রায়ট – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
রায়ট
একটা রায়ট হইয়া গেল।
‘রায়ট’ কথাটাই ব্যবহার করিলাম। ‘দাঙ্গা’য় জিনিসটার বিষাক্ততা, জিনিসটার ক্রূরতা ঠিক প্রকাশ পায় না। ‘মারামারি’ কথাটা তো একেবারে অচল। ‘রায়টে’র সামনে ‘মারামারি’ নিছক বাবুয়ানি—একটা বিলাসিতা।
‘রায়ট’ কথাটায় হিন্দু-মুসলমানের যৌথজীবনের চরম দুঃখের ইতিহাসটি গাঁথা আছে। একদিন- যে শুভদিনে ভ্রাতৃ-আহবের শ্রান্তির পর দুইটা জাত শান্তি খুঁজিবে সেই দিন এই রক্তে-লেখা কথাটার প্রয়োজন হইবে। সেদিন ভারতবাসী—তখন বোধ হয় হিন্দুও নয় মুসলমানও নয়—অতীতের কবর থেকে সেই ক্ষুদ্র, নীচ স্বার্থকে টানিয়া বাহির করিবে, দুইটি ভাইয়ের রক্ত-মসী দিয়া যে আজ কথাটা লিখিয়া রাখিল।…বিচার করিবে।
কেন হইল রায়ট, সে প্রশ্নের প্রয়োজন নাই; সে প্রশ্ন অযথা, কোনো রায়টের সম্বন্ধেই ও প্রশ্নটার সঠিক উত্তর এ পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। অবশ্য উত্তর খোঁজায় একটু ভুল বরাবরই হয়। দুর্গাগড় কিংবা ইসলামপুরে রায়ট হইলে দুর্গাগড় এবং ইসলামপুরেই তাহার মূল অনুসন্ধান করিতে যায় লোকে। মূল সে সাগর পারের কোথাও, কিংবা খুব নিকটে হইলেও বোম্বাই, কলিকাতা বা দিল্লির কোন বিলাসকক্ষে—এই কথাটা থাকে অজ্ঞাত।
কিন্তু সে কথা থাক আপাতত।
এই চারদিন আগে পর্যন্ত বেশ ছিল। কর্মে কোলাহলে, জীবনের শতধারার কলস্বনে জায়গাটা ছিল মুখর। তাহার পর হঠাৎ আকাশে-বাতাসে একটা কুটিল সন্দিগ্ধতা ছাইয়া গেল। একটা রব উঠিল—ধর্ম আর থাকিবে না। যাহারা শত শত বৎসর ধরিয়া বুক দিয়া পরস্পরের ধর্মকে আগুলাইয়া আসিয়াছে—মুসলমান দিয়াছে দুর্গাপূজার জোগান, হিন্দু দিয়াছে মহরমের তাজিয়ায় কাঁধ পাতিয়া— তাহারা এক মুহূর্তেই আশ্চর্য হইয়া উঠিল, এমন প্রচ্ছন্ন শত্রু পাশে—ধর্ম তাহাদের ঢেঁকিল কি করিয়া! এ বিষ বায়ুর বিশিষ্টতাই এই—ধর্ম যে ঢেঁকিয়া আছে এ সত্যে সান্ত্বনা দেয় না, ঢেঁকিল যে কি করিয়া এই পরম বিস্ময়েই ক্ষিপ্ত করিয়া তোলে।
যেমন হিন্দুর ধর্ম আছে, তেমন মুসলমানের ধর্ম আছে, রায়টেরও সেইরকম একটা ধর্ম আছে—তার মূল তত্ত্ব এই বিভ্রম। সংসারে উত্থান-পতন তো সব জিনিসেরই আছে? এখন চলিতেছে রায়টের বৃহস্পতির দশা,—দলে দলে লোক তাহার ধর্ম অবলম্বন করিতেছে।…লং লিভ রেভলিউশ্যন—বিপ্লবঃ সহস্রং জীবতু!—যে বিপ্লব ছোটে মরণ-ঢেউয়ের শীর্ষে পা ফেলিয়া—যে বিপ্লবের প্রথম সন্তান রায়ট।
হাওয়া বিষাক্ত, ছোট কথা বড় হইয়া উঠিতেছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় করিবার লোক জুটিতেছে অদ্ভুত ভাবে। অনেক ক্ষেত্রে তিল আপনি-আপনিই তাল হইয়া উঠিতেছে। শহরের শেখপুরা পল্লীতে কয়েকজন মুসলমান সান্ধ্য নামাজ পড়িয়া বাহির হইতেছিল, ফাটকের কাছে দীর্ঘ আলখাল্লা এবং লুঙ্গিপরা একজন মাঝবয়সী লোক খুব নম্রভাবে অভিবাদন করিল, “সেলাম ওয়ালেকুম।” সকলে প্রত্যভিবাদন করিল এবং চিনিবার চেষ্টা করিয়া তাহার মুখের উপর দৃষ্টি ন্যস্ত করিল।
লোকটা মুসলমানী কেতায় আর একবার সেলাম করিয়া বলিল, “আমি বিদেশী, নামাজের সময় হয়ে এল দেখে মসজিদে ঢুকছিলাম হঠাৎ একটা বাধা পেয়ে আর প্রবেশ করা হল না।”
সকলে প্রায় একসঙ্গেই প্রশ্ন করিয়া উঠিল “কি বাধা আপনার!… বলুন।”
লোকটা একটু মৌন রহিল—কথাটা বলা ঠিক হইবে কি না চিন্তা করিল যেন—তাহার পর দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বলিল, “না, তেমন কিছু নয়—এই হঠাৎ কয়েক জায়গায় শাঁখ বেজে উঠল কি না…ঠিক এই সময়টিতে ওদের শাঁখ না বাজালেও চলে না…
কয়েকজন যুবক একেবারে উত্তপ্ত হইয়া বলিয়া উঠিল, “সত্যি? —শাঁখ বেজেছিল না কি?…”
একজন শুভ্রকেশশ্মশ্রু বৃদ্ধ ছিল। কথাবার্তার গতিটা তাহার তেমন ভালো লাগিল না, বলিল, “ও আর কি করা যাবে? ওদেরও সাঁঝের পূজো—আর খোদার ওপর সমস্ত মনটা দিতে পারলে শোনা যায় না ও সব শব্দ।”
যুবক কয়টি আরো উত্তপ্ত হইয়া উঠিল, বলিল, “শোনা যায় না কি বললেন আপনি! কান ঝালাপালা হতে থাকলে আল্লার ওপর মন বসানো যায়! আপনাদেরই আশকারায় অবস্থাটা হয়ে পড়েছে এত সঙ্গীন।” আরো অনেকে সমর্থন করিল। বৃদ্ধ ভালোলোক গোছের, যুবকদের প্রশ্ন হইতেই যে টের পাওয়া গেছে কানে ঝালাপালা লাগে নাই, আর তার কারণ এই যে নামাজটা বেশ নিবিড় মনোনিবেশের সঙ্গেই সম্পন্ন হইয়াছে, এটা সে আর বলিতে পারিল না।
আগন্তুক শান্ত করিবার জন্য বলিল, “থাক, এর জন্যে আর রক্ত গরম করে কাজ নেই…জবানীর তাজা খুন—বিশেষ করে ধর্মের কথা, এখুনি বোধ হয় সব জান কবুল করে বসবে–থাক, এসব কথার আর চর্চা করে কাজ নেই। আচ্ছা, তাহলে আসি, সেলাম ওয়ালেকুম।”
শহরের অন্য এক প্রান্তে প্রায় এইরকম সময়েই আর একটা ঘটিল। এদিকটা হিন্দুপ্রধান, একজন মুসলমান একটা বলদ হাঁকাইয়া লইয়া যাইতেছিল। রাস্তার ধারে একটি টিউবওয়েলের নিকট জলের জন্য দাঁড়াইল। একটি মাড়োয়ারির দোকানে একজন প্রৌঢ় হিন্দু কাপড় কিনিতেছিল। রাস্তার দিকে মুখ ফিরাইতে হঠাৎ নজর পড়ায় প্রশ্ন করিল, “কত দিয়ে হল খাঁ সাহেব?”
যাহাকে প্রশ্ন করিল তাহার মধ্যে খাঁ সাহেবের কিছুই ছিল না–খালি গা, খালি পা, পরিধানে একটা সস্তা লুঙ্গি, কাঁধে গামছার মতো একটা মুসলমানী রুমাল। লোকটা উত্তর করিল, “সতেরো টাকায় হল, সাহেব।”
প্রশ্নকর্তা ঘুরিয়া বসিল, বলিল, “আমি আঠারোটা টাকা দিচ্চি, দিয়ে দাও।”
দোকানের আরো দু’একজন ঘুরিয়া বসিল, দোকানী একটা থান মাপিতেছিল, গজ হাতে রাস্তার লোকটার পানে চাহিয়া রহিল। লোকটা বলিল, “আজ্ঞে না, আমার গাড়ির জন্যে কেনা বলদ, জোড়া মিলিয়ে কেনা; বেচব না।”
প্রশ্নকর্তা বলিল, “না দাও সে আলাদা কথা; কিন্তু তোমার যে ব্যবসা কি এবং কি উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্চ বেচারি বলদকে, সে সম্বন্ধে আর ঠকাবার চেষ্টা করতে হবে না আমাদের।”—বলিয়া সবার দিকে, বিশেষ করিয়া মাড়োয়ারি দোকানীর দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিল। দোকানী বলিল, “আচ্ছা, উনিশ টাকা আমি দিচ্চি।”
“আজ্ঞে না, মাফ করবেন।”
“কুড়ি টাকা?”
“মাফ করবেন।”
“বাইশ টাকা?…পঁচিশ টাকা?… তিরিশ …”
দোকানের সবাই উঠিয়া বাহিরে আসিয়াছে, রাস্তায়ও লোক জড়ো হইয়াছে। গরম গরম অভিমত আরম্ভ হইয়া গিয়াছে।—সতেরো টাকার বলদ তিরিশ টাকায় দিতে চায় না—এ জিদের মানে কি?
মেলার মধ্য হইতে একটি লোক আসিয়া বলদের দড়ি ধরিয়া বলিল, “এ বলদ এখান থেকে নড়বে না; টাকা নাও ভালোই; না হয় অমনি ছেড়ে যাও।”
একজন পুলিশ আসিয়া পড়ায় লোকটা অব্যাহতি পাইল। তাড়াতাড়ি বলদ হাঁকাইয়া সরিয়া পড়িল।
পরদিন সকালের প্রথম খবর—শেখপুরার কতকগুলি লোক একজন মুসলমানের বলদ ছিনাইয়া তাহাকে উত্তম মধ্যম কয়েক ঘা দিয়াছে।
সমস্ত দিন শহরের আকাশটা থমথমে হইয়া রহিল। সন্ধ্যার ছায়া নামিতেই ‘রায়ট’ শহরের রাস্তায় পা বাড়াইল। অন্ধকারকে আগে করিয়া—প্রথমে সঙ্কীর্ণ গলিতে, তারপর অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত গলিতে, তাহার পর, অন্ধকার ঘন হইলে একেবারে সদর রাস্তায়।
রায়ট নিশাচর, অন্ধকারে তাহার গতির আরম্ভ, তাহার পর যখন খুব রক্তপুষ্ট হয় তখন নিজেই অন্ধকারের সৃষ্টি করে,—দিবাকেও করিয়া তোলে নিশীথ রজনী—স্তব্ধ, ভীত, ক্বচিৎ বিকট ধ্বনিতে উচ্চকিত! আক্রোশের প্রথম চোটটা অবশ্য গিয়া পড়িল ধর্মের উপর। মন্দির-মসজিদ কলুষিত হইল। মানুষের পূর্বে হিন্দু মুসলমান স্বয়ং ঈশ্বরকে প্রথমে দ্বিখণ্ডিত করিল—বিভক্ত করিল। তাহার পর তাঁহার খণ্ডিত শরীরকে লাঞ্ছিত করিল। ভগবানেরও পাপ-পুণ্য আছে। এবং তজ্জনিত ‘অদৃষ্ট’ আছে; মানুষ সৃষ্টি করিবার পাপের জন্য তাঁহাকে সাজা লইতে হয়—আর অদৃষ্টের এমন পরিহাস, সাজা লইতে হয় সেই মানুষেরই হাতে! খুব উঁচু থেকে—একেবারে দেবতার স্থান থেকে তাঁর সৃষ্টির দিকে নামে বলিয়া রায়টের গতি হয় দুর্বার, প্রমত্ত। তিন দিন মনুষ্যমেধ যজ্ঞ চলিল, সমানে; না, সমানে নয়—হয়, বেগ প্রতিদিনই উন্মত্ততর হইতে লাগিল। মানুষের মনের মুখ্য অনুভূতি হইয়া উঠিল ঘৃণা—সে আহার ভুলিল, বিশ্রাম ভুলিল, সারাজীবনের অভ্যাসগত দৈনন্দিন কাজ ভুলিল –খুনের নেশায় মাতিল—তাহার শ্রেষ্ঠ, তাহার একমাত্র বিলাস হইল গুপ্ত ছোরা।… জীয়ন্ত তাজা মানুষ অতর্কিত আঘাতে মুহূর্তেই ধরাশায়ী হইয়া সৃষ্টি হইতে বিদায় লইল–যে সৃষ্টিকে এত ভালোবাসিয়াছিল তাহাকে শেষ দান দিয়া গেল তার বিদ্বেষ-বিষাক্ত শেষ নিঃশ্বাস। যাহারা সদ্য মরিল না তাহারা হাসপাতালে গিয়া ভিড় করিয়া উঠিল। হাসপাতাল মরণযাত্রীর পান্থশালা—পথ চলিতে চলিতে যেন একটু দম লইয়া লওয়া।
তিন দিন গেল। প্রথমে প্রধানত যুবকরাই নামিল, তাহার পর প্রৌঢ়েরা, তাহার পর দু’একজন বৃদ্ধকেও দেখা গেল, বোধ হয় এরা সব হারাইয়া বয়সের জ্ঞান হারাইয়াছে। অথবা নিছক খুনের আনন্দ।…বার্ধক্যে মানুষ দেবতার পানে এগোয়, এরা রক্ত-পঙ্কিল পথে পিছলাইয়া কিরকম পিছাইয়া গিয়াছে।
নীচের দিকে বিদ্বেষ প্রায় শিশু পর্যন্ত নামিয়াছে। শিশুরা খেলাঘরে মন্দির গড়িতেছে, মসজিদ গড়িতেছে, মা কালীর নাম লইয়া অথবা আল্লাকে সাক্ষী রাখিয়া — আবার মাটিতে মিলাইয়া দিতেছে!
জীবনে যে পাঠ পড়িতে হইবে তাহার জন্য হাতেখড়ি!
হিন্দুপল্লীর শেষের দিকে একটি মসজিদ; আজ তিন দিন তাহাতে আজানের পবিত্র রব ওঠে নাই, নামাজে মন্ত্র উচ্চারিত হয় নাই। শুনা যাইতেছে কাল এই মহাযজ্ঞের পূর্ণ আহুতি, জোগাড়যন্ত্র চলিতেছে, এই মসজিদটি ধূলিসাৎ হইবে। কয়েকটা মন্দির সম্বন্ধেও এইরকম গুজব উঠিয়াছে। সমারোহ পড়িয়া গেছে।
মসজিদটি খুব কারুকার্যময়। এর ইমাম একটু শৌখিন লোক। মসজিদের ভিতরে বেষ্টনী প্রাচীরের পাশে পাশে খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করিয়া কয়েকরকম পাতা বাহার আর ফুলের গাছ মিলাইয়া একটা বাগান গোছের করিয়াছে। দেওয়াল আর মসজিদ গৃহ যেখানটা মিলিয়াছে সেখানটা একটা মার্সেলনীল গোলাপের লতা। তাহার গোটাকতক ডাল দেওয়াল বাহিয়া বাহিরে আসিয়া পড়িয়াছে, তাহাদের প্রান্তে থোকা থোকা একরাশ ফুল।…দেবগৃহ হইলে উছলিয়া দেবতার আশীর্বাদ বাহিরে আসিয়া পড়িয়াছে।
জায়গাটা নির্জন। একটি ছেলে পাশের একটি বাড়ি হইতে বাহির হইয়া সেইখানে আসিয়া দাঁড়াইল। প্রায় সবই হিন্দু এদিকটায়, মুসলমান যে কয় ঘর ছিল, চলিয়া গিয়াছে। ছেলেটি হিন্দু।
বয়স আট-নয় বৎসর হইবে। শহরে যে সংহার কাণ্ড চলিয়াছে সে সম্বন্ধে বিশেষ কিছু না বুঝিলেও এইটুকু বুঝিয়াছে যে সমস্ত মুসলমান রাতারাতি শত্রু হইয়া গিয়াছে, এবং যদিও খুব সঙ্গোপনে মা কালীর নিকট প্রার্থনা জানাইয়াছে—তাহার খেলার সাথী আবদুলের যেন কোনো বিপদ না হয়, তবুও আবদুলের আর সব মুসলমানের ক্ষতির জন্য তাহার কিশোর ধমনীতেও নেশার আমেজ ধরিয়াছে। কিছু একটা ক্ষতি, যা হয় কিছু একটা।…
দুরে একটা উৎকট রব উঠিল। হিন্দুর কি মুসলমানের বোঝা গেল না। গা-টা একটু ছমছম করিয়া উঠিল। যেদিক হইতে শব্দটা আসিল সেদিকটা ঘুরিতেই নজর পড়িল গোলাপ গাছের উপর।
বালক স্থিরদৃষ্টিতে পুষ্পস্তবকের দিকে চাহিয়া রহিল—অনেকক্ষণ। প্রথমে একটা উল্লাস- সুন্দরকে একসঙ্গে, এত বেশি করিয়া পাওয়ার একটা অহেতুক আনন্দ—কিছুক্ষণ গেল একটা নিবিড় আত্মবিস্মৃতির মধ্যে।… তাহার পর লোভ—তাহার পর ধীরে ধীরে অস্তরবির রাগরঞ্জিত, স্বর্গের পারিজাতের মতো সেই পুষ্পস্তবক বালকের মনে কুটিল হিংসার আগুন ধরাইল।…সৌন্দর্য আগুন ধরায় না?—ধরায় বৈকি,—এই তো ধর্মই আজ বুকে বুকে প্রদাহ জ্বালিয়াছে,—ধর্মের চেয়ে আর সুন্দর কি? —মসজিদের গায়ে লতাইয়া-পড়া গাছ থেকে ওই পুষ্পরাশি তুলিতে হইবে। এর তুল্য তার ক্ষতি হইতে পারে না, কেননা বালকের চক্ষে পুষ্পই শ্রেষ্ঠ সম্পদ।…বালক থাকে স্বর্গের কাছাকাছি—তাহার মনে স্বর্গের পারিজাতের স্মৃতি বোধ হয় তখনো সজাগ থাকে কতকটা।
গা ছমছম করে, তবুও একটা অবোধ নেশা।…ওদিকে শহর থেকে মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ ধ্বনি উঠিয়া সান্ধ্য আকাশ মথিত করিয়া তুলিতেছে।
বালক চোরের মতো অগ্রসর হইল।
ফুলগুলা তাহার হাতের একটু উপরে। নিকট হইতে খানকতক ইট উপরে উপরে সাজাইয়া- তাহার উপর দাঁড়াইল। তাহার পর তাড়াতাড়ি যতগুলি পারিল ফুল তুলিয়া নামিয়া পড়িল।… নেশা কাটিল কতকটা।
নেশা কাটিলে ভয় হয়। বালক কোঁচড়ে ফুল ভরিয়া একরকম দৌড়াইয়াই নিজের বাড়ির দরজায় ছুটিয়া আসিয়া হাঁপাইতে লাগিল।
ভয়টা কতকটা কাটিতে আবার নেশা।—আরো কিছু ক্ষতি করা যায় না? ওদের ভগবানের আরো কিছু অপকার? এ-প্রশ্নের উত্তর দিলেন স্বয়ং ভগবানই।—বালকের দৃষ্টি হঠাৎ অদুরে শিবালয়ের চূড়া গিয়া নিবদ্ধ হইল। অস্তগামী সূর্যের শেষ রশ্মিতে ঝলমল করিতেছে।
বালক স্থির করিল—ওরা আমাদের যে-ভগবানকে লাঞ্ছনা করিতেছে তাঁহারই মাথায় ওদের ভগবানের সৃষ্ট পুষ্প উৎসর্গ করিয়া দিতে হইবে। এই উপযুক্ত প্রতিহিংসা, এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কল্পনায় আসে না।
বালক মন্দিরের পানে চলিল, কোঁচড়ে ফুল। বেশি দূরত্ব নয়, ওদিকটা হিন্দুর ছেলের বিপদও নাই। রাস্তায় অনেক সঙ্গীও জুটিল, মন্দিরে পূজার একটু ধুম পড়িয়াছে।
মন্দিরে প্রবেশ করিল। দু’একজন জিজ্ঞাসা করিতে বলিল, “মা পূজার জন্য ফুল পাঠাইয়া দিয়াছেন।” দেবতার পূজার সমারোহ আজ সব গণ্ডি অতিক্রম করিয়া গেছে,–কেহ বড় একটা আশ্চর্য হইল না। সে তাহার পর অগ্রসর হইয়া শিবমূর্তির উপর কোঁচড়ের সমস্ত ফুল উজাড় করিয়া দিল।
বালক সব সম্প্রদায়ের উপরে, ওর মনের যেটাকে কালিমা ভাবি সেটা আসলে ওর কলুষিত পারিপার্শ্বিকের ছায়া মাত্র। বালক নিঃসম্প্রদায়, তাই কি ওর হাত দিয়া ভগবান নিজের অখণ্ড রূপের পূজা লইলেন?—পুষ্পরূপ পাষাণরূপ এক হইল?
***
যাহাই হোক, মরণযজ্ঞে পূর্ণাহুতি পড়িল না। কেহ বলিল, সেই রাত্রি থেকে আরম্ভ করিয়া তিনদিন ব্যাপী যে তুমুল বৃষ্টিধারা নামিল তাহাই আসল কারণ; অমন বৃষ্টি বহুদিন যাবৎ কেহ দেখে নাই। কেহ বলিল, স্থানীয় লীডারদের চেষ্টা, কেহ বলিল, গভর্নমেন্টের সুবন্দোবস্ত। ফলকথা, রায়ট শান্ত হইল।
মতিস্থির হইলে সকলে দুইটি লোককে খুঁজিল—মসজিদ-দ্বারের সেই মুসলমানকে এবং মাড়োয়াড়ির দোকানের সেই হিন্দুকে। কোনো সন্ধানই পাওয়া গেল না তাহাদের। তাহারা কোথাকার? —কলিকাতার—বোম্বাইয়ের—না দিল্লির?
একেবার গোড়ার এই প্রশ্নের উত্তর কে দিবে?
