ব্রাজিল ২০১৪ – ২
বিশ্বযুদ্ধ নয়, ব্যতিক্রমী বিশ্বযুদ্ধ
আকাশবাণী ভবন থেকে ইডেনের প্যাগোডা— দূরত্বটা আনুমানিক ছকে রাখুন। এ বার ভাবুন ওই অবধি লম্বা পলিথিনে ঢেকে দিয়ে ভেতরে বিশ্বকাপের উদ্বোধন হচ্ছে।
অবিশ্বাস্য? অকল্পনীয়? অমার্জনীয়? যা-ই মনে আসুক, এটাই বিশ্বকাপের উদ্বোধনীতে এরিনা কোরিন্থিয়ান্স।
পলিথিনে ঢেকে রাখার কারণ তো বোঝাই যাচ্ছে। স্টেডিয়ামের বাইরের কাজ শেষ হয়নি। সুরেশ কালমাদি তিহাড় যাওয়ার পক্ষে সেই সময়ের যোগ্যতম ক্যান্ডিডেট হতে পারেন। কিন্তু কমনওয়েলথ গেমসে স্টেডিয়ামগুলো অন্তত শেষ হয়ে খেলা শুরু হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার সকালে স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় দৃশ্যটা দেখে মনে হচ্ছিল সব দিক থেকেই বোধহয় ব্যতিক্রমী হতে যাচ্ছে কুড়িতম বিশ্বকাপ। নইলে এ দিন বেলো হরাইজন্তেতে আর্জেন্তিনা বেস ক্যাম্প থেকে আসা খবরটাও তো অবিশ্বাস্য।
রোনাল্ডিনহোর মতো দেখতে একটি ব্রাজিলীয় সমর্থক প্র্যাকটিসের সময় নিরাপত্তারক্ষীদের ফাঁকি দিয়ে লিওনেল মেসিকে চমকে দিয়েছেন। শুনলাম লিও মেসি প্র্যাকটিসের সময় আর্জেন্তিনীয় সমর্থকদের কাছে বন্দিত হয়েছেন যেমন। সারাক্ষণ ‘মেসি মেসি’ বলে চিৎকার হয়েছে যেমন। তেমন ব্রাজিলীয় সমর্থকরা মেসিকে বিদ্রুপও করেছেন। ফুটবলের রাজপুত্র ফুটবলের ধাত্রীভূমিতে এসে বিদ্রুপের মুখে, এটাও তো নজিরবিহীন।
নজিরবিহীন আরও অনেক কিছু। যেমন বিশ্বকাপ ফুটবলের এ রকম মেগা এগজিট পোল যাতে কিনা কিংবদন্তি স্টিভন হকিং থেকে সিডনির ছোট ক্যাঙারু। ব্রাজিলের ছোট কচ্ছপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী পূর্বাভাস অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দিয়ে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী তালিকায় চলে যাওয়া নেট সিলভার।
কে জিতবে শুধু নয়, কোন ম্যাচে কী ঘটবে— তা পুঙ্খানুপুঙ্খ আগাম বলে দেওয়া এ রকম সর্বগ্রাসী জ্যোতিষচর্চা কোনও খেলার ইতিহাসে কখনও ঘটেছে কি না সন্দেহ। পেলের আমলে এ সব পূর্বাভাস-টাস মিডিয়াই করত। বড়জোর উইলিয়াম হিল জাতীয় জুয়াড়ি সংস্থাগুলোর রেটিং গুরুত্ব পেত। তারাই ঠিক করে দিত কারা কত দরের ফেভারিট। কাগজে সেগুলোই ফলাও করে বেরোত।
এ বারেও জুয়াড়িদের পূর্বাভাস আছে। বাজির দর আছে। কিন্তু চার পাশ থেকে অর্থনীতিবিদ সংস্থা, স্ট্যাটিস্টিশিয়ান, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, পদার্থবিজ্ঞানী, আইটি এক্সপার্ট, জীবজন্তুর এমন ককটেল ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া শুরু হয়েছে যে, জুয়াড়িরা কী বলল এখন বিক্রি হয়ে যাওয়া খবরের কাগজ।
যাবতীয় ফুটবল এগজিট পোলে জয়ীর মুকুট কিন্তু তিনটে দেশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। না, রোনাল্ডোর পর্তুগাল তো নয়ই। মেসির আর্জেন্তিনাও নয়।
সবচেয়ে বেশি নাম উঠছে ব্রাজিলের।
তারপর স্পেন।
তারপর জার্মানি।
নেট সিলভারের কথা লিখলাম। ইনি জনসমক্ষে প্রবল ভাবে আবির্ভূত ২০০৮ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচনের ফল মিলিয়ে দিয়ে। ৫০ প্রদেশের ৪৯টা তিনি মিলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সিলভার বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন সকার পাওয়ার ইনডেক্স। সেই ইনডেক্স দেখাচ্ছে ব্রাজিল ৪২.২। তার অনেক পরে দ্বিতীয় হল আর্জেন্তিনা ১২.৮। ইনডেক্সের চেহারার মতোই নাকি টুর্নামেন্টে একাধিপত্য থাকবে স্কোলারির দলের।
সিডনিবাসী ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটা গোষ্ঠী আবার বহু গবেষণার পর সিলভারের পূর্বাভাস উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের তৈরি এগজিট পোল বলছে, ব্রাজিল ফাইনালে পৌঁছবে না। ফাইনাল হবে মেসি বনাম সোয়াইনস্টাইগার। আর তাতে হেরে যাবেন বিশ্ব ফুটবলের রাজকুমার।
সুইজারল্যান্ডের সিইপিএস ফুটবল অবজারভেটরি আবার বলছে, ট্রফি জিতবেন ফের ইনিয়েস্তারা। স্পেন রিও-র ফাইনালে বদলা নেবে কনফেডারেশন কাপে হারের। এই গোষ্ঠীর রেটিং অনুযায়ী ব্রাজিল রানার্স আপ। আর্জেন্তিনা তৃতীয়। ফ্রান্স চতুর্থ। এরা গবেষণা করে দেখেছে মোট বিশ্বকাপ ইতিহাসে সব ম্যাচ অংশগ্রহণকারী ৩২ দেশের প্লেয়ারদের স্ট্যাটিস্টিক্স, ব্রাজিলের গরম, মাঠের অবস্থা। এদের মধ্যে একটা সেমিফাইনালে আর্জেন্তিনা হারবে স্পেনের কাছে। আর একটায় ব্রাজিল হারাবে ফ্রান্সকে।
জীবজন্তুদের দিয়ে ফুটবল জ্যোতিষচর্চা সেই পল অক্টোপাসের সময় থেকে আবির্ভাবেই এমন জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছে যে, এ বার তার হিড়িক আরও বেশি। বাজারে নামানো হয়েছে ফ্লপসি নামের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাঙারু। ব্রাজিলের কচ্ছপ। আলফ নামক পেঙ্গুইন। শাহিন নামক মরুভূমির উট। আর নেলি নামাঙ্কিত হাতিকে। পলিথিন বেঁধে বিশ্বকাপ উদ্বোধন যেমন নজিরবিহীন। তেমনই পৃথিবীর নানান প্রান্তের জীবজন্তুকে দিয়ে স্পোর্টস ইভেন্টের ভাগ্য গণনাও। জন্তুরাও অবশ্য ঘুরে ফিরে মানুষের পর্যবেক্ষণের পথেই হেঁটেছে। সেই ব্রাজিল, জার্মানি বা স্পেন।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের অর্থনীতিবিদেরা আবার তাঁদের ষাট পাতার রিপোর্টে (হ্যাঁ, সাত নয়) বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন, কেন ব্রাজিলকে তাঁরা ফেভারিট আখ্যা দিয়েছেন। এঁদের ব্যাখ্যা একটা ফর্মুলার ওপর দাঁড়িয়ে, যা তৈরি হয়েছে অতীতের গবেষণায় ভিত্তি করে যে অমুক ম্যাচে একটা টিম কত গোল করতে পারে? এই ‘কত করতে পারে’, সেটা ঠিক করার সময় তাঁরা পরিচিত পরিবেশের সুযোগ পাচ্ছে কী পাচ্ছে না, এটাও মাথায় রাখা হয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাক্সও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছে কোন ম্যাচে কী হবে এবং কেন হবে।
কোনও কোনও পূর্বাভাস অনুযায়ী উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিল ২-০ হারাবে ক্রোয়েশিয়াকে। অর্থনীতিবিদেরা বলেছেন ব্রাজিল জিতবে ৪-১। আর ফাইনালে ৩-১ হারাবে মেসিদের। এই গবেষণার সমালোচনাও শুরু হয়ে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে যে, অতীত পারফরম্যান্সের ওপর এই গবেষণাটা বড় বেশি নির্ভরশীল। টুর্নামেন্টে যে টিম হঠাৎ উন্নতি করতে শুরু করল বা যারা হঠাৎ বাধার সামনে পড়ে ধ্যাড়াচ্ছে—সেই চান্স ফ্যাক্টরগুলো এখানে ধরা হয়নি।
সবচেয়ে শোরগোল ফেলেছে অবশ্যই বিশ্ববন্দিত স্টিফেন হকিংয়ের পূর্বাভাস। তিনি প্রধানত গবেষণা করেছেন ইংল্যান্ডের কাপ জেতার সম্ভাবনা। হকিং তাঁর ডাটা হিসেবে ব্যবহার করেছেন ছেষট্টির বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত—বিশ্বকাপের সব ক’টা ম্যাচ। খেয়াল রেখেছেন দলগুলোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। এমনকী ফ্রেন্ডলি ম্যাচগুলোও। তার পর তাঁর গবেষণা বলছে, ইংল্যান্ড লাল জার্সি পরে খেললে বেশি ভাল খেলবে। ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেললে তাদের জেতার সম্ভাবনা বেড়ে দাঁড়াবে শতকরা ৫৮ ভাগ। ৪-৪-২ খেললে সেটা কমে হবে শতকরা ৪৮ শতাংশ। তাঁর স্টাডি অনুযায়ী তাপমাত্রা পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়া মানে ইংল্যান্ডের জেতার শতকরা ৫৯ ভাগ আশা চলে গেল। আর বলেছেন ইংল্যান্ড লাইন-আপে যেন লালচুলো প্লেয়ারের সংখ্যা বেশি থাকে। তা হলে জেতার চান্স বাড়বে।
হুইলচেয়ার আবন্ধ পৃথিবীর অন্যতম সেরা মস্তিষ্ক অবশ্য গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর বিরোধিতার মুখেও পড়েছেন। এক ভক্ত উত্তেজিত চিঠি লিখেছে, আপনার মতো রোল মডেল কী করে এই সব পাবলিসিটি স্টান্টে জড়াতে পারেন? আর এক ভক্ত টুইট করেছেন, লম্বা হাঁটতে চললাম। আদর্শের অপমৃত্যু দেখে আর কী-ই বা করার আছে।
এতগুলো এগজিট পোলে একমাত্র হকিংই রেফারি ফ্যাক্টরকে গবেষণার মধ্যে রেখেছেন। তাঁর উপসংহার অনুযায়ী ইংল্যান্ডের জেতার সম্ভাবনা ইউরোপীয় রেফারির বেলা ৬৮ ভাগ। অন্য মহাদেশের রেফারি থাকলে শতকরা ৩৮ ভাগ।
আশ্চর্যের হল, একটা গবেষণার মধ্যেও তারকা প্লেয়ারের চোট-আঘাত ফ্যাক্টরকে বিবেচনার মধ্যে নেওয়া হয়নি। ম্যাচ চলাকালীন কোচের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবা হয়নি। রেফারির লাল কার্ড বা একটা পেনাল্টিও তো বিশ্বকাপের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে জিদান মাঠে থেকে পেনাল্টি মারলে কে বলতে পারে, ফ্রান্স টাইব্রেকে জিতত না?
আর পেনাল্টি। আজকালের মধ্যেই আর্জেন্তিনীয় রেডিওর হয়ে ধারাভাষ্য দিতে যাঁর ব্রাজিল পৌঁছনোর কথা, তাঁকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়। তিনি, দিয়েগো মারাদোনা তো নব্বইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানিকে পেনাল্টি দেওয়া সেই রেফারিকে আজও খুঁজে চলেছেন।
আর একটা কথা। কোনও পূর্বাভাসই বলেনি এ বারের বিশ্বকাপ ব্যাপারটাই যে ব্যতিক্রমী হবে। উদ্বোধনীতেও যে পলিথিন জড়াতে হবে, উত্তেজিত জনতার উদ্দেশ্যে কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে হবে। শুরু থেকেই যদি রিপোর্ট না মেলে, তাহলে এগজিট পোলে আস্থা রাখার কোনও কারণ আছে?
সাও পাওলো, ১৩ জুন
নেইমার জয়ধ্বনির মধ্যেই মেসির পদধ্বনি
ইউচি নিশিমুরার চেয়ে হাতে বেশি সময় পাবেন! কিন্তু রিও দে জেনেইরোর অন্তর্দেশীয় টার্মিনাল থেকে বার হয়ে মোটর রাস্তায় পড়ামাত্র আপনাকেও তড়িঘড়ি সাংঘাতিক একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হবে।
সামনে স্বর্গের দু’টো রাস্তা! কোনটায় যাবেন? বাঁ দিকে স্বর্গ লেন ওয়ান— কোপাকাবানা বিচ। ডান দিকে স্বর্গ লেন টু— মারাকানা স্টেডিয়াম।
ব্রাজিলীয় ট্যাক্সি ড্রাইভার জানতে চাইছে কোন দিকটায় যাব? আরোহী খানিক কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ”কোপাকাবানায় সারা রাত পার্টির পর সবাই টায়ার্ড। মারাকানায় যান এখন।” এমনিতে ব্রাজিলে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানা ট্যাক্সিচালক পেয়ে যাওয়াটা মমতা-বিমান সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকের চেয়ে সামান্য কম বিস্ময়কর। কিন্তু এই শুক্রবার সকালে ব্রাজিল জুড়ে তো নানান বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে।
কাল গভীর রাতে স্টেডিয়াম থেকে ফেরার সময়েও দেখলাম পানশালা আর নাইটক্লাবের বাইরে কী জমজমাট পার্টি চলছে। হলুদে-হলুদে ছয়লাপ চার দিক। চিৎকার-চেঁচামেচি, হাসাহাসি সব বড় বড় মোড়ে। কিন্তু বিষ্যুদবার তো পাশ্চাত্যে নাইটক্লাবে লোক যাওয়ার দিন হিসেবে পরিচিত নয়। উইকএন্ড শুরু আজ থেকে। তা ছাড়া এই যে শুনেছিলাম, ব্রাজিলের বিচ্ছুদের ভয়ে শনি-রোববার ছাড়া স্থানীয় লোকও বেশি রাত করে না। তা হলে কি বিচ্ছুগুলোও নেইমার দ্য সিলভারকে উদযাপন করছে?
ভোরে সাও পাওলো বিমানবন্দরে লাগেজ চেক-ইনের সময় বিস্ফরিত লাগল দেখে, চার দিকে শুধু হলুদ জার্সি। এরা কি মাঠের ড্রেসেই চলে এল? নাকি দু’টো করে সেট এনেছিল।
আমাদের দেশে বিশ্বকাপ ফাইনালের দিনও এত লোক অন্তত ভারতীয় জার্সি পরে প্লেনে চলাফেরা করে না। যাক গে, যাক। ব্রাজিলীয় জনজীবনের হাবভাব দেখে এটুকু বোঝা যাচ্ছে, তাদের গত এক বছরের যাবতীয় কাপজনিত বিদ্বেষ আর ঘৃণায় পেনকিলারের কাজ করেছেন নেইমার দ্য সিলভা। সিএনএনে দেখলাম ব্রাজিলীয় সমাজবিজ্ঞানী বাইট দিচ্ছেন, ”এই একটা ম্যাচের ফিলগুড ফ্যাক্টর থেকে কোনও সিদ্ধান্তে আসা উচিত হবে না। জনগণের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখনও ক্ষোভ রয়েছে।”
সমাজবিজ্ঞানীটি কাল এরিয়া দে সাও পাওলোয় মনে হল না ছিলেন বলে। বা আজ কাকভোরে রিও-র প্লেন ধরতেও বেরোননি। আম ব্রাজিলীয় সমর্থককে উদ্বোধনী ম্যাচের জয়ে যেমন খুশিয়াল দেখছি, এই লোকগুলো এত তাড়াতাড়ি আবার ঘুরে যাবে বলে মনে হয় না। পরে রিও-তে বসে শুনলাম, ট্যাক্সিচালক তো ঠিকই বলেছে। সত্যিই কাল রাতভোর পার্টি হয়েছে কোপাকাবানা বিচে। সাম্বা, পানীয় আর মস্তির টান এমন ভরপুর ছিল যে, স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ওখানে রাতভোর প্রতিনিধি রেখে দিয়েছিল। অনেকে বলছেন, এক গোলে পিছিয়ে পরে তিন গোল দেওয়ার ব্যাপারটা জয়ে বাড়তি হলুদ রং যোগ করে দিয়েছে। গোটা ব্রাজিলও যেন এক রাত্তিরেই তার হাসি মুখ ফেরত পেয়েছে।
মারাকানায় ঢুকতে গিয়ে দেখি, গেটের সামনে বেশ জটলা। ফটোগ্রাফাররা লাইন করে দাঁড়িয়ে। একদল সমর্থক নাচছে-গাইছে, চেঁচাচ্ছে। এদের গায়ে অবশ্য হলুদ জার্সি নেই। এদের হাতে বিশ্বকাপের রেপ্লিকা। ঠিক এক মাস বাদে এই দিন মারাকানায় বিশ্বকাপ ফাইনাল। এরা চেঁচাচ্ছে, ওই দিন আমাদের টিম ট্রফি নিয়ে এ ভাবেই পোজ দেবে।
ব্রাজিল তবু হলুদ পরেনি কেন? কারণ এরা ব্রাজিল নয়। আর্জেন্তিনা বলে। এক দঙ্গল আর্জেন্তিনীয় সমর্থক বুয়েনস আইরেস থেকে রিওয় উড়ে এসেছেন রোববার বিশ্বকাপ জয়ের অভিযান চালুর সাক্ষী থাকতে। ফুটবলের এমনই অমোঘ রূপটান যে, একই শহরে, একই সঙ্গে হলুদ আর নীল রং নিয়ে সম-উত্তেজনার আকৃতি, উচ্ছ্বাস আর উচ্চচাকাঙ্ক্ষা। এক দিকে যখন ব্রাজিলের আর পাঁচটা শহরের মতোই রিও-তে নেইমারকে নিয়ে জয়ধ্বনির কোরাসে, আবার সেই শহরেরই মঞ্চে অদৃশ্য সাউন্ড টেস্টিং চলছে বিশ্বফুটবলের মহানায়কের জন্য। লিওনেল মেসির পদধ্বনি যে এ বার ব্রাজিল বিশ্বকাপ এবং মারাকানায়।
মেসি আর নেইমারের তফাতটাও আর্জেন্তিনা সমর্থকদের ভিড়টা খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কী, না নেইমার হল নেইমার + রেফারি। মেসি মানে একা মেসি।
ব্রাজিলীয়রা আবার কাল রাত্তির থেকে বলা শুরু করেছে, এখনকার ফর্ম অনুযায়ী আগে নেইমার, পরে মেসি। এমনিতে বেলো হরাইজন্তেতে আর্জেন্তিনা অনুশীলন করার সময়ে যা-ই ঘটে থাক, গড়পড়তা ব্রাজিল সমর্থক পছন্দ করেন মেসিকে। আজ থেকে তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে যখন ক্লাব ফুটবলের এমন রমরমা হয়নি, যখন দেশই সর্বোত্তম ছিল, তখন মেসি ব্রাজিল ধরাধামে আসাটা হয়তো বর্গি এল দেশের মতো দেখা হত। এখন একেবারেই নয়। বার্সার এ দেশেও অজস্র ফ্যান। এ দিন দেখছিলাম সাও পাওলো আর রিও—দু’টো বিমানবন্দরের ক্লোজ সার্কিট টিভিতে বারবার করে মেসির মুখ ফুটে উঠছে। পরে জানা গেল, এগুলো মেসির বিশেষ বিশ্বকাপ বিজ্ঞাপন। পেলেই যদি সাঁইত্রিশ বছর জনতার সামনে বলে লাথি না মেরে শুধু এই বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন থেকে আঠারো কোটি টাকা রোজগার করতে পারেন, তা হলে মেসির কত আয় হতে পারে?
আন্দাজ করার ব্যর্থ চেষ্টায় না গিয়ে বরং ভাবছি, এশীয় র্যাঙ্কিংয়ে সবার আগে থাকা ইরান কি মেসির ক্রোয়েশিয়া হতে পারে?
সাও পাওলো মাঠে কাল ক্রোয়েশিয়া জিততে না পারুক, ব্রাজিলীয় ডিফেন্স সম্পর্কে প্রাক-টুর্নামেন্ট মিথটাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ভাবা হচ্ছিল দিয়াগো সিলভা, দানি আলভেজ আর চেলসির দাভিদ লুইজকে নিয়ে গড়া ডিফেন্স দানধ্যানে ফিফার মতোই কৃপণ। জার্নালিস্টদের জন্য ফিফা যেমন জলটাও দেড়শো টাকায় বিক্রি করছে, এরাও তেমন প্রতিপক্ষকে ফাঁকা জমি ফ্রি-তে দেওয়ায় বিশ্বাসী নয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ব্রাজিলীয় ডিফেন্স সম্পর্কে এমন সম্ভ্রমের ঢক্কানিনাদ চলছিল, যেন ডিফেন্সের সামনে ১৪৪ ধারা জারি থাকবে। অথচ গোল হওয়ার পর থেকে স্কোলারিকে প্রায় টানা দাঁড়িয়ে থাকতে হল। কলকাতায় টিভিতে বসা ব্রাজিলীয় ফ্যানদের দেখার উপায় ছিল না। টিভি বল দেখায়। বলের বাইরের মুহূর্ত কদাচিৎ। স্কোলারি বারবার গালাগাল দিয়ে গেলেন, মাঝখানে লোক আনো। ক্রোটরা হু হু করে ঢুকে যাচ্ছে এবং ঠিক মাঝমাঠে কোনও ব্লকারের খোঁজ নেই। ব্রাজিলীয় কোচ বলেছিলেন, তাঁর টিম খেলা ধরবে ঘণ্টায় একশো মাইল গতিতে। কিন্তু প্রতি আক্রমণ ঘণ্টায় সম গতিতে হলে? বৃহস্পতিবার রাতের সাও পাওলো জবাব পায়নি।
টিভি ক্যামেরা আরও একটা জিনিস অবশ্যই দেখাতে পারেনি যে, নেইমার গোটা ম্যাচে কতটা দৌড়েছেন? এক-এক সময় এতটাই নীচে নেমে ট্যাকল করছিলেন, যে বাড়তি কষ্টটা মহাতারকা স্ট্রাইকার বেশির ভাগ সময় করার জন্য তৈরি থাকে না। আগের দিন প্রেস কনফারেন্সে কয়েক হাত দূর থেকে দেখা। কাল ব্রাজিলের টিম ম্যানেজমেন্টের তরফে খেলার আগে ফিফার বুলেটিনে কার্লোস আলবার্তো পাহিরার ইন্টারভিউটাও পড়ছিলাম যে, নেইমার জীবনের প্রথম কাপে নিজেকে এত ঠান্ডা রাখতে পারছে মানে ও টপ পারফরম্যান্স দেবে। এরিনা সাও পাওলোয় বসে বারবার তা-ই মনে হল।
লালকার্ড দেখা থেকে বেঁচে গেলেন স্বয়ং রেফারি নার্ভের বলি হয়ে যাওয়ায়। কিন্তু বিশ্বকাপের উদ্বোধনীতেই যা খেলেছেন, সন্ত্রাসের লাল অ্যালার্ট তাঁর পরবর্তী ডিফেন্ডারদের মধ্যে জারি করার পক্ষে যথেষ্ট। মেসির মতোই মার খাওয়ার ললাটলিখন নিয়ে চলতি বিশ্বকাপে এসেছেন নেইমার। দেখে মনে হচ্ছে দেশের হয়ে সত্যি কাপ জিততে চান এবং বার্সায় আবার ফেরার দিন কবে, সেই ভাবনাটা আপাতত অতলান্তিকে উড়িয়ে দিয়েছেন। অনেক সময় কমবয়সী মহাতারকাকে নিয়ে দলের সিনিয়ররা বিপন্নতায় ভোগে। শোনা কথা যে, ব্রাজিল টিমে সে সব নেই। নেইমার ও টিমের বাকিদের মাঠে শরীরী ভাষা আদানপ্রদান দেখে আরও নিশ্চিত হওয়া গেল, সত্যিই নেই। বিশ্বকাপ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মতোই যে নেইমার দ্য সিলভারও আনুষ্ঠানিক উন্মোচন ঘটল বিশ্ব ফুটবলের রাজ-বংশধর হিসেবে। তাতে টিমের সিনিয়রদেরও গৌরাম্বিত দেখাল।
কোথাও যদিও মনে হচ্ছে, নেইমার আর জাপানি রেফারি নিয়ে কলরবে ব্রাজিল তার আসল নায়ককেই জয়ের মুহূর্তে ভুলে গেল। যে ভাবে ভারতীয় ক্রিকেট টিম নিয়মিত ভুলেছে রাহুল দ্রাবিড়কে।
তিনি জুলিও সিজার। ব্রাজিলের গোলকিপার। একটা সময় ব্রাজিলে প্রচলিত কথা ছিল যে, এ দেশের বিশেষত্ব হল বিয়ে টেকে না আর গোলকিপার লাগে না। কাব্যে বরাবরের উপেক্ষিত সেই গোলকিপারই কিন্তু কাল ব্রাজিলকে উতরে দিয়েছে। নেইমারের প্রথম গোলের ঠিক আগের মুহূর্তেই নিশ্চিত গোলমুখী জোরালো হেড বাঁচান সিজার। ওটা গোল হলে তখনই ০-২ হয়ে যায়। নেইমার ২-১ করার পরেও ক্রোটরা দূরপাল্লার দুর্দান্ত গড়ানো শট নিয়েছিল। বাঁ দিকে শরীর ফেলে অত্যাশ্চর্য সেভ করেন টরন্টো এফসি-তে খেলা জুলিও। ঠিক পরের মিনিটেই ব্রাজিল প্রতিআক্রমণ এবং মহাবিতর্কিত পেনাল্টি।
বলা হচ্ছে, ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডারের আত্মঘাতী গোল করার ঘটনা বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ঘটল। কিন্তু ব্রাজিলীয় গোলকিপার তিনটে অব্যর্থ গোল বাঁচিয়ে টিমকে জেতাচ্ছে, এটাই বা টাইব্রেকার ছাড়া কবে, কোন ইতিহাসে ঘটেছে? কোপাকাবানার বিচ ফুটবলেও কেউ দেখেনি।
মহাব্যতিক্রমী রাতের ব্যতিক্রমী উৎসবপালন— এ ভাবে ভাবলে মারাকানার বাইরে ট্রফি নিয়ে আর্জেন্তিনা সমর্থকদের আগাম ছবি তোলাতুলিও ব্যাখ্যা হয়। কী, না বিশ্বকাপ বাজারে সব কিছুর ব্যাখ্যা খুঁজতে নেই।
রিও, ১৪ জুন
ব্রাজিল জিতল ফিফা, বিশ্বকে খেপিয়ে দিয়ে
সিদ্ধান্তে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজস্ব প্রকাশ্য অনুমোদন জানাচ্ছেন সেপ ব্লাটার, তখন তিনি নিশ্চয়ই ভাবেননি জল এত দূর গড়াবে!
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের পর একটা মহাযুদ্ধই বলতে গেলে জেতার উপক্রম করে ফেলেছেন ফিফা মহাপ্রধান। ব্রাজিলীয় জনতার এমন একটা কামব্যাক ম্যাচ জিতে এত দিনকার বিশ্বকাপ বৈরি গনগনে মেজাজ গলে জল। কিন্তু ও দিকে যে নতুন শত্রু-সীমান্ত খুলে গেল। ফিফার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে গেছে বাকি বিশ্ব। তাদের মতে, উদ্যোক্তা দেশকে মাঠে অসঙ্গত সুবিধে দিয়েছেন জাপানি রেফারি। এই ইউচি নিশিমুরাকে অবিলম্বে বিশ্বকাপ থেকে তাড়ানো হোক।
রিখটার স্কেলে এমনই সেই অভিযোগের তীব্রতা যে, সকালে গোললাইন প্রযুক্তির ওপর আগাম ঠিক করা একটা ফিফা সাংবাদিক সম্মেলন ছিল। সেখানে অধিকাংশ সময় গেল রেফারিং নিয়ে ক্ষোভের উত্তর খুঁজে বের করতে। আর ফিফা কর্তাদের চাপের মুখে বেশ অস্বস্তিতে দেখাল। তখনও তাঁরা জানেন না, একটু পর তুলনামূলকভাবে নিরামিষ মেক্সিকো-ক্যামেরুন ম্যাচে দুটো গোল নাকচ নিয়েও তীব্র অসন্তাোষ দেখা দেবে। টুর্নামেন্টের প্রথম দুটো ম্যাচ। আর দুটোতেই কিনা রেফারি খলনায়ক।
ফিফা কর্তাদের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন গ্যারি লিনেকার। আন্তর্জাতিক ফুটবল সার্কিটে লিনেকারের বক্তব্যের একটা ওজন আছে। তা সেই লিনেকার টুইট করেছেন, ”কালকের ম্যান অব দ্য ম্যাচ কে ছিল, রেফারি না নেইমার, এটা প্রায় সরু চুলের মতো তফাত।” এদিন রিও মিডিয়া সেন্টারে রাশিয়ান সাংবাদিক তাঁদের দেশ থেকে আসা পেনাল্টি সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলেন। সবই রেফারির বিরুদ্ধে। খোদ নিশিমুরার দেশ জাপানেই রেফারির বিরুদ্ধে উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ায় দেশবাসী ফেটে পড়েছে। লুই ফিলিপ স্কোলারি কাল মিডিয়া কনফারেন্সে এসে বারবার বলার চেষ্টা করলেন, ”ওটা পেনাল্টি। দশ বারে দশ বার পেনাল্টি।” কিন্তু বাকি বিশ্ব সেই কণ্ঠস্বরকে প্রবল ভাবে কোরাস হতে দিতে চায় না।
জাপানের সোশ্যাল মিডিয়া এ দিন তীব্র কটাক্ষে বলেছে, রেফারি ব্রাজিলীয় জার্সি পরেছিলেন। কেউ কেউ লিখেছে ব্রাজিল যদি বিশ্বকাপ জেতে তা হলে নিশিমুরাকে বলা হবে এমভিপি, মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার।
বৃহস্পতিবার মাঠে বসে মনে হচ্ছিল, নিশিমুরা শুরুতে কিন্তু খেলা নিয়ন্ত্রণেই রেখেছিলেন। তাঁর সমস্যা শুরু হয় ঠিক কলকাতার রেফারিদের বিপজ্জনক সরণিতে। বড় টিম গোল খেয়ে যাওয়ার পর।
ঘরের মাঠে অবিসংবাদী ফেভারিট হারছে এবং দুর্দান্ত প্রতি আক্রমণ শানাচ্ছে অনামী বিপক্ষ—এই জায়গাতেই সম্ভবত নিশিমুরা খেই হারিয়ে ফেলেন। নইলে গোটা ম্যাচে তিনি বলের একেবারে কাছেই ছিলেন। হঠাৎ তাঁর সিদ্ধান্তে ব্যক্তিত্বের তীব্র অভাব শুরু হয়। ফ্রেডেরটা যদি পেনাল্টি হয়, তা হলে ক্রোয়েশিয়ার গোলটাই বা বাতিল হবে কেন?
রেফারিং নিয়ে ক্রোয়েশিয়া মাঠে যত অসন্তাোষ প্রকাশ করে থাক, খেলার পর বিশ্ব ফুটবলের সুপার-পাওয়ার ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এ ভাবে মুখ খুলবে, ভাবা যায়নি। ম্যাচের পর দু’তরফে যথেষ্ট সৌহার্দ্যপূর্ণ ভাবে জার্সি বদলও হয়। এর পর হঠাৎ আচমকা প্রতি আক্রমণে যাওয়ার মতো ফেটে পড়ে ক্রোটরা। তারা যে ভাবে গরল উগরে দিয়েছে, আইসিসি হলে এতক্ষণে সাসপেনশনের চিঠি ধরিয়ে দিত। বা বড়সড় কোনও জরিমানার। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ক্রোটদের প্রতিবাদী আওয়াজ এমন আন্তর্জাতিক অনুদান পেয়ে গিয়েছে, ইংল্যান্ড থেকে জার্মানি, রাশিয়া থেকে জাপান, যে দুম করে কড়া শাস্তি ঘোষণা করলে পরিস্থিতি না আরও ফিফা-র বিপক্ষে চলে যায়।
মিডিয়া সেন্টারে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেও কেউ ভাবেনি যে, ক্রোয়েশিয়ান ডিফেন্ডার দুজোঁ লোভেরান সরাসরি বলবেন, ”পেনাল্টির সিদ্ধান্তটা কেলেঙ্কারি। আমরা গোটা ম্যাচ বারো জনের বিরুদ্ধে খেললাম।” তাঁর এক সহ-খেলোয়াড় বলেছেন, ”এর জন্য যদি পেনাল্টি দিতে হয় তো গোটা টুর্নামেন্টে একশোখানা পেনাল্টি দিতে হবে।” ক্রোয়েশিয়ান প্লেয়াররা এমন কথাও বলেছেন যে, ফিফা চাইলে বিশ্বকাপটা ব্রাজিলকে আগাম দিয়ে দিক না। প্রহসন করার কী দরকার আছে?
অভিযোগ হিসেবে এগুলো সাংঘাতিক। কোরিয়া-জাপানে ২০০২ বিশ্বকাপেও রেফারিং নিয়ে নিয়মিত তীব্র অশান্তি হয়েছে। সেখানেও অভিযোগ উঠেছিল, রেফারি উদ্যোক্তা দেশকে টেনে খেলাচ্ছেন। কিন্তু প্লেয়াররা তাতে এত সরব হয়নি। আর মিডিয়াও তাকে আন্তর্জাতিক ইস্যু করেনি। এ বার ব্লাটারের ওপর পশ্চিমি প্রেস, বিশেষ করে ব্রিটিশ মিডিয়া এমনিতে ক্ষিপ্ত। তাদের তিনি ‘বর্ণবৈষম্যকারী’—এত বড় গালাগাল দিয়েছেন। প্রথম সুযোগে অন্তত ব্রিটিশ প্রেসের তো প্রত্যাঘাত করারই কথা।
কিন্তু সে সবেরও আগে সাবেক প্রশ্ন, নিশিমুরার রেকর্ড এমন অসামান্য কিছু নয় যে বিশ্বকাপের এমন হাই ভোল্টেজ ম্যাচ পেতে পারেন। অতীতে বরঞ্চ খারাপ রেকর্ডই রয়েছে এক-আধ বার। তিনি ইংরেজি জানেন না। জানেন না স্প্যানিশও। এ ধরনের ম্যাচে রেফারির অন্তত ন্যূনতম ইংরেজি জ্ঞানটা খুব জরুরি। ক্রোয়েশিয়া যেমন ইংরেজিতে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখেছে, রেফারি জাপানি ভাষায় উত্তর দিচ্ছেন। ”একটা ভাষা সমস্যায় কন্টকিত লোক কী করে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ পেতে পারে,” প্রশ্ন তুলেছে ক্রোয়েশিয়া। দাবি করেছে, এখনই বাড়ি পাঠানো হোক নিশিমুরাকে।
ফিফা যদি দাবি না-ও মানে, এই রেফারিকে আবার বড় ম্যাচ দেবে বলে মনে হয় না। আর এত সব দক্ষ ইউরোপীয় রেফারি থাকতে কেন এশিয়া? ব্লাটারের এশিয়া-আফ্রিকাকে খুশি রাখতেই হবে। ইউরোপীয় ভোট ব্যাঙ্ক তাঁর থেকে সরে গিয়েছে। তাদের খুশি করে ভোট বাজারে লাভ কী?
রিও, ১৫ জুন
মেসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক অপেক্ষায় ব্রাজিল ফুটবলের গর্ভগৃহ
মারাকানা স্টেডিয়ামের বহিরঙ্গেই কৌলীন্যের গা ছমছমে ব্যাপার আছে। ফুটবল ভালবাসার সিম কার্ড নিয়ে আসুন বা না আসুন, একটা নেটওয়ার্ক সিস্টেমে ঢুকবেই যে, এটা ফুটবল শাসকের দুনিয়া। মধ্য মেধার নয়।
পরাধীন দেশের ভারতীয় ক্রিকেটাররা এক সময় বারংবার লর্ডস বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলতেন, এমনিতেই সাহেবদের বিরুদ্ধে হীনমন্যতায় ভুগি। আর ওই মাঠে গেলে পরিবেশ আরও দমিয়ে দেয়। মারাকানা হল সেই পরিবেশ যাকে ইংরেজ সাংবাদিক এক কথায় লিখবেন ‘ইমপোজিং’। গেটের বাইরে একটা কুড়ি ফুট মতো উঁচু মূর্তি। ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের বাইরে ববি মুরেরও এ রকম একটা মূর্তি আছে। কিন্তু এটা যেন আরও সশব্দ। হিল্ডেরাল্ডো বেলিনির স্ট্যাচু। এ বছরই যিনি মারা গিয়েছেন।
মারাকানায় হোম টিম ড্রেসিংরুম যাঁর নামে, সেই গ্যারিঞ্চা নন।
মারাকানার অতিথি টিম ড্রেসিংরুম যাঁর নামে, সেই পেলেও নন।
বেলিনির মূর্তি বসার কারণ, তিনি ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক। চার বছর পরেও ব্রাজিল আবার বিশ্বকাপ জেতে। ওই মূর্তির তলায় চ্যাম্পিয়ন টিমের প্লেয়ারদের নামগুলো খোদাই করা। সেটা এক নজরে দেখলেই ব্রাজিল ফুটবল সভ্যতার প্রতি সপ্রশংস সম্ভ্রম জাগবে। কী কী সব নাম। কিন্তু আসল ধাক্কাটা বেলিনির ছবিতে। এক হাতে জুলে রিমে কাপটা শূন্যে তুলে দেওয়া। কার্যত ছুড়ে দেওয়া। পেলেরা সুইডেনে জেতার আঠাশ বছর আগে বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার আগে কোনও ক্যাপ্টেন নাকি ও ভাবে শূন্যে জ্বলে রিমে ট্রফি তোলেনি।
মূর্তি হয়েও একটা তাচ্ছিল্য আছে বেলিনির শরীরী ভাষায় যে, এটা ব্রাজিল ফুটবল সীমান্তে ঢুকছ। আমাদের সংরক্ষিত এলাকা। কোনও মগের মুলুক নয়। যা বলব, সে ভাবে চলবে। আরও এগারোটা জায়গায় তো ব্রাজিল জুড়ে খেলা হচ্ছে। কিন্তু মারাকানা হল মারাকানা। পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে জনবহুল স্টেডিয়াম। আর তার চেয়েও অসীম গুরুত্বপূর্ণ, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের গর্ভগৃহ।
বিশ্বকাপের ড্র তৈরির সময় কে জানত, সেই মারাকানায় নেইমারদের খেলা না পড়ে আবির্ভাব ঘটবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের ফুটবল সম্রাটের? বিশ্বকাপ বিপর্যয়ে পরপর দু’বার রক্তাক্ত আর আক্রান্ত হতে হতে এটা কি লিওনেল মেসির পোয়েটিক জাস্টিস যে, বিশ্বমঞ্চে তাঁর রাজ্যাভিষেকের ঐতিহাসিক প্রথম দৃশ্যের জন্য ফুটবল দেবতা মারাকানাকেই সরিয়ে রেখেছিলেন?
প্রতিপক্ষ বসনিয়া, সেটা নিছক একটা নিয়মরক্ষার ব্যাপার। কোনও না কোনও টিমকে হতে হত, তাই বসনিয়া। মারাকানার বাইরে যে ভিড়টাকে হলুদ আর নীল জার্সি মিলে সকাল থেকে আর্জেন্তিনা টিমের আগমন অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি, তাদের আর বাকি বিশ্বের চিন্তায় একটাই মিল—দু’দলের বাকি একুশ জন নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। মারাকানার বাইরে শুধু দশ নম্বর নীল-সাদা জার্সিতে লোক। আর এক সমর্থক দিয়েগো মারাদোনা সেজেও দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু তারও জিজ্ঞাসাটা কমন।
রাজ্যাভিষেকের প্রথম দৃশ্য কতটা জমকালো করতে পারবেন লিওনেল মেসি?
কাল রাত্তিরে একটা সময় মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের রং বুঝি কমলা হয়ে গেল। তিকিতাকার তো গ্রহণ হলই, সম্ভবত মনোযোগ সরে গেল ব্রাজিলে মেসির আবির্ভাবী কাপ ম্যাচ নিয়েও। সালভাদোরে স্প্যানিশ আর্মাডা কমলা আভায় পুড়ে যাওয়া নিয়ে শনিবার দিনভরও বিস্তর চর্চা চলল, সন্দেহ নেই। ফিফার লোকেরা রিওয় বসে বলছিলেন, খেলার আগে সালভাদোর প্রশাসন নাকি বলেছিল গোল-পিছু শহরে এক হাজার একশোটা গাছ লাগাবে। প্রতিশ্রুতি রাখতে তাদের এখন ৬৬০০ নতুন গাছ বসাতে হচ্ছে। খবর হিসেবে চটকদার এবং শিরোনাম-যোগ্য। এ দিনই আবার ইংল্যান্ড-ইতালির মতো অন্যতম ডার্বি ম্যাচ।
তবু তিনি, লিওনেল মেসি আলোচনা থেকে কিছুতেই মুক্ত নন। পরের রাশিয়া বিশ্বকাপে তাঁর বয়স হবে ৩০। ওই বয়সে একটা টিম টেনে নিয়ে যাওয়াটা আধুনিক ফুটবলের অ্যামফিথিয়েটারে কার্যত অসম্ভব। সবাই এবং মেসি নিজে একটা সারসত্য জানেন। হয় এ বারই, নয়তো কখনও নয়।
ছয় বার লা লিগা জেতা আছে মেসির। তিনটে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। চার বার পেয়েছেন ব্যালন ডি’অর। এমনকী অলিম্পিক সোনাও। কিন্তু ঠিক ঊনত্রিশ দিন বাদে মারাকানায় যা বিতরণ হবে, সেই বিশ্বকাপ পদকটা নেই তাঁর। আর তিনি তো নিজেই বলেছেন, সব থেকেও ওটা না থাকলে মারাদোনার সরণিতে ওঠা যাবে না। পেলেতেও নয়।
তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিআর সেভেন নিয়েও নিরন্তর আলোচনা। কিন্তু এত বেশি সংখ্যায় ফুটবল সমর্থক নিশ্চয়ই সোশ্যাল মিডিয়ায় হিট করে গবেষণা করছে না, রোনাল্ডো জেতাতে পারবেন কি না পর্তুগালকে? মেসির কাছে ওটা চাই-ই! যা দেখে বেলো হরাইজন্তের বেস ক্যাম্পে আর্জেন্তিনীয় কোচ বলেছেন, ”আমার আশ্চর্য লাগে, লোকে কেন ভুলে যায় লিও একজন মানুষ? ওর একটা পেনাল্টি মিস মানে এমন প্রতিক্রিয়া হবে যেন পৃথিবীকে ভিনগ্রহের মানুষ আক্রমণ করেছে।”
মেসিকে টিমের ক্যাপ্টেন বানিয়ে দিয়েছেন সাবেয়া। তাঁকে যত পারছেন ঠান্ডা, নিজের মতো রেখে দিয়েছেন। সাবেয়া-মেসি কম্বিনেশন নীল-সাদা স্ট্রাইপের হয়ে কাজও করছে। পূর্বতন কোচেরা যেখানে ৬১ ম্যাচে তাঁর কাছে ১৭ গোল পেয়েছেন, সেখানে সাবেয়ার আমলে ২৫ ম্যাচে ২১ গোল করে ফেলেছেন মেসি।
আর্জেন্তিনা টিমে একটা প্রথা আছে, ক্যাপ্টেনকে ম্যাচের আগে টিম-টক দিতে হয়। শুনলাম মেসি বেশিরভাগ দিনই বেশি কিছু বলতে চান না। একটা ম্যাচের আগে নাকি এমনও বলেন যে, চলো পিচে নেমে পড়ি। কিন্তু নতুন জমানায় তিনি নাকি খুব মেজাজেই আছেন। টিমমেট আগেরোকে নিয়ে সর্বক্ষণ আড্ডা মারছেন। রিল্যাক্সড থাকছেন যথাসম্ভব। যদিও গোটা ফুটবলদুনিয়ার এমন চাপ তাঁর ওপর যে, একটা সময় হয়তো রিও-র প্রবাদপ্রতিম ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার স্ট্যাচুর দিকে তাকিয়ে বলতে হবে, প্রভু আমার চাপ কমিয়ে দাও।
মারাকানার মতোই রিওয় রাজ্যাভিষেক যুদ্ধ শুরু হওয়াটাও যেন কবিত্বের ন্যায়বিচার। ব্রাজিলের আত্মা মানে আসলে রিওর আত্মা! অসাধারণ সব নৈসর্গিক দৃশ্য। সফেন সমুদ্র। কেবল কার। অপরূপ সব পাহাড়। ৯৮ ফুট উঁচু আর ৯২ ফুট চওড়া ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। কিন্তু যিশুর ওই মূর্তির ফাঁকে ফাঁকেই তো সব ফাবেলা। যাকে বলে এখানকার বস্তি। রিও শহরের পাঁচ ভাগের এক ভাগ বস্তি। এই দেখলেন আকাশছোঁয়া অট্টালিকা। তার পাশেই আবার এমন সরু গলি যা উত্তর কলকাতাকেও হার মানিয়ে দেবে।
পর্যটকদের এই শহরে তাই বারবার সাবধান করে দেওয়া হয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আবিষ্ট হয়েও পুরোপুরি সম্মোহিত হবেন না। কারণ কোপাকাবানা বিচ হোক কী শহরের অভিজাত বিল্ডিং—বিপদ কিন্তু সব সময় এক ইঞ্চি দূরেই থাকতে পারে। রিও তাই শুধু অসামান্য সুন্দর নয়। শুধু হাড় হিম করে দেওয়া বিপদসঙ্কুলও নয়। দুটোর মাঝামাঝি। সুনীলের একটা লেখা ছিল না— ভয়ঙ্কর সুন্দর।
লিওনেল মেসির অবস্থানও তো এই মুহূর্তে তাই। এক ভয়ঙ্কর সুন্দর নগরীতে ভয়ঙ্কর টেনশনের মধ্যে যুদ্ধজয় শুরু করতে চাওয়া ফুটবল সম্রাট।
ব্লেম ইট অন মেসি? ব্লেম ইট অন রিও? না, এমনটাই বোধহয় হওয়ার ছিল!
রিও, ১৫ জুন
বসনিয়ার সঙ্গে কাপ্পাও আজ প্রতিদ্বন্দ্বী লিওর বিশ্বযুদ্ধে
আর্জেন্তিনার মেসি? বার্সেলোনার মেসি? না নতুন মেসি? মেসি থ্রি? ফুটবলবিশ্ব রোমাঞ্চিত ভাবে এই উত্তরের জন্য চব্বিশ ঘণ্টা অপেক্ষা করবে যে, লিওনেল মেসি এ বার তাঁর কোন অবতার নিয়ে ব্রাজিল এসেছেন।
কলকাতায় মাসখানেক আগে আসা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের শীর্ষকর্তা বলে গিয়েছিলেন, ”মেসি খারাপ খেলছে বলে যে রটনাটা হচ্ছে, সেটা ঠিক নয়। ও আসলে এ বার বার্সায় খেলার মধ্যেও বিশ্বকাপ চিন্তায় ডুবে ছিল।” অ্যাটলেটিকোর শীর্ষকর্তার মন্তব্যটা বেশ ইন্টারেস্টিং এজন্য যে, যেখানে তাঁর টিম কোচের এত প্রশংসা হল যে দিয়েগো সিমিওনে জানেন কোন ট্যাকটিক্সে মেসিকে আটকানো যায় আর তাই রুখেও দিলেন। যেখানে তাঁর নিজের ডিরেক্টর বলছেন, মেসির কিছু হয়নি। এ বারে ক্লাব ফুটবলে ওর মনটা ছিল না।
বসনিয়া কোচের আজকের প্রেস কনফারেন্সটা আর খেলার পাতায় ধরানো যাবে না। ওটা মারাকানায় হতে হতে দেশে ভোররাত হয়ে যাবে। তবে শুনলাম সাফেত সুসিচ নাকি বলেছেন, তিনি মেসির পিছনে আলাদা করে কোনও লোক না লাগিয়ে জোনাল মার্কিংয়ে খেলার কথা ভাবছেন। বসনিয়া প্রাথমিক পর্বে ৩০ গোল করেছে। যা ওই গ্রুপে জার্মান, ডাচ আর ইংরেজ টিম ছাড়া কেউ করেনি। ক্রোয়েশিয়া যেমন তীব্র কাউন্টার অ্যাটাকে ব্রাজিলকে হার্ট অ্যাটাক উপহার দিয়েছিল, এদের পক্ষেও কি সম্ভব নয় আর্জেন্তিনীয় ডিফেন্সকে দৌড় করানো? বিশেষ করে আর্জেন্তিনা যখন এই জায়গাটায় দুর্বল।
এই সঙ্গত প্রশ্নটা নিয়ে রিও এবং এই গ্রহেও বিশেষ কৌতূহল দেখছি না। সবাই বরং জানতে চায়, মেসি কোথায় খেলবেন? ফুটবল বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন আগের বিশ্বকাপে মারাদোনা তাঁকে ভুল জায়গায় খেলিয়েছিলেন। ফর্মেশনে গণ্ডগোল থাকায় সামনে পুরো চাপটা মেসির উপর পড়ে যাচ্ছিল। সাবেয়া নাকি ৪-৩-৩ খেলবেন। যা আসলে ৪-২-৪। কারণ সামনে মেসি, সের্জিও আগেরো আর গঞ্জালো হিগুয়েন ছাড়াও ডান দিকে ক্রমাগত আক্রমণে উঠবেন দি’মারিয়া। যে কোনও বিপক্ষই তা হলে আর মেসিকে একা মার্ক করে সুবিধে পাবে না।
মেসি বরাবর কম কথার মানুষ। আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন। কলকাতায় খেলতে আসার সময় স্বয়ং এআইএফএফ সভাপতির সঙ্গে দেখা করতে চাননি। এ বারেও তাঁকে নিয়ে যে এত উত্তেজিত শোরগোল, তা নিয়ে আর্জেন্তিনা টিভিকে একটাই কথা বলেছেন, ”দু’টো বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা থেকে নিজের কিছু খুঁত খুঁজে পেয়েছি। এবার সেগুলোর পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।”
গত দু’বারের সঙ্গে ব্রাজিল বিশ্বকাপের একটা উল্লেখযোগ্য তফাত, অতীতে বল পায়ে মাঠে নামার আগে এত আক্রান্ত হননি মেসি। এ বার বার্সা যত খারাপ খেলেছে, তত চাপ বাড়ানো হয়েছে তাঁর ওপর।
প্র্যাকটিসে প্রায় বমি করছে। শরীর একেবারে বেহাল।
ইনকাম ট্যাক্স হানা নিয়ে বিপর্যস্ত।
হতাশায় ভুগে নিজের ফুটবলীয় দক্ষতায় সব বিশ্বাস হারিয়েছে।
ফুটবল প্যাশন হারিয়ে ফেলেছে।
শেষটা সবচেয়ে মারাত্মক।
যে পর্যবেক্ষণে স্প্যানিশ ফুটবলসমাজে হুটপাট ফেলে দেন বার্সার প্রাক্তন সহকারি কোচ এঞ্জেল কাপ্পা। ভ্যালেন্সিয়ার কাছে বার্সা ২-৩ হারার পর কাপ্পা বলেছিলেন, ”ফুটবলে রাজ করতে হলে যে প্যাশনটা চাই যে আমি সর্বত্র বল খুঁজব… ডাইনে…. বাঁয়ে… মাঝে…. ওয়ান টু খেলব… কাটাব…. দৌড়োব…. মেসির সেই জায়গাটাই নড়ে গিয়েছে। খেলাকে অবিমিশ্র ভালবাসলে ওই প্যাসনটা আপনিই চলে আসে। মারাদোনা ভাবুন। ইনিয়েস্তা দেখুন। জাভি দেখুন। মেসি সেখানে উৎসাহহীন, আপন খেয়ালে চলা এক নৌকোর মতো। এক-এক সময় মনে হচ্ছে পনেরো বছর ধরে ফুটবলের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়েছে। এখন সেই বিয়েতে বুঝি ও বোর হয়ে গিয়েছে।”
মেসি ঘনিষ্ঠমহলে বলেছিলেন, এঞ্জেলের ভলি যে ভঙ্গিতে আসতে পারে দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। কিন্তু অভিযোগের সরাসরি কোনও জবাবও দেননি। তাঁর বরাবরের স্টাইল হল, ফুটবল বুটের চেয়ে বড় মাইক্রোফোন পৃথিবীতে কোনও কালে আবিষ্কৃত হয়নি। এ বারও তাঁর দেশের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের বিশ্বাস, প্যাসন আছে কি নেই তার উত্তর একটা অসাধারণ কোরিওগ্রাফ করা গোলের মাধ্যমেই দেবেন মেসি। তিনি জানেন, অন্তত আর্জেন্তিনা তাঁর ওপর ভরসা হারায়নি।
প্রতি বার আর্জেন্তিনা-বিপর্যয়ের পর কারণ অনুসন্ধানের রিপোর্টে জাভি বা ইনিয়েস্তার একটা অনিবার্য কোট থাকে, ”বার্সায় ও সাপোর্টটা পায়। দেশের হয়ে পায় না।” ঘুরিয়ে-ঘারিয়ে যেন বলা, মেসি করে রেখেছি আমরা। স্প্যানিশ মিডিয়া যাকে বিশ্বমঞ্চে ‘লজ্জা’ অ্যাখ্যা দিয়েছে, সেই পূর্ণাঙ্গ ফুটবল-বস্ত্রহরণের পর মেসি কি হালকা করে বলবেন, ”জাভিরা বার্সেলোনায় গোল করার লোক পায়।” বা একটা টেক্সটও করবেন বন্ধুদের?
মনে হয় না। ফুটবল বুটই তাঁর সবচেয়ে জোরালো এসএমএস। যা নিয়ে মারাকানায় তিনি শুরু করে দিচ্ছেন দেশ এবং নিজের বিশ্বযুদ্ধ। এঞ্জেল কাপ্পাও তো খেলছেন কাল বসনিয়ার হয়ে। তাই না?
রিও, ১৫ জুন
