কুয়াশার ফুল – ৬
ষষ্ঠ অধ্যায়
‘কী ব্যাপার? কার জন্য অপেক্ষা করছেন?’
পিছন ঘুরে মৌলিকে দেখতে পায় সায়ন। আজ বেশ কিছুক্ষণ হল বাসুদেবের মাঠে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ওর দেখা পায় পায়নি। বিরক্ত হয়ে কিছুক্ষণ মাঠের উপরেই হাঁটাহাঁটি করছিল। ঘড়ির দিকে দেখে কয়েকবার। এতক্ষণে সূর্য উঠে যাওয়ার কথা, অথচ তাও এসে পৌঁছায়নি মেয়েটা। সূর্য উঠে গেলে কি করে সানরাইজ…
ভাবতে ভাবতে একটা সিগারেট ধরাতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময় পেছন থেকে এসে টোকা দিয়েছে মেয়েটা। ও পেছন ঘুরে একটু মিষ্টি করে হাসে, বলে, ‘এ গ্রামে দিলুজেঠু আর তুমি ছাড়া তেমন কাউকে চিনি না—।’
‘ওহ! তার মানে দিলুবাবুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন?’ মৌলির কথায় সায়নের হাসি পেয়ে যায়। তাও মুখ গম্ভীর রেখেই বলে, ‘হ্যাঁ, ভাবছি কাল দিলুজেঠু আমায় নীল ফুলটা দিয়ে গেলেন, তার বদলে আমার কিছু দেওয়া হল না…’
‘তাই নাকি? আপনি চাইলে কিন্তু আমি দিলুবাবু হতে পারি।’ দিলুবাবুর গলা নকল করে মেয়েটা, ‘সায়ন, দেখো তো গঙ্গা ডাইনি কিনা…’
দুজনেই একসঙ্গে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে সায়ন জিগ্যেস করে, ‘আপনি তার মানে জানেন ব্যাপারটা?’
‘এই গ্রামের অনেক লোক আমার মাকে ডাইনি মনে করে তা না জানার কী আছে। দিলুবাবুই বা ব্যতিক্রম হবেন কেন? সবার চোখে মুখে ওই একটাই প্রশ্ন, আমার মা কি ডাইনি?’
‘ডাইনি নয়?’ সায়ন কৌতুকের স্বরেই জিগ্যেস করে।
‘আপনার কী মনে হয়?’
‘আমি? আমি তো আপনার মাকে দেখিনি, তবে আপনি ভ্যাম্পায়ার হলেও হতে পারেন।’
‘ভ্যাম্পায়ার!’ অবাক হয়ে যায় মৌলি, ‘ভ্যাম্পায়ার কেন?’
সায়ন হিসেব করার ভঙ্গিতে বলে, ‘একজন আদর্শ ভ্যাম্পায়ারের সমস্ত লক্ষণ আপনার মধ্যে বর্তমান। এরকম টকটকে গায়ের রং, টুকটুকে লাল ঠোঁট…’
সায়নের পিঠে হালকা ধাক্কা দেয় মৌলি, ‘যদি ভ্যাম্পায়ার হতাম তাহলে খাদের ধার দিয়ে পড়ে যেতাম?’
‘হতে পারে ওটা ইচ্ছা করেই পড়ছিলেন আপনি। যাতে আমি গিয়ে আপনাকে বাঁচাই।’
‘বটে! তাতে আমার লাভ?’
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে কী যেন ভাবে সায়ন। তারপর বলে, ‘ধরে নিন আজ থেকে বহু বছর আগে কোনও এক ভ্যাম্পায়ার হান্টার আপনার প্রেমিককে হত্যা করে। তারপর থেকেই তার বংশের উপর প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা আপনার। আর আমি হলাম সেই ভ্যাম্পায়ার হান্টারের বংশধর!’
মৌলি এই বিশ্লেষণে ভয়ঙ্কর অবাক হয়ে যায়, গালে হাত রেখে বলে, ‘আচ্ছা তা আপনার উপর কীভাবে প্রতিশোধ নেব? রক্ত খেয়ে? সে তো কালকেই নিতে পারতাম!’
সায়নে সজোরে মাথা নাড়ে, ‘উঁহু, উঁহু, রক্ত খাওয়া আপনার উদ্দেশ্য নয়। ওসব ব্যাকডেটেড ভ্যাম্পায়াররা করে। আপনি একটু একটু করে আমার ভেতর থেকে সুখস্বাচ্ছন্দ্য কেড়ে নেবেন, আমার তারুণ্যকে কব্জা করে শরীরকে বশে এনে বিষণ্ণতায় মনকে ভরে দেবেন। বিষণ্ণতার প্রথম ধাপ কী জানেন?’
‘কী?’
‘মুগ্ধতা…’
দুজনে কখন হাঁটতে শুরু করেছে দুজনেই জানে না। ভোরের নতুন আলোর ফিকে ছটায় ভরে যেতে শুরু করেছে মাঠটা। দূরের বাঁশবন আর জঙ্গল স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাতে। সেই আলো এসে লাগছে মৌলির চোখেমুখে।
সায়ন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। ভ্যাম্পায়াররা দিনের আলোয় থাকতে পারে না, দিনের আলো এলে ওরা ছাই হয়ে যায়। কিন্তু মৌলির মুখে পড়ে নতুন সূর্যের আলো ওর ভেতরের কিশোরটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
‘ডাইনিতে আমিও বিশ্বাস করি না। কিন্তু আপনার মা যে বেশ রহস্যময় তা নিয়ে সন্দেহ নেই।’ সায়ন আনমনেই বলে।
‘এই পৃথিবীর কোন মা রহস্যময় নয় বলুন তো? পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী যে নিজের থেকে অন্য একজনকে বেশি ভালোবাসে। নিজের জীবনের ঝুঁকি থাকলেও তার সন্তানকে বাঁচায়। বলুন, এটা রহস্য নয়?’
কাঁধ ঝাঁকায় সায়ন, ‘আমি কী করে বলি বলুন?’
মৌলির চোখে মুখে তেমন বিকার লক্ষ করা যায় না, ও হাঁটতে হাঁটতেই বলে, ‘আমার কী মনে হয় জানেন? মা ব্যাপারটা না, অনেকটা সূর্যের মতো। আপনাকে সৃষ্টি করে, সারাদিন আলো দেয়। কিন্তু সারাজীবন তাকে দেখতে পাবেন না আপনি। চাইলেও তার কাছ থেকে সাহায্য পাবেন না। শক্তি আপনাকে নিজের ভিতর থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু সবসময় জানবেন আপনার ভিতরে যে শক্তি সেটাও তারই দেওয়া।’
মিষ্টি করে হেসে ওর দিকে তাকায় মৌলি, ‘কোথাও না কোথাও আছে, যত অন্ধকারই হয়ে যাক না কেন সূর্য ঠিক উঠবেই…’
‘আর যদি চিরকালের মতো অন্ধকার হয়ে যায়?’
ওর মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নেয় মৌলি। ধীরে ধীরে উচ্চারণ করে, ‘তাহলে এই অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবেন। অপেক্ষা করলে, ওই দেখুন…’ আঙুল দিয়ে দূরের দিগন্তের দিকে দেখিয়ে দেয় মৌলি। বিস্তীর্ণ বাঁশঝাড়ের উপর দিয়ে একটু একটু করে সোনালি আলোর রেখা ফুটছে। একটা লাল থালার কানা উঁকি দিচ্ছে সেখান থেকে।
মুগ্ধ হয়ে সেদিকে চেয়ে থাকে সায়ন। রাতের অন্ধকার কেটে যাচ্ছে একটু একটু করে। জঙ্গলের ভিতর বিরাট দুলন্ত গাছগুলো স্নিগ্ধ হাওয়া ছড়াচ্ছে উন্মুক্ত প্রান্তরে। শীতের আমেজ মেখে কয়েকটা পাখি উড়ে গেল সেই দিকে। এক ঝাঁক বক ডানা মেলে দিল পুকুরের উপর দিয়ে। তাদের সম্মিলিত কলতানে ভরে উঠল জায়গাটা।
হঠাৎ কোথা থেকে একটা নীল ফুল বার করে সায়নের দিকে এগিয়ে দেয় মৌলি। সায়ন অবাক হয়ে যায়, ‘একী! আজকেও ওখানে গিয়েছিলেন নাকি? এটা পেলেন কোত্থেকে?’
মৌলি আবার সেই মিষ্টি হাসিটা হাসে, ‘এই ফুলটা আমি কোথা থেকে পাই জিগ্যেস করবেন না। তবে আপনার সঙ্গে যতদিন দেখা হবে, আপনাকে একটা করে এই ফুল দেব এনে দেব, কেমন?’
ভোরের আলোয় আশ্চর্য কোমল দেখায় ফুলটা। কয়েক ফোঁটা শিশিরবিন্দু জমে আছে ফুলের ওপর। সেটা নিতে গিয়ে মৌলির আঙুলে নরম স্পর্শ লাগে সায়নের। ওর শরীরটা শিউরে ওঠে। সেইসঙ্গে ভেতরে একটা অদ্ভুত বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে। একটু একটু করে বাঁশবনের রেখা ছাড়িয়ে উপর দিকে উঠছে সূর্যটা। সোনালি আলো বদলে যাচ্ছে কমলা আভায়।
ঘাসের উপরেই বসে পড়তে যাচ্ছিল সায়ন। মৌলি ওর জামা চেপে ধরে ভয়ানক আপত্তি করে, ‘একী! বসে পড়ছেন কেন?’
‘ওমা বসব না কেন?’ সায়ন অবাক হয়।
‘বলেছিলেন যে সূর্যোদয় দেখবেন?’
‘এই তো দেখছি…’
‘ধুর, এটাকে দেখা বলে নাকি? বলেছিলাম রকেটে উঠে দেখতে হবে।’
‘রকেট!’
সায়ন কিছু বলার আগেই ওর হাত ধরে টানতে শুরু করেছে মৌলি। কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে কে জানে। সায়ন আর খুব একটা আপত্তি করে না। ভোরের ঘাস নরম হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওদের পা। নতুন ফোটা ভিজে ফুলের গন্ধ আসছে কোথা থেকে। সায়নের মনে হয় ও আবার যেন শৈশবে ফিরে গেছে। কোথাও কোনওকিছুর তাড়া নেই। ট্রেন, বাস, ওয়াটসঅ্যাপ মেসেজ মিস করার ভয় নেই, মানুষের আসা যাওয়া নেই। শুধু একটা অচেনা হাত যেন কোথায় টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। কোথায় যাচ্ছে ও নিজেও জানে না।
ছুটতে ছুটতে একসময়ে হাঁপিয়ে যায় দুজনে। দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁটুতে হাত রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে সায়ন জিগ্যেস করে, ‘কই, কোথায় আপনার রকেট?’
‘ওমা! এই তো রকেট! সামনে তাকিয়ে দেখুন।’
সায়ন সামনে তাকিয়ে একটুক্ষণ ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর হোহো করে পেট চেপে ধরে হসে ফেলে। ওর ঠিক সামনেই একটা পাঁচতলা বাড়ির সমান ইলেকট্রিকের ইউটিলিটি পোল। তার গঠনটা একদম মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা রকেটের কঙ্কালের মতো। গ্রামেগঞ্জে ফাঁকা মাঠের মাঝে এমন বিশালাকায় ইলেক্ট্রিকের খুঁটি মাঝে মধ্যেই ট্রেনের জানলা থেকে দেখা যায়।
‘একী! আপনি রকেট দেখে হাসছেন কেন?’ মৌলি প্রতিবাদ করে।
সায়ন কোনওরকমে হাসি থামিয়ে বলে, ‘আপনি সত্যি পারেন বটে! জানেন, আমি ছোটবেলায় ট্রেনের জানলা থেকে এগুলো দেখে সত্যি রকেট ভাবতাম। মাঠজুড়ে অনেকগুলো রকেট দাঁড়িয়ে আছে, যেদিন এলিয়েনরা আক্রমণ করবে সেদিনই উড়ে গিয়ে ওদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।’
‘আসুন উপরে উঠি—।’ মৌলিই এগিয়ে গিয়ে খপ করে ইলেকট্রিক পোলের রেলিং চেপে ধরে।
‘খেপেছেন নাকি?’ সায়ন আঁতকে ওঠে, ‘ওটা দিয়ে ইলেক্ট্রিকের তার যায়।’
‘সে তার অনেক উপরে, আপনি আসুন তো…’
সায়ন আর উপায়ন্তর দেখে না। গোটা কাঠামোটা শক্ত স্টিলের রেলিং দিয়ে তৈরি। শীতের ভোরে সেই রেলিং ঠান্ডা হয়ে আছে। মৌলি তাতে উঠে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। তারপর তরতরিয়ে উঠতে থাকে উপরের দিকে। বোঝা যায় এ জায়গাটায় মাঝে মধ্যেই এসে বসে থাকে সে।
সায়ন কসরত করে মোটামুটি মিটারদশেক উঁচু একটা আড়াআড়ি রেলিংয়ের উপরে উঠে বসে। মৌলি আরও উপরে উঠছিল, কিন্তু ওকে বসতে দেখে ওর পাশে এসেই বসে পড়ে।
সামনে তাকিয়ে সায়নের চোখ ভোরে যায়। ওদের ঠিক সামনেই একটা গাছপালায় ঢাকা পড়া ঝিল। তার উপর নতুন সূর্যের কমলা আলো এসে কমলালেবুর শরবতের রঙ লাগিয়েছে তাতে। চতুর্দিকে যতদূর দেখা যায় কোথাও কোনও বাড়িঘর নেই। দূরদূরান্তের গাছপালাগুলোকে কোনও প্রাগৈতিহাসিক জঙ্গল মনে হচ্ছে।
ওর হতবাক মুখের দিকে চেয়ে মৌলি বলে, ‘বলেছিলাম না, সব ভালো ভালো জিনিসের খোঁজ কুসুমের কাছে পাবেন না।’
সায়ন মৌলির দিকে তাকায়। খোলা চুলের কয়েকটা রেখা ওর কপাল বেয়ে গাল আর নাকের উপরে নেমেছে। হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে সেগুলো। মুখে কমলা রঙের সঙ্গে লালচে আভা খেলছে। হঠাৎ নামানো চোখ তুলে ওর দিকে তাকায় মৌলি। সায়নের ভিতরে একঝাঁক সমুদ্রের ঢেউ যেন এক মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওর গোছানো বালুতট তছনছ করে দেয়। সেকেন্ডের মধ্যে ও মুখ সরিয়ে নেয়। মৌলির দৃষ্টি যেন ওর বিধ্বস্ত বালুচরের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
সায়নের ঠোঁট নড়ে ওঠে। সমস্ত প্রান্তরে কোথাও কেউ নেই, তাও ও কাকে যেন লুকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আমি কখনও ভাবিনি আপনার মতো কারো সঙ্গে পরিচয় হবে।’
‘আমার মতো বলতে? ভ্যাম্পায়ার গোছের?’
‘উঁহু…’ সায়ন কিছু বলতে গিয়েও আটকে যায়, বলে, ‘আমি জানি না আপনি কী…’
মৌলি সামনে তাকিয়ে ওর একটা হাত ধরে কোলের উপরে টেনে নেয়, ‘এই একটা ব্যাপারে মিল আছে। আমিও জানি না আমি ঠিক কী।’
মৌলিকে সায়ন অনেকক্ষণ থেকেই একটা প্রশ্ন করতে চাইছিল। সুযোগ ছিল না। এবার সেই সুযোগ পেতে একবার ঢোঁক গিলে বলল, ‘গঙ্গা তো আপনার নিজের মা নয়, তাই না?’
মৌলি শীতল স্টিলের উপর আলতো আঙুল বোলাতে বোলাতে বলে, ‘নিজের মা কে নিজেই জানি না। ছোটবেলার কথা কিছুই মনে নেই আমার। কেবল ছেঁড়াছেঁড়া কিছু দৃশ্য মনে আসে মাঝে মাঝে।’
‘কীরকম দৃশ্য?’
‘একজন মহিলা। বয়স ধরুন চল্লিশ। মনে হয় উনিই আমার মা। একটা কালো রঙের পাথরে বাঁধা। জামা কাপড় সব ছেঁড়া। কয়েকটা লোক মিলে ছিঁড়ে খাচ্ছে তাকে…তারপর সেই ছবিটা ওখানেই শেষ। তারপর আরেকটা ছবি। আমি কোলের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি। কোথায় দৌড়াচ্ছি জানি না। তবে কোলের প্রাণীটা একটা বিড়াল…এই জানেন, আমার বাড়িতে একটা কালো বিড়াল আছে। ওর নাম কুচিলা!’
‘কুচিলা! এ কেমন নাম!’
‘ভালো না? একদম কুচকুচে কালো। ভীষণ বদমাশ। আমার বুকের উপর ছাড়া বসবেই না। রোজ সকালে ম্যাও ম্যাও করে ডেকে তুলে দেয় আমাকে। আপনি আমাদের বাড়ি গেলে দেখাব কুচিলাকে…’
সায়ন খেয়াল করে, মেয়েটা হঠাৎ করেই প্রচুর কথা বলতে শুরু করেছে। সম্ভবত এ গ্রামে অন্য তেমন কোনও বন্ধু নেই তার। তাই সায়নকে পেয়েই সমস্তটা উজাড় করে দিচ্ছে।
‘এ ছাড়া আর কী দেখেন?’
মৌলি মনে করে বলে, ‘একটা ঘন নীল রঙের আলো। আমি জঙ্গলের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছি। জঙ্গলটা ভরে গেছে সেই নীল আলোয়, আমার সব কিছু অচেনা লাগছে। অনেকদিন ধরে দেখছি তাও অচেনা লাগছে সমস্ত কিছু। নীল আলোটা আমার শরীরেও জ্বলছে! আশ্চর্য! না?’
সায়ন মন দিয়ে একটু ভাবে। তারপর বলে, ‘কী জানি। এটুকু থেকে বোঝা অসম্ভব। তবে এটা হতে পারে যে আপনি কোনও জায়গা থেকে পালিয়ে এসেছেন। আসার সময়ই আপনার স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায়।’
মৌলির মুখে একটা বিষণ্ণতার ছায়া নামে, ‘আমারও তাই মনে হয়। আমার মাকে কেউ ধর্ষণ করে খুন করেছিল বোধহয়। আর পোষা বিড়াল নিয়ে আমি পালিয়ে গেছিলাম। অন্তত এই দুটো ছবি থেকে তো তাই মনে হয়…জানেন, তারপর থেকে একটা ভয় হয়েছে আমার…’
‘কীসের ভয়?’
মৌলি মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে বলে, ‘দড়ির বাঁধন জিনিসটা আমি খুব ভয় পাই। মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখি আমাকে দড়ি দিয়ে কেউ বেঁধে রেখেছে। ভীষণ ভয় লাগে, ওর থেকে মরে যাওয়া ভালো!’
‘আপনার নিজের মাকে দেখতে ইচ্ছা করে না? যে আপনাকে জন্ম দিয়েছে…’ জিগ্যেস করে সায়ন। হাত দিয়ে মুখের সামনে এসে পড়া চুল সরায় মৌলি, বলে, ‘আপনারও তো মাকে দেখতে ইচ্ছা করে। কী করেন তখন?’
একদিকের রেলিঙে পিঠ রাখে সায়ন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবীর সব ক’টা মানুষ জন্মের পর থেকে শুধু অসহায় হয়ে মাকেই খুঁজে চলেছে। কখনও ঈশ্বর বলে জড়িয়ে ধরছে তাকে, পুজো আচ্চা করছে, কখনও প্রেমিকা হিসেবে, বেশ্যা হিসেবে, কখনও…শুধু এক অন্তহীন নিরাপত্তার খোঁজ। আমাদের সৃষ্টি থেকেই এক দীর্ঘ যন্ত্রণার শুরু, তার মুখে দাঁড়িয়ে এক চিরস্থায়ী নিরাপত্তার খোঁজ…জননীর গর্ভের মতো…’ কথাটা বলে মৌলির দিকে চায় সায়ন, ‘নাহ, আমরা সবাই অনাথ, বুঝলেন?
ঝিল থেকে বয়ে আসা মৃদুমন্দ হাওয়া বইতে থাকে ওদের ঘিরে। কানের পাশ দিয়ে বয়ে যায় ওপাশে। উপরে তাকাতে অনন্ত মহাকাশ চোখে পড়ে। তার বুকে গিয়ে যেন বিঁধেছে ইউটিলিটি পোলের খাড়াই দিকটা। এই পোল বেয়ে উঠতে থাকলেই আকাশে পৌঁছে যাবে ওরা। একটা চাপা অস্বস্তি এসে গ্রাস করে সায়নকে। সেটা কাটাতেই ও বলে, ‘গঙ্গা আপনাকে পেলেন কোথায়?’
‘তা তো বলতে পারব না। মা এসব নিয়ে বড় একটা কথা বলতে চায় না। তবে শুনেছি আমার যখন দশ বছর বয়স তখন নাকি জঙ্গলের রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। কেউ ফেলে দিয়ে গেছিল আমাকে। অনেক খোঁজখবর করেও আমার মা-বাবা কাউকে পাওয়া যায়নি। মা আমাকে নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছে। স্কুলে পড়ায়নি কোনওদিন। বিশেষ মানুষজনের সঙ্গে মিশতে দিত না আগে…’
‘কেন?’
‘তা বলতে পারব না। মা খুব ভয় পায় আমাকে নিয়ে। বলে আমার কিছু হলে নাকি সবার ভীষণ ক্ষতি হয়ে যাবে!’
সায়ন হিসেব করে মেয়েটা যদি দশ বছর বয়সে এসে থাকে আর ওর বয়স যদি এখন বাইশ হয়ে তাহলে গত বারো বছর ধরে এখানে আছে ও।
‘সবার ক্ষতি হয়ে যাবে! অদ্ভুত তো!’
ওর হাতের উপরে একটা চাপড় মারে মৌলি, ‘ধুর, এসব বাদ দিন তো। আচ্ছা, আপনি ক’দিন আছেন এখানে?’
‘ভেবেছি তো দিনসাতেক! সাতদিনে সাতটা নীল ফুল নিয়ে তবে বাড়ি ফিরব।’
‘মানে আপনার আর আমার রোজ দেখা হবে? কেন?’
‘ওই যে, এ গ্রামে আর কাউকে চিনি না বলে।’
দুজনের মুখেই হাসির রেখা খেলে যায়। হঠাৎ দূরে আকাশের গায়ে চড়ে বসতে থাকা সূর্যটার দিকে চেয়ে মৌলি বলে, ‘এই, আমি শুনেছি ভোরের নতুন সূর্যের কাছে কিছু চাইলে সূর্য সেটা দিয়ে দেয়!’
‘কোথায় শুনেছেন এসব?’
‘ওই যে বললাম না সূর্য মায়ের মতো, সব শক্তির উৎস…আরে, আপনি চেয়েই দেখুন না, বলুন কী চান!’
‘মানে, আপনি নিজেই বানালেন এটা! যাক গে…’ একটুক্ষণ ভেবে নেয় সায়ন, তারপ হুট করে চোখ খুলে বলে, ‘একটা ঘর…একটা ঠিকানাবিহীন ঘর…’
‘মানে?’
‘যেখানে আমি লুকিয়ে পড়লে কেউ কোনওদিন খুঁজে পাবে না। আমার সমস্তটা রাখা থাকবে যেখানে।’
ঠোঁটে আঙুল রেখে মাত্র কয়েক সেকেন্ড কী যেন ভাবে মৌলি। তারপর মুখে হাসি নিয়ে ওর হাত ধরে টান দেয়, ‘নেমে আসুন, আপনার আশা পূরণ হয়ে গেছে।’
‘হয়ে গেছে মানে? ঘর পেয়ে গেছেন?’
মৌলি এতক্ষণে রেলিং বেয়ে নামতে শুরু করেছে। সায়নও ওর সঙ্গে ধীরে ধীরে নেমে আসে। মৌলির মাথায় কিছু একটা ঢুকলে সেটা যে আর সহজে বেরতে চায় না তা এতক্ষণে বুঝে গেছে।
শেষের রেলিংটায় পৌঁছে ছোট একটা লাফ দেয় মেয়েটা। ধুপ করে ওর শরীরটা নেমে আসে মাটির উপরে। পায়ে হালকা ব্যথা পায় হয়ত। কিন্তু গুরুত্ব দেয় না তাতে। ওকে হাতের ইশারা করে বলে, ‘কই, আসুন তাড়াতাড়ি!’
সায়ন রেলিং বেয়ে নিচে নেমে আসতেই আবার ওর হাতটা ধরে মৌলি টান দেয়, ‘তাড়াতাড়ি পা চালান।’
ভাব এমন যেন এক্ষুনি গিয়ে না পৌঁছালে ঘর নিজে পায়ে হেঁটে চলে যাবে কোথাও। মাঠের উপর দিয়ে ওরা আবার দৌড়াতে থাকে জঙ্গলের দিকে। এতক্ষণে ভালো রোদ উঠে গেছে। সেই রোদের তাপে শরীরের শীতলতা জুড়িয়ে আসছে একটু একটু করে।
দৌড়াতে দৌড়াতে মৌলি মাঠের একেবারে শেষ প্রান্তে চলে আসে। হাত ধরে টেনে একেবারে কোণের দিকে নিয়ে আসে সায়নকে। এদিকটা লোকজন একেবারেই আসে না। তার উপরে গজিয়ে ওঠা গাছাপালা আর লতাপাতায় সমস্ত জায়গাটাই ঢাকা পড়ে গেছে। তবে ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, ঝোপঝাড়গুলো গজিয়েছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা জিনিসকে ঘিরে।
সায়ন হতভম্ব হয়ে যায়। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে মাঠ আর জঙ্গলের প্রান্তরেখায় দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরনো ভাঙাচোরা লরি! সে লরিটাকে ঘিরে লতাপাতা জন্মে পেছনের দিকের প্রায় সমস্তটাই গ্রাস করে নিয়েছে।
চাকাগুলো ভেঙে যাওয়ায় একদিকে বেঁকে আছে লরিটা। বোঝা যায় অন্তত বছরখানেক আগে কোনোভাবে লরিটা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। তারপর থেকে আর কেউ খোঁজ রাখেনি।
‘এটা কী করে এল এখানে?’ সায়ন অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।
‘এখান থেকে একটু দূরে হেঁটে গেলে মেন রোড পড়ে। সেখানেই হয়ত অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল কোনওভাবে। একেবারে উঁচু রাস্তা থেকে মাঠে এসে পড়ে বেচারা। এমন ভাবে ভেঙেচুরে যায় যে আর রাস্তায় তোলা যায়নি। মালিক ওকে এখানেই ফেলে দিয়ে চলে গেছিল। সেই থেকে এখানেই পড়ে আছে। লোকে ভুলেই গেছে ওর কথা।’
লরিটার দিকে এগিয়ে যায় দুজনে। পেছনের অংশটা প্রায় নেই বললেই চলে। জিনিসটা যে একটা লরি সেটা বোঝা যায় সামনের দিকে ড্রাইভারের সিটটা দেখলে। গায়ে লালচে রঙ, জরির সাজগোজ এখনও লেগে রয়েছে কোনওমতে।
ড্রাইভারের সিটের পাশের দরজাটা টেনে খুলে ফেলে মৌলি। বিশ্রী একটা ঘসঘসে শব্দ তুলে খুলে যায় সেটা। মৌলি বলে, ‘চলুন, আপনার নতুন ঘরে আপনার গৃহপ্রবেশ করিয়ে দিই।’
‘ওর ভিতরে ঢুকতে হবে এখন?’ সায়নের কাঁধ ঝুলে যায়। ঘর চেয়ে আচ্ছা বিপদে পড়েছে!
‘আসুন, উঠে আসুন, লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আপনি নতুন বিয়ে করা বউ নাকি, গৃহপ্রবেশ করতে লজ্জা পাচ্ছেন?’
‘আরে, ভেতরে তো সাপখোপ থাকতে পারে, কবে থেকে পড়ে আছে!’
‘সে থাকতে পারে। তা বলে গৃহপ্রবেশ করবেন না নাকি?’
সায়ন বোঝে এ মেয়ের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে তর্ক করে লাভ নেই। ক্লান্ত পায়ে হেঁটে লরির অন্য দিকের দরজাটা খুলে সিটের উপর উঠে বসে।
সামনের উইন্ডস্ক্রিনটার বেশিরভাগটাই ভাঙা। মাত্র দু-জায়গায় ছোট ছোট করে ভাঙা কাচ লেগে আছে। ভিতরে একটা বুনো গন্ধ। সেটা অবশ্য মন্দ লাগে না সায়নের। ও অনুভব করে সিটটা ছেঁড়াখোঁড়া হলেও স্পঞ্জের অনেকটা অংশ এখনও রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে একটা মোটামুটি আরামই লাগে ওর।
মৌলি নিজের দিকের দরজাটা বন্ধ করে দেয়, তারপর বলে, ‘নিন, এই হল আপনার ঘর। এর কোনও ঠিকানা নেই, আপনার কোনও চিঠিচাপাটি আসবে না। কেউ বিরক্ত করতে আসবে না—কেমন?’
‘সত্যি মাথায় গন্ডগোল আছে আপনার, জানেন তো?’
মৌলি চোখ বড়বড় করে, ‘একটু আগে তো ভ্যাম্পায়ার বলছিলেন। এখন পাগল বলছেন? আচ্ছা বেশ, আপনার যা মনে হবে, আমি তাই…’
সায়ন হঠাৎ করেই মৌলির হাতটা চেপে ধরে। মৌলি খুশিই হয় তাতে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই, আপনি ফাইনালি বলুন—আমি কী?’
সায়নের মুখে একটা নরম হাসি খেলে যায়, ছোট করে সে উচ্চারণ করে, ‘ঘর…’
‘সেকী! আমি ঘর হব কী করে? ঘরের মধ্যেই তো আপনি আছেন!’
সায়ন ওর দিক থেকে চোখ ফেরায় না। তেমনি চাপা গলায় বলে, ‘ঘর বলতে আসলে মানুষ বোঝায়, জানেন না আপনি?’
বড় করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মৌলি, ‘যাক বাঁচালেন। ডাইনি, ভ্যাম্পার, পাগল থেকে শুরু করে শেষে মানুষ অবধি এল তাহলে!’
মৌলির বলা কথাটার মধ্যে কৌতুক লুকিয়ে ছিল। ওরা দুজনেই খিলখিল করে হেসে ফেলে। হঠাৎই হাসতে হাসতে সায়নের গালে একটা হাত রাখে মৌলি। তারপর খুব নিচু ধরা গলায় বলে, ‘সায়নবাবু আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন না তো?’
কিছুক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থাকে সায়ন। ওদের মুখের হাসি মিলিয়ে এসেছে। হঠাৎ যেন ওদের কান খেয়াল করতে পেরেছে এই মুহূর্তে চারপাশে কোনও আওয়াজ নেই। সব কিছু নিথর নিঃস্পন্দ হয়ে আছে। এই লরির ভিতর অন্য একটা জগতের দরজা খুলে গেছে। সেখান দিয়ে অনেক দূর হেঁটে গেছে ওরা।
‘যত খারাপ সময়ই আসুক, আপনি যাই হোন না কেন…আমি কোথাও যাচ্ছি না…’
মৌলির চোখেমুখে একটা আশঙ্কার মেঘ দেখা যায়, ‘আমার মন বলছে— খুব খারাপ সময় আসছে সামনে। হয়ত আপনি আমি ভাবতেও পারছি না কী হতে চলেছে…’
অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় সায়নের। ওর মনে হয় মৌলি যা ভাব করছে তার থেকে অনেক বেশি কিছু জানে ও। কিন্তু এই মুহূর্তে সেগুলো সায়নকে বলতে চাইছে না। তবে সায়নের তাতে কিছু যায় আসে না।
‘এই দুদিনে এত কিছু হয়ে যাবে আমি ভাবতে পারিনি। আপনি এখান থেকে চলে গেলে মন খারাপ করবে আমার।’ মৌলি আঙুল দিয়ে চোখের জল সরাতে সরাতে বলে।
‘আমার ঘর ছেড়ে কোথায় যাব আমি? বলুন?’
আরও কিছু জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল মৌলি। কিন্তু পারে না। ওর ঠোঁটটা তির তির করে কাঁপছে। সায়ন হঠাৎ করে এগিয়ে আসে ওর দিকে। তারপর খুব আলতো করে ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। মুহূর্তে সব সংকোচ ধুয়ে মুছে যায়। মৌলি দু’হাতে ওকে টেনে নেয় নিজের ঠোঁটে।
ঠিক এই সময়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করে সায়ন। এই মুহূর্তে মৌলি নিয়ন্ত্রণ করছে ওকে। কেবল ঠোঁট দিয়ে নয়, কেবল নিরাপত্তার বেড়াজালে নয়, কেবল ভালোবাসার উষ্ণতা দিয়ে নয়, আরও কিছু…আরও কিছু আছে মৌলির মধ্যে…।
হ্যাঁ, কোনও ভুল নেই। সায়ন স্বেচ্ছায় কাছে টেনে নিয়েছে মৌলিকে। কিন্তু ওকে চিনতে পারেনি এখনও। ওর মনে হয়, এই মুহূর্তে মৌলি ওকে ছেড়ে না দিলে ওর নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনও উপায় নেই। ও এই মানুষের মন থেকে মুছে যাওয়া লরিটার মতোই এখানে পড়ে থাকবে অনন্তকাল। ক্ষয় হতে হতে মিলিয়ে যাবে মহাকালের বুকে…।
এটা কি স্বাভাবিক? নাঃ, স্বাভাবিক না। মৌলির মধ্যে কিছু একটা আছে। নিশ্চয়ই আছে…
