রাশিয়া ২০১৮ – ৩
সঙ্গীত-টঙ্গিত শেষ হয়ে আজ বিশ্বকাপ বিয়েবাড়ি
আশির দশকে ইমরান খান মাঠে নামলে মহিলাদের মুখ দিয়ে যেমন আধো সম্মতি-আধো শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিব্যক্তি বার হত,
অবিকল তাই দেখলাম স্প্যানিশ আর পর্তুগালের মহিলা রিপোর্টারদের মধ্যে। সোচি ওলিম্পিক স্টেডিয়ামে টিমমেটদের সঙ্গে প্র্যাকটিস করার সময় যখন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ড্রিবল করতে করতে হঠাৎ মাঠের ফেন্সিংয়ে দাঁড়ানো আমাদের খানিকটা কাছে চলে এলেন।
কাছে মানে অবশ্য হাতের কাছে নয়। দশ গজ দূরত্ব তো হবেই। তাতেই এই অবস্থা! অথচ তাঁরা ফুটবল সার্কিট ঘোরেন এবং রোনাল্ডোকে কাছ থেকে দেখার নিয়মিত সুযোগ পান। স্প্যানিশ মহিলা সাংবাদিক আবেগাপ্লুত ভাবে বললেন, ”কোনও কুন্ঠা না করে বলছি স্পেন জিতুক। কিন্তু রোনাল্ডোকে যেন মাথা হেঁট করে বেরিয়ে যেতে না দেখি।”
দুটো একইসঙ্গে কী করে ঘটবে প্রশ্ন করে লাভ নেই। সুপারস্টারকে ঘিরে হিস্টিরিয়ার এমনই ঘোর যার কোনও পাসওয়ার্ড হয় না। লজিক হয় না। আর বিশ্বকাপের চড়া বাজারে সিআর সেভেন যেন আরও অতিমানবীয় চেহারা নিয়েছেন। স্পেন সোচি শহরে শুধু নিজেদের ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু পাবে না। অনেক বেশি সমর্থক পাবে। তা যতই কোচ সমস্যায় কণ্টকিত থাক না কেন! কিন্তু বিষ্যুদবার দুপুরে রোনাল্ডো পা দেওয়ার পর যেন গরম আরও বেড়ে গিয়েছে!
যেটা সোচির শেষ সন্ধ্যায় আরও বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন সের্জিও র্যামোস। রোনাল্ডো যেমন সাংবাদিক সম্মেলনে আসেননি। স্পেন অধিনায়কেরও তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। বিশেষ করে এই স্পর্শকাতর সময়। কিন্তু র্যামোস শুধু এলেনই না। প্রশ্নগুলো যে ভাবে ট্যাকল করলেন তাতে মনে হল শুক্রবারের কিক অফ আজই হয়ে গিয়েছে। র্যামোসের সাংবাদিক সম্মেলন দেখার পর যেন নিশ্চিত হচ্ছি ফাটাফাটি ম্যাচ হতে যাচ্ছে।
আসলে ককটেল পার্টি শেষ হল।
ব্যাচেলার্স নাইট গেল।
সঙ্গীত হয়ে গেল এ দিন লুঝনিকিতে।
এ বার আসল বিয়েবাড়ি শুরু শুক্রবার। রুশরা যতই পাঁচ গোল দিক। ফুটবল সুপারপাওয়াদের বৃত্তে এই পাঁচ গোলের কোনও রেখাপাত নেই। ওটা সঙ্গীতই। সানাই বাজা শুরু হবে যখন ভারতীয় সময় সন্ধে আটটায় রাশিয়ান বিশ্বকাপে নেমে পড়বেন লুই সুয়ারেজ। আর রাত সাড়ে এগারোটায় ফুটবলের রাজাধিরাজ—ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। উল্টো দিকে নামবেন আরও এগারো জন যাঁদের মধ্যে নির্দিষ্ট একটা জিনিস শনাক্ত করা যায়—টিম প্লে। মারাকানায় জার্মানি জেতার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে স্টিভন জেরার্ড এমন একটা টুইট করেছিলেন, যা আজও ভোলা যায় না।
‘ব্রাজিলের আছে নেমার। পর্তুগালের আছে রোনাল্ডো। আর্জেন্টিনার আছে মেসি। জার্মানির আছে আস্ত একটা টিম।’
রোনাল্ডো প্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের এ বার ঠিক তাই রয়েছে। সের্জিও র্যামোসের নেতৃত্বে গত ২০ ম্যাচ অপরাজিত এরা আস্ত একটা টিম। রাশিয়া বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যা সব লেখালিখি হয়েছে তার বিচারে অবিসংবাদী ফেভারিট। ১৫ জুলাই লুঝনিকি ফাইনাল শুরুর এক মাস আগেই যেন পন্ডিতরা তাদের ‘মারাকানার জার্মানি-ভাবা শুরু করে দিয়েছেন। এরপর আর আনুষ্ঠানিক বিশ্বকাপ-বিয়েবাড়ি শুরু না হয়ে যায়। সুয়ারেজ গত বার বিশ্বকাপ বহিষ্কৃত হওয়ার পর যতই আত্মপ্রকাশ করুন। যতই মহম্মদ সালাহর মিশর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হোক। গ্রুপ পর্যায়ের সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল মারকাটারি ম্যাচ এটাই। বিশ্বের এক নম্বর ফুটবলার বনাম রাশিয়া বিশ্বকাপে স্বীকৃত এক নম্বর টিম। কী হতে পারে ম্যাচে? গবেষণা চলছে গত কয়েক দিন ধরে। নেট ঘেঁটে দেখছিলাম তিন রকম ফলের কথা বলা হচ্ছে।
কোচ নিয়ে মহাবিতর্ক অগ্রাহ্য করে স্পেন জিতবে ২-০।
ম্যাচে তীব্র লড়াই হয়ে স্পেন জিতবে ১-০।
১-১ ড্র হবে।
একটা পূর্বাভাসেও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নদের এগিয়ে রাখা নেই। পর্তুগাল গত ২৯ ম্যাচে মাত্র দুটো হেরেছে। ফাটিয়ে গোল করেছে বিশ্বকাপ প্রাথমিক পর্বের ম্যাচগুলোয়। যেখানে জিরো জিরো সেভেন, সরি সিআর সেভেন একাই করেছেন ১৫ গোল। তবুও আন্ডারডগ শুধু নয়, পর্তুগালকে ভয়ংকর আন্ডারডগ হিসাবে রাখা হচ্ছে।
সোচির অলিম্পিক ফিশট স্টেডিয়ামে এ দিন রোনাল্ডোকে প্রবল উৎসাহে ট্রেন করতে দেখে মনে পড়ে গেল চার বছর আগে ব্রাজিলে তাঁর অশুভ বিশ্বকাপ উদ্বোধনী মুহূর্ত। দুটোর শহরেরই আদ্যক্ষর ‘এস’ দিয়ে শুরু। এখানে সোচি। ওখানে সালভাদর। আরও মিল, আর্কিটেক্টরা পা দিলেই ডগমগ হবে। শহরে সর্বত্র এত ফাঁকা জমি।
জার্মানরা সে দিন পর্তুগাল ডিফেন্সে তেমন ফাঁকা জমিই তৈরি করেছিল। পর্তুগালের লক্ষ্য ছিল রোনাল্ডোকে উপরে রেখে মাঝমাঠ জমাট করা। কিন্তু সে দিনই জার্মানরা এমন স্ট্র্যাটেজি উপুড় করে যা ব্রাজিলের সঙ্গে বেলো হরাইজন্তের মহাকথিত সেমিফাইনালেও করবে। প্রতি আক্রমণ সামলাতে সামলাতে হঠাৎ রাইট উইংয়ে লম্বা বল বাড়ানো হবে টমাস মুলারকে। তিনি মাঝামাঝি এ বার একটা ক্রস করবেন। সেটা প্রচণ্ড গতিতে পেছন থেকে এসে হুমেলস বা বোয়াতেং কেউ রেডি করে দেবেন ক্লোজের জন্য। সে দিন পেপে দশ মিনিটের মধ্যে রেড কার্ড দেখায় রোনাল্ডো আরও চক্রব্যুহে পড়ে যান। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে দেখতে হয় মুলারের হ্যাটট্রিক। আর ওই ম্যাচের চার গোলই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ বার তিনি যেমন-তেমন নয়, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছেন। কী করে ডিঙোবেন প্রথম ম্যাচের ফাঁড়া যা গত দশ বছর ধরে পর্তুগালকে ভুগিয়ে চলেছে? পর্তুগাল মিডিয়া ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে মনে হল তাঁদের আশা এ বার সংসারে আরও রোজগেরে সদস্য এসেছে। এরা এ বার টানবে বড় দাদাকে। আন্দ্রে সিলভা আছেন। পর্যাপ্ত আশা তাঁর ওপর। আছেন বার্নার্ডো সিলভা। যাঁর ছোটখাটো চেহারা দেখলে অবাক লাগে কী করে সহ্য করেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের মারামারি? কিন্তু এ দিন প্র্যাকটিসেও দেখছিলাম দুরন্ত স্পিড, বল কন্ট্রোল আর নমনীয়তা। রোগা বলে ডাকনাম বাবলাগাম। কিন্তু পর্তুগাল সিনিয়র সাংবাদিকরা কেউ কেউ তাঁকে ‘আমাদের মেসি’ নাম দিয়েছেন। সবাই দেখছে রোনাল্ডো বনাম স্পেন। কে বলতে পারে ম্যাচটা বার্নার্ডো সিলভা বনাম ইস্কো-তে দাঁড়াবে না? গ্রুপে মরক্কো আর ইরান আছে বলে ঝুঁকি না নিয়ে দু’দল সেফ খেলবে মানতে পারছি না। বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগ এখন নকআউটের গুরুত্বই পাচ্ছে। একটা ম্যাচ হড়কালে তার খেসারত দিতে কেমন জান বেরিয়ে যায় এই দুটো টিমের চেয়ে ভাল কে জানে?
স্প্যানিশ আর্মাডাদেরও তো উদ্বোধনী ম্যাচ নিয়ে সংস্কার থাকবে। মার্চে আর্জেন্টিনা গিয়ে ফ্রেন্ডলি ম্যাচে যেমন ৬-১ জিতে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে তেমনই আগের বার ১-৫ তো হেরেওছে নেদারল্যান্ডসের কাছে। রোনাল্ডোর খোঁড়াতে খোঁড়াতে বিশ্বকাপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক ট্র্যাজিক স্মৃতি ইকের ক্যাসিয়াসের মাদ্রিদে ফিরে বিবৃতি—হে দেশবাসী আমাদের মার্জনা করবেন।
স্পেন যতই ভয়ংকর গৃহযুদ্ধে বিব্রত থাক, বিশ্বকাপ মর্যাদা লুটোতে দেবে না। দিনের শেষে কোচ তো মাঠে নেমে খেলেন না। খেলে ফুটবলাররা। রাতে সোচি মাঠে ইনিয়েস্তা-দিয়েগো কোস্তাদের যেমন হাসিমুখে ট্রেন করতে দেখলাম তাতে কোথাও মনে হল সাংসারিক রক্তারক্তি স্পেন টিমকে আরও চার্জ করে দিয়েছে।
নাকি বেশি ভেবে ফেললাম? বাইরে থেকে এরা যতই হাসিখুশি ইমেজ দেখাতে চাক, ভেতরে হয়তো ভড়কে রয়েছে। শুরুর দিকে গোছাতে সময় নেবে। আর তখনই ঝটকা দেওয়ার প্ল্যান করে রেখেছেন ফার্নান্ডো স্যান্টোস। লাগবে তো একটা বিদ্যুৎ চমক। আর সেটা তো দলেই আছে।
বলছি না বিয়েবাড়ি আজ থেকে শুরু!
সোচি, ১৫ জুন
রবি উইলিয়ামসের মাঝের আঙুল নামিয়ে দিতে মঞ্চে এ বার মেসি-নেইমার
দুপুর একটায় সোচি অলিম্পিক স্টেডিয়ামের বাইরে ভিড় দেখে আশ্চর্য লাগল। খেলা তো রাত ন-টায়। এখন লোকজন কীসের?
খেলা শুরু হতে আট ঘণ্টা, গেট খুলতে অন্তত তিন। তা-ও তাঁরা গলায়
ফ্যান আইডি কার্ড ঝুলিয়ে চলে এসেছেন। এই গরমে কাউন্টারের বাইরে এমন দীর্ঘ তিতিক্ষা ভাবাই যায় না। দুপুরের গরম এত বেশি যে, গুলিয়ে যেতে বাধ্য শারজায় ক্রিকেট কভার করতে এসেছি না কি রাশিয়ার ফুটবল? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এঁরা বেশির ভাগ স্পেন সমর্থক। কিছু এসেছেন ভেনেজুয়েলা থেকে। কেউ কেউ পেরুর। ব্রাজিলের সোচিতে বেসক্যাম্প বলেই কি না জানি না, বেশ কিছু নারী-পুরুষ ব্রাজিলীয় জার্সিতেও ঘুরছে।
মাঠের পশ্চিম প্রান্তে হুডখোলা একটা রূপোলি মার্সেডিজের সামনে বিশেষ পুলিশ গাড়ি। ফোটোগ্রাফাররা দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। এক সুন্দরী ও পাশে টুপি পরা রূপবান যুবক। এঁরা কারা? ফোটোগ্রাফার ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললেন, হলিউড। হলিউড কিন্তু কে? একটা ছবি তুলে রাখলাম। কিন্তু এখনও বুঝছি না কাদের দেখলাম? যাদবপুর অঞ্চলের যে চার তরুণের সঙ্গে মস্কো-সোচি ফ্লাইট ধরার সময় দেখা হয়েছিল তাদের ওই ভিড়ে খুঁজে পেলাম না। নিশ্চয়ই ভিড়ের মধ্যে কোথাও। দুপুর দু’টোতেই জানা হয়ে গিয়েছে যে, বিশ্বকাপের পূর্ণকুম্ভ এই শুরু হয়ে গেল। কিছু কিছু ম্যাচে আজকের উরুগুয়ে-মিশরের মতো গ্যালারি ফাঁকা থাকবে। কিন্তু টুর্নামেন্টের প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়ে গেল। আর আগামী তিন দিন তা ঘোড়ায় দম দিয়ে ছুটবে।
মস্কো থেকে ফোনে ফিফার হসপিটালটি বিভাগের কর্তা বললেন, তাঁরা এই মুহূর্তে খুব উৎফুল্ল আইসল্যান্ড সমর্থকদের নিয়ে। একে তো আইসল্যান্ডের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ। আর তা-ও কিনা লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত সবচেয়ে কম জনসংখ্যাসম্পন্ন দেশ হল আইসল্যান্ড। টালিগঞ্জ, বৈষ্ণবঘাটা আর গড়িয়া মিলিয়ে এর চেয়ে বেশি লোক বাস করে—সাড়ে তিন লাখ। সেই সাড়ে তিন লাখের দশ শতাংশ নাকি ওয়ার্ল্ড কাপ দেখতে এসেছেন। আর তার সিংহভাগটাই এই ম্যাচে। মেসির রাশিয়া আবির্ভাব ঘিরে এমনিতেই এত হাইপ যে, টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। মিডিয়া সেন্টারে অবধি এত পাসের আবেদন যে সবাই প্রেস বক্স টিকিট পাচ্ছেন না। সেখানে বরফের দেশের এত সংখ্যক সমর্থক হাজির হওয়া বিশ্বকাপ চিত্রকল্পকে আরও মনোহর করেছে। বিশ্বকাপের যখন সূচি তৈরি হয়, মেসিদের গ্রুপ লিগের প্রথম ম্যাচ নিয়মরক্ষার মনে হচ্ছিল। এখন উল্টে গবেষণা হচ্ছে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রোনাল্ডোদের ১-১ আটকে, ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দেওয়া আইসল্যান্ড মস্কো স্পার্টাক স্টেডিয়ামে অভাবনীয় কিছু ঘটাবে না তো?
রহস্য-রোমাঞ্চ গবেষণা আগামী ক’দিনে আরও বাড়বে। কারণ মেসি-র পরপর আবির্ভূত হচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি আর পরের তিন ঘণ্টায় রক্তে দোলা দেওয়া ব্রাজিল। ব্রিটিশ মিডিয়া এ দিন সকাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার টিম কেহিলকে নিয়ে খুব পড়েছে। ব্র্যাডম্যানের দেশের বিশ্বকাপ অভিযান মেসিদের দু’ঘণ্টা আগে শুরু। কাজানে সামনে ফ্রান্স। যাদের সামনে এ বারে পড়া মানে স্টিভ ওয়র অস্ট্রেলিয়াকে পারথে খেলা! সে দিন যদি না হয়, টিম কেহিলের সামনে আরও দু’টো সুযোগ থাকছে। গ্রুপ লিগ থেকে যদি অস্ট্রেলিয়া না-ও ওঠে, এই তিনটে ম্যাচের একটায় গোল করতে পারলেই তিনি পেলের সঙ্গে একটা কৃতিত্বে যুগ্ম হবেন। চারটে বিশ্বকাপ খেলে চারটেতেই গোল আছে পেলের। কেহিলের এখনও অবধি তিনটেয়।
কিন্তু এটা একান্তই ব্যক্তিগত সিলমোহর এবং টুর্নামেন্টের সার্বিক ওয়াইফাইতে নেটওয়ার্ক ধরা পড়বে বলে মনে হয় না। সিগন্যালে আসা ভাল ম্যাচ আর মানুষগুলো বললাম তো। রস্তভ মাঠে রোববার ব্রাজিল। মস্কোতে জার্মানি। আর মেসি-রোনাল্ডো তো থাকলেনই ফুটবল সাংবাদিককে মুহূর্তের নিষ্কৃতি না দেওয়ার জন্য। তাঁরা জিতলে খবর। হারলেও খবর। মেসি-রোনাল্ডো-নেইমার এই তিনটে আইটেম পরপর পাতে পড়ে হয়তো বিশ্বকাপের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সমালোচনা চাপা পড়বে।
জিওফ্রে বয়কট হলে নিশ্চয়ই লিখতেন ‘রুবিশ’। আর তাঁর দেশের প্রবাদপ্রতিম ফুটবলার বলেছেন ‘রাবিশ’। তাঁর নাম গ্যারি লিনেকার। লিনেকার দেখলাম টুইট করেছেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধন অনুষ্ঠান যেমন রাবিশ হয়, তেমনই।’ বাকিরা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক।
সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে রবি উইলিয়ামসের পনেরো মিনিটের পারফরম্যান্সের মধ্যে একবার বাঁ হাতের মধ্যমা তুলে দেখানোর জন্য। এই রাশিয়া জোসেফ স্ট্যালিনের নয়। ভ্লাদিমির পুতিনের। কিন্তু সেখানেও এমন প্রকাশ্য অঙ্গভঙ্গী অমার্জনীয়। দেশের আইনে সাজা অবধি হতে পারে।
মস্কোয় বসবাসকারী এক উত্তর ভারতীয়র মুখে শুনছিলাম, কমিউনিস্ট আমলে কী জাতীয় সেন্সরশিপ এখানে চলত। তাঁদের পরিবার ১৯৮৪ সালে মার্কিন দেশ থেকে মাইকেল জ্যাকসনের কিছু ভিডিও ক্যাসেট এনেছিল। বিমানবন্দরেই সেগুলো বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। একই ভাবে রাশিয়ান নাগরিক ডিউটি ফ্রি থেকে স্কচ হুইস্কি কিনতে পারতেন না। রাশিয়ান মানে দেশে যা তৈরি হবে, তাই নিয়ে থাকবে। রাশিয়ান ভদকা আর বিয়ার। বিদেশিদেরও স্কচ কিনতে হলে পারমিট নিয়ে বিশেষ দোকানে যেতে হত। রাশিয়া ক্রমে অবগুণ্ঠন খুলেছে। তা বলে এতটা নয় যে, জাঁকজমকপূর্ণ এবং সারা বিশ্বে প্রচারিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হলিউডি গায়ক মধ্য আঙুল তুলে ছাড় পেয়ে যাবে! ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী যারা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে, সেই ফক্স চ্যানেলের পক্ষ থেকে দর্শকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বল মাঠে পড়লে এই বিতর্কের ঢেউ কৃষ্ণসাগর বা ভলগা নদীতে গিয়ে পড়তে কতক্ষণ। ফ্যানদের মতো ফিফাও তাই চাইছে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় কোনও ম্যাজিক মুহূর্ত। হতে পারে সেটা নয়্যারের সেভ। মেসির ফ্রি কিক। বা নেমারের বক্সের মধ্যে ড্রিবল।
দু’তিনটে ম্যাজিক মুহূর্ত আর তার পরেই আঙুলটা নীচে, নীচে এবং একেবারে ভেতরে!
সোচি, ১৬ জুন
রোনাল্ডো দেখালেন তিনিই ‘বস’
রুশি বিশ্বকাপকে আলোয় আলোয় রাঙিয়ে দিয়ে গেলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। খেলা শেষের তিন মিনিট আগে যখন কুড়ি গজের ফ্রি-কিকের
জন্য তিনি বল বসাচ্ছেন মোবাইল টর্চের আলোয় স্টেডিয়াম ভরা। পারবেন রোনাল্ডো? গত দশ মিনিট ক্রমাগত মার খাচ্ছেন। তেত্রিশ বছর বয়সে আর সম্ভব হবে? এই সময়ই বিখ্যাত নাকলবল ফ্রি-কিক বার করলেন রোনাল্ডো। যা আইপিএলের অনেক আগেই তাঁরে জন্য প্রসিদ্ধ। স্প্যানিশ ওয়ালের পাশ দিয়ে গোঁত্তা খেয়ে বল ঢুকে গেল। তিন গোলে হারা মরচ হয়ে গেল ৩-৩। স্বপ্নেও কেউ ভেবেছিল ম্যাচ এই পর্যায়ে যেতে পারে?
কাল রুশরা পাঁচ গোল দেওয়ার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গিয়েছে ভডকা ৫, পেট্রল ০।
আজ কি লেখা হবে সিরিয়ালস ৩: অটোমোবাইলস ৩? না বিখ্যাত পর্তুগিজ সিরিয়ালসের বদলে রোনাল্ডো? সুসংহত স্প্যানিশ আর্মাডার বিরুদ্ধে এক ব্যক্তির নির্ঘোষ এই ম্যাচটাকে বিশ্বকাপ ইতিহাসে অমর করে দিয়ে গেল!
অ্যাম্ফিথিয়েটার শব্দটা রাশিয়ার সঙ্গে যায় না। ওটা রোমানদের সাম্রাজ্যভুক্ত। কিন্তু ভৌগোলিক লোকেশনে ইতালি না হলে কী হবে, ওলিম্পিক পার্ক ফিশট স্টেডিয়াম তো অ্যাম্ফিথিয়েটারের ডিজাইনেই বানানো। দু’দিকে বিশাল ঢেউ খেলানো গ্যালারি আর আদ্ধেকটা ছাদ। এমন বিশালাকায় একটা বরপার আছে মাঠটার মধ্যে যে ইডেন গার্ডেন্সকে পাশে রাখলে মনে হবে ওখানে শুধুই ভুল ক্রিকেট হয়! ট্রিপল এক্সএক্সএল এমন মাঠ তো মানানসই প্রতিদ্বন্দ্বিতাও দাবি করে। যেটা সাইজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
স্পেন বনাম পর্তুগাল—শুধু সেটাই দেখাল না। গ্রুপ বি-র ম্যাচটাকে এমন পর্যায়ে তুলে নিয়ে গেল যাকে রোমান
অ্যাম্ফিথিয়েটারে অনুষ্ঠিত এল ক্ল্যাসিকো ছাড়া কিছু বলতে পারছি না। রাশিয়ার কোনওটাই নিজস্ব নয়। না এল ক্ল্যাসিকো, না অ্যাম্ফিথিয়েটার। কিন্তু তাদের বিশ্বকাপের আসল বিয়েবাড়ি এমন ম্যাচ দিয়ে শুরু হল যা অবিশ্বাস্য! ভয়ংকর সংঘর্ষ, বশ্যতা স্বীকার, অহংকার, দর্পচূর্ণ, ইগোর লড়াই, রোমান্স, টেনশন, স্কিলের শ্রেষ্ঠত্ব, চাতুর্য! বিশ্বফুটবলের একটা বুফে যেন সোচি স্টেডিয়ামে ঝুরি নামিয়ে হাজির হয়ে গেছিল। ভাবা যায় না গ্রুপে বাকি দুটো টিম যেখানে মরক্কো আর ইরান। সেখানে সুপারপাওয়াররা প্রথম দিনেই নিজেদের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে চলে যাবে! আর সে জন্যই ম্যাচটা নিছক জেতা-হারার অঙ্ক ছাড়িয়ে উত্তীর্ণ।
টিভিতে বসে ফুটবল ম্যাচ দেখার একটা সমস্যা হল ক্যামেরা বলকে দেখায়। অফ দ্য বল কে কোথায় নড়ছে দেখায় না। তাই কলকাতায় মাঝরাতে টিভির সামনে বসে হয়তো বোঝা যাবে না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে কতটা ফাঁকা জমি এ দিন স্পেন দিয়েছিল? এটা যদি স্প্যানিশ ফুটবলের দর্প হয়ে থাকে যে আমরা স্পেন এত ভাল টিম তোর পেছনে মার্কার লাগাব না। জোনাল মার্কিংয়ে যার কাছে যাবি, ধরা পড়বি, তা হলে সেটা চূর্ণ হয়ে গেল তিন মিনিটের মধ্যে। বাঁ দিক থেকে আক্রমণ তুলছিল পর্তুগাল। একটা ছুটকো বল পেয়ে চোরা গতিতে ইনসাইড-আউটসাইড করতে করতে সিআর সেভেন ঢুকে পড়লেন। নাচো তাঁকে ট্রিপ করায় পেনাল্টি। দাভিদ ডি জিয়া এগিয়ে এলেন পেনাল্টির আগে। রোনাল্ডোর চোখে চোখ রেখে বোধহয় কিছু প্রেমের কথা বললেনও। কিন্তু তাতে কি আর রোনাল্ডো-দমন সম্ভব? দাভিদ ডি জিয়া ডানদিকে ঝাঁপিয়েছিলেন, বলটা ধাক্কা খেল ঠিক বাঁ দিকের নেটের কোনে। পেনাল্টি গোল অথচ ওস্তাদের শ্রী সমেত!
ফুটবল মাঠের যদি আগ্নেয়গিরি বলতে কিছু থাকে আর তার কয়েকটার মালিক হয় স্পেন, তা হলে এ বার তার লাভা উদগীরণ শুরু হল! স্পেন বছরকয়েক আগেও খেলত তিতিকাকা। যার জন্ম ১৯৮৮। কিন্তু মৃত্যু ২০১৪। মারাকানায় নেদারল্যান্ডসের কাছে হারার দিনই স্পেন একরকম তিকিতাকা-কে স্প্যামে পাঠিয়ে দেয়। নতুন কোচ নতুন টেমপ্লেট বানান, পাসিং ফুটবল। সেটা প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য কী রাক্ষুসে চেহারা নিতে পারে এরপর স্প্যানিয়ার্ডরা বার করল। একটা সময় টানা বারো-চোদ্দোটা পাস এমনভাবে খেলছিলেন ইনিয়েস্তা-দাভিদ সিলভা-ইস্কো-র্যামোসরা যেন সুনীল ছেত্রীর ভারতের সঙ্গে খেলছেন। দিয়োগো কোস্তা আগের বিশ্বকাপে হতাশা ছাড়া কিছুই দেননি। এবার মনে হল স্পেনকে তাঁর গতবারের ধারের ওপর কুড়ি পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট দিতে এসেছেন।
নেইমার-মেসির নিশ্চয়ই ম্যাচটা টিভিতে দেখছিলেন। আন্দাজ করার চেষ্টা করছি যুগ্ম প্রতিক্রিয়া। নেইমারের মনে হবে দিয়েগো কোস্তাটাকে তো আমার পাশে পাওয়া উচিত ছিল। পেয়ে গেল স্পেন। আর মেসি নিশ্চয়ই ভাবছেন এই স্পেন টিম তো গত বারের জার্মানি হয়ে এসেছে। একা একজন ফুটবলার কী করে মহড়া নেবে এদের, যদি মুখোমুখি হতে হয়?
কোস্তা বনাম পেপে—বহু বছরের একটা সংঘর্ষ রয়েছে। বিশ্বফুটবলের আর কোনও স্ট্রাইকার-ডিফেন্ডার এমন সমাপতন আছে কি না সন্দেহ। এঁরা মুখোমুখি হলেই কোনও না কোনও পর্যায়ে হাতাহাতি হয়। দু’জনে দু’জনের বিরুদ্ধে আটটা করে হলুদ কার্ড দেখেছেন। বেশির ভাগ ডুয়েলে জিতেছেন পেপে। আজ কোস্তার জেতার দিন ছিল। আর বদলা নেওয়ারও। গোলের কুড়ি-বাইশ গজ দূরে শূন্যে একটা ধাক্কা মারলেন পেপে-কে। ওই অবস্থায় দু’জনকে কাটিয়ে বারপোস্টের কোনায় ১-১।
জাভি এ দিন মাঠে ছিলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর বা ইনিয়েস্তার উত্তরসূরি এসে গিয়েছে স্পেন টিমে। দাভিদ সিলভা আর ইস্কো। এঁদের সঙ্গে দিয়েগো কোস্তা জুড়ে পাসিং গেমটা যে পর্যায়ের উচ্চচাঙ্গে উঠছে অবিশ্বাস্য। স্পেনের ফার্স্ট হাফেই তিন গোল করে ফেলার কথা। অথচ আবার এগিয়ে গেল পর্তুগাল। রোনাল্ডোকে একমাত্র সাহায্য করার মতো খেলছিলেন গঞ্জালো গুয়েদেস। ডিফেন্সে পেপে আর ফন্টের মোট বয়স ৬৯। গুয়েদেসের তারুণ্য মনে হচ্ছে টুর্নামেন্টে টিমকে টানবে। রোনাল্ডো টিমকে এগিয়ে দিলেন অবশ্য সম্পূর্ণ দাভিদ ডি জিয়ার দোষে। বাঁ পায়ের ওই নিচু শটে বিশ্ব মাপের গোলকিপার গোল খেতে পারেন, অকল্পনীয়। ম্যান ইউয়ের সাপোর্টারদের মনে হওয়া উচিত, টিভিটা ঠিকঠাক কাজ করছে তো?
দ্বিতীয়ার্ধে স্পেন আর রোনাল্ডোকে ফাঁকা জমি দেয়নি। ঘাড়ের কাছে দু’জন মার্কার। তাঁরা ক্রমাগত টাফ ট্যাকল এবং গুঁতোগুঁতি করে গেলেন। বিশ্বকাপে খেলা হলে দর্শকরা সারাক্ষণ চিৎকার করেন। গান করে যান। নিঃশব্দ কোনও মুহূর্তই থাকে না। অথচ সেটা মধ্যিখানে তৈরি হয়ে গেল ১-২ পিছিয়ে থাকা স্পেনের রুদ্রমূর্তিতে। একটা বিশাল ক্যানভাসের উপর তুলির আঁচড়ে যেমন দুর্ধর্ষ পেন্টিং করতে পারেন সেরা আর্টিস্ট। সে ভাবেই যেন মাঠটাকে বড় করে শিল্পের ফুল ফোটালো স্পেন। যে গতিতে টিমটা দৌড়োয় এবং রক্ষণে ফেরে তাতে রোনাল্ডো জাতীয় জিনিয়াস ছাড়া এদের শক্তিশেল বার করা দুঃসাধ্য। আর সব টিমে তো রোনাল্ডো নেই। থাকলেও তার পাশে তেমন লোক নেই।
একটা ম্যাচ দেখে অনুমান করাটা অন্যায়। তবু সোচি-তে যে স্পেনকে গত বারের জার্মানি দেখাল, সেটা না বললে অন্যায় হবে। রোজ রোজ তো রোনাল্ডো জিনিয়াস সামনে পড়বে না!
সারাক্ষণ মাঠে স্প্যানিশ সমর্থকরা রোনাল্ডো বল ধরলেই তাঁকে শিস দিচ্ছিলেন যাতে তাঁকে বিরক্ত করে তোলা যায়। বিরক্তির বদলে তা রোনাল্ডো- ফুলঝুরিকে জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। জিনিয়াস বনাম পাসিং সিস্টেম—যত দিন বিশ্বকাপ ফুটবল থাকবে ততদিন এই ‘এল ক্ল্যাসিকো’ ম্যাচটাও অমর হয়ে থাকবে।
সোচি, ১৬ জুন
মেসি কিন্তু মারাদোনা নয় : জুনিয়র
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের ইন্টারভিউ নিতে যাওয়া মস্ত সমস্যা। তাঁরা অনেকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানেন। কিন্তু সেই ইংরেজিতে সাক্ষাৎকার
দিতে রাজি থাকেন না। মিডিয়া সেন্টারে শুক্রবার রাতে যাঁকে আবিষ্কার কবলান, তিনিও সেই লম্বা লাইনে পড়েন। ‘সরি আই ভোন্ট নো ইংলিশ’ যে এত ঝরঝরে বলতে পারে, সে কাজ চালানোর কয়েকটা উত্তর দিতে পারবে না হয় না। কিন্তু তিনি লিনস দ্য গামা জুনিয়র এমনই। আফ্রিকান হেয়ারস্টাইলের জন্য সতীর্থরা তাঁর নাম দিয়েছিল হেলমেট। সেই চুল উড়ে গিয়ে এখন স্কোলারিরই মতো টাক। দু’টো বিশ্বকাপ খেলেছেন ব্রাজিলের হয়ে জুনিয়র—বিরাশি আর ছিয়াশি। বয়স ৬৪ ছুঁইছুঁই। অনেক দিন ফ্ল্যামেঙ্গোর কোচ ছিলেন। এখন ব্রাজিলের নামী টিভি চ্যানেল রোডে গ্লোবোতে বিশেষজ্ঞের কাজ করেন। গুগল ট্রান্সলেটর খুলে প্রশ্নোত্তরেও তিনি রাজি নন এবং এরপর মান বাঁচালেন জনৈক ইতালীয় সাংবাদিক। জুনিয়র ইতালিয়ান লিগে খেলেছেন এবং ইতালীয় ভাষায় কথা বলতে রাজি। টিভি স্টুডিয়োয় ছোটার আগে ছ’সাতটা প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউ দিয়ে গেলেন…
প্রশ্ন : কে জিতবে বিশ্বকাপ? বিশেষজ্ঞ জুনিয়রের কী মনে হয়?
জুনিয়র : ব্রাজিলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি দেখছি। আমি গর্বিত ব্রাজিলিয়ান বলে নয়। টিমটার মধ্যে ফুলকি দেখছি। সবচেয়ে ইর্ম্পট্যান্ট কথা হল কোচ তিতে টিমটা ভাল সাজিয়েছেন।
প্রশ্ন : সাজিয়েছেন বলতে?
জুনিয়র : সাজিয়েছেন মানে ফুটবলে আসল জিনিস হল গোটা টিমের কো-অর্ডিনেশন। কতটা সুসংগত ডিজাইন আপনি করতে পারছেন। পুরো সিস্টেমটা ঠিকঠাক চলছে কি না? ব্রাজিলকে দেখে আমার মনে হচ্ছে মেশিনটা ঠিকঠাক চলছে। এটা গতবছর ছিল না।
প্রশ্ন : আশঙ্কার জায়গা?
জুনিয়র : আশঙ্কার জায়গা নেইমার-নির্ভরতা। নেইমারের সাপোর্টিং প্লে-টা যেন ভাল হয়। এটা খুব জরুরি। ওকে বল দিতে হবে। তবে নেইমার-তিতে কম্বিনেশনটা জমবে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রশ্ন : আপনি কি জানেন কলকাতায় লাখ-লাখ ব্রাজিল ভক্ত। আর তারাও ব্রাজিলিয়ানদের মতো আশা-আশঙ্কায়?
জুনিয়র : না জানা ছিল না।
প্রশ্ন : ব্রাজিল ছাড়া ফেভারিট কারা?
জুনিয়র : জার্মানি আছে। স্পেন ভাল টিম। ওরা আছে। আর্জেন্টিনা আছে। তবে ওদের আগে বোধহয় বেলজিয়াম। বেলজিয়াম কিন্তু চমক দিতে পারে।
প্রশ্ন : আর্জেন্টিনা আপনার ক্যালকুলেশনে এত পিছনে কেন?
জুনিয়র : কারণ ওদের মেসি-সর্বস্বতা। আমি ছিয়াশি বিশ্বকাপে নিজে চোখের সামনে দেখেছি কী ভাবে একা মারাদোনা আর্জেন্টিনাকে জিতিয়েছিল। মেসির একা বিশ্বকাপ জেতানোর ক্ষমতা আছে বলে মনে হয় না। ও মারাদোনা নয়!
প্রশ্ন : পর্তুগাল?
জুনিয়র : এক প্রবলেম। শুধু রোনাল্ডো।
মস্কো, ১৭ জুন
মাঝরাতে মিডিয়ার সামনে উদয় হয়ে সিআর সেভেনের দ্রুত প্রস্থান
খেলা শেষ হওয়ার মিনিট পনেরো-কুড়ির মধ্যে বিশ্বকাপে অন্তত একটা টিম প্রেস কনফারেন্স করতে ঢুকে পড়ে। স্পেন-পর্তুগাল ঐতিহাসিক
ম্যাচ শেষের প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে গেল কারও দেখা নেই। এরপর হঠাৎ আবির্ভূত হলেন ফের্নান্দো হিয়েরো। সঙ্গে কোনো প্লেয়ার নেই। থমথমে মুখ। যদিও বারবার বোঝাতে চাইলেন জেতা ম্যাচ ফেলে আসায় টিমের কারও প্রতি তাঁর কোনও অনুযোগ নেই। গোলকিপার দাভিদ ডি’জিয়াকে তিনি কতটা বকলেন? কী বললেন? হিয়েরো হলেন আদ্যন্ত প্লেয়ার্স ম্যান। বললেন, ”বকব কেন? খেলায় তো হতেই পারে। দাভিদকে জড়িয়ে ধরলাম।” ডিফেন্সের খুঁত বা দিয়েগো কোস্তাকে আগে তুলে নেওয়া নিয়েও কোনো আক্ষেপ নেই হিয়েরোর। বললেন, ”এমন কঠিন সময়ের মধ্যে ছেলেরা যেমন দু’বার পিছিয়ে পড়ে ড্র করেছে তাতে কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। অনবদ্য এদের মোটিভেশন। শুধু যারা খেলল তারা নয়, টিমের বাইশ জনকে আমি কৃতিত্ব দেব।” শুনে অবাকই লাগল। বোঝা গেল এই মুহূর্তে টিম স্পিরিট কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন বাস্তব কিন্তু রূঢ় কথা বলবেন না।
স্পেন কোচের মামুলি এবং পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকা সাংবাদিক সাক্ষাৎ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ বিরতি। পর্তুগাল কি তাহলে আসবে না? এমন জল্পনা শুরু হতে হতে হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়লেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো! মুহূর্তে চেহারাই বদলে গেল ঘরের। ভিডিও ক্যামেরাম্যান আর ফোটোগ্রাফাররা এত কাছে চলে এলেন যে ফিফার লোককে সতর্ক করে দূরে সরিয়ে দিতে হল। রোনাল্ডো এলেন একটা অদ্ভুত মেজাজে। গম্ভীর টানটান হয়ে এমনভাবে বসে থাকলেন যে কেউ বলবে সোচি স্টেডিয়ামের বাইরে তাঁর ছবি নিয়ে যে উৎসব চলছে আর জেতা ম্যাচ ড্র করে স্প্যানিশ সমর্থকেরা মলিন মুখে ফিরে যাচ্ছেন?
রোনাল্ডো নিজেই শুরু করলেন। তাঁর হ্যাটট্রিক নিয়ে প্রশ্ন দূরে সরিয়ে দিয়ে বললেন, ”একার কৃতিত্বকে আলোকজ্জ্বল করার প্রয়োজন নেই। আমাদের টিম কী অ্যাচিভ করল সেটাই ইম্পর্ট্যান্ট। আমার মনে হয় ম্যাচ থেকে আমাদের যথেষ্ট সন্তুষ্টির ব্যাপার আছে। স্পেনের মতো একটা টিম তাদের আগাম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, তাদের সঙ্গে লড়াই করে ড্র রাখা যথেষ্ট সম্মানজনক।” দ্বিতীয় প্রশ্নে রোনাল্ডো বললেন, ”এই ম্যাচটা পরের রাউন্ডগুলোর জন্য আশা করি আমাদের মজবুত করে দেবে। লড়াই সবে শুরু। তবে আমরা সামনের কঠিনোত্তর একটা আভাস আজ পেয়ে গেলাম। ছেলেদের পক্ষে ভালই হল।”
মেসির সঙ্গে দেশজ রিপোর্টারদের সঙ্গে সদ্ভাব না থাকলেও এমন সাফল্যের দিনে নিজের হ্যাটট্রিক নিয়ে দু-চার কথা উঠলে পরিচিত সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে হাসেন। রোনাল্ডো ধার দিয়েই গেলেন না। হ্যাটট্রিকে আত্মতুষ্টির কোনোরকম চিহ্ন নেই। বারবার মুখে জেতার কথা বলছেন। রিয়াল মাদ্রিদের ভবিষ্যৎ চিন্তা যদি সমান্তরালভাবে থেকেও থাকে, পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনে শুধুই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি যে ভরে রাখতে চান না রোনাল্ডো। তাঁর হাবেভাবে শুক্রবার আরওই বোঝা গেল।
যেমন অকস্মাৎ এসেছিলেন তেমনই হঠাৎ তিন চারটে জবাব দিয়ে উঠে গেলেন রোনাল্ডো। ভাল হোক কী খারাপ বিশ্বকাপে নিয়ন্ত্রণটা বোঝা গেল প্রথম থেকে শেষ—তাঁর হাতেই থাকবে। তাঁর সামনে পর্তুগিজ মিডিয়া? কেন কাল দাভিদ ডি’জিয়াকে দেখেননি!
সোচি, ১৭ জুন,
মেসিয়ানা আরও ভাসল রোনাল্ডো হ্যাংওভারে
খেলা শেষ হওয়ার আধঘণ্টা পরের দৃশ্য! মিডিয়া ট্রিবিউনে থিকথিকে ভিড়। এমন ব্যস্ততা যেন ম্যাচ চলছে।
বলে রাখি বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঠের প্রেসবক্সকে এরা বলে মিডিয়া ট্রিবিউন। অনেক সাংবাদিক প্রেস কনফারেন্সে না গিয়ে দ্রুত যাঁর যাঁর কাগজ বা ডিজিট্যাল মিডিয়ার জন্য খবর পাঠাচ্ছেন। তাঁদের না হয় প্রায় জনশূন্য হয়ে আসা স্পার্টাক স্টেডিয়ামে থেকে যাওয়ার পেশাগত প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু ডানদিকের দুটো স্ট্যান্ডে যে বেশি কিছু মানুষ বসা এবং ভলেন্টিয়ারদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও নড়ছে না, এরা কারা?
তাকিয়ে দেখা গেল এরা নীল-সাদা জার্সিধারী কিছু মানুষ। অফুরান উৎসবের জোগাড়যন্ত্র নিয়ে স্পার্টাক স্টেডিয়াম জাঁকিয়ে বসেছিল। এখন স্তব্ধবাক। জানে না বাকি সন্ধে কীভাবে কাটাবে? রাতেই বা ঘুমোবে কী করে?
অথচ শনিবার সকাল থেকে মস্কো জুড়ে এদের কী বিক্রম! এয়ারপোর্ট থেকে এতটা লম্বা রাস্তা শহরে ঢুকলাম, সর্বত্র পুতিন প্রশাসনের লাগানো বিশ্বকাপ ফ্ল্যাগ। আর এদের ছেয়ে দেওয়া নীল-সাদা জার্সি। স্পার্টাক স্টেডিয়ামে পৌঁছনোর জন্য মেট্রোতে লম্বা আসছি। প্রতিটি কম্পার্টমেন্টে আর্জেন্তিনীয় সমর্থকেরা। গাইছে, বাজাচ্ছে, নাচছে। রাশিয়ান যাত্রীরা মনের সুখে সেই সব ভিডিও তুলছেন। মেট্রো স্টেশন থেকে নেমে স্টেডিয়ামের মোড়েও তারা ফুটবল শো বসিয়ে দিয়েছে। বড় বড় পতাকা লাগানো। কোথাও মারাদোনা। কোথাও মেসি। এক জায়গায় বিস্ময়ের বিস্ময়—এমনকী হিগুয়েনের ছবি নিয়েও নাচানাচি চলছে।
ম্যাচ শুরু হতে তখনও দু’ঘণ্টা বাকি। কিন্তু এরা ম্যাচ শুরু করে দিয়েছে। ওই বাঁধনছেড়া উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে শব্দব্রহ্মতেই তো আজ দু’গোল পিছিয়ে আইসল্যান্ড শুরু করছে। দেখে অবাক লাগছিল আর্জেন্টিনা থেকে মস্কো যথেষ্ট দূর। স্পেন বা পর্তুগালেরই যেখানে এত সমর্থক আসেনি। সেখানে মেসির দেশ থেকে হাজার হাজার লোক ফ্যান আইডি নিয়ে চলে এলো কী করে? হিটলার পারেননি। নেপোলিয়ন পারতে পারতেও পারেননি।
এরা তো মস্কো জিতে নিয়েছে আর আইসল্যান্ড নামক শিশুপাল সংহারের পর বোধহয় আজ সারা রাত মস্কোকে ঘুমোতে দেবে না।
কে জানত উৎসবের রঙিন ফোয়ারা নিভে গিয়ে ভেসে উঠবে ভৌতিক কিছু দৃশ্যকল্প? গ্রুপ লিগে সবচেয়ে দূর্বল টিমের কাছে পেনাল্টি মিস করে ড্র। এরপর বাকি থাকল ক্রোয়েশিয়া আর নাইজেরিয়া। কোনওটাই সহজে ছাড়নেওয়ালা টিম নয়। কী হবে যদি দুটোই জিততে না পারা যায়?
মারাকানার ফাইনালের সেই ভূত লিওনেল মেসিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল চার বছর। মস্কোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেও তা ঘাড় থেকে নামল না। রাশিয়ায় আসা বার্সেলোনার মেসি-ভক্ত সাংবাদিক সে দিন বলছিলেন, ”লিও যখন বার্সার হয়ে খেলে তখন সবকিছু যন্ত্রের মতো মসৃণভাবে চলে। বছরে ৪০-৫০ গোল ও করবেই, একটা নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড রাখবে। যে-ই দেশের হয়ে খেলতে যায় সেই মসৃণতা উধাও হয়ে উদয় হয় ক্যোওস। সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা।”
ঠিক এবং ঠিক নয়। স্পার্টাক স্টেডিয়াম সৃষ্ট শনিবাসরীয় বিশৃঙ্খলার জন্য মেসি নিজে সবচেয়ে দায়ী। আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। দু’পায়ে গোল লক্ষ্য করে শট নিলেন। ভিড়ের জঙ্গল থেকে রাস্তা খুঁজলেন। কিন্তু সেই মেসিয়ানা কোথায়, যে পারফিউমের জন্য তিনি এত বছর ধরে জগদ্বিখ্যাত? স্পার্টাক মাঠটা মস্কোর যেখানে ফাইনাল হবে সেই লুঝনিকির তুলনায় অনেক ছোট। মাত্র ৪৪ হাজার লোক ধরে। আর তার চেয়েও বড় বৈশিষ্ট্য, মাঠের গা ঘেঁষে একেবারে নীচ অবধি গ্যালারি। কোচের নির্দেশ যদি বা প্লেয়াররা শুনতে না পান, একদম নীচের সিটের দর্শক চিৎকার করলে অবধারিত শুনবে। ছোট ইন্ডোর স্টেডিয়াম যেমন হয়। এটা ইডেন, সল্টলেক বা মারাকানা নয় যে প্লেয়াররা দূরে দূরে। সেই মাঠে মেসি ১-১ অবস্থায় পেনাল্টি মারছেন মানে গোটা গ্যালারির নিশ্বাস তাঁর ঘাড়ে-মুখে।
আর মিস করাটাও তারা চোখের সামনে মাঠের ভিডিও স্ক্রিনের সাহায্য ছাড়া পরিষ্কার দেখল। মেসি পেনাল্টি কিকার হিসেবে এত ভাল যে প্রচুর চাপের ম্যাচে কিপার নড়ার সময় পায় না। যে কোনও একদিকের টপ কর্নারে মারেন। আজ সেই মেসি কিনা মারলেন কিপারের ডানদিকে, তার হাঁটুর সমান হাইটে। যে পেনাল্টিটা আটকানো সবচেয়ে সহজ।
ম্যাচে বল দখলে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ছিল আর্জেন্টাইনদের। ৭৩-২৭। মেসি সেই অনুপাতের বড় অংশীদার। প্রচুর বল ধরেছেন। দু’পায়ে গোলমুখী শটও মেরেছেন। কিন্তু কোথায় তাঁর সেই গোলমুখী দৌড় বা ফাইনাল পাস সাজিয়ে দেওয়া? রোনাল্ডোকে স্পেন জোনাল মার্কিং করেছিল। মেসির জন্য পেনিট্রেটিভ জোনে অপেক্ষা করেছে গায়ে গায়ে দু’জন ট্যাকলার। কিন্তু সে তো তাঁর জীবনে নতুন কিছু নয়। কত সামলেছেন।
এক-এক সময় মনে হচ্ছিল দু’টো কারণে আজ তিনি অত্যধিক চাপে। এক, মাঠে বসে খেলা দেখছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলের চিরশ্রেষ্ঠত্বে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দিয়েগো মারাদোনা। দুই, কাল ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর হ্যাটট্রিক। মনে হল আইসল্যান্ড নিছক উপলক্ষ ছিল। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রোনাল্ডোকে তিনি জোরদার পাল্টা দিতে চাইছিলেন। মেগা পারফর্মারদের দুনিয়ায় এমন পেশাগত লড়াই চলেই। একে অপরকে নিজের উচ্চতর কীর্তির মাধ্যমে জনপ্রিয়তার টাইমলাইন থেকে ডিলিট করে দিতে চায়।
আইসল্যান্ড বিশ্বকাপ খেলা দেশগুলোর মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে কম জনসংখ্যার। ইউরোতে তারা রোনাল্ডোর পর্তুগালকে ভুগিয়েছিল ১-১। ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। তা বলে বিশ্বকাপে রানার আপ টিম তাদের কাছে আটকে যাবে? যে টিমের মুকুটধারী শাহেনশা হলেন মেসি। বারবার মনে হচ্ছিল তিনি খেলছেন সোচি স্টেডিয়ামের সদ্য নির্মিত ভাস্কর্যকে। তাই রিল্যাক্সড হতে পারছেন না।
সেই ভাস্কর্যের পাশে নিজের উন্নততর মূর্তি তৈরির বদখেয়াল আপাতত আর্জেন্টিনাকে গভীর আশঙ্কায় রেখে দিল। কোচ সাম্পাওলিও ভাল শেফগিরি করেছেন বলে মনে হল না। টিমে ছন্দ বলতে কিছু তৈরি হয়নি। ডিফেন্সে জাবালেতা যে এ বার নেই প্রথম দশ মিনিটে বোঝা গেল। ওটামেন্ডি ডিফেন্সের প্লেয়ার। তাঁকে কেন মিডফিল্ডার করে দেওয়া হয়েছিল জানি না। আইসল্যান্ড যখনই অ্যাটাকে উঠেছে, ত্রাহি ত্রাহি রব ফেলেছে। আর মনে হয়েছে আর্জেন্টিনা না আর একটা গোল খায়।
এই টিম বিশ্বকাপ জিততে পারবে? বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ম্যাচে জঘন্য খেলে ভিকট্রি স্ট্যান্ডে চড়ার একাধিক নজির আছে। কিন্তু পরের ম্যাচেও যদি মেসিয়ানা উৎপন্ন না হয়, নীল-সাদা জার্সিদের শহরে দাপিয়ে বেড়ানোর পরিবর্তে না এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে দেখি!
বেশি রাতে স্টেডিয়াম থেকে মেট্রোয় ফিরছি। শোকাকুল কিছু আর্জেন্টিনা সমর্থকের সঙ্গে দেখা। মনে হল এঁরা স্টেডিয়ামের আশেপাশেই বসেছিলেন। খেলা শুরুর আগে এঁদেরই দেখেছি চিৎকার আর গান করে ফাটিয়ে দিতে। প্রায় প্রত্যেকের দশ নম্বর জার্সি পরা। পিছনে লেখা মেসি। দুপুরে ট্রেনে আসার সময় আইসল্যান্ড সমর্থকেরা এবং কিছু হলুদ জার্সির অস্ট্রেলিয়ান সাপোর্টার জড় হয়ে এদের টিটকিরি দিচ্ছিল, গো মেসি গো। মানে ওহে মেসি মানে মানে দেশে ফেরো। রাতে ফেরার সময় দেখলাম মেসিধারী জার্সিরাই কেউ কেউ আবেগে চেঁচাচ্ছেন, গো মেসি গো।
ভিডিওটা লিওনেল মেসির কাছে পাঠানো গেলে তিনি কী ভাবতেন? হয়তো ভাবতেন রোনাল্ডোর পর্তুগাল এদের সঙ্গে ড্র করেও নিষ্কৃতি পেতে পারে। সামান্য বেচালে আমার ক্রুশবিদ্ধ হওয়া থামবে না। এই তো আমার জীবন কালিদা!
মস্কো, ১৭ জুন
