বর্ষায় – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (গল্পগ্রন্থ)

গোলাপী রেশম – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়

গোলাপী রেশম

তারাপদ বিস্মিতভাবে প্রশ্ন করিল, “তোমার হয়েছে কি শৈলেন? একটা মনিঅর্ডার নিতে যে হিমসিম খেয়ে গেলে! দুবার জায়গা ভুল করে কোনোরকমে দস্তখটা তো সারলে, এখন আবার তারিখ নিয়ে ও কি কাণ্ড করছ?”

শৈলেন নিতান্ত অপ্রতিভ ভাবে তাড়াতাড়ি কলমটা তুলিয়া লইয়া বলিল, “ও, হ্যাঁ, তাই-তো! উনিশশ’ ছত্রিশ লিখছি কি বলে…”

তাহার পর ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া একটু চিন্তা করিয়া বলিল, “কত সাল যাচ্ছে বলো তো এটা!”

পিওন বলিল, “আটত্রিশ পড়েছে বাবু।”

“ঠিক তো। দেখো, মনেই ছিল না।” আরো বেশিরকম অপ্রতিভ হইয়া ব্যস্তভাবে তারিখটা শুধরইয়া টাকা কয়টা না গুনিয়াই পকেট ফেলিয়া পিওনকে বিদায় করিল।

তারাপদ ভ্রূ তুলিয়া গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করিল, “এত অন্যমনস্ক, ব্যাপার কি বন্ধু?”

“কই, অন্যমনস্ক হইনি তো!”

“হয়ে যে ছিলে তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই, অধিকন্তু এখনো রয়েছ। আর গোপনের বৃথা চেষ্টা না করে কারণটা বলে ফেলো দিকিন। কবি মানুষ, নতুন বসন্ত পড়েছে, আমি তেমন ভালো বুঝছি না।”

শৈলেন একটু লজ্জিতভাবে হাসিল, খানিকক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, তাহার পর আর একবার তাগাদা খাইয়া বলিল, “নিতান্তই ছাড়বে না তাহলে?”

তাহার পর জানালার বাহিরে খানিকটা স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, “সাল ভুল করার জন্যে আমায় দোষ দিয়ো না, আমি ১৯৩৮ সালে ছিলাম না খানিকক্ষণ, বোধ হয় এখনো ঠিকমতো নেই।”

তারাপদ একটা তাকিয়ায় হেলান দিয়াছিল, শুইয়া পড়িয়া বলিল, “এইচ. জি. ওয়েলস কল্পিত ‘টাইম মেশিনে’ যে তুমি কোন্ দূর-ভবিষ্যতে কিংবা দূর-অতীতে পাড়ি মেরেছ তা বুঝতে পেরেছি। একটু পরিচয় দাও তোমার প্রবাসযাত্রার, শোনা যাক।”

শৈলেন বলিল, ‘ভবিষ্যৎ তো মরুভূমি, সেদিকে গিয়ে কি করব? গিয়েছিলাম অতীতে, আজ থেকে ত্রিশ বৎসরের ব্যবধান। সেথায়, কোনো একটি শান্ত পল্লীগ্রামে রাধারমণের মন্দিরের পাশে উঁচু রকের ছায়ায় একটি ছোট মেয়ে খেলা করছে, তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম।”

তারাপদ ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “তার পাশটিতে একটি ছোট ছেলেও আছে।”

শৈলেন চোখ না ফিরাইয়াই বলিল, “আছে; তার নাম রাখা যাক শ…”

তারাপদ বলিল, “শ-য়ের আড়ালে ‘শৈলেন’ তেমন ঢাকা পড়ছে না, তুমি স্পষ্টাস্পষ্টি আত্মপ্রকাশই করো। আর পবিত্র মন্দিরের পাশে একটি বালিকার সঙ্গে খেলা করছ বলে এই ত্রিশ বৎসরের ব্যবধান থেকে কানমলা দেবে এমন লম্বা হাত কারুর নাই।”

শৈলেন দৃষ্টি ফিরাইয়া হাসিল। একটু নীরব থাকিয়া বলিল, “তোমায় পূর্বে কখনো বলেছি— ছেলেবেলায় আমার অভিভাবকেরা আমার পড়াশুনার সুবিধে হবে বলে তাঁদের কাছ থেকে অনেক দূরে বাংলায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন—কেননা তাঁরা থাকতেন দূর পশ্চিমাঞ্চলে। আমিও এই সুবিধে পেয়ে পাঠশালা আর গুরুমশাইকে আমার নিজের কাছ থেকে দূরে দূরে রাখতাম। বিদেশে পুত্রবিরহকাতর বাপ-মা যখন ভাবতেন, আমি গুরুমশাইয়ের উদ্যত ছড়ির নীচে বিদ্যাকর্ষণ করে যাচ্ছি, সে সময়টা আসলে আমি রাধারমণের মন্দিরের পাশে বেশ মাঝারি গোছের একটি দল জুটিয়ে অভিরুচিমতো নানারকম খেলায় মশগুল। দলের মধ্যে ছেলে-মেয়ে উভয়ই ছিল। তার মধ্যে একটি ছেলের পরিচয় দেওয়া আপাতত দরকার। ছেলেটার নাম ছিল…’

তারাপদ টুকিল, “লেডিজ ফার্স্ট”।

শৈলেন হাসিয়া বলিল, “আমারও ইচ্ছা ছিল, শুধু তুমি কি মনে করবে সেই ভয়েই আগে ছেলের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলাম। যাক মেয়েটির নাম ছিল চারু, আমরা চারী বলে ডাকতাম। যখনকার কথা বলছি তখন তার বয়েস হবে—এই বছর আষ্টেক। চওড়া চওড়া গড়ন, ঘোরাল মুখ, মাথায় বেড়া বেণী; একটা তিন-পেড়ে কাপড় খাটো করে পরা, আঁচলটা কোমরে মোটা করে জড়ানো। পায়ে এক জোড়া হাঙরমুখো মল ছিল, সে যুগে প্রায় সব মেয়ের পায়েই ওটা থাকত।

“এর ওপর চারীর ছিল টকটকে রঙ, যা বাংলার পল্লীগ্রামে দুর্লভ বলে টপ করে একটা বিশিষ্টতা এনে দেয়।

“চারীর বাড়িতে শুধু ছিলেন তার বাপ আর ঠাকুরমা। মেয়েদের পক্ষে শুধু বাপ আর ঠাকুরমা থাকা মানে ষোল আনা আদর। চারুর মা ছিলেন না, অর্থাৎ এই আদরের মধ্যে কোথাও শাসনের বালাই ছিল না। এর ফলে চারুর ছিল পূর্ণস্বরাজ এবং সেইজন্য সে আমার সমস্ত প্ল্যানগুলি পরিপক্ক করে তুলতে আর সবার চেয়ে সময় দিতে পারত। আমি ভুল বলছি, বরং অধিকাংশ প্ল্যান তারই মাথায় জন্ম নিত এবং তারই দক্ষতায় দানা বেঁধে উঠত। সময়ের অভাব না থাকায় আমি তার হুকুম তামিল করে মতলবগুলি কাজে রূপান্তরিত করতে অন্য ছেলের চেয়ে বেশি সাহায্য করতাম মাত্র।

“আমরা যেখানটায় খেলা করতাম, সে জায়গাটা ছিল বেশ নিরিবিলি। তার একদিকে রাধারমণের মন্দির আর দুদিকে দেয়াল। সামনেটা খোলা ছিল বটে, কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত ফাঁকা মাঠ আর মাঠের শেষে আগাছার জঙ্গল। বাড়ি-ঘর নেই। ঘর-বাড়ি যা কিছু তা মন্দিরের পিছনে কিংবা দেয়াল দুটোর আড়ালে। অর্থাৎ জায়গাটা গ্রামের শেষ প্রান্তে আর কি।

“খেলার রকমারি ছিল, বুঝতেই পারো। কখনো পাঠশালা – পাঠশালা খেলা হত। আমি ছিলাম পাঠশালার কায়েমী পলাতক; সুযোগ-সুবিধা পেয়ে রোজ গড়পড়তা আরো চার-পাঁচটি করে ফেরার জুটত—স্কুল-পাঠশালা মিলিয়ে। বেতটা বাদ দিয়ে আর সব বিষয়েই জিনিসটি স্বাভাবিক করবার চেষ্টা করা হত। এমন কি অনিচ্ছুককে চ্যাংদোলা করে টাঙিয়ে নিয়ে আসাও বাদ যেত না, আর যাকে টাঙিয়ে আনা যেত, সে-ও হাত-পা ছোঁড়া এবং অশ্রাব্য গালাগালি প্রয়োগে নকলটিকে সাধ্যমতো আসল জিনিসে দাঁড় করাবার চেষ্টা করত। কখনো কখনো এমন হত যে, ব্যাপারটা অভিনয়ের কোটা থেকে সত্যই বাস্তবে এসে দাঁড়াত। হঠাৎ কোথা থেকে স্কুল বা পাঠশালের সত্যিকার পোড়োরা এসে পড়ত এবং যাকে শখের চ্যাংদোলা করে আনা হচ্ছে, আর যারা আনছে তাদের সবাইকে আসল চ্যাংদোলা করে লটকে নিয়ে তারা অদৃশ্য হয়ে যেত। আমি গুরুমশাই হয়ে পাঠশালাতে থাকতাম বলে, কিংবা চারু গুরুমশাই হলে শিরপোড়ো হয়ে তার তামাক সাজতাম বলে পালে বাঘ পড়লেই দূর থেকে গা-ঢাকা দিতে পারতাম। চ্যাংদোলা হইনি কখনো।

“মাঝে মাঝে এইরকম আকস্মিক রসভঙ্গের জন্যে এ খেলাটার প্রতি আন্তরিক টান থাকলেও, বড় বেশি সাহস করা যেত না। এ ভিন্ন কানামাছি ছিল, কুমির-কুমির ছিল, পাড়ার নিত্য দলাদলির নকল ছিল। কিন্তু সবচেয়ে যা বেশি হত তা অভিনয়ের অভিনয়, অর্থাৎ অনুকরণ।

“সে সময় আমাদের গ্রামে ও জিনিসটার খুব চল। নিম্নশ্রেণীদের দুটো যাত্রার দল ছিল, ভদ্রলোকদের একটা অপেরা পার্টি। গ্রামের কয়েকটা ছেলে কলকাতায় পড়ত, তারা শহরের আনকোরা আধুনিকতা আমদানি করে একটা থিয়েটার ক্লাব পর্যন্ত দাঁড় করিয়েছিল। চারটি দলে যা করত, আমরা দুপুরে, মন্দিরের পাশটিতে তার পুনরভিনয় করতাম। যাত্রাটাই আমাদের বেশি ‘অ্যাপিল’ করত; তবে থিয়েটারের সীনের দিকে একটা ঝোঁক ছিল, সেইজন্যে প্রায়ই থিয়েটারের স্টেজে যাত্রার পালা ঢেলে অভিনয় করতাম। কেউ আনত গায়ের ব‍্যাপার, কেউ মায়ের কস্তাপেড়ে শাড়ি, কেউ দিদিমার নামাবলী। নামাবলীটা হত অরণ্যের সীন, নামের জঙ্গলকে আমরা গাছের জঙ্গল করে নিয়েছিলাম আর কি। পুকুর দেখাতে হলে নামাবলীর মাঝখানটায় ছিঁড়ে দেওয়া হত। ধ্রুবের মা সুরুচি অরণ্যে ঘুরে ঘুরে তৃষ্ণার্ত হয়ে জল খাচ্ছেন দেখাতে হলে সুরুচি হাত দুটো অঞ্জলিবদ্ধ করে নামাবলীর ছেঁড়া দিয়ে ভেতর দিকে গলিয়ে দিত এবং ওদিক থেকে ঘটি করে একজন জল ঢেলে দিত,—বাস্তবিকতার নেশায় কখনো কখনো পানাসুদ্ধ। পুকুরে জল খাবার এমন কৌশল পাড়ার আর কোনো পার্টিই দেখাতে পারত না বলে এই সীনটি আমাদের সকলের বড় প্রিয় ছিল। ফলে নামাবলী পাওয়া গেলেই ধ্রুবের পালা অনিবার্য ছিল, আর ধ্রুবের পালার ফাঁড়া কাটিয়ে কোনো নামাবলীকেই কখনো অক্ষত শরীরে ফিরে যেতে হয়নি।

“এই সব অভিনয়ে মেন পার্ট থাকত চারুর। সে মল দুগাছা হাঁটুর কাছে তুলে, বেটাছেলের মতো কাপড় পরে, ‘দ্রৌপদীর স্বয়ংবর’-এ অর্জুন হয়ে লক্ষ্য বিঁধত, ‘পাণ্ডবের অজ্ঞাতবাস’-এ ভীম হয়ে কীচক বধ করত, শ্রীকৃষ্ণ হয়ে কংস ধ্বংস করত। মেয়ের পার্ট বড় একটা নিত না; শুধু ‘সুভদ্রা-হরণে’ গোবরার মুখে লাগাম কষে অর্জুনের রথ হাঁকিয়ে নিয়ে যাবার লোভে সে সুভদ্রা সাজত।

“এই পালাটির জন্যে আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম। কেন, সে কথা বলবার আগে গোবরার পরিচয়টা দেওয়া দরকার।

“পরিচয়টি আগেই পেতে, কিন্তু তুমি নিজেই বাধা দিয়েছিলে, মনে থাকতে পারে।

“গোবরা আমাদেরই পাঠশালার ছেলে, আমার পরে ভর্তি হয়। দুবেলা এক কোঁচড় করে মুড়ি এনে পাঠশালায় বসে বসে খেত, আর মুড়ি বিলি করে দল পাকাত। এদিকে মাথা খেলত মন্দ নয়, তবে পড়াশুনার দিকে বড় একটা ঘেঁষত না। তার সঙ্গে আমার এই দ্বিতীয় বিষয়ে মিল ছিল এবং এরই বলে তাকে ক্রমে পাঠশালা ছাড়িয়ে আমাদের দলে ভেড়ালাম। ভুল হয়ে গিয়েছিল; যাকে বলে খাল কেটে কুমির ঢোকানো তাই করেছিলাম আর কি। গল্পটা শেষ পর্যন্ত শুনলেই বুঝতে পারবে।…”

“আচ্ছা একটা কথা বিশ্বাস করতে পারবে?

তারাপদ বলিল, “কি?”

“এই যে, আমি চারুকে ভালোবাসতাম।”

তারাপদ সবিস্ময়ে বলিল, “ভালোবাসতে? তখন যে তোমরা দুগ্ধপোষ্য!”

শৈলেন অবিচলিতভাবে বলিল, “ভালোই যদি না বাসতাম তো সর্বদা ওর কাছে কাছে থাকতাম কেন? আর কেনই বা হাজার কাছে থেকেও মনে হত যথেষ্ট কাছে নেই? এরই বা কারণ কি যে, ক্রমাগতই ইচ্ছে হত চারু একটা কিছু বিপদে পড়ুক, খুব মারাত্মকরকম বিপদে, যেমন ভুতে তাড়া করা, কিংবা হাতিতে শুঁড়ে জড়িয়ে ধরা কিংবা মাঝগঙ্গায় নৌকো থেকে পড়ে যাওয়া—আর আমি তাকে উদ্ধার করি। ভালোবাসার লক্ষণ নয়? তা ভিন্ন পাঠশালা থেকেও যে কায়েমিভাবে অনুপস্থিত থাকতাম, তারও মূলে ছিল চারুর প্রতি অনুরাগ, শুধুই গুরুমশাইয়ের প্রতি বিরাগ নয়।

“একদিন দুপুরে ‘সুভদ্রা-হরণ’ হবে ঠিক হয়েছে। আমার মনটা খুব হৃষ্ট, কেননা এই পালায় আমি সাজতাম অর্জুন। সকালে পাঠশালায় গেলাম—রথের ঘোড়াকে খবর দেবার জন্যে। তখন ঘোড়া সাজত নিবারণ। খবর পেলাম, সে চার-পাঁচ দিন আসেনি। গোবরা ওদের পাড়ার ছেলে; জিজ্ঞেস করতে বললে, ‘তার কদিন থেকে অসুখ।’ দুশ্চিন্তায় পড়া গেল।

“একটু পরে গোবরা প্রশ্ন করলে, ‘কেন র‍্যা নিবারণকে?’

“ছেলেটা নালিশ করতে এক নম্বর। এর কাছে সব কথা হুট করে বলা নয়, বললাম, ‘না, এমনি।’

“কিন্তু ঘোড়ার ভাবনায় মনটা বড় ব্যাকুল হয়ে রইল। একটু পরে একটা টোপ ফেলে দেখলাম, বললাম, ‘আজ আমাদের ওখানে যাত্রা হবে কিনা…’

“গোবরা শ্লেটে একটা বর্তুলাকার মুখ এঁকে তাতে দাঁত বসাচ্ছিল। মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করলে, ‘কার দল রে? মথুর সা’র? তার দল হলে একবার দেখতাম।’

“আমি উত্তর করলাম, ‘কেন, মথুর সা’র চেয়ে ভালো দল আর হতে নেই?”

“একটু উৎসুকভাবে প্রশ্ন করলে, ‘কি পালারে?’

“বললাম, ‘সুভদ্রা হরণ।’

“গোবরা আমার মুখের দিকে চাইলে। তারপর আবার নির্লিপ্তভাবে দাঁত আঁকতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘যাবি নাকি?’

“গোবরা একটু নিরাশভাবে বললে, ‘না ভাই, পাঠশালা রয়েছে যে।’

“আমি বললাম, ‘ঠাকুর দেবতার পালা দেখলে আবার নাকি দোষ হয়?

“পাশের অনাথকে সাক্ষী মানলাম। সে কম কথায় সারে, বললে, ‘দোষ হলে আর পাঠশালায় বসে পেল্লাদ কেষ্ট নাম করত না।’

“আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, ‘তুই যাবি নাকি তাহলে?’

“অনাথ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নাক সিঁটকে বললে, ‘ধ্যাৎ।’

“গোবরা সেদিন ধরা দিলে না। কিন্তু কয়েকদিন পরে দেখা গেল নিজেই নিবারণের সঙ্গে হাজির হয়েছে। সেদিন আমাদের ‘রিজিয়া’। দুদিন আগে কলেজের ছেলেরা প্লে করেছিল। নিবারণের পার্ট ছিল না। সে আর গোবরা অডিয়েন্স হয়ে স্টেজের বাইরে দুখানা চেয়ার নিয়ে বসল।…ঘাবড়ো না, ‘চেয়ার’ মানে অবশ্য থান ইট

“নূতন দর্শক পেয়ে খুব চুটিয়ে প্লে করা গেল। ওঠবার সময় গোবরা বললে, ‘তোরা করিস? তবে যে বললি, মথুর সা’র চেয়েও ভালো দল?”

“আমি মনে মনে চটলাম। বললাম, ‘মথুর সা’রা পেশাদার…’

“তারপর হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ল; বিজয়গর্বের সঙ্গে প্রশ্ন করলাম, ‘মথুর সা’র দলে সত্যিকার মেয়ে আছে?’

“গোবরা ঠোঁট উল্টে বললে, “আহা সত্যিকার মেয়ে হলেই যেন হল। তোদের রিজিয়া না হয় মেয়েই, কিন্তু অন্তার দাদার কাছে দাঁড়াতে পারে?’

“আমি হো-হো করে হেসে উঠলাম, বললাম, ‘খুব বুঝেছিস তো। রিজিয়া মেয়ে ছিল না কি? ও তো পেনোর ভাই, ওর মাথায় তো ওটা বাবার চুল।’

“তারকেশ্বরের মানত চুল নিয়ে পেনোর ভাই হারাধন খুব ঠকিয়েছে দেখে আমি আর হাসি সামলাতে পারছিলাম না। এমন সময় অন্য সবার সঙ্গে চারু এসে সামনে দাঁড়াল। ঝুঁকে পায়ের মল নামাতে নামাতে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলে, ‘কি রে শৈল, হাসছিস কেন অত?’

“সে সেজেছিল বক্তিয়ার, তিনপেড়ে শাড়ির মালকোঁচামারা বক্তিয়ার! বললাম, ‘এ তোকে ভেবেছে বেটাছেলে আর হারাধনকে ভেবেছে মেয়েমানুষ!

“সকলে আবার হেসে উঠলাম।

“চারু একটু গম্ভীর হয়ে, একটু হেসে, চোখ দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বললে, ‘এবার থেকে তোরা আমায় চারু-দা বলে ডাকবি, খবরদার।’—সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীরটা আলগা করে হো-হো করে হেসে উঠল।

“গোবরার অবস্থাটা যা হল তা আর বর্ণনা করে কাজ নেই, শুধু কাঁদতে বাকি রইল বেচারির। মুখ রাঙা করে বললে, ‘রোসো, তোমাদের সবার ভিরকুটি ভাঙছি গুরুমশাইকে বলে— মেয়েদের সঙ্গে মিশে এই সব খেলা হয় বাবুদের! নিবারণ, তোমারও এই বিদ্যে! বেশ…’

“নিবারণ বললে, ‘দিস বলে; ভারি ভয়, ওঃ।’

“চারু একটু এগিয়ে এল, গলা বাড়িয়ে বললে, ‘তুই মেয়েমানুষ দেখলি কোথায় রে এর মধ্যে? আমি তো চারু চন্দোর ভট্টাচার্য।’ বলে সোজা হয়ে গম্ভীর হয়ে দাঁড়াল। আর একটা হাসির রোল উঠল। “তার পরদিন বিকেলে পাঠশালার ফেরত গোবরা আবার এসে হাজির। বললে, ‘চলো সব, গুরুমশাই ডেকে পাঠিয়েছেন।’

“বিকেলে তখন অনেক ছেলে জুটেছে, তুমুল বেগে কি একটা হুটোপাটি খেলা হচ্ছে; কেউ ওর কথায় বড় একটা কান দিলে না। শুধু পাঁচী বলে একটা মেয়ে খেলার মাঝেই শরীরটা অষ্টাবক্র করে হাতের আঙুলগুলো ছেতরে গোবরার কথাগুলোই বিকৃত করে ভেংচে উঠল। তারপর আর কেউ ওর কথা ভাবলেও না এবং অনেকক্ষণ পরে খেলার মাঠে একটা ছেলের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়ে পড়ে গিয়ে যখন ঝেড়ে-ঝুড়ে উঠলাম—দেখি ছেলেটা আর কেউ নয়—আমাদের গোবরা।

“সেই থেকে গোবরা ভিড়ে গেল আমাদের দলে। অবশ্য রোজ আসত না, তবে খুব বেশি দেরিও করত না, আর যত দিন যেতে লাগল ততই তার হাজির ঘন ঘন হয়ে উঠতে লাগল। ক্রমে আমাদের থিয়েটারের অডিয়েন্স হওয়া থেকে একদিন স্টেজের ওপর তার প্রোমোশন হল।

“সেদিন আমাদের ‘রাধারমণ থিয়েটার পার্টি’র আজকালকার ভাষায় বলতে গেলে শ্ৰেষ্ঠ ‘অবদান’ ‘সুভদ্রাহরণ’। অশ্বিনীকুমার, নিবারণ অনুপস্থিত—ঘোষালের কাচ-বাঁধানো দেয়াল টপকে বেল পাড়তে গিয়ে তার ক্ষুরে কাচ বিঁধে গেছে।

“গোবরা ছিল, তাকে বললাম, ‘তুই ঘোড়া হ গোবরা, হবি?’

“গোবরা বললে, ‘যাঃ, ঘোড়ার পার্ট আবার মানুষে করে!

“একটু থেমে বললে, ‘যদি করি তো ও রকম পেছনে ঝাঁটা বেঁধে ন্যাজ করতে পারব না। ‘ “অগত্যা লাঙ্গুলহীন ঘোড়াই নামানো হল সেদিন। স্টেজে নেমে কিন্তু চিঁ-হি-হিঁ শব্দ করে, ঠোঁট কাঁপিয়ে, লাগামে ঝাঁকানি এবং পেছনের নারকেল-ডেঁপোরের রথে অর্জুন আর সুভদ্রাকে দু-একটা লাথি ঝেড়ে ঘোড়া সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলে। এক মুহূর্তেই প্লেটার চেহারা বদলে গেল। খুশিতে, বিস্ময়ে চারু তো স্টেজের মর্যাদা ভুলে হাততালি দিয়ে চেঁচিয়েই উঠল।

“তখুনি সীন নামিয়ে দেওয়া হল। একটু পরে যখন আবার সীন উঠল, বিস্মিত অডিয়েন্স দেখলে ঘোড়ার পিছনে অন্তাদের লক্ষ্মীনারায়ণের রুপোর চামর বাঁধা, আর সুভদ্রা আর তারকেশ্বরের চুলওয়ালা নকল মেয়ে হারাধন নয়, স্বয়ং চারু।

“এই দারুণ সীনটির লোভে চারু কায়েমিভাবে সুভদ্রার পার্ট নিলে, একাদিক্রমে চার দিন এই খেলাই চলল। সে যুগে এটা রেকর্ড।

“চারু গোবরার এত ভক্ত হয়ে পড়ল যে, কোথা থেকে খুঁজে পেতে একটা সম্বন্ধও বের করে ফেললে—গোবরা তার ভাই হয়।—এত বড় একটা স্টার-অ্যাকটারের সঙ্গে আত্মীয়তা না বের করে সে সন্তুষ্ট হতে পারল না।

“আমার কিন্তু মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। বুঝতে পারলাম আমার ভালোবাসার ক্ষেত্র আর মসৃণ নয়—গোবরা হতভাগাও মজেছে, সে-ও…”

তারাপদ “থামো!” বলিয়া, হাতটা বারণের ভঙ্গিতে উঁচু করিয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিল, বলিল, “নিঃসাড়ে, নির্বিবাদে শুনে যাচ্ছি বলে তুমি যে দস্তুরমতো রোমান্স ফেঁদে বসলে দেখছি হে! একটি মেয়ে, দুটি ছেলে—that damned eternal triangle again! সেই শাশ্বতী ত্রয়ী, মতলবখানা কি বলো দিকিন?”

শৈলেন বলিল, “হিংসা আছে, দ্বেষ আছে, চক্রান্ত অভিসন্ধি, এমনকি হত্যা পর্যন্ত… রোমান্স বলতে আপত্তি থাকে বোলো না।”

“নানাভাবে লক্ষণগুলি প্রকাশ পেতে লাগল। প্রথম প্রথম গোবরা আমাদের বেশ একটু চোখে চোখে রাখবার চেষ্টা করতে লাগল। খেলার মধ্যে আমরা দুজনে, অর্থাৎ আমি আর চারু একটু কাছে কাছে থাকতাম, কেননা আর সবার তুলনায় আমাদের দুজনের মধ্যে একটু ঘনিষ্ঠতাই ছিল। প্রায় দেখতাম, আমরা খুব ঘেঁষাঘেঁষি হতেই গোবরার বক্রদৃষ্টি আমাদের ওপর এসে পড়েছে। চারু কিছু বুঝত না, কেননা তার মনটা ছিল নি-দাগ, আমি কিন্তু একটু থতোমতো খেয়ে যেতাম, কেননা আমি চারুর সান্নিধ্যটা বেশ একটু সূক্ষ্ম ভাবে উপভোগ করতাম।

“এমনও হয়েছে—দুপুরবেলা, রোদ ঝাঁঝা করছে, আমার মতো নিতান্ত এলে-দেওয়া ছেলে এবং চারুর মতো নেহাত আদরে-গলা মেয়ে ভিন্ন কেউ বাড়ির বার হতে পারে না; আমরা দুটিতে মন্দিরের রকের কোণে বেলগাছের ছায়ায় পাশাপাশি বসে গল্প করছি, হঠাৎ গোবরা নিতান্ত একটা অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে বেরুল। আমাদের আশ্চর্য হবার কথা, সে কিন্তু আগেভাগেই কপালে চোখ তুলে প্রশ্ন করলে, ‘তুই এখানে, শৈলেন? আর আমি চারিদিক খুঁজে হয়রান হচ্ছি?’

“চারু হয়তো প্রশ্ন করলে, ‘কেন র‍্যা গোবরা?’

‘ওকে গুরুমশাই ডেকেছেন।’

‘কেন?’

কেন তা ও-ই জানে আর গুরুমশাই জানে। আর ডাকবে না? রোজ রোজ পাঠশালা কামাই করে এখানে বসে থাকা…’

“চারু বললে, ‘একলা কেন? এই তো আমি রয়েছি।’

“এর উত্তর গোবরা দিলে না। আমিও চুপ করে রইলাম। একটু পরে গোবরা বললে, ‘চল শৈলেন, বসে রইলি যে?’

“আমি রেগেমেগে বললাম, ‘যাঃ, যাব না।

“গোবরা বললে, “তাহলে যাই আমি, বলে দিগে যে…’

“আমি তাই চাই—বেশ জমাটি গল্প চলছিল, আপদ বিদায় হলেই বাঁচি, বললাম, ‘যা, এক্ষুনি যা… যাচ্ছিস না যে?’

“গোবরা বললে, “তোর হুকুম?’

“চারু বললে, “তার চেয়েও তুইও আয় না গোবরা, একটু পরেই তো নন্তী, ফ্যালা, এরা সবাই আসবে।’

“গোবরা অবশ্য আসতেই চায়, কিন্তু আসে না। বলে, ‘হ্যাঁ, শৈলর সঙ্গে আমায় কেউ দেখে ফেলুক!’

“ছবিটি আমার যেন চোখের সামনে ভাসছে। চারু আঁচলটা দাঁতে কামড়ে, রকের নীচে পা নামিয়ে গোড়ালি ঠুকে ঠুকে মল বাজাচ্ছে, সমস্ত শরীরটাও দুলছে, আমার পা দোলানো বন্ধ হয়ে গেছে—খানিকটা দূরে সিঁড়ির ওদিকটায় গোবরা দাঁড়িয়ে। গোবরার শেষের কথাটায় কি ছিল, চারু একেবারে ‘হো হো’ করে হেসে উঠল। বললে, ‘তাহলে শৈল না থাকলে আসবি তো? তুই যা তো শৈল।’

“সঙ্গে সঙ্গে গলাটা বাড়িয়ে নিয়ে এসে আমার কানে কানে বললে, ‘তুই অমনি ঘুরে পাঠশালা থেকে সবাইকে ডেকে নিয়ে আয়, উল্টে ওকেই চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাক….’

“তারপরে কি হল সে মনে পড়ছে না।…এক দিনের কথা মনে পড়ে, চারুকে মন্দিরে না পেয়ে তার বাড়িতে গেলাম। দেখি ঘরে-বারান্দায় বাঘবন্দীর ছক কেটে চারু আর গোবরা একাগ্রচিত্তে খেলায় মগ্ন। গোবরার পাশে পাঠশালার বই-শ্লেট রাখা। চারু একবার চোখ তুলে আমার দিকে চাইলে, কিন্তু বোধ হয় খুব অন্যমনস্ক ছিল বলে কিছু বললে না। গোবরা আমার দিকে পেছন ফিরে ছিল।

“আমার গায়ে যেন আগুন ছড়িয়ে দিলে। ছেলেবেলার কণ্ঠে যতটা কটুতা ভরা যায়, আর নেহাত কমও যায় না—ততটা ভরে বললাম, ‘হ্যাঁ রে গোবরা, আর নিজের বেলায় বুঝি পাঠশালা কামাই হয় না?’

“গোবরা চমকে ফিরে দেখে যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“বাঃ, আমি তো যাচ্ছিলাম পাঠশালা, আমার তেষ্টা পেয়েছিল তাই…’

‘আহা পাঠশালায় তো জল পাওয়া যায় না! …’

“চারু আধশোওয়া হয়ে খেলছিল, যেন ফণা ধরে উঠে বসল, হঠাৎ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললে, ‘ও খাবে না পাঠশালার জল, তোর কি রে? আ-মর! বাড়ি বয়ে কোঁদল করতে এল দেখো না। যা বেরো, ও যখন তোর বাড়িতে যাবে বলিস’খন। আ-গেল যা! নিজে সারাদিন টো-টো করে বেড়াচ্ছে, তাতে কিছু নয়, আর ও বেচারি…তুই উঠিস নি তো গোবরা, ও কি করে আমি দেখব…

“আমি হন হন করে বেরিয়ে এলাম; রাগ ছিল, অভিমান ছিল, আর কি ছিল ঠিক মনে পড়ে না, তবে খানিকটা গিয়ে প্রায় যখন মন্দিরের কাছাকাছি হয়েছি, হঠাৎ আমার গলা বন্ধ হয়ে এল, চোখে কি যেন ঠেলে উঠতে লাগল এবং বাপ-মা প্রভৃতিকে অনেকদিন দেখিনি বলে আমি কাপড়ে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম।

“হতাশ প্রেমের অশ্রু এইরকম একটা সম্পূর্ণ আলাদা কথা অবলম্বন করে উপছে ওঠে কি না, তোমরাই বলতে পারো।

“তিন দিন যাইনি। চতুর্থ দিন চারু নিজে এসে আমায় ডেকে নিয়ে গেল। রাস্তায় একবার আমার কাঁধে হাত দিয়ে মুখের দিকে চেয়ে বললে, ‘তোকে কথাগুলো বলে এত কষ্ট হয়েছিল, শৈল, মাইরি বলছি।’

“গোবরা কিন্তু সেদিন খুব আশকারা পেয়েছিল। তারপরেও যে তিনদিন যাইনি, সে তিন দিনও নিশ্চয় তার একাধিপত্য গেছে। সে যে ক্রমে ক্রমে আমায় পরাস্ত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র থেকে সরাচ্ছে, তাতে আর তার সন্দেহ ছিল না। এর পরেও দু’একটা ব্যাপার ঘটল, যাতে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাটা পরিপুষ্ট হবার বেশ অবসর পেলে। তারপর একদিন সে মনের কথাটা স্পষ্টই বলে ফেললে।

“সেদিন আমাদের সেই শ্রেষ্ঠ অবদান’ ‘সুভদ্রা হরণ’। প্রথামাফিক আমি সাজব অর্জুন, চারু সাজবে সুভদ্রা, গোবরা সাজবে ঘোড়া। ল্যাজের জন্য পেছনে চামর বাঁধবার সময় কিন্তু হঠাৎ সে বেঁকে বসল, বললে, ‘না, আমি ও সাজব না।’

‘প্রথমে সকলে বেশ একটু কৌতুক অনুভব করলাম, গ্রামের যাত্রা-থিয়েটারে এইরকম প্রায় হল বলে আমাদের যাত্রারও যেন কদর বেড়ে গেল। ‘ঘোঁড়া বেঁকে বসেছে’ বলে বেশ একটা আমোদমিশ্রিত রব উঠল। শেষ পর্যন্ত কিন্তু ঘোড়ার জিদে সব পণ্ড হয় দেখে সবাই চটে উঠল। কে একজন জিজ্ঞেস করলে, “তবে তুই কিসের পার্ট নিবি শুনি?’

গোবরা খানিকটা গোঁজ হয়ে রইল, তারপর আরো সবার পীড়াপীড়ির পর ঘাড়টা বেঁকিয়ে বললে, ‘আমি অর্জুনের পার্ট নেব।’

“সকলে এত বিস্মিত হয়ে উঠল, যেন সত্যিই একটা ঘোড়া অর্জুনে রূপান্তরিত হতে চাচ্ছে, কয়েকজন একসঙ্গে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘অর্জুনের।’

“গোবরা বললে, ‘বাঃ, কেন হব না? দুবার ঘোড়া সেজেছি বলে আমি যেন মানুষ নই! আমি শৈলর চেয়ে ঢের বড়, ওর চেয়ে ঢের সুন্দর। আর ও আসুক দিকিন আমার সঙ্গে কুস্তিতে।’

“চারু একেবারে কপালে চোখ তুলে বলে উঠল, ‘সে কি রে! তুই আমার সম্পর্কে দাদা হোস না? বলতে তোর আটকাল না জিভে? তুই অর্জুন সাজলে আমার সুভদ্রা সাজা চলে? তুই যে অবাক করলি রে।’

“নন্তী গালে তর্জনী ঠেকিয়ে বললে, ‘পাঠশালে পড়ে তোর এই বিদ্যে হচ্ছে গোবরা!’

“মাসখানেক থেকে পাঠশালে যে তার কোনো বিদ্যেই অর্জন হচ্ছে না সে কথাটা অবশ্য কেউ তুললে না।

“নিবারণ বললে, ‘আর তুই কুস্তিতে যদি শৈলকে হারাতে পারিস, তা হলে তো তুই ওর দাদা ভীম হলি, চারী তাহলে তোর ভাদ্দর-বৌ হল না?’

“সেদিনে আর প্লে হল না। ভালোই হল, কেননা গোবরা আমার দিকে এমনভাবে চাইলে, যাতে স্পষ্ট বোঝা গেল, সে ঘোড়া সাজলে একটি ক্ষুর যা ঝাড়ত, তাতে বীর অর্জুনকে আর এ জন্মে গাণ্ডীব তুলতে হত না।

“এর ফল এই হল যে আমার আর চারুর সম্বন্ধটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। অর্থাৎ চারু সুভদ্রা হলে আমার অর্জুন হতে কোনো দোষ নেই। বরং সব দিক দিয়ে আমিই যোগ্য। তুমি বিশ্বাস করো আর নাই করো, তারাপদ, এর পরে আমাদের দুজনের মনে মনে যেন একটা বোঝাপড়া হয়ে গেল। করছ না বিশ্বাস?”

“তারাপদ বলিল, বিশ্বাস করি আর নাই করি, ওর কাব্যটুকু উপভোগ করতে বাধা হচ্ছে না। কৈশোরের প্রেম বড় মধুর; আমাদের ধর্ম তাই একে দেব-মুখী করে শাশ্বত করে রেখেছে। সত্যিই নিজের শুদ্ধতার জোরে এ-প্রেম প্রেমাস্পদকে দেবতার সঙ্গে একাসনে…।”

“শৈলেন তারাপদর মুখের দিকে চাহিয়া ধীরে ধীরে হাসিতে লাগিল; বলিল, “ঠিক বলেছ, দেবতার সঙ্গে একাসনই বটে। সেই কথা বলব বলেই আজ এত কথার অবতারণা।

“সেদিন কি একটা অজ্ঞাত কারণে সকাল থেকেই ভালো ছেলে হবার ঝোঁক চেপেছিল। খুব ভোরে উঠলাম। বইয়ের ছেঁড়া পাতাগুলি জোরালো আঠা দিয়ে জুড়ে বইগুলোতে মলাট দিলাম, তারপর খাবার-টাবার বই শ্লেট নিয়ে পাঠশালায় বেরুলাম।

“রেল পেরিয়ে চারুর সঙ্গে দেখা; জিজ্ঞেস করলে, ‘কোথায় চলেছিস রে শৈল? পাঠশালায়?’

“মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম।

“জিজ্ঞেস করলে, ‘আজ আসবি না?’

“বললাম, ‘না। বাঃ, পাঠশালায় যেতে হবে না? শুধু তোদের সঙ্গে খেলা করলে চলবে আমার?”

“চারু শুধু ঠোটটা একটু উল্টে চলে গেল। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ঘুরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই কোথায় যাচ্ছিস রে?’

“বললে, ‘সজনে ফুল কুড়ুতে, ঘোষেদের পুকুরপাড়ে। ত

“আমি আবার পাঠশালা পানে ঘুরলাম বটে, কিন্তু দু’পা এগুতে পাঠশালা আর সজনে ফুল, অর্থাৎ গুরুমশাই আর চারুর দোটানায় পড়ে গতিটা শ্লথ হয়ে উঠল এবং হঠাৎ যখন মনে হল, সজনে ফুল কুড়িয়ে বাড়িতে তরকারির সাহায্য করাও ভালো ছেলের একটা লক্ষণ, তখন বেশ একটা তৃপ্তি পেলাম।

“সেদিন সকালবেলাটায় কিছু একটা ছিল। যেমন নিজেকেও খুব ভালো লাগছিল, ঘোষেদের দিলাম পুকুরপাড়ে চারুকেও তেমনি যেন বেশি করে মিষ্টি বোধ হচ্ছিল। তাকে ঝরে-পড়া ফুল কুড়ুতে না, আমি থাকতে সে বাসি ফুল কুড়ুবে? গাছে উঠে ডাল ভেঙে ভেঙে টাটকা ফুলে তার কোঁচড় ভর্তি করলাম। কিছু আমও চুরি করে দিলাম। তারপর বাস্তব ক্ষেত্রে আর তার কোনো উপকার করবার উপায় না দেখে বললাম, ‘আজ রিজিয়ার থিয়েটার করবি চারী?”

“মানে তাহলে বক্তিয়ার সেজে বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে হত্যা করা যায়। বইয়ে যাই থাক না কেন। চারুর জন্যে একটা প্রকাণ্ড কিছু না করতে পারা পর্যন্ত যেন স্থির হতে পারছিলাম না। যদি পারি তো বীরেন্দ্রের পার্টটা গোবরাকেই দোব।

“চারু একটা টোকো আম দাঁত দিয়ে কুরে কুরে খাচ্ছিল। চোখমুখ কুঁচকে বললে, ‘না।’

“জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন র‍্যা?’

“চারু বিরক্তভাবে বললে, ‘সাজ নেই, কিচ্ছু নেই, আমি অমন নামাবলী গায়ে দিয়ে রিজিয়া সাজতে পারব না, যাঃ।’

“একটু আশ্চর্য হলাম, কেননা চারুর কোন্কালে পোশাকের ফ্যাসাদ ছিল না। কথাবার্তায় রহস্যটা বোঝা গেল। আগের দিন শীতলাতলায় কলকাতার গণেশ পরামাণিকের দল গেয়ে গেছে। তারা আনকোরা নতুন সাজে একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, বিশেষ করে রুক্মিণী—সে আবার ঢুকল, ইংলন্ডের রানী এলিজাবেথের মতো একটা প্রকাণ্ড গোলাপী রেশমী শাড়ি পেছনে টানতে টানতে। ও জিনিসটা তখন সদ্য কলকাতায় যাত্রা-থিয়েটারে ঢুকেছে, আর নির্বিচারে চলেছে। এখনকার স্টেজে গ্রীক-প্যাটার্নের অভিবাদনের মতো—সেলুকাসের সেনাও ওই করছে, আবার শ্রীকৃষ্ণের দ্বাররক্ষীও ওই করছে, সেদিন এক জায়গায় দেখলাম দেবর্ষি নারদও বৈকুণ্ঠে মাথায় বীণা তুলে ওই ইউনানী অভিবাদন করলে।…তুমি হাসছ যে,–অমরলোকে না হয় সেখানকার বাসিন্দাদের মৃত্যুই নেই, তা বলে নূতন স্টাইল ঢুকবে না, এমন কোনো শর্ত আছে নাকি?

“আমি একটু ব্যাকুল হয়ে উঠলাম; চারুর ভালো পোশাক পরবার সাধ হয়েছে, এই সময় যদি কিছু করা যেত! বিশেষ করে চারুর মনোরঞ্জনের জন্যে আমার আর গোবরার মধ্যে যেরকম রেষারেষি চলছে।

“গল্প করতে করতে আমরা ঘাটে শানের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। আমি বললাম, ‘বৌদির ট্রাঙ্কে একটা শান্তিপুরে ডুরে শাড়ি আছে, যদি বলিস তো দুপুরবেলায় যখন ঘুমুবে…’

“চারু ঠোট দুটো কুঁচকে বললে, ‘মিছে বকসিনে শৈল, ডুরে শাড়ির নাকি আবার উড়ুনি হয়, তাও আবার শান্তিপুরে! অরুচি।

“বৌদির পরই জেঠাইমা আর ঠাকুরমা—থান আর নামাবলী। আমি অসহায়ভাবে চিন্তা করতে লাগলাম।

“একটু পরে মল-সুদ্ধ পা শানে ঠুকতে ঠুকতে চারু বললে, ‘এক জায়গায় পাওয়া যায়। ‘

“আমি ব্যগ্রভাবে বললাম, ‘কোথায় বল তো?’

“চারু উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে চেয়ে গা দোলাতে লাগল। আমি আবার প্রশ্ন করতে বললে, ‘সে তোর দ্বারা হবে না।’

“বললাম, ‘বলই না।’

“বললে, ‘রাধারমণের মন্দিরে।’

“আমার সমস্ত অন্তরাত্মা মন্দির ওলট-পালট করে এল। নিষ্ফল হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘মন্দিরে কোথায় রে? সেখানে তো দোলনা, ঠাকুরের শোবার খাট, নৈবিদ্যির থালা…’

“চারু আঁচলটা দাঁতে চেপে পালিশ করতে করতে বললে, ‘রাধার গায়ে।’

“বলে ফল কি হল দেখবার জন্যে একবার আড়চোখে আমার দিকে চাইলে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, ‘রাধার উড়ুনি তুই গায়ে দিবি!’

“চারু বোধ হয় ভয় পেয়ে গেল, তাড়াতাড়ি বললে, ‘বাঃ, তাই বললাম নাকি?’

“তারপরে গম্ভীরভাবে উঠে পড়ে বলল, ‘বাড়ি যাই, তুই পাঠশালে যাবিনি? খালি মেয়েদের সঙ্গে খেলা!’

“চারু রেগেছে। একসঙ্গে আসতে আসতে খানিক পরে আমি বললাম, ‘আর যদি কেউ টের পায়? তাছাড়া পাপও তো বটে?’

“চারু কোঁচড় থেকে এক মুঠো সজনে ফুল বের করে শুঁকতে শুঁকতে বললে, ‘কে তোকে বলেছে? তারচেয়ে গোবরাকে বললে বরং…’

“চারু ঈর্ষার শক্তির কথা জেনেই কি ওকথা বলেছিল? মেয়েমানুষ,—ওদের মনের বৃত্তি কখন থেকে অঙ্কুরিত হতে থাকে কে জানে? কিন্তু ওইতেই—ওই গোবরার নাম এনে ফেলতেই ফল হল।

“তার পরদিন দুপুরের পুজো করতে ঢুকে পুরুতঠাকুর দেখলেন রাধার গা খালি। একটুখানির মধ্যেই গ্রামে হৈ-চৈ পড়ে গেল।…সিগারেটের টিনটা সরিয়ে দাও দিকিন, দেশলাইটাও–থ্যাঙ্কস।

“কখন চুরি গেল, কে করলে কেমন করে—সে কথা থাক। আজ একটু আগে বড় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম—না? আসল কথা হচ্ছে—রাস্তা দিয়ে একটা লোক খানিকটা জরি-বসানো গোলাপী রেশম নিয়ে যাচ্ছিল, দুপুরের রোদে ঝলমল করছে। আলোর ঝলমল গোলাপী রঙ এখনো আমায় চঞ্চল করে তোলে। আমি আর বর্তমানে থাকি না। কালের পর্দা হালকা রেশমের মতোই ফরফরিয়ে উড়তে থাকে—দেখি তার ও-প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দুটি কিশোর-কিশোরী, স্থান—একটি পোড়োবাড়ির একটি নিভৃত প্রান্ত।

‘মেয়েটির গা একটি জরি পাড় দেওয়া গোলাপী রেশমে জড়ানো। তার ভাঁজে ভাঁজে ওপর থেকে এসে পড়েছে দুপুরের সূর্যের চোখ ঝলসানো আলো; তাতে ভেতরের গায়ের রঙ আর বেড়াবেণীর ঝিকমিকি যেন হয়ে উঠেছে রূপকথার মায়া। ছেলেটি বিজয়গর্বে দাঁড়িয়ে আছে; রাজকুমারীকে সোনার গাছের হীরের ফল এনে দিয়ে অরূপকুমার নিশ্চয় একদিন এইরকমভাবে দাঁড়িয়েছিল।”

“তারাপদ একটু অপেক্ষা করিয়া ঈষৎ হাসিয়া প্রশ্ন করিল, “তারপর?”

“শৈলেন বলিল, “হ্যাঁ একটা ‘তারপর’ আছে বৈকি,—তারপর সেই দৃশ্যমঞ্চে পুরোহিত প্রমুখ গ্রামের একপাল লোকের প্রবেশ—দুপুরের চেয়েও উগ্রমূর্তি সবার; পথনির্দেশক গোবরা।…হ্যাঁ, বলেছিলাম এ রোমান্সে হত্যা পর্যন্ত আছে, সেটা আর কিছু নয়, তোমার গার্ভিসলিকোপড়া মনে ঔৎসুক্যটা জাগিয়ে রাখবার জন্যে; ক্ষমা করো। ও কি!—তোমায় হঠাৎ অমন উদাস দেখাচ্ছে কেন? রেশমী উড়ুনীর মায়ার ছোঁয়াচ, না গোবরার হাতে হত্যা হলাম না বলে নিরাশা?—তার হাতে যতটুকু ছিল তা তো সে করেই ছিল।”