বর্ষায় – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (গল্পগ্রন্থ)

উপবাসী – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

উপবাসী

রূপচাঁদ রাস্তার ধারে একটা শুকনো গুঁড়ির উপর পা দুইটা গুটাইয়া বসিয়া চিন্তিতভাবে একটা চোরকাঁটার শিষ দাঁতে খুঁটিতেছিল। আজ সকাল হইতেই তাহার মনটা বড় অপ্রসন্ন। তাহার কারণ বোসেদের মেয়ে নেড়ির আজ বিবাহ। পাকা-দেখার দিন হইতেই সে সমস্ত ভণ্ডুল করিবার মতলব আঁটিতেছে কিন্তু কিছুই সুবিধা করিয়া উঠিতে পারে নাই। কাল গায়ে-হলুদটা হইয়াই গেল। আজ রাত্রে বিবাহ, একটু পরেই এই সাড়ে দশটার গাড়িতে বর আসিবে; এই পথ দিয়া বাজনাবাদ্য করিয়া যাইবে। নিতান্ত অপ্রীতিকর বস্তুর যে একটা নিগূঢ় মোহ থাকে তাহারই টানে রূপচাঁদ পথের উপরটিতে আসিয়া বসিয়া আছে।

কাজীপাড়ার রহমৎ আসিয়া পাশটিতে বসিল। চুপ করিয়া খানিকটা পা দুলাইল, তাহার পর প্রশ্ন করিল—“কিছু উপায় ঠাওরাতে পারলি রে রুপো?”

রূপচাঁদ ঠোঁট আর নাক একত্র করিয়া মাথা নাড়িল—না পারে নাই। রহমত্ত—বোধ হয় সহানুভূতির নিদর্শনস্বরূপ—একটা চোরকাঁটার শিষ তুলিয়া লইয়া দাঁতে খুঁটিতে লাগিল। খানিকক্ষণ নীরবেই গেল, তাহার পর ফোস করিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল— “আচ্ছা তোদের দুজনের মধ্যে কি খুব বেশি ভালোবাসা হয়েছিল?”

রূপচাঁদ এবারেও কথা কহিল না, মাথা নাড়িয়া জানাইল—হ্যাঁ।

রহমৎ কথাটাতে একটু টান দিয়া গভীর দুশ্চিন্তার সহিত বলিল, “তবেই তো!” আবার শিষ চিবাইতে লাগিল।

একটু পরে শুঁড়িটার উপর গুটাইয়া-সুটাইয়া বসিয়া প্রশ্ন করিল—“আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করব বলতে আপত্তি আছে? মানে, বিয়ের কথা হবার পর তোকে কিছু বলেছিল কি?—যেমন ধর, বিষ খেয়ে মরব, কি গলায় দড়ি দোব?…তা যদি বলে থাকে তো…”

রূপচাঁদ বলিল—“কিছুই বলেনি।”

রহমৎ কপালে চোখ তুলিয়া বলিল—“কিছুই বলেনি! তবে তো আরো ভাবনার কথা। তোর ঘাড়ে শেষ পর্যন্ত একটা স্ত্রীহত্যার পাপ না চাপে!…

রূপচাঁদ চোরকাঁটার শিষটা সরাইয়া লইয়া খানিকটা উদ্বেগের সহিতই প্রশ্ন করিল— “কেন?”

রহমৎ এখানে ছোকরা-মহলে প্রেম সম্বন্ধে একজন বিশেষজ্ঞ। বয়সের অনুপাতে বাংলা নভেলে তাহার জ্ঞান খুব সুগভীর, তাহা ভিন্ন বাড়িতে ফারসি ভাষায় একটু-আধটু চর্চা থাকায় বুলবুল, বাগিচা থেকে আরম্ভ করিয়া লায়লা-মজনু প্রভৃতি পশ্চিম-সীমান্তের ওদিককার ব্যাপারের সঙ্গে তাহার একরকম সাক্ষাৎ-পরিচয় আছে বলিয়া ধরিয়া লওয়া হয়। বলিল—“যদি সত্যিকার ভালোবাসা হয়—মানে, সে যদি সত্যিই লায়লা হয় আর তুই যদি সত্যিই মজনু হোস তো যে মুহূর্তে তোদের প্রথম চোখাচোখি হয়েছিল সেই মুহূর্তেই চোখের রাস্তা দিয়ে তোর দিল ওর দিলের কাছে গিয়ে তার এনজেল হয়েছিল—যাকে পার্সিতে বলে ফিরস্তা। তাহলে হল না?-তোকে না পেয়ে ও যদি সত্যি একটা কিছু করে বসে তো তোর গুনাহ অর্থাৎ পাপ লাগল না?”

রূপচাঁদ বলিল—“বয়ে গেল।”

রহমৎ এত বড় একটা তত্ত্বকথার পর নায়কের মুখে এরূপ গ্রাম্যতাদুষ্ট মন্তব্য শুনিয়া নিশ্চয় খুবই ক্ষুণ্ণ হইল। বিরক্তির সহিত বলিল—“তাহলে তোর ঈশ্ক্ খাঁটি নয়, শুধু ভড়ং করছিস, যাঃ।”

রূপচাঁদ প্রশ্ন করিল—“ইশক্‌ কি?”

রহমৎ দাঁড়াইয়া উঠিয়া ঘাড়টা তাহার দিকে ঝুঁকাইয়া অনেকটা ব্যঙ্গের স্বরে বলিল—“ঈশ্বক হচ্ছে—প্রেম, প্রণয়, ভালোবাসা–আশীকের জন্যে নিজেকে মিটিয়ে দেওয়া যা ছিল লায়লা আর মজনুর মধ্যে—যা ছিল জাহাঙ্গীর আর নূরজাহানের মধ্যে—যার মাঝখানে দাঁড়াতে গিয়ে শের আফগানের প্রাণ গেল—যা ছিল আয়েষা আর জগৎসিংহের মধ্যে—যার হাহাকার দেখতে পাবি শরৎবাবুর দেবদাসে…তুই ঘাস চিবো বসে বসে। …

হন হন করিয়া চলিয়া যাইতেছিল। খানিকটা অগ্রসর হইতে রূপচাঁদ ডাক দিল—“রহমৎ, শোন।”

অনেকটা অনিচ্ছার সহিত রহমৎ ফিরিয়া আসিল। তখনো রাগটা লাগিয়া আছে, বলিল—“তোর এসবে হাত দেওয়া ঠিক হয়নি। হুটোহুটি মারামারি করে বেড়াস, ওই নিয়েই থাকা উচিত ছিল। কেন ডাকছিলি?”

“একটা গাধা জোগাড় করতে পারিস?”

রহমৎ একদৃষ্টে রূপচাঁদের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। বোধ হয় ভিতরে ভিতরে আশা করিয়াছিল হতাশ প্রেমের ধাক্কায় বেচারি পাগল হইয়া গিয়াছে; কিন্তু তাহার আর কোনো নিদর্শন না পাইয়া সহজ বিস্ময়ের স্বরে প্রশ্ন করিল—“কেন, গাধা কি হবে? হঠাৎ গাধা?”

“বর শুনছি রমজানের গাড়ি করে আসবে। কাল নূতন করে রঙ করছিল, জিজ্ঞেস করলাম তো বললে…”

“গাড়িতে ঘোড়ার বদলে গাধা জুড়ে দিবি নাকি?”

“গাধা জুড়ে দেওয়া নয়।…রমজানের সাদা ঘোড়াটার একটা মস্ত দোষ আছে জানিস তো? —গাধার ডাকে ভয়ানক ভড়কে যায়…”

রহমৎ আরো বিস্ময়ের সহিত বলিল —“যাক, তাতে কি?”

“বরটাকে যদি ঘায়েল করা যেত,—বরের বাপকেও, পুরুতকেও—সবগুলোই নিশ্চয় এক গাড়িতেই থাকবে।”

রহমৎ আরো দুই পা আগাইয়া আসিয়া অপলক দৃষ্টিতে রূপচাঁদের দিকে একটু চাহিয়া রহিল, তাহার পর আসিয়া আবার গুঁড়িটার উপর বসিল। মনে হইল যেন একটু খুশি হইয়াছে,–বোধ হয় এই জন্য যে হতাশ প্রেমিক নিতান্তই চুপচাপ বসিয়া নাই, কিছু একটা করিতেছে। উন্মাদ হইয়া যাওয়া কিংবা আত্মহত্যা করা অবশ্য বেশি শাস্ত্রসঙ্গত হইত, অভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী-বিনাশও নিতান্ত নিন্দার নয়। জিনিসটাতে উন্মাদ লক্ষণও বর্তমান। বলিল—“কাজটা ভালো হয় না, যদিও জাহাঙ্গীরের নজির আছে…কিন্তু গাধা পাবি কোথায়?”

“তাই তো ভাবছি।…আমিও অবশ্য গাধা ডাকতে পারি…”

“দ্যুৎ, সে কি হয়? টের পেয়ে গেলে শেষকালে গাধা হোস আর নাই হোস ধোবার মতো বাড়ি হাঁকড়াবে। তার চেয়ে এ বাবা, ইংরেজের রাজত্ব,—গাধা নিজেকে খুশিতে, নিজের মনে ডেকেছে আমরা কি করব?”

রূপচাঁদ হাঁটুতে চিবুকটা চাপিয়া মাথা নাড়িয়া বলিল—“ঠিক তো;—বনে চরতে চরতে রঙচঙে গাড়ি সাজগোজ-করা লোক দেখে ওর মনে যদি ভাব এসে থাকে—আমরা কি ওকে উসকে দিতে গিয়েছিলাম?…তোমরা অত জুলুস করে না এলেই পারতে।… কিন্তু পাওয়া যায় কোথায়? সমিস্যে তো সেই; আর গাড়ির সময়ও হয়ে আসছে…

রহমৎ হঠাৎ উঠিয়া দাঁড়াইল, বলিল,—“আচ্ছা তুই বোস, আমি দেখছি একবার। আর দেখ—যদি আমার দেরিই হয় আর বর এর মধ্যে এসেই পড়ে তো তুই এই গুঁড়ির আড়ালে বসে দিস না হয় ডেকে খোদার নাম নিয়ে।…বাঃ, আমার মর্জি হয়েছে আমি ডেকেছি গাধার ডাক মশায়, তাতে আপনাদের ঘোড়া যে ঘাবড়ে বসবে কে জানে!…বসে থাক, দেখি একবার চেষ্টা।”

.

খানিকক্ষণ গেল। গুঁড়ির উপর থেকে স্টেশনের ওদিকে ডিস্ট্যান্ট সিগনালটা দেখা যায়; রূপচাঁদ সেইদিকে চাহিয়াছিল, দেখিল সিগনালটা মাথা হেঁট করিল। গাড়ি আসিতেছে। সে দাঁড়াইয়া উঠিয়া, রহমৎ যেদিকটায় গিয়াছে—তীব্র উৎকণ্ঠায় সেদিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিল। না, রহমতের কোনো চিহ্ন নাই। তাহা হইলে বোধ হয় তাহার নিজের গলাই শেষ পর্যন্ত ভরসা।

ছোট স্টেশন, রাস্তায় বিশেষ লোক চলাচল নাই। বরযাত্রীদের যাহারা অভ্যাগমন করিবে তাহারা অনেকক্ষণ স্টেশনে চলিয়া গিয়াছে। রতন মণ্ডল তাহার ছোট মেয়েটিকে লইয়া স্টেশন অভিমুখে যাইতেছিল—মেয়ের মামার বাড়ি যাইবে; জিজ্ঞাসা করিল—“ঘোষজা এখানে বসে যে?”

কিন্তু বেশি কৌতূহল দেখাইল না; কেন না রূপচাঁদকে ডোবার ধারে, কি জঙ্গলের মধ্যে, কি গাছের মগডালে, কি গুঁড়ির উপর দেখা এমন কিছু অসাধারণ ব্যাপার নয়।

রতন চলিয়া গেলে রূপচাঁদ আর একবার রহমতের পথের দিকে চাহিল, তাহার পর গলাটা পরিষ্কার করিয়া লইয়া খুব নিম্নকণ্ঠে— ‘হাঁক্কা—’ করিয়া একটা টানা আওয়াজ করিল। রাসভধ্বনির রিহার্সাল। দ্বিতীয়বার আর একটু জোরে। না, বেশ চলিবে। গলাখাঁকারি দিয়া আরো একটু জোরে আরম্ভ করিতে যাইবে, দেখিল রায়েদের পোড়ো বাড়ির পাশ দিয়া যে সরু রাস্তাটা চলিয়া গিয়াছে, সেই রাস্তা দিয়া, গাধার উপর, পাকা ঘোড়সওয়ারের ভঙ্গিতে পা ছাড়াইয়া রাসু ধোবার ছেলে সাতকড়ে গট্ গট্ করিয়া চলিয়া আসিতেছে। সামনে আসিয়া তড়াক করিয়া নীচে লাফাইয়া পড়িল, তাহার পর গাধাটার পিঠে দুইটা সাবাসির চাপড় কষিয়া রূপচাদকে বলিল—“রহমৎ ডেকে নিয়ে এল। সে আসছে। তোমরা চড়বে নাকি দাঠাউর? চড়ো না, ঘোড়া ছেড়ে চড়বে লোকে আমার মাতনের ওপর,—ওর নাম মাতুধন রেখেছি…পড়ার ভয় নেই, মাটিতে দুটো পা ঠেকিয়ে দাও, নীচে দিয়ে গলে বেরিয়ে যাবে; মায়ের যেমনকার ছেলে ঠিক তেমনটি রইলে, আঁচড় পর্যন্ত লাগল না।”

রূপচাঁদ প্রশ্ন করিল—“ডাকে কেমন?”

সাতকড়ে খুব সম্ভবত স্নেহের আধিক্যেই বলিল—“খুব মিষ্টি ডাক।”

রহমৎ আসিয়া উপস্থিত হইল। একটু বিজয়ের ভঙ্গিতে রূপচাদের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল— “কি রে, হল জোগাড়, না হল না? বাবা, এ যার নাম রহমৎ শেখ!…কাজটা কিন্তু অন্যায় হচ্ছে, বলে দিলাম, আমি এর মধ্যে নেই। নাও, সাতকড়েকে বলো এখন তোমার কি দরকার গাধায়।”

রূপচাঁদ বলিল—“সেই কথাই তো বলছিলাম, ও বলছে খুব মিষ্টি ডাক ওর গাধার—মিষ্টি ডাকে কি হবে?”

রহমৎ মুখ না ফিরাইয়াই বলিল—“রেখে দে, গাধার আবার মিষ্টি ডাক। আমাদের মোরগটা তাহলে মিঞা তানসেন।…এখন ঠিক তালের মাথায় ডাকবে কি না ডাকবে সেই কথা দেখ।…কাজটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না, বলে রাখছি; না-হক কজন বে-কসুর লোককে….

রূপচাঁদ সাতকড়ের দিকে তাকাইয়া জিজ্ঞাসা করিল—“কি বলিস রে, ডাকবে ফরমাশ মতন? …ব্যাপারটা তোকে বুঝিয়ে দিই; মানে হচ্ছে…’

সাতকড়ে কোমরে একটা হাত দিয়া সিধা হইয়া বলিল—“মাতন আমার ডাকে নিজের খেয়ালের উপর। কারুর তো রেয়ৎ নয়?—দাসখৎ ও লিখে দেয়নি,–বলো না কেন রহমৎ ভাই?”

এমন সময় গাধাটা হঠাৎ তরতর করিয়া কয়েক পা আগাইয়া গেল এবং ঘাড় পিঠ আর লেজ সোজা করিয়া বিকট রব করিয়া চিৎকার জুড়িয়া দিল এবং নিজস্ব ভঙ্গিতে আওয়াজটাকে ধাপে ধাপে নামাইয়া থামিয়া গেল। সাতকড়ে দৃপ্তভাবে তাহার দিকে হাত বাড়াইয়া বলিল—“ওই লেন, একখানি লমুনা ঝেড়ে দিলে। ভাবছেন বুঝি আমাদের কথা কিছু বুঝছে না ও? আর কিন্তু ঘণ্টা-দুত্তিন এখন ঠাণ্ডা। সারা দিনে পাঁচ-ছটি বার আওয়াজ দেয়, ব্যাস।”

রহমৎ ফিরিয়া বসিয়াছিল। স্টেশনের ওদিকে চাহিয়া বলিল—“তোর গাড়ি ওদিকে এসে গেল কিন্তু রুপো; ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।”

রূপচাঁদ ব্যস্ত হইয়া উঠিল। দাঁড়াইয়া পড়িয়া চারিদিকে চাহিয়া বলিল—“তাই তো। কোনো উপায় নেই রে সাতকড়ে? তুই ওকে বলেছিস, রহমৎ, কেন ডাকাতে হবে?…বলিসনি?…মানে হচ্ছে, একটা বরযাত্রী আমাদের গ্রামে আসছে, সাতকড়ে; তাদের একটু ঠাট্টা করা দরকার তো, নইলে ভাববে এদের দেশে ঠাট্টা করবার লোকই নেই; তাই ওরা যেই এখান দিয়ে যাবে আমরা শাঁক বাজিয়ে দোব… বিয়েবাড়ির হাজারটা শাঁকেও এমন বাজখেয়ে আওয়াজ হবে না বাবা, হুঁ!”

হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল, সাতকড়েও হাসিয়া হাততালি দিয়া উঠিল, বলিল- “খাসা মতলব, দা’ঠাউর, খাসা মতলব এঁটেছ বটে!”

রূপচাঁদ বলিল—“কিন্তু, তুই বলছিস যে আর ঘণ্টা দুয়েক ডাকবে না ও।”

সাতকড়ে বলিল—“দু-রকম ডাক আছে দা’ঠাউর। এ যা লমুনোটা দিলে এটা হচ্ছে আহ্লাদের ডাক—মনটা খুব খুশি রইল, ডেকে দিলে একবার। আমরা যেমন হাসলাম না এইমাত্তোর, সেইরকম আর কি। আর একরকম ডাক আছে মাতনের, সে কিন্তু এরকম মিষ্টি লাগবে না, তা বলে দিচ্ছি। সে ওর কান্নার ডাক।”

রহমৎ ঘুরিয়া প্রশ্ন করিল—“ঠেঙিয়ে ডাকানো নাকি?”

সাতকড়ে আগাইয়া গিয়া গাধার ঝুঁটি ধরিয়া তাহার পিঠে হেলান দিয়া রহমতের সহিত মুখোমুখি হইয়া দাঁড়াইল; বলিল—“তোমাদের মতো ইস্কুলের পোড়ো নয় যে একটা বেতের ঘায়ে ‘ভ্যা’ করে উঠবে, আস্ত একখানি বাঁশ পিঠে ভাঙলেও মাতৃধন টু শব্দ করবেনি। ওকে কাঁদাবার অন্য হদিস আছে। কিন্তু ওই যে কইনু,—শাঁক যা বাজবে তাতে কানে তালা লাগিয়ে থোবে।”

দুজনেই আগ্রহের সহিত বলিল—“কি, কি হদিস, বল না শিগগির, ওদিকে গাড়ি যে প্ৰায় স্টেশনে এসে পড়ল।”

সাতকড়ে বড় রাস্তার এ-মোড় ও-মোড় একবার দেখিয়া লইল, তাহার পর—“দাঁড়াও, দেখছি একবার” বলিয়া যে-পথে আসিয়াছিল সেই পথে বনের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল। রূপচাঁদ হাঁকিয়া বলিল—“দেরি করিস নে সাতকড়ে, গাড়ি ওদিকে এসে গেল!”

একটুখানির মধ্যেই সাতকড়ে আবার ঘুরিয়া আসিল। একটু নিরাশভাবে বলিল—“না, পাওয়া গেল না।”

রহমৎ জিজ্ঞাসা করিল—“কি খুঁজছিলি তুই?”

সাতকড়ে বলিল—“কুকুরের গায়ের মাছি। গাধাকে ডাকাতে একেবারে ধন্বন্তরি, তবে আর বলছি কি? দুটি মাছি একটু ধুলোর মধ্যে করে ছেড়ে দাও গায়ে, তার পর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শহর ধরে শোন না কত ডাক শুনবে। তা দিন বুঝে একটাও পাওয়া গেল না কুকুর—দরকার কিনা…সব বেটা ভাবলে উগার হবে।”

স্টেশনটা গোটাকতক গাছের আড়ালে পড়ে, দেখা যায় না, তবু হাঁকডাক, ব্যস্ততার আওয়াজ কানে আসিল। রহমৎ আবার নির্লিপ্তভাবে ঘুরিয়া বসিয়াছিল, সেইভাবেই বলিল —“মাছির কামড়ে যদি ডাকে তো বিছুটি ছোঁয়ালে ডাকবে না কেন? আমি কিন্তু এর মধ্যে নেই বাবা; তোমাদের যা মনে হয় করো। এটা কথা বললি, তার উত্তর দিতে হল; ব্যস।”

সাতকড়ে বিস্ময় এবং প্রশংসায় চোখ দুইটা বড় বড় করিয়া এমনভাবে চাহিল যেন সে রহমতের মধ্যে স্বয়ং মক্কার পীরকে প্রত্যক্ষ করিতেছে।

বরযাত্রীর দল স্টেশনের প্রাঙ্গণ ছাড়িয়া রাস্তায় নামিয়াছে। প্রায় জনত্রিশেক লোক। গ্রামে তিনখানি গাড়ি। যতদূর সঙ্কুলান হইয়াছে তাহাতে বরপক্ষীয়দের বসানো হইয়াছে। বাকি আর সকলেই পায়ে হাঁটিয়া আসিতেছে। রূপচাদের খবর ঠিকই ছিল, বর, নিতবর, বরের বাপ, এবং পুরুত রমজানের গাড়িতে চড়িয়াছে। সেটা সর্বাগ্রে রাখা হইয়াছে।

সমস্ত দলটা ধীরে ধীরে চলিয়াছে। বুড়া রমজান কিন্তু তাহার পেটমোটা ঘোড়া দুইটার রাস এমন কায়দা করিয়া কষিয়া ধরিয়া আছে, মনে হইতেছে যেন অন্যমনস্ক হইয়া রাস একটু ঢিলা করিলেই তাহারা একেবারে তীরবেগে ছুটিতে আরম্ভ করিয়া দিবে।

দলটা সামনে আসিতেই রূপচাঁদ গুঁড়ি হইতে নামিয়া দাঁড়াইয়া বলিল—“ সেলাম রমজানচাচা। “ তীব্র উৎকণ্ঠায় মুখটা একটু শুকাইয়া গিয়াছে।

রহমতেরও মনে একটা শঙ্কা এবং উদ্বেগ লাগিয়া ছিল। অনেকটা, পূর্বাহ্ণেই ভাব জমাইয়া রাখিবার জন্য বলিল—“সেলাম আলেকুম।”

রমজান কোনো উত্তর দিল না, শুধু গাধাটার পানে একবার আড়চোখে চাহিয়া রাসটা আরো সতর্ক হইয়া ধরিল।

সাদা ঘোড়াটাও একবার ঘাড়টা ঘুরাইয়া দেখিয়া অস্বস্তির সহিত কান দুইটা সঞ্চালিত করিতে লাগিল। রূপচাঁদ আর রহমৎ দুজনেই সঙ্গ হইল। রূপচাঁদ একবার গাড়ির ভিতরটা ভালো করিয়া দেখিয়া লইল। তাহার পর রমজানের সঙ্গে গল্প জমাইবার জন্য প্রশ্ন করিল—“রঙ ধরাতে কত খরচ পড়ল রমজান-চাচা?”

কোনো উত্তর হইল না। রহমতের বুকটা ধড়াস ধড়াস করিতেছিল, চকিতে ঘুরিয়া একবার গুঁড়িটা যেখানে আছে সেইখানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল, তাহার পর নির্লিপ্তভাবে বলিল—“আচ্ছা রঙ ধরাতে যাই খরচ পড়ুক, তুমি একটু সরে থেকো তো যদি জানের ডর থাকে; রমজানী খালার ঘোড়া একটি যদি লাথি ঝাড়ে তো উঠে আর তোমায় জল খেতে হবে না।…এ তোমার বাংলাদেশের পিলেরোগা ঘোড়া নয় যে মনে করেছ…”

এমন সময় “হাঁক্কা—“ করিয়া একটা অতি উগ্র আওয়াজ পিছনে শোনা গেল এবং পর মুহূর্তেই দেখা গেল আকাশপাতাল হাঁ করিয়া, লেজ সিধা করিয়া চিৎকার করিতে করিতে একটা গাধা বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়া আসিতেছে। পিছনের লোকেরা ত্রস্তভাবে রাস্তা ছাড়িয়া দিতেছে। নানারকম সন্ত্রস্ত রব উঠিয়াছে—সাবধান! গাধারা কামড়ায়ও আবার দেখো, যেন ছুঁয়ে ফেলো না, কি বিপদ!…ও মাড়িয়ে চলেছে মশাই, আর আপনি ছোঁবার ভয় করছেন!

রমজানের গাড়ির সাদা ঘোড়াটা দাঁড়াইয়া পড়িল। রাসটাতে একটা তীব্র ঝাঁকানি দিয়া পিছনে ঘুরিয়া দেখিবার চেষ্টা করিল, তাহার পর রমজান নামিয়া তাহাকে ধরিয়া ফেলিবার পূর্বেই পাশের ঘোড়াটাকে একরকম টানিতে টানিতেই সামনে গলা বাড়াইয়া মত্ত গতিতে ছুট দিল। একটা “সামাল সামাল” রব পড়িয়া গেল। গাড়িটা খানিকটা সিধাই ছুটিল, তাহার পর সাদা ঘোড়াটা রাস ছিঁড়িয়া পলায়ন করায়, একটা ঘোড়ার টানে খানিকটা একপেশে হইয়া ছুটিতে ছুটিতে রাস্তার ধারে একটা সেগুন-গাছের গুঁড়িতে প্রচণ্ড ধাক্কা লাগিয়া হেলিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল।

.

এর পরের দৃশ্য রূপচাদদের বাড়ির চিলেকোঠার অভ্যন্তর। সন্ধ্যার প্রাক্কাল। রূপচাঁদ ধূলিশয্যায় শয়ান; কাঁদিয়া কাঁদিয়া ক্লান্ত হইয়া বোধ হয় এইমাত্র নিদ্রা গিয়াছে। চোখের কোলে, গালে শুষ্ক অশ্রুর কলঙ্করেখা। নেড়ির সঙ্গে আসন্ন বিরহের অশ্রু নয়; অবশ্য পরোক্ষ হেতু এইটাই বটে। আসলে রূপচাদের পিঠে আজ একটি আস্ত কঞ্চি ভাঙিয়াছে।

মাতৃধন-ঘটিত ব্যাপারটা প্রকাশ পাইতে বিলম্ব হইল না। ডাকের মূলে বিছুটি—বিছুটি থেকে সাতকড়ে, সাতকড়ে থেকে রহমৎ, তাহার পর রহমৎ থেকে রূপচাদে বেশ সহজেই পৌঁছানো গেল। রূপচাদের পিতা দুর্ভাগ্যক্রমে দলের মধ্যেই ছিলেন। কান ধরিয়া বাড়ি লইয়া গেলেন, তাহার পর চোরের মতো মার দিয়া চিলেকোঠায় পুরিয়া বাহির হইতে তালা আঁটিয়া দিয়া বলিলেন—“সমস্ত দিন সমস্ত রাত আজ শুকো, রাস্কেল কোথাকার…নেমন্তন্ন বাড়ি যাওয়া একেবারে বন্ধ।…”

বিয়ে-বাড়ি।

দুইটা বাড়ি বাদে রায়েদের বৈঠকখানায় বরযাত্রীদের তোলা হইয়াছে। কতকগুলো ছোকরা আসিয়া অবধিই গণ্ডগোল বাধাইবার চেষ্টা করিতেছে। তাহাদের গাড়ি করিয়া আনা হয় নাই, তাহাদের অপমান হইয়াছে। যাহারা গাড়িতে আসিয়াছিল তাহাদের অনেককেও তাহারা দলে টানিয়াছে— বলিয়াছে গাড়ি চড়াইয়া জখম করিবার মতলব ছিল এদের, তাদের গুরুবল ছিল তাই তাহারা চড়ে নাই। অবশ্য বরের গাড়িতে কাহারও বিশেষ আঘাত লাগে নাই, অন্যান্য গাড়িগুলা একেবারে নিরাপদ ছিল, কিন্তু কি সর্বনাশটাই না হইতে পারিত, সেই দুশ্চিন্তায় সকলেই স্তম্ভিত হইয়া আছে। সর্বনাশের চেয়ে তার কল্পনাটাই আরো ভয়ঙ্কর, কারণ সে কল্পনায় তো কোনো সীমা বাঁধা থাকে না। তাই কিছু না-হওয়ার চেয়ে বড় বিপদ আর কিছুই হইতে পারে না। স্নানে, আহারে, চায়ে, পানে—যতরকমভাবে পারিল ইহারা কন্যাপক্ষীয়দের সমস্ত দিন বিপর্যস্ত করিয়া তুলিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত নিজের দিকের পুরুতকেও ইহারা দলে টানিল।

পুরুতঠাকুরের চা আসিলে একজন কাছে গিয়া দাঁড়াইল এবং চায়ে চুমুক দিয়া পুরুতঠাকুর মুখটা কুঞ্চিত করিয়া উঠিতেই, নিরীহের মতো প্রশ্ন করিল—“খুব মিষ্টি দিয়েছে বুঝি? তা বেচারিরা তো জানে যে আপনি কম মিষ্টি খান… “

পুরুতঠাকুর ঠোঁটে জিবটা অস্বস্তির সহিত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন—“মিষ্টি কোথায় হে, এ যে নুন!”

“—নুন—!! না পুরুতমশায় আপনি নিশ্চয় ভুল করেছেন। অবশ্য যা ছোটলোক এরা…কিন্তু আপনি বরপক্ষের পুরুত, আজকের কাজে আপনি দেবতার তুল্য, তায় সমস্ত দিন উপোস করে আছেন, আপনার সঙ্গেও কি এরকম ঠাট্টা-প্রবঞ্চনা করতে সাহস করবে? বোধ হয় ভুল করেছেন,–দেখুন তো আর একটা চুমুক…”

পুরুতঠাকুর একেবারে লাফাইয়া উঠিলেন, চায়ের বাটিটা আছড়াইয়া দিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন—“আমি পুরোহিত, তিন কুড়ি বয়স হতে চলল, আমার সঙ্গে তঞ্চকতা! আমি যদি আজ এ বিবাহে পৌরোহিত্য করি তো…”

সকলে আসিয়া পড়িল—কি ব্যাপার!…একটি ছোকরা বলিল—“থাক, পুরুতমশাই, এই উপোসের মুখে যদি একটা প্রতিজ্ঞা করে বসেন সে তো আর স্বয়ং বিধাতা এলেও রদ হবে না; থাক, সয়ে যান…”

একজন সামনে ঠেলিয়া আসিয়া বরের পিতাকে লক্ষ করিয়া বলিল—“তারচেয়ে বরং বর আসনে বসবার আগে, কাকা, একবার গয়নাপত্র, দানসামগ্রীগুলো দেখে নিন…”

কন্যাপক্ষের দিক থেকে একজন বেশ ষণ্ডাগোছের লোক উগ্রদৃষ্টিতে ছোকরার দিকে চাহিয়া প্ৰশ্ন করিল— “জিজ্ঞেস করি- কেন?”

ছোকরা রোগাগোছের, থতোমতো খাইয়া আমতা আমতা করিয়া বলিল, “আজ্ঞে, এমনি বলছিলাম—সবাই তাহলে একবার দেখতাম।” তাহার পর পাশের একটি সঙ্গীকে প্রশ্ন করিল—“তুই বলছিলি না রে—এখানকার স্যাকরারা চমৎকার গড়ন করে গয়নার?”

সে ছোকরা এসব ফ্যাসাদের কথায় একেবারেই না-থাকিবার জন্য বলিল—“যাঃ, আমি কি জানি এখানকার স্যাকরাদের কথা, দেখ তো! মিছিমিছি আমায় টানা…”

প্রথম ছোকরা একটু ছুতা করিয়া সরিয়া পড়িল।

গোলমাল কিন্তু থামিল না। বরের পিতা একটু সন্দিগ্ধ-প্রকৃতির লোক, বলিল —“ ছেলেমানুষ যদি তুলেই থাকে কথাটা, আপত্তির কারণও তো দেখি না আপনাদের। বিয়ের আগে গয়নাপত্র দেখে নেওয়া, এরকম তো আখছারই হচ্ছে আজকাল।”

কন্যাপক্ষের লোকটির রাগে তখন শরীরটা কাঁপিতে আরম্ভ করিয়াছে, কণ্ঠস্বর সংযত করিয়া বলিল—“এ-বাড়িতে হয়নি।”

অপর একজন বলিল—“এ তল্লাটে নয়।”

বরকর্তার হাতে একজন সুবিবেচনার সহিত নিজের হুঁকাটা তুলিয়া দিল। সে দু-তিনটা টান দিয়া শান্তস্বরে বলিল—“নাই-বা হল, আজ হোক। দোষ কি? পুরুতের চায়ে যখন নুন রয়েছে, তখন…কি যে বলে বেশ…”

যে হুঁকা জোগাইয়া দিয়াছিল তাহার আবার সুযোগের মাথায় কথা জোগাইয়া দেওয়াও অভ্যাস আছে, বলিল—“তখন কনের গয়নায় খাদ থাকবে না, কে বলতে পারে!”

“মুখ সামলে”—বলিয়া কয়েকজন একসঙ্গে হুঙ্কার করিয়া উঠিল।

বরকর্তা বলিল—“তা সামলাচ্ছে, কিন্তু গয়না যাচাই না হলে বর পিঁড়িতে উঠবে না।”

—“আলবৎ উঠবে।”

কন্যাপক্ষীয়দের সকলেই সমস্ত দিন নানারকম আবদার-অত্যাচার সহ্য করিয়া অন্তরে অন্তরে ক্ষিপ্ত হইয়াছিল। প্রতিশোধের আঁচ পাইয়া উল্লসিত হইয়া উঠিল। একজন ভিড়ের মধ্যে থেকে বলিয়া উঠিল—“তাকে কান ধরে টেনে এনে বসানো হবে।”

“কোথায় গেল বর?”

“পাকড়ো উস্‌কো।”

অবরুদ্ধ আক্রোশের বাঁধ ভাঙিয়া একটা হৈ-চৈ পড়িয়া গেল। এ-পক্ষের দল যেমন দেখিতে দেখিতে বাড়িয়া গেল, ও-পক্ষের দল সেই অনুপাতে কমিয়া আসিতে লাগিল; যে যেখানে পারিল সন্ধ্যার অন্ধকারে গা-ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করিতে লাগিল।

বরের কিন্তু খোঁজ পাওয়া গেল না। আনাচে, কানাচে, অন্ধকারে, গলি-ঘুঁজিতে, বনবাদাড়ে যে কয়জনকে ধরা গেল তাহাদের কেহই বর নয়।”…

“গোল কোথায় বর!”

প্রশ্ন উঠিল—“স্টেশনে যায়নি তো?”

একজন উত্তর করিল—“তাদের বাড়ির দিকে এখন গাড়ি নেই তো; কলকাতার গাড়ি আছে একটা।”

একটা দল স্টেশনের দিকে ছুটিল।

তখন কলিকাতার গাড়ি আসিয়া গিয়াছে। পাতলা অন্ধকারে দূর হইতে দেখা গেল টিকিটঘরের দিক থেকে খুব ঢিলাঢালা জামা-কাপড়-পরা একটি ছোকরা গাড়ির দিকে ছুটিয়াছে।…গার্ড হুইল দিল। দলের তিন-চারজন ছোকরা ছুটিল। প্লাটফর্মে যখন পঁহুছিল তখন গাড়ি বেশ একটু জোর দিয়াছে। তবুও বোধ হয় টানিয়া নামাইবার চেষ্টা করিত, কিন্তু সাহেব-গার্ডের ধমক খাইয়া থমকিয়া দাঁড়াইল।

একজন বলিল—“হজ ব্যান্ড স্যার, হজ ব্যান্ড রনিং এওয়ে!!”

বিবাহ না করিয়াই যে পলাইতেছে সেইটে স্পষ্ট করিয়া বুঝাইবার জন্য অপর একজন হাত তুলিয়া চিৎকার করিয়া বলিল—“আন-ম্যারেড হজব্যান্ড অফ আন-ম্যারেড ওয়াইফ, স্যার!!”

গাড়ি কিন্তু চলিয়া গেল।

.

তখন দুর্ভাবনা জুটিল—জাত-কুল বাঁচে কি করিয়া?

সদ্য বর কাঁড়িয়া বিয়ে দিতে হইবে। প্রথমে মিত্তিরদের শম্ভুর কথা মনে পড়িল সকলের। বিয়েবাড়ি তোলপাড় করিয়াও শম্ভুর সন্ধান পাওয়া গেল না। শম্ভু নিমন্ত্রণে আসে নাই—একটা অভাবনীয় ব্যাপার! কয়েকজন উৎসাহী ছোকরা তাহার বাড়ি ছুটিল।

বাড়িতে আর কেহই ছিল না, মেয়ে-পুরুষ সবাই বিয়ে-বাড়ি। বৈঠকখানায় তক্তপোশে শম্ভু ঘুমাইয়া আছে। পাশে ত্রৈলোক্য কবিরাজের ছেলে মাখন। তক্তপোশের এক ধারে কতকগুলা শিশি আর একটা ওষুধ মাড়িবার খল।

আজ দিনের বেলায় মেয়ে খাওয়ানো ছিল। টের পাওয়া গেল শম্ভু কোন্ সুযোগে এক জায়গায় বসিয়া পড়িয়াছিল। আহারটা অত্যধিক হইয়া গিয়াছে। মাখন এখন বাপের যতরকম হজমি বড়ি, চূর্ণ, আরক আছে সবগুলা তাহার উপর পরীক্ষা করিতেছে।

বিয়ের কথা শুনিয়া মাখন কবিরাজোচিত গাম্ভীর্যের সহিত প্রশ্ন করিল—“লগ্ন কখন?”

“সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে নটার মধ্যে।”

মাখন শম্ভুর পেটে দুইটা টোকা মারিয়া চক্ষু ঊর্ধ্বে তুলিয়া একটু হিসাব করিল; তাহার পর মাথা নাড়িয়া বলিল—“তাহলে হল না, এগারোটার আগে উঠে বসতে পারবে না। এগারোটা পর্যন্ত খেতে যাবে—সেই চেষ্টা করছি; সে সময় হলে হয় তো দেখো।”

আর তাহা হইলে ছেলে কই?

একজন বলিল—“কেন আমাদের ফেলু কেমন হয়? রমানাথের ভাগনে ফেলারাম…”

রমানাথ কাছেই ছিল। একটু লোভী লোক। ভাগনেকে ছেলেবেলা থেকে মানুষ করিয়াছে এবং তজ্জনিত খরচের একটা হিসাব রাখিয়া গিয়াছে, আশা ছিল বিয়েতে সেটা পুষাইয়া লইবে। সৌভাগ্যটা এমন অপ্রত্যাশিতভাবে আসায় উল্লসিত হইয়া উঠিল। মোচড় দিয়া আরো কিছু আদায় করিবার জন্য বলিল—“ওর মা কি রাজি হবে? ওই একটি ছেলে। আর কেউ তো নেই…”

গরজের বালাই, দর আর একটু উঠিল। ফেলারামের ডাক পড়িয়া গেল। তাহাকে পাওয়া গেল না। রমানাথের ছেলে কানাই বরযাত্রীদের টিটকারি দিতে দিতে স্টেশন পর্যন্ত ধাওয়া করিয়াছিল, ফিরিয়া আসিয়া সব শুনিয়া বলিল—“সে তো আজ বিয়ে করতে পারবে না।”

>

রমানাথ একেবারে খিঁচাইয়া উঠিল—“আজ পারবে না মানে?—এ কি পরাণে মণ্ডলের কর্জ শোধ দেওয়া নাকি?—আজ পারব না, কাল—কাল নয়, পরশু!…ডাক্ সে হারামজাদাকে। দেখি, কেমন না করে…”

কানাই বলিল—“ডাকলে আসবে কি করে? নেমন্তন্নর জন্যে জোলাপ নিয়ে বসে আছে— মাখনের কাছ থেকে। মাখনা ভুল করে কি একটা দিয়েছিল—এখনো জের কাটেনি। সে আসতে চাইলেও বরং রোকা উচিত।”

কন্যাকর্তা আর সমাজের মাতব্বরেরা মাথায় হাত দিয়া বসিল। গ্রামে আর ছেলে নাই। এদিকে লগ্ন বুঝি বহিয়া যায়।

কানাই-ই প্রশ্ন করিল—“রূপচাঁদকে হলে কাজ চলবে না? ওর বাবা-কাকা তো ওকে সমস্ত দিন উপোস করিয়ে রেখেছে, পেটফাপার হাঙ্গামাও নেই, জোলাপের হাঙ্গামাও নেই।”

এ হেন পাজি বরযাত্রীর দলকে গাড়ি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করায় সকলেই রূপচাদের ওপর সন্তুষ্ট হইয়া উঠিয়াছিল। অনেকেই একসঙ্গে চেঁচাইয়া উঠিল—“ঠিক তো! হ্যাঁ ওর সঙ্গেই দিয়ে দাও বিয়ে।” একজন সন্দেহ প্রকাশ করিল—“কিন্তু ঠিক মিল হবে কি? প্রায় একবয়সই যে দুটোতে।”

—“আরে বেশ হবে নাও, আগে জাত তো বাঁচুক, তারপর মিল আর টিল।”

একটি ছোকরা আবেগের মাথায় একেবারে গুরুলঘু ভুলিয়া সামনে আসিয়া বলিল—“আর ওদের দুজনের মধ্যে যে লব রয়েছে; লবের চেয়ে মিল…”

“বেরো” বলিয়া কে একজন তাহার গালে ঠাস করিয়া একটা চড় বসাইয়া পিছনে ঠেলিয়া দিল।

কনের মা মূর্ছা গিয়াছে, বাবা সেইখানেই ছিল। কয়েকজন তাহাকে ডাকিতে ছুটিল। ওদিকে কানাই আর রূপচাদের বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কয়েকজন তাহার বাড়ি ছুটিল।

বাড়িতে শুধু রূপচাদের ঠাকুরমা আর একটা বুড়ি ঝি। সকলে খোঁজ লইয়া চিলেকোঠার সামনে গিয়া দাঁড়াইল। বাহির হইতে তালা বন্ধ, ভিতরে কোনো সাড়াশব্দ নাই। সকলে একবার সভয়ে মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করিল। তাহার পর ভূতো দোরে একটা ধাক্কা দিয়া ডাকিল—“রূপো!”

কোনো উত্তর হইল না।

আরো জোরে ধাক্কা দিয়া ডাকিল—“রূপো, এই রূপচাঁদ।”

অতি ক্ষীণ একটা আওয়াজ ছিদ্রপথে বাহির হইল। একেবারে তিন-চারজন একসঙ্গে প্রশ্ন করিল—“বিয়ে করবি?”

রূপচাঁদ শরীরটাকে টানিয়া দুয়ারের কাছে সরিয়া আসিল। দুইটা কপাটের মাঝে ঠোঁট দিয়া প্ৰশ্ন করিল—“কিছু খাবার আছে রে?…ভূতো নাকি?”

—হ্যাঁ,…ওদের বর পালিয়েছে। তোর সঙ্গে নেড়ির বে ঠিক হয়েছে।”

রূপচাঁদ চিঁ চিঁ করিয়া বলিল—“দোরটা খুলে দে; কিছু খাবার এনেছিস তোরা? কেনো কোথায়?”

—“কানাই চাবি আনতে গেছে, ভুলে গিয়েছিল…একেবারে বিয়ের পর খাবি রূপো, ঘণ্টা দুয়েক একটু সবুর করে থাক না।

—“ওরে বাপ রে! দু-ঘণ্টা?…তবে থাক।”

—“তুই অত ভালোবাসতিস নেড়িকে রূপো, একবার অন্য জায়গায় হয়ে গেলে বিয়ে…”

রূপচাঁদ ভিতর হইতে একেবারে খিঁচাইয়া উঠিল—“ মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস নে ভূতো….

সমস্ত দিন পেটে অন্ন নেই, বলে এরও ওপর দু-ঘণ্টা চাপিয়ে বিয়ে করসে।… দোর খুলে কিছু খেতে দিবি তো দে, নইলে বেরো…সব উদ্‌গার করতে এসেছেন…” কণ্ঠস্বর ক্রমেই ক্ষীণতর হইয়া একেবারে অবসন্ন হইয়া পড়িল।

কানাই চাবি লইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া উপস্থিত হইল। দুয়ার খুলিয়া যতক্ষণ তাহারা নীচে নামিয়া আসিল ততক্ষণে রূপোর বাপ নেড়ির বাপ আরো সব অনেক লোক আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। এরকম অর্ধমৃত অবস্থায় বিবাহ হয় না। একজনকে পাঠাইয়া দেওয়া হইল, সে ছুটিয়া গিয়া একটু দুধ আর সন্দেশ লইয়া আসিল। রূপচাঁদ চাঙ্গা হইয়া উঠিতে উঠিতে বাড়িটা মেয়েপুরুষের কলরবে, হঠাৎ বিবাহের ত্রস্ত আয়োজনে গমগম করিতে লাগিল।

কন্যাকর্তা স্নেহ-দ্রব কণ্ঠে রূপচাদের পিঠে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন—“বাবা রূপচাঁদ, তোমার যদি কিছু সাধ থাকে তো বলো…বলো না, লজ্জা কি?…রূপোর আমার লজ্জা হয়েছে গো, তোমরা দেখো।”

পিঠে কঞ্চির দাগে আঙুল কটা আটকাইয়া যাইতেছে।

পুরুত, আরো কয়েকজন বয়স্থ ব্যক্তি বলিল—“হ্যাঁ, চাইবে বইকি, লজ্জা কি, পা-গাড়ি, হারমোনিয়াম, যা ইচ্ছে হয় বলো।”

কোনো উত্তর নেই।

—“বলো, বলো, ওদিকে আবার লগ্ন হয়ে এল…’

রূপচাঁদ একবার সমবয়সীদের পানে চকিতে চাহিয়া মাথাটা গুঁজিয়া লইয়া অর্ধস্ফুট কণ্ঠে প্রশ্ন করিল—“রহমৎ আর সাতকড়েকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে?”