কুয়াশার ফুল – ৪
চতুর্থ অধ্যায়
ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। আধো-অন্ধকারে ভরে আছে চতুর্দিক। ঝোপঝাড়ের উপর একটা নরম পায়ের হেঁটে আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটু দূরে কয়েকটা রঙিন প্রজাপতি সবে ডানা মেলতে শুরু করেছিল। তারা সেই আওয়াজে বিরক্ত হয় না, বরং আরও কিছুটা উড়ে আসে সেই আওয়াজ লক্ষ্য করে।
চারদিকে ছোট ছোট জংলি গাছ আর নানা জাতের অজানা বুনো ফুল ফুটে আছে। এই জায়গাটা ঠিক জঙ্গল নয়, জঙ্গল শুরু হওয়ার আগে কিছুটা ঝোপে ঘেরা এলাকা। একটু দূরেই একটা খাদ সোজা নিচের দিকে নেমে গেছে। তার ধার বরাবর কিছু আগাছা পাঁচিল তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
খুব বেশি লোকজন সচরাচর এদিকে আসে না। ফলে এখানকার উদ্ভিদের মধ্যে কিছু অচেনা আগন্তুক এসে মিশতে পারে। সদ্য ফোটা অচেনা ফুলগুলো যেন ভোরের অপেক্ষায় আকাশে উঁকি দিয়ে চলেছে ক্রমাগত।
হেঁটে আসা মেয়েটা আলতো করে হাত রাখে গাছের উপর। তার কোমল হাতের স্পর্শে যেন গাছগুলোর ঘুম ভাঙে। তারা চোখ মেলে তাকায় তার দিকে। তারপর নিশ্চিন্তে আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে।
মেয়েটার হাত থেকে একটা বেতের ঝুড়ি ঝুলছে। তার ভেতর আপাতত বেশ কয়েকটা ফুল। বিচিত্র রঙ তাদের। সাদা ফুলের নিচ থেকে মুখ বের করছে কয়েকটা অদ্ভুত নীলচে ফুল।
তবে ফুল তুলতে এখানে আসেনি মেয়েটা। ওগুলো ওর শখ। কিংবা খেয়াল। বুনো ঝাড়ের মাথা দুলিয়ে সে কিছু বিশেষ শিকড়ের খোঁজ করতে থাকে। একটু দূরেই যে গভীর খাদ নেমে গেছে তার একেবারে নিচে একটা ছোট্ট পুকুর। একবার মুখ বাড়িয়ে উঁকি মারে খাদের ভেতর। রোজ এখানে এসে খাদের ভিতর এইভাবে উঁকি মারে মেয়েটা। বুকের ভেতরটা ছমছম করে ওঠে। সেটুকুনিই উপভোগ করে।
ভোরের আলো ফোটেনি বলে এখনও অন্ধকার আছে, কেবল তার ঘনত্ব যেন জলে গুলে একটু পাতলা হয়েছে। কোনওরকমে পা পিছলে একবার নিচে পড়ে গেলে অন্তত হাত-পা ভাঙা অবধারিত। অথচ সাটকারা ফুলগুলো ফোটে একদম ওই খাদের ধারে। যেন ইচ্ছা করেই ওকে বিব্রত করার জন্য দুষ্টুমি করে ওরা। হাতছানি দিয়ে ডাকে ওদের কাছে। অন্যদিন ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসে। কিন্তু আজ আর ছেড়ে দিলে চলবে না। ও ঠিক আজ যেভাবেই হোক খাদের ধার থেকে তুলে আনবে সাটকারা ফুলগুলো।
বেতের ঝুড়িটা ঝোপের উপর নামিয়ে রেখে ধীরে ধীরে ওদিকে এগিয়ে যায় সে। লাল আর খয়েরি মেশানো মানুষের লম্বা আঙুলের মতো দেখতে আগাছা। আশেপাশে কিছু কাটাঝোপও আছে। সেগুলো থেকে হাতটা বাঁচিয়ে নেয় মেয়েটা। তারপর আরও কয়েক পা এগিয়ে যায় খাদের দিকে। হালকা শিস দিয়ে একটা গান করতে থাকে। কখনও ভয় পেলে মুখ দিয়ে এইভাবে শিস দেয় ও। তাতে বুকের ধুকপুকুনিটা একটু কমে আসে।
কোমর নিচু করে হাত বাড়িয়ে আলতো হাতে একটা শিকড়সুদ্ধ ফুল তুলে নেয়। হাতের মুঠোয় রেখে আবার আঙুল বাড়িয়ে দেয় অন্য একটা শিকড়ের দিকে। ঠিক এই সময় সামনে দিয়ে একটি রঙিন প্রজাপতি উড়ে যায়। অবাক হয়ে সেদিকে তাকায় মেয়েটা। কী অদ্ভুত সুন্দর রঙ প্রজাপতিটার! হলদে ডানার উপর সবুজ রঙের একটা কল্কা। তার ঠিক মাঝখানে একটা নীল বৃত্ত। অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকে সে। হঠাৎ ওর চোখের সামনে প্রজাপতির ডানাটা রঙিন থেকে ধীরে ধীরে কালো হয়ে আসতে থাকে। ডানার উপর বৃত্তটা পরিণত হয় একটা চোখে। চোখদুটো ওকে টানতে থাকে খাদের গভীরে। ঝাঁপ দিতে বলে…।
বুঝতে পারে অজান্তেই পা দুটো এগিয়ে যাচ্ছে খাদের কিনারায়। একটা পা মাটি থেকে উঠে আসে। পেছনে ঘাসের উপর একটা খসখসে আওয়াজ হয়। আর সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীরটা খাদের ধার বেয়ে নেমে আসতে থাকে নিচের দিকে। ওর হাত থেকে শিকড় খসে পড়ে। গান বন্ধ হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে নেয় ও…।
আর সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করে একটা শক্ত হাত এসে ওর কনুই খামচে ধরেছে। ওকে বাঁচিয়ে নিয়েছে খাদ থেকে নিচে পড়ার হাত থেকে। মানুষের শরীরের উত্তাপ পায় মেয়েটা। ঝাঁকুনি দিয়ে খাদে পড়ার আগেই কিনারায় আটকে যায় শরীরটা।
কয়েক সেকেন্ড সেই ভাবেই ঝুলে থাকে মেয়েটা। তারপর আচমকা হেঁচকা হাতের টানে খাদের কিনারা থেকে আবার সমতলের ওপর উঠে আসে।
ওর সমস্ত শরীর ততক্ষণে ধুলোয় ঢেকে গেছে। নিজের অজান্তেই পা দিয়ে কয়েকটা সাটকারার শিকড় মাড়িয়ে দিয়েছে। হাতে আর পেটের কাছে বেশ কয়েক জায়গায় ছড়েও গেছে। অপ্রস্তুত লাগে ওর। অজানা কেউ খাদে পড়া থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে ওকে। কিন্তু প্রজাপতিটা…!
মেয়েটাকে ইতস্তত করতে দেখে একটু হাসে সায়ন, ‘যে ফুল তুলতে যাচ্ছিলেন ঠিক ওরকমই একটা ওদিকটায় আছে।’
মেয়েটা কিছু বলে না। মাথা নিচু করেই সেইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। সায়ন হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলে, ‘কী দরকার এত রিস্ক নেওয়ার?’
‘আমি ঠিক জানতাম না। মনে হয় কাল রাতেই ফুটেছে।’
‘বেশ, আসুন এদিকটায় আসুন—।’ হাত দিয়ে একটু দূরের দিকে দেখায় সায়ন।
ঠান্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। গ্রামের দিকের ঠান্ডার তীব্রতা সম্পর্কে এতদিন ধারণা ছিল না ওর। একরকম প্রস্তুতি না নিয়েই ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছে ও। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই। গায়ের উপর একটা লাল রঙের উলের সোয়েটার চাপানো, মাথায় উলের টুপি। তাও থেকে থেকে হাত আর মুখের খোলা অংশ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
সায়ন অবাক হয়ে দেখে মেয়েটার গায়ে একটা সামান্য জামা। গ্রামের দিকের মানুষ হয়তো শীতে অভ্যস্ত। কিন্তু তা বলে এই ভোরবেলা কনকনে ঠান্ডায়…মেয়েটার ঠান্ডা লাগে না নাকি?
কচি ঘাসের উপর দিয়ে খসখস আওয়াজ তুলে ওরা হাঁটতে থাকে। সায়ন লক্ষ করে মেয়েটার মুখটা নিচের দিকে নামানো। লজ্জায় এতটাই কুঁকড়ে আছে যে গায়ের ধুলোটা ঝাড়ার কথাটাও মাথায় নেই। হাতে বেতের ঝুড়িটা কবজি থেকে দুলছে। তার ভেতর রঙিন ফুলগুলো এখনও আগের মতোই পড়ে আছে। ফুলগুলোর একটাও চেনে না সায়ন।
এখনও একটা বাক্য ছাড়া আর কোনও কথা বলেনি সে। ওকে এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য একটা ধন্যবাদ অবধি মনে করে বলে উঠতে পারেনি।
ভিতর ভিতর একটা অস্বস্তি শুরু হয় মেয়েটার। একেবারে কথা না বলা অভদ্রতা। কোনওরকমে ঢোঁক গিলে বলে, ‘আপনি এ গ্রামে নতুন?’
‘নতুন বলতে এই পরশুই এসেছি। ওই যে দিলুবাবু, উনি আমার বাবার বন্ধু হন।’
‘ও…’ কথাটা বলে যেন হঠাৎ করেই কথোপকথনটা শেষ করে দেয় মেয়েটা।
নীরবে বেশ কয়েক পা হেঁটে আসে ওরা, সায়ন বলে, ‘আপনি কী তুলছিলেন বলুন তো? মানে ফুলগুলো তোলার না হয় তাও একটা কারণ আছে। কিন্তু ওই আগাছাগুলো…’
‘চিকিৎসার জন্য।’
‘কবিরাজি চিকিৎসা? তা কী রোগের ওষুধ ওগুলো?’
মেয়েটা এবার হাসে। মাথা নিচু করেই বলে, ‘রোগ না, স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। যারা বেশি বেশি ভুলে যায় তাদের বেশি বেশি করে খেতে হয়।’
‘বাবা! আপনিই করেন চিকিৎসা?’
‘আমি করি না, আমার মা করে। আমি জোগাড়-যন্ত্র করে আনি। আগে মা নিজেই করত। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে তো…আপনি শোনেননি আমার মায়ের নাম?’
‘কী নাম বলুন তো?’
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মেয়েটা উত্তর দেয়, ‘গঙ্গা…’
সায়ন মাথা নাড়ে, ‘হ্যাঁ, শুনেছি বটে। সত্যি বলতে কী, এই কবিরাজি, হোমিওপ্যাথি এসব চিকিৎসায় আমার তেমন একটা ভরসা নেই।’
কথাটা বলে একবার আড় চোখে মেয়েটার দিকে তাকায় সায়ন। ভেবেছিল ও বুঝি রুষ্ট হবে, তার বদলে ও অবাক হয়ে দেখে মেয়েটার মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে যায়।
উৎসাহিত হয়ে বলে, ‘আমারও মায়ের সব কিছুতে বিশ্বাস হয় না। কত কিছুই তো বলে। আমি শুনে যাই খালি। কিন্তু এ গ্রামের সবাই বিশ্বাস করে।’
‘আপনি বিশ্বাস করেন না যখন এসব করেন কেন?’
মেয়েটা মলিন মুখে হাসে, ‘আমার তো মা ছাড়া আর কেউ নেই। কাজ না করলে খাব কী করে?’
মেয়েটার কথার মধ্যে কেমন যেন একটা মায়া আছে। সায়ন একবার সরাসরি মুখ তুলে তাকায় তার দিকে। রোগাটে গড়ন, গায়ের রং ফর্সার দিকেই। কেমন যেন ফ্যাকাসে ভাব। সম্ভবত রক্তাল্পতায় ভোগে। কপালের উপর যেখানে চুল শুরু হচ্ছে ঠিক সেখানে একটা হালকা কাটা দাগ। পাতলা গোলাপি ঠোঁট।
এই মুহূর্তে ভোরের নতুন আলো পড়ে ভারি মায়াবী দেখাচ্ছে তাকে। মেয়েটার চেহারার মধ্যে কোথায় যেন একটা লাজুক কোমলতা আছে। সায়নের মনে হয়, কোনওদিন কোনও কারণে কেউ এই মেয়েটাকে খুব জোরে বকাবকি কিংবা গালমন্দ করতে পারবে না। এক ধরনের মানুষ থাকে না, যাদের ধমক দিয়ে পরে নিজেরই খারাপ লাগে, খানিকটা সেই রকম।
‘যে জিনিসে বিশ্বাস করেন না, তার জন্য এত ভোরে এভাবে বনেবাদাড়ে ঘুরে না বেড়ানোই ভালো।’ সায়ন ওর মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে।
‘আপনিও তো ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন…’
শব্দটার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ ছিল। সেটা গায়ে মেখে মজাই পায় সায়ন। বলে, ‘আসলে আমি ছোট থেকে গ্রাম দেখিনি তো, শুনেছি ভোরবেলা গ্রামের খোলা মাঠে সূর্য ওঠা দেখতে নাকি ভীষণ ভালো লাগে। কুসুমকে জিগ্যেস করতে বলল, এখান থেকে সূর্য ওঠা দেখা যায়।’
‘সূর্য! এখানে!’ মেয়েটা যেন সায়নের বোকামিতে ভীষণ আমোদ পায়, ‘ধুর, আসল সূর্যোদয় মাটি থেকে দেখা যায় না। দেখতে হলে রকেটে উঠতে হয়।’
‘রকেট! সে এই গ্রামে কী করে পাব?’ সায়ন অবাক হয়ে জিগ্যেস করে।
‘চাইলেই পাওয়া যায়। সবকিছু কি আর কুসুম জানে?’
‘বেশ, তাহলে আপনিই বলুন।’
‘রকেট দেখতে গেলে বাসুদেবের মাঠে যেতে হবে।’
সায়ন বোঝে এতক্ষণে মেয়েটা একটু স্বাভাবিক হয়েছে। প্রাথমিক লজ্জার ভাবটা কেটে গেছে। সে সামনে থেকে একবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলে, ‘বটে! আপনি এ গ্রামের সব আটঘাট চেনেন দেখছি। ছোট থেকেই এখানে আছেন নাকি?’
‘না, ছোট থেকে নয়। কিন্তু আমি ঘুরে ঘুরে বেড়াই, তাই সব চেনা হয়ে গেছে।’
‘শুধু এইগুলোই দেখতে পাননি আর কী…’ সায়ন হাত তুলে সামনের ঝোপটা দেখায়, ‘এই যে আপনার সেই লাল শেকড়। তুলে নিন ক’টা? দেখুন স্মৃতিশক্তি কত ফেরে—।’
ঝুড়িটা পাশে নামিয়ে রেখে হাঁটু গেড়ে মাটির উপর বসে পড়ে মেয়েটা। তারপর মাটির ওপর ফুটে থাকা লালচে খয়েরি শিকড়গুলোর উপর আলতো করে হাত বোলায়। যেন ওদের মাটি থেকে উপড়ে নেবার আগে আদর করছে। ব্যাপারটা ভারি ভালো লাগে সায়নের। অজান্তেই একটা হাসি ফুটে ওঠে ওর মুখে।
মেয়েটা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি হাসছেন কেন?’
‘আমি আজ অবধি কাউকে তোলার আগে ফুলকে আদর করতে দেখিনি। আপনি ফুল খুব ভালোবাসেন, তাই না?’
মেয়েটা আবার মুখ নামিয়ে নেয়। বলে, ‘বাসি, কিন্তু ওকে ভালোবাসি বলে আদর করছি না। করছি নিজের জন্য।’
‘নিজের জন্য?’
পাশ থেকে মাটি সরাতে সরাতে মেয়েটা বলে, ‘যারা ফুল তোলে, পাঁঠা-মুরগি কাটে কিংবা ধরুন যারা ফাঁসুড়ে, তাদের কাছে দিনের পর দিন খুন করতে করতে বেঁচে থাকা প্রাণের মরে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক সহজ হয়ে যায়। তাদেরও ব্যথা লাগে কষ্ট হয়, সেই সহানুভূতিটা নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমি খুন করার আগে একটু আদর করে নিই। যাতে প্রত্যেকবার ফুল তোলার আগে সেই কষ্টটা হয়।’
‘তা শিকড়বাকড় আর ফুল ছাড়া আর কী খুন করেছেন আপনি?’
হাসির ছলে সায়ন জিগ্যেস করেছিল কথাটা। কিন্তু তাতেই হঠাৎ করে একটা পরিবর্তন আসে মেয়েটার মধ্যে। এই প্রথম দুটো উজ্জ্বল চোখ তুলে সায়নের দিকে তাকায় সে। একটা অদ্ভুত হাসি হাসে। এতক্ষণ মেয়েটাকে এইভাবে হাসতে দেখেনি সায়ন। দাঁত দেখা যায় না, কেবল ঠোঁটের দুটো কোণ কানের দিকে অল্প একটু প্রশস্ত হয়। সেই রকম হাসি হাসি মুখেই বেশ কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা। সায়নের মনে হয় ও ধীরে ধীরে ক্ষমতা হারাচ্ছে, সে ক্ষমতা দখল করছে মেয়েটা। এই মুহূর্তে নিজের অস্তিত্ব হয়ে যাচ্ছে ছোট, আর মেয়েটার উপস্থিতি ক্রমশ একটা দৈত্যের আকৃতি ধারণ করে মুখ নিচু করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
‘আমার নাম মৌলি…আপনার?’ ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটা। শীতল মাটিমাখা স্পর্শ ওর হাত ছুঁয়ে যায়।
‘সায়ন…সায়ন মজুমদার…’
মাথা নিচু করে একটা শিকড় উপড়ে ঝুড়িতে রাখে মেয়েটা। আশ্চর্য ব্যাপার। এতক্ষণ যে স্বাভাবিক লজ্জা আর সংকোচ ছিল মৌলির মধ্যে সেটা এখন সম্পূর্ণ উধাও।
‘কাল ভোরবেলা তাহলে এখানে চলে আসবেন। আপনাকে বাসুদেবের মাঠে রকেট থেকে সূর্য দেখাতে নিয়ে যাব, কেমন?’
ভারি আশ্চর্য লাগে সায়নের! যে কথাটা বলতে ও নিজেই ইতস্তত করছিল সেটা মেয়েটা কেমন সহজভাবে বলে ফেলল। খেয়াল করল মৌলি শিকড়গুলো মোটেই আলতো হাতে তুলছে না। বরঞ্চ মাটির বুক থেকে যেন এক ঝটকায় উপড়ে ফেলছে সমূলে। ওর চোখ দুটো আগের থেকে বড় দেখাচ্ছে। সতর্ক বিড়ালের মতো। কোন অজানা কারণে সায়নের বুকের ভেতরটা ছমছম করে ওঠে। কী ভীষণ অস্বাভাবিক লাগছে চারপাশটা।
শিকড়গুলো তুলে নিয়ে মেয়েটা উঠে পড়ে। তারপর আবার পেছনদিকে হাতের ইশারা করে বলে, ‘চলুন, আপনাকে এগিয়ে দিই।’
এতক্ষণে ভোরটা আর একটু পাতলা হয়ে এসেছে। আশেপাশের জঙ্গলের ভেতর থেকে পাখপাখালি ডাকতে শুরু করেছে। রোদের আলোয় কেমন একটা মধু মেশানো রঙ ধরেছে। একটু আগের অস্বস্তিটা কমে গেছে সায়নের। পকেটের ভেতর দুটো হাত ঢুকিয়ে আবার উল্টোদিকে দিকে হাঁটতে থাকে ও। মৌলি নিজের হাত দিয়ে থাবড়ে ওর গায়ের ধুলো ঝেড়ে নেয়।
‘আসুন, আপনাকে একটা জিনিস দেখাই—।’
‘কী জিনিস?’
‘আগে আসুন তো!’
ওর কথার মধ্যে একটা কর্তৃত্ব আছে। সায়নকে হাতছানি দিয়ে ডাকে মৌলি। ধীরে ধীরে ঝোপঝাড় ছেড়ে জঙ্গলের ভেতরে পা বাড়ায়। এইদিকে জঙ্গল একটু ঘন হয়ে এসেছে। গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে মাঝেমধ্যে বেশ বড় প্রশস্ত জায়গা। সেখানে গাছের পাতা পড়ে আছে।
মৌলির পেছনে পেছনে হেঁটে কিছু দূর এসে হঠাৎ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে সায়ন। জঙ্গলের ফাঁকে সেখানে একটা ছোট্ট ছাউনি করা আছে। কাঠের ছোট পাঠাতন, তার উপর চটের ছাউনি। জঙ্গলের মাঝে যেন এক টুকরো জিরিয়ে নেওয়ার জায়গা। সেদিকে এগিয়ে যায় মেয়েটা। পাঠাতনের উপর ফুলের ঝুড়িটা নামিয়ে রেখে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ে।
ক্লান্ত চোখে সায়নের দিকে চায় মৌলি, ‘আমার মায়ের সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ আপনার, তাই না?’
সায়ন অপ্রস্তুত হয়ে কাঁধ ঝাঁকায়, ‘কই, আমি তো সেরকম কিছু আপনাকে…’
‘সবার আছে। আগেও ছিল, ইদানীং সেটা দেখছি বেড়ে উঠেছে অনেকের মধ্যে।’
‘এমনটা কেন মনে হয় আপনার?’
‘কারণ, একা মহিলা। ইশকুল পাঠশালে না গিয়েও অনেকের থেকে বেশি শিক্ষিত। কারো পরোয়া করে না। এলাকার সব বয়সের মানুষ কখনও না কখনও সাহায্য চাইতে এসেছে শুনেছি। অল্প বয়সে ভারি মিষ্টি দেখতে ছিল মাকে। স্বভাবতই পাণিপ্রার্থীর অভাব ছিল না। মা কারো সঙ্গেই মিশত না। ফলে, একসময় বেশ্যা বলে বদনাম রটে গেল। বুড়ি হলে তো আর সেটা দেওয়া যায় না…তাই শেষ পর্যন্ত ডাইনি!’
‘ডাইনির আইডিয়াটাও ওখান থেকেই এসেছে জানেন। একটা সময়ে মহিলাদের যৌন আকাঙ্ক্ষাকে শয়তানের প্রবৃত্তি বলে মনে করা হত…সেখান থেকেই…’
মৌলি কাঠের বেঞ্চটা ছেড়ে উঠে পড়ে, যেন নিজের মনে ঘুরে দেখতে থাকে চারপাশটা। দেখতে দেখতে উদাস গলায় বলে, ‘মায়ের একটা আলাদা জগৎ ছিল, পড়ালেখা না শিখে একটা মানুষ যে এত বই পড়তে পারে আপনি ভাবতেও পারবেন না। আমাদের বাড়িতে একটা ছোটখাটো লাইব্রেরি আছে। মা আগে গান গাইত, ছবি আঁকত…তবে বেশিরভাগ ছবি নিজেই নষ্ট করে দিয়েছে। এখনও কিছু রয়ে গেছে, আপনাকে দেখাব একদিন। জানেন, কাঠকুটো দিয়ে ঘর বানাতেও জানত মা…’
‘তাই নাকি?’
ছাউনিটার দিকে দেখায় মৌলি, ‘মা নিজেই বানিয়েছিল এই জায়গাটা। দেখুন, কতদিন কেউ যত্ন নেয় না, তাও এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কখনও ঘরে মন না টিকলে বা দুঃখ হলে এখানে এসে বসে থাকত মা। মায়ের তো দুঃখ করার মতো কেউ ছিল না, তাই এইখানটায়…সারারাত এখানে কাটিয়ে সকালে আবার বাড়ি ফিরে যেত।’
‘রাতে! রাতে কেন?’
‘রাতে থাকবে বলেই তো বানিয়েছিল এটা। দিনেরবেলা তো থাকাই যায়, কষ্ট বা মন খারাপ তো রাতেই বেশি হয়, তাই না? রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের ঢুকত বলেই হয়ত বেশ্যা বলে বদনাম রটেছিল। তাতে মায়ের অবশ্য কিছু যায় আসত না।’
‘গ্রাম্য মহিলার এতটা বেপরোয়াভাব আর সাহস সত্যি প্রশংসা করার মতো। আচ্ছা, ভয় করত না?’
মৌলি দু’দিকে মাথা নাড়ে, ‘আমার মা ভয় পায় না। আগুন, সাপ, পশু, জন্তু, মানুষ, মৃত্যু— কোনও কিছুকেই ভয় পায় না। এখনও অবধি কিছুতে ভয় পেতে দেখিনি। জানেন, যত বয়স বাড়ছে আরও বেশি করে কেটে যাচ্ছে ভয়টা।’
মৌলির মুখে চোখে একটা আলো ঝলকে ওঠে এবার, খানিকটা চাপা অহঙ্কার আর গর্ব ঝরে পড়ে গলা থেকে।
‘আর আপনি? আপনি ভয় পান?’
হঠাৎ করেই ওর দিকে ফেরে মৌলি, ‘আমার ভয়টা বাড়ছে জানেন!’
‘কীসের ভয়?’
‘এ গ্রামে অনেক লোক আছে যারা আমার মায়ের ক্ষতি চায়। এমনকী মেরেও ফেলতে পারে। কোনওদিন রাগ বেড়ে উঠলে, সবাই এক জায়গায় হলে হয়ত গাছে বেঁধে পুড়িয়ে দেবে, কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে দেবে। আমার শক্তি আর কতটুকু বলুন, যদি সত্যি সেরকম কিছু করতে চায়, আমি আর কতদিন আটকে রাখতে পারব?’
সায়ন আর কিছু বলে না। চুপ করে হাঁটুর উপরে হাত রেখে বসে থাকে।
মৌলি একইরকম ভাবে বলতে থাকে, ‘বছর পাঁচেক আগেও মা আসত এখানে। তখন এ জঙ্গলে আরও জন্তু-জানোয়ার ছিল। এখন তো সব মেরে মেরে শেষ করে দিয়েছে গ্রামের লোকজন। তারা ভালোবাসত মাকে। দুপুরবেলা চুল খুলে এই বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে তাদের গান শোনাত মা। মা যখন গান গাইত তখন জঙ্গলের পশুরা এই জায়গাটাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে চুপ করে শুনত সেই গান…আপনি বিশ্বাস করছেন না, তাই না?’
সায়ন নিজের ভাবনায় হারিয়ে গেছিল। সম্বিত ফিরতে বলে, ‘না না, বিশ্বাস না করার কী আছে, তাহলে…’ একটু থেমে দম নিয়ে প্রশ্নটা করে সায়ন, ‘এই যে গ্রামে এত শিশু চুরির ঘটনা ঘটছে সেগুলো কী করে হচ্ছে বলে মনে হয় আপনার?’
সায়নের পাশে এসে এবার বসে পড়ে মৌলি, ‘আপনি তো কলকাতায় থাকেন, সেখানে শিশু চুরি হয় না? তার জন্য আপনার মাকে তো দায় নিতে হয় না, তাই না?’
সায়ন মাথা নামিয়ে নেয়, মুখ ঘুরিয়ে বলে, ‘আমার মা নেই…’
‘নেই মানে?’
‘মারা যায়নি, চলে গেছে। অন্য একটা লোকের সঙ্গে। আমার তখন আট বছর বয়স। অন্য জায়গায় ফ্যামিলি আছে মায়ের। আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখে না। আমি বাবার কাছেই মানুষ, বাবা খুব ভালোবাসে আমাকে।’
মৌলি করুণ হেসে বলে, ‘আর দেখুন, আমার মা আছে বাবা নেই। কোনওদিন ছিলও না।’
সায়নের মনে একটা প্রশ্ন উঠে আসছিল। কিন্তু কী যেন ভেবে সেটা করে না সে। একটা কাঠবেড়ালি ছাউনিটার দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসতে গিয়েও ওদের দেখে কী যেন হিসেব করে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। তারপর সতর্ক পায়ে সরে পড়ে কোথায় যেন।
মৌলির গলাটা এবার নরম হয়ে আসে, ‘মায়ের জন্য মন কেমন করে আপনার?’
সায়ন প্রশ্ন করার ধরনে হেসে ফেলে, ‘সে তো বাচ্চাদের করে। বড়দের কষ্ট হয়।’
‘মায়ের ব্যাপারে আমরা আর বড় হই কবে বলুন, মায়ের জন্য কষ্ট হয় না। মন কেমনই করে চিরকাল।’
দুজনে পাশাপাশি বসে থাকে ছাউনির তলায়। ওদের ঘিরে কিছু বিচিত্র পাখির হাঁকডাক শোনা যায়। গাছের ফাঁক গলে আসা রোদ ছুঁয়ে যায় ওদের। মনে ভারি আরাম লাগে সায়নের। মৌলির উপস্থিতির মধ্যে একটা ভেজা ভেজা স্নিগ্ধতা আছে। চুপ করে বসে থাকলেও মনে হয় কত কথা বলা হয়ে যায়।
‘বেশ, এর মধ্যে মন খারাপ হলে আমাদের বাড়ি চলে আসতে পারেন। মায়ের কাছে কিন্তু সব রোগেরই ওষুধ থাকে। মন কেমনেরও।’
‘আচ্ছা, আপনি কি একটা গুনগুন করছিলেন তখন? শোনাবেন?’
‘কোন গানটা বলুন তো? ও, ওই গানটা শুনেই তো পশুরা ভিড় করত এখানে…আমি ওইটুকুই জানি।’
‘সেকি, এতদিনে শিখে নেননি গানটা?’
মৌলি খিলখিলিয়ে হেসে ফেলে। তারপর বলে, ‘ধুর, আমি গান গাইতে পারি না। তাছাড়া মা আমাকে কিছু শেখাতে চান না।’
‘কেন?’
‘মায়ের মতো হয়ে কী লাভ বলুন, সেই তো লোকে একদিন না একদিন ডাইনি বলবে—।’
‘কই, আমি তো বলছি না…’
‘বেশ, তাহলে আসুন একদিন আমাদের বাড়ি।’
সায়ন বোঝে মেয়েটা এবার উঠতে চাইছে। সত্যি বেলা চড়ে আসছে। ওকেও ফিরতে হবে এবার।
‘ওঠা যাক তাহলে।’
সায়ন ঘাড় নাড়তে দুজনে উঠে পড়ে। তারপর ছাউনিটা পেরিয়ে বেশ কিছুদূর এগিয়ে যায়। হঠাৎ কী মনে পড়তে সায়ন ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘এই দেখুন, একটা জিনিস ভুলে গেলেন—।’
‘কী বলুন তো?’
‘এই যে আমি আপনার প্রাণ বাঁচালাম, তার বদলে আপনি আমাকে কিছু দিলেন না তো—।’
‘ঠিক বলেছেন, কিন্তু…কী দেওয়া যায় বলুন তো?’ থুতনিতে হাত দিয়ে কয়েক সেকেন্ড কী যেন ভাবে মৌলি। চোখদুটো ছোট হয়ে আসে। হঠাৎ জিগ্যেস করে, ‘আচ্ছা আপনার প্রিয় রঙ কী?’
‘নীল।’
‘বেশ, তাহলে…’ হাতের ঝুড়ি থেকে একটা ফুল সায়নের দিকে এগিয়ে দেয় মৌলি। তারপর বলে, ‘এই ফুলটার ইংরিজি নাম কী জানেন?’
সায়ন দেখে মেয়েটার হাতে একটা নীলচে রঙের বুনো ফুল। পাঁচটা পাপড়ি মেলে রয়েছে। নিশ্চয়ই একটু আগেই এখানকার কোনও গাছ থেকে তোলা হয়েছে এটাকে। একটু যেন ছাইছাই রঙ লেগে আছে ফুলের গায়ে। আগে কখনও এমন ফুল দেখেনি ও।
‘ইংরিজিতে বলে ব্লু-উইচ। ডাইনির ফুল। জঙ্গলে দাবানল লেগে সব ঝলসে যাওয়ার পর যখন আবার সব শান্ত হয় তখন সবার আগে এই ফুলটা জন্মাতে দেখা যায়। জঙ্গল ভরে যায় এই ফুলে। এদিকে এ ফুল ফোটার কথা নয়, তাও আজ খুঁজে পেলাম।’
‘আশ্চর্য তো!’ সায়ন অবাক হয়ে চেয়ে থাকে ফুলটার দিকে।
মৌলি সামনের দিকে পা বাড়ায়। চারাগাছের ঘন সবুজ কচিপাতা স্পর্শ করে যায় ওর পা। পায়ে মল পরে মেয়েটা। তার রুনঝুন আওয়াজ ক্রমশ এগিয়ে যায় সামনের দিকে। ডাইনির ফুল হাতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সায়ন। মুখ থেকে অজান্তেই একটু আগের শব্দটা আবার বেরিয়ে আসে, ‘আশ্চর্য তো!’
