মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

ব্রাজিল ২০১৪ – ৩

অর্থাভাবে বিক্রি হচ্ছে গ্যারিঞ্চার বাড়ি

রোববার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ রিও থেকে পঞ্চান্ন কিলোমিটার দূরের গ্রামটায় যখন ঢুকছি, ভাবছিলাম গ্রামটার নাম এখনও বদলায়নি

কেন? পাও গ্রান্দে-র নাম তো গ্যারিঞ্চা গ্রাম হওয়া উচিত।

রিও শহরটা গতকাল রাত থেকে আর্জেন্তিনা অধিগ্রহণ করে নিয়েছে। শুধু নীল-সাদা জার্সি। কোপাকাবানা তটে স্প্যানিশে বিশাল পোস্টার ঝোলানো— মারাদোনা ফর প্রেসিডেন্ট। কিন্তু পুঁচকে এই গ্রামে কোনও মেসি নেই। কোনও আর্জেন্তিনা নেই। শুধুই ব্রাজিল আর তাদের ভালবাসার গ্যারিঞ্চা। যাঁকে আদর করে লোকে ‘লিটল বার্ড’ বলত।

গ্রামের প্রবেশমুখেই গ্যারিঞ্চার নামে প্রাইমারি স্কুল। তাঁর আবক্ষ ব্রোঞ্জ মূর্তি। যার গায়ে লেখা: জন্ম ১৯৩৪। মৃত্যু ১৯৮৩। আর একটু এগোতেই গ্যারিঞ্চার নামে পানশালা। যার ওপর লেখা ‘কোপা দে মুন্দো।’ এই বিশ্বকাপেই ঘটা করে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার স্টেডিয়ামের নামকরণ হয়েছে গ্যারিঞ্চার নামে। কলকাতায় বসে আমরা চিরকাল জেনে এসেছি, গ্যারিঞ্চা হলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের মধু কবি। অসম্ভব প্রতিভাবান। অনেকে মনে করেন পেলের চেয়েও বড় প্লেয়ার। কিন্তু বিশৃঙ্খল জীবনের খাজনা গুনতে গিয়ে কখনও নিজের প্রাপ্য পাননি। সেই মানুষটার মৃত্যু পরবর্তী মূল্যায়ন শুরু হল দেশে বিশ্বকাপ হওয়ার সময়।

কিন্তু কে জানত, সেই মূল্যায়নের বহরটা গ্যারিঞ্চার বিখ্যাত বডি ফেন্টিংয়ের মতো। ডিফেন্ডাররা যা ভাবছে, শরীর ঠিক তার উল্টো দিকে ঘুরবে!

বার্বেডোজে ম্যালকম মার্শালের মার্বেল খোদাই করা সমাধিক্ষেত্র বাদ দিচ্ছি। সেই ১৯১৫-এ মারা যাওয়া ভিক্টর ট্রাম্পারের সিডনিস্থিত সমাধিও আজ পরিষ্কার, সাফসুতরো।

কলকাতায় মধু কবির শেষ শান্তিস্থলে ঢুকুন। পরিষ্কার করে লেখা— দাঁড়াও পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে।

তিষ্ঠ ক্ষণকাল এ সমাধিস্থলে!

জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম।

এখানে গ্যারিঞ্চার সমাধিটা কাঠের ওপর রং করা। রংটা আবার চটে গিয়েছে। ওপরে মলিন একটা লেখা, যা তর্জমা করে দিলেন সঙ্গে আসা দোভাষী কাম রিও-র পেশাদার ট্যুর গাইড। ‘লিটল বার্ড, অফুরন্ত আনন্দ দেওয়ার জন্য অসীম কৃতজ্ঞতা।’ কিন্তু এই কি কৃতজ্ঞতার ছিরি? অত সকালে রিও-য় ফুলের দোকান খোলেনি বলে একটা ফুলও আনতে পারিনি সঙ্গে করে। কিন্তু এনেই বা কী হত। এত নোংরা চার দিক।

সমাধির ঠিক পাশে যেখানে আলাদা করে তাঁর জন্য মেমোরিয়াল হয়েছে, যার ছবি গুগল খুললেই পাওয়া যায়, সেখানে রাখা আছে হলুদ ব্রাজিলীয় জার্সি আর এক টুকরো কাগজ— ওব্রিগার্দো। পর্তুগিজ ভাষায় ধন্যবাদ। নিজের শহরে বিশ্বকাপ শুরুর দিন এটুকু তো তাঁর জন্য থাকারই কথা!

ধুর ধুর! ঠিক ওখানেই যত রাজ্যের উচ্ছিষ্ট। দুর্গন্ধে পেটের নাড়িভুঁড়ি উঠে আসে। ওখানে দুটো মুরগি বলি দেওয়া রয়েছে, কোনও এক পরিবার বিদেহী আত্মাকে ডেকে আনতে চায় বলে। ঠিক পাশেই এলাকার মেয়রের মেমোরিয়াল— দুর্দান্ত সাজানোগোছানো আর পরিষ্কার। কিন্তু তাঁর, গ্যারিঞ্চার বরাবরের যা ভাগ্য, মৃত্যুর একত্রিশ বছর বাদেও তা বদলায় কী করে? সমাধিস্থলে যাঁরা শবদেহ নীচে নামানোর কাজ করেন, নেই লোকটিও মুখ বিকৃত করে ফেললেন— ”ছি ছি, এখানেই এ সব করতে হল।”

একটু এগিয়ে সমাধি থেকে দুটো টার্ন নিয়ে গ্যারিঞ্চার আদি ভিটে। প্রথম জীবনটা এখানেই কাটিয়েছেন এবং গুরুত্ব হিসেবে এত দিনে সরকার সংরক্ষিত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। খাড়াই জায়গা। গাড়ি ছেড়ে হেঁটে উঠতে হয়। ওপরে পাহাড়। পাশ দিয়ে একটা ঝরনা কুলকুল বইছে। যেমন বইত গ্যারিঞ্চার অবিশ্বাস্য ফুটবল প্রতিভা। একটু এগিয়ে একটা নদী। এমন একটা পরিবেশে তো লোকে ভাবুক হবে, তার ভেতর প্রশান্তি আসবে, কবিতাবোধ না থাকলেও এসে হাজির হতে পারে। গ্যারিঞ্চা ভবঘুরে, প্লে-বয় আর মদখোর হলেন কেন?

কিন্তু এই মুহূর্তে তার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ব্রাজিলীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় জাদুকরের ভিটে এত হতচ্ছিন্ন আর পাঁজরা-বার করা কেন? গ্যারিঞ্চার একই সঙ্গে তো পেলে খেলতেন। যাঁর তিন মহাদেশে তিনটে বিলিয়ন ডলার দামি বাড়ি আছে।

কাকার আদি বাড়িটা যিনি দেখাশোনা করেন, সেই ভাইপো হোবার্তো উত্তেজিত ভাবে বললেন, ”কন্ট্রিবিউশনে কাকার সঙ্গে পেলের কী তফাত বলুন তো? কাকা দুটো বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন দেশকে। আটান্ন-র ফাইনালে সুইডেন যখন এগিয়ে গেল, কাকার ড্রিবলেই খেলার গতি প্রথম ঘোরে। আর ১৯৬২-তে তো কাকা একা জিতিয়েছিলেন। পেলের কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই সেখানে। ব্রাজিল ফুটবলের প্রাক্তনদের জিজ্ঞেস করুন, ওরা বলবে কাকা বেটার প্লেয়ার ছিলেন। অথচ সমাজ কত আলাদা মূল্যায়ন করল ওঁদের।”

হোবার্তো প্রথমে ইন্টারভিউ দিতে চাইছিলেন না। ভাষা তো কিছুই বুঝছি না। হাত-পা নাড়া দেখে পরিষ্কার, খুব রেগে রয়েছেন। ট্যুর গাইড তর্জমা করলেন, ”উনি বলছেন কথা বলে কী লাভ? বিদেশ থেকে কত সাংবাদিক আসে, দেখে। লেখে। আমাদের অবস্থা একই থেকে যায়।”

হোবার্তো থাকেন পাশের বাড়িতে আর কাকার আদি ভিটে দেখাশোনা করেন। বাড়ির এমন জীর্ণ দশা, যেন তিনশো বছরের পুরনো। কেন জিজ্ঞেস করায় বললেন, ”সারানোর টাকা নেই। কে দেবে? এই তো সরকার কাকার নামে স্টেডিয়াম করেছে। আমাদের একটা নেমন্তন্নর চিঠি অবধি কেউ পাঠায়নি। টিভি দেখে জেনেছি।” মেসিকে দেখতে যাবেন না? ”টিকিট কোথায়। আমাদের কি কেউ খোঁজ নেয়?” কথা বলতে বলতে ক্রমশই অভিমানী হয়ে পড়ছেন হোবার্তো। টিনের চাল দেওয়া শতচ্ছিন্ন বাড়ির ভেতরটা ঝুলে ভরা। একটা স্টেশনারি দোকান চালান হোবার্তো। ডান দিকে একটা বড় চৌবাচ্চচা। সেখানেও গরমকালে নানান সাঁতার ইভেন্ট করে আয় হয়। সুইমিং পুল বললেন, কিন্তু লম্বায় দশ মিটারের বেশি হবে না। চওড়ায় চার-পাঁচ মিটার। ওটা প্রকৃতিগত ভাবে চৌবাচ্চচাই।

এত মলিন অবস্থা পরিবারের আর এই বাড়িটার। আপনারা ব্রাজিলীয় ফুটবল সংস্থাকে বলেন না কেন? বা পেলেকে? একই সঙ্গে ওঁরা আট বছর খেলেছেন। একই রকম বরেণ্য। অথচ পেলে তো ধনকুবের। ”পেলে করবে সাহায্য? তা হলেই হয়েছে,” এ বার আরও রেগে গেলেন হোবার্তো। ”জীবনে কাকার নামটাও ও উচ্চচারণ করে না। কাকার কথা বরং বলে মারাদোনা। আর পেলে? কাকা যখন মৃত্যুশয্যায়, একবার দেখতে অবধি আসেনি।” হোবার্তো গলা নামিয়ে এ বার বলতে থাকেন, ”মানুষ অত স্বার্থপরও হতে পারে। বাবা বলতেন, আটান্ন বিশ্বকাপে পেলে কমবয়সী ছিল বলে কাকা ওকে প্র্যাকটিসে আলাদা করে সময় দিতেন। আর সে-ই কিনা বেমালুম সব ভুলে গেল।”

গ্যারিঞ্চার যৌবনকালে কাটানো বাড়িটা কাছেই। আর সেটা অনেক ভাল। বাড়ির মালিক যে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে সিরোসিস অব লিভারে মারা গিয়েছেন। কোনও টাকাকড়ি রেখে যাননি, সেটা বাড়ির বাইরেটা দেখে বোঝার উপায় নেই। শুনলাম স্থানীয় টিভি কোম্পানি গ্যারিঞ্চার ওপর ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করতে চেয়ে কিছু টাকা সাহায্য করেছিল। তারাই বাড়িটা ব্রাজিলীয় জার্সির হলুদ আর সবুজে রং করে দিয়েছে। বাড়ির এক দিকে গ্যারিঞ্চা মিউজিয়াম করেছেন নাতনি আলেকজান্দ্রা। সরু একটা ছয় বাই ছয় ফুট ঘরে ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছে সেই মানুষটিকে, যাঁর সম্পর্কে বলা হয়, উচ্ছৃঙ্খলতম ফুটবলার হয়েও মানুষকে এত আনন্দ আর কেউ ফুটবল খেলে দিতে পারেনি।

”ফিফা বলুন, ব্রাজিল ফুটবল সংস্থা বলুন, বোটাফেগো ক্লাব বলুন, সবাই আজও ঠাকুরদাকে প্রয়োজন মতো ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের জন্য কেউ কিছু করেনি। দেশে বিশ্বকাপ হচ্ছে, অথচ আমাদের কেউ একটা কার্ডও পাঠায় না। পেলের কাছে আশা করি না। ও এত স্বার্থপর যে, পরিবারকেই দেখে না। কিন্তু ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কেন দেখবে না বলুন তো? দাদুর নামে স্টেডিয়াম বানাচ্ছো, তার মূর্তি গড়ছো, অথচ পরিবারকেই ডাকছো না?” উত্তেজিতভাবে বলেন আলেকসান্দ্রা। ব্রাজিলীয় মিডিয়ার ওপরও তাঁর রাগ। ”আইডলদের মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তো মিডিয়ার।”

এই জাদুঘর কেন রিও-য় করছেন না আলেকসান্দ্রা? অনেক বেশি দর্শক আসবে। টাকা রোজগারও বেশি হবে।

বললেন, ”ক’দিন আগে ডাকাতি হয়েছে বাড়িতে। সেই ভাঙা দরজাটাই মেরামত করতে পারছি না তো রিও-য় মিউজিয়াম করব ঘর ভাড়া করে। কী যে বলেন।” জানালেন, দাদুর এত স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি আর সামলাতে পারছেন না। খরচে চালানোও যাচ্ছে না। কাগজে নাকি বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন বাড়ি বিক্রি করে দেবেন বলে। চূড়ান্ত অর্থাভাব।

স্তম্ভিত হয়ে ভাবছি, কী কন্ট্রাডিকশন! দেশে যখন গ্যারিঞ্চার নামে ঘটা করে স্টেডিয়াম উদ্বোধন হয়েছে, ক’দিন বাদে সেখানে খেলা—সেখানে তাঁর আদি বাড়ি কিনা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অর্থাভাবে। কেউ খোঁজও রাখে না।

উঠে আসার আগে আলেকসান্দ্রা বললেন, ”কিছু দিন না। দাদুর ওপর এত রিসার্চ করলেন। আমাদেরও তো কিছু প্রাপ্য হয়। দরজাটা অন্তত সারাই।”

এমন প্রস্তাবের জন্য তো তৈরি হয়ে যাইনি। স্থানীয় কারেন্সিতে ৫০ রিয়াল দিতে পারি তাঁকে। ভারতীয় মুদ্রায় এক হাজার একশো টাকা মতো। তিনি কি নেবেন?

”নিশ্চয়ই নেব,” জানালেন নাতনি।

বেরিয়ে আসার পরেও মনটা খচখচ করতে লাগল, মাত্র এক হাজার একশো টাকা গ্যারিঞ্চার মতো জিনিয়াসের দাম হতে পারে? নাকি এটাই গ্যারিঞ্চার নিয়তির দুষ্টচক্র যে, সমাধিতে শুয়েও তুমি কখনও নিজের প্রাপ্য পাবে না? তুমি বরাবরের বঞ্চিত—বঞ্চিত আর হতভাগ্যই থাকবে…

পাও গ্রান্দে, ১৫ জুন

সিআর সাতকে ছায়ায় ঢাকলেন টিএম তেরো

পারবেন ইউসেবিও হতে? আটচল্লিশ বছর আগের সেই ম্যাচটাতেও তো আরও কম সময়ে তিন গোল খেয়ে গিয়েছিল পর্তুগাল। মাত্র ২৫ মিনিটে।

তার পর ইউসেবিও একাই ম্যাচে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পর্তুগালকে। তারা অসামান্য জিতে শেষ করেছিল উত্তর কোরিয়া ম্যাচ। রোনাল্ডোকে তাঁর নিজের দেশে বারবার শুনতে হয়, তুমি যতই করো, আমাদের দেশের সর্বকালের সেরা এখনও ইউসেবিও। সোমবারের সালভাদর তা হলে সিআর সেভেন-কে সোনার সুযোগ দিচ্ছে ইতিহাস বেয়ে সেই প্রবাদপ্রতিম ম্যাচের অ্যাকশন রিপ্লে করে দেখানোর।

মতবাদটা বিরতির সময় শুনে বেশ চটেই গেলেন প্রেস ট্রিবিউনে (এখানে প্রেস বক্স বলা হয় না) পাশে বসা পর্তুগাল সাংবাদিক। বললেন, ”ইউসেবির পা-টা আগে পর্তুগালের ছিল। তার পর বেনফিকা-র। এদের পা-হাঁটু সব ক্লাবের। দেশ কোথায় চিন্তার মধ্যে?” সালভাদর বিপর্যয়ের আকস্মিকতায় রোনাল্ডোর দেশীয় সাংবাদিক এতই মুহ্যমান যে ওঁকে ঘাঁটানো সমীচীন মনে করলাম না।

রোনাল্ডোকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে রিয়ালের হয়ে সপ্তাহখানেক আগে যেমন দেখিয়েছিল, আজ ক্যুপ দে মুন্দেতেও একই রকম লাগল। নিজের ফিটনেসের উপর সাহস সে দিন যতটা ছিল, আজ নিশ্চয়ই তার চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু এখনও ঝুঁকি নিয়ে তিনটে লোক কাটিয়ে বেরোবেন, সেই পর্যায়ে যায়নি। পিছন থেকে তাঁকে বল সাপ্লাই করারও লোক পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে আতঙ্কের তাঁর ডিফেন্স। আগের দিন মেসির আর্জেন্তিনাকে দেখে মনে হয়েছিল, তাঁদের ডিফেন্স বুঝি ভয়ের ছবি। সোমবার দুপুরে বোঝা গেল, মারাকানায় কাল রাত্তিরে নেহাতই বাচ্চচাদের ভূতের ছবি দেখাচ্ছিল।

পর্তুগাল সাংবাদিক এখন রাগের মাথায় যা-ই বলুন, পর্তুগাল কোচ যতই দাবি করুন, রোনাল্ডো পুরো ফিট বলেই সারাক্ষণ মাঠে ছিল, গোটা ম্যাচ দেখে একবারও মনে হয়নি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ফিটনেস সমস্যা পুরো সেরেছে বলে। তাই দেশের হয়ে খেলতে মোটিভেশনের অভাব নয়, আসল কারণটা বোঝাই যাচ্ছে। তবু রোনাল্ডো এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পরেও টিমটাকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এই পর্তুগাল টিমকে টানতে হলে তাঁকে নিজে দৃষ্টান্ত হতে হবে। জার্মানির মতো সিস্টেম-নির্ভর দলের বিরুদ্ধে একা সফল হওয়ার মতো শান কোথায় তাঁর এখনকার খেলায়? ইউসেবিও নন। ইতিহাস বরঞ্চ তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী মেসির সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে গেল। কেপটাউনে চার বছর আগে মেসিরাও খেয়েছিলেন চার গোল। তফাতের মধ্যে এটাই যে, রোনাল্ডোর টিম এখনও প্রতিযোগিতায় সড়কচ্যুত নয়।

সকাল থেকে দেখছি, গুগল সার্চ ইঞ্জিনে সিআর সেভেনে-র একার যা জনপ্রিয়তা, তা নাকি গোটা জার্মান টিমেরও নেই। ওয়েব দুনিয়ায় তাঁর ধারেকাছে এখন কেউ নেই। টুইটার ভক্ত-সংখ্যা দশ কোটির ওপর। সালভাদর ম্যাচের আগে গুগলেও ক্রমাগত হিট হয়েই চলেছে তাঁর নামের পাশে।

সমস্যা হল, দশ বছর বাদে যখন কেউ সিস্টেম বনাম মহাতারকা ম্যাচের রেজাল্ট খুলে দেখবে—সে কার কী ‘হিট’ হয়েছিল জানতে চাইবে না। এই গুগলই তখন স্কোরশিট দেখাবে, নেতা রোনাল্ডো জার্মান ঠোক্করে কেমন বিদ্ধ হয়েছিলেন। তাতে লেখা থাকবে, সার্বিয়ান রেফারি একটা পেনাল্টি দেননি পর্তুগালকে। কিন্তু ওটা দিলেও ম্যাচের হালচাল কিছু বদলাত না। মাত্র তিন দিন আগে এই মাঠই ক্যাসিয়াসদের কাঁদিয়েছে। আর টিম পর্তুগালের ইজ্জতের দফারফা করে দিয়ে গেল। ম্যাচে যে সাত গোল হয়নি, সেটা একমাত্র জার্মান ব্যর্থতায়।

টমাস মুলার হ্যাটট্রিক করে গেলেন। ইস্টবেঙ্গল মাঠে খেলে যাওয়া টমাস মুলার এমনিতে গার্ড মুলারের কেউ হন না। কিন্তু মুলার বংশের উত্তরসূরি। একই রকম ১৩ নম্বর জার্সি পরেন। সে রকমই গোলের খিদে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে যুগ্ম-সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। এখানে একক ভাবে সেটা হওয়ার ইচ্ছে সোমবার ফুটে উঠল বারবার। একটা টিমের ক্লোজে নেই। সোয়াইনস্টাইগার নেই। পোডলস্কি শেষের দিকে নামলেন। সেই টিমটা মুলার চালিয়ে নিয়ে গেলেন। আর ফিলিপ লাম-এর নেতৃত্বে রক্ষণ সাথ দিয়ে গেল।

সিআর সেভেন আর সার্চ ইঞ্জিন এ দিন নিছকই বিজ্ঞাপনী শোনাচ্ছে! বা কাগুজে। ক্যুপ দে মুন্দেতে আপাতত টমাস মুলারের দীর্ঘ ছায়া। সরি, টমাস মুলার না। টিএম থার্টিন।

সালভাদর, ১৭ জুন

সম্রাটের শাপমুক্তি, স্বপ্নের দিকে নয়া উজান

এবারের বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর আবির্ভাব দেখতে মাঝরাত্তিরের যে ফ্লাইটে রিও দে জেনেইরো থেকে সালভাদর নামলাম, তাতে প্রচুর পর্তুগাল টি-শার্ট আর পিছনে অনিবার্য ভাবে লেখা রোনাল্ডো।

লাগেজ নেওয়ার সময় দেখি জার্মানি থেকে সমর্থক বোঝাই একটা ফ্লাইট সদ্য এসে নেমেছে। তাতে সব ডয়েশল্যান্ড লেখা সাদা টি-শার্ট। ব্রাজিলে এখন সর্বত্র এমন বিশ্বকাপ-মাদকতা, কনভেয়র বেল্টের ওপরেও ক্লোজ সার্কিট টিভি আর ‘ক্যুপ দে মুন্দো’।

সেখানে চলছে মেসির মারাকানা গোল। গোটা জার্মানি এবং রোনাল্ডোর ‘ক্যাপটিভ অডিয়েন্স’ মাল তোলা থেকে মন সরিয়ে হাঁ করে টিভি দেখছে। লিওনেল মেসির মাপে এই গোল মিডিওকার। এ রকম কত গোল তিনি বার্সা-র হয়ে করে থাকেন। কিন্তু আট বছর পর এমন একটা ফুটবল-বিহ্বল সময়ে গোলটা এল বলেই হয়তো সেটা ব্রাজিল বিশ্বকাপে নতুন মহিমা যোগ করে দিয়েছে।

জয় এবং অধিনায়কের গোলে উচ্ছ্বসিত সাবেয়া বলেছেন, ”লিও আবার দেখাল ও সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের একজন।”

বাংলা ও ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার দেখলাম টুইট করেছেন, ‘ব্রাজিলে ফাদার্স ডে শেষ হওয়ার পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে করা গোলটা আবার বোঝাল বাবা কে।’

ইউ টিউবে ইতিমধ্যেই আঠাশ হাজারের কাছাকাছি হিট হয়ে গিয়েছে গত বারো ঘণ্টায়। স্রেফ মারাকানা গোলটা আবার ফিরে দেখতে।

আর্জেন্তিনার ফুটবল সম্রাটের শাপমোচন ঘটল ম্যাচের ৬৫ মিনিটে। বেশ দেরি করেই বলা যায়। হাফটাইম পর্যন্ত প্রেসবক্সের পাশে দশ নম্বর জার্সি পরা আর্জেন্তিনীয় সমর্থকেরা বেশ ঝিমিয়ে পড়েছিলেন। মেসি তখনও হেঁটে হেঁটে ফুটবল খেলছেন। রাইট উইংয়ে তাঁকে রেখে ৫-৩-২ ছকে শুরু করেছিল আর্জেন্তিনা। একে তো পাঁচজন পেছনে নিয়েও সামান্যতম বসনিয়া ঝোড়ো হাওয়ায় সেই ডিফেন্স বেতসপাতার মতো কাঁপছে। তার ওপর মেসি বল নিয়ে দৌড়তেই পারছেন না। বিরতিতে বাইরে বেরিয়ে দেখি, আর্জেন্তিনার জঙ্গি সমর্থকেরও মুখ শুকনো। কেউ কেউ হাত দেখিয়ে বলছেন, দু’-দুটো ডিফেন্ডার মার্ক করছে। তিন জনও সময়-সময় আসছে। কী করে খেলবে?

তখন মনে হচ্ছিল বার্সার প্রাক্তন সহকারী কোচই জিতে গেলেন। মেসির খেলাটা আগের মতো নেই। চিরজীবন যে লোকটা দু’-তিনটে লোক নিয়ে খেলেছে, সে ভিড়কে ভয় পাবে কেন? তা ছাড়া টিভি যেটা দেখাচ্ছে না এখানে অফ দ্য বল মুভমেন্ট তো আমরা দেখতে পাচ্ছি। ক্যাপ্টেনের যেমন চাড় থাকা উচিত, সেটা দেখা যাচ্ছে না। সেন্টর সার্কলে কেমন উদাসীনের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। রাইট উইং দিয়ে হচ্ছে না। বাঁ দিকে সরে যাচ্ছেন।

মেসির দুনিয়ায় আবার আটকে গিয়ে অন্য দিকে চলে যাওয়া থাকে নাকি? তাঁর তো সেই মানসিকতা যে, আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে লাইন শুরু। আমি যে দিকটায় আছি, সে দিকেই গোলটা হবে। আরও বিস্ময়কর, যাঁকে মেজাজ হারাতে দেখা যায় না, তিনি ডি’ মারিয়া একটা বল ভুল পাস করায় খিঁচিয়ে উঠলেন। চির ঐতিহ্যের মারাকানা এ কোন মেসিকে দেখছে? এত এত লোক উপচে পড়ে এসেছে তো শুধুই তাঁকে দেখতে। তাঁর গোল দেখতে।

চ্যাম্পিয়নদের চিরকালীন সেরা লগ্ন হল ঠিক এই সময়টা। আর পাঁচ জন যা সাধারণের মানদণ্ডের ভিত্তিতে ভাবছে-টাবছে, সেটাকে লজ্জাকর পর্যায়ে নামিয়ে আনা। মেসি ম্যাজিকটাও ৬৫ মিনিটে ঘটেই গেল। বসনিয়ার তিন আর চার নম্বর ক্রমাগত ডাবল কভারিংয়ে আসছিল। গোলের সামনে অনিবার্য ভাবে এঁদের দু’জনকেই মাটি ধরিয়ে এবং ইতিহাসের সাক্ষী করে দিয়ে মেসি বিশ্বকাপে আট বছরের গোল-খরাটা কাটালেন। জার্মানি বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে গোলটা ছিল ডান দিকে গতিতে হারিয়ে বল প্লেস করা। এটা তুলনায় অনেক দর্শনীয়। যে মেসি-রুটটা দিয়ে যেতে সারা বিশ্ব তাঁকে চেনে, সেটা দিয়েই গেলেন।

গোলটা আশ্চর্য নয়। বিস্ময়কর গোল-পরবর্তী তাঁর উৎসব প্রকাশের ধরন। গোল-পরবর্তী চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল বা লা লিগাতেও তাঁকে এত বাঁধনহারা হতে কেউ কখনও দেখেছে? কোথাও মনে হচ্ছে, বিশ্বকাপে গোল না পেয়ে-পেয়ে চার দিক থেকে আসতে থাকা সমালোচনা ফুটবল মহানায়ক হয়েও তাঁকে চূড়ান্ত চাপে রেখে দিয়েছিল। এমন সাংঘাতিক চাপে ছিলেন বলেই বোধহয় কাল খেলার আগেই যে ফুটফুটে কিশোরটি ম্যাচের ম্যাসকট ছিল, তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত দেখতে পাননি। টিম নিয়ে নামার সময় ছেলেটিকে পাশ কাটিয়ে চলে যান রেফারির কাছে। এই কিশোরটির দুর্ভাগ্য।

কিন্তু বেলো হরাইজন্তেতে ইরান ম্যাচের যে ম্যাসকট হবে, সে মেসির হাত পাবে। আর তো তাঁর ওপর ওই আট বছরের প্রাণান্তকর চাপটা নেই। এখন আসছে স্রেফ কাপ-স্বপ্নের চাপ। সেটা অনেক বৈধ ট্যাকল। এত দিন যে চোরাগোপ্তা আক্রমণ হচ্ছিল, তা থেকে তো শাপমোচন। সেটা এত বিশ্রী পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল যে বলাবলি হচ্ছিল, দেশের হয়ে ভাল খেলবে কি, মেসি তো আর্জেন্তিনার জাতীয় সঙ্গীতটাই ভাল করে গাইতে পারে না।

১৫ জুন পরবর্তী মেসি-পৃথিবী হল নিছকই স্বপ্নের উজানে দাঁড় বেয়ে চলার। আর এখনই অবৈধ ট্যাকল নেই অমর্যাদা করার জন্য।

সালভাদর, ১৭ জুন

সুখের রাজধানীতে অসুখী রোনাল্ডো

বিদেশি পর্যটকদের এত বছরের রেটিং অনুযায়ী পোর্তো দ্য বারা হল ব্রাজিলের তৃতীয় শ্রেষ্ঠ সমুদ্র সৈকত।

বিচের ছিমছাম, সুশ্রী নির্জনতা মাপলে সালভাদরের সমুদ্রতটই এক নম্বর। অতলান্তিক যেখানে আছড়ে পড়ছে, তার ঠিক পেছনেই আবার ফুটবল মাঠ। এ দিকে বালিতে জোর কলমে বিচ ফুটবল চলছে। পাশের মাঠে ঘাসের ওপর। রাস্তার মাঝখানে যেখানে ব্যুলেভার্ডের সৌন্দর্য থাকতে পারত, সেখানে আছে কিনা খোলা টেনিস কোর্ট। বিশ্বের আর কোনও সি-বিচে ফুটবল, বিচ ফুটবল আর টেনিসের এমন ত্রিবেণীসঙ্গম নেই। আর কোনওটাই গায়ে ঠোকাঠুকি করে নয়। পর্যাপ্ত জায়গা রেখে।

সালভাদর এক সময় ব্রাজিলের রাজধানী ছিল এবং রাজধানী হয়েও স্থপতিদের চেয়ে বোধহয় খোলা জায়গাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। মঙ্গলবার সেখান দিয়ে এরিনা ফন্তে নোভা অভিমুখী হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, সমুদ্র এই নতুন তৈরি স্টেডিয়াম থেকে অনেকটা দূরে ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় হয়েও সেই খোলা জায়গাটাকেই তো মাঠে তুলে আনল। বিশ্বব্যাপী কোচ এবং স্থপতিরা যে কমন লোভনীয় জায়গাটার জন্য ছোঁকছোঁক করে থাকেন, সেই ওপেন স্পেস কাজে লাগিয়েই তো ক্যুপ দ্য মুন্দে শিহরন ফেলে দিয়েছে জার্মানি।

চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেল সিআর সেভেনদের পর্যুদস্ত হওয়ার। আয়োজক দেশ নিজেরা সেই সময়ের মধ্যে ফোর্তালেজায় মাঠে নেমেছে। অথচ সালভাদর উপকূলে সোমবারের হ্যাংওভার কিছুতেই যেন যাওয়ার নয়। স্বয়ং মারাদোনা টিভিতে খেলা দেখে ভেনেজুয়েলার টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, জার্মান পারফেকশন দেখে তিনি স্তম্ভিত। লোথার ম্যাথেউজ মুগ্ধ বিস্ময়ে জার্মান টিমের প্রশংসা করে বলেছেন, এরা কাপ জেতার দাবিদার। যে শহরে সুপার ভিভিআইপিদের মধ্যে এই চূড়ান্ত জার্মান আগ্রাসন ঘটল, সেখানকার হাওয়ায় তার টাটকা রেশ তো থাকবেই।

স্টেডিয়ামে মিশেল প্লাতিনি আর সেপ ব্লাটার ছাড়াও ছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল। ছিলেন ফিগো। ছিল আবেগ এবং সমর্থক-অঙ্কে অনেক বেশি এগিয়ে থাকা পর্তুগাল। ঢাক এই শহরের সবচেয়ে ফেভারিট বাদ্যযন্ত্র। সেটা এবং মাদল জাতীয় আরও নানান কিছু আনা হয়েছিল স্টেডিয়ামে। সেগুলো নীরবই থেকে গিয়েছে। বরং জার্মান সমর্থকেরা মঙ্গলবার সকালেও শহরের রাস্তায়-রাস্তায় তীব্র উল্লাস করে গেলেন ‘মুলার মুলার’ বলে। কী বাজখাঁই চিৎকার তাঁদের। রোনাল্ডো সম্পর্কেও কিছু একটা বলছিলেন, বুঝতে পারিনি। তবে হাত দিয়ে যে সঙ্কেত করতে দেখলাম তার বঙ্গানুবাদ— ওহে রোনাল্ডো, পাতালপ্রবেশ করো!

পর্তুগালের কাপ-ভাগ্য কিন্তু সত্যিই পাতালপ্রবেশের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইংল্যান্ড, উরুগুয়ে, ইতালিকে নিয়ে গ্রুপ ডি যে অর্থে মৃত্যুগুহা, রোনাল্ডোদের জি গ্রুপ যদিও মোটেও তা নয়। বাংলা হিসেবে ঘানা আর যুক্তরাষ্ট্র, দুটো ম্যাচ জিতলেই হল। ঘানার বিখ্যাত ওঝা কোয়াকু বনসাম অবশ্য আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে, তিনি রোনাল্ডোর ওপর ঘানা ম্যাচে ব্ল্যাক ম্যাজিক করছেন। চারটে মৃত কুকুর নিয়ে যজ্ঞ হচ্ছে। রোনাল্ডোর ছবির গায়ে শয়তানের বিশেষ পাউডার ঘষা চলছে। এগুলো সমস্যা নয়। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলে বিপক্ষে পড়বে হয় বেলজিয়াম, নয় রাশিয়া। তারাও কেউ আর্জেন্তিনা, নেদারল্যান্ডস বা ব্রাজিল নয়। কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি রুট ম্যাপ মোটেও আমাজনের গভীর জঙ্গল নয়।

তা হলে?

সমস্যা আসলে রোনাল্ডোর নিজের টিমে। পেপে-র লালকার্ড। ফাবিও কোয়েস্ত্রাও-র চোট। ফরোয়ার্ড লাইনে নানি চূড়ান্ত অফ-ফর্মে। আলমেইডা একটা বল বাড়াতে পারছেন না। কাল একটা সময় তো বল না পেয়ে রোনাল্ডো চেঁচামেচি করাই শুরু করেন। হাফটাইমের একটু আগে দেখলাম ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড খুলে ক্ষোভে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। কোচ পাওলো বেন্তাো বুঝিয়ে-বাঝিয়ে তাঁর মাথা ঠান্ডা করেন।

নিছকই এক দিন খারাপ খেলে ম্যাচ হারা হলে এত দীর্ঘস্থায়ী হতো না প্রভাব। আসলে কাল তো নিছক একটা টিম আর একটাকে ৪-০ হারায়নি। দু’টো টিমই নিজস্ব পারফরম্যান্সে দুটো বিবৃতি দিয়েছে।

জার্মানি, আমরা চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের দাবিদার এবং দৌড়ের এখনও অনেক বাকি। কিন্তু লাতিন আমেরিকায় ইউরোপের দল জেতে না, এই মিথটা এ বার আমরা চুরমার করতে চাই।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, আমার দলের নাম পর্তুগাল হলেও সবটাই আমি। হারলেও রোনাল্ডো। জিতলেও রোনাল্ডো। আর আমার চিরকালীন স্বপ্ন খানখান হয়ে টিমসহ আমি বেরিয়ে যেতে পারি বিশ্বকাপ থেকে।

সালভাদর এমনই আমুদে, খোলামেলা আর অনর্গল শহর যে, তাকে বলা হয় ব্রাজিলের সুখের রাজধানী। সেই শহরই কিনা বিশ্বের এক নম্বর ফুটবলারের কাপ-ভাগ্যের নেটওয়ার্কে চির অসুখ রেখে দেওয়ার সিগন্যাল পাঠিয়ে রাখল। সার্বিয়ান রেফারিকে প্রকাশ্যে এত দুষল পর্তুগাল! অথচ ম্যাচ রেকর্ড বলছে গোটা ম্যাচে রোনাল্ডোকে ফাউল করা হয়েছে মাত্র দু’বার। তাঁর পাহারায় যিনি ছিলেন, সেই জার্মান রাইট-ব্যাক জেরোম বোয়াতেং বরং ডান দিক দিয়ে ওভারল্যাপ করেছেন। পর্তুগাল গোলমুখে ক্রস রেখেছেন একাধিক বার। মার্কার যদি এত ওভারল্যাপে যেতে পারে, তা হলে তিনি বিশ্বকাপ পর্যায়েও এক নম্বর না ক্লাব পর্যায়ের এক নম্বর, তা নিয়ে তো ভাই প্রশ্ন উঠবেই।

উঠছেও। সিআর সেভেনের ক্যাপটিভ অডিয়েন্স ওয়েবে বলাবলি শুরু করেছে, তিরিশ বছর বাদে যখন মেসির সঙ্গে লড়াইয়ের চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে, তখন তো বিশ্বকাপটাই তার নির্দ্ধারক হবে। চার বছর বাদে রাশিয়া বিশ্বকাপের সময় রোনাল্ডোর বয়স হবে তেত্রিশ। ধরে নেওয়া যায় এটাই শেষ। অতএব সিভি-র যে জায়গাটা একই রকম উজ্জ্বল নয়, সেটা আগামী দশ দিনেই যা ঠিক করার করতে হবে।

বেশ কয়েক মাস ধরে জল্পনা চলেছে পর্তুগাল-জার্মানি মেগা ম্যাচের ভাগ্য নিয়ে। তখন ভাবা হয়েছিল, পরিবেশের সাহায্যটা রোনাল্ডোদের পক্ষে যাবে। ম্যাচ যে পড়েছে দুপুর একটায় এবং ফুটবল ইতিহাস বলছে, জার্মানরা সব পারে। শুধু গরমটা ম্যানেজ করতে পারে না।

প্রত্যাশা মতো আবহাওয়ার রেফারিং সোমবার রোনাল্ডোদের পক্ষেই ছিল। খেলা হল তিরিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস সমন্বিত ভূমধ্যসাগরীয় গরমে। পর্তুগাল সমর্থকেরা আশায় ছিলেন, সুইডেনে গত নভেম্বরের হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে বিশ্বকাপের প্লে-অফ ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন রোনাল্ডো। সালভাদরের গরম তো সেখানে নস্যি।

রোনাল্ডো নিজেও তো নানা ভাবে প্রাণপণ তৈরি হয়েছেন প্রথম রাউন্ডের ডার্বি ম্যাচের জন্য। সে দিন ইংরেজি সাবটাইটেল দিয়ে সিআর সেভেনের ইন্টারভিউ চলছিল নিজের দেশের টিভি নেটওয়ার্কে। যেখানে বলছিলেন, ”জার্মানদের জন্য আমি গুছিয়ে তৈরি।” রোনাল্ডোকে মাঠে দেখলেও বোঝা যায়, তাঁর মধ্যে সবসময় এক নম্বরে থেকে যাওয়ার রোখ কাজ করে। জার্মানি চার গোলের মাধ্যমে যে বিবৃতিটা দিল, সেটা বিশ্বকাপে তিনি দেবেন বলেই না এত দিন অদম্য খেটেছেন। হাঁটুতে ক্রেপ ব্যান্ডেজ বেঁধেও প্র্যাকটিসে কামাই দেননি।

তিন ফুটবল মহানায়ক ব্রাজিল বিশ্বকাপের প্রথম চার দিনে তাঁদের ওপেনিং সিকোয়েন্স দেখালেন। বন্ডের ছবির প্রথম দৃশ্যে যেমন একটা ডায়লগ থাকবেই— দ্য নেম ইজ বন্ড, জেমস বন্ড। সেই শন কনারি থেকে রজার মুর, পিয়ার্স ব্রসনান থেকে ড্যানিয়েল ক্রেগ— সবাই এক উদ্বোধনী সংলাপ বলেছেন। কিন্তু আজও সেরা উদ্বোধনী লাইনটা ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে শন কনারিরই কিনা, তা নিয়ে মতামতের যুদ্ধ চলে।

ব্রাজিল বিশ্বকাপে মহাতারকাদের ওপেনিং সিকোয়েন্সটাও তো বন্ডের ছবির মতোই যার-যার পারফরম্যান্স। যার ওপর বিশ্বব্যাপী ফুটবল ভক্তদের অনন্ত কাটাছেঁড়া শুরু হয়ে গিয়েছে। আর তাতে সবার আগে থেকে গেলেন নেইমার। মেসি বা রোনাল্ডোর চেয়ে টেনশনে তাঁকে অনেক কম আক্রান্ত দেখিয়েছে।

তার একটা কারণ অবশ্যই হতে পারে কম বয়স। নেইমার জানেন, চার বছর পরেও তাঁর দরজা খোলা থাকবে। মেসি বা রোনাল্ডো নিশ্চিন্ত নন। ক্লাব ফুটবলে নিজেদের আর প্রমাণ করার কিছু নেই। কিন্তু দেশের হয়ে রাজমুকুট পরার একটাই শেষ সুযোগ। দেশের চাপটা অনেক বেশি। টেনিস সার্কিটে এই জন্য মহাতারকারা সাধারণত ডেভিস কাপ খেলতে চান না। ভয় পান ডেভিস কাপ সিন্ড্রোমের। যে ভীতি বলে, সার্কিটে নিজেকে সামলাতে পারি। একটা আস্ত দেশের চাপ নেব কী করে?

মেসি তো তবু একটা গোল করে উদ্বোধনী সংলাপটা উতরে দিয়েছেন। তাঁর সামনে এখন ইরান আর নাইজিরিয়া। রোনাল্ডো পাচ্ছেন চোটগ্রস্ত, অবিশ্বাসী দল আর সম্ভাব্য সমালোচকদের দাঁত-নখ। ক্লাব সেরা মানেই বিশ্বসেরা নয়, এই দর্শনের টেস্ট-টিউব বেবিও তাঁকেই করা হবে বলে সবাই তৈরি রয়েছে।

ডেটলাইন ২৬ জুন। সিআর সেভেনের অসুখী জীবন গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচের দিন বদলায় কি না, গোটা বিশ্ব রোমাঞ্চিত হয়ে দেখবে।

সালভাদর, ১৮ জুন

ব্রাজিলের হ্যাং হয়ে যাওয়া মেজাজের মধ্যে আজ অন্য মৃত্যুগুহার নৃশংস লড়াই

সাও পাওলো বা রিওর মতো বড় ব্রাজিলিয়ান শহরের বৈশিষ্ট্য হল, ক্রমাগত বদলে যেতে থাকা দেওয়াল লিখন। গিলারমো ওচোয়া যে

রিফ্লেক্সে ঝাঁপিয়ে গোল বাঁচান, মোটামুটি সেই দ্রুততায়ই এখানে পাল্টে যায় গ্রাফিটি। সবে কালকে একটা হাতে আঁকা ছবি আর সঙ্গের লেখা দেখে প্লেনে চাপলাম। আবার অন্য শহর থেকে সে দিন রাতেই ফিরে দেখলাম, বদলে গেছে। আপাতত যেমন সাও পাওলোর দেওয়াল লিখনে শোভা পাচ্ছে ক্যুপ দে মুন্দোর পাশে কিছু আরশোলার ছবি।

আরশোলা মানে তার প্যাঁচানো শুঁড় থাকবে। এ দেশে আরশোলা ছবির অর্থও তাই— প্যাঁচানো ব্যাপারস্যাপার। সোজা কথায়, দুর্নীতি। কিন্তু মেক্সিকোর সঙ্গে পয়েন্ট ভাগ করে নেওয়ার পরেও কাপ দুর্নীতির গল্পটা এই মুহূর্তে খাচ্ছে না। এখনও বিমানবন্দর-হোটেল-ট্যাক্সিচালক-সাধারণ পথচারী সবার গায়ে হলুদ টি-শার্ট। মেক্সিকো ম্যাচ ড্র হয়েও সেটা কেউ গা থেকে খুলেছে বলে তো মনে হল না। যা বুঝছি, বিশ্বকাপ চলাকালীন গোটা দেশের এটাই অঘোষিত ইউনিফর্ম। আরশোলার কী সাধ্য সেটা কামড়ে ফুটো করবে।

কিন্তু ব্রাজিলীয়দের মেজাজটা কালকে রাত্তিরের পর মোবাইল হ্যাং করার মতোই নিস্পৃহ হয়ে গিয়েছে। এক ব্যাঙ্ক কর্মীর সঙ্গে আলাপ হল যে তীব্র অনুতাপ করছে, পৃথিবীর সর্বকালের সেরা সেভগুলো কি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে হবে বলেই তোলা থাকে? সত্তরের বিশ্বকাপে পেলের পর এ বার নেইমার আর দিয়াগো সিলভা। ব্রাজিলে এ বার দেখছি দর্শকদের মধ্যে নতুন প্রবণতা সারাক্ষণ ম্যাচটা মোবাইলে ভিডিও করার। ফ্রি-কিক নেওয়ার সময় তো ছেড়েই দিলাম। পেনাল্টি কিকের মতো অতীব রুদ্ধশ্বাস কিছু ঘটার সময়ও মোবাইল ছবি আগে। সেটা দ্রুত আপলোড করে ফেসবুক বা ইউ-টিউবে পাঠিয়ে দেওয়া আগে। তার পর নির্ভেজাল মন দিয়ে খেলাটা দেখা। কিন্তু সারাক্ষণ ক্যামেরা অন করে থাকলেও মনে হয় না ওচোয়া-র সেভদুটোর ছবি কেউ তুলতে পেরেছেন বলে। এত দ্রুত সেগুলো ঘটেছে। পেলের হেডটার সময় গর্ডন ব্যাঙ্কস গোলপোস্টের দিকে মুখ করে খানিকটা বাঁ দিকে ছিলেন। নেইমারের হেড ডান দিক থেকে কোনাকুনি। আরও কঠিন বল। তাই ব্যাঙ্কসের চেয়েও কঠিন সেভ। ব্রিটিশ মিডিয়া নিজেদের গোলকিপার নয় বলে সেটাকে স্বীকৃতি দিতে না চায়, তাতেও কিছু হবে না।

বাকি বিশ্ব মাথা ঝুঁকিয়ে বলছে, হ্যাঁ এটাই শতাব্দীসেরা সেভ।

সমস্যা হল, শতাব্দীসেরা সেভ এমনই নিশ্চেষ্ট করে রেখেছে ভুক্তভোগী দেশের চেতনাকে যে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একটা শতাব্দীর আক্রোশের উত্তর পাওয়া যেতে পারে জেনেও কেউ গরজ দেখাচ্ছে না। বৃহস্পতিবার সাও পাওলো মাঠে মৃত্যুগুহার লড়াই। ইংল্যান্ড বা উরুগুয়ে যে-ই হারুক, তাদের ক’দিনের মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনালে ব্রাজিল কাস্টমসের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

লুই সুয়ারেজের দেশের যে এই অবস্থা, তাতে তো আম ব্রাজিলীয়র খুশিতে উদ্বেল থাকা উচিত। ১৯৫০-র বিশ্বকাপ ফাইনালের নিঃশব্দ বদলা নেওয়া যাবে। সেই ব্রাজিলেই এসে প্রথম রাউন্ডেই ছিটকে যাবে উরুগুয়ে। কোন উরুগুয়ে? না, যাদের কাছে কাপ খোয়ানোটা এ দেশের মননে এমন ধাক্কা যে, চৌষট্টি বছর পরেও মানুষ ভুলতে পারে না। ব্রাজিলের টিভি অনুষ্ঠান সে দিন গ্র্যাফিক্স সহযোগে বলছিল, ব্রাজিলীয়দের জীবনে গত একশো বছরে প্রথম তিন দুঃখজনক ঘটনার মধ্যে পঞ্চাশ সালের মারাকানা হারটা পড়ে। দুঃখের ঝাঁপিতে আরও দুই হল হিরোশিমায় বোমাবর্ষণ। আর ৯/১১!

টুর্নামেন্টের আগে তাই অনেককে বলতে শুনেছিলাম উরুগুয়ে যেন আগে হেরে না যায়। ওদের হারাব আমরা—আজ আর শুনলাম না। ব্রাজিল নিজেকে নিয়ে এতই চিন্তিত যে, ঐতিহাসিক বদলার মধ্যে এখুনি নেই। ব্রাজিলীয় মিডিয়াও নেই। থাকলে ওয়েন রুনি পত্নীর ১৫ পিস লাগেজ নিয়ে রিও অবতরণকে তারা গুরুত্ব দিত। ব্রিটিশ মিডিয়া যা দিয়েছে। তারা প্রশ্ন করেছে, এত লাগেজ কেন? ঘুরিয়ে বলতে চেয়েছে, ইংল্যান্ড তো আর বেশি দিন থাকবে না। তা হলে? হোটেল পোঁছেই টু-পিস বিকিনিতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে পড়ে পাপারাৎজির শিকার হয়ে যাওয়া কলিন রুনি বলেছেন, ”আমি তো আশা রাখি, ইংল্যান্ড শেষ অবধি থাকবে।”

উরুগুয়ের হয়ে আহত সুয়ারেজ কিক-অফ থেকেই নামতে পারবেন কি না তা নিয়ে যেমন জোর কৌতূহল, তেমনই জল্পনা রুনি নিয়ে। তাঁকে কি খেলানো হবে? কেউ কেউ বলছেন, আগের দিনের মতো বাঁ দিকে না খেলিয়ে রুনিকে মধ্যিখানে পরিচিত জায়গায় খেলানো হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, কোচ ওকে উরুগুয়ে ম্যাচে বাদ দেবেন। এমন চচ্চড়ি চলছে রুনি নিয়ে যে, টিমের সহকারী কোচ গ্যারি নেভিল খুব তিতকুটে ভাবে বলেছেন, ”এটা ইংল্যান্ডের মজ্জায় ঢুকে গেছে যে টপ প্লেয়ারকে অন্যায় আক্রমণ করে যাও। পল গাসকোয়েন এর ফল ভোগ করেছে ১৯৯৬-৯৮। ডেভিড বেকহ্যাম করেছে ২০০০-০৬। ইদানীং করছে রুনি।”

ম্যাচটা ইংল্যান্ড ডিফেন্স বনাম উরুগুয়ে ফরোয়ার্ড লাইন হওয়ার সম্ভাবনা। যদিও সেরা ইংল্যান্ড ডিফেন্স এই মুহূর্তে পাওয়া যাবে বিবিসি কমেন্ট্রি বক্সে। সেখানে রিও ফার্ডিন্যান্ড আর জন টেরি। ইংরেজ মিডিয়া যে ডিফেন্ডার এবং রুনি নিয়ে ক্রমান্বয়ে বলতে বলতে টিমের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রেখেছে। টিম ও মিডিয়া, দু’পক্ষে সম্পর্কের ক্রমশ আরও অবনতি হচ্ছে সেটা চমকপ্রদ কিছু নয়। ব্রাজিলীয় মিডিয়ার সঙ্গে ব্রাজিল টিমটারও তো চলছে। স্কোলারি কালকে প্রেস কনফারেন্সে এক সাংবাদিককে ধমকেই দিয়েছেন, ”আপনাদের মধ্যে এত নেগেটিভ মনোভাব কেন?” এমনকী জার্মান মিডিয়ার সঙ্গে জার্মান প্লেয়ারদের ঝামেলা। উরুগুয়ে এখনও এই সমস্যাক্রান্ত নয়। যদিও দিয়েগো ফোরলান বলে ফেলেছেন, ”আমাদের এত কম জনসংখ্যার পুঁচকে দেশ। কিন্তু সীমাহীন তাদের কাপ-প্রত্যাশা।”

উরুগুয়ে কাল হেরে গেলে আরও ভয়াবহ! তখন দু’ম্যাচ হেরে তারা ইতালির সামনে শেষ ম্যাচে পড়বে। ফোরলানরা এই সঙ্কটের মধ্যে পড়ে সাহস সেঁকছেন এখটা পুরনো অভিব্যক্তি থেকে। তার নাম লা জেরা।

মানে মৃত্যু অবধি দায়বদ্ধতা রেখে লড়াই করা। মনে রাখা—কে কী বলছে, পরিস্থিতি কী, তাতে কিছু আসে যায় না। কোনও কিছুই শেষ হওয়ার আগে শেষ নয়। ক্রিকেটে একেই বলে শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করার অস্ট্রেলিয়ান অভ্যেস। কিন্তু উরুগুয়েনরা তাকে বিজ্ঞান থেকে আধা বিশ্বাস, আধা সংস্কারের স্তরে নিয়ে গেছে। তারা মনে করে, উরুগুয়ে টিম যত ঝড়ঝঞ্ঝাটেই পড়ুক, লা জেরা ঠিকমতো অনুসরণ করলে বিপদ থেকে ঠিক পেরিয়ে যাবে। এ হেন সংস্কারের জন্ম ব্রাজিলেই। চৌষট্টি বছর আগের তীব্র জনবহুল মারাকানায়।

মাঠে যখন খেলার আগেই রিও-র মেয়র ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে দিয়েছেন` যখন ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে জয়ের আগাম অভিনন্দন জানিয়ে রাখছেন ব্রাজিলিয়ানদের` যখন মারাকানায় দু’লাখ জনতা চিৎকার করছে হোম টিমের সাফল্য আগাম উদযাপনে` তখন উরুগুয়ে অধিনায়ক বোদুলিও ভারেলা নাকি ড্রেসিংরুমে টিমকে জড়ো করে গা গরম করা রোমহর্ষক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। যার মর্মার্থ, কে কী বলছে গ্রাহ্য কোরো না। আমরা জানি এখনও কিছু ঘটেনি। আর সেটা ঘটাব আমরা। মনে রেখো যারা বকবক করছে তারা খেলবে না। মাঠে খেলবে প্লেয়াররা। চলো ওদের দেখব!

এমন উদ্দীপ্ত হয়েছিল টিম যে, প্রথমে গোল খেয়েও ২-১ জেতে। সে দিন থেকে লা জেরা মন্ত্রের জন্ম। যা চৌষট্টি বছর পরেও সাও পাওলোর লকার-রুমে প্রয়োগ করবেন বলে ভেবে রেখেছেন ফোরলান-সুয়ারেজরা।

বুধবার ম্যাচের চব্বিশ ঘণ্টা আগে যে উরুগুয়ে কোচকে একহাত দূর থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেখলাম, তিনি যথেষ্ট আতঙ্কিত। আতঙ্কের কারণও আছে। এমনিই টিমে এত চোটের ছোঁয়াচে রোগ ধরেছে। তার ওপর ক্যাপ্টেন দিয়েগো লুগানো চোটের জন্য মরণবাঁচন ম্যাচ খেলতে পারবেন না। সুয়ারেজ যতই খেলুন, অস্কার তাবারেজ তো সাফ বলে ছিনেল, ”যে ফিটনেসে খেলবে সেটা তো আর ইপিএলের মতো হবে না।”

তা হলে কী নীরব বশ্যতা স্বীকার? টুর্নামেন্ট থেকে বেরিয়ে যাওয়া? ঠিক এই জায়গাটায় এসেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তাবারেজের। ”উরুগুয়ের ইতিহাস দেখুন। আমরা মরার আগে মরি না।” শুনে আবার সেই লা জেরা মনে পড়ে গেল।

সাতাশি বছরের এক বৃদ্ধকে কাল উরুগুয়ে চেষ্টা করছে লকাররুমে একবার নিয়ে যাওয়ার। বয়স আর স্বাস্থ্যজনিত কারণেই নিশ্চিত থাকা যাচ্ছে না। যদিও তিনি সাও পাওলোতেই আছেন। ১৯৫০-র সেই বিশ্বকাপজয়ী দলের একমাত্র জীবিত সদস্য ঘিগিয়া। ফাইনালে ১-১ হয়ে যাওয়ার পর ঘিগিয়ার গোল ছিল জয়সূচক। তাঁর উপস্থিতি উদ্দীপক হতে পারে ভেবে গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেও ঘিগিয়াকে টিমের সঙ্গে রাখা হয়েছিল। এ বার ব্রাজিল এনেও তাঁকে বেসক্যাম্প নিয়ে যাওয়া যায়নি অসুস্থতার জন্য। কিন্তু কাল এরিয়া কোরিন্থিয়ান্সে হাজির হতেই পারেন।

মঙ্গলবার বিশ্বকাপের সর্বকালের অন্যতম সেরা সেভ। হয়তো বা সর্বকালের সেরাই। আবার বৃহস্পতিবার চৌষট্টি বছরের পুরনো মন্ত্রোচ্চচারণ। পঞ্চাশ বিশ্বকাপের জয়ের নায়কের সশরীর উপস্থিতি।

নবীন-প্রবীণ মিলে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জমে গেছে। আরশোলা কেন, সাও পাওলোর দেওয়ালে হাতির শুঁড় এঁকেও আর কিছু হবে না!

সাও পাওলো, ১৯ জুন