানুষের মত আকার হলেও উচ্চতার দিক থেকে বেশ এগিয়ে আছে ওটা। সাত ফুটেরও বেশি হবে লম্বায়।
‘আমার শিকার ছিনিয়ে নেবার আস্পর্ধা তোর হলো কী করে?’ আগন্তুকের উদ্দেশে খেঁকিয়ে উঠল ওটা। অমানুষিক জান্তব কণ্ঠস্বর, কেমন যেন ঘড়ঘড়ে, শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়।
‘আমার কাজই তো এটা!’ জলদগম্ভীর গলায় জবাব দিল আগন্তুক, ফুঁ দিয়ে পিস্তলের নল থেকে ধোঁয়া সরাচ্ছে সে। সামনে দাঁড়ানো অপার্থিব জিনিসটা তার ওপর কোন প্রভাব ফেলছে বলে মনে হলো না আশরাফের।
হঠাৎই লাফ দিল দানবটা, কোন কিছু এত ক্ষিপ্র গতিতে নড়তে পারে, বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো আশরাফের। চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখল ধারাল নখযুক্ত একটা থাবা চালিয়েছে ওটা আগন্তুককে লক্ষ্য করে। আবার গর্জে উঠল পিস্তল, তারপর আবারও। কিন্তু গুলি লাগল কি না ঠিক বোঝা গেল না। তবে পিছিয়ে গেছে জিনিসটা। আশরাফ দেখল ওটার গা থেকে ঝরে পড়ছে ফোঁটা-ফোঁটা কালচে রক্ত। তার মানে গুলি ওকে আঘাত করেছে। কিন্তু থামল না দানব, আবার তেড়ে গেল আগন্তুককে লক্ষ্য করে। ওটার গলার গভীর থেকে উঠে আসছে রক্তহিম করা ক্রুদ্ধ গর্জন।
বাউলি কেটে একপাশে সরে যেতে চাইল আগন্তুক, কিন্তু পুরোপুরি সফল হলো না। দানবের থাবা লাগল তার ট্রেঞ্চ কোটে। অদ্ভুত একটা লালাভ নকশা ক্ষণিকের জন্যে ফুটে উঠল কোটের গায়ে। ছিটকে বেরোল স্ফুলিঙ্গ, যেন গরম লোহায় হাতুড়ির বাড়ি পড়েছে। ধাক্কার চোটে পড়ে গেল সে, আবার তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল দানবটা।
শেষ মুহূর্তে খুব কাছ থেকে গুলি চালাল আগন্তুক।
আর্তনাদ করে লাফিয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে গেল দানবটা। কুঁজো হয়ে দাঁড়াল, ভয়ঙ্কর মুখ ব্যাদান করে তীব্র আক্রোশ নিয়ে তাকাল লোকটার দিকে। ওটার গা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল কালো ধোঁয়ার মত কী যেন।
ঠিক কী যে হচ্ছে বোধগম্য না হলেও দানবটা যে আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা ঠিকই বুঝল আশরাফ। ওদিকে উঠে পড়েছে আগন্তুক, দাঁড়িয়ে আছে দুই পা ফাঁক করে। অদ্ভুত ভঙ্গিতে তুলে ধরছে বাম হাতটা। কনিষ্ঠা এবং অনামিকা বাঁকানো এবং বাকি তিনটে আঙুল সোজা।
কালো ধোঁয়ার মত জিনিসটা জমাট বাঁধতে শুরু করল আশরাফের চোখের সামনে। তারপর ওটা রূপ নিল একটা গোলকে-দুর্বোধ্য কিছু শব্দ উচ্চারণ করল দানবটা, সামনে ঠেলে দেবার ভঙ্গি করল দুই হাত। সেই ইশারায় অন্ধকার গোলকটা তীব্র গতিতে ধেয়ে গেল আগন্তুকের দিকে।
আশরাফের মনে হলো সিনেমা দেখছে ও।
‘হুবড়িজাহ নোজাই!’ চাপা কিন্তু দৃঢ় স্বরে অদ্ভুত শব্দদুটো উচ্চারণ করল আগন্তুক। তার এগিয়ে দেয়া বাম হাতের তালু থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল অত্যন্ত উজ্জ্বল নীলাভ এক আগুনের ঝলক। ধাবমান কালো গোলকটার সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে ওটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে সেই ঝলক আঘাত করল দানবটাকে।
শব্দহীন বিস্ফোরণ! আশরাফ দেখল উধাও হয়ে গেছে দানবের কাঁধ এবং মাথাসহ দেহের ওপরের অর্ধেকটা।
.
‘আমার নাম অবলাল!’ আশরাফের প্রশ্নের জবাবে বলল রহস্যময় আগন্তুক। দানবটাকে শেষ করার পর অবলীলাক্রমে বাঘটার ভারী মৃত দেহটা টেনে সরিয়ে নিয়েছে সে আশরাফের ওপর থেকে। মানুষ গায়ে এতটা শক্তি কী করে ধরে, ভেবে পাচ্ছে না আশরাফ। তবে এ-ও সত্যি, মানুষ কী করে হাত থেকে আগুনের গোলা নিক্ষেপ করতে পারে, সেটারও কোন ব্যাখ্যা জানা নেই ওর।
এখনও বিহ্বলতা কাটাতে পারছে না আশরাফ। ‘ও-ওটা, কী ছিল?’ তোতলাতে তোতলাতে কোনমতে জানতে চাইল অবলালের কাছে।
‘কী ছিল তা জেনে আর কী করবেন?’ ট্রেঞ্চ কোটের পকেট থেকে একটা পাইপ বের করে তাতে তামাক ঠাসতে ঠাসতে বলল অবলাল, ‘ওটা একটা সাধক পিশাচ।’
‘মানে? সাধক আবার পিশাচ? কিছুই তো বুঝতে পারছি না!’
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আগন্তুক, ‘এসব ব্যাপারে যত কম জানবেন ততই ভাল-তবু বলছি। পৃথিবীটা আমরা চামড়ার চোখে যেমনটা দেখি, আসলে মোটেও তেমন নয়। আমাদের তথাকথিত ব্যাখ্যার বাইরে রয়েছে বিশাল এবং রহস্যময় এক অতিপ্রাকৃত জগৎ!’
সম্মোহিতের মত মাথা দুলিয়ে আগন্তুকের কথা শুনছে আশরাফ।
‘আমার কাজ অনেকটা পুলিশের মত,’ বলে চলল অবলাল, ‘তবে সাধারণ ক্রিমিনালের পেছনে না দৌড়ে আমি অতিপ্রাকৃত দুষ্কৃতিকারীদের নিয়ে কাজ করি। আজ যে জিনিসটা এখানে এসেছিল, সে কোন এক কালে হয়তো মানুষই ছিল, কিন্তু কালো জাদুর চর্চা করে পরিণত হয়েছে পিশাচে। অশুভ শক্তির পূজারী এধরনের পিশাচদের ক্ষমতা গড়পড়তা থেকে বেশিই হয়। আর যা বুঝলাম, বিভিন্ন মানুষের জীবনীশক্তি আত্মসাৎ করছিল ওটা। আপনার স্ত্রীও ওরই শিকার। কালী মন্দির জায়গাটা ফাঁদ হিসেবে আদর্শ, আর সন্ধ্যার সময় ওখানে গিয়ে বোকার মত সেই ফাঁদে পা দিয়েছে সে। কষ্টি পাথরের ওই মূর্তিটা ছিল টোপ, ওটা স্পর্শ করার সঙ্গে-সঙ্গেই পিশাচের প্রভাবের জালে জড়িয়ে যায় আপনার স্ত্রী। যাই হোক, আর বিস্তারিত আপনার না জানলেও চলবে, বিপদ কেটে গেছে-এখন বাড়ি গিয়ে ঘুম দিন।’ পাইপটা ধরিয়ে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল সে, ‘আজ রাতে যা দেখেছেন, ভুলে যান! এরপর থেকে পরিত্যক্ত মন্দির এড়িয়ে চলবেন।’
‘সেটা আর বলতে হবে না, ন্যাড়া একবারই যায় বেল তলায়!’ একটু আগের রোমহর্ষক ঘটনাটা মনে পড়ে যেতে শিউরে উঠল আশরাফ।
‘চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিচ্ছি।’
খামারের গেট পর্যন্ত আর কোন কথা হলো না ওদের মাঝে। পুরো ব্যাপারটাই স্বপ্নের মত লাগছে আশরাফের কাছে। সদর দরজার কাছে এসে থেমে দাঁড়াল আগন্তুক, ‘ঠিক আছে তা হলে, ভাল থাকবেন।’
‘ঠিক সময় মত হাজির হয়েছিলেন আপনি,’ বলল আশরাফ, ‘কিন্তু কী করে জানলেন যে আমি ওই সময়ে থাকব ওখানে?’
‘যে মাওলানা আপনাকে পানি পড়া দিয়েছিলেন, তিনি আন্দাজ করেছিলেন আপনি সাহস ধরে রাখতে পারবেন না, তাই আমাকে বিষয়টা জানান। আর যেহেতু আমার দায়িত্ব এসব অতিপ্রাকৃত অশুভ প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত রাখা, তাই চলে এলাম। যাই হোক, আসি, শুভ রাত্রি।’
‘আপনি আমার এবং আমার স্ত্রীর জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছেন, অবলাল ভাই, এভাবে খালি মুখে আপনাকে ছেড়ে দিই কী করে? এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যান?’
বেমানান শিশুসুলভ হাসি খেলে গেল অবলালের ঠোঁটের কোণে, ‘কফি হলে রাজি আছি।’
.
সৈয়দ অনির্বাণ
