মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

রাশিয়া ২০১৮ – ৫

মেসিকে স্বদেশীয় মিডিয়ার নতুন একপ্রস্থ তোপবৃষ্টি

ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে নতুন একপ্রস্থ গোলবারুদ বৃষ্টি শুরু

হল। আর সেটা শুরু করে দিলেন তাঁর দেশেরই মিডিয়ার লোকেরা। যারা অদ্ভুতভাবে যেন ধরে নিয়েছেন আর্জেন্টিনা যদি গ্রুপ থেকে ওঠেও, কাপ তাদের ভাগ্যে নেই। আর সেই ব্যর্থতার আগাম ভিলেনকে তো তারা পরিষ্কার দেখতেই পাচ্ছে। দিয়েগো মারাদোনার চিহ্নিত ভিলেন হতে পারেন জর্জ সাম্পাওলি। আর্জেন্টিনীয় মিডিয়ার নন। মেসির জীবনে এই প্রথম বোধহয় তাঁর দেশজ মিডিয়া রোনাল্ডোর তুলনা এনে বলছে, ওকে দেখে মেসির শেখা উচিত কী ভাবে সবাইকে নিয়ে চলতে হয়।

মেসির বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রিন্ট, টিভি এবং ডিজিট্যাল মিডিয়া মোটামুটি সবার। কেউ কেউ অবশ্য আছেন যাঁরা আধুনিক সময়ের সুপারস্টারের জন্য পুরনো মাপকাঠি ব্যবহারের কারণ দেবেন না। এঁদের মতে মেসি ছাড়া যেখানে টিম অচল সেখানে তাঁকে তাঁর মতো করেই মেনে নিতে হবে। দিনের শেষে বিশ্বমঞ্চে তিনি একাই আর্জেন্টিনা টিম। কিন্তু এমন মতাবলম্বীরা আপাতত সংখ্যালঘিষ্ঠ। কথা বললাম বুয়েনস আইরেসের খ্যাতনামা মহিলা টিভি সাংবাদিক ভেরোনিকা মার্সেলা এবং দৈনিক স্পোর্টস কাগজের জোয়াকিম আজেরো-র সঙ্গে। যে আধ ডজন অভিযোগনামা বেরোচ্ছে তা এ রকম :

(১) দলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : আর্জেন্টিনা টিমে মেসির কথাই নাকি প্রথম ও শেষ। সাম্পাওলি তাঁর ভয়ে কেঁচো হয়ে থাকেন। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলেও পারেন না। আর্জেন্টিনা যে ভঙ্গিতে এবং যে গতিতে ফুটবল খেলছে সেটাও সাম্পাওলির স্ট্র্যাটেজি নয়। গত বিশ্বকাপে চিলির কোচ হিসাবে যে উদাত্ত উইং প্লে নির্ভর ফুটবল সাম্পাওলি খেলিয়েছিলেন, সেটা এখানে পারছেন না। উইং-য়ে না ছড়িয়ে গোটা খেলা তৈরি হচ্ছে মাঝখান দিয়ে। জটলা পাকিয়ে যাচ্ছে।

(২) দিবালাকে ঢুকতে না দেওয়া : এটা নিয়ে কালকেও আর্জেন্টিনীয় মিডিয়ায় লেখালিখি হয়েছে যে, পাওলো দিবালাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে এগারোয় রাখছেন না মেসি। এখুনি আর্জেন্টিনা টিমে কোনও উত্তরসূচির তিনি চান না। সবাই এতদিনে জেনে গিয়েছে দিবালাই পরের বিশ্বকাপে মেসির পজিশনে খেলবেন। আর্জেন্টিনা টিমে তাঁর জার্সি নম্বর নয়। জুভেন্তাসের হয়ে দশ। যেখানে কোচ তাঁকে ঠিক মেসির মতো করেই ব্যবহার করেন। আর দিবালা তার প্রতিদানও দিয়েছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা টিমে তাঁর প্রতিভার কোনও দাম দেওয়া হচ্ছে না।

(৩) সব কিছু নিজে করতে চাওয়া : মেসি নাকি ক্ষমতা ছাড়তে জানেন না। দায়িত্ব ভাগ করতে চান না। তিনি মনে করেন একাই আর্জেন্টিনাকে জেতাবেন। তাই পুরো লোডটা নিজের কাঁধে রাখেন। তারপর প্রোজেক্টটা অসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। বার্সার হয়ে সেটা করেন না। অধিকার বাঁটোয়ারা করে দেন। দেশের হয়ে খেলতে গেলেই তাঁর রূপ বদলে যায়। মেসি মনে রাখতে চান না তিনি যতই প্রতিভাধর হন না কেন, দিনের শেষে ফুটবল হল টিম গেম। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এটা বোঝেন। তাই টিম তৈরি করায় সমান নজর দেন। জানেন, বাকি দশজন তৈরি না থাকলে তাঁর যাবতীয় ট্যালেন্ট মাঠে মারা যাবে। মেসি ঠিক এই জায়গাতেই অবুঝ। পুরোটাই তিনি নিজে।

(৪) মারাদোনার সেই লিডারশিপ ক্ষমতার অভাব : ফুটবলার হিসাবে মেসি অনন্য। আর্জেন্টিনা মিডিয়া মনে করে না মারাদোনা না তিনি, কে সেরা এই প্রশ্নের সমাধান কোনওদিন সম্ভব বলে। কিন্তু লিডার হিসাবে মারাদোনা অনেক এগিয়ে। তিনি অনেক বেশি উদ্দীপ্ত করতে পারেন দলকে। ছেলেদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের চাগিয়ে দিতে পারেন। মেসির এই ২০১৮-র তুলনায় তাঁর ছিয়াশির দল অনেক ভাল ছিল। তবু আর্জেন্টিনা জিতত না যদি মাঠের বাইরে মারাদোনা টানা দলকে উদ্বুব্ধ না করে রাখতেন।

(৫) যোগাযোগ ক্ষমতার অভাব : দল তাঁর দিকে চেয়ে থাকে মেসি কখন কী সিদ্ধান্ত দেবেন? সেই সিদ্ধান্তর পেছনে যুক্তি আছে কী নেই, প্রশ্নটাও তাঁকে করা সম্ভব নয়। সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাঁদের মুড-মিটারকে ঠিকঠাক করায় তাঁর কোনও আগ্রহ নেই। তিনি মনে করেন টিম দাঁড়িয়ে আছে তাঁর উপর। তিনি ও বাকি দশজন। বড়জোর মাসচেরানো বা ডিমারিয়ার মতামত নেন। এই যে বেস ক্যাম্পেই সব প্র্যাকটিস হবে। ম্যাচের আগে রাতে অন্য টিমের সঙ্গে ভেনুতে গিয়ে করব না, এগুলো সব তিনি ঠিক করেন। টিমমেটরা কেবল জানতে পারে।

(৬) স্বদেশীয় মিডিয়া বর্জন : রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলতে টিম ঢুকেছে ন’দিন। এই ন’দিনে নয় সেকেন্ড সময়ও স্বদেশীয় কোনও সাংবাদিক তাঁর কাছে পায়নি। বিশ্বকাপে স্বদেশীয় মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলা বলতে, এখন পর্যন্ত মস্কো ম্যাচের পর মিক্সড জোনে তাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। আর্জেন্টিনা মিডিয়ার অভিযোগ হল তোমার আমাদের পছন্দ হয় কি না, তাতে কিছু আসে না। তুমি ক্যাপ্টেন, দেশের লোক, তোমার কথা শুনতে চায়। সেই পরিবাহী সিস্টেম হলাম আমরা। আমাদের কী করে অগ্রাহ্য করতে পারো? মারাদোনার সঙ্গে আর্জেন্টিনীয় মিডিয়ার কারও কারও এত খারাপ সম্পর্ক ছিল যে, এয়ারগান দিয়ে তাঁদের মারতে গিয়েছিলেন। কখনও অশ্রাব্য গালাগালও করেছেন তাঁদের। কিন্তু ছিয়াশি আর নব্বইতে বিশ্বকাপ ক্যাপ্টেন্সি করার সময় নিয়মিত কথা বলতেন মিডিয়ার সঙ্গে। রোনাল্ডো আলাদা করে সময় রাখেন পর্তুগিজ সাংবাদিকদের জন্য। কিন্তু মেসি না আসছেন প্রেস কনফারেন্সে। না কথা বলবেন আলাদা করে। এতে টিম নিয়ে দেশবাসীর দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে কারণ তারা খোদ ক্যাপ্টেনের মুখ থেকে কিছু জানতে পারে না।

নিঝনি নভগরদ, ২১ জুন

মেসি দেখতে নিঝনি মাঠে সপুত্র প্রসেনজিৎ

বাবা-ছেলে দু’জনেই আর্জেন্টিনা জার্সিতে। একজনের গায়ে জাস্ট জার্সি আর একজনের গায়ে দশ নম্বর। পিছনে লেখা মেসি। ঘুরতে বেরিয়েছিলেন

ক্রেমলিন টু-র আশপাশটা। ঠিক উল্টোদিক থেকে আসছিল এক ক্রোয়েশিয়ান সাপোর্টার। অজানা কিন্তু স্লেজিংয়ের জন্য আবার পরিচয় লাগে না কি?

শুদ্ধ ইংরেজিতে এক গজ দূর থেকে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে বলল, ”বেস্ট অব লাক ফর দ্য নেক্সট ম্যাচ।” প্রসেনজিৎ হাসলেন, ”মিশুক শুনলি কী বলে গেল?”

মিশুক মানে তাঁর ছেলে তৃষাণজিৎ এতটুকু বিচলিত নয়। সে ডাই হার্ড আর্জেন্টাইন ফ্যান। তার চেয়েও বেশি মেসি-ভক্ত। এই সব ছোটখাটো ট্যাকল অনেক দেখেছে। বলল, ”মেসি আজ ফাটিয়ে দেবে।” বেচারা তখন কী করে জানবে আজ অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স হতে যাচ্ছে?

কেবিসি হোস্ট করবেন জুলাই থেকে। রয়েছে একগাদা ছবির কাজ। স্ক্রিপ্ট শোনা। কিন্তু সে সব কিছুদিনের জন্য দূরে সরিয়ে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রি থেকে যেন দিনসাতেকের আর্নড লিভ নিয়ে প্রসেনজিৎ চলে এসেছেন বিশ্বকাপ দেখতে। মুখ্যত প্রচণ্ড ফুটবল ভক্ত তাঁর ছেলের টানে। সফরসূচি বানানো নিজের হাতে থাকলে ঠিক এই সময়টা নির্বাচন না করে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিশ্বকাপের শেষ দিকটাও আসতে পারতেন। কিন্তু তৃষাণজিৎ হল নিখাদ আর্জেন্টাইন এবং তারও আগে মেসি ভক্ত। নিজে স্কুলে ফুটবল খেলে। সারাক্ষণ বিদেশি ফুটবল দেখে এবং তার মনে হয়েছে নকআউট পর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই। এখন রাশিয়া গেলে মেসি তো গ্যারাণ্টেড। এগারোটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট খাওয়া শেষ করে অর্থাৎ সে উত্তেজিত—কখন মাঠে ঢুকবে?

টালিগঞ্জের অবিসবাদী সুপারস্টার বহুদিন বাদে এমন সাধারণ পর্যটকের মতো যেখানে সেখানে ঘুরছেন। সঙ্গে না আছে দেহরক্ষী না ব্যক্তিগত সচিব। কালীঘাটের এক তরুণের মতো এক-আধজন বাঙালি দৌড়ে বুম্বাদা, বুম্বাদা করে চলে আসছে। কিন্তু বেশির ভাগ সময় তিনি এই অপরিচিত জোনে থাকাটা দারুণ উপভোগ করছেন।

ক্রেমলিনের সামনে ভরদুপুরে কিছু ছেলে আর্জেন্টিনীয় জার্সিতে ফুটবল পিটতে শুরু করেছে। তৃষাণজিৎ গিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। বাবা দ্রুত লাইভ ফেসবুক ভিডিও তুলতে শুরু করলেন। ডানদিকে ম্যাক্সিম গোর্কির বিখ্যাত মূর্তি। দৌড়ে ছবি তুলতে চলে গেলেন সেখানে। মেট্রো করে আম ফুটবল সমর্থকের সঙ্গে এসেছেন। আর এই এক্সপিরিয়েন্সটাও যেন দারুণ এনজয় করছেন। সামনের রাস্তায় কবির লড়াইয়ের মতো করে খেউড় চলেছে দু’দেশের সমর্থকের। ওলে ওলে করে তারা প্রচণ্ড নাচছে। গাইছে। সাপোর্টাররা হাততালি দিচ্ছে। পালা করে একবার আর্জেন্টিনা। একবার ক্রোয়েশিয়া। প্রায় সাতশো-আটশো মানুষের ভিড় সেখানে।

প্রসেনজিৎ দ্রুতই চললেন সেটা ভিডিও করতে। বিশ্বকাপ ফুটবলে এর আগে আসেননি। এইরকম স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের ঢল আর রূপ রং লাস্য দেখে তাঁর মনে হচ্ছে, এ তো জীবন আর সেলুলয়েড প্রায় এক হয়ে যাওয়া। স্বগতোক্তির মতো বললেন, ”এত ক্রোয়েশিয়ান সাপোর্টার এসেছে। ভাবা যায় না।” কলকাতা থেকে আসা তাঁর কি মনে হচ্ছে প্রায় অবাস্তব কিছু দেখছি? এত মানুষ ম্যাচের সাত-আট ঘণ্টা আগে স্টেডিয়াম থেকে এতদূরে এমন প্রাণঢালা আবেগ দেখাচ্ছে নিজের দেশের জন্য?

প্রসেনজিৎ বললেন, ”সত্যি তাই। তবে কানস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে গিয়েও আমি দেখেছি গোটা রাস্তা জুড়ে এরকমই নানা কিছু হতে থাকে। ফেস্টিভ্যালের মজাটাই তাই যে বিভিন্ন জায়গায় অবিরত কিছু না কিছু হয়েই চলেছে।” রাতের ম্যাচ দেখে শুক্রবার সকালে প্রসেনজিৎ উড়ে যাবেন সেন্ট পিটার্সবার্গ। সেখানে হোটেল পৌঁছে দ্রুত মাঠে। মেসি দেখে উঠেই ওখানে নেইমার। সেন্ট পিটার্সবাগ যাওয়ার ইচ্ছা তাঁর বহুদিনের। সেখানে ব্রাজিলকে দেখা উপরি পাওনা। শুনেছেন সম্প্রতি অমিতাভ বচ্চনের ব্লগের কথা যে, আমি গ্লাসগোতে শুটিং করব আর আমার অন্যতম প্রিয় শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে হোয়াইট সামারের সময় বিশ্বকাপ হবে। এটা ঘোরতর অন্যায়।

সেন্ট পিটার্সবার্গ শেষ করে আবার বাবা-ছেলে মেসি সফরে। এ বারের গন্তব্য মস্কো। মোট চার মাসের বিশ্বকাপ দর্শন। দুটো মেসি। দুটো ব্রাজিল।

জিজ্ঞেস করা হল না সফরসূচি কে বানিয়েছে? বাবা কি ব্রাজিলের কোনও কালে সমর্থক ছিলেন যে দুটো ম্যাচ ব্রাজিল রাখা? ছেলের অবশ্য ব্রাজিলে অরুচি নেই। বলল, ”গ্যাব্রিয়েল জেসুস নেক্সট সুপারস্টার অব ফুটবল হয়ে যেতে পারে।” গড়গড় করে আরও কিছু নাম বলল। প্রসেনজিৎ ঘাড় নাড়ছেন, ”একেবারে ইন্টারন্যাশনাল ফুটবলের পোকা।” দু’জনে এবার এগিয়ে গেলেন ফিফা ফ্যানশপের দিকে। বাইরে প্রচুর লাইন। কিছু সেই লাইনে দাঁড়াতে কোনও আপত্তি নেই। এখানে তিনি টলিউডের বুম্বাদা নন। জনৈক ফুটবল ফ্যান।

মস্কো থেকে মা অর্পিতার সঙ্গে ছেলে ফিরে যাবে দেশে। তিনি উড়বেন নিউইয়র্কের বিমানে। আটলান্টিক সিটির বঙ্গ সম্মেলনে এবার তাঁর রেট্রোস্পেকটিভ। আজ পর্যন্ত কারও জন্য যা হয়নি। তখন আবার ফিরে যাবেন টালিগঞ্জের বুম্বাদা-তে।

আপাতত তাঁর ফ্যান কেউ নন। তিনি নিজে যে মেসি-নেইমারদের ফ্যানের চরিত্র করছেন।

নিঝনি নভগরদ, ২২ জুন

মেসির দর্পচূর্ণ

সাংবাদিক সম্মেলনে ঢুকে মনে হল কারও শেষকৃত্যে এসেছি। আর্জেন্টাইন সাংবাদিকেরা গালে হাত দিয়ে বসা। এক সিনিয়র আর জুনিয়র

সাংবাদিকের মধ্যে তর্ক উঠল। সিনিয়র সাংবাদিকটি ধমকালেন আর কোনওদিন যেন দিয়েগো ভার্সাস মেসি নিয়ে তর্কটা ওদের মুখে না শুনি। কমবয়সি রিপোর্টার অনেকেই। অন্যদিন হলে গর্জে ওঠার কথা। কিন্তু আজ সবাই স্তব্ধ। ভাবছে কথাটা বোধহয় ঠিক।

আর্জেন্টাইন ভক্তরা একুশে জুন দিনটা যে লিওনেল মেসির জন্য পয়া যাবে, একরকম নিশ্চিত ছিলেন। চার বছর আগে বিশ্বকাপে একইদিনে ইরানের সঙ্গে তাঁর জয়সূচক গোল আছে। আর দু’বছর আগে আমেরিকার সঙ্গে ফ্রিকিকে গোল করে আর্জেন্টিনার হায়েস্ট স্কোরার হয়েছিলেন। কে জানত, সেই একুশে জুনই তাঁর জন্য কালাদিবস হয়ে দাঁড়াবে? বিশ্বকাপ জীবনের সম্ভবত তাঁর কুৎসিততম ম্যাচ খেলে তিন এখন বাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায়। সাম্পাওলির মতো তাঁরও না বুয়েনস আইরেসে ফেরাটা সমস্যা হয়। দাঁড় করিয়ে তিন গোল দিয়ে গেল তাঁকে ক্রোয়েশিয়া। একটা ফ্রিকিক ক্রসপিসে লাগা ধরলে ওটা চার হয়। আর্জেন্টিনীয়দের বিশ্বকাপে বোধহয় শতাব্দীর লজ্জা। বিশ্বকাপ জিততে এসেছিলেন মেসি। যা দাঁড়াল, গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় হওয়াও ভয়ঙ্কর কঠিন।

খেলা শেষ হতে ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখলাম। জর্জ সাম্পাওলি কারও সঙ্গে হাত না মিলিয়ে, প্লেয়ারদের বা বিপক্ষ কোচের সঙ্গে করমর্দন না করে গটমটিয়ে চলে গেলেন চেঞ্জিং রুমে। অনেক বারুদ এখন আর্জেন্টাইন শিবিরে অপেক্ষা করে থাকবে। ক্রোটরা ততক্ষণে অভিনন্দন কুড়োচ্ছেন। পঁয়ত্রিশ ভাগ সাপোর্টার ছিল তাঁদের। যারা দেখল, দ্রুতগামী মিডফিল্ড থাকলে ডেভিডও গোলিয়াথ বধ করতে পারে। এই ক্রোয়েশিয়া যদি শেষ চারে পৌঁছেয়, বিস্ময়ের কিছু নেই। আর্জেন্টিনার জন্য আক্ষেপ নয়, গ্রুপ লিগে তারা বিদায় নিলেই সমর্থকদের খুশি হওয়া উচিত। ক্রোয়েশিয়া যদি তিনটে দেয়, স্পেন-ব্রাজিল সামনে পড়লে কী হবে?

একটা বিশ্বকাপ রানার আপ যাদের সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাওয়ার কথা। তাদের চার বছরে কতটা অবনমন হতে পারে এ দিন আর্জেন্টিনা দেখাল। বিশ্বকাপ থেকে একরকম ছিটকেই গেল দ্বিতীয়ার্ধে প্রথম তিরিশ মিনিটে দু’টো গোল খেয়ে। লিওনেল মেসি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। মাঠে ০-২ অবধি ভূমিকা দর্শকের। বরং পাওলো দিবালা নামার পর কিছু গতি এল। মেসি দেশের হয়ে সত্যি বড় স্নায়ুচাপে ভোগেন। ফুটবলার হিসেবে তিনি না দিয়েগো কে আগে, তর্ক থাকবে। আর্জেন্টিনার জন্য কে আগে, বোধহয় থাকবে না।

দু’টো টিম আজ প্রথম মিনিট থেকে এত নার্ভের চাপে ভুগেছে কেন? এত মিস পাস। এত ভুল রিসিভিং। এত অদক্ষ বল কন্ট্রোল। এত গা-জোয়ারি। বিশ্বকাপ ফাইনাল বা সেমিফাইনাল হলে নার্ভের চাপ বোঝা যায়। এ তো গ্রুপ লিগ। নকআউট নয়। গ্রুপ লিগ ম্যাচ যেখানে আবার লিও মেসি জড়িয়ে। সেটাকে কেন ইংল্যান্ডের ফোর্থ ডিভিশনের মতো দেখাবে?

জুতসই একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল, দু’পক্ষই সিটিয়ে আছে। গ্রুপ থেকে সেকেন্ড হওয়া চলবে না। তা হলে শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের মুখে পড়তে হবে। দু’টো টিমই জানে তাদের যা হাল, এম্ব্যাপেদের বিপক্ষে পড়লে কী হতে পারে?

যে কোনও ফুটবল ম্যাচে সবচেয়ে বেশি দৌড়োয় মিডফিল্ডাররা। হিসেবমতো সেটা কমপক্ষে চোদ্দো-ষোলো কিলোমিটার। তা ফার্স্ট হাফে আর্জেন্টিনা বা ক্রোয়েশিয়া কোনও টিমের মিডফিল্ডার নন। যাঁকে সবচেয়ে বেশি ছুটতে দেখলাম, তিনি সাম্পাওলি। সাইডলাইন দিয়ে এর অর্ধেক ছোটা, চিৎকার, চেঁচামেচি আর লাইন্সম্যানের দিকে তেড়ে যাওয়ার জন্য কলকাতার নেহরু কাপে কার্লোস বিলার্দোকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন রেফারি। এক এক সময় ভাবছিলাম, সাম্পাওলি যেমন উত্তেজিত ভাবে তেড়ে যাচ্ছেন তাঁর না বিলার্দোর দশা হয়।

সকাল থেকে নিঝনি নভগরদের রিংটোন যেন প্রতিরক্ষা। শহরের জায়গায় জায়গায় সিকিওরিটি জোন তৈরি করে এয়ারপোর্টের মতো চেকিং। ক্রেমলিনের সামনে চেকিং। মেট্রোর বাইরে চেকিং। ফ্যান জোনে ঢোকার মুখে চেকিং। আগের একটা ম্যাচেও রাশিয়ার জায়গায় জায়গায় এমন মোবাইল সিকিওরিটি ব্যবস্থা হতে দেখিনি। আর্জেন্টিনা ম্যাচ হলে এটা বেশি করে হচ্ছে। মেসিদের বেস ক্যাম্পে পরশু দিন ঢুকতে গিয়ে তো চশমা আর মোবাইল গচ্ছিত রেখে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে হেঁটে যেতে হল। চশমা খুলতে তথাকথিত উগ্রতম আমেরিকান সিকিওরিটিও বলে না। সমস্যা হল, যাদের ঘিরে কিনা এত প্রতিরক্ষা, তাদেরই সেটা সবচেয়ে খামতি। স্বয়ং আর্জেন্টিনা ডিফেন্স ভাবুন।

মাসচেরানো বাদ দিয়ে একটা দশ গজের ক্রসও কেউ ঠিকঠাক করতে পারছে না। নিকোলাস ওটামেন্ডির এত নাম ক্লাব সার্কিটে। ম্যাঞ্চেস্টার সিটির ডাকাডুকো ডিফেন্ডার। কিন্তু দেশের হয়ে ক্রোয়েশিয়া অ্যাটাক সামলাতে এমন হিমসিম যে লাথি মেরে হলুদ কার্ড খেলেন।

যেমন খোলতাই ডিফেন্স, তেমন তার সঙ্গে সঙ্গত করার মতো গোলকিপার। কাবায়েরো হলেন টিমের থার্ড গোলকিপার। যে বলটায় তিনি ডিফেন্ডারদের ব্যাকপাসে ভলি মারতে গিয়ে ক্রোট স্ট্রাইকারের পায়ে দিয়ে দিলেন তা ক্ষমাহীন বললে ক্ষমাহীন-কে সম্মান জানানো হয়। কমন সেন্স বলে, বিশ্বকাপ রানার আপ টিমের বিরুদ্ধে গোল করলে এ বার বাকি সময় ছোটটিম নেমে আসবে। অথচ ক্রোয়েশিয়া তখন ক্রমাগত অ্যাটাক করে যাচ্ছে। পুরো ম্যাচে আর্জেন্টাইন ডিফেন্সকে দেখলে বোঝা যাচ্ছিল, কেন গত মার্চে স্পেনের কাছে ছয় গোল খেয়েছে? আজও মাসচেরানো না থাকলে চার গোল হয়।

গোটা ম্যাচ জুড়ে চোরাগোপ্তা এবং প্রকাশ্য—মারধর এত চলল যে রাগবি না ফুটবল বোঝার উপায় নেই। ফুটবলে যত প্লেয়ারদের ফিটনেস বাড়ছে, স্পিড বাড়ছে, তত জমি কমছে মাঠে। আর সংঘর্ষ বাড়ছে। টেনিসের যেমন সার্ভ অ্যান্ড ভলি সর্বস্বতা নিয়ে সঙ্কট হয়েছিল, ফুটবলেরও এ বার রাশিয়ায় সেই অবস্থা। হলুদ কার্ড আজকাল আর কেউ ভয় পায় না। যতক্ষণ না লাল কার্ড বেরোচ্ছে, মেসির দর্পচূর্ণ দেখতেও কেউ আনন্দ পাবে না।

নিঝনি নভগরদ, ২২ জুন

রুশ দেশে বাঙালি ফুটবল পর্যটকের চটি গাইড

রাশিয়ায় দু’সপ্তাহ কাটিয়ে যা অভিজ্ঞতা হল তার ভিত্তিতে ছোট গাইড তৈরি করলাম। কলকাতা এবং বৃহত্তর বাংলা থেকে যে শতখানেক

ফুটবল পর্যটক আগামী ক’সপ্তাহে বিশ্বকাপ দেখতে আসছেন, তাঁদের হয়তো কাজে আসতে পারে। একেবারে মাঠঘাট ঘুরে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তুলে আনা যে…

মোটা জ্যাকেট অতি অবশ্য

এতকাল বইয়ে পড়েছেন ইংল্যান্ডের আবহাওয়া নাকি খেয়ালি। রাশিয়ায় এসে মনে হল ইংরেজরা দেশ শাসন করত বলে খালি নিজেদের কথাই বলে গিয়েছে। রাশিয়া ইংলিশ ওয়েদাদের চেয়ে অনেক খামখেয়ালি। এই গরম তো এই বৃষ্টি। এই ঘাম হচ্ছে তো পরমুহূর্তে ঠান্ডা হাওয়া। মেসির দেশে জাবালেতার পর ভাল ডিফেন্ডার নেই, তাই আনতে পারেনি। কিন্তু আপনার রাশিয়ায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিক করতে তো কেউ আটকাচ্ছে না। এই যে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় কলকাতায় সুটকেসে জ্যাকেটগুলো ঢুকিয়েও আনেননি। গুগলে দেখেছিলেন নিঝনি ওয়েদার ভাল যাবে। দুপুরে হাওয়া দিতে শুরু করা মাত্র ছেলেকে নিয়ে দোকানে ছুটলেন জ্যাকেট কিনতে। জ্যাকেট সঙ্গে আনাই শুধু নয়। সবসময় ব্যাগে রাখতে হবে। মাঙ্কি ম্যাপ আনলে ভাল। এমনি সময় হয়তো লাগবে না কিন্তু একবার যখন হাওয়া দিতে শুরু করে কান, ঢাকা না থাকলে পেটরোগা বাঙালির মনে হবে রোনাল্ডোর ফ্রিকিক উড়ে আসছে আপনার দিকে। চামড়ার ফর্মাল জুতো আনার কোনও মানেই হয় না। যদি না ফিফার কোনও ডিনাটিনারে আপনার ইনভাইট থাকে। বরঞ্চ একজোড়া স্নিকার্স আনুন। মনে রাখবেন সেটা যেন ওয়াটারপ্রুফ হয়। কারণ এদেশে দেখছি একটু জল জমে যায়। সেই জল সামলাতে হলে জুতোর স্পেশ্যাল কেয়ার অতি অবশ্য। বলতে ভুলে গেলাম, সঙ্গে থাক ছোট স্টাইলিশ ছাতা। মেসি টুর্নামেন্টে থাকবেন কি না কেউ জানে না। কিন্তু ছাতা রাশিয়ার গরম-বৃষ্টি দু’টোতেই আপনার জন্য থাকল।

ফ্যান আইডি সব সময় গলায়

রাশিয়ার মতো চিররক্ষণশীল দেশে গেলে একসময় বলা হত, পাসপোর্ট যেন সবসময় সঙ্গে থাকে। একটু এদিক-ওদিক হলেই পুলিশ ধরবে। এত এদের নজরদারি। বিশ্বকাপের আমলে পাসপোর্ট ডিলিট হয়ে সেখানে বসেছে ফ্যান আইডি। আপনি হয়তো মাঠে যাচ্ছেন না তখনও ফ্যান আইডি গলায় মানে বকলমে আপনি রুশ সরকারের সন্মানিত ফুটবল অতিথি। ফিফা হল আপনার স্পনসর। জামাইষষ্ঠীর বাজারে ওই ফ্যান কার্ডটা জামাইআদর দেবে। মেট্রোয় ভাড়া লাগবে না। মিষ্টি রাশিয়ান ভলন্টিয়াররা তাকিয়ে হাসবে। একটু গল্পগাছা হলে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও যেতে বা আসতে পারে।

রাশিয়ার মেট্রো ম্যাপ ডাউনলোড থাকা

মেট্রো হল রাশিয়ার সবচেয়ে সক্রিয় পরিবহণ ব্যবস্থা। দ্রুত স্টেডিয়াম পৌঁছনোর তাড়া থাকলে মেট্রো সুয়ারেজের গতিতে স্টেডিয়াম নামক পেনিট্রেটিভ জোনে পৌঁছে দেবে। মস্কো মেট্রোয় কোনও কোনও কাউন্টার থাকছে ‘আই ক্যান স্পিক ইংলিশ’। কিন্তু সেটা সেই শহরে ম্যাচের দিনগুলোয়। বাকি নন ম্যাচ ডে-তেও আপনাকে শহরে ঘুরতে হবে। তার জন্য মেট্রো ম্যাপ নিজের মোবাইলে ডাউনলোড থাকলে অনেক সুবিধে। ভিআইপিএদেরও দেখছি মেট্রো করে ঘুরতে। কারণ রাশিয়ার জ্যাম আবার ঢাকার জ্যামের মতোই জগৎদ্বিখ্যাত।

লম্বা হাঁটার যেন অভ্যেস থাকে

ব্রাজিলীয় ডিফেন্স প্রথম ম্যাচেই পরীক্ষিত হল। পরে কী হবে কেউ জানে না। কিন্তু আপনাকে জেনে আসতে হবে যে আমার হাঁটার পরীক্ষা কিন্তু রুশিদের বিশ্বকাপ নেবে। স্টেডিয়াম যেতে হলে কমপক্ষে দেড় থেকে দু’কিলোমিটার হাঁটার জন্য তৈরি থাকুন। ট্যাক্সিও আপনাকে এ দেশে এ বার বাঁচাতে পারবে না। নিরাপত্তার জন্য অনেক আগে গাড়ি ব্লক করে দেওয়া। হাঁটতে হবেই। একমাত্র সামান্য নিষ্কৃতি মিলবে যদি ফিফা প্রেসিডেন্ট বা আমাদের প্রফুল্ল প্যাটেলের দূর সম্পর্কের আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধব হন। তাতে বিশেষ কার পার্ক মিলতে পারে। কিন্তু সেখানেও মিনিমাম হাঁটতে হবে। রুশিরা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে এটা ক্রিকেট নয়। এটা ফিট লোকেদের খেলা। ফুটবলার এবং দর্শক দু’জনের জন্যই খেলার এক নিয়ম। রাশিয়া রওনা হওয়ার আগে ট্রেডমিলে অন্ততকুড়ি মিনিট করে দিন। যদি মনে হয় পা চলছে না। হাঁটুতে খুব ব্যথা, তা হলে দ্রুত টিকিটটা ক্যান্সেল করুন। আপনার জন্য কলকাতার টিভিই সেরা জায়গা।

পেজার যেন ডাউনলোড করা থাকে

রুশ দেশে ওলা চলে কি না জানি না। সবাই দেখছি পেজার ব্যবহার করে। আর রাস্তায় ট্যাক্সি ঘুরছে, আপনি ডাকছেন, এই যে ট্যাক্সি, ও সব ভুলে যান। জানি না লেনিনের আমলে হত কি না? পুতিনের সময় পেজার আর সেটা ট্যাক্সির চেয়ে সস্তাও। ওয়াইফাই মোটামুটি সর্বত্র ভাল কাজ করে। কাজেই পেজারে ড্রাইভার পেতে সমস্যা নেই। শুধু লোকেশনগুলো ঠিকঠাক বুঝে নিতে হবে। কারণ একটু এদিক-ওদিক হলেই পুলিশ গাড়ি হঠিয়ে দেবে। আর হ্যাঁ, দেশ থেকে আসার সময় অবশ্যই টু পিন অ্যাডাপ্টর নিয়ে আসবেন মোবাইল চার্জ দিতে।

মোবাইলে গুগল ট্রান্সলেটর অ্যাপ থাকা টপ প্রায়োরিটি

রাশিয়ায় অ্যাডজাস্ট করার সবচেয়ে বড় সমস্যা ঠান্ডা, না ভাষা? ঠিক করতে হলে ভিডিও অ্যাসিসট্যান্ট রেফারির সাহায্য লাগবে। কখনও মনে হবে এই রাক্ষুসে হাওয়া। কখনও মনে হবে ভাষা সমস্যা। দশজনের ন’জন ইংরেজি বোঝে না এটা গুরুতর সমস্যা। মানুষজন এমনিতে খুব উষ্ণ। ইন্ডিয়া সবাই জানে এবং ভালবাসে। এমনিতেও ‘মোবাইলে আমার ছবিটা একটু তুলে দেবেন’ ক্যামেরা এগিয়ে দিলে সবাই বুঝবে। কিন্তু অমুক জায়গাটা কোথায়? জিজ্ঞেস করলে, মুখ ঘুরিয়ে দৌড়। রাস্তার বোর্ডগুলো রাশিয়ানে লেখা। সবচেয়ে অসুবিধে মেনুকার্ড বোঝা। সেগুলো যে রাশিয়ানে। মাংস বলতে এদেশের লোক প্রধানত বোঝে গরু। যদি সেটা খাওয়ার আসক্তি না থাকে তা হলে চিকেনকে রাশিয়ানে কী বলে, গুগল ট্রান্সলেটর থেকে দেখে নিতে হবে। এখানে পৌঁছেও মনের ভাব প্রকাশের জন্য গুগল ট্রান্সলেটর নিয়মিত লাগবে। মনে রাখতে হবে এটাই আপনার সেট পিস মুভমেন্টের প্রিপারেশন। নিখুঁত করতেই হবে কঠিন ম্যাচে। নইলে বাঁচা যাবে না।

সঙ্গে কিছু খাবার রেখে দেওয়া

দেশ থেকে মুড়ি, চানাচুর, প্যাঁড়া জাতীয় অল্প খাবার অনেকে নিয়ে এসেছেন এবং রাশিয়ান কাস্টমস এপর্যন্ত আপত্তি করেনি। এগুলো হাতে থাকা ভাল। কারণ অনেক হোটেল বা পাড়ার দোকান সন্ধ্যেতে তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। বা যে দু’একটা খোলা থাকে মনমতো দূরে থাক, চেনা-জানা কোনও খাবার পাওয়া যায় না। পিৎজা যেমন অনেক জায়গাতেই ভেজিটেরিয়ান পিৎজা। দুর্যোগে চিড়েভাজা কিন্তু রাশিয়ায় বসে মন্দ না।

সঙ্গে ‘জিমি’র ছবি

আধুনিক রাশিয়া বলিউডকে আগের মতো মনে রাখেনি। সোচি-তে এক যুবক বলছিলেন, শেষ হিন্দি সিনেমা দেখেছিলেন ‘দেবদাস’। খুব কেঁদেছেন। কিন্তু শাহরুখের ছবি দেখাতে চিনতে পারলেন না। ঐশ্বর্য রাইকে বরং মনে আছে। পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা বড় অংশ এখনও হিন্দি ছবি দেখে। যেমন ইউক্রেন, কাজাখাস্তান-এর। কিন্তু রাশিয়া বলতে এখন যা বোঝায় তার কারেন্ট জেনারেশন হিন্দি সাবটাইটেলড সিনেমা থেকে সরে এখন আমেরিকান ক্ল্যাসিকস বা ওয়েব সিরিজ দেখে। ইন্টারনেটের যুগে আমেরিকান ছবি খুলে গিয়েছে। খামোকা বলিউড দেখবে কেন? সেই সময় দেখত কারণ সরকারি স্পনসরশিপে আমেরিকান সিনেমা এখানে পৌঁছত না। কিন্তু পুরনো জেনারেশন এখনও বলিউড বলতে বাড়তি তৃপ্তি পায়। আর সেই স্মৃতির সম্রাট অমিতাভ বচ্চন বা রাজেশ খান্না নন। আজও বাঙালিবাবু মিঠুন চক্রবর্তী। ট্রান্সপোর্ট ডেস্ক হল ফ্যান বা মিডিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। দূর দেশে তো ট্রান্সপোর্টটা বিরাট প্রবলেম। সেখানে বছর আঠাশ-তিরিশের একগাদা ছেলে-মেয়ে কাজ করে। জিজ্ঞেস করলেই জানবেন, এরা বলিউড বলতে বোঝে ডিস্কো ডান্সার-এর জিমি। মানে মিঠুন। মিঠুনের রাজ্য থেকে এসেছেন বললে এদের চোখ চকচক করবে। আর জিমির সঙ্গে যদি নিজের ছবি দেখাতে পারেন, এরা এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে লম্বা হেঁটে আপনাকে গাড়িতে তুলে দিতেও রাজি থাকবে। প্রমাণ পেয়েছি বলেই লিখলাম। ফুটবলপ্রেমী মিঠুন ফ্রান্সে বিশ্বকাপ দেখতে গিয়েছিলেন। আপাতত অভিমানে নিজেকে মুম্বইয়ে ঘরবন্দি রেখেছেন। এখানে এলে বুঝতেন, আজ বিশ্বকাপ ফুটবলারদের মতোই রাশিয়া তাঁকে মাথায় তুলে রাখত।

ম্যাপ সঙ্গে রাখা

পশ্চিমি দেশগুলোর মতোই এরা ম্যাপ দেখে কাজ করায় খুব বিশ্বাসী। কোথাও হয়তো ভাষা বুঝবে না। ওয়াইফাই এসে কেটে যাচ্ছে বলে গুগল ট্রান্সলেটর কাজ করছে না। তখন ম্যাপ অব্যর্থ। গভীর রাতেও গোললাইন সেভ করে দেবে। এরা তখন পেন দিয়ে আপনাকে ম্যাপের পয়েন্টগুলো বুঝিয়ে দেবে।

ট্যাক্সিতে ড্রাইভারের পাশে বসুন, পিছনে নয়

রাশিয়ায় অনেক ড্রাইভার আছে, যারা সাবেকি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে এসেছে। এমনকী মস্কোর রাস্তাও ঠিকঠাক চেনে না। এদের যদি বলতে যান আর কত দূর বাকি, তখন গুগল ট্রান্সলেটরে অনুবাদ করে দেখাতে হবে। সেটা এদের পিছনে বসে ঘাড় কাত করে দেখে একহাতে স্টিয়ারিং চালানোটা রাশিয়ান সার্কাসে ট্র্যাপিজের খেলা দেখার মতো। এমনিতেই এরা উদ্দাম গাড়ি চালায়। তার মধ্যে পিছন ফিরে ক্রমাগত মোবাইল দেখলে আপনার মনে হতে পারে নিউ রাশিয়ান সার্কাসের আপনিও অঙ্গ! এ বার ভেবে নিন আপনি সার্কাসে নামতে চান কি না?

মস্কো, ২৩ জুন

মারাকানার জার্মান ভাগ্য কি এবার মেসির দিকে ঘুরছে

প্রথমে ছিল একান্ত জার্মান ফুটবলের। তারপর সেটা বদলে গিয়ে বিশ্বফুটবলের প্রাচীন অরণ্যপ্রবাদ হয়ে দাঁড়ায় যে, জার্মান রক্ত যদি মাঠে পড়ে।

জার্মানিকে হারানো যাবে না। সেই সত্তরের দশকে বেকেনবাউয়ার। সেই আশির দশকে বেকেনবাউয়ার। সেই আশির দশকে ক্লিন্সম্যান। আর টাটকা মারাকানা বিশ্বকাপ ফাইনালে সোয়াইনস্টাইগার।

জার্মান রক্ত যত মাঠে ঝরেছে, জার্মানরা তত অপরাজেয় হয়ে গিয়েছে, জার্মানিরা এমন অভূতপূর্ব ফুটবল ঐতিহ্যে ভাগ বসাল আর্জেন্টিনা। আধুনিক অরণ্যপ্রবাদ হয়তো দাঁড়াল, জেভিয়ার মাসচেরানোর মতো মহাতারকার রক্ত যদি মাঠে ঝরে তা হলে আর্জেন্টিনাকে সে দিন হারানো যাবে না।

স্থানীয়রা বলেন সেন্ট পিটার্সবার্গ হল রাশিয়ার সবচেয়ে দর্শনীয় শহর। সেন্ট পিটার্সবার্গে না এলে রাশিয়া-দর্শনই অসম্পূর্ণ থাকে। মঙ্গলবার মাঝরাত্তিরে অবিরত রক্ত ঝরানো বাঁদিকের গালকে উপেক্ষা করা মাসচেরানো যখন জীবনের ম্যাচ খেলছিলেন, তাঁকে কোথাও মনে হচ্ছিল অ্যান্টিগা মাঠের সেই চোয়াল ভেঙে যাওয়া অনিল কুম্বলে। স্রেফ দেশকে জেতানোর জন্য নিজ স্বাস্থ্যের চরম বিপন্নতাকে বলি দিতে রাজি আছেন।

মাসচেরানো যদি পুরনো ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটা কুম্বলে হন এ দিনের মেসি কি তা হলে ওয়াংখেড়ে ফাইনালের শচীন? ওয়াংখেড়ে জিতে উঠে বিরাট কোহলি বলেছিলেন, ”ওঁকে কাঁধে তুলেছিলাম কারণ এতদিন উনি দেশকে কাঁধে তুলে বয়েছেন।” লিওমেল মেসিকেও যেন ম্যাচের শেষ দিকটা বইলেন তাঁর সতীর্থরা। বিশেষ করে মার্কাস রোখো-র ওই গোলটা। এত নিখুঁত ভলি কানেক্ট করা আর্জেন্টিনীয় জাতীয় দলে গত দশ বছরে মেসি ছাড়া কেউ করেননি। গোল শোধ হয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের শেষ দিকটা মেসি মরিয়া হয়ে গোলের রাস্তা খুঁজছিলেন। পাচ্ছিলেন না। বিশ্বকাপ বিদায়ী দেশ হিসাবে মোটামুটি নামই লেখা হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে রোখোর ওই গোল তাঁকে বিলেটেড বার্থডে গিফট বললে খুব কম বলা হয়। ওই শটটায় একটা নীরব টেক্সট মেসেজ ছিল, এতদিন তুমি একা সংসার টেনেছ। আজ চরম প্রয়োজনের সময় তোমার ছোট ভাইদেরও কিছু কন্ট্রিবিউশন থাকল।

রুশ দেশটা অদ্ভুত দেশ। চমকপ্রদ কিন্তু রহস্যময়। এটা কোনওমতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়। মার্কিনীদের সব কিছু ‘অন ইওর ফেস’। ম্যানহ্যাটন আপনাকে যে ভাবে দেখবে সেটাই আপনাকে তার খতিয়ে দেখার মানদণ্ড। ভাল লাগলে ভাল। খারাপ লাগলে খারাপ। গ্রহণ করলে করল। না হলে মুখের ওপর বলে দিল।

রাশিয়া তা নয়। রাশিয়া কখনও অসম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ। কখনও আবার মনে হবে একটা মাকড়সার জালের মধ্যে আপনাকে ঘিরে রাখা হয়েছে। চারদিকে ফ্যানজোন। মিডিয়া সেন্টার। রুশিদের উদারতা। আবার সেখানেই হোটেলে আপনাকে সন্দেহজনক চোখে মাপবে। হোটেলে চাবির সঙ্গে একটা রেজিস্ট্রেশন কার্ড এগিয়ে দেবে। বলবে এই কার্ডটা সঙ্গে না নিয়ে পথে-ঘাটে বেরোবেন না। তখন কখনও মনে হবে কোনটা আসল রাশিয়া? এরা উদার? না আগের মতোই দেশি-বিদেশি নাগরিকদের ওপর অতন্দ্র নজরদারি রাখে? আপনার মনে হবে এই রোদ্দুর। এই কুয়াশা।

মেসির এ বারের আর্জেন্টিনা ঠিক তাই। মঙ্গলবার যখন লাইনআপে দেখলাম আগুয়েরো আর দিবালা, কেউ প্রথম একাদশে নেই তখন মনে হল টিমটা কে করছে? এতদিন শোনা যাচ্ছিল সাম্পাওলি করছেন। মেসির তা নিয়ে বিরক্তি রয়েছে। আর্জেন্টিনীয় মিডিয়া বলছিল পুরোটাই মেসির টিম। সাম্পাওলির যা নিয়ে বিরক্তি রয়েছে। গতকাল যে কয়েকজন মাঠে নেমে আর্জেন্টিনাকে প্রায় বিশ্বকাপের বাইরে করে দিয়েছিল, তাঁদের তা হলে নির্বাচিত করল কে? মেসি বাছলেন? সাম্পাওলি বাছলেন? নাকি মেসি-মাসচেরানোদের প্লেয়ারদের গ্রুপ বাছল?

হিগুয়েনের নির্বাচন দেখে মনে হচ্ছে মেসিই বাছলেন। ইতালীয় লিগের বাইরে গোটা বিশ্ব তাঁকে নিয়ে ছ্যা ছ্যা করে। মারকানায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতা হয়নি একমাত্র তাঁর ব্যর্থতায়। নাইজেরিয়া ম্যাচেও শেষ দিকে যে ভলিটা উড়িয়ে দিলেন সেখান থেকে কোনও বিশ্বমানের স্ট্রাইকার দশ বারে সাত বার গোল করবে। হিগুয়েনের খেলাটা আশ্চর্য নয়। যদি মেসি মনে করেন তাঁর আড়াআড়ি দৌড়ানো ডিফেন্সে ফাঁকা জমি তৈরি করবে। যে জমিটা কাজে লাগবে তাঁর, যিনি বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের নজরদারিতে পার স্কোয়ার ফিট সবচেয়ে কম জায়গা পান। কিন্তু এ বারের বিশ্বকাপে হিগুয়েনের সেই দৌড়ও নেই। ফিনিশিং তো বাদ দিচ্ছি। তাঁকে খেলানোটা আশ্চর্য নয়। আশ্চর্য তাঁকে গোটা সময় রেখে দেওয়া।

আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের সঙ্গে যদি কথা বলেন, তাঁদের কাছে মাঝরাত্তিরের ম্যাচের গভীরতম মুহূর্ত হল মেসির ফ্রি কিক পোস্টে লেগে ফেরা। নইলে তখনই ২-০ হয়ে যায়। খেলার বাইরে চলে যায় নাইজেরিয়া।

কিন্তু নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলুন। সেন্ট পিটার্সবার্গ মাঠের সবচেয়ে মহানাটকীয় মুহূর্ত ছিল বল খেলার বাইরে থাকার সময়। যখন তুরস্কের রেফারি ডিএআরের সাহায্য নিলেন। ওই মুহুর্তটা সঠিক বিশ্লেষিত না হলে রোখো খলনায়ক হিসাবে শেষ করেন। ম্যাচের রাজা হয়ে নয়। আর ওটা পেনাল্টি হলে হয়তো মস্কো বিমানবন্দরেই ম্যানুয়েল নয়্যারদের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত আর্জেন্টিনার। তুরস্কের রেফারিয়া কিন্তু ইংল্যান্ড-স্পেন বা জার্মান রেফারিদের মতো এত ম্যাচ খেলানোর সুযোগ পান না। ফুটবলে অনুন্নত দেশের কোনও রেফারি ওই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা করে যে পেনাল্টি সিদ্ধান্তটা দেননি, সেটা মাসচেরানোর রক্তপাতের চেয়েও প্রণিধানযোগ্য মুহূর্ত। এমনিতে ফুটবলের নিয়মকানুনের চটি বইগুলো কলেজ স্ট্রিটে কিনতে পাওয়া যায়। সেখানেও পাওয়া যাবে হ্যান্ডবলের নিয়ম খুব সহজ।

হাতে বল লাগলে হ্যান্ডবল নয়।

হাতে বল লাগালে সেটা হ্যান্ডবল।

রোখো বক্সের মধ্যে হেডে ক্লিয়ার করতে দিয়েছিলেন। সেই মোশনে বল তাঁর হাতে লেগে যায়। ইচ্ছাকৃত লাগাননি। সমস্যা হল, ওই একটা মুহূর্ত ম্যাচের চূড়ান্ত হার্টবিট ঠিক করছিল। কারা বিশ্বকাপের বাইরে যাবে? কারা থাকবে? ওই অসীম চাপের পরিস্থিতিতে তুরস্কের রেফারির নার্ভ ঠিক রাখতে পারাটা অবশ্যই আর্জেন্টিনীয় ভাগ্য। গড়পরতা দিনে তার সাহায্য পাওয়া একেবারেই নিশ্চিত নয়।

৩০ জুন অবধি সেই ভাগ্যের মেগা অফার থাকবে? নাকি ফ্রান্স বনাম আর্জেন্টিনা দুধ আর জল তফাত করে দেবে? লিওনেল মেসি ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে টেনেছিলেন। সেমিফাইনাল-ফাইনালে মেসিয়ানা পাওয়া যায়নি। সেটা যদি ক্লকওয়াইজ মুভমেন্ট হয়ে থাকে, এটা কি তার উল্টো, অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ মুভমেন্ট? যে গ্রুপ লিগের তিনটেতেই খারাপ খেললেন। এ বার নকআউটে ভাল খেলবেন।

মস্কো শহরে চল্লিশ পঞ্চাশটা বাঙালি পরিবার হয়েছেন। বিস্ময়কর ভাবে তাঁরা একটাই দুর্গাপুজো করেন। সাধারণভাবে বলা হয়, পাঁচজন বাঙালি এক হলে দুটো দুর্গাপুজো হয়। সেখানে মাত্র একটা পুজো আর তাতেও কি না কলকাতার গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকার দিনক্ষণ অনুযায়ী পুজো হয়। ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো নয় যে পুজোর উইকএন্ডে পুজো হয়। কলকাতার যে দিন সপ্তমী, মস্কোতেও সে দিন সপ্তমী।

শনিবার কাজানে ফুটবলের ঈশ্বরের পুরনো সাম্রাজ্যে প্রত্যাবর্তন অন্তত এর চেয়ে বিস্ময়কর কিছু হবে না। বিস্ময় এমনিতে যে রুশ বিশ্বকাপের বৈশিষ্ট্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে সে তো জার্মানরাই সবচেয়ে ভাল জানে। মারাকানা বিজয়ী তারা যে হড়কে গেল, এটাও তো লিওনেল মেসির দিকে ভাগ্যের নতুন হাওয়াই প্রদর্শন করছে, তাই নয় কি?

রাশিয়া বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে তাদের সাবেকি সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মতো। যেখানে শাসক আর শাসিতে কোনও ভেদাভেদ থাকবে না। স্ট্যালিনের আমলের রাশিয়ার মতো প্রত্যেকের অধিকার থাকবে সমান। সুপারহিউম্যান বলে কেউ থাকবে না। সেই মাপকাঠিতে এ বারের আর্জেন্টিনা কোন শ্রেণিতে পড়ছে? গত বার রানার আপ হিসেবে তাদের পড়া উচিত শাসক শ্রেণিতে। কিন্তু প্রথম তিন ম্যাচ দেখে মনে হয়েছে শাসিত।

শাসিত হলে তো ভালই। শনিবারের ফরাসিদের বিরুদ্ধে ভাল হাওয়াটা থাকবে।

পুনশ্চ : দুঃখিত, আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের সেই ৩-৪ ম্যাচ দেখতে পারিনি। মস্কো ফেরত আমি তখন নিউইয়র্কগামী বিমানে।

সেন্ট পিটার্সবার্গ, ২৮ জুন