মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

ব্রাজিল ২০১৪ – ১০

অবিরত বৃষ্টিতে মারাকানা ফাইনালের জল-হাওয়া  সেই জার্মান টিম বনাম ব্যক্তি

রিও শহরের চারশো সত্তর মাইল উত্তরের মাঠে শুক্রবার সকালে তাঁর গোপন অনুশীলন চলছিল। বেলো হরাইজন্তের প্রধান বিমানবন্দর থেকে দশ মিনিট দূরত্বের এই মাঠটায় আজ বাইরের লোক তো দূরে থাক, স্বদেশীয় মিডিয়ারও ঢোকার অধিকার নেই! টিম বাদ দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রায় কাকচক্ষুর আড়ালে এই ভেসপাসিয়ানোতেই মারাকানা ফাইনালের মহড়া সেরে নিলেন লিওনেল মেসি!

রিও পৌঁছে শনিবার মারাকানায় ট্রেনিংয়ের সুযোগ থাকবে। টেকনিক্যালি ফাইনালের আগে ওটাই শেষ প্র্যাকটিস। কিন্তু সেখানে কোনও প্রাইভেসি আছে নাকি? পুরো মিডিয়াকে যদি বারও করে দেওয়া যায়, কর্মকর্তা গোছের কিছু লোকজন থেকেই যাবে। তারা ফিফার হোক কী স্থানীয়। এই বাজারে তাদের এতটুকু বিশ্বাস করার কারণ নেই। তাই শুক্রবার নিজেদের বেস ক্যাম্পেই শেষ সুযোগ, জার্মান চক্রব্যূহে ঢুকে পড়ার পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা করার।

আর্জেন্তিনা ফুটবল সংস্থার কর্তারা রিওতে। তাঁরা আজ বেস ক্যাম্প যাননি। কিন্তু খবর তো বেস ক্যাম্প থেকে প্রতিনিয়তই আসছে যে, জার্মানদের মাস্টারপ্ল্যানটা কী হতে যাচ্ছে! কেপটাউনে আগের সাক্ষাতে মেসিকে ঠুঁটো করে দেন সোয়াইনস্টাইগার আর খেদিরা। এ বার নাকি একটা ত্রিভুজ তাঁর জন্য তৈরি থাকছে—হুমেলস, সোয়াইনস্টাইগার আর সামি খেদিরা।

সকাল থেকে আর্জেন্তিনীয়দের মুখে বদলাতে থাকা ব্রেকিং নিউজের মতো এক-এক বার মেসির জন্য এক-এক জন জার্মান রক্ষীর নাম শুনলাম। জার্মানদের মেসি-মডেল জানার জন্য যে পরিমাণ আর্জেন্তিনার ছোঁকছোঁকানি তাতে সিআইএ-কে প্রয়োজনে কাজে লাগানো গেলে তারা বোধহয় নেই সুযোগটা নিয়ে নিত।

ব্রাজিলের ১-৭ নিধন সম্পূর্ণ হওয়ার মিনিটখানেকের মধ্যে জনৈক ফুটবলার টুইট করেছিলেন। ব্রাজিলের আছে নেইমার। পর্তুগালের কাছে রোনাল্ডো। আর্জেন্তিনার আছে মেসি। জার্মানির আছে একটা টিম! এটা ব্রাজিলে ফুটবল দেখতে আসা দীপেন্দু বিশ্বাস জাতীয় কেউ করলে বলার ছিল না। সাধারণ ভাবে মনে হওয়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু করেছিলেন স্টিভন জেরার।

কোনও ইংল্যান্ড ক্যাপ্টেন কখনও এত মুক্ত ভাবে তার চিরশত্রু জার্মানদের এমন প্রশংসা করেনি। অথচ সর্বাঙ্গীণ ব্যালান্স শিটের মাপকাঠিতে জোয়াকিম লো-র এই টিমটা নব্বইয়ে তার কাপ জেতা টিম বা চুয়াত্তরের বেকেনবাউয়ারের ছেলেদের হারাতে পারত বলে মনে হয় না।

যদিও একটা পরম্পরা সব প্রজন্মেই জার্মানি অটুট রেখে দিয়েছে। এরা যেমন রেখেছে। দ্রুতগামী এবং অসম্ভব বলশালী ডিফেন্স। লোকে জার্মানির আক্রমণ করাটাই দেখে। কিন্তু আরও অনেক রোম্যান্টিক—জার্মান টিম যখন আক্রান্ত হয়। একটা জাতির মেজাজটা তখনই চামড়ার গোলকের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে।

বোয়াতেং আর হুমেলস দু’জনেই বড় চেহারার। কিন্তু পেছনে দৌড়নোর সময়ও অসম্ভব ক্ষিপ্ত। তাঁরা দুঃস্বপ্নেও মার্সেলো বা দাঁতে নন যে হা-রে-রে-রে করে সামনে গেলাম তো মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট নিয়ে চলে গেলাম। ওভারল্যাপে যাওয়া জার্মান ডিফেন্স যদি আক্রান্তও হয়, প্রত্যেকটা ডিফেন্ডার ফেরে থিয়েটার স্টাইল সেটিংয়ে। কখনও কেউ কারও সমান্তরাল নয় যে, এক জনকে পেরোলাম তো বাকিরাও কেটে গেল। এদের সঙ্গে আবার সোয়াইনস্টাইগার। পিকাসো আর ভ্যান গঘকে দেখে যদি বিপক্ষের স্বাদ না মেটে, তিনি সোয়াইনস্টাইগার আবির্ভূত হয়ে পড়েন জার্মানদের মাইকেল অ্যাঞ্জেলো হয়ে! এর সঙ্গে সুইপারে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যানুয়েল নয়্যার। কার সাধ্য এই টিমকে ফুটোফাটা করে দেয়!

বার্সা বা রিয়াল হলে তা-ও কথা ছিল। সব পজিশনে তারকা প্লেয়ার তাদের টানা খেলে খেলে দারুণ কম্বিনেশন তৈরি। জাতীয় দলে তো সে সবের বালাই নেই। সুব্রত ভট্টাচার্য কলকাতায় টিভিতে খেলা দেখেও খুব নিখুঁত লিখছেন, কেন মেসির অসহায়তা ক্রমে বাড়ছে। বার্সার মেসি অনেক বেশি ওয়ান-টু খেলতে পারতেন। কিন্তু ব্রাজিলের মাঠে বল দিয়ে অর্ধেক সময় ফেরতই পাচ্ছেন না। অসহায়ের মতো দূরে দাঁড়িয়ে সতীর্থদের ইঙ্গিত করছেন, নিলি যে বলটা, আবার ঠিক জায়গায় আমাকে দে!

মোরিনহো এ দিন কী লিখেছেন, গোটা ফুটবলবিশ্বের পড়া হয়ে গিয়েছে। মেসি দারুণ, কিন্তু কিছুতেই গ্রেটেস্ট নয়। এই মারাকানাতেই বসনিয়া ম্যাচের অসাধারণ গোল দিয়ে ঠিক সাতাশ দিন আগে লিও মেসির বিশ্বকাপ অভিযান ব্রাজিলে নতুন টেক অফ করেছিল। আর গ্রুপ লিগ হতে না হতেই ফ্লাইট দুর্যোগে পড়ে সেই উচ্চতা আর পাচ্ছে না। বেলজিয়াম আর নেদারল্যান্ডস পরপর দুই ম্যানেজারের কৌশল তাঁকে আটকেছে। আর্জেন্তিনা টিমটাও যে আগের মতো মেসি-সিদ্ধ নয়, মাসচেরানো-জাবালেতারা ক্রমশ দেখাচ্ছেন।

তা হলে জার্মানির মতো একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ টিমের মধ্যে তাঁকে নিয়ে এত আলোচনা কেন? আর্জেন্তিনাই বা বারবার দক্ষ গুপ্তচরের খোঁজ করছে কেন, যারা জার্মান ক্যাম্পের মেসি সংক্রান্ত হাঁড়ির খবর তাদের এনে দিতে পারে।

সিনিয়র জার্মান সাংবাদিক বলছিলেন, ”ইউ টিউবে যান। উত্তরটা নিজেই পাবেন। ফ্রাঙ্কফুর্টে দু’বছর আগের ফ্রেন্ডলি ম্যাচে মেসি কী করেছিল দেখে নিন।” গিয়ে দেখা গেল ম্যাচটা ৩-১ আর্জেন্তিনা জিতেছিল। মেসি গোল করেছিলেন আর করিয়েছিলেন। জার্মান গোলে নয়্যার ছিলেন না। কিন্তু বাকিরা মোটামুটি এক। মুলার, লাম, বোয়াতেং। দু’দেশের ওটাই শেষ সাক্ষাৎ। মেসি যদিও সেই ফ্রাঙ্কফুর্টের ফর্মে নেই, জার্মানরা ন্যূনতম ঝুঁকি নিতে চায় না।

হামবুর্গ থেকে আসা সাংবাদিক বলেছিলেন, টিম আমাদের দুটো কথা বলেছে। ফাইনালে ওদের অগ্রাধিকার সম্পর্কে। এক, বলের দখল রেখে দিতে পারা। নেদারল্যান্ডসের মতো বলের দখল হারিয়ে ফেললে হবে না। দুই, মেসিকে কন্ট্রোল করতে হবে। ও যেন দু’পাশে হাওয়া চলছে সেটাও বুঝতে না পারে। ঐতিহাসিক ভাবে জার্মান টিম নাকি একটা আপ্তবাক্যে বিশ্বাস করে এসেছে। মরণাপন্নের নিঃশ্বাস পড়ে। তাই সে জীবিত। অর্থাৎ শত্রু মরার আগে মরেনি!

সব মিলেমিশে সেই নব্বইয়ের যেন টাইমমেশিনে পরিস্থিতিটা ফিরে গেল।

চব্বিশ বছর পরেও পরম্পরাটা অক্ষূণ্ণ থেকে গেল—ব্যক্তি বনাম দল! মারাদোনার জায়গায় শুধু মেসি।

রিও-র ফাইনাল পরম্পরায় কাল রাত্তির থেকে ক্রমাগত হতে থাকা বৃষ্টিটা একটু আঘাত বসাচ্ছে। চৌষট্টি বছর আগে তো বৃষ্টির জল লাগেনি। গোটা ব্রাজিলের চোখের জল পড়েছিল বলে।

পরম্পরা অবশ্যই এমনিতে তো ভাঙছে। বৃষ্টি অর নো বৃষ্টি। লাতিন আমেরিকার বিশ্বকাপে এই প্রথম ইউরোপের দল অবিসংবাদী ফেভারিট—সেই পরম্পরা নয়। লাতিন দেশে এই প্রথম ইউরোপের দল পাগলের মতো স্থানীয় জনসমর্থন পাবে বলে।

এমনিতে ব্রাজিল টুর্নামেন্ট থেকে সরে গিয়ে উদ্দীপনার মাত্রাটাই ধপ করে নেমে গিয়েছে। আর্জেন্তিনীয়রা জঙ্গি মেজাজে রিও-র অধিকার নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু ফুটবল-আবহাওয়ার ঝলমলে রোদ্দুর তাতেও উঠছে না। ব্রাজিলের সেন্টিমেন্টই হল, জন্মদিনের পার্টির জন্য আগাম ভাড়ার টাকা নিয়েছিলাম বলে নেহাত করতে দিচ্ছি। নইলে এমন শোকের সময় কিছুতেই দিতাম না। স্থানীয় মিডিয়া অবশ্য কাপ ফাইনালের উপযুক্ত কভারেজ দিয়ে যাচ্ছে। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে গাইতে মাঝরাত্তিরে এসে পৌঁছেছেন শাকিরা। ক্যামেরা এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত তাঁকে এমন ফলো করল যেন মারাকানায় খেলার জন্য ফিলিপ লাম নামলেন! অমিতাভ বচ্চনও তাঁর প্রথম ব্রাজিল সফরে সপুত্র এসে পড়েছেন। প্রাক্তন মহাতারকাদের মধ্যে বেকেনবাউয়ার আসছেন না। কিন্তু জিনেদিন জিদান আর জোহান ক্রুয়েফকে বিশেষ আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে। পেলে-রোনাল্ডোরা তো থাকছেনই!

কোপাকাবানা বিচ সংক্রান্ত এলাকা যারা অধিগ্রহণে এক রকম বুয়েনস আইরেস বানিয়ে দিয়েছে, সেই আর্জেন্তিনীয়রা আবার ব্রাজিলের টিভিতে উত্তেজিত বাইট দিচ্ছে, ব্রাজিল তোমার লজ্জা করে না। যারা তোমাদের সাত গোলের মালা পরিয়েছে, তাদের রোববার সাপোর্ট করছ?

ব্রাজিলীয়রা যদিও অবিচলিত। নেইমার দ্য সিলভা কাল থেকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট এবং আম-ব্রাজিলীয়র মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছেন এই বলে যে তিনি মেসির হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চান। কাল রিও বিমানবন্দরের টিভিতে নেইমারের সাংবাদিক সম্মেলন লাইভ দেখাচ্ছিল। যেখানে তিনি কাঁদলেনও।

কিন্তু ওই যে বলা, মেসি ফুটবলকে এত দিয়েছে। ওর হাতে কাপ দেখতে চাই, এটায় ব্রাজিলীয়রা চটে অস্থির। বিমানবন্দরে ট্যাক্সির লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ ব্রাজিলীয় ইঞ্জিনিয়ার বলছিলেন, ”শিরদাঁড়া ভাঙলে কি মাথারও গণ্ডগোল হয়? জানতাম না তো!”

সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত অংশেরই এমন মনের ভাব! তো যে ট্যাক্সির ড্রাইভার সকালে মারাকানায় নামিয়ে দিয়ে গেল, তাকে দোষ দিই কী করে? মেসি পাতালে বলতে বলতে সে মোবাইলে গুগল ট্রান্সলেটর বার করল। ভাষা সমস্যায় আক্রান্ত হোটেলকর্মীদের গুগল ট্রান্সলেটর বার করা ছাড়া অনেক সময়ই উপায় থাকে না। কিন্তু গত চল্লিশ দিনে এখানে কোনও ট্যাক্সিচালককে গুগল ট্রান্সলেটর বার করতে শুনিনি।

বোঝা গেল, এ উত্তেজিত ভাবে কিছু বলতে চায়। তার টাচস্ক্রিনে যা ফুটে উঠেছে একটা লাইন। বাংলা করলে দাঁড়ায়—ভূমিকম্প একটা হয়ে গিয়েছে, রোববার আর যেন না হয়।

মেসির চক্রব্যূহের রংয়ে রোববার হলুদও থাকছে।

রিও, ১১ জুলাই

বন্য আবেগও স্বস্তি দিচ্ছে না মেসিদের

দিয়েগো মারাদোনা নাকি মাত্র ক’দিন আগেও তাঁর ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করেছেন, ”হ্যাঁ রে, কলকাতায় ব্রাজিলের ফ্ল্যাগের সংখ্যা কমার ব্যাপারে কিছু জানলি?” ছ’বছর আগে কলকাতায় দু’দিনের সফর মারাদোনাকে এত ছুঁয়ে গিয়েছিল যে, বারবারই তিনি বলে ফেলেন, ”এত দেশে গিয়েছি। কিন্তু আর্জেন্তিনার বাইরে কোথাও যদি সবচেয়ে বেশি ভালবাসা পেয়ে থাকি, তা হলে এক নম্বর হল নাপোলি। দুই কলকাতা।”

দিয়েগোর বাংলা-প্রীতি দেখে তাঁর ম্যানেজার সেবাস্তিয়ান দে মন্তে দু’হাতে তাঁর ছেলেমেয়ের নামে দু’টো ট্যাটু করেছেন। দু’টোই বাংলা হরফে। রোববার কাপ ফাইনাল ব্রাজিলের মতো শত্রু দেশে খেলার বদলে সল্ট লেক স্টেডিয়ামে হলে কি মারাদোনা সহ আর্জেন্তিনীয়রা অনেক আশ্বস্ত বোধ করতেন?

উত্তর, ‘না’। আর্জেন্তিনা তো রিও-কে বিলক্ষণ বুয়েনস আইরেস বানিয়ে দিয়েছে। এখানকার বিশ্ববিখ্যাত ইপেনেমা বিচে শনিবার সকালে দেখলাম, চোদ্দোশো টাকায় আর্জেন্তিনার পতাকা বিক্রি হচ্ছে! দরাদরি করেও যখন কমলো না, তার মানে পতাকার বিশাল বাজার। রিও শহরের মাঝখানে তেরেইরো বলে একটা জায়গা রয়েছে, অনেকটা ধর্মতলা বাসগুমটির মতো। সেখানে এখন শ’য়ে-শ’য়ে তাঁবু পাতা। রিওর মেয়র এঁদের এখানে দয়াপরবশত হয়ে থাকতে দিয়েছেন। এঁরা সব সফরকারী আর্জেন্তিনীয়। হোটেলে ক’জনের ব্যবস্থা হবে? এক লক্ষের মতো লোক তো মেসির দেশ থেকে চলে এসেছেন। এমনিতে ফাইনালের বাজারে রিওর হোটেলগুলো যা দাম বাড়িয়েছে, তা অস্বাভাবিক! ডেকার্স লেনের ঘুগনি গ্র্যান্ডের ক্লাব স্যান্ডউইচের সমান টাকা দাবি করার মতো। যাঁরা এসেছেন তাঁদের অর্ধেকের না আছে টিকিট, না থাকার জায়গা।

পাবলো জাবালেতা অবাক হয়ে বলছেন, কেউ কেউ নিজের গাড়ি বিক্রি করে সেই টাকায় চলে এসেছেন। অথচ ম্যাচের টিকিট নেই। কাল রাত্তিরে মারাকানা প্রেসবক্সে বসে কাজ করা যাচ্ছিল না, বাইরে এত চিৎকার আর বাজনা। কী না, আর্জেন্তিনীয় সমর্থকরা ব্যান্ডপার্টি নিয়ে শোভাযাত্রা করছেন। আর সেই মিছিলটা ঘুরেফিরে বারবার মারাকানাতেই জমা হচ্ছে।

কোপাকাবানা তটে তো শুধুই নীল আর সাদা। হলুদ রংটা যে দু’দিন আগে জ্বলজ্বল করছিল এবং তাদের আজ শেষ খেলাও রয়েছে—কে বলবে? পোপের পোশাক এবং তাঁর মুখোশে এক আর্জেন্তিনীয় সমুদ্রের ধারে ঘুরছেন। সমর্থকেরা তাঁর কাছে হাঁটু গেড়ে বসছে। আর তিনি যেন ভ্যাটিকানের আশীর্বাদ দিয়ে বলছেন, ”বৎস, মনস্কামনা পূর্ণ হবে। গোলটা মেসিই করছে।” একটু এগিয়ে সমুদ্রের ধারে প্ল্যাকার্ড ঝুলছে, ‘রোখো ক্ষমা চাইছি’। এর সঙ্গের গল্প হল, মার্কাস রোখোকে নাকি আর্জেন্তিনীয় ফুটবল অনুরাগীরা কিছু দিন আগেও তীব্র কটাক্ষ করতেন। বলতেন, ও জাতীয় দলে খেলার যোগ্যই নয়। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে এসে সেই অনূরাগীরাই রোখোর কাছে ক্ষমা চাইছেন। আর বলছেন, আর্জেন্তিনা টিমে মেসি, রোখো আর ন’জন মিললেই জার্মানির জন্য যথেষ্ট। এই প্ল্যাকার্ডটা ঝুলিয়েছে ক্যানুয়েলাসের লোকেরা। ক্যানুয়েলাস হল বুয়েনস আইরেস উপকণ্ঠের ছোট শহর।

কোপাকাবানা যেখানে শেষ হচ্ছে, ঠিক সেই দিকের এক প্রান্তে সোফিটেল হোটেল। ঢুকতে গিয়ে দেখি বিশাল ভিড় আর পুলিশের গাড়ি কিলবিল করছে। কোনও ভিভিআইপি এখনই বেরোবেন। তাঁর জন্য জেড প্লাস নিরাপত্তা দেখাই যাচ্ছে। কিন্তু সেই ব্যক্তিটি কে? মারাদোনা তো এ দিকে নেই। থাকার কথাও না। এটা ফিফার হোটেল। তা হলে কি পেলে? জানা গেল, পেলেও নন। তবে?

জোসেফ ব্লাটার। এখনই বার হবেন তিনি। তা ফিফা মহাকর্তার গাড়ির সামনে পতাকা হাতে আর্জেন্তিনীয়রা ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে দিলেন।

বন্য আবেগ ও দু’কূল ছাপানো ফুটবল-ভালবাসা যদি মাপকাঠি হতো, তা হলে বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসিরা চার গোলে এগিয়ে থেকে খেলা শুরু করছেন। কিন্তু তা যে হয় না, জাতীয় সঙ্গীতের সময় নেইমারের জার্সি দুলিয়ে সাত গোল খাওয়া ব্রাজিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ!

আধুনিক ফুটবল-যুদ্ধ মানে বিজ্ঞান। ফিটনেস। শক্তি। আর চুলচেরা ব্যাপারেও নিখুঁত থাকা। এর সব ক’টা ধারায় জার্মানরা এগিয়ে। আর্জেন্তিনা সবচেয়ে ভয় পায় জার্মানদের বন্য শারীরিক শক্তিকে। আলেকজান্দ্রো সাবেয়া রোববার ফাইনালের পর চাকরি ছেড়ে দিলে কোচ হিসেবে যাঁর নাম সবার আগে উঠছে, সেই দিয়েগো সিমিওনে এ দিন প্রেসক্রিপশন দিয়েছেন—জার্মানরা হাফ লাইন অবধি এগিয়ে যে অফসাইডের ফাঁদ পাতে, ওদের পেছনের সেই ফাঁকা জমিটাই কাজে লাগাতে হবে। সমস্যা হল, বোয়াতেং, সোয়াইনস্টাইগারদের সরিয়ে তো ওই অবধি পৌঁছতে হবে।

রিওতেই শোনা যায়, বিখ্যাত বাঙালি কর্নেল সুরেশ বিশ্বাসের নামে রাস্তা আছে। ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’-এ তাঁর কথা সত্যজিৎ রায় মনে না করিয়ে দিলে বাঙালি ভুলেই গিয়েছিল। মুখ্যত অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় সুরেশ অসমসাহসী যোদ্ধাও ছিলেন। বঙ্গভঙ্গের বছরে ব্রাজিলেই মারা যান। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে ব্রাজিলীয় সেনাবাহিনীর হয়ে কখনও খালি হাতেও দুঃসাহসী সব যুদ্ধ করেছেন। রিওতে তাই এক সময় তাঁর এত প্রসিদ্ধি ছিল।

জার্মান ডিফেন্স ঐতিহাসিক ভাবেই এমন শক্ত গ্র্যানাইটে তৈরি যে, সেটা মারাকানায় ভাঙতে হলে স্কিলের আগে ফুটবলারের দরকার কর্নেল সুরেশ বিশ্বাসের মতো যোদ্ধার অদম্য সাহস। মারাদোনা, যাঁকে একই শহরে থেকেও টিমের কেউ ফোন অবধি করেনি, তিনি নিজে থেকে বলেছেন—”মেসি, জিতলে উৎসব করব। লাল কার্পেট দেব তোমাকে।” মারাদোনা এখন দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে চলে গিয়েছেন। ওখানেই থাকেন। সাবেয়া বিশ্বকাপের পর ছেড়ে দিলেও তাঁকে ফেরাবে না আর্জেন্তিনীয় ফুটবল সংস্থা। শুনছি মারাদোনা ভেনেজুয়েলার কোচ হয়ে যাবেন শিগগির। মেসির সংবর্ধনা তার মানে দুবাইয়ের কোনও শেখ বা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতির আবাসে হবে। কিন্তু তার আগে লাল কার্পেটের ব্যবস্থাটা কীভাবে হবে? কে-ই বা করবে?

রিও যেমন অসম্ভব সুন্দর হতে হতেও কোথাও গিয়ে যেমন চোরাবালির ছন্দপতন থাকবেই, জার্মান ডিফেন্সের রক্তক্ষয়ী দিকটাও সেখানে। এখানে পাহাড়, সমুদ্র, শনিবারের তুলনামূলক নীল আকাশ সব একাকার হয়ে যাওয়া আর সুন্দর সুন্দর বিচ দেখে যখন মনে হবে এটাই স্বর্গ। স্থানীয় বিশ্বস্ত মানুষেরা তখনই মনে করিয়ে দেবে সতর্ক থাকতে। পাহাড়ের ধারে ওই যে বাড়িগুলো লম্বা লম্বা নেমে এসেছে, যাদের বলা হয় সাবেলা, সেগুলোর প্রতিটা মাদকের আড়ত। মারিজুয়ানা, হাশিস, এলএসডি মুড়িমুড়কির মতো পাওয়া যায়। ব্রাজিলীয় হোটেল মালিক বলছিলেন, ব্রাজিলে ফুটবলের দোকান পেতে একটু দেরি হতে পারে। ড্রাগ সব সময় হাতের কাছে।

জার্মান ডিফেন্সও যে কী মারাত্মক চোরাবালি প্রথম ম্যাচে পর্তুগাল আবিষ্কার করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরেও স্কোলারির টিম শিক্ষা নেয়নি। ছকটা এই রকম: জার্মানি প্রথম গোলটা করে দেওয়ার পর যে-ই বিপক্ষ কাউন্টার অ্যাটাকে উঠবে, একটা লুজ লম্বা বল দিয়ে দেওয়া হবে রাইট উইংয়ে মুলারকে। সেখান থেকে বাঁ দিকে ওজিল আর মাঝখানে ক্লোজে অপেক্ষা করে থাকবেন! এ দিন দেখছিলাম জাবালেতা বলেছেন, এই ফাঁদ সম্পর্কে আর্জেন্তিনা ওয়াকিবহাল। তারা বেলো হরাইজন্তের ব্রাজিল হবে না! মাসচেরানো বকলমে আর্জেন্তিনা টিমের ম্যানেজার। তিনি বাকিদের দিনভর বুঝিয়ে গেলেন, জার্মানি মানে শুধু পাওয়ার নয়। ফাঁদও। ম্যাচে সতর্ক থেকো।

ফাইনালের জন্য দু’টিম কী ফর্মেশন বাছে, সেটাও ফুটবল-গবেষকদের লোভনীয় খাদ্য হবে। চব্বিশ বছর আগের পরিস্থিতি আর নেই। এখন টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ব্যাটিং অর্ডারের মতো প্রত্যেক ম্যাচে সুবিধে অনুযায়ী টিমগুলো ফর্মেশন বদলায়। কখনও ব্যাক বাড়িয়ে দিল। কখনও কমিয়ে মিডফিল্ডে লোক বাড়াল। কখনও আসল স্ট্রাইকারকে লুকিয়ে রাখল দুই স্ট্রাইকারের পিছনে নকল মাঝমাঠ করে। বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার মতোই আকর্ষণীয়—ফর্মেশন নিয়ে ফুটবল-আধুনিক দেশগুলোর ক্রমান্বয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরীক্ষা!

জার্মানি যেমন প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে লাতিন আমেরিকা থেকে ট্রফি ছিনিয়ে নেওয়ার ঐতিহাসিক দাবিদার। আর সেটাই তাদের চূড়ান্ত মোটিভেশন। আর্জেন্তিনা তেমন চব্বিশ বছর পুরনো ক্ষতের ন্যায়বিচার চায়। মারাদোনা টিমের কাছাকাছি একবারের জন্য না ভিড়ে এই যে টিভি নেটওয়ার্ক মারফত টিমকে চাগাচ্ছেন। বলছেন, তোমরা ব্রাজিলের সঙ্গে ওদের রূপটা শুধু মনে রেখো না। মাথায় রেখো আলজিরিয়ার সামনে সে দিন জার্মানিকে কেমন অসহায় লাগছিল। তার কারণ হল নব্বইয়ে টিমের তাঁরা সবাই চব্বিশ বছরের একটা বদলা চান।

ওই টিমের অনেকে এখনও ক্লিন্সম্যান বা ফোলারের সঙ্গে কথা বলেন না। ক্লিন্সম্যান একটা ফলস ডাইভ দিয়ে লালকার্ড খাইয়েছিলেন মারাদোনার টিমকে। তারা অনেকটা সময় দশ জনে খেলেছিল। আর সেনসিনির ট্যাকলে ফোলার এমন ভান করেছিলেন যেন তাঁকে অসম্ভব অবৈধ ট্যাকল করা হয়েছে। ওই শরীরী ভাষাতেই নাকি মেক্সিকান রেফারি বিভ্রান্ত হয়ে পেনাল্টি স্পটে বল বসিয়ে দেন।

ব্রিটিশ প্রেস অবশ্য মনে করে বিচার তো হয়ে গিয়েছে। মেসির ওপর গতকাল যেমন আর্জেন্তিনার বিখ্যাত সাংবাদিক সের্জিও লোভোনেস্কির নতুন বই বার হল। তেমনই বিশ্বকাপ নিয়ে ইংল্যান্ডের বাজারেও নতুন বই এসেছে। তাতে লেখা, ন্যায়বিচার তো হয়ে গিয়েছে। নতুন আবার কী পাবে? ছিয়াশিতে চুরি করে হাত দিয়ে গোল করেছিল। ভুল পেনাল্টিতে চার বছর পর তার বিচার হয়েছে। সাংবাদিক এবং ফুটবলার মিলে এমনই মারাদোনা বিদ্বেষ ইংরেজদের যে পিটার শিলটন বলেছেন, সে দিন তাঁকে দেওয়া দ্বিতীয় গোল দেওয়ার সময় গোলকারী নাকি মাত্র একজন ইংরেজ ডিফেন্ডারকে কাটিয়েছিলেন। মারাদোনার সেই দ্বিতীয় গোল বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা। ইউ টিউব কেন, যে কোনও স্পোর্টস লাইব্রেরিতে সযত্ন রক্ষিত। যখন-তখন চেক করা যায়। শিলটন নিজে গোলটা খেয়েছিলেন। তাঁর মনে নেই যে অন্তত চার জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ওই গোলটা করা!

মেসিদেরও একটা ছোট বদলার ব্যাপার রয়েছে। চার বছর আগে কেপটাউনে বিস্বাদ হয়ে যাওয়া বিকেলটা সুদে-আসলে এখন অনেক বেড়েছে। কিন্তু রোববারের মারাকানা যুদ্ধের প্রতীকী হিসেবে চার বছরটা নিতান্ত কম সময়। এর নির্যাস অনেক গভীরে।

লিওনেল মেসি সম্ভবত জানেনও না যে রোববার নব্বই মিনিটে তাঁর বাঁ পায়ের ঠিক ব্যবহারের ওপর ইতিহাসের কত ঝরা পাতারা সানন্দে চিরবিশ্রামে চলে যাবে। কত সবুজ পাতাই বা যে গজাবে!

রিও, ১২ জুলাই

সংস্কার আর ইগো ভুলে দিয়েগোকে একটা ফোন করলেই তো পারত মেসি – সাক্ষাৎকার : সের্গিই গোয়কোচিয়া

খুব নার্ভাস যে লাগছে সেটা ভারতীয় বন্ধু আপনার কাছে স্বীকার করে নিতে কোনও অসুবিধে নেই। এত হুল্লোড় দেখছি এখানে আর্জেন্তিনীয় সমর্থকদের। এক পা যেতে না যেতে লোকে ছবির আবদার করছে। অটোগ্রাফ নিচ্ছে। সে দিন রোমেরো টাইব্রেকারে জেতানোর পর আমার কাছে অন্তত পাঁচশো এসএমএস এসেছে। আর্জেন্তিনার বেশ কিছু কাগজ হেডিং করেছে ‘হিরোইকয়’। মানে গোয়কো যেহেতু আমাকে ডাকা হয়, তার সঙ্গে হিরো যোগ করে হেডলাইনটা হয়েছে। লাতিন কাগজ ছেয়ে গিয়েছে সে দিন এই হেডলাইনে যেহেতু নব্বইয়ে আমিও একরকম টাইব্রেকার বাঁচিয়ে দেশকে ফাইনালে তুলেছিলাম। দিয়েগো এসে তখন বলেছিল, গোয়কো তোর কাছে সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকলাম রে! কিন্তু এ বার সত্যিই ভয় হচ্ছে ভেবে যে, জার্মানরা এমনিতেই শারীরিক দিক থেকে এত বড়সড়। চালিয়ে খেলে। তার ওপর গায়েগতরে ওদের অনেক শক্তসমর্থ, আরও বেশি ফিট লাগছে। সেমিফাইনালে ওরা খেলল মাত্র ২৫ মিনিট। আমরা খেললাম একশো কুড়ি মিনিট আর তার পরে টাইব্রেকার। ওরা পঁয়ত্রিশ মিনিটেই জেনে গিয়েছিল ৫-০ এগিয়ে আছি। আর এনার্জি খরচ করে লাভ নেই। আমরা এক্সট্রা টাইমের পরেও একশো দশ ভাগ দিতে বাধ্য হয়েছি। তার তিন দিনের মধ্যে ফাইনাল। জানি না ওদের শরীরগুলো রিকভার করেছে কি না। মেসির করেছে কি না, আমার খুব সন্দেহ আছে। সে দিন চ্যানেলের হয়ে মেসির সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। কেমন আছো জিজ্ঞেস করায় হেসে বলল, রিল্যাক্সড আছি। আমি জানি ও এতটুকু রিল্যাক্সড নয়। থাকা সম্ভবও নয়। গত ক’মাসে প্রচুর ঝড়ঝাপটা গিয়েছে ওর ওপর দিয়ে। একে তো চোট পেল। তার পর বার্সায় ওর মেন্টর টিটো মারা গেলেন। মধ্যিখানে ও বাবা হল। রোনাল্ডোর কাছে বর্ষসেরা ফুটবলারের মুকুটটা হারাল। এখানে ক্যাপ্টেন হয়ে এসে প্রথম দিককার ম্যাচে দলকে একা টেনে তুলল। কিন্তু এত ধকলের পর এ বার ওকে আমার যেন ক্লান্ত লাগছে। কী অমানুষিক প্রত্যাশা আমার দেশের মানুষ ওর ওপর করতে শুরু করেছে, ভাবাই যায় না। এক সমর্থক এসে আমাকে বলল, মেসির শুধু ফাইনালে গোল করলেই হবে না। জার্মান গোলকিপারকে কাটিয়ে গোল করতে হবে। ভাবা যায় কী চাপ? দিয়েগো ওপরও অমানুষিক চাপ থাকত কিন্তু ও অন্য টাইপের। দিয়েগো মানসিক ভাবে আরও ডাকাবুকো। মেসি সেখানে অন্তর্মুখী। আমার কাছে লিওনেল মেসি দেশকে বিশ্বকাপ দিতে পারল কী পারল না দিয়ে ওর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে না। দেশকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আমি জানি ফাইনাল হারুক বা জিতুক, মেসিই বিশ্বসেরা! কিন্তু ওর শরীর-মনের যা অবস্থা বুঝতে পারছি বলে ওর ভেতরকার চেহারাটাও বোধহয় ধরতে পারছি। শেষ দুটো ম্যাচে মেসিকে দেখে আমার মনে হয়েছে, ও গোটা খেলায় লেগে থাকার ঝুঁকি নিচ্ছে না। বরঞ্চ এনার্জি জমিয়ে রেখে কয়েক পশলা চেষ্টা করছে কিছু জাদু মুহূর্ত তৈরি করার। ফাইনালে মেসির এই জাদু মুহূর্ত তৈরি করতে পারাটাই আর্জেন্তিনার একমাত্র আশা! শুধু আমি আশা করব মুহূর্তটা যেন তাড়াতাড়ি আসে। কারণ জার্মানি যদি প্রথম গোল করে ফেলে তা হলে গেল। আর লকগেট খোলার নয়। টাইব্রেকার অবধি ফাইনাল গড়াবে বলে আমার তো মনে হচ্ছে না। খুব জরুরি হল আর্জেন্টাইন ডিপ ডিফেন্স আর মাসচেরানোর ভাল খেলাটা। রোমেরোকেও ভাল ফর্মে থাকতে হবে। রোমেরো ছেলেটা খুব বিনয়ী। টাইব্রেকার বাঁচানোর পর সবাই যখন ওকে আমার সঙ্গে তুলনা করছে, তখন ও বলেছে গোয়কো এক জনই। আমার সঙ্গে তুলনা হয় না। ফাইনালে রোমেরোর ওপর জার্মানরা চাপ তৈরি করতে চাইবেই। আমজনতা মেসি মেসি করে লাফাচ্ছে। কিন্তু এই জায়গাগুলোও খুব জরুরি। আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন ফাইনালের আগে টিম কেন এক বার দিয়েগোর সঙ্গে কথা বলল না? একই শহরে ও বসে আছে। সত্যিই তো টিমকে চাগিয়ে দিতে পারত। দিয়েগো নিজে থেকে যাচ্ছে না। কারণটা আমি বুঝতে পারি। ও প্রাক্তন কোচ। এখন একজন কোচ রয়েছে। নাক গলাতে যাবে কেন? কেউ যদি কিছু বলে বসে? কিন্তু টিমের ওর কাছে যাওয়া উচিত ছিল। আর্জেন্তিনীয়দের একটা সমস্যা হল, আমাদের বড্ড ইগো। আর দু’নম্বর, আমরা বড্ড সংস্কারগ্রস্ত। সাফল্য এক রকম ভাবে গোটা টুর্নামেন্ট জুড়ে আসছে তো সেটাকে আঁকড়ে থাকো! ফাইনালের আগে হঠাৎ করে সেটা বদলাতে যেও না। কেউ কেউ বলছেন মেসি তো পারত, দিয়েগোকে একটা ফোন করতে। আমি তো দেখি দু’জনেই দু’জনের সম্পর্কে খুব ভাল ভাল কথা বলে। সম্পর্কটা ভালই। তা বলে দারুণ ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয় না। আমি দিয়েগোর সঙ্গে এত সময় কাটাই। কোনও দিন তো ইনবক্সে দেখিনি মেসির কোনও মেসেজ এসেছে বলে! আমাদের সেই নব্বইয়ের টিমের তিন-চার জন বোধহয় এখানে আছে। ক্যানিজিয়া এসে দেশে ফেরত গিয়েছে। বুরুচাগাও তো চলে গেল। তবে যারাই এসে বা না এসে থাকুক, সবাই কিন্তু মনে মনে টিভির সামনে বসে নব্বইয়ের ইতালিতে ফিরে যাবে। আমার কাছে ওই ম্যাচটা জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত! পেনাল্টিটা ছিল না। দিয়ে দিল। তার পর যখন ব্রেহমে মারতে যাচ্ছে, আমি শিওর ছিলাম বাঁচিয়ে দেব। সেবার দুটো ম্যাচে আমি পেনাল্টি বাঁচিয়ে টিমকে পার করেছিলাম। সে দিন স্নাইডারের পেনাল্টিটা রোমেরোর বাঁচানো দেখে আমার ছ্যাঁক করে নব্বইয়ের ব্রেহমেকে মনে পড়ে গেল। আমি জানতাম আমার ডান দিকে মারবে। ঝাঁপিয়েও ছিলাম সে দিকে। কিন্তু হাইটটা বুঝতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম সে দিনের স্নাইডারের মতো বলটা বুঝি ওপরে থাকবে। হাইটটা নিচুতে ছিল। রেফারিটাকে মারতে চেয়েছিলাম। আজও পাইনি। আশা করব জীবন যেখানেই কাটাক, ওর খুব একটা ভাল কাটছে না। মারাকানা ফাইনালে পরিষ্কার ফেভারিট জার্মানি। তবু ঈশ্বরের কাছে একটা ছোট প্রার্থনা যে, একটা বাজে লোকের পাপের প্রায়শ্চিত্ত আমরা করেছি চব্বিশ বছর ধরে। এ বার কি আপনার মনে হচ্ছে না যে বেচারিদের দিকে আমার মুখ তুলে তাকানোর সময় হয়েছে…

রিও, ১৩ জুলাই

মারাকানায় ম্লান মেসি

মারাকানা ফিরিয়ে নিল তার অভিশাপ যে এখানে ফেভারিট জিতবে না, এটা আন্ডারডগদের চরণভূমি!

পঞ্চাশ বছর আগে যে ওলট-পালট ঘটে থাকুক, রোববার তারা কাগজে-কলমে ফেভারিট ফিলিপ লামের দলকেই স্থানীয় প্রচুর জনসমর্থনের মধ্যে চতুর্থ বার বিশ্বকাপ জিতিয়ে দিল। গোটা ম্যাচ জুড়ে আর্জেন্তিনীয়রা সুযোগ নষ্ট করে গিয়েছেন। জার্মান পেশাদারিত্বের মুখ হিসেবে অতিরিক্ত প্লেয়ার মারিও গোটজে, যাঁকে কেউ হিসেবের মধ্যেই ধরেনি। তিনি বাঁ দিক থেকে ভেসে আসা একটা লুপিং পাস বুকে জমালেন। তার পর ভলিতে গোল করে দিলেন। এর চেয়ে অনেক সহজ সুযোগ হিগুয়েন আর মেসি নষ্ট করেছেন। সের্জিও আগেরোর কথা যত কম বলা যায়, তত ভাল। গোটা টুর্নামেন্টটাই অবিশ্বাস্য খারাপ খেললেন। সাবেয়ার তাঁকে বদলি নামানোর স্ট্র্যাটেজি কাজ করল না আজও।

লিওনেল মেসির যে বিশ্বকাপ স্বপ্নে হাত রাখা হল না তা একান্তই নিজেদের গোল করতে না পারার ব্যর্থতায়।

অদৃষ্ট দায়ী নয়। অদৃষ্ট তো বরঞ্চ দু’টো শট —একটা ক্রসপিসে, একটা সাইডপোস্টে। দু’টোর কোনওটাই গোলে ঢুকতে দেয়নি। জার্মানরা শুধু নব্বইয়ের ফাইনালের বদলাই নিতে দিল না নয়। লাতিন আমেরিকা থেকে প্রথম ইউরোপের দেশ হিসেবে ট্রফি জিতে অনন্য নজির তৈরি করে গেল।

অথচ জার্মানরা এ দিন নিজেদের খেলার আশি ভাগও খেলেনি। স্রেফ জার্মান স্পিরিটে ম্যাচ নিয়ে চলে গেল। ব্রাজিল ধন্য ধন্য করছে মেসিদের পরাজয়ে। মেসি নিজে কী ভাবছেন? শেষ সুযোগ হিসেবে একটা ফ্রি কিক পেয়েছিলেন। বাঁ পায়ে ওই জায়গা থেকে অনেক গোল আছে তাঁর। জার্মান এবং ব্রাজিলীয় সমর্থকরা তখন ক্লিষ্ট মুখে বসেছিলেন। কিন্তু এই মেসি ০-১ পিছিয়ে ম্যাচের শেষ মিনিটে টেনশন ভোগা মানুষ। বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দিলেন। ১১৩ মিনিটে তাঁদের গোল খাওয়াটাই বহাল রইল। আর কোপাকাবানার সমুদ্রের জল অবশ্যই কিছু বাড়ল লক্ষাধিক আর্জেন্তিনীয় সমর্থকদের সেখানকার জমায়েতের অশ্রু থেকে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথমার্ধের প্রোমো বলছিল, শেষ অংশ আরও জমজমাট হওয়া উচিত। প্রথমার্ধেই একটা নাকচ গোল। একটা সাইডপোস্টে প্রত্যাখ্যাত গোল। একটা সহজতম সুযোগ নষ্ট!

সবাই জানত জার্মানি ফাইনালে অবিসংবাদী ফেভারিট! কিন্তু দশ-পনেরো মিনিট বাদ দিয়ে বোঝা যাচ্ছিল না খেলাটা কারা নিয়ে চলে যাবে? বল দখল কার কত অংশ সেটা খেলার পর ফিফা থেকে মিডিয়ার কাছে একটা হিসেব আসে। কিন্তু সেই হিসেব আসার অনেক আগেই বলে দেওয়া যায়, বল দখলে জার্মানি অন্তত দশ শতাংশ এগিয়ে থাকবে। শুরুতে মনে হচ্ছিল আজ কি আরও একটা ‘পর্তুগাল’ বা ‘ব্রাজিল’ ঘটতে পারে? জার্মানি তো হাফলাইন অবধি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চলে আসছে।

এর পর বোঝা গেল এটাই সাবেয়ার স্ট্র্যাটেজি। ওদের এগোতে দাও। চাপটা তোমরা নাও। তার পর হঠাৎ ওদের ফাঁকা জমিতে দৌড়োতে শুরু করো। শুরুর দিকে মাঠে মেসিকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। যথারীতি জার্মান সাঁজোয়া ট্যাঙ্কে ট্যাঙ্কে তিনি অবরুদ্ধ।

কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে এমন কাউকে যাঁকে কাপ ফাইনালের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ভাবাই হয়নি। গঞ্জালো হিগুয়েন। আর্জেন্তিনা যেমন তাদের ডিফেন্সের বাঁ দিকটা অদ্ভুত ভাবে অরক্ষিত রেখে দিয়েছিল, তেমনই জার্মানির বাঁ দিকটাতেও অপ্রত্যাশিত ফাঁকা জমি। হিগুয়েন সেখান থেকে একটা লম্বা দৌড়ে কোনাকুনি বল বাইরে মারলেন। কাপ ফাইনালে ওই জায়গা থেকে গোল হলে কেউ দারুণ গোলও বলবে না। এর পর আচমকাই সহজতম সুযোগটা পেয়ে গেলেন টনি ক্রুজের গোলকিপারকে করা ব্যাকহেড থেকে।

সামনে শুধু নয়্যার এবং আসলে ফাঁকা গোল। নাপোলি মাঠে এটা রোজ গোল করতেন। কিন্তু আজ উড়িয়ে দিলেন বাইরে। মেসি ততক্ষণে ডান দিক থেকে মুভমেন্ট শুরু করেছেন। তার থেকে বল নিয়ে লাভেজ্জি ডান দিক থেকে যে ক্রস করেছিলেন, তাতে পা ছুঁইয়ে হিগুয়েন গোল করেও ফেলেন। কিন্তু দু’গজের অফসাইড। আর্জেন্তিনীয়রা উৎসব করতে শুরু করেও দিয়েছিল। স্তব্ধ হয়ে গেল।

মারাকানা ততক্ষণে জমে গিয়েছে। তার আগে সন্দেহ হচ্ছিল জমবে কি না? শাকিরা অবধি গ্যালারির উত্তাপ তুলতে পারেননি। বেশ কিছু সিট ফাঁকা। তা হলে অনেক ব্রাজিলিয়ানরা দুঃখে এলেন না?

দশ মিনিটের মাঠের উত্তেজনা আবার গ্যালারিকে মারাকানার স্বমহিমায় ফিরিয়ে দিয়ে গেল। তখন বোঝার উপায় নেই দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই আর্জেন্তিনীয়দের সহজ গোল মিস যে দুইতে গিয়ে দাঁড়াবে। লিওনেল মেসি বাঁ পায়ে পনেরো গজ থেকে সহজতম পুশ বাইরে মারবেন। ম্যানুয়েল নয়্যারের আজ সুইপার খেলা হচ্ছে না, জার্মানি এগারো জনেই নামছে। তা বলে এত সহজ গোল মিস করে কি জার্মানদের হারানো যায়?

কাপ ফাইনালের চাপ? তা তো কামড়াচ্ছে জার্মানিকেও। নইলে একটা ক্রসেও ক্লোজে মাথা ছোঁয়াতে পারছেন না কেন? টনি ক্রুজ কেন আজ সেই বল রোমেরোর হাতে মারবেন, যা ক’দিন আগে বেলো মাঠে গোল করেছেন। হাফটাইমে মিডিয়া সেন্টারে নেমে দেখি ব্রাজিলীয় সাংবাদিক গজগজ করছেন, সে দিন কী মেরেছিলি, আর আজ কী মারলি! প্রথমার্ধের শেষ দিকটা আবার জার্মানি খেলা ধরল। এই সময় কর্নার থেকে বেনেডিক্ট হাওডেস দূরন্ত হেডার নিয়েছিলেন। বলটা সাইডপোস্টে লেগে প্রথমার্ধের ভাগ্য যেন ড্র করিয়ে দিল ১-১!

সমাপ্তি অনুষ্ঠান সেই মাত্রায় যে পৌঁছলো না, এটা আশ্চর্য। জেনিফার লোপেজ বরং ব্রাজিলীয় জনতার অনেক অপ্রিয়ভাজন ছিলেন শুরু থেকে থিম সংটা পছন্দ না হওয়ায়। কিন্তু উদ্বোধনের দিন লোপেজ কুড়োলেন সাও পাওলো দর্শকের তুমুল হাততালি। আর শাকিরা— যাঁকে দেখার জন্য এখানকার জনতা এত আকুল ভাবে তাকিয়ে ছিল, তার শো এমন ভাবে শেষ হল যেন ব্রাজিলের ডিফেন্স খেলে উঠল।

মিডিয়া সেন্টার আর তার আশোপশের এলাকা কিন্তু শুরু থেকেই গমগম করছে, জাভিয়ের জানেত্তি—আর্জেন্তিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা প্লেয়ারকে ঘিরে তখন প্রচন্ড উদ্দীপনা। জানেত্তিকে আগের বিশ্বকাপে বিস্ময়কর ভাবে মারাদোনা বাদ দিয়েছিলেন। সেই জায়গাতেই আজ খেলছেন মাসচেরানো। জানেত্তি, তাঁর কী মনে হচ্ছে? উত্তর দিলেন না। এসে পড়ছেন ভালদানোও। হিগুয়েনের গোলটা যিনি মেসির টিমে থাকলে মনে হয় না মিস করতেন বলে।

দ্বিতীয়ার্ধ থেকে লিওনেল মেসি বোধহয় সেই ম্যাজিক মুহূর্ত খুঁজতে থাকেন যা গোয়কোচিয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন। রাইট ইনসাইডের জায়গা থেকে বাঁ পায়ে বারবার ড্রিবল করতে করতে তিনি ঢুকে পড়ছেন। পিছন পিছন তিন থেকে চার জন। ফাইনালের এটাই হয়তো সেরা চিত্রকল্প। মুলার-লামের ডান দিকে বারবার আক্রমণ তৈরি করাও।

ওঠা-নামা, গতি আর টেনশনে এটা নব্বইয়ের সেই রোম-যুদ্ধের চেয়ে অনেক উন্নততর ফুটবল। বোঝাই যাচ্ছিল না আর্জেন্তিনা যে এত তীব্র আন্ডারডগ। খেলা শুরুর অল্প আগে মিডিয়া সেন্টার দুলিয়ে দিয়ে গেলেন মেক্সিকান মডেল কাম অভিনেত্রী কাম অ্যাঙ্কর ইনেস সাইনজ। মার্কিন দেশে বছরখানেক আগে একটা লকাররুম ঘটনা আর ফক্স টিভিতে খোলামেলা পোশাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় যাঁকে নিয়ে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। মেক্সিকোর সেই বিখ্যাত মডেল বরাবর মেসি-প্রেমে অন্ধ। সাইনজ বলে গেলেন, ”একটা মানত করেছি আজ যেন লিও ফুটবলের প্রতি ওর শৈশবের অকৃত্রিম ভালবাসাটা ফেরত পায়। তা হলেই চলবে।”

পরে দেখা গেল মেসিদের শৈশব ফিরে পাওয়াটা জার্মানদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ওটা ম্যাচের সেরা ছবিও ছিল না। ম্যাচ সেরা দৃশ্য—মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে অবস্থাতেও সোয়াইনস্টাইগারের মাঠ ছাড়তে না চাওয়া।

আর একটা নতুন প্রবাদেরও হয়তো তা জন্ম দিয়ে গেল—জার্মান রক্ত পড়লে, জার্মানিকে হারানো যায় না। মেসি কেন, পোপ আর্জেন্তিনীয় হলেও না!

রিও, ১৪ জুলাই

মারাকানার হাঁড়িকাঠ মেসিকেও বলি দিল

আলেজান্দ্রো সাবেয়া ব্রাজিল বিশ্বকাপের যাবতীয় কোচেদের মধ্যে মোটামুটি ভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সব চেয়ে কম গ্রহণযোগ্য।

এমনকী, দেশজ মিডিয়াতেও। সাবেয়ার কথাবার্তা বিদেশ দপ্তরের মুখপাত্রের মতো। এত সতর্ক, বাহারহীন এবং মাপা যে, তাঁকে টিমের প্লেয়ারবিহীন একা প্রেস কনফারেন্সে ঢুকতে দেখলেই সকলের ভুরু কুঁচকে যায়, সময়টা তা হলে বেকার গেল!

এ হেন সাবেয়া যখন ফাইনাল পরবর্তী মিডিয়া বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন, দাঁড়িয়ে উঠে তাঁকে হাততালি দিল গোটা মিডিয়া! তার আগের যে আলোচনা হয়েছে তাতে পরিষ্কার, হাততালিটা কেন? আর্জেন্তিনা হেরেছে তিনটে সুযোগ কাজে লাগাতে না পেরে। কিন্তু ফেভারিট জার্মানিকে তারা একটু হলেই কাঁদিয়ে ছেড়েছিল। ফিফার ম্যাচ স্ট্যাটসে দেখাচ্ছে, ম্যাচে বল দখলের যুদ্ধে আর্জেন্তিনাকে শতকরা কুড়ি ভাগ পিছনে রেখেছিল জোয়াকিম লো-র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। তারা বল নিজেদের দখলে রেখেছে ম্যাচের ষাট ভাগ। আর্জেন্তিনীয়রা রেখেছে শতকরা চল্লিশ ভাগ! অথচ পেনিট্রেটিভ জোনে জার্মানির ঢোকার অনুপাত যেখানে ১১%, সেখানে মাসচেরানোর আর্জেন্তিনার ১৭%।

চুরাশি বছরে পড়া বিশ্বকাপ একশো চুরাশি বছরে পড়ে গেলেও হয়তো এই দার্শনিক তর্কটা থাকবে যে, মারাকানার ফাইনালে সে দিন জার্মানি তাদের বাড়তি স্ট্যামিনা আর বিশ্ববিখ্যাত জার্মান রোখে কি অতিরিক্ত সময়ে জিতেছিল? নাকি আর্জেন্তিনাই আর্জেন্তিনাকে হারিয়েছিল তিনটে সহজতম সুযোগের অপচয়ে?

একটা বিষয় নিয়ে অবশ্য কোনও দর্শন নেই। কোনও তর্কও না। লিওনেল মেসির যে চূড়ান্ত হার হয়েছে।

আর্জেন্তিনাকে এই মুহূর্তে ‘পৃথিবীর সব চেয়ে বিষাদগ্রস্ত দেশ’ বলেছে জনপ্রিয় মার্কিন দৈনিক। আর মেসিকে ‘বিশ্বের সব চেয়ে বিষণ্ণ মানুষ’। এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও কোনও তর্ক আমদানি হওয়ার প্রশ্ন নেই!

মেসি যে বিজয়মঞ্চে উঠবেন বলে স্বপ্ন দেখিছিলেন, সেটাতেই উঠলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা বা অন্য বিশ্বকাপের মতো এখানে মাঠের মধ্যে প্রাইজ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। প্লেয়ারদের হেঁটে উঠতে হল দেড়তলা সাইজের অস্থায়ী মঞ্চে। এই সরণিটাই তো মেসি হাঁটতে চেয়েছিলেন। কাপটাও হাতে পেলেন।

কিন্তু এটা ভুল ট্রফি! ভুল মুহূর্ত! আর ভুল পুরস্কারও! যা পাওয়া নিয়ে জীবনে এই প্রথম নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে হবে আধুনিক ফুটবলের বরাবরের ফার্স্ট বয়কে! যেখানে কি না জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম দাঁড়িয়ে পড়বেন দিয়েগো মারাদোনাও! এমনকী যারা দিল এই ট্রফি, সেই ফিফা প্রেসিডেন্ট অবধি বলে দেবেন, ”আরে, মেসি প্রাইজটা নিতে উঠে আসছে দেখে আমি তো আশ্চর্য হয়ে গেলাম!”

ফিফার বিচারেই চার বারের বর্ষসেরা। কিন্তু এমন কাঁটার মুকুট জীবনে পরেননি লিওনেল মেসি!

তখন অবশ্য অতশত না জেনেও একটা পৃথিবী অস্ত যাওয়ার জেরেই তিনি রক্তশূন্য আর চরম অবসাদগ্রস্ত! সরণি বেয়ে ওঠার সময় ভিভিআইপিদের বাড়ানো হাত এড়িয়ে গেলেন। ম্যানুয়েল নয়্যার এবং তিনি পাশাপাশি হেঁটে প্রাইজ নিতে গেলেন। মনে হল নয়্যারকে তিনি চেনেনই না। মাঠে তাঁর সর্বক্ষণের প্রহরী সোয়াইনস্টাইগার এসে জড়িয়ে ধরলেন। তাতেও মুখ সেই রক্তশূন্য। দল নিয়ে রানার্স আপের প্রাইজ নিতে যাওয়ার সময়েও মেসিকে মনে হল ঘোরের মধ্যে। যেন নিশির ডাকে সাড়া দিয়ে চলছেন। গোল্ডেন বল যে জেতে সে ম্যান অব দ্য ম্যাচের মতোই প্রেসের সামনে তিনটে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আসে। মেসি এলেন না।

একমাত্র তখন তাঁর মুখোমুখি হওয়া সম্ভব মিক্সড জোনে। ঘিরে রাখা সেই জায়গাটা যেটাকে অতিক্রম করে প্লেয়াররা হোটেলে ফেরার জন্য বাসে ওঠেন। নিয়ম হল ওখানে সাংবাদিক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে প্লেয়ারকে উত্তর দিতেই হবে। স্থানাভাবের ফলে ভারতীয় সাংবাদিকরা সেই মিক্সড জোনের কার্ড গোটা বিশ্বকাপে এক-দু’বারও পায় কি না সন্দেহ! ফাইনালের দিন তো পাওয়ার প্রশ্নই নেই। যে দু’টো দেশ খেলছে, আগে তাদের রিপোর্টার। তারপর ফুটবল-উন্নত দেশগুলোর।

প্রেসরুমের টিভিতে অবশ্য বাসে উঠে যাওয়ার ছবিটা দেখাচ্ছে। আর্জেন্তাইন সাংবাদিকরা ঘিরে ধরেছেন তাঁদের অধিনায়ককে। খেলার প্রথমার্ধে মেসি বমি করা শুরু করেন। সময়-সময় আনফিটও লাগছিল তাঁকে। কিন্তু স্বদেশীয় রিপোর্টারদের কাছে নাকি তিনি কথা বলেছেন এমন এক ব্যক্তির মতো যে কাঁদছে না, কারণ ভেতরে ভেতরে রক্তস্নান করছে বলে। ”এই প্রাইজ দিয়ে আমি কী করব? এর কী মূল্য। আমার কাছে কোনও কিছুই আর কোনও সান্ত্বনা নয়,” বলে চলে যাচ্ছিলেন মেসি। সাংবাদিকেরা আবার ডাকায় থমকে বলেছেন, ”তিনটে স্পষ্ট সুযোগ। আমি, হিগুয়েন, রডরিগো। ফাইনালে এর চেয়ে বেশি সুযোগ কোনও দিন আসে?” শুনলাম যাওয়ার আগে বলে গিয়েছেন, ”পুরো আর্জেন্তিনা আশা করে বসেছিল। তাদের স্বপ্নে আমরা চুনকালি মাখিয়ে দিলাম।”

যে বার্সিলোনার ক্লাব ফুটবল গ্রহের কথা মাথায় রেখে ঝুঁকি নেবে না, এই যন্ত্রণাকাতর শরীরী ভাষা ও কণ্ঠস্বর কি তার হওয়া সম্ভব?

তবু এ বার বার্সার হয়ে ভাল খেললেও তো অনিবার্য প্রশ্নটা উঠবেই যে, ক্লাবের কথা ভেবে সে দিন মারাকানায় চোটের ঝুঁকি নেননি? প্রতিযোগিতা সেরার পুরস্কার নিয়ে জলঘোলা, সেটা তো থাকলই। মারিও গোটজে অবধি গোল-পরবর্তী হালকা নুন-লঙ্কা ছড়িয়ে দিয়েছেন : আমি জার্মান মেসি নই। জার্মান ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। টুর্নামেন্ট এমন অসাধারণ শুরু করেও নক আউট ম্যাচে গোল নেই। সেমিফাইনাল-ফাইনালে জেতাতে পারেননি দেশকে। লোকে তো কটাক্ষ করবেই।

মেসি-ঘনিষ্ঠ আর্জেন্তিনীয় সাংবাদিক বলছিলেন, ”গত পনেরো দিন ধরেই ও যথেষ্ট ফিট নয়। আর টানতে পারছে না। ভেতরে মারাত্মক টাফ বলে টুর্নামেন্টটা শেষ করল। কিন্তু সেটা এখন কে বুঝবে? আর প্রাইজটাও তো নিজে নেয়নি। ওকে বেছেছে ফিফার টেকনিক্যাল গ্রুপ। লিও-র দোষ কোথায়?”

রাশিয়া বিশ্বকাপের প্রোমো এ দিনই ফিফা সরকারি ভাবে প্রকাশ করল। দেখাল, রাশিয়ানরা বলছে ২০১৮ আমরা তৈরি হচ্ছি। কিন্তু লিওনেল মেসি কী করে তৈরি হবেন? ছ’টা লা লিগা, তিনটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যদি বা মধ্যিখানে আরও বাড়ে তখন তো তাঁর বয়স দাঁড়াবে একত্রিশ। ফুটবলারের মাপে প্রৌঢ়ত্বে!

মারাকানা গত কাল এমন গমগমে থাকার পর আজ অনেকটাই অবাধ। খোলামেলা, কার্যত নিঃশব্দ। ভল্যান্টিয়াররা খেলছে। কোনও কোনও দর্শনার্থী ছবি তুলছে সেই গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে যেখানে মারিও গোটজের বাঁ পায়ের নিষ্ঠুর ভলিটা ঢুকে লিওনেল মেসির সম্মান এবং সাফল্য দু’টো পৃথিবীকেই সাময়িক চূর্ণ করে দিয়েছে!

কাল ম্যাচ রিপোর্টে দেখছি বিশ্লেষণটা মারাত্মক ভুল হয়েছিল। মারাকানার ওই আপাত-নিরীহ রূপে কোথায় একটা ছোবল আছে! চৌষট্টি বছর আগে তা নিঃস্ব করে দিয়েছিল বিশ্বসেরা হিসেবে স্বীকৃত একটা ফুটবলার-গোষ্ঠীকে। এ বার ঐতিহ্য রক্ষায় বেছে নিল বিশ্বসেরা ফুটবলারকে।

যে যত বড়, যত প্রসিদ্ধ, মারাকানার হাঁড়িকাঠ আগে তার রক্ত দেখতে চায়। এটাই কালের নিয়ম। লিওনেল মেসি নিছকই ঘটনাক্রমে এক হতভাগ্যের নাম।

রিও, ১৫ জুলাই