কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ৩

তৃতীয় অধ্যায়

গভীর রাতে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল গুপি। আজ সন্ধে থেকে ওর মনটা ভালো নেই।

গ্রামের মন্দিরের পুরোহিত মাধববাবুর চ্যালা গুপি। ছোট থেকে গুপির চেহারাটা দশাশই, আর মাথাটা ঠিক ততটাই ভোঁতা। খানিকটা সেই কারণে কোনও কাজটাজ বিশেষ জোটেনি ওর। শেষে দিলুবাবু ওকে মাধব ভট্টাচার্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে দেয়। তাও নয় নয় করে আজ বছর পাঁচেক হতে চলল।

মাধব ভট্টাচার্য একা মানুষ, বিয়ে-থা করেননি। গুপি সর্বক্ষণ তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে। খাওয়াদাওয়া আর মাস গেলে কিছু টাকা পায়, তাতে কোনওরকমে চলে যায়। তাছাড়া পুরোহিতমশাইয়ের আশেপাশে থাকলে গাঁয়ের লোক বাড়তি সম্মান করে। সম্মান জিনিসটার প্রতি খানিক লোভ আছে ওর।

মন্দিরের পুজোআচ্চার জোগাড়-যন্ত্র করা হাট্টা-কাট্টা জোয়ানের কাজ। এতদিন সব কাজ মুখ বুজে করে আসছিল সে। কিন্তু ইদানীং মাধব পুরোহিতকে কেমন যেন পছন্দ হয় না গুপির। কথায় কথায় তেড়ে ফুঁড়ে ওঠেন, অবজ্ঞা করেন, গালমন্দও করেন। আজ মনের ভুলে ওর হাত থেকে কাঁসার থালা পড়ে গেছিল, বেশি কিছু ছিলও না তাতে। কয়েকটা পুজোর ফুল আর সামান্য কিছু দুব্ব ঘাস, তাতেই ওর বাপ-বাপান্ত করলেন।

গুপির আজ কিছুটা রাগই হয়েছিল। একে গুরুজন তার উপর পুরোহিত বলে কিছু বলতে পারেনি। দশটা নাগাদ ছুটি হয় গুপির। পুরোহিতমশাই তার ঘণ্টাখানেক পর বাড়ি ফেরেন।

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল গুপি। ওর ঠিক বাঁদিকে শুঁড়ের বন। বাঁশ আর বুনো লতাপাতার জঙ্গল। খুব একটা বড় নয়, কিন্তু বেশ ঘন। বাচ্চাকাচ্চারা যাতে এদিকটায় না আসে সেজন্য এলাকায় কিছু গল্পগাছা চালু আছে এই জঙ্গলটাকে নিয়ে। গুপি অবশ্য তেমন একটা ভয় পায় না। রোজ এ জঙ্গলের পাশ দিয়েই ফেরে সে।

একবার সেই জঙ্গলের দিকে ফিরে তাকিয়ে আবার মাটির উপর খসখস আওয়াজ তুলে হাঁটতে থাকে গুপি। গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নেয়। শীত পড়েছে জাঁকিয়ে। জঙ্গলের দিক থেকে যে মৃদু বাতাস ভেসে আসছে সেটা আজ যেন একটু বেশি শীতল। ভিতর অবধি কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

গুনগুন করে একটা গান ধরে গুপি। হিন্দি ফিল্মের গান। গুপি হিন্দি গান শুনতে ভালোবাসে। আর সেসব শুনলে মাধব পুরোহিত খচে যায়। আচ্ছা টেটিয়া লোক বটে! পুরোহিতমশাইকে অস্ফুটে একটা গালি দেয় গুপি। তারপরেই সতর্ক হয়ে যায়। কে জানে আশপাশ থেকে কেউ শুনছে কিনা। অবশ্য এত রাতে এদিকে…।

হঠাৎ জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা পায়ের শব্দ ভেসে আসে। শুকনো পাতার উপর পায়ের অল্প নড়াচড়ার শব্দ। গুপি স্পষ্ট বুঝতে পারে আওয়াজটা এসেছে কোনও দুপেয়ে প্রাণীর নড়াচড়ায়।

গুপির কাছে ঘড়ি নেই কিন্তু ও জানে এখন অন্তত রাত সাড়ে দশটা হবে। এই সময়ে এখানে লোক ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যায়। জঙ্গলের দিকে কারোর আসার কথা নয়। তবে কে দাঁড়িয়ে আছে শুঁড়ের বনের ভিতরে? নাকি ভুল শুনল ও?

গুপি এ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আবার ফিরতি পথ ধরতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই আবার আসে শব্দটা। এবার ওর মনে হয়, যেন ওকে শোনাবার জন্যই আওয়াজটা করেছে কেউ। মুহূর্তে ঘুরে তাকায় ও। হাতের টর্চটা জঙ্গলের দিকে ফেলে উঁচু গলায় হাঁক দেয়, ‘কে? কে ওখানে?’

গুপি লম্বায় ছ’ফিটের বেশি। চওড়া কাঁধ। একসময় বালির বস্তা বইত দু’কাধে দুটো। কাঠের বাক্সের মতো নিরেট আর ধারাল মুখ। তবে চোখের মধ্যে একটা নরম ছায়া আছে। গায়ের জোরে সে মানুষ থেকে বুনো প্রাণী কাউকেই ভয় পায় না।

একটা ছায়ামূর্তি ইতস্তত পায়ে জঙ্গলের অন্ধকার ভেদ করে একটু এগিয়ে আসে। ধীরে ধীরে টর্চের আলোয় শরীরটা স্পষ্ট হয়। মণি! নিশিখুড়োর নাতি। সদ্য মাধ্যমিক দিয়েছে। গুপির সঙ্গে ভালোই আলাপ আছে ওর। মাঝে মাঝে মন্দিরে আসে। গুপি ওকে প্যাঁড়া খেতে দেয়, গল্প করে। কিন্তু সে এত রাতে এখানে কী করছে? অবশ্য আগেও এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে ওকে। বাপ-মা কেউ বেঁচে নেই। দাদু শয্যাশায়ী, ফলে ওকে দেখার কেউ নেই। সুযোগ পেলেই যখন তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু তাই বলে এত রাতে!

গুপি দু-পা এগিয়ে গিয়ে হাত রাখে ওর কাঁধে, ‘এত রাতে তুই জঙ্গলে কেন?’

‘চলে এসেছি…’ মাথা নিচু করে অপরাধী গলায় বলে মণি।

‘চলে এসেছিস মানে? কেউ ডেকেছে?’

দু’দিকে মাথা দোলায় মণি, ‘বাড়িতে আমার ভাল্লাগে না। দাদু বকা দেয়, দূর ছাই করে। তাই চলে এসেছি…’

গুপির মনের মধ্যে জমা হওয়া আশঙ্কার মেঘটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে আসে। মণির কাঁধ থেকে পিঠে নেমে আসে ওর হাত। তারপর বলে, ‘চল, বাড়ি চল, রাতবিরেতে এখানে থাকলে বিপদ আছে।’

মণি আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে। তার হাবভাব দেখে মনে হয় সেও বাড়ি ফিরেতেই চাইছিল।

‘কীসের বিপদ?’ মণি হাঁটতে হাঁটতেই আনমনে জিগ্যেস করে।

কথাটা অতশত ভেবে বলেনি গুপি, কিন্তু উত্তরটা দিতে গিয়ে একটা কথা মাথায় আসল। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে সেটাই উত্তর বলে চালিয়ে দিল সে, ‘দিলুবাবু বলছিল এই গ্রামে নাকি মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কেউ তুলে নিয়ে যায়…’

গুপি আড় চোখে লক্ষ করে এ কথাটায় মণির মধ্যে কোনও পরিবর্তন আসে না। সে একইভাবে হাঁটতে হাঁটতে বলে, ‘তোমারও যেমন বুদ্ধি! আমি তাতে ভয় পাব কেন? যাদের তুলে নিয়ে যায় তারা সব শিশু…আমি তো আর ছোট নেই…’

‘বলিস কী! তুই জানিস কাদের তুলে নিয়ে যায়?’

‘না জানার কী আছে? কাদের তুলে নিয়ে যায় জানি, কে তুলে নিয়ে যায় তাও জানি…’

গুপি দাঁড়িয়ে পড়ে ওর দিকে তাকায়। ছেলেটা যেরকম কল্পনাপ্রবণ তাতে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথা বলা আশ্চর্যের নয়। আবার রাতবিরেতে যেমন বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়, তাতে নিজের চোখে কিছু দেখেও থাকতে পারে।

‘কে নিয়ে যায়?’

‘গঙ্গা…’ নিঃস্পৃহ গলায় বলে মণি।

‘কিন্তু, তুই কী করে জানলি?’

‘উফ!’ মণি বিরক্ত হয় এবার, ‘জানব কী করে আবার? বললাম না, আমি দেখেছি—নিজের চোখে দেখেছি…’

‘কী দেখেছিস?’

‘গঙ্গা বাচ্চা চুরি করল, তারপর একটু হাসল, একটু কাঁদল, তারপর ঝাঁটায় উঠে আকাশে ভাসতে ভাসতে কোথায় যেন চলে গেল। আর দেখতে পেলাম না…’

এইবার হাসি পায় গুপির। এতক্ষণে ব্যাপারটা কল্পনা করে নেওয়া উচিত ছিল। গ্রামের কারুর মুখে হয়তো গঙ্গার ব্যাপারে কিছু শুনেছে। আর বাকিটা ওর কল্পনা। গঙ্গা ছেলে চুরি করে সেটা যদিও বা মেনে নেওয়া যায়, সে ঝাঁটায় করে রাতবিরেতে উড়ে যায়—একথা একদমই হাস্যকর।

‘তোর যত বানানো গালগপ্পো, ধুর!’

মণি রাগী গলায় বলে, ‘আমি দেখেছি, তুমি বিশ্বাস করছ না? আরও দেখেছি জানো? একটা নীল আলো…’

গুপি আর ওর কথায় পাত্তা দেয় না। আবার হাঁটতে শুরু করে দুজনে। ওর পিঠে একটা চাপড় মারে গুপি, ‘ছোট ছেলেদের খায় বলে তোকেও যে খাবে না তার কী মানে? ধর, একদিন এমন হল ছোট বাচ্চাদের খেয়ে খেয়ে ডাইনির মন ভরল না—তখন তো একটু বড়দের উপরেই ঝাঁপাবে? কী বল?’

এই প্রথম মণির ভুরু কুঁচকে যায়। সে বলে, ‘তুমি গঙ্গাকে ডাইনি বললে কেন? ও তো ডাইনি নয়…’

‘সেকি! তুই তো নিজেই বললি ওকে বাচ্চা খেতে দেখেছিস!’

মণি কাঁধ ঝাঁকায়, ‘তুমি কিছু জানো না। ডাইনিরা বাচ্চা খায় না। ডাইনিরা…’ একটু ভেবেচিন্তে মণি বলে, ‘অনেক মন্ত্রতন্ত্র জানে। ওদের হাতে একটা গাছের ডাল থাকে, সেটা দিয়ে মানুষকে কুকুর, ছাগল, ভেড়া বানিয়ে দিতে পারে। তাছাড়া…’

‘বাবা! ডাইনিদের নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছিস দেখছি!’

‘করব না কেন? আমার এইসব পড়তে ভালো লাগে, জানো? আচ্ছা গুপিদা, তুমি আমাকে একটা কথা বলো তো—।’

‘কী কথা?’

‘ডাইনিরা সবসময় বুড়ি হয় কেন? অল্পবয়সি ডাইনিদের ছবি তুমি কখনও দেখেছ?’

গুপির বিশেষ পড়াশোনা নেই, তার ওপরে ডাইনির ব্যাপারে তো একেবারেই নয়। সে কিছুক্ষণ মনে করার ভান করে। ও আগে যে গ্রামে থাকত সেখানেও ডাইনি সন্দেহে এক বুড়িকে একঘরে করে দেওয়া হয়। তার মুখটা মনে পড়ে ওর। আজ অবধি ও যে ক’টা ঘটনা শুনেছে তারা সবাই বয়স্ক মহিলা। অল্পবয়সি কিংবা কুড়ি পঁচিশ বছরের মেয়েরা ডাইনি হয়েছে বলে ও কখনও শোনেনি। গুপি মাথা নাড়ে।

‘তাহলে একটা জিনিস তুমি ভেবে দেখেছ?’

‘কী?’

‘ডাইনি কেউ জন্ম থেকে হয়ে যায় না। কিছু একটা করে মানুষ ডাইনি হয়। মানে যেমন স্পাইডারম্যান হয় না…আচ্ছা, ডাইনি কী করে হয় বলো তো?’

গুপি ধন্ধে পড়ে যায়। এমন সব জটিল প্রশ্ন ধেয়ে আসবে জানলে আগে মণিকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করত না সে। প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার চেষ্টা করে গুপি, ‘ডাইনি…ডাইনি যেভাবেই হোক। মোটকথা রাতবিরেতে এভাবে বাড়ি থেকে চলে আসবি না। সে বাড়ির উপর যত রাগই হোক না কেন।’

কথাটা শেষ করতে পারে না গুপি। তার আগেই মণি একটা ভঙ্গিমা করে আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখায়, ‘গুপিদা! ওই দেখো!’

গুপির বুক কেঁপে ওঠে। চকিতে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায় ও। কিন্তু তেমন কিছু দেখতে পায় না।

‘দেখলে? কী যেন একটা উড়ে গেল?’ মণি ফিসফিসিয়ে বলল।

গুপি কথাটা খেলাচ্ছলে উড়িয়েই দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ওর মনের ভিতরেও কে যেন বলে ওঠে—এইমাত্র বিকট হাওয়ার শব্দ করে ওর মাথার ঠিক উপর দিয়ে কিছু একটা জঙ্গলের এদিক থেকে আরেকদিকে পার হয়ে গেছে। তবে কি কোনও পাখি? কিন্তু কোনও পাখির পক্ষেও কি এত তাড়াতাড়ি ওড়া সম্ভব?

একটু থতমত খায় গুপি। তারপর চতুর্দিকটা ভালো করে একবার দেখে নিয়ে আবার মণির মুখের দিকে তাকায়। ওর মুখে কিন্তু কোনও বিকার নেই। গা’টা একটু ছমছম করে ওঠে ওর। রাস্তার এক পাশে পড়ে থাকা একটা লাঠি কুড়িয়ে নেয়। মণি হাসে, ‘ডাইনিদের হাতে ওরকম একটা লাঠি থাকে, জানো?’

‘ধর, এটা যদি কোনও ডাইনির লাঠি হয়? তাহলে আমি তোকে পাথর করে দেব…’

মণি অবজ্ঞার হাসি হাসে, ‘হুশ! অত সহজ নয়। ডাইনিদের হাতে লাঠি থাকলেই পাথর করে দেওয়া যায় না। কার হাতে আছে সেটাই বড় কথা। তুমি ক্লডিয়ার গল্প শোনোনি?’

‘সেইটা আবার কেমন গল্প?’

‘সেই যে একটা ডাইনি ছিল যে…’

মণির কথা মাঝপথেই থেমে যায়। তার কারণটা স্পষ্ট। বহু দূর থেকে ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে আসছে। একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ। আশেপাশের কোনও বাড়ির ভেতর থেকেই আসছে শব্দটা। সন্দেহ নেই। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু তাও একটা অদ্ভুত আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে এল গুপির মনের ভেতর। ও কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল, কান্নার সঙ্গে আর কিছু শোনা যায় কিনা। নাঃ শোনা যাচ্ছে না।

মণির হাত ধরে একবার টান দিল গুপি, ‘চলে আয়, পা চালা তাড়াতাড়ি। আমি এখনও বাড়ি যাইনি দেখলে পুরুতমশাই আবার…’ মনটা কেমন যেন কু ডাকতে শুরু করেছে গুপির। বাচ্চাটার কান্নার মধ্যে কী যেন আছে। এমন করে কোনও বাচ্চাকে আগে কাঁদতে শোনেনি গুপি।

দ্রুত পা চালাতে চালাতে গুপি ঠিক করে নেয় কোন বাড়ির বাচ্চা কাঁদছে সেটা একবার দেখে যাবে। মণিকে নিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে? এত রাতে ওকে একা বাড়ি যেতে দিতে ইচ্ছা করছে না। শেষে সাতপাঁচ ভেবে ঠিক করে ওকে নিয়েই একটি বার দেখে এসে আবার বাড়ির পথ ধরবে।

‘একবার আয় তো আমার সঙ্গে। কোন বাড়িতে বাচ্চা কাঁদছে দেখি—।’ গুপি শক্ত গলায় বলে। মণিও আপত্তি করে না।

কান্নাটা একটানা হয়েই চলেছে। রাতের খোলা হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ে দিগ্বিদিকে ভেসে যাচ্ছে আওয়াজটা। গুপির বুকের ভিতর আশঙ্কার মেঘ ঘনীভূত হয়। এবার মণির হাত ধরে দৌড় লাগায় সে।

এই এলাকার সব বাড়ি গুপির চেনা, মানুষগুলোকেও। ফলে গলি খুঁজে খুঁজে কান্নার উৎস বরাবর এগোতে বিশেষ অসুবিধা হল না ওর। ওর মন বলছে, কান্নাটা খুব একটা স্বাভাবিক নয়। বাচ্চাটা ভীষণ ভয় পেয়েছে।

‘ওই…ওই শুনতে পেলে?’ হঠাৎ আকাশের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বলে উঠল মণি।

‘কী শুনব?’

‘ওই যে…উড়ে গেল আকাশ দিয়ে!’

গুপি খেয়াল করে না। ওর কানের পাশের শিরা দপদপ করছে। নিজের রক্তের দপদপানিতে অন্য কোনও শব্দ খেয়াল হয়নি ওর। একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার মণির হাতে টান মারে। সে কিন্তু সহজে নড়তে চায় না, ‘ওদিকে যেও না গুপিদা, তুমি পারবে না!’ মণির মুখ থমথমে হয়ে গেছে।

‘কী পারব না?’

‘বাঁচাতে…’

‘তোকে কে বলছে এসব?’ গুপি প্রায় চিৎকার করে ওঠে।

‘যেও না, গুপিদা…’ মণি এবার কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আজ সন্ধ্যায় এই প্রথমবারের মতো তাকে ভীষণ আতঙ্কিত দেখাচ্ছে।

‘আমার কাছে কাছে থাক। খবরদার হাত ছাড়বি না!’

মিত্রদের বাড়ির দিক থেকে আসছে আওয়াজটা। ওদের পাড়ায় ঢুকেই বাড়িটার দিকে ছুটে যায় দুজনে। মিত্রদেরকে ভালো করেই চেনে গুপি। ছোট দোতলা বাড়ি ওদের। আপাতত ওরা যেদিকে এসে দাঁড়িয়েছে সেদিকের সমস্ত জানলা-দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। কোনও জানলায় আলো জ্বলছে না।

গুপি খেয়াল করে, এতক্ষণে বাচ্চার কান্নার শব্দ অনেকটা কমে এসেছে। আশপাশে অন্য কোনও আওয়াজ নেই। আকাশের দিকে চেয়েও কিছু দেখা গেল না। শুধু মেঘের আড়ালে ঢাকা চাঁদ ভয়ার্ত বিড়ালের মতো উঁকি মারছে।

গুপি আর মণি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। এতক্ষণ ধরে বাচ্চা কাঁদছিল যখন বাড়ির সবার নিশ্চয়ই উঠে যাওয়ার কথা। তাও অন্য কোনও শব্দ আসছে না মানে, আপাতত বিপদের কোনও আশঙ্কা নেই। মনে মনে গুপি নিজেকে একটু ভর্ৎসনা করে। রাত হয়েছে। এভাবে সামান্য একটা কান্না শুনে এতদূর দৌড়ে দৌড়ে আসার কোনও মানেই হয় না। আসলে ছোট থেকেই আগ বাড়িয়ে বিপদ-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়া ওর স্বভাব। তাতে খানিক সম্মান পাওয়া যায়। তার উপরে মণির বানিয়ে বানিয়ে বলা গল্পগুলোই ওর মাথাটা খেয়েছে। সাধে কি আর লোকে ওকে বোকা বলে?

ক্যামেরায় তোলা ছবির মতো নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। কোথাও কোনও শব্দ নেই।

খানিকটা তিরস্কারের ভঙ্গিতেই মণির পিঠে চাপড় মারে ও, বলে, ‘চ’ মণি, বাড়ি ফিরে যাই। আর ফের যদি তোর ওইসব গালগল্প আমাকে শুনিয়ে মাথা খারাপ করেছিস তাহলে…’

কথাটা শেষ না করেই দুজনে ফিরতি পথে পা বাড়ায়। আর ঠিক সেই সময় মিত্রদের বাড়ির দিক থেকে একটা অদ্ভুত জোরালো শব্দ ভেসে আসে। মনে হয় শক্ত লোহা বা ধাতুর কোনও দরজাকে যেন মাটির উপর আছড়ে ভেঙে ফেলছে কেউ। পরমুহূর্তে সেটা মাটিতে এসে পড়ার একটা তীব্র আওয়াজ। কেউ জানলা ভাঙছে—।

গুপি আর দাঁড়ায় না। শব্দটা এসেছে বাড়ির ডানপাশ থেকে। সেদিকটা ঝোপঝাড় হয়ে আছে। ঊর্ধ্বশ্বাসে সেদিক লক্ষ্য করে দৌড় দেয় গুপি। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই তার বুকের ভিতরের রক্ত ঠান্ডা হয়ে যায়।

একটা হাড় হিম করা গগনভেদী আর্তনাদ ভেসে এল বাড়ির ভিতর থেকে। কিন্তু একটু আগের মতো এ আর্তনাদ শিশুর নয়, কোনও পরিণত মানুষের। মরণ আর্তনাদ!

যে ঘরটা থেকে এসেছে সেখানে মিত্রদের বড় ছেলে সমীরণ তার স্ত্রী আর তাদের সদ্যোজাত থাকে। আওয়াজটা সম্ভবত এসেছে সমীরণের গলা থেকে। যেন ভয়ানক কোনও আতঙ্ক টুঁটি টিপে ধরেছে তার। আর্তনাদটা কাঁপছে। অর্থাৎ এ অবস্থাতেই কেউ ক্রমগত কিছু দিয়ে আঘাত করে চলেছে তাকে।

মণির কথা ভুলে যায় গুপি। সে দৌড় লাগায় জানলাটা লক্ষ্য করে। ডাইনি হোক আর যাই হোক, তার নিজের গায়ের জোরও কম নয়। পেছন থেকে মণি তখনও বলে চলেছে, ‘তুমি পারবে না গুপিদা, পারবে না…’

ছুটে জানলাটার দশেকের মধ্যে এসে থমকে দাঁড়ায় গুপি। একদিকে তাকিয়ে খেয়াল করে জানলার ঠিক নিচেই কাঠের পাল্লাটা টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। মাটির উপর ফেলে যেন রোলার দিয়ে সেটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে কেউ। একটা খুব হালকা নীলচে আভা জ্বলছে জানলার ভিতরে। সেখান থেকে এখনও আর্তনাদ ভেসে আসছে।

মুখ তুলে সেই জানলার দিকে তাকাতে গুপির ভয়টা কয়েক গুণ বেড়ে যায়! জানলায় মোটা লোহার গরাদ দেওয়া ছিল। সেই গরাদগুলো আপাতত ভাঙা পাঁজরের মতো এঁকেবেঁকে গেছে। যেন কোনও আদিম শক্তিশালী দৈত্য অমানুষিক হাতের জোরে সেগুলো মুচড়ে ভেতরে প্রবেশ করেছে।

সেই অদ্ভুত নীলচে আভাটা বেড়ে উঠছে থেকে থেকে। কম্পিত হচ্ছে সেটা। সেইসঙ্গে তীব্র আর্তনাদ। যেন কোনও ধারালো ছুরি বারবার সজোরে সমীরণের শরীরে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

গুপি সাহস হাতড়ে জানলার কাছে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই হঠাৎ একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। ও খেয়াল করে ও শত চেষ্টা করেও নিজের পা দুটোকে নাড়াতে পারছে না যেন। কোনও জাদুমন্ত্র বলে পাথরে পরিণত হয়েছে ওর পা দুটো। ঘাড় ঘুরিয়ে মণির দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয় না। ওর সমস্ত শরীরে কোথাও কোনও সাড় নেই।

নীল আলোর ভয়াবহতা যেন আরও বেড়ে ওঠে। সমীরণ মিত্রের আর্তচিৎকারের সঙ্গে এবার ধীরে ধীরে একটা মেয়েলি হাসির শব্দ ভেসে আসে। রক্তের গন্ধ লেগে আছে সে হাসিতে। এক আদিম হিংস্রতায় অনুরণিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাতের খোলা বাতাসে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সমীরণ মিত্রের গলার আওয়াজ ফিকে হয়ে আসে। আর সেইসঙ্গে নীল আলোটাও। জানালার সামনের অন্ধকারটা বেড়ে ওঠে। গুপি লক্ষ করে সেই অন্ধকার একটু যেন কম্পিত হয়। মনে হয় অন্ধকারের ভেতর গা বাঁচিয়ে কে যেন জানলা দিয়ে অন্ধকারের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। একটা মেয়েলি শরীর না? গুপি তাকে অনুসরণ করতে চায়, কিন্তু সাহসে কুলায় না।

‘ডাইনি…’ বিড়বিড় করে কথাটা উচ্চারণ করে গুপি। চকিতে আবার সাড় ফিরে আসে দেহে। বাড়ির ভেতরেও হইহাল্লা শুরু হয়।

মিত্রদের জয়েন্ট ফ্যামিলি। কাকা, জ্যাঠা তাদের পরিবার মিলে পরিবার অন্তত জনা দশেক সদস্য। সবাই এতক্ষণে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেছে। কান্নার শব্দও মিশে আসে সেই চিৎকারের মধ্যে।

গুপির শরীরে প্রাণ ফিরে আসতেই ও দেখে মণি এসে দাঁড়িয়েছে ওর পিছনে। ওর মুখে কৌতূহল।

‘ভিতরে যেও না গুপিদাদা। আমার ভয় করছে খুব…’ মণি অস্ফুটে বলে।

‘ডাইনি পালিয়েছে…’ ফিসফিসে গলায় বলে গুপি, ‘তুই দাঁড়া এখানে, আমি একটু দেখে আসি কী হয়েছে ভিতরে…’

এতক্ষণে ভিতর থেকে বাচ্চার চাপা কান্নার শব্দ আসছে। অর্থাৎ বেঁচে আছে বাচ্চাটা!

খোলা জানলার দিকে দৌড় দেয় গুপি। গ্রিলটা এখনও আগের মতোই ভেঙে পড়ে আছে বাইরে। সেটা দিয়ে ঝাঁপ মেরে ও ভিতরে ঢুকে আসে।

মরাকান্নার রোল ওঠার কথা এতক্ষণে। কিন্তু অবাক হয়ে গুপি দেখে, ঘরের দরজা খুলে যারা ভিতরে এসেছে তারা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের টর্চগুলোও নিভিয়ে ফেলেছে। তাই আবার অন্ধকারে ভরে গেছে ঘরটা। কেবল কীসের একটা গন্ধ বুঝি ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে— হ্যাঁ, কাঁচা রক্তের গন্ধ! তাজা উষ্ণ রক্তের গন্ধ!

‘কী…কী হয়েছে?’ গুপি ঘরের ভিতর ঢুকেই চিৎকার করে ওঠে। খেয়াল করে, একটা নয়, দু-দুটো বাচ্চার কান্না শোনা যাচ্ছে ঘরের ভিতর। অর্থাৎ মিত্রদের দুই ভাইয়ের ছেলেমেয়ে আছে এ ঘরে।

অর্থাৎ ডাইনি ব্যর্থ হয়েছে এবার। সমীরণ আর তার বউ জেগে উঠতেই ডাইনি পালিয়েছে। কিন্তু তাহলে রক্তের গন্ধটা আসছে কোথা থেকে?

গুপির বুকের মধ্যে ঢিপঢিপানিটা আগের চেয়ে একটু কমে এসেছে। ছুটে গিয়ে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর হাত থেকে একটা টর্চ কেড়ে নেয় সে। তারপর সেটা জ্বেলে ঘরের ভিতরটা আলোকিত করে। আর পরমুহূর্তেই আগের থেকেও দ্বিগুণ মাত্রার চিৎকারে সমস্ত ঘর ভেসে যায়।

টর্চের আলো এতক্ষণ গিয়ে পড়েছে ঘরের অন্যদিকের প্রান্তে। সেখানে মেঝের ওপর পড়ে আছে সমীরণ! তার শরীরটা অসংখ্য ছুরির ফলায় ক্ষতবিক্ষত করেছে কেউ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সমস্ত মেঝে। চোখদুটো উপড়ে পড়ে আছে মেঝেতে। গলার চামড়া জুতোর সুকতলার মতো উপড়ে এসেছে। মানুষের দেহ বলে আর চেনা যায় না প্রায়।

পাশেই তার স্ত্রীর নিথর দেহ। তারও সমস্ত শরীরময় অসংখ্য কাটাকুটি খেলা। যেন একপাল নেকড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে তাদের।

দরজায় এসে দাঁড়ানো আগন্তুকদের কেউ কেউ ছিটকে পিছিয়ে যায়। একদল মানুষের আতঙ্ক আর যন্ত্রণা মেশানো চিৎকারে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। এই বীভৎসতা এই গ্রামের কেউ আগে দেখেনি। বাকিরা ধপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। রক্তের স্রোত গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পৌঁছায় ওদের পায়ের কাছে।

‘ডাইনি, ওই শয়তান ডাইনি! বাচ্চা নিতে না পেরে শেষে…’ দরজার দিক থেকে কে যেন চিৎকার করে উঠল!

‘আমি নিজে দেখেছি, কুপিয়ে কুপিয়ে শেষ করে দিল গো আমাদের ছেলেটাকে…’ অন্য কেউ কান্নামাখা গলায় বলল।

‘জানলা দিয়ে ঢুকে আবার জানলা দিয়েই বেরিয়ে গেছে…’

কিছুক্ষণের জন্য আবার নিথর হয়ে গেছিল গুপি। তবে এবার কেবল আতঙ্কে। সে পেছন ফিরে তাকায়। ভাঙা জানলার গরাদ দিয়ে বাইরেটা এখনও দেখা যাচ্ছে। একটু আগের সেই ফিনফিনে মেয়েলি গলার আকাশ কাঁপানো হাসিটার কথা মনে করলেই বুকটা কেঁপে উঠছে ওর। আগের মতোই জানলা গলে বাইরে বেরিয়ে আসে গুপি। তার পুরুষালী হাত-পা এখন থর থর করে কাঁপছে।

জানালার বাইরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মণি। এখন ভেতরে কী চলছে, সে আন্দাজ করতে পারেনি। তবে ভয়ঙ্কর কিছু যে একটা ঘটেছে তা গুপির মুখ দেখে আর চিৎকার শুনে বুঝতে পেরেছে সে।

‘কী হয়েছে গুপিদা? সবাই এমন চিৎকার করছে কেন?’ সে জোর গলাতেই জিগ্যেস করে।

‘ভিতরে খুন হয়ে গেছে মণি…’ গুপি থমথমে গলায় উত্তর দেয়।

‘বলেছিলাম না, তুমি বাঁচাতে পারবে না।’

মণির মুখের দিকে একবার তাকায় গুপি। একটু আগে ওর নিজের বলা কথাগুলো মাথায় আসে আর একবার—

‘ধর, একদিন এমন হল ছোট বাচ্চাদের খেয়ে খেয়ে ডাইনির মন ভরল না, তখন তো একটু বড়দের উপরেই ঝাঁপাবে— কী বল?’

বিড়বিড় করে গুপি বলে, ‘আমার আশঙ্কাই সত্যি হল রে মণি। ও ডাইনির মন আর শিশুতে ভরছে না…’