মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

রাশিয়া ২০১৮ – ২

রুশ দেশে যেন ফ্ল্যামবয়েন্স কমানো সতর্ক রোনাল্ডো

দ্য নেম ইজ বন্ড। জেমস বন্ড।

 ধ্যাত ওটা আদ্যিকালের ব্যাপার। স্প্যানে চলে গিযেছে। নতুন টেনপ্লেট

আমরা যখন জানিই, ব্যবহার করব না কেন?

দ্য নেম ইজ রোনাল্ডো। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

সোমবার বিকেলে মেসিকে দেখার পর মঙ্গলবার সাতসকালে আবার মস্কো ছাড়লাম তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখার জন্য! আউটার মস্কোর রিং রোড হাইওয়ে ধরে পুবে টানা দু’দিন লম্বা যেতে হল বিশ্বফুটবলের দ্বৈত মহানায়ককে দেখার জন্য। কালকেই লিখেছি ওঁদের বেস ক্যাম্প এবার অদ্ভুত ভাবে একই দিকে। সেই মোটরওয়ে যেখানে রাশিয়ানরা বিএমডব্লিউ আর মার্সিডিজ এমন ভাবে চালায় যেন কলকাতার রাস্তায় অটো আর মিনিবাস চালাচ্ছে। লেনের কোনও বাবা মা নেই। যে কোন থেকে পারছে এত দামি গাড়ি পেটে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। রাশিয়ান হাইওয়ে ড্রাইভিং দেখলে মনে হবে কলকাতার অটোওয়ালাদের ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিত। দু’জনের কাছে পৌঁছনোর রাস্তাটা অনেকটা একই দিকে। আবার একটা অতর্কিত টার্ন নিয়ে সম্পূর্ণ দু’দিকে চলে যাওয়া।

এই ভিন্ন দু’দিকে বাঁক নেওয়াটা মেসি-রোনাল্ডোর জীবনে বরাবরের প্রতীকী। একটা রাস্তায় নীল সাদা কোনও ফ্ল্যাগ নেই। সুপারস্টারের কোনও ছবি নেই। নিশ্চুপ, নিরুত্তাপ, ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়।

অন্য রাস্তাটায় অনেক আগে থেকে পর্তুগালের ফ্ল্যাগ। পরপর ছবি আর উৎসাহব্যঞ্জক লেখা। এটাই তো সিআর সেভেন। বরাবরের উচ্চকিত, জমকালো শো-ম্যান।

আর এ দিনের প্র্যাকটিসে তাঁকে মিডিয়ার জন্য বরাদ্দ ওই মিনিট পনেরো দেখে সন্দেহ হল, রাশিয়ায় বোধহয় তা নন। রোনাল্ডোকে ব্রাজিল বিশ্বকাপেও টিমের সঙ্গে ট্রেন করতে দেখেছি। কোথাও যেন এই মানুষটা আলাদা। ঠাঁটবাট আদৌ যায়নি। নতুন হেয়ারস্টাইলে এসেছেন বিশ্বকাপে। নাইকির ৯যে তরুণ, সংস্থার তরফে তাঁর সঙ্গে লিয়াজো করত, তাকে চাকরি দিয়েছেন নিজের ম্যানেজারের। সে রাশিয়াতেও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে। এটা না হয় নিজের বাণিজ্যিক দিকটা বরাবরের মতো টনটনে রাখা। কিন্তু এর বাইরে ওইটুকু সময় দেখেই মনে হল, দেশকে বিশ্বকাপ মুকুট পরাতে লিওনেল মেসির মতোই তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তফাত হল, মেসির তুলনায় তিনি অনেক ধূর্ত। তাই ‘কাপ জিততেই হবে’ জাতীয় কথা বলেনি। এ দিনও তাঁর ঘনিষ্ঠ লিসবনের টিভি সাংবাদিক বলছিলেন, (‘ক্রিশ্চিয়ানো কায়দা করে আমাদের সে দিন বলল আমরা তো কখনও বিশ্বকাপ ফাইনালই খেলিনি। তা হলে কাপ জেতা কোথা থেকে আসছে? আর্জেন্টিনার কথা আলাদা। ওরা দু’বার ট্রফি জিতেছে। আমাদের তুলনায় অনেক বনেদি দল।’) অর্থাৎ চাপটা মেসির। আমার হতে যাবে কেন?

মস্কো থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে স্যাটার্ন ট্রেনিং বেসে রোনাল্ডোদের প্র্যাকটিস শুরু হল সকাল দশটায়। ফিল্মে যেমন রেন সিকোয়েন্সের জন্য কৃত্রিম ভাবে ড্রেন-পাইপ দিয়ে জল ছেটানো হয়, আজও দেখলাম তেমনি মাঠটার চারদিক ভেজানো হল। রাশিয়াতে টানা বৃষ্টি পড়ছে বলে কি পর্তুগাল-আর্জেন্টিনা আগাম ভিজে মাঠে খেলার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে? হয়তো মস্কোয় আজকের মতো বৃষ্টি মাঝে মধ্যে হচ্ছে বলেই এটা প্ল্যান বি? ঈশ্বর জানেন। তবে এটুকু কনফার্মড জানা গেল, মেসির মতোই এই ত্রোবারো ভিলেজ বেস ক্যাম্পটা রোনাল্ডোর প্রেসক্রিপশন মেনেই নির্বাচন হয়েছে।

অদ্ভুত গোপনীয়তার সঙ্গে এখানে পর্তুগিজ ঘাঁটি উৎক্ষেপণের চেষ্টা হচ্ছে। প্র্যাকটিস থেকে আমাদের বেরিয়ে যেতে বলার পরেও আনাচকানাচ থেকে উঁকি মারার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। যদি কোনও মুভমেন্ট তৈরি দেখা যায়। অসম্ভব! প্রায় তিরিশ ফুট উঁচু লোহার গেট দিয়ে চারদিক বন্ধ করা। আর সর্বত্র নেট লাগানো। ফ্লাডলাইট তো ওপরে আছেই। সঙ্গে মাঠের প্রতিটি কোণে ক্লোজ সার্কিট টিভি। বেস ক্যাম্পের ঠিক বাইরে মিডিয়া সেন্টার। শুনছিলাম বেস ক্যাম্পের ভেতরে টিমের জন্য অনুপ্রেরণামূলক নানা লাইন আটকানো রয়েছে। সে তো আর দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু মিডিয়া সেন্টার নামক নিরপেক্ষ জোনেই পর্তুগিজরা বড় করে মেরে রেখেছে— কংকিস্তা ও সেনহো। মানে তোমার স্বপ্নকে জয় করো।

প্র্যাকটিসে কাল মেসিকে যেমন সাবেকি হাউসওয়াইফ টাইপ দেখছিলাম যে, নিজে রোজগারের চেয়ে সংসার কী ভাবে চলবে তার হিসেব নিতে প্রাথমিক ভাবে ব্যস্ত। রোনাল্ডো সেখানে প্রথম মিনিট থেকেই সংসারের কর্তা। নিজে পাস বাড়িয়ে অন্যদের মতো বল নিয়ে দৌড়চ্ছেন। খাটছেন। কিন্তু সব সময় পরিস্থিতির দিকে নজর। ওই পনেরো মিনিট যদি স্বপ্ন না দেখে থাকি তবে ফার্নান্দো সান্টোস এই পর্তুগাল টিমের কোচ নিছক চুক্তিপত্রে। যেখানে প্র্যাকটিস করছেন তার কুড়ি গজের মধ্যে তাক করা শয়ে শয়ে ফোটোগ্রাফারদের ক্যামেরা। মাঝে পনেরো গজও দূরত্ব হবে কি না সন্দেহ। যে রোনাল্ডোর সঙ্গে আমরা আলোকবর্ষ দূরে থেকেও সামান্য পরিচিত, তিনি কতক্ষণে একটা গ্যালারি শো করবেন। ফোটোগ্রাফারদের দিকে মুখ করে অবচেতনে একটা স্টাইলিশ পোজ দেবেন। যা পরে বোঝা যাবে সচেতনে করা হয়েছিল। আজ সে সবের বালাই নেই। স্বদেশীয় রিপোর্টার-ফোটোগ্রাফারদের দূর থেকে গ্রিট করতেও দেখলাম না।

রোনাল্ডো-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিককে বলার চেষ্টা করলাম, কলকাতার সিআর সেভেন ভক্তরা কেউ কেউ দুশ্চিন্তায় আছেন, বিশ্বকাপের জন্য তিনি অন্যদের তুলনায় ক্লান্ত। মেসির যেমন বিশ্রাম অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রোনাল্ডোকে তো রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল খেলতে হয়েছে। মরসুমটা তাঁর জন্য অনেক বেশি লম্বা হয়ে গিয়েছে। যে অসুবিধে বাকিদের নেই। ভদ্রলোক জাস্ট নস্যাৎ করে দিলেন, ”ক্রিশ্চিয়ানোর সঙ্গে একদিন এটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। ও বলল কম্পিউটার খুলে চেক করো গত ন’টা লা লিগা-র মধ্যে এ বছর আমি সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলেছি। লাস্ট চারটে ম্যাচে জিদান আমায় ব্যবহার করেছেন মাত্র দুটো ম্যাচ। তাও একটা পুরো খেলিনি।”

কিন্তু গত বছরের বিশ্বকাপে পর্তুগালকে গ্রুপ থেকেই তুলতে না পারা? ব্রাজিলে তাঁর বয়স ছিল ঊনত্রিশ। ঊনত্রিশের তারুণ্য যা পারেনি, তেত্রিশ তার মহড়া নেবে কী করে?

আর এক পর্তুগাল সাংবাদিক এগিয়ে এলেন। ইনিও ভাষা ভাষা ইংরেজি বলতে পারেন। বললেন, ”আগের বিশ্বকাপে ওর বাঁ পায়ে চোট ছিল। জোর করে ওয়ার্ল্ড কাপটা খেলেছিল। এ বার সে সব সমস্যা নেই।”

শুনতে শুনতে মনে পড়ছিল ব্রাজিল বিশ্বকাপ চলাকালীন রোনাল্ডো জোকস। পর্তুগাল তখন সদ্য ছিটকে গিয়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক লিখেছিল, ‘লিসবনের আদালতে সন্তানের অধিকার নিয়ে বিবাহবিচ্ছিন্ন স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছে। বিচারক এ বার শিশুপুত্রকেই জিজ্ঞেস করেছে, তুমি কার কাছে থাকতে চাও? বাবা না মা?

সে বলেছে, ইওর অনার এদের কারও কাছেই নয়। দু’জনেই আমাকে পড়াশোনা না করলে বেধড়ক মারে। আমি বরং ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কাছে থাকতে চাই। যে কাউকে মারতে পারে না।

স্যাটার্ন ট্রেনিং বেস নামক রোনাল্ডোদের রাশিয়া ট্রেনিং ক্যাম্প পেছনে রেখে মস্কো ফিরতে ফিরতে মনে হল, এক শনির দশা না হলে রোনাল্ডো জোকসগুলো এ বছর না সোশাল মিডিয়ার প্রশংসাসূচক ট্রেন্ডিং-য়ে বদলে যায়!

বেস ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে পর্তুগালের রেডিও সাংবাদিক এগিয়ে এলেন। বললেন, ”আমার সহকর্মীকে আপনি এতক্ষণ ধরে কম্পিটিশন কম্পিটিশন বলছিলেন। কীসের কম্পিটিশন? ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো হল স্বীকৃতভাবে বিশ্বের এক নম্বর ফুটবলার। এ বারও তো ব্যালন ডি অব জিতেছে। তার আবার প্রতিদ্বন্দ্বী হয় নাকি?” প্রথমে মনে হচ্ছিল ভদ্রলোক মজা করে বলছেন। তারপর বুঝলাম সিরিয়াস ফুটবলীয় পর্যবেক্ষণ। বেস ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে মাঝ রাস্তায় গিয়ে মনে হল এই নতুন পর্তুগাল, এরা অন্যবারের মতো সুতপুত্র নয়। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ধমক নিয়ে এসেছে। আর ওই যে কথাটা, এক নম্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয় নাকি? এটা বোধহয় রোনাল্ডোরও রিংটোন—আমি যেখানে দাঁড়িয়ে লাইন সেখান থেকে শুরু হয়!

ত্রোবোরো, ১৩ জুন

মেসি জমানা যেন ধোনির শাসনকাল

বারো ঘণ্টা কেটে গিয়েছে গতকাল লিওনেল মেসি ও তাঁর দলবলের রাশিয়ায় প্রথম পাবলিক ট্রেনিংয়ের। অথচ সোমবারও দেখছি রাগে

গজগজ করছেন আর্জেন্টাইন সাংবাদিকরা। এত দূর গেলাম কাল টিমের ট্রেনিং দেখতে। বিনা প্রেস কনফারেন্সে ফেরত পাঠিয়ে দিল।

মেসিরা যে প্র্যাকটিসের পর সাংবাদিক বৈঠক করবেন না, জানাই ছিল। তবু এঁদের চূড়ান্ত আশা ছিল যে শেষ মুহূর্তে মন বদলাতে পারে। কারণ রাশিয়ায় প্রথম নেমে টিমের ব্যাপারে একটা তো কথা বলবে। প্রেসের তো দানাপানি দরকার যাতে তারা উন্মুখ হয়ে থাকা দেশের লোককে আর্জেন্টাইন টিম সম্পর্কে লেটেস্ট খবর জানাতে পারে। প্রথম দিন এসে দুর্যোগের অজুহাতে অপেক্ষমান মিডিয়াকে ঢুকতে দেয়নি। দ্বিতীয় দিন ঢুকতে দিয়েছে। কিন্তু কথা বলেনি। প্র্যাকটিস যেটুকু দেখিয়েছে, ও পাড়ার লাল্টুসোনা পাশের বাড়ির মিন্টুর সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করলে যেমন হয়, তেমন। ওইটুকুর ওপর কী লিখবে মিডিয়া? আর আজকালকার ডিজিট্যাল যুগে লোকে ও সব পড়বেই বা কেন?

পর্তুগাল যেমন। রোনাল্ডো নিজে না আসুন, বার্নার্ডো সিলভার মতো উঠতি তারাকে না পাঠান। অন্তত মারিওকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর প্রেস কনফারেন্স যত নিরামিষই হোক, মাঝে মাঝে ফুলকি তো উঠেছে। আর্জেন্টিনার তরফে সেখানে আজ পর্যন্ত কিছু নেই। ছবিটা দেখে দু’হাজার এগারো বিশ্বকাপে মহেন্দ্র সিং ধোনি আর দেশজ মিডিয়ার সম্পর্ক মনে পড়ে গেল। ধোনি সে বার প্রতি ম্যাচের আগের দিন শুধু সাংবাদিক বৈঠক করতেন। বহু বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিল যে, দেশের লোক বিশ্বকাপের লেটেস্ট খবর জানার জন্য মরিয়া। আপনি অন্তত ম্যাচের আগের আগের দিন কোনও প্লেয়ারকে মিডিয়ার সামনে পাঠান। বিশেষ করে টিম যেখানে প্র্যাকটিসের জন্য মাঠে আসছে।

ধোনি কর্ণপাত করেননি। হাবেভাবে বুঝিয়েছেন, ওটা আপনাদের সমস্যা। আপনারা বুঝবেন। এই সাহায্য করতে না চাওয়ার কারণ ভারতীয় মিডিয়ার দু’একজনের বিরুদ্ধে পুরনো বীতরাগ। কবেকার শ্রীলঙ্কা সফরে কলম্বোর শপিং মলে বাজার করার সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়া ঢুকে পড়েছিল। সেই থেকে তাঁর মাথা বিগড়ে যায়। এরা প্লেয়ারের ব্যক্তিগত স্পেশে ঢুকে পড়ে। এমন চরম অসৌজন্যের সঙ্গে কোনও আপস নেই। মেসিদের ঘটনাটা অনেকটাই তাই। শুনলে বিস্ফোরিত হয়ে যেতে হয় যে, সুপারস্টাররা একটা শ্রেণির এক-আধ জনের পেশাদারিত্বের অভাবের জন্য পুরো গোষ্ঠীকে তার ফল ভোগ করতে বাধ্য করেন।

ধোনির আমলে ভারতীয় ক্রিকেটে একটা নতুন অভিব্যক্তি ঘুরেফিরে আসত। ভিশন ওনলি। মানে টিমের নেট প্র্যাকটিস তোমার শুধু দেখারই অধিকার রয়েছে, প্লেয়ারদের সঙ্গে কথা বলার নেই। মেসিদের কালকের প্র্যাকটিসটাও তাই। প্রথম দিন দেশজ মিডিয়াকে দুর্যোগের জন্য গেট বন্ধ করে দিয়ে সেকেন্ড দিন কথাই না বলা। সেই ভিশন ওনলি।

মেসিদের উষ্মার কারণ তাঁদের সতীর্থ এজেকিল লাভেজ্জি সম্পর্কে আর্জেন্টাইন রেডিওয় জনৈক ভাষ্যকারের মন্তব্য। লাভেজ্জি আগের বিশ্বকাপে দলে ছিলেন। টিমের প্লেয়ারদের মধ্যে তিনি খুব প্রিয়। ফরোয়ার্ডে অনেকটা জায়াগা নিয়ে খেলেন। মেসির মতো বাকি ফরোয়ার্ডের জন্য ফাঁকা জমিও তৈরি করে থাকেন। কিন্তু হঠাৎই একদিন দেশের হয়ে খেলার সময় তাঁর উত্তেজিত ভাবভঙ্গি দেখে জনৈক সিনিয়র ভাষ্যকার বলে বসেন, ”লাভেজ্জি কি ড্রাগ নেয়?” সেই থেকে এমন সন্দেহ তৈরি হয়ে যায় যে, আার্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন কর্তারা নড়েচড়ে বসেন। আর্জেন্টাইন প্রেসের তাদের ফুটবল কর্তাদের ওপর ব্যাপক প্রভাব আছে। যতই টিমের তারকারা তাদের পাত্তা না দিন। দ্রুত লাভেজ্জি বাদ হয়ে যান।

এতেই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েন মেসি, মাসচেরানো আর ডি’মারিয়ারা। এঁরা বলেন, একটা প্লেয়ারের জীবন মিডিয়া ট্রায়ালে কী করে শেষ হয়ে যেতে পারে? লাভেজ্জির কথাটা তো শোনা হোক। সেটা আর হয়নি। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত মেসি, মাসচেরানোরা আর্জেন্টাইন মিডিয়াকে একটাও ইন্টারভিউ দেননি। কোনও রকম খাতির করেননি। সিনিয়রদের মধ্যে কেউ কেউ বোঝাতে গিয়েছিলেন, একটা লোক কী বলেছে তার জন্য বাকিরা দায়ী হবে কেন? সমাজে তো সব ধরনের লোক থাকে। কিছু খারাপের জন্য বেশির ভাগ ভালরা কেন মূল্য চোকাবে?

মেসি দূরে থাক। মাসচেরানো পর্যন্ত উড়িয়ে দিয়েছেন বক্তব্য। ”টিমের এত বড় ক্ষতি আপনারা বাকিরা প্রতিহত করতে পারলেন না কেন? তা হলে আপনাদের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ করতে যাব কেন যে, কে ভাল কে খারাপ? সকলের জন্য আমাদের এক ট্রিটমেন্ট।”

শুনে বিস্ফারিত লাগল। এটাই তো ধোনি ভারত অধিনায়ক থাকাকালীন নিয়মিত ভাবে সিনিয়র সাংবাদিকদের বলতেন যে, একজন করুক আর দশ জন। দায়টা সবার।

কাল বিকেলের প্র্যাকটিসে মেসি দেশজ মিডিয়ার দিকে না তাকিয়ে বাসে উঠে গেলেন। এমনকী কোনও পোজও দিলেন না। বুয়েনস আইরেসের এক সাংবাদিক দুঃখ করছিলেন, ”এরা এখন এত বড় হয়ে গিয়েছে যে আমাদের ন্যূনতম সম্মানও দেয় না।” বার্সিলোনায় গত সপ্তাহের বেস ক্যাম্প চলাকালীন আর্জেন্টাইন মিডিয়া ওখানে গিয়ে বসে ছিল। মেসি ওই সাত দিনে দু’টো ইন্টারভিউও দিয়েছেন। কিন্তু বার্সেলোনার দৈনিকে।

হতাশ মিডিয়ার কেউ কেউ এখনও হাল ছাড়েননি। যদি টিমের সুমতি ফেরে। মেজরিটি যদিও নেগেটিভটাই ধরে নিচ্ছে। বিশ্বকাপে যে দিন গোল-টোল করে নিজে ভাল করবেন, টিম জিতবে, এমন দিন ছাড়া প্রেস কনফারেন্সে মেসির আবির্ভাব চিন্তাই করছে না। যদি আসেন তা হলে রাশিয়া সফরের বিশেষ সামার বোনাস।

কাল প্র্যাকটিসে মেসিরা যে দিকে ছিলেন, তার ধারে ফিফার লোকজন। একটা বেড়া পেরিয়ে তবে মিডিয়া। আই টু আই কনট্যাক্ট বা চিৎকার করে ডাকলেও শোনার উপায় নেই। যোগাযোগের শেষ রাস্তা প্র্যাকটিসের পর পিছনের দিকে চলে যাওয়া। টিম বাসের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় প্লেয়ার আর সাংবাদিকদের সঙ্গে দূরত্ব মাত্র দশ গজ। মাঝে শুধু একটা দড়ি। দলবদ্ধ ভাবে আর্জেন্টাইন জার্নালিস্টরা দাঁড়িয়ে ছিলেন ওখানে। এক এক করে ডাকলেন আগেরো, ওটামান্ডি আর দিবালাকে। এঁরা হাত নেড়ে হাসলেনও। কিন্তু প্লেয়ারদের ম্যানেজমেন্টের যে কোর গ্রুপ, সেই মেসি, মাসচেরানো আর ডি’মারিয়া মিডিয়ার দিকে তাকালেনই না। ভাবাই যায় না বিশ্বফুটবলের রাজপুত্র বা ঈশ্বর যাই তিনি হন, নিজের দেশের মিডিয়ার সঙ্গে এমন নো নেটওয়ার্ক।

মস্কো, ১৩ জুন

বিশ্বযুদ্ধ আজ থেকে রাশিয়ায়? নাকি বিশ্বের অন্যতম সেরা যুদ্ধ?

পিকে ব্যানার্জি আজও সেই ফুটবলারের নাম ফাঁস করেননি। একাশি সালে সল্টলেক স্টেডিয়াম থেকে জাতীয় শিবির ত্যাগ করার সময় যে চেঁচিয়ে

বলেছিল, ”ক্ষুদিরাম দেশের জন্য গ্যাস খেয়ে মরেছিল। আমি সেভাবে প্রাণ দিতে রাজি নই।”

পিকে নাম না বললেও কলকাতা ময়দানে মোটামুটি অনেকেই প্লেয়ারটিকে পরবর্তীকালে শনাক্ত করে ফেলেছিলেন। আশির দশকে মিডফিল্ড খেলা মূলত বাঁ-পায়ের দর্শনীয় বল প্লেয়ার।

সেই সময় ক্লাব কর্তাদের গাড়িতে সল্টলেক স্টেডিয়াম ত্যাগ করা ফুটবলারদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।

আজ আধুনিক সময়ও কি তাই বলবে? প্লেয়াররা আসল টাকা পায় ক্লাবের হয়ে খেলে। যেমন মেসি মাইনে পান বার্সেলোনা থেকে। রোনাল্ডো পান রিয়াল থেকে। কলকাতাতেও তাই। ক্লাবই যদি আয়ের উৎস হয় তা হলে পেশাদার ফুটবলার ক্লাবের ক্ষতি করে দেশের হয়ে সর্বস্ব দেবে কেন?

ক্ষুদিরাম নিয়ে সেই সময়ের কটাক্ষ নিশ্চয়ই অসভ্যতা এবং কুরুচিকর। কিন্তু কাহিনি সংক্ষিপ্তসার তো এক, আমায় যে বেশি করে দেখবে আমি তাকে দেখব। সল্টলেক শিবির ত্যাগ যদি সাঁইত্রিশ বছর আগে ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা হয়, এ দিন স্পেন ফুটবল ঘিরে যা ঘটল তার তো একই সুর। দেশের আগে ক্লাব। যেখানে শুধু আর্থিক নিরাপত্তাই নেই। সর্বোচ্চ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। হুলেন লোপেতেগি তো বলতেই পারতেন, আমার ভুল মেনে নিলাম। দেশের কোচিংই চূড়ান্ত। রিয়ালকে না করে দিচ্ছি।

 তিনি বলেননি, কারণ পৃথিবীর কোনও পেশাতেই যেমন সর্বোচ্চ মানের পেশাদারকে দেশের গণ্ডি দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। তারা সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতা খোঁজে। নিজের আখের গোছায়। ফুটবল কোচও তাই।

সোচি-র স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে হুলেন দর্শন নিয়ে চরম বিহ্বলতা লক্ষ্য করা গেল। রুশি সাংবাদিকেরা কেউ কেউ বলছিলেন, তুমি দেশের প্রথম ম্যাচের আগে ক্লাবের ডিল করবে কেন? শুনে মনে হল একদা চূড়ান্ত সমাজতান্ত্রিক দেশের মানসিকতায় আজও হয়তো একটা জাতীয় মনোভাব কাজ করে। জার্মানদের সম্পর্কে যেমন বলা হয় তাদের বিখ্যাত জাত্যাভিমান। আর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মতো তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে তো করেই।

এই যে গঞ্জালো হিগুয়েন। আর্জেন্টিনা বেস ক্যাম্পে সে দিন প্র্যাকটিসে লক্ষ্য করছিলাম। মাথা নিচু করে ট্রেনিং করে যাচ্ছেন। মিডিয়া এবং ফটোগ্রাফারদের থেকে শতহস্ত দূরে। সের্জিও র‌্যামোস কী এমন হেট মেল পেয়েছেন? গতবার ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফাইনালে হারার পর হিগুয়েনের বিরুদ্ধে স্বদেশীয় ট্রোলিং সব রকম রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। রেডিও প্রোগ্রামে তাঁর উদ্দেশ্যে জনৈক সমর্থক বলেছে, দুনিয়ার সমস্ত অভিশাপ ঝরে পড়ুক তোর আর তোর পরিবারের ওপর। আর্জেন্টিনার মানুষ বিশ্বাস করে দেশ আগে, ক্লাব পরে। হিগুয়েনও সেই মানসিকতার। মেসি সেই মানসিকতার।

কিন্তু প্রতিটি মেসির জন্য একজন রোনাল্ডো আছে। যিনি বিশ্বকাপের মধ্যেও অ্যাসিস্ট্যান্টকে দিয়ে রিয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। যেমন প্রতিটি হিগুয়েনের জন্য একজন লোপেতেগি আছেন। যেমন প্রতিটি তেন্ডুলকরের জন্য একজন ক্রিস গেইল।

তেণ্ডুলকরের সময় ক্রিকেট মুলত দেশজ স্পোর্ট ছিল। গেইল যখন খেলে চলেছেন তখন তা দেশজ সত্ত্বা ছাড়িয়ে ক্লাব বা ফ্র্যাঞ্চাইজির দিকে সমান্তরাল ভাবে চালিত হচ্ছে। গেইল যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্যাপ্টেন সেই ২০১০ সালে লর্ডস টেস্ট ম্যাচ খেলতে সে দিন সকালে লন্ডন পৌঁছেছিলেন। আইপিএলের আরও একটা বাড়তি ম্যাচ খেলে লন্ডনের ফ্লাইট ধরেছিলেন। কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে দেশের হয়ে বেশি টাকা দেয়।

বুধবার মিডিয়া সেন্টারে স্প্যানিশ সাংবাদিকরা বলছিলেন এটা আমাদের দেশের ফেডারেশনের সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের কর্তৃত্বের লড়াই। স্পেনে ফুটবলের বস কারা? এত দিন ধরে টেনশনটা ধিকিধিকি জ্বলছিল। আজকের পর প্রকাশ্যে চলে এল।

শুনে মনে হল দেখার ধরনটা ভুল। এটা রিয়াল বা স্পেন ছাড়িয়ে অনেক বৃহত্তর ইস্যু। পেশাদারের সার্বভৌমত্বের অধিকারের ইস্যু। আমি ভারতে জন্মে ভারতের নাগরিক হয়ে যদি উচ্চতর সুযোগ-সুবিধের জন্য আমেরিকায় রিসার্চ করতে চলে যেতে পারি, তা হলে স্পোর্টসের সেরা পেশাদারই বা দেশজ গণ্ডি মানবে কেন?

বিশ্ব ফুটবল চৌহদ্দিতে ইদানীং এমন প্রশ্ন ক্রমাগত উঠছে সর্বোচ্চ মানের ফুটবল বা বিশ্বযুদ্ধ কোনটা? রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বার্সেলোনা—যেখানে বিশ্বের সেরারা খেলে? না কি জার্মানি বনাম ব্রাজিল? যেখানে দেশের টিমের চার-পাঁচজন বাদে কেউ রিয়াল বা বার্সার সুযোগই পাবে না?

বিশ্ব ফুটবল অবধি যাওয়ার দরকার নেই। ঘরের নমুনা দিচ্ছি। ভারতীয় বোর্ডকে মধ্যিখানে কোচের চাকরিতে বিদেশি ক্যান্ডিডেট অ্যাপ্লাই করানোর জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়েছিল। আইপিএলের আট ফ্র্যাঞ্চাইজিতে পাঁচজন বিদেশি কোচ আছেন। এঁদের মধ্যে টম মুডি ছাড়া কাউকে কোচের চাকরিতে আবেদনের বরখাস্ত দেওয়ানো যায়নি। ভারতীয় বোর্ড কর্তারা উৎসাহী ছিলেন, রিকি পন্টিং যদি আবেদন করেন। বা গ্যারি কার্স্টেন ফিরে আসেন। দু’জনেই বলেছেন, আইপিএলে আট সপ্তাহে তাঁরা যা আয় করেন, সারা বছর টিমের সঙ্গে থাকাটা আনুপাক্ষিকভাবে তার চেয়ে কম। সুতরাং তাঁরা আগ্রহী নন।

দেশ—কোনও সন্দেহ নেই জনগণের মধ্যে একটা অন্য ধরনের আবেগ। জনগণের কাছে এটাই বিশ্বযুদ্ধ। কিন্তু প্লেয়াররা কি তাই দেখে? ব্রিটেনের দৈনিক গত সপ্তাহে লিখেছে, এটা কীসের বিশ্বযুদ্ধ যেখানে ইতালি নেই অথচ ইরান আছে। হল্যান্ড নেই অথচ তিউনিসিয়া আছে। এটা কী ধরনের বিশ্ব-প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেখানে বুফোঁ বাড়িতে বসে দেখবে তিউনিসিয়া আর দক্ষিণ কোরিয়া খেলছে? দৈনিকটা পৃথিবীর সেরা তিন কোচের মধ্যে গুয়ার্দিওলা, জিদান আর মোরিনহোকে বেছে বলেছে, শ্রেষ্ঠ কোচেরা কোথায় জাতীয় দলের ফুটবলে? আর বলেছে বিশ্বকাপে যাঁরা কোচিং করবেন তাদের মধ্যে মাত্র তিনজন চ্যাম্পিয়ন্স লিগে কোচিং করানোর সুযোগ পেয়েছেন। সাম্পাওলি, আগে হারিদে ও লোপেতেগি। ২৯ জন টপ লেভেলে কোচিংই করাননি। তা হলে এটা সর্বোচ্চ মান কী করে যা সর্বোচ্চ ট্যালেন্টকেই আকৃষ্ট করে না?

এদিনের পর তর্কটা আরও জাঁকিয়ে বসবে। ফিফার মতো ফুটবলের ভুবনীকরণে যারা বেশি আগ্রহী, তারা তো নির্দয় ভাবে বলে চলেছে, বিশ্বসেরা ফুটবলারদের মধ্যে অনেকেই চলতি বিশ্বকাপে নেই। লেরয় সানে, অ্যালেক্সিস স্যাঞ্চেজ গ্যারেথ বেল, মাওরো ইকার্ডি এঁরা বিশ্বকাপে নেই। তাহলে কিসের বিশ্বকাপ?

মস্কোতে প্রচুর জাঁকজমক করে বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। ব্রাজিলে গেয়েছিলেন জেনিফার লোপেজ। মস্কোতে গাইবেন রবি উইলিয়ামস। যিনি আজ ভোররাতেও লুঝনিকিতে রিহার্সাল করছিলেন। সঙ্গে ব্রাজিলের সেই রোনাল্ডো। কিন্তু যাবতীয় জাঁকজমকের মধ্যে তর্কটা থেকেই যাবে সময় আর পরিস্থিতি কি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে? টপ টেনিস প্লেয়াররা অনেকেই যেমন ডেভিস কাপ খেলা নিয়ে হেলাফেলা করেন। ২০২৬ মার্কিন বিশ্বকাপে তেমনই কিছু ঘটবে না তো? আগামী বিশ্বকাপগুলোয় কি বিশ্বকাপ পড়ে যাবে অসম যুদ্ধে।

প্লেয়ারের অধিকার বনাম বাধ্যবাধকতা ও সমাজ—ম্যাচটা সত্যিই বিশ্বযুদ্ধ।

সোচি, ১৪ জুন

সিআর সেভেন শক্তিশেল উড়ে গেল স্পেনে

সুন্দরের বিপরীত শব্দ যদি কুৎসিত হয়। গতিশীলের বিপরীত শব্দ যদি মন্থরতা হয়। সাইবেরিয়ার বিপরীত শব্দ কী? উত্তর-সোচি!

 সকালে মস্কো থেকে রাশিয়ার দক্ষিণ উপকূলবর্তী এই শহরে নেমে মনে

হল শীতের দার্জিলিং থেকে মে মাসের শিলিগুড়িতে নামলাম। যা গরম এখানে ফিফার লোকজন যে থ্রি পিস স্যুট পরে আগামী ক’দিন চলাফেরা করবে তাদের ততটাই বিসদৃশ দেখাবে যতটা শহরের উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর ৬০ ঘণ্টা আগের স্প্যানিশ অ্যানাউন্সমেন্টটায় ঘটল।

এমন অভাবিত শক্তিশেল গ্রহণের পক্ষে সোচি বোধহয় রাশিয়ার সবচেয়ে অনুপযুক্ত ভেনু। এটা মোটামুটি হলিডে ডেস্টিনেশন। খাও দাও, কৃষ্ণসাগরের ধারে বিকিনি পরে রোদ পোহাও। নিজে নির্ঝঞ্ঝাট থাকো। অন্যকেও থাকতে দাও। লিড অ্যান্ড লেট লিভের অদ্ভুত একটা মেজাজ রয়েছে। কিছুটা গোয়া। পাহাড়-সমুদ্র দুটোই। কিছুটা মায়ামি। আবার কিছুটা ব্যাংকক। বুদ্ধ মন্দির না থাক, ব্যাংকক স্টাইলের অটো আছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ল্যাজের তলায় জ্বলতে থাকা রিয়ালের চুক্তির আগুন কী করে অকস্মাৎ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে ঘুরে গেল তার চেয়ে নিশ্চয়ই অনেক সহজ হবে বার করা যে ব্যাংককের মতো এখানেও অটোকে টুকটুক বলে কেন?

গতকাল রোনাল্ডোদের প্র্যাকটিস দেখতে গিয়ে এই রিয়াল শক্তিশেল নিয়ে গুনগুন, ফিসফাস শুনছিলাম। প্রেস কনফারেন্সে এসে রোজার রোমিও রেযমন পাখিপড়ার মতো বললেন, ”ক্লাব চুক্তি নিয়ে এই মুহূর্তে কোনও আলোচনা নয়। আমাদের পুরো নজর দেশের দিকে।” তখন আরও বেশি বোঝা গেল একটা হাল্কা টেনশন রয়েছে। কিন্তু সেই নিম্নচাপটা যে ভাবে কলকাতায় আছড়ে পড়তে পড়তে চিটাগঙের বন্দর উপকূলে উড়ে যাওয়ার মতো স্পেন শিবিরে এমন মারাত্মক ছোবল দেবে কে জানত! কে জানত স্পেনের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অপরাজিত থাকা হুলেন লোপেতেগি-কে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ শুরুর দেড় দিন আগে স্যাক করবে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন?

লোপেতেগি গত দু’বছরেই এমন বরেণ্য যে দেশকে বিশ্বকাপ এনে দিতে পারবেন মনে করা হচ্ছিল। ইস্কোর মতো কেউ কেউ অনূর্ধ্ব স্পেন থেকে তাঁর হাতে তৈরি। তাঁকে আচমকা জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন তাড়িয়ে দিল রিয়াল মাদ্রিদ কোচ হিসেবে তাঁর নাম ঘোষিত হওয়ায়। এক মাস হল স্পেন ফুটবল সংস্থার দায়িত্ব নেওয়া লুই রুবিকলস এ দিন রাশিয়ায় বসে দেওয়া সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ”হুলেনকে আমি শ্রদ্ধা করি যথেষ্ট। কিন্তু রিয়ালের সঙ্গে ভিলটা ও করেছে আমাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে। আমরা রিয়াল মাদ্রিদ থেকে খবরটা পাই প্রেস বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে। সব কিছুর একটা নীতি আছে। একটা দর্শন আছে। এই স্পেন টিমটা গোটা স্পেনিয়ার্ড জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে তুমি বিশ্বকাপের আগে ক্লাবের সঙ্গে গোপন ডিল করবে?”

স্পেন এখনও সোচি না পৌঁছলে কী হবে, কৃষ্ণসাগর উপত্যকা বিশ্বকাপ ফুটবলের এই আচমকা বোমাবর্ষণে হতচকিত। বলতে পারি রিয়াল শক্তিশেলে তার স্বাভাবিক হলিডে মুড কিছুটা আক্রান্ত।

সোচি-র একটা পরিচয় আগে দেওয়া উচিত ছিল। অলিম্পিকের শহর। সেই ২০১৪-এ এখানে উইন্টার অলিম্পিক হয়েছিল। আজও যেন শহরটা সেই কস্টিউম খোলার সময় পায়নি। এমনিতে বিশ্বকাপ ফুটবলের পোস্টার আর ফ্ল্যাগ দিয়ে শহরটা মোড়া। কিন্তু বারবারই স্প্যানিশ সাইডব্যাকদের মতো ওভারল্যাপে উঠে আসছে অলিম্পিকের পঞ্চবলয়। স্থানীয় সংগঠন কমিটির সঙ্গে জড়িত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম শহর জুড়ে এত ফ্ল্যাগ, পরশুর ম্যাচ নিয়ে এত উদ্দীপনা। অথচ সিআর সেভেনের মুখও কোথাও নেই কেন? জায়গায় জায়গায় বিজ্ঞাপনী ভাষা বলছে, স্টারস আর ইন ইওর সিটি। এই হেডলাইন মস্কোতে দেখিনি। মানে সোচির জন্য আলাদা তৈরি হয়েছে। তাতে রোনাল্ডোর রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রথম আবির্ভাব বিজ্ঞাপিত হবে না? স্টারস আর ইন ইওর সিটি না বলে কেন সুপারস্টার ইন ইওর সিটি বলবে না? স্পেনের সমর্থক এখানে বেশি বুঝলাম। সের্জিও র‌্যামেস সেই মহম্মদ সালাহ-র ঘটনার পর সোচি থেকে হেট মেল পাননি। কিন্তু স্পেনেরও তো কারও ছবি নেই।

উত্তরটা যা পাওয়া গেল তা এরকম, এখানে তো আরও ম্যাচ আছে। জার্মানরাও খেলবে। সোচি তাই জনপ্রিয়তার অঙ্কে না গিয়ে সাম্যবাদ রাখতে চেয়েছে। বললাম না সব ব্যাপারে সেফ থাকতে চাওয়া। এখানে এক টুর গাইডের সঙ্গে আলাপ হল। যিনি সোচির প্রধান দ্রষ্টব্যের মধ্যে অলিম্পিক টর্চ রিলের জায়গাটা আর কৃষ্ণসাগর দেখাতে নিয়ে গেলেন। নেইমারসহ ব্রাজিল কোন হোটেলে ছিল এখানে? জানেন না। বললাম না সোচি চায় অলিম্পিক আদর্শের হাওয়ায় বিশ্বকাপটা মানে মানে চুকে যাক। লোকে খেলা দেখে ভরপুর বিনোদন পাক। শহরের নাম পৃথিবীব্যাপী আরও ফাটুক!

বুধবারে বারবেলার বোম ফাটার মতো আওয়াজে সোচির নির্বিরোধী অতিথিপরায়ণতা কিঞ্চিৎ বিড়ম্বনায় পড়েছে। এখন যা দাঁড়াল শুক্রবারের ম্যাচটা মোটেও স্পেন ভার্সেস পর্তুগাল থাকল না। অনেকগুলো আঙ্গিক তার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে ম্যাচকে আগাম বিতর্কিত করে দিল। ধরে নেওয়া হচ্ছিল ম্যাচটা নিছক মর্যাদার লড়াই। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ জিতে মোমেন্টাম তৈরির জাঁকজমক। গ্রুপে আর যে দুটো টিম তাতে এদের কারওরই পরের রাউন্ডে এগোতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। মহানাটকীয় ভাবে হুলেনকে সরিয়ে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ফের্নান্দো হিয়েরোকে কোচ করার পর সেটা আর থাকল না। রাশিয়া বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আগাম সম্ভ্রম পাচ্ছিল স্পেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনার পর তাদের এখন প্রতিটি মুভমেন্টের পুঙ্খানুপুঙ্খ স্ক্রিনিং হবে।

স্পেন টিম এখনও সোচি পৌঁছয়নি। আসবে বিষ্যুদবার বিকেলে। কাল মস্কোয় উদ্বোধনী ম্যাচ শুরুর দেড় ঘণ্টা আগে তাদের নতুন সাংবাদিক সম্মেলন। তখন হয়তো জমকালো ওপেনিং সেরেমোনি চলবে যার ড্রেস রিহার্সাল কাল বেশি রাতেও লুঝনিকি স্টেডিয়ামে দেখছিলাম। কিন্তু আপাতত তাকে ছাপিয়ে ব্রেকিং নিউজ হতে যাচ্ছে নতুন কোচ ফের্নান্দো হিয়েরোর মিট দ্য প্রেস। এতদিন টিমের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ছিলেন ঠিক আছে। কিন্তু এই ভঙ্গুর সময় পারবেন টিমকে মানসিক ভাবে টেনে তুলতে?

লোপেতেগি স্পেন টিমটার শুধু কোচই ছিলেন না, সময়ের সঙ্গে পথপ্রদর্শক হয়ে যান। টিডি হিসেবে কোচের তলায় থাকা এক জিনিস। কিন্তু একা সেটাই সামলাতে গেলে সোচির হঠাৎ শুরু হয়ে যাওয়া পাহাড়ি রাস্তার মতো ড্রাইভিংয়ের নতুন পরীক্ষা দিতে হবে। এখানে বেশিরভাগ গাড়ি দেখছি রাইট হ্যান্ড ড্রাইভ। যা পাশ্চাত্যে দেখাই যায় না। কে বলতে পারে এমনই কোনও চমক টিম থেকে হিয়েরোর জন্য অপেক্ষা করবে না? লোপেতেগি সেই তিকিতাকা থেকে টিমকে বদলে এমন ডিরেক্ট পাসিং ফুটবলে উন্নীত করেছেন যে গোটা বিশ্ব স্পেনকে সমীহ করে। এক ভদ্রলোক তো বলেই রেখেছেন আর যে টিম সামনে পড়ুক, শুরুর দিকে যেন স্পেন না পড়ে।

মন্তব্যটা আরও গুরুত্ব পেয়েছে কারণ বক্তার নাম শ্রীমান লিওনেল মেসি। গত দুটো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই বিশ্রী হেরেছে স্পেন। ব্যর্থতার হ্যাটট্রিক যাতে না হয় তার জন্য নাকি সের্জিও র‌্যামোস এবং সিনিয়রদের নিয়ে হেড কোচ বারবার কথা বলেছেন বলে জানালেন স্প্যানিশ সাংবাদিকেরা।

সেই মূল কান্ডারি উধাও। এ বার নতুন লোক ভাল ভাবে ধরবে কী করে? বিশেষ করে যেখানে অধিনায়ক র‌্যামোসের নেতৃত্বে সিনিয়র টিম ম্যানেজমেন্ট বারবার ফেডারেশন প্রেসিডেন্টকে বলেছেন, কোচকে রাখুন। সোচি মিডিয়া সেন্টারের ক্লোজড সার্কিট টিভিতে দেখানো হচ্ছিল ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনো ২০২৬ বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকায় সংগঠিত হবে বলে ঘোষণা করছেন। আর পাঁচটা দিন হলে এটাই খবর হত আমেরিকায় বিশ্ব ফুটবল ফিরল। আজ রিয়ালের শক্তিশেলে সেটা কোথায় ডুবে গিয়েছে। গোটা মিডিয়া সেন্টারে স্প্যানিশদের ছোটাছুটি দেখে মনে হচ্ছে সিস্টেমে বুঝি ভয়ংকর ভাইরাস ঢুকে ওয়াইফাই বিগড়ে গেছে।

অনুমান করার ব্যর্থ চেষ্টা করছি রোনাল্ডো কী ভাবছেন? মুচকি হাসছেন স্পেন কেমন প্যাঁচে পড়ল? নাকি নিজের রিয়াল ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও চিন্তায় পড়ে গেলেন? আজকের ঘটনা তো তাঁর কাছে সোচির বিখ্যাত ট্র্যাকে গাড়ি না চালিয়ে ফর্মুলা ওয়ান জেতার মতো। তাঁর পর্তুগাল শিবিরে যেটা নিয়ে এত কানাকানি আর ক্রমাগত ভয় যে বিশ্বকাপের মধ্যে রোনাল্ডোর রিয়াল সিদ্ধান্ত পিষে ফেলবে পর্তুগালকে। সেটাই কি না চলে গেল উল্টো দিকে।

তাঁর পরিচিত সাংবাদিকেরা বলছিলেন, ও রিয়ালেই থাকবে। কিন্তু নিজের স্যালারিটা বাড়াতে চায়। মেসির চেয়ে টাকাটা যেন অনেক বেশি হয়। তা হলেই থাকবে। আসলে রিয়ালের সঙ্গে ওর দর কষাকষি চলছে। কোনও সন্দেহ নেই শক্তিশেলের আচমকা দিক পরিবর্তন করে স্প্যানিশ আর্মাডাকে ফুটো করা সিআর সেভেনকে রোমাঞ্চিতই করবে।

লিখলাম না, এ তো গাড়ি না চালিয়ে ফর্মুলা ওয়ান জেতা।

সোচি, ১৪ জুন

আমি কি শেষকৃত্যে যোগ দিতে এসেছি?’ – সের্জিও র‌্যামোসের মহানাটকীয় সাংবাদিক সম্মেলন

স্পেন মুখপাত্র : দশ মিনিট দেরিতে আমরা ঢুকলাম। এ জন্য প্রথমেই মার্জনা চাইছি।

সমবেত মিডিয়া : ঠিক আছে (যদিও প্রশ্নটা থেকে গেল বিশ্বকাপের সাংবাদিক সম্মেলনে আসতে দশ মিনিট দেরি হল কেন? এটা কি স্প্যানিশ অন্তর্বিবাদের বহিঃপ্রকাশ)।

প্রশ্ন : সের্জিও, ক্যাপ্টেন হিসেবে দুঃসহ গত দু’দিনের যদি বর্ণনা দেন।

সের্জিও : আমাদের যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব এই পরিস্থিতি থেকে বেরোতে হবে। লোপেতেগি এই টিমের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তিনি আমাদের বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করতে এত সাহায্য করেছেন। ওঁকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সামনের দিকে তাকাতে হবে। যত তাড়াতাড়ি আমরা অতীতের ফাঁকা জমি ছেড়ে সামনের যুদ্ধের জন্য মন দেব, তত ভাল। আর ফের্নান্দো হিয়েরো হলেন এর জন্য যোগ্যতম মানুষ।

প্রশ্ন : শোনা যাচ্ছে লাস্ট চব্বিশ ঘণ্টা প্লেয়াররাও কোচের ভবিষ্যৎ ঠিক করার ব্যাপারে জড়িত হয়ে গিয়েছিল? এ-ও শোনা যাচ্ছে তারা অনেকেই চায়নি হুলেন চলে যান।

সের্জিও : আমাদের প্রত্যেকের নিজের মতো করে মত থাকতে পারে। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। দিনের শেষে সংস্থা কী ঠিক করছে, সেটাই আসল। প্লেয়ারদের কাজ খেলা। সাইডলাইনে বসে সিদ্ধান্তটা জেনে নেওয়া। আর মাঠের মাঝখানে গিয়ে নিজেদের প্রমাণ করা। মনে রাখবেন কাল আমাদের বিশ্বকাপ শুরু। আর আমাদের বিপক্ষে কিনা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা।

প্রশ্ন : এমন কঠিন পরিস্থিতিতে স্প্যানিশ ক্যাপ্টেনের করণীয় কী?

সের্জিও : আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব স্বপ্নালু চোখে এই বিশ্বকাপের দিকে তাকিয়ে আছি। ক্যাপ্টেন হিসেবে আমার প্রথম বিশ্বকাপ। আমি আমার টিমকে নেতৃত্ব দিচ্ছি। দেশের ভার বহন করছি। ফুটবল আমাদের শেখায় জীবনকে কীভাবে নিতে হয়? কী ভাবে দুঃসহ পরিস্থিতিকে সামলাতে হয়? হুলেন আমাদের অংশ ছিলেন। থাকবেন। বিশ্বকাপে যা-ই হোক না কেন, সেটার কোনও নড়চড় হবে না।

প্রশ্ন : কিন্তু প্লেয়াররা তো ফেডারেশন প্রেসিডেন্টকে থামাতে পারত।

সের্জিও : বললাম তো, এটা আমাদের ইস্যু নয়। প্লেয়াররা মাঠে নেমে খেলে। যা কথা হওয়ার হুলেন আর প্রেসিডেন্টের মধ্যে হয়েছে।

প্রশ্ন : সের্জিও, আমি বিবিসি রিপোর্টার। জানতে চাইছি এই যে আপনার খুনে মেজাজ। যে কোনও মূল্যে জিততে হবে। জেতার জন্য কোনও রকম ভাবে অনুতপ্ত হওয়া নেই। এটা কী আপনার ধ্যান? মানে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে তো আমরা তাই দেখলাম।

সের্জিও : (না রেগে) এটা আমার টিমমেটরা বেশি ভাল বলতে পারবে যে আমার মানসিকতা কী? তবে ইয়েস, আমি হারতে চাই না। একটা তুচ্ছ তাস খেললেও হারতে রাজি নই।

প্রশ্ন : ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে আপনি সবচেয়ে ভাল চেনেন। কাল ম্যাচে ওকে নিয়ে কী ভাবছেন?

সের্জিও : (প্রথম মুখে হাসি) সুযোগ থাকলে আমি ওকে কাল আমার টিমে রাখতাম। বিরুদ্ধে নয়। ক্রিস সব সময় বিপজ্জনক। যে কোনও পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক। ইদানিং দারুণ ফর্মেও আছে। তবে আমি চাইব কাল ক্রিস কিছুতেই ওর সেরাটা বার করতে না পারে।

প্রশ্ন : সের্জিও, এই যা ঘটেছে তাতে টিমে তো অনেক বিভেদ হয়ে গেল। অনেকগুলো গ্রুপ হয়ে গেল। এদের এক সুরে বাঁধবেন কী করে?

সের্জিও : না, না। ওপিনিয়ন আমাদের থাকতেই পারে। কিন্তু ডিভিশন হবে কেন? উল্টে এটা আমাদের আরও জোরালো আর সংঘবদ্ধ করে দিতে পারে। এটা হয়তো আমাদের বিশ্বকাপের মূল্য আরও বেশি করে বোঝাবে। তা ছাড়া ফের্নান্দো হিয়েরো এমন একজন মানুষ যিনি এই ফাঁকা জায়গাটা পূরণের পক্ষে আদর্শ। কাজেই আমরা মন নিয়ে কাপের লক্ষ্যে ডুবে যাচ্ছি। যা হয়েছে, থাকল পিছনে।

প্রশ্ন : এই যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে সালাহকে মারা নিয়ে এত বিতর্ক হল। আপনার কি অনুশোচনা বা আফশোস হয়?

সের্জিও : আমার না বুঝলেন তো রাত্তিরে খুব ভাল ঘুম হয়। আমার ঘুমের কোনও সমস্যা নেই। যদি লোকে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য ইস্যু তৈরি করতে চায় তারা তাদের মতো থাক। আমি যা তেমনই থাকব। আমার সিভিটা একটু চেক করুন না।

আমি আপাতত প্রেস কনফারেন্স থেকে উঠে পড়ছি। আমার এতক্ষণ থেকে মনে হল যেন শেষকৃত্যে যোগ দিতে এসেছি। আরে ভাই, কাল থেকে বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে। কারও শেষকৃত্য নয়।

সোচি, ১৫ জুন