কুয়াশার ফুল – ৫
পঞ্চম অধ্যায়
ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী গাড়ি থেকে নামতেই হই-হট্টগোল থেমে গেল। বাড়িটার সামনে যে ক’টা লোক জটলা করেছিল তারা নিজে থেকেই যেন দু’পা সরে দাঁড়াল। দিনের আলোয় পুলিশের গাড়ি আর রাতে ডাইনি—এ দুটো জিনিসকেই এই গ্রামের সবাই ভয় পায়।
অপরেশ গাঙ্গুলী গাড়ি থেকে একটা ছোট লাফ দিয়ে নেমে এসে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। এদিকটায় বড় একটা আসেননি তিনি এর আগে। যে একমাস এদিকে রয়েছেন তার বেশিভাগটা সরকারি কাগজের ঠেলা সামলাতেই কেটে গেছে। তবে সঞ্জয় এদিকের পুরনো খেলোয়াড়। তাকেই গা বাড়াতে হচ্ছে বেশি করে।
আজ সকালে নিজের কোয়ার্টারে ঘুমাচ্ছিলেন অপরেশ। এমন সময় বড়বাবুর জরুরি তলব। ব্রুটাল হোমিসাইড। খুনি নাকি বডি একদম ফর্দাফাই করে দিয়েছে। এমনিতে এ অঞ্চলে ক্রাইম রেট কম। খুন জখম এক রাজনৈতিক কারণ ছাড়া হয় না বললেই চলে। তার মাঝে গৃহস্থের জানলা ভেঙে এমন নৃশংস খুনে উপরমহলও নড়েচড়ে বসেছে। যে লোকটা মারা গেছে সে আবার স্থানীয় নেতা দিলীপ দস্তিদারের স্নেহভাজন। ফলে ভদ্রলোক খুনিকে টেনে বের করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। নিজেই গাড়ি হাঁকিয়েছেন এদিক পানে। এসে পড়লেন বলে।
অপরেশের বিরক্তই লাগে। সকালে ঘুমটা জমেছিল ভালো। তার মাঝে দিলুবাবুর হেঁড়ে গলায় নির্দেশ শুনতে হল। তখন থেকেই মেজাজ ব্যোমকে আছে।
অপরেশের পেছনে পেছনে সঞ্জয় নামে গাড়ি থেকে, সঙ্গে দুজন কনস্টেবল। সঞ্জয় পকেট থেকে মোবাইল বের করে একটা ছবি তুলে নেয় বাইরেটার। তারপর সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে ছোট করে, ‘আসুন স্যার’ বলে এগিয়ে যায়।
‘তোমার বাড়িতে মেয়ে দেখতে আসিনি। এই কথায় কথায় আসুন স্যার, বসুন স্যার করে আপ্যায়ন করতে হবে না!’ খিঁচিয়ে ওঠে অপরেশ।
সঞ্জয় জিভ কাটে।
দুজনে মিলে একবার বাইরে থেকে জানলাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনার পর প্রায় সাত ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের একটা টিম প্রাথমিক তদন্ত করে গেছে। ফরেনসিকের লোকও এসে স্যাম্পেল কালেক্টও করে গেছে। ঘরের ভেতরে বাড়ির লোককেও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। বডি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই।
ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী দেখলেন সারি সারি জং ধরা গ্রিলগুলো যেন পাতাঝরা গাছের ডালপালার মতো দুমড়ে গেছে। ফাঁকটা তিনি ভালো করে লক্ষ করলেন। একটা ছ-সাত ফুট মানুষের পক্ষে আরামসে ওই ফাঁক দিয়ে গলে যাওয়া যায়। অর্থাৎ খুনি ছোট বড় যে-কোনও চেহারার হতে পারে।
গ্রিলটা ভালো করে পরীক্ষা করলেন তিনি। নাঃ, সন্দেহ নেই, গ্রিলগুলো বাঁকাতে কোনও যন্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। বরং হাতের টানে মাকড়সার জালের মতো দুদিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাতের লাঠিটা দিয়ে গ্রিলের উপর ঠং-ঠং করে দুবার বাজালেন তিনি। একবার ঘরের ভেতরে উঁকি মারলেন তারপর সঞ্জয়ের দিকে ফিরে বললেন, ‘লোকে বলছে, এই জানলা হাত দিয়ে ভেঙে খুনি ঘরে ঢুকে ছিল?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আমাদের টিমও দেখে বলেছে ওগুলো যন্ত্র দিয়ে কাটা নয়। দুপাশ থেকে টেনে ভাঙা। তাছাড়া স্যার, যন্ত্রপাতির কোনও আওয়াজও শুনতে পায়নি কেউ।’
ঠোঁট উল্টান ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। বিড়বিড় করে বলেন, ‘লোকটাকে ধরতে পারলে একবার তোমার দিলুবাবুর অণ্ডকোষ দুটো খামচে ধরতে বললে হয়…’
‘লোক নয়, স্যার। সবাই বলছে মহিলা।’
‘সবাইটা কে?’
‘খুনদুটো যখন হয় তখন জানলার কাছে এলাকারই একটা ছেলে দাঁড়িয়েছিল। সে বলছে একটা মেয়েকে দেখেছে জানলা দিয়ে নেমে পালিয়ে যেতে। আমরা স্টেটমেন্ট নিয়ে রেখেছি।’
‘তাহলে তো ভালোই হল।’
‘কী ভালো হল স্যার?’
‘একটা মেয়েকে দিয়েই তোমার দিলুবাবুর অণ্ড…’ কথাটা বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন অপরেশ গাঙ্গুলী।
সঞ্জয় কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল। থেমে গেল। একটা গাড়ি এসে থেমেছে বাড়িটার সামনে।
গাড়িটা চেনেন অপরেশ। বিড়বিড় করে বলেন, ‘মালিক এসেছে, জিভ রেডি করো সঞ্জয়, চাটতে হবে—।’
গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন দিলীপ দস্তিদার। সঙ্গে দুটো অল্পবয়সি ছেলে-মেয়ে। এরা সম্ভবত রিপোর্টার গোছের কেউ হবে। এছাড়াও আর একটা স্থানীয় ছেলে আছে, তবে সে সম্ভবত চ্যালাচামুণ্ডা গোত্রের।
চারজনেই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসেন ওদের দিকে। দিলীপ দস্তিদার নিজেই আগ বাড়িয়ে বলেন, ‘ফরেনসিকের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে গাঙ্গুলী, ওদের ফার্স্ট ট্র্যাকে কাজ করতে বলেছি। আজ রাতের মধ্যেই রিপোর্ট দিয়ে দেবে।’
গাঙ্গুলী বিশেষ উত্তর-টুত্তর দেন না।
দিলীপবাবু নিজেই বিমর্ষ গলায় বলেন, ‘আমার এলাকায় এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল। কী বলি বলুন দেখি…’
গাঙ্গুলী সঞ্জয়ের কানে কানে ফিসফিস করেন, ‘দিলীপবাবু কোথায় হিসি করেছেন পরে জিগ্যেস করে নিও…’
‘ইয়ে…হিসি মানে?’
‘এলাকা তো কুকুরের হয় কিনা, আর ওরা হিসি করে করেই এলাকা মার্ক করে রাখে…’
মেয়েটির সঙ্গে ক্যামেরাম্যানটি ক্যামেরা বাগিয়ে ধরে পুলিশের দিকে ফেরায়। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী লাঠি দিয়ে ইশারা করে তাকে ক্যামেরা নামাতে বলেন।
‘এরা ওই সাংবাদিক গোছের। আমার রেকমেন্ডেই এসেছে। তনুজা, ভারি ভালো মেয়ে। আর ও প্রত্যয়…’ দস্তিদার আলাপ করিয়ে দেন, ‘ওদের সঙ্গে যে-কোনও ইনফরমেশন শেয়ার করতে পারো। বিশ্বস্ত লোক!’
সঞ্জয় আর গাঙ্গুলী বিরক্ত হয়। এসব পুলিশের কাজের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ভদ্রলোক এই এলাকায় এতটাই প্রভাবশালী যে এরকম বেয়াড়া আবদার মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
জমাট ভিড়ের মধ্যে আবার একটা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী একবার গাল চুলকে নিয়ে সঞ্জয়কে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘চলো হে, বাইরের চাকচিক্য তো দেখলাম। এবার একটু ভেতরের সাজসজ্জা দেখে আসি…’
পাঁচজন মিলেই ভেতরে ঢুকে আসে। বাড়ির লোকেদের আপাতত সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্য জায়গায়। নানা জায়গায় পুলিশের লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই ওদের পাঁচজনের নাকেই রক্তের গন্ধ এসে ঝাপটা মারে। দিলীপবাবু নাকে রুমাল দেন।
ঘরের মেঝেতে এখনও রক্তের দাগ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেদিকে ভালো করে লক্ষ করেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। যে পরিমাণ রক্ত বেরিয়েছে একটা মানুষকে খুন করতে হলে ততটা রক্তের প্রয়োজন হয় না। হয় খুনি এলোপাথাড়ি ছুরি চালিয়েছে আর না হয় সে জানত না ঠিক কোথায় মারলে অল্প পরিশ্রমে মানুষ খুন করা যায়।
মেঝের উপর হাঁটু মুড়ে বসে রক্তের দাগ লক্ষ করেন ইন্সপেক্টর। একটি কনস্টেবল এসে দাঁড়িয়েছিল পেছনে। তাকে লক্ষ করে বলেন, ‘ফুটপ্রিন্ট?’
লোকটা হন্তদন্ত হয়ে বলে, ‘রক্তের উপর কিছু ফুটপ্রিন্ট ছিল স্যার, বাইরে থেকে লোক এসেছিল আর বাড়ির লোকজনের মিলেমিশে অন্তত গোটা চল্লিশেক। ছবি তোলা আছে।’
ইন্সপেক্টর ভালো করে তাকিয়ে দেখেন রক্তের উপর কয়েকটা পায়ের ছাপ এখনও হালকা ভাবে ফুটে রয়েছে। বেশিরভাগই আবছা হয়ে এসেছে।
‘ঘটনার সময় বাড়িতে যারা ছিল তাদের মধ্যে কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় আছে?’
‘দাদা অনিমেষবাবুর সঙ্গে সকালবেলা আমার কথা হয়েছে। উনি আপাতত একটু সামলে নিয়েছেন…’
‘ডেকে আনো—।’
দিলীপ দস্তিদারের মুখে আতঙ্কের ছায়া নামছিল, মেঝে থেকে মুখ সরিয়ে তিনি বলেন, ‘ফরেনসিকের লোক বলছে সমীরণের বডিতে নাকি ছত্রিশবার আর ওর বউয়ের শরীরে ন’বার ছুরি চলেছে?’
‘সেটাই আশ্চর্যের!’ বললেন অপরেশ গাঙ্গুলী, ‘মনে হচ্ছে খুনি যেন শুধু খুন করেনি। চিলি চিকেনের পিস বের করেছে। ভদ্রলোকের রেপুটেশন কেমন? মানে এলাকায় লোকজন কী বলে?’
‘নির্বিবাদী ভালো মানুষ। কারো সাতেপাঁচে থাকত না। আমার কাছেও এসেছিল কয়েকবার। কিন্তু পার্টিপলিটিকসের ব্যাপারে নয়। কিছু দরকার নিয়ে…সেই থেকেই চেনা!’
‘বাচ্চা?’
‘এই তো আগের বছর বিয়ে হল। বাচ্চাটা হয়েছে বোধহয় মাসতিনেক হল।’
‘তাও কেউ মাঝরাতে এসে জানলা ভেঙে এভাবে কিমা করে দিয়ে চলে গেল, হুম?’ ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবতে লাগলেন গাঙ্গুলী।
এতক্ষণে কনস্টেবলটি সমীরণ মিত্রের দাদাকে এনে দাঁড় করিয়েছে ঘরের বাইরে। ভদ্রলোকের গায়ে আপাতত একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি। মাথার চুল উশকো-খুশকো। বোঝা যায়, বাড়ির লোকেদের সামলাতে গিয়ে নিজের শোকপ্রকাশটুকু আর হয়ে ওঠেনি। বাইরে এসে তাকে সিঁড়ির পাশে রাখা একটা চেয়ারে বসতে বললেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। তারপর দেওয়ালে হেলান দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা বাচ্চার কান্না শুনে ঘরে ছুটে এসেছিলেন তাই তো?’
‘হ্যাঁ, অনেকক্ষণ থেকেই কান্না আওয়াজ শুনছিলাম। বাচ্চারা রাতবিরেতে কাঁদবে এতে আশ্চর্যের কী?’
‘তখন শুধু বাচ্চার আওয়াজ ছিল, আর কিছু ছিল না?’
‘না, আমরা অন্তত শুনতে পাইনি।’
‘বেশ, তারপর? কান্নাটা যে স্বাভাবিক নয় সেটা সবার আগে কী করে সন্দেহ হল আপনাদের?’
একটু মনে করার চেষ্টা করলেন অনিমেষ মিত্র, তারপর বললেন, ‘একটা অদ্ভুত শব্দ হল। ভারী শব্দ! পুরনো কাঠ চিড় খেলে যেমন আওয়াজ হয়, সেই রকম। আমরা ভাবলাম বাচ্চারা বুঝি ঝুলনা ভেঙে মাটিতে পড়ে গেছে…’
‘দুটো বাচ্চা ছিল, তাই তো? একটা আপনার অন্যটা আপনার ভাইয়ের। আপনার বাচ্চা কত বড়?’
‘এই সামনের মাসে এক বছর হবে!’
‘হুম, আপনি কী করছিলেন তখন?’
‘খেলা দেখছিলাম। আসলে বিদেশি ফুটবল দেখার নেশা আছে আমার। খেলাগুলো রাতে হয় তো, তাই ছেলেকে ওর কাকার কাছে রেখে আমরা একটু পরে আবার নিয়ে যাই। দুটো বাচ্চা, একসঙ্গে থাকে, অসুবিধা হয় না…’
‘বটে! তারপর কী হল?’
‘তারপর গ্রিলের উপর একটা আওয়াজ! ভীষণ জোরে। মনে হল মট করে যেন ভেঙে গেল গ্রিলটা! তারপর সুমির চিৎকার শুনে আমরা নেমে এসে দরজা খুললাম!’
‘কী দেখলেন?’
‘ঘরের ভেতর দেখলাম সুমি আর ওর বউ উল্টে পড়ে আছে। ওই দৃশ্য দেখেই আমি টর্চের আলো নিভিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর জানলার দিকে তাকালাম। আমাদের মধ্যেই কেউ ডাইনির কথা বলছিল। আমি ওসবে বিশ্বাস করি না। কিন্তু…’
‘হঠাৎ ডাইনির কথা মনে হল কেন?’
উত্তরটা দিতে গিয়ে একটু ইতস্তত করলেন অনিমেষ মিত্র, তারপর বললেন, ‘আমিই সবার আগে ঘরের দরজায় পৌঁছাই স্যার। পৌঁছাতে গিয়ে একটা অদ্ভুত খেয়াল হয় আমার। মনে হয় আমার পা চলেছে না…’
‘সেকী! প্যারালিসিস গোছের?’
‘খানিকটা সেইরকম। মনে হল কেউ পা’টা চেপে ধরে আছে। যতক্ষণ না সমীরণের চিৎকার থামল ততক্ষণ কেউ নড়তে পারিনি আমরা।’
‘সেই থেকেই আপনাদের মনে হল এটা ডাইনির কাজ?’
‘আমি জানি না স্যার। তবে…গ্রামের লোক বলছে গত অনেক বছর থেকেই নাকি এ গ্রামে…’
‘হুম…বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা, আপনাদের বাচ্চাদুটো একদম সুস্থ আছে তো?’
উপরে নিচে মাথা নাড়ালেন অনিমেষ। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী একবার গাল চুলকে আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি বা আপনার বাড়ির কেউ মিস্টার আর মিসেস মিত্রের চিৎকার, বাচ্চাদের চিৎকার ছাড়া আর কোনও শব্দ শোনেননি?’
‘না।’ দুদিকে মাথা নাড়েন অনিমেষ মিত্র।
গাঙ্গুলীর ভুরু কুঁচকে যায়। দেওয়াল থেকে পিঠ তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করেন, ‘ভালো করে ভেবে দেখুন তো, গ্রামের একটা ছেলে সেই সময়ে আপনাদের গ্রিলের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়েছিল। সে ঘরের ভেতর থেকে একটা মহিলা কণ্ঠের হাসির আওয়াজ শুনতে পায়। সেটা মিসেস মিত্রের হওয়া সম্ভব নয়।’
‘আমি অন্তত কিছু শুনতে পাইনি। ঘরের ভেতর কেবল ওদের দুজনের আওয়াজ শুনেছিলাম।’
হাঁটু মুড়ে মেঝের উপরেই উবু হয়ে বসলেন গাঙ্গুলী। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা ওর কোনও শত্রু থাকতে পারে বলে জানেন আপনি?’
‘না, অসম্ভব। আমার ভাইয়ের মতো ভালো ছেলে এই গ্রামে ছিল না। তবে শত্রু বলতে…’ ঘরে উপস্থিত বাকিদের মুখের দিকে চোখ বুলিয়ে নেন অনিমেষ মিত্র। তারপর বলেন, ‘বছর দুয়েক আগে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার ভাইয়ের দেখাশোনা করে সম্পর্ক ঠিক হয়েছিল…’
‘বিয়ে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। সবাই জানে সে কথা। আমাদের পাশের গ্রামেরই মেয়ে। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবার পর মেয়েটি হঠাৎ করে বেঁকে বসে। তার নাকি অন্য একটি প্রেমিক আছে। এতদিন বলেনি, এখন বলছে। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা একটা সামাজিক কলঙ্কের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিয়ে ভেঙে আসার আগে তার বাড়ি বয়ে গিয়ে আমিই তাকে দু-কথা শুনিয়ে আসি। তাতে তার আমাদের উপর একটা চাপা রাগ থাকারই কথা, কিন্তু তার জন্য একটা মানুষকে এভাবে কুপিয়ে খুন করবে!’
দিলীপবাবুর দিকে চোখ তুলে তাকান ইন্সপেক্টর। তারপর সঞ্জয়ের দিকে ফিরে বলেন, ‘একটা ব্যাপার ভারি আশ্চর্য লাগছে বুঝলে? এটা প্রিমেডিটেটের মার্ডার হওয়া অসম্ভব! ভদ্রলোক রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতেন। এদিক-ওদিক যেতেন। ছুরি দিয়েই যদি খুন করতে হয় তাহলে রাস্তাঘাটে হঠাৎ করে ছুরি মেরে পালিয়ে যাওয়াটাই তো ভালো। রাত্রিবেলা সুরক্ষিত অবস্থায় জানলা ভেঙে ঘরে ঢুকে তার বউয়ের সামনে তাকে খুন করে পালিয়ে যাওয়াটা অ্যাবসার্ড নয়?’
‘মানে আপনি বলছেন খুনটা হঠাৎ করেই করা?’
‘তাই যদি হয় তাহলে খুনি রাতবিরেতে ছুরি নিয়ে ঘুরছিল কেন? মার্ডার ওয়েপনটা তো পাওয়া যায়নি কোথাও…’
দিলীপ দস্তিদার এতক্ষণ মন দিয়ে কী যেন ভাবছিলেন, তিনি বললেন, ‘আমার কি মনে হয় জানেন স্যার?’
‘কী মনে হয়?’
‘খুনির টার্গেট সমীরণ ছিল না। ছিল অন্য কেউ…’ মুখ তুলে একটা ইশারা করেন দিলীপ দস্তিদার, ‘ওই বাচ্চা দুটোকেই তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল ডাইনিটা। সমীরণ আর ওর বউ এসে বাধা দেওয়ায় ওদের দুজনকে রাগের মাথায় খুন করে পালিয়ে যায়।’
‘ডাইনি মানে আপনার সেই গঙ্গা বলে মেয়েটি? আপনি বলছেন এতসব তারই কীর্তি?’
দিলীপবাবু সরাসরি কিছু উত্তর দেন না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। গাঙ্গুলী উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘তার মাথার রোগ আছে বুঝলাম। বাচ্চা চুরি করে তাও নাহয় মেনে নেওয়া গেল, কিন্তু সে রোগে একটা আস্ত গ্রিলের জানলা হাত দিয়ে টেনে ভেঙে ফেলে, এটা আদৌ সম্ভব?’
‘আপনি তো গুপির কথা নিজের কানে শুনলেন, আমি বলি কি ইন্সপেক্টর, আপনি থানা থেকে একটা অর্ডার বের করে ওর বাড়িটা একবার ভালো করে তল্লাশ করুন। ওর বাড়িতে খুঁজলে কিছু না কিছু নিশ্চয়ই পাবেন আপনি।’
ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী একটানা ভাঙা জানলাটার দিকে তাকিয়েছিলেন। সেদিকে চোখ রেখেই বললেন, ‘উঁহু, ডাইনির ব্যাপারটা বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু এই খুনটার মধ্যে যে একটা অমানুষিক ব্যাপার আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। আগেরবার আপনার কথা শুনে ওর একটা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করিয়েছিলাম। সেটা মোটামুটি পরিষ্কারই আছে। এই গ্রাম ছেড়ে ভদ্রমহিলা খুব একটা নড়েননি।’
‘কোনও অভিযোগ নেই?’ তনুজা এতক্ষণ চুপ করে লক্ষ করছিল সব কিছু। এবার সাহস পেয়ে সে প্রশ্ন করে।
‘সে যা অভিযোগ তার ডায়েরি হয় না। একদল মহিলা দল বেঁধে থানায় গেছিলেন এই অভিযোগ নিয়ে যে গঙ্গা তাদের স্বামীকে ফুস-মন্তর করে বশ করেছে, কেউ আবার বলেছে এক শয়তানের সঙ্গে নাকি বিয়ে হয়েছে ওর। তাকে বশ করেই এইসব অনর্থ করায় ও। মোটকথা কংক্রিট কিছু কোনওদিন কারো কাছেই ছিল না। তবে…’ ইন্সপেক্টর কী ভেবে একটু চুপ করে আবার নিজেই বলতে থাকেন, ‘কিছু একটা তো করেন মহিলা। আমার মন বলছে কোনও না কোনও ক্রাইমের সঙ্গে জড়িত উনি। আমরা ভুল দিকে ছুটে মরছি…’
‘ওয়ারেন্টের ব্যাপারটা…’ দিলীপবাবুকে মাঝপথেই থামিয়ে দেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, একটা বড় শ্বাস নিয়ে বলেন, ‘ঠিক আছে আপনি বলছেন যখন আমি দেখছি। তবে আমার গঙ্গার এগেন্সটে কোনও পার্সোনাল ভেনডেটা নেই। কিছু যে বের করে আনবই এমন কিছু কথা দিতে পারছি না।’
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তেজও বেড়ে চলেছে। দিলুবাবু বাড়ির মধ্যেই রয়ে গেলেন। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, সঞ্জয় আর রিপোর্টার দুজন বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগলেন চায়ের দোকানের দিকে। রিপোর্টার দুজন যে ওর খাস লোক সেকথা আর একবার মনে করিয়ে দিলেন দিলুবাবু।
তনুজা কথাবার্তায় বেশ চৌকস। ছোট ছোট করে কাটা বয় কাট চুল। পরনে টপ আর জিন্স। মুখ-চোখ দেখে বেশ চাঁচা-ছোলা ব্যক্তিত্ব আছে বলে মনে হয়। ঝকঝকে স্মার্ট কথাবার্তা। দিলুবাবু বিদায় নিতে গাঙ্গুলীর উপর একরকম হামলে পড়েই বলল, ‘আপনি বিশ্বাস করছেন নাকি এই ডাইনির ব্যাপারটা?’
‘পুলিশে ভর্তি হওয়ার সময় দুটো জিনিস সবার আগে শিখিয়েছিল— কারও কথায় বিশ্বাস না করা, আর কোনটা বিশ্বাস করছি আর কোনটা করছি না সেটা রাজনীতির লোকেদের না জানানো…’ একটা সিগারেট ধরান ইন্সপেক্টর, ‘গঙ্গাকে এই গ্রাম থেকে সরালে দিলুবাবুর নিজের কিছু সুবিধা হবে। গঙ্গার মুখের কথা এই গ্রামের লোকেরা মাথায় করে রাখে। ও এখানকার ছোটখাটো একটা মেসিহা। দিলুবাবু রাজনীতির লোক, কোনওদিন গঙ্গা খেপে গিয়ে ওর বিরুদ্ধে দুটো কথা বললে ভোট ব্যাঙ্কে টান পড়তে পারে। এটুকু বোঝার মতো জ্ঞান-গম্যি আমার আছে। কিন্তু আপনি ওই জানলাটা এক্সপ্লেইন করতে পারবেন?’
তনুজা আর কথা বাড়ায় না। নরম কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে, ‘জানি না, কিন্তু ভাবতেও লজ্জা লাগে আজ বিংশশতাব্দীতে দাঁড়িয়েও একটা শিক্ষিত মানুষ আর একজন মহিলাকে ডাইনি অপবাদ দিতে পারে।’
‘বিংশশতাব্দীতেই হচ্ছে বাচ্চা চুরিগুলো। বডি বেমালুম গায়েব। হাত দিয়ে টেনে লোহার গ্রিল ভেঙে ফেলছে কেউ…’
গাঙ্গুলী কথায় কথায় জানলেন বাংলার গ্রামেগঞ্জে ডাইনির মিথ নিয়ে কী যেন লেখালিখি করছে মেয়েটা। দিলীপবাবুর বিশেষ পরিচিতা। তার মুখ থেকেই এসব জেনে এতদূর এসে পড়েছে।
গল্প করার ঢঙেই অপরেশকে প্রশ্ন করে মেয়েটা, ‘তাহলে আপনার কী মনে হয় স্যার, গঙ্গার অপরাধটা কী?’
ইন্সপেক্টর কাঁধ ঝাঁকান, ‘মহিলা খুনটা করতে ফিজিক্যালি কেপাবেল না। সঙ্গের মেয়েটিও দুবলাই বলা চলে। এর পেছনে যদি ওদের মাথা থেকেও থাকে, শরীর অন্য কারো।’
‘আপনার মনে হয় না অকারণেই মহিলাকে ফাঁসানো হচ্ছে? গঙ্গা তো শুনলাম কারো সঙ্গে মেলামেশাই করে না। ও কাউকে দিয়ে খুন করাবে কেন?’
‘আপনি ভুলে যাচ্ছেন গঙ্গা এ গ্রামের কিছু মানুষের কাছে মেসিহা, আবার কারো কাছে ডাইনি। এই মেসিহা হওয়ার বাসনা থেকেই হয়ত অন্য কারো হয়ে খুনগুলো…’
সঞ্জয় এবার পাশ থেকে বলে ওঠে, ‘আমি স্যার একটা হিচককের ফিল্ম দেখেছিলাম। তাতে দুটো সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের মধ্যে খুনের অদল বদল হত। মানে আপনার শত্রুকে আমি খুন করব আর আমার শত্রুকে আপনি। আপাতভাবে আমাদের দুজনেরই মোটিভ থাকবে না, পুলিশ ধন্দে পড়ে শেষে ছেড়ে দেবে। ধরুন এক্ষেত্রে গঙ্গা এই মিডল ম্যানের কাজটা করে। ওর কাছে তো কত লোক আসে। নিজেদের সমস্যা খুলে বলে ওকে। সেখানেই হয়ত…’
‘প্যাসেঞ্জারস অন আ ট্রেন…’ পাশ থেকে প্রত্যয় বলে।
মাথা নাড়ে অপরেশ, ‘বিচিত্র নয়। মহিলা বুদ্ধিমান এবং শিক্ষিত। নইলে এতদিন এই হিংসুটে শেয়াল কুকুরের মধ্যে সারভাইভ করতে পারতেন না।’
চারজন মিলে চায়ের দোকানে ঢোকে। আপাতত তেমন লোক নেই এখানে। পুলিশ অফিসারকে ঢুকতে দেখে আরও ফাঁকা হয়ে যায়। সঞ্জয় খবরের কাগজ দিয়ে বেঞ্চের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে, ‘আপনি ওয়ারেন্ট বের করবেন ভাবছেন নাকি?’
‘দিলুবাবু যেভাবে হাতধুয়ে মহিলার পেছনে পড়েছেন, না বের করে উপায় নেই।’
সঞ্জয় একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলে, ‘দেখুন, এটা যদি ধরেও নিই যে মহিলা বাচ্চা চুরি করেছে সে অবশ্যই তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখেনি। ওয়ারেন্ট ফোয়ারেন্টে লাভ কিছু হবে না।’
‘তাতে কিছু যায় আসে না। দিলুবাবু ইনফ্লুয়েন্সিয়াল লোক। আজ না হোক কাল ও মহিলাকে গ্রাম ছাড়া করবেই…’
রিপোর্টার মেয়েটা চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে প্রশ্ন করে, ‘আপনি মহিলাকে দেখেছেন সামনে থেকে?’
‘উঁহু, এলামই তো ক’দিন হল মাত্র। তবে থানায় খুঁজে কিছু ছবি পেয়েছি ওর।’
মোবাইল ফোনের গ্যালারিতে গিয়ে একটা পুরনো ছবি বের করেন ইন্সপেক্টর। দেখে বোঝা যায় কোনও ডকুমেন্টের উপরে লাগানো ফটোগ্রাফ থেকে মোবাইলে তোলা ছবি।
সঞ্জয় ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে বছর পঞ্চাশের রোগাটে এক মহিলা। গায়ের রং ফ্যাকাসে। নাকটা স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি খাড়া। চোখের কোণ বয়সের ভারে কুঁচকে গেলেও মণি দুটো ভারি উজ্জ্বল। আকাশি রঙের একটা আলখাল্লা জাতীয় পোশাক জড়ানো গায়ে। গালগুলো ভেঙে গেছে, মুখভর্তি বলিরেখা। তবে একসময় যে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন সেটা চোখদুটো দেখে বোঝা যায়। অদ্ভুত একটা দ্যুতি আছে মুখটায়। সহজে চোখ ফেরানো যায় না। একটানা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ছবি তুলেছেন। চোখে পড়ল কপালের দিকে ক’টা নখের আঁচড়ের দাগ। গাঙ্গুলী সেটা দেখিয়ে বললেন, ‘শুনেছি ছোটবেলায় নিজেই নিজেকে খিমচে করেছিল ওই দাগগুলো! ভাবা যায়!’
সঞ্জয় চাপা গলাতেই ফুট কাটে, ‘ডাইনি হিসেবে কিন্তু মানাবে ভালো, কী বলুন?’
মেয়েটির হাতে ছবিটা দেয় সঞ্জয়। অপরেশ বলে, ‘এটা বছর তিনেক আগের ছবি। এখন নিশ্চয়ই স্বাস্থ্য আরও ভেঙেছে। শুনছি গত ছয়মাস নাকি কাউকেই খুব একটা সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না। মেয়েটিই তার থেকে জেনে এসে জড়িবুটি বলে দিচ্ছে…’
‘মেয়েটারও তো ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করিয়েছেন শুনলাম, তার কোনও ছবি আছে আপনার কাছে?’
খুঁজে খুঁজে একটা পুরোনো ডকুমেন্টের ভেতর মেয়েটার ছবি আবিষ্কার করলেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, ‘এই যে, এই ছবিটা…তবে এর ব্যাকগ্রাউন্ড একটু গন্ডগোলের। বাবা-মা কাউকেই নাকি চেনে না। কাইন্ড অফ অরফ্যান!’
আড় চোখে সেটার দিকে একবার তাকিয়ে সঞ্জয়ের হাতে তুলে দিতে গিয়ে থমকে গেলেন ইন্সপেক্টর। আবার টেনে আনলেন ছবিটা চোখের সামনে। আতিপাতি করে কী যেন দেখার চেষ্টা করলেন ছবিটার মধ্যে। আচমকাই খামচে ধরলেন সঞ্জয়ের হাতটা। গ্যালারিতে সাফল করতে গিয়ে এইমাত্র একটা ছবি চোখে পড়েছে তার। অন্য ছবি খুঁজতে গিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন সেটা। কিন্তু ওই মুহূর্তের ভগ্নাংশেই ছবিটা একটা খোঁচা দিয়ে গেছে ওর মাথার মধ্যে।
থতমত খেল সঞ্জয়, ‘কী হল স্যার? কী দেখতে পেয়েছেন?’
উত্তর না দিয়ে স্ক্রিনের উপর একটা ছবি টেনে আনেন অপরেশ। ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটার একটা হাত আর পায়ের ছাপও নেওয়া আছে। পায়ের ছাপটা বের করে কয়েক সেকেন্ড ঠায় সেদিকে চেয়ে রইলেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। তারপর আচমকা চা ছেড়ে উঠে পড়ে দৌড়াতে লাগলেন বাড়ি লক্ষ্য করে।
বাড়ির সামনে হল্লা আবার বেড়ে উঠেছে। সেটাকে পাত্তা না দিয়ে জমাট বাধা ভিড়টাকে ঠেলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়লেন ইন্সপেক্টর। সঞ্জয় এতদূর দৌড়ে এসেছে ওর পেছন পেছন।
খুনের ঘরটায় ঢুকে মাটির উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন ইন্সপেক্টর অপরেশ গাঙ্গুলী। সেখানে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগের উপর কয়েকটা পায়ের ছাপ ফুটে আছে। যে বিশেষ পায়ের ছাপের উপর ইন্সপেক্টরের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে সেটা একেবারেই আবছা। দুতিনটে পায়ের ছাপের নিচে উপরে আর তলার দিকে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে।
ফোনে খোলা ছবিটা সেই ছাপটার পাশে রাখলেন ইন্সপেক্টর। তারপর একপা পিছিয়ে এলেন। সঞ্জয়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘উই ওয়্যার বিটিং দ্যা রঙ বুশ সঞ্জয়।’
সঞ্জয়ের চোখ ততক্ষণে আটকে গেছে সেই পায়ের ছাপে। দুটো ছাপ যে একই মানুষের সেটা স্পষ্ট করে বলা না গেলেও আন্দাজ করে নিতে অসুবিধা হয় না।
‘মেয়েটা কাল রাতে এসেছিল এইঘরে। এবং তাকেই সম্ভবত ঘর থেকে পালাতে দেখেছে ছেলেটা…’ সঞ্জয় স্বগতোক্তি করে।
‘এবং আমি যদি খুব ভুল না হই, তাহলে এই খুনটা ও-ই করেছে!’
