ল্যান্সডাউন ও বিপিন পাল – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
ল্যান্সডাউন ও বিপিন পাল
কলিকাতা কংগ্রেসী কর্পোরেশনের মতিচ্ছন্ন ধরিয়াছে। গুরু লঘু জ্ঞান হারানো মতিচ্ছন্ন ধরারই লক্ষণ বৈকি, আর ল্যান্সডাউন-বিপিন পালের প্রভেদ না বোঝা গুরুলঘুভেদজ্ঞানের অভাব বলিব না তো কি বলিব?
ল্যান্সডাউন কে ছিল? –ও প্রশ্ন তুলিয়া আর ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিবেন না। কথাটা জিহ্বাগ্রে লইয়া একবার মুখের মধ্যে নাড়াচাড়া করুন দেখি—একবার টাগরায় ফেলুন, একবার এ-গালে নিন, একবার ও-গালে…কেমন—আভিজাত্যের রসে মুখটা ভরিয়া উঠিতেছে না?—’ল্যান্সডাউন’ ওই জিনিস! ইট স্ট্যান্ডস ফর ডিগনিটি, ইট স্ট্যান্ডস ফর অ্যারিস্টোক্র্যাসি; ল্যান্সডাউন ইজ ল্যান্সডাউন, অ্যান্ড ইজ নট টু বি কাপল্ড, উইথ ইওর বিপিন পলস্ অর্ ভোপেন বোসেস্। (it stands for dignity, it stands for aristocracy; Lansdowne is Lansdowne and is not to be coupled with your Bepin Pauls or Bhopen Boses. —ল্যান্সডাউন মহত্ত্ব আর আভিজাত্যের প্রতীক; ল্যান্সডাউন ল্যান্সডাউনই—ওর সঙ্গে তোমাদের ওই বিপিন পাল কি ভূপেন বোসকে মিশ খাওয়াতে গেলে চলবে না।)
বাক্যগুলা আমার নয়, একজন অ্যারিস্টোক্র্যাটেরই। ব্যারিস্টার বিরাজশঙ্কর মৌলিক (B. S Molek) শ্বশুরের পয়সায় বৈঠকখানা রোড থেকে বিলাত যান। সেখানে মনে যে সব উচ্চাশা জন্মগ্রহণ করে তাহার মধ্যে ল্যান্সডাউন রোড ছিল একটি। বহুদিন ঠাঁই হয় নাই, সম্প্রতি কর্পোরেশন রাস্তাটি একটু বাড়াইয়া দেওয়ায় একটি ছোটখাটো বাড়ি তুলিয়াছেন। বনেদী ল্যান্সডাউনে হইল না—আহা, তবুও তো ল্যান্সডাউনই?—নয়াপুরানোর প্রভেদ ঘুচিতে কতদিন লাগিবে?
এমন সময় খবর পাওয়া গেল কংগ্রেসী কর্পোরেশনের মতিচ্ছন্ন ধরিয়াছে,—কথা উঠিয়াছে নূতন রাস্তাটির নামকরণ হইবে বিপিনচন্দ্র পাল রোড।
মৌলিক বার-লাইব্রেরিতে একটু উষ্ণ গুঞ্জন তুলিবার চেষ্টা করিল। তাহার বিলাতের সঙ্গী রঞ্জন বোসের কাঁধে হাতটা চাপিয়া প্রশ্ন করিল— “শুনচ হ্যা, ল্যান্সডাউন এক্সটেনশন যেটাকে বলচি আমরা এখন, কর্পোরেশন সেটার নাম করেচে বিপিনচন্দ্র পাল রোড!”
রঞ্জন বনেদী ল্যান্সডাউনের বাসিন্দা; ঘুরিয়া পাঁশনেটা নাক থেকে সরাইয়া প্রশ্ন করিল—“ইউ রিয়েলি ডোন্ট মীন দ্যাট!” (You really don’t mean that! তাই নাকি? ঠাট্টা নয় তো?)
–“আই মীন নাথিং লেস; সী” (I mean nothing less; see — মোটেই নয়, দেখো বরং)—বলিয়া মৌলিক হাতের সংবাদপত্রটার একটা স্থানে নখ টিপিয়া রঞ্জনের সামনে ধরিল। রঞ্জন চশমাটা আবার যথাস্থানে বসাইয়া ভীতভাবে বলিল—“আই ওয়ান্ডার হোয়াট দে আর আপ টু নেক্সট উইথ দেয়ার খ্যাডার মেন্টালিটি।” (I wonder what they are up to next with their khaddhar mentality—ওদের এই খদ্দরি মন নিয়ে ওরা এর পরে যে আরো কি করে বসবে তাই ভাবি!) একটা মোকদ্দমায় নথি ঘাঁটিতেছিল, ঘুরিয়া আবার মনঃসংযোগ করিল।
মৌলিক মনের উত্তেজনায় একজন প্রবীণ সাহেব ব্যারিস্ট্যারকে বলিল দুঃসংবাদটা। সাহেব মৃদু হাসিয়া তাহার কাঁধে লঘু আঘাত করিয়া বলিল—“সোব চরখা হৈয়া যাবে মি. মোলেক; আই উইল লিভ টু সী দ্যাট…” (I will live to see that—মরব না—দেখে যাব।)…হাঃ, হাঃ, হাঃ,…”
প্রাচীন অ্যাডভোকেট মিস্টার রয়চৌধুরীও নুতন রাস্তায় বাড়ি করিয়াছেন, উৎসাহভরে মৌলিক তাঁহাকেও খুঁজিয়া বাহির করিল। ব্যস্ত ছিলেন, বলিলেন—“সত্যি নাকি? একটু ভালো করে খোঁজ নাও তো। আমিও পালের নামটা সেদিন সাজেস্ট করেছিলাম একজন কাউন্সিলারের কাছে….নামটা মনে আসছে না…”
একজন ছোকরা ব্যারিস্টার আলোচনাটা শুনিতেছিল। মিস্টার রায়চৌধুরী চলিয়া গেলে মৌলিক অবজ্ঞাভরে বলিল—“দ্যাটস্ হোয়াট আই কল ভার্নাকুলার মেন্টালিটি;” (Thats what I call vernacular mentality!)—একেই নিছক দেবী মনোভাব বলি।
কোর্টে তেমন জমিল না, জমিবার কথাও নয়। বাড়ি আসিয়া কিন্তু মৌলিক সদ্য সদ্য এক তুমুল আন্দোলন শুরু করিয়া দিল; রাস্তার দুধারে যাহারা বাড়ি তুলিয়াছে তাহাদের অনেকের সহিতই সেই দিনই দেখা করিয়া ফেলিল, এবং বিপদের কথাটা জানাইল। উকিল, ব্যারিস্টার, ডাক্তার, ব্যবসাদার, নানারকমের লোক। অনেকে জানিত, তাহার মধ্যে কয়েকজন মনে মনে একটু নিরাশও হইয়াছিল, কিন্তু মনের ভাব প্রকাশ করিবার সুযোগ বা যৌক্তিকতা খুঁজিয়া পাইতেছিল না, সঙ্গী পাইয়া তাঁহারা স্পষ্টভাবে নৈরাশ্য জানাইল এবং চটিল। যাহারা গায়ে মাখে নাই, উদাসীন ছিল—অর্থাৎ যাহাদের ল্যান্সডাউন, কি বিপিন পাল কি সওদাগর মুন্সি—যে কোনো একটা নাম হইলেই চলিত তাহারাও আভিজাত্যের নেশার মাতিয়া উঠিল। দু’একজন সাহেব — আর্মেনিয়ান আছে, তাহারা তো যোগ দিলই। একটু পিছনে থাকিয়া, একজন মাড়োয়ারি খানিকটা জমি লইয়া খানকয়েক বাড়ি তুলিতেছে, বলিল—“হামি ও সব অ্যারিস্টোকেসিফেসি সমঝে না; মকানকা ভ্যালুয়েশন ঘটনেসে ড্যামিজস্যুট লে আবেগা!”
আন্দোলনটা কয়েকদিনের মধ্যেই বেশ ঘোরাল হইয়া উঠিল। কিন্তু বেশ কেন্দ্রীভূত না করিয়া ফেলা পর্যন্ত লাগসই হইতেছে না। মৌলিক প্রমুখ কয়েকজন খুব মাথা ঘামাইতে লাগিল এবং তাহাদের ঘর্মাক্ত মস্তকের উষ্ণতায় সমস্ত আবহাওয়াটা উষ্ণতায় উত্তপ্ত করিয়া তুলিল।
রঞ্জন এর মধ্যে ছিল, বলিল—“আই হ্যাভ, এ ব্রেন ওয়েভ, বিরাজ, লেট আস টেক এ লীফ আউট অব দি হাক মিনিস্ট্রিজ বুক” (I have a brain wave, Biraj, let us take a leaf out of the Huq ministry’s book; –আমার মাথায় একটা মতলব এসেছে, বিরাজ;–এসো, হক মিনিস্ট্রির পন্থা অবলম্বন করা যাক)—“মানে, কর্পোরেশনের ইউরোপীয়ান গ্রুপকে ভাঙাও, হোয়াট আর দে দেয়ার ফর ইফ নট টু হেল্প আস আউট অব স্যচ স্ক্রেপ্স (What are they there for, if not to help us out of such scraps—এই রকম সব বিপদ থেকে ওরা যদি আমাদের টেনে না তুলতে পারে তো আছে কি করতে?”
মৌলিক বিপুল বিস্ময়ে তাহার মুখের পানে চাহিয়া বলিল—“ইউ আর এ ব্রিক রঞ্জন!” (You are a brick Ranjan –তুমি একখানি রত্ন।) “কিন্তু কথা হচ্ছে হাউ টু ডু ইট” (How to do it?—ওটা ঘটানো যায় কি করে? )
রঞ্জন বুড়া আঙুলের নখ দাঁতে খুঁটিতে খুঁটিতে গূঢ় সঙ্কেতের সহিত বলিল—“ভাবা হয়ে গেছে— ডিনার,—ল্যান্সডাউন ডিনার!” Dinner – Lansdowne Dinner! —ল্যান্সডাউন ভোজ। মৌলিক বিস্ময়ে, প্রশংসায় হর্ষে খানিকক্ষণ একেবারে নির্বাক হইয়া রহিল, তারপর একটু নিরুৎসাহ হইয়া বলিল—“কিন্তু টাকা!”
—“তাও ভেবে রেখেচি,—ফাদার-ইন-ল—পরমপূজনীয় শ্বশুরঠাকুর গৌরীসেনকল্পেষু…”— বলিয়া সামনে পিছনে দুলিয়া দুলিয়া হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিল।
মৌলিক একটু হাসিল, তারপর ডাইনে-বাঁয়ে মাথা নাড়িয়া বলিল—“নো গো (No go– হবার নয়।) তবে দাঁড়াও—হয়েছে—আমার প্রতিভাও এবার জেগে উঠেছে—শেঠজিকে ধরা যাক— সেন্টিমেন্টের ধার ধারে না—যদি হিসাব খতিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যায় ডিনারের দামটা শেষ পর্যন্ত বাড়ির ভ্যালুয়েশনকে পুষ্ট করবে—শেঠজি ঠিক নেমে পড়বে। দিব্যি প্ল্যান-ল্যান্সডাউন ডিনার!— স্পীচেস-ল্যান্সডাউন জিন্দাবাদ!—ডাউন উইথ বিপিন পাল!…কিন্তু তোমার প্ল্যানটাকে আরো মডিফায়েড করতে হবে।—ইউরোপীয়ান গ্রুপকে সোজাসুজি ধরলে হবে না, খরচও অনেক। হিয়ার দি অরিজিনাল জিনিয়াস অব দি মৌলিক ব্র্যান্ড কম্স্ ইন। (Here the original Genius of the Maulik brand comes in,–এইখানে মৌলিক মার্কা আদি মুল প্রতিভার আবির্ভাব)। মৌলিক মানে, —অরিজিনাল, জানোই। আমি লোকও ঠিক করে ফেলেচি মনে মনে,—ম্যাকার্থি হে, তোমার শ্বশুরের বাড়ির সামনেই প্রকাণ্ড কম্পাউন্ডওয়ালা বাড়ি। মস্ত বড় মার্চেন্ট আর ইউরোপীয়ান মহলে হিউজ ইনফ্লুয়েন্স, আর এবভ্ অল—স্কচ, বাঙাল; ডাণ্ডীতে (Dundee), বাড়ি, সে হিসেবে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের বাঙাল বলতে পারো; মাথায় একটা আইডিয়া ঢুকিয়ে দিলে না করে ছাড়বে না। ফাদার-ইন-ল’র সঙ্গে খুব দহরম-মহরম—আমাকেও চেনে, ধরা সহজ হবে।”
ল্যান্সডাউন ডিনার—গেস্ট অব অনার স্যর অমুক ম্যাকার্থি, কে. টি. এটসেটরা—ওর ক্রিশ্চান নেম আর ডেররেশনগুলো জেনে নিতে হবে…সিভিয়ার কনডেমননেশ্যন অব কংগ্রেস কর্পোরেশন মেথড্রস। (কংগ্রেস কার্যপদ্ধতির তীব্র নিন্দা)… বোল্ড হেডলাইন দিয়ে স্টেটসম্যানে বেরুবে। কর্পোরেশনের একেবারে গোড়া পর্যন্ত নেড়ে ছেড়ে দেব; মিস্টার জাকেরিয়া উইল সিমপ্লি হ্যাভ টু শেক ইন হিজ শুজ।…বিপিন পাল, ইনডীড!… (Mr. Zakaria will simply have to shake in his shoes. Bepin Paul, indeed!) মি. জাকেরিয়ার থরহরি কম্প লাগিয়ে দেবে। বিপিন পাল—বটে!
সকলের পরামর্শে তাহাই ঠিক হইল। একজন ইউরোপীয়ানকে খাওয়াইয়া যদি ইউরোপীয়ান যজ্ঞের ফল পাওয়া যায় তো সেই ভালো; তাহা ভিন্ন গোড়া হইতে সব ইউরোপীয়ানদের ডাকিয়া একটা হল্লা করিয়া ফেলা সমীচীন নয়। এদিকে ডিনারের সুবিধাও অনেক, সব মাথাকে একত্রিত করিতে হইলে সব রসনাকে লুব্ধ করার চেয়ে ভালো ফন্দি আর নাই। শেঠজি বাঙালির বাচ্ছা মৌলিক রঞ্জনের চেয়ে হিসাব জিনিসটা ঢের বেশি বোঝে, ফাঁকা আওয়াজের ওপর সমস্ত ডিনারের খরচটা গছিয়া লইবার পাত্রই নয়, তবুও একটা মোটা চাঁদা দিল, বাকি টাকাটা নিজেদের মধ্যেই তুলিতে হইল, বৈঠকখানা রোডের যে ভদ্রলোকটি মৌলিকের হস্তে কন্যা সমর্পণ করিয়াছিলেন প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তাহারও কিছু খসিল।
ম্যাকার্থির ভাবটা মৌলিক নিজে লইল এবং শ্বশুরের একটা চিঠি লইয়া গিয়া একদিন বাসায় দেখা করিল। লোকটা বুড়ো ঘাঘি, তেত্রিশ বৎসর যাবৎ কত বিচিত্র ঘটনা সংঘাতের মধ্য দিয়া অটুট একাগ্রতার সঙ্গে এদেশের মাটির রস শোষণ করিয়া আসিয়াছে। অনেক অভিজ্ঞতা।…খুব সহানুভূতি দেখাইল। বলিল —“ইয়ং ম্যান, তোমাদের মধ্যে এরকম সিভিক সেন্স (নাগরিক মনোবৃত্তি) দেখে আমি আবার ভারতবর্ষ সম্বন্ধে আশান্বিত হচ্ছি। আমার সাহায্যের ওপর তোমরা পূর্ণভাবেই নির্ভর করতে পারো— ইউরোপীয়ান গ্রুপ যে শেষ রেখা পর্যন্ত লড়বে এ একরকম আমি কথাই দিচ্ছি তোমায়—তাদের না জিজ্ঞেস করেই।…ল্যান্সডাউন ডিনারে অধ্যক্ষতা করতে বলবার জন্যে ধন্যবাদ; আর কে কে আসবেন? “ মৌলিক নাম করিতে লাগিল। গোটা চার-পাঁচ শুনিয়া সাহেব বলিল —“না, কোনো ইউরোপীয়ান ভদ্রলোক আছেন কিনা?”
মৌলিক একটু আমতা আমতা করিয়া বলিল—“না, তাঁদের যোগ্যতম প্রতিনিধি হিসাবে আপনাকেই ডেকেছি আমরা। প্রথম বারেই সবাইকে ডেকে একটা তুলকালাম করা সবার মত হল না।” সাহেবের মুখটায় একটু ছায়া উঠিয়াই মিলাইয়া গেল;—মৌলিক বোধ হয় লক্ষ করিবারও সময় পাইল না। বলিল—“বেশ তা আমি নিশ্চয় যাব, আর আমার সহানুভূতির কথা বললামই—একচুলও নড়চড় হবে না…ধন্যবাদ মিস্টার মোলেক রাইট-ইও; তোমার শ্বশুরকে আমার অভিবাদন জানিয়ো।”
ঘরের বাহির পর্যন্ত আসিয়া উষ্ণ করমর্দনের সঙ্গে বিদায় দিল। মৌলিক আসিয়া বলিল—“কেল্লা ফতে।”
ডিনার হইল মৌলিকের বাড়িতে। একটু খুঁত থাকিয়া গেল, ম্যাকার্থি সাহেব আসিতে পারিল না, একটা চিঠি লিখিয়া জানাইল সে হঠাৎ একটু অসুস্থ হইয়া পড়িয়াছে, তাহাকে ক্ষমা করিতে হইবে।
ডিনার কিন্তু নিতান্ত অসফল হইল না। খুব চোখা চোখা স্পীচ ম্যাকার্থি থাকিলে বোধ হয় একজন সাহেবের সামনেই যাহারা তাহার মাতৃভাষার কোরবানি করিতে কুণ্ঠিত হইত তাহারা পর্যন্ত প্রাণ খুলিয়া বক্তৃতা করিল। ঠিক হইল রাস্তা তো বিপিন পালের নাম দিয়া কলুষিত করিতে দেওয়া হইবেই না; অধিকন্তু আশেপাশে ল্যান্সডাউন রোডের সংলগ্ন কোণকান যেখানে যা আছে সমস্তগুলাকে যোগ্যতা অনুযায়ী ল্যান্সডাউন স্পার (Lansdowne spar), ল্যান্সডাউন ক্রিসেন্ট (Lansdowne cresent), ল্যান্সডাউন কর্নার (Lansdowne corner) প্রভৃতি উপযুক্ত নাম দিয়া আভিজাত্য-গৌরবমণ্ডিত করিতে হইবে। কংগ্রেসী কর্পোরেশন উত্তর কলিকাতা তাহাদের ঘোষ বোস- মিত্তির-পালে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলুক, পূর্বে দক্ষিণেও তাহাদের ঔদ্ধত্য চরিতার্থ করিবার অনন্ত পথ খোলা আছে; কিন্তু তাহারা যদি ল্যান্সডাউন রোডের পবিত্র গণ্ডির মধ্যে পা বাড়াইতে যায় তো তাহাদের অপরিণামদর্শিতার জন্য পরিতাপের আর অন্ত থাকিবে না। বুঝিয়া-সুঝিয়া, ভাবিয়া-চিন্তিয়া অগ্রসর হোক!… ইউরোপীয় গ্রুপের সহানুভূতি জ্ঞাপনের জন্য ম্যাকার্থিকে ধন্যবাদ দেওয়া হইল। তিনি অসুস্থ হইয়া পড়ার জন্য সকলেই বিশেষ দুঃখিত। স্থির হইল এই দুঃখের কথা এবং সমবেত মণ্ডলীর আন্তরিক ধন্যবাদ মিস্টার মৌলিক গিয়া স্বয়ং ম্যাকার্থি সাহেবকে জানাইবেন এবং এও বলিবেন তিনি শারীরিক অনুপস্থিত থাকিলেও তাঁহার আশাময়ী বাণী ল্যান্সডাউন ডিনারের সাফল্যে পূর্ণভাবেই সাহায্য করিয়াছে।
পরদিন সকালেই মৌলিক হাজিরা দিল। সাহেব বিশেষ দুঃখ প্রকাশ করিল,–একেবারে শেষমুহূর্তে তাহার শরীরটা একটু অসুস্থ হইয়া পড়িল।…কিন্তু মিস্টার মৌলিক এবং বিপিন পাল-বিরোধী মহোদয়েরা যেন জানেন ইউরোপীয়ান গ্রুপের সাহায্য সম্বন্ধে তিনি যে কথা দিয়াছেন তাহার নড়চড় হইবে না। একটু সুযোগও সামনে আছে, — সামনের শনিবারে পেলিটিতে তাহাদের ডান্ডী ডিনার, (Dundee dinner)। কর্পোরেশনের ইউরোপীয়ান কাউন্সিলারদের অনেকেই উপস্থিত থাকিবেন—কথাটা সেইখানেই পাড়িবেন।
কাচপোকার কবলে পড়িয়া আরশোলা কাচপোকা হইয়া যায়।—ইচ্ছায় হয়, কি অনিচ্ছায় হয় জানি না, তবে নাকি হয়। মানব সমাজের একপ্রান্তে অনুরূপ একটা ঘটনা ঘটে। সাহেবের সংসর্গে আসিলে বাঙালি সাহেব হইয়া যায়,—ঠিক হইয়া যায় বলিতে পারি না, তবে ভাবে—হইয়া গিয়াছি। সাহেব কাচপোকাকে আয়াস করিতে হয় না,—দু’বার একটু দেখা করা, দুটা মিষ্ট কথা—বারদুয়েক করমর্দন—এইতেই রূপান্তরের পালা আরম্ভ হইয়া যায়।…
‘পেলিটি’তে ‘ডাণ্ডী ডিনার’! —কী সম্মোহন শব্দটার মধ্যে!… মৌলিক একটু মাথাটা নীচু করিল, তাহার পর অন্তরের লালসা চাপিতে না পারিয়া মুখটা তুলিয়া একটু অপ্রতিভভাবে বলিয়া ফেলিল— “সেখানে—ইয়ে—আমার নিজের তাঁদের অনুরোধ করবার সুবিধা হতে পারে না, স্যার?”…
ম্যাকার্থির মুখে ছায়াটা যেন এবার একটু বেশি গাঢ় হইয়া পড়িল কিন্তু তখনই সামলাইয়া লইয়া উৎসাহের সহিত বলিল—“ও ইয়েস, টু বি স্যুয়র মিস্টার মোলেক, ইউ উইল হ্যাভ এ কার্ড; ইন ফ্যাক্ট, উই উড ফীল অনার্ড। (Oh, yes, to be sure Mr. molek, you will have a card; in fact, we would feel honoured.—হ্যাঁ, নিশ্চয় তুমিও একটি নিমন্ত্রণ পত্র পাবে; আসলে তুমি উপস্থিত হলে আমরা গৌরবান্বিতই হব।)
আবার ঘরের বাহির পর্যন্ত আসিয়া করমর্দন করিয়া বিদায় দিল।
.
শনিবার রাত্রি। ডিনার হলের দরজার সামনে নিখুঁত ডিনার সুট পরা একটি বাঙালি যুবক উপস্থিত হইল। বেয়ারা আসিয়া সামনে দাঁড়াইয়া একটু বিস্মিতভাবে সেলাম করিয়া বলিল —“সাহেব লোগকা ডিনার হ্যায় হুজুর।” যুবক পকেট হইতে কার্ড বাহির করিয়া হাতে দিল। বেয়ারা আর একটা সেলাম করিয়া বলিল—“তব্ ভি, সাহেব নেহি হোনেসে মানা হ্যায় হুজুর।”
মৌলিকের ভ্রূজোড়া অধৈর্যতায় কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। কয়েক জায়গায় ট্রাফিক পুলিশের হাতে অতিরিক্ত রকম বাধা পাইয়া তাহার দেরি হইয়া গিয়াছিল। একটু চিন্তা করিল, পকেট হইতে একটা পাঁচ টাকার নোট বেয়ারার হাতে দিয়া বলিল—“কার্ডঠো ম্যাকার্থি সাহেবকো দেও। হাম ইয়া ঠাড়া হ্যায়।”
ম্যাকার্থির চোখে, গালে তখন রঙ ধরিতে শুরু হইয়াছে। কার্ডটা হাতে লইয়া একবারে দাঁতে দাঁতে চাপিয়া ইংরাজি—অথবা খাঁটি স্কচ ভাষায় কি একটা বলিল, তাহার পর বেয়ারার দিকে চাহিয়া হিন্দিতেই বলিল—“বেঙ্গলী বাবুকো বোলো-খালি হিন্দুস্টানীকা ডিনারমে আলি সাহেব লোগ নেহি যাটা, ইসিবাস্টে হামারা বেমারি হুয়াঠা; অওর, আলি সাহেবলোগকা ডিনারমে হিন্দুস্টানী নেহি আ সাটা–বাবুকা ভি বিমারি কা চিঠি আনা চাহটা ঠা। যাও।” (বাঙালি বাবুকে বলো যে খাঁটি হিন্দুস্থানীদের ভোজে সাহেবরা যেতে পারে না, সেই জন্যই আমার অসুখ হয়েছিল, তেমনি খাঁটি সাহেবদের ভোজেও হিন্দুস্থানীদের প্রবেশ নিষেধ, বাবুরও অসুখের চিঠি আসা উচিত ছিল)।
আবার ঘুরিয়া ডাকিয়া বলিল—“ইউ! শুনো,—বাবুকো বোলো—সাহেবলোগ হেল্প করেগা, মডট্ করেগা, ইস্ বাস্টে কে—আলি সাহেব ল্যান্সডাউকে সাঠ কোই কালা আডমিকা নাম নেহি মিল সাটা। যাও,—গেট্ অ্যাওয়ে।”
আবার একটা খাঁটি স্কচ্ গালাগাল দাঁতে পিষিয়া ঘুরিয়া ডিনারে প্রবৃত্ত হইল।”*
—
* কাহিনীটির ভূমিকা ১৩৪৫-এর ভাদ্র সংখ্যা প্রবাসীর বিবিধ প্রসঙ্গে পাওয়া যাইবে।
