কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ২

দ্বিতীয় অধ্যায়

‘আচ্ছা বল, কীসের গল্প শুনবি?’

‘ডাইনির গল্প। সেই যে সেই বইটা থেকে…’

সুপর্ণা হেসে ফেলেন। আট বছরের ছেলের মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে দেন, ‘তুই শুধু ওই একটাই বই চিনিস। আর যে এত বই কিনে দিলাম, সেগুলো পড়তে ইচ্ছা করে না?’

সায়ন অন্যমনস্কভাবেই মাথা নাড়ে, ‘আমার তো পড়তে ইচ্ছা করে না। শুধু শুনতে ইচ্ছা করে।’

‘তা বললে কী করে চলবে বাবা? নিজেকে তো পড়তে হবে। মা কি চিরকাল পড়ে দিতে পারে?’ ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন সুপর্ণা। তারপর হাত বাড়িয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে ভিতর থেকে পুরনো ছেড়াখোঁড়া বইটা বের করে আনেন।

সায়নের কৌতূহলী চোখ ঘরের এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছিল। একদিকে চোখ পড়তে অবাক হয়ে জিগ্যেস করে, ‘তুমি ব্যাগ গুছিয়েছ কেন মা? আমরা ঘুরতে যাব?’

‘হ্যাঁ, যাব তো।’

‘কোথায় যাব?’

‘সেটা তো এখন বলব না তোকে। তোর বাবা বাড়ি আসুক, তারপর সবাই মিলে ভেবে দেখব কোথায় যাওয়া যায়…তোর কোথায় যেতে ইচ্ছা করে?’

‘জঙ্গলে।’

সুপর্ণা মুখ তুলে তাকান, ‘জঙ্গলে কেন?’

আঙুল দিয়ে বইটা দেখিয়ে দেয় সায়ন, ‘জঙ্গলে ডাইনি থাকে।’

মায়ের হাত থেকে বইটা নেয় সায়ন—মরা ডাইনির অভিশাপ। ছোট থেকে এটাই সায়নের প্রিয় বই। পড়ার আগে কিছুক্ষণ উল্টে-পাল্টে বইয়ের ছবি দেখে ও। শেষে প্রচ্ছদে এসে একমনে তাকিয়ে থাকে উপরের রঙিন ছবিটার দিকে। কয়েকটা মরার খুলি, একটা ঝুরঝুরে হয়ে যাওয়া নেড়া গাছ দেখা যাচ্ছে সেখানে। পেছনে কয়েকটা বাদুড় উড়ছে। তবে সব থেকে বেশি যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা হল সেই গাছের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বছর তিরিশের ডাইনি। তার নাকটা খাড়া, চোখদুটো গাঢ় হলুদ। হাত দুটো সামনের দিকে তুলে লিকলিকে আঙুল বাড়িয়ে সে যেন এক্ষুনি সায়নকে ধরতে আসবে!

সায়ন এই ছবিটা বারবার দেখে। এইরকম ডাইনি কি সত্যিই কোথাও আছে? ও মনে মনে ভাবে। ছবির উপর আঙুল বোলাতে বোলাতে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা মা, ডাইনি বলে কি সত্যিই কিছু হয়?’

সুপর্ণা একটু ভেবে বলেন, ‘উঁহু, যারা বিশ্বাস করে ডাইনি বলে কিছু আছে তারা খারাপ লোক।’

‘তাহলে এই বইটা যে লিখেছে সে খারাপ লোক?’

‘না বাবা, বইতে কিছু লেখা মানে সেটা সত্যি কথা লেখা, তার তো মানে নেই? আমরা এমনি এমনি অনেক কিছু লিখি। যেমন তুমি স্কুলের রাফখাতার পেছনে লিখেছিলে না—তোমার আমাকে স্কেল দিয়ে মারতে ইচ্ছা করে?’

সায়ন শুয়েছিল। এবার উঠে বসে পড়ে। তারপর লজ্জিত মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি এটা পড়ে ফেলেছ মা?’

ওর থুতনিতে হাত রাখেন সুপর্ণা, ‘ওমা, এতে এত লজ্জার কী আছে? আমাদের কারো উপর রাগ হতেই পারে। এমনকী মায়ের উপরেও। কিন্তু যাদের আমরা ভালোবাসি তাদের উপর হওয়া রাগটা ভালো করে লুকিয়ে ফেলতে হয়। খোলা রেখে দিলে যদি তারা দেখে ফেলে, তাহলে তাদের মন খারাপ হয়।’

সায়নের বুকের ভেতর কেমন একটা কষ্ট হয়। ও মাকে ভীষণ ভালোবাসে। ছোট থেকেই মায়ের খুব ন্যাওটা। বাবা-মা দুজনেই চাকরি করে। তবে বাবা মনে হয় বেশি চাকরি করে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে মেলা রাত হয়ে যায়। মা অফিস থেকে চলে আসে তাড়াতাড়ি। সেদিন ওর স্কুল না থাকলে ওকে ভাত খাইয়ে দেয়, চুল আঁচড়ে দেয়, দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আর সবথেকে ভালো কাজ যেটা করে, সেটা হল গল্প বলা। সায়ন ঘুরতে-ফিরতে মন খারাপ হলে মাঝেমধ্যেই জড়িয়ে ধরে মাকে। বুকের উপর মাথা রেখে চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর আবার কোথায় যেন চলে যায়। বেশিক্ষণ মাকে ছাড়া থাকলেই মনটা কেমন যেন ভারী ভারী লাগে।

ওর ছবি দেখা হয়ে যেতে মা গল্প পড়া শুরু করেন, ‘এক দূর গ্রামে এক সুন্দরী ডাইনি ছিল!’

‘ডাইনি কি সুন্দরী হয় মা?’

‘ডাইনি তো কল্পনা, তুমি যে রকম ভাববে, সে রকমই হতে পারে। তুমি নিজের মতো ভেবে নাও, কেমন?’

‘তারপর?’

‘কিন্তু সেই ডাইনিটা আসলে ডাইনি ছিল না…’

‘তাহলে কী ছিল?’

সুপর্ণা বইতে লেখা গল্প না বলে খানিক ভেবেচিন্তে বলেন, ‘সে ছিল এক রাজার মেয়ে। ভারী চঞ্চল, একদম হরিণের মতো। আর সব কিছু নিয়ে ভীষণ কৌতূহল। অনেকগুলো পোষা বিড়াল ছিল তার। সেগুলো ঘুরঘুর করত তার পায়ের কাছে। তাদের নিয়ে এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে ঘুরে বেড়াত সে। একদিন তার দেখা হল এক রাজকুমারের সঙ্গে…’

‘রাজকুমার কি সত্যি হয় মা?’

‘সত্যি না হলে আমার সামনে কে শুয়ে আছে?’ কথাটা বলে ছেলের নাক টিপে দেন সুপর্ণা। তারপর নিচু হয়ে একটা চুমু খান কপালে। আবার গল্প পড়ায় মন দেন।

গল্প শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ছেলেটা। ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধু-ধু মাঠ। তার উপর একটা ছোট্ট কুটির। একলা থাকে একটা বাচ্চা মেয়ে। সারাদিন বিড়ালের মিউমিউ শুনতে পায়। আর কাউকে চেনে না। তার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে সায়ন।

ঘুম ভাঙতেই দেখে পাশে মা নেই। নিশ্চয়ই কোথাও একটা গেছে মা। বইটা তখনও পড়ে আছে বিছানায়। ডাইনিটা সেভাবেই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও আবার একবার হাত রাখে ডাইনিটার মুখে। যেন ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে ডাইনিটার।

বাইরে তাকিয়ে সায়ন দেখে বিকেল হয়ে এসেছে। এই সময় অন্যদিন খেলতে যায় সায়ন, কিন্তু আজ টিপটিপিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। সেই বৃষ্টির মধ্যে ওদের অ্যাপার্টমেন্টের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো ভিজছে। ঝমঝম শব্দ আসছে কাচের জানলার পাত্তা থেকে। সায়নের শিশু মনটা কোন অজানা কারণে বিষণ্ণ হয়ে যায়। রাত্রিবেলা যখন সবাই বাড়ি থাকে তখন বৃষ্টি এলে ভারি ভালো লাগে ওর। কিন্তু এখন তো মা বাড়িতে নেই। বৃষ্টি হলে মা যদি বাইরে কোথাও দাঁড়িয়ে ভেজে? বাড়ির লোকেরা বাড়িতে থাকলে মন খুশি খুশি থাকে ওর।

বাবা এখনও ফেরেনি। গোটা ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখে ও। অন্যদিন এই সময়টায় খেলতে না গেলে ও কার্টুন দেখে কিংবা বারান্দায় গিয়ে চুপ করে বসে থাকে। আজ ওয়াকম্যানে গান চালিয়ে শুনতে চেষ্টা করল। সেটাও ভালো লাগল না। বাইরে কেমন ঘ্যানঘ্যানিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। একদম ভালো লাগছে না মনটা। বাবা কখন আসবে কে জানে?

খানিক পরে ল্যান্ডলাইনের ফোনটা বেজে উঠতে ছুটে গিয়ে সেটা রিসিভ করতে ওপাশ থেকে দাদুর গলা ভেসে এল, ‘কী করছিলে তুমি দাদুভাই?’

সায়ন ব্যস্ত গলায় বলে, ‘গান শুনছিলাম, এখন জামাকাপড় পরা শুরু করব।’

‘জামাকাপড় পরবে! কোথায় যাবে তুমি?’

‘মা বলেছে আমরা সবাই মিলে আজ বেড়াতে যাব। দাদু, কোথায় ভালো জঙ্গল আছে জানো তুমি?’

‘তোর মা একটা ডাইনি!’ হঠাৎ দাদু মায়ের উপরে রেগে গেল কেন সায়ন বুঝতে পারে না। দাদু কি খারাপ লোক? ওর আর কথা বলতে ইচ্ছা করে না। দু-একটা হু-হাঁ করে রেখে দেয় ফোন।

মোজাটা পরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সায়ন। নিজের মুখের দিকে ভালো করে তাকায়। মনে মনে ভাবে ও যখন বড় হবে তখন কেমন দেখতে হবে ওকে?

সায়নের খুব ইচ্ছে ওকে হৃত্বিক রোশনের মতো দেখতে হোক। কিন্তু ওর নাকটা অতটা চোখা নয়। আর চোখের মণিটাও কটা নয়। মনে পড়ল মরা ডাইনির অভিশাপের প্রচ্ছদে ওই ডাইনিটার চোখ কটা। নাকটাও চোখা।

আচ্ছা, ওই ডাইনিটাকে তাহলে হৃত্বিক রোশনের মতো দেখতে নয় কেন? সায়ন অনেকক্ষণ ধরে ভেবেচিন্তে বুঝতে পারে ডাইনিটার সঙ্গে সত্যিই হৃত্বিক রোশনের অনেক মিল আছে। পরক্ষণেই একটা খেয়াল আসে ওর মনে। মনে হয় ডাইনিটাকে ও আগে কোথাও দেখেছে। ওর মাথাটা গুলিয়ে যায়। আস্তে আস্তে ঘড়ির কাঁটা এগোতে থাকে।

বাবা যখন রাতে বাড়ি ফেরে তখন মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। আজ বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই। কলিংবেল বাজতে ও দরজাটা খুলে দেয়। কাকভেজা হয়ে ঘরে ঢোকে বাবা।

বাবার দিকে ও তোয়ালেটা এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘মা কোথায় গেছে গো? বেড়াতে যাব না আমরা?’

‘বেড়াতে!’ বাবার মুখটা থমথমে দেখায়। বৃষ্টির জলে ভিজেছে বলেই বোধহয় মুখটা কেমন যেন চুপসে শুকিয়ে আছে, ‘কে বেড়াতে যাবে?’

‘মা বলছিল তো কোথায় বেড়াতে যাবে…ব্যাগ গোছাচ্ছিল…’

বাবা আর কিছু বলে না। গা হাত পা মুছতে মুছতে সোজা বাথরুমে ঢুকে যায়। সায়ন বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে। তারপর আবার একবার আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখে। চুলটা আঁচড়ে নেয়। মুখের উপর একটু পাউডার লেপে নেয়। তার মধ্যে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে বাবা।

সায়ন তার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করে, ‘কী গো? তুমি জামাকাপড় পরবে না? ট্রেনের দেরি হয়ে যাবে তো!’

‘আমরা কোথাও যাচ্ছি না সায়ন…’ এগিয়ে এসে ছেলের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন বিপ্লব মজুমদার। তারপর বিমর্ষ গলায় বলেন, ‘তোর মা একাই যাচ্ছে। আর ফিরবে না।’

‘আর ফিরবে না কেন? কোথায় যাচ্ছে?’

‘তোর মা আর আমাদের সঙ্গে থাকতে চায় না। এটাকে ডিভোর্স বলে—।’

ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে না সায়নের, ‘আমাদের সঙ্গে থাকবে না তো কার সঙ্গে থাকবে?’

‘অন্য একজনের সঙ্গে।’

সায়ন অবোধ গলায় প্রশ্ন করে, ‘তোমার মতো একজন? না আমার মতো একজন?’

বিপ্লব মজুমদারের বিষণ্ণ মুখেও হাসি খেলে যায়, ‘আমার মতো একজন। একদিন হয়ত তোর মতো একজনও আসবে…’

সায়ন বোঝে না ওর কোথায় কষ্ট হচ্ছে। অভিমানের গলায় বলে, ‘আমার মতো একজনের সঙ্গে থাকবে যখন, তখন আমার সঙ্গে থাকবে না কেন?’

কথাটা বলেই গটগট করে হেঁটে নিজের ঘরে ঢুকে যায়। তারপর সোজা এসে শুয়ে পড়ে ওর বিছানায়। বিছানায় তখনও পড়ে আছে সেই গল্পের বইটা—মরা ডাইনির অভিশাপ।

ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে ও। কোন অজানা কারণে ওর চোখ দিয়ে জল নামে আজ। সেই ঝাপসা চোখের মধ্যেই কোথায় যেন হারিয়ে যায় ডাইনিটা…!

দরমার ঘরে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল জগন্নাথ। রাত হয়েছে। এতক্ষণে মদের নেশাটা ছুটে গেছে ওর। কোনওরকমে ধড়ফড়িয়ে উঠে দেখতে পায় ওর বউটা মেঝের উপর পড়ে আছে। একটু আগেই জগন্নাথ রাগের মাথায় সাঁড়াশির বাড়ি মেরেছে ওর মাথায়। তখন থেকে সেই যে পড়েছে তারপর আর ওঠেনি। যাঃ শালা, মরে ফরে গেল নাকি?

ও খাট থেকে পা বাড়িয়ে একবার ঠেলা দেয় বউকে, ‘এই মাগি, বেঁচে আছিস?’

একটা চাপা যন্ত্রণা মাখা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসে মেয়েটির মুখ থেকে। ইটভাটায় কাজ করে জগন্নাথ। মোটামুটি মাইনে পায়। তবে টাকাপয়সা যা পায় তার বেশিরভাগই ঢেলে দেয় মদ আর মেয়েছেলের পেছনে। বউ আগে বারণ করত, অভিমান করত, তখন ওর শরীরে মজা ছিল। তাই সে বারণ শুনত জগন্নাথ। মদের গ্লাস আর মেয়েমানুষের একটাই পার্থক্য। মদ খেতে খেতে নেশা বাড়ে, আর মেয়েমানুষ খেতে খেতে নেশা কমে যায়। জগন্নাথও প্রথম প্রথম বউয়ের কথা শুনত। তারপর কিছুদিন যেতে না যেতেই হাত বাড়ায় অন্য গ্লাসের দিকে।

এইসবের মাঝে ফেঁসে গেছে বাচ্চাটা। তাকেও কোথায় যেন ভালোবেসে ফেলেছে জগন্নাথ। ওইটুকুনি বাচ্চা, একটা সময় বড় হবে, হাত পা ছুড়বে। ওকে বাবা বলে ডাকবে।

কোমরে ভর দিয়ে উঠে বসে চারদিকটা খেয়াল করে ও। বউটা বেঁচে আছে। ওকে নিয়ে আর মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আজ সকালেই বাচ্চাটার ঝোলার জন্য বস্তা দিয়ে একটা ঝুলনা করে দিয়ে গেছে নিজের হাতে। তাতেই দুলছে বাচ্চাটা। ও একরকম বউয়ের হাত মাড়িয়েই সেদিকে এগিয়ে যায়।

বাচ্চাটা জেগে আছে অথচ কেমন স্থির হয়ে আছে। তার দৃষ্টি জানলার দিকে। যেন জানলার বাইরে কিছু একটা আগ্রহ টেনে ধরেছে ওকে। বাচ্চার পেটে হাত দিয়ে একটা খোঁচা মারে জগন্নাথ, ‘কীরে? ঘুম ভেঙে গেছে?’

ও মুখ নামিয়ে বাচ্চার পায়ের পাতায় একটা চুমু খায়। তারপর দুহাতে ঝুলন্ত দোলনা থেকে তাকে কোলে তুলে নেয়। গুনগুন করে একটা গান গাইতে গাইতে দোলাতে থাকে বাচ্চাটাকে। এবং অবাক হয়ে লক্ষ করে এখনও সে জানালার বাইরেই তাকিয়ে আছে। সেদিক থেকে এতক্ষণে একবারের জন্য চোখ ফেরায়নি।

‘কী দেখছিস বল তো ওদিকে?’

ঝট করে সেদিকে তাকাতেই জগন্নাথের মনে হয় জানলার দিক থেকে একটা ছায়া যেন হুট করে সরে গেল। এতক্ষণ জানলার বাইরে থেকে কেউ বাচ্চাটাকেই দেখছিল। হঠাৎ করে ও তাকানোয় লুকিয়ে পড়ল।

মনে সন্দেহ জাগে জগন্নাথের। সে পায়ে পায়ে জানলার কাছে এগিয়ে যায়। বাচ্চাটা এখনও জানলার দিকে দেখছে। জানলার গ্রিল নেই। কোনওরকমে দরমার ফাঁক দিয়ে একটা কাপড় ঝুলানো আছে। সেটা ডানদিকে সরানো।

ভালো করে সেখানে দাঁড়িয়ে বাইরেটা দেখে জগন্নাথ। চাঁদের আলো আসছে বাইরে থেকে। ওদের বস্তিটা ঝকঝক করছে সেই চাঁদের আলোয়। গভীর রাত হয়েছে মনে হয়। কোথাও কোনও লোকজন চোখে পড়ছে না।

কই, কেউ তো নেই! অবশ্য যে দাঁড়িয়ে ছিল সে ঘরের অন্যদিকে লুকিয়ে পড়ে থাকতে পারে।

‘কে বে এখানে?’ খিস্তি দিয়ে ওঠে জগন্নাথ। নিচের দিকে চেয়ে ও খেয়াল করে বাচ্চাটা একটা নির্দিষ্ট দিকে আঙুল তুলে ধরেছে। বাচ্চাটা কি নির্দেশ করে কিছু দেখাতে চাইছে ওকে? ঘরের সেদিকে কোনও জানলা নেই। দরমার দেওয়াল। তাও চাঁদের আলোয় জগন্নাথ বুঝতে পারে সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে কেউ। দরমার ফাঁক দিয়ে আসা চাঁদের আলো আটকে রেখেছে একটা মানুষের অবয়ব।

দ্রুত পায়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে জগন্নাথ। ওর বাড়িতে চুরি করার মতো কিছু নেই। তাও এত রাতে কীসের লোভে এসেছে?

বাইরে এসে ঘরের চারদিকটা প্রদক্ষিণ করেও কাউকে দেখতে পায় না জগন্নাথ। ‘মারা ভুল দেখলাম নাকি?’ বিড়বিড় করে কথাটা বলে আবার ঘরে ঢুকে পড়ে ও।

দরজা দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তে যাচ্ছিল হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করে জগন্নাথ। বাচ্চার ঝুলনাটা এখনও দুলছে। অথচ অন্তত মিনিট তিনেক আগে ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে তুলে নিয়েছে জগন্নাথ। এখন তো আর সেটা দোলার কথা নয়। তাহলে কি ও যখন বেরিয়েছিল তখন ওর বউ দুলিয়েছে ওটা? কিন্তু কেন?

ও আবার পা দিয়ে বউয়ের কাঁধে একটা ধাক্কা দেয়, ‘এই মাগি, তুই জেগে আছিস নাকি?’

‘না…’ মেঝে থেকে কঠিন গলার স্বর ভেসে আসে। কিন্তু এই গলাটা তো ওর বউয়ের না! শব্দটা এসেছে খাটের তলা থেকে। তাকিয়ে দেখে বউ এখনও আগের মতোই মেঝেতে উল্টে পড়ে আছে। তাহলে খাটের তলা থেকে কে উত্তর দিল?

ও বাচ্চাটাকে বিছানার উপর রেখে উঁকি দেয়। অন্ধকারে ভরে আছে খাটের তলাটা। তার ভেতরে কেউ বসে বা শুয়ে থাকলে বাইরে থেকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়। মাথা নিচু করে ও পকেট থেকে ওর ফোনটা বের করে। তারপর কোনওরকমে টর্চটা জেলে খাটের নিচে ফেলে। চারপাশটা ঘুরিয়ে দেখে কেউ নেই সেখানে।

একটা ঠান্ডা শীর্ণ হাত ওঁর গোড়ালি চেপে ধরে। মুখ ফিরিয়ে দেখে ওঁর বউ পা চেপে ধরেছে। লাথি মারার ভঙ্গিতে সেটা সরিয়ে দেয় জগন্নাথ, ‘শালি আবার আমার পা ধরে…’

হঠাৎ বউয়ের চোখের দিকে চোখ পড়তেই ও থমকে যায়। একদৃষ্টে খাটের দিকে তাকিয়ে আছে ওর বউ। কাউকে দেখতে পেয়েছে সেখানে। সেই দৃষ্টি লক্ষ্য করে মুখ ফেরায় জগন্নাথ।

মাথা ঘুরিয়ে বিছানার উপরে তাকাতেই ও যা দেখতে পায় তাতে ওর রক্ত হিম হয়ে যায়…

বিছানার উপর ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে আছে এক অদ্ভুত নারীমূর্তি। সমস্ত গায়ে একটা নীলচে আভা। মুখের বেশিটা মাথা থেকে নেমে আসা কোঁকড়া খয়েরি চুলে ঢাকা। তার ফাঁক দিয়ে যেটুকু মুখ দেখা যায় তাতে লোমের কোনও চিহ্ন নেই। আশ্চর্য মসৃণ মুখ। চোখের ভিতর একটা ব্লেড দিয়ে চেরা ক্ষতর মতো চোখের মণি। মুখের নিচের দিকটা ছোপ ছোপ রক্তের দাগ…!

অন্ধকারে বাকি শরীরটা ও দেখতে পায় না। চিৎকার করে ওঠার আগেই নারীমূর্তি বাচ্চাটার পা ধরে তুলে নেয়। সজোরে কেঁদে ওঠে বাচ্চাটা। ওদের দরমার ঘর ছেড়ে গোল চাঁদের গায়ে গিয়ে যেন ধাক্কা খায় সেই চিৎকার।

জগন্নাথ ভয়ে পিছিয়ে গেছিল। বউকে ঠেলা মারে। সেও নিথর পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়েছে। কান্না ছাপিয়ে একটা চাপা হাসির শব্দে ঘর ভরে ওঠে। হাসছে ডাইনিটা। বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানা থেকে এক লাফে নেমে আসে সে। আবার একটা লাফ মেরে উঠে পড়ে জানলার উপর। পরমুহূর্তে বাইরের জ্যোৎস্নামাখা রাতে হারিয়ে যায় সে।

‘ওকে…ওকে নিয়ে পালালো…’ বউয়ের আর্ত চিৎকারে যেন হুঁশ ফেরে জগন্নাথের। চকিতে শরীরে প্রাণ আসে তার।

দ্রুত জানলা দিয়ে লাফিয়ে বাইরে নেমে পড়ে জগন্নাথ। তারপর দৌড়াতে থাকে ডাইনিটার পেছন পেছন। যেন হাওয়ার উপর দিয়ে উড়ে চলেছে সে। হাওয়ার ঝাপটায় তার চাদর ওড়ে, আরও অলৌকিক দেখায় ডাইনিটাকে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাড়ি ঘরের মাঝখান দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কোথায় যেন উধাও হয়ে যায় নীলচে নারীমূর্তি। চারিদিকে তাকিয়ে চিৎকার ছেড়ে কেঁদে ওঠে জগন্নাথ। ওর চিৎকারে আশপাশের বাড়ি থেকে লোক বেরিয়ে এসেছে এতক্ষণে। তারা হম্বিতম্বি করে ছুটে আসে এদিকে। জগন্নাথকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখে তাদের মধ্যে একজন চিৎকার করে ওঠে, ‘কী হয়েছে রে জগা?’

‘আ…আমার বাচ্চা নিয়ে পালাইচে…’ ভয়, আশঙ্কা আর যন্ত্রণায় ডুকরে ওঠে সে।

‘কে? কে পালাইচে?’

একটা শব্দ বেরিয়ে আসে জগন্নাথের মুখ থেকে, ‘ডাইনি…’

ডাইনি যেদিকে মিলিয়ে গেছে গ্রামের লোক লাঠিসোটা যা পায় সম্বল করে দৌড়ে যায় সেদিকে। সবার বাড়ির আনাচ-কানাচ খুঁজে ফেলা হয়। কেউ কোত্থাও কেউ নেই। এমনকী কোথাও বাচ্চার কান্নার আওয়াজও নেই। গেল কোথায় ডাইনিটা?

কেউ কেউ পুলিশে খবর দিতে যায়। একসময় সবকিছুই আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে যায়। এলাকার বোদ্ধারা জগন্নাথকে আশ্বাস দিয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে যায়।

ঘরে ফিরে এসে জগন্নাথ দেখে ওর বউ বসে আছে বিছানার উপরে। গায়ের কাপড় এলোমেলো। চোখে কান্নার জল শুকিয়ে আছে। শরীরটা আতঙ্কে মাঝে মাঝে শিউরে উঠছে।

‘ডাইনিতে নে গেছে আমার ছেলেরে…’ থমথমে গলায় বলে জগন্নাথ। খোলা জানলাটা এখনও আগের মতোই পড়ে আছে। চাঁদের আলো সেই জানলা দিয়ে এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে।

‘আগের বছর মিশু পণ্ডিতের ছেলেটারে তুলছিল। রাতে এমন করেই নিয়ে গেছেল। আর পায়নি কোথাও…’ কথাটা বলে আবার বউয়ের দিকে চায়। তার দৃষ্টি এখনও স্থির। ঝুলন্ত ঝুলনাটা দেখে চলেছে সে। একটু আগেও ওখানে শুয়ে ছিল ছেলেটা।

‘পত্তিবচ্ছর একটা একটা করে বাচ্চা তুলচে…’ হাতের আঙুলে মাথা চেপে ধরে জগন্নাথ।

‘তুই মুখে কুলুপ দিলি কেনে?’ রাগের মাথায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে জগন্নাথ।

ওর বউ উঠে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় কুলুঙ্গির দিকে। ঠিক নীচ থেকে সড়াত শব্দ করে কিছু একটা টেনে বার করে। জগন্নাথ তাকিয়ে দেখে ওর হাতে একটা বড় কাটারি। কবে থেকে এটা লুকিয়ে রেখেছিল জগন্নাথ জানে না। ও চিৎকার করে ওঠে, ‘ও কাটারি তুই কই পেলি?’

চাঁদের আলো লেগে ঝিকমিক করছে জিনিসটা। বোঝা যায় মুহূর্তে একটা জ্যান্ত মানুষের মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দিতে পারে ও জিনিস।

জগন্নাথের বউয়ের গলার আওয়াজ ওদের দরমার ঘর কাঁপিয়ে দেয়, ‘তোর জন্য রেখেছিলাম রে মাগির পো। যেদিন আর সহ্য হবেনি সেদিন…’ কথাটা বলতে বলতে থেমে যায় মেয়েটি, ‘এই দিয়ে আজ ওই ডাইনিমাগিরে শেষ করব আমি…’

কাটারিটা নিয়ে জানলার দিকে ছুটে যায় সে। জগন্নাথ দ্রুত উঠে তাকে থামায়। কাটারিটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিরস্ত করে। তারপর সপাটে গালে একটা চড় মেরে বলে, ‘ডাইনিকে খুঁজে পাবি কই তুই? কার গলা কাটবি?’

‘খুঁজে পাব!’ মেয়েটি আবার ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘কেন তুই দ্যাখতে পাস নাই ওকে? ওই মুখ ওই শরিল তুই চিনিস না?’

জগন্নাথের ভুরু কুঁচকে যায়, ‘কে?’

‘গঙ্গা! তোর আগে আমি দেখচি ওকে। তখন আলো পড়ে দেখতে পেয়েচি ও মুখ— ও গঙ্গা!’

জগন্নাথ দু’পা পিছিয়ে আসে। এ গ্রামে গঙ্গাকে মানুষ ভগবানের মতো ভক্তি করে। হেন লোক নেই যে সাহায্যের জন্য তার কাছে হাত পাতে না। তাকে হুট করে ডাইনি বলাটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে ওদের ছেলে হারিয়েছে। অন্তত একবার গঙ্গাকে এনে জিগ্যেস করলে…

দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়ায় জগন্নাথ। মুখে বলে, ‘তুই এট্টু ইসথির হয়ে বস। আমি মোড়লমশাইকে বলে দেখচি…’

জগন্নাথের বউ আর কিছু কথা বলে না। প্রতিহিংসার আগুনে পুড়তে পুড়তে সে সেই ঝুলনাটা একটানে ছিঁড়ে ফেলে মাটিতে। তারপর সেই কাপড়টা জড়িয়েই হাউহাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নার তোড়ের সঙ্গে তার মুখ থেকে অভিসম্পাত বেরিয়ে আসে, ‘আমার কোল থিকে ছেলে কেড়ে নিলি গঙ্গা! আমি অভিশাপ দিলাম তুকে, পুড়ে মরবি তুই…দাউ দাউ করে জ্বলবি আগুনে। এ গ্রামের কচিবুড়ো সবাই মিলে পুড়িয়ে খাক করে দেবে তোকে মাগি…’

বাইরে চাঁদ জেগেছিল সেদিন। এমন অদ্ভুত রাতে কেউ না কেউ জেগে থাকে জানলায়। জগন্নাথের বউ সেদিন জানত না ওর জানলার ঠিক বাইরে চাঁদ ছাড়াও কেউ জেগেছিল সেদিন। সে মন দিয়ে শুনছিল ওর অভিসম্পাত!

‘পুড়ে মরবি তুই গঙ্গা! একদিন পুড়ে খাক হয়ে যাবি…দেখিস, একদিন এই গ্রামের সবাই মিলে তোকে…’