ব্রাজিল ২০১৪ – ৯
‘হায়, আমাদের মতো এদের গ্যারিঞ্চা নেই’
নেইমার দ্য সিলভার অবর্তমানে জার্মানির সামনে কম্পিত ব্রাজিল নানা ভাবে উৎসাহ-তরঙ্গ খুঁজছে। রোববার রাতে যেমন গোটা টিমকে
স্কোলারি লাস ভেগাসে হওয়া আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ দেখালেন। তার মিডলওয়েট ফাইনালে ব্রাজিলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রচণ্ড লড়েও উইম্বলডনে ফেডেরারের মতোই পাঁচ রাউন্ডে হেরে গেলেন। কিন্তু গোটা টিম বড় স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে সুদূর তেরেসোপলিস বেসক্যাম্প থেকে উৎসাহ দিয়ে গেল। জুলিও সিজার তো একবার প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে বড় স্ক্রিনের ঘুঁষি মেরে বসেন। রাতে পুরনো বিশ্বকাপ ভিডিও-ও দেখানো হল দলকে। আশ্চর্য লাগছে ব্রাজিলীয় কোচ উদ্দীপনার সবচেয়ে সহজ তরঙ্গ হাতের কাছে থেকেও ব্যবহার করলেন না দেখে! তিনি আমারিল্ডো তাবারেজ দ্য সিলভেরা তো থাকেন রিওতেই। এই পঁচাত্তর বছর বয়সেও যখন মারাকানায় ফ্রান্স-জার্মানি ম্যাচ দেখতে গিয়েছেন, তখন বেসক্যাম্প অবধি আসতেই পারতেন। তেরেসোপলিস তো রিও থেকে খুব দূরে নয়!
বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ফোনে তো তাঁকে ধরা গেল। কথা বলার সময়ও রয়েছে। কিন্তু বাষট্টির বিশ্বকাপে পেলের অবর্তমানে তাঁর বদলি হিসেবে নায়ক বলে যাওয়া আমারিল্ডো যে ইংরেজি বলতে পারেন না। মিলানে খেলতেন বলে ইতালিয়ান জানেন। ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশও। কিন্তু নো ইংলিশ। বিস্মিত লাগল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিছুদিন কোচিং করিয়েও তিনি ইংরেজি জানেন না দেখে! ফোন রেখে আবার নতুন করে দোভাষী খুঁজতে হল। সাও পাওলোর নামী ব্রাজিলীয় সাংবাদিক লুইস অগাস্টা সহৃদয় ভাবে অনুবাদকের কাজ করতে রাজি হলেন ল্যাপটপে নিজের কপি কম্পোজ করা ছেড়ে।
একটা করে প্রশ্ন তাঁকে ইংরেজিতে লিখে দিচ্ছি আর তিনি ফোনে ও-প্রান্তের জবাব শুনে তর্জমা করছেন। ফোনে অনেকটাই সময় দিলেন আমারিল্ডো। ভাষা সমস্যায় তার পুরো ফায়দা তোলা গেল না। কিন্তু মর্মার্থ খুব পরিষ্কার—ব্রাজিল এত ভয় পেও না…ইতিহাস থেকে উদ্দীপনা নাও…
প্রশ্ন : অদ্ভুত মিল বাষট্টির সঙ্গে। সে বার পেলে ছিলেন না। এবার নেইমার নেই। আপনি মিল পাচ্ছেন?
আমারিল্ডো : অসম্ভব মিল পাচ্ছি। অবাক হয়ে ভাবছি নিজের জীবদ্দশাতেই যে কী করে দু’টো জিনিস আগের আর পরের এ রকম মিলে যেতে পারে! এবার যেমন জার্মানিটা মরণ-বাঁচন ম্যাচ, সে বার তেমনই ছিল স্পেন! স্পেন তখনকার দারুণ টিম। আমাদের অবস্থা ভাবুন, বিশ্বের এক নম্বর প্লেয়ার পেলে টিমের বাইরে। আর স্পেনকে হারাতে না পারলে আমরা আউট। সেই ম্যাচটা ব্রাজিল তার পর ফাটিয়ে খেলে। আমরা জিতেছিলাম ৩-০। দু’টো গোল ছিল আমার। পেলের বদলি হিসেবে খুব একটা ঝোলাইনি।
প্র: ঝোলানোর কথা কী বলছেন। বাষট্টির রিপোর্ট খুললে এখনও দেখা যায় আপনি বাকি টুর্নামেন্টে পেলের অভাব বুঝতেই দেননি। এমনকী ফাইনালে ব্রাজিল ০-১ পিছিয়ে পড়ার পর আপনি গোল শোধ করেছিলেন।
আমারিল্ডো : অবশ্যই করেছিলাম। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট তিনটে গোলই আমার। তাই এবারও কেন এত মুষড়ে পড়ছে জানি না। আমি তো মাঠে বসে সে দিন জার্মানি-ফ্রান্স ম্যাচ দেখেছি। আমার মোটেই এই জার্মানিকে অতীতের সুপার-জার্মান টিমগুলোর মতো লাগেনি। এদের অনেক ফাঁক-ঢাক আছে। আমার তো মনে হয় আমরা যদি পেলে ছাড়া কাপ জিততে পারি, এরাও নেইমার ছাড়া ফাইনাল ওঠার ক্ষমতা রাখে।
প্র: নেইমার এখনও জেদ করছেন ব্রাজিল ফাইনাল গেলে একটা অসম্ভব চেষ্টা করবেন। তাঁর শিরদাঁড়ার ব্যথা নাকি ওষুধে খানিকটা কমেছে।
আমারিল্ডো : পাগলামি হচ্ছে নাকি? ও নামলে তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যে আবার একটা মারবে। বিশ্বকাপে দ্রুততম প্লেয়ার হিসেবে মাঠ থেকে উঠে আসতে হবে।
প্র: তা হলে টিম কী ভাবে পরিকল্পনা করবে?
আমারিল্ডো : প্রথমত উইলিয়ান যদি নেইমারের পরিবর্ত খেলে বা যে-ই খেলুক, তাকে আমি বলব, তোমার সবচেয়ে সুবিধে হবে জার্মানি জানে না তুমি কী? ওরা পুরোটাই নেইমার ভেবে এতদিনকার ব্রাজিলকে দেখেছে। এই বিশ্বকাপে সব ক’টা টিমই জেনে এসেছে নেইমারকে আটকে দিলেই ব্রাজিল ফরোয়ার্ড লাইন শেষ। কালকে সেটা হঠাৎই বদলাচ্ছে। বিপক্ষ জানেই না ব্রাজিল কী ভাবে আক্রমণে যাবে? এটা একটা বড় সুবিধে। উইলিয়ান, মনের জোর রাখো! জার্মানি এমন কিছু নয়। এদের চেয়ে ঢের ভাল জার্মান টিম আমি আগে দেখেছি।
প্র: সে বার পেলে বসে যাওয়াটা আপনারা মানসিক ভাবে সামলেছিলেন কী ভাবে? কোচ কোনও ভাষণ-টাষণ দিয়েছিলেন? সে যুগে তো মনোবিদ-টিদেরও চল ছিল না?
আমারিল্ডো : না, না ও সব ছিল না। তবে আমাদের টিমটা অনেক বেটার ছিল। কী কী সব প্লেয়ার ছিল। ডিডি, ভাভা, গ্যারিঞ্চা। উফ গ্যারিঞ্চা! বোতাফোগোয় আমরা একসঙ্গে খেলতাম বলে ওর সঙ্গে আমার বোঝাপড়াটাও দারুণ ছিল।
প্র: স্পেন ম্যাচের সকালটা মনে পড়ে? বা বাষট্টির ফাইনালের দুপুর? পেলে কোনওভাবে উদ্দীপ্ত করেছিলেন?
আমারিল্ডো : মনে পড়ে না! পেলে বেচারি খুব মনমরা ছিল। এত বড় প্লেয়ার, গোটা বিশ্ব তাকে দেখবে বলে তাকিয়ে রয়েছে, আর সে-ই কিনা খেলতে পারছে না!
প্র: গ্যারিঞ্চা?
আমারিল্ডো : যখন চার দিকে দুর্ভাবনার ঢেউ—গ্যারিঞ্চা গিয়ে কোচকে বলেছিল, এত ভাববেন না। খেলার কি বাঁশি এখনও বেজেছে? মাঠে যাইনি তো আমরা এখনও। আর আমাকে ডেকে বলেছিল, এত কথা কীসের রে। যা তো ঘরগুলো দেখে আয়, আমাদের এগারো জন আছে কি না? এগারো থাকলেই চলবে! তার পর কী খেলাটাই না খেলেছিল।
হ্যাঁ, এটা আমি স্বীকার করতে বাধ্য সেই যুগের সঙ্গে একটাই তফাত। নেইমারের না থাকা ঢাকতে এই টিমটায় কোনও গ্যারিঞ্চা নেই।
বেলো হরাইজন্তে, ৮ জুলাই
সাত গোলের লজ্জায় জ্বলে উঠল আগুন
হলুদের মহাসমুদ্র মনে হচ্ছিল এস্তাদিও মিনেইরোকে। খেলা সাতাশ-আঠাশ মিনিট গড়াতে না গড়াতে সেই সমুদ্রের কোনায় কোনায় দেখা গেল পলি
পড়ে গিয়েছে। আসলে তখনই ০-৫ হয়ে গিয়েছে। আর সেই মর্মবেদনা সহ্য করতে না পেরে শত শত হলুদ জার্সি তখনই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন!
মারাকানায় চৌষট্টি বছর আগের ক্ষতকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল মারাকানাজো। মারাকানার মর্মভেদী আঘাত। মঙ্গলবারের বেলো হরাইজন্তের কালো সন্ধেকে কী বলা হবে? মিনেইরোজো?
কিছু ভাবাই যাচ্ছে না! উনিশশো পঞ্চাশের ম্যাচটায় তো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবল হয়েছিল। প্রথমে এগিয়েও ব্রাজিল হেরেছিল ১-২। আজকেরটা তো হার নয়। পেলে-সহ ব্রাজিলীয় ফুটবলের একরাশ মহারথীর সামনে ব্রাজিল ফুটবলের বস্ত্রহরণ। ব্রাজিলে ফুটবল খেলার প্রতিষ্ঠা মোহনবাগান ক্লাব জন্ম নেওয়ার ঠিক পাঁচ বছর বাদে ১৮৯৪-এ। তা একশো কুড়ি বছরের ফুটবল-ইতিহাসে এত বড় লজ্জার দিন আসেনি! বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের ইতিহাসে এত গোল আর কোনও টিমকে হজম করতে হয়নি! সময়-সময় মনে হচ্ছিল ভারত বুঝি খেলছে জার্মানির সঙ্গে!
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্রাজিলীয় কোচের মনোভাব। টিম নিঃশেষিত। বন্যার মতো জার্মান আক্রমণ উঠছে দেখেও তিনি স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইলেন। ০-৫ পিছিয়েও টিম একটাও প্লেয়ার বদলায় না, কেউ দুঃস্বপ্নেও কখনও দেখেছে! এ দিনের বিহ্বল করে দেওয়া ব্রাজিল সেটাই দেখাল!
অবিশ্বাস্য যেমন ফলটা, তেমনই অবিশ্বাস্য গোল হওয়ার ভঙ্গিগুলো। বিশ্ব ক্লাব পর্যায়েও এখন পাঁচ-ছয় গোল হয়েই থাকে। বায়ার্ন থেকে রিয়াল— সবাই গোল খায়। কিন্তু ব্রাজিল যে ভঙ্গিতে খেল, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন অসহায়তা কোনও সুপার-পাওয়ার কখনও দেখিয়েছে কি না সন্দেহ।
প্রথম গোল কর্নার থেকে ফাঁকায় দাঁড়ানো টমাস মুলার হাল্কা ভলিতে করে গেলেন! আচ্ছা টমাস মুলার যদি এমনি কারও নাম হয়, আর সে ফুটবল খেলে তা হলেও লোকে সম্ভ্রমে তাকে মার্ক করবে। আর ইনি তো আসল টমাস মুলার! তাঁকে কেউ কর্নার হওয়ার সময় ফাঁকা ছেড়ে দেয়?
এরপর মিরোস্লাভ ক্লোসে যখন তাঁর বিশ্বরেকর্ডটা করে গেলেন, তাঁর আশেপাশে অন্তত তিনটে হলুদ জার্সি। তাতেও তিনি শটের সুযোগ পেলেন। সেটা জুলিও সিজার আটকালেন। আবার ফিরতি বলে ক্লোজে মেরে দিলেন। সেই যে দু’গোল হয়ে গেল, তার পর থেকে এটা যে বিশ্বকাপ ম্যাচ হচ্ছে বোঝার কোনও উপায় ছিল না। ল্যাপটপে কম্পোজ করতে করতেও ভাবছি, কেউ কোনও মাদক-টাদক খাইয়ে দেননি তো? সত্যিই ব্রাজিলকে দেখলাম প্রেসবক্সের সামনের দিকের পোস্টে পাঁচ গোল খেতে? ব্রাজিল তো, যারা ১১ থেকে ২৯ মিনিটের মধ্যে পাঁচ গোল খেয়ে গেল?
ব্রাজিল দেশের মাঠে উনচল্লিশ বছর পর প্রথম কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ হারল, এটা তো একটা হিসেব। আসল হিসেব হল, বিশ্বকাপের চুরাশি বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ফল এ দিন ঘটে গেল! ফ্লেড বলেছিলেন, এ বার দেশবাসীর মারাকানায় ঘা মুছিয়ে দেবেন। তা তাঁরা এমন ফুটবল খেললেন যে, আধুনিক ব্রাজিলীয় প্রজন্মেরও নতুন ঘা হয়ে গেল। তারা যত দিন বাঁচবে, জার্মানদের কাছে হেনস্থা হওয়ার এই মলিন ইতিহাস নিয়ে বাকি জীবন কাটাবে।
খেলা শুরুর আগে দুই বিশ্ববিখ্যাত কোচের সঙ্গে মিডিয়া সেন্টারে দেখা হল। আর্সেন ওয়েঙ্গার আর বোরা মিলুটেনোভিচ। ম্যাচে কী হবে? দু’জনের কেউই পূর্বাভাসে গেলেন না। ”জমবে খুব,” বলে ওয়েঙ্গার চলে গেলেন টিভি বক্সের দিকে।
গোটা পৃথিবীও তাই জানত, যে-ই হারুক, যে-ই জিতুক, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হবে। নেইমারের জার্সি নিয়ে মাঠে এসেছে গোটা টিম। বাসে নেইমার লেখা ফেট্টি বেঁধে সবাই নামছে। খেলার আগে দি’স্তেফানোর মতো বড় ফুটবলারের প্রয়াণে এক মিনিট নীরবতা পালনের ব্যবস্থা নেই। অথচ নেইমারের দশ নম্বর জার্সি হাতে নিয়ে দাভিদ লুই জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়িয়ে।
এমন বল্গাহীন আবেগ কে কোথায় বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে দেখেছে। আর এই অতিরিক্ত আবেগেই ব্রাজিল ধ্বংস হয়ে গেল কি না, এ বার তার ময়নাতদন্ত বহু বছর চলবে। বিশ্বকাপ পাওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার ২৮ মিনিটে পাঁচ গোল খেতে পারে, জীবনে কেউ ভেবেছে?
সবচেয়ে আশ্চর্য আবার লাগছে, গোলগুলো হওয়ার ভঙ্গিতে। নিজেদের মধ্যে ছ’টা-সাতটা পাস খেলে বিপক্ষ চলে যাচ্ছে। বিনা বাধায় গোল করে আসছে। আর হলুদ জার্সি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। দাভিদ লুই গোটা টুর্নামেন্ট এত ভাল খেলে ব্রাজিলীয় ফুটবলের সবচেয়ে নারকীয় ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেন! স্কোলারির তো চাকরি যাবেই। লুইকে জনতা কীভাবে আগামী ক’দিন নেয়, সেটা দেখার।
দাঁতেকে নেওয়া হয়েছিল বুন্দেশলিগার অভিজ্ঞতার জন্য। তাঁকে একটা ট্যাকলেও পাওয়া যায়নি। মার্সেলো ওভারল্যাপেই থাকছিলেন যেন ডিফেন্স করাটা তাঁর কাজের মধ্যে পড়ে না। ফার্নান্দিনহো দু’টো গোল খাওয়ালেন। আর এত সব যখন হচ্ছে, দাভিদ লুই ডুবন্ত জাহাজ ছেড়ে দেওয়া ক্যাপ্টেনের মতো হঠাৎ ম্যাচ থেকে হারিয়ে গেলেন। মাঝমাঠে যে কোনও মার্কার নেই। ফ্রেড যে অচল, প্রথম ম্যাচ থেকে আন্তর্জাতিক মিডিয়া লিখছে। স্কোলারি কর্ণপাত করেননি। ঐতিহাসিক এত বড় মাসুল তাই তাঁকে দিয়ে যেতে হল। যত দিন বাঁচবেন, সাত গোল খাওয়া জুলিও সিজার আর তাঁকে দিয়ে যেতে হবে!
ব্রাজিলীয় সমর্থকেরা অতুলনীয়। যাঁরা বেরিয়ে গেলেন, বেরিয়ে গেলেন। বাকিরা ০-৫-এর পরেও চিৎকার করে যাচ্ছিলেন ব্রাজিল, ব্রাজিল বলে। জার্মানি ছয় গোল করে ফেলার পর প্রথম দেখলাম তাঁদেরও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেতে। ব্রাজিল ফুটবলে শতাব্দীর কালো সন্ধে চলাকালীন স্কোলারি অবশেষে তিনটে পরিবর্তন করেছেন। তাতে কাজের মধ্যে ম্যানুয়েল নয়্যারকে ওয়ান টু ওয়ানে দু’টো দারুণ গোল বাঁচাতে হল, ওই অবধি।
ব্রাজিলের পরবর্তী প্রজন্ম যখন চিরদিন অবিশ্বাসীর মতো এই সাত গোলের ম্যাচের দিকে তাকাবে, তখন তারা হয়তো বুঝতেও চাইবে না ম্যাচের শুরুতে আক্রমণ করছিল ব্রাজিলই। একটা কর্নারও দ্বিতীয় মিনিটে জোগাড় করেছিল। কিন্তু জেরোম বোয়াতেংয়ের নেতৃত্বে এমন অসাধারণ জার্মানদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে ঠিক শাটার টেনে দিতে পারে। আর ডিফেন্ডাররা কখনও প্যারালাল লাইনে যায় না!
বোয়াতেংয়ের নাম গোলকারীদের তালিকায় নেই। কিন্তু কেউ জানে না প্রথম দশ মিনিটে ব্রাজিল গোল পেয়ে গেলে অন্তত কিছুটা লড়াই হত কি না?
মারাকানাও ব্রাজিলের ফুটবল জীবনে এত অভিশাপ বয়ে আনেনি যা আনল এস্তাদিও মিনেইরো। যত দিন ফুটবল থাকবে, ততদিন পেলের হাজার গোল। তাদের পাঁচ বারের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি এই সাত গোলের লজ্জাটাও থাকবে! বেরোনোর মুখে এক স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে দেখা হল। যে ম্লান মুখে কাঁদছে আর বলছে, হে ঈশ্বর সে দিন চিলিকে জিতিয়ে দিলে না কেন!
পুনশ্চ : গ্যালারিতে কান্নার রোল আর যেন স্বপ্নের চিতা জ্বলছে! দাভিদ লুই এই বেরিয়ে যাচ্ছেন কাঁদতে কাঁদতে একরাশ বিদ্রুপের মধ্যে। অস্কারের নব্বই মিনিটে করা ১-৭-এ কোনও প্রলেপ পড়েনি। টিভিতে শুনছি, অ্যালান শিয়েরার বলছেন, ”এই টিমটা বাকি জীবন এর থেকে কী ভাবে উঠে দাঁড়াবে জানি না!”
বেলো হরাইজন্তে, ৯ জুলাই
যতদিন বাঁচব পৈশাচিক হারের দায় নিয়ে বাঁচতে হবে
খুব করুণভাবে ১-৭ পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বলে গেলেন লুই ফিলিপ স্কোলারি! সেই বাজখাঁই গলা আর সাংবাদিকদের ওপর চোটপাট
আজ আর নেই। চুপচাপ বসে পরের পর প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছেন আর একাধিক বার বলছেন, বিপর্যয়ের সব দায় আমার! ইঙ্গিত পাওয়া গেল শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ হয়ে গেলে তিনি পদত্যাগ করবেন।
প্র: হে ফিলিপাও, ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে লজ্জাকর হারের পর সমর্থকদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?
স্কোলারি : ওঁদের উদ্দেশে আমি এটুকুই বলব, আমরা আমাদের সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমরা ততটাই করতে পেরেছি যতটা আমাদের সাধ্যে কুলিয়েছে। গণ্ডগোল হয়ে গেল মাঝের ওই সাত-আট মিনিটে। জার্মানি ওই সময় তিন গোল করে দিল! আমি ফ্যানদের বলতে চাই যে পাঁচ-ছয় গোল হয়ে যাওয়ার পরেও আপনারা যে ভাবে আমাদের সমর্থন করছিলেন দেখে অবিশ্বাস্য লেগেছে! মার্জনা করবেন, আপনাদের এত ভালবাসার যোগ্য সমাদর না করে আমরা বরং বদনামের কালো পোঁচ মাখিয়ে দিলাম দেশবাসীর মুখে! তাঁদের কাছে শেষ আবেদন, তৃতীয় স্থানের জন্য এ বার আমরা শনিবার ব্রাসিলিয়ায় লড়ব। এই ম্যাচটায় অনুগ্রহ করে সঙ্গে থাকুন।
প্র: এই জাতীয় বিপর্যয়ের জন্য কে দায়ী?
স্কোলারি : কোচ যখন প্লেয়ার ঠিক করেছে। ট্যাকটিক্স ঠিক করেছে তখন আমিই দায়ী। আমাকেই দায়িত্ব নিতে হবে।
প্র: পরপর ম্যাচেই তো আমাদের টিম খারাপ খেলছিল। মেক্সিকো আমরা জিতিনি। আজ জঘন্য খেলে উড়ে গেলাম। আপনার কি মনে হয় টুর্নামেন্ট জুড়েই আমাদের ট্যাকটিক্স ভুলভাল ছিল?
স্কোলারি : আমি মনে করি না। আমরা চিলি বা কলম্বিয়ার মতো বিপজ্জনক টিমের সঙ্গে যথেষ্ট ভাল খেলেছি। কী যে হল। প্লেয়াররা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। আমাদের গণ্ডগোল হয়ে গেল আজকের ওই এগারো মিনিট মতো। একটা আতঙ্ক হঠাৎ তৈরি হয়ে গেল! এটা মোটেও স্বাভাবিক নয়! রোজ রোজ ঘটে না। কিন্তু আজ ঘটল। আমাকে খেলার পর জার্মান ফুটবলাররা বলছিল, ওরাও ভাবতে পারেনি এমন কিছু ঘটতে পারে!
প্র: স্কোলারি, ২০০২ সালে আপনি দেশকে বিশ্বকাপ দিয়েছিলেন। আর ২০১৪-এ দিলেন ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজ্জা।
ব্রাজিলের কাছে আপনার কি অনেক ঋণ হয়ে গেল না?
স্কোলারি : না, ঋণ হতে যাবে কেন? আমি কোচ হিসেবে নিজের কাজ করেছি। যথাসাধ্য করেছি। গত দেড় বছর ধরে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ বাদ দিয়ে ব্রাজিল কারও কাছেই হারেনি। সেখান থেকে এত বড় থাপ্পড়! ভাবাই যায় না। তবে ঋণ-টিন হতে যাবে কেন?
আর একটা কথা বন্ধুদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আমাদের কিন্তু শনিবার একটা ম্যাচ রয়েছে। ভুলবেন না আমরা এখনও বিশ্বকাপে থার্ড হতে পারি।
প্র: এই টিম, এই প্লেয়াররা কী করে ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াবে?
স্কোলারি : কেন পারবে না? একটা ম্যাচে লজ্জাকর খেলেছি তো কী, এই তেইশ জনের টিমটার চোদ্দো-পনেরো জনই পরের ওয়ার্ল্ড কাপে ব্রাজিলের হয়ে খেলবে। হ্যাঁ, সর্বকালের নিকৃষ্টতম হার তো নিশ্চয়ই! কিন্তু তাকে তো সামলানোর একটা চেষ্টা করতে হবে।
প্র: আপনি কি হারের দায়িত্ব নিয়ে অব্যাহতি চাইবেন? না এর পরেও চালিয়ে যাবেন?
স্কোলারি : এটা নিয়ে আলোচনার সময় এখনও আসেনি। শনিবারের খেলাটা আগে শেষ হোক! কোচ যখন সব সিদ্ধান্তের একক কর্তা, তখন দায়ভারটাও তাকে একক ভাবে নিতে হবে।
প্র: প্রথমার্ধে যখন গোলের পর গোল হচ্ছিল, তখন আপনারও ব্ল্যাক আউট হয়ে গেল কেন? কেন একটাও প্লেয়ার বদলালেন না?
স্কোলারি : কী রকম আমরা রিঅ্যাক্ট করতে পারার আগেই ঘটনাগুলো ঘটে গেল। ওই সর্বনাশা ৮-১১ মিনিটে চার গোল হয়ে গেল।
প্র: এই যে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই আপনারা বলতে শুরু করেছিলেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চাই। সেটা কি টিমের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল? সেই আগাম বলাটা কি ভুল হয়েছিল বলে এখন মনে হচ্ছে?
স্কোলারি : না, সেটা মনে হয় না। চাপ নিয়েও তো আমরা সেমিফাইনাল গিয়েছিলাম। এতগুলো ম্যাচ তো জিতেই উঠেছি! চাপের জন্য নয়। ওই এগারো মিনিটের ব্যর্থতাই সব লন্ডভন্ড করে দিল।
প্র: নেইমার থাকলে এটা ঘটত?
স্কোলারি : নেইমার থাকলেও হত। ও কী করত? নেইমার তো আর ডিফেন্ডার নয়!
প্র: আপনি কালকে প্র্যাকটিস পওলিনহোকে দিয়ে শুরু করলেন। বার্নার্ডকে আনলেন একেবারে শেষে। আমরা তাই জানতাম, পওলিনহো শুরু করবেন। আর আপনি তাঁকে টিমেই রাখেননি, এটা কী স্ট্র্যাটেজি?
স্কোলারি : ইচ্ছাকৃত রাখিনি। কারণ আপনিই (পরিচিত ব্রাজিলীয় সাংবাদিককে উদ্দেশ্য করে) আমাদের প্র্যাকটিস দেখে ব্রাজিলিয়ান টিভিতে বলেন। আর বিপক্ষ সেটা দেখে আগাম স্ট্র্যাটেজিগুলো বুঝে যায়। তাই আপনাকে ও আপনাদের চোখে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ওটা ইচ্ছাকৃত করেছিলাম।
প্র: তাতে উল্টো ফল পেলেন। তা ছাড়া নেইমার নিয়ে এই যে আপনাদের আদিখ্যেতা। জাতীয় সঙ্গীতের সময় আপনার ক্যাপ্টেন হাতে নেইমারের জার্সি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই আবেগের বাড়াবাড়িটাই কি আপনাদের ডোবাল না?
স্কোলারি : না, না ওটা কারণ না। আমরা ম্যাচে খুব সহজ কিছু ভুল করেছি আর জার্মানি এমনই গ্রেট টিম যে ওরা চারটে সুযোগ পেয়ে চারটেতেই গোল করে চলে গিয়েছে।
প্র: একটা সময় তো টিমের প্রস্তুতি ঠিকঠাক করার ব্যাপারে আপনার নামযশ ছিল। এ বারের এত বড় অ্যাক্সিডেন্টটা কেন হল?
স্কোলারি : প্রস্তুতি ভালই করেছিলাম। কী যে হল ওই এক গোল থেকে পাঁচ গোলের মাঝের সময়টা। পরবর্তী কালে টিমের সঙ্গে বসে সবাই ভাবার চেষ্টা করব, কী ঠিক ঘটে গিয়েছিল?
প্র: ব্যক্তি হিসেবে আপনার কী মনে হচ্ছে? পেশাদার জীবনের সবচেয়ে হতাশাজনক দিন?
স্কোলারি : পেশাদার জীবন কী! ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে দুঃসহ দিন! ওয়ার্স্ট মোমেন্ট। জীবনের ওয়ার্স্ট দিন!
প্র: আর কী মনে হচ্ছে আপনার?
স্কোলারি : মনে হচ্ছে, বাকি জীবন এই ১-৭ এর হাহাকারই শুধু নয়, এর দায় বুকে নিয়ে বেড়াতে হবে আমাকে। কিন্তু সেটা তো আমি জানতামই যে সব সিদ্ধান্ত যখন আমার, বেয়োনেটের প্রথম শিকারও আমাকেই হতে হবে। যদি কিছু বেচাল হয়। আর এটা তো শুধু বেচাল নয়। কেলেঙ্কারি!
বেলো হরাইজন্তে, ৯ জুলাই
ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে ‘দুর্যোগের দিনে’ও সেই মেসি-মন্ত্র জপে যাওয়া
দিয়েগো মারাদোনা এখনও ঠিক করে উঠতে পারেননি রিও থেকে বুধবার মেসির টিমকে দেখতে সাও পাওলো উড়ে যাবেন কি না?
তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এ দিন বলছিলেন, টিমের কতটা কাছে দিয়েগো এ বার যাবে, সেটা নিয়ে নানান কারণে ওর নিজেরই দ্বিধা রয়েছে। তাই মাঠে বসে মেসিদের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার টগবগে সমর্থন জানাবে কি না, দিয়েগো নিজেই জানে না। তা ছাড়া আর্জেন্তিনা এখন অবধি যা খেলেছে, তাতে দারুণ ভরসাও পাচ্ছে না।
একা মারাদোনা নন। আর্জেন্তিনা ফুটবল মহলে কথা বলে মনে হল, নেইমার বিহীন ব্রাজিল যেমন জার্মানির সামনে পড়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল! আর্জেন্তিনার মেসি সঙ্গে থেকেও ডাচদের নিয়ে মারাত্মক দুর্ভাবনা রয়েছে। গুলেরমো তোফোনি হলেন ওখানকার ফুটবল মহলের এক হর্তা-কর্তা। নিজে কোনও পদে না থেকেও সর্বময় কর্তা গ্রন্দোনাকে তিনি রিমোটে চালান! সেই তোফোনিকে মঙ্গলবার যখন ফোনে ধরলাম তিনি বুয়েনস আইরেস বিমানবন্দর থেকে ব্রাজিলগামী ফ্লাইটে ওঠার তোড়জোড় করছেন। আর্জেন্তিনা ফুটবল মহলে হাতে গোনা তিন থেকে চার জন ভাঙা-ভাঙা ইংরেজি বলতে পারেন। গোয়কোচিয়া, ড্যানিয়েল বার্তোনি, গুলেরমো তোফোনি। তা শেষোক্ত ব্যক্তি তাঁর মোবাইল থেকে বললেন, ”নেদারল্যান্ডস সামনে না পড়লেই ভাল হত। আমরা চেয়েছিলাম কোস্টারিকা। দেখে নেবেন সাও পাওলোটাই কার্যত ফাইনাল। কাল যারা জিতবে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!”
শুনে অবাকই লাগল। প্রথমত আর্জেন্তিনার এক ফুটবল-কর্তা এত খোলাখুলি তাঁদের উদ্বেগের কথা বলছেন। তা ছাড়া বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার বরাবরের গাঁট হল জার্মানি! জার্মানদের ওই বলিষ্ঠ ডিফেন্স সংগঠন আর গতিকে বরাবর ভয় পেয়েছে আর্জেন্টাইনরা। এমনকী মারাদোনারও জার্মান ডিফেন্সের বিরুদ্ধে কোনও গোল নেই। অন্য সেমিতে জার্মানি রয়েছে এই অবস্থায় নেদারল্যান্ডস নিয়ে এমন হৃদকম্প কেন!
তোফোনি ব্যাখ্যা করলেন, ”নেদারল্যান্ডস এ বারের টুর্নামেন্টে এখন অবধি সেরা টিম! ওদের সেদিন টাইব্রেকার মারাগুলো লক্ষ করেছিলেন? বদলি গোলকিপার নামানো থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা পেনাল্টি—ওদের পেশাদারিত্বের নিপুণ ছাপ।” বেলোর কাছে আর্জেন্টাইন বেসক্যাম্পেও শুনলাম বারবার একটা প্রসঙ্গ আলোচিত হচ্ছে, নেদারল্যান্ডস হল সাংঘাতিক টিম যারা এবার খুব রাগী হয়ে টুর্নামেন্টে এসেছে। রাগটা কী, না আগের বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে যাওয়ার। আর্জেন্তিনীয়দের মতে, কোনও টিম যদি এমন দলগত রাগের একটা চলমান ভিত্তিপ্রস্তর নিয়ে ঘোরে তখন তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মারাত্মক হয়ে যায়। তখন তাদের লম্বা টুর্নামেন্টেও ক্রমাগত মোটিভেশন রেখে যাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় না।
হতাশার এই আপাত-সুড়ঙ্গ থেকে বাইরে বেরোনোর সবুজ আলো অবশ্য মেসির টিমেরই কেউ কেউ তাঁদের অধিনায়ককে দিয়েছেন। বলেছেন, ”এক দিক নিয়ে আমাদের সুবিধে হবে। ওরা সুইজারল্যান্ড বা বেলজিয়াম নয়। অ্যাটাকে যখন আসবে, সবাইকে নিয়ে ওপেন আসবে। জায়গাটা কালকে বেশি পাওয়া যাবে।”
শুনে টোস্টাওয়ের কথাটা মনে পড়ে গেল। ‘হোয়াইট পেলে’ নামে নিজের সময়ে খ্যাত টোস্টাও থাকেন বেলো হরাইজন্তেয়। কাল এখানকার কাগজে নিজের কলামে তিনি লিখেছেন, ‘মেসি আর নেইমারের কথা ভাবলে আমার খারাপই লাগে। সত্তর দশকে খেললে ওরা আরও বড় স্টার হত! এখন তো ফুটবলে জায়গাই পাওয়া যায় না। তার মধ্যেই ওরা যেভাবে খেলা তৈরি করে!’
শহরের এক ফুটবল-উৎসাহী তর্জমা করে দিচ্ছিলেন পর্তুগিজ থেকে টোস্টাওয়ের কলাম। এক জায়গায় তিনি রীতিমতো বিলাপই করেছেন, এখন মিডফিল্ডে খেলার জন্য ফুটবলার লাগছে না। ভাল অ্যাথলিট সঙ্গে ফুটবল সেন্স আছে, এ রকম থাকলেই চলবে। শর্ত হল, অবিরাম গোটা মাঠ দৌড়ে ট্যাকল করে যেতে হবে আর ম্যাচ পিছু ১১ কিলোমিটার করে দৌড়োনোর স্ট্যামিনা থাকতে হবে।
এটা শুনতে শুনতে আরও মনে হচ্ছে মেসির সতীর্থরা সাও পাওলোয় এবার যে ওপেন স্পেস পাবে বলে ভরসা করছে, সেটা আদৌ পাবে? স্নাইডার, রবেন আর ফান পার্সিদের মতো ডিফেন্স কচুকাটা করা আক্রমণ এই প্রতিযোগিতায় আর্জেন্তিনা দেখেনি তো নিশ্চয়ই। এর সঙ্গে কোচ লুই ফান গলের মস্তিষ্ক। এক-এক জন কোচ এক-এক ভাবে অপারেশন মেসি সম্পন্ন করতে চেয়েছেন। এক-আধ জন সফল হয়েছেন। বেশিরভাগই হননি। হলে আর্জেন্তিনা চব্বিশ বছর পর ২০১৪-এ সেমিফাইনাল খেলত না!
মেসি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আছেন যথাসম্ভব। ডি’মারিয়াকে খোয়ানো আর্জেন্তিনা আপাতত অ্যাগেরোর প্রত্যাবর্তনী গতির দিকে তাকিয়ে। সামনে অ্যাগেরো, হিগুয়েনরা গতি তুলবেন আর একটু পিছিয়ে মার্কারের আড়ালে খেলতে চাইবেন মেসি! চলতি বিশ্বকাপে মেসি যা খেলছেন তাতে এক-এক সময় মনে হচ্ছে, হাতিবাগানের অফিস টাইমের ভিড় বাসের মধ্যেও ড্রিবল করতে করতে চলে যেতে পারবেন। মেসি রুটটাই খুব সঙ্কীর্ণ জায়গা দিয়ে যাওয়ার মতো করে যেন তৈরি!
প্রশ্ন হল, সেই এক চিলতে জায়গাটা তাঁকে বুধবারের ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বী দেবে? আর্জেন্তিনা সরকার বর্তমানে ঋণের দায়ে জর্জরিত। তাদের অর্থ উপদেষ্টা মোটেও সাও পাওলো উড়ে আসছেন না। বরং গত কাল নিউ ইয়র্ক পৌঁছেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রককে বোঝাতে যে, প্লিজ এখনই আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন না। ঋণ শোধের আরও কিছুদিন সময় দিন।
মার্কিনরা সহৃদয় হলেও হতে পারে। নেদারল্যান্ডস হবে এমন কোনও পূর্বাভাস ভবিষ্যতদ্রষ্টা হাতি নেলিও করেনি।
তা হলে আর দুর্যোগের দিনে সেই মেসি-মন্ত্র প্রাণপণ জপে যাওয়া ছাড়া নীল-সাদা জার্সির উপায় কী-ই বা খোলা থাকল!
সাও পাওলো, ৯ জুলাই
টাইব্রেকারে স্বপ্নের শেষ সিঁড়িতে মেসিরা
কে জানত একশো কুড়ি মিনিটের পর বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের চূড়ান্ত নায়ক হয়ে দেখা দেবেন সের্জিও রোমেরো! আর্জেন্তিনা গোলকিপার বিশ্বকাপের ভরা গোলকিপারদের বাজারে কোনও কলকেই পাননি। কিন্তু তাঁর টাইব্রেকারে অব্যর্থ দুটো গোল বাঁচানোই লিওনেল মেসিকে তুলে দিল বিশ্বকাপ স্বপ্নের শেষ সিঁড়িতে।
মেসি থেকে শুরু করে আর্জেন্তিনার চার জন কিকার গোল করলেন। কমলা জার্সির সেখানে দুটো পেনাস্টি চারটেতে নষ্ট। নেদারল্যান্ডস কোচ ম্যাচ পেনাল্টিতে যেতে পারে জেনেও তিন তিনটে বদলি আগেই কেন করে নিলেন? ব্রাজিলীয় ডিফেন্সের বেলো কেলেঙ্কারির মতোই ফান গলের কোচিং জীবনে প্রশ্নটা এ বার সঙ্গে ঘুরবে।
তার ঘণ্টাখানেক আগের ছবি। হেড করতে ওঠা এক আর্জেন্তিনীয় যখন চোট পেয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। মাঠে উদ্বেগের ছায়া নীল-সাদা জার্সির মধ্যে। স্ট্রেচার আনা হয়ে গিয়েছে। তখন মনে হল আর্জেন্তিনার এই এতক্ষণের উদিত সম্ভাবনাটা সাও পাওলোর কংক্রিটওয়ালা বাড়িগুলোর তলায় চাপা পড়ে গেল। তাঁর পদবির আদ্যক্ষর ‘এম’ এবং তিনি ছাড়া আজকের আর্জেন্তিনাকে রক্ষা করবে কে?
এম-এ মেসি! একদম নয়! এম-এ মাসচেরানো! আর্জেন্তিনাকে প্রথম মিনিট থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, কাল এস্তাদিও মিনেইরোর ব্রাজিলের দেখা ভয়ঙ্কর ভূতের ছবিটা একেবারেই দেখতে চায় না। আর সেই লাতিন আমেরিকান প্রকল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় যে সামনের চুল পাতলা হয়ে যাওয়া জাভিয়ের মাসচেরানো।
খেলা শুরুর ঘণ্টা দুই আগে থেকে হঠাৎ বৃষ্টি। নটিংহামে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি আজ ব্যাট করার সময় এই পরিবেশ আশা করতে পারতেন। কিন্তু ব্রাজিলে দুম করে ইংলিশ আবহাওয়া, ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর তাপমাত্রা কমে যাওয়া তো আচমকাই হয়। আজও কি তা হলে আচমকা কিছু ঘটতে যাচ্ছে?
আরও বেশি করে কি তা হলে খেলা শুরুর আগেই অ্যাডভান্টেজ কমলা-জার্সি? রবার্তো কার্লোসকে জিজ্ঞেস করায় তিনি দু’হাত নেড়ে এমন ভঙ্গি করলেন যেন আমার দেশ নেই। আমি আর কোনও কিছু নিয়ে ভাবছি না। ঠিক ছাব্বিশ দিন আগে এই এরিনা দি সাও পাওলোয় পৃথিবীতে হলুদের সর্বোচ্চ জলপ্রপাত দেখেছি। খোলা আর ঢালু গ্যালারির ওপর থেকে নীচ অবধি ব্রাজিলের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখতে হলুদ জার্সি। খেলা শুরুর আগে দি’স্তেফানোর জন্য নীরবতা পালন হলে কী হবে। মনে হচ্ছে ১-৭-এর জন্যই মৌনপালন হচ্ছে।
দ্রুত দেখা গেল আর্জেন্তিনা কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না রক্ষণ নিয়ে। দুই স্টপারের সামনে মাসচেরানোকে রাখাই শুধু নয়, ক্রমাগত তাদের ফরোয়ার্ড নীচে নামছে। এমনকী মেসিও। রবেনরা যে আগুনে গতিতে স্পেনকে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই ফাঁকা জায়গাটায় তাঁদের দিচ্ছিল না মেসির টিম! যত পারছে বল নিজেদের মধ্যে রেখে দিচ্ছে। বল নিয়ে বিপক্ষ ঘোরার আগেই কড়া ট্যাকল করছে।
সাবেয়ার এই আর্জেন্তিনাকে প্রথমার্ধে দেখে তখন মনেই হচ্ছে না যে বেলোয় কালকের রাতের পর তারা আরও আন্ডারডগ বনে গিয়েছে। টুর্নামেন্টে তখনও তাদের সেরা ম্যাচটা খেলছে এবং মেসি মোটেও একক হয়ে ফুটছেন না। বরং মনে হচ্ছে তিনি বেশ চাপের মধ্যে। দু’জনকে কাটিয়ে তিন নম্বর লোকের কাছে আটকে যাচ্ছেন। ফ্রিকিক বা কর্নারে মেসিচিতো ধার নেই।
রবেন, স্নাইডার আর ফান পার্সিরা চলতি বিশ্বকাপের সবচেয়ে তেজিয়ান ফরোয়ার্ড লাইন। জার্মানদেরও আগে। এতক্ষণ তাঁদের বলই ধরতে দিচ্ছিলেন না মাসচেরানোরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি থেকে ডাচরা প্রতি-আক্রমণে উঠতে শুরু করল। ফান পার্সি দুর্দান্ত একটা ব্যাকভলিও মেরেছিলেন। অল্পের জন্য সেটা বারের ওপর দিয়ে উড়ে গেল।
মাঠে হাজির তেষট্টি হাজার দর্শক। বাংলা কথা, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে সাত হাজার টিকিটে লোক আসেনি। অথচ ম্যাচ হিসেবে বেলো সেমিফাইনালের চেয়ে অনেক উচ্চচাঙ্গের, অনেক ট্যাকটিক্যাল। মডার্ন বিশ্ব ফুটবলে গতি এসে জমির হাহাকার কোন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে তার প্রকৃষ্ট নমুনা বুধবারের এরিনা সাও পাওলো!
শেষ মিনিটে রবেন ছ’গজে ঢুকে পড়ে অব্যর্থ গোল করতে যাচ্ছেন। স্লাইডিংয়ে বাঁচিয়ে দিয়ে গেলেন সেই মাসচেরানো। তাঁকে দেখে তখন মনে হচ্ছে জার্মানির হয়ে পুরোনো সোয়াইনস্টাইগার। ওই স্লাইডিং ট্যাকলটাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট না অতিরিক্ত সময় অন্য কিছু বলবে, তখন গভীর সাসপেন্সের মধ্যে।
ম্যাচ শেষে মেসিরা যখন ড্রেসিংরুমে ঢুকে গিয়েছেন, রোমেরোকে দেখলাম একা মাঠে দাঁড়িয়ে সমর্থকদের অভিনন্দন কুড়োচ্ছেন। আজ আসলে আন্ডারডগদের দিন। মেসি বা রবেনের মতো মহানায়কদের নয়।
সাও পাওলো, ১০ জুলাই
মারাদোনার অপমানের জবাব দিতে তৈরি টিম মেসি
রাইট অফ প্যাসেজ হল— তিন তলার বড় ঘরের চিলেকোঠা টাইপের এক চিলতে জায়গা। সেখানে একটা টেপ চলছে দুপুরেও। রোজ যেমন চলে। মারাকানা ফাইনালে ব্রাজিলের চৌষট্টি বছর আগে হেরে যাওয়ার সেই চিরজখমি ফিল্ম ক্লিপিং।
কিন্তু বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতিটা দেখা গেল একেবারে আলাদা। মুজো দো ফুবল— ব্রাজিলের সরকারি ফুটবল-জাদুঘরে যে দর্শনার্থী হয়ে ঢুকে পড়েছে একদল আর্জেন্তিনীয়। তারা জাদুঘরে এসে কর্মীদের জিজ্ঞেস করছে, রাইট অফ প্যাসেজ এতটুকু ছোট জায়গায় কী করে হবে? তা হলে বেলোর ১-৭-টা আসবে কোথায়? এদের ব্যঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে জাদুঘর কর্মীরা উত্তেজিত না হয়েই বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ওটাও আসবে। তবে পরের বছর।
সামনে একটু এগিয়ে ফ্রেমে বাঁধানো পেলের সত্তর সালের বিশ্বকাপ খেলা দশ নম্বর জার্সি। এরা বলছে মারাদোনা কোথায়? মহিলা তখনও ঠান্ডা মাথায় বোঝানোর চেষ্টা করছেন, এটা ব্রাজিলের সরকারি ফুটবল-জাদুঘর। আমরা ব্রাজিলীয় ফুটবলারদেরই এখানে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যদিও মারাদোনার স্মরণীয় সব গোলের টেপ সব সময় চলে। পাশের ঘরটায় এলেই দেখতে পাবেন। কিন্তু এরা অনড়, আরে সের্জিও রোমেরোর গ্লাভস জোড়া চেয়ে রাখুন। ফাইনাল জিতে ও না হয় এখানে পাঠিয়ে দেবে।
বিশ্বকাপ ফাইনালে দল পৌঁছে যাওয়ার পর যেন আরও অদম্য হয়ে উঠেছে ব্রাজিলে আসা মেসির দেশের সমর্থকেরা। মনে হচ্ছে আগামী ক’দিন এদের জন্য রিও আর্জেন্তিনীয় কলোনির চেহারা নেবে। ব্রাজিলীয় জাদুঘরে যে ভিড়টা পেলাম তারা কেউ কেউ এক সময় নিউ ইয়র্কে কাটানোর জন্য ইংরেজি বলতে পারেন। রোববারের ফাইনাল নিয়ে নিরন্তর আলোচনাও করে যাচ্ছেন। কিন্তু মানসিক ভাবে এরা এমন গ্রহে যে বোঝানোর চেষ্টা করাটাই বোকামি, বাকি পৃথিবী কাপ ফেভারিট হিসেবে যে জার্মানদের বাছছে!
আর্জেন রবেন যেমন ব্রাজিল বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফর্মার। কাল শেষ মুহূর্তেও মাসচেরানোর স্লাইডিং ট্যাকলটা না হলে গোল করে দিচ্ছিলেন। ম্যাচটা অতিরিক্ত সময়ে যেতই না। টাইব্রেকার তো দূরের কথা। তা রবেন মনে করেন, ফাইনালে মেসিদের কোনও আশা নেই। অবিসংবাদী জার্মানি। স্লাইডারেরও খুব অসহ্য লেগেছে কালকের আর্জেন্তিনীয় ট্যাকটিক্স। পেনাল্টি মিস করে আরও বেশি খাপ্পা তিনি অভিযোগ করেছেন, জেতার চেষ্টা না করে আর্জেন্তিনা ম্যাচটা টাইব্রেকারে নিয়ে যেতে বেশি উদ্যোগী ছিল। এই মনোভাব নিয়ে জার্মানদের সঙ্গে আর কত দূর যাবে?
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের অবশ্য মনে হচ্ছে, ফাইনাল যেতে না পারার চূড়ান্ত হতাশাতেই ডাচ তারকারা এ সব বলছেন। কাল ম্যাচে অনেক বেশি আক্রমণ তো মেসির আর্জেন্তিনাই করেছে। তা মেসি যতই নিষ্ক্রিয় থাকুন। আর তাঁকে ছিয়াশি নয়, ক্রমাগত নব্বই বিশ্বকাপের মারাদোনা দেখাতেথাকুক। গোটা ম্যাচে ফ্রিকিক গোলকিপারের হাতে মারা আর অতিরিক্ত সময়ের আগে উদ্দীপ্ত টিম টক দেওয়া ছাড়া মেসি একটাই কাজ করেছেন। খেলার শেষ দিকে রাইট উইং থেকে অনবদ্য সেন্টার ভাসিয়েছিলেন। যেটা পনেরো গজের ভলিতে ঠিকঠাক রাখতে পারলেই গোল। ম্যাক্সি রদ্রিগেজ সেটারই টাইমিং গণ্ডগোল করে ফেলেন। এই রড্রিগেজের পেনাল্টিটাই চূড়ান্ত ৪-২ তফাত করে দেয়। ভলিটা লাগাতে পারলে তাঁকে পেনাল্টি কিকের যন্ত্রণা নিতেই হত না। আর এক বার সহজ হেড করলে গোল—ছয় গজ থেকে আর্জেন্তিনা নষ্ট করে।
টাইব্রেকারের জন্য মেসিরা যে খেলছিলেন না, তার পরিষ্কার নমুনা রয়েছে। বরং যেটা পরিষ্কার হচ্ছে না, কাল ডাচদের হয়ে প্রথম পেনাল্টি মারতে কোন দু’জন অস্বীকার করেছিলেন? তাঁদের নাম কি রবেন আর স্নাইডার? সাংবাদিক সম্মেলনে এসে এই গররাজি হওয়ার খবরটা ফাঁস করলেন স্বয়ং কোচ লুই ফান গল। কাল রাত্তিরে এরিনা সাও পাওলোয় ফান গলের সাংবাদিক সম্মেলনে থেকে অবাকই লাগছিল।
কত বড় বড় কোচ বিশ্বকাপে এসে হেরে চলে গিয়েছেন। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের নতুন কোচের মতো এত তিতকুটে মেজাজ কারও দেখিনি। ওল্ড ট্রাফোর্ডে ঢুকে পড়ার পর ব্রিটিশ মিডিয়ার সঙ্গে তাঁর কী রকম যাবে, জানি না। তবে এ দিন যা নমুনা পাওয়া গেল সেটা যদি প্রোমো হয়, তা হলে নিয়মিত স্টোরি হবে! নাম না করে টিমের দু’জন তারকা সম্পর্কে এমন সাংঘাতিক অভিযোগ হানলেন। তার পর বললেন, তৃতীয় স্থানের জন্য খেলাটা একেবারে বোকা বোকা। কোনও মানে হয় না। ওটা জোর করে আমাদের খেলানো হচ্ছে। বাধা হয়ে যাচ্ছি। এরপর আবার বলেন, সের্জিও রোমেরোকে আমিই শিখিয়েছি কী করে পেনাল্টি আটকাতে হয়। আজ সেই গুরুমারা বিদ্যেটাই দেখাল। দ্রুত প্রশ্ন হল, তা হলে কি আর্জেন্তিনার জয়ের পিছনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোচের শেখানো টেকনিক কাজ করেছে?
এ বার প্রচণ্ড চটে গেলেন ফান গল। ”অত্যন্ত নোংরা মানসিকতা নিয়ে এই প্রশ্নটা করা হল। আমি তীব্র আপত্তি জানাচ্ছি।” সাংবাদিকরা দেখেটেখে হাঁ। বায়ার্ন মিউনিখে তাঁর প্রাক্তন সহকারী মেহরুট স্কোল তো সরাসরি অভিযোগ এনে বলেছেন, ফান গলের ভুল স্ট্র্যাটেজিই নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে উঠতে দিল না। বাকি ফুটবল-বিশ্ব অনেকটাই একমত যে মেসিকে আটকানোয় সফল হয়েও তিনি ট্যাকটিক্স তৈরিতে স্বভাববিরুদ্ধ এমন কিছু ভুল করেছেন যে, কমলা জার্সির দাপটটাই ম্যাচে ছিল না। সবচেয়ে আশ্চর্যের, ম্যাচ টাইব্রেকারে যাচ্ছে দেখেও তিন নম্বর বদলিটা করে ফেললেন কেন? টিম ক্রুল তো আগের ম্যাচটাই তাঁকে টাইব্রেকারে জিতিয়েছিলেন!
জ্যাসপার সিলেসেন গোলকিপার হিসেবে যত ভালই হন না কেন, টাইব্রেকারের শরীরী ভাষাটা তাঁর নেই! টাইব্রেকারে গোলকিপারকে দস্যি হতে হবে। লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে এমন একটা বাতাবরণ তৈরি করতে হবে যে, কিকার কিক নিতে গিয়ে ভাববে, কোথা দিয়ে মারব? সব দিকই তো আটকানো। দুর্দান্ত রিফ্লেক্স নিশ্চয়ই চাই যেটা দেখিয়ে রোমেরো টিমকে ফাইনাল তুললেন। প্রথম শটটা বাঁ দিকে আর স্নাইডারের বেলা ডান দিকে ঝাঁপিয়েছিলেন। কিন্তু রোমেরোরও দাপুটে শরীরী ভাষা আছে। আর্জেন্তিনীয় পেনাল্টিগুলো চারটেই দারুণ মারা। তবু কোচ তাঁর পেনাল্টি রক্ষার সেরা স্ট্রোক বেঞ্চে রাখবেন কেন?
বেঞ্চ লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল, অ্যাঞ্জেল ডি’মারিয়াকে রিজার্ভ বেঞ্চে দেখা গেল। শুনলাম আজ বেসক্যাম্পে হালকা ট্রেনিংও তিনি করেছেন। মানে কী? ফাইনালে নামবেন নাকি? না জার্মানদের ওপর চাপ রাখছেন মেসিরা? বোঝা যাচ্ছে না। তবু এটুকু বেশ বোধগম্য যে আর্জেন্তিনা একক মেসি থেকে দলে এখন রূপান্তরিত। ডিফেন্সে দারুণ খেলছেন পাবলো জাবালেতা। কাল মুখ ফেটে রক্ত ঝরার পরেও মুখে ব্যান্ডেজ বেঁধে চালিয়ে গেলেন।
ব্রিটিশ মিডিয়া এ দিন মেসির টিমকে উজ্জীবিত করাকেই প্রচারে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু টাইব্রেকারের আগে রোমেরোকে টগবগে করে দেওয়াটা মাসচেরানোই করেন। রোমেরো গত বছর মোনোকোতে ছ’টা ম্যাচও পেয়েছেন কি না সন্দেহ। ব্রাজিল বিশ্বকাপও তাঁকে এমন কিছু আত্মবিশ্বাস দেয়নি। তিনি চাপে থাকতে পারেন বুঝে মাসচেরানো দৌড়ে যান। মাথায় মাথা ঠেকিয়ে বলে আসেন, যা বলে দিলাম তুই আগামী কয়েক মিনিটে পৃথিবীজোড়া নাম করে ফেলবি পেনাল্টি বাঁচিয়ে।
মারাকানা থেকে ৩৭৬৮ মাইল দূরবর্তী। রিও-র মতোই অসামান্য রূপসী এক শহরে ঠিক চার বছর দশ দিন আগে লাঞ্ছনাটা এসেছিল। টমাস মুলারের গোল থেকে শুরু হয়েছিল। ব্যবধান গিয়ে দাঁড়ায় ৪-০। কিন্তু রোববার মনে হচ্ছে জার্মানরা কাগজে-কলমে ফেভারিট হয়েও মাঠে অনেক বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হবে।
ওটা ছিল মেসি নামক প্রিয়তম শিষ্যনির্ভর কোচ মারাদোনার আর্জেন্তিনা!
এটা ক্যাপ্টেন মেসির আর্জেন্তিনা! টিম আর্জেন্তিনা!
রিও, ১১ জুলাই
