মেসিয়ানার জ্যোৎস্নারাত – গৌতম ভট্টাচার্য

ব্রাজিল ২০১৪ – ৭

মেসি বোরিং, ডেট করলে রোনাল্ডো

চিলিয়ান সুন্দরী। এমন কোনও পরী নন যে তাঁকে পেলে বলিউড লাফিয়ে পড়বে। বা টালিগঞ্জ লালায়িত হয়ে যাবে। কিন্তু দুর্ধর্ষ ফিগার। চিলির খুব নামকরা মডেল-অভিনেত্রী। আর ঝান্দেলিন নুনেজ যে ব্রাজিলে স্বীকৃত হয়েছেন বিশ্বকাপের রানি হিসেবে। শনিবার মিডিয়া সেন্টারে ঢোকামাত্র সাংবাদিকরা তাঁর ওপর যে ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মনে হচ্ছিল কোনও রোনাল্ডো বা জিকোকে দেখতে পেলেন। ইংরেজ জানেন না। দোভাষীর মাধ্যমে কথা বললেন আমার সঙ্গে…

প্রশ্ন: এখানে কি মডেলিং করতে?

ঝা: না, টিভি চ্যানেলের হয়ে বিশ্বকাপ কভার করতে। খুব মজা করে সেটা করছি।

প্র: প্রথম ম্যাচ থেকেই ব্রাজিল আপনার সৌন্দর্যের তুমুল কদর করে যাচ্ছে।

ঝা: হ্যাঁ, ওরা তো লিখছে যত মহিলা সাংবাদিক এখানে এসেছে তার মধ্যে আমি সেক্সিয়েস্ট। গ্লোবো চ্যানেল বলেছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন অন্যতম আকর্ষণ ছিলাম আমি। ভালই লাগছে। তবে বিনয় না করে বলছি, চিলিতে এই অ্যাটেনশন পেয়ে আমি অভ্যস্ত।

প্র: আজ ম্যাচে কী দেখতে চান?

ঝা: অবশ্যই চিলির দু’গোলে জয়। আর তার একটা গোল যেন সাঞ্চেজের হয়।

প্র: সাঞ্চেজ কি আপনার প্রিয়তম?

ঝা: বলতে পারেন। ওকে দারুণ লাগে। অল্পস্বল্প চিনিও।

প্র: পরের পছন্দ?

ঝা: নেইমার। ও যদিও শত্রু দেশের। কিন্তু ওর মধ্যে একটা চঞ্চলতা আছে। আমায় দারুণ টানে। ব্রাজিলিয়ান টিভিতে আমায় এত দেখাচ্ছে। আশা করি নেইমার আমায় দেখেছে।

প্র: মেসি আর নেইমারের মধ্যে?

ঝা: নেইমার।

প্র: কেন?

ঝা: কারণ মেসি একটু কীরকম যেন! ভাল খেলে কিন্তু বোরিং।

প্র: ডেটিং-এ যাওয়ার মতো নয়?

ঝা: একেবারেই নয় (চোখ নাচিয়ে)।

প্র: ডেটিং-য়ে কে যেতে পারে? রোনাল্ডো?

ঝা: ওহ! ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

প্র: ব্রাজিলে শো কী করছেন?

ঝা: খুব মজা করছি। স্টেডিয়ামের বাইরে-ভেতরে চ্যাট করছি। দুর্ভাগ্য, এদের মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় দেখছি। হা হা হা।

প্র: একটু আগে ব্রাজিলীয় টিভি চ্যানেলের সামনে আপনি জামা খুলে কয়েক বার অন্তর্বাস দেখালেন। এটা কী ব্যাপার?

ঝা: এটা আমার শপথ। টিম জিতলে অন্তর্বাস দেখিয়ে সেলিব্রেট করব।

প্র: আর চিলি চ্যাম্পিয়ন হলে?

ঝা: সেটা এখনও ঠিক করিনি। আগে ব্রাজিলকে হারাই। নেইমারটাকে কোনও বিশ্বাস নেই।

প্র: একটা জিনিস আশ্চর্য লাগছে। আপনি ব্রাজিল অধিনায়কের স্ত্রী নন। কোনও প্লেয়ারের বান্ধবী নন। চিলিয়ান সুন্দরী। আপনাকে এরা এত আদিখ্যেতা করছে কেন? কী মনে হয়?

ঝা: কারণ আমি মজার কথা বলি। আমার মধ্যে একটা প্যাশন আছে। একটা স্পিড আছে। একটা সৌন্দর্য আছে। ব্রাজিলীয় পুরুষের খারাপ লাগার কথা নয় (চোখ টিপে)।

বেলো হরাইজন্তে, ২৮ জুন

কাপ জেতার বল্গাহীন পার্টি উপভোগ করে নিল ব্রাজিল

ওরা কেউ হামেস রদ্রিগেজ নামটা শুনেছে বলে মনে হয় না! ঘণ্টাখানেক আগের মারাকানায় বিশ্বকাপের সেরা গোলটাও নির্ঘাত টিভিতে দেখে বাড়ি থেকে বেরোয়নি!

নইলে বন্যার মতো বাঁধ ভেঙে যাওয়া আনন্দ, উচ্ছ্বাসের প্রগলভতা আর মস্তির এমন জৌলুস থাকে কী করে! বেলো স্টেডিয়াম থেকে আমাদের শহরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া মিডিয়া বাসটা আটকে পড়ল সেই আবেগের ট্র্যাফিক জ্যামে!

কোচ সুপারভাইজার গোছের যিনি, তিনি বিব্রত ভাবে বললেন, আজ এটুকু সামলাতে হবে। স্ট্রিট পার্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। সল্টলেক স্টেডিয়ামে ডার্বি ম্যাচ থাকলেও তো আবেগের মুহূর্মুহূ ট্র্যাফিক জ্যাম ঘটে থাকে। অহরহ গাড়ি আটকে যায়। কিন্তু এখন তো রাত সাড়ে ন’টা। চিলির শেষ পেনাল্টি বারে লাগার পর পাঁচ ঘণ্টারও বেশি হয়ে গিয়েছে। এখন পার্টি? তা-ও বেলো হরাইজন্তের যেটা সানি পার্ক বা আলিপুর। সেই সাভাসিতে!

অবিশ্বাস্য সব দৃশ্য এর পর চোখের সামনে ঘটে যেতে দেখলাম। ট্র্যাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে, সিগন্যালে লাল জ্বলছে। পথচারীদের জন্য সবুজ নয়। সেখানে হলুদ জার্সির দুই তরুণ-তরুণী ঠিক মধ্যিখানে এসে চুমু খেতে শুরু করল। হলিউড ছবিতে যেমন হয়। দেখাদেখি চলে এল আরও কিছু যুগল। মুহূর্তে ব্রাজিলীয় জার্সি আর চুমুর চারণক্ষেত্র হয়ে গেল সাভাসির অভিজাত চারমাথার মোড়! পুলিশ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এই লায়লা-মজনুরা যেন পরিষ্কার বলছে, আমাদের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দাও। গ্রাহ্য করি না। ব্রাজিল জিতেছে, এ বার মরে যেতেও রাজি আছি।

বাধ্য হয়ে কোচ থেকে নেমে পড়তে হল। একটু এগিয়ে দেখি, বিশাল পার্টির আয়োজন। একটা স্টেজের ওপর ব্যান্ড গাইছে আর তার তলায় হাজারখানেক মানুষ অবিরাম নাচছে, গাইছে, জাপটাচ্ছে, চুমু খাচ্ছে। যেন অস্থায়ী নজরুল মঞ্চে কোনও জনপ্রিয় রকব্যান্ডের কনসার্ট হচ্ছে আর দর্শক সেখানে গো অ্যাজ ইউ লাইক। বড় অনুষ্ঠান হলে যেমন ভ্রাম্যমাণ পাবলিক ইউরিনাল রাখা হয়, তেমন চার-পাঁচটাও রয়েছে। কাতারে কাতারে মানুষ আর ড্রেস কোড খুব ফর্ম্যাল।

হলুদ, একমাত্র হলুদ!

ফিফার কার্ডটা দেখিয়ে তবে সেই ফুটবল-আবেগের সমুদ্রে প্রবেশাধিকার পেলাম। একটু আগে মাঠ থেকে শুনে বেরিয়েছি, টাইব্রেকার নিষ্পত্তির পরেও অশান্তির কী ভয়ঙ্কর চোরাস্রোত চলছে ব্রাজিল-চিলিতে। ব্রাজিল প্রচণ্ড উত্তেজিত নেইমারকে ও ভাবে জখম করে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে অনিশ্চিত করে দেওয়ায়।

এর পর লকাররুমের দিকে দুটো টিম ফেরত যাওয়ার সময় চিলি কিছু টিটকিরি দিয়েছিল ব্রাজিলকে রেফারি তুলে। তাতে ব্রাজিলীয় মিডিয়া ম্যানেজার রডরিগো নাকি সটান ঘুষি মেরেছেন চিলির স্ট্রাইকার পিনিয়াকে। চিলি প্রেস অফিসার তা নিয়ে অভিযোগও জানিয়ে গিয়েছেন যে, ফিফার ভিডিওয় সব আছে। আমরা দেখে নেব ব্রাজিলকে। রডরিগো জবাবে বলেছেন, ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। ঘুষোঘুষি নয়। এর পর বাসে ওঠার আগে যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে প্লেয়ারদের সঙ্গে একমাত্র কথা বলার সুযোগ, সেই মিক্সড জোনে এসে দাভিদ লুইজের মতো ঠান্ডা মাথার মানুষ বলে গিয়েছেন, ”চিলি চাইছিল প্ররোচনা। ম্যাচ হেরেও সেই ফন্দি করে গেল ”বা…র্ডরা।”

কিন্তু সাভাসির এই উৎসবখানা একই শহরে এমনই বৈপরীত্যের পৃথিবী যে, কারও হুঁশই নেই। কেউ চেঁচাচ্ছে নেইমার। কেউ বলছে দিয়াগো। এমনকী ফ্রেডের ন’নম্বর জার্সিরও ঢল সেখানে। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, মাঠ থেকে সরাসরি? বলল, ”না, টিকিট ছিল না। কিন্তু টিম জিতেছে, এটাই আমাদের মাঠ।” কলম্বিয়া বলে এই গ্রহে কোনও দেশ আছে বলে এদের শনিবার রাতের চেতনায় নিশ্চয়ই ছিল না। হামেস রদ্রিগেজ নামক বিশ্ব ফুটবলের নবতম তারাকে যিনি সবচেয়ে ভাল মার্ক করতে পারতেন, সেই লুইস গুস্তাভো দুটো হলুদ কার্ড খেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে নেই। তা নিয়ে স্কোলারির চুলটা যতই আরও অনুপম খেরের মতো হয়ে আসুক, এদের কোনও দুর্ভাবনা নেই। বরং যত রাত গড়াচ্ছে, এরা তত পোশাক নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ব্রাজিলের বুঝি এটা রজনীশ আশ্রম।

ফোর্তালেজায় আগামী শুক্রবার ব্রাজিলীয় সমর্থকদের যে সরবিট্রেটের ব্রাজিলীয় সংস্করণ নিয়ে বসা উচিত, এটা বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই মনে হচ্ছে। ব্র্যাঙ্কো একমাত্র দেখছি যাঁর কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে ফেভারিট লাগছে। নইলে জিকো পরিষ্কার বলছেন, (ওহে ব্রাজিল, হয় উন্নতি করো নইলে অঘটনের জন্য বুক বাঁধো)। রিও ফার্দিনান্দ সোজাসাপ্টা লিখছেন, ‘ব্রাজিলের তিনটে ডিফেন্ডার অ্যাটাকে চলে যাচ্ছে। পেছনে বল এলেই গেল-গেল। ডিফেন্স তো পুরো লিক করছে।’

চিলির সেই বিখ্যাত অভিনেত্রী কাম মডেল ঝান্দেলিন নুনেজের সঙ্গে বেরোবার আগে প্রেস সেন্টারে দেখা হয়েছিল। সাঞ্চেজ গোল শোধ করার পর ঝান্দেলিন মাঠের মধ্যেই শার্ট খুলে তাঁর অন্তর্বাস দেখিয়েছিলেন, যার উপর চিলির জাতীয় পতাকার ছবি। আজ সেই ছবি বিলেতের কাগজেও বেরিয়েছে। তা ঝান্দেলিন বলে গেলেন, ”গর্বিত আমার দেশের জন্য। আর এই ব্রাজিলের জন্য চিলির সমস্ত অভিশাপ তোলা থাকল। ভাগ্য ওদের রোজ দেখবে না।”

নাচগানের এই মেহফিল শুনতেই রাজি নয়। তারা বিভিন্ন রকম নেচেই চলেছে অবিরাম। কখনও সাম্বা, কখনও বলিউডি, কখনও শরীরে শরীর ঠেকিয়ে বল কাম চুমু ডান্স। এক মধ্যবয়সী পুরুষ সাময়িক জিরোচ্ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, চিলির ১১৮ মিনিটের ওই শটটা ক্রসবারে লেগে না ফিরলে?

ইনি ইংরেজি জানেন না। ডেকে নিলেন পাশের সুন্দরী তরুণীকে। যাঁর সঙ্গে এতক্ষণ নাচছিলেন। মহিলা আমেরিকায় চাকরি করতেন বলে কাজ চালিয়ে দেওয়ার মতো ইংলিশ বলতে পারেন। ওই উৎসবের রামধনুই যেন ছিটিয়ে দিলেন তাঁর উত্তরে। ”ক্রসবারের বল লাগার মুহূর্তটাই আমরা আরও সেলিব্রেট করছি। ওটাই আমাদের পথনির্দেশ যে, ঈশ্বর টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের সঙ্গে আছেন। কাপটা আমরাই জিতব।” প্রেস কার্ড বুকে ঝুলছে। গায়ে হলুদ জার্সি নেই। বিজাতীয় কী ইন্টারভিউ নিচ্ছে দেখে এগিয়ে এল আরও কিছু কৌতূহলী মুখ। তাদের একজন বলল, ”ফাইনাল আমরা আর আর্জেন্তিনা। আর ওই কথাটা শুনেছেন যেটা এখানে খুব চালু? পোপ একজন আর্জেন্তিনীয়। ঈশ্বর হলেন ব্রাজিলিয়ান।”

সাভাসির পার্টি চলল রাত্তির দুটো অবধি। হোটেলের চোদ্দো তলার ঘরে অবধি ঘুমনোর উপায় নেই। সকালে বেলো মাঠের মিডিয়া সেন্টারে ঢুকে যে নিশ্চুপ, একেবারে ফাঁকা পেলাম যে ভলান্টিয়াররা অবধি আসেনি, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। বেলোয় কাল ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় প্রত্যেককে ভোররাত্তির অবধি জাগতে হয়েছে। রাত দুটোয় নাচগান বন্ধ হয়ে শুরু হল আতসবাজি।

ব্রাজিল কাপ জেতার পার্টিই যেন করে নিল কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে। এটাই এমন আরব্য উপন্যাসের রাতের মতো স্বচক্ষে ঘটতে দেখলাম যে জানি না আরও এগোলে এর চেয়ে বেশি কী হতে পারে! হলুদ সমুদ্র থেকে হলুদের মহাসাগর? ভাবতে পারছি না। এত কম ঘুমোলে মাথা কাজ করে বুঝি?

বেলো হরাইজন্তে, ৩০ জুন

নেইমার নিয়ে নতুন আশা আশঙ্কার হৃদস্পন্দনে ব্রাজিল

নেইমার দ্য সিলভা গতকাল যখন সেন্টার সার্কল থেকে হেঁটে যাচ্ছিলেন পেনাল্টি স্পটে বল বসানোর জন্য, তাঁকে অতিক্রম করতে হল মোটামুটি ৪৮ গজ।

নেইমার পরে কবুল করেছেন ওই দূরত্বটা তখনকার মতো তাঁর কাছে মনে হয়েছিল দশ কিলোমিটার! এতটাই কম্পিত আর উদ্বিগ্ন ছিলেন।

টিম ব্রাজিলেরও এক অবস্থা। ফোর্তালেজায় তাদের কলম্বিয়া ম্যাচের কিক অফ হতে আরও সাড়ে চার দিন।

কিন্তু মনে মনে তাদের মনে হচ্ছে বোধহয় অনন্তের অপেক্ষা। ব্রাজিলীয় ফুটবলাররা কাল মিক্সড জোনে স্বীকার করেছেন, নেইমারের থাইয়ের অবস্থা দেখে শুক্রবারটা ঠিক কবে গুলিয়ে যাচ্ছে!

বিখ্যাত মার্কিন নেটওয়ার্ক গতকাল রাতেই একটা অনুষ্ঠান দেখাচ্ছিল— ১৯১৪ আর ২০১৪-এ কী অদ্ভুত মিল। তাতে সিআইএ-র প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল বলছিলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঠিক যেমন প্ররোচনামূলক পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছিল, পাকেচক্রে একশো বছর বাদে ইরাক-ইস্যু এক প্ররোচনা শুরু করেছে! আবার না মহাযুদ্ধ বাঁধে!

১৯৬৬ আর ২০১৪-এ তফাত একশো বছরের নয়! কিন্তু অবিকল একই যেন ছবি। সে বার পেলেকে মেরে মেরে বিশ্বকাপের বাইরে করে দিয়েছিল ঘাতক ডিফেন্ডাররা। এ বার নেইমারের জন্য যেন একই ভাগ্যলিপি তৈরির তোড়জোড় চলছে। মেসির সঙ্গে নেইমারের তফাত হল, যেহেতু নীচে নেমে ডিফেন্স করেন, অনেকটা বেশি জায়গা জুড়ে দৌঁড়োন, তাঁকে মারার সুযোগ আসে বেশি। আর ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ থেকে তাঁরই যেন সুযোগ নিচ্ছে ডিফেন্ডাররা। এক এক সময় অবাকই লাগছে তাঁর চেহারা যদি হাল্ক বা রোনাল্ডোর মতোও হত, মারটা সহ্য হত। বিশ্বকাপের জন্য দশ কেজি ওজন বাড়ানো আর পেশি উন্নত করলেও ফুটবলীয় মাপে তাঁকে প্যাংলাই বলবে লোকে।

ছয় মিনিটেই চিলি তাঁকে যে মারাত্মক ফাউল করে সেটা দেখে লুই ফিলিপ স্কোলারির কী সর্বনাশা আতঙ্ক হয়েছিল, পরে সাংবাদিক সম্মেলনে স্বীকার করলেন। তিনি পর্তুগাল কোচ থাকার সময় ডাচ ডিফেন্ডার এমনই মেরেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। রোনাল্ডো খানিকক্ষণ মাঠে থাকার চেষ্টা করেও বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন। ”নেইমারকে জিজ্ঞেস করলাম পারবে? ও বলল ঠিক পারব। অতুলনীয় সাহস ছেলেটার। বললাম তো, বয়স বাইশ। কিন্তু মাথাটা পঁয়ত্রিশের।” আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন স্কোলারি।

ওই রকম ফোলা নিয়ে নেইমার পেনাল্টি মারতে অস্বীকার করলেও কিছু বলার ছিল না। ডান পায়ে অবিরাম লাগছে। ওই পায়ের তো ফ্লেক্সিবিলিটি থাকার কথা নয় পেনাল্টির মতো সূক্ষ্ম প্লেসিংয়ের কাজে। তার ওপর ওই চাপে মুহূর্তে। এর আগে বিশ্বকাপে জিকো, প্লাতিনি, বাজ্জোরা পর্যন্ত টেনশনে পেনাল্টি মিস করছেন। সাঞ্চেজ অবধি পারলেন না। কিন্তু নেইমার দেখা গেল মানসিক ভাবে অন্য ধাতুর। সীমাহীন চাপও নিজের ভেতরকার প্রেশার কুকারে ঠিক সেদ্ধ করে নিতে পারেন। স্কোলারি তো বললেনই, ”দেখে মনে হল সান্তাোসে পেনাল্টি মারছে বা বন্ধুর বাড়ির বাগানে।”

মিক্সড জোনে নেইমার অবশ্য স্বীকার করে গেলেন, নিজের প্রচণ্ড নার্ভাসই লাগছিল। কিন্তু বলটা এক বার পায়ে পেয়ে যেতে আর কোনও টেনশন নেই। এমনিতে ম্যাচ থেকে উঠে তাঁর মনে হচ্ছে ফুটবলজীবনের কঠিনতম দিন কাটিয়ে উঠলেন। ”প্রচুর চুল এক দিনে পেকে গেল। এক এক সময় মনে হচ্ছে মারাই বুঝি গিয়েছি,” এত ক্লান্ত যে জয়োচ্ছ্বাসটা সে ভাবে নেই।

তাঁর অভিনেত্রী বান্ধবী আর বোন দু’জনেই কাল ছিলেন মাঠে। নেইমার যখন পেনাল্টি মারছেন, বান্ধবী চোখ বন্ধ করে কেমন প্রার্থনারত ছিলেন। রোববার ব্রাজিলের সব কাগজে তাঁর ছবি।

এ বার গোটা ব্রাজিল জাতির প্রার্থনার সময়, নেইমার যেন শুক্রবার নামতে পারেন। মৃত্যুর মুখ থেকে জীবনে প্রত্যাবর্তন— এ ভাবে চিলি ম্যাচ ব্যাখ্যা করছে ব্রাজিলীয় মিডিয়া।

কিন্তু নেইমার খেলতে না পারা মানে তো এই লঝঝড়ে ব্রাজিলের ফের মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাওয়া।

বেলো হরাইজন্তে, ৩০ জুন

সুইস ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে মাঝমাঠের খোঁজে মেসি

নিজের বাড়ির সুইমিং পুলের ধারে বন্ধুদের সঙ্গে দিব্য তাস খেলছেন। পিছনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে তাঁর অভিনেত্রী বান্ধবী।

নেইমার দ্য সিলভার ফুলে থাকা থাই নয়। বরং রোববার দুপুরে রিল্যাক্স করার এই ছবিটাই আজ ব্রাজিলীয় দৈনিকে বেরিয়েছে। ছবিটা দেখে মনে হল, বার্সায় সে দিন এ রকম ছুটির মেজাজেই নিশ্চয়ই লিওনেল মেসিকে বলেছিলেন নেইমার, ”রিও-র ফাইনালে মনে হয় আমাদেরই দেখা হবে।” মেসি কিছু বলেননি। প্রশ্রয়ের হাসি হাসেন।

বেশ কিছু দিন আগের কথা। মাসখানেক হবে। বিশ্বকাপই পড়ে গেল ঊনিশতম দিনে। সাও পাওলোর মাঠে উদ্বোধনের সময়ই তো পশ্চিম ভারতের অন্যতম সেরা অহঙ্কার রত্নগিরির আলফন্সো আমের মরসুম শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ব্রাজিলের আমের মরসুম শুরু। তখন ব্যাপক টক ছিল। জুনের শেষে এসে বেশ মিষ্টি।

ব্রাজিলের ফলের বাজারে এত উল্লেখযোগ্য রূপান্তর হয়ে গেল। কিন্তু নেইমার-মেসির মিডফিল্ড যেমন টক ছিল, তেমনই থেকে গেল। স্মরণ করলেই এই দু’দেশের সমর্থকরা এমন হতাশ হয়ে পড়ছেন যেন গলায় চোঁয়া ঢেকুর উঠল! সকালে এখান থেকে নব্বই মাইল দূরের ক্যাম্পিনাস বিমানবন্দরের ফিফা কাউন্টারে ব্রাজিল সমর্থক উত্তেজিত ভাবে বলছিল, ”অস্কারকে কি কোনও জ্যোতিষী ট্যাকল করতে বারণ করে দিয়েছে?” এরিনা সাও পাওলো পৌঁছে দেখলাম আর্জেন্তাইন সাংবাদিকরা তেমনই খাপ্পা মাসচেরানো আর ডি’মারিয়ার ওপর। রোজ বিবৃতি আর ইন্টারভিউ। একটা লোককে মাঝমাঠে আটকানোর নাম নেই!

দুপুরে আলেজান্দ্রো সাবেয়ার প্রেস কনফারেন্স কভার করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল,কী করুণ অবস্থা তাঁর। ফুটবল-দুনিয়ার কোচই সর্বেসর্বা, কোচই মালিক, কোচই ম্যানেজিং ডিরেক্টর। কিন্তু আর্জেন্তিনা ফুটবল টিমে পুরো একচেটিয়া মেসি! সাবেয়ার একমাত্র কাজ হল মেসি সম্পর্কে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাওয়া। আর বারবার বলা, ”মেসির সঙ্গে আমার কোনও মনোমালিন্য নেই। ও একজন স্পেশ্যাল মানুষ।”

একটা টিম তিনটে টানা ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালের পাদানিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর তা-ও প্রতিপক্ষ কাকে পেয়েছে, না যারা জন্মদিনে সুইস চকোলেট বা সুইস ঘড়ির মতোই লোভনীয় উপহার—সুইজারল্যান্ড! কোথায় টগবগ করবে আর্জেন্তিনীয়রা! তা নয়, বরং কেমন ঝিমিয়ে পড়া, চিন্তাক্লিষ্ট পরিবেশ দেখলাম।

সে দিন নেইমারদের যখন সেই সরবিট্রেটওয়ালা টাইব্রেকার চলছিল, তখন মেসিরা কিন্তু পাশের পাড়াতেই ছিলেন। আর্জেন্তিনা বেসক্যাম্প তো বেলোর পাশেই। নেইমারের পেনাল্টি যদি বাগবাজারে হয়ে থাকে, মেসিরা ছিলেন বৈষ্ণবঘাটা! কিন্তু বিশ্বকাপে একটা টিম আর একটার খেলা দেখতে আসার চল নেই। টিভিতে দেখেছেন। ফুটবল টিভিতে দেখে ঠিক মাঝমাঠের অবস্থা বোঝা যায় না। কে বল ছাড়া জায়গা নিচ্ছে, কে ট্যাকলের জন্য আগাম লোক ধরছে, এগুলো টিভিতে আসে না। একে অপরের খেলা মাঠে বসে দেখলে বুঝতেন, কারওরই যে মাঝমাঠ বলে কিছু নেই। এবং নিজেরা যদি পুরো দায়িত্ব না নেন, বার্সার সে দিনের কথোপকথন নিছক ধারণাই থেকে যাবে।

রোববার নেইমার যখন বন্ধুদের সঙ্গে ফুর্তির তাস খেলছেন, বেলোয় তখন মেসি কিন্তু মাঠে। তাঁদের বেসক্যাম্পের বাইরে বেশ কিছু আর্জেন্টাইন সাংবাদিক জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদেরও বলে দেওয়া হয়, আজ গোপন প্র্যাকটিস। কারও ঢোকার অনুমতি নেই। ”কীসের আবার এত গোপনীয়তা! জেতালে মেসি, হারালে মেসি। এই তো টিম,” বলে গজগজ করতে করতে তাঁরা বেরিয়ে আসেন।

আসলে টিমের প্রতিযোগিতায় করা ছ’টা গোলের মধ্যে চারটেই তো মেসির। আর একটা তিনি করিয়েছেন। নামটা আর্জেন্তিনা। জার্সি আর্জেন্তিনা। কিন্তু ভারসাম্যই তো তৈরি হয়নি। সেই জন্য হয়তো সুইস চকোলেট হিসেবে না ধরে জার্মান কোচ অটমার হিৎজফেল্ডের টিমকে মেসির সতীর্থরা ধরছেন অন্য ভাবে। যেন সুইস ব্যাঙ্কে কারও গোপন অ্যাকাউন্ট নম্বর বার করাটা সাও পাওলো মাঠে মঙ্গলবারের পরীক্ষা।

আর্জেন্তিনীয় ডিফেন্সের হাইপ্রেশার এখন থেকেই যাঁকে নিয়ে হয়ে রয়েছে তিনিও মেসি! মেসি-টু। মেসি-ওয়ান তিন ম্যাচে চার গোল করেছেন, আর ইনি মেসি-টু—….শাকিরি এক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক! তা-ও মানাউসের ওই সেঁকে দেওয়া গরমের মধ্যে। তাঁকে এমনিতেই নিজের দেশের লোক আল্পসের মেসি বলে ডাকত। হন্ডুরাস-হ্যাটট্রিকোত্তর ডাকটা আরও প্রসিদ্ধ হচ্ছে!

বয়সে মেসি-টু পাঁচ বছরের ছোট। বায়ার্নে খেলেন। কিন্তু হাইটে এক। মেসি যেমন স্পেন চলে যান ছোটবেলায় আর্জেন্তিনা ছেড়ে, ইনি শাকিরিও তেমনই কসোভো ছেড়ে আল্পসের ধারে চলে এসেছিলেন। কৌলিন্যে দু’জনের তুলনাই হয় না। তবু আল্পসের মেসি নামটা বাজারে হিট করায় তুলনা হচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে, নিজের নিজের দেশজ ম্যাচে পাসিং আর ড্রিবলে মেসি ওয়ান আগে থাকলেও গড়পড়তা গোলের সুযোগ তৈরিতে দু’জনেই এক বিন্দুতে। প্রতি চব্বিশ মিনিট পিছু এঁরা গোলের সুযোগ তৈরি করেন। শ্যুটিংয়ের জোরে কাছাকাছি। আর মেসি-টু মানে, শাকিরির বৈশিষ্ট্য আরও একটা কারণে। যেটা মেসি কেন, নেইমার, রোনাল্ডো কারও নেই।

তাঁর সুডৌল থাই। শাকিরির থাইয়ের মাপ হল ২৭ ইঞ্চি। ওই মজবুত থাই থেকে কাল না রকেটের মতো শট বেরোয়, এই ভাবনাতেই বোধহয় আর্জেন্তিনার এত গোপন প্র্যাকটিস। মাসচেরানো তো বলেওছেন, শাকিরিকে তীক্ষ্ন নজরে রাখতে হবে। ব্রাজিল বিশ্বকাপ এমনিতেই আন্ডারডগদের প্রিয় টুর্নামেন্ট হয়ে গিয়েছে। কে বলতে পারে একটা মুহূর্তের অসতর্কতা চিলি-আতঙ্ক ফিরিয়ে দেবে না!

ঐতিহাসিক ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সুইসরা কখনও ব্রাজিলের ‘চিলি’ হতে পারেনি। ছ’টা ম্যাচে চারটে হেরেছে। দু’টো ড্র করেছে। শেষ যে ফ্রেন্ডলি হয় তাতে তো ১-৩ হেরেছে। আর্জেন্তিনার তিনটে গোলের তিনটেই করেছিলেন—কে আবার, মেসি-ওয়ান।

মঙ্গলবার তাই ফিফার ফিক্সচার যা-ই দেখাক, দু’টো টিম হল সুইস ব্যাঙ্ক আর লিও মেসি! একটা টিমের নাম অবশ্য খেলার পর শুদ্ধ হয়ে সুইস চকোলেট হয়ে যেতে পারে। যদি তিনি, এলএম তেমন ইচ্ছে করেন!

সাও পাওলো, ১ জুলাই

মেসিচ্যুত নয়, বিশ্বকাপে অটুট মেসিয়ানাই

নেইমার দ্য সিলভাকে রক্ষা করেছিল ক্রসবার। লিওনেল মেসিকে টাইব্রেকারের অশুভতম আতঙ্কের থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল সাও

পাওলো মাঠের পশ্চিম দিকের সাইডপোস্ট।

সুইজারল্যান্ডের ১-১ করে দেওয়ার অব্যর্থ হেড সাইডপোস্টে লেগে ঝুলে থাকল। ম্যাচের পর দেখছিলাম অ্যাল্পাইন মেসি নামে খ্যাত জারদান শাকিরি-সহ সুইসরা অনেকে কাঁদছেন। কাঁদার মতোই চিত্রনাট্য। দুটো টিম যা সুযোগ পেয়েছিল তাতে মেসিরা ম্যাচটা ২-৩ হেরে ফেরেন। বিশ্বকাপ হয়ে যায় মেসিচ্যুত।

এ দিনের মতো অবশ্য চ্যুত নয়। মেসিয়ানা অটুট থেকে গেল ব্রাজিল বিশ্বকাপে। ইরানেরটা ছিল শেষ সেকেন্ডে। আজকেরটা অতিরিক্ত সময় শেষ হওয়ার আড়াই মিনিট আগে। একটা হাফলাইনের কাছে বল ধরে তিন জনকে দুলিয়ে দিয়ে ডি’মারিয়াকে যে বলটা রাখলেন ফুটবলার, তার একটা নাম আছে—ফাইনাল পাস!

দ্বিধাহীনভাবে আবার তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ। চার ম্যাচে এই নিয়ে চার বার। ছিয়াশির মারাদোনারও এই রেকর্ড ছিল না। মারাদোনা বলতে গিয়ে আবার মনে পড়ে গেল পেলে!

পেলেকে সেই উদ্বোধনের পর আবার সাও পাওলো মাঠের ভিভিআইপি বক্সে দেখা গেল। কী ভাবছিলেন তিনি মধ্যবিত্ততা আর টাফ ট্যাকলিংয়ে ভরা ম্যাচটা দেখতে দেখতে? অনুমান করার চেষ্টা করছি। একটা হতে পারে ভাবছিলেন মেসি, যাকে নিয়ে এরা এত হাইপ তোলে, সে থেকেও কিনা সুইস অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বার করতে মাথা খুঁড়ে মরে। অথবা উল্টোটাও হতে পারে যে ভাবছিলেন, ভাগ্যিস এই সময় আমাকে ফুটবল খেলতে হচ্ছে না।

আধুনিক ফুটবল যে গতি আর ফিটনেসে পৌঁছে গিয়েছে, প্রত্যেকটা প্লেয়ার এমন রুদ্ধশ্বাস ওঠানামায় অভ্যস্ত যে, ফাঁকা জমি পাওয়াই যায় না। পেলের সময় ট্যাকল করার জন্য ববি মুররা থাকতেন। এখন হলে ববি চার্লটনরাও ট্যাকল করতেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের স্কিলের ওপরও কোথাও না কোথাও গতির গ্রহণ হতই।

একে তো জাতীয় দলের প্র্যাক্টিসে যথেষ্ট কম্বিনেশন তৈরির সময় হয় না। তার ওপর ক্লাবের চাপ নিয়ে নিয়ে ক্লান্তি। অ্যাঞ্জেল ডি’মারিয়া জয়সূচক গোলটা করলেন। ক্লাব পর্যায়ে যাঁকে এত দৃপ্ত লাগে, শুরুর দিকে তাঁকেও তো দেখলাম সুইস টিমের মতো লোভনীয় নকআউট প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে আল্পসের শিখর দেখছেন।

দিয়েগো মারাদোনাকে দেখতে পেলাম না। তিনি, পেলে, মেসি এক মাঠে, স্বর্গীয় বাতাবরণ রাজ করত। শুনলাম মারাদোনার সামান্য দ্বিধা টিমে অ্যাগেরোর উপস্থিতি নিয়ে। মারাদোনার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অ্যাগেরোর। সেটা ভেঙে গিয়েছে খুব তিক্ততার মধ্যে। ইরান ম্যাচে একেবারেই ভাল খেলেননি অ্যাগেরো। তার পর নাকি টিমে তাঁর কোনও কোনও বন্ধু বলেছে, তোর প্রাক্তন শ্বশুরের বদ নজরের জন্য এটা হয়েছে। এ দিন যদিও অ্যাগেরোর চোটের জন্য খেলার প্রশ্নই ছিল না। তবু কি বিরক্ত হয়েই এলেন না মারাদোনা? এলে অবশ্য দেখতেন আর্জেন্তিনার এই টিমটা খারাপ খেলার জন্য কারও বদ নজরের অপেক্ষায় থাকে না। তাদের টিমে মেসি ছাড়া পুরনো সেই আর্জেন্তিনীয় সুগন্ধটাই নেই!

মারাদোনার বিশ্বকাপে বল প্লেয়াররা রেফারির অনেক নিরাপত্তা ভোগ করেছিলেন। সে বার মারাদোনার মতো এ বারের মেসি বা নেইমার কিন্তু সুরক্ষা পাচ্ছেন না। এমন মারছিল সুইসরা মেসিকে যে, এক বার নিজে হাত ঘুরিয়ে ডিফেন্ডারের মুখে মারলেন। মেসির মাথা গরম ফুটবল মাঠের বিরলতম ছবি আর সেটাই মঙ্গলবার ঘটছিল একাধিক বার।

কলকাতার অনেক ছোট ছোট দোকানে লেখা থাকে—ধার চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। এ বারের বিশ্বকাপের ছোট ছোট টিমগুলো যেন একটা দৃশ্য সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে—ঐতিহ্যের ডিসকাউন্ট চেয়ে লজ্জা দেবেন না।

একটা টিমের ফুটবল ঐতিহ্য যত কুলীনই হোক, এই বিশ্বকাপে কেউ যে মানছে না, বারবার প্রমাণ হচ্ছে। স্পেন, ইতালির পর পরশু-র ব্রাজিল, কালকের জার্মানি আর মঙ্গলবারের আর্জেন্তিনা ব্রাজিল বিশ্বকাপ ঐতিহ্যকেই বরং আরও জমাট বাঁধাল, কেউ বড় নয়। কেউ ছোট নয়। খেলা শুরু হয় ড্র দিয়ে। নব্বই মিনিটের পরেও দেখায় ড্র চলছে।

জার্মান কোচ অটমার হিৎজফেল্ডের অধীনে সুইসরা আরও অনুদার ফুটবল খেলতে শিখেছে। তাদের জাতীয় ফুটবল কৌলীন্য শেষ যখন ডক্টর রাজেন্দ্রপ্রসাদ ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এই কোচ তাদের শিখিয়েছেন ব্যক্তিগত নৈপুণ্য না থাকলে কী ভাবে ফিটনেস দিয়ে সেটাকে ম্যানেজ করতে হয়। কী ভাবে আপ্রাণ সারা ম্যাচ দৌড়তে হয়। শুরুর দিকে তো সুইসরাই দু’বার নিশ্চিত গোল পেয়ে যাচ্ছিল। একটা সের্জিও রোমেরো বাঁচালেন। আর একটা জোসিপ ড্রমিচ এমন হাতে তুলে দিলেন যেন জন্মদিনে সুইস ঘড়ি হাতে তুলে দিচ্ছেন। ব্রাজিলের ক্রসবারের মতোই এটাও চূড়ান্ত ভাগ্য!

দুই মেসির লড়াইয়ে ঠিক হওয়ার কথা ছিল ম্যাচের ভাগ্য। এর মধ্যে আল্পসের মেসিকে কড়া নজরে রেখেছিল আর্জেন্টাইন ডিফেন্স। বল নিয়ে গোলের দিকে ঘোরার আগেই ট্যাকল করেছে। আর মেসি ওয়ানের জন্য পোস্টিং ছিলেন মারাদোনার পুরনো ক্লাব নাপোলির ডিফেন্ডার ভালোন বেরামি। বাঁ পাশে আর এক জন ছয় ফুটের তীব্র ট্যাকলার। মেসি তারই মধ্যে তিন-চার বার ছিটকে বেরিয়েছিলেন কিন্তু আজ তিন জনের কঠোরতম বীরত্বকে পেরোতে পারেননি। বিরতির সময় ভালোন দেখলাম মেসির পিঠে হাত রেখে সৌজন্যসূচক কিছু বলতে গিয়েছিলেন। এক ঝটকায় হাত সরিয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

১১৮ মিনিটের চমকের বারুদ হয়তো তখনই জ্বালা হয়ে গিয়েছিল। কে জানে!

সাও পাওলো, ২ জুলাই

বিশ্বকাপে অনেক আজব কিছু ঘটেই থাকে, বলে গেলেন আবেগাপ্লুত মেসি

সাধারণত ম্যান অব দ্য ম্যাচের সাংবাদিক সম্মেলনটা হয়ে যায় খেলা শেষে খানিকক্ষণ বাদেই। তা খেলা শেষ হয়েছে মিনিট কুড়ি হয়ে গেল। পরপর দুই কোচ—অটমার হিৎজফেল্ড আর সাবেয়ার প্রেস কনফারেন্স হয়ে গেল। ম্যান অব দ্য ম্যাচ গেলেন কোথায়?

ফিফার লোক এসে জানালেন, আরও দশ মিনিট বসতে হবে। তার চেয়েও বেশি সময় পর আবির্ভূত হলেন লিওনেল মেসি! প্রথমে ভেবেছিলাম, মাঠে আজ এত ট্যাকল সামলেছেন। হয়তো ফিজিওর কাছে পরিচর্যা চলছে তাঁর। কথা শুনে মনে হল, আবেগ সামলাতে এই সময়টা ব্যয় হয়েছে। কারণ এখনও যেন আর্জেন্তিনীয় অধিনায়ক ১১৮ মিনিটের মৌতাতে। বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল তো আগের বারও খেলেছেন। কিন্তু এ বারে এ ভাবে যাওয়াটা মনে হচ্ছে তাঁকে সম্ভাব্য শোক থেকে সমৃদ্ধিতে এনে দিয়েছে!

স্বীকারও করলেন, ”প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম। শেষ দিকে যখন গোল হচ্ছে না তখন ভাবছি ম্যাচ তো টাইব্রেকারে চলে গেল। এখন কী হবে? হেরে তা হলে চলে যাব? আউটই হয়ে যাব বিশ্বকাপ থেকে? দেশে এত লোক আশা করে রয়েছে, সব শেষ হয়ে যাবে।”

মেসি বললেন, ”আজকের ম্যান অব দ্য ম্যাচের যোগ্য আমি কি না জানি না। অন্যগুলোর ব্যাপারে এটা মনে হয়নি। তবে শেষ দিকে যখন গোল হচ্ছে না তখন সিদ্ধান্ত নিই, আমাকেই কিছু করতে হবে!”

হেডফোনে অনুবাদে শুনতে শুনতেও রোম খাড়া হয়ে যাবে এক হাত দূরে বসে মেসি বলছেন, তখন আমি ঠিক করি আমাকেই কিছু করতে হবে।

”দৌড়টা শুরু করলাম। শুধু ওই গতির মধ্যে একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ছিল—নিজে মারব না ডি’মারিয়াকে দেব? যেহেতু ও ভাল জায়গায় ছিল ওকেই বলটা ঠেলি। বাকিটা আপনারা দেখেছেন।” একটু আগে সুইস কোচকে ব্রিটিশ মিডিয়া ছিঁড়ে খেয়েছে যে, তিন জনকে আলাদা করে মেসির জন্য লাগিয়েও আপনি ওর ১১৮ মিনিটের ম্যাজিক বন্ধ করতে পারলেন না। কোচ কথা শুনে বেশ রেগেই গিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁকে এমনও বলেছে, এত বেশি ডিফেন্সিভ হয়ে কী লাভ হল। সেই তো মেসির কাছে হারলেন। মেসি সুইস টিম নিয়ে অবশ্য কোনও মন্তব্যে যাননি।

এত প্রাণান্তকর খাটুনি কেন হল কটাক্ষের উত্তরে শুধু বললেন, ”এটা বিশ্বকাপ হচ্ছে মনে রাখবেন। অনেক আজব কিছু বিশ্বকাপে ঘটে। কারা কারা বাড়ি চলে গিয়েছে দেখুন। স্পেন, ইতালি, উরুগুয়ে, ইংল্যান্ড। এক একটা বাঘা বাঘা দল। আর অনেকে আছে যাদের কেউ ভাবেইনি যে এত দূর যেতে পারে।” বললেন, ”আমি জানতাম সুইস ম্যাচটা খুব কঠিন হবে। তবে এই পর্যায়ের ঠকঠকানি ধরাতে পারে ভাবিনি।”

হেডটা সাইডপোস্টে লেগে শেষ মিনিটের বেঁচে যাওয়ার প্রসঙ্গটা উঠল। মেসি বললেন, ”ভাগ্যের বদান্যতা। বোঝাল কাপ জেতার যুদ্ধে আজ আমাদের সঙ্গে ছিল।” উঠে পড়লেন এ বার। দেখে মনে হল টাইব্রেকার পরীক্ষায় না বসেই টাইয়ে জেতার বেশ কয়েকটা ফোস্কা নিয়ে ফেরত যাচ্ছেন।

সাও পাওলো, ২ জুলাই

এ বার কার পালা, ব্যতিক্রমী যুদ্ধে ত্রস্ত ব্রাজিল-আর্জেন্তিনা

রাফায়েল নাদাল হেরে গেলেন সেন্টার কোর্টে। অথচ উইম্বলডনের ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁর হারার কথা তিন নম্বর কোর্টে! ঐতিহাসিক ভাবে

ওটাই চ্যাম্পিয়নদের ভাগাড়। যেটাকে আগে কোর্ট নাম্বার টু বলা হত। বলা হত দু’নম্বর কোর্ট মানেই বাছাইদের বুক কাঁপবে আর শকুনদের আনাগোনা শুরু হবে। সে যত অনামীর সঙ্গেই তার খেলা পড়ুক। ওখানে টুর্নামেন্টের শুরুতেই অক্কা পাওয়ার তালিকাটা এ রকম—ম্যাকেনরো, কোনর্স, আগাসি, প্যাট ক্যাশ, সাম্প্রাস, সেরেনা ও ভেনাস এবং মার্টিনা হিঙ্গিস।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের শুরুতেই সালভাদর মাঠটা উইম্বলডনের দু’নম্বর কোর্ট সদৃশ ভাবমূর্তি পেয়ে যায়! ওখানেই স্পেনের পাঁচ গোল খাওয়া। রোনাল্ডোর চার জার্মান গোল হজম করা। বলা শুরু হয়ে যায়, সালভাদর স্টেডিয়াম মানেই অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় হবে বড় রকমের।

রটনাটা কোয়ার্টার ফাইনালের প্রাক্কালে চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিক দেখাচ্ছে। গোটা ব্রাজিলের সব ক’টা বিশ্বকাপ স্টেডিয়াম জুড়েই তো এমন ফুটবলের ভাগাড় আর শকুনদের ওড়াউড়ি! শীর্ষ বাছাইদের এমন কাঁপিয়ে দিয়েছে যে, ব্রাজিল থেকে আর্জেন্তিনা হয়ে জার্মানি—সবাই আতঙ্কিত। কেউ জানে না, এর পর ভাগ্যে কোন পর্দাটা খুলবে? সর্বনাশা কালো, নাকি উদ্ধার হতে থাকা নীল? বড় টিমের ব্রাহ্মণত্বের তেজ স্বীকারের দিন গিয়েছে। এটা মুক্ত পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত টুর্নামেন্ট।

সাংবাদিক সম্মেলনে কাল রাত্তিরে লিওনেল মেসিকে যে চেহারায় দেখলাম, শুধু ওই ভিডিওটাই যদি কেউ ব্লগে আপডেট করে দেয়, তা হলেই ব্রাজিল বিশ্বকাপের বৈপ্লবিক চেহারাটা বেরিয়ে আসবে। ভাবতে পারিনি স্বয়ং মেসি বলছেন, ”আমি তো ধরেই নিয়েছিলাম, এই বুঝি টাইব্রেকার শুরু হবে আর আমরা বিশ্বকাপের বাইরে চলে যাব।” আর্জেন্তিনার খারাপ খেলার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একটু পরে এমনও বললেন, ”শুধু আমাদের খারাপ খেলা! কারা কারা টুর্নামেন্টের বাইরে চলে গিয়েছে আর কারা আছে, এক বার দেখুন তো!”

প্রেস কনফারেন্সে কোনও আবহ থাকে না। তবু কোনও সঙ্গীত পরিচালককে দায়িত্ব দিলে মেসির ওই ভয়ার্ত মুখের পিছনে শকুনের ডানা ঝাপটানোই হয়তো মিক্স করাতেন। কে বলতে পারে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কখনও দ্বিতীয় রাউন্ডে এতগুলো ম্যাচ এক্সট্রা টাইমে গড়ায়নি। এ বার শুধু গড়াচ্ছেই না, কী শেষে ঘটবে কেউ জানে না। কাল দেখছিলাম ব্রাজিলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর আলবার্তো পাহিরা সর্বসমক্ষে তাঁর ক্যাপ্টেন দিয়াগো সিলভা-র সমালোচনা করেছেন। বলেছেন, এ কী কথা? তুমি ব্রাজিল টিমের ক্যাপ্টেন। চিলি ম্যাচের পর প্রকাশ্যে এমন হাউহাউ করে কাঁদবে কেন! ক্যাপ্টেন তা হলে দৃষ্টান্ত হল কী করে!

কিন্তু পাহিরার কথাটা বিশেষ ভোট পায়নি। মেসিই তো কাল যদি কেঁদে-টেদে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে পড়েন, এতটুকু আশ্চর্য হব না। জীবনের চরম আতঙ্কের জেলখানাবাস না হয়ে হঠাৎ প্যারোলে মুক্তি। আবেগ তো গভীরতম জায়গায় যাবেই। ব্রাজিল টিম যেমন চিলি-আতঙ্কের পরে তিন দিন ফুটবলারদের কাউকে বল ছুঁতে দেয়নি। রবি, সোম, মঙ্গল তিন দিন নির্ভেজাল ছুটি কোয়ার্টার ফাইনালের আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনও টিম পেয়েছে? নাকি নিয়েছে?

স্কোলারি বুঝেছেন, আগে এদের মনটা সারাতে হবে। তার পর স্ট্র্যাটেজি। কাল তো মনোবিদ মার্ক উইলমন্টের সঙ্গে আলাদা করে বসল সে দিনকার টিম। টিম সেশনেই নেইমার দ্য সিলভা আবির্ভূত ডান পায়ে ব্যান্ডেজ আর একটা ছোট যন্ত্র হাঁটুতে বেঁধে। যাঁর নাম ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেটর। অন্য দিন হলে শুধু এই ছবিটাই হেডলাইন হয়ে যেত।

এটা যে ব্যতিক্রমী বিশ্বকাপ! ব্রাজিলীয় মিডিয়ার মুখে তাই নেইমারের হাঁটুর ব্যান্ডেজ নয়, অন্য হতাশ উপলব্ধি। কী দিনকাল পড়ল যে, কলম্বিয়া ম্যাচের আগে ব্রাজিলের মনোবিদ দরকার পড়ছে! কী কী সব ফল হয়েছে এ বারের বিশ্বকাপে। এই একগুচ্ছ অর্থনীতিবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, জুয়াড়ি, ফুটবল-বিশেষজ্ঞ—সবাইকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।

আমেরিকা-২ : পর্তুগাল-২

স্পেন-১ : নেদারল্যান্ডস-৫

চিলি-২ : স্পেন-০

কোস্টারিকা-১ : ইতালি-০

জার্মানি-২ : ঘানা-২

কলম্বিয়া-২ : উরুগুয়ে-০

ব্রাজিল মানে সুদূরতম অনিশ্চয়তা! ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের মূর্তি। বিকিনি আর সফেন সমুদ্রের উচ্ছ্বাস। অনবদ্য মাপের বিচ ফুটবল। পরমুহূর্তেই রিওর সরু গলি আর বন্ধুকবাজের ছিনতাই। ফুটপাথে গুলির আওয়াজ। পড়ে থাকা চাপচাপ রক্ত। পুলিশের গাড়ির তীব্র সাইরেন। জনজীবনে সুস্থির কোনও নিশ্চয়তা নেই, বরাবর এটাই সবাই জেনে এসেছে। কে জানত সেই থিমটাই তার বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে উঠে আসবে যে, কেউ কখনও নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে কোরো না?

হামেস রদ্রিগেজ—যাঁকে কেউ টুর্নামেন্টের আগে চিনতই না, তাঁকে নিয়ে ব্রাজিলীয় মিডিয়ায় এখন নতুন আতঙ্ক। রোজ নতুন চর্চা যে, গড়পড়তা ফুটবলারের চেয়ে তাঁর পেরিফেরাল ভিশন বেশি। পুরো মাঠটা সামনে দৌড়তে দৌড়তেই বুঝতে পারেন। আতঙ্কের হৃৎস্পন্দন ব্রাজিল টিমেও ধরা পড়ছে। রদ্রিগেজ সামলাতে স্কোলারি নাকি ছক বদলে ৩-৫-২ খেলতে পারেন! ও দিকে আর্জেন্তিনার ইতিমধ্যে দুঃস্বপ্ন শুরু হয়ে গিয়েছে, কী ভাবে থামাবে বেলজিয়াম ফরোয়ার্ড লাইনের তারুণাকে? সুইসরা কাউন্টার অ্যাটাকেই ঘাম ঝরিয়ে দিয়েছিল। আর এরা এত আক্রমণাত্মক যে আমেরিকা ম্যাচে সাতাশটা স্কোরিং চান্স তৈরি করেছিল। টিম হাওয়ার্ড হেরেও যে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’, তার কারণ বিশ্বকাপের চুরাশি বছরের ইতিহাসে একটা কোনও ম্যাচে গোলকিপার এত বেশি গোল বাঁচায়নি! প্রতিযোগিতার সাব-অল্টার্ন থিম অনুযায়ী এই রকম একটা সেমিফাইনাল লাইন-আপ ব্রাজিল ফুটবলমহলের অন্দরে খুব চলছে।

কলম্বিয়া বনাম ফ্রান্স।

কোস্টারিকা বনাম বেলজিয়াম।

শুনে সাও পাওলোর এক গভীর ফুটবল অনুরাগী বললেন, ”ঠিক হয়ে যাবে। সেমিফাইনালে দেখবেন আমরাই যাব। আর্জেন্তিনাও যাবে।” ইভান নামক এই তরুণ এককালে রেডিওয় ফুটবল সাংবাদিকতা করতেন। এখন ছেড়ে দিয়েও নেটে প্রতি সপ্তাহে ফুটবল ব্লগ লেখেন। মেসি-নেইমারদের পরের রাউন্ডে ওঠার কোনও সূচক অবশ্য চলতি সপ্তাহের ব্লগেও তিনি বার করতে পারেননি স্বীকারই করে নিলেন। আর বললেন, ”ভয়ঙ্কর উল্টোপাল্টা কিছু ঘটলে ব্রাজিলের ঘরে ঘরে দুঃখের আগুন জ্বলবে! বিশ্বকাপ মারা যাবে স্যার, সেমিফাইনাল শুরুর আগেই।”

সাও পাওলো, ৩ জুলাই