মুরারি ডাক্তারের ঠিকেদারি – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
মুরারি ডাক্তারের ঠিকেদারি
শেষ পর্যন্ত মুরারি ডাক্তারকে ডাকাই স্থির রইল।
মেয়ের মনটা শুধু একটু ক্ষুণ্ণ হইয়া রহিল। বলিল, “ওপাড়া থেকে সাধন ডাক্তারকে ডাকলে ভালো হত না তারু কাকা? অবিশ্যি মুরারি কাকা খুবই ভালো, কিন্তু আমার যেমন অদেষ্ট…”
তারিণী খুড়ো হুঁকা হইতে মুখ সরাইয়া প্রশ্ন করিলেন, “আর সেদো এসে তোর অদেষ্ট পাল্টে দেবে? গীতায় শ্রীকৃষ্ণ কি বলেছেন জানিস?”
তিনি নিজেও জানেন না বলিয়া আবার হুঁকা টানিতে লাগিলেন।
স্বামী বিরক্ত হইয়া বলিল, “তখন থেকে সাধন-ডাক্তার, সাধন-ডাক্তার যে করছে, ওকে জিজ্ঞেস করুন তো তারু কাকা, সাধন ডাক্তারের খাঁই আর হ্যাপা মেটানো কি চাড্ডিখানি কথা? কলেজের পাশ-করা ডাক্তার, বোধ হয় এমন একটা ওষুধের নাম করে বসবে, রোগী ছেড়ে ছোটো কলকাতা ওষুধ খুঁজতে। ও যাবে কাছা-কোঁচা এঁটে? আমার দ্বারা তো হবে না, বলে নিজের শরীর নিয়েই প্রাণান্ত। আর কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে ঘর করা, বছরে বছরে একটি করে বেড়েই চলেছে, নিজেদের পাড়ার ডাক্তারকে আমাদের মতো ছাপোষা গেরস্থর অবহেলা করা চলে? আপনিই বলুন না কাকা।”
দোরের পাশ হইতে উত্তর আসিল, “চুপ করতে বলো, আর ছেলেগুলোর অকল্যাণ কামনা করতে হবে না। আসুন তাহলে মুরারি কাকা, আমার কপালে যা আছে হবে।”
তারু খুড়ো বলিলেন, “ভালোই হবে বাছা। মুরারির অনেক গুণ, রোগী হাতে তুলে দিলাম, তারপর নিশ্চিন্তি, আর ওসব পাশ-করা ডাক্তারদের কি যে বলে, ইয়েও অনেক—রোগী দেখবি, রোগী দেখ, তা নয়, তার পেচ্ছাব যাযচ করিয়ে আনাও, তার রক্ত দেখব—আর লোকটা বেজায় অর্থপিশাচ ও বাছা, আমার নিজের ভোগা কিনা; সে সব কথা তুলতে হলে…” কি ভাবিয়া আর না তুলিয়া খুড়ো আরো ঘন ঘন হুঁকা টানিতে লাগিলেন।
দোরের পাশ থেকে উহারই মধ্যে একটু উষ্মার সহিত আপত্তি হইল, “তা হলে উনি যেন একাই আসেন, আমি ভলান্টিয়ার ছোঁড়াদের দরজা মাড়াতে দোব না, তা বলে দিচ্ছি… অলুক্ষুণ!”
প্রত্যেক গ্রামেই দু’একজন লোক থাকে—প্রৌঢ় কিংবা বৃদ্ধ—সমস্ত গ্রাম যাহাদের মৃত্যুর জন্য উন্মুখ হইয়া বসিয়া থাকে-লোভের বিষয় শ্রাদ্ধের দিনটি। বসিয়া বসিয়া সবার চোখের সামনে সে টাকা করিতেছে, খরচের বেলায় কিন্তু হাতটান। যেমন প্রায়ই হইয়া থাকে এসব ক্ষেত্রে, উত্তরাধিকারীদের হাত বেশ দরাজ। এখন বিশেষ সুবিধা পাইতেছে না, কিন্তু খরচের জন্য যে তাহাদের হাত নিসপিস করে, নানা ছুতানাতায় তাহার পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের রাসটানা হাতের প্রথম খরচ শ্রাদ্ধটা তারা ভালো করিয়া করিবে—গ্রামের সে একটা বড় আশা ও উৎসবের দিন।
পরেশ চক্রবর্তী কতকটা এই ধরনের মানুষ। তাঁর পরমায়ু লইয়া গ্রামের চেয়ে আবার তাঁর বাড়ির মধ্যে বেশি উৎকণ্ঠা, কেননা উত্তরাধিকারী জামাই। অপুত্রক শ্বশুরের কন্যা বিবাহ করিয়া লোকটা খুব একটা দাঁও মারিল বলিয়া আশা করিয়াছিল; কিন্তু ওইরকম অস্থিচর্মসার শরীরের মধ্যে পরমায়ুর বহর দেখিয়া তাহার নিজের পরমায়ু নিত্য হ্রাস হইয়া আসিতেছে। বছরকে বছর ঘুরিয়া যাইতেছে, অসুখে পড়িবার নামগন্ধ নাই! যদি বা হইল একটু কিছু, একটা দিন উপবাস দিয়া সঙ্গে সঙ্গে চাঙ্গা। ক্রমেই যেন ধৈর্য রাখা দায় হইয়া উঠিতেছিল। মুখ ফুটিয়া তো কিছু বলা যায় না, শুধু গুমরিয়া মরা।
এইবার যেন একটু কাবু করিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে। জামাই চিকিৎসার পরামর্শের জন্য পাড়া তোলপাড় করিয়া বেড়াইতেছে। আহা, শ্বশুর মানুষ, যদি পরমায়ু থাকে তো আলাদা কথা, না হইলে ভগবান করুন যেন অল্প ভোগের উপর দিয়াই নিষ্কৃতি পান। গুরুজন…
শুধু মেয়ের মনটি বড় ভার। বুড়ো বাপ, চার-চারটে দিন কখন তাঁহাকে কেহ বিছানায় পড়িয়া থাকিতে দেখে নাই। পরিচর্যা করিতে করিতে কেবলই বাহিরে গিয়া চোখ মুছিতেছে।
মুরারি ডাক্তার আসিলেন। বেশ গোলগাল চেহারা, মুখে প্রসন্ন হাসি। কথাবার্তা চলাফেরার মধ্যে সকলের সঙ্গে একটি নিবিড় আত্মীয়তার ভাব মাখানো এবং সেইজন্য গলার আওয়াজটা খুব মুক্ত। আর সব অবস্থাতেই এক ভাব—নিমন্ত্রণ-বাড়িতেই হোক বা রোগীর ঘরেই হোক; রোগের প্রথম অবস্থাতেই হোক, মাঝ অবস্থাতেই হোক, শ্বাসের সময়েই হোক—গলার সেই একরকম স্বর, সেই অকৃপণ হাস্য, সেই নির্বাধ মুখরতা…
সদানন্দ লোক, সব তাতেই পাওয়া যায়। তবে রোগের সময় লোকে একটু এড়াইয়া চলে। মুরারি ডাক্তার একবার ঢুকিলে নাকি শ্রাদ্ধের লুচিটি পরিবেশন না করা পর্যন্ত ফেরে না। গ্রামে ‘মুরারি ডাক্তারের ঠিকে’ বলিয়া একটা চলতি কথাই দাঁড়াইয়া গিয়াছে।
বাড়ি ঢুকিয়াই একগাল হাসিয়া বলিলেন, “এই যে বাবাজী, ভালো তো? পরেশদা কোন্ ঘরে?… নিঝুম হয়ে পড়ে আছেন? তা আর এমন অন্যায় হয়েছে কি বাপু? তিন কুড়ি বয়েস হল, এখন কি আর লাফালাফি করে বেড়াবেন?…দে বিন্দু, একটা আসন দে দিকিন, এইটুকু আসতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমারও তো হল—আর কি, এই আশ্বিনটা পেরুলেই পঞ্চাশ বছর।”
বিন্দুবাসিনী রকে আসনটা পাতিয়া দিয়া চোখ দুইটা মুছিয়া বলিল, “আজ চার দিন থেকে শয্যেগত, ফিরে পাব তো বাবাকে মুরারি কাকা?”— জোরে অশ্রু নামিল।
মুরারি ডাক্তার বাড়ি কাঁপাইয়া হাসিয়া উঠিলেন, বলিলেন, “শুনছ পাগলীর কথা?…ধর যদি নাই পাস। পারবি চিরকাল ধরে রাখতে? মুরারি কাকার হাতে তো পরমায়ু নেই, তবু না হয় জোড়াতাড়া দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলাম, কিন্তু কদিন?”
তারিণী খুড়ো প্রবেশ করিলেন।
“এই যে খুড়োও এসেছে।… বিন্দু বলে—ফিরে পাব তো বাবাকে? তাই বলছিলাম—বলি, মুরারি কাকা ওষুধই দেবে, পরমায়ু তো দেবে না? ওঁর যদি তলবই এসে থাকে…” হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন।
তারিণী খুড়ো বলিলেন, “পরমায়ু স্বয়ং ভগবানই দিতে অপারগ, তা তুমি আমি কোন্ ছার সেই—ভাগবতে সেইখানটায় বলেছেন না?…নে বিন্দি, একটু তামাক সেজে আন দিকিন।… দেখলে নাকি দাদাকে?”
“না, হচ্ছে কিনা, তাড়াতাড়ি কিসের? তামাকটা আসুক, একটু বেদম হয়ে পড়েছি। তোমার শরীরটা কেমন যাচ্ছে খুড়ো?…হ্যাঁ বাবাজী, তোমার সেই কাজটার কি হল, শুনলাম একটু আশা হয়েছে…
“আর আশা, নবীনদা রোজই তাগাদা দিচ্ছে, চলো একবার সায়েবের কাছে নিয়ে যাই, নতুন সিজনটা শুরু হয়েছে; তা দেখুন না, ঠিক মোকা বুঝে শ্বশুর ঠাকুরের এই…”
“তা বটে। তা এ দিকটা চুকে গেলে, তুমি করো একবার দেখা, তোমাদের হলে আবার আমাদের ছেলেপুলেগুলোর একটা রাস্তা খুলবে।”
তামাক আসিল; আরো সব নানারকম আলোচনা হইল। তারপর ধীরে সুস্থে মুরারি ডাক্তার গিয়া রোগীর ঘরে প্রবেশ করিলেন। বৃদ্ধ পরেশ চক্রবর্তী ও-পাশ ফিরিয়া আচ্ছন্নভাবে পড়িয়া আছেন। মুরারি ডাক্তার মুক্তকণ্ঠে ডাক দিলেন, ‘দাদা!”
রোগী একটু চকিত হইয়া উঠিয়া পাশ ফিরিলেন এবং একটু বিহ্বলভাবে চাহিয়া থাকিয়া বিছানার পাশে আঙুল কয়টা চাপিয়া অতি ক্ষীণকণ্ঠে বলিলেন, “বোসো।”
মুরারি ডাক্তার নিজের স্বাভাবিক কণ্ঠেই প্রশ্ন করিলেন, “বলি, মতলবখানা কি?”
বৃদ্ধ উত্তর স্বরূপ উপরে অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন।
“আজ্ঞে না, সেটি এখন হচ্ছে না, মেয়ে জামাই বড্ড ছেলেমানুষ।…ওদিকে উনি টানছেন তো এদিকে মুরারি ডাক্তারও এসে ধরলে।…দাও দিকিনি হাতটা।”
তারিণী খুড়ো আর বিন্দুর দিকে চাহিয়া নিজের রসিকতায় উচ্চহাস্য করিয়া উঠিলেন। দরজার কাছে ছেলেমেয়ে কয়টি ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, কিছু একটা মজার কথা হইয়াছে ভাবিয়া তাহারাও পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিয়া হাসিল। বিন্দু তারিণী ঘোষালের হাতটা একটু স্পর্শ করিয়া বাহিরে ডাকিয়া চাপা গলায় বলিল, “কাকা, ওরকম করে বলছেন…রোগীর মন…
তারিণী খুড়ো একটু হাসিয়া বলিলেন, “শোনো কথা বিন্দুর! চিরকালটা ‘কাকা কাকা’ বলে ঠাট্টা করে এসেছে, আজ আর বলবে না? কিরকম মিষ্টি শুনতে হল বল দিকিন, বুড়ো বয়সের একটা সাধ। সেদো, কি বাইরের কোনো ডাক্তার এসে বলতে পারত অমন প্রাণ খুলে? …আর একটা টিকে ভেঙে দে তো কলকেটাতে। মুরারি এসে হাত ধরেছে, নিশ্চিত্তি, আর তোকে এদিকে দেখতে হবে না— ছেলেমেয়েগুলোর দিকে একটু নজর কর এবার।”
বিন্দু টিকা আনিয়া কলিকায় ভাঙিয়া দিতে দিতে বলিল, “আশীর্বাদ করো ভালোর দিকেই যেন নিশ্চিন্তি হতে পারি কাকা; সব কথাগুলাই কেমন যেন অমঙ্গল-অমঙ্গল ঠেকছে কানে … “
মুরারি ডাক্তার হাসি মুখে বাহির হইয়া আসিলেন; বলিলেন, “কই?—ব্যাপার তো কিছুই দেখলাম না, বুকে একটু সর্দি বসেছে, তারই তাড়সে….”
বিন্দু ব্যস্তভাবে বলিল, “সেরে যাবেন তো কাকা?”
“সেরে যাবে না তো যাবে কোথায় বল?—কি, হয়েছে কি খুড়োর? ভাবিসনি রে পাগলী—–বুড়ো শিগগির নড়ছে না। এখন আরো দিনকতক মেয়ে-জামাইয়ের সেবা খেয়ে তবে…”
“তাই আশীর্বাদ করো কাকা”–হাসিতে মেয়ের গালে চোখের অশ্রুবিন্দু কয়টি ঝরিয়া পড়িল। দুয়ারের কাছে জামাইয়ের মুখের দিকে কেহ লক্ষ করিল না; না করিয়া ভালোই করিল।
.
২
চিকিৎসার মতো চিকিৎসা আরম্ভ হইল। মুরারি ডাক্তারের ওই গুণ; সাবু তোয়ের করা থেকে দাগে দাগে ঔষধ খাওয়ানো পর্যন্ত সবই প্রায় নিজের হাতে। বিন্দু মৃদু আপত্তি করিল, কিন্তু সে আপত্তি টিকিল না। মুরারি ডাক্তার বলিলেন, “তুই সেদিনকার মেয়ে, হাওয়ার কাপড় পরে ওই জামতলায় পুতুল খেলা করতিস, তুই রুগী সেবার কি বুঝবি? শেষকালে মেরে ফেল বুড়োকে।”
অবশ্য এ কথার পর আর কোনো মেয়েই অগ্রসর হইতে পারে না। সে জোগাড়-যন্ত্র করিয়া দিয়া, রোগীর মাথায় হাত বুলাইয়া, হাত-পা টিপিয়া মুমুর্ষু পিতার সেবার সাধ মিটাইতে লাগিল।
সমস্ত দিন জোর চিকিৎসার পর সন্ধ্যার সময় রোগীর পরিবর্তন দেখা দিল; অবশ্য খারাপের দিকে। একেবারে নিঝুম মারিয়া পড়িয়া না থাকিয়া রোগী মাঝে মাঝে চাড়া দিয়া উঠিয়া বসিবার চেষ্টা করিতে লাগিল এবং কথার মধ্যে একটু একটু অসংলগ্নতা আসিতে লাগিল।
বিন্দুর কান্না দেখিয়া মুরারি ডাক্তার আদরের ধমকানি দিয়া বলিলেন, “অসুখ হয়েছে, একটু-আধটু বেফাঁস না বলে কি তোর বাপ এখন রুক্মিণী-হরণের কথকতা করবে আশা করেছিস? কচি খুকির বাড়া হলি যে তুই বিন্দি…”
বাহিরে আসিয়া জামাই, তারিণী খুড়ো প্রভৃতির সামনে নিজের বুকের উপর দুইটা মুঠা রাখিয়া হাসিয়া ঈষৎ চাপা গলায় বলিলেন, “দুটো বুকই সর্দিতে ঝাঁঝরে গেছে।” সঙ্গে সঙ্গে মুঠার মধ্যে হইতে দুই বুড়া আঙুলকে মুক্ত করিয়া নাড়িয়া বলিলেন, “আশা বড় একটা নেই, দেখে নিয়ো আমার কথা।”
জামাই চিন্তিতভাবে বলিল, “আজ রাত্তিরটা…”
মুরারি ডাক্তার হো হো করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “তুমিও যে বিন্দু হলে দেখছি বাবাজী,— রাত কাটবে না কিরকম? পরেশদাকে চেনো না—এখন ক’রাত যুঝবে ও। দাদার আমার ওই শুকনো হাড়ে ভেল্কি খেলে…তোমরা সেদিনকার ছেলে, কিন্তু আমি তো জানি, তারু খুড়ো তো জানে।… কোনো ভাবনা নেই, আমি ওদের সেবাসমিতির দুজন ছেলেকে বলে এসেছি…”
শেষের কথাগুলি স্বাভাবিক কণ্ঠে বলায় বিন্দুর কানে গিয়াছিল, বাপের বিছানা হইতে উঠিয়া দুয়ারের কাছে আসিয়া বলিল, “না, আমি কখনই তাদের আসতে দেব না। অপয়ারা একবার ঢুকলে না নিয়ে বেরোয় না। এমনি সবাই সোনার ছেলে স্বীকার করি, কিন্তু সেবা করবার জন্যে রোগীর ঘরে ঢুকলে ….
জামাই বিরক্ত কণ্ঠে বলিল, “পালা করে জাগতে হবে।”
অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে উত্তর হইল, “আর পালা করতে হবে না, আমি একাই জাগব। না, কখনো আমি ঢুকতে দোব না ওদের…
মুরারি ডাক্তার বলিলেন, “ওই করে তুইও সুদ্ধু পড়, আমি দুটো নিয়ে নাজেহাল হই। বাপের তা হলে খুব সেবা হবে!”
বিন্দু চুপ করিয়া রহিল। একটু পরে রাঙা গলায় বলিল, “আমি কিন্তু দুজনের বেশি আসতে দোব না।”
অবশ্য দুজনই আসিল না। বুড়ো পরেশ চক্রবর্তীর অসুখ, তায় আবার মুরারি ডাক্তার দেখিতেছে—একদিনেই নিউমোনিয়ায় দাঁড় করাইয়াছে, পাড়ায় একটা সাড়া পড়িয়া গিয়াছে। বারোয়ারির চণ্ডীমণ্ডপে দলাদলির নেতারা অনেক ছিলিম তামাক পোড়াইয়াছে, আজ রাত্রি হইতে পাড়ার সখের যাত্রাপার্টি কীর্তনের মহলা দিবে—শ্রাদ্ধবাসরের জন্য। বয়স্থারা বলিতেছে, “আহা, লোকটা ছিল ভালো গো, দোষে গুণে। মেয়ে কাজ কিরকম করে দেখা যাক।”
ছেলেদের শখের সেবা-সমিতি। দুজনকে বলা হইয়াছিল, ওপরপড়া হইয়া চারজন আসিল। নিজেরাই ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া গাই দুইয়া খানিকটা দুধ জোগাড় করিয়া রাখিল। তাহার পর সমস্ত রাত তাসে, চায়ে, হল্লায় কাটাইয়া দিল। অবশ্য সেবা, ঔষধপত্র চালাইল বিন্দু আর মুরারি ডাক্তার মিলিয়া। বিন্দু একবার বলিলও।
মুরারি ডাক্তার একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসিয়া বলিলেন, “হ্যাঁ, দুধের ছেলে, ওরা আবার সেবা করবে! একটা আমোদ; আমোদের বয়সই যে এটা।”
সকালে জামাই জাগিয়া উঠিয়া দেখিতে আসিলে বলিলেন, “আমি বলিলাম না তোমায় কালকে? আজ সকালেই একটা টাল গেছে, অবিশ্যি বিন্দিকে বুঝতে দিই নি; কিন্তু আর বসে থাকা চলে না, হাতে যেটুকু আছে করে-কর্মে দেখতে হবে তো? আমি আসছি…হ্যাঁ হ্যাঁ চা হয়ে গেছে খাওয়া, হীরের টুকরো ছেলে সব–কোন্ ভোরে গাই দুইয়ে, চা করে, খাইয়ে তবে অন্য কথা।…আমি এই এলাম বলে, ওষুধের সব বলে দিয়েছি বিন্দুকে। কিছু ভাবতে হবে না তোমায়, তুমি বরং তারু কাকার সঙ্গে পরামর্শ করে ওদিককার জোগাড়যন্ত্র করো গে।”
দুয়ারের দিকে পা বাড়াইতেই সেবাসমিতির ছেলে চারিটি আসিয়া দাঁড়াইল। রাত্রিজাগরণের ফলে মুখ শুকাইয়া গিয়াছে, চক্ষু রক্তাক্ত, মাথার চুল ফুলিয়া ফাঁপিয়া বিশৃঙ্খল হইয়া রহিয়াছে। একজন আগাইয়া বলিল, “আমাদের কি এখন আর কোনো কাজ আছে মুরারি কাকা?”
মুরারি ডাক্তার ঘুরিয়া বলিলেন, “বিস্তর কাজ; কাজের তো এখনো সবই পড়ে। তবু আবার নিজের শরীরও দেখতে হবে তো? তোরা এক কাজ কর, দুজন থাক, দুজন চট করে দুটো ডুব দিয়ে মুখে কিছু দিয়ে চলে আয়,—পালাপালি করে।”
জামাইয়ের পানে চাহিয়া বলিলেন, “কাল সমস্ত রাত ছোঁড়াগুলো একটু চোখ বোজেনি গা! ওদের এইসব সময়ে একটু কাছে কাছে থাকাই তো দরকার। হাসি-হুল্লোড়ের মধ্যে কোথা দিয়ে রাতটা কাটিয়ে দিলে—একবার কি বুঝতে পেরেছিলে বাড়িতে রোগী রয়েছে একটা।”
কয়টা দিন হইতে ভবিষ্যতের গোলাপী স্বপ্নের মধ্যে দিব্য নিদ্রাটি হইতেছে। জামাই বলিল, “রামঃ, আমার তো আপনাকে দেখে তখন মনে পড়ল শ্বশুরঠাকুর অসুখে পড়ে।”
ছেলে কয়টি প্রশংসায় একটু লজ্জিত হইল। একজন একটু বেশি অগ্রণী, বলিল, “না, কাজ থাকে তো সবাই থেকে যাই। নাওয়া খাওয়া—সে তো পরের কথা।”
একজন একটু রুগ্ণ গোছের; একটু যেন নিরাশার সহিত বলিল, “এখনই নেয়ে নেব?— তাহলে আজকে আর নাওয়ার দরকার হবে না মনে করছেন নাকি?”
কথাটা কেহ বুঝিতে না পারিয়া পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিল। অগ্রণী ছেলেটি বলিল, “ও বলছে—ভগবান না করুন—পরেশ জ্যাঠা আমাদের আজই ছেড়ে যান তো আর একবার নাইতে হবে কিনা…গোবিন্দের আবার ম্যালেরিয়া দেখা দেয় কি না মাঝে মাঝে।
মুরারি ডাক্তার উচ্চ কণ্ঠে হাসিয়া উঠিলেন, জামাইয়ের দিকে চাহিয়া বলিলেন, “একবার দূরদৃষ্টিটা দেখো! আমেরিকায় জন্মালে এ সব ছেলে প্রেসিডেন্ট হত।…আজ সে ভয় নেই, তুই নেয়ে নিগে যা।…দেখেছ, কথায় কথায় অনেক দেরি হয়ে গেল। আমি চলি। ঠিক, আসল কথাই ভুলে যাচ্ছিলাম—আগে তোদের একজন সঙ্গে আয় দিকিনি আমার, একলা সামলাতে পারব না।….হ্যাঁ, ভুলেই যাচ্ছিলাম,—বাবাজী, তুমি আর বিন্দি নেয়ে-টেয়ে তোয়ের হয়ে থেকো।”
ঘণ্টা দুয়েক পরে ফিরিলেন, সেবা সমিতির ছেলেটির হাতে মালসায়, কলসিতে পূজার নানারকম সরঞ্জাম। নিজের গায়ে একটা নামাবলী, একটা সাজিতে কিছু ফুল। সঙ্গে পুরোহিত—অভয় ভট্ট্চাজ।
তারু খুড়ো আসিয়াছিলেন—পাড়ার আরো দু-একজন বৃদ্ধ, বর্ষীয়ান ব্যক্তি। মুরারি ডাক্তার বাড়িতে ঢুকিয়াই হাসিয়া বলিলেন, “এই যে তারুদা এসেছ। অভয়পদকে ডেকে নিয়ে এলাম। স্বস্ত্যেনটা করিয়ে দিই। শেষকালে বুড়ো বলবে—মুরারিকে ডাকা হল অথচ স্বস্ত্যেনটা করিয়ে দিলে না; বুড়ো বয়সে শুধু কতকগুলো অখাদ্য কুখাদ্য খাইয়ে দিলে।…কই গো বিন্দু…”
নটবর ঘোষাল বলিল, “কি রকম বুঝছ তাহলে?”
বিন্দু দুয়ারের কাছে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। তাহার অলক্ষিতে মুরারি ডাক্তার নটবরের দিকে চাহিয়া একবার বুড়া আঙুলটা নাড়িলেন; তাহার পর বিন্দুকে শুনাইয়া একটু গলা চড়াইয়া বলিলেন, “বুঝছি তো ভালোই। ওষুধ চলুক না। তবে কি জানো? –বলে, ‘ন্য চ দৈবাৎ পরং বলম্’– ওষুধেই যদি সব করত রে দাদা, তবে আর কুইন ভিক্টোরিয়া মরে যেত না। নে বিন্দু, দাঁড়িয়ে থাকলে তো চলবে না মা, তাড়াতাড়ি জোগাড় করে দে দিকিন একটু, তুমিও লেগে যাও অভয়পদ–তোমার তো আবার মেল ডে আজ; আটটা বত্রিশের গাড়িটা ধরতে হবে।”
অভয়পদ ডেলি-প্যাসেঞ্জার-পুরোহিত, কলিকাতায় মার্চেন্ট আফিসে কাজ করে। সকাল থেকে সব কাজের মধ্যেই তাহার স্টেশনে গাড়ি আসিয়া পড়িবার চিত্রটি মনে সুস্পষ্ট থাকে বলিয়া সে সর্বদা খুব ত্রস্ত। বিন্দু ঠাই করিয়া দিলে চটপট পূজার সরঞ্জাম সব দোকান সাজানো করিয়া সাজাইয়া লইয়া আচমন করিয়া বসিয়া গেল।
পরেশ চক্রবর্তী নিঝুম হইয়া পড়িয়া ছিলেন, মুরারি ডাক্তার গিয়া হাতটা তুলিয়া ধরিয়া একবার নাড়িটা পরীক্ষা করিল, বুকটা দেখিল, তাহার পর ঔষধের শিশি তুলিয়া ধরিয়া একবার দাগ দেখিয়া লইয়া বাহির হইয়া গেল। জামাই, তারু খুড়ো, আরো দু’একজন অগ্রসর হইয়া প্রশ্ন করিলেন, “কি রকম হে?”
বিন্দু পূজার কাছে বসিয়াছিল, প্রশ্নে সে-ও মুরারি ডাক্তারের মুখের দিকে চাহিল। ডাক্তার বোধ হয় রসিকতা করিতে যাইতেছিল, সামলাইয়া লইয়া বলিল, “আবার রকম কি? অভয়পদর হাতে গিয়েছে আর ভাবনার কি আছে? আমি এতটা সামলে নিয়ে এলাম আর ও, কি যে বলে…একটু হাত চালিয়ে নাও হে অভয়। দাদার মাথায় ফুলটা ছুঁইয়ে দাও…”
বিন্দু ব্যাকুলভাবে চাহিয়া প্রশ্ন করিল, “মুরারি কাকা?”
“এই দেখ বিন্দি, তুই ছেলেমানুষ হলি যে! পূজার দিকে মন দে দিকিন। বলে-শান্তি স্বস্তেন হল আত্মার শান্তির জন্যে আর তুই কি না…। আগে ফলটা দেখ। দৈব বিশ্বাস করিস, না, করিস না? অভয়পদর শেষ হোক, দেখবি খুড়ো সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে চাঙ্গা হয়ে উঠবে। এ আমাদের প্রত্যক্ষ করা, একা তোর বাবারই তো স্বস্ত্যেন করালুম না, সেই পাশ করেছি অবধি যারই নাড়ি ধরেছি…”
বোধ হয় হুঁস হইল; হঠাৎ থামিয়া গিয়া তারু খুড়োর হাত হইতে হুঁকাটা লইয়া দুটো টান দিয়া বলিলেন, “তোমার সেই সনাতন রক্ষিতের কথাটা মনে আছে তো খুড়ো।—সব ঠিকঠাক, নিয়ে যাবে গঙ্গার তীরে, বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে; তারেশ পুরুত স্বস্ত্যেন করে উঠল। ‘যাক, অন্তত দেহটাও তো শুদ্ধ হবে’–বলে কপালে ফুলটা ছুঁইয়ে বললে—’তোল, তাহলে’—সব ধরাধরি করতেই রুগী একেবারে মারমুখো হয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল, –’কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস আমায় সব পাঠশালার ছেলের মতো চ্যাংদোলা করে শুনি!…মহা রাগী লোক, ভয়ে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত! তিন দিন পড়ে ছিল; ভিড় করে পাড়ার লোক তামাশা দেখতে এসে জুটেছিল—যে যেখানে পারলে সটকান দিলে। জয়হরি পায়ের দিকে ধরেছিল, লাফ দিয়ে পালাবে- দরজায় মাথা কেটে এক হুলুস্থুল কাণ্ড…বলে, স্বস্ত্যেনের গুণ নেই!…”
ঘরের মধ্যে দুই-তিনজন বর্ষীয়সী আর সেবাসমিতির ছেলে দুইটি বসিয়াছিল। হঠাৎ একটি ছেলে বাহির হইয়া আসিয়া বলিল, “মুরারি কাকা, শিগগির আসুন একবার।”
“অভয়, তুমি উঠো না যেন, বিন্দুও বোস, ও কিছু নয়, আমরা দেখছি।”
সকলে ঘরের মধ্যে গিয়া দাঁড়াইল, বিন্দুও একটু দোমনা থাকিয়া উঠিল এবং তাড়াতাড়ি ভিড় ঠেলিয়া ঘরের মাঝে গিয়া উপস্থিত হইল।
রোগী উঠিয়া বসিয়াছে, বিকারের ঘোরে চক্ষু রক্তবর্ণ, সেবাসমিতির ছেলে দুইটির দিকে ঠায় চাহিয়া আছে। একটু পরে বারকতক কি বিড়বিড় করিয়া প্রশ্ন করিল, “কি চায় ওরা? কাকে চায়?”
ছেলে দুইটি ঘর থেকে সনাতন রক্ষিতের গল্প শুনিয়া ভয়ে একেবারে কাঠ হইয়া গিয়াছিল। একজন বলিল, “আজ্ঞে, আমরা কিছু চাই না তো; শুধু প্রাণপণে, না খেয়ে-দেয়ে, রাত জেগে সেবা করতে…’
“আমি যাব না, যাব না, আমি; যাও তোমরা, তোমাদের হাতে কি ও?”
ছেলে দুইটি ভয়ে মুরারি ডাক্তারের দিকে হাত একটু বাড়াইয়া বলিল, “কিছু তো নেই আমাদের হাতে।”
একজন ব্যাকুলভাবে বলিল, “ওঁর হাতের কাছ থেকে সাবুর জামবাটিটা সরিয়ে নিন না…
মুরারি ডাক্তার বলিলেন, “তোরা একটু বাইরে চলে যা দিকিন।…ঘোর এসেছে দাদার একটু…আর যত বলি তোরা বাবরি চুলগুলো ছেঁটে ফেল…”
রোগীর ঘোর কিন্তু কাটিল না। সে ক্রমে সব মাথাতেই বাবরি এবং সব হাতেই কি একটা দেখিতে লাগিল। প্রায় মিনিট পনেরো প্রলাপ বকিয়া শেষে ক্লান্ত হইয়া শুইয়া পড়িল। মুরারি ডাক্তার মাথা নাড়িয়া তারু খুড়োর দিকে চাহিয়া বলিলেন, “এর পরের টালটা আর সামলাতে পারবে না, এই বলে দিলাম তোমায়, খুড়ো দেখে নিয়ো…জামাই কোথায় গেল? এসো হে ফদটা একবার করে নাও দিকিন, আর জয়নালকে বলো, বাঁশ-টাশ কেটে নিয়ে আসুক…।”
.
দাহকার্য সমাধা করিতে ভোর হইয়া গেল। গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করিয়া মুরারি ডাক্তার বলিলেন, “এদের সব সঙ্গে করে নিয়ে যাও জামাই—নিম, লোহা আমি সব জোগাড় করে রেখে এসেছিলাম, সুদাম ময়রাকেও বলে দিয়েছি—মিষ্টি পৌঁছে দিয়েছে নিশ্চয়। আমি একটু বাগদিপাড়াটা ঘুরে আসি…”
জামাই বলিল, “কোনো কেস-টেস আছে নাকি? তা একটু জল খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আসবেন— সমস্ত রাত জাগা মেহনত…”
“এই দেখো, বুদ্ধি দেখো ব্যাটার আমার! বলে ‘কেস’! আমার কি আর একটা দিন ‘কেস’ দেখবার ফুরসৎ আছে, না খাওয়া নিয়ে থাকলেই চলবে? কুল্যে এই কটা দিন হাতে। পরাণে বাগদির ষাঁড়টা সম্বন্ধে পাকা করে আসি একেবারে, অবশ্য কথা হয়ে রয়েছে। যেদিন দাদাকে দেখতে যাই, সেই দিনই পরাণে বাড়ি বয়ে এসেছিল কিনা; বলে—দাদাঠাকুর, শুনলাম আপনি গোঁসাইপাড়ার পরেশ ঠাকুরকে হাতে করে নিয়েছেন, আমার ষাঁড়টারও গতি করে দিতে হবে এই মোহাড়ায়, জামাইঠাকুর বেষোৎসর্গ না করে তো থাকতে পারবেন না।…সস্তায় ছাড়বে, তবুও একবার পাকা করে আসি। বাগদির মন তো।”
মুরারি ডাক্তার যখন পরেশ চক্রবর্তীর বাড়ি ফিরিলেন, তখন প্রায় নয়টা হইয়া গিয়াছে। বিধিমতো তেতো মিষ্টি খাইয়া ঘট ঘট করিয়া খানিকটা জল পান করিয়া বলিলেন, “পরাণের কাণ্ডটা দেখলে তারু খুড়ো! সেদিন ওপর-পড়া হয়ে বলে এল তো? আর আজ স্বচ্ছন্দে বললে কিনা—দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে ভাবলাম বুঝি পরেশ ঠাকুর এ যাত্রা টিকে গেলেন। তাই ও-পাড়ায় জনার্দন ঠাকুরের জন্যে কথা দিয়ে ফেলেছি।’…পণ্ডিতপাড়ার জনার্দন হালদার গো। সেদো ডাক্তার দেখছে…ওরা বোধ হয় তাতে দু-এক টাকা বায়না গুঁজে দিয়েছে, জেতে বাগদি তো—কথা উল্টে দিলে। তা আমিও বলে এলাম, “কথা দিয়ে কথা রাখলি না পরাণে, দেখিস জনার্দন খুড়ো ডেংডেঙিয়ে সেরে উঠে তোকে কলা দেখাবে, এই প্রাতর্বাক্যে শাপ দিয়ে গেলাম….”
তারু খুড়ো বলিলেন, “ঘোর কলি হয়ে দাঁড়াল। চার পো। তাই তো ভাবছি—পরেশ দাদা দিব্যি গেল—পুণ্যিবান লোক…”
মুরারি ডাক্তার মুখ বাঁকাইয়া কুলকুল করিয়া ধোঁয়া ছাড়িয়া বলিলেন, “আর দেরির কথা যে বললে—দেরিটা হয়েছে কোথায় শুনি? পরশু সকালে দাদাকে হাতে নিয়েছি, আজ সকালে…”
হঠাৎ চৈতন্য হওয়ায় থামিয়া গিয়া ক্রুদ্ধভাবে মুখটা গোঁজ করিয়া তামাক টানিতে লাগিলেন। তারু খুড়ো বলিলেন, “তা হলে উপায়?”
“উপায় মজাদিঘির হাট, চার কোশ পথ হেঁটে যেতে হবে এই বুধবার, উপায় তো নেই; পরেশদা ভাববে মুরারির হাতে গেলাম, বৃষোৎসর্গটাও একটু চেষ্টাচরিত্তির করে করিয়ে দিতে পারলে না। কিন্তু সময় কই? আমি তো সেই কথাই ভাবছি—সময় কই। মাঝখানে আবার একটা চতুর্থীর হাঙ্গামা আছে। … কই গো বিন্দু!…এই দেখ, তুই কাঁদতে বসলি। সামনে দু-দুটো কাজ, আর এইটে তোর কাঁদবার সময় হল?…তারু খুড়ো!’
তারু খুড়ো একটু প্রশ্রয়ের হাসি হাসিয়া বলিলেন, “সময় তো নয়; কিন্তু শোক, সে তো আর সময় অসময় মানবে না…স্বয়ং ভগবান অর্জুনকে কি বলেছেন?…
তামাক টানিতে লাগিলেন।
বিকালবেলা মুরারি ডাক্তার সুদাম ময়রা, গণেশ মুদী, অভয় ভটচায প্রভৃতি কয়েকজনকে লইয়া প্রবেশ করিলেন, উঠানে দাঁড়াইয়া ডাকিলেন, “কই জামাই কোথায় গেলে? গিন্নিকে পাঠিয়ে দিয়ে আমি একটু কুমোরপাড়ায় চলে গিয়েছিলাম—জলটল একটু মুখে দিলে বিন্দু?…দুটো বাতাসা খেয়ে একটু জল খেয়েছে?…আর ওর বেশি কি পারে বাবাজী? মেয়ের প্রাণ তো? তুমি খানিকটা কাগজ আর কালিকলম নিয়ে এসো তো, ফর্দগুলো সেরে ফেলা যাক।”
ক্রমে ক্রমে তারু খুড়ো, নবীন ঘটক, ঘোষাল মশাই, হারুপণ্ডিত প্রভৃতি পাড়ার মাতব্বরেরা আসিয়া জুটিল। নানারকম মতামত, তর্ক কেচ্ছাকাহিনীর মধ্য দিয়া অশেষরকম আকার পরিবর্তন করিতে করিতে সন্ধ্যা পর্যন্ত চতুর্থী আর শ্রাদ্ধের তালিকা দুইটা প্রস্তুত হইল। মুরারি ডাক্তার কাগজ-কলম ছাড়িয়া দিয়া নিশ্চিতভাবে বলিলেন, “নাও, বাবাজী এইবার একটু তামাকের জোগাড় করো দিকিন। একটা যেন বোঝা নেমে গেল।”
একটু খোশগল্প চলিল—পরেশ চক্রবর্তীর জীবন লইয়া খানিকটা আলোচনা—জামাইয়ের শ্বশুরের প্রতি অচলা ভক্তি (যা কখনই ছিল না), জনার্দন যদি মরে সে যেন পরেশ চক্রবর্তীর ওপর না টেক্কা দেয়, শত্রুপক্ষ যেন না বলিতে পারে—জামাইতে ছেলেতে ঢের তফাত—না, সে কেহই হইতে দিবে না, —গ্রামের বদনাম তো!
পিছনে যে যাহা বলুক, মুরারি ডাক্তারেরও প্রশংসার বন্যা ছুটিল, “কে করে আজকালকার দিনে শুনি? নিজের ভিজিট পকেটস্থ করলেই নিশ্চিন্ত…”
মুরারি ডাক্তার বলিল, “সমাজ আমার,–স্বস্ত্যেন, শ্রাদ্ধশান্তি এ সব করবে কি সিবিল সার্জেন জেলা থেকে এসে?”
হারাণ পণ্ডিত লোকটা একটু কটুভাষী, তবে মিষ্ট করিয়া বলে, হাসিয়া বলিল, “বাঁচালে তো আর শ্রাদ্ধ করতে হয় না ভায়া…”
দলের সমস্ত প্রশংসার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন হাসি ছিলই, সুযোগ পাইয়া সেটা প্রকাশ হইয়া পড়িল। তারু খুড়া সামলাইয়া লইবার জন্য বলিলেন, “বাঃ, বলবে না? সুবাদে মুরারি ওর নাতি হয়, ঠাট্টা করবে না।”
কিন্তু সামলাইবার কোনো প্রয়োজনই ছিল না, ওসব কথা মুরারি ডাক্তারের এক কান দিয়া ঢোকে অপর কান দিয়া বাহির হইয়া যায়। তা ভিন্ন ওসব কথা ভাবিবার সময় বা কোথায়?
চতুর্থীটা বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন হইল। সবাই বাহবা দিল মুরারি ডাক্তারের। জামাই কৃতজ্ঞতার সহিত হাতজোড় করিয়া বলিল, “কাকা, আপনি না থাকলে কি যে হত? আমার তো এই অবস্থা!”
মুরারি ডাক্তার বলিলেন, “দাদার কাজ দাদা নিজে করে নিচ্ছেন, আমার আর কি এ দিকে মন আছে বাবাজী? বৃষটা না এনে ফেলতে পারলে…বেটা বাগদির পো কি ভীষণ ফেরে ফেললে যে। হ্যাঁ বাবাজী, আমি সব জন মজুর বলে দিয়ে এসেছি—কাল সকালেই এসে পড়বে, দাঁড়িয়ে চারিদিকে পরিষ্কার-টরিষ্কার করিয়ে নেবে, আমিও এসে পৌঁছুব, তবে আমার আবার একবার ন’ গাঁয়ে চৌধুরীদের বাড়ি যেতে হবে—শামিয়ানা একটা চাই তো, বৃষোৎসর্গ ব্যাপার, খেলা নয় তো, সময় বুঝে রোদ্দুরের তেজটা দেখছ তো। হ্যাঁ…রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ তিনটি দিন বাকি—বুধবার দিন মজাদিঘির হাট —চারটি কোশ পথ…বলছিলাম তুমি যদি ও ব্যাপারটা সেরে নিতে…”
জামাই মিনতির স্বরে বলিল, “আজ্ঞে আমার অবস্থা তো দেখছেনই–শেষে…”
“তা তো বুঝছি। যাব, আর করা যায় কি।…আজ আবার পেনো কুমার এসেছিল, তার শাশুড়িটা পড়ে কিনা। —বললাম, ‘তুই কি ঠাট্টা করছিস পেনো? খুব ফুরসত দেখেছিস আমার।’ যাব, আর ষাঁড় কেনা তোমার কর্মও নয়, বাবাজী…”
.
ষাঁড়েরও খুব তারিফ হইল। মুরারি ডাক্তারের পছন্দ, কিছু নয় তো নিজের হাতেই দশ বারোটা ষাঁড় কিনিয়াছে। কিন্তু ষাঁড়ের প্রশংসা শুনিবার ফুরসতই বা কোথায় মুরারি ডাক্তারের। একটা দিন ছিল না, সব ওলটপালট। সে সব সামলাইতেই একটা দিন গেল। শামিয়ানা আসে নাই, আবার যাইতে হইবে দেড় ক্রোশ পথ।
বলিলেন, “তাহলে তুমি নেমন্তন্নটা সেরে নাও জামাই বাবাজী, দুটো দিন লাগবে।”
জামাই বলিল, “আমার অবস্থা তো দেখছেনই কাকা, তার ওপর এই নিদারুণ শোকটা যাচ্ছে…দুটো পা হাঁটতে গেলেই ভির্মি লাগবার মতো হচ্ছে।”
“থাক তবে, একটা কাটিয়ে উঠলে আর একটা না শুরু হয়। কোনোরকমের সেরে নিতেই হবে…দেখ কাণ্ড, কেত্তনের কথাটা ভুলেই গেছলাম। সিদু ঢপওয়ালীকেই কাল দিই বায়না পাঠিয়ে, হুগলীতে গিয়ে বাছাই করে আনবার তো সময় নেই। তবু আসরটা একেবারে খালি যাবে না…”
***
মহাসমারোহে শ্রাদ্ধকার্য চলিয়াছে। এদিকে বৃষোৎসর্গ—ওদিকে কীর্তন—সভায় পণ্ডিতদের অনুস্বার বিসর্গের টঙ্কার — বাড়ির উঠোনে চাঁদোয়া খাটানো হইয়াছে—তাহার এক প্রান্তে ভিয়েনের আয়োজন। গ্রামের মাতব্বরেরা সেইখানে জটলা করিতেছে। চারিদিক তদারক করিয়া মুরারি ডাক্তার উপস্থিত হইলেন। কাঁধে ফেলা গামছাটার কোণ দিয়া কপালের ঘাম মুছিতে মুছিতে বলিলেন, “সন্দেশের পাকটার দিকে নজর রেখে যেয়ো সুদাম। দেখো যেন সময় পেরিয়ে এসে গোষ্পদে না ডুবতে হয়…
সুদাম বাঁ হাতে হুঁকা টানিতে টানিতে ডান হাতে তাড়ু ধরিয়া ছানা মাড়িতেছিল, বলিল, “সুদাম ময়রা কি মরে গেছে বাবাঠাকুর? হ্যাঁ, এ যা বলেছেন একটা কথার মতো কথা, সমুদ্র পেরোনোই বটে। আমি সেই কথাই তো তারু ঠাকুরকে বলছিলাম, বলি, হাতযশ বলি তো একে, যে দিকটা দেখ যেন গমগম করছে, আর এই বাড়িই তো আগেও ছিল…
মুরারি ডাক্তার পাশ থেকে একটা কড়িবাঁধা হুঁকা তুলিয়া লইয়া ক্ষেত্র ঘোষের হুঁকা হইতে কলিকাটা বসাইয়া দিলেন। তার পর তারু খুড়োর দিকে চাহিয়া বলিলেন, “আত্মপ্রশংসার মতো শোনায় তাই বলিনি, তবে সুদাম নেহাত নাকি কথাটা তুললে…দক্ষিণপাড়ায় নিবারণ গো-মামা মারা যাওয়ার অবধি সম্পত্তিটির লোভে আজ বোধ হয় ছ-সাত বছর ধরে তিথির কাকের মতো এসে বসে আছে…বলে ‘মুরারি মামা, আজ মাসখানেক ধরে রাঙ্গা মামী পড়ে, না এদিক না ওদিক, আর তো কষ্ট চোখে দেখতে পারি না। একটি বার দয়া করে চলুন’…ঝুলো-ঝুলি…বললাম, “দাঁড়াও বাবু, একটি যা হাতে নিয়েছি সেইটিই সামলে নিতে দাও আগে…এই যে বাবাজী, পরিবেশনের লোকের অভাব হচ্ছে। চলো, চলো, আসল কাজটা তো হল পরিবেশন…বলে মধুরেণ…”
দেওয়ালের আড়ালে গিয়া পড়ায় আর বাকিটা শোনা গেল না।
