ব্রাজিল ২০১৪ – ৬
জন্মদিনটা নিজের দেশেই যেন কাটল লিও মেসির
পোর্তো আলেগ্রে হল ব্রাজিলের কন্যাকুমারিকা। একেবারে দক্ষিণ বিন্দুর ওপর বসা টিপের মতো।
তার শুধু কোনও ভারত-মহাসাগর নেই। আছে সমুদ্র-সদৃশ বিশাল নদী। যার ধারাটা বিচের মতো ব্যবহার করেন স্থানীয়রা। গোটা ব্রাজিলের মধ্যে জীবনযাত্রার মান এখানে সবচেয়ে উঁচু। সাদা বাংলায় রিওয় যেটা পঞ্চাশ ডলারে পাবেন, সেটা এখানে চোখ বুজে পঁচাত্তর! আরও একটা বৈশিষ্ট্য এই ব্রাজিলীয় শহরের রয়েছে, যা গোটা দেশের নেই।
পোর্তো আলেগ্রে বলে ব্রাজিলের একটা অদ্ভুত জায়গা আছে যেখানে বরফও পড়ে মাঝেমধ্যে, এটা নিশ্চয়ই লালমোহনবাবু বেঁচে থাকলে কোনও না কোনও দিন শুনতেন ফেলুদার কাছে!
জুনের শেষে সেখানে বরফের কাহিনি নেই। কিন্তু কনকনে ভাবটা বিস্তর। সেটা বোধহয় হাড়ে হাড়ে আরও জানান দিত, ব্রাজিলের এই দক্ষিণ দেশে কোনও এক লিওনেল মেসির উপস্থিতি না থাকলে! এমনিতে পোর্তো আলেগ্রে হল ব্রাজিলের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী প্রদেশ। যার আগে ঠেকাঠেকি করে রয়েছে এক দিকে উরুগুয়ে, এক দিকে আর্জেন্তিনা। বুয়েনস আইরেস থেকে পোর্তো আলেগ্রে প্রায় কলকাতা-আগরতলা করার মতো ব্যাপার!
আর্জেন্তিনার অনেক গরিবগুর্বো সমর্থক রয়েছে, যাদের প্লেনে লম্বা জার্নি করে ব্রাজিলের দূর-দূর খেলা দেখতে আসার সঙ্গতি নেই। কিন্তু পোর্তো আলেগ্রে তো বলতে গেলে নিজের পাড়া। তা-ও আবার তাদের ভালবাসার রাজকুমারের জন্মদিনে থাকা যাচ্ছে। প্লাস বুধবার দুপুরে নাইজিরিয়া ম্যাচ দেখে রাত্তিরেই দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। কেউ ছাড়ে? ফিফার এক কর্তা ব্রাসিলিয়ার বিমানবন্দরেই হুঁশিয়ার করে দিলেন, ”সকাল থেকে পোর্তো আলেগ্রের যা খবর পাচ্ছি, ব্রাজিলের ভূখণ্ড আর্জেন্তিনা এক রকম নিয়ে নিয়েছে।”
বিশেষ গ্রিটিংস কার্ডও বেরিয়েছে বার্থডে বয়কে সম্মান জানাতে। মঙ্গলবার সকালে ব্রাসিলিয়া বিমানবন্দরের দোকানগুলোয় দেখছিলাম প্রথম পাতায় রোনাল্ডোর বড় ছবি দিয়ে লেখা। কী লেখা, একজন পাশ থেকে অনুবাদ করে দিলেন, প্লে-বয় গো হোম। একই দিনে লিওনেল মেসি যখন ব্রাজিলেও আদরের বার্থডে বয় হিসেবে বন্দিত হচ্ছেন, সেই একই দিন রোনাল্ডোর রকস্টার ইমেজকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁকে প্লে-বয় বলে কটাক্ষ করছে।
বিমানবন্দরের সামনে একটা কোচ থেকে নামলেন কার্লোস। ইনি সক্রেটিসের বিরাশির ব্রাজিল টিমে ছিলেন। এখন এ দেশের নামী ভাষ্যকার। লম্বা পেটানো চেহারা। কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। ফিফা প্রতিনিধি তাঁকে দেখতে পেয়ে বলেন, ”মারাদোনার কাণ্ডটা সে দিন দেখলে?” কার্লোস পর্তুগিজে কী একটা উত্তর দিলেন স্বদেশীয়কে, বুঝলাম না। চলে গেলেন চেক-ইন করতে। ব্রাজিলীয় ফুটবল ফেডারেশনের ফিফা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি তখন গজগজ করছেন, ”মানছি তুমি অসাধারণ ফুটবলার ছিলে। তা বলে এত অসভ্যতা করবে কেন? মারাকানায় যে গেটটা দিয়ে তোমার ঢোকার কথা, সেখান থেকে তোমাকে যেখানে আটকানো হয়েছিল মাত্র পাঁচ মিটার কি না সন্দেহ। কেন তুমি বুঝবে না যে, ওই গেটটাই তোমার? প্লেয়ারদের গেটটা নয়! এমন দম্ভ তোমার যে, ওই গেট দিয়ে যখন ঢুকতে দেওয়া হল না, তুমি বেরিয়ে চলে গেলে। আর তার পর গালাগাল দিলে ফিফাকে।”
কর্তাটি এ বার গলা নামিয়ে বলেন, ”ঘটনার সারমর্ম একটাই যে, তুমি তিন নম্বর। এক পেলে। দুই জিকো। তার পর তুমি। ড্রাগ না ধরলে তুমি পেলেকে নিশ্চয়ই হারাতে পারতে। কিন্তু পারোনি এটাই রেকর্ডে রয়েছে।” দেখলাম মারাদোনার ওপর বিস্তর ক্ষোভ। ”এখানে এসে দুটো হোটেল ভাড়া করেছে। একটায় আছে পরিবার। একটায় বান্ধবীরা। এক বার এখানে যাচ্ছে। এক বার ওটায় গিয়ে রাত কাটিয়ে আসছে।” তিনি কি জানেন মেসির আজ জন্মদিন? বলেন ”নিশ্চয়ই। ফিফা তো ওকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছে সকাল-সকাল।” এর পর বললেন, ”এ-ই হল ফুটবলার। আমার ধারণা ও পেলের পরেই চলে আসবে। রোনাল্ডোর মতো উদ্ধত নয়। আসে, খেলে, চলে যায়। অসাধারণ। প্লেয়ার এমনই হওয়া উচিত।”
যা নির্যাস পেলাম ব্রাজিল আসা ইস্তক দেখছি। হলুদ জার্সির বিরুদ্ধে মেসির দাঁড়ানোটা যাদের কাছে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের, তারাও মনে মনে মেসি মানুষটাকে পছন্দ করেন। তাঁর ফুটবল প্রতিভাকে বুক ঠুকে সার্টিফিকেট দেন। ব্রাজিল ফুটবল সমাজেরই যেখানে নীরব অনুমোদন রয়েছে। সেখানে আর্জেন্টাইন ফুটবল ভক্তদের তাঁকে নিয়ে কী উদ্দীপনা থাকতে পারে, সহজবোধ্য। সুরকার শান্তনু মৈত্র কাল ব্রাসিলিয়ায় ব্রাজিল ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি আর পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী বিশ্বকাপের খেলা দেখে বেড়াচ্ছেন। তা শান্তনুর ব্রাজিলীয় সমর্থকদের সুর করে পরের পর গান দেখে অবিশ্বাস্য লেগেছে। ”একটা মোটিভেশন নিয়ে এখানে থেকে ফিরব যে, আমাকেও এক দিন এ রকম সুরেলা গান লিখতে হবে যা গোটা জাতিকে একসঙ্গে নাড়িয়ে দেবে।”
কিন্তু শান্তনু তো এখনও আর্জেন্তিনা দেখেননি। দেখলে বুঝতেন ভিনদেশে অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে এসেও এরা কত চিত্তাকর্ষক, আমুদে এবং একই সঙ্গে মারকুটে হতে পারে।
আর্জেন্তিনার আগের ম্যাচে ইরান যখন প্রচণ্ড লড়াই করছে, গ্যালারির এক অংশ হঠাৎই ‘ওলে ওলে ইরান’ শুরু করে দিয়েছিল। সেটা চলছিল দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে। মেসির গোল হতেই আর্জেন্তিনার তীব্র চিৎকারে সে সব ধুয়ে দেয়। আর তার পর থেকে পোর্তো আলেগ্রে শহরের রাস্তায়-রাস্তায় তাদের সমর্থক বাহিনী এখন সুর করে গাইছে আর নাচছে। পোর্তো আলেগ্রে হল ব্যারেটোর বাড়ি। কে বলতে পারে, ব্যারেটোর বাড়ির বাইরেও সেই আর্জেন্তিনীয় কবিয়ালদের ব্যান্ড পার্টি নাচছে না আর গাইছে না ওই গানটা যাকে তারা নাম দিয়েছে, ব্যাড মুন রাইজিং। আকাশে অশুভ চাঁদের উদয়।
এদের গানের লাইনগুলোর ‘মানে খেউড়ের কাছাকাছি’ বঙ্গানুবাদ করে দিলাম:
ব্রাজিল বলো তো ভাই, এখন কেমন লাগছে / তোমাদের বাবা যে তোমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছে / শপথ করে বলতে পারি এতগুলো বছর পরেও / তোমরা ভোলোনি / দিয়েগো কী ভাবে ড্রিবল করেছিল / ক্যানিজিয়া তার পর সাঁচটা কেমন ঢুকিয়ে দিয়েছিল / সে দিন থেকে আজ অবধি তোমরা কেবল কেঁদেই চলেছ / এ বার দেখছ মেসিকে / কাপটা যে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে / কারণ মারাদোনা যে পেলের চেয়েও বড় রে ভাই।
ব্রাজিলীয়রা শুনলাম পাল্টা গান বাঁধছেন। এ যেন ভোলা ময়রা আর অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির ফুটবল-কবিতার লড়াই! কিন্তু যত দিন না ব্রাজিলীয়দের প্রত্যুত্তরের গানটা বাজারে আসে, ব্রাজিলের দক্ষিণ ভূখণ্ড শুধু নীলে ভরা। তার ওপর কেবল জন্মদিনের একটা লাল গোলাপ আর সাতাশটা মোমবাতি। কালকের ম্যাচ জেতাটাও জরুরি হঠাৎ উদ্দীপিত ফ্রান্সকে দ্বিতীয় রাউন্ডে এড়াবার জন্য। সুইজারল্যান্ড বা হন্ডুরাস পড়লে জন্মদিনের পার্টিটা এক সপ্তাহ চালানো যেতে পারে।
কিন্তু খেলার এ সব কচকচি—সার্বিক বিচারে এই মুহূর্তে ব্রাজিলের দক্ষিণতম ভূখণ্ডে মূল্যহীন।
অনেক জরুরি কথা হল লিওনেল মেসি তাঁর নিজের সাম্রাজ্যে সাতাশতম জন্মদিনের দ্বিতীয় দিনটা কাটাবেন।
পোর্তো আলেগ্রে ২৫ জুন
সুয়ারেজের দাঁতের চেয়ে বেশি কামড় মেসির বাঁ পায়ে
ঈশ্বরের হাত খ্যাত সেই গোলের পর সুয়ারেজের দাঁত।
বিশ্বকাপে আর কোনও অঙ্গপ্রতঙ্গ নিয়ে গত চৌত্রিশ বছরে এত গবেষণা হয়নি, যা উরুগুয়ান স্ট্রাইকার শুরু করে দিলেন কাল বিকেল থেকে। আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলে তাঁর কামড়ের হ্যাটট্রিক নিয়ে প্রাক-আর্জেন্তিনা ম্যাচও এতই হইচই যে মনে হল যাক, আজ লিওনেল মেসির গ্রহণ হতে যাচ্ছে।
এমনিতেই আর্জেন্তিনা গ্রুপ থেকে উঠে গিয়েছে বলে বুক ছ্যাঁতছ্যাঁত করা অনিশ্চয়তার পরিমান নেই। তার পর জিওর্জিও চিয়েলিনির বাঁ কাঁধ খুবলে যাওয়া।
গ্রেটরা কি এ রকম পরিস্থিতিকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেয় যে কেউ যা ভাবছে না ঘটবে, সেটা করে দেখিয়ে দেব? একা ঘুরিয়ে দেব যাবতীয় ভাবনার মোড়? নইলে কী ভাবে ব্যাখ্যা হয় এস্তাদিও বেইরা রিওয় বুধবারের মেসির? সরি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রবল ভাবে আলোচিত হওয়ার দিন তো, তাই মেসি নন, মেসির বাঁ পা।
জাদুগরি? চলবে না, অনেক বার হয়ে গিয়েছে।
ভোজবাজি? বড্ড বস্তাপচা।
অলৌকিক? ঊনিশ শতকের বাংলা।
মেসিচিত বরং বলার সময় হয়েছে। মেসিচিত দু’টো গোলে আফ্রিকান চ্যালেঞ্জ উড়িয়ে দিল মারাদোনার দেশ। মাঠে বসে বিশ্বকাপে তাঁর পরপর তিনটে ম্যাচ দেখলাম। যত বিশ্বকাপ এগোচ্ছে তত যেন বেশি রিল্যাক্সড এবং আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন মেসি। দেশের হয়ে খেলতে পারে না মতবাদ পোর্তো আলেগ্রের স্টেডিয়াম মুখোমুখি লেকের জলে পড়ার সুযোগ পায়নি। কারণ সেটা তো আগেই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। জাভি-ইনিয়েস্তেরা বল না বাড়ালে নাকি গোল করতে পারেন না। তা বিশ্বকাপে চার গোল করে ফেলার পর সেটাও আর কারও মুখে শোভা পাচ্ছে না।
কেমন মনে হচ্ছে ভেতর থেকে একটা প্রশান্তিতে আছেন আর্জেন্তিনীয় অধিনায়ক। নাইজিরিয়া দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ২-২ করে ফেলার পরেও ভেতরের সেই আরামে আঁচড়টুকু পড়েনি। তাঁর গোটা মনোভাবটাই এমন যেন যিশুর বাগানে মুক্তকচ্ছ হয়ে ফুটবল খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। সানন্দে ফ্রি কিক মারছেন, কর্নার করছেন। দু’তিন জনকে ড্রিবল করে বেরোচ্ছেন। সুয়ারেজের দাঁতের চেয়েও উগ্র সমালোচকদের দাঁত-নখ তো আর সেই যিশুর বাগানে পৌঁছনোর নেটওয়ার্ক পায় না।
এখন মনে হচ্ছে আটলেটিকো মাদ্রিদের শীর্ষকর্তা কলকাতায় খুব দামি কথাই বলেছিলেন যে, বার্সায় এ বছরের পারফরম্যান্স দিয়ে মেসিকে মাপতে যাবেন না। ও বিশ্বকাপে নিজেকে পুরোপুরি তৈরি করবে বলে সাময়িক গো স্লো দিয়েছে। আর্জেন্তিনীয় সাংবাদিকদের মুখেও শুনেছিলাম বছরটা শেষ হয়েছিল তাঁর নানা বিপর্যয়ের মধ্যে। শরীর খারাপ। ফর্ম ঠিক নেই। আয়কর বিভাগের হানা। কিন্তু জানুয়ারি থেকে একমনা হয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন বুয়েনস আইরেসে। এ দিন বাঁ পায়ে যে বাইশ গজের ফ্রি কিকটা মারলেন, আন্দাজ করছি বুয়েনস আইরেসে কত দিন প্র্যাকটিস করেছিলেন?
বার্সার হয়েও ফ্রি কিকে অনেক গোল আছে মেসির। কিন্তু তাঁর প্রবলতম প্রতিপক্ষ যেমন ফ্রি কিক স্পেশ্যালিস্ট, মেসি তা নন। রোনাল্ডোর নাকল-বলের মতো মেসির ফ্রি কিক কোনও ব্র্যান্ড নয়। কিন্তু এ দিন বাঁ পায়ে যে টপস্পিনটা রাখলেন রামধনুর মতো ছড়িয়ে গিয়ে ফার্স্ট পোস্টের কোণ ঘেঁষে ঢুকে গেল, সেটাকে কী বলা হবে? ওই শটটায় আর্জেন্তিনা ২-১ এগোল। কিন্তু স্কোরে কী আসে যায়!
যিশুর বাগানে শোভা পাবে এমন শট দেখার পর কেউ কি ম্যাচের স্কোর হিসেব করতে বসে?
বুয়েনস আইরেসে মেসি যেখানে ট্রেনিং করেন, সেটা পোর্তো থেকে বাসে দশ ঘণ্টা। আর ভিটা ফ্লোরিটো শহরতলিতে মারাদোনার বাড়ি সাড়ে এগারো ঘণ্টা। লাতিন আমেরিকান নাগরিক হলে একটা দেশ থেকে আর একটা দেশে যাতায়াতে কোনও ভিসার কাহিনিও নেই। কাজেই একলক্ষের মতো আর্জেন্তিনীয় চলে এসেছেন সীমান্তবর্তী ব্রাজিলীয় শহরে। এঁদের সবাই যে মাঠে ঢুকতে পারলেন, তা তো নয়। পোর্তো মাঠের জায়গা এর অর্ধেক। কিন্তু সমর্থনের জন্য মাঠে ঢুকতে হবে নাকি?
আর এঁদের একটাই মাধ্যাকর্ষণ—লিওনেল মেসি। মার্কোস রোহো এ দিন জয়সূচক গোল করলেন মেসির কর্ণার থেকে। তাঁকে সামনে পেলেও যে এঁদের খুব একটা ঔৎসুক্য থাকবে বলে মনে হয় না। কাল মাঝরাত্তিরে দেখছিলাম পোর্তো আলেগ্রে বাস স্টেশনের ঠিক উল্টো দিকের রিট্টার হোটেলে এঁরা বিশ্বকাপের পুরস্কার-বিতরণ সেরে নিলেন। একটা বিশ্বকাপের রেপ্লিকা নিয়ে এসেছিলেন। একজনকে কল্পনার সেপ ব্লাটার সাজানো হয়েছিল। এক সমর্থক মেসি সেজে তাঁর হাত থেকে বিশ্বকাপ নিলেন। সবাই ভিডিও ক্যামেরার দৃশ্যটা ধরে রাখল।
এই মুহূর্তে আর্জেন্তাইন সমর্থকদের এমনই মানসিকতা। টিম সবে দ্বিতীয় রাউন্ডে কিন্তু তাঁরা মানসচক্ষে ১৩ জুলাইয়ের মারাকানা এবং কাপ ছাড়া কিছু দেখছেন না।
কে বুঝবে তাঁদের ডিফেন্সটা ব্রাজিলের ফজলি আমের মতো। দেখতে মনে হয় খুব মিষ্টি কিন্তু টকের একশেষ। একটা খেলে দ্রুত ডাইজিন লাগবে। নাইজিরিয়া সেটা আবার দেখাল। নেইমারের তো তবু দাভিদ লুইজ আর দিয়াগো সিলভা আছেন। মেসির লড়াই তিনি এবং অনন্ত।
আর্জেন্তিনীয় সমর্থককে কে বোঝাবে! তাঁরা তো পুরস্কার-বিতরণী করে ফেলেছেন।
পুনশ্চ : লিখতে ভুলে গিয়েছি প্রথম গোলটা সেই বিখ্যাত বাঁ পায়ে। বাঁ পায়ের কামড়ের যা জোর দেখছি, শেষ ষোলোয় ডান পা-ও আসবে। ভঙ্গুরতম ডিফেন্স এবং মেসির দু-পা।
নাইজিরিয়া কোচ তো খেলার পর বলেই দিলেন, আর্জেন্তিনা টিমের অন্যরাও ভাল খেলে। কিন্তু তারা এই পৃথিবীর। মেসি এসেছে বৃহস্পতি থেকে। বিশ্বকাপের প্রথম তিনটে ম্যাচেই গোল আর বিপক্ষ কোচের তাঁকে আখ্যা দেওয়া—গ্রহান্তরের মানুষ।
ধুর ধুর কোথায় সুয়ারেজের দাঁত।
পোর্তো আলেগ্রে ২৬ জুন
বিশ্বকাপের বিয়েবাড়ি থেকে সেই তাড়িয়েই দেওয়া হল সুয়ারেজকে
মঙ্গলগ্রহ একাদশকে খেলার জন্য এখুনি ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে যদি একটা টিম বাছতে হয়, ফরোয়ার্ড লাইন তৈরিতে সবচেয়ে কম সময় যাবে।
লিওনেল মেসি।
নেইমার দ্য সিলভা।
লুই সুয়ারেজ।
আর ম্যাচটা মঙ্গলগ্রহে হলেই একমাত্র খেলতে পারতেন সুয়ারেজ। কেননা এই গ্রহের সর্বত্র আগামী চার মাসের জন্য তিনি ফুটবল থেকে নির্বাসিত। সরকারি ভাবে সাজা হল বিশ্বকাপে উরুগুয়ে আর যত দিন টিঁকে থাকবে, সেই মেয়াদ সমেত ন’টা আন্তর্জাতিক ম্যাচের। এমনকী ফিফার শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি তাঁর দাঁতের কামড় নিয়ে এতটাই উত্তেজিত যে তারা এই ক’মাসের মধ্যে সুয়ারেজের কোনও ফুটবল স্টেডিয়াম ঢোকাও নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। নাটালে দ্বিতীয় রাউন্ডে কলম্বিয়ার সঙ্গে নিজের দেশের খেলা তিনি রিজার্ভ বেঞ্চ বা গ্যালারি কোথাও বসে দেখতে পারবেন না।
শোনা যাচ্ছে, ঊনিশ সদস্যের ফিফা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি সর্বসম্মত ভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুয়ারেজের আইনজীবী দাবি করেছিলেন, ইংল্যান্ড আর ইতালি তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু ফিফা শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিতে যাঁরা এককাট্টা হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, তার প্রধান সুইজারল্যান্ডের। সহ প্রধান সিঙ্গাপুরের। এমনকী পাকিস্তান বা কলম্বিয়ার সদস্য রয়েছেন। এঁদের মনে হয়েছে ফুটবলের ভাবমূর্তি রক্ষায় এ রকম দৃষ্টান্তমূলক শান্তির প্রয়োজন ছিল।
সোজা কথা লুই সুয়ারেজকে ঘাড়ধাক্কাটুকু দিতে বাকি রেখে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে। খুব দ্রুতই তাঁর মন্টেভিডিওগামী বিমানে ক্লিষ্ট মুখের ছবি চলে আসা উচিত। উরুগুয়ে সরকার যতই উত্তেজনা দেখাক। ফুটবল ফেডারেশন যতই আবেদন করুক। সুয়ারেজের বিশ্বকাপটা অন্তত গেল। আর জিওর্জিও চিয়েলিনিকে কামড়ে দেওয়ার জন্য তিনি যা সাজা পেলেন, এত বড় সাজা বিশ্বকাপ ইতিহাসে নেই। চুরানব্বইয়ে স্পেন ফুটবলার লুই এনরিকের নাক ভেঙে দেওয়ার জন্য আট ম্যাচ সাসপেন্ড করা হয়েছিল ইতালিয়ান মিডফিল্ডার মার্কো তাসোত্তিকে। সুয়ারেজকে যে ন’ম্যাচ বাইরে বসিয়ে দেওয়া হবে সেটা ফুটবলমহল স্বপ্নেও ভাবেনি। ফিফার দেশগুলো যতই একমত হোক, ফুটবলাররা অনেকে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন, তাঁর মাঠে খেলা দেখতে আসার অধিকার কেড়ে নেওয়া হল দেখে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট বা টিভি চ্যানেলে অনেকেই বলেছেন, ও কি অপরাধী নাকি? ও কি কাউকে খুন করেছে? কিন্তু এ সব বলায় কিছু আসে যায় না। শাস্তির সিলমোহরের উপর সই হয়ে গিয়েছে।
বিষ্যুদবার পোর্তো আলেগ্রে থেকে দু’বার ফ্লাইট বদলে বেলো হরাইজন্তে নামার সময় পারিপার্শ্বিক দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, সুয়ারেজের অন্ধকারের মধ্যে নির্বাসিত হয়ে যাওয়াটা কী অদ্ভুত বৈপরীত্য। গোটা ব্রাজিল এখন হাসছে। নাচছে। কাপ দিয়ে তুমুল আলোচনা করে যাচ্ছে। যেখানে যান, ফুটবল থেকে নিস্তার নেই। পোর্তো বিমানবন্দরে বিশাল বিশাল সব দেশের পতাকা। বেলোয় প্রত্যেকটা দেশের জার্সির পাশে ফুল স্তূপীকৃত করে রাখা। শহরের মধ্যে একটু পরপর পোস্টার, বেম ভিন্দে। আপনাকে স্বাগত। পাবে বসে লোকে রেডিও চালিয়ে পাগলের মতো পর্তুগাল-ঘানা ম্যাচের কমেন্ট্রি শুনছে। যে পাবে টিভি আছে তার বাইরে তো মেট্রো সিনেমার সামনের মতো গিজগিজে ভিড়। প্লেনের মধ্যেও সারাক্ষণ টিভিতে মেসি-নেইমারদের গোল দেখাচ্ছে। দেখাচ্ছে স্কোলারি-সাবেয়াদের প্রেস কনফারেন্স পর্যন্ত।
মনেই হচ্ছে না এই দেশে মাত্র দিন সতেরো আগে কত গঞ্জনা শুনেছি বিশ্বকাপ সম্পর্কে। বিশ্বকাপের মুখ বলে লোকে পেলে-রোনাল্ডোকেও প্রকাশ্যে গালাগাল করতে ছাড়েনি। এ দিন পোর্তো থেকে রোনাল্ডোদের বেসক্যাম্প যেখানে সেই ক্যাম্পিনাস আসার সময় ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন উদ্বিগ্ন ভাবে বলছিলেন, ”ব্রাজিলীয় ডিফেন্সকে আমার বিশ্বাস নেই। একটা অঘটন যদি হয়ে যায় আবার কিন্তু দেশে বিশ্বকাপ বিরোধিতা ফিরে আসবে।”
কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ প্রবক্তার সংখ্যা আর কত? ব্রাজিল যে বরাবরের চার্বাক দর্শনে বিশ্বাসী। এখন ইন্দ্রিয়সুখ কীসে—না নেইমার-মেসির যুগলবন্দিতে।
দু’জনেই চারটে করে গোল করে ফেলে গোল্ডেন বুটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এটাই একমাত্র মিল নয়। দু’জনে যেন নিজের নিজের টিমের হয়ে এক ঘোড়ার গাড়ি টানছেন। এঁদের চোট হলে কী হবে, ভাবনায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কোচেরা পুরো সময় মাঠে অবধি রাখতে পারছেন না। বিশ্বে এত সব প্রান্তের মানুষ এ দেশে এসে ব্রাজিলবাসীর সঙ্গে খুশিতে মাতোয়ারা। বিয়েবাড়ির অদৃশ্য প্যান্ডেল তৈরি আছে যাবতীয় ডেকরেশন সমেত। তার পর বুটের কারুকার্যে যেন হাজার-হাজার ওয়াট আলোর সব ঝাড়লন্ঠন লাগিয়ে দিয়েছেন মেসি-নেইমার। ওঁদের দুই দেশ ফাইনাল যাক বা না, ব্রাজিল বিশ্বকাপের লাইটিংয়ের দায়িত্বে এঁরা দু’জন। বার্সার দুই সতীর্থ।
আর সেই ঝাড়লন্ঠনের পাশে মূর্তিমান অন্ধকার যেন সুয়ারেজ। বিশ্বকাপের চুরাশি বছরের ইতিহাসে এমন কলঙ্কিত প্রস্থান সেই মার্কিন বিশ্বকাপে মারাদোনা ছাড়া কারও ভাগ্যে জোটেনি। উরুগুয়ে সাংবাদিকেরাও কেউ কেউ তাঁদের ক্যাপ্টেনের মতোই বলেছেন, ইতালির জাঁদরেল ডিফেন্ডার যে এত অপুরুষোচিত মনোভাব দেখাতে পারেন তা তাঁরা ভাবতেই পারেননি। কেউ কেউ বলেছেন, রেফারি যদি ক্রমাগত সুয়ারেজকে লাথি মারার জন্য ইতালি স্টপারদের আগে সতর্ক করতেন, এই ঘটনা হত না। প্ররোচনা পুরোটা ইতালি থেকে এসেছে।
কিন্তু ডিফেন্ডার লাথি মারলেই যদি তাকে কামড়ে দিতে হয়, তা হলে তো নেইমার-মেসির বত্রিশ পাটির প্রতি ম্যাচে ব্যবহার হওয়া উচিত। বন্যতার শান্তি দিয়েছে ফিফা এবং আবিষ্কার করেছে, মোটামুটি বাকি ফুটবল-বিশ্বে পাশে রয়েছে।
তা বলে সুয়ারেজও এই বিশ্বকাপের একতরফা অন্ধকার নন। আলো তো তিনিও বয়ে এনেছিলেন প্রথম ম্যাচে দু’গোল করে।
নির্বাসনের দিন সুয়ারেজের নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে, গোল্ডেন বুটের দাবিদার আমিও তো হতে পারতাম। দুটো ম্যাচে দুটো গোল করেছি। বুফোঁ ওই শটটা দারুণ না বাঁচালে তিনটে হত। ইংল্যান্ড ম্যাচে জয়সূচক গোলের পর হাউহাউ করে কেঁদেই ফেলেছিলাম এক মাসের আগের জীবনটা মনে করে। যখন আমি হুইলচেয়ারে ঘুরছিলাম। বিশ্বকাপ খেলতে পারব কি না জানতাম না। সেই বিশ্বকাপে এলাম। এসেও নিয়তি আবার বাড়ি পাঠিয়ে দিল।
হুইলচেয়ারের অন্ধকার থেকে নিজকৃতিত্বে আলোয় ফিরে আবার সেই আলোটাকেই বিসর্জন দিয়ে দিলেন উরুগুয়ান। যত দিন বিশ্বকাপ থাকবে তত দিন সর্বকালের ট্র্যাজিক নায়কের নমিনেশনে তাঁর নামটাও থাকবে! অন্যদের হয়তো যন্ত্রণার বহর আরও বেশি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকেও তো নকআউট পর্বের আগেই চলে যেতে হল। কিন্তু তাঁর একটা সান্ত্বনা আছে, সেই নিষ্কমণ নিছক ফুটবল স্কিলের ব্যর্থতায়। গায়ের জোরে ভরা বিয়েবাড়ি থেকে আর কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
বেলো হরাইজন্তে, ২৭ জুন
ব্রাজিলের বহিরঙ্গে গিটার, ভেতরে হাড় হিমহিমে চিলি
লুই সুয়ারেজের দাঁত কেলেঙ্কারি! ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর গোল করেও বিশ্বকাপ নিষ্ক্রমণ। লিওনেল মেসির স্বর্গীয় ফ্রি কিক।
ক প্লাস খ প্লাস গ। তিনটে মিলেজুলে অন্তত বৃহস্পতিবারের জন্য স্কোলারির ব্রাজিল নিয়ে ক্রমাগত চলতে থাকা উত্তেজিত আলোচনাটা সামান্য মিউটে! নইলে আটচল্লিশ ঘণ্টা বাদেই এমন একটা দেশের সামনে হলুদ জার্সি নামছে যাদের মিনেইরো মাঠেই হারাতে না পেরে তারা প্রভুত অসন্তাোষের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। সবচেয়ে বিড়ম্বনার মুখে পড়েছিলেন ব্রাজিলের আজকের সোনার ছেলে নেইমার দ্য সিলভা।
বিশ্বকাপ নকআউট মানেই কঠিন। সেটা যদি আবার জাতীয় দলের বরাবরের বাঘা তেঁতুল চিলি হয়, তা হলে তো আরওই। স্কোলারি নিজেই যেখানে স্বীকার করে নিচ্ছেন, আর যাকে হোক চিলিকে সামনে চাননি। সেখানে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মহাযুদ্ধ-মাহাত্ম্য আরওই বোঝা যায়!
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্টিভ ওয়র টিমে এই সব পরিস্থিতিতে কোচ যা করতেন, অবিকল তাই করছেন লুই ফিলিপ স্কোলারি। সকালে বেলো বিমানবন্দরে টিম যখন বেরোচ্ছিল, তখন কারও হাতে ড্রাম। কারও হাতে গিটার। স্কোলারির নিজের বাঁধা জায়গা ওয়ান-সি সিটটা ছেড়ে দিয়েছিলেন গানবাজনার জন্য। পাইলটও এই টিমের বাঁধাধরা। প্রত্যেকটা শহরে তিনি নিয়ে যাচ্ছেন। সেই চুরানব্বই বিশ্বকাপের লাকি পাইলট তিনি। আমেরিকার এক-একটা শহরে টিমকে নিয়ে যেতেন। নাচাগানার সময় তিনি না থাকলেও স্টুয়ার্ডরা অংশ নিলেন।
কিন্তু এটা বহিরঙ্গ এবং সব সময় বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভেতরে হাড় হিম করা ঠান্ডার আস্তরণ। আর সে জন্যই হয়তো স্কোলারিকে ঘরে-ঘরে মোটিভেশনাল চিরকুট পাঠাতে হচ্ছে। জন বুকাননের সঙ্গে তফাত হল, তিনি নিজেই লিখে চিটটা প্লেয়ারদের হোটেলের ঘরে ঢুকিয়ে দিতেন। ফুটবল অনেক বেশি সংগঠিত। স্কোলারি চিটটা পেনে লিখে দিচ্ছেন ব্রাজিলীয় ফুটবল সংস্থার মিডিয়া উপদেষ্টাকে। সেটা কম্পোজ এবং স্ক্যান হয়ে প্লেয়ারদের ঘরে-ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।
দাভিদ লুইজ ধারাবাহিক ভাল খেলা সত্ত্বেও ব্রাজিলীয় ডিফেন্সের ওপর বিশেষজ্ঞদের প্রত্যয় এমন কমছে যে, এ দিন প্লেনে স্পেনের গত বারের বিশ্বজয়ী টিমের ডিফেন্ডার জন কাপদেভিয়া বলছিলেন, তাঁর বাজি ব্রাজিল নয়! দেখা হয়ে গেল বিলেতের টিভি বিশেষজ্ঞ ব্রাজিলের প্রাক্তন ফুটবল কাহিলার সঙ্গে। ইনি জাতীয় দলের বারান্দায় বহু বছর ঘোরাফেরা করেও সুযোগ পাননি। কিন্তু ইংল্যান্ডে সতেরো বছর পেশাদার লিগ খেলেছেন। কাহিলা মাঠ থেকে বলেন আর স্টুডিওয় থাকেন কানাভারো এবং প্যাট্রিক ভিয়েরা। শুনলাম, নাইজিরিয়া ম্যাচ দেখার পর কানাভারো-রা তাঁদের সম্ভাব্য ফাইনালিস্টদের নাম বলে দিয়েছেন। ফ্রান্স বনাম মেসি!
স্কোলারিকে প্রসন্ন করার মতো পূর্বাভাস অবশ্যই নয়। ব্রাজিলীয় কোচের অস্বস্তি সামান্য বাড়িয়েছে, বেশিরভাগ দিন রিজার্ভে থাকা ফরোয়ার্ড উইলিয়ানের বাবার মন্তব্য। ব্রাজিল গণমাধ্যম বলছে, ফ্রেডকে বসিয়ে উইলিয়ানকে খেলানো উচিত। জনতাও তাই বলছে সে যতই গোঁফ রেখে ফ্রেড গোল পান। কিন্তু স্কোলারির অবিচলিত আস্থা ফ্রেডে। আর তার কারণও আছে। অতীতে ফ্রেড বড় ম্যাচ জিতিয়েছেন। ট্রফি দিয়েছেন তাঁকে। কিন্তু উইলিয়ানের বাবার অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিতে কোনও আগ্রহ নেই। তিনি সোজাসাপ্টা বলেছেন, ”এই যা টিমের অবস্থা, আমার ছেলের অবশ্যই প্রথম এগারোয় চান্স পাওয়া উচিত।” ক্যামেরুন ম্যাচের শেষ দিকটা উইলিয়ান নেমেছিলেন। তাঁর সক্রিয় নড়াচড়া দেখে ব্রাজিল মিডিয়ারও মনে হয়েছে, ফার্নান্দিনহোর মতোই উইলিয়ান ঢুকলে শক্তি বাড়বে।
মিডিয়া বলা এক রকম। প্লেয়ারের বাবা বলা এক রকম। সিনিয়র উইলিয়ানের মন্তব্য বার হতেই তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্কোলারির তথাকথিত সুখের সংসার কি আসলে ভেতর ভেতরে মাটির মতো ঠুনকো? তার মানে কি স্কোলারির সংসারে আভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে? সুখী পরিবারের এই বারবার ফুটিয়ে তোলা প্রোজেকশন ঠিক নয়? এমন বিতর্ক বেঁধেছে যে উইলিয়ান নিজে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ”আমার বাবা আমার আদর্শ। আমি তো আর ওঁর মনোভাব কন্ট্রোল করতে পারি না। উনি এখন আবেগে ভাসছেন। উনিও ব্রাজিল টিম আর স্কোলারি স্যরকে খুব সম্মান করেন। কিন্তু বাবা হিসেবে ওই যে সেন্টিমেন্ট হয় না যে, আমার ছেলে সব সময় মাঠে থাকুক। তার বশবর্তী হয়ে বলে ফেলেছেন।”
এই বিতর্কের ওপর নবতম নুনের ছিটেও আছে। চিলি টিমে যাঁকে ফুটবল-বিশ্ব সবচেয়ে সমীহ করে, সেই ভিদাল নিজেকে ব্রাজিল ম্যাচের জন্য সুস্থ ঘোষণা করেছেন।
টুর্নামেন্টের হিসেবে যতই টেকনিক্যালি দ্বিতীয় রাউন্ড হোক, দরজার তলা দিয়ে স্কোলারির চিরকুটটা এই ম্যাচেই তো লাগার কথা ছিল।
বেলো হরাইজন্তে, ২৭ জুন
উত্তাপে মনে হচ্ছে আজ বুঝি ফাইনালেই খেলছে ব্রাজিল
রডরিগো তিস্তা এমন হ্যান্ডসাম পুরুষ যাঁকে স্বচ্ছন্দে যে কোনও ব্রাজিলীয় তরুণী বাড়ি নিয়ে বলতে পারে—মা ওকে বাছলাম! হলিউড তারকাদের
মতো ঝকঝকে। লম্বা-চওড়া চেহারা। সব সময় মুখে হাসি লেগে রয়েছে। ব্রাজিল আসার পর থেকে স্কোলারির সব ক’টা সাংবাদিক সম্মেলনে দেখছি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকেন রডরিগো। এমনকী ভারতীয় সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়েও হাসেন-টাসেন, যা ফুটবলের প্রথম বিশ্বে খুব রোজকার ঘটনা নয়।
পরিচয় দেওয়া যাক—রডরিগো অনেক বছর ধরে ব্রাজিল ফুটবল টিমের মিডিয়া ম্যানেজার। হাসি ছাড়া সাংবাদিক সম্মেলনে যাঁর কোনও ভূমিকাই থাকে না, তাঁকে শুক্রবার যেমন তেলেবেগুনে গর্জে উঠতে দেখলাম, গ্রুপ লিগ থেকে সি আর সেভেনের বিদায়ের মতোই সেটা চমকপ্রদ! প্রশ্নটা করা হয়েছিল লুই ফিলিপ স্কোলারিকে, যিনি সাংবাদিক সম্মেলনেও একটা অলিখিত গুরুকুল চালান। এই কী বললে, তুমি বোসো তোমার উত্তরটা আগে দিই, এ রকম। স্কোলারির পাশে আজ ক্যাপ্টেন দিয়াগো সিলভা।
কিন্তু টেবল থেকে মাইক তুলে নিয়ে রডরিগোর গর্জনের সময় দেখলাম তাঁরাও নির্বাক হয়ে গেলেন।
”হে, চিলির সাংবাদিক, কী ভেবেছেনটা কী! যা খুশি তাই বলবেন! ফিফার অমর্যাদা করবেন! এত বড় কথা মুখে আনছেন যে, কালকের ম্যাচে ইংরেজ রেফারি আমাদের টেনে খেলাবে কি না?”
এর আগে মোটামুটি স্কোলারিকে যা জিজ্ঞেস করার, অধিনায়কের যা উত্তর দেওয়ার, সব ঘটেই গিয়েছে। সাংবাদিকদের এক রকম নোটবুক গোছানোর পালা। সেই সময় ইঞ্জুরি টাইমে যে এমন গোলমুখী আক্রমণ হবে, কে জানত! কে-ই বা জানত, তার এত রুষ্ট প্রত্যুত্তর আসবে ব্রাজিল শিবির থেকে!
হোটেল ব্যাঙ্কোয়েটের মতো একটা অত বড় ঘরে হঠাৎ করে এতটাই নীরবতা, যেন পিন পড়লে শোনা যায়। ”ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্যের কোনও খবর রাখেন যে এতবড় কথা বললেন! আমাদের একশো বছরের ফুটবল ইতিহাসটা কোনও দিন নেড়েচেড়ে দেখেছেন? দেখলে বুঝতেন কাপ জিততে রেফারি লাগে না ব্রাজিলের।”
উত্তেজনা সিরিজ রডরিগো থেকে শুরু হল, মনে করার কোনও কারণ নেই। ওটা হয়ে গিয়েছে সকাল-সকাল চিলি অনুশীলনে এক হেলিকপ্টারের আচমকা উপস্থিতিতে। চিলি এমনিতে নিজেদের প্র্যাক্টিসে আর সব দলের মতোই বিশ্ব মিডিয়াকে সকালে পনেরো মিনিট সময় দিয়েছিল। তাতে কিছু দেখানোর কথা নয়। ওটা বাচ্চচাদের লেবেঞ্চুস খাওয়ানো। গোপন ট্যাকটিক্সের ট্রেনিং তো গোপন ভাবেই হওয়ার কথা। মিডিয়াও তাই আরও একটা কনডাক্টেড ট্যুরের পর বেরিয়ে আসে। এর পর সাম্পাওলি যখন তাঁর ছেলেদের নিয়ে আসল স্ট্র্যাটেজি ফর্মেশন করে দেখাচ্ছেন, হঠাৎই উদয় হয় সেই হেলিকপ্টার।
প্রচণ্ড চটে গিয়ে চিলি ফুটবলাররা শূন্যে ধাঁই-ধাঁই শট মেরে হেলিকপ্টারে লাগানোর চেষ্টা করেন। টিমের এক ডিফেন্ডার বিকেলেও গজগজ করেছেন, এত চেষ্টা করেও হেলিকপ্টারে মারতে পারলাম না। বার্সায় নেইমারের সহ-খেলোয়াড় তারকা ফরোয়ার্ড সাঞ্চেজ উত্তেজিত ভাবে বলেছেন, ”এ সবে লাভ নেই। সংগঠকদের নিজের মাঠে হারিয়ে ইতিহাস গড়ব কাল।”
চিলি টিমকে লা রোখা নামে ডাকা হয় আন্তর্জাতিক ফুটবল সার্কিটে। তারা পরিষ্কার বলছে, এই হেলিকপ্টার গুপ্তচরবৃত্তির জন্য পাঠিয়েছিল ব্রাজিল টিম। ধরা পড়ে যাওয়ায় সুড়সুড় করে পালিয়েছে। পরে জানা গেল হেলিকপ্টারটি ব্রাজিলের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল ও গ্লোবোর। তারা দাবি করেছে, রুদ্ধ অনুশীলনের ছবি তুলতে গিয়েছিল। কিন্তু উত্তাপের এমনই আঁচ যে, শেষমেশ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছে।
ক্রিকেটে সেই আজহারের আমল থেকে সুন্দরী মহিলাদের টেপ হিসেবে ব্যবহারের চল আছে। আইসিসির মতে, আজও সেটা হয়ে থাকে। কিন্তু সেখানে খবর পাচার করা হয় বুকিদের, বিপক্ষ দলকে নয়। অতীতের এক বিশ্বকাপে জার্মানদের বিরুদ্ধেও হেলিকপ্টার পাঠানোর অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু সে অনেক পরের দিকের ম্যাচে। দ্বিতীয় রাউন্ডে গুপ্তচরগিরি, রেফারিং নিয়ে প্রকাশ্য এমন অনাস্থা, ব্রাজিলের মতো সুপারপাওয়ার দলের উদ্দেশে এমন গর্জন—কখনও হয়নি।
বেম ভিন্দো আও মুন্দো দে নাকআওতেস।—নকআউটের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগত!
কিন্তু বেলোয় বসে এ সব দেখে-টেখে মাঝেমধ্যে গুলিয়ে যাচ্ছে, সবে দ্বিতীয় রাউন্ড? নাকি কাপ ফাইনাল? ব্রাজিলে ফুটবল ধর্মান্ধতা এমন চরমে পৌঁছেছে যে, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা বুঝে পাচ্ছেন না এমন মহাজাগতিক প্রত্যাশার সঙ্গে কী করে তাল রাখবেন? বেলো ম্যাচের টিকিট পাওয়া আর মন্টেভিডিওয় সুয়াবেজের ইন্টারভিউ জোগাড় করা মোটামুটি সমপর্যায়ে চলে গিয়েছে। এই শহরের বাসিন্দা এক ব্রাজিলীয় তো ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট দিয়েছেন, ‘টিকিট দাও। আমার অ্যাপার্টমেন্ট নাও!’
এমনিতে বেলোয় ড্রাইভাররা যে ভাবে গাড়ি চালায়, তাতে কসবা-রথতলা মিনি, বেহালা চৌরাস্তা-সখের বাজার অটো, দমদম-নাগেরবাজার অটোর অভিজ্ঞতা না থাকলে যে কোনও সময় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি সার্জনের কাছে যেতে হতে পারে। লেন আছে, কিন্তু সেটা মানার জন্য নয়। এক ড্রাইভার বলল, প্রবলেমটা কী জানেন? সবাই মদ খেয়ে গাড়ি চালায়, আর পুলিশ দেখেও না।
বেলো হাইওয়েতে ড্রাইভারদের বন্য গতি কিন্তু কাল স্কোলারির ব্রাজিল তাঁর ফরোয়ার্ডদের মধ্যে দেখতে চাইবে। স্কোলারি যাকে বলেন, ঘণ্টায় একশো মাইল গতিতে শুরু করা। ধরে নেওয়া যায় পওলিনহো কাল বসছেন এবং ফার্নান্দিনহো অন্তত শুরু করবেন। নেইমারকে উগ্র আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত করার চেষ্টা হবে এবং তাতে তাঁর মাথা গরম করলে চলবে না, কারণ একটা হলুদ কার্ড খাওয়া আছে!
বিশ্বকাপে টিম হিসেবে ব্রাজিলের পাশে চিলি হল মোহনবাগান বনাম পুরনো সময়ের ভ্রাতৃ সঙ্ঘ। ভ্রাতৃ দারুণ খেলবে। খেলার পাতায় মুখরিত হবে সেই লড়াই। কিন্তু ম্যাচটা জিতবে মোহনবাগান।
কাগজেকলমে এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। ব্রাজিল কোথাও মনে করছে—আলজিরিয়া, সুইজারল্যান্ড, আমেরিকা যে কেউ হলে চলত। এই শক্ত গাঁটটা এখন না পড়লেই চলছিল না! আর যদি বেলো ড্রাইভারদের মতো গতি চিলি তোলে, তা হলে তো ব্রাজিল জুড়ে মনে হয় শুধুই অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি অপারেশন হবে।
কোথাও একটা মনে হচ্ছে স্কোলারির চাপের আরও বেশি কারণ ব্রাজিলীয় দর্শনবিরোধী খেলায় টিমকে তৈরি করা। পুরনো ব্রাজিল যেভাবে খেলত, চিলি অনেকটা সেভাবে খেলে। আর ব্রাজিল কিনা সেই চ্যালেঞ্জ আটকাতে বাহার বিসর্জন দিচ্ছে। ফুটবল খেলে ফুল ফোটাতে পারলে ভাল। রংমশাল জ্বালিয়ে দিলে আরওই ভাল। কিন্তু সেটা স্কোলারির অগ্রাধিকার নয়। তিনি চান প্রথমে জিততে। তারপর সম্ভব হলে সৌন্দর্য দেখাতে।
কুলীন ব্রাজিল ফুটবল-সমাজ এটা মেনে নিতে পারছে না। তাদের ঐতিহাসিক সীমান্ত লঙ্ঘন করে, ফ্ল্যামবয়েন্স ছেড়ে একান্তই ফলের দুনিয়ায় চলে আসাটা ঘটে বিরাশির বিশ্বকাপের পর। বিরাশির সেই দলকে বলা হয় ব্রাজিলের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক সোনার টিম, যারা দর্শককে আনন্দে বিহ্বল করে দিয়েও কাপ থেকে বঞ্চিত থেকেছে। ব্রাজিল ফুটবলে ঠিক এর পরের পিরিয়ড হল ক্রসওভার যুগ।
স্কোলারিরা মনে করেন, আধুনিক পৃথিবীতে সাবেকি স্টাইলে খেলাটা ছিল ঐতিহাসিক ভুল। ইতালির কাছে সেই ২-৩ হেরে যাওয়ার কাঁটা সমূলে দেশের মাঠে উপড়ে ফেলতে চান স্কোলারি। এ ভাবেই কনফেডারেশন কাপ জিতেছেন। ২০০২ বিশ্বকাপও তো এভাবেই জেতা। তাই তাঁর এই অব্রাজিলীয় ছক বহাল থেকে যাচ্ছে এই টুর্নামেন্টেও।
আর এজন্য সিস্টেমের সঙ্গে ব্রাজিল ফুটবল টিমের একটা সংঘর্ষ প্রতিনিয়ত চলছে। যত টুর্নামেন্ট এগোবে, তত বাড়বে। পুরনো দর্শনের চলমান প্রবক্তা বিরাশির কাপজয়ী দলের অধিনায়ককে বিশ্বকাপে দেখার উপায় নেই। ধোনিদের বিশ্বকাপ জেতার মাসখানেকের মধ্যে তাঁর শোকসভায় মুমূর্ষু ছিল গোটা ব্রাজিল।
সক্রেটিস, অসম্ভব বরেণ্য চরিত্র অথচ বিশ্বকাপ মঞ্চে তাঁর নামই উচ্চচারিত হতে দেখছি না। সক্রেটিস শুয়ে আছেন সাও পাওলো থেকে প্রায় চার ঘণ্টা মোটর-দূরত্বের রিবেরিও প্রেতো বলে একটা সম্পন্ন শহরে। তাঁর গ্যারিঞ্চার মতো অর্থাভাব ছিল না। মাত্র সাতান্ন বছরে চলে যাওয়ার আগে প্রচুর আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়েছেন। দু’হাত ভরে কলাম লিখেছেন। মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগেও লেখার শিরোনাম ছিল, ‘কিছু লোক স্বপ্ন দেখে, কিছু লোক দেখে না’।
নিশানা পেলে। বিজাতীর স্টাইলের বিপর্যয় হলে স্কোলারি কি ছাড়া পাবেন? কে বলেছে যারা কবরে শুয়ে থাকে তারা কলাম লিখতে পারে না?
বেলো হরাইজন্তে, ২৮ জুন
ব্রাজিলকে বাঁচাল সিজারের দস্তানা
খেলা শেষ হয়ে গিয়েছে মিনিটপাঁচেক। সেন্টার সার্কলের ওপর উপুড় হয়ে ওঁরা শোয়া। প্রথমে মনে হবে হামাগুড়ি দেওয়ার মতো। ভাল
করে দেখলে বোঝা যাচ্ছে প্রার্থনার ভঙ্গি।
কোচ গেলেন ডাকতে। বলতে যে, অনুশোচনার কিছু নেই। ওঠো। খেলা হতেই প্রায় বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালেনও সেখানে। তবু এরা উঠছে না দেখে কোচই এ বার সরে গেলেন। নিশ্চয়ই মুখ গুঁজে তাঁর প্লেয়াররা কাঁদছিলেন।
টাইব্রেকারে শেষ মুহূর্তের দুর্ভাগ্য হারালে তো লোকে মুখ গুঁজে কাঁদবেই। গঞ্জালো জারার শেষ পেনাল্টিটা সাইড পোস্টে না লাগলে তো চিলি হেরে দেশে ফেরে না! তারও আগে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে একটা কুড়ি গজি শট ব্রাজিলের ক্রসপিসে লেগে ফিরেছে। হাল্ক যদি দাবি করে যান যে, ইংরেজ রেফারি হ্যান্ড বলের জন্য তাঁর যে গোলটা নাকচ করেছেন সেটা বগলের তলায় লেগেছিল। সেটা বনাম চিলির দুটো দুর্ভাগ্য—কাটাকুটি হয়ে গেল।
আজ সত্যি চিলির ম্যাচ শেষেও মাঠে শুয়ে থাকার দিন। প্রায় একটা গোটা স্টেডিয়াম আর বিশ্ব ফুটবলের এত বড় সুপার-পাওয়ারকে তার দেশে নাস্তানাবুদ করেও কিনা হেরে ফিরছে।
এ বার বলি, শুয়ে যাঁরা কাঁদছিলেন দু’জনের কেউই চিলির নন। একজন পেনাল্টি বাইরে মারা উইলিয়ান। অন্য জন দানি আলভেজ। ওঁদের ডাকতে যিনি গিয়েছিলেন তাঁর নামও লুই ফিলিপ স্কোলারি। কলকাতায় টিভি দেখিয়েছে কি না জানি না, কিন্তু ব্রাজিলের দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস হওয়ার পর ফিলিপাও রিজার্ভ বেঞ্চের দিকে যে ইঙ্গিত করেছিলেন তার অনুবাদ—সব শেষ।
সাধারণত কোচেরা প্রথম বা শেষ পেনাল্টিতে তাঁদের সবচেয়ে দক্ষ পেনাল্টি-মারিয়েদের রাখেন। ব্রাজিল রেখেছিল নেইমার দ্য সিলভাকে। যে বাজারে সাঞ্চেজের মতো ভাল পেনাল্টি-মারিয়ের শট বাঁচিয়ে দিয়েছেন জুলিও সিজার, সেখানে শেষ কিকের চাপ নিতে পারবেন তিনি?
যখন শেষ শট নিতে যাচ্ছেন, গ্যালারি আর নেইমার-নেইমার ডাক তোলার অবস্থায় নেই। আমার সামনের মহিলা কাঁদছেন। তাঁর টিনএজার কন্যা দু’হাত মুখে চাপা দিয়ে বসে আছে। আগের শটটা হাল্ক মিস করায় যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে হাহাকারের লগ্ন আগত। পঞ্চাশের সেই অভিশপ্ত মারাকানা ফিরল বলে।
নেইমার গোটা ম্যাচে থাকা মানে অবিরত ভাল খেলা এবং অবিরত মার খাওয়া। ফিফা তাঁর মতো বল প্লেয়ারদের জন্য কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখেনি, এটা চরম আশ্চর্য। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে তিনি তো আরও অনিরাপদ। চিলি গোলকিপারকে পেছনের গ্যালারি টগবগে আওয়াজে চার্জ করছে, সবে আগের শটটা বাঁচিয়েওছে, এই বার নেইমার সেই পেনাল্টিটা মারলেন যেটা ইউ-টিউবে এখনও রক্ষিত থাকা উচিত। একটা ফলস দিলেন। দৌঁড়ের সঙ্গে ওই ফলসে গোলকিপার বিভ্রান্ত হয়ে যায়। শিবাজি বন্দ্যোপাধ্যায় পেনাল্টি বাঁচানোর স্পেশ্যালিস্ট হিসেবে ভারতে গণ্য হন। তিনি এক বার বলেছিলেন, পেনাল্টি ভাল মারলে তো কিছু করার নেই। তবে একটা টোটকা হল কিকার বল ভাসানোর সময় কোন দিকে তাকাল সেটা দেখে নেওয়া। একমাত্র অমলরাজ ছাড়া সবাই নাকি যে দিকে তাকাতেন তার উল্টো দিকে মারতেন।
শিবাজিদের ফুটবল আর এটা পুরোপুরি অন্য গ্রহ। কিন্তু পেনাল্টির ক্ষেত্রে এখনও অনেক মিল। ভাল কিকাররাও যে দিকে মারবেন, অন্তত এক বার তাকিয়ে নেন। নেইমার ব্যতিক্রম। তাঁর পা থেকে বডি মুভমেন্ট পুরোটাই হিলতে থাকে। পেনাল্টিটাও মারলেন ড্রিবল করার মতো। ওই ৩-২ হয়ে যাওয়ার পর শেষ শটটা পোস্টে লাগা আংশিক চিলির মন্দ ভাগ্য। আর বেশির ভাগটাই নেইমারের কেরামতি।
সক্রেটিস হয়তো কবরে শুয়ে কলামই লিখছেন, হে স্কোলারি, সেকেন্ড রাউন্ডেই টাইব্রেকার! এর পর কী করবে?
বেলো হরাইজন্তে, ২৯ জুন
