কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১৩

ত্রয়োদশ অধ্যায়

টিপটিপে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শীতকালের বৃষ্টি। গ্রামের লাগোয়া শ্মশান থেকে ভ্যানে চেপে ফিরছিল সায়ন। ভ্যানে ওর পাশেই বসেছেন পুরোহিত মাধব ভট্টাচার্য। একটু আগেই মৌলির মৃতদেহটাকে পুড়ে যেতে দেখল সায়ন। কালো ধোঁয়া ঘিরে ফেলেছিল আকাশ। সেই কালো ধোঁয়াই যেন মেঘ হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি নামালো।

শীতের বৃষ্টি বলে তার তীক্ষ্ণতা বেশি। চিতার শেষ আগুনটুকু তাতেই নিভে গেল। পুরোহিতমশাই নিজেই শেষকৃত্য করলেন। কী যেন মন্ত্রতন্ত্র পড়লেন। সায়ন ঠায় দাঁড়িয়েছিল শ্মশানের এক কোণে। ওর মনের ভিতর এক অদ্ভুত ঝড় উঠেছে। ও জানে মৌলি বেঁচে আছে, ওর ঘরে, ওর বিছানায় শুয়ে আছে নিরাপদে। অথচ ওর শরীরটা জ্বলছে!

সায়নের সমস্ত শরীরে অসহ্য ব্যথা। হাঁটাচলার শক্তি নেই। দোতলা থেকে নিচে পড়ে চোট লেগেছিল মাথায়। অন্তত আধঘণ্টা জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান আসতে খেয়াল করে পুলিশ মৌলির শরীরটা খুঁজে পেতে নিয়ে গেছে। অন্তত আটঘণ্টা আগে ছুরি দিয়ে বুকে আঘাত করে খুন করা হয়েছে তাকে। খুনের অস্ত্র আশেপাশে কোথাও পাওয়া যায়নি। মৌলিকে কে খুন করল সেই নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। দিলুজেঠুকে নাকি খুব জরুরি একটা কাজে কলকাতার বাড়িতে যেতে হয়েছে।

বাইরে দাঁড়িয়েই অপেক্ষা করছিল দুটো ভ্যান। তার একটায় চেপে বসল সায়ন আর মাধব ভট্টাচার্য। গ্রাম থেকে কয়েকজন লোক এসেছিল শ্মশানে। তাদের কেউ অন্য ভ্যানে উঠল, আবার কেউ পায়ে হেঁটে রওনা দিল।

ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে গ্রামের রাস্তার উপর দিয়ে চলেছে সায়নদের ভ্যানটা। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো নয়। মাঝে মাঝেই অসম্ভব দুলে উঠছে ভ্যানটা। মাধব ভট্টাচার্য ঝুলন্ত পা-দুটো কোনওরকমে তুলে নিলেন ওপরে। তার গায়ে একটা সাদা সুতির গেঞ্জি। কাঁধের গামছাটা দিয়ে একবার ভেজা মুখটা মুছে নিলেন তিনি। মাথাটা নিচের দিকে নামিয়ে রেখেই বললেন, ‘মেয়েটা ভালো ছিল হে…এমন নির্মমভাবে ওকে খুন করে…’

সায়ন কিছু বলল না। ওর এক্ষুনি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু মৃতদেহটা ওই যেহেতু প্রথম দেখেছিল তাই থানায় হাজিরা দিতে হয়েছে, সেখান থেকে বডি পোস্টমর্টেম করে পুড়িয়ে একেবারে বাড়িমুখো যাত্রা করেছে। ওর জলে ভেজা মুখে ঠিক কোন অনুভূতি খেলা করছে, দেখা যাচ্ছে না।

‘তোমার সঙ্গে তো পরিচয় ছিল, তাই না?’

‘সেরকম নয়, কিছুই জানতাম না প্রায়। আচ্ছা, ওরা মৌলিকে কোথা থেকে তুলে এনেছিল? ওর বাড়ি থেকে?’

মাথা নাড়েন পুরোহিতমশাই, ‘না, প্রভাকর বলেছিল ওরা নাকি গঙ্গার কাছে জবাব চাইতে গেছিল রাতেরবেলা। মৌলি রুখে দাঁড়ায়। ও কিছুতেই দেখা করতে দেয়নি। শেষে উপায়ান্তর না দেখে রাগের মাথায় ওরা মৌলিকেই তুলে আনে…’

সায়ন ঠোঁট কামড়ে ধরে, তারপর জিগ্যেস করে, ‘এদের মা মেয়েকে আপনি নিজের চোখে একসঙ্গে কখনও দেখেছেন?’

কী যেন একটা ভাবেন পুরোহিতমশাই, বলেন, ‘মনে তো হয় না। গঙ্গাকে ছেলেবেলায় দেখতাম। তখন মৌলি তো ছিল না। মৌলি আসার পর থেকেই গঙ্গা আর বাড়ি থেকে বেরোত না। কেন বলো তো?’

সায়ন প্রশ্নটার উত্তর দেয় না। উল্টে জিগ্যেস করে ‘যারা অসুখ নিয়ে গঙ্গার কাছে আসত তাদের মধ্যে অনেকে ভেতরে গিয়ে তো গঙ্গাকে সশরীরে দেখত, তাই না?’

‘তেমনটাই তো শুনেছি…’

‘সে সময় মৌলি বাইরে বসে থাকত?’

‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি কী সন্দেহ করছ বলো তো?’

সায়ন মাথা নাড়ায়। ওর যে কী সন্দেহ করা উচিত তা ও নিজেই বুঝতে পারছে না। একটা মানুষ যাকে ও নিজের ঘরে নিজের হাতে তালা বন্ধ করে রেখে এসেছে, যাকে স্পর্শ করে এসেছে, সে কী করে আরেক জায়গায় মৃতদেহ হয়ে শুয়ে থাকতে পারে? যদি মৌলি মারা গিয়ে থাকে তাহলে ওর ঘরে যে আছে সে কে? আর যদি না মারা গিয়ে থাকে তাহলে যাকে ওরা দাহ করে এল তার পরিচয় কী?

‘আপনি অলৌকিকে বিশ্বাস করেন পুরোহিতমশাই?’

মাধব ভট্টাচার্য হাসেন, ‘অলৌকিকে যদি বিশ্বাস না করতাম তাহলে পুরোহিত হতাম কেন বলুন? আমাদের চারপাশে ঈশ্বর যেমন আছেন, শুভশক্তি যেমন আছে, তেমন অশুভ শক্তিও নিশ্চয়ই আছে…’

‘যেমন? ডাইনি?’

দুপাশে মাথা নাড়ান পুরোহিতমশাই, ‘এত বছর ধরে এত হাজার হাজার মেয়েকে ডাইনি সন্দেহে যে শক্তি পুড়িয়ে মারে তাকে অশুভ শক্তি বলে…’

সজোরে একটা ঝাঁকুনি খায় ভ্যানটা। সায়নের মাথাটা ঝনঝনিয়ে ওঠে। মাথায় হাত দিয়ে একটা শব্দ করে ও। মাধব ভট্টাচার্য ওর মাথায় হাত রাখেন, ‘তোমার শ্মশানে আসা উচিত হয়নি। বারণ করেছিলাম, শুনলে না তো…’

মাথা থেকে হাতটা সরিয়ে নেয় সায়ন, তারপর ক্লান্ত গলাতেই বলে, ‘আমার মনে হয় এই গ্রামে কিছু একটা হচ্ছে। আজ থেকে নয়, অনেক দিন আগে থেকে। শুধু আমরা সেটা বুঝতে পারছি না।’

স্মিত হাসি খেলে যায় পুরোহিতমশায়ের মুখে। বৃষ্টির জলে ভিজে তার মাথার টাক আরও বেশি চকচক করছে। গরুর গাড়ি দুলনিতে শরীরটা দুলছে। কোনওরকম একটু সামলে নিয়ে বসলেন তিনি।

সায়ন প্রশ্ন করে, ‘একটা ব্যাপার ভারি অদ্ভুত লাগছে জানেন?’

‘কী?’

‘গোটা গ্রাম এখন বিশ্বাস করে যে গঙ্গা আর মৌলি খুনগুলো করেছে। আপনি কোনওদিনও গঙ্গার কাছে যাননি, গঙ্গার কাছে আপনার কোনও প্রয়োজনও নেই, কিন্তু তাও আপনি এটা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে গঙ্গা বাচ্চাগুলোকে চুরি করেছে?’

পুরোহিতমশাই প্রশ্নটার উত্তর দেন না। মাটির উপর চাকার আওয়াজ আর সেই সঙ্গে বৃষ্টির শব্দ বেড়ে উঠে।

‘আপনি যা বলছেন তার থেকে বেশি কিছু জানেন আপনি, তাই না?’ সায়ন আবার প্রশ্ন করে।

উপরে নিচে মাথা নাড়ান মাধব ভট্টাচার্য, ‘গঙ্গা ডাইনি কিনা জানি না। কিন্তু হলেও আমার মনে হয় না সেটা খুব অপরাধের কিছু হত…’

‘মানে? কী বলতে চাইছেন?’

মাধব ভট্টাচার্য কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। সায়ন বুঝতে পারে তার ভিতরেও মেঘ জমে আছে। বহুদিনের জমা মেঘ। আজ বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়বার আগে একটুখানি স্তব্ধ হয়ে আছে সমস্ত কিছু।

‘আজ থেকে প্রায় বছর চল্লিশেক আগের কথা। আমার বয়স তখন পনেরোর আশেপাশে। গঙ্গারও তাই। ভারি মিষ্টি দেখতে ছিল ওকে। নরম মুখ, ভোরের আলোর মতো স্নিগ্ধ একটা মেয়ে। একটু মুখচোরা। খানিক ভীতু হয়ত। গ্রামের দিকে সে বয়সে তখন মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। গঙ্গার কিন্তু বিয়ে করার কোনও ইচ্ছা ছিল না। গ্রামোফোনে গান শুনত সে, বই পড়ত, আর জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়াত। এ ছাড়া জগতের আর কোনও কিছুর প্রতি টান ছিল না তার।

গঙ্গার প্রতি দৃষ্টি ছিল অনেকের। সুন্দরী অবিবাহিত মেয়ে স্বাধীন হয়ে ঘুরে বেড়ালে আর পাঁচটা সমাজে যা হয় তাই হল। কিছু খারাপ লোকের দৃষ্টিতে পড়ে গেল…’ কথাটা বলে একটু দম নিলেন পুরোহিতমশাই। চোখ নেমে এল মাটির দিকে।

‘এরকমই কোনও শীতের রাত। আমি মন্দির থেকে ফিরছি পায়ে হেঁটে। সেদিন গঙ্গার বাড়ির সামনে দিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম একটা চাপা চিৎকারের শব্দ আসছে।

আমি আর একটু এগোতেই দেখতে পেলাম গ্রামের জনাচারেক লোক মিলে চ্যাংদোলা করে গঙ্গাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ওকে মারছে, কনুই দিয়ে গলা চেপে ধরেছে। আমি ওদের পিছু নিলাম। দেখলাম জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে ওরা। তখনও বুঝতে পারিনি কী উদ্দেশ্য ওদের…

জঙ্গলের ভিতরে গঙ্গার নিজের হাতে তৈরি করা একটা ছাউনি আছে। মাঝে মাঝে রাতের দিকে সেখানে গিয়ে বসে থাকত ও। লোকগুলো ওখানেই নিয়ে গেল গঙ্গাকে। তারপর ওকে মেরে মেরে অবশ করে ওর জামাকাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলে দিল…তারপর একজন একজন করে…’

পুরোহিতমশাইয়ের গলা বুজে আসে, ‘আমি সেদিন গাছের আড়াল থেকে সবটা দেখেছিলাম, কিন্তু কিছু করতে পারিনি ভাই, ওরা ওখানেই গঙ্গাকে ফেলে রেখে চলে গেছিল। আধমরা অবস্থায়। ওরা চলে যেতে আমি পায়ে পায়ে ওর কাছে গিয়ে বসেছিলাম…গঙ্গা কোনওরকমে গোঙাচ্ছিল। বনের জন্তুগুলো সেদিন সবাই এসে জড় হয়েছিল ওই ছাউনিটার আশেপাশে। সেদিন ওরা সবাই কাঁদছিল, জানো? আর…আর আমিও…’ পুরোহিত মাধব ভট্টাচার্যের চোখ দিয়ে জলের ধারা নামে। বৃষ্টির ফোঁটার সঙ্গে মিশে যায় সেই জল।

‘ভেবেছিলাম ও বাঁচবে না। কিন্তু গঙ্গা বেঁচে গেল। আমিই ওকে কোলে করে বাড়ি অবধি নিয়ে এসেছিলাম…তারপর ডাক্তার ডেকে…’

সায়নের কপালের পাশের রগগুলো দপদপ করতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড রাগে চলমান ভ্যানের উপরেই একটা ঘুষি মারে ও, ‘লোকগুলোর বিরুদ্ধে কেউ কিছু করেনি?’

‘কে করবে? একটা বিচারসভা বসেছিল গ্রামে। গঙ্গা কাউকেই চিনতে পারেনি…’

‘আর আপনি?’

‘অন্ধকার ছিল সেদিন। তাদের কারো মুখ দেখতে পাইনি। শুধু গলার আওয়াজটুকুনি এখনও শুনতে পাই…’ কথাগুলো বলে মুখ তোলেন মাধব ভট্টাচার্য, ‘চল্লিশ বছর আগের ঘটনা। তারা কেউ হয়ত আজ আর বেঁচে নেই…’

‘আপনি সেদিন গঙ্গার বাড়ির সামনে দিয়ে ফিরছিলেন কেন? মন্দির থেকে আপনার বাড়ি ফিরতে তো ওখান দিয়ে যেতে হয় না!’ সায়নের প্রশ্নে একটু থতমত খান পুরোহিতমশাই। মুখে কিছু বলেন না।

‘ও গ্রামোফোনে গান শুনত, বই পড়ত এগুলো তো আপনার জানার কথা নয়, অথচ আপনি…’ কথাটা শেষ হতেই সায়নের গলার সুর পাল্টে যায়, ‘আপনি গঙ্গাকে ভালোবাসতেন, তাই না?’

মৃদু স্বরে মেঘ ডেকে ওঠে। কিছু বলার সুযোগ পান না পুরোহিতমশাই। তার আগেই ভ্যানটা এসে দাঁড়িয়েছে দিলীপ দস্তিদারের বাড়ির সামনে। সায়নকে ধরে ধরে ভ্যান থেকে নামান পুরোহিতমশাই। ওকে বাড়ির সিঁড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে আবার উঠে পড়েন ভ্যানে।

‘দাদা, কী হয়েছে গো তোমার?’

কুসুম ছুটে এসে সায়নের একটা হাত চেপে ধরে। সায়ন হাত তুলে আশ্বস্ত করে ওকে, ‘একটু পড়ে গেছি, কোনও ব্যাপার না।’

‘চলো আমি তোমাকে ঘরে দিয়ে আসি।’

সায়ন নিরস্ত করে তাকে, ‘আমি একাই চলে যাব। তুই ভিতরে যা এখন।’

কাকভেজা অবস্থাতেই দোতলায় গিয়ে নিজের ঘরের চাবি খুলে আবার দরজাটা বন্ধ করে দেয় সায়ন।

খাটের উপর দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে মৌলি। দেখে বোঝা যায় একটু আগেই স্নান করেছে। গায়ে একটা ফিনফিনে সুতির জামা আর ট্রাউজার। মাথার চুল খোলা। কোথা থেকে যেন অদ্ভুত মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে।

সায়নের দিকে তাকিয়েই তার মুখে একটা আনন্দের হাসি খেলে যায়। ভুরু তুলে বলে, ‘এই যে! আপনি জানেন না ঘরে একটা মেয়ে থাকলে নক করে ঢুকতে হয়!’

সায়নের শরীর ঝিমিয়ে আসে, তাও ও গলায় জোর এনে বলে, ‘কে? কে আপনি?’

‘যে ঘরে ঢোকে তাকে পরিচয় দিতে হয়। যে ঘরে ছিল তাকে নয়…’

সায়ন খোঁড়াতে খোঁড়াতেই এগিয়ে যায় ওর দিকে, ‘আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার এক্ষুনি চাই। আধঘণ্টা আগে আপনার এই শরীরটা আমি শ্মশানে চিতার আগুনে পুড়ে যেতে দেখেছি। তাহলে আপনি কে?’

‘আমরা যা দেখি তার সবকিছুই কি সত্যি হয়?’ কথাটা বলেই বিছানা থেকে উঠে পড়ে মৌলি। ওর ঠিক পাশেই একটা গামছা রাখা ছিল। সেটা নিয়ে সায়নের দিকে এগিয়ে আসে। গামছাটা মাথার উপর রেখে ওর মাথাটা মুছিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘দেখুন তো, একেবারে ভিজে গেছেন আপনি। এই গ্রামে-গঞ্জে এসে ঠান্ডা লাগলে যত্ন নেবে কে? আপনার দিলুজেঠু?’

হঠাৎই মৌলির মৃত মুখটা মনে পড়ে যায় ওর। বুকের ভেতরটা ডুকরে ওঠে। চোখদুটো নিশ্চল। মুখটা খোলা। একটু স্পর্শ করতে পেরেছিল ও। সমস্ত শরীর জুড়ে একটা গভীর শীতলতা…শিউরে উঠেছিল সায়ন! কেমন কান্না পেয়ে যায় ওর। দুহাতে আঁকড়ে ধরে মৌলিকে, ‘আমার খুব কষ্ট হয়েছে মৌলি, তোমাকে ওইভাবে দেখব আমি কোনওদিন ভাবিনি। তুমি যেই হও, আমি তোমাকে হারাতে পারব না…’

শক্ত হাতে ওর মাথাটা ভালো করে মুছিয়ে দেয় মৌলি। তারপর বুক থেকে ওর মুখটা তুলে ধরে থুতনিতে আঙুল রাখে। ওর কপাল চোখ নাক চিবুক স্পর্শ করে যায় মৌলির চোখের দৃষ্টি, ও বলে, ‘তোমার প্রশ্নের উত্তর জানার কৌতূহলের থেকেও বেশি আটকে রাখতে চাও আমাকে, তাই না?’

‘আমার কোনও প্রশ্নের উত্তর চাই না। শুধু বলো তুমি আমাকে…’

‘ভালোবাসি কিনা?’ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মৌলি। ওর একটা হাত সায়নের বুকের উপর নেমে আসে।

‘না, তুমি বেঁচে আছ কিনা!’

মৌলি উত্তর দেয় না, ওর বুকে মাথা রেখে বলে, ‘ভালোবাসা আর বেঁচে থাকা কোনটা অলৌকিক সায়নবাবু? আমি বেঁচে আছি এটা অলৌকিক, নাকি আমি ভালোবাসি এটা অলৌকিক?’

সায়নের ঠোঁট কাঁপে, ‘তুমি কী বলছ আমি কিছু বুঝতে পারছি না…’

‘পারবে। কয়েকদিনের মধ্যেই পারবে। জানো, তোমার সঙ্গে চিরকাল থাকতে পারব না। কিন্তু তোমার সব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোথাও যাব না আমি…’

ওর হাত ধরে ওকে জানালার সামনে টেনে নিয়ে আসে মৌলি। তারপর একটা হাত বাড়িয়ে দেয় বাইরের দিকে। টিপটিপে বৃষ্টির ফোঁটা ওর ফর্সা হাতে পড়ে আবার চুঁইয়ে পড়তে থাকে মাটির দিকে। দুজনের হাত একে অপরের উপর আশ্রয় নেয়। জলের ফোঁটা যেন সম্পৃক্ত করতে চায় দুটো হাতকে।

‘আচ্ছা কাল আমাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবে?’ মৌলির গলায় অনুনয়ের সুর।

‘বাইরে? কোথায়?’

‘আমাদের সেই রকেটটার কাছে? খুব দেখতে ইচ্ছা করছে ওটা।’

‘কী করবে ওখানে গিয়ে?’

‘রকেট নিয়ে যা করে মানুষ, অন্য জগতে পাড়ি দেয়…’

সায়ন হাসে, ‘আর কেউ যদি দেখে ফেলে তোমাকে? এ গ্রামে ডাইনি ছিল, এবার ভূতের গুজব রটবে।’

‘তোমার এমন কোনও জামা নেই যাতে মুখ ঢাকা যায়? বলো নিয়ে যাবে না?’

উপরে নিচে মাথা নাড়ে সায়ন। ওর মনে হয় মৌলি সত্যি বশ করেছে ওকে। ও কাছে থাকলে নিজের ইচ্ছায় চলতে পারে না। যত কাছে আসে তত অক্ষম মনে হয় নিজেকে।

‘তোমার মায়ের সঙ্গে কী হয়েছিল আমি জানি…’ ফিসফিসে গলায় অপরাধীর মতো বলে সায়ন।

‘শুধু একটা জানো?’ ব্যাঙ্গের হাসি হাসে মৌলি, ‘ভুলে যাও ওসব, তোমাকে শান্ত করে দিই?’

সায়নের ঠোঁট দুটো মৌলির গলার কাছে এসে আশ্রয় নেয়। সেই পরিচিত সুরটা গুনগুন করে মৌলি।

‘চোখ বন্ধ করো…’ ফিসফিসে গলায় নির্দেশ আসে, ‘আমাকে অনুভব করতে পারছ সায়নবাবু? দেখো তো…’

দুহাত দিয়ে মৌলির শরীর স্পর্শ করে সায়ন। এখন অদ্ভুত শিহরন ছড়িয়ে যাচ্ছে ওর শরীরময়। গলা, ঘাড়, পিঠ, কোমর সব জায়গায় অজানা শীতলতা এসে ভর করছে। এ শীতলতা মৃত্যুর নয়…প্রশান্তির…

সায়নের মনে হয় ও যেন জন্ম থেকে স্পর্শ করে আছে এই শরীরটা। ওর হাতটা মৌলির মুখে উঠে আসে। ওর ঠোঁটের উপর আঙুল রাখে সায়ন। বৃষ্টি ভেজা জলে মৌলির গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট ভিজে আছে।

‘বেঁচে থাকাটা অলৌকিক সায়নবাবু। এই পৃথিবীর সব বেঁচে থাকা অলৌকিক। বেঁচে থাকা আর ভালোবাসা আলাদা কিছু না…’

একটিমাত্র শব্দ সায়ন চিনতে পারে। এই অলৌকিক গ্রামে এই রক্তাক্ত পটভূমিতে, হাজার হাজার উত্তরহীন প্রশ্নের মাঝে একটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যায় সায়ন। সে ধীরে ধীরে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় মৌলির ঠোঁটে। বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ বেড়ে ওঠে। মৌলির চুল চুঁইয়ে জল পড়তে থাকে মেঝেতে। একসময় সেটাও মিশে যায় সায়নের শরীরে। জননীর গর্ভের মতো নিরাপত্তা এসে গ্রাস করে নেয় সায়নকে। বাইরে ওদের হাত এখনও ভিজতে থাকে। সায়নের মনে হয় ওর আত্মাকে শরীর থেকে টেনে বার করে সে জানলা দিয়ে কোথায় যেন ভাসিয়ে দিয়েছে মৌলি। একটু আগে ঠিক যেভাবে ওর মৃতদেহটা ছিল, সেইভাবে ওদের প্রাণহীন দুটো শরীর ডুবে থাকে…

* * * *

‘বুকের কাছে একবার স্ট্যাব করা হয়েছে…’ রিপোর্ট পড়ে নিয়ে সেটা টেবিলের উপরে রেখে বলল সঞ্জয়। আজ স্যারকে ভয়ানকরকম হতাশ দেখাচ্ছে, মেজাজটাও তিরিক্ষি হয়ে আছে। ওর ঠিক উল্টোদিকেই বসে আছেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। তিনি আগেই চোখ বুলিয়ে নিয়েছেন রিপোর্টে। গালে হাত রেখে বললেন, ‘তার মানে কি দাঁড়াচ্ছে তাহলে?’

‘কাল ওই লোকগুলোর হাত থেকে গঙ্গাই ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এবং তারপর ভুলিয়েভালিয়ে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওকে খুন করে। খুন করে রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়…’

‘হুম, প্রশ্নগুলো কিন্তু থেকেই যাচ্ছে সঞ্জয়। ওইভাবে দুটো মানুষকে গঙ্গা মারল কী করে, এবং দ্বিতীয় কথা তার মতো বয়সের এক মহিলা ওই উঁচু লফটে একটা মানুষের দেহ লুকিয়ে রাখল কী করে? তাছাড়া যদি গঙ্গা ওকে খুন করবে ভেবেই থাকে তাহলে নিয়ে যাওয়ার কী দরকার ছিল? ওখানেই তো খুন করে রেখে আসতে পারত…’

‘স্যার রিপোর্ট কিন্তু বলছে খুন ওখানে হয়নি। হয়েছে অন্য কোথাও। এবং সম্ভবত মাটিতে। খুন করার পর ওর বডিটা তুলে নিয়ে গিয়ে উপরে রাখা হয়েছে। যার জন্য লফটের মধ্যে রক্তের ট্রেস কম…’

‘তোমার কী মনে হয়?’

‘হয়তো প্রথমে খুন করবে ভাবেনি। বাড়ি ফিরে মেয়েটি বলে যে সে সব গোপন কথা ফাঁস করে দেবে। তখন তাকে বুকে ছুরি মেরে খুন করে। তারপর অন্য কাউকে দিয়ে লাশটা…’

টেবিলের উপরে পড়ে থাকা পেপারওয়েটটা ঘোরাতে ঘোরাতে গাঙ্গুলী বললেন, ‘মেয়েটি যদি সব কথা বলেই দিতে চাইত, তাহলে সারারাত অত্যাচার সহ্য না করে অনেক আগেই বলে দিতে পারত। কখন ওর মা ওকে উদ্ধার করবে, তারপরে গিয়ে বলবে। এটা একটু অসম্ভব লাগছে না?’

রিপোর্টটা ছেড়ে একটু পিছিয়ে বসেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। তারপর বলেন, ‘না হে সঞ্জয়, গঙ্গা না ধরা পড়া অবধি কিছু করা সম্ভব নয়। তার কোনও খোঁজ?’

উল্টোদিকের দেওয়ালের কাছে একজন কনস্টেবল দাঁড়িয়েছিল। সে এবার দু-পা এগিয়ে এসে মুখ তুলে বলে, ‘স্যার গ্রামের ক’টা লোক বলেছে তারা নাকি জঙ্গলের দিকে গঙ্গাকে হেঁটে যেতে দেখতে পেয়েছে…আর তাছাড়া গ্রামের একটা বছর পনেরোর ছেলে উধাও হয়েছে, তাকেও নাকি গঙ্গাই নিয়ে গেছে…’

‘বছর পনেরো!’ গাঙ্গুলীর ভুরু কুঁচকে যায়, ‘এটা তো প্রোফাইলের সঙ্গে মিলছে না…নাম কী?’

‘মণিকান্ত মণ্ডল। বাড়ির লোক বলছে সে নাকি মাঝেমধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক চলে যেত। মা-বাপ মরা ছেলে স্যার। কাল রাতেও গেছিল কিন্তু তারপর আর ফিরে আসেনি…’

সঞ্জয় আর একটা রিপোর্ট গাঙ্গুলীর সামনে ফেলে বলেন, ‘এটা দেখুন স্যার, সমীরণ মিত্রর রিপোর্ট…’

ইদানীং একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছে সঞ্জয়। স্যার এই কেসে কিছু বিশেষ বিশেষ লিডকে একেবারেই চেজ করছেন না, যেন সেগুলোর অস্তিত্ব দেখতে পাচ্ছেন না। ও কয়েকবার মনে করানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু তার উল্টে ওর উপর খেপে গিয়ে দুকথা শুনিয়ে দিয়েছেন। যেমন এই সমীরণ মিত্রের যার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তার কাছ থেকেই একটা লিড নিয়ে এসেছিল সঞ্জয়। স্যার দেখেও দেখলেন না যেন।

‘গঙ্গার বাড়িতে পাওয়া ছুরির সঙ্গে ব্লাড স্যাম্পেল মিলছে?’

বিমর্ষ মুখে মাথা নাড়ে সঞ্জয়, ‘সেটাই আশ্চর্যের স্যার। গঙ্গার ছুরিতে কোনও ব্লাড স্যাম্পেলই নেই। ও দিয়ে কাউকে খুন করা হয়নি…’

‘তাহলে মিত্র খুন হল কী দিয়ে?’

ফাইল থেকে একটা বিশেষ কাগজ ইন্সপেক্টরের দিকে এগিয়ে দেয় সঞ্জয়, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে প্রচণ্ড রাগের বসে শক্তিশালী হাতে ছুরি মারা হয়েছে। ছুরিটা অন্তত ফুট দেড়েক লম্বা আর অবিশ্বাস্য ধারাল। হাড়গুলোকে বিলকুল মাখনের মতো কেটেছে! আরও একটা জিনিস গোলমাল লাগছে…’

‘কী গোলমাল?’

‘স্যার মোটামুটি গোটা স্ট্যাবিংয়ের ঘটনাটা ঘটেছে বড়জোর দেড় কি দু-মিনিটের মধ্যে। মোট পঁয়তাল্লিশবার আঘাত। দেড়শ সেকেন্ডের মধ্যে দুটো মানুষকে পঁয়তাল্লিশবার ছুরি মারা মুখের কথা নয় স্যার। খুনি শরীরে অসম্ভব শক্তি ধরে এবং যতদূর সম্ভব তার দুহাত সমান চলে…’

‘অর্থাৎ খুনি একটি দানো…’ বিড়বিড় করেন ইন্সপেক্টর।

সঞ্জয় অনেকক্ষণ ধরে একটা কথা বলার জন্য উশখুশ করছিল, এবার সে মুখ ফুটে বলেই ফেলে, ‘আমার যতদূর মনে হচ্ছে গঙ্গা সোসিওপ্যাথ বা সিরিয়ালকিলার। বিভিন্ন সময়ে নানানরকম মানসিক ট্রমা থেকে এ ব্যাপারটা জন্মায়। তাছাড়া ওর বাড়িতে যে সমস্ত বইপত্র আছে সেগুলো পড়ে দেখা যাচ্ছে ডাইনিদের নিয়ে পড়াশোনা ছিল। সেখান থেকেই হয়ত ওর নিজের ভেতরে ডাইনি হয়ে ওঠার একটা টেন্ডেন্সি জন্মায়। হয়ত ডাইনিদের মতো, সন্দেহের বশে ওর উপরেও কোনও টর্চার গোছের কিছু হয়েছিল। ব্যাপারটা সেখান থেকেই ঘটে। সঙ্গের মেয়েটি প্রথম থেকেই সবকিছু জানত। কিন্তু ভয়ে হোক কিংবা আনুগত্যে— এসব কথা কিছুই সে বলেনি। প্রশ্ন তাহলে কেবল দুটো থাকছে। এক, গঙ্গার গায়ে এমন অমানুষিক শক্তি এল কী করে, আর দুই সে এখন আছে কোথায়?’

বাইরে বৃষ্টির ঝিমঝিম শব্দ বেড়ে চলেছে। সারাটা বিকেল দরকারি কাগজপত্র আর ফাইল ঘেঁটেই কেটে যায় ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীর। কিছুতেই মাথার ভিতরে হিসেব মিলিয়ে উঠতে পারছেন না তিনি। নাওয়া খাওয়া মাথায় উঠেছে। প্যাকেটের পর প্যাকেট সিগারেট উড়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।

রাত খানিক বাড়তে ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী চেয়ে ছেড়ে উঠে পড়েন। ঠিক সেই সময় একজন কনস্টেবল ওনার ঘরে ঢুকে আসে।

‘গ্রামের একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। থানার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি…’

‘আমার সঙ্গে! নাম কী বলছে?’

‘বলছে গুপি।’

‘ও আচ্ছা! ঠিক আছে পাঠিয়ে দাও।’

কনস্টেবল বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট খানেকের মধ্যেই গুপি এসে চেয়ার টেনে বসে। এ থানায় প্রতিনিয়ত যাতায়াত আছে ওর। গাঙ্গুলীর নিযুক্ত করা খোঁচরদের মধ্যে গুপি একজন।

ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী ওর উল্টোদিকে বসে পড়েন। একটা সিগারেট অফার করে জিগ্যেস করেন, ‘ব্যাপার কী? বলছিলে কাল কীসব খবর দিতে আসবে?’

‘স্যার, ভেবেছিলাম কালকেই ভালো করে খোঁজ নিয়ে আসব, কিন্তু তার আগে আরও বড় একটা জিনিস জানতে পেরেছি স্যার…’ গুপির চোখেমুখে উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে। গাঙ্গুলী বুঝতে পারেন সত্যি বড়সড় কিছু একটা খবর পেটের ভিতর চেপে রেখেছে ও।

‘বেশ, ছোটটাই আগে বল…’

‘আজকে একটা জিনিস দেখতে পেলাম স্যার। আজ বিকেল বিকেলে গুপ্তদের বাড়ির খেজুর গাছে উঠতে বলেছিল ডাব পাড়তে। বৃষ্টি পড়ছিল, তাও উঠেছিলাম…’

‘তো? তাতে কী হয়েছে?’

‘আমি তখন একটা জিনিস দেখতে পেয়েছি স্যার। দিলুবাবুর দোতলার জানলার থেকে দুটো হাত বেরিয়েছিল। একটা ছেলেদের হাত একটা মেয়েদের হাত…’

‘তাতেই বা হয়েছেটা কী?’ ইন্সপেক্টর বিরক্ত হন।

‘ওখানে মেয়েদের হাত থাকার কথা নয় স্যার, ও ঘরে তো শুধু ওই নতুন যে ছেলেটা এসেছে সে একা থাকে…’

গাঙ্গুলী কথাটায় বিশেষ পাত্তা দেন না। কার না কার হাত দেখেছে তাতেই দুটো কাঁচা পয়সার লোভে চলে এসেছে।

‘আমি স্পষ্ট দেখেছি স্যার। একটা ছেলেদের হাত একটা মেয়েদের…’

ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দেন গাঙ্গুলী, ‘বেশ বুঝলাম, এছাড়া?’

গুপির মুখে একটা আদুরে হাসি খেলে যায়, ‘এই খবরটাই দেব বলে ভাবছিলাম আপনাকে…’

‘তো দেরি না করে তাড়াতাড়ি বলে ফেলো।’

বাঁ হাতটা টেবিলের উপর তুলে হাত দিয়ে একটু ইশারা করে গুপি। কিছু টাকার দরকার ওর। এই মুহূর্তে টাকার প্রেসার যাচ্ছে। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দুটো একশো টাকার নোট ওর দিকে এগিয়ে দেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। তারপর নিঃস্পৃহ গলায় বলেন, ‘বল এবার কী বলবি?’

টাকাটা পেয়ে খুশি হয় গুপি, একগাল হেসে ফিসফিসে শীতল গলায় বলে, ‘গঙ্গা কোথায় আছে আমি জানি না স্যার। তবে একটা কথা আপনাকে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।’

‘কী কথা?’

সতর্ক বিড়ালের মতো দৃষ্টিতে ঘরের এদিক-ওদিক তাকায় গুপি। তারপর গলা নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে, ‘মৌলিকে ওর মা খুন করেনি স্যার…’

‘তাহলে কে করেছে?’

‘পুরোহিতমশাই…’