মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

রাশিয়া ২০১৮ – ৪

ব্রাজিল অতিথি হলে ডনের শান্তিতে বইবার সুযোগ কোথায়

পৃথিবীর নানা দেশের শহরগুলোকে যদি আয়তন আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সাংসারিক মাপে কাটছাঁট করা যায়, রস্তভ অন ডনকে বড়দা বলার কোনও উপায় নেই। মস্কো যদি বড়দা হয়, তা হলে এটা মেজদাও

নয়। সেজদা হওয়ার মতো ওজনদার নয়। রস্তভ অন ডনকে বলা যেতে পারে রাশিয়ান সংসারের ফুলদা। ওজনদার নয় কিন্তু সুশ্রী আর একটা ঐতিহ্য বহন করে।

কাকভোরে মস্কো থেকে রস্তভ আসার জন্য ফ্লাইটে উঠে দেখি, তিন বঙ্গসন্তান। দু’জন বঙ্গসন্তান এডমন্টন থেকে এসেছেন। আরেকজন মুম্বইয়ের চ্যার্টার্ড অ্যাকাউটেন্ট। কলকাতা থেকে প্রচুর লোক দেখছি এবার রুশি বিশ্বকাপে। বেশিরভাগই ব্রাজিল অভিযাত্রী। এঁদের সঙ্গে হলুদ জার্সিধারী নেইমারের দেশের মানুষ তো থাকবেনই। এঁরা এয়ারপোর্ট থেকেই ‘ওলে, ওলে’ গাইতে শুরু করেছিলেন। মাঠের ধারে একটু আগে পৌঁছে দেখি সত্তর-আশি জন এই তিরিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি ভ্যাপসা গরম অগ্রাহ্য করে চিলচিৎকার জুড়ে দিয়েছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হলুদ জার্সির স্রোত শুরু। মস্কো থেকে সকালের ফ্লাইটে বেশ কিছু সুইস সমর্থকেরাও উঠেছিলেন। কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পাশে তাঁরা কী করবেন!

ব্রাজিলের নামী কর্পোরেট সংস্থার মার্কেটিং ম্যানেজারকে পেলাম। পেদারো। ডিজিটিং কার্ডটা হাতে না পেলে বিশ্বাসই হত না ভদ্রলোক এত বড় চাকরি করেন। বললেন, ”মেসির জন্য এতটুকু খারাপ লাগছে না। গতবার আর্জেন্টিনীয়গুলো আমাদের রিও সি বিচে সারারাত চিৎকার করে গান গেয়েছিল, ব্রাজিল তোর পাড়ায় তোর বাবাকে দেখে নে।”

স্টেডিয়ামের বাইরে যেখানে ব্রাজিলীয়দের চিল-চিৎকার চলছে তার একটু দূরেই বিখ্যাত সেই নদী—ডন। নদীর পাড় থেকে এত হাওয়া যে মাথার টুপি শুধু উড়িয়ে নিয়ে যায় না। মনে হতে থাকে রস্তভ স্টেডিয়ামে ক্রিকেট হলে সুইং বোলিংয়ের অপর্যাপ্ত সুবিধে হত! নদীর ওপরে একটা ব্রিজ। ব্রিজের পূব দিকটা ইউরোপ। পশ্চিমে এশিয়া। পড়তে আশ্চর্যজনক লাগলেও এটাই বাস্তব রস্তভ অন ডন স্টেডিয়ামটা ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এশিয়ায় পড়ছে। অর্থাৎ রুশ দেশে নেইমারদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হল এশিয়ার বুকে।

আর ব্রাজিল সমর্থকদের হল্লাবোলে যার নির্জনতা সবচেয়ে বিঘ্নিত হচ্ছিল সেটা পৃথিবীর সাহিত্যে অমর থাকা ডন নদী। এই নদীর ওপর ভিত্তি করেই সেই কালজয়ী উপন্যাস লেখেন মিখায়েল সোলোকভ। ‘অ্যান্ড কোয়ায়েটলি ফ্লোজ দ্য ডন।’ শান্তিতে বয়ে যায় ডন নদী। রুশ ও পৃথিবীর সাহিত্যে এমনই কালজয়ী উপন্যাস যে শুধু নোবেল পায়নি, উৎসাহিত হয়ে কেউ কেউ একে টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর সমতুল্য বলেছেন।

নদীর ধার দিয়ে একটু এগিয়ে গেলে আরও একটা ঐতিহাসিক সম্ভাষণ। অ্যান্টন চেকভের মূর্তি! চেকভ শুধু বিশ্ববন্দিত নাট্যকারই নন, সর্বকালের অন্যতম সেরা ছোটগল্প লেখক। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মেক্সিকোর কাছে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার মতো মোচড় নয়। চেকভ মানে শুরু থেকে শরীরে স্পন্দন তোলা অভিজ্ঞতা। দাঁড়ান, শেষ হয়নি। রস্তভ শহরেই পড়াশোনার অনেকটা ধাপ ডিঙিয়েছেন আলেকজান্ডার সলজেনিৎসীন। শহরটাকে দেখলে মনে হবে সুপার পাওয়ার শহর নয়। শুরুতেই যে লিখলাম বড়দা, মেজদা শ্রেণিভুক্ত নয়। কিন্তু তার খাঁজে খাঁজে কৌলিন্য আর চমকপ্রদ সব গল্প।

মস্কোতে সব অ্যাথলিটদের ট্রেনিংয়ের সুযোগ নেই। বছরের বেশির ভাগ সময় এত ঠান্ডা যে জিমন্যাস্ট বা দাবাড়ু না হলে আউটডোর ট্রেনিং দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। সোচিতে তাই দেখেছিলাম মারিয়া শারাপোভা কোথায় ট্রেনিং করতেন? সোচি বা রস্তভে মোটামুটি সারা বছর আউটডোর ট্রেনিংয়ের সুযোগ রয়েছে। অবাক হয়ে যাওয়ার মতো একটা পরিসংখ্যান এদের ওয়ার্ল্ড কাপ বুকলেটে দেওয়া। গোটা রস্তভ অঞ্চল রাশিয়াকে ১১৩ অলিম্পিক মেডেল দিয়েছে। যার ৪০টা সোনার। অলিম্পিক পদকজয়ীদের মাথা পিছু জমির পরিমানে এদের রেকর্ড যে সবার আগে তা গিনেস বুকে ইতিমধ্যে স্বীকৃত। শহরটা দেখে বোঝাই যায় না তার অনুষঙ্গে যে এত মণিমাণিক।

ব্রাজিল সমর্থকদের অবশ্য এত কিছু ভাবার নিকুচি করেছে। তারা গাঁটের ব্রাজিলিয়ান রিয়াল খরচ করে রাশিয়ার ঐতিহ্যের খাজনা গুনতে আসেনি। অতএব ডনের ধারে চলুক ‘ওলে ওলে।’ চলতেই থাকুক। যতক্ষণ না নেইমারদের পাশের মাঠটায় নেমে পড়ার সময় হয়।

১৮ জুন, রস্তভ অন ডন

ব্রাজিলীয় হাহাকার পেরিয়ে আর্জেন্টিনীয় নিস্তব্ধতায়

ব্রাজিলের ফুটবলমহলে আগের বিশ্বকাপে কাহিনিটা শোনা। যত দূর জানি ঐতিহাসিক সত্য।

বাষট্টির চিলি বিশ্বকাপে যখন জানা হয়ে গিয়েছে আহত পেলে বিশ্বকাপের বাইরে চলে যাচ্ছেন, সেমিফাইনাল খেলতে নির্বাচিত আমারিল্ডো খুব টেনশনে পড়ে গিয়েছিলেন। এত বড় ফুটবলারের জায়গা সামলাবেন কী করে? লোকে তো নিয়ত তুলনা করবে। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর পেলে ছাড়া টিম হারলে সবাই বলবে আমারিল্ডোটা অপয়া। আসা মাত্র টিমটা হেরে গেল। নানা মুখ দিয়ে এগারোয় নবাগতর শিরশিরানির খবর পেয়ে মানে গ্যারিঞ্চা ডেকে পাঠান আমারিল্ডোকে। বলেন, ঘরগুলো একটু দেখে আয় তো। গোন, আমাদের এগারোজন আছে না কি? এগারো-বারো জনকে যদি পাস, কোনও চিন্তা করিস না। বাকিটা আমি সামলে নেব। সামলে নিয়েছিলেন। এক রকম ড্যাং ড্যাং করে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতে যায়।

রস্তভ অন ডন স্টেডিয়াম থেকে কাল মাঝরাত্তিরে বেরোবার সময় মনে হচ্ছিল আশঙ্কা বিদীর্ণ ব্রাজিলে এখন গ্যারিঞ্চার মতো কাউকে দরকার ছিল। সে গ্যাব্রিয়েল জেসুস বা কুটিনহোকে ডেকে বলবে রুমগুলো একটু গুনে আয় তো, এগারো জন আছে না কি?

কিন্তু সেই মস্তানি কোথায়? নেইমর দ্য সিলভার পক্ষে টিমে এনার্জি ফেরানো সম্ভব। কিন্তু নেইমার তো নিজেই ফের বিশ্বকাপ ফুটবলের কাঁটাঝোপে। বল ধরে তিনি এগোতে গেলেই যে কোনও সময় দু’জন লাথি মারছে। পাশ থেকে কেউ ফেলে দিচ্ছে। ঠিক ব্রাজিল বিশ্বকাপে গত বার প্রথম ম্যাচ যে রকম মারে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন, রোববার তাই হলেন। এমন মার খেতে খেতেই তো সেমিফাইনালে আর খেলার মতো অবস্থা ছিল না তাঁর। এবার কানাঘুষো শুনেছিলাম ব্রাজিলীয় ফুটবল ফেডারেশন নেইমারের নিরাপত্তার ব্যাপারে ফিফাকে আগাম বলে রেখেছে। ব্রাজিলীয় সাংবাদিকদের কেউ কেউ কালকের ম্যাচের পর যৎপরোনাস্তি আশ্চর্য। তা হলে কী কথা হল?

বৃহত্তর প্রশ্নটা অবশ্য ব্রাজিল বা নেইমারকে ঘিরে নয়। ইস্যুটা ভিন্ন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফুটবলকে যান্ত্রিকতার হাত থেকে বাঁচাতে বল প্লেয়ারদের নিরাপত্তা। রেফারি সেই তিনটে হলুদ কার্ড দেখালেন। একজনকেই ক্রমাগত মারার জন্য বিপক্ষকে তিনটে হলুদ কার্ড দেখানো বিশ্বকাপে অভূতপূর্ব। কিন্তু এই কড়া হওয়াটা ম্যাচের শুরুতে হলে মারামারিটা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেত না।

রস্তভ অন ডন ছাপিয়ে ১০৫৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে সোমবার সন্ধেবেলা পৌঁছলাম ব্রনিৎসিতে। মেসিদের ডেরায়। আরও একটা শিবির যেখানে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসেছে। গাড়িতে এলে এগারো ঘণ্টার বেশি লাগত। ভোর রাত্তিরের প্লেনে মস্কো চলে আসায় প্র্যাকটিসের ঠিক আগে মেসিদের ডেরায় পৌঁছানো গেল। সমর্থকেরা সেই যে দু’দিন আগে শোকাহত হয়েছিলেন, তার জের এখনও পুরো কাটেনি। যদিও মেসিরা কিঞ্চিৎ স্বস্তি পাচ্ছেন দেখে যে একা শুধু তাঁরা হড়কাননি। সুপার পাওয়ারদের কম-বেশি এক হাল সবার।

তফাত হল, ব্রাজিলের শক কাটিয়ে ওঠার জন্য সার্বিয়া বা কোস্টারিকা রয়েছে। স্পেনের আছে মরক্কো আর ইরান। মেসিদের সামনে তো বিশ্বকাপের অন্যতম গতিশীল দল ক্রোয়েশিয়া। ক্রোটরা বরাবর বিশ্বকাপে একটা প্রাথমিক ফুলকি দেখায়। সমস্যা হল সেই ফুলকি ফেজের মধ্যেই যে মেসিরা পড়ছেন। এ দিন সাংবাদিক সম্মেলনে এসে মেসির দুই সতীর্থ পাভন আর গ্যাব্রিয়েল মার্কাডো বলেও গেলেন যে, ক্রোয়েশিয়া মিডফিল্ড খুব জমকালো। ভাল দৌড়োয়। আর একটা ম্যাচ জিতেও রয়েছে। মস্কো থেকে অন্তত পঁচাশি কিলোমিটার দূরের ব্রনিৎসিতে গজানো নতুন স্পোর্টিং বারের আশেপাশে জটলা। সেই জটলাতে আর্জেন্টিনীয় জার্সিতে বেশ কিছু লোক। আর সবার মুখে এক কথা, ২১ তারিখের ম্যাচটা জিতব তো? এটা এমন ফেজ যে টিমের ওপর নির্ভর করতে করতেও মরমী সমর্থক কম্পিত হচ্ছে। ক্রোয়েশিয়ার কাছে নিঝনি নভগরদ স্টেডিয়ামে হেরে গেলে তো একরকম বিদায়। ম্যাক্সিম গোর্কির শহরেই মেসির কাপ আকাঙ্খার সৎকার হয়ে যাবে।

আর্জেন্টিনা বিপন্ন হলে কী হবে, তাদের দেখার জন্য সবচেয়ে বেশি ভিড়। প্রায় দেড়শো সাংবাদিককে দেখলাম গুঁতোগুতি করে বেস ক্যাম্পে ঢুকতে। ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ঘটল। কিন্তু যাঁর জন্য এত কিছু সেই মেসি কোথায়? তিনি একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় নিজেকে সরিয়ে নিযেছেন। সাংবাদিকদের দল ঢোকামাত্র একটা গলফ কার্টে করে বাসের দিকে এগিয়ে গেলেন। এত ভিড় যেখানে, সেখানে টিমের কোনও মাথা এলেন না সাংবাদিক সম্মেলনে। না সাম্পাওলি, না মাসচেরানো, না ডি’মারিয়া। না মেসি নিজে। এমন দু’জনকে পাঠানো হল যাঁদের দলে জায়গা নিশ্চিত নয়। আবেগজনিত প্রচণ্ড আশঙ্কার বৃত্তে মেসিরা যেন একটা নির্লিপ্ত আর নিস্তব্ধতার জোনে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন।

আর্জেন্টিনার এই টিমের বিপদ গ্রুপ লিগ স্তর থেকেই শুরু হতে পারে আশঙ্কায় এ বার মেসি ভক্তদের অনেককেই দেখছি ইতিমধ্যে মস্কো পৌঁছে গিয়েছেন। কী ভারতের, কী বাংলাদেশের। ফুটবল-পণ্ডিতেরা যতই তাঁদের কাপ যুদ্ধে অন্যতম ফেভারিট ধরুন, আম-মেসি ভক্তর হিসেব বোধহয় আরও বাস্তবোচিত। এই টিম যদি নকআউটে হেরে যায়? তার চেয়ে গ্রুপ লিগে মন ভরে দেখে নিই।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় যেমন। বিশ্বকাপ ফাইনালসহ শেষ দিকটা দেখায় বেশি উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু স্কুল ছাত্র ছেলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছ, তার কাছে ফুটবল-তীর্থ মানে বিশ্বকাপ-তীর্থ নয়। মেসি-তীর্থ। ছেলের ইচ্ছেকে গুরুত্ব দিতে তাই প্রসেনজিতকে শেষ দু’টো গ্রুপ লিগ ম্যাচ ছেলে সমেত দেখার জন্য অবিলম্বে রাশিয়া উড়ে আসতে হচ্ছে। ক্রোয়েশিয়া, নাইজিরিয়া দু’টো ম্যাচই পুত্র তৃষাণজিৎ দেখবে। শিল্পপতি সত্যম রায়চৌধুরী পুত্র দেবদূতও তাই। মস্কোতে আর্জেন্টিনার ওই রকম কুশ্রী শুরু করায় প্রচণ্ড হতাশ কি না জিজ্ঞেস করায় বলল, ”খারাপ লাগেনি তো। চোখের সামনে মেসিকে বিশ্বকাপ পেনাল্টি মারতে দেখলাম এটাও তো পাওয়া।” এমন শ্রেণিভুক্ত বাঙালি এই মুহূর্তে রাশিয়ায় অন্তত ষাট-সত্তর জন। যাঁদের কাছে মেসি বিসর্জন মানে সব শেষ। ওই বিশ্বকাপ না কী কার হল কোনও গুরুত্ব নেই। মেসি ভাসান মানে বিশ্বকাপেরও নিরঞ্জন।

বাংলাদেশ থেকে আসা চার ব্রাজিল সমর্থকের সঙ্গে কাল মাঝরাতে এয়ারপোর্টে দেখা। এঁরা আবার উগ্র ব্রাজিল সমর্থক। হলুদ জার্সি আর ব্রাজিলের টুপি পরা বলে ব্রাজিলীয় ভাবছিলাম। সবাই ঢাকা থেকে এসেছেন। এঁদের সেন্টিমেন্ট হল, সব মিডিয়াতেই লিখছে ইউরোপের দেশগুলোর চান্স বেশি। কী হবে যদি সেমিফাইনালে দেখা যায় জার্মানি, বেলজিয়াম, স্পেন আর ফ্রান্স, তার চেয়ে শুরুর দিকে ব্রাজিলে থাকো। দেখতে পাওয়াটা গ্যারান্টেড।

এঁদের আশেপাশে গোটা বিমানবন্দর জুড়ে থিকথিক করছে হলুদ জার্সি। চেক ইনের সময়ের চার-পাঁচ ঘণ্টা আগে এঁরা এক-একজন চলে এসেছেন। সাধারণত ব্রাজিলীয়দের রুটিন হল, টিমের খেলা দেখে সোজা বারে ছোটা। সেখানে একটু মদ খাও। তারপর ফুটবল নিয়ে চর্চা আর ফাটাফাটি করে আবার মদ খেতে বসো। লাস্টে যখন ফ্লাইটের টিকিট আছে মনে পড়বে, তখন এয়ারপোর্ট রওনা হও। সমস্যা হল, কালকের জিততে না পারা এঁদের একদম গভীরে আঘাত করেছে। গতবারের শোচনীয় সেমিফাইনালের পর এ বার নতুন কোচের অধীনে ব্রাজিল টিমটার ওপর এত আশা যে, ওঝা ডেকে ঝাড়ফুঁক অবধি করানো হয়েছে। সবাই ধরে রেখেছিল, এ তো শুধু গানের দিন শুরু হওয়াটা শুধুমাত্র কিক অফের অপেক্ষা। উৎসবটা যে এমন খিচুড়ি পাকিয়ে যাবে, কে জানত!

কিছু সমর্থক পানশালা নির্ঘাত গিয়েছিলেন। নইলে গোটা মস্কোগামী প্লেনের কেবিন এত গন্ধ করত না। কিন্তু বেশির ভাগ যাননি। এঁরা এয়ারপোর্ট জুড়ে কেউ শুয়ে থাকলেন। কেউ গালে হাত দিয়ে বসে রইলেন। কেউ মাটিতে শুয়ে পড়লেন ঢুকেই। কী অসামান্য ইনভলভমেন্ট ওঁদের দলের সঙ্গে মাঝরাতে এয়ারপোর্টের ছবিটা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম। শুধু এয়ারপোর্টের ফ্রেমগুলো জুড়ে যদি একটা ভিডিও তুলে পোস্ট করা যায়। ফুটবলরসিক অপার বিস্ময়ে দেখবে, ব্রাজিল যদি মাঠে একটা ম্যাচ খেলে সেই ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে ফিরতি ম্যাচ খেলে সমর্থকেরা।

আর্জেন্টিনীয়রাও তাই। এই দু’দেশের সমর্থক রাশিয়া থেকে বিদায় নিলে টুর্নামেন্টে অনেক ওজনদার দেশ পড়ে থাকবে। কিন্তু রাশিয়া বিশ্বকাপে না থাকবে নুন, না লঙ্কা। মস্কোতে সন্ধেবেলাও যথেষ্ট আলো থাকে। আর্জেন্টিনা বেস ক্যাম্প থেকে যখন বেরোচ্ছি, পিছনে দূর আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। রিপোর্টারদের অনেককেই দেখলাম, মেসিদের বেসক্যাম্পের ওপরে সূর্য অস্ত যাওয়ার ছবি ভিডিওয় তুলে রাখতে।

বোঝা গেল, বৃহস্পতিবার নিয়ে সবার বুক দুরদুরানি আছে!

রস্তভ অন ডন, ১৮ জুন

ভলগা নদীর ধারে পরীক্ষার্থী লিও মেসির জন্য প্রার্থনা শুরু

এরোফ্লোটের মস্কো-নিঝনি ফ্লাইটটা মঙ্গলবার সকালে যখন ছাড়ব ছাড়ব পাশের সিটের যাত্রী দেখলাম, বিড়বিড় করে প্রার্থনা করছেন। একেবারেই

নতুন কিছু নয়। প্লেনে যাত্রীর হামেশাই করেন। বিশেষ করে যাঁরা মাঝ আকাশে টার্বুলেন্সের ভয় পান।

তা টার্বুলেন্স শুরুও হল কিছু পর। মসেকা যতটা খটখটে, নিঝনি এ দিন দুপুরে ততটাই বৃষ্টিস্নিক্ত। তা-ও ক্রমাগত বিদ্যুৎসহ বৃষ্টি। প্লেন বার কয়েক ধুম করে নামল আবার কিছু যাত্রীর আর্তচিৎকারের মধ্যে উঠল। সবাই সচকিত। পাশের যাত্রীটি নির্বিকার। ভদ্রলোক ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলেন আগেই দেখেছি।

কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, একটু আগে প্রার্থনা করছিলেন। কী ছিল, গুড ফ্লাইটের জন্য? পঞ্চাশ মিনিটের ফ্লাইট ততক্ষণে ল্যান্ড করে গিয়েছে।

মাঝবয়সি চোখে চশমা, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ির উত্তর, ”একেবারেই না। আমি ধর্মপ্রাণ ক্যাথলিক। সচরাচর কোনও বস্তুবাদী প্রার্থনা করি না। কিন্তু নিঝনি উড়ে যাওয়ার আগে করলাম। ওখানে নেমেও চার্চে যাব। আমাদের দেশের ফুটবলের মহাসঙ্কটের ম্যাচ এটা। মেসির জন্যও। তাই ক্রমাগত ডাকছি ফাঁড়াটা কাটিয়ে দাও।” শুনে আশ্চর্য লাগল বললে খুব কম বলা হয়। ইনি পরিচয় দিলেন দ্রুত, বুয়েনস আইরেসের কাছে একটা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। স্কুল পর্যায়ে ইংলিশ অ্যাতদশপাল ল্যাঙ্গোয়েজ ছিল বলে এতটা গুছিয়ে বলতে পারলেন। এ বার তিনি ডাকলেন সামনের সিটের এক কমবয়সি তরুণকে। যার বাড়ি বুয়েনস আইরেসে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ডেভেলপার। ঘিরে রঙা শার্ট পরে নামলেন ওই ভদ্রলোক। শুনলাম এটা নাকি তাঁর পয়া শার্ট। ইকুয়েডরকে মেসির হ্যাটট্রিকে হারিয়ে যেদিন একই রকম কোণঠাসা আর্জেন্টিনা মূলপর্বে যাওয়ার লড়াই করছিল, সেই শার্ট সঙ্গে করে এতদূর এসেছেন।

আজ পরলেন কেন? ম্যাচ তো বিষ্যুদবার। বললেন, ‘নিঝনিতে নামছি বলে। তুকতাক এটাই যে কাঙ্ক্ষিত লোকেশনে শার্টটা সব সময় গায়ে।”

একই বিমান থেকে নামলেন বেশ কিছু আর্জেন্টিনীয়। যাঁদের কালো শর্টস আর নীল-সাদা জার্সি। বাধ্যতামূলকভাবে পিছনে দশ নম্বর। এঁরা না হয় প্রো-টাইপ আর্জেন্টাইন ফ্যান। যাঁদের সঙ্গে কথা বলছি দু’জনেই উচ্চশিক্ষিত।

প্রোফেসর, কী প্রতিষ্ঠিত আইটি বিশেষজ্ঞের চাকরি করে এঁরা কীভাবে খেলার স্কিল ছেড়ে তুকতাকে বেশি ভরসা করেন?

পাওলো পাবলা নামের প্রার্থনাকারী অধ্যাপকের ব্যাখ্যা, দেশ যখন বৃহত্তর সঙ্কটের মুখোমুখি তখন শিক্ষকতা কী, বিজ্ঞান কী, যুক্তি কী, এ সব প্রশ্ন অবান্তর। প্রশ্ন করলাম আপনি নিশ্চয়ই জর্জ সাম্পাওলি বিদ্বেষী? মারাদোনা তো বলেই দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা নকআউট পর্যায়ে না গেলে সাম্পাওলি যেন দেশে ফেরার চেষ্টা না করেন। ফ্যানের বর্ম ছেড়ে এই প্রথম যেন অধ্যাপকীয় ঢঙে বললেন, ”সাম্পাওলি-র দোষ নেই। আমি দায়ী করব মেসিকে। টিমে ও নিজের পছন্দের প্লেয়ার ঢুকিয়েছে। যেমন হিগুয়েন। মনে রাখতে হবে আগের বার ওর জন্য আমরা বিশ্বকাপ পাইনি। আর মেসির সঙ্গে ওর কম্বিনেশন প্লে-ও ভাল নয়।”

সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার যোগ করলেন, ”তবে আমরা আউট হয়ে গেলে আমি অন্তত মেসিকে দোষ দেব না। আমরা ওর পাশে কম্বিনেশন প্লে ঠিক দাঁড় করাতে পারিনি। এতদিন ধরে তা হলে আমরা কী প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম কে জানে।”

ওই ফ্লাইটেই পেলাম পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউট থেকে পাশ করা মুম্বইয়ের তরুণ অভিনেতা যশোবন্ত সিংকে। যশোবন্ত অনুষ্কা শর্মার ‘এনএইচ ১০’-এ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছাড়াও অধুনা বেশ কিছু ফিল্মে কাজ করছেন। যশোবন্ত বলছিলেন তাঁর খবর মুম্বই থেকে রণবীর কাপুর নির্ঝনি উড়ে আসতে পারেন। রণবীর আপাতত ‘সঞ্জু’-র প্রোমোশন নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। সামনে ছবি রিলিজ। কিন্তু মেসি যে নিজের ছবির চেয়েও আরাধ্য। রণবীর বার্সার ব্র্যাণ্ড অ্যাম্বাসাডর আমাদের দেশে। কিন্তু বার্সার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসির মধ্যে যে তফাত আছে।

বার্সার মেসি কদাপি বিপদে পড়েন। প্রায় মেক বিলিভ চরিত্র। আর্জেন্টিনার মেসির আবার সংগ্রামী জীবন। প্রতিপদে ক্ষতবিক্ষত তাঁকে রক্তমাংসের মনে হতে থাকে। তাই অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

বলতে ভুলতে গেলাম, কিছু মেসি সমর্থক চেন্নাই থেকে এসেছেন। এঁদের গায়ে বার্সার জার্সি। আর মনে দৃঢ় বিশ্বাস যে বার্সার জার্সি ভাল সময় ফিরিয়ে দেবে। এমন ঘটনা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে কখনও হয়েছে কি না জানি না যে, প্রিয়তম নায়ককে দেশের হয়ে লড়তে রক্তাক্ত দেখে তাঁর সাহায্যে লাকি ক্লাব জার্সি এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্লাব ফুটবল হয়তো সর্বশ্রেষ্ঠ পেশাদার জড়ো করে। আরও উচ্চচাঙ্গের প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেশ করে। কিন্তু ভৌগোলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে এই তৃতীয় বিশ্বের একত্রিত হওয়ার আবেগের পাসওয়ার্ড তার অজানা।

শুনলাম পরিচালক সুজিত সরকারও এসেছিলেন মস্কোয় আর্জেন্টিনা ম্যাচ দেখতে। আপাতত ফিরে গিয়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপে যা লিখলেন তার মূল সুর, মেসির পেনাল্টি মিসে এখনও শকড।

এ ভাবেই বিভিন্ন পেশা, ধর্ম ও জাতীয়তাবাদের মানুষকে তাঁর সঙ্কটে সমব্যথী করে তুলতে পেরেছেন লিও মেসি। ফুটবল ইতিহাসে গ্রেট প্লেয়ার তো অনেক। স্যর স্ট্যানলি ম্যাথেউজ। ক্রুয়েফ। বেকেনবাওয়ার। জিদান। জিকো। বেকহ্যাম। রোমারিও। ব্রাজিলের রোনাল্ডো। মারিও কেম্পেস। রুমেনিগে। স্যর ববি চার্লটন। ববি মুর। কিন্তু ব্যক্তির জন্য এই আবেগ উৎপন্ন পেলে-মারাদোনা ছাড়া সম্ভবত হয়নি। জর্জ বেস্ট বিশ্বকাপ খেললে হয়তো তাঁর জন্য হত।

নির্ঝনি নভগরদ ম্যাচে যা-ই ঘটুক লিও মেসির জীবনে একটা দিকচিহ্ন বার করতে চলেছে সন্দেহ নেই। শহরটা ঘুরে অবশ্য বাহ্যিক আনুষঙ্গে তার কোনও প্রবেশ নেই। মস্কোর আদলে প্রচুর বিশ্বকাপ ফ্ল্যাগ। কিন্তু মস্কোর মতো মেসির ছবি কোথায়? যাবতীয় বিলবোর্ড তো নিয়ে বসে রয়েছেন অ্যালেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ। বেশির ভাগ বিলবোর্ডে তাঁর বড় বড় ছবি। ইতিহাস বই থেকে এত পরিচিত মুখ যে একঝলক তাকালে বাঙালি ফুটবল পর্যটক অন্তত চিনে ফেলবে। ম্যাক্সিম গোর্কি। এখানেই ভলগার তীরে খুব গরিব রুশ পরিবারে তাঁর জন্ম। গোর্কি ছদ্মনামটা অনেক পরে নেওয়া। রাশিয়ান ভাষায় গোর্কি শব্দের অর্থ তেতো। তাঁর কলমগুলো তেতো স্বাদের বলে এমন ছদ্মনাম নেওয়া।

এ বার গোর্কির দেড়শোতম জন্মবার্ষিকী। বিশাল করে তার আয়োজন হচ্ছে। তাই জায়গায় জায়গায় নিঝনি পুরসভা এত বিলবোর্ড বসিয়েছে। যে বাড়িতে তিনি থাকতেন সেটা নিঝনি ফুটবল স্টেডিয়ামের থেকে সাত-আট কিলোমিটার। এখন মিউজিয়াম হয়ে গিয়েছে। একটু দূরে তাঁর নামে মনুমেন্ট। গোর্কির বাড়ি আর স্টেডিয়ামের মধ্যে বিশ্বসাহিত্যের সেই বহু কথিত ভলগা নদী। ভলগার ধারে বিষ্যুদবার লিও মেসির ভাগ্য একরকম নির্ধারিত হবে।

মেসি-তীর্থে আগত পর্যটকদের আর মনে করালাম না যে গোর্কির জীবনেও একটা অতৃপ্ত বাসনা থেকে গিয়েছে। পাঁচবার সাহিত্যে নোবেলের জন্য মনোনীত হয়ে তিনি একবারও পাননি। মেসির চারটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ আছে। লা লিগা আছে ন’টা। কিন্তু তিনবারের অভিযানে একবারও বিশ্বফুটবলের রাজমুকুট নেই।

ম্যাক্সিম গোর্কির শহর তাঁর জন্য কোন আবেগটা বাড়িয়ে দেবে? চরম নৈরাশ্যের? নাকি জমকালো সম্ভাবনার? মেসি-পর্যটক সহ ভলগার জলও তার ঐতিহাসিক খেয়াল রাখবে।

নিঝনি নভগরদ, ২০ জুন

জন্মদিনের আগে মেসির জন্য কাঁটার সব মুকুট

মস্কো থেকে মাইল পঁচাশি দূরে লিওনেল মেসিদের বেস ক্যাম্পটা দূর্গের মতো। আগেকার দিনের দুর্গগুলো যেমন পরিখা কেটে একেবারে জনবসতি

থেকে দূরবর্তী করে দেওয়া হত, এটা তেমনই। মস্কো থেকে উবের ড্রাইভার ম্যাপ অনুসরণ করে যদি নিয়ে যায় এমন সব খানাখন্দর মধ্যে পড়তে হবে যে বিভ্রম জাগবে পুতিনের রাশিয়া? না বাংলায় বাম আমলের বোলপুর থেকে বর্ধমান? ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে একটা জায়গায় পুলিশ বেড়ি দিয়ে ঘিরে রেখেছে। বিশেষ ফিফা কার পাস ছাড়া ভেতরে ঢোকা নিষিদ্ধ। সেখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার সবাইকে পায়ে হাঁটতে হচ্ছে ক্যাম্পে ঢুকতে গেলে।

সমর্থকদের জন্য কেটে দেওয়া লক্ষ্মণের গণ্ডি ঠিক ওটাই। আপাতত সেখানে আর্জেন্টিনীয় বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা এক হয়ে ফুটবল টিমকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ফ্ল্যাগ পাঠিয়েছে। এটাও বোধহয় অভূতপূর্ব যে ফুটবল টিমের বিপন্নতায় অন্য ক্রীড়া সংস্থার লোকজন ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। ভারত হলে ঠিক উল্টো হত। ক্রিকেট টিম সমস্যায় পড়লে কোনও কোনও ক্রীড়াসংস্থার ব্যক্তিরা খুশি হন যাতে জাতীয় মিডিয়ার লাইমলাইট ঘুরে অন্য খেলায় আসে। আর্জেন্টিনা ফুটবল এমন বিচিত্র ছবি যে অদৃষ্টের অদ্ভুত লীলাখেলায় যখন অন্য ক্রীড়া সংস্থারা একত্রিত হচ্ছেন তখন খোদ ফুটবল টিমটা শোনা যাচ্ছে অর্ন্তদ্বন্দ্বে বিক্ষত। আর তার কেন্দ্রস্থলে নাকি লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী টিমে কিছু কিছু তরুণ প্রতিভা যথেষ্ট বিরক্ত। মেসির স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের পছন্দ হচ্ছে না।

আগামী ২৪ জুন মেসির ৩১তম জন্মদিন। জন্মদিনের প্রাক্কালে এমন সব অবাঞ্ছিত বার্থডে গিফট তাঁর দিকে উড়ে আসছে যা আগে কখনও পাননি। যেমন দলগঠনে অন্যায় হস্তক্ষেপে তরুণ প্রতিভাদের ইচ্ছাকৃত আটকে রাখা। আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিকদের বক্তব্য দিয়ে এবার ব্রিটিশ দৈনিক খবর করতে শুরু করেছে, মেসি চান না টিমে তাঁকে কেউ ছাপিয়ে তারকা হয়ে যান। তাই পাওলো দিবালা-র মতো ট্যালেন্টেড ফুটবলারকে খেলতে দিচ্ছেন না। যাঁকে কিছু দিনের মধ্যে এমনকী রিয়াল মাদ্রিদ ছোঁ মেরে নিয়ে নিতে পারে।

গতকাল মেসির দুই সতীর্থ সাংবাদিক সম্মেলনে এসে ঠিক উল্টো বলেছেন যে মেসি বেচারি একা কত টানবে? ওর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ওকেও তো আমাদের একটু সাহায্য করতে হবে। সেই প্রেস কনফারেন্সে টিম চাপে পড়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকলেও চিড় ধরার নেই। মেসি কি সত্যি দলগঠনে প্রভাব খাটান? আসলে কি তিনি সাম্পাওলির কোচ?

দু’তিনজন আর্জেন্টাইন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে যা শুনলাম তা কিছুটা আলাদা। দিবালা আর মেসিকে কয়েকটা ম্যাচে একসঙ্গে খেলানো হয়েছিল। কিন্তু কম্বিনেশন কিছুতেই কাজ করেনি কারণ দু’জনের স্টাইল আর পজিশন নেওয়া অনেকটা এক ধরনের। কয়েকটা প্রস্তুতি ম্যাচে খারাপ হওয়ার পর সাম্পাওলি বাধ্য হয়ে কম্বিনেশন বদলান। আর তাই দিবালা-র আইসল্যান্ড ম্যাচে টিমে জায়গা হয়নি। হিগুয়েনের নাকি মেসি চান তাঁর প্রচণ্ড দৌড়, কোনাকুনি মুভমেন্ট আর জায়গা তৈরির জন্য। হিগুয়েনকে দৌড়ে বিপক্ষ ডিফেন্ডার সঙ্গে সরলে মেসি কিছুটা ওপেন স্পেস পান। নইলে তাঁর গায়ের ওপরে তো সদাই মার্কার। কিন্তু এখনকার আবেগসঙ্কুল পরিস্থিতিতে সেই যুক্তি শুনতে কেউ রাজি নয়। আর্জেন্টিনার কম্পিত ক্রোয়েশিয়া-চিন্তা যত বাড়ছে তত মিডিয়া আগাম ভিলেন খুঁজছে।

এ দিকে আর্জেন্টিনা প্রচণ্ড চাপ বিধ্বস্ত দেখে ক্রোয়েশিয়া কৌশলে তাদের উপর চাপ আরও বাড়াচ্ছে। নিঝনি মাঠে পরশু যদি ক্রোটরা জেতে তা হলে নকআউট পর্বে সরাসরি চলে যাবে। কোপ বুঝে ঝোঁপ মারার মতো ক্রোয়েশিয়া কোচ বলেছেন, মাঠে স্ট্র্যাটেজি তৈরির আগে তিনি ইভান রাকিটিচের সঙ্গে বিস্তারিত বসবেন। ছকে নেবেন কী করে মেসিকে আটকানো যায়? বার্সোলোনা টিমে গত চার বছর ধরে মেসি আর রাকিটিচ একসঙ্গে খেলছেন। তিনি অবশ্যই খোঁচখোঁচ জানবেন।

মিডিয়া ঠিক এই প্রশ্ন রাকিটিচকে বিশ্বকাপে পৌঁছনোর পর করায় তিনি বলেছিলেন, ”আজ পর্যন্ত কেউ মেসিকে আটকাবার পাসওয়ার্ড বার করতে পারেনি। আমি তো কোন ছার। আর লিও ফুটবলকে যা দিয়েছে তাতে বিশ্বকাপ ওর ন্যায্য পাওনা।” মাত্র ক’দিন আগে ইন্টারভিউটা দেওয়া। নেট থেকে এখনও হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। অথচ এই ম্যাচের আগে নতুন করে জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, ”আজেন্টিনার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ হল লিও। ওকে আটকে দিলেই এদের টিমটা শেষ। দেখা যাক আমরা লিওর জন্য কী করতে পারি।” কথা বলার মেজাজটাই এই ক’দিনে বদলে গিয়েছে। আর পেশাদার ফুটবলার সেটা করবে নাই বা কেন? এই মুহূর্তে মেসির ওপর চাপ বাড়ানোটা ক্রোটদের সেরা স্ট্র্যাটেজি তো নিশ্চয়ই। মেসি যত চাপে রুগ্ন হবেন তত পরশুর ম্যাচে তাদের সুবিধে।

নিঝনি নভগরদ, ২০ জুন

দ্বিতীয় ক্রেমলিনের ফাটক থেকে শেষ চেষ্টায় মেসি

ক্রেমলিনের প্রাচীর দু’টো আছে জানতেন?

 শুনেছেন কখনও উদগ্র চাপের পরিস্থিতিতে ভেন্যু উদগ্র চাপের

পরিস্থিতিতে ভেন্যু প্র্যাকটিসের সুযোগ হাতছাড়া করে বড় টিম বেস ক্যাম্পে বসে থাকে? কোথাও দেখেছেন হাইপ্রোফাইল টিমের কোচ গ্রুপ পর্যায়ে একঘর সাংবাদিককে আগাম সাফাই দিতে পারেন, আমি টিমকে তৈরির সময় পাইনি?

যথেষ্ট আশ্চর্যজনক এমন তিন ঘটনার সাক্ষী থাকলাম বুধবার। প্রথমটা বলতে পারেন হয়তো জানা উচিত ছিল। যদিও আমার ধারণা অনেকেই জানে না যে রাশিয়ায় দু’টো ক্রেমলিন রয়েছে। একটা অরিজিন্যাল রেড স্কোয়ারের পাশে। যেখান থেকে এতগুলো শতক রাশিয়া এবং প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ হয়েছে। আর দ্বিতীয়টা মস্কো থেকে ৪২০ কিলোমিটার দূরে নিঝনি নভগরদে। মধ্যযুগে তৈরি বিশাল দুর্গ। যা লম্বায় ২০৪৫ মিটার। আর ভেতরে চোদ্দটা বিশাল টাওয়ার। মহেন্দ্র সিং ধোনি আজ পর্যন্ত কোথাও ক্রিকেট জাদুঘর দেখতে গিয়েছেন বলে অভিযোগ নেই। কিন্তু সামরিক বাহিনীর প্রচণ্ড ভক্ত তিনি। এই শহরে এলে নির্ঘাৎ ক্রেমলিন-টু দেখতে ছুটতেন। ভলগা আর ওকা নদীর সংযোগস্থলে একটা অদ্ভুত লোকেশনে যে দুর্গটা অবস্থিত, এটা জয় গোস্বামীদের আদর্শ বিষয়। প্রাক্তন ভারত অধিনায়কের নয়।

কিন্তু ধোনি শুনলে নির্ঘাত অভিভূত হয়ে পড়তেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার রাশিয়া আক্রমণের সময় এই কেল্লাটা কীভাবে রাশিয়ান প্রতিরক্ষাকে সচল রেখেছিল! স্থানীয়দের মুখে শুনলাম এর ভেতরে রকেট লঞ্চার তৈরি হত। অশ্বারোহী বাহিনীর গোলাবারুদ মজুত থাকত। সোভিয়েত সাবমেরিন এস-১৩ তৈরির অন্যতম কারখানা ছিল। অ্যান্টি এয়ারক্রাফট আর অ্যান্টি ট্যাঙ্ক সব বন্ধু বানানো হত।

বিশালাকায় দূর্গ। দুপুরে সেখানে এক চক্কর কাটতে গিয়ে মনে হল, এ তো রাশিয়ান প্রতিরক্ষার জীবন্ত ইতিহাস শুধু নয়। অনুচ্চচারিত গর্বও—যে আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিতে এসো না। দেখছ আমি কে?

ক্রেমলিন-টু বার্সিলোনা নামক কোনও দুর্গ স্পেনের ফুটবল বিখ্যাত শহরে অবস্থিত হলে এটাই লিও মেসির নীরব সংলাপ হত। যেহেতু জয়ী সম্রাট নয়, তাঁকে দেখাচ্ছে ভীতগ্রস্ত। সেই মানুষ যার জন্য ক্রেমলিনের গারদ এগিয়ে আসছে। এক সেন্টিমিটার গণ্ডগোল হয়ে গেলে কে বলতে পারে, ভলগাতেই তাঁর বিশ্বকাপ স্বপ্ন তলিয়ে যাবে না? তার আগের সন্ধেয় ভেন্যুতে প্র্যাকটিসের সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে? যতই বেস ক্যাম্পে জোরদার অনুশীলন হোক, দিনের শেষে ব্রনিৎসি প্র্যাকটিস মাঠটা স্কুলমাঠ। ইন্টারন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ঘাসের চরিত্রই আলাদা। নইলে স্পেন থেকে ব্রাজিল, পর্তুগাল থেকে উরুগুয়ে, সবাই গিয়ে গিয়ে আগের রাত্তিরে বল মেরে আসত না। আর্জেন্টিনা সেটা করল না। তারা কি ভয় পেল বাইরের কোনও মাঠে মুভমেন্ট প্র্যাকটিস করলে ক্রোয়েশিয়ান গুপ্তচর ভিডিওয় তুলে নেবে? ফাঁস হয়ে যাবে? নইলে না করার কী ব্যাখ্যা?

জর্জ সাম্পাওলি অদ্ভুত উত্তর দিলেন, ”খেলব তো ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে। ছকটা তো মাঠ ভিত্তিক হবে না। টিম ভিত্তিক হবে।” এটা যদি সত্যি হত, তা হলে ভেন্যু প্র্যাকটিসের জন্য টিমগুলো এত মাথা খারাপ করত না। নাকি এটা হল সেই ফেজ যখন চাপের মুখে সব তালগোল পাকিয়ে সহজ সিদ্ধান্তও বেকার ভুল হতে থাকে।

দিনের তৃতীয় এবং সেরা আশ্চর্য অপেক্ষা করেছিল রাতের দিকে। যখন সাম্পাওলি বললেন, ”আমাদের টিমের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি তৈরি করব কী করে? হাতে তো সময় পাইনি। মাত্র দশ মাস। তা-ও বেশির ভাগ প্লেয়ার খেলছিল তাদের ক্লাবের হয়ে।” এটা প্রেস কনফারেন্সে হেডফোনে ইংরেজি অনুদিত হয়ে যখন শুনছি, নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছি না। সাম্পাওলি এর পরে যোগ করলেন, ”তা ছাড়া আর্জেন্টিনা টিমটা এতবার কোচ বদলেছে যে, নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি তৈরি হবে কী করে? এ এক রকম খেলাচ্ছিল, ও আর এক রকম। আমি তো সুযোগই পাইনি সে ভাবে।”

বিস্ফারিত হয়ে যাওয়ার মতো বিবৃতি। একটা টিম যারা গত বারের রানার আপ এবং মেসিসহ বিশ্বকাপ জয়ের প্রতিজ্ঞায় গত ১১ জুন রুশ দেশে পা দিয়েছিল। আজ মাত্র দশ দিনের মধ্যে তার কোচ এমন কথা কী করে বলতে পারে? এত মাস ধরে আর্জেন্টিনায় মিডিয়ায় সাম্পাওলির ইন্টারভিউ বেরোচ্ছে। মনে পড়ছে না একটাতেও বিলাপ করেছেন বলে যে, হ্যাঁ আমি তো টিম নিয়ে সময়ই পেলাম না।

লিও মেসিকে হাতে নিয়ে কোচিং করছেন। এখনও ম্যাচ হারেননি। ৭৩ পার্সেন্ট বল পজেশন নিয়ে ১-১ ড্র করেছেন। সে তো এ দিন মস্কোতে রোনাল্ডোদের বল দখলে ছিল ৪৬ পার্সেন্ট। অজ্ঞাতকুলশীল মরক্কোর শতকরা ৫৪ শতাংশ। একটা ম্যাচে বিভ্রাট তো হতেই পারে। এ বার ফুটবলের তথাকথিত আমেরিকা-রাশিয়া-চায়নাদের সবার হচ্ছে। তিনি আর্জেন্টাইন কোচ এখনই ঘোষণা করে দিচ্ছে টিম তৈরিতে সময় পাননি, তা হলে কি আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের অভিযোগটাই সত্যি যা বকলমে বোঝাতে চাইলেন সাম্পাওলি—ভাইরা দেখুন, গ্রুপ লিগ থেকে অতর্কিত চলে গেলে আমায় দোষ দেবেন না। এটা মেসির তৈরি টিম। আমি পুতুল ছিলাম মাত্র।

ক্রেমলিনের ঠিক উল্টো দিকে ফ্যান জোন হয়েছে। এই ফ্যান জোন ফুটবল রসিকদের জন্য আরব্য উপন্যাসের নগরীর মতো। সারাদিন এখানে বড় স্ক্রিনে টিভি চলে। ফুটবলভক্তরা পর্দায় চোখ রেখে হইহল্লা করেন। পানীয়-টানীয় চলে। ফুটবল মস্তির অরিজিনাল ‘দুর্গ’ যদি খোদ নিঝনি নভগরদ স্টেডিয়াম হয় এটা তা হলে ক্রেমলিন-টু। কাল রাত্তিরে রাশিয়া জেতার পর এখানে এত ফূর্তিফার্তা আর চিৎকার চলেছে যে কাছের হোটেলে থাকায় রাত তিনটে অবধি ঘুমোতে পারিনি। জায়গাটাকে স্থানীয় প্রশাসন দারুণ বানিয়েছে। চারপাশে ফুলের স্তুপ। ছোট ছোট বেঞ্চ। নিখুঁত করে কাটা ঘাস। আর ঘাস থেকে মুখ তুললেই ম্যাক্সিম গোর্কির বিশাল মূর্তি।

সেই বিশাল মূর্তির তলায় সেলফি তুলছে ফ্যান আইডি লাগানো দুই তরুণ। একজন বলল জার্মানির। অন্যজন ক্রোয়েশিয়ার। আর্জেন্টিনা কি এদের কমন শত্রু নাকি যে মেসি ম্যাচের আগে একসঙ্গে ছক করছে? জিজ্ঞেস করায় ক্রোয়েশিয়ার তরুণ হাত নাড়ল। ইংরেজি জানে না। জার্মান ছেলেটি জানে। সে তর্জমা করে যা বলল অবাক হওয়ার মতো। ”আপনারা সারাক্ষণ মেসি মেসি করছেন কেন? আজ নেটে দেখলাম আমাদের কোচকে মিডিয়া জিজ্ঞেস করেছে, মেসিকে কী করে আটকাবেন? আমার তো মনে হয় উল্টে প্রশ্নটা হওয়া উচিত আর্জেন্টিনা ডিফেন্সকে একটা সিগারেট লাইটারের মতো পাতলা দেখিয়েছে। আপনাদের ফরোয়ার্ডদের কি ওটা ক্র্যাক করা সহজ হবে না?”

কত বয়স হবে ছেলেটির। আঠাশ থেকে বত্রিশ। এই ভঙ্গিতে কথা শুনে মনে হল জাস্ট একটা ম্যাচের পেনাল্টি মিস কি লিও মেসিকে মার্সেডিজ থেকে ভাঙা সাইকেলে নামিয়ে দিল যে চারপাশগুলো এত বদলে বদলে যাচ্ছে?

ক্রেমলিনের ফুটপাথে ডান দিক ধরে হাঁটতে বলেছিলেন হোটেল মালিক। বলেছিলেন এই স্ট্রেচটা হল বলশয় পোজভস্কায়া স্ট্রিট। এটা দিয়ে হাঁটলে সোজা স্টেডিয়ামের মেট্রো পেয়ে যাবেন। আর হাঁটতেও ভাল লাগবে। সরেজমিন গিয়ে মনে হল ঠিক পরামর্শ।

আর মেসি ম্যাচ দেখতে বিকেলে নিঝনি পৌঁছনো স্বপুত্র প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের এখানে এলে মনে হবে, স্ট্যালিনের রাশিয়ার বুঝি রেট্রোস্পেকটিভ দেখছেন। একটা দোকানে শুধু দেখলাম নবীন সভ্যতার অগ্রগমন রয়েছে। কারণ ট্যাটু সেন্টার কথাটা লেখা। বাকি সর্বত্র যেন ১৯৩০-র রাশিয়া। গোর্কির মূর্তি এখানেও। যেহেতু তাঁর অরিজিনাল বাড়ি খুব কাছে।

একটু আগে ভুল লিখেছি বোধহয়। সবার আগে মেসিকে এই পাড়ায় নিয়ে আসা উচিত ছিল সাম্পাওলির। বোঝাতে যে মাঠে নেমো না কিন্তু ক্রেমলিন চত্বরটা ঘুরে যাও। দেখবে অতীতের ঝরা পাতা। দেখবে লেজেন্ডদের আর বুঝবে জীবনে শেষ পর্যন্ত কিছুই চিরস্থায়ী হয় না। কালকের ম্যাচ নিয়ে এত ভেবো না। আর্জেন্টিনাকে জেতাতে না পারলেও জীবন তার মতো করেই ভবিষ্যতের বছরগুলোয় চলবে। এত চাপ নিও না।

পেশাদার কোচেদের এ সব ছলাকলা করতেই হয়। যদি তার সেরা পারফর্মার ঘটনাচক্রে ক্রেমলিনের গারদবন্দি হিসাবে নিজেকে ভাবা শুরু করে!

সমস্যা হল এই কোচ তো সবার আগে নিজে পালাতে ব্যস্ত!

নিঝনি নভগরদ, ২১ জুন