মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

ব্রাজিল ২০১৪ – ৪

রুনির সেরা ম্যাচ নিয়ে চলে গেলেন সুয়ারেজ

জয়সূচক গোল করে কেঁদে ফেললেন লুই সুয়ারেজ। আর এখানে মিডিয়া সেন্টারে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলেন উরুগুয়ের কিছু সাংবাদিক। অন্য দেশের রিপোর্টাররা মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে তখন ছুটছেন ভিডিওয় অভাবনীয় সেই দৃশ্য আর কান্নার রোল তুলে রাখতে।

একটা গ্রুপ লিগ ম্যাচ পরিস্থিতি বিচারে নকআউট হয়ে গিয়ে কী অতিনাটকীয় চেহারা নিতে পারে, বিষ্যুদবার বিকেলের এরিনা সাও পাওলো তাই দেখল! প্রেস ট্রিবিউনে বিতরণ করা ফিফার হিসেবে দেখছি, বল দখলে ইংরেজরা যেখানে ৬১ শতাংশ, সেখানে উরুগুয়ে মাত্র ৩৯। কিন্তু শুধু বল দখলে তো ফুটবল হয় না। গোল করতে হয়। দু’টিমে সেই গোল করার সর্বশ্রেষ্ঠ লোক যেহেতু উরুগুয়ের নীল জার্সিতে খেলেন, তারাই ম্যাচটা শেষ মুহূর্তে জিতে ইংল্যান্ডকে বিশ্বফুটবল যুদ্ধ থেকে কার্যত বার করে দিল।

অন্য বারের মতো হাইপ না তুলে ইংল্যান্ডের অভিজাত ব্রডশিটগুলো এ বার ব্রাজিল ফুটবল-তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্যে অনেক বাস্তববাদী দিগনির্দেশ দিয়েছিল। বলেছিল, ব্রাজিলে থাকাকালীন কী কী না দেখলেই নয়।

নাটাল: অসাধারণ সব সি বিচ।

পোর্তো আলেগ্রে: উদ্দাম নিশুতি জীবন।

রিও: ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের স্ট্যাচু এবং দুর্ধর্ষ সব সি বিচ।

সাও পাওলো : আর্ট গ্যালারি আর ফ্যাশন স্টোর্স। স্যান্টোসে গিয়ে পেলের ভিটে।

আর বলেছিল ফুটবলটা সঙ্গে থাক। কারণ ওটায় তো ইংল্যান্ডের বিশেষ কোনও সুযোগ নেই। দ্রুতই হারবে এবং সম্ভবত আর্জেন্তিনার কাছে দু’গোল খেয়ে হারবে। যাতে মনের দুঃখটা আরও বেশি হয়।

দু’গোলই হল। হারলও। শুধু লাতিন আমেরিকার অন্য দেশের কাছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে উরুগুয়েকে বলা হচ্ছিল ডার্ক হর্স। কোস্টারিকার কাছে খাওয়া তিন গোলে ঘোড়াটোড়া বলা বন্ধ হয়ে যায়। সম্ভবত আজ থেকে আবার শুরু হবে। শুধুই লুই সুয়ারেজের জন্য। প্রথম গোলটা অর্জুন রামপাল কাটিং ক্যাভানির সঙ্গে বুদ্ধি করে ওয়ান টু খেলতে খেলতে ঢুকে পড়ে। পরেরটা ডান দিক থেকে গোলার মতো শটে।

লিভারপুলের হয়ে চলতি মরসুমে ৩১ গোল করেছেন সুয়ারেজ। ভাবা হয়েছিল হাঁটুর চোট নিয়েও ম্যাচটা খেলতে বাধ্য হয়েছেন তো! ইপিএলের ফর্ম কিছুতেই এখানে দেখা যাবে না। দেখা গেল ভুল ভাবা হয়েছিল। গ্রুপ লিগের এই একটা ম্যাচ সময়-সময় সেমিফাইনাল সদৃশ চাপের হয়ে গিয়েছিল। সেটা একা বার করলেন সুয়ারেজ।

ঠিক উল্টো দিকে ড্যানিয়েল স্ট্যারিজ ছিলেন। তিনিও ইপিএলের তারকা স্ট্রাইকার। কিন্তু সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারলেন না এবং সেই প্রবাদবাক্যটা ভারী হল যে, বন্যেরা যেমন বনে সুন্দর তেমনই সুন্দর কিছু ইংরেজ ফুটবলা ইপিএলে!

এই তালিকায় আর যাতে তাঁকে না ফেলা যায় তার জন্য উরুগুয়ে ম্যাচে অবশ্য পর্যাপ্ত করেছেন ওয়েন রুনি। খেলা শেষ হওয়ার পনেরো মিনিট আগে রুনির গোলে ইংল্যান্ড১-১ করে দিয়েছিল। কিন্তু চাপ রাখতে পারেনি। একটা টিম এত সংঘর্ষপূর্ণ টুর্নামেন্টের সবচেয়ে মারামারির ম্যাচে যখন পিছন থেকে ফিরে গোল শোধ করে, তখন সচরাচর তারাই জেতে। এ দিনের ইংল্যান্ড ব্যতিক্রমী থাকতে বাধ্য হল দিয়েগো গডিনকে নিয়ে গড়া দুর্ভেদ্য উরুগুয়ে রক্ষণ আর সুয়ারেজের জন্য। গ্যারি লিনেকার থেকে শুরু করে তাবৎ ব্রিটিশ মিডিয়াই সম্মান যুদ্ধে অন্তত এ দিনের জন্য জয়ী। তাঁর একটা হেড ক্রসপিসে লেগে না ফিরলে ইংল্যান্ডেরই ১-০ এগিয়ে যাওয়ার কথা। যেটা দাঁড়াল, রুনি দেশজ মিডিয়ার বিরুদ্ধে জিতে উরুগুয়ের কাছে হেরে গেলেন।

টুর্নামেন্টের আগে করা যাবতীয় পূর্বাভাস এখন শুধু ভুলই প্রমাণ হচ্ছে না, হাস্যকর পর্যায়ে নেমে এসেছে। স্টিফেন হকিং যেমন! প্রবাদপ্রতিম পদার্থবিজ্ঞানীর পূর্বাভাস ছিল, দুটো ফ্যাক্টর কাজ করলে ইংল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।

যদি ইউরোপিয়ান রেফারি ম্যাচ খেলান তা হলে শতকরা ৬৩ ভাগ বাড়বে। যদি তাপমাত্রা নেমে যায় অন্তত পাঁচ ডিগ্রি তা হলে শতকরা ৫৪ ভাগ আশা বাড়বে।

সাও পাওলোয় এ দিন মাঠের মধ্যে যা ঠান্ডা ছিল, তাতে গ্যালারিতে ফায়ারপ্লেস রাখলে কেউ আপত্তি করতেন না। আর স্পেনের রেফারি ম্যাচ খেলিয়েছেন। তাতেও তো রুনিকে ষোলো পিস লাগেজ আর পরিবার নিয়ে ফিরেই যেতে হচ্ছে!

আসলে এ সব পূর্বাভাস আজকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার ম্যাচে সম্ভবই নয়। ওই রুনির হেডটাই যদি আগে গোল হয়ে যায়। তার পর উরুগুয়ের রডরিগেজ যদি ফাঁকা গোল পেয়েও বাইরে না মারতেন। ভাগ্যের টুকরোটাকরা এমন সব এক ইঞ্চি-আধ ইঞ্চি ঘুরে যাওয়ার ব্যাপার থাকে যে, সেগুলোই হয়ে যায় চূড়ান্ত নির্ণায়ক।

তবে একটা পূর্বাভাস এরিনা সাও পাওলোয় বসে করাই যায়। মেসির যদি উরুগুয়ে ডিফেন্স থাকত, তা হলে আর্জেন্তিনা ফেভারিট।

সাও পাওলো, ২০ জুন

অস্তে গেল এক কালের তারকাখচিত দল তিকিতাকাকে ধরাধামে রেখে গিয়ে

জাতকের নাম তিকিতাকা।

 পিতৃপরিচয়: জোহান ক্রুয়েফ।

নামকরণ: স্প্যানিশ ভাষ্যকার আন্দ্রে মন্তেস।

কাকা-জেঠু: লুই আরাগোনেস, পেপ গুয়ার্দিওলা।

বিশেষ কৃতিত্ব: ইউরোপিয়ান কাপ, লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপ এবং অবশ্যই বিশ্বকাপ জয়।

জন্ম: ১৯৮৮, জুলাই (সঠিক দিন বলা সম্ভব নয়)।

অফিশিয়াল বার্থ সার্টিফিকেট: ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপ।

মৃত্যু: ২০১৪, ১৮ জুন।

আন্তর্জাতিক ফুটবল দুনিয়ায় বুধবার থেকে শুরু কোরাস তাই বলছে— ইনিয়েস্তারা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার সঙ্গেই তিকিতাকারও মৃত্যু ঘোষণা হয়ে গেল। বায়ার্ন মিউনিখের ঘরের মাঠে বিপর্যয় থেকেই সে ভেন্টিলেটরে চলে গেছিল। মারাকানা নামক মৃতস্বপ্নের সুবিখ্যাত ভাগাড়ে তার এ বার সলিলসমাধি ঘটল। ঠিক যেমন ১৯৫০ সালে এ মাঠে ঘটেছিল ব্রাজিলীয় বিশ্বকাপ-স্বপ্নের।

বিশ্বব্যাপী আলোচনার মাপকাঠিতে তিকিতাকা বহু দিনই রেনাস মিশেলস প্রবর্তিত টোটাল ফুটবলকে হারিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছর তা আরওই আলোচিত হতে হতে বুধবার যেন অনেকে তার প্রামাণ্য ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে গেলেন। ব্রাজিলীয় ফুটবল সমাজের হাবভাব দেখে কিন্তু মনে হল না তারা সেই কোরাসে গলা মেলাতে এতটুকু আগ্রহী বলে।

সত্যি-মিথ্যে জানি না, কোনও একটা ব্রাজিলীয় চ্যানেলে নাকি জর্জিনহো বলেছেন, ”তিকিতাকার মৃত্যুতে এত বিস্ময়ের কী আছে! এটা তো হওয়ারই ছিল। বাড়ির পোষ্য কখনও বাড়ির লোকের চেয়ে বেশি বাঁচে নাকি?” সাংবাদিকদের মুখে শুনলাম বলেই নয়। এই ভঙ্গিতে কোনও ব্রাজিলীয় ফুটবলার তিকিতাকার বিরুদ্ধে বলবে, শুনে আশ্চর্য লাগছে।

মুখ্য কারণ, বার্সা এদের খুব ভালবাসার ক্লাব। অতীতে একটা সময় ছিল যখন ব্রাজিলীয় ফুটবলে একটা ইগো কাজ করত যে, আমরা হলাম বিশ্বসেরা। আমাদের আবার অন্যের খেলার মডেল কপি করতে হবে কেন? ওয়েস্ট ইন্ডিজ যেমন আজও বিদেশ থেকে ফাস্ট বোলার ট্রেনিং দিতে আসবে শুনলে সাম্রাজ্যের এমন পড়তি অবস্থাতেও খিঁচিয়ে আসে। আধুনিক ব্রাজিল ফুটবল সেই ইগো-মুক্ত।

তারা বরং মনে করে, যেহেতু আমাদের আগের সেই সোনার দল নেই যে তিনটে টাচে বিপক্ষ পেনাল্টি বক্সে পৌঁছে দেবে, তা হলে পাসিং গেমটা খারাপ কী? টোস্টাও— যাঁকে একটা সময় হোয়াইট পেলে বলা হত, তিনি গত বছর অবধি বলে এসেছেন, ”ব্রাজিলের উচিত তিকিতাকা খেলে মাঠটাকে বড় করা। নইলে ওরা খেলার ধকল নিতে পারবে না। আমাদের আর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে খেলার সেই টিম নেই।”

বিশ্বকাপ এমনিতে এমন একটা কুম্ভমেলার মতো ব্যাপার আর মিডিয়া ব্যবস্থায় যেহেতু পেশাদারিত্বের অভাব এবং তার সঙ্গে বিকট ভাষা-সমস্যা, জানা গেল না জোহান ক্রুয়েফ এখানে এসেছেন কিনা? মহা-আলোচিত এই সিস্টেমের তিনি জন্মদাতা। আজকের দিনে একটা মন্তব্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হত যে, চব্বিশ বছর পুরনো সিস্টেমকে ফেলে কি ফুটবল এগিয়ে গিয়েছে? নাকি যন্ত্র আগের মতো কাজেরই আছে, দক্ষ যন্ত্রী নেই?

প্রবাদ অনুযায়ী ২০০৬ বিশ্বকাপে স্পেন বনাম তিউনিশিয়া ম্যাচ থেকে এই অভিব্যক্তির জন্ম। যখন স্প্যানিয়ার্ডরা টুকটুক করে নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট পাসে খেলেছেন, প্রয়াত ভাষ্যকার আন্দ্রে মন্তেস বলতে থাকেন, তি-কি-তা-কা, তি-কি-তা-কা। বলা হয়ে থাকে এই সময় সিস্টেমের মাধ্যমে সেই সব ফুটবলাররাও শ্রেষ্ঠত্বের সুযোগ পায়, যারা বড় চেহারার নয়। তেমন লম্বা নয়, কিন্তু টেকনিক্যালি নিখুঁত। যেমন মেসি। যেমন জাভি। যেমন ইনিয়েস্তা। যেমন ফ্যাব্রেগাস।

ইন্টারেস্টিং হল, ভারত মনে করে এই তিকিতাকা পদ্ধতিতে খেলেই তারা জাতীয় ফুটবল কৃতিত্বের শেষ কোহিনুরে হাত দিতে পেরেছিল। বাষট্টির এশিয়ান গেমস জয় নাকি সম্ভব হয়েছিল এই পাসিং নির্ভর সিস্টেমের জন্য। কলকাতা থেকে পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় বলছিলেন, ”রহিম সাহেবকে এজন্য ভারতের সর্বকালের সবচেয়ে দূরদর্শী কোচ মানি। উনি সেই কবেই আমাদের বলতেন, ‘ইউরোপ-লাতিন আমেরিকা তো বটেই, ফিজিক্যালি অনেক ফিট কোরিয়া-জাপানের সঙ্গে স্বাভাবিক খেলে ওদের হারাতে পারবে না। বল দখলের খেলায় যাও। চার-পাঁচটা পাস নিজেদের মধ্যে খেলতে খেলতে তার পর পেনিট্রেটিভ জোনে চলে যাও।”

চূনী গোস্বামী— বাষট্টির সোনাজয়ী অধিনায়কও তাই মনে করেন যে, রহিমের চোখ যুগান্তকারী ছিল। চুনী বলছিলেন, ”ক্যালকাটা ফুটবলে সেই সময় ব্রিটিশ-নির্ভর লম্বা বল স্টাইলে খেলা হত। জাতীয় দলে রহিম সাহেব সেটা পুরো বদলে দেন। উনি ছোট ছোট পাসে আমাদের খেলানো প্রথম শুরু করেন। বারবার বলতেন মাঠটাকে বড় করো। স্ট্রেচ করো নিজেদের মধ্যে পাস খেলে খেলে। দেখবে কত সুবিধা পাও। তখন কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি, এক কালে এর উন্নতর ভার্সানকেই বলা হবে তিকিতাকা। আর সেই সিস্টেম বিশ্বব্যাপী এত জনপ্রিয় হবে।”

আর্মান্দো কোলাসো গোয়া থেকে ফোনে বলছিলেন, ”ডেম্পোর কোচ থাকাকালীন আমি চেষ্টা করেছি এই সিস্টেমে খেলতে। সাফল্যও পেয়েছি। তবে এই সিস্টেমে খেলতে দুটো জিনিস লাগবে। প্রথমত একটা সেট টিম লাগবে যারা কয়েক বছর খেলে খেলে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভাল করে ফেলেছে। দুই, টেকনিক্যালি সেই প্লেয়ারদের প্রায় নিখুঁত হতে হবে।” মোহনবাগান কোচ এই ব্যাপারে ইস্টবেঙ্গল কোচের সঙ্গে এক মেরুতে। সুভাষ ভৌমিকও মনে করেন, চুনীর দল-পরবর্তী ভারত যে এই সিস্টেম অক্ষত রাখতে পারেনি কারণ সেই কোয়ালিটির এক ঝাঁক প্লেয়ার আর একসঙ্গে আসেনি।

ব্রাজিলে বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের মত হল, সিস্টেমের জন্য স্পেন হারেনি। হেরেছে তারুণ্যের টগবগানি হারিয়ে ফেলা একদল তারকা প্লেয়ারের ব্যর্থতায়। যারা সিস্টেমের যোগ্য থাকতে পারেনি। প্লাস কোচের ভুল সিদ্ধান্তে। তাদের মতে, সামনে দিয়েগো কোস্তাকে রেখে তিকিতাকা সম্ভব নয়। দু’ম্যাচে ১৩৯ মিনিট মাঠে থেকে কোস্তা একটাও গোলে শট নিতে পারেননি। শুধু সে জন্য নয়, তাঁর খেলার ধরনটা যে ইংলিশ ফুটবলের মতো। তিকিতাকার সঙ্গে যায় না, এটা দেল বস্কির বোঝা উচিত ছিল। শুনে মনে পড়ে গেল, টোস্টাও যখন ব্রাজিলের তিকিতাকা খেলার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, তখন তিনিও গত বছর বলেছিলেন, ”ফ্রেডকে কিন্তু তা হলে বলি দেওয়ার জন্য তৈরি থাকতে হবে। তিকিতাকা খেলার যোগ্যতা ওর নেই।”

শেষ পর্যন্ত এটাই দাঁড়াল যে, তিকিতাকা স্পেনের সঙ্গে সাময়িক বিদায় নিয়েও অবচেতনে সেই থেকে গেল। বিশ্বে যখনই কোনও কোচ অসম্ভব ট্যালেন্টেড একটা দল নিয়েও দেখবেন স্রেফ শরীরের বিপক্ষের কাছে মার খাচ্ছেন, বা উচ্চতায়। আবার তিকিতাকা মন্ত্রের শরণ নেবেন তিনি।

জাভি-ইনিয়েস্তারা তত দিনে নির্ঘাত টিভি বক্সে হঠাৎই আবিষ্কার করবেন, বহু দিনের সাথী আবার আসিছে ফিরিয়া!

রিও, ২০ জুন

ক্যাসিয়াসদের শোকের আগুনে পোড়ার ভয় পাচ্ছে এ বার ব্রাজিল

কুয়ের্মাস পেদির পর্দন আ তোডা নয়েস্ত্রা জেন্ত্রে।

 বিশ্বকাপের খেতাবরক্ষায় যেমন চ্যাম্পিয়নদের এটাই সর্বকালের নিকৃষ্টতম পারফরম্যান্স, তেমনই ওপরের স্প্যানিশ মন্তব্যের চেয়ে করুণতম সংলাপও বোধহয় বিশ্বকাপের চুরাশি বছরের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

‘হে দেশবাসী, আপনাদের সবার মার্জনা ভিক্ষা করছি।’

বক্তা ইকার ক্যাসিয়াস।

তিনি সপ্তাহও হয়নি, লিসবনের ফাইনালে আটলেটিকো মাদ্রিদকে হারিয়ে উঠে এই ক্যাসিয়াসই বলেছিলেন, বিশ্বকাপের চেয়ে অনেক বড় হল চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। স্প্যানিশ আর্মাডা ব্রাজিল থেকে অস্ত যাওয়ার জন্য কাঠগড়ায় সবার আগে দাঁড়াতে বাধ্য হওয়া স্প্যানিশ গোলকিপারই বুঝিয়েছেন, অন্তত আবেগের তীব্রতা আর স্বপ্নের মাদকতায় দেশের সঙ্গে ক্লাব ফুটবলের তুলনাই হয় না।

একটা এত বড় ফুটবল সমাজের গাছ যখন ধরাশায়ী হয়, সে তো আর একা নিজে পড়ে না। প্রচণ্ড শব্দ করে আরও কিছু গাছ নিয়েই পড়ে! আয়োজক দেশেও তার মারাত্মক রেশ। যতই হোক না সেটা দূরবর্তী অন্য মহাদেশ। উরুগুয়ে-ইংল্যান্ড ম্যাচ কভার করতে এসেও দেখছি, এই দুটো টিমের কোনটা আজ টুর্নামেন্ট থেকে ইনিয়েস্তাদের পদানুসারী হবে, তা নিয়ে কোনও আলোচনা নেই। এরিনা কোরিন্থিয়ান্সের কফির তুফানে, বিয়ারের ফেনায় একচেটিয়া প্রসঙ্গ স্পেন!

সাও পাওলোয় বিকেলে ইংল্যান্ড খেলবে বলেই যেন সকাল থেকে শহরে প্রতীকী ইংল্যান্ড ওয়েদার। ঝিরঝির বৃষ্টি হঠাৎ তাপমাত্রা নামিয়ে দিয়েছে যে, হাফ নয়, ফুল সোয়েটার থাকলে ব্যাপারটা জুতের হয়। আলো জ্বলছে সকাল থেকে রাস্তায়। আর তাই বোধহয় আইল্যান্ড বোর্ডের নীচে আরও পরিষ্কার করে স্কোরটা ফুটে উঠেছে— স্পেন ০ : চিলি ২। কালকের আর কোনও ম্যাচের স্কোর নেই। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ জেতার পর ব্রাজিলের স্কোরটাও রাস্তার বিলবোর্ডে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। হঠাৎ স্পেন কেন? না কি এই জন্যই যে, এটা বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ব্রেকিং নিউজ! একটা ছয় বছরের চ্যাম্পিয়ন টিম মাত্র তিন ঘণ্টায় ফুটবল-চুল্লিতে ভস্মীভূত!

ব্রাজিলের এমনিতে ক্যাসিয়াসদের শোকগাথায় আচ্ছন্ন থাকার কারণ ছিল না। স্পেন যাওয়া মানে তো একটা সম্ভাব্য বড় শত্রুর পতন। তাতে তো খুশি হওয়ার কথা। তা ছাড়া রবেনদের কাছে স্পেন হেরে যাওয়ার পর যা দাঁড়িয়েছিল, তাতে গ্রুপ থেকে ব্রাজিল প্রথম হলে সেকেন্ড রাউন্ডে স্পেনকেই খেলতে হত। বাকি ফুটবল পৃথিবী যতই বলুক আগামী ১৩ জুলাই অবধি হ্যামলেট অভিনীত হবে প্রিন্স অব ডেনমার্ককে বাদ দিয়েই স্কোলারির ব্রাজিলের সেই বিষণ্ণতার শরিক হওয়ার কোনও কারণ ছিল না।

অথচ কাল স্পেন ম্যাচ শেষ হওয়ার পর থেকে ব্রাজিলের রেডিও স্টেশন, টিভি চ্যানেল এমনকী স্টেডিয়ামেও ফোন করে অনুরাগীরা বলছে, ব্রাজিল সতর্ক হোক। এখনই শিক্ষা নিক স্পেন থেকে। নইলে বিপদ আসন্ন।

আচমকা এই ঠকঠকানি তৈরি হওয়ার কারণ ব্রাজিলের এ যাবৎ দুটো ম্যাচ খেলার কুৎসিত ধরন আর এ বারের বিশ্বকাপের প্যাটার্ন। প্রথম চার দিন বস্তা বস্তা গোল হওয়ার পর বলা হচ্ছিল, এটাই সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ। বোঝাচ্ছে কেন ফুটবলকে দ্য বিউটিফুল গেম বলা হয়! এখন ক্রমশ টুর্নামেন্ট এগোনোর সঙ্গে মনে হচ্ছে, এটা সর্বকালের নির্দয়তম বিশ্বকাপ হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। যেখানে প্রতিপক্ষের ফুটবল-ঐতিহ্য বা র্যাঙ্কিংয়ের পরোয়া করছে না অনামীরা। কোস্টারিকা, চিলি, ক্রোয়েশিয়া— এরা এক-একটা মার্কামারা আন্ডারডগ টিম। অথচ তারাই দেখা যাচ্ছে, শিহরণ জাগিয়ে দিচ্ছে।

ব্রাজিলিয়ান রেডিওর সিনিয়র সাংবাদিক বলছিলেন, স্কোলারিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে পাচ্ছি না। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমাকে দেওয়া ইন্টারভিউয়ে উনি বলেছিলেন, ”আর যে কোনও টিমকে সেকেন্ড রাউন্ডে খেলতে রাজি। কেবল চিলি যেন সামনে না পড়ে।” স্কোলারি মনে করেন, চিলিকে সামলানোর সবচেয়ে বড় সমস্যা, তারা অবিরত অ্যাটাক করে। নির্দিষ্ট কোনও প্যাটার্নে খেলে না। আর হারা-জেতা নিয়ে অত মাথা ঘামায় না বলে ভীষণ ফ্রি থাকে। ব্রাজিল কোচ নাকি বলেছিলেন ”স্পেন হোক, নেদারল্যান্ডস হোক, ওদের খেলাটা বুঝে প্ল্যান করা যায়। চিলির সঙ্গে করা কঠিন।”

সাংবাদিকটি এজন্য স্কোলারিকে খুঁজছেন না যে, তাঁর ভবিষ্যৎ-দর্শন মিলে গিয়েছে। ওই গোল্ডম্যান স্যাকস বা সিডনি ফরেনসিক অনুসন্ধানীদের কাপ পূর্বাভাসকে ধুলোয় মিশিয়ে। তিনি খুঁজছেন কারণ, ব্রাজিল গ্রুপ থেকে এক নম্বর হলে উল্টো দিকে চিলিই পড়বে!

পেলে ফোর্তালেজায় সে দিন ব্রাজিল ম্যাচের প্রথমার্ধটা মিস করেছেন ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে পড়ে। বলেছেন, ”এই প্রথম হল বিশ্বকাপে ব্রাজিল খেলছে আর আমি মাঠে নেই।” তার পর আবার যোগ করেছেন , ”যা শুনলাম তাতে অবশ্য খুব মিস করেছি বলে মনে হচ্ছে না।” তাঁর দেশবাসী যারা মাঠে ছিল তারাও প্রশ্ন তুলেছে, মাঠে থেকে কী পেলাম?

স্থানীয় টিভি চ্যানেলে রোমারিও নাকি বলেছেন, ”যা খেলছে পুরোটাই তো নেইমার। যে দিন নেইমার আটকে যাবে, সে দিন ব্রাজিলকে কে দেখবে?” সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া, কাগজে লেখালেখি, চ্যানেলে বলা সব কিছু থেকে পরিষ্কার, কাঠগড়ায় সবার আগে পওলিনহো আর অস্কার। তার পরেই ফ্রেড। ব্রাজিলের গ্রুপটা অন্যগুলোর মাপে নিছকই সহজ। তবু দু’টো ম্যাচে ব্রাজিল গোলে মোট শট হয়েছে বারো বার। চার থেকে পাঁচটা সেভ করেছেন জুলিও সিজার। যা ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে অভূতপূর্ব। মাঝমাঠে বল স্ন্যাচ করার মতো কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। ডান দিক থেকেও যখন-তখন দানি আলভেজের সুনামের তোয়াক্কা না করে আক্রমণকারীরা চলে আসছে।

ব্রাজিল ফুটবল-জনতার স্পেনকে দেখে ভয় ধরে গিয়েছে, গ্রুপ লিগ থেকে না হয় বার হওয়া গেল। তারপর তো নক আউট। একটা ছোট ভুলেই সেখানে ফুটবল-চুল্লিতে স্পেনের মতোই ঢুকে যাবে যাবতীয় স্বপ্ন। তার চেয়েও আতঙ্কিত জিজ্ঞাসা, যারা টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন হবে বলে আমরা এত দিন ধরে শুনছি। শুনে বিশ্বাসও করছি, তাদের এখনই এত অনির্ভরযোগ্য লাগবে কেন?

ব্রাজিলীয় সাংবাদিকদের মুখে শুনছিলাম, এমনিতেও স্কোলারির ডিফেন্স শক্ত করে অ-ব্রাজিলীয় খেলার ধরনটা আমজনতার আত্মিক পছন্দ নয়। তাদের আত্মার সঙ্গে যায়, সাবেকি ব্রাজিল। বল ধরো, কাটাও, কাটিয়ে গোল করে এসো। এমনকী একটা সময় রিভেলিনহো-টোস্টাওরা পরামর্শও দিয়েছিলেন, স্পেনের অনুকরণে ব্রাজিল তিকিতাকা ধরুক।

এই সব প্রস্তাব আর সমালোচনা বদলে যায় গত বছর এমন দাপটের সঙ্গে কনফেড-কাপ জেতায়। তখন থেকে সবাই স্কোলারির সাফল্যের কাছে মাথা নত করে বলতে থাকে, ঠিক আছে চ্যাম্পিয়ন যদি এতে হওয়া যায়, তা হলে এটাই সেরা মডেল। তাই ফুটবল-জনতার অপছন্দ তলায় তলায় ছিলই। এ বার দু’টো ম্যাচ দেখার পর আবার ওপরে উঠেছে। স্পেন বিদায় তার ওপর ছড়িয়েছে নুন আর গোলমরিচ।

প্রকাশ্যে অবশ্য টিমকে কেউ কোনও ক্ষোভ জানায়নি। স্কোলারি নিজেও অবিচলিত। ঘনিষ্ঠমহলে বলেছেন, ”বিশ্বকাপ ম্যারাথন রেসের মতো। শুরুতেই বেশি ফুলকি দেখালে চলে না।” আগের দিন ম্যাচ ড্র করে ফেরার সময় ব্রাজিলের নীল রঙা টিম বাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে লোকে উৎসাহই দিয়েছে। হলুদ পতাকা আর জার্সি নাড়িয়েছে।

কিন্তু তখনও তো স্পেন ঘটেনি। ক্যামেরুন ম্যাচে আরও চারটে গোলে শট আর নিষ্ক্রিয় মাঝমাঠ দেখে বেরোলে ব্রাজিলীয় জনতার ধৈর্যের বাঁধ অক্ষুণ্ণ থাকবে তো?

মনে হচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি সাময়িক ঠান্ডা করার জন্য তখন না থিয়াগো সিলভাদের কিছু বলতে-টলতে হয়। ক্যাসিয়াসের সংলাপ না হলেও ওই দেশবাসী উদ্দেশ্য করেই বলা আর কী!

রিও, ২১ জুন

সুন্দরী, পানশালা ও কোচ বনাম মেসি

বেলো হরাইজন্তে মানে কী? বিমানবন্দরের অভ্যর্থনা ডেস্কে কিছু হাসিখুশি মুখ। তাদের কারও কারও আবার গলায় ছোট ব্যাগ ঝুলছে—

আই স্পিক ইংলিশ।

তেমনই এক তরুণী উত্তর দিল, বেলো হরাইজন্তে মানে বিউটিফুল হরাইজন। বাংলায় অপরূপ দিগন্ত। শহরের দিকে কিছু দূর যেতে না যেতেই বোঝা গেল এটা আদতে শৈলশহর। দিগন্ত শোভার মধ্যে পাহাড়ের শ্রেণিটা ধরতে হবে। কারণ চার দিকে পাহাড়। শহরটাকে পাহাড়ই ঘিরে রেখেছে।

কিন্তু বিচ? ব্রাজিলে সূদৃশ্য গিরিশৃঙ্গ তো বোঝা গেল। কিন্তু ভাই বিচ কোথায়? ব্রাজিল আবার ফুটবল, বিচ আর বিকিনি বাদ দিয়ে হয় নাকি?

বহু দিন বাদে এক ট্যাক্সিচালকের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে যাকে প্রশ্ন করতে গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্য লাগে না। ভাল ইংরেজি জানে। সে বলল, বেলোর বিখ্যাত মন্তব্যটা জানেন না? তেমোস মার্মাস, তেমোস বার।

”আমাদের বিচ নেই, আমাদের বার আছে!”

ছেলেটি বলল, ”স্টেডিয়াম যাওয়ার তাড়া না থাকলে আপনাকে স্ট্রেট বারে নিয়ে যেতাম। সকাল থেকে লোকে এখানে মদ খায় আর খুব এনজয় করে। বারে যে কত এনজয় করা যায়, ওখানে গেলে বুঝবেন। দু’একটা বার আছে স্যার, আপনি বেশি খেয়ে ফেললে আপনাকে রাত্তিরের জন্য রেখে দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে।”

ড্রাইভারকে অবিশ্বাস করার কারণ নেই কারণ সে কি না ট্যুর গাইড হিসেবেও কাজ করে। এই শহর থেকেই উঠে এসেছেন টোস্টাও। এখনকার ব্রাজিল দলের রামিরেজ। গোটা ব্রাজিলের ঠিক এই মুহূর্তের চক্ষুশূল ফ্রেড। ফ্রেড অনেক বছর নাকি এই শহরে কাটিয়েছেন। দু’টো বড় ফুটবল ক্লাব আছে শহরে। ফুটবল-সংস্কৃতি যথেষ্ট উচ্চমার্গের।

কিন্তু বেলো হরাইজন্তের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য নাকি তার মহিলায়। চালক খুব গর্বের সঙ্গে বলল, ”সারা ব্রাজিলের মধ্যে আমাদের এখানকার মেয়েরা সবচেয়ে সুন্দরী। রিও-র যত মডেল আর ব্রাজিলিয়ান অভিনেত্রী দেখবেন, মনে রাখবেন তার বেশির ভাগ বেলো সাপ্লাই দিয়েছে।’

কালকেই নেটে পড়ছিলাম ইরান কোচ বলেছেন, ”শনিবারের আর্জেন্তিনা ম্যাচ হল ইরানের ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম দিন।” তা চির-রক্ষণশীল, পর্দানসীন ইরান কিনা তার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরজনক দিন এমন একটা শহরে এসে পাচ্ছে, যেখানে উদ্দাম পানশালা আর বাছাই করা সেরা সুন্দরী!

কোথায় কি একটু ধাক্কা লাগে? সেটার মাত্রা আরও বেড়ে যাবে স্টেডিয়ামের ভেতর আর্জেন্তিনার প্রেস কনফারেন্সে ঢুকলে। আর্জেন্তিনীয় কোচ সেখানে হাজির— আলেসান্দ্রো সাবেয়া। ম্যাচের আগের দিন এ সব প্রেস কনফারেন্স কী হবে, চোখে বুজে বলে দেওয়া যায়। বিপক্ষ নিয়ে প্রশ্ন হবে। আর সাবেয়ার মতো হুঁশিয়ার, সতর্ক মানুষ পরের পর পলিটিক্যালি কারেক্ট উত্তর দেবেন। বিপক্ষ যত না ভাল তার চেয়ে বেশি নম্বর দেবেন। নিজেদের সম্ভাবনা নিয়ে কাছা খুলে কিছু বলবেন না। এ তো কলকাতায় অফিসে বসে বলে দেওয়া যায়, এস্তাদিও মিনেরোর কনফারেন্স রুমে কী ঘটছে!

আধ ঘণ্টার সাংবাদিক সম্মেলন। সেখানে বেশির ভাগ আর্জেন্তিনীয় সাংবাদিক। তাঁরা দেশজ কোচকে যে ভঙ্গিতে পরপর আক্রমণাত্মক প্রশ্নে বিঁধলেন, তা ভিডিও করে সবার আগে মহেন্দ্র সিংহ ধোনিকে দেখানো উচিত। যে, ভারতীয় ক্রিকেট মিডিয়া এখনও কত সভ্যভব্য।

ইরান নিয়ে প্রশ্ন মাত্র একটা। মনে হল আর্জেন্তিনা কালকে মাকড়দহ স্পোর্টিং বা পূর্ব পুঁটিয়ারি সম্মিলিত একাদশের সঙ্গে খেলছে। পুরোটাই, কোচ আপনার সঙ্গে কি মেসির ঝগড়া লেগেছে? দলে কি আপনার কথা আর প্রথম ও শেষ কথা নয়? এই সব প্রশ্ন।

ধোনি হলে পুরো মরসুমটা নির্ঘাত প্রেস বয়কট করতেন। সাবেয়ার অনন্ত ধৈর্য। ফেরার সময় আবার সেই সাংবাদিকদের অনুরোধে ছবির জন্য মিনিট পাঁচেক পোজ দিলেন।

অপরূপ দিগন্তশোভায় ভরা এই শহরের পাশেই আর্জেন্তিনার ঘাঁটি। যাকে বলে, বেসক্যাম্প। আর সেখানে নাকি টিমের অন্তর্লীন সৌন্দর্যটা মোটেও অপরূপ যাচ্ছে না। কোন সিস্টেমে খেলা হবে তা নিয়ে তীব্র খটাখটি লেগেছে ক্যাপ্টেন আর কোচের। কোচ বসনিয়া ম্যাচে শুরু করেছিলেন পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে। ৫-৩-২ ছকে। সেটা নাকি মেসির একেবারেই পছন্দ হয়নি। এই ছকে তিনি একেবারে একা হয়ে যাচ্ছিলেন। বল পাচ্ছিলেন না। বিরতির পর আর্জেন্তিনা সামনে লোক বাড়ায়। মেসিও গোল পান।

ফুটবলের সুপার-পাওয়াররা ইরানের মতো প্রতিপক্ষ পেলে, সামনে আরও লোক এনে গোল বাড়িয়ে রাখবে তো স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু মেসি যেহেতু দু’দিন আগে মিডিয়াকে বলেছেন আর্জেন্তিনার যে কোনও অবস্থাতেই ৪-৩-৩ খেলা উচিত, তীব্র জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে যে, তিনি কোচের ওপর খবরদারি করছেন। কাল প্র্যাকটিসে কোচ যে টিম খেলিয়েছেন, তাতে সামনে আর্জেন্তিনার সেই বিখ্যাত ফ্যাব ফোর। আগেরো, হিগুয়েন, মেসি এবং পেছনে ডান দিক থেকে আক্রমণে অংশ নেওয়া ডি’মারিয়া।

গোটাটাই নাকি মেসি-বিপ্লব। কোচের ভিতু-ভিতু রক্ষণাত্মক স্ট্র্যাটেজি তাঁর পছন্দ হচ্ছে না। সাবেয়া এই অভিযোগগুলো শুনে বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ”হতেই পারে লিওর সেটা মতামত। আমাদের টিমে সবার স্বাধীন ভাবে কথা বলার অধিকার আছে। আর সেই অধিকারটা আমি দিয়েছি। মেসিকে প্রেসের কাছে তো আমিই পাঠিয়েছি।”

সাবেয়া এর পর সবিস্তারে বললেন, মেসির বিপরীতধর্মী মন্তব্যে তিনি এতটুকু আহত নন। তাঁরা পরস্পরকে যথেষ্ট সম্মান করেন। আর সেই সম্পর্কে এতটুকু চিড় ধরেনি। এর পর আর্জেন্তাইন কোচ বললেন, তাঁর নিজের ধারণা বসনিয়া ম্যাচে প্রথমার্ধে মাত্র এক গোলে এগোলেও আর্জেন্তিনা যথেষ্ট ভাল খেলেছে। সব সময় স্কোরবোর্ডটা আসল নয়।

বোঝা গেল, এই জায়গাটায় অধিনায়ক আর তাঁর বক্তব্যের ভিন্নতা থেকেই গেল। যদিও তা থেকে মতান্তর সত্যি হয়েছে কি না, বোঝার উপায় নেই। শনিবার আর্জেন্তিনা যে ৪-৩-৩ খেলছে, সেটা কোচ আজই জানিয়ে দিলেন। এটাও আশ্চর্য। যাঁকে প্রথম দিন থেকে কোনও কিছু ফাঁস করতে না চাওয়া, সতর্ক এবং ঝানু পেশাদার হিসেবে দেখছি, তিনি ম্যাচের আগের দিন কোন ছকে খেলবেন তা উপুড় করে দিচ্ছেন।

এটা কি গৃহযুদ্ধের সম্ভাব্য দাবানলে জল ঢেলে মেসিকে শান্ত করতে চাওয়া? মেসির এমন একটা দেবদূত সদৃশ ভাবমূর্তি আছে,; যে, তিনি কোচের পেছনে লাগবেন। তাঁকে গুরুত্বহীন করে দেবেন। ঠিক ভাবাই যায় না। যদিও বার্সা ক্যাম্প থেকে খবর বেরিয়েছিল যে, তিনি নাকি তখনকার কোচ পেপ গুয়ার্দিওলাকে প্রকাশ্য অপমান করেছিলেন।

লা লিগা ম্যাচের আগে মেসি নাকি সফট ড্রিঙ্ক চেয়েছিলেন। কোচ চেঁচিয়ে বলে দেন, ম্যাচের তিন ঘণ্টা আগে-পরে তোমরা কেউ সফট ড্রিঙ্ক খেও না। পরের দৃশ্য এ রকম যে, একটা কোকের বটল নিয়ে এসে পা ছড়িয়ে সবার সামনে মেসি খাওয়া শুরু করেন। অপমানিত কোচ কিডছু বলতে পারেননি। বার্সারই এক প্লেয়ার পরে ঘটনাটা ফাঁস করে মন্তব্য করেছিলেন, ”দেবদূত দেখায় মানেই ওরা ঈশ্বরতুল্য নয়।” ওরা বহুবচন কিন্তু এখানে বুঝতে হবে একবচন, তা হৃদয়ঙ্গম করতে কারও অসুবিধে হয়নি।

কিন্তু সত্যি যদি আর্জেন্তিনীয় ক্যাম্পে হালকা গৃহযুদ্ধের রেশ থাকে, তার সুযোগ নিতে পারবে ইরান? এশীয় দেশগুলোর মধ্যে যারা বিশ্বকাপ খেলছে, সেই তালিকায় ইরানই এক নম্বর। ইরানের র‌্যাঙ্কিং ৩৭। জাপান ৪৭। কোরিয়া ৫৫। বিশ্বকাপ প্রস্তুতি পর্বে ইরান সবচেয়ে ভাল খেলেছে। শতকরা তিরিশ ভাগ গোল সেট পিস থেকে করলেও বিশেষত্ব দেখিয়েছে মজবুত ডিফেন্স। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দ্রুতগামী নাইজিরিয়ান ফরোয়ার্ডদেরও ইরানি ডিফেন্স গোল করতে দেয়নি।

আর্জেন্টিনা ফরোয়ার্ড লাইন যদিও অন্য গ্রহের বস্তু হবে! তা ছাড়া ইরান অর্থনৈতিক সমস্যা আর দেশের টালমাটাল পরিস্থিতিতে এমনই বিধ্বস্ত যে, টাকার অভাবে টিমের জন্য ফ্রেন্ডলি ম্যাচ পর্যন্ত ব্রাজিলে আয়োজন করতে পারেনি। তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাস দূরতম কল্পনাতেও গর্বের মিনার নয়। তিনটে বিশ্বকাপ খেলে একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো ছাড়া তেহরানকে গর্বিত করার কিছু ঘটেনি।

আর খেলাটা যতই ব্রাজিলে হোক, কার্যত হচ্ছে বুয়েনস আইরেসে। ব্রাজিলের আর সব শহরের মধ্যে বেলোতেই সবচেয়ে বেশি আর্জেন্তিনীয় থাকেন। আর দেশ থেকে তো বিশ্বকাপ দেখতে আসা পর্যটক আছেই। শুনলাম মাঠে সাতাশ হাজার আর্জেন্তিনীয় থাকবে। সাতাশ, পঁচিশ না তিরিশ, কোনওটাতেই কিছু আসে যায় না। মোদ্দা কথা হল, দিনের শেষে এটা মেসিদের হোম ম্যাচ!

ইরানের সম্মান কুড়োনো ছাড়া ম্যাচে আরও কিছু করার থাকলে সেটা বিশ্বকাপের অন্যতম চমক হবে। কিন্তু ইরান, ইরান বারবার এখানে বসে শুনতে শুনতে, সাংবাদিক সম্মেলন ফার্সিতে অনূদিত হচ্ছে দেখে কোথাও যেন ভারতীয় সাংবাদিকের বিষণ্ণতাটা থেকেই যায়। তার বারবার মনে হতে থাকে, এই ইরানকেই তো বিরাশি-তিরাশি সালেও ভারত নিয়মিত হারিয়েছে। তারা আজ মেসির সামনে চলে গেল আর ভারত কি না ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৪৭।

ঠিক ওই সময়টাতেই বেলো হরাইজন্তের অপরূপ দিগন্ত, একগুচ্ছ পানশালা, সুন্দরী মহিলা আর মেসি ছাড়িয়ে ভারত সমর্থক অন্য একটা উপত্যকায় পৌঁছে যায়।

ফুটবল-দুঃখের উপত্যকা!

বেলো হরাইজন্তে, ২১ জুন

মেসির গাণ্ডীবে হারল ইরান

সারা বিশ্ব ব্রাজিলীয় সমর্থকদের ফুটবল মাঠ রূপসী হলুদে রাঙিয়ে দেওয়ার কথাই বলে! বলে তাদের মায়াবী উচ্ছ্বাস আর শব্দব্রহ্মের কথা, যা ফুটবল ম্যাচের চেহারাই বদলে দেয়। খোদ ব্রাজিলে বসে বারবার মনে হচ্ছে এমন একপেশে বিচার আর্জেন্টাইন সমর্থকদের প্রাপ্য নয়। শনিবার যেমন বেলো হরাইজন্তের মাঠে তাঁরা শুধু রঙিন নন। পাহাড়ি ঝর্নার কলরবে হাজির ছিলেন আর ম্যাচের ঘণ্টাখানেক আগে থেকে দৃশ্যকল্প তৈরি করে গেলেন। নীল-সাদা জার্সি। কারও হলুদ। মাথায় শিঙের মতো টুপি। কিক অফের আগে থেকেই গান গেয়ে-নেচে এমন অসামান্য কোরিওগ্রাফি যে, হে—অধিনায়ক, আসুন, মঞ্চ তৈরি। এ বার আপনি শুধু পারফর্মটা করে যান। আজ দুর্বল এশীয় দলকে আমাদের গোলের মালা পরানোর দিন।

আপাদমস্তক লিওনেল মেসির মঞ্চে এর পর যা ঘটল গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছে—আর্জেন্তিনা ১ : ইরান ০।

গোলের অব্যর্থ সুযোগ তৈরি এবং নষ্টের যদি ম্যাচ স্কোরবোর্ড হয়, তা হলে দাঁড়ায় ইরান ৩ : আর্জেন্তিনা ২।

কী লিখব বুঝতেই পারছি না। গ্যালারিতে থাকা মারাদোনার সামনে মেসির দুর্ধর্ষ গোল?

এশিয়ার হেরে গিয়েও বিশ্বমঞ্চে সোনার দিন?

নাকি ইরানের কোস্টারিকা হয়ে যেতে যেতে মাত্র কয়েক ইঞ্চির জন্য থেমে যাওয়া?

ইরানি ডিফেন্স যা খেলছিল ইরান-ইরাক যুদ্ধে তাদের সেনাবাহিনী সেই লড়াই করলে গোটা দেশ গর্বিত হত! আগেরো, হিগুয়েন, অ্যাঞ্জেলো ডি’ মারিয়া, এঁরা কোটি কোটি টাকার ইউরোপীয় লিগের এক একজন তারকা। কিন্তু ভেদই করতে পারছিলেন না ইরানি ডিফেন্স। পেনিট্রেটিভ জোনে যে কোনও সময় অন্তত ছয় থেকে সাত জন লাল জার্সি। আর তারা এত ক্ষিপ্র এবং শক্তিধর যে, লাতিন আমেরিকান ক্ষিপ্রতাও জমি তৈরি করতে পারছে না।

শনিবার খেলার একানব্বই মিনিটে খাওয়া গোলে ইরান হারলেও প্রমাণ করে গেল, অন্তত দেশজ মঞ্চে এখন বড় টিম আর ছোট টিমের তফাত অনেক কমে গিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কমবে। জিম করে, ওজন তুলে, স্প্রিন্ট করে সবাই এখন এত ফিট যে জায়গাই পাওয়া যায় না। চারটে লোককে ফেলে দিয়ে দুরন্ত গোল করে দিলাম, সেটা হয়তো এখনও এক-আধ দিন ঘটবে। কিন্তু হাতে গোনা যাবে। এত দিন লোকে সামনে একশো মিটার টানত দশ সেকেন্ড বা তারও কমে। এখন দশ সেকেন্ডে নিজের গোলে উল্টোমুখী ফিরে আসছে। শুধু তো ডিফেন্ডারদের হারালেই হবে না, দ্রুত গতির মিডফিল্ডার সারাক্ষণ ট্যাকলের ছোবল নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। পুলিশম্যান মার্কিং আর হচ্ছে না। এমনকী মেসির জন্যও না। রোনাল্ডো থেকে মেসি— সবাইকে এখন জোনাল মার্কিংয়ের মধ্যে ফেলা হচ্ছে। যখন বল পাবেন শনিবারের মতো তিন জন করে থাকবে। কিন্তু আলাদা করে কেউ অন ডিউটি মেসি না।

প্রথমার্ধে একটা সময় মনে হচ্ছিল ৪-৩-৩ নিয়েও আর্জেন্তিনা গোল করতে পারছে না তো ঠিক আছে। এ তো কলকাতা মাঠে ছোট দলও লিগে ফার্স্ট হাফ আটকে দেয়। একবার গোল শুরু হলে পরপর বন্যা বইবে। তখনও স্বপ্নেও ভাবিনি দিয়েগো মারাদোনাকে মাঠে বসে দেখতে হবে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ৩৭ নম্বরে থাকা কোথাকার কে ইরান তাঁর দেশের ফুটবল-গরিমায় এমন হাত দিতে যাচ্ছে।

সের্জিও রোমেরো আজ ইরানি ডিফেন্সের মতোই দুর্ভেদ্য না থাকলে মেসিরা হয় হারতেন। না হয় বড়জোর ড্র হত। শেষ পনেরো মিনিটে মনে হল মেসি খেলাটা ব্যক্তিগত গর্বে ধরলেন। এতক্ষণ চলছিল আর্জেন্তিনার অ্যাকাউন্টে। তিনি নাগাড়ে স্কিমিং করে বল বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন। আর সহ-ফরোয়ার্ডরা অপচয় করে যাচ্ছিল। এ বার যেন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টটার চেক বই বার করলেন। যা গ্রেট প্লেয়াররা চরম বিপন্নতায় আপনাই বের করে আনতে জানে!

এই জন্যই তিনি গ্রেট। আগেরো নন। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢোকা একটা নিরামিষ আক্রমণ যেটা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকের নোটবইয়েই ওঠে না। সেটাকে তাঁর মহিমায় জীবন্ত করে দিলেন মেসি। একটা ফলস দিলেন, যেন পাস করবেন। ডিফেন্ডার ডান দিক দেখছে। এ বার বাঁ পায়ে রাইট ইনসাইডের জায়গা থেকে শট নিলেন। সোয়ার্ভ করে গোলপোস্টের কোনা দিয়ে ঢুকে গেল। মুগ্ধ সাবেয়া তাঁর আধিনায়কের সঙ্গে যদি কোনও ঝগড়াও থেকে থাকে তা থামিয়ে, মোহাবিষ্টের মতো সাংবাদিক সম্মেলনে বলে গেলেন, ”দু’টো গোলকিপার মিলিয়েও ওই শট বাঁচাতে পারত না।” একেবারে হক কথা।

দশ দিনের বিশ্বকাপের সেরা গোল। খেলার পরেও নাগাড়ে কাঁদছিলেন ইরানি গোলকিপার হাঘিগি। কিন্তু টিমমেটদের তাঁকে বোঝানো উচিত— তুমি আর্জেন্তিনার কাছে অপরাজিত। তুমি হেরেছ মেসির কাছে।

মনে রেখো তোমায় হারাতে ওকে গাণ্ডীবটাই বার করতে হয়েছিল।

বেলো হরাইজন্তে, ২২ জুন