কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১১

একাদশ অধ্যায়

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ হতেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসে মৌলি। চাপা স্বরে ওকে শান্ত করে সায়ন, ‘কেউ না, কেউ আসবে না…তুমি ঘুমাও…’

কাল নিচে গিয়ে কুসুমকে দোতলার অন্য একটা ঘরে আসতে বলেছে সায়ন। ওকে ভালো করে বুঝিয়ে বলেছে, ওর ঘরে যেন ভুলেও না ঢোকে। বেচারির একটু মন খারাপ হলেও মাথায় হাত বুলিয়ে আপেল আর ক্রিম বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে কোনওরকমে ম্যানেজ করেছে ব্যাপারটা। তবে দিলুজেঠু এখনও বিষয়টা জানতে পারেননি, এই যা শান্তি।

মৌলির বিশ্বাস হয় না কথাটায়। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শোনার চেষ্টা করে। তারপর একটু আশ্বস্ত হয়। কিন্তু বালিশে মাথা রাখতে সাহস হয় না। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আওয়াজটা না হতে একটু নিশ্চিন্ত হয় সে। তারপর বিড়বিড় করে বলে, ‘আমার খুব ভয় করে সায়নবাবু, খুব ভয় করে!’

সায়নের মুখে একটা নরম হাসি খেলে যায়, বলে, ‘আমি যতদূর জানি আপাতত আপনাকেই এ গ্রামের বেশিরভাগ লোক ভয় পাচ্ছে। যেভাবে লোকদুটোকে মেরেছেন!’

‘আমি! আমি কাউকে মারিনি—’

‘তাহলে কে মারল?’

মৌলি মুখ নামিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে বলে, ‘মা হতে পারে। আমি জানি না। আমার খুব ক্লান্ত লাগছিল। ওরা খুব মারছিল আমাকে। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ চিৎকার শুনতে পেলাম। দেখলাম ওই দুটো লোক গাছ থেকে ঝুলছে। আর আমি…আমার দড়িগুলো হালকা হয়ে আছে…সুযোগ পেয়ে পালিয়ে গেলাম।’

মৌলির কথাগুলো কেমন মেকি লাগে সায়নের। ওর অবচেতন মন বলে মৌলি মিথ্যে কথা বলছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে মৌলি, সায়ন জিগ্যেস করে, ‘আপনার পেটে যে উল্কিগুলো আছে সেগুলোর মানে জানেন আপনি?’

দু’পাশে মাথা নাড়ায় মৌলি। চাদরটা আরও বেশি করে গায়ে টেনে নেয়। সায়ন হাত তুলে আশ্বস্ত করে তাকে, ‘ঘাবড়াবেন না। আপনার জামাকাপড় খুলে দেখিনি আমি। ওরা আপনার কয়েকটা ছবি তুলেছিল। আমাকে দেখিয়ে জানতে চাইছিল ওগুলোর মানে কী…কবে থেকে আছে ওগুলো?’

‘ছোট থেকেই।’

‘কে করেছিল ট্যাটুগুলো?’

‘মনে নেই…’

‘ওয়াল্পারগা হাস্মানিন নামটা আগে শুনেছেন আপনি?’

দুদিকে মাথা নাড়ে মৌলি। ওর মুখটা থমথমে দেখায়। সেদিকে তাকিয়ে মায়া হয় সায়নের। বিছানায় ওর পাশে উঠে বসে বলে, ‘আপনার চিন্তার কিছু নেই, আমি থাকতে আপনার ক্ষতি কেউ করতে পারবে না…’

‘পুলিশ আমাকে খুঁজছে সায়নবাবু, আর ওই লোকগুলো আমায় দেখতে পেলে…আপনি আমায় ছেড়ে যাবেন না তো?’

সায়ন উঠে গিয়ে আলনা থেকে একটা জামা আর ট্রাউজার এনে ওর সামনে রাখে, ‘আপনি জামাকাপড় চেঞ্জ করে নিন, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।’

‘না, যাবেন না কোথাও। এখানে একটু থাকুন। আমার ভয়টা কমুক। তারপর অন্য কোথাও যাবেন!’

সায়ন বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়িয়েছিল, পা দুটোকে আবার বিছানার উপর তুলে নেয়। মৌলি একটু আশ্বস্ত হয়ে বলে, ‘চোখমুখ ফুলে আছে আপনার, রাতে ঘুমাননি?’

‘না, ওই চেয়ারে বসেছিলাম। মাঝেমধ্যে ঢুলুনি আসছিল।’

‘ঘুমাননি কেন? ভয় করছিল আমাকে?’

‘আপনাকে ভয় করবে কেন?’

‘এই যে জিগ্যেস করলেন—আমি ওই লোকদুটোকে খুন করেছি কিনা?’

‘করেছেন?’

মৌলির মুখে হঠাৎ করেই একটা রহস্যময় হাসি খেলে যায়। আজ রাতে এই প্রথমবারের মতো হাসে ও। বলে, ‘সবার সব ভয় কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয়, জানেন সায়নবাবু, বিশেষ করে মেয়েদের…’

‘আপনি অনেক কথা আমাকে বলেননি, তাই না?’

‘আপনি সব কথা আমায় বলেছেন?’

‘আমি আবার কী বললাম না?’

বালিশে মাথা রেখে অন্য দিকে মুখ ফেরায় মৌলি, ‘মাঝরাতে চেয়ার থেকে উঠে আমার মাথায় হাত রাখছিলেন আপনি। রাখেননি?’

সায়ন প্রথমে অপ্রস্তুত হয়, তারপর বলে, ‘হ্যাঁ রেখেছিলাম। দেখছিলাম আপনার জ্বর আছে কিনা। তাছাড়া, এখানে আমার খুব একটা ভালো ঘুম হয় না। অস্বস্তি হয়, মনে হয় বাইরে থেকে কেউ দেখছে আমাকে!’

হঠাৎ করেই বালিশের আড়ালে মুখ লুকিয়ে নেয় মৌলি, ‘এখানে কেউ হয়ত ভালোবাসে আপনাকে, রাতবিরেতে বিপদ আপদের হাত থেকে রক্ষা করে…’

এগিয়ে এসে ওর বালিশে হাত রাখে সায়ন, ‘আমার কেউ আছে কিনা জানি না, কিন্তু আপনাকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার লোক আছে এখানে।’

‘কে বলুন তো?’ মৌলি অবোধ গলায় জিগ্যেস করে।

‘জানেন না?’

মিষ্টি করে হেসে আবার মুখ লুকিয়ে ফেলে মৌলি, ‘বাইরের লোক যদি জানতে পারে আপনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, আমার সঙ্গে আপনাকেও কিন্তু ছেড়ে দেবে না!’

‘আমার বাবা পেশায় উকিল, আমারও ডিগ্রিটা আছে, ঠিক সামলে নেব। তাছাড়া…’

‘তাছাড়া কী?’

‘আপনি কাছে থাকলে জানি না কেন আমার খুব একটা ভয় লাগে না।’

‘এই যে বললেন, সবাই আমায় ভয় পাচ্ছে, তা আপনি পাচ্ছেন না? ডাইনিকে ভয় করে না আপনার?’

হঠাৎ জোরে শব্দ করে হেসে ফেলে সায়ন, ‘এই জানেন, ছোটবেলায় আমার কাছে একটা বই ছিল—মরা ডাইনির অভিশাপ। মা রোজ ওটা থেকে গল্প পড়ে শোনাত আমাকে। তার কভারের ছবিতে যে ডাইনিটা ছিল তাকে একদম আপনার মতো দেখতে!’

ওর পিঠের ওপর একটা ঘুষি মারে মৌলি, ‘তবে রে! আমাকে ডাইনির মতো দেখতে?’

‘আহা, চটছেন কেন? ডাইনিটাকে ভারি ভলোবাসতাম আমি। আমার ফার্স্ট গার্লফ্রেন্ড ছিল ডাইনিটা…’

‘তাই নাকি?’ মৌলি কথাটা বলে উঠে বসে, ‘এই, জানেন, ডাইনিরা কিন্তু পুরুষমানুষকে খুব ভালো বশ করতে জানে…’

‘আচ্ছা! কীভাবে?’

‘চোখের দিকে তাকিয়ে। বেশিক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেই আপনি পাথর হয়ে যাবে…’

‘তাই নাকি?’ সায়ন নিজের মুখটা মৌলির মুখের ভীষণ কাছে নিয়ে আসে। দুটো হাত রাখে ওর গালে। তারপর ওর চোখের দিকে চোখ তুলে তাকায়, ‘করুন বশ…আমি তো আপত্তি করিনি…’

মৌলিরও দুটো হাত উঠে এসে ওর গাল স্পর্শ করে। কয়েক সেকেন্ড দুজন অপলক চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের পাতা পড়ে না। কেবল চোখের ফাঁকে অনন্ত সময় ডুবে যায়। ঠিক যেন পাথরের মূর্তিতেই পরিণত হয় দুজনে।

আস্তে আস্তে মৌলির মাথাটা সায়নের ঘাড়ে নেমে আসে, ‘আমার খুব ভয় করছে…আমার খুব ভয় করছে সায়নবাবু…’

অজান্তেই সায়নের হাতটা মৌলির পিঠে নেমে আসে, শিশুর মতো ওকে শান্ত করতে থাকে সায়ন, ‘ভয় পাবেন না। আমি আছি আপনার কাছে, সব সময়…’

সায়নের বুক থেকে মুখ সরায় না মৌলি। একটা মিহি সুরে গান গেয়ে ওঠে ও । ভীষণ চাপা স্বর। শুধু সায়নকে শোনানোর জন্যেই।

‘এটা কী গান বলুন তো?’ সায়ন জিগ্যেস করে।

‘যেটা আপনি শুনতে চেয়েছিলেন প্রথমদিন…’

‘আপনি শিখে নিয়েছেন?’

মিহি সুরের সেই গান ওর চোখ বন্ধ করিয়ে দেয়। একটা আবেশ এসে মিশে যায় ওদের শরীরে। মনে হয় জানলা দিয়ে বেরিয়ে গ্রামের দূরতম প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে সেই গানের রেশ। রক্তাক্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ কিছু মানুষ, হিংস্র কিছু অন্ধকার আর অজানা কোনও ভয়কে যেন শান্ত করে দিচ্ছে সেই গান। ও মৌলিকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে।

হঠাৎ সায়নের মনে হয় মেয়েটার অনাবৃত শরীর অনেকটা স্পর্শ করে রয়েছে ওর বুক-পিঠ। নরম পাখির মতো স্পর্শে ওর গা-টা শিরশির করে ওঠে। এবং সেইসঙ্গে একটা অদ্ভুত নিয়ন্ত্রণ। ও চাইলেও নিজের ইচ্ছায় কিছু করতে পারবে না।

বুক থেকে মুখ তুলে ওর মাথাটা বালিশের উপর রেখে দেয় সায়ন। তারপর বলে, ‘একটু পরে ওরা হয়তো বেরোবে…’

‘কোথায়?’

‘আপনাদের বাড়ি সার্চ করতে।’

‘আপনিও যাবেন?’

‘যেতে তো বলেছে…’

‘বেশ, তবে যান, কিন্তু ওখানে কিছু খুঁজে পাবেন না। শুধু আমার একটা কথা রাখবেন?’

‘কী কথা?’

‘দোতলায় যে ভাঙা ঘরটা আছে তার ছাদের সঙ্গে লাগোয়া একটা খোপ আছে। নিচ থেকে বোঝা যায় না যে ওটা একটা খোপ। সেটা অন্য কেউ দেখার আগে আপনি দেখবেন। আর কেউ না। ঠিক আছে?’

‘কেন? কী আছে ওখানে?’

মৌলি কথাটার উত্তর দেয় না। বালিশের উপর মুখ ফিরিয়ে শোয়। সায়ন ওর মাথায় একটা হাত রাখে, তারপর বলে, ‘আপনি ঘুমিয়ে নিন, আমি একটু পরে ব্রেকফাস্ট নিয়ে উপরে চলে আসব। বেরোনোর সময় বাইরে থেকে চাবি দিয়ে যাব। ভয় নেই, দরজা কেউ খুলবে না। শুধু আপনি কোনও আওয়াজ করবেন না।’

বাচ্চা মেয়ের মতো উপরে নিচে মাথা নাড়ে মৌলি। তারপর চোখ বোজে।

* * * *

তালাটা খুলতেই একটা তীব্র শব্দ পাঁচিলের ভিতরের ফাঁকা জায়গাটায় ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের দলটা দরজা খুলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে আসে। এই চত্বরেই কম্পাউন্ডার বসত। তার জন্য বরাদ্দ একটা গোল ভাঙা কাঠের টেবিল আর চেয়ার এখনও আগের মতোই একধারে পড়ে আছে।

সদর দরজাতেও তালা। তালা ভাঙার ঝনঝন শব্দ উঠোনের ভেতর গমগমিয়ে ওঠে। ওরা জনাছয়েক লোক পিছিয়ে আসে সেই আওয়াজে।

এতক্ষণে বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষকে এদিকটায় আসতে দেওয়া হচ্ছে না। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, দিলীপ দস্তিদার, সায়ন আর দুজন কনস্টেবল একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা এবার এগিয়ে এসে উঁকি মারে ঘরের দরজা দিয়ে।

বাইরের জায়গাটা একবার ভালো করে দেখে নেয় ওরা। সামান্য কিছু কাগজপত্র আর ডাঁই করা কিছু প্লাস্টিকের প্যাকেট রাখা আছে। তাতেই সম্ভবত জড়িবুটি থাকত।

ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী আগে ঘরে ঢোকেন। বাড়িটা বড় হলেও ঘরগুলো কেমন খুপরি মতো। মনে হয় বেশিক্ষণ থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসবে। দরজাটা খুলেই একটা ছোট্ট দালান। তার দুদিকে দুটো ঘর। দালান দিয়ে একদম সোজা চলে গেলে একটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো কুয়ো। তার পাঁচিলে বালতি রাখা রয়েছে।

নিচতলায় মোট চারটে ঘর। এই চারটে ঘরের মধ্যে দুটো ব্যবহার হয় না।

দিলীপ দস্তিদার বললেন, ‘দুশো বছরের পুরনো বাড়ি। বেশি গুঁতোগুঁতি করতে গেলে মাথার উপর না ভেঙে পড়ে!’

ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী তার কথায় কর্ণপাত না করে দুজন কনস্টেবলকে অন্য ঘরটা দেখিয়ে ইশারা করলেন। নিজে ঢুকে এলেন গঙ্গার ঘরে। ঘরের উপর একবার চোখ বুলিয়েই বললেন, ‘আমার যতদূর মনে হচ্ছে মহিলা হুট করে বেরিয়ে যাননি। বেশ আটঘাট বেঁধেই বেরিয়েছিলেন। রাত অবধি মেয়ে বাড়িতে না ফেরাতেই মনে হয় বুঝে গেছিলেন কিছু একটা হয়েছে। তখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন…’

চারদিকের দেওয়াল থেকে ভাঙা ইট বেরিয়ে আছে। একটা বড় টেবিলের উপর ভাঙা গ্রামোফোন, কিছু ছেঁড়া কাপড়। জলের গ্লাস, দুটো কাচভাঙা চশমাও উল্টে পড়ে আছে। দেওয়ালের দিকে তাকাতে ওরা সবাই খানিক অবাক হয়ে যায়। গোটা ঘরের একদিকের দেওয়ালে কাঠের তাক করে অজস্র বই রাখা আছে। সব বই-ই পুরনো, হলদেটে ছাপ লাগা। হয়তো গঙ্গা নিজে হাতে মলাট দিয়েছিল কোনও এক সময়। সেই মলাটও ধুলোয় ধুলোয় কালচে হয়ে গেছে। কাছে গিয়ে বইগুলো খতিয়ে দেখতে থাকেন ইন্সপেক্টর, ‘এখানে ইতিহাসের বই তো বেশি দেখছি! আশ্চর্যের ব্যাপার, তাই না? একজন অশিক্ষিত গ্রাম্য মহিলা…ইতিহাস নিয়ে এত আগ্রহ এল কোথা থেকে?’

ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী দিলুবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, ‘বাচ্চা চুরি করার ব্যাপারটা যদি সত্যি হয় তাহলে সেসব জিনিস একতলায় থাকবে বলে মনে হয় না। এখানে লোকজনের যাতায়াত ছিল…’

একটা বইতে নজর পড়তে ভুরু কুঁচকে যায় ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীর। বইটা ডাইনিদের নিয়ে। তবে মন্ত্র-তন্ত্র নয়। খানিক প্রবন্ধ সংকলন গোছের। সেটা তাক থেকে টেনে বের করেন তিনি। একটা বিশেষ পাতায় এসে থেমে যান। তারপর সায়নের দিকে চেয়ে বলেন, ‘মিস্টার মজুমদার, আপনি সেদিন এই মহিলার কথা বলছিলেন না?’

সায়ন ঝুঁকে পড়ে দেখে বইয়ের খোলা পাতায় ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের ব্যাপারে বিশদে লেখা আছে। সঙ্গে একটা হাতে আঁকা ছবিও দেওয়া আছে তার। ঘাড় নাড়ায় সায়ন, ‘হ্যাঁ, ইনি…’

খোলা পাতাটার কয়েক জায়গায় লাল কালি দিয়ে কীসব দাগ দেওয়া আছে। পেন্সিলে একসময় কিছু লেখাও হয়েছিল কিন্তু সেসব আবছা হয়ে এখন উঠে গেছে। সায়ন আরও দু-একটা পাতা উলটে বলে, ‘অন্য ডাইনিদের ব্যাপারে কিন্তু এত দাগ বা হাইলাইট করা নেই। মানে এনাকে নিয়েই আসল আগ্রহের জায়গা…’

একটা কথা মাথায় আসে সায়নের। মৌলি ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের ব্যাপারে কিছু জানে না, এদিকে ওর মায়ের তাকে নিয়ে এত আগ্রহ। ওর শরীরের ট্যাটুটা নিশ্চয়ই গঙ্গাও দেখেছিল? তাহলে তো মৌলির না জানার কথা নয়! মৌলি কি মিথ্যে বলছে? অবশ্য মৌলি কিছু একটা গোপন করছে সেটা আগেই সন্দেহ করেছিল সায়ন।

বইতে আর কিছু না পেয়ে সেটা আবার তাকে গুঁজে রাখতে যাচ্ছিলেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। একটু অসুবিধা হয় তার। পাশের বইটা না সরালে কিছুতেই ঢুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না এটা। সায়ন দ্রুত পাশের বইটা সরিয়ে নেয়। দুজনের একইসঙ্গে চোখ পড়ে সরিয়ে নেওয়া বইটার উপর।

বই নয়, একটা ডায়েরি। একই মলাট দেওয়া আছে বলে আলাদা করে ডায়েরি বলে বোঝা যায়নি।

সায়নের হাত থেকে ডায়েরিটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে আলোর মধ্যে ধরে সেটা খোলেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। বাকি দুজন ওর কাঁধের পাশ দিয়ে উঁকি দেয় তার খোলা পাতায়।

মলাটটা পুরনো হলেও ডায়েরিটা ততটা মলিন নয়। তবে কাগজগুলো হাতে তৈরি। নানারকম ছবি আর আঁকায় ভরে আছে ডায়েরিটা। বাংলা গোটা গোটা অক্ষরে কিছু জড়িবুটির নাম, তার থেকে তৈরি হওয়া ওষুধ, কিছু হিজিবিজি, কিছু অস্পষ্ট লাইনে ভর্তি।

পাতা উল্টে একটা জায়গায় চোখ আটকে যায় ইন্সপেক্টরের, মুখ না ঘুরিয়েই ডাক দেন তিনি, ‘দিলুবাবু, দেখুন তো নামগুলো চিনতে পারছেন কিনা!’

দিলুবাবু এগিয়ে এসে ডায়েরির উপরে ঝুঁকে পড়ে দেখেন একেবারে শেষের দিকের একটা পাতায় আঁকিবুকির মাঝে স্পষ্ট করে লিস্টের মতো বেশ কিছু নাম লেখা আছে। কালো কালি পরিষ্কার ফুটে রয়েছে, যেন নামগুলো লেখার সময় লেখক ভারি যত্ন নিয়ে ফুটিয়ে ফুটিয়ে লিখেছেন।

ভালো করে লক্ষ করতেই কয়েকটা নাম চিনতে পারেন তিনি। উৎসাহে তার চোখ চকচক করে ওঠে, ‘স্যার, এরা সবাই…মানে এদের সবার বাড়ি থেকেই বাচ্চা চুরি হয়েছিল…হারু ঘোষ, গোবিন্দ মাইতি, জগন্নাথ, দেবলাল, প্রভাকর…’

‘আর বাকি নামগুলো?’

কাঁধ ঝাঁকান দিলীপবাবু, ‘ওগুলো চিনি না স্যার। এ গ্রামে ওরকম নাম কারো আছে বলে তো মনে হয় না। পাশের গ্রামের হলেও হতে পারে…’

ইন্সপেক্টরের আঙুল একটু সরে আসে, ‘নামের উপরে তারিখ লেখা আছে। অর্থাৎ যবে বাচ্চাগুলো চুরি হয়েছিল, তারিখগুলো মিলছে সম্ভবত, তাই না?’

‘আমি আপনাকে বলেছিলাম স্যার, এই সব কিছু ওই ডাইনির কারসাজি, ও-ই চুরি করেছে বাচ্চাগুলো। আপনি আমাকে বিশ্বাস করেননি, এবার বুঝতে পারছেন তো!’

ডায়েরিটা একজন কন্সটেবলের হাতে দিয়ে উঠে পড়েন গাঙ্গুলী, ‘কিন্তু…একটা বাচ্চারও বডি পাওয়া গেল না! বডিগুলোকে রাখে কোথায়?’

‘স্যার আমার মনে হয় বাইরের উঠোনটা খুঁড়লেই পাওয়া যাবে। বিশেষ করে টেবিলের নিচটা…’

নিজের কপালের দুপাশ চেপে ধরলেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। শোকেসের উপর কয়েকবার আঙুল দিয়ে বললেন, ‘বেশ, আমি আজ রাতের মধ্যেই বডিগুলো উদ্ধারের চেষ্টা…’

কথা শেষ করতে পারেন না গাঙ্গুলী। এমন সময় পেছনের ঘর থেকে একটা চিৎকার ভেসে আসে, ‘স্যার এখানে কিছু একটা আছে স্যার…এদিকে আসুন…’

আওয়াজটা কানে যেতেই তিনজনে দ্রুত পা চালিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে আসেন।

এ ঘরটা আগেরটার চেয়ে একটু বেশি গোছানো। বইপত্রেরও তেমন আধিক্য নেই। সম্ভবত মৌলি থাকত এই ঘরে। ঘরের বেশিরভাগটা জুড়ে একটা দশাসই খাট। তার সামনে হুমড়ি খেয়েই হাঁক পেড়েছে একজন কনস্টেবল।

গাঙ্গুলীকে দেখতে পেয়েই সে উত্তেজিত গলায় বলে ওঠে, ‘এখানে প্যাকেট করে কিছু রাখা আছে স্যার…মনে হচ্ছে বাচ্চাদের জামাকাপড়!’

সায়ন আর ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী ছুটে গিয়ে ঝুঁকে পড়েন খাটের তলায়। হাতের লাঠি দিয়ে ধীরে ধীরে ঝুলে থাকা বিছানার চাদরটাকে উপরের দিকে তোলেন।

বিছানার নিচে অনেকগুলো ছোটছোট কাচের শিশি উল্টে পড়ে আছে, কয়েকটা পুরনো ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ। তার মাঝে সাদা প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট করে দুটো পুঁটলি। একটা বড়, একটা ছোট।

দুটো পুঁটলি টেনে এনে তার গিঁট খুলে ফেলেন গাঙ্গুলী। সায়ন স্তব্ধ হয়ে অপলকে চেয়ে দেখতে থাকে। গিঁট খুলতেই পুটলির ভিতর থেকে কিছু ছোটছোট কাপড়ের টুকরো বেরিয়ে আসে। তাতে চাপচাপ রক্ত লেগে আছে। দেখে মনে হয়, এক কি দুই বছরের শিশুদের পোশাক।

দিলীপ দস্তিদার গড়গড়ে গলায় বলে ওঠেন, ‘ডাইনি, শয়তান ডাইনি! এবার ধরতে পারি তারপর…’

এবার দ্বিতীয় পুঁটলিটা বের করেন ইন্সপেক্টর। এটা আগেরটার থেকে অপেক্ষাকৃত ভারী। গিঁট খুলতে তার ভিতর থেকে যা বেরিয়ে আসে সেটা দেখে এক-পা পিছিয়ে আসে সায়ন। ওর মেরুদণ্ড মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে যায়। দুটো প্রায় কাটারি সাইজের ধারালো ছুরি। সকালের রোদ লেগে চকচক করছে ছুরিদুটো।

‘এটা দিয়েই সম্ভবত খুন করা হয়েছিল মিস্টার মিত্রকে…’ কথাটা বলতে বলতেই কন্সটেবলের হাতে সেটা তুলে দেন ইন্সপেক্টর, ‘এটা ব্লাড স্যাম্পেলের জন্য পাঠাও…’

পুঁটলির ভিতর থেকে বেরোয় একটা বীভৎস মুখোশ! হালকা নীলচে ভাব আছে সেটায়। সম্ভবত একটা ডাইনির মুখোশ। মাথার দুপাশ থেকে গোছা গোছা কোঁকড়া চুলের ঢল নেমেছে। রাতবিরেতে আধো অন্ধকারে এ মুখোশ মুখে পরলে ডাইনি বলে ভুল হওয়া বিচিত্র নয়।

মুখোশটা কন্সটেবলের হাতে তুলে দিতে দিতে গাঙ্গুলী বলে, ‘জগন্নাথ বলে লোকটার বউ ডাইনিকে দেখেছিল না?’

‘সে তো মারা গেছে। তবে প্রভাকরের বউ আর জগন্নাথও দেখেছিল যদ্দুর জানি।’

‘বেশ, তাহলে ওদেরকে আইডেন্টিফাই করতে বলুন এই সেই মুখোশ কিনা…’

নির্দেশটা দিয়ে পড়ে থাকা ওষুধের শিশিগুলোর মধ্যে থেকে একটা ভাঙা শিশি হাতের তালুতে নেন ইন্সপেক্টর। তারপর সতর্ক ভঙ্গিতে সেটা নাকের কাছে এনে ঘ্রাণ নেন। মাথাটা গুলিয়ে ওঠে তার। বুঝতে পারেন এটা বেশিক্ষণ নাকের কাছে ধরে রাখলে অজ্ঞান হয়ে যাবেন।

‘ক্লোরোফর্ম?’ জিগ্যেস করে সায়ন।

দুদিকে মাথা নাড়েন ইন্সপেক্টর, ‘উঁহু, তবে কাজটা একই করে। সম্ভবত গাছপালার শিকড় দিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরি করা…’

শিশিটা মাটিতে রেখে উঠে পড়েন ইন্সপেক্টর। কনস্টেবলদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দেন, ‘আপাতত এগুলো এখানেই থাক। বাড়িটা কমপ্লিটলি সিল করে দাও। আর থানায় বলে দাও আশেপাশে যত গ্রাম আছে, গঙ্গাকে যেখানেই দেখা যাক, যেন পুলিশে খবর দেয়। বাট বি কেয়ারফুল, শি ক্যান বি এক্সট্রিমলি ডেঞ্জারাস…’

কথাগুলো বলে বাকি ঘরগুলো দেখতে বেরিয়ে যান তিনি।

মিনিটদশেক পরে কায়দা করে পুলিশের টিমটা থেকে সরে আসে সায়ন। একটা ছোট্ট লোহার গেট দেওয়া আছে দোতলার সিঁড়ির মুখে। তার ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে খোলা অবশ্য কঠিন নয়।

সবার নজর বাঁচিয়ে গেটটা খুলে সিঁড়ির ওপর উঠে আসে সায়ন। লম্বাটে চেহারার জন্য সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে খানিক অসুবিধা হয় ওর। সত্যিই দুশো বছর আগের বাড়ি আর বসবাসযোগ্য নেই। এখানে দুজন কী করে থাকত কে জানে! সায়ন ভাবে, গঙ্গার ছেলেপিলে নেই, ধরা পড়লে হয় এতগুলো বাচ্চা খুনের জন্য ফাঁসি হবে না হয় জেলে যাবে আজীবনের জন্য। সায়নের মনটা খারাপ হয়ে যায়। গঙ্গা সত্যি ডাইনি? কিন্তু মৌলির কথা শুনে তো একবারও মনে হয়নি…

কোনওরকমে গা বাঁচিয়ে সে উঠে আসে দোতলায়। যে জায়গাটায় এসে ও দাঁড়ায় তার দুদিকে দুটো ঘর। তার মধ্যে বাঁদিকেরটা ভগ্নপ্রায়। উড়ন্ত বাদুড়দের একটানা কিচমিচ আওয়াজ আসছে চারদিক থেকে। সিঁড়ির দিকের দেওয়াল ভেঙে পড়ে উঠোনের কুয়োটা দেখা যাচ্ছে।

ডান দিকের পাঁচিলটা তাও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ছাদের বেশ কিছু জায়গা গায়েব। সেখানে মাকড়সার জালের বুননে কী আছে কিছুর দেখার উপায় নেই।

সায়ন ভালো করে চারপাশটা দেখতে থাকে। তারপর ডানদিকের ঘরটাতে ঢুকে পড়ে। ভেঙে পড়া জানলা দিয়ে একফালি আলো এসে পড়েছে ঘরটাতে। সমস্ত ঘরটা একবার ঘুরে দেখতে দেখতে একটা জিনিস চোখে পড়ে ওর। নেহাত মৌলি বলেছিল বলে খেয়াল করে, না হলে মাটিতে দাঁড়িয়ে আদৌ যে ব্যাপারটা আছে সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই।

ভেঙে পড়া ছাদের ধার ঘেঁষে বাড়ির বাইরের দিকে একটা লফট জাতীয় ইটের গাঁথনি। পলকা ইট দিয়ে সাজিয়ে এমনভাবে ঢাকা হয়েছে জায়গাটা যে, মাটিতে দাঁড়িয়ে বোঝা অসম্ভব ওখানে কিছু আছে।

কিন্তু বাড়ির বাইরের দিকে কেউ লফট করবে কেন? কিছু লুকানোর জন্য? ওখানে কি কিছু লুকিয়ে রাখা আছে? ওকে কেন এটা দেখতে বলেছে মৌলি? প্রশ্নগুলো সায়নের মাথার মধ্যে ভেসে ওঠে।

লফটটা মাটি থেকে অন্তত দশ ফুট উঁচুতে। তাছাড়া সেটার কাছাকাছি পৌঁছাতে হলে পাঁচিলের উপর দিয়ে একটা হালকা লাফ মারতে হয়। ব্যাপারটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ! একবার পা পিছলে গেলেই সটান নিচে এসে পড়বে।

 আরেকবার সিঁড়ির কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে আসে সায়ন। সিঁড়ি দিয়ে কেউ ওপরে আসছে না। সে তারপর আবার ফিরে যায় ঘরের ভিতর।

নিচে দাঁড়িয়ে অত উঁচুতে হাত যাওয়া সম্ভব নয়। মোবাইল ফোনটা বের করে লফটটার দিকে টর্চের আলো ফেলে সায়ন। ভেতরে সাদা কাপড়ের টুকরো মতো কিছু একটা ছাড়া প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

বাঁদিকের ঘরটাতে ফেলে রাখা জিনিসপত্রের মধ্যে একটা মই দেখেছিল সায়ন। ওটা ছাড়া উপরে ওঠার আর অন্য কোনও উপায় নেই।

কোনওরকমে দু’হাতে ধরে মইটা লফটটার নিচে নিয়ে আসে সায়ন। তারপর সাবধানে ওটা বেয়ে উঠতে থাকে। মচমচ করে ওঠে মইটা। রীতিমতো ঝুরঝুরে অবস্থা।

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে ছোট একটা লাফ দিয়ে লফটের একটা প্রান্ত ও ধরে ফেলে। ওর দেহটা ঝুলতে থাকে জরাজীর্ণ বাড়িটার বাইরে। বাড়ির পেছন দিক থেকে বাইরে থেকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না ওকে। বুকটা শিরশির করে। এখানে যদি কিছু থেকেও থাকে, সেটা এখানে রাখল কে?

ঝুলতে ঝুলতেই লফটের ভেতরে উঁকি মারে ও। হ্যাঁ সত্যিই বড়সড়ো কিছু একটা পড়ে আছে সেখানে। কাঁধের ওপরে চাপ দিয়ে মাথাটা আর একটু উপরে তোলে সায়ন। ভিতরে পড়ে থাকা জিনিসটার উপরে ওর মোবাইলের টর্চের আলো গিয়ে পড়ে।

যে জিনিসটা চোখে পড়েছে তা ওর বুকের ভেতর থেকে সমস্ত রক্ত জমিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছে। এ কী করে সম্ভব?

ওর মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত অঙ্গ অসাড় হয়ে যায়। হাতদুটো ছেড়ে যায় লফট থেকে। শরীরটা আলগা হয়ে নেমে আসতে থাকে মাটির দিকে।

তখনও লুকোনো লফটের ভিতর নিথর, নিঃস্পন্দ, মৃত অবস্থায় একটা দেহ পড়ে আছে। দেহটা আর কারো নয়, মৌলির।