মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

কাতার ২০২২

কাতারের গর্ভগৃহে

দিল্লি আর দোহা দুটোই ডি দিয়ে শুরু। কোথাও এসে দুই রাজধানী যেন আমার জন্য মিলে গেল। চল্লিশ বছর আগে আগমার্কা স্পোর্টস ফ্যানের মতো জীবনের প্রথম চাকরির টাকা থেকে বাঁচিয়েটাচিয়ে বুক ঠুকে চলে গেছিলাম দিল্লি এশিয়ান গেমস। বিরাশির এশিয়াডের ওপর আকাশবাণী কলকাতার ইংরেজি বিভাগ তিনটে স্পোর্টস প্রোগ্রাম করিয়েছিল। তা থেকে একপিঠের ট্রেনের টিকিটও খরচ ওঠেনি। জানতাম না যে পরের মাসে ‘টেলিগ্রাফ’ পত্রিকা থেকে অতর্কিত ইন্টারভিউ অফারে জীবনটাই বদলে যাবে। খেলা দেখার জন্য আর খরচ করতে হবে না।

আবার কে জানত, সাংবাদিক জীবনের চারদশক পূর্ণ হওয়ার মাত্র আট সপ্তাহ আগে আমার কর্মজীবনে যে নাটকীয় পরিবর্তন আসবে এবং জি ২৪ ঘণ্টা থেকে সম্পাদক হিসেবে পদত্যাগ করে ফ্রি ল্যান্সার হিসাবে কাতার বিশ্বকাপে হাজির থাকবো। সেই নিজের খরচে প্লেনের টিকিট কেটে। বিশ্বপর্যায়ের কোনো টুর্নামেন্ট কখনো এমন মজা করে উপভোগ করার সুযোগ পাইনি।

কাতার থেকে লেখা বা চ্যানেলে মুখ দেখানোর সুযোগ থাকলেও আপাতত না। ক’দিন পর ভাবা যাবে। শুধু নিজের ফেসবুক পেজে আপনাদের জন্য কয়েকদিন লিখব। এক-আধটা ভিডিওও করতে পারি। পুরো টুর্নামেন্ট থাকবো কিনা ঠিক করিনি। এত কভারেজ-টেনশনে গোটা জীবন কাটিয়েছি যে স্ত্রী বারবার ঠেলাঠেলি করে কাতার না পাঠালে জীবনের চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা বাকি থেকে যেত।

গত দু’তিন দিন যখন ইচ্ছে স্টেডিয়াম ঘুরে ঘুরে খেলা দেখছি। ডেডলাইনের ভয়ঙ্কর চাপ নেই। লেখা পাঠানো, অনিচ্ছুক ভিনদেশি তারকাকে ইন্টারভিউতে রাজি করানো বা বাইট জোগাড়ের ব্যস্ততা নেই। হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল আমার বরাবরের প্রিয় জার্মান ফুটবলারের সঙ্গে। জুরগেন ক্লিন্সম্যান। পাশেই ছিলেন দিয়েগো ফোরলান। ক্রিকেট-ফুটবল মিলে কভার করা আগের ১৬ বিশ্বকাপে সঙ্গে লেপটে ছিল মারাত্মক টেনশন মাখা জীবন। এটা বিন্দাস। ওটা যদি ম্যাচ হয়। এটা নির্মল নেট প্র্যাক্টিস।

জীবন অবশ্য শিখিয়েছে প্র্যাক্টিসে থাকা সবসময় স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী।

সেই কোন কালে লর্ডস জাদুঘর থেকে কেনা জ্যাকেট টানা তিনটে বিশ্বকাপে গায়ে থাকলো। ২০১৪-২০২২। প্রথম লেখার বিষয়ও— মেসি-রোনাল্ডো।

জীবনে কিছু কিছু জিনিস কি বদলায় না?

দোহা, ৩০ নভেম্বর

শান্তিতে ঘুমোও ফুটবল ভক্তেরা

কোন একটা বিদেশী ডিজিট্যালের দোহা ম্যাচ রিপোর্টের প্রথম প্যারাটা পড়ে দারুণ লাগল। গোটা কাহিনী এর মধ্যে বলা আছে? রেস্ট ইজি সকার ফ্যানস। হি উইল গ্রেস দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ স্টেজ ফর অ্যাট লিস্ট ওয়ান মোর ম্যাচ।

একটা বড় ভয় শেষ অবধি ছিল যে শেষ ষোলোতে না অতর্কিত বড় প্রতিপক্ষ মেসিদের সামনে চলে আসে। সেটা হতে পারে স্পেন। হতে পারে ফ্রান্স। সেই ভয় অন্তর্হিত। শেষ আটে যাওয়ার জন্য শনিবারের অস্ট্রেলিয়া কি আদর্শ বিপক্ষ নয়? সে যতই দোহা বিশ্বকাপে চমকে দিক।

কিন্তু তার আগে হাল্কা ফ্ল্যাশ ব্যাকে গেলে দেখা যাবে পোলিশরা ডেকে এনেছিল ভয়ঙ্কর শিরশিরানি। বাঙালিরা না হয় আর্জেন্টিনা নিয়ে বাড়তি অনুভূতিপ্রবণ। সেই ছিয়াশি সালে নীল-সাদা জার্সির এক বেঁটের কাছে হৃদয় খুইয়েছিল এবং আজও ভালোবাসার এমন দাম দেয় যেন লায়লা মজনুর মতোই যুগোত্তীর্ণ প্রেম। মারাদোনার সেই ভারি উত্তরাধিকারকে এমন সিংহাসনে উন্নীত করেছেন মেসি যে বাংলা—বাংলার বাইরে পৃথিবীর প্রতি কোণে যেখানে ফুটবলের স্পর্শ পড়ে, সেখানেই তিনি সমাদৃত। দোহাতে কাল তাঁর সম্ভাব্য বিদায়ী ঘন্টাকে কেন্দ্র করে যে আকুতি দেখা গেছিল তা নিছক বিশ্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার হয়েও পাওয়া যায় না। তাঁকে ফুটবল ছাপিয়ে টেক অফ করতে হয় গান, কবিতা, শিল্পে। কোথাও গিয়ে হয়ে দাঁড়াতে হয় জীবনের মানে।

মিডিয়া আকর্ষণ একটা সূচক তো বটেই। আর সেই সূচকে দোহা-তে দাঁড়িয়ে ব্রাজিল, এম্ব্যাপে, নেইমার এমনকি রোনাল্ডোকেও সুক্ষ চুলের তফাতে রেখে বৃহত্তম আকর্ষণবিন্দু তিনি। এখানে এসে প্রচুর সাংবাদিককে পেলাম যাঁরা টুর্নামেন্টের শুরুর দিন থেকে আজও মেসি ম্যাচের টিকিট পাননি। বিশ্বপর্যায়ের টুর্নামেন্টগুলোতে নিয়ম হল আপনি মূল অ্যাক্রেডেটিশন যতই পান না কেন,পৃথক ম্যাচপিছু অ্যাক্রেডেটিশন দরকার পড়ে। মনে করা যাক উইম্বলডন কভার করতে এসেছেন। প্রথম দু’তিন রাউন্ড সমস্যা হবে না। কিন্তু যত খেলা এগোবে তত ম্যাচপিছু পাসের দরকার হবে। উইম্বলডন কভার করেছেন কিন্তু ফাইনালে প্রেস বক্সে জায়গা পাননি এমন সাংবাদিক সংখ্যা ভুরি ভুরি। কিন্তু টেনিস স্টেডিয়ামগুলোর না হয় মিডিয়া এনক্লোজারে জায়গা কম। ফুটবল মাঠে তার সংখ্যা অনেক বেশি। আর তাতেও মেসির ম্যাচের জন্য সাংবাদিকদের জায়গা করা যাচ্ছে না। ফিফার লোকেরা বলছিলেন, এত দূর দূর দেশ থেকে মিডিয়ার লোকেরা এসেছেন। আমরা তো চাই সবাইকে জায়গা দিতে। কিন্তু আর্জেন্টিনা ম্যাচে এত চাহিদা যে পেরে উঠছি না। জানলাম কাল মেসি ম্যাচে ওয়েটলিস্টের সংখ্যা ছিল আশির কাছাকাছি। তা থেকে মাত্র চারজনকে জায়গা দেওয়া গিয়েছে। অকল্পনীয় অবস্থা।

আমি নিজে দোহা পৌঁছনো থেকে এই ক’দিনে কালকের ব্রাজিল -ক্যামেরুন অ্যাপ্লাই করে পেলাম। রোনাল্ডোর পর্তুগাল দু’বারে দু’বার। জার্মানি-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স কোনো ম্যাচ সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু আর্জেন্টিনা হলেই ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট এ তরী। মিডিয়া সেন্টারে ভাগ্যিস একটা বিকল্প ব্যবস্থা আছে ভার্চুয়াল স্টেডিয়ামের। নন্দন টু-র মতো একটা হলে প্রোজেকশন করে শুধু ম্যাচ দেখানো হয় না। সঙ্গে-র যে সব শটগুলো বিভিন্ন পজিশনে থাকা টিভি ক্যামেরা তোলে। কখনো প্রোডিউসার যা ব্যবহার করেন। কখনো করেন না। সেগুলোও দেখানো হয়। তাই মনে হয় যেন মাঠে বসে রয়েছি।

কাল ভার্চুয়াল স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালীন শুধু পাস না পাওয়া সাংবাদিকেরা নন, টেকনিক্যাল লোক, আইটি কর্মী ,কেটেরারের লোক সবাই চলে এলেন ম্যাচ দেখতে। দেখে মনে হচ্ছিল গিলবার্ট জেসপকে যথেষ্ট বড় ব্যাটসম্যান নয় বলে কটাক্ষ করায় প্রত্যুত্তরে কার্ডাস বলেছিলেন, হয়তো ঠিক, কিন্তু পাবে বসে বিয়ারের গ্লাস ছেড়ে লোকে তখনি ছুটে আসতো যখন জানতো জেসপ ব্যাট করতে এসেছে। ক্রিকেটইতিহাসে নাকি তাঁর চেয়ে দ্রুত রান করিয়ে কখনো আসেনি। ১৮ টেস্টে ২১ গড় নিয়ে শেষ করা জেসপ প্লেয়ার হিসেবে মেসির অনেক নিচে। কিন্তু আকর্ষণের মাহাত্ম্য দেখে প্রাচীন ক্রিকেটগাথা মনে পড়ে গেল।

মেসি মাঠে থাকা মানে সবাই যে যার কাজ ফেলে মেসিয়ানার একাত্ম হয়ে যাওয়া। কখনো তা গভীর সুখের। কখনো শিল্পের। আবার শিরশিরানির। কুড়ি ঘন্টা বাদে অন্য মাঠে বেলজিয়াম-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ কভার করতে এসে প্রেস সেন্টারে জটলা শুনলাম —পেনাল্টি গোল না পেয়ে মেসির ভাল হয়েছে। গোল হলে মিনি কলঙ্ক হয়ে থাকত। দেখে মনে হল লুকা মদ্রিচ এবং তাঁর জাদুগরি উপেক্ষা করে, লুকাকুর মতো তারকা ও বেলজিয়ামের মতো বিশ্ব ক্রমপর্যায়ে দ্বিতীয় ফুটবল-দেশের প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার লাল আলো দূরে সরিয়েও পয়েন্ট অফ রেফারেন্স একটাই লোক। আর্জেন্টিনাকে কাপ দিতে শেষ পর্যন্ত পারুন বা না পারুন—মারাদোনাকে শ্রেষ্ঠত্বের একটা মাপকাঠিতে তিনি ধরে ফেলেছেন। টানা তিন বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠ চৌম্বকীয় ঝাড়লণ্ঠন হয়ে।

রোনাল্ডোর আবেদন অন্যরকম। মেসি যতটা অন্তর্মুখী। রোনাল্ডো ঠিক ততটাই কথা না বলেও সোচ্চার। উরুগুয়ে ম্যাচে তিনি ঢোকা মাত্র মনে হল স্টেডিয়ামের সবকটা আলো এবার জ্বলতে শুরু করে দিল। চার বছর আগের রাশিয়া বিশ্বকাপে যত সপ্রতিভ দেখেছি এবার তুলনায় ম্লান। চাপের মুখে সামনে ড্রিবল করে আটকে যাচ্ছেন। বিখ্যাত সেই নাকল বল ফ্রি কিক রাশিয়া বিশ্বকাপে সোচির মাঠে যেমন স্পেনকে বিধ্বস্ত করেছিল, এবার তার দেখা নেই। কিন্তু রোনাল্ডোর পর্যায়ের স্কিল সেটা পুনরুদ্ধার করতে কতক্ষণ? আর টিভিতে যেটা দেখা যায় না তা হল, তিনি আগের মতোই ফিট। অবিরাম দৌড়ে যাচ্ছেন আক্রমণের সঙ্গে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তিনি মাঠে ঢোকা মানে এমন অবিরাম চিৎকার শুরু হয়ে যাওয়া রোনাল্ডো, রোনাল্ডো যেন নিজেও নিরুচ্চারে বলছেন দ্য নাম ইজ রোনাল্ডো। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

উপযোগিতার দিক থেকে পর্তুগাল টিমে ব্রুনো ফার্নান্ডেজ বা আর্জেন্টিনায় তিনি জুলিয়ান আলভারেজ—এই মুহূর্তে অনেক এগিয়ে। একজন ম্যান ইউ-র নক্ষত্র। একজন ম্যান সিটি-র। নিজের নিজের টিমকে আগামী কদিন তাঁরা কীভাবে টানবেন তার ওপর অনেক হিসেবনিকেশ, অনেক আবেগের গঙ্গাযমুনা নির্ভর করে থাকবে। তা বলে আকর্ষণ যে দুই ব্যক্তির ওপর ছিল, তাঁদের থেকে সরার কোনো লক্ষণ নেই। নিজেদের মধ্যে তাঁরা ভাগ করেছেন একডজন ব্যালন ডিওর। নটা চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ খেতাব। ষোলো বছর ধরে ক্রমাগত এঁরা বিশ্বমঞ্চে ফুটবল জিনিয়াসের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। সমকালীন খেলার জগতে একমাত্র তুলনা ফেডেরার আর নাদাল। মেসি যদি ফেড এক্স হন তো তিনি রোনাল্ডো —বন্যস্বাস্থ্য ও আথলেটিসিজমের অনন্য নমুনা।

শেষ ষোলো এবার কিভাবে তাঁদের সমাদর করে সেটা দেখার জন্য শুধু সমকাল নয়, শুধু দোহা-র কোটি কোটি টিভি দর্শক নয়, ফুটবল ইতিহাস অপেক্ষায় থাকবে। তবে ওই যে লিখলাম আবেগে মেসি এগিয়ে। রোনাল্ডো যদি পুঞ্জীভূত আবেগ হন। তিনি মেসি সাক্ষাৎ আগ্নেয়গিরি। বালিতে ভরা শুকনো মরুশহরে সেই লাভাস্রোত বয়েই চলেছে।

আর্জেন্টিনীয়দের ফুটবল শৈলী দেখে ১৯৬৭-তে ইংল্যান্ডে সফরকারী পতৌদির টিমের সম্মানে আয়োজিত ডিনারে নেভিল কার্ডাসের সেই বক্তৃতা মনে পড়ে গেল। ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার এখনো সেই বক্তৃতার উল্লেখ করে থাকেন। কার্ডাস বলেছিলেন, আমি যদি পতৌদির নবাব হয় তাহলে ব্রায়ান ক্লোজ যে পদ্ধতিতে খেলে জেতে নয়। রঞ্জির আত্মা যে ভঙ্গিতে খেলে হারলেও খুশি হবে সেই ভাবে খেলতে চাইব।

মেসিদেরও কি কাল কেউ প্রাক ম্যাচ মনে করিয়ে দিয়েছিল, যে সাউথগেট যে ভঙ্গিতে খেলে জিততে চায়। তার চেয়ে দিয়েগো যেভাবে খেলে হারলেও খুশি হত সেই অনাবিল প্যাসনেট ভঙ্গিতে খেল!

দোহা, ১ ডিসেম্বব

জার্মান স্বপ্নের মরুসমাধি জার্মান স্বপ্নের নতুন গোলাপ

মাত্র কয়েকদিন আগে দু’জনের সাক্ষাৎটা মনে পড়ছে। লুসেইল স্টেডিয়ামের সাততলায় দাঁড়িয়ে তিনি ডিয়েগো ফোরলান আকুলভাবে বলছিলেন জুর্গেন ক্লিন্সম্যানকে যে ”জার্মানি এটা কী খেলছে?”

ছবি তোলার জন্য এক হাতের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম বলে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনটা কানে এল। ক্লিন্সম্যান এত দেশে খেলেছেন। তাই ইংরেজি বোঝেন। আর ফোরলান তো বলতে পারেনই। উরুগুয়েন বলছিলেন, ”জার্মানি এত ছোট ছোট পাসে খেলছে কেন? লম্বা ক্রসগুলো কোথায় গেল?” ক্লিন্সম্যান মাথা নাড়ান। একমত মনে হল। এবার বললেন, ”উরুগুয়েরই বা কী হল? খুলে আক্রমণ করছে না কেন?” ফোরলানের কাঁধ ঝাঁকানো দেখে মনে হল তাঁর কাছেও কোনো উত্তর নেই।

শনিবার দোহা-র মিডিয়া সেন্টারে বসে ভাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম যে এখানে টিভি বিশেষজ্ঞ হিসেবে অবতীর্ণ দু দেশের প্রাক্তন দুই সুপারস্টারও কি তাঁদের দেশজ টিমের সঙ্গে দেশে ফিরে গেলেন? এদের মিডিয়ার কাছে যা শুনলাম দু’দেশেই বিশ্বকাপ থেকে গ্রুপ লিগের দ্রুত বিদায়ে খুব খারাপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে। বিশেষ করে জার্মানিতে। কাগজের হেডলাইনগুলো বোঝার জন্য যথেষ্ট: ‘শীতের মহাআতঙ্ক।’ ‘পাহাড়প্রমাণ লজ্জা’। ‘ফুটবলবামনত্ম।’

জার্মান মিডিয়া বলতে গিয়ে একটা লেখার কথা মনে পড়ে গেল। এগুলো পড়লে ভারতীয় ক্রিকেট তারারা বুঝতেন, বিশ্বপর্যায়ে সমালোচনা কাকে বলে। বুঝতেন তাঁরা যে সবে এত গোঁসা করেন তা স্রেফ মশার কামড়। লেখাটা শুরু বাধ্যতামূলক পরামর্শ দিয়ে : বন্ধুরা, আপনারা এই গ্রীষ্মে যদি বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান করে থাকেন প্লিজ এমন হোটেল খুঁজতে চেষ্টা করবেন যা আরামদায়ক কিন্তু যেখানে ঘরের মধ্যে টিভি নেই। কেন? টিভি থাকলে ভুল করে আপনি সেটা খুলে ফেলতে পারেন। আর খুললেই হয়তো দেখবেন জার্মান ফুটবল টিম খেলছে। আর তখন ওদের ছন্নছাড়া খেলার ধরণ দেখে নির্ঘাত আপনার গোটা ছুটি মাটি হয়ে যাবে।

জার্মান মিডিয়াতে দেশের টিমকে নিয়ে আগাম কী হুল ফোটানো হয়েছিল বোঝা গেল? তারা নিশ্চয়ই প্রথম রাউন্ডের উপর্যূপুরি বিশ্বকাপ বিদায়ে উল্লসিত হয়ে গর্জন করছে? আজ্ঞে না। এটা লেখা হয়েছিল আজ থেকে আট বছর আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপের প্রস্তুতি লগ্নে। যখন জোয়াকিম লো-র টিম ভালো খেলছিল না। লো শুধু খুব হ্যাণ্ডসাম নন, চটপট হাঁটা চলা, বয়েস আন্দাজে দারুণ সপ্রতিভ। শাহরুখ খানের মতো শরীরী ভাষায় নীরব মস্তানি আছে। কাপ জেতার পর শুধু জার্মান মিডিয়াকে সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, ”কী এখন সবাই তৃপ্ত তো?” বাক্যটার এভাবেও অনুবাদ করা যায় —এখন আর ছুটিতে গিয়ে টিভি খোলার সমস্যা নেই তো?

হ্যান্সি ফ্লিক বায়ার্ন মিউনিখকে নিয়ে অতীতে যতই মস্তানি করুন ,জার্মান টিমে এখন তাঁকে নিয়ে কী করা হবে সেই প্রশ্নের সামনে পড়বেন। উরুগুয়ের সামনে তো নানাবিধ বিকল্প নেই। তার কোচ অন্যরকম প্রশ্নের সামনে পড়ছেন যে সুয়ারেজকে কি টুর্নামেন্টে আরও বেশি খেলানো উচিত ছিল না? কেউ কেউ বলছেন ,এই বয়েসে সুয়ারেজের পুরো নব্বই মিনিট খেলার মতো ফিটনেস ছিল না? কিন্তূ জার্মান কোচ আগুনে সমালোচনা শুনছেন যে ম্যানুয়েল নয়্যার এবং এই ফর্মের টমাস মুলারকে তিনি দলে বেছেছিলেন কী করে? নয়্যার নিজের ফর্মে থাকলে কোস্টা রিকা গোলই করতে পারতো না। আর টমাস মুলার —যাঁকে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মনে হয়েছে গোল না পেলে ক্ষুধার্ত নেকড়ে হয়ে ওঠেন,তাঁকে দোহা-তে দেখাল সেই শান্তিপ্রিয় বাঙ্গালি গেরস্থ যিনি করুণাময়ীর কাছে পি এফ অফিসে নিজের পেনশনের টাকা তল্লাশি অভিযানে এসেছেন। মারিও গোটজে বিশ্বকাপ ফাইনালে বদলি প্লেয়ার হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। অতিরিক্ত সময়ে তাঁকে নামানোর আগে জোয়াকিম লো-র টোটকা লোকগাথা হয়ে গিয়েছে—”মেসিকে দেখাও তুমি কে!” তা কাতারে গোটজে দেখিয়েছেন মেসি কেন, কাউকে দেখানোর মতোই তাঁর খেলোয়াড় জীবনে অবশিষ্ট কিছু পড়ে নেই।

এক একসময় মনে হচ্ছে ফ্লিককে দায়ী করে লাভ নেই। তিনি ব্রাজিল বিশ্বকাপের সেই সোনার টিম কোথায় পেলেন? ছিয়াশির জার্মানি যদি লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয় তাহলে তাদের দু’হাজার চোদ্দোর টিম স্টিভ ওয়-র অস্ট্রেলিয়া। পেছনে টপ ফর্মের নয়্যার। তাঁর সামনে ফিলিপ লাম। জেরোম বোয়েটিং। ম্যাটস হুমেলস। টনি ক্রুজ। সামনে মুলার আর মিলোস্লাভ ক্লোসে। এ বলে আমায় দ্যাখ। ও বলে আমায় দ্যাখ। এবং টিমের ঠিক মধ্যিখানে মেজর জেনারেলের মতো বাস্তিয়ান সোয়াইনস্টাইগার।

নেটে দেখলাম জার্মান টিমে কমিটমেন্টের অভাব নিয়ে সোয়াইনস্টাইগার কথা বলায় কোচ উত্তেজিত প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু কথাটা তো ঠিক। ব্রাজিল ফাইনালের পরে ওই ফ্রেমটা কারো ভোলার কথা নয় যে নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে আর তিনি জার্মান মিডফিল্ডের হৃৎপিন্ড হাসছেন। মতি নন্দী লিখেছিলেন, ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে সোলকারের মর্মরমূর্তি স্থাপন হওয়া উচিত। সোয়াইনস্টাইগারেরও কি মর্মর মূর্তি বসা উচিত নয় জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের অফিসে? লোকে বলে, মেসি বিশ্বকাপ দিতে পারেননি দেশকে। উল্টে প্রশ্ন হওয়া উচিত যে ওই জার্মান টিমের বিরুদ্ধেও কী করে ম্যাচ এতক্ষণ টেনে নিয়ে গেছিলেন? তারই মধ্যে কী করে হিগুয়েনের জন্য সাজিয়ে দিয়েছিলেন সোনার সুযোগ?

বেলজিয়াম বা উরুগুয়ের সঙ্গে মরুসমাধিস্থ হওয়া জার্মানির একটাই অমিল। টিউনিসিয়া ম্যাচে বিস্ময়করভাবে ব্যর্থ লুকাকুর বিকল্প কে হতে পারে বেলজিয়ামের কাছে সন্ধান নেই। জার্মানি জানে তাদের নতুন টিম কাদের কেন্দ্র করে তৈরি হতে পারে? কোস্টারিকার সঙ্গে ওই অভিশপ্ত ম্যাচেই তো তাঁদের ঝলক দেখা গেল। যখন বিখ্যাত জার্মান জাত্যাভিমান নিয়ে ফোয়ারার মতো আক্রমণে উঠছিলেন ওরা দুজন। কাই হ্যাভেটস। আর জামাল মুসিয়ালা। হ্যাভেটস চেলসির হয়ে খেলেন। ইতিমধ্যে বড় নাম। তিনি আর জামাল যে নক আউট ম্যাচে জাদু ছড়াবার আগেই বেরিয়ে গেলেন তা নিয়ে মিডিয়া সেন্টারে ভিনদেশীয় সাংবাদিকদেরও বিলাপ কানে এল। জার্মানি সেদিন সত্তর ভাগ বল পসেজন নিয়েও যে গোল পার্থক্য বাড়াতে পারেনি সেই স্ট্যাটসের সঙ্গে আর একটা তথ্য পেলাম। মুশিয়ালা সেদিন পেনাল্টি এরিয়ায় বারোটা সফল ড্রিবল করেছেন। মাত্র ঊনিশ বছর বয়েসে এই বল কন্ট্রোল আর টাচ ভাবা যায় না। জার্মানি ১৮ মাস বাদে নিজের দেশে ইউরো কাপ আয়োজন করছে। বারবার ঘুঘু ধান গেয়ে যাবে না যে আবার প্রথম রাউন্ডেই তারা বিদায় নিল।

মরুভূমির বালিতে বিশ্বের দ্বিতীয় সফলতম ফুটবল দেশের স্বপ্ন সমাধিস্থ বোঝা গেল। কিন্তু এই হ্যাভেটস যদি আগামী দিনে ‘দ্রাবিড়’ হয়ে ওঠেন আর মুশিয়ালা আরো বিকশিত হন ‘শচীন’ হয়ে—কে বলতে পারে দোহার মরুভূমি থেকেই নতুন স্বপ্নের গোলাপ ফোটাবে না জার্মানি?

দোহা, ৩ ডিসেম্বব

ব্রাজিল হেরেও পেশাদারিত্বে থাকলো

ব্রাজিল খেলছে মানে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন কখনোই মাঠে ব্রাজিল খেলছে না। ব্রাজিল যখন খেলে তখন কখনো এগারোজন খেলে না। একটা সমষ্টি খেলে। উত্তেজিত এবং ভীষণরকম প্যাসনেট গ্যালারি খেলে। গ্যালারির বাইরে মাঠের ওপাড়া খেলে। তার পাশের চৌহদ্দি খেলে। আর হ্যাঁ ব্রাজিল যখন খেলে—হলুদ রং চোখের সামনে প্রতিনিয়ত এমন খেলে বেড়ায় যেন দায়িত্ব নিয়ে হলুদ লাইটিংয়ে কেউ আশপাশ ভরিয়ে দিয়েছে। আর বিশ্বে জয়ীর পছন্দ এই রংটাই!

আর ষোলো দিন বাদে বিশ্বকাপের যেখানে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে, দোহা শহরতলীর সেই লুসেইল স্টেডিয়ামে ঢোকার আগে অবাক হয়ে দেখলাম, ব্রাজিলীয় সমর্থকেরা অলরেডি ম্যাচকে ফাইনালের মেজাজ দিয়ে দিয়েছে। এদের অনেকেই রিও বা পোর্তো আলেগ্রা থেকে উড়ে আসার মতো সম্পন্ন নয়। আসল ব্রাজিলীয় সমর্থকদের যে ঝাঁক তারা আসেনি। নইলে ব্রাজিল খেললে যে ওলে ওলে গানটা সারাক্ষণ গ্যালারি গায় সেটা শুনতে পেলাম না কেন? মানে আজ ব্রাজিল যেমন তাদের সব তারকাকে বিশ্রাম দিয়ে দ্বিতীয় সারির দল নামালো, সমর্থকদের দলটাও তেমন। রিজার্ভ বেঞ্চ।

কিন্তু সমর্থকদের রিজার্ভ বেঞ্চও যে যুগ্মভাবে টুর্নামেন্টের পয়লা নম্বর। নাচ-গান-হলুদ জার্সি-অবিরাম স্ফূর্তিতে এমন উচ্ছলতা ব্রাজিলীয়রা নিয়ে আসে যে মনে হতে থাকে পুরোটাই কেউ যত্নের সঙ্গে কোরিওগ্রাফি করেছে। ব্রাজিল যে গ্রুপ থেকে এক নম্বর হয়ে উঠছে এবং তাদের সমর্থকদের জন্য জার্মানি-উরুগুয়ে -বেলজিয়াম হয়ে হৃদয়বিদারক ভাবে দেখা দেবে না, ক্যামেরুন ম্যাচের আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। ব্রাজিল তাই শুধু দ্বিতীয় দল নামালো না আজ কোরিয়ার বিরুদ্ধে রোনাল্ডো যেমন পার্সেন্টেজ খেললেন, তারাও মোটামুটি ঝুঁকিহীন ভাবে ম্যাচটা কাটালো। বিরতির ঠিক আগে ব্রাজিলীয় কিপার দুর্দান্ত সেভ না করলে একমাত্র ম্যাচে উত্তেজনা তৈরি হতে পারত। বিরতির পর হয়তো তেড়েফুড়ে ওঠা ব্রাজিল পাওয়া যেত।

রোনাল্ডো যেমন ট্রেডমিল করার মতো নিরাপদ-আপাত নিস্পন্দ থেকে গোটা ম্যাচ কাটালেন,ততটা হয়তো নয়। কিন্তু আধুনিক ব্রাজিল দেখাল সক্রেটিসের সময় তারা যেমন স্কোরবোর্ড পাত্তা না দিয়ে স্রেফ সৌন্দর্য আর বিনোদনে আগ্রহী থাকত সেসব দিন পেরিয়ে গিয়েছে। ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলার ভঙ্গিতে চোটআঘাত বাঁচিয়ে তারা শেষ করল। শেষ মিনিটের গোল খাওয়া তাদের বিশেষ গ্রাহ্যের মধ্যে নেওয়া উচিত নয়। গরিমার মুকুটে দাগ লাগল। কিন্তু সেটা মুছতে দ্রুত সুযোগ পাওয়া যাবে।

এক একসময় মনে হচ্ছিল মাঠের চেয়ে গ্যালারি বেশি আকর্ষণীয়। যারা অবিরাম এমন ভঙ্গিতে নাচছে গাইছে যেন আজ দোসরা নয়। ১৮ ডিসেম্বর। তারা নিয়মরক্ষার বিশ্বকাপ নিতে এসেছে। হলুদ জার্সিতে সুশোভিত গ্যালারি যেমন পেলে, সুস্থ হয়ে উঠুন প্ল্যাকার্ড দেখাচ্ছে। তেমনি হাতে বিশ্বকাপের ছোট রেপ্লিকা নিয়েও অবিরাম নাড়াচ্ছে। শুধু সর্বগ্রাসী হলুদের মধ্যে একটাই কাল ছোপ দেখলাম। নেইমারকে গ্যালারিতে ম্লান মুখে বসে থাকতে দেখে। মনে হয় না এটা নক আউট-এর বিপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য প্লে অ্যাক্টিং। নেইমারকে বেশ অসহায় দেখাচ্ছে।

 কাপ ষোলো দিন বাদে লুসেইল স্টেডিয়ামে তুলতে গেলে নেইমারকে কিন্তু লাগবে। নইলে কোরিওগ্রাফি দিয়ে রং হবে। ড্যানি আলভিসদের গোল নয়।

দোহা, ৩ ডিসেম্বর

নীল রাজার রাজত্বে

অস্কার রুগেরিকে পেয়ে গেলাম সামান্য চেষ্টাতেই। ছিয়াশির কাপজয়ী টিমের সেই মারকুটে ডিফেন্ডার। মারাদোনাকে যিনি অনেক সার্ভিস

দিয়েছেন এবং এখন মাঠের টাফ লোকটা থেকে সদাহাস্যময় টিভি ভাষ্যকারে রূপান্তরিত। বললেন, ”অস্ট্রেলিয়া প্রব্লেম হওয়া উচিত নয়।”

অথচ বহু খুঁজেও সের্জিও গোয়কোচিয়াকে আর্জেন্টিনা রেডিও বক্সে পাওয়া গেল না। তিনিও ধারাভাষ্য দিতে দোহা এসেছেন। আর মেসিদের শেষ আটে ওঠার ম্যাচে থাকবেন না হয় নাকি? শিয়ালদহ লোকালের মতো ভিড়াক্কার অস্ট্রেলীয় ডিফেন্সের মধ্যে দিয়ে মেসির জাদুগরি চল্লিশ মিটারের দৌড় দেখে গোয়কোচিয়ার আট বছর আগে নেওয়া সাক্ষাৎকার মনে পড়ছিলো। কোপাকাবানা বিচের ধারের ক্যাফেতে বসে নব্বইয়ের বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনীয় গোলকিপার বলেছিলেন, ”মেসি কেন রোনাল্ডোর চেয়ে এগিয়ে জানেন? রোনাল্ডোর কারিগরির জন্য বেশি জায়গা লাগে। মেসি বুটের জঙ্গল থেকেও গোল করে দেবে। ওর লাগে মাত্র ১ ইঞ্চি স্পেস।”

নীল জার্সির অতুলনীয় সম্রাটকে তাঁর জীবনের হাজারতম পেশাদারি ম্যাচে শুধু মাঠে বসে আরো একটা বিশ্বকাপ-গোল করতে দেখা নয়। ওই চল্লিশ মিটারের দৌড়টা দেখাও অভিজ্ঞতা। মাঝমাঠের আগে থেকে সাত অস্ট্রেলীয় ডিফেন্ডারদের মধ্যে রাস্তা বার করে এগোবার সময় একটাই পাস খেলেছেন ওটামণ্ডির সঙ্গে। বক্সে দুই অস্ট্রেলিয়র জোড়া ট্যাকলে শেষ কাজটা আটকে গেল। কিন্তু গোল হলে নীল রাজের জীবনের সম্ভবত শ্রেষ্ঠ বিশ্বকাপ গোল হত। ভিডিও ক্লিপ হয়ে মুহূর্তগুলো অবশ্য থেকে গেল। আর গোল না হয়েও যদি অচিরে ভাইরাল হয়ে যায় আশ্চর্য হওয়ার নেই।

যেটা ধরা পড়লো না সেটা টিভি ক্যামেরার সীমাবদ্ধতা। টিভি বলকে অনুসরণ করে। বল—ইন প্লে থাকাকালীন মাঠের বাইরের ব্যাপারস্যাপারকে নয়। স্টিভের অস্ট্রেলীয়রা ক্রিকেটে একটা শব্দ একাধিকবার ব্যবহার করেছে—মেন্টাল ডিসইন্টিগ্রেশন। বিপক্ষ প্রথম বল খেলার আগেই তার মানসিক বুনোটে আঘাত হানতে থাকো। সেটা চাউনিতে হতে পারে। সংলাপে হতে পারে। মোটমাট কোনোরকম অপেক্ষা না করে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে থাকো। নীলরাজের হয়ে এই কাজটা করে দিচ্ছেন আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা। মাঠের চারদিকে ফেস্টুন ঝুলিয়ে রেখেছেন তাঁরা। নীলসাদা জার্সি প্রায় সবার। যার পেছনে বাধ্যতামূলক ১০ নম্বর। কেউ পরেছেন মেসির মুখোশ। কেউ মারাদোনার। মারাদোনার ছবির পাশে সব উদ্দীপ্ত করা মন্তব্য। ব্রাজিল সমর্থকদের রংঢং দেখে আগের দিন লিখেছিলাম অসামান্য কোরিওগ্রাফি। দোহা-র আর্জেন্টাইন গ্যালারি দেখে মনে হল ওটা যদি হলুদ রঙা আর্ট এগজিবিশন হয়, এটা অবিরাম রক কনসার্ট। ম্যাচের আগে থেকে চিলচিৎকার আর গান চলছে। গোটা মাঠ দুলে দুলে সেটা গাইছে। নাচছে। মেসির পায়ে বল পড়লে তার ভলিউম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিপক্ষের মানসিক ডেরা দখলে এর চেয়ে বড় সংঘর্ষ আর কী হতে পারে? আর সেটাও কিনা শুরু হয়ে যাচ্ছে কিক অফের আগেই। অবাক লাগছিল। গরিব আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা অনেকেই এত দূর থেকে আসতে পারেননি শুনেছিলাম। তাহলে গ্যালারি নীল-সাদায় এমন পরিপূর্ণ থাকে কী করে? মাঝ রাতে মেট্রোয় ফেরার সময় আবিষ্কার করলাম অনেকেই স্থানীয়।

আসলে মারাদোনা-মেসি মিলে আধুনিক বিশ্বে যে পরিমান ফুটবল সমর্থককে নীলসাদা মন্ত্রে ধর্মান্তকরণ করেছেন, তার পাশে একমাত্র বসতে পারে পেলের সময় থেকে মানুষের মনে উত্থিত পেলের ব্রাজিল। নাকি ব্রাজিলও এমন বৃহত্তম ধর্মযাজক হতে পারেনি? ভবিষ্যৎ রায় দেবে।

কিন্তু একটা ব্যাপারে রায় দেওয়ার কিছু নেই যে সৌদি আরবের ফরাসি কোচ মেসি ম্যাচে যে স্ট্রাটেজি নিয়েছিলেন তাই আগামীদিনে দুর্বল দলের গুগল ম্যাপ হতে যাচ্ছে। ডেভিডরা এবার থেকে এই রুটেই গলিয়াথের মোকাবিলা করবে। ডিফেন্সকে ওপরে তুলে এনে। উন্নততর অফ সাইড প্রযুক্তি ছোট টিমগুলোকে এই সুবিধে দিচ্ছে যে তারা ডিফেন্ডারদের ওপরে এনে হাই লাইন ডিফেন্স করতে পারে। অস্ট্রলিয়ার মাঠে মিচেল জনসনদের বিরুদ্ধে দু পা এগিয়ে স্টান্স নিচ্ছেন বিরাট কোহলি—যেমন দৃশ্য হিসেবে প্রথম প্রথম অভাবনীয় ছিল, এটাও তাই। ভাবাই যায় না বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার যুদ্ধে কিনা মেসির বিরুদ্ধে পেনাল্টি বক্সের ওপরে কোনো ডিফেন্ডার নেই। যেখানে পেছনে খেলা স্টপার দাঁড়ায় সেই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে টিমের গোলকিপার। যেন সে ম্যানুয়াল নয়্যার। বাকিরা সব ওপরে উঠে রয়েছে। মধ্যিখানে লম্বা ক্রস করে চিরাচরিত ভাবে শক্তিশালীরা ঢুকে আসবে সেই উপায় নেই। আকাশপথ কার্যত বন্ধ। তোমায় সড়ক যুদ্ধে জিতে গোল করতে হবে।

অস্ট্রেলিয়ানদের চিরকালীন সম্পদ তাদের ফিটনেস আর পাওয়ার। মেসিকে ম্যান মার্ক না করেও তারা পাঁচ মিডফিল্ডারে গুছিয়ে রেখেছিল নিজেদের দুর্গ। অত্যন্ত বলশালী ও সুপারফিট এমন দুর্গ ভাঙতে হলে দুর্ধর্ষ্য ফুটবল স্কিল চাই। যার মধ্যে অবশ্যই থাকতে হবে হাই স্পিড বল কন্ট্রোল। ঈশ্বরকে অসীম ধন্যবাদ যে ল্যাটিন আমেরিকার জাদুকে এই জায়গায় এসে আজও ছুঁতে পারেনি প্রযুক্তি। না পেরেছে ফিটনেস রোবটেরা। নইলে চোট পাওয়া ডি’মারিয়ার না থাকাটা নীলের দেশকে গভীর উদ্বেগে ফেলে দিত।

নীল রাজ মেসি। হলুদ রাজের নেইমার তাই আজও টুর্নামেন্টে অক্ষত। আগামী ১০ ডিসেম্বর যদি নেদারল্যান্ডসের বাধা টপকাতে পারে আর্জেন্টিনা। আর কোরিয়াসহ পরপর দুটো ম্যাচ জেতে গভীর বিপন্ন, একরকম মৃত্যু পথযাত্রী পেলের দেশ—সেমি ফাইনালেই ঘটবে এই গ্রহের বৃহত্তম ফুটবল-হাঙ্গামা।

এমুহূর্তে অবশ্য কারও ভাবার সময় নেই। নীলরাজদের তো নয়ই। সেতুটা যখন সামনে আসবে তখন পার হওয়া নিয়ে ভাবা যাবে। আগাম স্নায়ুকে ফালতু উত্তেজিত করে লাভ কী? প্রতি তিনদিনে একটা করে ম্যাচ খেলেছে আর্জেন্টিনা। যে দুর্ভোগ আর কারো হয়নি বলে কোচ থেকে মেসি সবাই সমান উত্তেজিত। পাঁচদিন বিশ্রাম পেলে ডাচদের সঙ্গে স্ট্রাটেজি নিয়েও ভাবা যাবে। উদ্দীপ্ত অস্ট্রেলিয়া আর শৃঙ্খলিত ফুটবল বোধে টইটম্বুর ডাচরা যে এক নয়, মেসি সবচেয়ে ভাল জানেন।

আর হ্যাঁ, ক’দিন বিশ্রাম প্রাপ্য ওই নীল দেশের অনাবাসী নাগরিকদেরও। যারা কণ্ঠনালির ওপর প্রতি তিনদিন যাবৎ ভয়ঙ্কর চাপ দিয়ে গিয়েছে।

দোহা, ৪ ডিসেম্বব

বাস্তিল দুর্গের নয়া নাম ‘এম্ব্যাপে’

কলকাতার বনেদি বারোয়ারি পুজোর কিছু উদ্যোক্তার হাবেভাবে একধরণের অটল আত্মবিশ্বাস কাজ করে যে বাকিরা থিম পুজো নিয়ে যত আচ্ছন্ন থাক। মিডিয়া সেই নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে যত আদিখ্যেতা করুক। পুরস্কার কমিটিগুলো যত এদের দু’হাত উজাড় করে দিক। আমরা সনাতন ডাকের সাজের ধর্ম থেকে নড়ছি না। প্যান্ডেল তাতেই ভরা থাকবে।

ফ্রান্স টিমটার ম্যানেজমেন্টের হাবভাব আর শরীরী ভাষায় তেমন নীরব মস্তানি রয়েছে যে অন্যরা উদ্ভাবনী সব মডেল আর স্ট্র্যাটেজি নিয়ে যত ইচ্ছে হাইপ তুলুক। আমরা হলাম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আমরা কাউকে কেয়ার করি না। আমরা নিজেদের মতো থাকবো, খেলব আর জিতবো। পোলিশদের সঙ্গে কাল রাতের ফরাসি বিক্রম দেখে মনে হচ্ছিল,এই টিমকেই এত মারমার কাটকাট লাগছে। করিম বেনজেমা,পল পোগবা আর কান্তে যোগ হলে তো অপরাজেয় হয়ে যেত।

চমৎকৃত হয়ে দেখার মতো টিমটার ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশন। নিজেদের ফাইনাল থার্ডে চাপের মুখেও মিস পাস করছে না। ঝাঁপিয়ে থ্রো করে দিচ্ছে না। পোল্যান্ড ম্যাচে গোল করার আগে টানা দু’মিনিট ফ্রান্সের বরঞ্চ গোল খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মিডিয়া ট্রিবিউনের দিকের গোলপোস্টে হল বলে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। টানা তিনটে গোল লাইন সেভ যেভাবে হল, অনেকে আগে দেখেছেন কিনা জানি না। আমার আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখার সামান্য অভিজ্ঞতায় এত জোরে শট তিনবার গোললাইন থেকে ক্রমাগত সেভ হতে কখনও দেখিনি। দুটো পরপর সেভ হওয়া কমন। একটা গোলকিপার বাঁচালো। যেমন হুগো লোরিস বাঁচালেন। কিন্তু এরপর টানা দুটো পোলিশ শট গোল লাইন থেকে এমন অকল্পনীয় সেভ হল যে ডিফেন্সিভ টেকনিকের আদর্শ ভিডিও ক্লিপ হিসেবে ফুটবলবিশ্বে ভাইরাল করে দেওয়া উচিত।

ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র বেরিয়ে দেখলাম নাম না জানা ফরাসি অভিনেত্রী তাঁর বডিগার্ড সমেত হেঁটে যাচ্ছেন। শো বিজ দুনিয়ার লোক। রীতিমতো নাচতে নাচতে বেরোচ্ছেন বোধহয় আরও বেশি করে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। কাতারে যাদের হেডকোয়ার্টার এবং যারা পুরো মধ্যপ্রাচ্য মোটমুটি ক্যাপচার করে ফেলেছে সেই আল জাজিরা টিভি চ্যানেল প্রতিনিধি দ্রুত ধরলেন অভিনেত্রীকে। ”কী চান এবার টিমের জন্য?”

 মহিলা পরিষ্কার ইংরেজিতে বললেন ”কাপ জিততে চাই.কিন্তু তার আগে চাই ইংল্যান্ডকে হারাতে।” ইংল্যান্ড তখনও আধুনিক সময়ের বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে স্ট্রেস ফ্রি নক আউট ম্যাচ খেলতে নামেনি। কেউ তখনও জানে না সেনেগালকে যে এমন সহজে উপড়ে ফেলা যাবে। সেই ম্যাচ শুরুরও আগে এত ইংরেজ-বিদ্বেষ দেখে আশ্চর্য লাগলো।

পরক্ষণে মনে হল, আশ্চর্যের কিছু নেই। ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা যে চিরাচরিত। ১৬৮৯-১৮১৫ -র মধ্যে দু দেশে গোটাকুড়ি যুদ্ধ হয়েছে। শেষবার হয় আজ থেকে ৮২ বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। কিন্তু রক্তের দাগ শুকোয়নি। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ফরাসি মিডিয়ার কোনো না কোনো অংশ টিমকে মনে করিয়ে দেবেই যে শনিবার তোমরা হ্যারি কেন বা সাউথগেটের মুখোমুখি লড়ছ না। চার্চিলের দেশের বিরুদ্ধে সেদিন তোমরা যুদ্ধ করবে।

ইংল্যান্ড টুর্নামেন্টে এখনো অপরাজিত। রুনি বা বেকহ্যামের আমলেও কখনো তাদের এত দুর্ভেদ্য মনে হয়নি—এবার যা দেখাচ্ছে। ব্রিটিশ লিখিয়েরা দোহায় বসে সাউথগেটের উচ্ছসিত প্রশংসা করছিলেন যে টিমকে তিনি বদলে ভেতরে একটা অদ্ভুত ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল মনন নিয়ে এসেছেন যা প্রচন্ডতম চাপেও নোঙ্গরহারা হতে দেয় না। হতচকিত করে দেয় না। ম্যাচের অবিরত ঢেউয়ের মধ্যেও প্লেয়াররা নিজেকে নিজে নেতৃত্ব দেওয়ার রোড ম্যাপ হারিয়ে ফেলে না। এই যে বুকিরা অলরেডি ফ্রান্সকে ফেভারিট ঘোষণা করে রেখেছে তাতেও তাঁদের ম্যাচ ফোকাস ক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা নয়। অন্তত সেভাবেই নাকি তাঁদের তৈরি করেছেন সাউথগেট। শনিবারের ম্যাচ ঘিরে অলরেডি তীব্রতার যা মাপ, সন্দেহাতীতভাবে শতাব্দীর কোয়ার্টার ফাইনাল আখ্যা পাবে। ফুটবল দক্ষতার নিরিখে—বাস্তিলের দুর্গ বনাম টাওয়ার অফ লন্ডন। এ বলে আমায় দ্যাখ। ও বলে আমায় দ্যাখ।

ব্যক্তিগতভাবে ফ্রান্স বিদায় নিলে দুঃখিত হব। কারণ? তা হলে কিলিয়ান এম্ব্যাপে যে আর বিশ্বকাপ প্যান্ডেলে থাকবেন না। বারোয়ারি পুজোর কোনো কোনো উদ্যোক্তাদের মানসিকতার কথা শুরুতে বলছিলাম। টপ ক্লাস পারফর্মারদের জগতেও ভিন্ন মানসিকতাসম্পন্নদের বসবাস থাকে। একদল খুব কমন। যারা গৌরবগাথা অর্জন করতে চায় টিমের বাকিদের সঙ্গে লক্ষ্য মিলিয়ে। এর বাইরের মহাকাশের দিকে তাকানোর স্পর্ধা করে না। আর সেই দলে ব্যতিক্রমী কেউ কেউ থাকে যারা দুটো লেনে একইসঙ্গে দৌড়াবোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। টিমের সঙ্গে বোঝাপড়ায় টেকনিক্যালি তো তৈরি হয়ই। প্লাস বাড়তি কনসেনট্রেট করে নিজের বিভাগেও সেরা হওয়ার। নিজেকে নিজে খোঁচায়, টিম স্পোর্টে মুকুট তো নিতেই হবে। দেশকে জেতানোয় মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে আমায়। কিন্তু এর সঙ্গে ইন্ডিভিজুয়াল স্পোর্টেও আমায় ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে হবে। সেই স্ট্যান্ডের নাম কখনো হতে পারে ব্যালন ডি ওর। কখনো গোল্ডেন বুট। কিন্তু সেন্টিমেন্ট এক —উচ্চাকাঙ্খায় রক্তাক্ত হওয়ার মাত্রা টিমেটদের চেয়ে আমার ক্ষেত্রে অনেক বেশি হবে জেনেও যৌথ লক্ষ্য ধাওয়া করছি। কারণ আমার প্রতিভা আমাকে আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক লক্ষ্য থেকে দূরে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই তাড়নায় নিঃসঙ্গতার মাত্রা বাড়ে তো বাড়ুক। রক্ত বেশি ঝরলে ঝরুক।

একটা কথা আছে না—স্বপ্ন তা নয় যা আপনি ঘুমের মধ্যে দেখেন। স্বপ্ন সেই বস্তু যা আপনাকে কিনা ঘুমোতেই দেয় না। সাংবাদিকতায় ফেলে আসা এতগুলো দশকে এত সব কিংবদন্তীর নীরব শরীরী ভাষা দেখে সামান্য আন্দাজ তো জন্মেছে। তার ভিত্তিতে একটা কথা বলি। এম্ব্যাপে-কে চলতি বিশ্বকাপের এতগুলো ম্যাচে মাঠে বসে দেখার পর নিশ্চিত হচ্ছি যে বড়দিনের আগে টিমসহ আইফেল টাওয়ারের তলায় বিশ্বকাপ নিয়ে উৎসব—নিজের লক্ষকে এতটা গড়পড়তা তিনি রাখেননি। এম্ব্যাপে খেলছেন কাতার বিশ্বকাপের ওপর নিজের নাম খোদাইয়ের জন্য। পাছে মনসংযোগে ছেদ পড়ে—তাই প্রথম রাউন্ডে এত অনুরোধেও সাংবাদিক বৈঠকে পর্যন্ত আসেননি। না আসার জন্য জরিমানার টাকা গুণেছেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত থেকে নড়েননি।

ফ্রান্স যদি তাদের ঐতিহাসিক কীর্তিভূমিগুলোর সঙ্গে কাতার বিশ্বকাপ যুক্ত করতে পারে, তিনি এম্ব্যাপে অবশ্যই সম্মানিত বোধ করবেন। কিন্তু আপাতত আরব বেদুইনদের দেশে তাঁর যা পারফরমেন্স, লুভর জাদুঘর-যোগ্য।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় তাঁর দৌড়। যেন বাচ্চা চিতা বলসহ শিকার তাড়া করেছে। রোনাল্ডোর ট্রেডমার্ক নাকল বল ফ্রিকিক। মেসির কঠিনতম সর্পিল গতিপথে তেকাঠি খুঁজে নেওয়া। পাশাপাশি বসার যোগ্য এখন এম্ব্যাপের দৌড়। টুর্নামেন্টে ৫ গোল শুধু নয়। এম্ব্যাপের মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত যেন নীরব বিবৃতি যে মেসি-রোনাল্ডো বংশের অভিজাত উত্তরাধিকার আমি এবং একমাত্র আমি। পবিত্র পুতাগ্নিটা কাতারে হাতে তুলব।

স্ট্যাট দেখছিলাম উসেইন বোল্টের গড়পড়তা গতি ঘন্টায় ২৩.৩ মাইল। এম্ব্যাপে-র ২৩.৬ মাইল। যদি সামান্য অতিরঞ্জিত হয়, এই গতিতে বলসহ বিশ্বের কোনো ফুটবলার কখনো দৌড়েছে? নিশ্চিত নই।

ফরাসি সাংবাদিকদের মধ্যে মনে হল না তিনি খুব জনপ্রিয় বলে। লুভরের জাদুঘরে তৈলচিত্র হয়ে থাকা উচিত তাঁর দৌড়ের ছবি —আমার লেখার এমন আইডিয়া শুনে একেবারেই একমত নন প্যারিস উপকণ্ঠের দুই সাংবাদিক। বললেন, ”কী যে বলেন। লুভরে যাবে এম্ব্যাপে? মোস্ট কমপ্লিকেটেড চরিত্র। আগে ও জিদানকে হারাক।”

শুনে আশ্বস্ত হলাম। ছিয়াশির বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনা মিডিয়াও তো তাদের সচেয়ে ঝলমলে তারকাকে নিয়ে কত নেগেটিভ কথা বলেছিল !

দোহা, ৫ ডিসেম্বর

যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে

দক্ষিণ কোরিয়া কোচের কী করে এমন মায়াবী বিভ্রম হল ভাবার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে তাদের ফেডারেশন। আরও সহজ উপায় আছে— কোনো কৈফিয়ত না চেয়ে স্ট্রেট বার করে দাও। অপরাধ—আপনি চার বছরের পুরোনো কোচ হতে পারেন। কিন্তু ভরা বিশ্ব ফুটবলের রাজসভায় শুধু কোরিয়া-র মান ডোবাননি। আরব বেদুইনদের দেশে ক্রমশ তৈরি হতে থাকা এশীয় ফুটবলের বীরগাঁথার দর্পচূর্ণ করে ছেড়েছেন।

পি কে ব্যানার্জি বেঁচে থাকলে নির্ঘাত বলতেন, ”এবার বুঝেছো বাবা কেন আমি শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে ওপেন খেলতে যেতাম না? অথচ তখন তোমরা দিগগজরা ডিফেন্সিভ কোচ বলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে।” একটাই ব্যাখ্যা,গ্রুপের গুরুত্বহীন শেষ ম্যাচে পর্তুগাল আর ব্রাজিলকে রক্তহীন দেখে ওটাই হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ধরে নিয়েছিলেন কোরিয়ার পর্তুগিজ কোচ। পাওলো বেন্তো সেদিন ক্যামেরুন ম্যাচে বোধহয় হলুদ জার্সির রক্তশূন্যতা দেখে নিজের মতো করে হিমোগ্লোবিন মেপেছিলেন—৬। আজ অরিজিনালটা দেখলেন—১৫।

বুঝলেন রোনাল্ডোর পর্তুগালের মতো ওটা ছিল ব্রাজিলেরও শীতল পেশাদারিত্ব। দুটো দেশই গুরুত্বহীন শেষ ম্যাচ পার্সেন্টেজ খেলেছিল। কোচ যখন বুঝলেন, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

নেইমারদের ব্রাজিল সাবেকি ব্রাজিল না হতে পারে কিন্তু ব্রাজিল তো! অতীতের কলকাতা লিগের বালি প্রতিভা নয়। তাকে না মেপে, না দেখে তুমি হারেরেরে করে ঝাঁপিয়ে পড়বে? মাঝমাঠে লক গেট দেবে না? মিডফিল্ডে তো চারশো স্কোয়ার ফিটের এককামরার ঘর তোলা যেত। এত জায়গা ছাড়া। সবচেয়ে বড় বিস্ময়, শেষ জুনের ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে পাঁচ গোল খেয়েছে কোরিয়া। তারপর এমন উৎপটাং সাহস কেন?

টুর্নামেন্টে এতদিন চাপে থাকা ব্রাজিল দ্রুত আবিষ্কার করল মাঝমাঠ থেকে পেনাল্টি বক্স পর্যন্ত ফ্রেন্ডলি ম্যাচের বাতাবরণ বিরাজ করছে। তারপর তাদের পায় কে? ভিআইপি বক্সে উপস্থিত ছিলেন চার ব্রাজিলীয় তারকা। রোনাল্ডো, কাফু, রবার্তো কার্লস আর রিভালদো। এঁদের বাড়তি অভিবাদন জানাতেই যেন নেইমাররা এরপর শুরু করে দিলেন ব্রাজিল ফুটবলের সেই রেট্রোস্পেক্টিভ। সারা পৃথিবী যে জাদুতে মজে থাকত।

কোরিয়া বারবার আক্রমণে উঠছিল। সেকেন্ড হাফে একটা গোলও পেল। কিন্তু মাঝমাঠ আর ডিপ ডিফেন্স জমাট না করে কেউ যদি রিচার্লিসনদের সঙ্গে খেলতে যায় ,তাহলে তার প্রথম আধঘন্টায় তিন গোল খাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনা। রিচার্লিসন গোলটার আগে যে ওয়াল খেললেন শূন্যে বল নাচাতে নাচাতে—এইসব পায়ের ব্যালেন্সিংয়ের জাদু ভিডিও প্রযুক্তির যুগে ফুটবল মাঠ থেকে উঠে প্রায় গিয়েছে। বিশ্বকাপ নকআউটে তো ভাবাই যায় না।

কিন্তু ব্রাজিল এত দ্রুত স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যায় যে ফোয়ারার মতো উপচে উপচে পড়ছিল তাদের ফুটবল জৌলুশ। কে না জানে, ব্রাজিল যখন এমন মেজাজে থাকে তখন তারা গদ্য লেখে না। গদ্য তো ছুতোর মিস্ত্রি আর শ্রমিকের অবলম্বন। ওসব ইউরোপিয়ানরা লিখবে। তারা ল্যাটিন আমেরিকার কুলীন দেশ। তারা লেখে কবিতা। যখন ফুটবল বুটের চারধার দিয়ে আজকের মতো ঝংকার তোলে তখন যেন নেপথ্যে কেউ গুনগুন করে গায় —যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে।

নেইমারদের একমাত্র হতাশার কারণ হতে পারে সাম্বার পুরোনো ছন্দের ম্যাচে বেশ কিছু সিট ফাঁকা থাকা। আদম ইভের সময় থেকে এইসব ম্যাচে গ্যালারির দুই তৃতীয়াংশ হলুদ জার্সিতে ভরে থেকেছে। কিন্তু এবার রক্ষণশীল ইসলামিক দেশে পান থেকে চুন খসলে হাজতবাস —প্রচারে আতঙ্কিত ব্রাজিলীয় সমর্থক সংখ্যায় কম এসেছে। তাই উচ্ছলতার মাত্রা তুলনামূলক কম। নইলে তো অন্য ব্যাখ্যা ভাবতে হয় যে দক্ষিণ কোরীয় কোচের মতো তারাও এই ব্রাজিল নিয়ে খুব আলোড়িত ছিল না? মনে হয় প্রথম ব্যাখ্যাই ঠিক। কারণ এই ব্রাজিল দীর্ঘদিন এককভাবে নেইমারের নৈপুণ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়।

আজকের ৪-১ নিছকই সংখ্যা। ব্রাজিল দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপে বুট দিয়ে দিওয়ালির আলো জ্বালালো। ক্রোয়েশিয়া ডিফেন্ডার হলে আমার আজ রাত্তিরের ঘুমটা চটকে থাকতো!

দোহা, ৬ ডিসেম্বর

সূর্যাস্ত হয়ে গেল সি আর সেভেনের?

ইনিংসের শুরুতে তিনি বোল্ড। দ্রুত বেলটা আবার উইকেটে লাগিয়ে আম্পায়ারের দিকে এগিয়ে গেছিলেন ডব্লিউ জি গ্রেস ”এই ভাই শোনো, গোটা গ্রাম এসেছে আমার ব্যাটিং দেখতে। তোমার আম্পায়ারিং দেখতে নয়। চলো খেলাটা আবার শুরু কর।”

রোনাল্ডো ক্রিকেটের খুচখাচ খবরাখবর রাখেন। কোহলির নাম জানেন। ইংল্যান্ডে এত বছর খেলেছেন। কে বলতে পারে গ্রেসের বহুখ্যাত কাহিনীও জানেন না? তাঁর কি টিম শুনে ফার্নান্দো সান্তোসকে বলার ইচ্ছে জাগেনি, এই শোনো এত লোক ভিড় করে এসেছে আমার ফুটবল দেখবে বলে। তোমার কোচিং দেখতে নয়। টিমটা বদলাও।

আর মাত্র এগারোদিন বাদে যে মাঠ বিশ্বকাপ পুরস্কারের চূড়ান্ত মঞ্চ হিসেবে নির্দিষ্ট সেই লুসেইল স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে খেলা শুরুর আগে মিনিটচল্লিশেক আগে মিডিয়া সেন্টার টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বিহ্বলসৃষ্টিকারী খবরটা পেল যে সত্যি পর্তুগালের প্রথম দল থেকে রোনাল্ডো বাদ। তার আগে মাঠের যা চেহারাছবি দেখছিলাম তাতে মনে হচ্ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আজ সুইজারল্যান্ড বনাম পর্তুগাল শুধু ফিফার স্কোরারগুলোই লিখবে। মঙ্গলবারের নিশুতি ম্যাচ রোনাল্ডো বনাম রোনাল্ডো। ভক্তরা দল বেঁধে দেখতে এসেছে সাঁইত্রিশ বছরের ফুটবলপ্রৌঢ়ত্বে আগেকার লোকটার গনগনে যৌবন কতটা ফেরত আসে? ফুটবলজীবনে সংকটে থাকা এই লোকটা যদি রোনাল্ডো টু হয় কে বলতে পারে বিশ্বকাপ নকআউটে এসে আজ সে পারবে না রোনাল্ডো ওয়ানকে বিদ্যুৎঝলকে মনে করাতে? বড় প্লেয়ার তো এসব বিপন্ন পরিস্থিতিকেই না আহ্বান করে নিজের ভেতর থেকে নতুন উদ্দীপক জ্বালানি বার করে আনার জন্য!

কাতার বিশ্বকাপের অন্য স্টেডিয়ামগুলোর তুলনায় লুসেইলের বিশেষত্ব —সবচেয়ে মেট্রো ফ্রেন্ডলি। প্রায় পেটের মধ্যে। ইডেন যদি লুসেইল হয়। লুসেইল মেট্রো হল বাবুঘাট। না আরো কাছে? ইডেনের প্যাগোডা। সেখান থেকে ম্যাচ শুরুর আগে দফায় দফায় ভিড় বার হচ্ছে। প্রায় প্রত্যেকের লাল পর্তুগাল জার্সি। আর মুখে চিৎকার র-ও-না—ল-ড-ও। র-ও-না-এ-ল-ড-ও। পরপর কাট আউট নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সি আর সেভেনের। যার অনেকগুলো বইছে ভারতীয় তরুণেরা। প্রচুর মহিলা দর্শক এদিন চোখে পড়লো। যারা কেউ ব্রাজিল জার্সিতে। কেউ ফ্রান্সের। কিন্তু মুখে সেই সি আর সেভেন নিয়ে উদ্বেলতা। আগের কোনো পর্তুগাল ম্যাচে তার সমর্থকদের এমন উত্তেজক মেজাজে দেখিনি। আবার ভুল লেখা হলো—আগে দোহায় কখনো রোনাল্ডো সমর্থকদের এমন উত্তেজক মেজাজে দেখিনি!

এঁরা কী করে জানবেন যে চূড়ান্ত শক অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁদের জন্য? রোনাল্ডো যে থাকবেনই না প্রথম একাদশে। বিপুল হাততালির মধ্যে নামবেন ৭২ মিনিটে। একটা অফ সাইড গোল করবেন। কিন্তু সেটা ঘটার আগে সেন্টার ফরওয়ার্ড হিসাবে তাঁর পজিশনে নির্বাচিত গঞ্জালো র‌্যামোস হ্যাটট্রিক করে বসে রয়েছেন। হ্যাটট্রিকে চমকপ্রদ পারফরমেন্স শুধু নয়। যাঁর প্রথম গোল এমন দুর্দান্ত শটে যে সেরা সময়ের সি আর সেভেনকে মনে করিয়ে দেবে। খুব পরিষ্কার যে রোনাল্ডো নিছক বাদই পড়লেন না। তাঁর উত্তরাধিকার মান্যতা পেয়ে গেল বিশ্বকাপ আবির্ভাবেই। মরক্কো ম্যাচে এরপর চরম রোনাল্ডো ফ্যানও গঞ্জালো-কে বসাবে না। কী দাঁড়ালো? ম্যান ইউ অধ্যায় শেষ। চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ খেলে এমন কোনো ক্লাব এখনো তাঁর সম্পর্কে প্রকাশ্য আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এবার দেশের হয়েও এই ঘটনা। সূর্যাস্ত কি হয়ে গেল?

জল্পনায় ঢোকার আগে বলি, প্রাচীন সময়কালে ঘটেছে কিনা জানি না। তবে আধুনিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে নজিরবিহীন। মনে করতে পারছি না এমন মহাতারাকে কোনো কোচ বসিয়ে দেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন বলে। আর তা-ও এমন কেউ যাঁর দুনিয়াজোড়া নাম। যাঁর হাতে কিনা ক্যাপ্টেনের আর্ম ব্যান্ড রয়েছে।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো তিনি তো বহুবছর ধরে ইতিহাস। আজকের বিস্ময়কর রাতের পর তিনি ফার্নান্দো স্যান্টোসও ফুটবল শাস্ত্রে ঢুকে গেলেন। ক্লাব ফুটবলে এসব আকছার হয়। বেকহ্যামকে বসানো তো বাচ্চাদের খেল। ম্যান ইউ ড্রেসিংরুমে তাঁকে জুতো ছুড়ে মেরেছিলেন স্যর অ্যালেক্স ফার্গুসন। ম্যান ইউ তো রোনাল্ডোকে কতগুলো ম্যাচ বসালো।

কিন্তু দেশজ পর্যায়ে হয় না। সেখানে রোনাল্ডো-মেসির মতো মহাতারারা যখন জাতীয় জার্সিতে খেলতে আসেন একটা অদৃশ্য আলাউন্স পান যে দেশের হয়ে আত্মত্যাগ করতে এসেছে। জাতীয় ফেডারেশন কোচের কথা শোনে দল তৈরির সময়। তখন কোচের অমত থাকলে রোমারিও-কাকারাও বাদ পড়তে পারেন। পড়েওছেন। কিন্তু টিম বিশ্বকাপ খেলতে খেলতে এই পর্যায়ের মহাতারা বাদ এমন ঘটনা দোহা-র মাঝরাত্তিরে মনে পড়ছে না।

একটা জিনিস এখনও পরিষ্কার নয় যে রোনাল্ডো সাইড বেঞ্চে বসলেন কি কোরিয়া ম্যাচে কোচ তুলে নেওয়ার পর তাঁকে গালাগালির জন্য? নাকি ফর্মের বিচারে? মনে হয় পরেরটা। শৃঙ্খলাই শুধু কারণ হলে তো তাঁকে নামানোই হত না। আজ তাঁকে ছাড়া পর্তুগাল যা ফুটবল খেলল তা উৎসবের মতো দীপ্যমান। কে বলে শুধু ব্রাজিলেরই শিল্প আছে? ইউরোপিয়ান ফুটবল শিল্প আধুনিক সময়ে যে কতদূর প্রসারিত তার একটা ডেমন্সট্রেশন যেন লুসেইল স্টেডিয়ামে দিলেন ব্রুনো ফার্নান্ডেজ, পেঁপেরা।

সেই গোলউৎসবের মাঝে যিনি মিস্টার পর্তুগিজ ফুটবল তিনিই যেন বেমানান। আগের তিন ম্যাচে মাত্র ২৬ স্ট্রোক করেছেন। সেন্টার ফরওয়ার্ড হয়ে গোলে শট মাত্র ২। একটা পেনাল্টি গোল বাদ দিলে মোট ৮ ঠিকঠাক পাস বাড়িয়েছেন। অফসাইড হয়েছেন ৬ বার। তাঁর গোলকিপারের স্ট্রোকের সংখ্যা বরং বেশি। সামনে একবারও ড্রিবলে যেতে পারেননি। স্ট্যাটস হিসেবে শোচনীয়। এইমুহূর্তে মিডিয়ায় তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী সমর্থককে এদিন মাঠের ধারে বহু খোঁজেও পেলাম না। শুনলাম তিনি পিয়ার্স মর্গ্যান মাঠের কোনো একটা বক্সে আছেন। পিয়ার্স হলেন সেই সাংবাদিক যাঁকে বিস্ফোরক এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ দিয়ে ম্যান ইউ থেকে বিতাড়িত রোনাল্ডো। পিয়ার্স এমুহূর্তে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন লিনেকার-অ্যালেন শিয়ারার সমৃদ্ধ বিবিসি কমেন্ট্রি টিমকে একহাত নিয়ে। বলেছেন এঁদের আদিখ্যেতা দেখলে মনে হয় সব মেসির ফ্যান গার্ল। বোঝাই যায় এমুহূর্তে তিনি যে রোনাল্ডো শিবিরের মাথা।

কিন্তু মঙ্গলবারের রাতের উপাখ্যানের পর কীভাবে প্রত্যাবর্তন ঘটবে রোনাল্ডোর? যেভাবে উন্মোচিত হচ্ছে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের সীমান্ত তাতে নেট ফ্লিক্স বা আমাজন এক নিঃশ্বাসে ওটিটি সিরিজ বানাবে। কিন্তু সে তো পরের কথা। আপাতত কি মরুভূমির বালির তলায় চাপা পড়বে তাঁর অবশিষ্ট ফুটবল সম্ভ্রম? এটা দেখছি দুরন্ত বিশ্বকাপ! সাসপেন্স, ট্র্যাজেডি আর নাটকীয়তায় মোড়া। ওটা বিশ্বকাপ। এটা না হয় রোনাল্ডো কাপ।

দোহা, ৭ ডিসেম্বর

দোহার বুকে মেসিদের জন্য ‘হর হর মহাদেব’

শুক ওয়াকিফ জায়গাটাতে প্রথম পা দিয়ে মনে হয়েছিল কলকাতার চৌরঙ্গী। শংকরের সেই অমর উপন্যাসের শেষ লাইনের মতো—শাহজাহান

হোটেলের লাল সবুজ আলোগুলো যে অঞ্চলে অবিরাম জ্বলছে আর নিভছে।

কিন্তু দ্রুত আবিষ্কার করি, শুক ওয়াকিফ নিছক চৌরঙ্গী নয়। দোহা সদরের এমন মোহনা যেখানে ধর্মতলার পাশাপাশি কলেজ স্ট্রিট আছে। বইমেলা চত্বর আছে। আছে নন্দন আর আকাদেমি। কাতারে নামা থেকে গত দিনদশেক স্টেডিয়াম আর মিডিয়া সেন্টার ঘুরঘুর করছিলাম। শহরের মুক্ত উপত্যকায় এসে বিশ্বকাপ ঘিরে উৎসবের নতুন ডায়মেনশন পাওয়া গেল। দেখা গেল আর পাঁচটা বিশ্বকাপের মতো স্টেডিয়ামে বিয়ার নেই। উত্তেজক পোশাকে সুন্দরী নেই। উদ্দামতা নেই শহরজুড়ে। কিন্তু তার দোহা-রও নিজের মতো করে বিশ্বকাপের গাছে গাছে শিল্প-রূপ-রঙ-উত্তেজনার পাপড়ি মেলা রয়েছে।

সেটা আকর্ষণীয় নয় বিবিসি বললেই শুনতে হবে নাকি? বিবিসি তো ব্রাজিল নিয়ে কতরকম প্রচার করেছিল। রাশিয়াকে যথেচ্ছ সমালোচনা করেছে। এশিয়ার দেশকে ভালো বলবে না জানাই কথা। আর কাতার তো ১৯৭১ পর্যন্ত ব্রিটেনেরই অধীনে ছিল। তারা স্বাধীনভাবে একটা টুর্নামেন্ট নিখুঁত নামিয়ে ফেলছে, কী করে সহ্য হবে?

যাক যে যাক, যে এলাকাটার কথা বলছিলাম তার কুড়ি কিলোমিটার দূরের মূল বিশ্বকাপ মিডিয়া সেন্টারে বসে দুপুর থেকে টানা চারটে সাংবাদিক সম্মেলন হতে দেখলাম। ব্রাজিল। ক্রোয়েশিয়া। আর্জেন্টিনা। নেদারল্যান্ডস। এর মধ্যে ব্রাজিল সাংবাদিক সম্মেলনে ঢুকতে গিয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল। কোনো জায়গা নেই। প্রেস কনফারেন্স রুম ফুল। ভেতরে যত লোক বসে রয়েছে বাইরে প্রায় সমসংখ্যক। দেখে মনে হল বক্স অফিস একেই বলে। কোয়ার্টার ফাইনালে এই অবস্থা। হলুদ জার্সি ফাইনাল গেলে কী হবে? ফিফা-র মহিলা যন্ত্রণা উপশম করতে চাইলেন, ”ব্রাজিল বেরিয়ে গেলে ক্রোয়েশিয়া ঢুকবে। তখন মনে হয় ঘরটা খালি পেয়ে যাবেন।” লুকা মদ্রিচ এলেন ক্রোয়েশিয়ানদের হয়ে। এতবড় ফুটবলার। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডে জন্মালে সুপারস্টার হয়ে যেতেন। ক্রোয়েশিয়ান বলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের কর্ণ থেকে গেলেন।

মহিলা যা আন্দাজ করেছিলেন ঠিক তাই। ব্রাজিলিয়ান কোচ বেরিয়ে যেতেই ভিড় পাতলা হয়ে গেলো। মনে রাখবেন যিনি ঘর কার্যত খালি করে দিয়ে চলে গেলেন তিনি তিতে। নেইমার নন। আসলে ব্রাজিল মানেই অদৃশ্য মাদকতা আর আকর্ষণের চুম্বক।

প্রাচীন ময়দানে যেমন মাঠে ঢুকতে না পারলে ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে র‌্যাম্পার্ট ছিল দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর ব্যবস্থা। এখানেও প্রেস মিটে সরাসরি অংশ নিতে না পারলে বাইরে টিভিতে দেখা এবং ইংরেজি অনুদিত কথোপকথন শোনার ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু ফিফার বিশেষ অ্যাপ ডাউনলোড করে নিতে হবে। তো মূল ঘরের বাইরের সেই ভিড়ে আলাপ হল জনৈক ইতালিয় সাংবাদিকের সঙ্গে। বললেন, ”আমার দেশ এবার টুর্নামেন্টে নেই। কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে প্রাণমন সমর্থন করে যাচ্ছি। বিশেষ করে ব্রাজিলকে। কারণ ফ্রান্সকে হারাবার সম্ভাবনা ওদের বেশি।” জানলাম ইংল্যান্ডকে সমর্থনের প্রশ্ন নেই। কিন্তু ইতালি বেশি ঘৃণা করে নাকি ফ্রান্সকে। যার পিছনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আপাতত যা সংক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য সব ডুয়েলে— ”ওদের সঙ্গে সব ব্যাপারে আমাদের জাতীয় ইগোর লড়াই। আমাদের ওয়াইন ভালো? না ওদের? ওদের চিজ ভালো না আমাদের? ওদের মেয়েরা বেশি সুন্দরী না আমাদের?”

ভেতরে তখন তিতে কৌতুক আর তীর মিশিয়ে চমৎকার ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। গোল করে উঠে নাচের মাধ্যমে ব্রাজিলীয় উচ্ছ্বাস প্রকাশ নিয়ে যে তীব্র বিতর্ক, সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল তিতে বলেন, ”নাচের মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করাটা ব্রাজিলীয় সংস্কৃতি। কিছু লোক সমালোচনা করছে বলে দেশজ সংস্কৃতি বিসর্জন দিতে হবে নাকি?” একজন বলল, কিন্তু এই বয়েসে আপনিও তো ওদের সঙ্গে রুচিহীন ভাবে সেলিব্রেট করে যাচ্ছেন। ব্রাজিলীয় কোচ সটান তাকালেন প্রশ্নকর্তার দিকে, বয়সী ”শুনুন ভাই আমার বয়েস ৬১। টিমের বেশির ভাগ ২১-২৩। আমার নাতির বয়েসী ওরা। আমি নেচেটেচে যদি ওদের মনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারি তাহলে দোষ কী?”

হলিউড স্টারদের মতো দেখতে আর্জেন্টিনীয় কোচকে যত টেনশনে দেখাল ,তিতে যেন ততটাই বিন্দাস। আবার শুক ওয়াকিফের মেজাজটা উল্টো। সেখানে ব্রাজিলকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। আর্জেন্টিনীয়দের দেখে মনে হচ্ছে কাল ফাইনাল। আর আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্যাপারটা যেন কয়েক ঘন্টার অপেক্ষা। বলা হয়নি এই এলাকার মেজাজে ভুবনীকরণের মেজাজ রয়েছে। পারস্যের রেস্তোরাঁ। মরক্কোর কুইসিন। ইতালিয়ান খাবারের দোকান। চিনা-ভারতীয় তো থাকবেই। কিন্তু সাপোর্টাররা এতো লম্বা তালিকায় আগ্রহী নয়। তারা সংক্ষেপ করে নিয়েছে —ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। গোপন ব্যালটে মনে হল, নীলসাদা জার্সি সহজে জিতবে।

এলাকাটাতে চিত্র প্রদর্শনী চলে সারাবছর। সেখানে জীবনসংকটে আক্রান্ত ফুটবল সম্রাট মনোনয়ন পাননি দেখা গেল। ব্রাজিল টিম এদিনও পেলের আরোগ্যের জন্য আকুল প্রার্থনা জানাল। ব্রাজিলীয় সাংবাদিক বললেন, ”কিং অফ ফুটবল। আমাদের দেশের পৃথিবীর কাছে ব্রাজিলীয় কফির চেয়েও বড় রপ্তানি। বিশ্বকাপের মাঝে চলে গেলে কী হবে ভাবতেই পারছি না। আমরা অবশ্য শোকগাথা রেডি রেখেছি।” বোঝাই যাচ্ছে শুক্রবার এক অন্তহীন আবেগ হিসেবে ব্রাজিল ম্যাচে দেখা দেবেন পেলে।

কিন্তু কাতারি চিত্রশিল্পীদের পছন্দ যে দু’বছর আগে চলে যাওয়া মারাদোনা এবং তিনি লিওনেল মেসি। জায়গায় জায়গায় দু’জনের ছবি। সেই প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে মেসির কাট আউট নিয়ে গর্জন শুনলাম, হর হর মহাদেব। সহজেই বোঝা যাবে আর্জেন্টিনীয়দের যত আধিপত্য থাক, এলাকাটা বুয়েনস আইরেস নয়। শখানেক আর্জেন্টিনীয়দের সঙ্গে জড় হয়েছে বেশ কিছু ভিনদেশির সেই জার্সির প্রতি মর্মস্পর্শী আবেগ। বাংলার একাধিক মুখ চোখে পড়লো সেই ভিড়ে। এবারের মতো এত বেশি সংখ্যায় বাঙ্গালি পর্যটক বিশ্বকাপে যে আর কখনো দেখা যায়নি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। দমদমের এক তরুণকে দেখলাম আইবি-র চাকরিতে যোগদান ক’দিন পিছিয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল দেখতে এসেছেন। লুসেইল স্টেডিয়ামে মেসির ম্যাচে নিয়ে যাবেন ৩০ ফুট চওড়া ভারতীয় পতাকা। ভারত এবার এতটাই বেশি যে প্রেসের মেনুতে পর্যন্ত নিয়মিত থাকছে চিকেন বিরিয়ানি আর কড়াক চা। এই এলাকাতেও বিক্রি হতে দেখলাম কড়াক চা। যা মুম্বই এবং কেরলের বৈশিষ্ট্য।

কাতারে বিশ্বকাপের আয়োজনে অবশ্য শুধু কেরল বা মুম্বইয়ের মুখ নয়। স্থানীয় কিছু বাঙ্গালি খুব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। দীর্ঘদিনের প্রবাসী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপ হল। যিনি এদেশের বিখ্যাত স্থপতি। বিশ্বকাপ স্টেডিয়াম তৈরিতেই শুধু তাঁর সংস্থা শুধু সরাসরিভাবে জড়িত নয়। এই যে স্টেডিয়ামে স্টেডিয়ামে ওপেনএয়ার এয়ার কন্ডিশনিং করে কাতারীরা গোটা বিশ্বের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে সেই প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত। এমনকী মার্কিনিদের জৌলুসের চূড়ান্ত পীঠস্থান লাস ভেগাসেও ওপেনএয়ার এয়ার কন্ডিশনিং দেখিনি। দুবাইতে নেই। ইংল্যান্ডে নেই। অস্ট্রেলিয়াতে নেই। জানি না বিশ্বের আর কোথাও আছে কিনা?

এখনকার মতো স্টেডিয়ামের ওপরটা খোলা। রাতের দিকে ঠান্ডায় কখনো জ্যাকেট লাগছে গ্যালারিতে। প্লেয়াররা জল-জল করে হাঁপাচ্ছে না সর্বক্ষণ —যা হওয়ার কথা ছিল। এ তো আধুনিক সময়ের আরব্য উপন্যাস। আর যদি এমন আবহে সেই সেমি ফাইনাল লাইন আপটা কাল ভারতীয় সময় রাত দুটো নাগাদ দাঁড়িয়ে যায়—তাহলে তো কথাই নেই। আরব্য উপন্যাসের নতুন সংস্করণের দ্বিতীয় খন্ড।

আধুনিক সময়ে ফিরে সেই খেলা দেখার জন্য শুধু কিছু সর্বিট্রেট রাখতে হবে হাতের কাছে। কী বলেন?

দোহা, ৮ ডিসেম্বব

কাপ-উৎসব নবমীতে পড়েও মণ্ডপে থেকে গেলেন মেসি

স্কোরশিট বলছে আর্জেন্টিনা ২। নেদারল্যান্ডস ২। তারপর টাইব্রেকারে ৪-৩ আর্জেন্টিনার জয়। এবং আসলে স্কোরশিট গোটা ব্যাপারটা কিছুই গুছিয়ে বলতে পারছে না। এভাবে বলা উচিত— এবারের বিশ্বকাপ তো বটেই। গত চল্লিশ বছরের বিশ্বকাপে সবচেয়ে রুক্ষ, কড়া, কুশ্রী এবং দক্ষ পরিচালনার অভাবে বিষাক্ত ম্যাচ জিতে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ সেমি ফাইনালে গেল।

তৃতীয়বার বিশ্বকাপ কভার করছি। এইরকম গুন্ডামি ভরা ম্যাচ আগে কখনো দেখিনি। ইউ টিউব খুঁজে কাল সময়মতো দেখতে হবে আর কী নমুনা আছে? কোথাও দেখেছেন টাইব্রেকারে ম্যাচ মীমাংসিত হওয়ার পরেও দুটো টিমে হাতাহাতি হচ্ছে? মহানাটকীয় ম্যাচ একটা টিম জিতে যাওয়ার পর কোনায় দাঁড়িয়ে উৎসব শুরু করে দিয়েছে। আর তারই মধ্যে রেফারী দৌড়ে গিয়ে কিনা বিজিত দলের প্লেয়ারকে হলুদ কার্ড দেখাচ্ছেন। অকল্পনীয়। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে যা যা সব ঘটলো বিভিন্ন মহল্লার মধ্যে টেনশন ভরা মারদাঙ্গায় হয়।

শেষ বাঁশির পর বিশ্বকাপের মঞ্চে হলুদ কার্ড আর হয়েছে কিনা জানি না। তবে আজকের মতো ১৯ হলুদ কার্ড নিশ্চয়ই কুখ্যাত রেকর্ড হয়ে থাকলো। হলুদ দেখার তালিকায় বিস্ময়করভাবে মেসি নিজে। তাঁর কোচ এবং আরও একজন সাপোর্ট স্টাফ।

নেটে দেখছিলাম কেউ একটা ভিডিও পোস্ট করেছেন মারাদোনাকে আদর করছেন জোহান ক্রুয়েফ। খুব ভালো সম্পর্ক ছিল দু’জনের। স্বর্গে বসে একসঙ্গে ম্যাচ দেখার মতো সম্পর্ক। এইরকম অলীক ব্যাপার সত্যি ঘটলে মারাদোনা অবশ্যই গর্জে উঠতেন, জোহান,আপনার টোটাল ফুটবলের নেদারল্যান্ডস? আমার সময়ের গুলিত-ভ্যান বাস্তেনদের কমলা জার্সি? নাকি এরা বিরাশির সেই জেন্তিলের মতো কসাই? যে আমায় ইতালিতে মেরে মেরে খেলতে দেয়নি। কিন্তু যার জন্য ফিফা পরের বছর থেকে নিয়ম করে যে বল প্লেয়ারদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা দিতে হবে।

টাইব্রেকারে দুটো দুরন্ত সেভ করে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ম্যাচের নায়ক হয়ে গেলেন। মেসি পেছনেই থাকবেন দুটো পেনাল্টি গোল এবং একটা অ্যাসিস্ট করিয়েছেন বলে। কিন্তু খলনায়ক এককথায় স্প্যানিশ রেফারি আন্তোনিও লাহোজ। এই পর্যায়ে যে রেফারী পোস্টিং পাচ্ছে তার অবশ্যই বড় ম্যাচ পরিচালনার যোগ্যতা থাকবে। কিন্তু প্লেয়ারদের মতো কোনো কোনোদিন আম্পায়ার-রেফারিরও অফ ফর্ম যায়। আর আজ এই আন্তোনিয়োর ভয়ঙ্কর অফ ফর্ম ছিল। এখনকার দিনে এত সব নিয়ম বদলাচ্ছে। খেলার প্রয়োজনে অফ সাইড টেকনোলজির মতো অভিনবত্ব আসছে। ম্যাচের মধ্যে কোনো রেফারি আজকের মতো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে ম্যাচ কমিশনারের হাতে ক্ষমতা দেওয়া উচিত বিকল্প রেফারিমাঠে নামানোর।

বিরতিতে আর্জেন্টিনা ১-০ এগিয়ে। কিন্তু প্লেয়াররা ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় দেখা গেল মেসি মাঠে দাঁড়িয়ে। এগুলো কলকাতায় বসে টিভিতে আপনারা দেখতে পেলেন কিনা নিশ্চিত নই। প্রায় মিনিটপাঁচেক দাঁড়িয়ে তিনি রেফারিকে বোঝাতে চাইলেন, নেদারল্যান্ডসের এত রাফ খেলা আপনি সামলান প্লিজ। হাত পা ঝাঁকানো আর মুখভঙ্গি দেখে তাই মনে হল। মেসি এতগুলো বিশ্বকাপে কত উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু পাঁচবারের একবারও রেফারিং নিয়ে লাগাতার অসন্তোষ প্রকাশ আর এইভাবে মার খাচ্ছেন আগে কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। আর্জেন্টিনার ক্যাপ্টেন আজ তাঁর জায়গায় পুরোনো দশ নম্বর হলে ম্যাচ শেষ হত কিনা জানি না।

টিভিতে অনেক কিছু সেন্সর করে দেখানো হয়। তাই জানি না দু’টিমে উত্তেজক মারপিটের সময় একটি মুশকো চেহারার যুবক যে ঢুকে পড়েছিল তার কতটা দেখানো হয়েছে? সে কিন্তু তেড়ে গেছিল ওই জটলার দিকেই। নিরাপত্তারক্ষীরা পেড়ে না ফেললে কী ঘটতো কেউ জানে না।

আর একটা ঘটনা। আর্জেন্টিনা রাইট ব্যাকের ট্যাকলে কমলা রঙা স্ট্রাইকার পড়ে যেতেই পুরো ডাচ রিজার্ভ বেঞ্চ মাঠে ঢুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আবার লিখছি বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ২০২২ সালে এই জিনিস ঘটছে! ম্যাচ শেষ হতে আবার এক প্রস্থ মারপিট। এমনি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর হাঙ্গামা হতে পারে। হয়েও থাকে। কিন্তু টাইব্রেকারে ম্যাচ হেরে সাধারণত বিজিত পক্ষ এমন মনমরা আর নিস্পন্দ থাকে যে দৌড়ে গিয়ে মারপিট করার মানসিকতা কারো থাকে না। আজ সেটাও ঘটল।

‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’ মনে করিয়ে দিলেন ফেসবুক বন্ধু। পর্তুগাল বনাম নেদারল্যান্ডস। একইরকম কদর্য। ২০০৬ বিশ্বকাপ। ২০ বার কার্ড দেখাতে হয়েছিল। কিন্তু এর মাহাত্ম্য আরও বেশি। কাপ কোয়াটার ফাইনাল এবং স্বয়ং মেসি জড়িয়ে।

এখন দোহায় রাত্তির তিনটে প্রায়। এখনো আর্জেন্টাইন সমর্থকদের চিৎকার শুনছি মিডিয়া সেন্টারে বসে। কিন্তু যাবতীয় সমর্থন আজ বাবুঘাট বিসর্জনের দিকে যাচ্ছিলো। নেইমারের মতো বিশ্বকাপ মণ্ডপ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে বসেছিলেন মেসিও। ৭৩ মিনিট পর্যন্ত তাঁরা ২-০ এগিয়ে। মনে হচ্ছে ব্রাজিল টু— এখানে আর ঘটবে না। কুড়ি কিলোমিটার দূরের মাঠটায় নেইমাররা ২-০ করে রাখতে পারলে তাঁদের মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটা ঘটে না। এখানে দু’গোল আছে বলে সেই ভয় নেই!

এবং ভয় আছে। কারণ ট্যাকটিকস বদলে নেদারল্যান্ডস লম্বা চেহারার দুই ফরওয়ার্ড নামালো। দু-দিক থেকে অবিরাম উঁচু ক্রস করা শুরু হল। আজকালকার ফুটবলে এত শূন্যে ভাসানো কম হয়ে থাকে। কিন্তু আজ ডাচ কোচের স্ট্র্যাটেজি দারুণ কাজে লাগলো এবং ক্রোয়েশিয়াও হয়তো সেমি ফাইনালে ব্যবহার করবে। মেসির টিমে লম্বা ডিফেন্ডারের সংখ্যা কম। উঁচু ক্রসে তাঁদের বারবার অসহায় লাগছিলো। দ্বিতীয় গোল অবশ্য হল ১১১ মিনিটে গ্রাউন্ডে। ফ্রি কিক থেকে সেট পিসে। দুটো গোলই দীর্ঘকায় ওয়েগহর্স্টের। শেষ মিনিটে গোল শোধ হওয়ার পর মনে হচ্ছিল ব্রাজিলের পর লাতিন আমেরিকায় তাদের প্রতিবেশী দেশেরও আজ ফুটবল সমাধি আসন্ন।

মেসিকে দুজন রাখছিল বলে শুধু নয় বল প্লেয়ারকে ফিফা যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলে তার সিকিভাগ পাননি তিনি। পাশে আলভারেজ অন্যদিনের তুলনায় নিষ্ক্রিয়। ডি’মারিয়া তখনও নেই। মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপের মায়াবী আকর্ষণ আজ যৌথ পতনে শেষ হয়ে গেল। নবমী পেরিয়ে সোজা তা ঢুকে গেল দশমীর বিষণ্ণতায়।

গোলকিপারের নৈপুণ্য মেসিকে এ যাত্রা রক্ষা করে তাঁর শেষ স্বপ্নের দিকে এগিয়ে দিল। আর চাই দুটো সিঁড়ি। হিগুয়েন একটা স্বপ্ন ব্যর্থ করেছেন। মার্টিনেজ একটা সফল করলেন। ম্যাচের সব কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। সাংবাদিক সম্মেলনে মেসি রেফারি নিয়ে মুখ খুললেন। সামান্য বললেও ফিফা কীভাবে নেবে? তার আগে অবশ্য ডাচ টিমের অর্ধেককে সাসপেন্ড করা উচিত।

মহানাটকীয় কোয়ার্টার ফাইনাল। তারও আগে নারকীয়।

দোহা, ১০ ডিসেম্বর

যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাওয়া হল না রোনাল্ডোর

রাঙিয়ে দিয়ে যাওয়া হল না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর।

 পরাজিত, বিফলমনোরথ এবং হতোদ্যম পর্তুগিজ টিম তখনও মাঠের মধ্যে। পেঁপে-রা বার হলেন মিনিট দশেক বাদে। তথাকথিত সুপার পাওয়ারের মধ্যে গণ্য না হওয়া একটা দেশের কাছে হেরে যদি বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ছিটকে যেতে হয় তাহলে নিছক হার থাকে না। হয়ে দাঁড়ায় শক্তিশেল।

কিন্তু তিনি টিমের কারও জন্য অপেক্ষা না করে সটান বেরিয়ে গিয়েছেন আর্জেন্টিনীয় রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই। বিশ্বকাপ মন্দিরে চিরবিদায়। পরের বিশ্বকাপে বয়েস হবে ৪১। টিভি বিশেষজ্ঞ হিসেবেই একমাত্র পাওয়া যাবে যদি এত টাকা দিয়ে কোনো নেটওয়ার্ক তাঁকে নিতে পারে। আপাতত তাঁর জন্য যৌথ শক্তিশেল। একটা পর্তুগালের গণ্যমান্য সিনিয়র হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠতে না পেরে অসম্মানজনক বিসর্জন।। আর একটা গভীর ব্যক্তিগত শোক—টিমের আর কারও যার অংশীদার হওয়া সম্ভব নয়। কারণ তারা সেই উচ্চতায় পৌঁছয়নি। এই ক’দিন আগেই ছিলেন সসাগরা সাম্রাজ্যপাটের অধিকারী। ম্যান ইউ-তে ফিরে যাওয়ার সময় থেকে সেই রাজত্বের ওপর তান্ডব শুরু হয়েছিল। কাতার বিশ্বকাপ তাতে সরকারি স্ট্যাম্প মেরে দিল যে তোমার জমানা শেষ। কোথায় কী পেনশন? কী পিএফ পাবে? সেগুলো এবার কুড়িয়ে বাড়িয়ে খোঁজ করো। বাঁশি বেজে গিয়েছে।

বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন। শুধু তো প্রথমার্ধে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থেকে ৫১ মিনিটে মাঠে নামা নয়। তাঁর অসম্মানের জন্য আর কী বাকি থাকলো? এ তো মার্সেডিজের লেটেস্ট ব্র্যাণ্ডে চড়া লোককে সাধারণ সাইকেলে নামিয়ে দেওয়া। তাঁর—রোনাল্ডোর নিশ্চয়ই সেই অনুভূতি হচ্ছে যা অনেক কিংবদন্তির শেষ বেলায় হয়েছে—এদের কি স্মৃতিশক্তিতে ছানি পড়েছে যে সবাই সব কিছু এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল?

তবে তিনি চূড়ান্ত বেলায় বিশ্বকাপ-মঞ্চ ছাড়বেন আর নাটক থাকবে না কখনো হয়? মিডিয়া ট্রিবিউনে বসে অবাক হয়ে দেখলাম মাঠের বাইরে শেষ সেকেন্ডে পা রাখতে যাচ্ছেন। অতর্কিতে ছুটে এসেছিল গ্যালারির নিচ থেকে এক অনুরাগী। পেনাল্টি বক্সে যে রিফ্লেক্স দেখালে পর্তুগালের গোলটা শোধ হয়ে যায় সেই তৎপরতা দেখিয়ে এক নিরাপত্তারক্ষী দ্রুত তাকে জাপটে ধরল। পরপর দু’দিন এমন ঘটনা দেখলাম বিশ্বকাপের মতো টাইট সিকিউরিটি জোনে। কী করে হয় দুর্বোধ্য? যে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে পৃথিবী চেনে তিনি উপভোগ করতেন। পড়ন্ত বেলাতেও ভক্তদের মধ্যে কী দুর্দমনীয় আকর্ষণ, তাতে আরও সেই ছটা ফুটে ওঠে। কিন্তু আজকের রোনাল্ডো শোকের আগুনে পুড়তে নয়, ভস্ম হতে থাকা পেশাদার। জাস্ট তাকালেন-ই না। গটগটিয়ে ঢুকে গেলেন ড্রেসিংরুমে। আজ গ্ল্যামারের নয়, আনমনা থাকার দিন। নিজের ও দেশের জন্য চোখের জল ফেলার দিন।

দুনিয়া জুড়ে ফুটবল ভক্তরা দেখছি সি আর সেভেনের বিসর্জনের পরেও বিভাজিত। তাঁকে শুরুতে বসিয়ে না রাখলে কি ফল এক হত? চলতি টুর্নামেন্টে পর্তুগালের সবকটা খেলা অনুপুঙ্খ দেখার সুবাদে আমার বিনীত বক্তব্য ,পুরো খেললে কিছুই হত না। রোনাল্ডো একা পর্তুগালকে টিমকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার যে চিরাচরিত মেজাজ সেটাই হারিয়ে ফেলেছেন। বড় নায়ক যেমন দুর্বল চিত্রনাট্য সামলেও ছবি পার করতে দিতে পারে। রোনাল্ডো তো তেমনি ছিলেন। চার বছর আগেই সোচি মাঠে স্পেনের বিরুদ্ধে তাঁকে যেভাবে ৩-৩ করতে দেখেছি সেটা বায়োপিকে থাকার মতো। কিন্তু এই লোকটি এখন সহশিল্পী। পেনাল্টি এরিয়ায় যে ক্রমাগত অন্যকে পাস করে। নিজে বল হোল্ড করে খেলার সাহস এর নেই। টিম বিশ্বকাপ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখেও যার নিচ থেকে বল নিয়ে ওঠার উদ্যম নেই। শেষ ছয় গজে যদি কিছু খুচুং খাচুঙ করে বল গোলে রাখা যায় এই লোকটির লক্ষ্য। অথচ এই তো অতীতে বলে এসেছে আমার কোনো সাহায্য দরকার নেই। আমার দুটো পা-কাফি। মাথাটা কাফি। প্রদীপ ব্যানার্জি কিংবদন্তি ফুটবলারের প্রাক্তন হতে মেনে নিতে না পারার দোলাচল নিয়ে একটা শব্দ খুব ব্যবহার করতেন—ওরা বুঝতে চায় না, দেহপট সনে নট সকলি হারায়। এটাই শাশ্বত।

পিকে মানের ফুটবল গ্রহ যদি পৃথিবী হয়। তিনি রোনাল্ডো তাহলে মঙ্গলগ্রহ। কিন্তু দর্শনটা দু’জায়গাতেই প্রযোজ্য। শুধু একটা জিনিস বুদ্ধির অগম্য থাকল। রোনাল্ডো যদি বা গতি হারান, শটের জোর নিশ্চয়ই পালকের মতো হয়ে যায়নি। তাহলে মরক্কো অঞ্চলের বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি কিক তিনি না মেরে ব্রুনো ফার্নান্ডেজ কেন? যে নাকল বল ফ্রিকিকের জন্য বিশ্বব্যাপী তিনি ট্রেন্ডসেটার হিসেবে পরিচিত, ধরে নিলাম তা আগের মতো অভ্রান্ত নেই। তাহলেও রোনাল্ডো শট নেবে বলে আমার বিরুদ্ধে বল বসাচ্ছে। জাস্ট এই ছবিটাই তো অনেক গোলকিপারের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিতে পারে। আর্জেন্টিনা কোচ কি তার মানে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ফ্রি কিক বা কর্নারের জন্যও আমার প্রাক্তন ক্যাপ্টেন আর উপযুক্ত নয়? তাই যদি হয় তাহলে দেশের ফুটবল সংস্থা ক্যাপ্টেন বেছেছিল কেন? আশ্চর্য!

‘আশ্চর্য’ সিরিজে এদিন দুপুরে আরো একটা সংযোজন। বিখ্যাত বাঙ্গালি স্থপতির দোহার বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজে ডাল-পোস্ত খাওয়ার সময় শুনলাম, এখানে পোস্ত নাকি ঘোরতর বেআইনি। দেশ থেকে আসার সময় কারো লাগেজে যদি পোস্ত বা পান পাওয়া যায় তার জরিমানা তো হবেই। কপাল খারাপ থাকলে হাজতবাস হতে পারে। পোস্তকে ধরা হয় প্রায় মাদকের ক্যাটেগরিতে।

আশ্চর্য—তিন। মরক্কো টিমটার জনপ্রিয়তা। ম্যাচ চলাকালীন সমর্থকদের যে উল্লাস এবং আবেগ দেখলাম, আর্জেন্টিনা ছাড়া কেউ পাল্লা দিতে পারবে না। ব্রাজিলও না। এখানে আসার আগে মরক্কো টিম নিয়ে এক সেকেন্ড ব্যয় করিনি। এখন দেখছি আরব দেশগুলোর একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে বিশাল সমর্থন কুড়োচ্ছে। যেন এটাই হোম টিম।

মরক্কোর সামনে রোনাল্ডোর ব্যর্থতা অবশ্য আশ্চর্য সিরিজে পড়ছে না। যে গতিতে মরক্কো খেলছে তা তাদের দেশের আরবি ঘোড়াগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। কী অসম্ভব স্পিডে খেলে। আর প্রতিনিয়ত ওপর নিচ ওঠানামা করে। প্রতিদিন এরা বোধহয় রাজ্য আথলেটিকসের রেকর্ড ভাঙে। এদের সামনে এম্ব্যাপে চলবে। নতুন পৃথিবী!

তিনি রোনাল্ডো বিশাল বিশাল প্লেয়ার। কিন্তু আজকের স্পিডের দুনিয়ায় তিনি যে পাস্ট টেন্স কী করে অস্বীকার করবেন?

দোহা ১১ ডিসেম্বর

এম ভার্সেস এম

জটিল করে দেখার মানে হয় না। লুসেইল স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার রাতে যা ঘটতে চলেছে—সেটা ক্ল্যাসিক্যাল দ্বন্দ্বযুদ্ধ। এগারোজন বনাম এগারোজন নিছক প্রতীকী। লড়াই খুব পরিষ্কারভাবে একের বিরুদ্ধে এক। দশ নম্বর জার্সি বনাম ওদিকের দশ নম্বর জার্সি। লুকা মদ্রিচের বিপরীতে তিনি লিওনেল মেসি।

 মাঠ একটা জিনিস। মাঠের একরকম অংক। মাঠের একরকম প্রদর্শন। কিন্তু মাঠের বাইরে নিজের নিজের শিবিরে ম্যাচের ২৪/৪৮ ঘন্টা আগে মাঠেরই খেলা চলতে থাকে। সেখানে ফিফা থাকে না। রেফারি থাকে না। দর্শক থাকে না। মিডিয়া ঢুকতে পারে না। কিন্তু সেখানেও কিক অফের পরের ব্যাপারস্যাপার আগাম ঘটে যায়। যা ম্যাচের ফাইনাল স্কোরশিটে গিয়ে তুমুল ছাপ ফেলে।

কখনো সেটা নীরব প্রস্তুতি হতে পারে। আইটি বিশেষজ্ঞর সঙ্গে একান্তে বসে বিপক্ষ সম্পর্কে ঠিকঠাক ডাটা সংগ্রহ হতে পারে। ট্রেনারের সঙ্গে কার কন্ডিশনিং ঠিকঠাক আছে? কার নেই? খোঁজখবর নেওয়া হতে পারে। কিন্তু আসল জিনিস হল সব কুড়িয়ে বাড়িয়ে মাঠে পৌঁছে ড্রেসিংরুমের ভেতর টিমের জন্য একটা নীহারিকা তৈরি করা যে এই হবে আমাদের বিস্তার। অমুক ছায়াপথ ধরে আমরা ভাববো,দৌড়োবো আর জিতবো।

রুড গুলিত নইলে কেন বলবেন, ফুটবল যুদ্ধের জেতাহারা মাঠ নয়। করিডোরগুলোতে নিধারিত হয়।

বিখ্যাত কোচ বোরা মিলুটিনোভিচ নাকি কালকের ইন্টারভিউতে বলেছেন,আর্জেন্টিনার জেতা হারা মেসি নয়। আর্জেন্টিনার টেকনিক্যাল স্টাফ নির্ধারণ করে। সোমবার বিকেলের আর্জেন্টিনা সাংবাদিক সম্মেলনে লায়োনেল স্কলনিকে জিজ্ঞেসও করা হল সেই মন্তব্য সম্পর্কে। স্কলনি-কে এত ঝকঝকে দেখতে যে কয়েক দশক আগে জন্মালে ‘সাউন্ড অফ মিউজিক’-এর ক্যাপ্টেনের রোলের জন্য ক্রিস্টোফার প্লামারের সঙ্গে অডিশন দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি আর্জেন্টিনা টিমের সংসার চালান, মেসি নন—এটা ফুটবল কল্পবিজ্ঞান। স্কলনির পাড়ার পিৎজার দোকানও বিশ্বাস করবে না।

নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে রেফারীবিক্ষত ম্যাচের হলুদ কার্ড দেখার জেরে মার্কাস আকুনা এবং গঞ্জালো মন্তিয়েল দুজনেই খেলতে পারবেন না। সেই জায়গাগুলো কীভাবে ভরাট হবে, অবশ্যই কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফ ভাববে। ক্রোয়েশিয়ার হেড কোচ দালিচ চাপ বাড়াতে শুরু করে দিয়েছেন এই বলে যে ”ওদের চাপ বেশি। আমাদের ওপর লক্ষ লক্ষ মানুষের এত ভরসা নেই। আমাদের এত সাপোর্টার নেই। তাই কাল জিতলে ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসে সর্বকালের সেরা কৃতিত্ব হবে।” বাইরের দোদোমা মার্কা এইসব কথাবার্তা থেকে টিমকে সরিয়ে রাখার দায়িত্ব স্কলনি ও দলবলের। তা বলে জেতার মূল রোড ম্যাপ মেসি ছাড়া কে করবে?

ধরে নেওয়া যায় ডি’মারিয়া থাকবেন মেসির প্রজেক্টের ভাইস ক্যাপ্টেন। জনপ্রিয়তার বিচারে তাঁর দেশের দু’নম্বর। নেদারল্যান্ডস ম্যাচে তিনি নামার পর আক্রমণ অনেক ধারালো হয়েছিল। মনের দিক থেকেও এখন অনেক শক্তপোক্ত। নইলে মধ্যিখানে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিংয়ের শিকার হয়ে তাঁকে মনোবিদ দেখাতে হয়েছিল। কোথায় গিয়ে ডি’মারিয়া খেলাটা ধরবেন? কী করে কম্বিনেশন প্লে তৈরি হবে তাঁর মেসির সঙ্গে এইসব ঠিক করবেন টিমের দশ নম্বর নিজে। একটা কথা বুঝে নেওয়া ভাল। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের এই পর্বে এসে মহাতারকারা অন্য কারো হাতে হুঁকো খেতে রাজি থাকে না। নিজেদের ভবিষ্যৎ তারা নিজেরাই ঠিক করতে নেমে পড়ে। সে তাঁর নাম মেসি হোক। কী শচীন। কী মারাদোনা।

নেদারল্যান্ডস কোচকে জেতার পর মেসি যে ভঙ্গিতে বিদ্রুপ করেছেন দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে গোটা ফুটবল বিশ্ব। দু’হাতে নিজের কান ধরে মুখটাকে এগিয়ে দেওয়া—আর্জেন্টিনা ফুটবলে তীব্রতম বিদ্রুপ যে কী রে বোকাটা শুনছিস? এখানেই থামেননি মেসি। কমলা জার্সির কোচের দিকে এগিয়ে গিয়ে উত্তেজিতভাবে বলেছেন, ”আর্জেন্টিনাকে অসম্মান করতে চেয়েছিলি। কেমন দেখলি?” ‘মেসি ছুটে যাচ্ছেন বিপক্ষ কোচের দিকে। তাঁকে গালাগাল করছেন এ জিনিষ বিশ্ব দেখেনি। আসলে ডাচ কোচ ম্যাচের আগে বলেছিলেন, ”ব্রাজিলে মেসিকে বল ছুঁতে দিইনি। এখানেও দেবো না।” ব্রাজিলে সেই ম্যাচ টাইব্রেকারে জিতে ফাইনাল গেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু মেসি মূল ম্যাচে ভালো খেলেননি। সেটাই সম্ভবত বোঝাতে গেছিলেন ডাচ কোচ। কিন্তু এই মেসি ব্রাজিলের চেয়েও মানসিক দিক থেকে বেশি তাগড়া। খেলা হয়তো আগের মতো নেই। কিন্তু এত বুদ্ধি করে নিজেকে ব্যবহার করছেন। বল নিয়ে এত দ্রুত ঘুরে সূক্ষ্ম মোচড় দিচ্ছেন যে সেই ম্যাজিকেই কাজ হয়ে যাচ্ছে।

দালিচের একদিন আগে যে ইন্টারভিউ নেটে দেখলাম আর যে সাক্ষাৎকার চোখের সামনে এদিন মিডিয়া সেন্টারে হতে দেখলাম— দুয়ে অনেক তফাৎ। আগেরটায় বলেছিলেন, ”লুকা, ম্যাটিও আর মার্সেলো নিয়ে আমাদের যা মাঝমাঠ সেটা ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়েও সেফ। বল গেলে ওখানেই থাকে। মেসিকে জানি। রাশিয়াতে আটকেছি তো দেখেছেন।” রাশিয়াতে ৩-০ জিতেছিল ক্রোয়েশিয়া। মেসি একটাও সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। কিন্তু আবার বলি পেছনে মাসচেরানো না থেকেও এবারের মেসি বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সাপোর্টিং প্লে-তে আগুয়েরো-হিগুয়েনরা তাঁকে ব্রাজিলে ডুবিয়েছিলেন। এখানে আলভারেজ বা মার্টিনেজরা কিন্তু গোটা ম্যাচ অনবরত দৌড়ে বিপক্ষের ওপর চাপ রেখে যাচ্ছেন। আর নেদারল্যান্ডস ম্যাচে প্রমাণিত যে হঠাৎ হঠাৎ একটা ২০/২৫ মিটারের দৌড়ে মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন মেসি। ক্রোয়েশিয়া কোচ তাই বোধহয় আজ মেসির প্রশংসা ছাড়াও বলে গেলেন যে রাশিয়ার সঙ্গে এই ম্যাচের কোনো তুলনাই চলে না। ওটা ছিল গ্রুপ লিগ। তুলনায় চাপ অনেক কম। এটা নক আউট। আলাদা পৃথিবী।

কোচের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের দিন মদ্রিচ এসেছিলেন। আজ এলেন না। মেসির মতো তিনিও নিভৃতে নিজেকে তৈরি করছেন। ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসে আরো বিশ্বদাপানো ফুটবলার এসেছে। কিন্তু লুকা মদ্রিচের মতো এমন সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়নি। শিবিরসূত্রে শুনলাম, মদ্রিচ বরাবর গুরুত্ব দেন টিমের গোলকিপার ডমিনিক লিভাকোভিচকে। ফিফা স্ট্যাটসে বলছে ব্রাজিলের ১২ আক্রমণ একা রুখেছেন লিভাকোভিচ। এদিন জুর্গেন ক্লিন্সম্যানকে বলতে শুনলাম ”পেনাল্টি পেলে তাড়াতাড়ি মেরে নেওয়া ভালো। যত বেশি সময় যাবে তত কিকারের ওপর চাপ বাড়বে। আমার মনে হয় হ্যারি কেনের পেনাল্টিটা তখুনি বল বসিয়ে মারলে এক জিনিষ হত না।” ব্রাজিল প্রসঙ্গে যেমন ক্লিন্সম্যান মনে করেন, প্রথম কিক করা উচিত ছিল নেইমারের। বলেন, ”পুরোনো ধারণাগুলো এখন বদলানোর সময় এসেছে যে সেরা কিকার পাঁচ নম্বরটা মারবে। এখনকার থিওরি হলো ভালরা শুরুতে মেরে প্রথম থেকেই বিপক্ষকে চাপে রেখে দেবে।” আর একটা ধারণা যে ব্রাজিল ১১৭ মিনিটে গোল খেল বলে টাইব্রেকারে মানসিকতা বদলানোর সময় পায়নি। আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়টা পুরো পেয়েছিলো নিজেদের মানসিকভাবে গুছিয়ে নিতে। ক্লিন্সম্যানের কথা শুনে মনে হল তিনি কিংবদন্তি জার্মান ফুটবলার হয়েও ব্রাজিলের বিদায়ের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না।

লিভাকোভিচের গুরুত্ব তাতে এক মিলিমিটার কমছে না। বরঞ্চ গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে ক্রোয়েশীয় গোলকিপার যা খেলছেন, শেষ দুই-তে তাঁর দেশ গেলে গোল্ডেন বলের দাবীদারদের মধ্যে নির্ঘাত থাকবেন। অতীতে অলিভার কান-মাইকেল নয়্যাররা পেয়েছেন। তিনি পাবেন না কেন যেখানে একা দেশকে বাঁচিয়ে চলেছেন? কাল মেসির সঙ্গে তাঁরও একটা রুদ্ধশ্বাস লড়াই হতে পারে।

মদ্রিচ এবারে মেসির মতো আলোকিত নন। রাশিয়াতে ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার অর্জুন। এবার যুধিষ্ঠির। কিন্ত সুনিপুণ অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টারের মতো গোটা টিমের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখছেন। লুকা মদ্রিচ বাদ দিয়ে ক্রোয়েশিয়া। আর মেসিহীন আর্জেন্টিনা ভাবতে পারেন? কালকের ম্যাচ তাই নিছক স্ট্র্যাটেজি নয় প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত হবে দুই দলনায়কের স্নায়ুর লড়াইয়ে।

ওই বিশেষ দিনের বিশেষ নব্বই মিনিটে চাপটা কে বেশি ভালো নেন?

দোহা, ১২ ডিসেম্বর

হর্ষ-বিষাদের চাঁদোয়ায় ব্যতিক্রমী সেমি ফাইনাল মঞ্চ

দোহা শহরের কেন্দ্রস্থলে উল্লেখযোগ্য মেট্রো স্টেশনের নাম আল মনসুরা। তার সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানের গায়ে নেইমারের এত বড় ছবি যে মিস করার উপায় নেই। কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়লে যেন কেমন লাগে। মানুষটা শহর ছেড়ে গিয়েছে। কিন্তু তার স্মৃতিটা কী টগবগে। আর বিষাদের হাওয়া বাড়িয়ে দেয়।

একটু এগিয়ে কোনার চায়ের দোকান। যেখানে আমাদের রাধুবাবুর চায়ের দোকানের মতো চা আর সিঙ্গাড়ার ব্যাপক নৈমিত্তিক ভিড়। সাঁটানো বিশাল ছবিতে নেইমারের সঙ্গে শোভা পাচ্ছেন রোনাল্ডো আর হ্যারি কেন। ডাউনটাউন দোহার লুলুস সুপারমার্কেটে ঢুকে দেখি সবুজ কৃত্রিম টার্ফ তৈরি করা রয়েছে। কাস্টমাররা সুপারমার্কেটে ঢুকেই যাতে বিশ্বকাপের অনুভূতি চাখতে পারেন। সেখানেও জ্বলজ্জ্বল করে রোনাল্ডো আর নেইমার।

এঁদের আচমকা টুর্নামেন্ট থেকে নির্গমন এবং সদ্য ইংল্যান্ডের এত ভাল খেলে বিদায় যেন টুর্নামেন্টের পরিবেশকে নতুন বিষাদবিহ্বল মাত্রায় এনে ফেলে দিয়েছে। মানুষ বলাবলি করছে, কাতার বিশ্বকাপ এত অনিশ্চিত ট্রেন্ড নিয়ে এসেছে যে কোনও কিছু এবার ঘটতে পারে। ফাইনাল হতে পারে ক্রোয়েশিয়া আর মরক্কোতে।

এমনিতে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বেশি সমর্থিত দলের কোনোটাই শহর ছেড়ে যায়নি। আর্জেন্টিনা ও মরক্কো।

বিশেষ করে মরক্কোর জন্য স্থানীয় আবেগ কল্পনাতীত। কিন্তু কাতারে সেই স্থানীয় আবেগের বাইরে বিশ্বফুটবলের একটা বায়ুমণ্ডল তো তৈরি রয়েছে। তার পৃথক কিছু চিন্তাভাবনা আর প্রেক্ষিত রয়েছে। সেই মনন ইংল্যান্ড-ব্রাজিল ও রোনাল্ডো—প্রিয় ত্রিভুজের বিদায়ী আঘাতে ব্যথিত।

আর পাঁচটা বিশ্বকাপের প্রাক সেমিফাইনাল দেখেছি নতুন উদ্দীপনার ফুলকি ভেসে বেড়াতে। কিছু সুপার পাওয়ারের বিসর্জন প্রতিবার অনিবার্যভাবে হয়ে যায়। রাশিয়াতেও তো রথীমহারথিরা অনেকে আগেই ছিটকে গেছিলেন। অথচ সেবার এইরকম বিষাদের চাঁদোয়া তৈরি হয়ে যায়নি পরিস্থিতির ওপর। এবার একে তো পর্তুগালের বিদায়ের মাধ্যমে সি আর সেভেনের বিশ্বকাপ থেকে চূড়ান্ত নিষ্ক্রমণ ধ্বনিত। পৃথিবী জুড়ে বৃহত্তম ক্যাপটিভ অডিয়েন্স তাঁর। সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনো হলিউড স্টারও কাছাকাছি নেই। তিনি চলে গেলে বিশাল ফুটবল ভূকম্পন তো হবারই কথা। প্লাস একটা ধারণা জন্মেছে যে কোয়ার্টার ফাইনালে চূড়ান্ত আপসেট হয়েছে। খেলা অনুযায়ী বিজয়ী নির্ধারিত হলে ব্রাজিল এবং ইংল্যান্ড দুটো টিমেরই শহর ছেড়ে যাওয়ার কারণ ছিল না।

ব্রাজিল সাংবাদিকদের মুখে শুনলাম টিমে নেইমার বাদ দিয়েও খুব ভেঙে পড়েছেন রিচার্লিসন। অলিম্পিকের সোনার পদক জিতে ফিফা প্রেসিডেন্টকে তিনি বড় মুখ করে বলেছিলেন,এই পদকটা আমার গলায় ঝোলাচ্ছেন তো। কাতারের জন্যও তৈরি থাকুন। আবার আমাদেরই দেখতে পাবেন। স্বয়ং প্রেসিড়েন্টকে করা এমন দম্ভোক্তি ফিফার লোকেদের একেবারেই পছন্দ হয়নি। কিন্তু কাতারে রিচার্লিসনের ব্যাকভলির গোল আর কোরিয়া ম্যাচের পায়ের জাদুতে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। এখন দেশজ মিডিয়াও বলছে, আসল ম্যাচে তো তোমায় শেষ দিকে তুলে নিতে হল। তাহলে কিসের তুমি বড় ম্যাচ প্লেয়ার, বিপন্ন ব্রাজিলকে বার করে আনতে পার না?

কোচ তিতে সরে গিয়েও সমালোচনার হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিপর্যয়ে রাহুল দ্রাবিড়ের জন্য যেমন অনেক দাঁতনখ বেরিয়ে পড়েছে। তেমনি ফুটবল মহলে কেউ কেউ বলছেন, কোচ, দুটো পরপর বিশ্বকাপ আপনার অধীনে টিম ছিল। সময় পাননি বলতে পারবেন না। তার পরেও লাস্ট কোপা আমেরিকা অবধি আমরা জিতিনি। তাহলে কিসের বড় টিম? অথবা এমন বড় টিম যাদের বড় ম্যাচ খেলার মানসিকতা আপনি আনতে পারেননি। নেইমারকে পেনাল্টি না মারানো নিয়ে কোচের বক্তব্য লোকে শুনছে যে ওঁকে ইম্পরট্যান্ট ফিফথ শটের জন্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু রেহাই পাচ্ছে না তাঁর টিম কম্বিনেশন তৈরি আর ব্রাজিলের বিগ ম্যাচ টেম্পারামেন্ট নিয়ে চর্চা।

দেখেশুনে মনে হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট টিমের জন্য যে স্পোর্টিং অবজ্ঞাসূচক টার্ম ক্রিকেটে ছড়িয়ে পড়েছে তা না ব্রাজিলের জন্য উঠে আসে—চোকার্স?

মেসি আপাতত নেগেটিভ চর্চার বাইরে। কিন্তু এঁদের মতো বিশ্বসেরাদের জীবন এমন ট্র্যাপিজের ওপর চলে যে একটা ম্যাচের ফল আচমকা গত তিন সপ্তাহ ধরে ভালো খেলাতে কাল পোঁচ লাগিয়ে দিতে পারে। রাশিয়াতে আগেরবার এই ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ দেখানোর জন্য মেসির আদ্যন্ত ফ্যান তাঁর একমাত্র পুত্রকে নিয়ে গেছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। পুত্র তৃষাণজিৎ ম্যাচের পর এত আপসেট হয়ে পড়ে যে সেই রাত্তিরে আর বিশেষ কথা বলেনি। মেসিদের সেদিন ৩-০ চুরমার করেছিল মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া। কেউ জানে না মঙ্গলবার কী ঘটবে? বদলা? না আরও একটা চূড়ান্ত স্বপ্নভঙ্গের রাত?

কলকাতা থেকে প্রচুর ফুটবল পর্যটক সেমি ফাইনালের দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছেন। এত বড় ঝাঁক অন্যবার দেখা যায় না। ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন ফুটবল সচিব প্রদীপ সেনগুপ্ত অবশ্য প্রতিবারই আসেন। কাল গেছিলেন ইংল্যান্ড-ফ্রান্স ম্যাচ দেখতে। দেখা হল প্রাক্তন সিএবি সচিব বাবলু গাঙ্গুলির সঙ্গে। এসেছেন ইস্টবেঙ্গলের অন্যতম কর্তা রাজা গুহ। বিখ্যাত আইনজীবী অজয় চট্টোপাধ্যায়কে পাওয়া গেল তারা হোটেল হলিডে ভিলেজের লবিতে। তিনি ও আইটিসি বোর্ডের সদস্য, কলকাতার কর্পোরেট জগতের পরিচিত মুখ বিশ্ব চ্যাটার্জি গেছিলেন পর্তুগাল এবং তার আগের দিন রেফারি-বিধ্বস্ত মেসি ম্যাচ দেখতে। গোলপোস্টের পেছনে বসে মেসির এমন সব এক্সপ্রেশনের ভিডিও তাঁরা করেছেন, যা ইউ টিউব স্বচ্ছন্দে ধারণ করে নেবে। শিলচর নিবাসী আসামের প্রাক্তন ক্রিকেট কর্তা বাবুল হোড়-ও এসেছেন খেলা দেখতে।

তন্ময় ব্যানার্জি—কলকাতার আইটি জগতের এক বিখ্যাত নাম এবং ফিল্ম প্রযোজক আবার কাতার নেমে ঢুকে গেলেন জাহাজে। কাতারের রাজপরিবার এই বিশ্বকাপ পরিচালনা করছে এবং স্থান সংকুলনে এটা তাঁদের অভিনব আইডিয়া। হোটেলে যেহেতু আর কোথাও রুম নেই। দোহার ডাঙায় থাকার ব্যবস্থা নিঃশেষিত। তাই জলে বিকল্প ব্যবস্থা রাখো। ক্রুজ লাইনারগুলোতে মানুষ থাকবে। যেমন হোটেলে থাকে। শুনলাম অভিনেত্রী রচনা বন্দোপাধ্যায়ও সপুত্র ক্রুজের ভেতর। উত্তরের বিখ্যাত শাড়ি বিপনী আদি মোহিনী মোহন কাঞ্জিলালের কর্ণধার দম্পতি আশিস-স্বর্ণালীও মেসির সেমি ফাইনালের অমোঘ টানে ছুটে এসেছেন কাতারে। সঙ্গীত পরিচালক এবং তারও আগে নিখাদ ক্রীড়াপ্রেমী জয় সরকার দোহাতে। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় আর অনুপম রায়ও। আপাতত দু’লাখে বিক্রি হচ্ছে প্রথম সেমি ফাইনালের টিকিট। ফাইনাল মোটামুটি লাখতিনেক।

ব্যতিক্রমী সেমি ফাইনাল মঞ্চ বলছিলাম। ব্যতিক্রমী ছাড়া কী বলবো? একে তো ব্যতিক্রমী ওয়েদার। আরব বেদুইনের দেশে টানা তিন রাত এমন ঠান্ডা আর হাওয়া ভাবা যায় না। তার ওপর ৭২ ঘন্টা পরেও তীব্র হ্যাং ওভার রয়েছে আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস ম্যাচের। নেটে দেখলাম ম্যাচটাকে ‘ক্ল্যাসিক’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কী করে ‘ক্ল্যাসিক’ হয় জানি না এমন আদ্যন্ত মারপিটের ম্যাচ। বহু বিতর্কিত হতে পারে। মহানাটকীয়ও। কিন্তু কোনোমতেই উচ্চাঙ্গের নয়।

রেফারির বিরুদ্ধে সেদিন রাতে যে পরিমান লাভা উৎগরণ মেসি আর তাঁর গোলকিপার করেছেন তাতে কোনো না কোনোরকম শাস্তি অনিবার্য। ফিফা অবশ্য জানিয়েও দিয়েছে যে তারা দু’টিমের বিরুদ্ধেই তদন্ত শুরু করেছে। এমন হতে পারে যে সেমি জিতে উঠেও আর্জেন্টিনা টিম বা তাদের কেউ না কেউ শাস্তির খপ্পরে পড়লো। তাই মরক্কো বাদে কাউকেই আশেপাশে খুব প্রফুল্ল দেখছি না।

এরপর হেডিং-য়ে কেন বিষাদের চাঁদোয়া ব্যবহার হয়েছে বুঝলেন?

দোহা, ১২ ডিসেম্বর

নীল-বসন্তে ফুল গাঁথলো আমার জয়ের মালা

প্রথমে মনে হয়েছিল জুলিয়ান আলভারেজের জন্য গানের অন্য লাইনটা তো বেশি উপযুক্ত! যৌবনেরই ঝড় উঠেছে আকাশপাতালে/নাচের তালে ঝংকারে তার আমায় মাতালে।

পর মুহূর্তে মনে হল শুধু দৃপ্ত যৌবন কোথায়? ক্রোটদের চূর্ণ করতে নীলাভ যৌবনের পাশাপাশি অভিজ্ঞতার রূপোলি ঝলক তো বরাবরের মতো ছিল। থার্ড গোলটা মেসি যেভাবে সাজিয়ে দিলেন তাতে মনে হল, নিজের উত্তরাধিকারকে বলছেন, এস আমার আর্ম ব্যান্ড নিয়ে নাও। আজ থেকে দায়িত্ব তোমাকে দিয়ে দিলাম। আর একটা ম্যাচ বাদে আমি তো ইতিহাস। নীল জার্সির পূতাগ্নি তোমাকেই জ্বালিয়ে রাখতে হবে আলভারেজ।

ব্যাখ্যা করতে সমস্যা হবে এমন বৈশিষ্ট্যের সেমি ফাইনাল। আর্জেন্টিনা অদ্ভুত ইউরোপিয়ান স্টাইলে ম্যাচটা খেলল যা মিডিয়া সেন্টারে বসে গরমাগরম লিখতে গিয়ে কেমন ঘোরের মতো লাগছে। ল্যাটিন আমেরিকান টিমগুলো যেমন লাবণ্যের সঙ্গে খেলে প্রথম দিকে কোথায় সেই লাবণ্য? বরং রীতিমতো ধুঁকছে। ইতিহাস বলছে, আর যারা টাচ প্লে-র ওপর খেলে তারা যেদিন টাচ পায় না, কখনোই পায় না। মেসিকে কেউ ম্যান মার্ক না করলে কী হবে, অদৃশ্য চক্রব্যূহের মধ্যে রেখেছে। তিনি বল ধরা মাত্র তিনজনের মোবাইল ইউনিট তাঁকে ঘিরে ফেলছে। মাঝমাঠ পুরো ছন্নছাড়া।

প্রথম ২৫ মিনিট খেলা দেখে মনে হচ্ছিল রাশিয়াতে অবিকল এক জিনিস দেখেছি। লুকা মদ্রিচ ওটি-তে সার্জনের কোট পড়া পেশাদারের মতো সেদিনও শান্তভাবে পুরো অর্কেস্ট্রাটা নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। কোনও ব্যস্ততা নেই। বাড়তি উত্তেজনা নেই। ফাইনাল থার্ডেও কী নিখুঁত ফুটবল খেলেন। ভবিতব্য তো ঠিকই আছে। এমন সর্বাত্মক আধিপত্য। আবার দু-তিন গোল হতে যাচ্ছে। প্রায় নব্বই হাজারের স্টেডিয়ামে কী প্রচণ্ড অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স হয়েই না সেটা নেমে আসবে। অলরেডি আর্জেন্টিনা ফ্যানদের চিৎকার কমে গিয়েছে।

মাঠের টিভিতে স্ট্যাট দেখাল, এ পর্যন্ত বল পজেসনে ক্রোয়েশিয়া ৫৭ পার্সেন্ট। আর্জেন্টিনা ৩১ পার্সেন্ট। দেখে অবাক লাগল আমি ভাবছিলাম আর্জেন্টিনার ১৩/১৪ হওয়ার কথা। ৩১ পার্সেন্ট কোথা থেকে হল? আর একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিল। ফুটবলে বহুল প্রচলিত। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা সত্তর-আশির দশকে কলকাতা ময়দানে ভীষণ আওড়াতেন। সেই সময়ের বিশ্বখ্যাত ‘ওয়ার্ল্ড সকার’ পত্রিকায় আসলে আইডিয়াটার কথা প্রথম লিখতে শুরু করেন কিংবদন্তি ফুটবল লিখিয়ে ব্রায়ান গ্ল্যানভিল। আর সেখান থেকে কলকাতার ছিনিয়ে নেওয়া। কী? না মাঝমাঠ যার-ম্যাচ তার।

মঙ্গলবারের লুসেইল স্টেডিয়াম ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ টুকরো টুকরো করে কাটল সেই প্রাচীন অরণ্য প্রবাদ। দেখাল গতির তুফান যার ম্যাচ তার। নইলে ক্রোয়েশিয়া যেভাবে শুরু করেছিল এবং মাঝমাঠ যেভাবে ইজারা নিয়ে নেয় তাতে মনে হচ্ছিল আজ এরা নয়ছয় করে দেবে। একটা সময় বিস্ফারিত হয়ে দেখলাম নিজেদের মধ্যে ১৮টা পাস খেলল। বিস্ফারিত হয়ে দেখার মতোই। বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কেউ টানা ১৮ পাস খেলতে পারে—না দেখলে বিশ্বাস হবে না। তখন অবধি জানি ক্রোয়েশিয়া মাঝমাঠ হল আদর্শ শক অবজার্ভার। তারা হজম করছে আর্জেন্টিনা আক্রমণ। লিও মেসি আটকে যাচ্ছেন চক্রব্যূহে। তাহলে আর কে বাঁচাবে নীল জার্সিকে?

আর্জেন্টিনা হঠাৎ করে গতির তুফান তুলল। তিন-চার টাচে তারা যে মাঝমাঠ থেকে গোলে পৌঁছে যেতে পারে বারবার দেখাল। ক্রোয়েশিয়াকে একাধিকবার বোঝাল স্যাকরার ঠুকঠাক, কামারের এক ঘা। পেনাল্টির সময় এমনভাবে দাঁড়ান ক্রোট গোলকিপার যে পুরো গোল মনে হয় আড়াল হয়ে গেছে। মেসি কি তাহলে আজকের হ্যারি কেন? সেই আতঙ্কেই বোধহয় পেনাল্টি শটটা দেখতে চাননি ব্রাজিল গোলকিপার। এমিলিয়ানো নিজের গোলের দিকে পেছন ফিরে বসে ছিলেন।

তখন অবধি জানি এটাই ম্যাচের সেরা ছবি। আলভারেজ দেখালেন কী ভুলই না আগাম ভাবা হয়েছিল। ৫৫ গজ দৌড়ে তাঁর আজকের প্রথম গোল তর্কযোগ্যভাবে এবারের বিশ্বকাপের সেরা। দৌড়ের মধ্যে দুই ডিফেন্ডার বাধা দিতে এসেছে। তাদের পায়ে বল লেগে নিয়ন্ত্রণ থেকে সামান্য ছিটকে যাওয়া বল আবার আলভারেজের পায়ে এসেছে। সব ঠিক। কিন্তু এই গোল আজকের ফিটনেস সম্পন্ন ফুটবলে তিরিশ চল্লিশ বছরে এক আধবার হয়। এক কথায় গ্রহান্তরের। এক মুহূর্তের জন্য কি তাঁর বুটে দিয়েগো ভর করেছিলেন? ছিয়াশির দুটো অমর গোল বাদ দিচ্ছি। এইরকম দু-চার পিস গোল ইউ টিউব খুললে মারাদোনার নাপোলির হয়ে দেখা যাবে।

আলভারেজের দৌড় দেখে মনে হল এম্ব্যাপে এবার জাঁদরেল প্রতিপক্ষর মুখে পড়লেন। উইং থেকে ফাঁকা জায়গায় তবু দৌড়নো যায়। এত ভিড়ে ঠাসা মাঝমাঠ দিয়ে গোল পর্যন্ত তীরবেগে দৌড়নো তো প্রায় ফুটবলের কল্পবিজ্ঞান।

এই আর্জেন্টিনা ফাইনালে হারলে অঘটন হবে!

দোহা, ১৪ ডিসেম্বর

কাপ ছাড়াই ধরে ফেলেছেন মারাদোনাকে?

মিডিয়া সেন্টারে কাল মাঝ রাত্তিরে ম্যাচ লেখার ফাঁকে লক্ষ্য করলাম, এক টেবিলে বসা দুই আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিক ক্রমাগত উসখুস করে যাচ্ছেন।

বিদেশী কোনো নাম্বার দুজনেই ট্রাই করছেন আর না পেয়ে মুখে নানারকম হুশহাশ শব্দ। দেশ ওইরকম ৩-০ জেতার পর মুখে হতাশার প্রতিচ্ছবি কেন? ঠিক উল্টোটাই তো হওয়ার কথা?

কৌতূহল হল যে এঁরা কি মেসির বাবাকে ফোনে ধরছেন? আর পাচ্ছেন না? অভদ্রের মতোন জিজ্ঞেস করে জানলাম, না এঁরা মারিও কেম্পেসের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কেম্পেসকে অন্তত মধ্যবয়ষ্ক বাঙালির ভোলার কোনো কারণ নেই। তার বিশ্বকাপ ফুটবল প্রথম টিভিতে লাইভ দেখা সেই ১৯৭৮-এ।

লিওনেল মেসির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ট্রফি থেকে তিনি মাত্র ৯০ মিনিট দূরে সেই বিশ্বসম্মান আর্জেন্টিনাকে প্রথম এনে দেন কেম্পেস। দেশ ছেড়ে এখন তিনি থাকেন আমেরিকাতে। দোহা এসেছেন ইএসপিএনের বিশেষজ্ঞ ভাষ্যকার হিসেবে কাজ করতে। লোকাল নাম্বার নেননি। হোয়াটসআপেও উত্তর দেন না। তাঁকে করতে হয় নর্ম্যাল মেসেজ। আপাতত না কেম্পেস এঁদের ফোন ধরছেন। না মেসেজের জবাব দিচ্ছেন। আমার ফোন থেকে চেষ্টা করা হল। সেই নিস্ফলা।

ম্যাচ প্রতিক্রিয়া ততটা নয়, এঁরা কেম্পেসকে তখুনি খুঁজছিলেন নির্দিষ্ট একটা উত্তর পাওয়ার জন্য। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে অসামান্য অ্যাসিস্ট এবং মেসির নিজে পেনাল্টি গোল দেখার পর এখন কেম্পেসের কি মনে হচ্ছে যে কাপ ছাড়াই কী দিয়েগোকে ধরে ফেলেছেন মেসি? আলোচনার সূত্রপাত করেছেন ক’দিন আগে আটাত্তরের বিশ্বজয়ী দলের ক্যাপ্টেন ড্যানিয়েল পাসারেলা। বলেছেন, ”কবে থেকে বলছি! এবার সবাই বুঝছে যে মেসি ছাড়িয়ে গেছে দিয়েগোকে।”

মারাদোনার বিশ্বস্ত সৈনিক গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা অবধি চলতি বিশ্বকাপে মেসিকে নিয়ে এমন উচ্ছ্বসিত যেন তিনি আর্জেন্টিনীয় ফুটবলের প্রথম প্রকৃত সুপারস্টার। অ্যালান শিয়ারার যেমন ঘুরিয়ে বলেছেন যে মেসির তর্ক জেতার জন্য শুধু রোববারের ম্যাচটা জিতলেই চলবে। বাকিরা তা বলছেন না। এঁদের কারো কারো মতে, মেসি এই টুর্নামেন্টে অলরেডি যা করেছেন তাতে আর অগ্নিপরীক্ষার অর্থ হয় না যে কাপ জিতলে একমাত্র তাহলেই ওর তুমি পাশে বসার যোগ্য।

মারাদোনার টিমের বিশ্বস্ত গোলকিপার গোয়কোচিয়াকে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিলার্দো কোচ। মেসি-মারাদোনা দুজনকেই পাওয়া যাবে। এই অবস্থায় বিলার্দো কাকে খেলাতেন? গোয়কোচিয়ার জবাব, কোচ দুজনকেই একটা হাফ করে ব্যবহার করতেন। সাদা বাংলায়, মারাদোনার সমসাময়িকরাই অনেকে মনে করছেন, কাপ অথবা নো কাপ, দীর্ঘ ফুটবল ছায়াযুদ্ধে মেসি আর পেছনে নেই। মেসি গতকাল রাতে জানিয়ে দিয়েছেন দোহার ফাইনাল তাঁর বিশ্বকাপে শেষ ম্যাচ। ধরে নেওয়া হচ্ছে দেশের হয়েও শেষ ম্যাচ। তাই চূড়ান্ত এক্সেল শিট টেনে ফেলা হচ্ছে—কে এগিয়ে থেকে শেষ করলেন? নাকি অলরেডি সমান সমান?

নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মিডিয়া রাখঢাক না করে বলছে মেসি এগিয়ে গিয়েছেন। লন্ডনের কাগজে দেখলাম লেখা হয়েছে যে মেসি-রোনাল্ডো গত বারো বছর ফুটবল বিশ্বে যেভাবে রাজ করেছেন, তার দ্বিতীয় কোনো নমুনা পেলে পরবর্তী বিশ্ব ফুটবলে নেই। এঁদের হিসেব দেখাচ্ছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে মারাদোনার সময়সীমা সাত বছর। ১৯৮৪-৯১। এর পর মাদক কেলেঙ্কারিধস্ত মহানায়ককে নাপোলি ছেড়ে দেয়। জিনেদিন জিদান পরবর্তী সময়ের বিশাল সুপারস্টার। কিন্তু তিনিও আট বছরের বেশি সর্বোচ্চ মঞ্চে টানতে পারেননি। মেসি শুধু টেনেই যাচ্ছেন না। এই বিশ্বকাপে অস্তগামী রোনাল্ডোর সমান্তরালভাবে এমন ফুটবল খেলছেন যে কে বলবে তাঁর বয়েস ৩৫?

মঙ্গলবার লুসেইল স্টেডিয়ামে তাঁর খেলা দেখার জন্য সুনীল গাভাসকর ও সানিয়া মির্জা দুজনেই হসপিটালিটি বক্সে হাজির ছিলেন। ছিলেন অন্য জগতের তারকারা। জীবনের পঞ্চম ও শেষ বিশ্বকাপে এসেও সেরা চুম্বক এখনো তিনি। গোল্ডেন বুট আর গোল্ডেন বল—দুটোরই তালিকায় মেসির নাম থাকা উচিত। টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার করা ১২ গোলের মধ্যে পাঁচটা নিজে করেছেন। তিনটে অ্যাসিস্ট করেছেন। কী অসামান্য স্ট্যাট!

বিলেতের কাগজ মনে করিয়ে দিয়েছে, মেসি শুধু তাঁর টিমকে কার্যত একা দুটো বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলেননি। সাতখানা ব্যালন ডি ও’র। চারবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। এগারোটা চ্যাম্পিয়নশিপ। আর একটা কোপা জিতেছেন সঙ্গে। আধুনিক সময়ে ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব কিন্তু দেশজ মঞ্চে রমরমার চেয়ে বেশি কঠিন। ম্যাচ চলাকালীন বেসরকারিভাবে দোহায় উড়ে আসা ৪৫ হাজার আর্জেন্টিনা সমর্থক একটা গান অবিরত গেয়ে চলেছে। ইংরেজি অনুবাদ করলে এইরকম দাঁড়ায় : বয়েজ আমাদের আশা আবার নতুন করে জেগে উঠেছে। একটা করে লাইন গাওয়া শেষ হয় আর চিৎকার ওঠে মেসি মেসি। কোনো দেশনায়কও এইরকম সমর্থন পাবেন কিনা সন্দেহ।

ক্রোটদের বিরুদ্ধে আলভারেজের গোলটা কঠিনতম হলেও আলোচনায় বারবার ফিরছে মেসির চমৎকার ভাবে থার্ড গোলটা সাজিয়ে দেওয়া। রাইট উইং দিয়ে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে ঢোকার পর ওইটুকু সরু জায়গার মধ্যে ড্রিবল করতে করতে যেভাবে তিনি গোললাইন থেকে ব্যাক সেন্টার করেন, তা রূপকথা! আধুনিক ফুটবলে কেউ কাউকে ন্যূনতম জায়গা দেয় না। ফিটনেসেরও গড়পড়তা মান এখন এত উঁচু যে তিন-চার ইঞ্চি দূর দিয়ে গেলেও ডিফেন্ডার ঠিক ট্যাকলে পা পেয়ে যাবে। প্লেয়ারদের গড় গতি এখন অনেক বেশি। অর্থাৎ মিডফিল্ড থেকে পেনাল্টি বক্স— ডাউনটাউন দোহার মতো ছাড়া ছাড়া জায়গা আদৌ নেই। বরঞ্চ পেনিট্রেটিভ জোন মানে ধারাভির বস্তি। মেসি সেখানে যে আচমকা নিজের বা কোনো সতীর্থর জন্য স্পেস বার করে ফেলেন সেটা প্রখর বাস্তব। কিন্তু সেই মুহূর্তের ঝটকায় মনে হয় অপটিক্যাল ইলিউশনের মতো। ঘটে যাওয়ার পর অবিশ্বাসী মন প্রশ্ন তোলে, সত্যি ঘটল? কী করে ঘটল? স্বপ্ন দেখিনি তো?

কারো কারো মনে হচ্ছে ২০১১-র বিশ্বকাপ অদৃষ্ট যেমন সচিনের জন্য চূড়ান্ত সম্মান রেখে দিয়েছিল, কাতারেরটাও অদৃশ্য শক্তির দ্বারা পূর্বনির্দিষ্ট আছে মেসির জন্য। সমস্যা হল বিশ্বপর্যায়ের স্পোর্টকে রূপকথা সময় সময় মনে হলেও সেটা বিজ্ঞান। পাওয়ার, ফিটনেস আর স্কিলের বিজ্ঞান। রূপকথা কখনো নয়। ক্রিকেটে একটা কথা খুব চলে, ল অফ অ্যাভারেজ। সেটা ফুটবলের ক্ষেত্রেও সত্যি যে অনেকগুলো দ্রুতগামী দিন পরপর যাওয়ার পর কোনো একদিন চাকাটা সাময়িক থামে।

যদি রোববার সেই দিন হয়? পেট্রোলের দাম এখানে মাত্র ৪৪ টাকা বলে (কলকাতায় ১০৬) অনেক লম্বা রাস্তা যেতেও কম টাকা লাগে। শহরের ওপর দিয়ে ১০০ কিলোমিটার স্পিডে অকাতরে উবের বা প্রাইভেট গাড়ি চলে। মেসি সেভাবেই চলছেন গোটা বিশ্বকাপ।

কিন্তু ওই বিশেষ-রোববার যদি কলকাতার স্পিডে চলে? এখানেই কাতার বিশ্বকাপের ২০২২ ডিসেম্বরের কাহিনী। তারা বলছে রোববার বিশেষ রঙে হাজির হলেও মেসি সমান সমান করবেন না। ওটা অলরেডি হয়ে গিয়েছে। ট্রফি হাতে উঠলে অন্তত ব্যক্তিগত পারফরমেন্স বিচারে তিনি ছাপিয়ে যাবেন বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালীন রাজপুত্রকে!

যতই আর্জেন্টিনার ঘরের মামলা হোক—সেটাও তো এক বিশ্বকাপ!

দোহা, ১৪ ডিসেম্বব

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ’

দুটো জায়গার মাঝে দূরত্ব ৩৩৯৩ কিলোমিটার।

দুটো তারিখের মধ্যে দূরত্ব ১৬৩২ দিনের।

দুটো মহাদেশের মাঝে দূরত্ব। ওটা ঘটেছিল ইউরোপে। এটা এশিয়া।

উবেরের মতো করে প্রাথমিক লোকেশন দিতে হলে ওটা কাজানের মাঠ। এটা দোহা-র স্টেডিয়াম। ওটা ছিল শেষ আটে ওঠার নকআউট। এটা বিশ্বের একনম্বর নিষ্পত্তির নকআউট।

মেসির আর্জেন্টিনা এবং এম্ব্যাপের ফ্রান্স ফের মুখোমুখি। ক্ল্যাসিক্যাল চ্যালেঞ্জার বনাম চ্যাম্পিয়নের লড়াই। রোববারের লুসেল স্টেডিয়াম এই গ্রহের কয়েকশো কোটি মানুষের অসীম উত্তেজনার ভারবাহক হিসেবে অকৃত্রিম বদলার যুদ্ধও দেখবে। রাশিয়া যা দেয়নি। কাতারের মরুভূমি কি দেবে? ওখানে আপ্রাণ যুদ্ধে ৩-৪ হেরে গেছিল আর্জেন্টিনা। এখানে আর্জেন্টিনার হয়ে জীবনের শেষ ম্যাচে মেসি কি ন্যায় বিচার নামক সেই অপার্থিব বস্তুটা পাবেন যাকে রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকে ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

নাকি যুদ্ধে রোম্যান্টিকতার স্থান নেই। ভাবালুতা চলে না? যুদ্ধ মীমাংসা করে বেয়নেটের আস্ফালন। তরোয়ালের আধিক্য। আর মরদের মন। বিশ্ব ফুটবলের প্রথম পানিপথের যুদ্ধে জিতেছিল ফরাসিরা। বাবর যেমন সেই যুদ্ধে জিতে মোঘল সাম্রাজ্যের স্থাপন করেন, তেমনি মেসিদের হারিয়ে এরকম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার রাস্তা কণ্টকশূন্য করে ফেলেছিল দেশ-র ফ্রান্স।

আন্দাজ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিলাম কাতারে নিজের ঘরে বসে ফরাসিদের রাতের সেমি ফাইনাল একা দেখছিলেন মেসি? নাকি কোচকে নিয়ে? টিমকে নিয়ে? একান্নবর্তী পরিবারের ধাঁচে এই সবাই মিলে বসে টিভিতে নিজেদের চূড়ান্ত প্রতিপক্ষ কে হচ্ছে লাইভ দেখাটা অনেক সময় টিম বন্ডিং বাড়ায়। স্কলনি সেই ব্যবস্থা করেছিলেন কি করেননি তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হল, আর্জেন্টিনা ফাইনালে মরক্কোকে চেয়েছিল। আর পেল না।

কোনো কিছু খবর না নিয়ে এটা লিখছি। একেবারে বেসিক কমন সেন্স। শখ করে জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত আর গুরুত্বপূর্ণ প্রহরে কেউ গ্রিজম্যান আর এম্ব্যাপে-কে উল্টোদিকে চায়? গ্রিজম্যান লিখতে গিয়ে মনে পড়ল যেটা আগের দিন লিখতে গিয়েও ভুলে গেছিলাম। আমরা এম্ব্যাপে এম্ব্যাপে নাগাড়ে করছি। নিশ্চয়ই সঙ্গত কারণে করছি। কিন্তু ফ্রান্সের পরপর ম্যাচগুলো একটা জিনিস একেবারেই ধূসর রাখে না। সেটা কী? না এম্ব্যাপে হলেন বাড়ির কৃতী বিলেতফেরত ছোট ছেলে। কিন্তু পরিবারটা যে দাদা অসীম পেশাদারিত্বে ধরে রেখেছেন তিনি গ্রিজম্যান। পুরো বাড়ির ফিউজ তিনি। আর্জেন্টিনা যদি মূল ফিউজের বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ করে দিতে পারে, এই ফ্রান্স হাঁসফাঁস করবে। আল বায়েত স্টেডিয়ামে টানা দু’ম্যাচ জিতল ফ্রান্স। যেমন লুসেইলে জিতেছে আর্জেন্টিনা।

আল বায়েত স্টেডিয়ামটা যেতে আসতে যা সময় লাগে একটা গোটা ওটিটি সিরিজ দেখা হয়ে যাবে। যেতে দেড় ঘণ্টা। ফিরতেও তাই। এখানে যেমন দ্রুত গতিতে মিডিয়া শাটল চলে সেটা ভাবলে জার্নিটা কলকাতা থেকে বর্ধমান।

আর ঢুকে মনে হল তিরিশ বছর আগে কেউ জ্যোতিবাবুর ব্রিগেডের সভায় যেন ফেরত নিয়ে গেছে। চারদিকে শুধু লাল আর লাল। লালের উপত্যকা থেকে মরক্কোর জন্য সমুদ্রগর্জনই হচ্ছিল না। বিপক্ষর পায়ে বল পড়লেই উঠছিল সমবেত বিদ্রুপের আওয়াজ। টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে তত এটা মরক্কো সমর্থকদের স্ট্রাটেজি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্রুপাত্মক আওয়াজ টানা করে করে ওদের বল পায়ে কন্সেন্ট্রেশন নষ্ট করে দাও। জায়েন্ট কিলার হিসেবে নাম কিনেছিল মরক্কো। আর আজ প্রথম আফ্রিকান দেশের সেমি ফাইনাল খেলা। পুরো আরব দেশগুলো সমর্থন করছে। অনেকের মনে হচ্ছিল, আজ তারা ফ্রান্সেরও ঘাতক হয়ে দাঁড়াবে না তো? বিশেষ করে এই মাঠ যখন ফেভারিটদের বিদায় দেখেছে এবারে একাধিকবার। দ্রুত মনে পড়ছে জার্মানি আর ইংল্যান্ডের কথা। হ্যারি কেনের ঐতিহাসিক পেনাল্টি নষ্ট তো এখানে।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুর্দান্ত সাইড ভলিতে গোল খেয়ে যাওয়ার পর মরক্কো বিপুল হর্ষধ্বনি আর ক্রমাগত উত্তেজনার মাধ্যমে ভাল কিছুই সুযোগ তৈরিও করেছিল। একবার তাদের পিএসজি-র তারকা প্লেয়ার আশরাফ হাকিমের দুর্দান্ত ব্যাকভলি সাইড পোস্টে লেগে ফিরল। আরো দু-একবার শট নিতে দেরি করল গোল এরিয়ায়। ফ্রান্স প্রতিআক্রমণে এবারের বিশ্বকাপের ক্ষিপ্রতম। ফরোয়ার্ড ও মিডফিল্ডাররা যে গতিতে দৌড়োয়, শেষ ছ-গজ থেকে বিপক্ষের ছয় গজ জাস্ট তিন টাচে পৌঁছে যাচ্ছে।

রোববারের জন্য দুর্ভাবনা যদি লাইভ টিভি কভারেজ বয়ে আনা এই দৃশ্য ক্রমান্বয়ে আমদানিও করে থাকে। মেসির জন্য স্বস্তির ফ্রেমও ছিল অনেক। ফরাসি ডিফেন্সকে মোটেও দুর্গ সদৃশ মনে হয়নি। লাল জার্সি যদি এতগুলো চান্স ওপেন করতে পারে, নীল থাকলে কী করত? পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে নিশ্চয়ই তারা গুছিয়েই লড়তে আসবে।

দোহা, ১৫ ডিসেম্বর

দোহা এখন আর্জেন্টিনার ‘কলোনি’

এক একসময় ফুটবল পর্যটককে তীব্র দোটানায় পড়ে যেতে হচ্ছে। কোনটা বেশি তাজ্জব হয়ে সে দেখবে? মেসির জাদুগরি? হাফ লাইন থেকে গ্রিজমানের অচঞ্চল নেতৃত্ব? এগুলো দেখার জন্যই তো তার অমোঘ মাধ্যাকর্ষণে গাঁটের কড়ি খরচা করে দূর কাতারে উড়ে আসা? নাকি তন্ময় হয়ে প্রত্যক্ষ করবে ফুটবল আর আর্জেন্টিনা ঘিরে ঘটতে থাকা আরব্য উপন্যাসের এক একটা রাত?

পরেরটা তো হিসেবের মধ্যেই ছিল না। বরঞ্চ কাতার নামক রক্ষণশীল ইসলামিক সভ্যতার বুকে বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া মানে সবাই জানতো একটা বিধিনিষেধের প্রিজমের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখতে হবে। মানসচক্ষে সে মোটামুটি দেখে নিয়েছিল এত গোঁড়া জায়গা যে সাহসী পোশাক চলবে না। সন্ধ্যাহ্নিকের আইডিয়া ঝেড়ে ফেলতে হবে। এই কটা দিন কাটাতে হবে ফুটবল আশ্রমিকের জীবন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবল দেখার বিনিময়ে সব রকম উচ্ছ্বলতা ক’দিন ঝেড়ে ফেলতে হবে জীবন থেকে। ধরেই নিতে হবে নিছক ফুটবল বেঁচে থাকবে তার চিরপরিচিত হাইপার উত্তেজনাকে স্লাইডিং ট্যাকলে মাঠের বাইরে বার করে দিয়ে।

অথচ কাল রাত্তির দেড়টার সময় দোহা শহরের কেন্দ্রস্থলে শুক ওয়াকিফ বলে জায়গাটা থেকে প্রায় ধাক্কাধাক্কি করে মেট্রোয় উঠলাম। একটা সময় মনে হচ্ছিল ভিড়ের চাপে দমবন্ধ হয়ে যাবে। চিলচিৎকার চলছে জায়গাটায়। মনে হচ্ছে এই গ্রহের সেরা ফুটবল টিম আর ৫২ ঘন্টা বাদে যে লুসেইল স্টেডিয়ামে নির্ধারিত হবে শুক ওয়াকিফ বুঝি তার সাইড গ্যালারি। আসার সময় তাড়াতাড়ি পৌঁছতে চেয়ে ট্যাক্সি নিয়েছিলাম এবং সেটা নেদারল্যান্ডস-আর্জেন্টিনা ম্যাচের রেফারির নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মতোই ভুল ছিল। আদ্ধেক রাস্তা যানজটে স্থবির। চালক ফরিদপুরের। সামনে দিয়ে বিশাল আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের শোভাযাত্রা আর পতাকা করে ছোট ভ্যান ঘুরছে দেখে বলল, ”দাদা ভয় লাগতেছে। ফ্রান্স কিন্তু দারুণ টিম।”

মনে হচ্ছিল হায়, মেসিকে যদি কেউ ভিডিও করে দেখাত। দেশের সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ক’দিন আগে তিনি অঙ্গীকার করেছেন নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেবেন। কিন্ত তিনি যদি জানতেন, কত কোটি কোটি বিদেশী হৃদয় তাঁর জন্য অদৃশ্য গির্জা-মন্দির -মসজিদে প্রার্থনারত! এই যে মুখগুলো রাত দুটো আড়াইটাতেও তাঁদের হয়ে গাইছে-নাচছে। অন্য দেশের পতাকা তুলে নিয়ে সম্মোহিতের মতো মার্চপাস্ট করছে। এরাও তো ক্যাপটিভ অডিয়েন্স।

বেসরকারি হিসেবমতো দোহা এসেছেন চল্লিশ হাজার আর্জেন্টিনীয়। কিন্তু এই যে উন্মাদনা বুয়েনস আইরেস থেকে ১৩৩০৬ কিলোমিটার দূর ভূখণ্ডে ঘটছে তা শুধু মেসির দেশের নাগরিকদের মধ্যে তৈরি সম্ভব নয়। এটা আর্জেন্টিনা ঘিরে বাকি পৃথিবীর একটা গরিষ্ট অংশের আকুলতা যা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মারাদোনা-রাজে। মেসি তাকে নতুন সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ শিখরের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। লোকের যেন আর তর সইছে না। তারা যত দ্রুত সম্ভব মেসির হাতে কাপ দেখতে চায়। দেখতে চায় বিউগলের আওয়াজসমেত পূর্ণাঙ্গ এবং অভিজাত রাজ্যাভিষেক।

দেশ বিদেশ মিলে আপাতত আর্জেন্টিনীয় নাগরিকত্ব নেওয়া ফুটবল উৎসাহীদের ‘কমন’ আশঙ্কা —ফ্রান্স এত সলিড টিম যে বিপক্ষ আবেগের বৃহৎ সব হিমশৈলকে পাত্তা না দিয়ে জ্যামিতিক বুননে অভ্রান্ত থাকবে। কিলিয়ান এম্ব্যাপে তাঁর চিতাসদৃশ দৌড়ে টালমাটাল করে দেবেন ওটামেন্ডিদের। মেসিকে নিবিড় চক্রবুহে আটকে দেবে ফ্রান্স রক্ষণ। ঠিক যেমন ২০১৪ ফাইনালে করেছিল সোয়াইনস্টাইগারের জার্মানি।

বিপরীতমুখী আশা, সেবার মেসির স্বপ্নে জল ঢেলে দেওয়ার জন্য একটা হিগুয়েন ছিলেন। জুলিয়ান আলভারেজ কিন্তু হিগুয়েন নন। আট বছর আগের ফাইনালে তিনি পাশে থাকলে একই ফল হত কিনা কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না। মেসি নিজেও একেবারে অন্যরকম ভাবে নিজেকে ব্যবহার করছেন। প্রথম দশ পনেরো মিনিট জাস্ট হেঁটে বেড়াচ্ছেন কবির উদাসীনতা নিয়ে। বল পেয়ে হোল্ড করছেন না। এক টাচে ছেড়ে দিচ্ছেন কারো জন্য। তারপর হঠাৎ দৌড়ের অফ দ্য বল মুভমেন্ট থেকে ভিড়ের মধ্যে মুক্তো তৈরি করে দিচ্ছেন।

এরকম সৃষ্টিশীল খেললে তাকে মার্ক করা খুব কঠিন। অন্তত দু’জনকে তাহলে স্যাক্রিফাইস করতে হবে। যা আজকালকার দিনে কেউ করে না। আর একটা স্ট্যাট দেখছিলাম কোনো একটা বছরে বিশ্বপর্যায়ের টুর্নামেন্টে মেসি শেষ দিকে বেশি বিপজ্জনক থেকেছেন তার হিসেব। প্রথম ৮০ মিনিট ১০ গোলে অংশগ্রহণ। ৯০ প্লাস মিনিটে ২৫ গোলে যোগদান। কবেকার এই হিসেব কে জানে। এবারে অবশ্য প্রথম ২৫/২৭ মিনিটের পর থেকেই তিনি ম্যাচ ঘোরাতে শুরু করছেন। অনুমান করার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি ফাইনালে তিনি গোল পেলে লুসেইলের বাইরে কী কী ঘটতে পারে?

আরো একবার বলি, একমাত্র মাঠ আর তাঁর এলাকা নয়। কাতারের জনজীবনে আর্জেন্টিনীয়দের এমন প্রভাব যে কোথাও কোনো দোকানে আর্জেন্টিনার মেমেন্টো নেই। সব বিক্রি হয়ে গ্যাছে। না আছে জার্সি। না মাফলার। ব্রাজিল পাবেন। ফ্রান্স পাবেন। জার্মানি পাবেন। কিন্তু নো আর্জেন্টিনা। তেল আর গ্যাসের বাইরে কাতারের বাণিজ্যে মেসিদের এইরকম অংশগ্রহণ থাকবে কে জানতো? স্থানীয় মুদ্রা রিয়ালের হিসেবে বাণিজ্যের পরিমান ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু প্রভাব দেখে মনে হচ্ছে অন্তত ফাইনাল শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত দোহা আর্জেন্টিনার কলোনি হয়ে গিয়েছে। যেমন ১৯৭১-র আগে দেশটা ছিল ব্রিটিশ অধীনে।

 রক্ষণশীল ইসলামিক দেশ। তারা বিশ্বকাপের আয়োজন করছে বলে কত বিতর্ক। কত সমালোচনা। সেই জুরিখের মহাবিতর্কিত বৈঠকে কাতারের কাপ-সংগঠনের দায়িত্ব পাওয়া থেকে শুরু হয়েছিল। অথচ কী চমৎকার ভাবেই না কাতার করে দেখাল। পর্যটকদের জন্য বাস ফ্রি। মেট্রো ফ্রি। স্কুল-কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ২৫ ডিসেম্বর অবধি যাতে বাড়তি ট্র্যাফিক না থাকে। সরকারি অফিস মাত্র চার ঘন্টা করে। প্লাস এই যে পাঁচটা ক্রুজকে খাড়িতে দাঁড় করিয়ে সেগুলোকে হোটেলের মতো ব্যবহার করা। অন্তত পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার মানুষ এতে জায়গা পেয়ে গেলেন। কলকাতার আইটি নক্ষত্র তন্ময় বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে এরকমই একটা ক্রুজ এম এম সি ওয়ার্ল্ড ইউরোপা-তে গিয়ে দেখলাম দূর্ধর্ষ ব্যবস্থা। ক্রুজেই সিনেমা হল। ডিস্ক। স্পেশালিটি রেস্তোরাঁ। সুইমিং পুল। সেখানে উদ্ভিন্নযৌবনা সুন্দরীদের জলকেলির মাঝেও আর্জেন্টিনীয় সমর্থন। মেসি ও মারাদোনার পোস্টার। তন্ময় ছাড়াও ক্রুজে একাধিক বঙ্গসন্তান রয়েছেন। ফুটবল কর্তা সুব্রত দত্ত। ট্র্যাভেল এজেন্সির কর্ণধার অভিজিৎ দাস। আগরতলায় আইটি পৃথিবীর খুব পরিচিত নাম কমল নাথ।

বিশ্বকাপ দেখতে আগেও দূর দেশে বাঙ্গালি আগমন ঘটেছে। কিন্তু এইরকম ঝাঁকে ঝাঁকে বাঙ্গালিকে বিশ্বফুটবল মঞ্চে আগে দেখিনি। সৌরভ ফাইনাল দেখতে আসছেন জেনে স্থানীয় বঙ্গীয় পরিষদের পক্ষে জয়তী মৈত্র এবং সুব্রত মুখোপাধ্যায় পরিষদের অন্য কর্তাদের সঙ্গে এখন উদ্যোগে যে কী করে প্রিন্স অব ক্যালকুটাকে সংবর্ধিত করা যায়? আদৌ যাবে এতো কম সময়ে? কল্যাণ চৌবেও আসছেন আজকালের মধ্যে। মোহনবাগান থেকে দেবাশিস দত্ত। আর ইস্টবেঙ্গল থেকে সদলবলে দেবব্রত সরকারও পৌঁছেছেন ফাইনালের আগে। গোটা ক্রীড়া বিশ্ব যেন এখন কাতারে হাজির।

এবং তার মধ্যে বাংলার অংশগ্রহণ কিন্তু কম নয়। মধ্য রাতে শুক ওয়াকিফে কুনাফা নামক মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে বিশাল লাইন। সেখানে দাঁড়িয়ে অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন মেসির ম্যাচ দেখেছেন। সঙ্গে থাকা তাঁর পুত্র রৌনক আবার ওই ভিড়ে আর্জেন্টিনার জার্সির খোঁজে। অশেষ পাল নামক শিবপুরের প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ারও সেখানে। উপকারী হিসেবে ঘনিষ্ঠ মহলে পরিচিত অশেষ প্রায় দেড়শো টিকিট বিলি করেছেন বাংলা থেকে আসা তাঁর বন্ধু ও প্রাক্তন শিবপুরীদের। এঁদের ভিড়ে পেলাম কলকাতার ব্যবসায়ী অভিরূপ নাগচৌধুরী আর অরিজিৎ চট্টোপাধ্যাযকে। শুক্রবার সকালে আর এক দঙ্গল বাঙালির সঙ্গে দেখা। প্রাক্তন সি এ বি কর্তা সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়। ব্রেকফাস্টে উল্টোদিকে প্রাক্তন ইস্টবেঙ্গল কর্তা প্রদীপ সেনগুপ্ত আর চিরকালের ফুটবলপ্রেমী ব্যবসায়ী কংসারি কয়াল। এঁরা আবার গাড়ি নিয়ে সৌদি বর্ডারে চলে গেলেন। কাল থেকে তো আর সময় পাব না বলে। কিন্তু ফাইনাল তো কাল নয়—পরশু।

তাহলে? ওই যে বললাম তর সইছে না। ডিটিডিসি কর্তা শুভাশিস চক্রবর্তীও যাবতীয় কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে কাতারে পড়ে আছেন। তুঙ্গস্পর্শী ব্যস্ততা থাকে সারাবছর। কিন্তু ফুটবল কী করে অপেক্ষা করে? তাই এখন কিছুদিন ছেলের হাতে ব্যবসার ভার।

মেসি যদি জানতেন ওই কালজয়ী গানটার কথা—সব খেলার সেরা বাঙালিরই তুমি ফুটবল।

দোহা, ১৬ ডিসেম্বর

ঈশ্বরের দু’পা

লেখার অরিজিনাল হেডলাইন এটা ছিল না শুরুতে স্বীকার করে নেওয়া ভাল। বিদেশে বিশ্বপর্যায়ের যে কোনো টুর্নামেন্ট কভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের জিজ্ঞেস করবেন। টাইম ডিফারেন্সের সঙ্গে যুদ্ধ করে লেখাটা ঠিকমতো ধরানোর জন্য তাদের খেলা চলতে চলতে নানান রকম হেডলাইন মাথায় খেলাতে খেলাতে যেতে হয়। পুরস্কার বিতরণ শেষ হল। সব শুনলেন। তারপর ধীরেসুস্থে শিরোনাম ভাবলেন—সেটা এম্ব্যাপেকে পেনাল্টি বক্সে ছেড়ে রাখার মতো মৃত্যুকামী বিলাসিতা।

দুটো ম্যাচে কোনো তুলনাই হয় না। আজকেরটা শতাব্দীসেরা বিশ্বকাপ ফাইনাল। অন্যটা যত বাহারিই হোক পাঁচ দলের ওয়ান ডে ফাইনাল। তবু শারজায় সেই জাভেদ মিয়াঁদাদের শেষ বলে ছক্কার ম্যাচ রিপোর্টের মতো আজ প্রথম প্যারাগ্রাফ প্রতিনিয়ত বদলেছি। এম্ব্যাপের দ্বিতীয় পেনাল্টির পর শেষ হেডলাইন ল্যাপটপে কম্পোজ করে রাখি। জানতাম এটাই ব্যবহার হবে।

বিশ্বশ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনীর ভাঙা কাঁচের টুকরো।

প্রথম প্যারাও লেখা হয়ে যায়; জীবনে কিছু কিছু ঘটনা এমনই অদৃষ্টনির্দিষ্ট থাকে যে যতরকম ফুল ফোটানোর চেষ্টা হোক। যাত্রাপথ যত বাহারি আর ঐশ্বরিক দেখতে লাগুক। ভবিতব্য ঠিক সেই ধুসর, বাঁকাচোরা গলিতে ঢুকিয়ে অন্তহীন রোমান্সের পেটে ছুরি চালিয়ে দেয়। কাহিনীগুলো অমর হয়ে থাকে। কিন্তু শেষ হয় ট্র্যাজিক বিন্দুতে।

লায়লা-মজনু।

রোমিও -জুলিয়েট।

মার্ক অ্যান্টনি-ক্লিওপেট্রা।

টাইট্যানিকের রোজ এন্ড জ্যাক।

লিওনেল মেসি ও বিশ্বকাপ।

কে জানত যে মারাত্মক ভুল। আধুনিক পৃথিবীর ফুটবলঈশ্বরকে প্রাচীন প্রেমকাহিনী বা ক্ল্যাসিকসের নিরিখে মাপতে নেই। ঈশ্বর তাঁর নিজের মতো করে মর্তের রাজমুকুট ছিনিয়ে নেন। নইলে আজকের অমর ফুটবল-রাত বিশ্বকাপ ইতিহাসে কখনও আবির্ভূত হয়?

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর গোল্ডেন বল পুরস্কার নিতে গিয়ে মেসির মারাকানার হেঁটে যাওয়া, যতদিন বেঁচে থাকব মনে থাকবে। জীবজগতে কোনো মনুষ্য বিশ্বসেরার পুরস্কার নিতে গিয়ে এমন নিস্পন্দ,রক্তশূন্য আর প্রাণহীন ভাবে এগিয়ে যেতে পারে— না দেখলে বিশ্বাস হত না। আর এদিনকার মেসি? কাপ আর একগাল হাসি নিয়ে এমন নাচতে নাচতে ভিকট্রি স্ট্যান্ডে অলরেডি জড় হয়ে যাওয়া তাঁর টিমমেটদের দিকে এগোচ্ছিলেন, যা বিশ্বকাপ আর্কাইভে নিশ্চয়ই চিরকালের জন্য ফ্রেমবন্দি থাকল।

শুধু তো বিশ্বকাপ নয়। শুধু তো গোল্ডেন বল নয়। আর একটা সুক্ষ্ম খেলায় তিনি বহুদিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে গিয়েছেন—গোটের লড়াই। খুব কম মেম্বার এই ক্লাবের। কারণ গোট হল গ্রেটেস্ট প্লেয়ার অফ অল টাইম। ক্লাব ফুটবলের মুকুটহীন অধীশ্বর হয়েও স্রেফ দেশকে মারাদোনার মতো বিশ্বকাপ দিতে পারেননি বলে কোথায় একটা কর্ণ সিন্ড্রোমে রেখে দেওয়া হত মেসিকে। লুসেইল স্টেডিয়াম তাঁকে আগের কয়েকটা কঠিন ম্যাচ জিতিয়ে লাকি মাঠের সংস্কারে ঢুকছিল। রোববার রাতে সুতপুত্র থেকে বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুনে রূপান্তরিত করে গেল। ফুটবল ইতিহাসের এমন মোহিনী রাত কবে এসেছে যে এক ৩৫ বছরের আপাত বৃদ্ধ ফুটবলার চূড়ান্ত প্রতিকূলতা এবং বিপক্ষ যৌবনের উদ্দাম দাপাদাপি সামলে স্থিতধী এবং জয়যুক্ত থেকে সিংহাসনে বসলেন!

সকালে স্যর জিওফ হার্স্টের ইন্টারভিউ দেখে অবাক লাগলো। হার্স্টকে গত কুড়ি বছর ধরে ইন্টারভিউয়ের ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এমনিতে সেই কোন প্রাচীন কালে তিনি বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতিয়েছিলেন ইংল্যান্ডকে। ১৯৬৬-তে যে ফুটবল খেলত তার ইন্টারভিউ পাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ হওয়া উচিত। কিন্তু হার্স্ট এখনো এমন ঠাঁটবাটে থাকেন যে ম্যানেজার অতিক্রম করে পৌঁছনোই যায় না। স্বদেশীয় কাগজে এদিন তাঁর সাক্ষাৎকারের বক্তব্য ছিল, এই ৮১ বছর পৌঁছে তাঁর প্রার্থনা, জীবদ্দশায় কাপ ফাইনালে যেন হ্যাট্রিক না হয়। যাতে বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাট্রিকের রেকর্ড অক্ষত রেখে তিনি ওপারে যেতে পারেন।

কে জানত, সেই প্রার্থনাকে হাস্যকরতম পর্যায়ে নামিয়ে আনতে তিনি কিলিয়ান এম্ব্যাপে করবেন চার গোল। আর মেসি তিন। হার্স্টের একটা গোল নিয়ে আজও বিতর্ক থেকে গিয়েছে যে বল ঠিকমতো গোললাইন ক্রস করেছিল কিনা? মারাদোনা তো ঠিকই বলতেন যে ইংরেজরা হ্যান্ড অফ গড গোল নিয়ে এত কথা লেখে। ওদের নিজেদের চুরি নিয়ে তো টুঁ শব্দটি করে না। আজকের নায়ক ও বিজিতকে নিয়ে ভবিষ্যৎ তেমন কোনো প্রশ্ন তোলার সাহস পাবে না।

ইংল্যান্ড মিডিয়া এত নেগেটিভ সব কথা লিখেছিল কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে। ঠিক যেমন পেছনে লেগেছিল ব্রাজিলের। কাতারের রাজা শুধু পুরস্কারই ফিফা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হাসিমুখে তুলে দিলেন না, ফাইনাল ম্যাচের মহিমায় আরো বেশি করে আধুনিক সময়ের শ্রেষ্ঠ বিশ্বকাপ সংগঠক হিসেবে আলোকিত হয়ে থাকলেন। শতাব্দী সেরা ফাইনাল তো নিঃসন্দেহে। তর্কযোগ্যভাবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ম্যাচ।

 কোনো জ্যোতিষী। কোনো বেটিংবাজ। কোনো বিশেষজ্ঞর কোনোরকম পূর্বাভাস মেলেনি। কেউ জানতো গ্রিজমানকে তুলে নিতে হবে কোচকে? কেউ জানতো গিরু —ফ্রান্সের আর এক সোনালী রেখা—তাঁকে যে তুলতে হবে? কেউ জানতো যে ডি, মারিয়া সেমিফাইনাল খেলতে পারেননি। চোটের জন্য একই ভাবে মিস করেছেন ২০১৪ ফাইনাল। তিনি নেমে গোল শুধু করবেন না। আর একটা গোলের পেছনে থাকা পেনাল্টি আদায় হবে তাঁর জন্য? কেউ ভেবেছিল আলভারেজকেও পুরো সময় মাঠে রাখা হবে না? কেউ জানত এম্ব্যাপে ফার্স্ট হাফে চূড়ান্ত নিরাশ করে দর্শক-সদৃশ উপস্থিতি রাখবেন? কেউ জানত সেই এম্ব্যাপেই দ্বিতীয়ার্ধে এমন তোড়ফোড় শুরু করবেন যে আর্জেন্টিনা রক্ষণ বাদ দিচ্ছি। মেসিরও সাময়িক গ্রহণ হয়ে যাবে। মনে হতে থাকবে যৌবনেরই ঝড় উঠেছে আকাশ পাতালে।

অথচ আর্জেন্টিনা যেভাবে শুরু করেছিল তাতে মনে হচ্ছিল মাঠে একটা টিম শুধু খেলছে। আর প্রথমার্ধেই ২-০ এগিয়ে যাওয়া তারা নিশ্চিন্তে বিশ্বকাপ জয়ী দেশের মেডেলগুলো গলায় পরবে। সুনীল গাঙ্গুলি আরও ভালো ভাবে বঙ্গজ পাঠককে বুঝিয়েছেন যে ফ্রান্স হল ছবির দেশ। কবিতার দেশ। কিন্তু তখনকার মতো কবিতা, ছবি আর গান তো আর্জেন্টিনীয়দের পায়ে। মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে।

মেসি অন্য খেলায় ম্যাচে ঢুকেছেন একটু দেরিতে। সবিস্ময়ে আবিস্কার করলাম জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আড়াই মিনিট থেকে তিনি ধ্বংসাত্মক। যেমন সেরা চ্যাম্পিয়নের নার্ভ তেমনি তাগড়া শরীর। বিপক্ষের চোরাগোপ্তা হাত চালানোয় কানে যে প্রচন্ড চোট পেলেন সেটা সামলানোর জন্য বিশ্বসেরা মনও লাগে।

কী করেননি মেসি! দুটো পেনাল্টি সহ তিনটে গোল। দুটো ফাইনাল পাস। দুটো গোলে তীব্রতম শট। অবিরাম দু দিকে বল বাড়িয়ে যাওয়া। এমনকি বিপক্ষ আক্রমণ বাঁচাতে হেড করে কর্নার করা। সবাই জানত, আধুনিক ফুটবলঈশ্বরের একটা পা। বাঁ পা। আজ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল তো ডান পায়ে করলেন। ঈশ্বর যেন এই জবাবটাও চুকিয়ে দেওয়ার প্রতীক্ষারত ছিলেন।

তবু এত কিছুর পরেও তিনি আমার পুরোনো হেডলাইন অনুযায়ী —ব্যর্থ অমর প্রেম কাহিনী হয়ে থাকতেন এমিলিয়ানো ফার্নান্ডেজের সাহায্য না পেলে। ক”দিন আগে মিডিয়া সেন্টারে আর্জেন্টিনার দু’জন সাংবাদিক বলছিলেন এমিলিয়ানো থাকলে নাকি ২০১৪-র ফাইনাল তাঁরা হারতেন না। মারাকানার সেই গোলটা মিডিয়া গ্যালারির দিকে হয়েছিল। কাছ থেকে দেখেছিলাম বলে মৃদু প্রতিবাদ করি যে মারিও গোটজে চেস্টট্র্যাপ করে যেভাবে কাছ থেকে ঠেলেছিলেন তাতে কিপারের কিছু করার ছিল না। সকালে ইউ টিউবে জার্মানির গোলটা আবার দেখে। এবং অতিরিক্ত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে এমিলিয়ানোর এগিয়ে এসে অব্যর্থ গোল বাঁচানো দেখে মনে হচ্ছে এড়ে তর্ক করছিলাম।

টাইব্রেকারে দূরন্ত বাঁচানো বাদ দিচ্ছি। শেষ মিনিটে তাঁর এগিয়ে এসে অব্যর্থ গোল বাঁচানো না ঘটলে তো খেলার শেষে মাঠের সিংহসদৃশ এম্ব্যাপেকে এত ম্রিয়মান লাগার কথা নয়। তখনই বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আবার খেতাব পেয়ে যায় ৪-৩। গোল্ডেন বল নিয়ে মেসির নিস্পন্দ হাঁটা আবার প্রত্যক্ষ করতে হয় বিশ্বকে। ফাইনালের ওটাই টার্নিং পয়েন্ট।

আর বিশ্ববাণিজ্যের বাজারে বিভিন্ন খেলার সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকা ফুটবলের টার্নিং পয়েন্ট —আজকের ফাইনালের মহাজাগতিক মান। নাহ, এই গ্রহে যতদিন একটি লোকও ফুটবলে কেউ লাথি মারবে, ততদিন জীবিত থাকবে মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত!

দোহা, ১৮ ডিসেম্বর