রাশিয়া ২০১৮ – ১
ইয়াসিন ভুলেই কাপ কুচকাওয়াজ
লুঝনিকি স্টেডিয়াম! ব্র্যান্ড নিউ স্টেডিয়াম কোনও ভাবে বলা সম্ভব নয়। বরং বদ্রু ব্যানার্জিরা যে বার মেলবোর্ন অলিম্পিকে চতুর্থ হন, সে বছর এ মাঠে প্রথম বল পড়ে। স্থানীয়দের বোঝার মতো করে বললে, জোশেফ
স্ট্যালিন মারা যাওয়ার তিন বছর বাদে। শুনলেই কেমন প্রাচীন, ঝরাপাতা টাইপের একটা ইমেজারি আসে আর বাস্তবের ছবিটা ঠিক আলাদা।
শনিবার বিকেলে প্রহরীর চোখ এড়িয়ে বিশ্বকাপ উদ্বোধনী মাঠে ঢুকে পড়ে মনে হল, আহা মাঠ তো নয় যেন মখমল! গ্যালারিরও সৌন্দর্য মেকওভার হয়েছে। এই মাঠ অতীতে বহন করেছে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল, কনফেডারেশনস কাপ ফাইনাল এবং রাশিয়া জাতীয় দলের অসংখ্য ম্যাচ। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ও শেষ ম্যাচের আয়োজন সম্পূর্ণ অন্য পৃথিবী! দু’দিকের বারপোস্ট দু’টো সাইডে লটকে আছে। লাগানো হয়নি। তার আগে টেলিভিশনের লোকেরা স্পাইডারক্যাম চালানোর আগাম রিহার্সাল দিচ্ছে। মারাকানার ফাইনালের মতো এখানেও আশি হাজারের বেশি বসার উপায় নেই। কিন্তু মারাকানা তার যাবতীয় ইতিহাস সত্ত্বেও এত চিত্তাকর্ষক নয়। ফাইবার গ্লাসের চেয়ারগুলো কোনওটা মেরুন, কোনওটা চকোলেট কালার, কোনওটা খয়েরি। এত সুন্দর করে খাপে খাপে বসানো যেন কোনও ড্রেস ডিজাইনারকে আনিয়ে করা হয়েছে। স্টেডিয়ামের ওপরের ছাদ অর্ধেক ঢেকে করা নতুন ডিজাইনে যেন আরও মনে হচ্ছে আরব্য উপন্যাসের মতো মসলিনের চাঁদোয়া বিছিয়ে রয়েছে লুঝনিকির ওপর। ভিডিও-টিডিও তুলে বার হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, রাশিয়া বিশ্বকাপের সেরা দ্রষ্টব্য কি চাখা হয়ে গেল?
কে জানত, এটা সবে প্রোমো। আসল ছবিগুলো পরপর অপেক্ষা করে রয়েছে। ক্রমশ আসবে। মূল মাঠ থেকে বার হয়ে স্টেডিয়াম চত্বরে ফিরতেই চোখে পড়ল বিশাল ব্রোঞ্জ মূর্তি। ফুটবল স্টেডিয়ামে এমন অতিকায় মূর্তি ব্রাজিলের হলে না বোঝা যেত পেলে। আর্জেন্টিনায় মারাদোনা। এখানে কে? না, ভ্লাদিমির লেনিন! আর তাঁর অতিমানবিক অবস্থানের দশ গজের মধ্যে ঠিক মুখোমুখি কোকাকোলার বিরাট ডিসপ্লে বোর্ড। আর তাকে ঘিরে স্পনসর্স স্টল। তিয়েন আন স্কোয়ারে বহু বছর আগে কোকের বড় হোর্ডিং শোভা পাওয়ার দিন রুশ দৈনিক লিখেছিল, লেনিন যদি আজ জীবিত থাকতেন! আজ নিজের শহরেই নাকি তাঁর মূর্তির অনতিদূরে পুঁজিবাদী বহুজাতিক ঝাণ্ডা তুলে দাঁড়িয়ে।
বাকরুদ্ধকারী এমন সহাবস্থান ছেড়ে এসে হাইওয়েতে পড়েছি। এবার আরও একটা স্ট্যাচু। প্রায় ৪৫ মিটার উঁচু। রকেট লঞ্চারের ঢঙে জমি থেকে ক্রমশ ওপরে উঠে গিয়েছে। শুনলাম এটাই বিখ্যাত ইউরি গ্যাগারিন মনুমেন্ট। পুরো টাইটেনিয়ামের তৈরি যা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় আশি সালের মস্কো অলিম্পিকে। নভোচর হিসেবে গ্যাগারিন এমনই পথিকৃৎ যে মৃত্যু পরবর্তী তাঁর সুউচ্চ অবস্থান নিয়েই প্রশ্নের সুযোগই নেই।
কিন্তু প্রশ্ন যে থাকছে মনুমেন্টের পাশ দিয়ে উড়তে থাকা হেলিকপ্টার নিয়ে। এটা ক্রমাগত এমন চক্কর দিয়ে চলেছে কেন? বিশ্বকাপের মধ্যিখানে হলে তবু বলা যেত কেউ বিপক্ষের গোপন প্র্যাকটিস দেখার জন্য ভাড়া করেছে।
ব্রাজিল যেমন গতবার ধিকৃত হয়েছিল হেলিকপ্টার থেকে চিলির প্র্যাকটিস তোলার জন্য। এখানে সেটা কীভাবে সম্ভব? আপাতত যেখানে বড় টিমগুলোই মস্কো ঢোকেনি, সেখানে কার মনে সাধ জাগবে হেলিকপ্টার ভাড়া করে স্টেডিয়াম মেরামতির কাজ দেখার? নাকি স্থানীয় প্রশাসন ট্রায়াল দিয়ে রাখছে আইএসআইএসের বিশ্বকাপ ঘিরে জঙ্গি হানার পরিপ্রেক্ষিতে? স্থানীয় চালক বললেন, শহরে এমন হেলিকপ্টারের টহল হয়েই থাকে মস্কোর কুখ্যাত ট্র্যাফিক জ্যাম নিয়ন্ত্রণে।
মস্কোর সর্বাঙ্গে ইতিহাসের এমন সর্বগ্রাসী দলিল যে একটা মোড় থেকে আর একটা মোড় নতুন উইকিপিডিয়া খুলে দেয়।
আলেকজান্ডার পুস্কিনের বিখ্যাত স্ট্যাচু ডান দিকে এল। তার দু’ধারে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফ্ল্যাগ উড়ছে। সকালে মস্কো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে মনে হচ্ছিল, তেমন আবেগ কোথায়? পাসপোর্ট কন্ট্রোলে হয়তো ক্লোজ সার্কিট টিভিতে মহম্মদ সালাহর গোল দেখাচ্ছে। বা লাগেজ নিয়ে বার হওয়া মাত্র সামনে নেইমারের বিশাল বোর্ড। একটু পর মেসি। কিন্তু সেই মাধ্যাকর্ষণ কোথায় যে শহরের খাঁজে খাঁজে বিশ্বকাপ ঢুকিয়ে দেবে?
মস্কো সফরে গোটা দুপুর, বিকেল কাটিয়ে দিয়ে মনে হল বহিরঙ্গের ছবি দেখে সকাল সকাল সিদ্ধান্তে আসা চরম অনুচিত হত। রাশিয়া যে অর্থে অলিম্পিকের দেশ, সে অর্থে কখনও ফুটবলের নয়। আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রোঞ্জও জেতেনি। কিন্তু যে সব ইম্পর্ট্যান্ট জায়গায় বিশ্বকাপ ফুটবল প্রোমোশনের ব্যবস্থা করেছে তা অনবদ্য। লেনিন স্কোয়ারের কিছু দূরে বিশ্বকাপের উদ্বাহু বিজ্ঞাপন। কাল মার্কসের মূর্তির দু’পাশে। এমনকী ক্রেমলিনের লাল প্রাচীরের আশেপাশেও ওয়ার্ল্ড কাপ কাউন্টডাউন ঘড়ি।
আর এখানেই চেকভের গল্পের মতো আশ্চর্য, বিস্ময়কর মোচড়। রুশদের এই গ্রহে বিশ্বকাপ যদি এত আদৃতই হয়, তা হলে বিশ্বফুটবলে রাশিয়ানদের সর্বকালের সেরা রত্ন এমন অনাদৃত শয্যায় বসবাস করবেন কেন?
ব্রাজিল বিশ্বকাপের সময় মানে গ্যারিঞ্চার গ্রামে তাঁর সমাধি দেখতে গিয়ে যেমন মর্মস্পশী অভিজ্ঞতা হয়েছিল, এদিন লেভ ইয়াসিনের শেষ শয্যা প্রত্যক্ষ করাটাও যেন তেমনই বিয়োগান্ত। অন্তত ঘোর বিশ্বকাপের বাজারে।
জায়গাটার নাম ভাগাইনকোভাস্কোইয়া। ক্রেমলিন থেকে আট-নয় কিলোমিটার। ভরা মস্কো শহরের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত সমাধিক্ষেত্র। শনিবার ছুটির দিনে সেই সমাধির মুখে ফুলের দোকানটায় যথেষ্ট ভিড়। বিশ্বের কোথাও সমাধির ভেতর ফ্লোরিস্টের এত বড় দোকান দেখিনি। কিন্তু এত অভিজাত সমাধিক্ষেত্রই বা কোথায় দেখেছি? এ তো মৃত্যুরও ভিভিআইপি জোন! তাবড় তাবড় কবি, লেখক, রুশ তারকা অভিনেত্রী, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, সেনাধ্যক্ষ, অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন, ফুটবলাররা এখানে শেষ শয্যায় শায়িত। কলকাতার পার্ক স্ট্রিট বা মল্লিক বাজারের সমাধিক্ষেত্র বাদ দিলাম। এমন পরপর মার্বেল মোড়া প্ল্যাটফর্ম, বিশাল ব্রোঞ্জ মূর্তির ফুলের ডেকরেশন বিশ্বের কোথাও দেখিনি। মস্কো ডায়নামোর প্রাক্তন কোচের বিশাল মূর্তি। ভ্যালেন্টাইন ইভানভের খোদাই করা ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য। ইভানভ সোভিয়েত ইউনিয়ন টিমে ইয়াসিনের সতীর্থ ছিলেন। বাষট্টির বিশ্বকাপে যুগ্ম সর্বোচ্চ স্কোরার। কী যত্নের সঙ্গে তাঁর সংরক্ষণ। অথচ ইভানভের টিমের মহাতারকা এমন মলিন অবস্থায়।
রুশ ফুটবল ভাণ্ডারের কোহিনুর ছিলেন ইয়াসিন। চারটে বিশ্বকাপ খেলেছেন। জীবনে দেড়শো পেনাল্টি বাঁচিয়েছেন। এমনই শ্রদ্ধেয় ছিলেন ফুটবল সার্কিটে যে ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ নামে খ্যাত তাঁর বেনিফিট ম্যাচ খেলতে পেলে ইউসেবিও-বেকেনবাওয়ার সব মস্কোর মাঠে জড়ো হয়ে যান। বিশ্বকাপের এমন চড়া বাজারে যেখানে তাঁর সমাধির আশেপাশে ফুটবলের কাড়া নাকাড়া বাজছে, ইয়াসিন এমন অলক্ষ্যে পড়ে থাকা কেন? না কোনও ওবি ভ্যান আশেপাশে দেখলাম। না রুশ মিডিয়ার কোনও মুখ।
সমাধির ঘাসের উপরে ফুলের কিছু স্টিক বিছিয়ে দিলাম ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর তরফে। প্রতীক শ্রদ্ধার্ঘ। সাইডে কিছু ইউক্যালিপটাসের পাতা বিছানো। আর সামনে ইয়াসিন দাঁড়িয়ে। এক হাতে গ্লাভস আর একটা খালি হাতে বল। তাঁর ঠিক পাশের সমাধিটাই এক রুশি গায়কের। যাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। এই সমাধিবেদী আরও আড়ম্বরের। আর পাশেরটা ঠিক ততটাই নিম্নবিত্ত।
রুশ দেশে প্রথম দিন কাটিয়ে মনে হল বিশ্বকাপটা সম্ভবত লেনিন মূর্তি আর কোকাকোলার সহাবস্থানের মতো মায়াবী কিছু বিভ্রমসহ চলবে। যার কিছু সমাধান হবে। কিছু অব্যক্ত থাকবে।
সি এল আর জেমস লিখেছিলেন না, তারা ক্রিকেটের কী বোঝে যারা শুধুই ক্রিকেট বোঝে। রুশ দেশে প্রথম দিবসেই মনে হচ্ছে, তারা ফুটবলের কী বোঝে যারা এ বারের বিশ্বকাপে শুধুই ফুটবল বুঝতে চাইবে?
মস্কো, ১০ জুন
রুশ দেশে নেমে মেসি অধরা
লোকেশন এমন বিস্ময়কর আর ঐতিহাসিক পদচিহ্নগুলো এমন কাছাকাছি যে এক-এক সময় ঘোর লেগে যেতে বাধ্য। সত্যি
দেখছি, না ডিজাইনার সেটিং? নইলে চারশো গজের জায়গার ভেতর এতগুলো দ্রষ্টব্য জিনিস কী করে ভিড় করতে পারে?
মেট্রোতে যেখানে নামলেন সেই স্টেশনের নামকরণেই তো রোমাঞ্চ। থিয়েট্রিকাল স্কোয়ার। স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে সুদৃশ্য ফোয়ারা। এই ছুটির দিন শয়ে শয়ে টুরিস্ট সেখানে ছবি তুলছে। ফোয়ারার মধ্যে যদিও কোনও রোমাঞ্চ নেই।
সেলফির আসল কারণ পিছনের প্রাসাদোপম হলুদ বাড়িটা। বলশয় থিয়েটার। রাশিয়ান ব্যালে আর থিয়েটারের প্রধানতম পরিবেশন কেন্দ্র। যেখানে প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষ পারফরম্যান্স দেখার নিষ্ফল প্রতীক্ষায় দুঃখিত হয়।
বলশয় থিয়েটারের সামনের রাস্তাটা ক্রস করলেন তো স্পোর্টসের সবচেয়ে বড় থিয়েটার আপনার সামনে হাজির হয়ে গেল। বিশ্বকাপ ফুটবল! সারি সারি বিভিন্ন দেশের ফ্ল্যাগ আর ডান পাশের ব্যাকলিট হোর্ডিংয়ে ক্রমাগত যাঁর ছবি এসেই যাচ্ছে তিনি গতকাল সবে রাশিয়ায় নেমেছেন রোলিং স্টোনসের বিশেষ বিমানে। মেসি। লিওনেল মেসি!
দাঁড়ান, পুরোটা তো বলাই হল না। ফ্ল্যাগগুলো থেকে বাঁ দিকে চোখ ঘোরালেই প্রায় কুড়ি ফুটের উঁচু মূর্তি মিস করার ন্যূনতম সুযোগ নেই। প্রবল মেসি সমর্থকও তাঁর প্রিয়তমের দিকে তাকিয়ে দ্রুত এখানে ছবি তোলার জন্য ঝুঁকবে। জায়গাটা ঐতিহাসিক কারণ তার নাম রেভোলিউশন স্কোয়ার। ১৯১৭-র বলশেভিক বিপ্লবের ভিত্তিভূমি। চিরঐতিহাসিক রুশ বিপ্লবের সেই অনুষ্ঠানকেন্দ্রকে আরও আভিজাত্য দিয়েছে মূর্তিটা।
বিশ্বব্যাপী কমিউনিজমের স্বপ্ন ভয়ংকরভাবে আক্রান্ত হয়েও এই মূর্তির জায়গাটা বামপন্থী নাগরিকের আজও একান্ত আশ্রয়স্থল— রেভোলিউশন স্কোয়ারে কার্ল মার্কস।
ব্রোঞ্জের বিশাল মূর্তির পেছনে দুটো বড় পাথরে রাশিয়ান ভাষায় কিছু লেখা। সঙ্গী মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ঝটিতি তর্জমা করে দিল। একদিকে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের উক্তি— বছর চলে যাবে। শতক চলে যাবে। মহাকাল এগিয়ে যাবে। কিন্তু কার্ল মার্কসের নাম মানুষের কাছে বিস্মৃত হবে না। ডান দিকে যাঁর উক্তি তিনি ভ্লাদিমির লেনিন— মার্কসের কথা আজও এত জীবন্ত। এত প্রাসঙ্গিক। কারণ সেগুলো সত্যি কথা।
হারিয়ে যাওয়া সমাজতান্ত্রিক সভ্যতার এমন ঐতিহ্যপূর্ণ অবস্থান থেকে নিষ্ক্রমণের আগেই বিশ্বকাপ ফুটবল আবার আপনার সঙ্গে করমর্দন করবে। আবার রাস্তাজুড়ে ফ্ল্যাগের দাপট। একটু এগোতে না এগোতেই রেড স্কোয়ারের ছোট গেট আর পিছনে ক্রেমলিন। গতকাল লিখেছি সেখানে জ্বলজ্বল করছে ওয়ার্ল্ড কাপের কাউন্টডাউন ওয়াচ। লোকে একবার ক্রেমলিন ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ছবি তুলছে আবার একদিকে চলে আসছে বিশ্বকাপ ঘড়ির সামনে। বনেদি সেই কমিউনিস্ট সভ্যতা আর বিশ্ব ফুটবলের আশ্চর্য ককটেল মস্কো জুড়ে প্রত্যক্ষ করছি আর প্রবল বিস্ময়বিষ্ট লাগছে।
যেমন বিস্ময়ে মেসিদের প্র্যাকটিসে এ দিন মিডিয়াকে ঢুকতে দেওয়া হল না কেন? মেসিদের বেস ক্যাম্প মস্কো শহর থেকে অন্তত পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরের ব্রনিৎসিতে। পাতাল রেল, ওপরের রেল, নানাভাবে মস্কো শহর থেকে পৌঁছতে হয়। রোববার গোটা দিনের বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে সত্তর-আশিজন সাংবাদিক পৌঁছেছিলেন সেখানে। কথা ছিল আর্জেন্টিনা ওপেন প্র্যাকটিস সেশন করবে। তারপর হয়তো কেউ আসবেন মিডিয়ার সামনে। কোথায় কী? সাম্পাওলি-র তরফে হঠাৎ জানানো হল, আবহাওয়ার দুর্যোগের জন্য আজ মেসিরা গোপন প্র্যাকটিস করবেন। মিডিয়ার ঢোকা নিষেধ। রাশিয়ায় নেমে প্রথম দিনেই কী অদ্ভুত সিদ্ধান্ত আর খবরে চলে যাওয়া!
ব্যাখ্যা কী? বিখ্যাত আর্জেন্টাইন ফুটবল সাংবাদিক সের্জিও লেভেনেস্কিকে দেখলাম প্রেসবক্সে বেশ উত্তেজিত। বললেন, ”আমার এটা নবম বিশ্বকাপ। মেসিকে ছোট থেকে দেখছি। কিন্তু আমাকেও তো অন্যদের মতো ফিরে আসতে হল। আর ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করছেন তো? আমি বলব এরা এ রকমই।”
বোঝা গেল ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন বোঝা যাচ্ছে না আরও কিছু। মস্কো জুড়ে হোর্ডিং আর বিশ্বকাপের প্রচার দেখে একটা জিনিস খুব পরিষ্কার। আর্জেন্টিনা টিমের যেমন দুটো স্ট্র্যাটেজি।, এক, বল পেলে মেসিকে দাও। দুই, বল পেলে মেসিকে দাও। রুশ সরকার আর ফিফারও বোধহয় তাই। এরাও যেন নীরবে তাই বলছে। এক, বিজ্ঞাপনে মেসিকে ব্যবহার করো। দুই, বিজ্ঞাপনে মেসিকে ব্যবহার করো। রাশিয়ানদের নিজস্ব জাতীয় দল নিয়ে একটাও বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল না। কে বলবে রাশিয়া এই বিশ্বকাপে খেলছে। হালফিল তাদের কোনও প্রবাদপ্রতিম ফুটবলার নেই বলেই কি প্রবল দেশপ্রেমিক রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরুর আগে হাল ছেড়ে দিল? আবার তা হলে প্রতিপ্রশ্ন হবে, দেশে একমাত্র প্রবাদপ্রতিম ফুটবলারের স্মৃতিকেই বা তা হলে ভাগাড়ে ডুবিয়ে রাখছে কেন এমন অসীম অযত্নে?
লেভ ইয়াসিনের সমাধি বিশ্বকাপের এত প্রাচুর্যের মধ্যেও কেন এত রিক্ত? কেন এ দিন মস্কো ডায়নামোর নির্মীয়মাণ নতুন স্টেডিয়ামের বাইরে ইয়াসিনের বিখ্যাত ব্রোঞ্জমূর্তি আবর্জনায় উল্টে পড়ে থাকতে দেখে এলাম, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। ঠিক তেমনই বৃষ্টিতে প্র্যাকটিস গোপন হয়ে যাওয়ার কী কারণ থাকতে পারে? এ তো ক্রিকেট নয় যে বৃষ্টিতে প্রায় হবে না, বা বিক্ষিপ্তভাবে হবে? ফুটবলে বৃষ্টি নৈমিত্তিক ব্যাপার। আর আজকের রুশ দেশে বৃষ্টি মোটেও জল জমে যাওয়ার মতো হয়নি। নাগাড়ে হয়েছে। কিন্তু পরিমাণ যা ছিল উত্তর কলকাতার এঁদো গলিও ডুববে না।
রেড স্কোয়ারের ঠিক বাঁ পাশের রাস্তা এত সাজানো যে মনে হবে হলিউড ফিল্মে কোনও ক্রিসমাসের সময়কার দোকানপাট দেখানো হচ্ছে। সমস্যা হল এটা ফিল্ম নয়, জীবন। যেখানে প্রতিটি সৌন্দর্যের আড়ালে ওত পেতে থাকে চরম অনিশ্চয়তা। রাস্তাটা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানেই ওই হলুদ-মেটে রংয়ের উঁচু বাড়িটা। ফেডারেল স্টেট সিকিউরিটি। ওটা ভাল নাম। এত ভাল নাম কেউ বোঝে না। ডাকনামে বরং গোটা বিশ্ব চেনে এবং কম্পিত হয়। স্থানীয়রা বলছিলেন, পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়ন আমলে মহাদেশের সবচেয়ে বেশি লস্ট অ্যান্ড নট ফাউন্ডের ঈর্ষণীয় রেকর্ড নাকি এই রাস্তার। প্রচুর মানুষ রাস্তা দিয়ে হেঁটে এই বাড়িটায় ঢুকেছে। তারপর তাদের কেউ দেখেনি। এটাই বহুকথিত, বহুলিখিত, বহু আলোচিত কেজিবি হেড কোয়ার্টার্স।
পুরনো আমল হলে এরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বার করে ফেলেছে, মেসিরা কেন বিশ্বকাপের প্রথম দিনের প্র্যাকটিসে গোপন রাখলেন? বৃষ্টিভেজা মাঠে কী এমন ছক তৈরি করছিলেন তাঁরা?
মস্কো, ১১ জুন
মস্কোর নতুন ফুটবল জাদুঘর ম্যাচের রোমাঞ্চ দিচ্ছে
নিউ আরবেট অ্যাভেনিউ রাস্তাটা মস্কোর অত্যাধুনিক আভিজাত্যের শিরস্ত্রাণ। বিশাল চওড়া রাস্তাটার মধ্যিখানে সুদৃশ্য বুলেভার্ড। ছুটির দিনে
হরে রামা হরে কৃষ্ণ গাইতে গাইতে ইসকনের একঝাঁক পুরুষ-মহিলা চলেছে সেই রাস্তা দিয়ে। তাদের ঘিরে যেখানে কৌতূহলী মানুষজন আর মোবাইল ক্যামেরার ভিড় জমেছে তার ঠিক সামনেই মস্কোর প্রবীণতম ফিল্ম হল। অধুনা যা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। পাশে রুশ সরকারের পররাষ্ট্র দফতর। আর সেই বিল্ডিং ডিঙিয়ে পুরনো আরবেট অ্যাভেনিউ। কুড়ি-তিরিশ দশকের মস্কোকে দেখতে হলে রাস্তাটা আদর্শ।
প্রবীণ আর আধুনিকতার দ্বৈতসঙ্গমে ঠিক উপযুক্ত লোকেশনেই যেন আবির্ভাব ঘটেছে ফিফা ফুটবল মিউজিয়ামের। বিশ্বে স্বীকৃত ফুটবল মিউজিয়ামের সংখ্যা মাত্র এক। যা রয়েছে জুরিখে ফিফার সদর দফতরে। এর বাইরেও ব্রাজিল বা অন্য নানা দেশে ফুটবল জাদুঘর রয়েছে। কিন্তু সেগুলোতে পাতে দেওয়ার মতো চমক নেই। রোববার মস্কোর অস্থায়ী কিন্তু ব্র্যান্ড নিউ ফুটবল মিউজিয়ামে পা দিয়ে মন হল, চোখের সামনে বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখছি।
১৯৩৪ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জার্সি। বিশ্বকাপ বলের সঙ্গে রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং জুলে রিমে কাপও সাজানো। গত পরশু ফুটবল মিউজিয়ামের উদ্বোধন করেছেন রবের্তো কার্লোস। জাদুঘরে কার্লোসের কোনও স্মারক চোখে পড়ল না। কিন্তু তাঁর দেশের বরেণ্যরা প্রবলভাবে উপস্থিত। ফিফার লোকেরা শুধু ফুটবলার নয়, ফুটবল ফ্যানদেরও অসীম গুরুত্ব দিয়েছে। কোন দেশের ফ্যান কী ভঙ্গিতে চিয়ার করে তার আলাদা ডিভিডি চলছে ভেতরে। চলছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের চিরস্মরণীয় সব ম্যাচের ভিডিও। মারাদোনা থেকে মেসি। পেলে থেকে পুসকাস। কোনায় লেজেন্ডস গ্যালারি। সেখানে পেলে-মারাদোনা পাশাপাশি। এটা ফ্যানদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা যেখানে বিশ্বফুটবলের দুই মহানায়কের মাঝে দাঁড়িয়ে তাঁরা সেলফি তুলতে পারেন। ভিডিও করতে পারেন। একটু পাশে তৃতীয় লেজেন্ড হিসেবে রাখা হয়েছে লেড ইয়াসিনকে। রুশ সরকার বা ফুটবল প্রশাসন বিশ্বকাপের বাজারে ইয়াসিন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অমনযোগী থাকলে কী হবে, ফিফা জাদুঘর তাঁকে পেলে-মারাদোনার পাশেই রেখেছে।
এঁরা দুই সর্বকালীন নায়ক যদি পাশাপাশি থাকেন, একটু দূরের কাঁচের শো-কেসে ধরা রয়েছে আধুনিক ফুটবলের দুই মহানায়ককে। মেসির ব্রাজিল বিশ্বকাপের জাতীয় জার্সি আর রোনাল্ডোর ঘানা ম্যাচের জার্সি পাশাপাশি। ঠিক সামনে কাটআউট করা দু’জনের সাম্প্রতিক উদ্ধৃতি। রোনাল্ডো—আমি মনে করি আমিই গ্রেটেস্ট। আমি যদি নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে না করি তা হলে অন্যদের হারিয়ে শ্রেষ্ঠ হব কী করে? মেসি— আমার মুভমেন্টের পেছনে বিরাট প্ল্যানিং থাকে এটা কিন্তু নয়। পায়ে বল পড়লে অনুভূতিটা তাৎক্ষণিকভাবে টেনে নিয়ে যায়। বাকিটা সে-ই করে।
বেকেনবাওয়ারের কসমস জার্সি থেকে তাফারেলের পেনাল্টি বাঁচানো গোলকিপিং গ্লাভস। রোমারিও-র চুরানব্বইয়ের টি-শার্ট। চুয়ান্নর বার্ন ফাইনালে বুট বিভ্রাটে হারা হাঙ্গেরির কোনও প্লেয়ারের বুটজোড়া। জার্মানির এক ফ্যানের ছেষট্টির বিশ্বকাপ ফাইনালের বিতর্কিত গোলের পর টেলিগ্রাম— কেন আপনারা স্লো মোশন রিপ্লে করিয়ে বাড়তি একজন রেফারিকে দিয়ে চেক করান না?
ফিফার লোকেরা বলছিলেন ৫২ বছর আগে একজন ফ্যান যা ভেবেছিল ফিফা সেটার প্রয়োগ করছে কিনা প্রথম এই বিশ্বকাপে। যেখানে বিতর্কিত প্রতিটা গোল রিভিউ করা হবে। দেখলাম ১৯৬২ বিশ্বকাপে পেলের বদলি হিসেবে খেলা আমারিল্ডোর সই করা টি-শার্ট ঝুলছে। কিন্তু আমারিল্ডো যত চমকপ্রদ হন, পেলে হলেন পেলে। তাঁর সুইডেন বিশ্বাকাপের বুটজোড়া এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
এক ঝলক দেখা মাত্র ব্র্যাডম্যানের ব্যাটের কথা মনে পড়ে গেল। কাঠের দু’পাউন্ডের পলকা ব্যাট যা আজকের দিনে খুদে শিক্ষার্থীও হাতে তুলতে চাইবে না। পেলের বুটটাও তেমন. মাত্র ছ’টা স্টাডের। আধুনিক ফুটবলার কত বেশি স্টাড ব্যবহার করে। আর সেগুলোর প্রযুক্তি কত উচ্চমানের। এই বুটটা দেখে মনে হচ্ছে এখনই ময়দান মার্কেট থেকে কিনে আনা হল। আর এটাই বোধহয় জিনিয়াস। ব্যাখ্যা না পেয়ে এটাই ব্যাখ্যা— জিনিয়াস ইজ হোয়াট জিনিয়াস ডাজ। ইতালির ভিভারিও পোজো যেমন। ইতালির দু’বার বিশ্বকাপ জয়ের হোতা। একাই বদলে দিয়েছিলেন ফুটবল ব্যাকরণ। তাঁর আমলে ইতালি দু’বার বিশ্বকাপ জেতে। আর পোজো কিনা ছিলেন পেশায় সাংবাদিক। যে টাইপরাইটারে তিনি রিপোর্ট লিখতেন সেটা ফিফা মিউজিয়ামে সযত্নে সংরক্ষিত। সাংবাদিক হয়ে বিশ্বকাপজয়ী যুগন্ধর কোচ।
আবার সেই একই কথা চলে আসছে, জিনিয়াস হল তা-ই যা জিনিয়াস ঘটায়!
মস্কো, ১১ জুন
বলে শট করার আগেই রাশিয়ায় মেসিম্যানিয়া
বার্সিলোনা থেকে আসা ফুটবল সাংবাদিকদের কথা যদি বিশ্বাস করতে হয় তা হলে ঠিক এরকমই জায়গা নাকি বেসক্যাম্পের জন্য নির্বাচন
করতে চেয়েছিলেন লিওনেল মেসি। টিমে যারা বেসক্যাম্পের নির্ভুল জায়গা মস্কো উপকণ্ঠে তল্লাশি করছিল তাঁদের বলেছিলেন, একটা বাঙ্কার খোঁজো।
মস্কো থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে রাশিয়া বিশ্বকাপের মাঠে মেসি ও দলবলের প্রথম পাবলিক অবতরণ দেখতে এসে মনে হল জায়গাটা ঠিক বাঙ্কারের মতোই। রাশিয়ার জনজীবনে ব্রনিৎসির একমাত্র প্রভাব গয়না তৈরি করে তাকে রফতানি দেওয়ার। এবার তার ওপর মহান দায়িত্ব, বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে দামী অলঙ্কারকে তার ইচ্ছে মতো ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় সরবরাহ করা।
সেটিং হিসেবে আদর্শ। এক দিকে লেক। আর এক দিকে মস্কোভা নদী। মধ্যিখানে একটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স রয়েছে সাইজোয়েজকিনার। এখানে রাশিয়ান জিমন্যাস্ট ও বাস্কেটবল টিম অলিম্পিক যাওয়ার আগে ট্রেনিং করে। ধারে-কাছে কোনও জনপ্রাণী নেই। জানি না স্ট্যালিনের আমলে এঠা রাশিয়ান দুর্গ-টুর্গ ছিল কি না? সবচেয়ে আশ্চর্যের গোটা মস্কো যেখানে মেসির ছবিতে ছয়লাপ, সেখানে বেস ক্যাম্পে ঢোকার আগে তিন-চার কিলোমিটার জুড়ে না আছে আর্জেন্টিনার ফ্ল্যাগ না মেসির ছবি। দেখেও অবিশ্বাস্য লাগবে। হাজার-হাজার মাইল দূরে কলকাতার দেওয়ালে যখন মেসির ছবি আঁকা বা লাগানো হয়েছে, তখন খোদ আর্জেন্টাইন বেস ক্যাম্পের আশেপাশে না আছে কোনও পতাকা, না ছবি। এই ভাবেই হয়তো মেসি চেয়েছেন— একেবারে হাইপবিহীন বিশ্বকাপের প্রস্তুতি করতে।
গাড়ি ছেড়ে দিয়ে বেস ক্যাম্পে পৌঁছবার জন্য হাঁটতে হল প্রায় দেড় কিলোমিটার। আই এস আই এসের হুমকির কারণে বোধহয় এবার মেসির জন্য এমন ত্রিস্তর নিরাপত্তা। প্রতিটি মোড়ে পুলিশের গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যান্স। রাশিয়া জুড়ে বেস ক্যাম্পে ঢোকার সময় প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড যথেষ্ট। আজ জানা গেল মেসিকে দেখার জন্য যথেষ্ট নয়। আর্জেন্টিনার প্র্যাকটিস দেখতে গেলেও আলাদা টিকিট লাগবে। ফিফার আমন্ত্রিত লোকেরা ঢুকে গেলেন। আমরা জনা সত্তর সাংবাদিক বাইরে দাঁড়িয়ে। এমনকী আর্জেন্টিনার সাংবাদিকেরাও। রীতিমতো চিৎকার জুড়ে দেওয়ার পর আর্জেন্টিনা মিডিয়ার অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার আমাদের জন্য টিকিট নিয়ে এলেন। এবার ঢুকতে গিয়েও যা তল্লাশি, এয়ারপোর্টে হয় না। ভেতরে ঢুকতে দেখা গেল সিসিএফসি সাইজের স্কুল মাঠ। সবুজে ভরা। আশেপাশে গাছগাছালি এত ঢেকে রাখা যে, মনেই হবে না বিশ্বকাপ রানার আপরা এখানে মুকুট ছিনিয়ে নিতে এই মহাদেশে তাদের দ্বিতীয় অনুশীলনে নামল। অস্থায়ী গ্যালারি তিন ধাপের করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে কাতারে-কাতারে মানুষ। এক এক সময় মনে হচ্ছিল, আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ড ম্যাচ দেখতে এসেছি কি না? এখান থেকে মাত্র কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার দূরে পর্তুগাল বেস ক্যাম্প। রাশিয়া বিশ্বকাপ কী অদ্ভুত ভাবে বিশ্বফুটবলের দুই বিপন্ন মহানায়ককে মস্কো শহরতলির কাছাকাছি দু’দিকে ঠেলে দিয়েছে— দ্যাখো নিখুঁত প্রস্তুতিতে ওই মুকুটটা পাও কি না?
আর্জেন্টাইন সাংবাদিকেরা দেখলাম টিম নিয়ে বিশেষ আশাবাদী নন। অন্তত জনা কয়েক প্র্যাকটিস দেখতে দেখতে বলছিলেন, একা মেসি কত টানবে? কেন দিবালা? যাঁকে নিয়ে এ দিন সমর্থকদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেল? বা আগুয়েরো? এঁরা ঘাড় নেড়ে বলছেন, একদিক যদি গোল দেয় আর একদিকটা ডোবাবে। ডিফেন্স নেই। গোলি ভাল নেই। এক ঘণ্টার প্র্যাকটিসে সাম্পাওলি যে কোনও গোলগামী মুভমেন্ট প্র্যাকটিস করাবেন না, জানা কথা। আজকালকার দিনে পাগলেও করাবে না যেখানে সবার হাতে মোবাইল ক্যামেরা।
কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট কোচকে দেখলাম দুই গোলকিপারকে নিয়ে জোর ট্রেনিং দিতে। বল নিয়ে কম্বিনেশন প্লে প্র্যাকটিস করানো হচ্ছিল দিবালা আরা ওটামেন্ডিকে। মেসি কয়েকটা ওয়ান-টু খেললেন মাসচেরানোর সঙ্গে। কিন্তু বাকি সময় মাঠের মাঝখানে সতীর্থদের পরখ করতেই কাটিয়ে দিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল, টিমের আসল কোচ সাম্পাওলি নন, তিনি!
এমন একটা জায়গা যেখানে রাশিয়ান মেট্রো আর ওভারহেড ট্রেন ধরে আবার ট্যাক্সি নিয়ে আসতে হয়। সেখানে প্রথম দিনের প্র্যাকটিসে এক হাজার লোক জড়ো হওয়া ভাবাই যায় না। রাশিয়ান সংগঠন প্রথম বিশ্বের যাবতীয় শৃঙ্খলা আর তৎপরতা নিয়ে মজুত ছিল। ভিড় যাতে নিয়ন্ত্রণ করা চায়। মেসি মাঠে নামামাত্র সেই প্রথম বিশ্ব রূপান্তরিত হল তৃতীয় বিশ্বে।
গোটা এক ঘণ্টার প্র্যাকটিসে মেসি বলে হালকা পুশ ছাড়া কিছু করলেন না। এত লোক উপচে পড়ে এসেছে। সবাই চাইছিল দু’দিকের বারপোস্টে অন্তত একটা বাঁ পায়ের শট নিন। কিন্তু তিনি যেন এদিন পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় ছিলেন। মাঠ ছেড়ে বাকি টিম বাসে উঠে গেল। মেসি আটকে ভক্তদের দাবিতে। সেলফি নয়। এরা অটোগ্রাফ চায়। আর চেঁচিয়েই চলেছে, ‘মেসি, মেসি’। যার মধ্যে রাশিয়ার অনুর্ধ্ব চোদ্দো ফুটবলারদের ঝাঁক। দেখেটেখে মনে হচ্ছিল রাশিয়া নয়। এটা বার্সিলোনা। এত কাছে তো রোনাল্ডোরও রুশি আস্তানা। কিন্তু সেখানে এর অর্ধেক ভিড়ও আছে?
রাশিয়ায় এ বার মেসিম্যানিয়া কী পর্যায়ে যাবে তার প্রোমো বোধহয় এ দিন দেখে ফেললাম।
ব্রনিৎসি, ১২ জুন
মারাদোনায় মেসি রুষ্ট নাকি ফ্রিকিক দেখানো নিয়ে
মস্কো থেকে ৬০ কিলোমিটার উজিয়ে ব্রনিৎসি নামক রাশিয়ার মফস্বল শহরে পৌঁছে যে খবর পেলাম, তা অবাক করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।
বিশ্ব ফুটবলের দুই মহানায়ক দিয়েগো মারাদোনা এবং লিওনেল মেসির গত কয়েক বছরের টেনশনের পিছনে নাকি আট বছর আগের আপাত নির্দোষ এক কথোপকথন। যা ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের সময়।
মারাদোনা এখন আর্জেন্টিনা ছেড়ে দুবাইয়ে থাকেন বলে কিনা জানি না। তবে এ বার দেখলাম দেশজ মিডিয়ার মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যরকম হ্রাস পেয়েছে। গত ব্রাজিল বিশ্বকাপের সময়ও যাঁদের দেখেছি দিয়েগো বলতে অজ্ঞান। মেসি আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীতও ঠিক করে গাইতে পারেন না জাতীয় অবজ্ঞায় মশগুল থাকতে, তাঁদের মুখে এ বার শুনছি উল্টো সুর।
এমন নয় যে এঁরা মেসি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। বরঞ্চ এঁদের সঙ্গে মেসির প্রায় কোনও যোগাযোগ নেই। আর্জেন্টিনীয় বেসক্যাম্পে গোটা দশ-বারো সাংবাদিকের সঙ্গে আলোচনায় যা বার হয়ে এল, তাতে ঝরে পড়ছে মারাদোনার প্রতি অসন্তাোষ। ষাট-সত্তর জনের আর্জেন্টিনীয় মিডিয়া কন্টিনজেন্ট দেখলাম বেস ক্যাম্পে। এঁদের তিন-চারজনের বেশি ইংরেজি জানেন না। যার একজন আর্জেন্টিনা থেকে আসা ফক্স স্পোর্টসের প্রোডিউসর। নিজের মোবাইল বার করে তাঁকে দেখাচ্ছিলাম, মাসখানেক আগে দমদম বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মীর সঙ্গে পানীয়র নেশায় মশগুল মারাদোনার তর্কাতর্কি।
ভদ্রলোক দ্রুত মোবাইলটা নিয়ে গেলেন স্বদেশীয়দের ছোট্ট ভিড়ের কাছে। ”দ্যাখো, দিয়েগো কলকাতাতেও কী করে এসেছে।” বাকিরা যা বললেন, তার ভাবানুবাদ ঠাওর করতে পারলাম— ওর কাছে এটাই প্রত্যাশিত।
মেসি কি তাঁদের এখন বেশি কাছের? জবাব এল, ”ওর সঙ্গে তেমন আবেগঘন সম্পর্কই তৈরি হয়নি যা দিয়েগোর সঙ্গে আমাদের কারও কারও ছিল। কিন্তু মানুষ হিসেবে লিও অনেক নির্ভরযোগ্য। আর ফেয়ার।”
একটা সময় মারাদোনা-মেসি দারুণ সম্পর্ক ছিল। সেটা ভেঙে যাওয়ার কারণ কি পারস্পরিক ইগো? মেসি কি মেনে নিতে পারেন না দিয়েগো দেশকে বিশ্বকাপ দিয়েছে, আমি আজও পারিনি?
রিপোর্টাররা বললেন, ”ঠিক উল্টো। এটা দিয়েগো ক্রমাগত প্রচার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। একবারও বলছে না ওর কী টিম ছিল আর মেসি কী পেয়েছে? ব্রাজিল বিশ্বকাপে তবু আমাদের জাবালেতা ছিল ডিফেন্সে। গোলে রোমেরো। এ বারের ডিফেন্সটা সোনার খনি। থার্ড গোলকিপার সম্ভবত খেলবে। দিয়েগো কি একবারও বলছে এই টিম নিয়ে বিশ্বকাপ না দিতে পারলেও মেসি মেসি থাকবে? উল্টে নানা স্টেটমেন্টে ওর ওপর চাপ বাড়িয়ে যাচ্ছে।”
আশ্চর্য লাগল মারাদোনা বনাম মেসি বিতর্কে দিয়োগোর চিরকালীন সমর্থক সের্জিও লেভেনেস্কিকে উল্টো দিকে চলে যেতে দেখে। লেভেনেস্কি মনে করেন, যত সময় যাচ্ছে তত মারাদোনা প্রতি পদক্ষেপে দেখাতে চাইছেন, মেসি হলেন আর্জেন্টিনার ঈশ্বর। আর তিনি ফুটবলের। কলকাতায় যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো বলছেন তিনি সর্বকালের সেরা। দিয়েগো, তিনি কী মনে করেন? মারাদোনা তখন শরীর কাঁপানো অট্টহাসিতে বলেছিলেন, ”ওই রোনাল্ডো না কী, আগে লিওকে হারাক, তারপর তো আমি।”
এই উত্তরেও আপত্তি রয়েছে আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিককুলের। এর মানে কি বোঝাতে চাইছ তুমি এক, মেসি দুই? এই বিচারটা তুমি করার কে?
বার্সিলোনা থেকে জনৈক স্প্যানিশ সাংবাদিক এখানে এসেছেন। ঘোর মেসি ভক্ত। মনে হল, তাঁকে ব্যক্তিগত ভাবে চেনেনও। এ দিন আর্জেন্টিনা টিমের প্র্যাকটিসের ফাঁকে সেই সাংবাদিক বললেন, ”মারাদোনা গত বছর বলেছে আর্জেন্টিনা মানে মাসচেরানো আর দশ জন। কী বলতে চাইছে মেসি দশ জনের একজন? এটা লিও মোটেও ভাল ভাবে নেয়নি।”
আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিকদের মতে অবশ্য মূল মন কষাকষির শুরু ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানি ম্যাচের আগের দিন প্র্যাকটিসে। যে দিন হঠাৎ করে মারাদোনো মাঠের মধ্যে মেসিকে ডাকিয়ে তাঁকে ফ্রিকিক মারার ট্রেনিং দেওয়া শুরু করেন। এতে নাকি টিম হকচকিয়ে যায়। সেট পিসে তত দিনে মেসি বিশ্বসেরা। হয়তো আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরা। তাঁকে কোচ ফ্রিকিক মারা শেখাবেন কেন? তা-ও এত হাঁকডাক করে।
তখনই মেসি ঘনিষ্ঠ কোনও কোনও প্লেয়ার তাঁকে বোঝানো শুরু করে, দিয়েগো দেখাতে চাইছে তুমি যত বড় হও না কেন, দিনের শেষে ছাত্র। শিক্ষক হল ও। এর পরে সম্পর্কটা ক্রমশ আরও অবনতির দিকে যেতে থাকে মারাদোনার নানা মন্তব্যে। তাই ব্রাজিল বিশ্বকাপ চলাকালীন মেসি একবারও টিমকে উদ্দীপ্ত করার জন্য মারাদোনাকে আমন্ত্রণ জানাননি। এমনকী ফাইনালের আগেও ডাকেননি। রিও-তে মারাদোনা থাকা সত্ত্বেও। এর পর নিজের বিয়েতেও ডাকেননি।
এ বার দেখার রাশিয়া বিশ্বকাপ এই মন কষাকষিকে নতুন কোন মোড়ে নিয়ে ফেলে?
ব্রনিৎসি, ১২ জুন
