পেলে-মারাদোনার সাক্ষাৎকার
পেলে-মারাদোনার সাক্ষাৎকার
বখে যেতে দেননি বাবা
কলকাতায় পেলের একান্ত সাক্ষাৎকার। আর তার পিছনের গল্প
কী কী শট নেওয়া নিষিদ্ধ ইন্টারভিউর আগেই তো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে! দেওয়ালির শব্দবাজির মতোই কড়া দমননীতির মধ্যে পড়ছে সেই সব
প্রশ্ন যা দুম করে পেলের সামনে ফাটতে পারে। চকোলেট বোম চলবে না। এমনকী এই পরিবেশে কালিপটকাও না।
তিনটে প্রশ্ন খুব দ্রুত তৈরি খসড়া থেকে বাদ দিয়ে দিলাম। এক, আপনি মারাদোনাকে পছন্দ করেন না কেন? দুই, এই পর্যায়ের সশ্রদ্ধ অধিষ্ঠান নিয়েও কখনও ফিফার বিরোধিতা করেননি কেন? তিন, গ্যারিঞ্চার পরিবারের অভিযোগ কি সত্যি যে আপনি তাদের এত দুরবস্থা জেনেও পাশে দাঁড়াননি?
২০১৫-র অক্টোবর। কলকাতার সুইস হোটেলের দুপুর। সঞ্জীব গোয়েঙ্কার আমন্ত্রণে লাঞ্চে এসেছেন পেলে। এত সময় কম এবং এত সব গণ্যমান্য অতিথি তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যাকুল যে আলাদা করে কোনও সময় বার হচ্ছে না ইন্টারভিউয়ের। অথচ তেমনই কথা ছিল যে, ধারের কোনও কেবিনে একান্তে নিয়ে যাওয়া যাবে পেলেকে। উল্টে দেখা যাচ্ছে একটা অভিনব ব্যবস্থা। পর্দা ঘেরা কেবিনে কিছু ভিভিআইপি অতিথির সঙ্গে বসা পেলে। শুরু হয়ে গিয়েছে সেভেন কোর্স লাঞ্চ। জানা গেল লানচ শেষ করতে অন্তত পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ মিনিট সময় নেবেন তিনি। সেই সময়ের মধ্যে দফায় দফায় অতিথিরা গিয়ে বসবেন পেলের পাশে। ছবি তুলবেন। উঠে যাবেন। আবার পরের পরের লোক গিয়ে বসবেন। আমার ইন্টারভিউয়ের যদি সুযোগ হয়, লাঞ্চের শেষের দিকে।
মনে মনে যখন সাক্ষাৎকারের অপমৃত্যু দেখছি, পেলে প্রায় মেন কোর্স শেষ করে ফেলার দিকে। এমন সময় এটিকে-র তরফে জয়নীল মুখার্জি অভিনব বক্তব্য নিয়ে হাজির হলেন। এখুনি আমাকে পেলের পাশে বসিয়ে দেওয়া হবে। তিনি লাঞ্চ শেষ করা পর্যন্ত আমার সময়সীমা। মানে বড়জোর পনেরো থেকে সতেরো মিনিট। একান্তে হয়েও একান্তে নয়, কারণ আশেপাশে লোক ঠাসা।
সেটা যদি বা মানা গেল, এই বেখাপ্পা সেটিংয়ে এমন বিশ্বখ্যাত মানুষকে ইন্টারভিউ করব কী করে? চারপাশে আওয়াজ। দু’হাতের মধ্যে লোক। সামনের টেবিলটা পাঁচ গজ দূরেও নয়। তারা তো সবই শুনতে পাবে। পেলেকে ঘিরে একটা অদ্ভুত পুজো পরিক্রমার দমকা হাওয়া। এর মধ্যে একান্ত ইন্টারভিউ কী করে সম্ভব? হট্টগোলের মধ্যে কে কবে তার প্রার্থিত মহানায়কের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছে?
তার চেয়েও বড় সমস্যা এমন ক্ষণজন্মা মেগাস্টার ভিনদেশে অতিথি হয়ে খেতে বসেছে। খাওয়ার মধ্যে তাকে প্রশ্ন করাটা চরম অসৌজন্য। দুই, খেতে খেতে সে উত্তর দেবে কী করে? উত্তরগুলো তো মোনোসিলেবলসের মতো হয়ে যাবে। হুঁ। হ্যাঁ। না। সাংবাদিকতার এত বছরের অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে, টেস্ট ব্যাটসম্যানের রান তোলার সেরা সময় যেমন লাঞ্চ থেকে টি-র মধ্যবর্তী সেশন। তেমনই বেস্ট কোয়ালিটি ইন্টারভিউ পাওয়ার সেরা সময় প্রার্থিত ব্যক্তি খাওয়া শেষ করে ওঠার পর। সেটা ব্রেকফাস্ট হতে পারে। লানচ হতে পারে। ডিনার হতে পারে। খাওয়ার মধ্যে কখনও নয়। ইন্টারভিউয়ের প্রশ্নে ফুলঝুরি আর রংমশাল জ্বালিয়ে বসে থাকতে হবে, সে তো পরের কথা। তার চেয়ে বিপজ্জনক হল, এই সেটিং অ্যাদ্দিনকার উপলব্ধিকে যে তীব্র স্লাইডিং ট্যাকল করছে।
দ্রুত বোঝা গেল বেগার্স কান্ট বি চুজার্স। এই পেলের হাতে যতই স্টিক থাকুক। মুখচোখ নিস্তেজ ভাব দেখাক। রোজকার মতো আজও তিনি মোনোপলি সেলার্স মার্কেট। তাঁর শর্তে তাঁকে মানতে হবে। বেগড়বাই করলে স্প্যাম খোলা।
সাক্ষাৎকারের শেষে অবশ্য চমৎকৃত লেগেছিল। মানুষটা কী আদ্যন্ত পেশাদার। এত সব লোক ঘাড়ের ওপর। একটা ড্রিঙ্ক আধখানা শেষ করেছেন। ডেজার্ট শুরু হবে। খাওয়ার স্নিগ্ধতায় ক্রমাগত বাধা বসাচ্ছে অপরিচিত মিডিয়া। তাকে পেনাল্টি বক্সে অনায়াসে ড্রিবল করে যাওয়া। পেলে বলেই সম্ভব। ঘাড় কাত করে এমন নিচু গলায় উত্তরগুলো দিলেন যে, আমিই শুধু শুনতে পেলাম।
➤➤ ডন ব্র্যাডম্যান আপনার খুব পরিচিত ছিলেন?
ব্র্যাডম্যান? না তো! ঠিক বুঝলাম না।
➤➤ অস্ট্রেলিয়ায় ব্র্যাডম্যানের উপর লেখা বিশেষ বইতে আপনাদের পাশাপাশি দাঁড়ানো হাসিমুখের ছবি দেখেছি। সেটা তো অ্যাডিলেডে ব্র্যাডম্যানের বাড়ির ড্রয়িংরুমেই তোলা।
(একটু ভেবে) এবার বুঝতে পেরেছি। হুবল ঘড়ি কোম্পানির হয়ে আমি ইন্টারন্যাশনালি অ্যাড ক্যাম্পেন করেছি বহু বছর। আমি ওদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। হুবল-ই আমাকে অ্যাডিলেডে মিস্টার ব্র্যাডম্যানের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।
➤➤ সেটাই পেলে-ব্র্যাডম্যান প্রথম ও শেষ দেখা?
হ্যাঁ, আর মনে পড়ছে না কখনও ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে। আমি এমনিতে দুমদাম অপরিচিত কারও বাড়িতে যাই না। কিন্তু হুবল-ই প্রস্তাব দেয় যে, আমি যাতে ওঁর বাড়ি যাই। মনে হয় মিস্টার ব্র্যাডম্যান অস্ট্রেলিয়াতে ওদের মডেল ছিলেন। সেটাই হয়তো আমাদের দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড় করাবার কানেক্টিং পয়েন্ট হয়ে থাকতে পারে।
➤➤ ব্র্যাডম্যান সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু হুবল-র লোকেরা বলেনি?
বলেছিল (হাসি) যে উনি হলেন ক্রিকেটের পেলে (হাসি)।
➤➤ তাজ বেঙ্গলের প্রেস কনফারেন্সে সেদিন যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করা হল, পারতেন এই আমলের তীব্র ম্যান মার্কিংয়ের যুগে নিজের পুরনো শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে? তখন আপনি তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে বললেন, তাহলে তো বলতে হয় বিথোফেন এখনকার দিনে বাজাতে পারতেন না?
ঠিকই তো বলেছি। আপনার স্কিল যদি সর্বোচ্চ মাপের হয়, সে সব আমলেই বিপক্ষকে হটিয়ে নিজের জায়গা করে নেবে। টপ লেভেল স্কিল শতাব্দীর দূরত্ব মানে না।
➤➤ কিন্তু এখন তো নজরদারির সূক্ষ্মতা অনেক বেড়েছে। স্লো মোশন রিপ্লেতে কেটে কেটে বিশ্লেষণ হয়। স্ট্রাইকারের রহস্যকে উধাও করে দেওয়ার সুযোগ হাতের কাছে।
তাই কি? তাহলে আজকের দিনে আমরা এত মেসিকে নিয়ে কথা বলি কেন? কেন নেইমার এত সফল? ওদের উপর কি গবেষণা হয় না।
➤➤ আধুনিক সময়ের হার্ড ট্যাকল…
(থামিয়ে দিয়ে) কীসের হার্ড ট্যাকল? এখন তো ফিফা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ফরোয়ার্ডদের জন্য কত রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে। ছুঁলেই ডিরেক্ট ফ্রি কিক পাওয়া যায়। বক্সের মধ্যে হলে পেনাল্টি। আমার প্লেয়িং লাইফের বেশির ভাগ সময় দেখার কেউ ছিল না। সিক্সটি সিক্সের ইংল্যান্ডে যখন ওইরকম মার খেয়েছিলাম কে পাশে ছিল? আমাকেই টুর্নামেন্ট থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল।
➤➤ আশ্চর্য লাগছে। পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে ঘটনার। তবু এমন যন্ত্রণার সঙ্গে বলছেন যেন পঞ্চাশ মিনিট আগের কথা।
এ জন্যই জ্বলজ্বলে আছে যে, ওই মার কেরিয়ারের ফরদাফাই করে দিতে বসেছিল। ইংল্যান্ডে বসে মনে হয়েছিল ফুটবল জীবনটাই অনিশ্চিত হয়ে গেল। মেক্সিকো নাইনটিন সেভেনটির ওয়ার্ল্ড কাপ তাই আমার কাছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট ছিল।
➤➤ ইম্পর্ট্যান্ট বলতে?
লোকে আমায় মুছে দেওয়ার জন্য তৈরি ছিল। আর এক শ্রেণির লোক খুব বেশি চাইছিল আমার কাছে। দুটোই ছিল এক্সট্রিম। বেশ বুঝতে পারি, সেভেনটির ওয়ার্ল্ড কাপ না জিতলে আমার ট্যালেন্ট নিয়ে বোধহয় গণসন্দেহ তৈরি হত।
➤➤ পেলের ঔজ্জ্বল্য থাকত না?
(উত্তর না দিয়ে ঘাড় নাড়ালেন)।
➤➤ ষাট বছর হল ফুটবল নিয়ে ঘাঁটছেন। সুইডেনে ওইরকম চমকপ্রদ আবির্ভাবের পরেই তো আপনি পেলে হয়ে গিয়েছিলেন।
ইয়েস সুইডেন ওয়াজ ভেরি সুইট (এটাও এমনভাবে বললেন যেন এখুনি ঘটল)। সুইডেনে ওরা আমাকে দারুণ সম্মান দিয়েছিল। খুব ভালবেসে ছিল। তার আগে অবশ্য ব্রাজিলে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়েছিল। মনে রাখবেন আমি যখন স্যান্টোসের মতো জবরদস্ত টিমের হয়ে প্রথম খেলি তখন আমি সবে পনেরো।
➤➤ আজও তাই বলা হয় অন্য তারকারা দুর্ধর্ষ ফুটবল খেলত। আপনি খেলতেন অন্য কিছু!
আমি ঈশ্বরের কাছে আজও কৃতজ্ঞ যে, অবিশ্বাস্য ট্যালেন্ট দিয়ে উনি আমায় পাঠিয়েছিলেন। আজও পৃথিবীর সর্বত্র যখন ফুটবল নিয়ে ঘুরি, কথা বলি। সভা-সমিতিতে যাই। তখন মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিই। সব ওঁর মহিমা।
➤➤ মাঠের মধ্যে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় আপনি যে সব সিদ্ধান্ত নিতেন। সেগুলো ওই মিলি সেকেন্ডে কীভাবে নেওয়া সম্ভব ছিল?
উত্তর দিতে পারব না। এটাই বোধহয় ট্যালেন্ট। এটাই বোধ হয় ঈশ্বরের দান। আর আমার বাবার আশীর্বাদ। রিটায়ারমেন্টের পরে এই প্রশ্নটা আমায় বহু বার করা হয়েছে। আমায় বলতে হয়েছে ফিল্মের পেলেকে দেখে বাস্তবের পেলে নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেছে। তার বল কন্ট্রোল যতই নিখুঁত আর স্পিডি থাক। কী করে ওই স্পিডে সে ঠিক ডিসিশনগুলো নিত? আমি নিজেই জানি না।
➤➤ বলা হয়ে থাকে প্রত্যেক ক্ষণজন্মা প্রতিভার মধ্যে অতিরিক্ত এনার্জির যে ঢেউ থাকে সেটাকে কন্ট্রোল করার জন্য তার একটা আধারের প্রয়োজন হয়। নইলে সেই প্রতিভা নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেবে। আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াবে। যেমন হয়েওছে অনেক জিনিয়াসের ক্ষেত্রে। আপনি ব্যতিক্রম। কারণ আপনার প্রতিভা নাকি আশ্রয় খুঁজে নিয়েছিল ক্যাথলিক ধর্মের রক্ষণশীলতায়।
(সোজা হয়ে বসলেন) ইন্টারেস্টিং বিষয়। আমার নিজের বিশ্বাস, আমাকে বয়ে যেতে দেয়নি আমার বাবার শিক্ষা। ধর্মভীতির চেয়েও এটাকে আমি বড় করে দেখতে চাই যে উনি আমায় নাম করার পর কী বলেছিলেন। সেটাকেই জীবনের মন্ত্র মনে করে আমি এগিয়েছি।
➤➤ কী বলেছিলেন?
বাবা বলতেন সব সময় লোকের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে। কখনও কাউকে ছোট করে দেখবে না। মনে রাখবে নিজেকে সেরা ভাবতে শুরু করলে ফুটবলার হিসাবে তোমার গ্রোথ বন্ধ হয়ে যাবে। আর তুমি এগোতে পারবে না। বাবাই আমার হিরো। বাবাই আমার জীবনের গাইডিং লাইট। যত বয়স বড়ছে তত যেন বাবার শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাটা বুঝতে পারছি।
➤➤ উনি খেলতেন?
একটা লেভেল অবধি চুটিয়ে খেলতেন। ইন ফ্যাক্ট আমার বাবার একটা রেকর্ড আছে যা হাজারের ওপর গোল করেও আমি কখনও ভাঙতে পারিনি (হাসি)।
➤➤ তাই?
ড্যাড হ্যাঁ একটা ম্যাচে পাঁচ গোল করেছিলেন। পাঁচটা গোলই হেড করে। আমি ফুটবল জীবনে হাজারের উপর গোল করেছি। কখনও হেডে পাঁচ গোল করতে পারিনি (খিলখিল হাসি)।
➤➤ জানতাম না আপনি নিজের বাবার কাছে এত ঋণী। কোথাও পড়িওনি।
আমার জীবনটা ওঁর দর্শন মেনেই। আর একটা কথা বলেছিলেন যা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছি।
➤➤ কী?
বলেছিলেন আঁকড়ে পড়ে থেকো না। তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিও। নইলে সমালোচকেরা গুলি করার সুযোগ পাবে। আমি সেই সুযোগ কাউকে দিইনি।
➤➤ স্যান্টোস স্টেডিয়ামের ঠিক উল্টো দিকে একটা কাটার চুল ছোট সেলুন রয়েছে। তার মালিক দাবি করেছিলেন, চল্লিশ বছর ধরে আপনি নাকি ওই সেলুনে চুল কাটছেন।
(হাসি) অনেকটা সত্যি। আমার পুরনো বন্ধু, পুরনো মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ কখনও বদলায়নি।
➤➤ ষাট বছর ধরে ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন। কাকে দেখেছেন আপনার ট্যালেন্টের সবচেয়ে কাছাকাছি?
এটা এক কথায় বলা খুব শক্ত। এত সব বড় ফুটবলার খেলে গেছে।
➤➤ গ্যারিঞ্চা?
গ্যারিঞ্চা দুর্ধর্ষ ছিল। গ্যারিঞ্চা বল নিয়ে জাদু দেখাত। কিন্তু আমি বোধহয় সামান্য আগে রাখব জর্জ বেস্টকে।
➤➤ কেন?
বেস্ট আরও কমপ্লিট প্লেয়ার ছিল।
➤➤ জর্জ বেস্ট বলছেন এত ভাল। তাহলে তাঁর সেই ব্যাপ্তি বিশ্ব ফুটবলে ফুটে বার হয়নি কেন?
পসিবলি হি ওয়াজ উইথ দ্য রং কোম্পানি অ্যাট দ্য রং টাইম।
➤➤ গ্যারিঞ্চা নিয়ে ব্রাজিল আজও আবেগে ভরপুর। গ্যারিঞ্চার বাড়িতে ওঁর আত্মীয়দের সঙ্গে আমি দেখা করতে গেছিলাম। ওঁরা বলছিলেন…
(পেলে একটু মুখ তুলে তাকালেন) গ্যারিঞ্চা ভাল বন্ধু ছিল। ওর পরিবারের সঙ্গে আমি তো নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। (এই জায়গাটায় মনে হল পেলে সত্যি বলছেন না। কারণ গ্যারিঞ্চার পরিবারের তীব্র ক্ষোভ, পেলের সম্পূর্ণভাবে তাঁর সহ খেলোয়াড়কে ভুলে যাওয়া। কিন্তু পরিবেশ এমন যে এখানে আক্রমণাত্মক ফলো আপ প্রশ্ন সম্ভব নয়)।
➤➤ মারাদোনাকে কোথায় রাখবেন?
খুব ভাল। তবে গ্যারিঞ্চাকে সামান্য এগিয়ে রাখব।
➤➤ এই যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফুটবলারকে ঘিরে আলোচনা হয়েছে ‘নতুন পেলে’ বলে। কখনও ক্রুয়েফ। কখনও জিদান। কখনও জিকো। কখনও রোনাল্ডো। কখনও মারাদোনা। তখন আসল পেলে কী ভেবেছেন?
ভেবেছে যে, কী করে সম্ভব? বাবা-মা তো বহু বছর মেশিন বন্ধ করে পরপারে চলে গিয়েছেন (অট্টহাসি)।
➤➤ বিশ্বকাপে ব্রাজিল যেদিন জার্মানির কাছে ১-৭ হারল আপনি বেলো হরাইজন্তের মাঠে ছিলেন। ফিফার ভিভিআইপি বক্সে বসে ছিলেন। অনেক চেষ্টাতেও সেদিন আপনাকে ধরতে পারিনি। আজ জিজ্ঞেস করছি, কী মনে হয়েছিল ব্রাজিলের হেনস্তা দেখে?
সেদিন এমনিতেও আমার কথা বলার মতো অবস্থা ছিল না। আই ওয়াজ টেরিবলি শকড। আমার আজও মনে হয় আমাদের স্ট্র্যাটেজিতে গন্ডগোল ছিল। ব্রাজিল তার নিজস্ব পদ্ধতি ফলো করলে এই জিনিস ঘটত না। আমি কোচকে দায়ী করতে চাই।
➤➤ নিজস্ব পদ্ধতি বলতে?
ক্রিয়েটিভিটি অনুসরণ করা। ওটাই আমাদের ফুটবলের মাহাত্ম্য—জিঙ্গা। ব্রাজিলকে সৃষ্টিশীল ফুটবল খেলতে হবে। ওটাই তার ‘এজ’ (জিঙ্গা কাকে বলে, সেটা পরের বছরে ‘পেলে’ ফিল্ম দেখে বুঝতে শিখি। ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় জানতাম না)।
➤➤ আধুনিক ফুটবল পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জার্মানদের মতো টাফেস্ট ফুটবল মেশিনের বিরুদ্ধে নিছক ক্রিয়েটিভিটি অচল।
(অপাঙ্গে তাকিয়ে) সেজন্যই সেদিন বলছিলাম বিথোফেন আজ জন্মালে লোকে কি তাঁর বাজনা শুনত না? ক্রিয়েটিভিটি যে কোনও সিস্টেমকে হারাতে পারে।
➤➤ ফুটবল নিয়ে গোটা বিশ্বের চেতনাকে বলতে গেলে আপনিই ঘুরিয়ে দিয়েছেন।
আমি আবার নিজেকে লাকি বলতে চাই। বলতে চাই আমি যেভাবে এত বছর সারভাইভ করেছি, সেটাও ঈশ্বরের একটা আশীর্বাদ। আমার মনে আছে ‘এসকেপ টু ভিকট্রি’ যখন শুটিং হচ্ছিল, তখন সিলভেস্টার স্ট্যালোন আমাকে বলেছিল, তুমি গোলকিপার দাঁড়াও। আমি শট মেরে গোল করব। তার পরে বলে লাথি-টাথি মেরে আমায় বলেছিল, ফুটবল খুব কঠিন খেলা। শুনে খুব মজা পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল সেটা আমার চেয়ে ভাল কে জানে (হাসি)?
অক্টোবর, ২০১৫
মারাদোনার ইন্টারভিউ নিতে গেলে
পেলেকে ইন্টারভিউ করতে বসার অভিজ্ঞতা অবধারিত মনে করিয়ে দেবে শচীন তেণ্ডুলকরকে।
মারাদোনাকে ইন্টারভিউ করতে বসার অভিজ্ঞতা অবধারিত মনে করিয়ে দেবে ভিভিয়ান রিচার্ডসকে!
পেলে হলেন সাক্ষাৎ প্রতিষ্ঠান। একটা ভদ্র নম্র সুরে সারাক্ষণ কথা বলেন। চট করে কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করেন না। ইন্টারভিউ করতে যে বলেছে তাকে এমন ইম্প্রেশন দেন যেন কত কাছের। সে বোঝেও না দেড় মিনিট পর অন্য কোনও টেবিলে বসে পেলে তাকে চিনতেও পারবেন না। ইন্টারভিউয়ার তাই একটা মন ভাল করে দেওয়া আফটার আফটার শেভের গন্ধ নিয়ে ফেরে। সে এমন কিছু দেখেনি যা তাকে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে। বরঞ্চ এমন মানুষকে চোখের সামনে দেখে ফিরল, যে মহাতারা হয়েও বিনয়ে ন্যুব্জ।
মারাদোনা ঠিক উল্টো। তাঁর সঙ্গে পেলের কেন বনিবনা নেই, বোঝার জন্য দু’জনের সঙ্গে আলাদা করে দশ মিনিট যথেষ্ট। মারাদোনা এত উঁচুতে উঠেও কোনও কোলনের তোয়াক্কা করেন না। ঘামের গন্ধ হলেও তাঁর চলবে। পেলে ভাবেন আগে, করেন পরে। মারাদোনা করেন আগে, ভাবেন পরে। পেলে যদি সবসময় ক্ষমতাসীন সরকার হন, মারাদোনা দেশের এক নম্বর বিরোধী দলনেতা।
তাঁকে ইন্টারভিউ করতে গেলে বিস্মিত লাগবে একটা মানুষ এত যশ আর খ্যাতি পেয়ে মধ্য পঞ্চাশেও কী করে এমন অনির্ভরযোগ্য থাকতে পারে? এ কখন কী ভাবে কোনও স্থিরতা নেই। ইন্টারভিউয়ারের পক্ষে কখনও জানা সম্ভব নয়, সে যে মুড নিয়ে রেকর্ডারের বাটন অন করেছিল, সেটাই অক্ষত থাকবে কি না? কারণ মারাদোনা কখনও মিডিয়ার সঙ্গে পার্সেন্টেজ খেলায় বিশ্বাসী নন। তিনি দ্রুত বুঝিয়ে দেবেন একে আমার পছন্দ হয়েছে? না আলাপের প্রথম মিনিট থেকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি?
ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে তুলনা করছিলাম। শুধু ভিভ নন। ভিভ-ওয়ার্ন-সৌরভ মিলে অদ্ভুত কম্বিনেশন ভাবুন। মারাদোনাকে খানিকটা ধরতে পারবেন। আজ পর্যন্ত তাঁর একমাত্র কলকাতা সফরে গাছ থেকে ঝুপ করে ফল পড়ার মতো অযাচিত ইন্টারভিউয়ের সুযোগ হাজির হয়ে যায়। তখন আমি যে প্রতিষ্ঠানে তারা মারাদোনার কলকাতা সফরের মিডিয়া স্পনসর। কাজেই আলাদা করে কুড়ি মিনিট পাওয়া যাবে।
এরপর জানা গেল কুড়ি নয়—বরাদ্দ তিরিশ মিনিট। আরও ভাল। গুছিয়ে একটা লম্বা প্রশ্নপত্র তৈরি করলাম। শহরে লম্বা প্রেস কনফারেন্স গতকাল করেছেন মারাদোনা। কিন্তু তাতে কি আশ মেটে? কত কত কিছু জানা বাকি রয়ে গিয়েছে। আসল কিছু প্রশ্নই তো করা হয়নি। সাক্ষাৎকার শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে লেটেস্ট যে স্টেটাস আপডেট পাওয়া গেল, সেটা মাথা ভোঁ ভোঁ করিয়ে দেওয়ার মতো। একান্ত কথাবার্তা হবে। কিন্তু মাত্র পনেরো মিনিট। পনেরো মিনিট মানে ঠিক পনেরো মিনিট। স্টপ ওয়াচের মতো মাপা হবে আর মারাদোনা জাস্ট উঠে যাবেন। এ-ও জানা গেল যে তিনি দোভাষীই ব্যবহার করবেন। প্রেস কনফারেন্সে তাঁকে দেখে ঘোর সন্দেহ জেগেছিল যে ইংরেজি যথেষ্ট বোঝেন। যে কোনও কারণে হোক বলেন না। তাই সফর সংগঠকদের অনুরোধ পাঠিয়েছিলাম যে যদি একা বসেন। বোঝা গেল সেটা রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু দোভাষী মানে তো কেলেঙ্কারি হয়ে গেল। পনেরো মিনিটটা হয়ে দাঁড়াবে সাড়ে সাত মিনিট। দোভাষী প্রশ্ন শুনবে, বোঝাবে, উত্তর নেবে, অনুবাদ করবে—সে তো বিস্তর সময় যাবে। মারাদোনাকে এত বছর পর কাছে পেয়ে মাত্র কিনা সাড়ে সাত মিনিট?
তখনও দুপুর গড়ায়নি। কিন্তু চোখের সামনে নিজের মনোবাঞ্ছার ভরপুর সূর্যাস্ত দেখছি। কে জানত ব্যাপারটা এত ট্র্যাজিক হয়ে দাঁড়াবে? এত দাগা দিয়ে যাবে?
খড়কুঠোর মতো শেষ আশা, বহুবছর আগে মারাদোনার উপর এই সাংবাদিকের একটা বই— ‘দিগভ্রষ্ট রাজপুত্র’। বাংলা বই। কিন্তু লেখকের ছবি তো রয়েছে। এটা দেখিয়ে যদি দিয়েগোর মন প্রসন্ন করা যায়?
যদি বাড়তি দশ মিনিট দেন—অরিজিনাল প্রশ্নপত্রের অন্তর কিছুটা কভার্ড হয়ে যাবে। একটা মোটামুটি কিছু দাঁড়াবে।
এবং সেই সম্ভাবনা এবার গঙ্গাবক্ষে খসে পড়েছে। কারণ বই নিয়ে অটোগ্রাফ করার সময় মারাদোনা অন্তত পরিষ্কার ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করেছেন, ”সেল?” বলেছি দারুণ। অনেকগুলো এডিশন গিয়েছে। সেলিব্রিটির নিজের উপর বই অনেকগুলো এডিশন গেলে কে না খুশি হয়।
কিন্তু এই ভদ্রলোক মুখ গম্ভীর করে বলছেন, ”র-য়া-ল-তি? র-য়া-ল-তি?” দশ নম্বর জার্সির সেই দুনিয়া কাঁপানো আবেগ কোথায়? এ তো দেখছি মূর্তিমান ক্যালকুলেশন। ১৯৯৪ সালে বার হওয়া বইয়ের লভ্যাংশ চাইছে ২০০৮-এ। ইন্টারভিউ না করতে এলেই ভাল ছিল দেখছি।
ইন্টারভিউয়ার তীব্র অস্বস্তিতে দেখে বিশ্বখ্যাত অতিথির বোধহয় সামান্য দয়া হল। ডান হাতটা উপরে তুলে যা বোঝালেন তার অনুবাদ হল, ওহে অজানা লেখক এই রয়্যালটির টাকাটা তোমার টিপস দিয়ে দিলাম।
বাট পরিবেশটা এত ভারী হয়ে গেল যে সাড়ে সাত মিনিট সাড়ে চারে নেমে আসার মতো মেঘলা। এমন পরিবেশে ইন্টারভিউ হয় না। জাস্ট উপভোগ করা যায় অভিজ্ঞতাটাকে। মনে ভাসছিল নিউজ এডিটরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। পেজ ওয়ানের জন্য আজ কপি দেব। তার সলিল সমাধি হল। এখন শুধু কথাবার্তা হবে। যার কোনও ভ্যালু নেই।
বললাম, আপনাকে কী বলে সম্বোধন করব? মিস্টার মারাদোনা। ”নো কল মি দিয়েগো, দিয়েগো।”
আচ্ছা আপনি কি বলতে পারেন কোডেসাল মেন্ডেস মালটা এখন কোথায়?
”কোডেসাল মেন্ডেস?” নামটা শুনে মারাদোনা এবং তাঁর দোভাষী দু’জনেই মুখ বিকৃত করেছেন।
বলা হয়নি শুধু তো দোভাষী নন, দিয়েগো নিয়ে এসেছেন দেহরক্ষী সমেত আরও কিছু স্প্যানিশ মুখকে। এই ভিড়ের মধ্যে আর যা-ই হোক একান্ত শব্দটা খাপ খায় না। আমি অবশ্য ততক্ষণে সাক্ষাৎকারের মৃত্যু ঘোষণা দেখে ফেলেছি। ভিড় আর ফাঁকাতে কী আসে যায়?
কে জানত পরের মিনিটে আচমকা সাক্ষাৎকারের মোড় ঘুরে যাবে। যখন ব্যাখ্যা করলাম কলকাতার আর্জেন্টিনীয় অংশ লোকটাকে মারবে বলে আজও খুঁজছে। নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে সেই জঘন্য পেনাল্টিটা দেওয়ার জন্য। কলকাতায় নামলে আজও রেফারিটার বডিগার্ড লাগবে।
দোভাষী অনুবাদ করামাত্র এতক্ষণ চোখ কুঁচকে থাকা মারাদোনা শরীর কাঁপিয়ে হাসতে শুরু করলেন, ”হাঃ, হাঃ হাঃ। আমার তো মনে হয় মালটা বিশ্বের যেখানেই যাবে সেখানেই ওকে নিরাপত্তা দেওয়া উচিত। এতগুলো প্লেয়ার ইনজিওর্ড ছিল আমার। কীভাবে লড়তে লড়তে ফাইনালে গিয়েছিলাম। একটা নারকীয় সিদ্ধান্তে পুরো লড়াইটা মিথ্যে করে দিল।”
আঠারো বছর কেটে গিয়েছে। অ্যাদ্দিনে নিশ্চয়ই মার্জনা করে দিয়েছেন লোকটাকে।
”ভাই ইতিহাস তো আর বদলানো যাবে না। স্কোরবোর্ড সেই ০-১ দেখিয়ে যাচ্ছে। আমি এটুকু নীরবে প্রার্থনা করে যাই যে রেফারিটা বিশ্বের আজ যেখানেই বাস করুক ওর মনে যেন কোনও শান্তি না থাকে।”
এই একটা প্রসঙ্গে পুরো বডি ল্যাঙ্গোয়েজ বদলে গিয়েছে দিয়েগোর। অভিজ্ঞ রিপোর্টারেরা জানেন, ইন্টারভিউ দুই প্রকারের হয়।
(ক) ডুয়িং দ্য ইন্টারভিউ। (খ) গিভিং দ্য ইন্টারভিউ। ডুয়িং মানে খুব যান্ত্রিক একটা ব্যাপার। কাজটা তুলতে হবে, তাই তোলা। আর গিভিং হল আনন্দ করে সাক্ষাৎকার দেওয়া।
এই মারাদোনাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি দুয়ের সীমান্তে। ঠিক এই সময় আর একটা প্রসঙ্গ দিতে হবে যাতে তিনি লাইন অফ কন্ট্রোল ত্যাগ করে দ্বিতীয়টায় চলে আসেন। সুতরাং পেলে। এত দ্রুত যাঁর সাক্ষাৎকারে আবির্ভূত হওয়ার কথা নয়। নর্মাল রুটিনে পেলে আসবেন সেকেন্ড হাফে। কিন্তু এই কথোপকথনের লাইফলাইনের বাটন পুরোটাই তো প্রতিপক্ষের হাতে।
পেলের নাম শুনে মারাদোনা চোখ টিপলেন। তারপর দোভাষীর অনুবাদ শুনে ভড়কে গেলাম। ”দিয়েগো কোনও খারাপ কথা পেলে সম্পর্কে বলবে না। তার কারণ পেলে গ্রেট ফুটবলার! দুর্ধর্ষ।”
বলে কী রে? অ্যাদ্দিনে যে শুনতাম দু’জনে খুব খারাপ সম্পর্ক। আর সম্পর্ক যদি ভাল হবে মারাদোনা প্রথমে চোখ টিপলেন কেন? তাহলে কি দোভাষীটা ভুল অনুবাদ করল? নইলে সামনে বসা লোকটা অনর্গল হেসে চলেছে কেন? দোভাষীর মুখেও প্রবল হাসি।
এবার সে বলল ”দিয়েগো খারাপ কথা না বললে কী হবে, কোনও ফূটবলারই যে পেলে সম্পর্কে ভাল কথা বলে না।”
মারাদোনা আরও বলতে লাগলেন, ‘আমাদের আসল তফাত হল, দিয়েগোকে ফুটবলাররা পছন্দ করে। এমনকী ব্রাজিল ফুটবল টিম খেলতে নামার আগে দিয়েগো অনায়াসে ওদের লকার রুমে গিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে আসতে পারে। পেলে সেখানে ঢুকতেও পারবে না।” কিছু পরে মারাদোনা এমনও দাবি করলেন, রিও তে ওপিনিয়ন পোলে দেখা গিয়েছিল তিনি প্রথম আয়ার্টন সেনা সেকেন্ড। পেলে থার্ড।
ব্রাজিল বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে বারবার মনে হত, কোন ওপিনিয়ন পোল এই রায় দিয়েছিল জানি না। আবিষ্কার করেছি, পেলেই ব্রাজিলের মুকুটহীন সম্রাট। তাঁর অবস্থান একেবারে আলাদা। এরপর নেইমার। তিন নম্বর জিকো। চার মারাদোনা।
তাছাড়া ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় এমন সাংঘাতিক ফুটবল বৈরিত্য যে এক দেশের মহানায়ককে আর এক দেশ বরণ করে নেবে, এমন দুরতম সম্ভাবনা নেই। নইলে জার্মানির বিরুদ্ধে কাপ ফাইনালে ব্রাজিলীয় জনতা মেসিকে সাপোর্ট করত। ব্রাজিলের ফুটবল জনতা আজও মনে করে, প্লেয়ার হিসাবে পেলে অনেক কমপ্লিট। হেডিং, পাসিং, স্কোরিং দু’পায়ে শুটিং কোথাও কোনও খুঁত নেই। মারাদোনা হতে পারেন তাঁর নিকটতম চ্যালেঞ্জার। কিন্তু তিনি চ্যাম্পিয়ন নন।
আর্জেন্তিনীয় জনতা অবশ্যই অন্য কথা বলে। জনতা কেন তাদের ফুটবল সমাজের কথাতেও মেসির অনেক আগে দিয়েগো। আর দিয়েগো তো পেলের মতো নিছক শ্রেষ্ঠ ফুটবলার নন, তাঁর ফুটবল মাঠের লড়াই জীবনের সব শ্রেণির মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস। মারাদোনার বাঁ পা শুধু বিপক্ষ ডিফেন্সই খান খান করে দেয়নি, প্রতিবাদী মানুষের পিস্তলের নল ঠেকিয়েছে রাজ সিংহাসনে। মারাদোনা শুধু শ্রেষ্ঠ ড্রিবলার নন, শোষিত মানুষের উচ্চচাকাঙ্খা পূরণের ছোবল।
মানুষটাও তাই। নইলে সম্পূর্ণ অপরিচিত সাংবাদিকের সঙ্গে কেউ এই টোনে কথা বলতে পারে? আজকালকার দিনে পেলে নিয়ে এসব কথা প্রাক্তনরা নিজের কলমে বিক্রি করবে। টিভি শোয়ে বলবে। ফ্রি-তে বিলোবে কোন দুঃখে?
কিন্তু মানুষটাই মনে হল এমন। দায়িত্বহীন উদাত্ততার সঙ্গে ঘন সহবাস। নইলে ব্রিটিশ প্রেস নিয়ে বলার সময় হঠাৎ দোভাষীর জন্য ওয়েট না করে বলে দিলেন”, ব্রিটিশ প্রেস হ্যান্ড অব গডের কথা বলে। ছেষট্টির ফাইনালে ওরা যে জার্মানিকে চুরি করে হারিয়েছিল, সেটা ভুলে যায়। সময় সময় ওদের স্মৃতিশক্তি খারাপ হয়ে যায়।”
কথা বলতে বলতে মিনিট কুড়ি হয়ে গিয়েছে। ভেবেই পাচ্ছি না ঘোরে আছি কিনা? লোকটার তো মনে হচ্ছে কোনও তাড়া নেই।
বললাম ডেভিড বেকহ্যামকে আপনি কেমন রেট করেন? মাঝে বেকহ্যাম নিয়ে যখন দারুণ হইচই হচ্ছিল আপনি কী ভাবছিলেন?
মারাদোনা ছোট একটা উত্তর দিলেন। যা শুনে তাঁর বন্ধু বডিগার্ড-দোভাষী- ম্যানেজার-সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। কী এমন মজার উত্তর এটা? সত্যিই মজার। যখন দোভাষী তর্জমা করলেন, ”আমি এটাই ভাবছিলাম বেকহ্যামকে খুব ভাল দেখতে।”
এবার দেহরক্ষী টোকা দিয়ে গেলেন, ফিনিশ। আঙুল তুলে বললাম, লাস্ট টু। মারাদোনাও হাত তুললেন। তিনটে আঙুল লাস্ট থ্রি প্লিজ।
ন’বছর হয়ে গেল আজও সেই ইন্টারভিউকে ভুলতে পারি না। পেলের সাক্ষাৎকার নিয়েছি কলকাতায় সবে গতবছর। কিন্তু এত নীরস আর প্রেডিক্টেবল যেন ব্যাকরণ ক্লাস করে উঠলাম।
মারাদোনা হলেন একটা গোটা ছায়াছবি। দুঃখ আছে। ফাইটিং আছে। নাচ আছে। গান আছে। কমেডি আছে।
আবার যদি কখনও দেখা হয়, টেপ রেকর্ড করার ভুল কিছুতেই করব না। লোকটা কি নিছক কণ্ঠ নাকি? একটা ডায়েমেনশনে কি ধরা যায় নাকি। ফুল ভিডিও করতে হবে। তারপর বারবার চালাতে হবে। স্বপ্ন দেখছি নাকি সত্য?
পেলে একনম্বর হতে পারেন, রক্তকনিকায় ঢুকবেন না।
রিওতেই তো ওরা বলে পেলে থার্ড, আমি ফার্স্ট
দিয়েগো মারাদোনা একটা অভিজ্ঞতা তো নিশ্চয়ই। তার সঙ্গে আরও কিছু। দোভাষী-বডিগার্ড আর এজেন্টের ভিড়ে মাত্র কুড়ি মিনিট হাতে নিয়ে
ওঁর নাটকীয় কোনও ইন্টারভিউ যে নেওয়া সম্ভব আমার আদৌ বিশ্বাস ছিল না। অথচ মারাদোনা এমনই স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি কিংবদন্তি আন্তর্জাতিক মেগাস্টার যে রঙিন করে দিলেন সাক্ষাৎকারটাকে। পিছন ফিরলে আজও ভিডিয়ো ফিল্মের মতো গোটা ব্যাপারটা দেখতে পাই। ওই যে মারাদোনা হো হো করে হাসতে শুরু করলেন বেকহ্যামের ফুটবল নিয়ে প্রশ্ন শুনে… ওই যে তাঁর হাসি দেখে ফেটে পড়ছে গোটা ঘর… ইন্টারভিউ হচ্ছে নাকি লাফটার চ্যালেঞ্জ রাউন্ড…
➤➤শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার হয়ে যাওয়া ভাল। সম্বোধন করব কী বলে আপনাকে? দিয়েগো, না মিস্টার মারাদোনা?
দিয়েগো। দিয়েগো। কোনও কথা আছে নাকি!
➤➤আপনি এমনই বিশাল ক্যানভাস যে ইন্টারভিউয়ের আগে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো। বেচারি ইন্টারভিউয়ার কোথা থেকে শুরু করবে? কোথায় হাত রাখবে? দিয়েগো, আপনি একটু সাহায্য করতে পারেন? বিশ্ববিখ্যাত মারাদোনাকে কী প্রশ্ন করা উচিত ইন্টারভিউয়ের শুরুতে?
ওর সঙ্গে যখন শুরু করবেন, একেবারে সিম্পল থাকবেন। যত সিম্পল হবেন তত ভাল। ও ভাবে শুরু করলে যে কোনও জায়গায় যেতে পারেন। যে কোনও প্রশ্নের উত্তর চাইতে পারেন। সব সময় মনে রাখতে হবে, লোকটা খুব সিম্পল।
➤➤আপনি কি জানেন, এই প্রদেশের বৃহত্তম বিভাজন আজ থেকে বাইশ বছর আগে আপনি ঘটিয়ে দিয়েছেন। বাইশ বছর আগে রাজ্যটা ছিল ব্রাজিলের অকৃত্রিম ভোটব্যাঙ্ক। আজ সেটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে এমন দাঁড়িয়েছে, শহরের গলিতে গলিতে জঙ্গি আর্জেন্তিনা সমর্থক।
ভেরি গুড। মনে রাখবেন, আর্জেন্তিনা টিম তার পতাকার ভালবাসার জন্য খেলে। হৃদয়ের ডাক শুনে খেলে। আর্জেন্তিনা হারতে পারে। জিততে পারে। কিন্তু আর্জেন্তিনার ফুটবলে হৃদয় থাকবে। আমাদের শপথ হল, মাঠে প্রথম হৃদয়টা উপুড় করো। তার ওপর ফুটবলটা ঢেলে দাও।
➤➤সে দিন সন্ধ্যাবেলা সল্টলেকে যাদের দেখলেন তাদের জন্যও কি আপনার একই প্রেসক্রিপশন? হারো-জেতো যাই হোক, ইন্ডিয়ান ভাইরা হৃদয় দিয়ে খেলো।
যে টিমের হৃদয় নেই, তাকে আমি টিম বলেই মনে করি না।
➤➤আপনি একজন ভিভিআইপি। আপনাকে ঘিরে বডিগার্ড, সৈন্যসামন্ত সব সময় থাকবে জানার কথা। কিন্তু আপনি কি জানেন, নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে যে রেফারি আপনার টিমের বিরুদ্ধে পেনাল্টি দিয়েছিলেন, কলকাতায় নামলে আজও তাঁর বডিগার্ড লাগবে! সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে অবশ্য। জঙ্গি কিছু আর্জেন্তিনা সমর্থক আজও লোকটাকে খুঁজে চলেছে।
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। আমার তো মনে হয়, মালটা বিশ্বের যেখানে যাবে সেখানেই ওকে নিরাপত্তা দেওয়া উচিত। এতগুলো প্লেয়ার ইনজিওরড ছিল আমার। কী ভাবে লড়তে লড়তে ফাইনালে গেছিলাম। একটা নারকীয় সিদ্ধান্তে পুরো লড়াইটাকে মিথ্যে করে দিল।
➤➤আঠারো বছর কেটে গেছে। এত দিনে নিশ্চয়ই নিজগুণে মার্জনা করে দিয়েছেন।
ভাই ইতিহাস তো বদলানো যাবে না। স্কোরকার্ড তো আজও ০-১-ই দেখিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু এটুকু প্রার্থনা করতে পারি, ওই কোডেসাল মেন্ডেস বিশ্বের যেখানেই থাকুক না কেন, ওর মনে যেন শান্তি না থাকে।
➤➤কলকাতার আর এক অতিপ্রিয় মানুষের কথা বলছি। যিনি আপনার বিরুদ্ধে নিয়মিত মন্তব্য করে তীব্রগতিতে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। হারিয়েছেন। পেলে। পেলে সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?
হাঃ হাঃ হাঃ। পেলে? পেলে সম্পর্কে কোনও খারাপ কথা দিয়েগো বলবে না। গ্রেট ফুটবলার। দুর্ধর্ষ!
➤➤তাই?
উত্তরটা শেষ হয়নি। সমস্যা হল, কোনও ফুটবলার পেলেকে দু’চোখে দেখতে পারে না। আমাদের মধ্যে আসল তফাতটাই হল দিয়েগোকে ফুটবল পছন্দ করে। ফুটবলাররা করে। দিয়েগো ব্রাজিল খেলতে নামার আগে ব্রাজিলের লকার রুমে গিয়ে প্লেয়ারদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসতে পারে। পেলের এমন হাল ব্রাজিলের লকার রুমেও ঢুকতে পারে না। আর্জেন্তিনা তো কোন ছার!
➤➤পেলে তা হলে চতুর, সুযোগসন্ধানী?
পেলে হল নিজের ক্ষীরটা খেয়ে যাওয়া লোক। সব লাইমলাইট নিজের ওপর রাখার লোক। সেটা করতে গিয়ে ফুটবল থেকে বারবার সরে গিয়ে যদি ফুটবল কর্তাদের গলায় উঠে পড়তে হয় তাতে ওর কোনও সমস্যা নেই। আর সেটাই পেলে করে থাকে।
➤➤একটা ব্যাপারে প্রায়ই খটকা লাগে। আপনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল। ব্রিটিশ মিডিয়া ওই গোলটার কথাই বারবার করে লেখে। অথচ গোলটা বাদ দিয়েও আপনার পরের গোলে তো এমনিতেই ওরা ১-০ ম্যাচ হারে। এমন তো নয় যে ‘হ্যান্ড অব গড’-এই মীমাংসা হয়েছিল। কেন জানি না, লিনেকারের গোলশোধের কথা তখন মনে পড়েনি।
ইংরেজদের বৈশিষ্ট্য হল, ইতিহাস যখন তখন প্রয়োজন মতো ভুলে যেতে পারে। ছেষট্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে একটা চুরি করে দেওয়া গোলে ওরা জার্মানিকে হারিয়েছিল। বলটা পুরো গোলেই ঢোকেনি। কিন্তু ওদের জিজ্ঞাসা করে দেখুন। মনেই করতে পারবে না। ওদের বিচিত্র ইতিহাস। যেখানে ‘হ্যান্ড অব গড’ আছে। ছেষট্টির চুরিটা নেই।
➤➤আচ্ছা ব্রিটিশ মিডিয়াকে কত দেবেন দশের ভেতর?
সাড়ে পাঁচ থেকে ছয়।
➤➤এই দু’টো রেটিং করে দিন। ইতালিয়ান আর ব্রাজিল মিডিয়া।
ইতালি….হুঁ হুঁ হুঁ…একটু ভাবি…তাও সাত পাবে। ব্রাজিল আট।
➤➤ব্রাজিল এত ভাল?
হ্যাঁ, ব্রাজিল মিডিয়া আমার ওপর খুব ফেয়ার। ওখানকার মানুষও। ব্রাজিলীয় সাংবাদিক এবং জনগণ—দুটো ওপিনিয়ন পেলেই আমি পেলেকে হারিয়েছি। পেলে আর একটা ওপিনিয়ন পোলেও সেকেন্ড হয়েছে। সেখানে হেরেছে আয়ার্টন সেনার কাছে।
সত্যি বলতে কী, নিজের দেশে ওপিনিয়ন পোল হারা থেকেই ওর আমার ওপর এত রাগ আর হিংসে।
➤➤আপনার আর পেলের যখন দেখা হয় তখন কী কথা বলেন?
আমরা কথাই বলি না।
➤➤সে কী?
দু’টো লোকের ফুটবল সম্পর্কে ভিন্ন চিন্তা। জীবন সম্পর্কে আলাদা দর্শন। কোথাও কোনও কিছুতে মিল নেই। কথা বলে কী হবে?
➤➤সবাই উত্তর খোঁজে মারাদোনার পর কে? মারাদোনা নিজে কী উত্তর পেয়েছেন?
রোনাল্ডিনহোর নাম করব। মেসির কথা বলব। এরা কেউ এক নম্বর হয়নি। তবে প্রচুর আনন্দ দিয়েছে। সত্যি বলতে কী, ছিয়াশির পর থেকে আমার অবস্থাটা রূপকার্থে বোঝাতে হবে। আমি আর পেলে যেন আকাশের নিঃসঙ্গ দুই নক্ষত্র। যাদের কাছে আসার চেষ্টা করেও কেউ কাছে আসতে পারেনি।
➤➤বেকহ্যাম নিয়ে মাঝে খুব হইচই হচ্ছিল। আপনি তখন কী ভাবছিলেন?
ভাবছিলাম বেকহ্যামকে খুব ভাল দেখতে।
(হাসিতে ফেটে পড়ল গোটা ঘর। মারাদোনার দেহরক্ষী, বান্ধবী, দোভাষী। হাসি থামছে না কারও। এবার হাসি থামিয়ে)।
আমি প্রথম থেকেই বলেছিলাম, বেকহ্যামকে দিয়ে কিছু হবে না। কোনও দিনও এক নম্বর হবে না। প্রেস ওকে চড়িয়ে এমন বাজার করেছে যে, বেচারির প্রাণ যেতে বাধ্য। দিনের শেষে আমার মন্তব্য চান? বেকহ্যামের মার্কেটিং ঠিক আছে, ফুটবলটাই নেই।
➤➤তা হলে ফাইনাল রেটিং কী দাঁড়াল? মারাদোনা এক, পেলে দুই, তিন পাওয়া যাচ্ছে না।
পেলের পাড়া রিওতেই তো ওরা বলে, পেলে থার্ড। মারাদোনা ফার্স্ট, গ্যারিঞ্চা সেকেন্ড। গ্যারিঞ্চাকে অনেকে বেশি নম্বর দেয়।
➤➤চুরানব্বইয়ের বিশ্বকাপে মাদক নিতে গিয়ে আপনার ধরা পড়া নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ডোপ টেস্টটা ঠিক ছিল। কেউ কেউ বলেন, আপনাকে ফাঁসানো হয়েছিল। কোনটা ঠিক?
হান্ড্রেড পারসেন্ট ফাঁসানো হয়েছিল। আজ পর্যন্ত কেউ প্রমাণ করতে পারেনি, পারফরম্যান্স বলবর্ধক কোনও ড্রাগ নিয়েছিলাম বলে। নাইজিরিয়াকে আমরা হারানোর পর যে-ই হইচই শুরু হল, সবাই বলতে লাগল আমরাই অবধারিত ওয়ার্ল্ড কাপ জিতব, অমনি ওর মাথাটা ঘুরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ষড়যন্ত্র শুরু করল দিয়েগোকে কী করে টাইট দেওয়া যায়।
➤➤’ওর’ মানে কার? মার্কিন প্রেসিডেন্টের?
না, না। ওই যে হ্যাভেলাঞ্জের। হ্যাভেলাঞ্জ তখন ফিফা মহাকর্তা। যে-ই দেখল আর্জেন্তিনাকে নিয়ে নাচানাচি শুরু হয়েছে, তখনই ব্রাজিলীয়র মুখ শুকিয়ে গেল। এমনিতেই রাজনীতি ফিফাতে খুব চলে। এ বার একদম জোর কদমে নেমে পড়ল।
➤➤হ্যাভেলাঞ্জ সম্পর্কে এখন আপনার কী মনোভাব?
কোনও মনোভাব নেই এটাই মনোভাব।
আপনাকে যারা ভালবাসে বা ঘৃণা করে দু’পক্ষই একই রকম সঙ্কটে আক্রান্ত হয়। চোখের সামনে তারা দুই মারাদোনাকে দেখে। একটা লোক, যে শিশুদের প্রচণ্ড ভালবাসে। হৃদয় থেকে কথা বলে। বাচ্চচাদের পাশে দাঁড়ায়। আর একটা লোক, যে কথায় কথায় অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ে। জার্নালিস্টকে হোসপাইপ দিয়ে জল ছিটিয়ে দেয়। যখন তখন বিস্ফোরক সব কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ে।
➤➤কোন মারাদোনাটা আসল? এক না দুই?
দিয়েগো একটাই। সেই মানুষটা খুব ফেয়ার। ভেতর থেকে ভালবাসে। শ্রদ্ধা পেলে নিজের বড় হৃদয়টাকে উপুড় করে দেয়। শ্রদ্ধা পাওয়াটা ওর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। দিয়েগো মনে করে, তুমি ফুটবল প্লেয়ার হতে পার, সাংবাদিক হতে পার, সবার আগে তুমি মানুষ হও। ওই মিটিং পয়েন্টটায় এসো। তারপর আমরা তরতরিয়ে এগোব। কিন্তু তোমার মধ্যে শ্রদ্ধাই যদি না থাকে তা হলে এগোব কোথায়?
➤➤ব্রিটিশ প্রেস কি এই শ্রদ্ধাটাই আপনাকে দেয়নি?
ওরা আসলে আমার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটা আজও ভুলতে পারেনি। আর তার পর থেকে তাই কখনও আমার ইন্টারভিউ নিতে আসেনি। তাতে আমার কোনও সমস্যা নেই। এই সুন্দর পৃথিবীতে ওরা যদি দিয়েগো মারাদোনা ছাড়া বাঁচতে পারে তা হলে দিয়েগো মারাদোনাও ওদের ছাড়া পরম সুখে বাঁচতে পারে।
➤➤রানির ভাষাটা শিখলেন না কি জাতটার প্রতি রাগে?
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ (হাসি থামছে না)। আমি অন্তত দশ বার চেষ্টা করেছি শেখার। সফল হইনি। তারপর মনে হল ইতালিয়ান ভাষাটা এত ভালবাসি। ওটা নিয়ে থাকাই ভাল। আর একটা কথা। ভেতর থেকে ইংরেজি ভাষাটা আমার এতটুকু ভাল লাগে না।
➤➤ইতালির কথা বলতে মনে পড়ল ওখানে কাটানো আপনার অন্ধকার সময়ের কথা। ড্রাগ, মাফিয়া, মহিলাচক্র। মনে করা যাক, কাল আর্জেন্তিনার কোনও উঠতি ফুটবলার নাপোলিতে খেলতে যাচ্ছে। কী পরামর্শ দেবেন তাকে? কী ভাবে সে অন্ধকার জগতের খপ্পরে পড়া থেকে দূরে থাকবে?
(এই প্রথম উত্তরের জন্য সময় নিলেন) এটা বলা খুব মুশকিল। প্রত্যেকের জীবন আলাদা। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই আলাদা। এটা আমি বলতেই পারি যে, বন্ধু, দিয়েগো যা-যা সব করেছে সেগুলো রিপিট কোরো না। গাড্ডায় পড়ে যাবে। কিন্তু দিনের শেষে জীবনটা তার নিজের। কে কী ভাবে এগুলো হ্যান্ডল করবে সেটা নির্ভর করে কোন পরিবার থেকে সে এসেছে? উত্তরাধিকার সূত্রে কী কী পেয়েছে? তার বাবা-মা’র কাছে কী শিখেছে? আজ মাদার টেরেসার হোমে গিয়ে দেখছিলাম একটা জায়গায় লেখা, এভরিথিং স্টার্টস ইন দ্য ফ্যামিলি। নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি, এর চেয়ে খাঁটি কথা আর হয় না।
➤➤আপনি এমন একটা জীবনে অভ্যস্ত, যেখানে সারা পৃথিবী জুড়ে আপনার সমর্থকেরা আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। আর নানান সব বর চায়। যে ভাবে লোকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে। কখনও চেয়েছে আর্জেন্তিনাকে বিশ্বকাপে জিতিয়ে দিন, কখনও বলেছে নাপোলিকে লিগ শীর্ষে নিয়ে যান। এখন বলা শুরু করেছে যে, কোচ হয়ে আর্জেন্তিনাকে আপনার বিশ্বকাপ দিতে হবে। ভক্তদের প্রার্থনা-প্রার্থনায় নিশ্চয়ই ফুটবল ঈশ্বরের প্রাণ জেরবার। জানতে ইচ্ছে করছে, সেই আপনি যখন প্রার্থনায় বসেন—কী বর চান? কীসের আব্দার করেন ঈশ্বরের কাছে?
বর চাওয়া-টাওয়া বহু দিন ছেড়ে দিয়েছি। মাঝখানে একটা সময় প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। প্রায় মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরে এসেছি। সেখান থেকে ফিরে এসে আজ এই সুস্থ, সবল চেহারায় দেশ ঘুরছি, এখানে ইন্টারভিউ দিচ্ছি, সেটাই তো ঈশ্বরের সব চেয়ে বড় কৃপা।
তবু কখনও-সখনও যদি কিছু চাইবার হয়, সেটা চাই আমার দুই কন্যার জন্য। এটা জানলে আমার বাবা-মা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। এখানে আমার বান্ধবী ভেরোনিকা বসে শুনছে, ওর খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু প্রকৃত সত্য এটাই যে, ওদের জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে কিছু চাই না। আমার নিজের জন্যও কিছু চাই না। ঈশ্বর যেন শুধু আমার মেয়ে দু’টোকে সুখে রাখেন।
➤➤এত সব চমক পরতে পরতে মিশে আছে আপনার জীবনে। কখনও কি ফিরে তাকিয়ে ভেবেছেন, নিজেকেই নিজে চমৎকৃত করে দিচ্ছেন মোড়ে মোড়ে সব আকর্ষণীয় ঘটনায়?
একেবারেই নয়। চমক তৈরির ক্ষমতা এবং দূরদর্শিতা দু’টোই আমার মধ্যে আছে। বাইরে থেকে যেগুলো চমক মনে হয়, সেগুলো আমার ভেতর থেকেই তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আমি সজ্ঞানে থাকি। তা হলে সেগুলোকে চমক বলব কী করে?
এর পরেও বলব, কলকাতায় আমাকে ঘিরে যা দেখলাম তাতে কিন্তু আমি চমৎকৃত। আর আমাকে আশ্চর্য করাটা মোটেই সহজ নয়।
➤➤শুনছি কলকাতার ভালবাসায় ভিজে আবার নাকি এখানে ফিরবেন?
ঠিক শুনেছেন। আমার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি ভারতীয় ফুটবলকে সাহায্য করতে চাই। ভারতকে অন্তত সেকেন্ড লেভেলে যাতে নিয়ে আসা যায় তার জন্য যে যথাসাধ্য করব, কথা দিয়ে গেলাম।
(দেহরক্ষী টোকা দিয়ে গেলেন। অনেক হয়েছে, এবার লাস্ট কোয়েশ্চেন। আমি বললাম, প্লিজ লাস্ট টু। মারাদোনা আঙুল তুলে দেখালেন লাস্ট থ্রি।)
➤➤কলকাতা তা হলে আপনার জন্য অপেক্ষায় থাকবে?
বলছি তো, আমাকে যে ভালবাসা দেওয়া হয়েছে তাতে মনে হচ্ছিল, বিদেশে আসিনি। বাড়িতেই রয়েছি। আশা করব, পরের বার ফিরে দেখব এই শহরে ব্রাজিলীয় শার্ট-টার্ট কেউ না পরে সবাই আর্জেন্তিনারটাই কিনছে। (হাসি)।
➤➤হাত দেখানোয় বিশ্বাস করেন?
করি।
➤➤জ্যোতিষীর পরামর্শ মেনে কাজ করেন?
না, ও সব মানি না।
➤➤আপনি কি জানেন, ভারতে বলিউড নামক একটা ইন্ডাস্ট্রি আছে? ক্রিকেট বলে একটা খেলা আছে?
ইয়েস, ক্রিকেট আমি জানি।
➤➤কী করে জানলেন?
আরে আমি এ-ও জানি যে, ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিমটা দারুণ। রিসেন্টলি আপনারা ইংল্যান্ডকে সলিড হারিয়েছেন। এক দিন একটা ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যেতে চাই।
➤➤আপনাকে সবাই জানে প্রশাসন-বিরোধী মানুষ হিসেবে। বিদ্রোহী হিসেবে। সেই আপনি কোচ হয়ে গেলেন। কোচও তো প্রশাসনের অংশ। আপস করতে হবে না চিরবিদ্রোহী মারাদোনাকে?
যে মুহূর্তে দেখব আপস করতে হচ্ছে, প্রশাসনের অংশ হয়ে যাচিছ, তখনই দায়িত্ব ছেড়ে দেব। আমি টিমটাকে কোচ করতে রাজি হয়েছি ফুটবলারদের জন্য। কর্তাদের কথা ভেবে নয়। সব কিছু পিছনে রেখে যাতে একমাত্র ফুটবলাররা উপকৃত হয়। দেশের ফুটবলটা বাঁচে। ফুটবল কর্তারা আমাকে স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করছে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আমাকে একমাত্র বাড়িতেই পাওয়া যাবে।
➤➤থ্যাঙ্ক ইউ-কে স্প্যানিশে কী বলে?
গ্রাসিয়াস।
➤➤দিয়েগো, গ্রাসিয়াস।
থ্যাঙ্ক ইউ-কে আপনাদের ভাষায় কী বলে?
➤➤ধন্যবাদ।
ঢান্যাবাদ। ঢান্যাবাদ।
২০০৮ মার্চ
