কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১০

দশম অধ্যায়

‘আই ফাকিং গট ইট…’

কথাটা বলেই মদের গ্লাসটাকে ঠকাস করে টেবিলের উপর রাখল তনুজা। প্রত্যয় একটু দূরে ছাদের মেঝেতেই বসেছিল। ওর সামনে হুইস্কির বোতল আর গ্লাস। রাতের মৃদুমন্দ হাওয়ায় দু-তিন পেগ পেটে যাওয়ার পর মন্দ লাগছিল না। জমাটি শীতটাও কমে এসেছে। সোয়েটারটা খুলে রেখেছে মাটিতে। গা গরম হচ্ছে ক্রমশ। ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা জ্যাজ চালিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। মৌতাতী আমেজের মাঝখানে তনুজার আচমকা চিৎকারে একটু কেঁপে যায় প্রত্যয়।

ঠোঁটের সামনে আনা মদের গ্লাসটা মাটিতে নামিয়ে রেখে বলে, ‘ধুর বাঁড়া, রাতবিরেতে চিৎকার করিস না তো!’

তনুজার চোখ মুখ হ্যালোজেনের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। হাতের সিগারেটটায় লম্বা করে টান মেরে ছাদের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেয় সে। চোখ এখনও স্ক্রিনের দিকে নিবদ্ধ। সে দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলে, ‘তুই বিশ্বাস করবি না আমি কী আবিষ্কার করেছি!’

‘আর তুই বিশ্বাস করবি না আমার মেজাজটা কী লেভেলের খিঁচে যাচ্ছে…’

ল্যাপটপটা টেবিল থেকে তুলে নিয়ে প্রত্যয়ের পাশে এসে বসে তনুজা। তারপর স্ক্রিনটা ওর দিকে কিছুটা ঘুরিয়ে বলে, ‘জাস্ট টেক আ লুক, এতদিন এটাই পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম!’

তনুজা আগে একটা খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করত। মুচমুচে আর মশালাদার খবর করার জন্য খানিক নামডাকও হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই খবরের দপ্তরে চিঠি আসে—সাংবাদিক তনুজা দাস জনৈক মন্ত্রীর মদ্যপ অবস্থায় কোলে বসা যে ‘রাখেল’-এর ছবি তুলেছে সে নাকি মন্ত্রীর বোন ও ‘নিছক বন্ধু’। মন্ত্রী ও মন্ত্রীর সেই বন্ধু দুম করে মামলা করে দেয় খবরের কাগজের নামে।

বলা বাহুল্য, এর পরেই তনুজাকে পিঙ্ক স্লিপ ধরানো হয়। অন্য কোনও কাগজের অফিসে চাকরি জোটে না। হঠাৎ একদিন শিকে ছেঁড়ে। হঠাৎ করে ফেসবুকে একটা অফার পায়। একজন নাম করা বাংলা থ্রিলার লেখকের হয়ে রিসার্চ অ্যান্ড ডেটা কালেক্টারের কাজ। ব্যাপার কিছুই না, সেই লেখক রিসেন্টলি ‘উইচেস অফ বেঙ্গল’ বলে একটা বই লিখতে শুরু করেছেন। তো বাংলার ইতিহাসে যত উইচ ব্র্যান্ডিং হয়েছে তাদের ব্যাপারে কিছু চমকপ্রদ তথ্য খুঁজে আনাই তার কাজ।

কিছুটা অভিজ্ঞতা এবং কিছুটা মুচমুচে খবর তৈরি করতে পারার ক্ষমতার জন্যই ওকে মোটা মাইনে দিয়ে মাসখানেকের জন্য নিয়োগ করেছেন তিনি। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় গেছে তনুজা, বিস্তর পুরনো খবরের কাগজ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে, বইপত্র উল্টেপাল্টে দেখেছে।

আগের অফিসে থাকাকালীন কাজের সূত্রে দিলুবাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল তার। দিলুবাবু ধুরন্ধর লোক। পলিটিক্যাল কেরিয়ারকে আরও বেশি স্ট্রং করতে বিভিন্ন সময়ে খুঁটিনাটি টিপস নেন তিনি। এই দিলীপ দস্তিদারের মুখ থেকেই কথায় কথায় তনুজা জানতে পারে, এ অঞ্চলে ডাইনিদের নিয়ে নাকি কিছু ইতিহাস আছে। শুধু তাই নয়, এত বছর পরে নাকি এক আধুনিক ডাইনির উৎপাত হয়েছে এখানে।

তনুজা আর অপেক্ষা করে না। প্রত্যয়কে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

প্রত্যয় আগে ফিল্মে সাউন্ড ডিপার্টমেন্টে কাজ করত। ইদানীং ক্যামেরা ধরেছে। তনুজার সঙ্গে এসেছে একরকম বান্ধবীর অনুরোধ ফেলতে না পেরে। ওকে ছাড়া নাকি এ কাজ একেবারে হবেই না।

আজ সারাদিন কাজকর্মের পর বাড়ি ফিরে ছাদে বসে গঙ্গার পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করছিল তনুজা। এমন সময় একটা আশ্চর্য জিনিস চোখে পড়ে।

প্রত্যয়ের এসবে কোনও আগ্রহ নেই। সে মদের গ্লাসে আরেকটা চুমুক দিয়ে ছাদের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে। তনুজা ওর থাই-এর উপর একটা চাপড় মেরে বলে, ‘দেখ, ডাইনিদের নিয়ে গবেষণা শুধু গালগল্প ফাঁদার জন্য নয়।’

‘তো আর কী? শালা, কে কবে কাকে পুড়িয়ে মেরেছে এসব জেনে আমাদের কী লাভ হবে বল তো?’

তনুজা ফিসফিসে গলায় বলে, ‘গুপ্তধনের সংকেত পাব!’

‘গুপ্তধন? বালের গুপ্তধন!’ প্রত্যয়ের মুখটা আরও ব্যাজার হয়ে যায়, ‘শালা, এরপর থেকে তোর সঙ্গে মাল খেলে শুধু বাংলা খাব। ফরেনের মজাটাই নষ্ট করে দিস বাঁড়া…’

তনুজা নিজেও ওর মদের গ্লাসে একটা চুমুক মারে, বলে, ‘দেখ, এত বছর ধরে, বিশেষ করে আমাদের দেশে, সেই সব মহিলাদেরকেই ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হত যাদের জ্ঞানগম্মি একটু বেশি হত। যারা একটু চিকিৎসা করতে জানত, একটু কাউন্সেলিং জানত, কিংবা ধর কেমিস্ট্রির নলেজ…শিক্ষাগুলোর প্রথাগত নাম হয়ত ছিল না, কিন্তু অ্যাপ্লিকেশন ছিল। ডাইনিরা ম্যাজিক জানত বলে একটা কথা আছে না, ম্যাজিক মানে তো অ্যাডভান্স সায়েন্স ছাড়া অন্য কিছু নয়, তাই না?’

‘তো?’

‘তো এখন কথা হল তখনকার ডাইনিরা এইসব ম্যাজিক জানবে কোথা থেকে? এই বাঞ্চোত…তুই শুনছিস আমার কথা?’ প্রত্যয়ের থাইতে আবার ঠেলা দেয় তনুজা।

নিরুৎসাহে একটা কিম্ভূত আওয়াজ করে সে, ‘হ্যাঁ, বল বল, কোথা থেকে?’

‘যেমন করে আমাদের মা-কাকিমারা জানত কেটে গেলে কোন গাছের পাতার রস দিতে হবে, কী খেলে চুল পড়া কমবে, কেমন করে সংসার খরচ করলে সারামাস চলে যাবে। তারা জানত তাদের মায়ের থেকে, কিংবা ধর নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে, ছোট ছোট টোটকা নিজেদের মধ্যে চালাচালি করতে করতে! সেকালের তথাকথিত ডাইনিরাও সেই ভাবেই জানত। যাদের আগ্রহ বেশি ছিল তারা আর একটু পড়াশোনা করত। তুই ভাবতে পারছিস?’ ওর জামা ধরে নাড়া দেয় তনুজা।

‘ষাট এম.এল. চার পেগের পরে শুধু ভাবছি কেন, দেখতেও পাচ্ছি চোখের সামনে…ওই যে একটা ডাইনি এসএন দে খুলে ইন্টিগ্রেশন নামাচ্ছে, তুই বলে যা…’

‘এদের এই যে এত জ্ঞান, এত ছোট ছোট নলেজ—তার কোনও প্রপার ডকুমেন্ট নেই। জানিস, বিদেশে উইচ হান্টের সময় ডাইনিদের তৈরি করা কিছু ওষুধ ক্যাথলিক চার্চ সংগ্রহ করে নিজেরা বিলি করত আর যার থেকে সেগুলো কালেক্ট করত সেই ডাইনিকে পুড়িয়ে মারত! আমাদের দেশেও নিশ্চয়ই ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজির এমন অনেক জ্ঞান সেইসব ডাইনিদের সঙ্গেই হারিয়ে গেছে…’

‘খুব খারাপ হয়েছে।’ প্রত্যয় যেন গর্জে ওঠে, ‘দে, এই দুঃখে আর এক পেগ দে!’

‘এখন যদি সেগুলোকে উদ্ধার করা হয় কোনওভাবে, আমাদের জীবনযাত্রা কত সহজ হয়ে যাবে তুই ভাবতে পারছিস!’

‘হ্যাঁ, বিলক্ষণ। আচ্ছা, বলছি মদ খাওয়ার সময় ফালতু ঘ্যানঘ্যান করার অপরাধে কাউকে ডাইনি বলে পোড়ানো হত না?’

‘ধুর, তোকে কিছু বলাই বেকার!’ তনুজা রেগেমেগে উঠে যাওয়ার তোড়জোড় করে। প্রত্যয় হাত ধরে থামিয়ে দেয় তাকে, গলা নরম করে বলে, ‘আচ্ছা বল, বল।’

নিজের ল্যাপটপের স্ক্রিনের উপর ঝুঁকে পড়ে তনুজা। স্ক্রল করে একটা আর্টিকেলের এক জায়গায় থেমে যায়, বলে, ‘গঙ্গার ফ্যামিলি হিস্ট্রি তো তুই আগেই শুনেছিস। ওর পূর্বপুরুষরা গ্রামে এসেছিল জমিদারের ছেলের অসুখ সারাতে। এখন প্রশ্ন হল জমিদারের ছেলের রোগটা ঠিক কী ছিল? কালিপদর বউয়ের হাতে সে দাওয়াই এল কী করে?’

‘কী করে?’

‘দেখ, জমিদারের ছেলের রোগের ধরনগুলো শুনে মনে হচ্ছে এটা যক্ষ্মা বা অ্যানিমিয়া গোছের কিছু। যাতে প্রতিনিয়ত শরীরে রক্ত ঢোকাতে হত। কালিপদর বউ দুদিন অন্তর একবার করে জমিদারের ছেলেকে দেখতে আসত। হাতে থাকত একটা থলে। এখন রোগ আর চিকিৎসার ধরনটা দেখে কী মনে হচ্ছে? ওই থলিতে কী থাকত?’

‘রক্ত?’

‘পারফেক্ট! রক্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ডাইনি সেই রক্ত জোগাড় করত কোথা থেকে? কোনও কারখানায় তো সে জিনিস তৈরি করা যায় না। একমাত্র মানুষের শরীর ছাড়া অন্য কোথাও রক্ত তৈরি হয় না।’

আজকে তুই আমি বিজ্ঞানের বই পড়ে বলতে পারি যে রোগটা ছিল টিবি বা অ্যানিমিয়া। কিন্তু আজ থেকে দেড়শো বছর আগে ভারতের এক গ্রাম্য মহিলার কাছে সেই রোগের খবর এবং তার ওষুধ এল কী করে?

‘কী করে?’

ঠোঁটে আঙুল রাখে তনুজা, ‘সেটা জানতে গেলে জানতে হবে কালিপদর বউ এল কোথা থেকে?’

‘মানে! তা কী করে সম্ভব?’

ছাদের মেঝের উপর চাপড় মারে তনুজা, ‘সেটাই আমার আবিষ্কার। সেই জন্যেই এত গৌরচন্দ্রিকা।’

‘কী বলছিস তুই?’

ল্যাপটপটা আবার প্রত্যয়ের দিকে ঘুরিয়ে দেয় তনুজা, ‘দেখ ভাই। আজ থেকে আড়াইশো বছর আগের একটা ঘটনা—’

প্রত্যয় দেখে ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা আর্টিক্যাল ফুটে আছে, ‘এখান থেকে ষাট কিলোমিটার দূরে একটা গ্রাম বেলতলা। কথিত আছে, সেখানে ঠিক ওই একই সময় এক দম্পতিকে ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।’

‘কেন? মানে ডাইনি সন্দেহের কারণ কী?’

‘এখানেই আসছে মজার ব্যাপার! মহিলা নাকি নানান রকমের চিকিৎসা জানতেন। গ্রামের মহিলারা তার কাছে নিজেদের নানান সমস্যা নিয়ে হাজির হত। যমে একেবারে চৌকাঠ অবধি এনে ফেলেছে এমন রোগীকেও নাকি সারিয়ে ফেলতে পারতেন তিনি। এলাকার একদল লোক তাকে ভগবান মনে করত। বিশেষ করে মেয়েরা। ক্রমশ তাদের মেসিহা হয়ে ওঠেন তিনি। তার অবশ্য একটা কারণ ছিল এবং সেটাই হয় তার কাল।’

‘কী কারণ?’

‘সেকালের পুরুষরা বছর বছর স্ত্রীদের পোয়াতি করত। বলা বাহুল্য, প্রতি বছর এই ঝক্কি পোহানো তাদের স্ত্রীদের পছন্দ ছিল না। এদিকে স্বামীর ভয়ে, সমাজের ভয়ে কিছু বলাও যায় না। তাই তারা দল বেঁধে গোপনে তার কাছে সেই সমস্যার কথা জানালে তিনি সবাইকে একটা বিশেষ ওষুধ দেন। বলেন, খাবারের সঙ্গে তিনদিন স্বামীকে খাওয়ালেই নাকি সমাধান পাওয়া যাবে। তার কথামতো কাজ করায় তাদের স্বামীরা নির্বীজ হয়ে পড়ে।

প্রথম প্রথম কারো সন্দেহ হয়নি। কিন্তু এলাকার এতগুলো পুরুষমানুষ একসঙ্গে খোজা হয়ে যাওয়ায় শোরগোল পড়ে যায়। জেরার মুখে কোনও এক মহিলা কথাটা ফাঁস করে ফেলে। ব্যাস, ক্যাঙ্গারু কোর্ট বসে। মহিলার স্বামী তাকে সমর্থন করে। ফলে দুজনকেই ডাইনি অপবাদ দেওয়া হয় এবং পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়।’

‘টিল ডেথ ডু আস পার্ট! তারপর?’

‘উঁহু, নট এক্স্যাক্টলি। দুজনকে একটা ছাগলঘরে পোড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়।’

‘এত পোড়ানোর জায়গা থাকে ছাগলঘরে? ওয়াট দা ফাক!’

‘গ্রামের ওইটাই ছিল নিয়ম। এখন ক্যাচটা হচ্ছে, যে ছাগলঘরে দুজনকে পোড়ানো হয় সেখানে আগুন নিভতে লোকজন ঢুকে দেখে—সেখানে মাত্র একটা মৃতদেহ পড়ে আছে। সেটা মহিলার স্বামীর। কিন্তু মহিলা কোথায় পালান তা কেউ জানে না।’

‘গাঁড় মেরেছে! ঢুকল দুপিস কিন্তু রোস্ট হল একপিস!’

‘আমার মনে হচ্ছে, এই আনবার্ন্ট মহিলাই গঙ্গার পূর্বপুরুষ। স্থান কাল এবং পাত্র দেখে সেটাই গেস করতে হচ্ছে।’

প্রত্যয় কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসেছিল, এবার সে বলল, ‘আচ্ছা, একটা ব্যাপার বল, মহিলার স্বামী যদি সেই ঘরেই পুড়ে মরে গিয়ে থাকে, এবং সেই মহিলাই যদি জমিদারের বাড়িতে ছেলের রোগ সারাতে আসে, তাহলে হু ইজ দিস কালিপদ? সেও তো দাবি করেছিল মহিলা ওর বউ…রোস্ট হওয়া স্বামীকে ভুলে কি নতুন দোস্ত পাতিয়েছিল?’

‘দেয়ার আর সো মেনি আনসল্ভড কোয়েশ্চেন্স!’ মদের গ্লাসে আবার চুমুক দেয় তনুজা।

‘বেশ তো, তুই সব ফলাও করে লিখে ফেল—।’

দুদিকে মাথা নাড়ে তনুজা, ‘না, শুধু লিখলে চলবে না। কাল এখান থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে।’

‘করে?’

‘ওই গ্রামে শুনেছি ওদের পুরনো জায়গাজমি এখনও আছে। স্থানীয় একটা জমিদারবাড়ি আছে। সেখান পুরনো লোকজনকে জিগ্যেস করে কিছু জানা যেতে পারে।’

কথাগুলো বলতে বলতে উঠে পাঁচিলের ধারে দাঁড়ায় তনুজা। প্রত্যয়ও ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। তারপর নরম গলায় বলে, ‘আমার মনে হয়, জিনিসটাকে তুই যতটা কল্পনা করছিস ততটা গভীর কিছু নয়।’

‘মানে?’

‘মানে তুই তো জানিস তোর কল্পনাটা একটু বেশি উড়তে থাকে…’

‘আর সেই জন্যই আমার চাকরিটা চলে গেছে, তাই না?’ আর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বলে তনুজা, ‘খবরের কাগজে চাকরি ছেড়ে কোথায় এঁদো গ্রামে ডাইনির ঝাঁটা খুঁজে বেড়াচ্ছি…’

‘ঝাঁটার ব্যাপার জানি না, কিন্তু আমার শালা ঝাঁট জ্বলে যাচ্ছে…’

সিগারেটটা প্রত্যয়ের দিকে এগোতে যাচ্ছিল তনুজা। তাকিয়ে দেখে তার ভুরু কুঁচকে গেছে। খুব মন দিয়ে দূরের মাঠে কী যেন দেখার চেষ্টা করছে।

‘কী হল তোর?’

প্রত্যয় বিড়বিড় করে, ‘মাঠের মধ্যে একটা আলো জ্বলছে না?’

‘আলো!’ তনুজা সামনের দিকে তাকায়। হ্যাঁ, ওদের থেকে অন্তত দুশো মিটার দূরে খোলা মাঠের উপরে একটা আলো জ্বলছে। শুধু জ্বলছে না, ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে সেটা।

ভালো করে তাকিয়ে তনুজা বুঝতে পারে আলোটা একটা টর্চ। সেটা হাতে ধরে কেউ মাঠ পার হচ্ছে। ঘড়ির দিকে তাকায় সে।

‘এত রাতে টর্চ নিয়ে কে মাঠে এসেছে বল তো? তার উপর চারপাশে যা হচ্ছে!’ ঝুঁকে পড়ে চেহারাটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করে প্রত্যয়। ওর মুখটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়, ‘একটা বাচ্চা ছেলে মনে হচ্ছে…’

‘বাচ্চা! এত রাতে! সঙ্গে কেউ নেই?’

‘নাঃ, একাই তো হাঁটছে!’

‘যাঃ শালা! মনে ভয় ডর নেই নাকি? বাবা-মায়েরই বা কী আক্কেল? চল তো একবার এগিয়ে দেখি—।’

প্রত্যয়ের নেশাটা এতক্ষণে বোধহয় চড়েছে। নইলে রাতবিরেতে তেমন কর্মবীর হওয়া তার স্বভাবে নেই। তনুজার কথায় আপত্তি করে না।

দুজনে লজের এক তলায় নেমে আসে। এখনও বাইরের দরজায় তালা পড়েনি। তবে রিসেপশন ফাঁকা। ওদের কেউ দেখতে পায় না। দ্রুত পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়ে দুজনে।

লজের পেছনের দিকের খোলা মাঠটা থমথম করছে। বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে ইতস্তত জোনাকি জ্বলছে। হাওয়ায় শীতের গন্ধ।

একটানা ঝিঁঝির ডাক কানে তালা ধরিয়ে দেয় যেন। দুজনে বেশ জোরে পা চালায়। মাঠটা পার হওয়ার আগেই ধরতে হবে ছেলেটাকে। নিশ্চয়ই বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

খানিক হেঁটে, কিছুটা দৌড়ে দুজনে ছেলেটার কাছে চলে আসে। ছেলেটা কিন্তু ওদের দেখতে পায় না। ওদের পাত্তা না দিয়ে নিজের মনেই সে হেঁটে চলেছে। চোখে কেমন স্থির দৃষ্টি। মনে হয় যেন অন্য কোনও দিকে নজর নেই তার।

‘এই ছেলে, এত রাতে কী করছিস এখানে?’ চেঁচিয়ে ওঠে প্রত্যয়।

তনুজা এগিয়ে এসে হাত রাখে ওর মাথায়। ছেলেটা এবার দাঁড়িয়ে পড়ে। ওদের দিকে ঘুরে তাকায়। কিন্তু কোনও কথা বলে না। যেন মুখ দেখে ওদের পরিচয় বোঝার চেষ্টা করে।

‘নাম কী রে বাবা তোর?’ তনুজা জিগ্যেস করে।

‘মণি।’

‘এই গ্রামেই থাকিস?’

‘হ্যাঁ।’

‘একা একা এত রাতে কোথায় যাচ্ছিস? জানিস না, এভাবে রাতের বেলায় বাড়ি থেকে বেরোতে সবাই নিষেধ করছে?’

‘আমাকে ডেকেছিল তো তাই যাচ্ছি, রোজই তো আসি। আজ নতুন নাকি?’

‘ডেকেছিল? কে?’

‘ওই যে, যাকে তোমরা ভয় পাও—।’

প্রত্যয় একটু পিছিয়ে আসে, উঁচু গলাতেই বলে, ‘আলবাল বকছে। এই খোকা তোমার বাবার নম্বর দাও তো!’

‘বাবা নেই।’ মণি নিঃস্পৃহ গলায় বলে।

‘কে ডাকছিল তোকে?’ তনুজা ওর সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে।

‘নাম তো জানি না। ওই জঙ্গল থেকে ডাকছিল।’ আঙুল তুলে জঙ্গলের অন্ধকার দিকটা দেখায় মণি।

প্রত্যয়ের বিরক্ত লাগে, ধমকের সুরে বলে, ‘ডাহা মিথ্যা কথা, নিশ্চয়ই বিড়ি খেতে যাচ্ছিল। এখন ধরা পড়ে বাওয়াল দিচ্ছে!’

তনুজা ভালো করে ছেলেটার চোখের দিকে তাকায়। ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে না মিথ্যে বলছে। কিন্তু এত রাতে জঙ্গল থেকে কে ডাকবে ওকে?

প্রত্যয়ের দিকে ঘুরে তাকায় তনুজা, ‘না ভাই, ও মিথ্যে বলছে না। আমি মানুষের চোখ দেখে বুঝতে পারি।’

প্রত্যয় অবাক হয়ে এক পা এগিয়ে আসে ওর দিকে, ‘ওর সঙ্গে সঙ্গে কি তোরও মাথা খারাপ হল? স্পষ্ট বানিয়ে বানিয়ে গুল মারছে আর তুই…’

মণির দিকে ফিরে তনুজা বলে, ‘কই, চল আমার সঙ্গে, দেখি কে ডাকছে—।’

প্রত্যয় এবার খিঁচিয়ে ওঠে, ‘এ ভাই তোর মাথা ফাথা খারাপ হয়েছে নাকি? ওর সঙ্গে এখন জঙ্গলে যাব আমরা?’

মণি আবার হাঁটতে থাকে টর্চটা সামনে নিয়ে। তনুজা ওকে অনুসরণ করে, ‘তোকে কে আসতে বলেছে, তুই হোটেলে বসে মদ গেল।’

‘শালা, আমি মাতাল হয়ে বুঝতে পারছি ছেলেটা আলবাল বকছে। এতগুলো খুন হয়ে গেল এই গ্রামে আর তুই রাতবিরেতে কার না কার কথা শুনে ভূতের পিছু ধাওয়া করে…’

তনুজা আর কিছু বলে না। মণির কাঁধে একটা হাত রেখে হাঁটতে থাকে ওর সঙ্গে।

‘এটা তোর জব ডেসক্রিপশনে ছিল না তনু, তোর সঙ্গে ওই আকাট বাচ্চাটার কোনও পার্থক্য নেই!’

তনুজা থেমে পেছনে ফিরে তাকায়, ‘তুই এতটা স্বার্থপর কী করে হতে পারিস প্রত্যয়?’

‘আমি স্বার্থপর হচ্ছি না। নিজের ভালোটা বুঝছি। একটা বাচ্চা ছেলে কোথায় না কোথায় যাচ্ছে আমরাও তার পেছন পেছন যাব! আর ইউ ফাকিং নাটস?’

‘তুই কি ভয় পাচ্ছিস?’

‘হ্যাঁ, পাচ্ছি। চারপাশে যা হচ্ছে তাতে আমার ভয় লাগছে!’

মাথা নাড়ায় তনুজা, ‘আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল। তুই একটা কাপুরুষ জানলে তোকে নিয়ে এখানে আসতামই না শালা…’

মদের নেশাটা ক্রমশ চড়ে গেছিল প্রত্যয়ের। এই মুহূর্তে রাগটা মাথায় উঠে যায় ওর। চিৎকার করে এক দলা থুতু ফেলার ভঙ্গিতে বলে, ‘আর আমারও জানা উচিত ছিল তুই একটা চিটিংবাজ। নিজের ইচ্ছেমতো গল্প বানিয়ে ক্রেডিট নিস। যা, যেখানে খুশি যা, আর যা খুশি গল্প বানা। আমি তোর সঙ্গে যাব না।’

কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তনুজা। চোখদুটো জ্বলে ওঠে ওর। ছেলেটার জামার কাঁধের কাছটা শক্ত করে ধরে। তারপর পেছন ফিরে আবার হাঁটতে থাকে জঙ্গলের দিকে।

প্রত্যয় কথাটা বলেই বুঝতে পারে উত্তেজনায় আর মদের নেশায় কথাটা বেরিয়ে গেছে। ওর অসহায় লাগে। কয়েক সেকেন্ড সেখানেই দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে। আবার তনুজার পিছু নেয়, ‘দেখ ভাই, আই অ্যাম সরি। বুঝতেই তো পারছিস। একগাদা মালফাল খেয়ে ফেলেছি, কী না কী বলে ফেলছি…মাল খেয়ে বলা কথা মনে নিতে নেই…’

কথাগুলো বলতে বলতে তনুজার পেছনে হাঁটতে থাকে প্রত্যয়। ছেলেটা ওদের থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছে। জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করেছে তার টর্চের আলো।

একটু জোরে পা চালায় তনুজা। ছেলেটা গুনগুন করে একটা গান গাইছে মনে হয়। হাঁটাচলা দেখে বোঝা যায় সে মাঝেমধ্যেই এ পথে যাতায়াত করে। গাছ-গাছড়ার ভিড় দিয়ে নির্দ্বিধায় জায়গা খুঁজে নিচ্ছে।

তনুজা ওর আরেকটু কাছে সরে আসে, তারপর জিগ্যেস করে, ‘মণি, এই রাত্রিবেলা জঙ্গলের ভেতর ঢুকতে তোর ভয় করে না?’

‘আগে করত, এখন আর করে না। এখন তোমরা ভয় পাও…’

‘তাই বুঝি? কিন্তু ভয় করে না কেন?’

‘কীসে ভয় পাব?’

‘কেন, ডাইনির কথা শুনিসনি?’

‘ডাইনি?’ ছেলেটার মুখে যেন একটা আলগা হাসি ফোটে, ‘ডাইনি বলে কিছু হয় না…’

‘তাই নাকি?’

‘তনু, আর ভিতরে যাস না, মা আমার…’ প্রত্যয়ের ডাক শোনা যায় পেছন থেকে, ‘আমার কেমন জানি ভালো লাগছে না। এখানে কিছু একটা আছে…’

‘তোকে আমি আসতে বারণ করেছিলাম!’

‘তুই চটছিস কেন বল তো? অন্য কিছু না হোক, জঙ্গলের মধ্যে কোথায় সাপখোপ থাকে…বিপদ একটা হতে কতক্ষণ?’

ওর দিকে ফিরেও তাকায় না তনুজা। ওর বুকের ভেতরটাও চিন চিন করছে। এত রাতে জঙ্গলের ভেতরে আগে কখনও ঢোকেনি ও। ফেরার পথ চিনতে অবশ্য অসুবিধা হবে না। এতক্ষণ তো সোজা পথেই হাঁটছে।

হঠাৎ করেই ওর সামনে পায়ের আওয়াজটা থেমে যায়। অর্থাৎ হাঁটা থামিয়ে মণি দাঁড়িয়ে পড়েছে।

‘কীরে কে ডাকছিল তোকে? এখানে তো কেউ নেই!’

মণি ওর দিকে না ফিরেই বলে, ‘আছে, দেখতে পাচ্ছ না।’

‘তাহলে তুই দেখছিস কী করে?’

ওর কথার উত্তর না দিয়ে হঠাৎ করেই গলা তুলে চিৎকার করে ওঠে মণি, ‘মা? মা…’

তনুজা অবাক হয়ে যায়। পেছন থেকে ওর মাথায় একটা ঠেলা দিয়ে বলে, ‘এই তোর মা এখানে আসবে কী করে?’

প্রত্যয়ের গলায় আবার আগের ঝাঁজটা ফিরে আসে, ‘শালার রামকৃষ্ণদেব হওয়ার শখ হয়েছে! আমি আগেই বলেছিলাম এর মাথার তার কাটা। নাও, রাতবিরেতে পিছু নাও, হয়েছে শিক্ষা?’

ছেলেটা ফিরেও তাকায় না। আগের মতোই আবার চিৎকার করে ওঠে। এবার চিৎকারের সঙ্গে কয়েকটা কথা মিশে যায়, ‘মা, ওদের নিয়ে এসেছি এখানে। তুমি যেমন বলেছিলে। এবার নিচে নেমে এসো—।’

দুটো মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ করেই আশেপাশের পরিবেশ স্বাভাবিকের থেকে বেশি শীতল হয়ে ওঠে। মদের নেশা মুহূর্তে কেটে যায়। মনে হয় ওদের ঠিক পিছনে একটা ফিসফিসে নিঃশ্বাস পড়ছে। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই নিঃশ্বাসের শব্দ। সঙ্গে রাতের জঙ্গলে বেড়ে উঠছে একটা খিলখিলে চাপা মেয়েলি হাসি।

ওদের ঘাড়ের ওপর থেকে কিছু যেন নেমে এসেছে। সেইসঙ্গে বেড়ে উঠছে একটা ফিকে নীলচে আলো। মণির দিকে চায় তনুজা। ছেলেটা ওদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। ঠিক ওদের দিকে নয়, ওদের ঘাড়ের পাশ দিয়ে একটু পেছনে। অস্ফুটে তার মুখ দিয়ে একটা শব্দ বেরিয়ে আসে, ‘মা…’