বর্ষায় – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (গল্পগ্রন্থ)

স্বয়ংবর – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

স্বয়ংবর

শিবপুরের স্টীমার-ঘাট। জেটির কাছে ঘাসের উপর সব বসিয়া আছে,—গণ্‌শা, ঘোঁত্‌না, কে. গুপ্ত, গোরাচাঁদ আর রাজেন। ত্রিলোচন উপস্থিত নাই, শ্বশুরবাড়ি গিয়াছে।

ছয়টা বাহান্নর স্টীমার আসিয়া লাগিল। আর সব প্যাসেঞ্জার বাহির হইয়া গেলে ছোটখাটো একটি পশ্চিমা বরযাত্রীর দল নামিল, বোধ হয় তক্তাঘাট হইতে আসিয়াছে। বরের কানে দুইটা বড় বড় কুণ্ডল, গায়ে ফিনফিনে সবুজ সিল্কের পাঞ্জাবি, গলায় আরো মিহি জাপানী সিল্কের গোলাপী রঙের চাদর। মাথায় প্রচুর তেল এবং চোখে প্রচুর কাজল। জেটি হইতে বাহির হইয়া বোধ হয় নিজের বিশিষ্টতাকে আরো ফুটাইয়া তুলিবার জন্য সে চোখে কেমিকেলের ফ্রেমের একটা নীল চশমা আঁটিয়া একটা হাওয়াগাড়ি সিগারেট ধরাইল।

স্টীমার ছাড়িয়া গেলে গারা সব আসিয়া জেটির রেলিঙে ঠেস দিয়া দাঁড়াইল। খানিকক্ষণ চুপচাপের পর রাজেন বলিল—“এদের খুব ছেলেবেলায়ই দিব্যি বিয়ে হয়ে যায়, নিশ্চিন্দি।”

আবার খানিকক্ষণ চুপচাপ। একটু পরে ঘোঁত্‌না জিজ্ঞাসা করিল—“গণৎকারের কাছে তো গেছলি গন্‌শা; কি বললে র‍্যা?”

গনশার মুখটা একটু কুঞ্চিত হইল মাত্র, কোনো উত্তর না দিয়া দূরে হাওড়ার পুলের দিকে চাহিয়া রহিল। গোরাচাঁদ বলিল—“আম্মো তো সঙ্গে ছেলাম। বললে, বউ তো ওদিকে ডাগোরডোগোরটি হয়ে তোয়ের রয়েছে, কিন্তু গনশার আজন্মের একটা দোষ আছে, সেটা না খণ্ডালে তো বিয়ে হতে পারে না। তাতে কম করে সারতে গেলেও সওয়া পাঁচ টাকা লাগবে।…না গেলেই ছেল ভালো,—ওর মামা অত টাকা বের করবে না, মাঝে পড়ে বউ কোথায় ডাগর হয়ে উঠছে শুনে ভাবনায় ও বেচারির মনটা…’

রাজেন বলিল—“যা যাঃ, ওসব ধাপ্পাবাজি, বিশ্বাস করি না।”

গণ্‌শা হাওড়ার পুল হইতে দৃষ্টি সরাইয়া অত্যন্ত বিরক্তির সহিত বলিল—“তু-তুই কি বলতে চাস এখনো হা-হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে?”

রাজেন বলিল—“না তোর বউয়ের কথা বলছি না, সে তো ডাগরটি হবেই শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে। বলছি এই গণৎকারদের কথা—তুই বিশ্বাস করিস? এই দোষ খণ্ডানোর কথা?”

গণ্‌শা কোনো উত্তর দিল না। ঘোঁতনা বলিল—“বিশ্বাস না করে কি করবে? শানাপাড়ার ‘কায়েৎ মহারাজ’ বলে এক সাধু এসেছেন। বলেছেন নাকি এতদিন আত্মবিস্মৃত হয়ে ছিলেন, হঠাৎ যোগনিদ্রায় স্বপ্ন দেখেছেন তিনি আসলে চিত্রগুপ্তের নাতজামাই। মন বড্ড উতলা হয়ে উঠেছে। শিগগিরই দেহত্যাগ করবেন। সেখানে গিয়ে চিত্রগুপ্তের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে দেবেন বলে, যে-সব পুরানো পাপী হাতে পায়ে ধরেছে তাদের নামধাম একটা খেরোর খাতায় লিখে নিচ্ছেন; পনেরো টাকা ফি—বলেন দাদাশ্বশুরের একটা মন্দিরের ব্যবস্থা করেই দেহ রাখবেন—উকিল, ব্যারিস্টার, অ্যাটর্নির ভিড় লেগে গেছে। বল,—তারা ঠকবার লোক।”

গোরাচাঁদ বলিল—“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আগে আমিও কয়েকদিন গেছলাম—যা খেতে চাইবে মুঠো খুলে হাতে দিয়ে দিত। এখন শুনছি আর সময় পায় না। আর এখন গেলে কেমন যেন গা ছমছম করে লোকটাকে দেখে। ওর দাদাশ্বশুর যমের পাশেই বসে খাতা লেখে কি না।”

গণ্‌শা একটা বিড়ি ধরাইয়া নীরবে টানিতে লাগিল। রাজেন বলিল—“সত্যিই যদি আর জন্মের কোন্ দোষে বিয়ে হচ্ছে না, তো কাটাবার কি আর উপায় নেই? তীর্থ-টীর্থ করা, গঙ্গাস্নান করা…আর বিড়ি সিগারেটগুলোও ছাড় গন্‌শা—নেশাও একটা পাপ তো?”

কে. গুপ্ত বলিল—“গঙ্গাস্নানের তো একটা মস্ত বড় যোগও আসছে—দশহরা…’

ঘোঁত্‌না—“ঠিক হয়েছে রে!” বলিয়া এ ধারের রেলিং থেকে ও-ধারের রেলিঙে গিয়া গন্‌শার মুখোমুখি হইয়া বলিল—“সেদিনকার গঙ্গার ঘাটের মেলার জন্যে বাজেশিবপুর থেকেও এবার ভলান্টিয়ার দল গড়ছে। চল না, গঙ্গাস্নানও হবে, লোকসেবাও হবে; যদি সত্যিই কিছু দোষটোষ থাকেই তো একসঙ্গে দুটো পুণ্যির ধাক্কায়…”

গোরাচাঁদ বলিল—“আর বেশ খ্যাটের বন্দোবস্তও আছে, শিবপুরের দলের সঙ্গে ওরা টেক্কা দিচ্ছে কিনা…”

রাজেন বলিল—“তাহলে দেখ না গন্‌শা, ন্যায়রত্ন মশাই বলছিলেন–এর পরেই উপরো-উপরি তিনটে ভালো লগ্ন রয়েছে, যদি সত্যিই কেটে যায় দোষটা…অন্তত গণৎকারের কথাটা হাতে হাতে মিলিয়ে দেখবার মস্ত একটা সুবিধে।”

গণ্‌শা বোধ হয় পুণ্য অর্জনের হাতেখড়ি হিসাবে অর্ধদগ্ধ বিড়িটা গঙ্গায় ফেলিয়া দিয়া প্রশ্ন করিল—“নে-নেবে ভলন্টিয়ার? যাই তো কিন্তু সবাই যাব।”

ঘোঁতনা বলিল—“লুফে নেবে গণেশের দল শুনলে। শিবপুরের দলের এরাই তো কতবার বলেছে আমায়—’ঘোঁতন, তোমাদের সবাই এসো না; একটা সৎ কাজ।’…তখন গা করিনি। অবিশ্যি এখন আর ওরা নিচ্ছে না, বন্ধ করে দিয়েছে।”

.

পরের দিন সকালে ছয়জনে স্বেচ্ছাসেবক দলে ভর্তি হইবার জন্য বাহির হইল। রাত্রে ত্রিলোচন আসিয়াছে। তাহার শ্বশুরবাড়ির গল্প শুনিতে শুনিতে সকলে চৌধুরীপাড়ার রাস্তা ধরিয়া বাজেশিবপুরের দিকে অগ্রসর হইল এবং এ-গলি সে-গলি করিয়া একটা দোতলা বাড়ির সামনে আসিয়া দাঁড়াইল। রেলিং দিয়া ঘেরা সামনে ছটাকখানেক বাগান। ঘোঁত্‌না বলিল—“এই তো সতেরো নম্বর।”

গণ্‌শা জিজ্ঞাসা করিল—“এই বাড়িটাই? লোকজন কাউকে তো দেখছি না!”

ঘোঁতনা উত্তর করিল—“নম্বর তো সতেরো ঠিকই রয়েছে। আয় না দেখাই যাক।” বলিয়া ভেজানো ফটক ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ করিল। ইতস্তত করিতে করিতে একে একে সবাই অনুসরণ করিল—শুধু গোরাচাঁদ সব পেছনে ফটকের একটা পাল্লা ধরিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

বাড়িটার গম্ভীর আকৃতি-প্রকৃতি দেখিয়া সবাই একটা অস্বস্তি বোধ করিতেছিল।

ত্রিলোচন বলিল —“একটা হাঁক দে না ঘোঁত্‌না।”

ঘোঁত্‌না তাহার দিকে ঘুরিয়া বলিল—“তুই দে না। ঘোঁত্‌না পথ দেখিয়ে নিয়েও আসবে, ডেকেও দেবে, তারপর বলবি গাড়ি করে ফিরিয়ে নিয়ে চল…আবদার!”

গণ্‌শা চটিয়া উঠিয়া বলিল —“প-পথ দেখিয়ে কোন্ চুলোয় নিয়ে এলি আগে তাই বল তো? ভ-ভলন্টিয়ার তো গিজ গিজ করচে দেখছি!”

এমন সময় উপরের বারান্দায় কালো মোটাগোছের একটি মাঝবয়সী লোক বাহির হইয়া প্রশ্ন করিল— “কি চাই আপনাদের?”

সকলে পরস্পরের মুখের দিকে একবার চাহিল। ঘোঁত্‌না বলিল—“আজ্ঞে চাই না কিছু।”

“তবে?”

“একবার নীচে আসবেন?”

গোরাচাঁদ নিঃসাড়ে ফটকের বাহির হইয়া দাঁতে একটা ঘাস চিবাইতে চিবাইতে রাস্তায় পায়চারি করিতে লাগিল। উপর হইতে রুক্ষস্বরে উত্তর হইল—“কিছু চাই না, অথচ নীচে আসতে হবে— মানে?”

রাজেন ঘোঁত্‌নাকে ফিসফিস করিয়া বলিল—“গুছিয়ে বল না, চটিয়ে তুলছিস যে।”

নিজেই সামনে একটু আগাইয়া গিয়া বলিল—“আজ্ঞে নামতে হবে না আপনাকে কষ্ট করে, –বলছিলাম গঙ্গাস্নানের মেলা হবে তাই ভলন্টিয়ার…”

আরো রুক্ষস্বর এবং বিকৃতভঙ্গিতে উত্তর হইল—“তাই আমায় ভলন্টিয়ারি করতে হবে…? তা রাজি আছি—বলো তো নেমে একটু শক্তির পরিচয়ও দিই গিয়ে।”

গোরাচাঁদ বাড়ির সুমুখ হইতে সরিয়া গিয়া স্যান্ডাল জোড়াটা হাতে তুলিয়া লইয়া এবং মাথা নীচু করিয়া উৎকর্ণ হইয়া দাঁড়াইয়া দাঁতে বুড়া আঙুলের নখ খুঁটিতে লাগিল।

গণ্‌শা ঘোঁত্‌নার পিছনে নিজের জায়গায় সরিয়া আসিয়া বলিল—“আজ্ঞে না ইয়ে…ভ-ভলন্টিয়ার তো আমরা…দশহরার মেলায়…গঙ্গার ঘাটে…”

“বাড়িটাতে গঙ্গার ঘাট বলে ভুল করবার মতো কিছু পাচ্ছ কি সব?” গলা আরো কর্কশ হইয়া উঠিল—“ভজুয়া!…”

রাজেন গনশার জামার খুঁটে টান দিয়া নিম্নস্বরেই বলিল—“চল, বুঝতেই পারা যাচ্ছে এ বাড়ি নয়। সব কথার উল্টো মানে করছে…’

গোরাচাঁদের সহিত এদের দেখা হইল অনেকটা দূরে গলির একটা মোড়ের অন্তরালে। সে স্যান্ডালে পা সাঁদ করাইতে করাইতে একটু অপ্রতিভ হইয়া প্রশ্ন করিল—“ভজুয়া বেটা বেরিয়েছিল নাকি?”

গন্‌শা ভেঙচাইয়া বলিল-”তুই আর কথা কোসনি গোরে; ঘেন্না ধরালি।… পা-প্পালালি কি বলে র‍্যা? এদিকে ভলন্টিয়ারি করবার শখও আছে!”

গোরাচাঁদ পূর্বে পূর্বে এর প্রতিবাদ করিত, আজকাল তাহার এ দুর্বলতাটুকুর প্রমাণের সংখ্যা নিয়তই বৃদ্ধি পাওয়ায় চুপ করিয়া থাকে; সে দলের মাঝখানে একটি নির্বিঘ্ন জায়গা করিয়া লইয়া চলিতে লাগিল। সবাই মনমরা হইয়া গিয়াছে; কিছুক্ষণ কেহ কোনো কথাই কহিল না। শেষে ঘোঁত্‌না নিতান্ত যেন মৌনতার অস্বস্তিটা এড়াইবার জন্য বলিল—“কেন যে এমনটা হল ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।”

কে. গুপ্ত বলিল—“আপনি বোধ হয় ঠিকানাটা ভুল শুনেছিলেন।”

ঘোঁত্‌না বিরক্তির সহিত বলিল—“আপনি কি বলতে চান ওটা সতেরো নম্বর ছিল না? একের পিঠে সাত তাহলে কি হয় বলুন তো শুনি? তেষট্টি?”

কে. গুপ্ত একটু থতোমতো খাইয়া বলিল—“না সে কথা বলছি না, বলছি বোধ হয় অন্য কোনো নম্বর বলেছিল।”

“অন্য নম্বর বললে আমি সতেরো বলতে যাব কেন মশাই? আমাকে বলেছিল ছিয়ানব্বই, আমি এসে বললাম সতেরো?…আপনাকে কেউ যদি বলে গনশাকে একবার ডেকে দিন, আপনি ত্রিলোচনকে ধরে নিয়ে আসবেন?”

কে. গুপ্তের প্রশ্নটা সকলেরই মনে জাগিয়াছিল; কিন্তু ঘোঁতনার তর্কের ভাষা ও ভঙ্গি দেখিয়া কেহ আর উত্থাপন করিল না।

কে. গুপ্ত স্বভাবতই একটু মোটাবুদ্ধি, প্যাঁচালো তর্কের ধাঁধায় পড়িয়া চুপ করিয়া গেল এবং কিভাবে তাহার মনের কথাটা গুছাইয়া বলা চলে ভাবিতে লাগিল।

ত্রিলোচন গনশাকে বলিল—“তোর বোধ হয় বিয়ের ফুলটা এখনো ফোটেনি গণেশ, নইলে….” গন্‌শার মনটা অত্যন্ত খিঁচড়াইয়া ছিল, উষ্মার সহিত বলিল—“ন-ন্নৈলে ওই কেলে যমদূতটা ভলন্টিয়ারিতে নাম লিখে নিত? তোর বিয়ের ফুলই ফুটেছে তিলে, বু-বুদ্ধির ফুল কিন্তু শুকিয়ে আসছে…”

কে. গুপ্ত একটু ভয়ে ভয়ে ঘোঁত্‌নাকে বলিল—’না, আমি সে কথা বলছি না; বলছিলাম ধরুন, যাকে আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন সেও তো ভুল বলতে পারে…

ঘোঁত্‌না আবার একটু ধমকের সুরে বলিল-”পৃথিবীতে এত লোক থাকতে আমি বেছে বেছে এমন লোককেই জিজ্ঞেস করতে যাব কেন শুনি? আর তার নিজেরই যদি সন্দেহ থাকবে তো বলতেই বা যাবে কেন মশাই?”

কে. গুপ্ত আবার চুপ করিয়া গেল এবং একটু পরে বাঁ-হাতের বুড়ো আঙুলের ডগা দাঁতে চাপিয়া চিন্তা করিতে লাগিল।

গোরাচাঁদ বলিল—“তাহলে শুধু গঙ্গাস্নানই করে নে গনশা। দশহরার দিন ভোর থেকে এসে সব গঙ্গায় পড়ে থাকা যাবে এখন। মা গঙ্গা যদি মুখ তুলে চান তো পুণ্যির একটু ব্যবস্থা করে দেবেন না? দু-তিন ঘণ্টার মধ্যেও একটা-আধটা অ্যাকসিডেন্ট হবে না?—অত বুড়ি-টুড়ি, কচি ছেলেমেয়ে সব আসবে। আমার হাতের কাছে যেটা পড়বে সেটা তোকেই দিয়ে দেব।”

রাজেন বলিল—“হ্যাঁ, সেবা করা নিয়ে বিষয়, ভলন্টিয়ার হয়েই যে সেবা করতে হবে শাস্ত্রে এমন কথা তো ধরে লিখে দেয়নি?”

ত্রিলোচন বলিল—“স্ত্রী স্বামীর সেবা করে কি করে? সে তো আর ভলন্টিয়ার নয়?”

গন্‌শার মাথায় মা-গঙ্গার মুখ তুলে চাওয়ার কথাটা ঘুরিতেছিল; বিরক্ত ভাবে বলিল—“ধ্যাৎ, আর ঠা-ঠাকুর দেবতার উপর বিশ্বাস চলে যাচ্ছে। যদি দ-দ্দয়াই হবে তো আজ ছ-বছর থেকে ভোগা দিচ্ছে কেন?”

গোরাচাঁদ পাঞ্জাবির পকেটে দুইটি হাত সাঁদ করাইয়া কি বলিতে যাইতেছিল, এমন সময় কে. গুপ্ত বলিয়া উঠিল—“নিন ঘোঁতন বাবু, এবার কি বলবেন বলুন।”

আর সবার কাছে একটু অপ্রতিভ হইয়া ঘোঁত্‌না কে গুপ্তকে মাঝে মাঝে থাবা দিয়া একটা তৃপ্তি এবং সান্ত্বনা পাইতেছিল, বলিল —“কি শুনতে চান বলুন?”

“আপনি বাড়িটা রাধানাথ মিত্তিরের গলিতে বলেছিলেন না?”

“এখনো তো বলছি মশাই, কারুর ভয় না কি?”

“ওই দেখুন।”

কয়েক পা সামনে গলিটা মোড় ফিরিয়াছে, আর সেই মোড়ে অন্য দিক দিয়া একটা সরু গলি বাহির হইয়াছে। সেই মোড়ে একটা জরা-জীর্ণ কাঠের ফলকে গলিটার নাম লেখা রহিয়াছে। পাশের দেওয়ালের পিছন থেকে একটা পেঁপের ডাল ভাঙিয়া পড়িয়াছে বলিয়া ফলকটা ভালো করিয়া দেখা যায় না; ক্রমাগত ঠকিয়া কে, গুপ্তের নজর ওইদিকে ছিল বলিয়া সে দেখিতে পাইয়াছে—সকলে পড়িল ‘রাধানাথ ঘোষ লেন’।

সকলে একটু হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। ঘোঁত্‌নার মনে হইতেছিল কে. গুপ্তকে চিবাইয়া খায়। নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলিল—“তাই তো দেখছি, একটু ভুল হয়ে গেছে।”

গন্‌শা অত্যন্ত চটিয়া গিয়াছিল। মুখটা বিরক্ত করিয়া বলিল—তুই কি ভেবেছিলি যখন ঘোষ-মিত্তির দুই-ই কু-কুলীন কায়েত তখন গলিতে বেশি তফাত হবে না।”

দলের মধ্যে এক ঘোঁত্‌নাই গনশাকে সব সময় খাতির করে না, রাগিয়া কি একটা বলিতে যাইতেছিল এমন সময় ত্রিলোচন দুজনের মাঝখানে দাঁড়াইয়া বলিল—“একটা শুভ কাজে নেমে তোরা ঝগড়া করতে লাগলি। আমার একটা মতলব এসেছে—থাম দিকিন তোরা।”

সকলে উদ্‌গ্রীব হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল। ত্রিলোচন বলিল—“এই কইপুকুরের কাছাকাছি ন্যায়রত্ন মশায় থাকেন। তাঁকে খুঁজে বের করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—পুরুষমানুষ, শিবপুর- বাজেশিবপুরের অলিগলি নখদর্পণে।”

গোরাচাঁদ একটু উৎসাহিত হইল, বোধ হয় পুরোহিতবাড়ির সন্দেশ কলা-নারকেল নাড়ুর কথা মনে পড়িল। বলিল—“মন্দ নয়, জলতেষ্টাও পেয়েছে বেজায়।”

রাজেন বলিল—“তাহলে সামনে কেমন দিন-টিন আছে সেটাও একবার দেখিয়ে নেওয়া যায়।” গন্‌শার মেজাজটা ঠিক হয় নাই। রুক্ষস্বরে বলিল—“খুব মতলব খাড়া করেছিস—সতেরো নম্বর বাড়ির জন্যে ন্যায়রত্ন মশায়ের বাড়ি খোঁজ, ন্যায়রত্ন মশায়ের বাড়ি খোঁজবার জন্যে শিষ্যিদের বাড়ি খোঁজ, তা-ত্তাদের বাড়ি খোঁজবার জন্যে…”

এমন সময় রাজেন, ত্রিলোচন, কে. গুপ্ত তিনজনে একসঙ্গে চিৎকার করিয়া উঠিল—“ওই ন্যায়রত্ন মশাই আসছেন!—নাম করতেই!”

.

সত্যই দেখা গেল, তালতলার চটি পায়ে নামাবলী গায়ে ন্যায়রত্ন মহাশয় সামনের একটা বাড়ির বারান্দা হইতে নামিতেছেন। সবাই যেন হাতে স্বর্গ পাইল, অবশ্য এক গোরাচাঁদ ভিন্ন। ঘোঁতনা অগ্রসর হইয়া ন্যায়রত্ন মহাশয়ের কানের উপযোগী আওয়াজ করিয়া বলিল—“প্রণাম হই মশাই।”

সবাই ঘেরিয়া দাঁড়াইল।

ন্যায়রত্ন মহাশয় ডান কানটা আগাইয়া আনিয়া প্রশ্ন করিলেন—“কি বলছ?”

ঘোঁত্‌না বলিল—“প্রণাম হই, প্রণাম।”

আরো কাছে কানটা আনিয়া ন্যায়রত্ন মহাশয় বলিলেন—“ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না, কাল উপবাস ছিল কি না, কাহিল হয়ে রয়েছি বলে কানটা একটু…”

গণ্‌শা বলিল—“ক-ক্কপালে হাত ঠেকিয়ে বল না বাপু…’কাহিল হয়ে রয়েছি!’…কবে যে কাহিল কম তা তো বুঝি না!”

রাজেন বলিল—“পেন্নামের হ্যাঙ্গামটা তুলে দিয়ে কাজের কথাটাই পাড় না একেবারে–তোরও যেন ভক্তির রোখ চেপে গেছে।”

গোরাচাঁদ বলিল—’তার চেয়ে ওঁর বাড়িই নিয়ে চল ওঁকে; মাঝরাস্তায় চেঁচামেচি করার চেয়ে বরং…একে তো এমনিই গলা শুকিয়ে কাঠ…”

ঘোঁত্‌না কপালে যুক্তকর ঠেকাইয়া বলিল—“এই প্রণাম করছি!”

“দীর্ঘজীবী হও, রাজরাজেশ্বর হও, তা কোথায় এসেছ তোমরা? রোদে ঘুরে ঘুরে মুখ যে রাঙা হয়ে গেছে!…গণেশ…?”

গণ্‌শা বাজে কথার দিকে গেল না, চেঁচাইয়া বলিল—“রাধানাথ মিত্তিরের গলি জানেন? ঘোঁত্‌না বে-বেশি ওস্তাদি করতে গিয়ে রাধানাথ ঘোষের গলিতে এনে চ-চ্চড়কি ঘোরাচ্ছে।”

ঘোঁত্‌না বিরক্তভাবে মুখটা ঘুরাইয়া লইল।

ন্যায়রত্ন মহাশয় হাসিয়া রাজেনের দিকে চাহিলেন। সে আরো চেঁচাইয়া বলিল—“জিজ্ঞেস করছে—রাধানাথ মিত্তিরের গলি চেনেন?”

“খুব চিনতুম, সে তো মারা গেছে।”

রাজেন নিরাশভাবে একটু এলাইয়া পড়িয়া বলিল—“এ এক দোসরা ফ্যাসাদে পড়া গেল।— ‘রাধানাথের গলি চেনেন’?–না, ‘সে তো মারা গেছে!”

এমন অবস্থায় ন্যায়রত্ন মহাশয় কখনো কখনো চটিয়াও যান আবার।

সেই দিকটা সামলাইয়া ত্রিলোচন বলিল —“মারা গেছেন শুনে বড় কষ্ট হল। তাঁর গলিটা চেনেন? রাস্তাটার উপর ইশারায় হাতটা চালাইয়া বলিল—“গলি-গলি!”

“ও বুঝেছি, সে তো এখানে নয়। আমার সঙ্গে এসো; ওই দিক হয়েই না-হয় চৌধুরীদের বাড়ি চলে যাব। তারু চৌধুরীর খুড়ির বড় কঠিন পীড়া শুনছি, চান্দ্রায়ণ করবার জন্যে একবার বলে দেখি।…এই তো গোরাচাঁদ, তোমাদেরই তো পাড়ার; কেমন আছে বলতে পারো যদুনাথের পরিবার? আহা যদু চৌধুরী ছিল…”

গোরাচাঁদের মুখটা যেন শুকাইয়া গেল, সহজ ভাব দেখাইবার চেষ্টা করিয়া বলিল—“আজ্ঞে, তিনি তো দিব্যি সেরে উঠেছেন। কাল গেছলাম—ডেকে গায়ে হাত বুলিয়ে কত জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। আপনি কষ্ট করে যাবেন না; বুড়োমানুষ,–এই কাঠফাটা রোদ্দুর। আমাদের গলিটা দেখিয়ে ফিরে আসুন।”

পিছনে সরিয়া আসিয়া অত্যন্ত চটিয়া হাত-পা নাড়িয়া গন্‌শাকে বলিল —“দেখো তো বে-আক্কেলপনা!—সে ধুঁকছে—এখন-তখন—সঙ্গে কেত্তনপার্টি বেরুবে, সব ঠিকঠাক করছি— কদ্দিনকার আশা—ওর মাঝে পড়ে আবার তাকে চান্দ্রায়ণ করে চাঙ্গা করে তোলবার চেষ্টা। এ কি শত্রুতা বল দিকিন!…এর ওপরও যদি যেতে চায় তো বলব পাঁচটা সায়েব ডাক্তারে ঘেরে আছে… তাদের কুকুর নিয়ে—বাজে লোককে ভিড়তে দিচ্ছে না—বিশেষ করে পুরুতদের।…কদ্দিন পরে একটা চান্স!—শুনছি নাকি আবার বৃষোৎসর্গ করবে।”

গণ্‌শা ব্যঙ্গ হাসিতে ঠোট দুইটা একটু কুঞ্চিত করিয়া বলিল—“তুই বোকা, বুঝিস না। ও চান্দ্রায়ণ করলে আরো শিগগির টেসে যাবে বরং। একে বদ্ধ কালা হয়ে গেছে, তায় আবার ভয়ঙ্কর ভুলো মন, একটা বিঘ্নিটিঘ্নি হবেই, ভ-ব্লগবান্ না করুন।”

গোরাচাঁদের মুখটা আবার পরিষ্কার হইল। তবুও একটু সন্দিগ্ধ হাসি হাসিয়া বলিল —“যাঃ, ঠাট্টা করচিস। ওদিকে একজন মরতে বসেছে আর গন্‌শার যেন ফূর্তি বেড়ে গেছে। যাঃ…”

গণ্‌শা ভারিক্কে হইয়া বলিল—“গ-গ্ গনশা সব কথা নিয়ে ঠাট্টা করে না।”

রাস্তার ডানদিকে একটা গলি আরম্ভ হইয়াছে, ন্যায়রত্ন মহাশয় দাঁড়াইয়া পড়িয়া বলিলেন—“এই রাধু মিত্তিরের গলি, আমি তা হলে চললাম। তাহলে যদুনাথের পরিবার ভালোই আছে বলছ গোরাচাঁদ? শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। আজ আর হল না, অপর একদিন দেখে আসব’খন।”

গনশার অভিমত শুনিয়া গোরাচাঁদের মনটা খুঁত খুঁত করিতেছিল। সে চিন্তিতভাবে নিজের দলের সঙ্গে খানিকটা অগ্রসর হইল, তাহার পর ঘুরিয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়া দাঁতে বুড়ো আঙুলের নখ খুঁটিল এবং আর দ্বিধা না করিয়া ফিরিয়া দ্রুতপদে ন্যায়রত্ন মহাশয়ের পাশে গিয়া বলিল —“একটা কথা ভুলে যাচ্ছিলাম ন্যায়রত্ন মশাই, দরকারী কথা—ভাগ্যিস মনে পড়ে গেল! ওই যে বললাম কিনা— যদু চৌধুরীর স্ত্রী—চৌধুরী-জেঠাইমা আমার গায়ে হাত বুলিয়ে কত কথা জিজ্ঞেস করলেন?—সে সময় একটা কথা বলে দিয়েছিলেন—মাথার দিব্যি দিয়ে—বললেন—’গোরে, বাবা, ওদিকে যখন যাবি একবার ন্যায়রত্ন ঠাকুরকে ডেকে দিস; সেরে তো উঠলাম, কিন্তু কবে আছি কবে নেই—তাঁর দয়ার শরীর; একবারটি বললেই আসবেন। কুলের পুরুত, দেবতার সমান কিনা।…তাহলে না-হয় এখুনি হয়ে আসবেন একবার—ঠাণ্ডা থাকতে থাকতে?”

.

গঙ্গা দশহরা। এবার যোগটা বিশেষ গোছের; অত্যন্ত ভিড় হইয়াছে। একে ভিড় তায় ছোটবড় অনেকগুলি ভলন্টিয়ারের দল; রেষারেষির ঝোঁকে তাহারা প্রায় বাড়ি হইতেই সেবার জন্য পেছনে লাগিয়াছে। সমস্ত যাত্রীর—বিশেষ করিয়া স্ত্রীলোকদের এবং তাহার মধ্যেও আবার আরো বিশেষ করিয়া বৃদ্ধাদের—মনটা প্রায়ই বড় খিঁচাইয়া রহিয়াছে।

ভলন্টিয়ারদের সকলেরই চেষ্টা অণুমাত্র ত্রুটি হইতে দিবে না। ঘাটের কাছে বাঁশ দিয়া মেয়েপুরুষের রাস্তা আলাদা করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহাতে প্রবেশপথের মুখে, বাছাইয়ের জন্য ভিড় জমিয়া উঠিয়াছে। এসব মেলায় একটু ষাঁড়-গরুর আমদানি হয়। অন্যান্য বার তাহাদের অগ্রাহ্য করা হইত, এবার তাহাদের গতিবিধিতেও ভেদাভেদ সৃষ্টি করিবার চেষ্টা করায় গোলমাল বাড়িয়াছে। একটা ষাঁড় মেয়েদের নির্দিষ্ট পথে কোনো দিক দিয়া প্রবেশ করিয়া ফেলিয়াছিল। সে গরু নয় বলিয়া তাহাকে বাহির করিতে সবাই লাগিয়া যায়। সে-ও বাঁশের বেড়া ভাঙিয়া, যাত্রী ভলন্টিয়ার মর্দিত করিয়া জানাইয়া গেল—সে সত্যই গরু নয়।

লোকে—বিশেষ করিয়া বৃদ্ধারা—স্নান করিয়া যেটুকু পুণ্য অর্জন করিতেছে, সেটুকু অভিশাপে সদ্য সদ্য ব্যয়িত করিয়া বাড়ি ফিরিতেছে।

বাজেশিবপুরের দল তেমন জমে নাই—তেমন কেন মোটেই জমে নাই বলা চলে। ওরা শিবপুরের সঙ্গে টেক্কা দিয়া কেতাদুরস্তভাবে গঠনকার্য করিতে চাহিয়াছিল। সকালে বিকালে মিলাইয়া ঝাড়া পাঁচ-ঘণ্টা ড্রিল, তারপর সামনের ধোপাপুকুরে সাঁতার। যাহারা সাঁতার জানিত, তাহাদের অনেকের সর্দিগর্মি হওয়ায় ছাড়িয়া দেয়। যাহাদের হাতেখড়ি হইতেছিল তাহাদেরও বেশির ভাগ সাজিমাটি-গোলা পানাপুকুরের জল উদরস্থ করিয়া পীড়িত হইয়া পড়ে। এখন কয়েকজন ব্যাজ লাগাইয়া মনমরা হইয়া কাশিতে কাশিতে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। শত্রুপক্ষের ভলন্টিয়াররা রটাইতেছে—’কাশি-ই ওদের ব্যাজ।”

গণ্‌শা প্রভৃতি পুণ্যার্জনের পূর্বে প্রায়শ্চিত্তের বহর দেখিয়া ছাড়িবে ছাড়িবে করিতেছিল এমন সময় খবর পাইল সমস্ত ভলন্টিয়ারের মধ্যে সাহস এবং কার্যকুশলতার জন্য কয়েকটি স্বর্ণপদক দেওয়া হইবে বলিয়া কে একজন নাম গোপন করিয়া ঘোষণা করিয়াছে।

রাজেন কবি, বলিল, “মেডেল পেলে আবার অনেক সময় প্রেমও হয়ে যায় গনশা; ধর কোনো বড়লোকের মেয়ে যদি ভালোবেসে ফেললে, তখন তোর মামাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাতে পারবি।”

মেডেলের লোভও, আবার অন্য কোনো কাজের অভাবেও ছাড়া হয় নাই।

গণ্‌শা, ঘোঁত্‌না আর রাজেন জেটির ওপর দাঁড়াইয়া আছে। উপকারের সুবিধাও হইতেছে না এবং কিভাবে করিতে হয় জানাও নাই। মোটামুটি একটা ধারণা ছিল এমন বড় বড় যোগে লোকে খুব ডুবিয়া মরে; কিন্তু যাহাকেই ডুব দিতে দেখিতেছে তাহারই মাথা আবার জল ফুঁড়িয়া উঠিতে দেখিয়া বেজায় নিরাশ হইয়া পড়িতেছে। শেষ পর্যন্ত এমন দাঁড়াইয়াছে যে পুণ্য অর্জনে হতাশ হইয়া মনে হইতেছে এক-একটা মাথা জলে টিপিয়া ধরিতে পারিলে গায়ের জ্বালা মেটে। দুবার আক্রোশের দাঁত কড়মড়ানি শোনা গেল; কার ঠিক ধরা গেল না—সম্ভবত গন্‌শা কিংবা ঘোঁত্‌নার।

গোরাচাদ, কে. গুপ্ত এবং ত্রিলোচন এখানে নাই; তাহারা তিনজনে দুর্ঘটনার প্রত্যাশায় ভিড়ের মধ্যে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, কিন্তু কোনো দুর্ঘটনাই তাহাদের হাতে ধরা পড়িতেছে না। অথচ দুর্ঘটনার যে নিতান্ত দুর্ভিক্ষ পড়িয়াছে এমন নয়। একটি বৃদ্ধা কিরকমভাবে হঠাৎ উঁচুনীচুতে পা মচকাইয়া বেসামাল হইয়া পড়িয়া যায়; প্রায় শেষ হইয়া গিয়াছিল, শিবপুরের দল সন্ধান পাইয়া অ্যাম্বুলেন্স খাটে করিয়া তুলিয়া লইয়া গেল; একটা গুণ্ডা একটি ছোট মেয়ের কানের দুল ছিঁড়িয়া লইয়া পলাইতেছিল, শিবপুরের ব্যাজ পরা একটি ভলন্টিয়ার ধরিল; এমন কি একটি স্ত্রীলোক স্নান করিতে করিতে মৃগী রোগাক্রান্ত হইয়া প্রায় সাবাড় হইবার দাখিল হইয়াছিল, যেন পাতাল ফুঁড়িয়া কোথা হইতে শিবপুরের একটি ভলন্টিয়ার তাহাকে বাঁচাইল এবং বেশ ঘটা করিয়াই তাহাকে ক্যাম্পে লইয়া গেল।

গোরাচাঁদ বলিল, “এরা বেশ কপাল করে নেমেছে, টপাটপ কেমন পেয়ে যাচ্ছে, আর আমাদের পোড়া অদিষ্টে…”

ত্রিলোচন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “গনশাটার জন্যেই কষ্ট হচ্ছে। নিজে না পাক, যদি আমরাও একটা হাতে তুলে দিতে পারতাম তবুও ষোল আনা নাহোক কতকটা পুণ্যি হল মনে করে বুক বাঁধতে পারত। এ যেন দেখছি একেবারে মুষড়ে পড়বে বেচারা।”

গোরাচাদও একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিতে যাইতেছিল, মাঝপথে থামিয়া সম্মুখে এক স্থানে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া দাঁড়াইল এবং ত্রিলোচনের কাঁধে হাত দিয়া উৎসুকভাবে প্রশ্ন করিল, “তিলে, দেখেছিস?” ত্রিলোচন গলাটা উঁচু করিয়া সামনে দেখিল, কিন্তু কিছু বুঝিতে না পারিয়া প্রশ্ন করিল, “কি র‍্যা?”

“ওই যে মেয়েটা…?”

“হুঁ; তা কি?”

“ইডিয়ট্—দেখতে পাচ্ছিস না?—নিশ্চয় কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, না হলে ওরকম ফ্যাল ফ্যাল করে চারিদিকে চাইবে কেন?”

“তাহলে নিয়ে আসব গনশাদের ডেকে?”

“হ্যাঁ, এমন না হলে আর বুদ্ধি! আমরা ডাকতে যাই আর সেই তালে শিবপুর এসে কেল্লা ফতে করে নিক। ওকে হাত করে বরঞ্চ গনশার কাছে নিয়ে যাওয়া যাক।”

গোরাচাঁদ পা বাড়াইল, ত্রিলোচনও অগ্রসর হইল এবং শ্যেনদৃষ্টি শিবপুরের দলের ভয়ে, কাহারও ঘাড়ের উপর দিয়া, কাহারও কাঁকালের নীচে দিয়া, ঠেলিয়া, মাড়াইয়া দুইজনে লক্ষ্যস্থলে একরকম ছুটিয়াই চলিল—কেহ গাল দিল, কেহ বা রাগের চোটে গালাগাল খুঁজিয়া না পাইয়া উগ্র বিষাক্ত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল,—দুজনের মধ্যে কেহই সেদিকে দৃকপাত করিল না।

একটি ফুটফুটে বছর পাঁচেকের মেয়ে জল থেকে খানিকটা দূরে, ইটের গাঁথুনি যেখানে শেষ হইয়াছে সেইখানে একটা শুকনো কাপড়, নামাবলী আর ঘটি কোলের কাছে করিয়া বসিয়াছিল। গোরাচাঁদ উৎকণ্ঠিত ভাবে প্রশ্ন করিল, “কি হয়েছে তোমার খুকি?”

মেয়েটি ভ্যাবাচাকা খাইয়া দুজনের মুখের দিকে চাহিল।

গোরাচাঁদ বলিল, “বলো, কি হয়েছে তোমার, কিছু ভয় নেই।”

একটি পশ্চিমা স্ত্রীলোক স্নান সারিয়া মাথা ঝাড়িতেছিল, তাহার পাশ দিয়া সামনে আসিয়া ত্রিলোচন বলিল, “ভয় কি? আমরা ভলন্টিয়ার, এই দেখো।” বলিয়া বুকে পিন আঁটা রেশমের ফুলটা দেখাইয়া দিল।

মেয়েটি শুকনো মুখে ব্যাজটার দিকে চাহিয়া রহিল।

গোরাচাঁদ বলিল, “তুমি কার সঙ্গে এসেছিলে বলো তো খুকুমণি?”

ত্রিলোচন প্রশ্ন করিল, “মার সঙ্গে?…বাবার সঙ্গে?…ঠাকুরমার সঙ্গে?”

মেয়েটি মুখ চুন করিয়া একটু রুদ্ধ কণ্ঠে বলিল, “না, দিদিমার সঙ্গে।”

মেলার ব্যাপার, ততক্ষণে ছেলের, মেয়েয়, বুড়োয় অনেকগুলি লোক ইহাদের ঘেরিয়া লইয়াছে, একজন প্রশ্ন করিল “কি হয়েছে মেয়েটির?”

গোরাচাঁদ বলিল, “ওর দিদিমার সঙ্গে এসেছিল, সে ডুবে গেছে।…তুমি কেঁদো না খুকু। আমরা তোমায় তোমার মার কাছে রেখে আসব।”

কে. গুপ্ত সান্ত্বনা দিবার জন্য বুদ্ধি করিয়া বলিল, “আর দিদিমা তো বুড়োও হয়ে গিয়েছিল খুকুমণি…”

একটি নিম্নশ্রেণীর লোক উৎসুকভাবে শুনিতেছিল; বলিল, “সে কথা কইলে কি ছেলেমানুষ শোনে বাবু?—তাছাড়া দিদিমা আর কার লবযুবতী হয়ে থাকে বলুন না?”

মেয়েটি এতক্ষণে কোনোরকমে সামলাইয়া ছিল, এবার “ও দিদিমা গো!” বলিয়া একেবারে ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। আরো লোক জমা হইয়া গেল এবং মাঝখানে পড়িয়া নানাবিধ প্রশ্নের আবর্তে মেয়েটি ক্রমেই ব্যাকুল হইয়া উঠিতে লাগিল। উত্তর আর দিবে কি? অঝোর ঝোরে কান্নার মধ্যে তাহার কেবলই এক কথা “দিদিমাকে এনে দাও…দিদিমার কাছে যাব!…”

খাঁটি, দুর্লভ অ্যাকসিডেন্ট! আবিষ্কার করার জন্য গোরাচাঁদ আর ত্রিলোচন ভিতরে ভিতরে ফুলিতেছিল, সবার মোড়লিতে একটু বিরক্তও যে না হইতেছিল এমন নয়। ত্রিলোচন বলিল, “আপনারা যে যার কাজে যান না মশাই। বাজেশিবপুর সেবক-সঙ্ঘের হাতে পড়েছে, ওর আর কোনো ভয় নেই।…কোন্‌খানে তোমার দিদিমা ডুবেছিল, খুকু!”

মেয়েটি একদিকে ঘুরিয়া দাঁড়াইতে সেখানে ভিড়টা পৃথক হইয়া গেল, গঙ্গার উপর নজর পড়ায় মেয়েটি আরো জোরে কাঁদিয়া উঠিয়া বলিল, “ওইখানটায়…ওগো দিদিমা গো!”

বৃত্তটা আবার জুটিয়া গিয়া মেয়েটাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। একজন আধবয়সী নিম্নশ্রেণীর লোক বলিল, “ওখানে তো জল বেশি নয়, তবে…”

একজন বয়স্থগোছের লোক বলিল, “কাল পূর্ণ হলে বলে গোষ্পদেই ডুবে মরে, ওখানে তবুও তো এক কোমর জল রয়েছে…”

শিবপুরের হাতের জলে ডোবার কেসটা দেখিয়া ত্রিলোচনের হিংসা লাগিয়াছিল; বলিল, “মিরগি ছিল সে বুড়ির, না হলে কখনো কি আর অতটুকু জলে ডোবে!”

একজন পরামর্শ দিল, “তাহলে জাল ফেলে জায়গাটা একবার হেঁকে ফেলা দরকার, পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে?”

ত্রিলোচন বিরক্তভাবে বক্তার দিকে চাহিয়া বলিল, “পুলিশে জাল ফেলার কি জানে মশাই, জাল ফেলা কাকে বলে যদি দেখতে চান তো একটু দাঁড়ান।” কে. গুপ্তর পানে চাহিয়া বলিল, “যান তো, গণ্‌শাকে ডেকে নিয়ে আসুন তো, আর তার আগে আমাদের ক্যাম্পে (ভিড়ের দিকে চাহিয়া) বাজেশিবপুর সেবা-সংঘ ক্যাম্পে বলে যান যে শিগগির একটা জালের বন্দোবস্ত করে পাঠিয়ে দিক।”

কে একজন বলিল, “তবেই হয়েছে! ওনাদের গণেশঠাকুর আর জাল এসতে এসতে বুড়ি ত্যাতক্ষণ উলুবেড়েয় ঠেলে উঠবে। আর তানারে ক্লেশ দেওয়া কেন বাপু, তিনি তো মা-গঙ্গার কিরপেয় দিব্যি গিয়েছে, এখন মেয়েটারে ঘরে লিয়ে যাবার ব্যবস্থা করুন, বেজায় কাঁদতেছে।”

ত্রিলোচন গনশার অবর্তমানে বড় অস্বস্তি বোধ করিতেছিল; অনেক কষ্টে পাওয়া কেস, কি করিতে হইবে ঠিকমতো জানা নাই, তাহা ভিন্ন শিবপুরের দল হাঁ করিয়া আছে, পুলিশ আছে। বলিল, ‘তবে গনশাকেই শিগগির ডেকে আনুন। আর মিরগি রুগী, বাঁচিয়েই বা কি হবে? আজ বাঁচাও, কাল আবার জল ঘুলিয়ে মরবে—মেহনতই সার…চুপ করো খুকু তুমি, এক্ষুনি তোমার মার কাছে নিয়ে যাচ্ছি।”

গোরাচাঁদ বলিল, “হ্যাঁ, মাঝে পড়ে সে বেচারির বুড়ো বয়সে দুবার মরবার কষ্ট, একে তো একবার মরতেই লোকের কণ্ঠাগত প্রাণ।”

গোরাচাঁদ অগ্রসর হইবে এমন সময় সামনে ভিড়ের প্রান্ত হইতে প্রশ্ন হইল, “এখানে কি র‍্যা গোরে?”

গনশার আওয়াজ, মুহূর্তেই সে ভিড় চিরিয়া সামনে আসিয়া দাঁড়াইল, পেছনে বাকি দুইজন। ত্রিলোচন, গোরাচাঁদ একসঙ্গে বলিয়া উঠিল, “একটা পেয়েছি গনশা!”

গোরাচাঁদ বলিল, “তোকে ডাকতে যাচ্ছিলাম।”

রাজেন উৎসুকভাবে প্রশ্ন করিল, “কাদের মেয়ে।”

গোরাচাঁদ ফূর্তির চোটে বিশেষ ভাবিয়া দেখিয়া উত্তর করিল, “ওর দিদিশর। মিরগি রুগী, ডুবে মরেছে।”

“ডু-ডুবে মরেছে! কোন্‌খানে।”

ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিয়া উঠিল, “ওই ওখানে বলছে খুকি।”

“একটা জাল নিয়ে আসুন না মশাই।”

“এরা তো তখন থেকে শুধু জল্পনাই করছে।”

“ভারি আমার চোটের—ভলন্টিয়ার সব!”

গনশা বলিল, “একমুঠো তি-ত্তিল ছুঁড়লে এখন একটাও জলে পড়বে না এমন ভিড়, জাল ফেলবেন কোথায় মশাই? আর সে কি ততক্ষণ জা-জ্জালের ভরসায় বসে থাকবে? চল ঘোঁত্‌না—”

ভিড় ঠেলিয়া বাহির হইতে হইতে বলিল, “আর তোরা দুজন মেয়েটাকে আগলা, তিলে আর গোরা।”

ইটের গাঁথুনির পরই ভয়ানক কাদা, পেছল, ভিড়। প্রায় পঞ্চাশ-ষাট গজ দুরে জেটির পন্টুনের কাছে জল। টলিতে টলিতে সামলাইতে সামলাইতে চারজনে অগ্রসর হইল। ভিড়ের মধ্য হইতে কয়েকজন সঙ্গ লইল; তাহাদের কথাবার্তায় দু-চারজন করিয়া আরো লোক জমিতে লাগিল। জলের ধারে আসিয়া গন্‌শা পিছন ফিরিয়া জামা খুলিতে খুলিতে চিৎকার করিয়া প্রশ্ন করিল, “এইখানে তিলে?”

এদিকে ত্রিলোচনদের, ওদিকে গনশাদের ঘেরিয়া দুটা ভিড় জমিয়া গিয়াছে, অত দূরে দেখা যায় না। ত্রিলোচন শব্দ লক্ষ করিয়া উত্তর দিল। এমন অপ্রত্যাশিত সাফল্যে একটু ইংরেজির লোভ সামলাইতে পারিল না, ভিড়ের মধ্য হইতে হাত তুলিয়া গলাটা উঁচু করিয়া বলিল, “ইয়েস, দেয়ার।”

ঘোঁত্‌না, কে. গুপ্তও জামা খুলিল, রাজেন ডাঙায় সকলের জামা লইয়া থাকিবে।

বেশ সাড়া পড়িয়া গিয়াছিল। গনশা আবার গঙ্গামুখো হইতেই একটি প্রৌঢ়া স্ত্রীলোক প্রশ্ন করিল, “ওখানে ভিড় কিসের বাছা?” স্নান করিয়া উঠিয়াছে, বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হইবে। দীর্ঘাকার, পুরুষালি ছাঁদের চেহারা, গলার স্বর ভাঙা কাঁসির মতো ঝনঝনে, হাতে একটি পিতলের কমণ্ডলু, সেরতিনেক জল ধরে।

গন্‌শা, শুধু গন্‌শা কেন, সকলেই একটু থতোমতো খাইয়া গিয়াছিল। স্ত্রীলোকটি শঙ্কিতভাবে প্রশ্ন করিল, “একটি মেয়ে বসেছিল—কিছু হয়নি তো তার?”

কে. গুপ্ত অবস্থাটা চট করিয়া হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে না, তাহা ভিন্ন একটু ছাপরেয়েগোছের চেহারা দেখিলে খুশি হয়, একটু আলাপ করিতে চায়; অগ্রসর হইয়া বলিল, “আজ্ঞে, সে তো বেশ আছে—আমাদের সেবা-সংঘের হেফাজতে; তার দিদিমা মিরগি রুগী, ডুবে মরেছে! শুনে পর্যন্ত আমাদের মনটা…

“কে ডুবে মরেছে!!”—এক মুহূর্তে মূর্তি আর স্বরে যে পরিবর্তন হইল তা সেই জাতীয় স্ত্রীলোকেই সম্ভব। কমণ্ডলুর ডাণ্ডির ওপর মুঠাটা কড় কড় করিয়া উঠিল।

সকলে, এমনকি, কে. গুপ্ত পর্যন্ত শঙ্কিতভাবে দুই-পা পিছাইয়া গেল।

“বলি কে ডুবে মরেছে? খেন্তীর দিদিমা? তাই বুঝি বলিয়েছিস তাকে দিয়ে? ভলেন্টিয়ার সব, না?—উগার হচ্ছে? খেন্তীর দিদিমা যদি মরে থাকে, অমর্তবামনীর মরা যদি এতই সহজ তো আমি কে র‍্যা ড্যাক্রা? এই কে তোর মুণ্ডপাত করছে?”

বাঁ-হাতটা বাঘের পাঞ্জার মতো কে. গুপ্তর মস্তক লক্ষ করিয়া ছুটিল। ফুটবলের দাঁওপ্যাচে অভ্যস্ত থাকায় একটা গোঁত্তা মারিয়া সে নিজেকে বাঁচাইয়া লইতেই থাবাটা কে. গুপ্তর পিছনেই রাজেনের উপর গিয়া পড়িল। সে কবি বলিয়া বাবরি রাখে, মুঠাটা কড়াক্কর করিয়া জমিয়া বসিল।

“ঠিক ধরেছি—এ-ই সর্দার! বল মেয়েটাকে কোথায় রেখেছিস?”

রাজেন ঝাঁকানির মধ্যে আর্তভাবে ডাকিল, “গন্‌শা! গণেশ!!”

গন্‌শা জলে নামিয়া পড়িয়াছিল—তিনজনেই; উত্তর করিল—“এক খাবলা পাঁক তুলে মাথায় দে রাজেন।”

স্ত্রীলোকটা মুঠা এবং ঝাঁকানি ঠিক রাখিয়া, বরং উগ্রতর করিয়া মাথা ঘুরাইয়া বলিল, “বটে! পাঁক দিয়ে আমার মাথা ঠাণ্ডা করবে—নাতনী চুরি করে? মিরগি রুগী করে? মাথা গরমের এখন দেখেছ কি?—তুই আয় না র‍্যা অলপ্পেয়ে, তুই আয় না উঠে, দেখি কত পাঁক বইতে পারিস।’

সেই নিম্নশ্রেণীর লোকটি অগ্রসর হইয়া আসিল, সভয় ভক্তির সহিত যুক্তকর মাথায় ঠেকাইয়া বলিল, “আজ্ঞে মাঠান, দা’ঠাউর ওনাকে নিজের মাথায় পাঁক দিতে বলতেছে আর কি, এঁটেল মাটির পাঁক—পেছল কিনা…

“কে তুই? তুই নিজে এসে দে না। আয়। কই, এগুচ্চিস না যে?”

লোকটা তাড়াতাড়ি পিছনের ভিড়ে একটা চাপ দিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল।

তাহার দিকে মনটা যাওয়ায় মুষ্টিটা বোধ হয় একটু আলগা হইয়া গিয়া থাকিবে, রাজেন একটা মরি-কি-বাঁচি গোছের ঝাঁকানি দিয়া নিজেকে ছাড়াইয়া লইল; কিন্তু পিছল, আর গঙ্গার ঢালুর জন্য আর সামলাইতে পারিল না, ওলট-পালট খাইয়া, কাহারও হাতের ঘটি ফেলিয়া, কাহারও আহ্নিক নষ্ট করিয়া গঙ্গার গর্ভে গিয়া পড়িল এবং প্রচণ্ড হুঙ্কারের সহিত অমর্ত-বামনীকে ঘুরিয়া দাঁড়াইতে দেখিয়া এটা ডুব সাঁতার দিয়া বহুদূরে গিয়া কুঁড়িয়া উঠিল এবং দৈবক্রমে সেখানে আবার একটি স্ত্রীলোকের একেবারে সামনাসামনি হইয়া উঠায় সঙ্গে সঙ্গেই আর একটা ডুব দিয়া একেবারে মাঝগঙ্গামুখো হইল। ততক্ষণে চারিদিকে বেশ একটা হৈ-চৈ পড়িয়া গিয়াছে। কেহ বলিতেছে খুন হইয়াছে, কেহ বলিতেছে ষাঁড় ক্ষেপিয়াছে, কেহ বলিতেছে বান ডাকিবে; কেহ অনেকটা কাছাকাছি আন্দাজ করিয়া বলিতেছে কচি মেয়ের গলায় হার চুরি। উহারই মধ্যে গনশা একবার জাহাজের জেটির উপর উঠিয়া একরকম তীব্র সাঙ্কেতিক চিৎকারে ত্রিলোচনের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল।

ত্রিলোচন মুঠোটা বাঁশির মতো করিয়া তার মধ্য দিয়া তারস্বরে প্রশ্ন করিল, “ডেড উয়োম্যান গট্‌?”

গন্‌শা উত্তর করিল, “নট্ ডেড; ডা-ড্রাইং রাজেন;—রাজেনকে মেরে ফেলছে, চুলের মুঠি ধরে; তো-ত্তারা সেইখানে চলে আয়—মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়ে, নো মিরগি। ম্যান ট্রেডমার্ক উয়োম্যান। –এক্কেবারে বেটাছেলে মার্কা!..”

***

শিবপুর ঘাট থেকে অনেকটা উত্তরে।

ভাঁটার জন্য জলের কাছাকাছি একটা মাঝারি সাইজের গাধা-বোট কাত হইয়া আছে। লোক নাই; অর্থাৎ গাধা-বোটের লোক নাই, আছে গন্‌শা, ঘোঁত্‌না, কে. গুপ্ত, গোরাচাঁদ। হঠাৎ দেখিলে কিন্তু কাহাকেও চিনিবার উপায় নাই—আর কেহ চেনে উহারাও সেজন্য ব্যস্ত নয়। ভলন্টিয়ারের ব্যাজ নাই এবং ব্যাজ আঁটিবার জামাও নাই গায়ে। গোরাচাঁদ একটা কামিজ পরিয়া আছে, যথাস্থানে নয়, কোমরের নীচে। বাঁধিবার কিছু না-থাকায়, কামিজের গলাটার এক জায়গায় ছিঁড়িয়া ফাঁদটা বড় করিয়া নাভিকুণ্ডলের কাছে বোতামটা আঁটিয়া দিয়াছে। হাঁটুর কাছে কামিজের হাতা দুইটা লটপট করিতেছে। কেহ বিশেষ কথা বলিতেছে না।

রাজেন আর ত্রিলোচন নাই। রাজেন একটু দূরে গঙ্গায় আবক্ষ ডুবিয়া যেন কিছুই হয় নাই এইভাবে কুলকুচি করিবার চেষ্টা করিতেছে। ত্রিলোচন না আসিলে উঠিবে না।—উঠিবার জো নাই।

ত্রিলোচন সবার জন্য কাপড় আনিতে গিয়াছে।