নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

পানিমুড়া – শাহেদ জামান

পানিমুড়া

গতকাল দুপুর থেকে আমার গলায় কাঁটা বিঁধে আছে। চিতল মাছের কাঁটা। গ্রামের বাড়ি থেকে ছোট মামা এসেছেন গতকাল। সঙ্গে করে আরেকজন লোককে নিয়ে এসেছেন। তার মাথায় বিশাল একটা ঝুড়ি। ঝুড়ির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল গ্রামে পাওয়া যায় এমন কোন শাকসবজি, ফলমূল বা মাছ, মুরগি মামা আনতে বাদ রাখেননি। শুকনো লোকটা কী করে ওই বিশাল ঝুড়ি মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা ভেবে খুবই অবাক লাগছিল। আরও অবাক হলাম যখন দেখলাম ওই ঝুড়ি মাথায় নিয়েই সে মাকে একটা লম্বা সালাম দিয়ে দিল। সাথে ফিক করে একটা হাসি।

ঝুড়ি থেকে একটা দশাসই সাইজের চিতল মাছ বের করে ছোট মামা মা’র হাতে দিয়েছেন। তারপর কাঁচা-পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেছেন, ‘ফাশকেলাস কইরা ভুনা কইরা ফ্যাল। ত্যাল চুইয়া-চুইয়া পড়তাছে। তাড়াতাড়ি করবি। আমার হাতে মেলা কাজ। বেশি বিলম্ব করা যাইব না।’

মা দুপুরে সেই চিতল মাছ দিয়ে অসাধারণ ভুনা করেছেন। গোগ্রাসে খেতে গিয়ে বুঝলাম গলায় কাঁটা আটকেছে। সেই যে আটকাল, এখনও খোলেনি। নিজেকে বড়শিতে বেঁধা মাছের মতই মনে হচ্ছে। ছিপ যার হাতে সে আমার অবস্থা দেখে ভালই মজা পাচ্ছে মনে হয়।

আমার অবস্থা এদিকে খারাপ, কিন্তু কারও কোন বিকার দেখতে পাচ্ছি না। মা ছোট মামার আদর-আপ্যায়নে ব্যস্ত। ছোট মামা যদিও বলেছেন তাঁর মেলা কাজ আছে, কিন্তু কাল দুপুরের পর থেকে ঘুমানো আর খাওয়া ছাড়া তাঁকে আর কোন কাজ করতে দেখিনি। আমার গলায় কাঁটা বিঁধেছে সেটা বোধহয় তিনি খেয়ালও করেননি। ভাবছি খাবার-দাবার যা এনেছেন, সব যদি নিজের পেটেই ঢোকান তা হলে আর লাভ কী!

বিকালের দিকে একটা মাফলার গলায় জড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। গলায় এখনও ব্যথা আছে। সেই সাথে একটু জ্বর-জ্বরও বোধ হচ্ছে। ঠিক করেছি কাউকে কিছু বলব না। হোক ব্যথা।

‘ভাইজানের কী হইছে?’

ঘুরে তাকালাম। ছোট মামার সঙ্গে যে লোকটা এসেছিল সে বারান্দার এক কোণে পা ছড়িয়ে বসে আছে। লুঙ্গি হাঁটুর উপর ওঠানো। থেকে-থেকে ঘ্যাস-ঘ্যাস করে পা চুলকাচ্ছে। এক হাতে একটা ম্যাচের কাঠি। কান চুলকাচ্ছে খুব সম্ভব। মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়িগোঁফ। এক কথায়, লোকটাকে দেখেই মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল আমার।

‘কিছু হয় নাই,’ মুখ আরেক দিকে ঘুরিয়ে জবাব দিলাম আমি।

‘মাছের কাঁড়া বিনছে গলায়, তাই না, ভাইজান?’

‘হ্যাঁ। আপনার কোন সমস্যা?’

‘না-না, কী যে কন, ভাইজান! তয় ওষুদ খান নাই?’

‘না। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।’

‘হেইডা হইতে পারে, তয় ঠিক না হইলে কী করবেন?’ গলায় মধু মাখিয়েছে যেন লোকটা।

‘সেটা আপনার জেনে কী হবে?’ মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেছে আমার। কী সব উটকো ঝামেলা! নিশ্চয়ই বাসার কারও মুখে আমার গলায় কাঁটা বেঁধার কথা শুনেছে। এখন ওস্তাদি ফলানোর চেষ্টা করছে।

‘ভাইজান, রাগ কইরেন না। আমার কাছে আইয়া বহেন। আমি কাঁড়া বিন্ধনের চিকিৎসা জানি।’

‘মানে? আপনি কি ডাক্তার?’

‘না। তয় গাঁওগেরামের মানুষ তো, এইসব টুকটাক জানতে হয়। আহেন, এইদিক আছেন।’

যাব না, যাব না করেও আমি পায়ে-পায়ে লোকটার পাশে গিয়ে বসলাম। এবার লোকটার চোখের দিকে চোখ পড়ল আমার। একটা চোখের মণি ঘোলাটে, স্থির। অর্থাৎ লোকটা এক চোখে দেখতে পায় না।

লোকটা যে-হাত দিয়ে পা চুলকাচ্ছিল সেই হাতটা দিয়েই আমার গলাটা আস্তে করে চেপে ধরল। গা ঘিন ঘিন করে উঠল আমার, কিন্তু কিছু বললাম না। দেখা যাক কী হয়!

এবার দেখলাম লোকটা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে। কয়েক সেকেণ্ড কেটে গেল। তারপর লোকটা আমার গলা ছেড়ে দিল। আর আমি হতভম্ব হয়ে আবিষ্কার করলাম আমার গলায় আর কোন অসুবিধে হচ্ছে না। চিতল মাছের কাঁটা উধাও।

আমার হতভম্ব অবস্থা লোকটাও বুঝতে পেরেছে। একগাল হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী, ভাইজান? ব্যথা আরাম হইছে?’

‘হ্যাঁ, গলায় কোন ব্যথা নেই আর!’ বললাম আমি। ‘কিন্তু, এটা কীভাবে করলেন? জাদুমন্ত্র কিছু জানেন নাকি?’

‘কী যে কন, ভাইজান! আমরা এইসব কইত্তে জানমু? এইডা কইতে পারেন পানিমুড়ার দয়া।’

‘পানিমুড়া আবার কী?’ জানতে চাইলাম।

‘পানিমুড়া হইতেছে গিয়া আপনের…ক্যামনে বুঝাই, মনে করেন এক রকমের পেরেত। বিল-বাঁওড়ে থাকে।

‘পেরেত? মানে ভূত-প্রেত?’

‘ওই তো, সব একই। মাছের কাঁড়া নামানোর এই ব্যাপারডা মনে করেন আমি তার দয়াতেই পাইছি।’ দুই হাত এক করে কপালে ঠেকাল লোকটা।

অদ্ভুত লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম আমি। এই ২০১৭ সালের ঢাকা শহরে বসে এখন আমাকে ভূতের কাহিনী শুনতে হবে? তা-ও রাতের বেলা হলে একটা কথা ছিল। কিন্তু এখন?

‘খুলে বলেন তো ব্যাপারটা!’ আমার জিদ চেপে গেছে। ইয়ার্কি পেয়েছে নাকি লোকটা আমার সঙ্গে? মনে-মনে ভাবলাম, চান্দু, আমারে তোমার গেরামের আদমি পাও নাই। গল্প শেষ করো, শুনি। বন্ধুদের কাছে হাসাহাসি করার একটা ভাল ম্যাটেরিয়াল পাওয়া গেল!

‘হুনেন তাইলে।’ লুঙ্গি গুছিয়ে আরাম করে বসল লোকটা। তারপর ম্যাচের কাঠিটা দিয়ে শেষবারের মত কানে একটা খোঁচা মেরে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দিল।

‘ছুডোবেলায় আমি অনেক বান্দর আছিলাম, বুঝছেন? সারা দিন গাছে উডা, সাঁতার কাড়া, পুলাপানের লগে বানরামি, বাইচলামি এইগুলা কইরা বেরাইতাম আমারে গেরামের লোকজন দুই চক্ষে দেখতে পারত না। আর যাগো ক্ষ্যাত- খামার বা ফলের গাছ আছিল, হ্যারা তো আরও না। সব তো মনে করেন সাবাড় কইরা দিতাম, হ্যাহ-হ্যাহ-হ্যাহ।’ দাঁত বের করে হাসল লোকটা।

‘যাউক গা। আসল কতা কই। আমাগো গেরামের পাশে একটা বিশাল বিল, আছে, বুঝছেন? আমরা কই ভেদরের বিল। হারা বছর পানি থাহে। গেরামের লোকজন মনে করেন ইচ্ছামত মাছ ধরে, খায়, বিক্রি করে। এহন অবশ্য আর আগের মত মাছ পাওন যায় না। মানুষ বাড়তাছে, আর মাছ কইমা যাইতেছে।’

আমি চুপ করে আছি। বোঝা যাচ্ছে, এই লোকের বেশি কথা বলার অভ্যাস আছে। আর কথায়-কথায় ‘মনে করেন’ বলাটা সম্ভবত এর মুদ্রাদোষ।

‘তো হেই বিলে আমি একদিন গেছি মাছ ধরতে। আমার বয়স তহন মনে করেন দশ-বারো বছর। বিকালবেলা একলা একলা ডিঙ্গি লইয়া গেছি গা। আমার তহন সেইরহম সাহস। কাউরে ডরাই না।

‘মাছ ধরতে-ধরতে কোন্ সুম সন্ধ্যা হইয়া গেছে বুঝবার পারি নাই। বেশি দেরি হইলে আবার মা ধইরা পিডাইব। চাইরদিক আন্ধার হইয়া গেছে দেইখা আমি নৌকা ঘুরানোর ভাব লইতাছি, এইসুম একটা বড়শিতে টান পড়ল। আমি ভাবলাম, তাইলে এই মাছটা ধইরাই যাই।

‘ছিপ ধইরা আমি টান দিলাম ঠিকই কিন্তু উড়াইতে পারলাম না। মনে হইল, কে জানি পানির নিচে টাইনা ধইরা রাখছে। আবার বেশি জোরে টানও দিবার পারতাছি না, সুতা ছিড়া যাইতে পারে বা ছিপ ভাইঙ্গা যাইতে পারে। একবার মনে হইল মাছ না, অন্য কিছুতে আটকাইছে। তারপরে দেহি একটানে বেশ খানিকটা সুতা লইয়া গেল। বুঝলাম, মাছই। বেশ বড় সাইজের মাছ। মনে-মনে খুশি হইয়া গেলাম, বড় মাছ লইয়া গেলে মা’য় কিছু কইতে পারব না।

‘কিন্তু মাছটারে উডাইতে যাইয়া মনে হইল, আমি না, মাছটাই আমারে লইয়া খেলতেছে। একবার টানে, আবার ঢিল দেয়। এমনে চলল প্রায় ঘণ্টা দুই। আমি ততক্ষণে ঘাইমা গোসল হইয়া গেছি। শ্যাষে মাথায় জিদ চাইপ্পা গেল। দাঁতে দাঁত কইষা আল্লার নাম লইয়া মারলাম এক টান। হয় ছিপ ভাঙব, না হইলে মাছ উঠব।

‘টানডা যেই মারলাম, ভাইজান, কী কমু আর! আন্ধার হইয়া গেলেও ততক্ষণে চান উইঠা গেছে। আকাশে চান্দের ফকফকা জোছনা আছিল। দেখলাম, প্রায় আমার সমান লম্বা, বিরাট এক বোয়াল মাছ, মুখ হাঁ কইরা আমার নৌকার পাশে দিয়া লাফ মারল। সেই মাছের মুখে আটকানো আমার বড়শি। নৌকার একপাশ দিয়া লাফ মাইরা মাছটা আরেক পাশে গিয়া পড়ল, আর সাথে-সাথে ট্যার পাইলাম, আমার এই চক্ষুটায় কী জানি বিনছে। দরদর কইরা রক্ত বাইরাইয়া আইল। ব্যথার চোটে ছিপ ছাইড়া দিলাম হাত থিকা।

‘মাছটা যেই লাফ দিছে, সাথে-সাথে বড়শিডা ওর মুখ থিক্কা ছুইটা আইসা লাগছে আমার চক্ষে। আমার মাছ ধরার কথা তহন আর মনে নাই। কোনমতে গামছা দিয়া চক্ষুড়া বাইন্ধা নৌকা ঘুরাইয়া বাড়িত আইলাম। মা’য় আমার অবস্থা দেইখা চিল্লায়া বাড়ি মাথায় তুলল, হ্যারপর হলুদ বাটা লাগাইয়া পরিষ্কার কাপড় দিয়া বাইন্ধা দিল।

‘রাত্রেবেলায় চক্ষে উঠল ব্যথা। সে কী ব্যথা, ভাইজান! মনে হইল, পুরা দুনিয়াডা আমার মাথার ভিতরে ঢুইক্কা লাফালাফি করবার লাগছে। একবার এইদিক ফিরি, আরেক বার ওইদিক। সারাডা রাইত কাটল এমনে। শ্যাষ রাইতের দিকে হালকা ঘুম আইল। তহন স্বপ্নে দেখলাম এক বুড়ারে। ধবধবা সাদা দাড়ি, আর নাকের নিচে বোয়াল মাছের লাহান লম্বা-লম্বা চিকন গোঁফ। হে আমারে কইল, ‘শোন রে, ব্যাটা, আমি হইতাছি পানিমুড়া। ওই বিলে থাহি। রাইতবিরাইতে মাছ ধরতে যাওন ঠিক না। তুই ছুড়ো মানুষ বইল্লা তোরে ছাইড়া দিছি। চক্ষুড়া নিয়া তোরে বাঁচাইয়া দিলাম। অন্য কেউ হইলে জ্যান্ত ফিরতে দিতাম না। আর তোর চক্ষু নিছি, কিন্তু তার বদলে আরেকটা জিনিস দিয়া যাইতেছি। কারও গলায় যদি মাছের কাঁড়া বিন্ধে, তাইলে তার গলায় হাত রাইখা মনে-মনে আমারে স্মরণ করবি, আর এই মন্ত্রড়া পড়বি। দেখবি, ব্যথা ভালা হইয়া গেছে।’ এই কইয়া সে আমারে একটা মন্ত্র শিখাইয়া দিল।

পরের দিন সকালে উইডা ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার ওষুধ দিল ঠিকই কিন্তু চক্ষুডা আর ভালা হইল না। এদিকে আমি তো সেই স্বপ্নের কথা ভুইলাই গেছিলাম। মনে পড়ল কোন্ সুম, জানেন? প্রায় এক সপ্তা পরে আমার ছুডো বইন যহন মাছ খাইতে গিয়া গলায় কাঁড়া বিন্ধাইল। মা’য় অনেক চেষ্টা করল কিন্তু কাঁড়া নামাইতে পারল না। তহন আমার স্বপ্নের কথা মনে হইল। ভাবলাম, দেহি একবার চেষ্টা কইরা, কী হয়। বইনরে কাছে ডাইকা গলায় হাত রাইখা মন্ত্ৰ পড়লাম। দেহি, লগে-লগে ভালা হইয়া গেল।

‘হ্যারপর থিকা বহু মানুষের কাঁড়া নামাইয়া দিছি। গেরামের কারও গলায় কাঁড়া বিনলেই মনে করেন আমার কাছে ছুইটা আইত। এমনকী আমার নামই হইয়া গেছিল ‘কাঁড়া মজিদ’।

‘তো, ভাইজান, এই হইল গিয়া কাহিনী,’ বলে একগাল হাসল লোকটা। এদিকে আমি কী বলব, ভেবে পাচ্ছি না। আষাঢ়ে গল্প মানলাম, কিন্তু তারও তো একটা লিমিট থাকে। এ তো গল্পের গরু পুরো গাছে নিয়ে তুলেছে!

‘গো হোম, ইউ আর ড্রাঙ্ক,’ লোকটার দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।

‘কী কইলেন, ভাইজান? বুঝলাম না।’

‘কিছু না। আপনি তা হলে বসেন? আমি একটু বাইরে যাব। আর কাঁটাটা নামানোর জন্য ধন্যবাদ।’

‘ওইসব কইয়া লজ্জা দিয়েন না, ভাইজান।’ একটা লাজুক হাসি দিল লোকটা।

আমি আর বসলাম না। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারার সময় হয়ে গেছে। গরম- গরম বলতে হবে গল্পটা।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতেই মা’র সামনে পড়ে গেলাম। বললেন, ‘কী রে? তোর কাঁটা নেমে গেছে গলা থেকে? কীভাবে?’

‘ওই এমনিতেই।’ বলে আর দাঁড়ালাম না।

রাতে খাবার সময় ছোট মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মামা, মজিদ লোকটা কেমন?’

‘কেডা, মজিদ?’ গাল ভর্তি খাসির মাংস আর পোলাও চিবাতে চিবাতে বললেন মামা। ‘ভালই তো। তয় একটু বেশিই কথা কয়। আর চাপা পিডাইতে ওস্তাদ। ক্যান, তোরে কিছু কইছে নাকি?’

‘না, না। কিছু বলে নাই। এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম আর কী।’

আমার মনে হলো, পানিমুড়ার গল্পটা না হয় চাপাবাজি ধরে নিলাম। কিন্তু আমার কাঁটাও যে নামিয়ে দিল! সেটার কী হবে?

.

শাহেদ জামান