কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১৮

অষ্টাদশ অধ্যায়

ষোড়শ শতাব্দীর আশির দশকে, কোনও এক অন্ধকার সময়ে…

রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছিল মেয়েটা। ওর কোলে ধরা একটা ছোট্ট বিড়ালছানা। এতক্ষণে ওর মায়ের দেহটা মনে হয় টেনে টেনে খেয়ছে শেয়ালকুকুরে। গোটা গ্রামে ছড়িয়ে আছে লোকগুলো। ওকে দেখতে পেলেই টেনে নিয়ে যাবে। ওদের হাত থেকে বাঁচতেই ও পালাচ্ছে। কিন্তু ওর ছোট পাগুলো আর চলতে চাইছে না। এক্ষুনি রাস্তার উপরেই বসে পড়তে হবে ওকে। প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল, এমন সময় দুটো হাত এসে বাঁচিয়ে নেয় ওকে। নরম হাতের স্পর্শে চোট লাগতে লাগতেও বেঁচে যায় ও।

‘একী! এমন পাগলের মতো দৌড়াচ্ছ কেন? ভূতে তাড়া করেছে নাকি?’

মেয়েটা তাকিয়ে দেখে ওর সামনে দাঁড়িয়ে এক মাঝবয়সি মহিলা। মোটাসোটা, ঝুলে পড়া গালে একটা নরম তুলতুলে হাসি। আদুরে ভাব। ওর দিকে হাসি হাসি মুখে চেয়ে আছেন তিনি।

‘ওই লোকগুলো! লোকগুলো…’ মেয়েটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘মেরে ফেলেছে আমার মালকিনকে। মাকেও মেরেছে। আর আমাকেও…এই যে ব্র্যান্ড করে দিয়েছে আমাকে…’

কাপড় তুলে পেটে খোদাই করা উল্কিটা দেখায় মেয়েটা। ওর মালকিনের নামের আদ্যাক্ষর খোদাই করা আছে সেখানে। কোনও মহিলা ডাইনি প্রমাণিত হলে তার বাড়ির কিংবা পরিচিত অন্য মহিলাদেরও পরীক্ষা করে দেখা হয় তারাও ডাইনিবিদ্যার চর্চা করে কিনা। কারো উপর সন্দেহ হলে তার শরীরে সেই ডাইনির আদ্যাক্ষর খোদাই করে বিচার চলে। বাচ্চারাও বাদ যায় না সেই বিচার থেকে। কোনও বাচ্চা মেয়ে যদি ইনকুইজিশনের চোখে পড়ে যায় তাহলে আর নিস্তার থাকে না। এ মেয়েটির বয়স যদিও দশ কি বারোর মধ্যে, ওর মধ্যেও হয়ত যৌন উত্তেজনা খুঁজে নিয়েছে কোনও ইনকুইজিটর।

‘আমাকে বাঁচান ম্যাম। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে…’

‘ওরা একদিন গোটা দুনিয়াটাকেই মেরে ফেলবে মাই লেডি। ওই একটাই নেশা ওদের। সে যাক গে…’ মেয়েটির গালে হাত রাখেন মহিলা, ‘তোমার কাছের কেউ আছে এখানে?’

‘না…’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে মেয়েটি।

‘যাওয়ার জায়গা আছে কোথাও?’

‘না…’

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে টানটান হয়ে দাঁড়ান মহিলা। তারপর হাতের একটা আঙুল তুলে হাওয়ায় একটা বৃত্ত আঁকতে আঁকতে বলেন, ‘বেশ, কাছের কেউ নেই, যাওয়ার জায়গাও নেই…তাহলে দেখা যাক, কোনও সময় আছে কিনা তোমার যাওয়ার মতো…’

মহিলার আঙুলের ইশারায় ধীরে ধীরে হাওয়ার মাঝে একটা নীলচে বৃত্ত তৈরি হতে শুরু করে। তার ওপারে একটা অচেনা জগৎ। বেশিক্ষণ চেয়ে থাকলে বোঝা যায় অনেক ছোট ছোট দৃশ্য খেলা করে যাচ্ছে সেখানে।

সেদিকে আঙুল দেখিয়ে মহিলা জিগ্যেস করেন, ‘বলো, কোন সময়ে যেতে চাও তুমি?’

মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে স্তব্ধ হয়ে দেখার চেষ্টা করে দৃশ্যগুলো। কিছুক্ষণ সেইভাবে চেয়ে থেকে বলে, ‘এমন কোনও সময়ে যেখানে ওই লোকগুলো নেই—।’

একটু থমকান থলথলে চেহারার মহিলা, তারপর বলেন, ‘দুঃখিত মাই লেডি। পৃথিবীতে এমন কোনও সময় নেই যখন ওরা নেই। ওরা সবসময় আছে। তবে…’

কী যেন লক্ষ করে আবার আঙুল দিয়ে ইশারা করেন মহিলা, ‘তোমাকে একজনের কাছে পাঠাতে পারি আমি। সেখানে ভালো থাকবে তুমি, কেমন?’

মেয়েটা খুশি হয়। কোলের বিড়ালটাকে চেপে ধরে তার মাথায় একটা চুমু খায় সে।

‘কিন্তু, তার বদলে তোমাকে যে একটা জিনিস দিতে হবে।’

হাতের বিড়ালটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে মেয়েটা, ‘আমার কুচিলাকে কিন্তু দেব না আমি।’

মহিলা হাসেন, ‘ওকে আমার চাইও না। ওসবে ভারি ভয় লাগে আমার। আমার সঙ্গে তোমাকে একটা ডিল করতে হবে।’

‘ডিল!’ মেয়েটা একটু ভয় পেয়ে বলে, ‘আমার মা বলে, ডেভিল মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে ডিল করে তার আত্মা কেড়ে নেয়…’

মহিলার মুখে একটা দুষ্টু হাসি খেলে যায়, ‘তোমার মা জানে না মাই লেডি। ডেভিল শুধু শরীর কেড়ে নিতে পারে। আত্মা বেচে দেয় সেই লোকগুলো যারা তোমার মাকে মেরেছে। ধর্মের কাছে বেচে, রাজার কাছে বেচে, দেশের কাছে বেচে…ওদের আত্মা খুব সস্তা। প্রাণ বাঁচানোর বদলে এত সস্তা জিনিস নিয়ে কী করব বলো তো? আমার শুধু তোমাদের শরীর দুটো দরকার!’

‘আমাদের! কিন্তু আমি তো…’

জঙ্গলের দিকে আঙুল তুলে দেখান মহিলা, একটু ছদ্ম রাগের ভঙ্গিতে বলেন, ‘আমার কাছে মিথ্যে বলে কিন্তু পার পাবে না মাই লেডি। তোমার যমজ বোন ওই জঙ্গলে লুকিয়ে আছে। তোমার মা আগেই ওদের হাত থেকে বাঁচাতে পার করে দিয়েছে ওকে…তাই না?’

মেয়েটার ইশারায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে ঠিক ওরই মতো দেখতে আর একটা মেয়ে। মহিলা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন ওদের দুজনের দিকে।

‘তবে ওকে এক্ষুনি নিয়ে যাব না আমি। যদি কখনও দরকার পড়ে, তখন আবার হাজির হব ওকে নিতে। ততদিন ও এখানে নিজের মতো থাক, কেমন?’

মেয়েটি আর কোনও কথা বলে না। মহিলা ইশারা করতে সেই নীল বৃত্তের দিকে পা বাড়ায় সে। একটা নীল আলোয় ভরে যায় চারপাশ। খুব দ্রুত যেন অনেক কিছু পাল্টে যেতে থাকে। সময়ের প্রবাহ অনুভব করে মেয়েটা, নিজের চারপাশে।

ওর পেছনের থলথলে মহিলা কখন যেন হারিয়ে যায় হাওয়ায়।

* * * *

‘অসম্ভব! তুই মিথ্যে বলছিস…আমি জানি তুই রোজ রাতে জানলার বাইরে থেকে আমার উপর নজর রাখতিস। আমি যদি ডাইনি হই তাহলে সেটা করার দরকার পড়ত না!’

মৌলি একটা অদ্ভুত হাসি হাসে, ওর ভেজা চোখ প্রশস্ত হয়, ‘আমি আপনার দিকে নজর রাখতাম ঠিকই, কিন্তু আপনাকে রক্ষা করতাম না। এই গ্রামকে রক্ষা করতাম আপনার থেকে।’

সায়ন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মৌলি বলে চলে, ‘এই ক’দিন আপনি যতক্ষণ এই গ্রামে ছিলেন ততক্ষণ আমি আপনার আশেপাশে ছিলাম।’

‘কিন্তু কেন?’

মৌলি পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করে। ওদেরকে ঘিরে ছোট ছোট আগুনের ফুলকি এখনও উড়ে চলেছে। রাতের অন্ধকার মাঠে অন্য সমস্ত আলো নিভে গেছে। কেবল কুয়াশার চাদর বিছিয়ে আছে এদিক-ওদিক। সেই চাদর কেটে হাঁটতে থাকে মৌলি। মনে হয় ওর গলার স্বর যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে, ‘এই পৃথিবীতে যেখানে কোনও ভয়াবহ শক্তি তৈরি হয়, তার ঠিক পাশাপাশি তৈরি হয় সেই শক্তির একটা নিয়ন্ত্রক। যা সেই শক্তিকে আয়ত্তে রাখে। যুগ-যুগান্ত ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। নাহলে দুনিয়া কবেই ধ্বংস হয়ে যেত। আমি না থাকলে এই গ্রাম এই ক’দিনে শ্মশান হয়ে যেত। এই ক’দিনে রোজ আপনার শরীর থেকে রক্ত মুছে দিয়েছি আমি। জানলায় আপনার রক্তাক্ত শরীর ছুঁয়ে যাবার দাগ মুছে দিয়েছি…’

‘কিন্তু কে তুই?’

এ প্রশ্নটা আগেও বহুবার করেছে সায়ন। কিন্তু উত্তর পায়নি। আজ ওর গলায় একটা অক্ষম আকুতি ঝরে পড়ে। মৌলি হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই থেমে যায়। আগের থেকে আরও বেশি মোহময় আরও স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ওকে। সায়নের কাছে এগিয়ে এসে ওর বুকের উপরে দুটো হাত রাখে ও। মাথা রাখে ওর বুকে। তারপর নরম গলায় বলে, ‘ওই তো শুনলেন একটু আগে ওষুধটার কথা, তাও চিনতে পারলেন না?’

‘ওয়াল্পারগা হাস্মানিন?’

‘উঁহু, যে তাকে ওষুধটা দিয়েছিল—’

‘শয়তান!’ কথাটা উচ্চারণ করেই পেছনে ছিটকে আসে সায়ন। মাটিতে পড়ে যেতে যেতে সামলে নেয়, ‘এতগুলো ধর্মগ্রন্থে যে শয়তানের কথা পড়েছি…’

মৌলি অভিমানী চোখে তাকায় ওর দিকে, ‘কোন ধর্মগ্রন্থে সায়নবাবু? যে গ্রন্থের দোহাই দিয়ে এত হাজার হাজার মানুষকে ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হল সেই গ্রন্থ? আজও লক্ষ লক্ষ মানুষকে যে গ্রন্থ একে অন্যের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে সেই গ্রন্থ পড়ে আপনি আমাকে চিনেছেন? এই ক’দিনে ভালোবাসলেন, আর চিনতে পারলেন না আমাকে?’

মৌলির চোখদুটো আহত হরিণের মতো ওর অন্তরকে বিদ্ধ করছে যেন। মেয়েটা ভালোবেসেছে ওকে! মৌলি ওকে ভালোবাসে। ও জানে। কিন্তু মৌলি…

মৌলি এগিয়ে এসে আবার ওর গালে হাত রাখে, চোখদুটো অভিমানে ভরা। মুখে কাঁচা হলুদের রঙ লেগে আছে। খোলা চুল ঝালরের মতো উড়ছে হাওয়ায়।

‘কী ভেবেছিলেন? কেমন হব আমি? কৃষ্ণাঙ্গ? শিং থাকবে মাথায়? ভাঁটার মতো লাল চোখ? সায়নবাবু…’ ওর একটা হাত নিজের হাতে নেয় মৌলি, ‘যে গ্রন্থ নারীর যৌন কামনাকে বিকৃত রেখায় আঁকে, নারীর শিক্ষাকে ডাইনি বলে বিকৃত রূপ দেয় তাদের আঁকা ছবিতে বিশ্বাস করেন আপনি?’

‘তাহলে কীসে বিশ্বাস করব?’

মৌলির মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘ভগবান আর শয়তান বলে কিছু হয় না সায়নবাবু। জানবেন যারা কোনওকিছুকে কেবল ভালো আর কেবল খারাপ বলে তারা আসলে সত্যি কথা বলে না। পৃথিবী ওই নিয়মে চলে না। আমি…’ মৌলিকে কিছুক্ষণ ভাবতে হয়, ‘আমি শুধু প্রকৃতির নিয়ম। যে ভালো আর খারাপের একটা ভারসাম্য রক্ষা করে। আমি একা নই…’

সায়ন কিছু বলতে পারে না। মৌলি মুখ নামিয়ে নেয়। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে বলতে থাকে, ‘গঙ্গার সন্তান আপনি। ওর ভিতরে জমা হওয়া ক্রোধ আর প্রতিহিংসা থেকে আপনার জন্ম হয়। এক প্রাচীন ঔষধি আপনার ভেতর দুটো সত্তার জন্ম দেয়। এক, আপনার নিজের আর দুই, এক প্রাচীন দানবের। আপনারা কেউ কাউকে চিনতেন না। কিন্তু দুজন একই দেহে বাস করতে থাকেন।

সন্তানের মধ্যে যে দ্বৈত সত্তা আছে তা একমাত্র গঙ্গা জানত। সে জানত আপনাকে যত কাছে রাখবে তত আপনার মধ্যে মনুষ্যত্বের ভাব কমে গিয়ে দানবের ভাব বাড়তে থাকবে। তাই আপনাকে দূর শহরে পাঠিয়ে দেয় ও। কখনও আপনার সামনে যায়নি। এরপর আপনি যখন এই গ্রামে আসেন তখন থেকেই আপনার ভেতরে রোজ রাতে এক দানব জাগ্রত হয়। রোজ রাতে বিছানা থেকে উঠে আপনি দানবরূপ ধারণ করেছেন।

আপনি যে মুহূর্তে এই গ্রামে আসেন তখনই গঙ্গা টের পেয়ে যায়। তীব্র অনুশোচনাতেও ভুগতে থাকে সে। যদিও আপনার ভেতরকার ওই দানবটা আসলে তারই রাগ, ঘৃণা কিংবা প্রতিহিংসা যাই বলুন—তার ফসল, তবু তার হাতে দিনের পর দিন এতগুলো মানুষকে খুন হতে দেখে নিজেকে দায়ী করত গঙ্গা, কারণ জন্মটাও সে-ই আপনাকে দিয়েছিল। তাই, খানিকটা গায়ে পড়েই আমি আলাপ করি আপনার সঙ্গে। আমি জানি, আমি সঙ্গে থাকলে আপনার শক্তিকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব। বেছে বেছে ঠিক সেই মানুষগুলোকেই হত্যা করতে পারব যাদের আমি হত্যা করতে চাই। যাদের শাস্তি পাওয়া উচিত। আপনি প্রথম খুনটা যেদিন করেন সেদিন আমি আপনার সঙ্গেই ছিলাম। যদি আমি না থাকতাম ওই শিশু দুটোকেও খুন করতেন আপনি।

যেদিন ওরা এখানে আমাকে বেঁধে নিয়ে আসে সেদিনই জানতাম আমার খোঁজে আপনি এখানে আসবেন। ঘটেও তাই। আপনি ওদের দুজনকে খুন করতে আমি ওখান থেকে পালিয়ে যাই। হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম আপনি ওদের সবাইকে মেরে ফেলুন। যারা একটা কিশোরী মেয়েকে বেঁধে রেখে তার উপর অত্যাচার করতে পারে তাদের বেঁচে থাকার কোনও প্রয়োজন নেই।

জঙ্গলের ভেতর আমার পুরোহিতমশায়ের সঙ্গে দেখা হয়। তার কাছে আমি বলি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য লুকিয়ে রাখতে। কিন্তু তিনি আমায় খুন করে আমার দেহটা জঙ্গলের ভিতরেই ফেলে রাখেন।

পরেরদিন আমি আবার আপনার কাছে ফিরে আসি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আর বাইরে থেকে আপনার উপর লক্ষ রাখা সম্ভব নয়। আমাকে আপনার সঙ্গেই থাকতে হবে।’

‘কিন্তু গঙ্গা মরতে চাইল কেন?’

‘মৃত্যু খুব খারাপ আপনার কাছে, তাই না?’ মৌলি আদুরে গলায় বলে, ‘গঙ্গাকে সত্যি খুব ভালোবাসতাম আমি। ওর মতো মানুষ আমি কোনওদিন দেখিনি…’

কথাগুলো বলতে গিয়ে মৌলির মুখে একটা করুণ হাসি খেলে যায়, ‘আপনি যখন এই গ্রামে আসেন তখন গঙ্গা ভয় পেয়েছিল। ও জানত একদিন আপনি অজান্তেই ধরা পড়বেন। ওর কাছে দুটো পথ খোলা ছিল। এক, এই গ্রাম থেকে বহু দূরে পালিয়ে যাওয়া, আর দুই, আত্মহত্যা করা। দুটোর একটারও প্রয়োজন হয়নি কারণ আমি ছিলাম। আমি আপনার শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম।

কিন্তু গন্ডগোলটা হল যখন ওরা আমাকে ধরে নিয়ে গেল। গঙ্গা বুঝতে পারল ও এখানে থাকলে আজ না হোক কাল আপনার ভেতর যে একটা ডাইনি লুকিয়ে আছে সেটা ধরা পড়ে যাবে। আর একবার ডাইনি হিসেবে ধরা পড়লে তার ফল কী হয় সে তো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন…তাই ও ঠিক করে ও আত্মহত্যা করবে…’

‘কিন্তু পালিয়ে গেল না কেন?’

‘কোথায় পালাবে সায়নবাবু? ওর বয়স হয়েছিল। এই ঘর, এই বাড়ি, ওর ছোটবেলা, ওর গড়ে তোলা ওই পাতার ছাউনি, ওর গ্রাম, এসব ছেড়ে আর পালাতে চায়নি ও। ও ঠিক করে আত্মহত্যা করবে। কিন্তু করার আগে একবার আপনাকে দেখতে চেয়েছিল। সেজন্যই সেদিন ওই রকেটের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম আপনাকে। কিন্তু ও সেখানে আসার আগেই গ্রামের লোকজন ওখানে চলে আসে…তারপর যা ঘটে আপনি জানেন।’

‘কিন্তু তাহলে মৌলির শরীর…’

‘প্রথমে যে মৌলির সঙ্গে দেখা হয়েছিল আপনার, আর এই আমি যে আপনার হাতটা ধরে আছি, এই দুটো শরীর আলাদা। প্রথম শরীরটার মৃত্যুর পর, ধরে নিন একে ডেকে নিয়েছি আমি…আপনার জন্য। হয়তো অন্য কোনও…সময় থেকে! সেখানে হয়তো…অবিকল মৌলির মতো এই শরীরটা নিয়েছিল কেউ। অপেক্ষাই করছিল হয়তো। একটা চুক্তি ছিল আমার সঙ্গে…’

‘যমজ?’ ফিসফিস করে জিগ্যেস করে সায়ন।

‘কী আসে যায় সায়নবাবু? বলেছিলাম না আপনাকে…শরীরে কিচ্ছু থাকে না। আপনি এ গ্রামে এসে শুধু আমাকেই চিনেছেন। আর কাউকে না…’ ওর হাতটা চেপে ধরে আবার টান দেয় মৌলি, ‘আজ অনেকটা ফাঁকা জায়গা আমাদের সামনে। এক জায়গায় নিয়ে যাই আপনাকে—’

‘কোথায় যাব আমি?’

‘এতদিন তো আমি যেখানে নিয়ে যেতাম সেখানেই যেতেন। আজ হঠাৎ যেতে চাইছেন না যে?’

সায়ন আর আপত্তি করে না। দুজন মিলে আবার ছুটতে থাকে কোন অনন্তের উদ্দেশে। যেন জীবনের পর জীবন চলে গেছে। ওরা দুজন কেবল এক জীবন থেকে আর এক জীবনে মহাকালের রেখে যাওয়া পথে দৌড়ে যেতে থাকে। চতুর্দিকে আগুনের ফুলকি উড়ছে। ঝলসানো গাছের পাতা ছাই হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে মাঠের যত্রতত্র। যেন আকাশ থেকে খসে পড়েছে নক্ষত্রপুঞ্জ। অন্ধকার জেগে আছে কেবল। চোখ বন্ধ করে নেয় সায়ন। পরমুহূর্তে চোখ খুলতেই দেখল ও দাঁড়িয়ে আছে সেই ইউটিলিটি পোলের একেবারে উপরের রেলিংটায়।

এখান থেকে নিচের পৃথিবীটা দেখাচ্ছে কোনও অপরিচিত গ্রহের মতো। গঙ্গার পোড়া শরীর, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ, কোথাও কেউ নেই। শুধু চরাচর জেগে আছে। দূরে সেই অদ্ভুত ঝিলটা চাঁদ বুকে নিয়ে চেয়ে আছে ওদের দিকে।

সামনে তাকিয়ে মৌলিকে দেখতে পায় সায়ন। এখন ওকে আগের থেকে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। সেই ভাবেই চোখ তুলে ওর দিকে চায় মেয়েটা। তারপর সুরেলা গলায় বলে, ‘কেন এখানে আপনাকে আনলাম বলুন তো?’

‘জানি না…’

‘আপনি কীসের খোঁজ করছিলেন যেন? মায়ের?’

উপর থেকে নিচে তাকাতে মাথাটা ঘুরে যায় সায়নের। এত উঁচু থেকে নিচে তাকানোর অভ্যেস নেই ওর। মনে হয় এক্ষুনি টলে পড়ে যাব।

‘দেখুন সায়নবাবু, নিচে তাকালে দেখতে পাবেন মাকে। যে মাকে আমরা খুঁজে বেড়াই চিরকাল—অথচ বুঝতে পারি না আমরা পায়ে পায়ে কেবল তার দিকেই হেঁটে চলেছি।’

‘নিচে…’ সায়নের কথা আটকে যায়।

‘এখান থেকে নিচে পড়লে অবধারিত মৃত্যু। তাই না? মৃত্যু মা নয় আপনার কাছে? জন্ম থেকে, যন্ত্রণা থেকে, বিচ্ছেদ থেকে এক অনন্তের পথে নিয়ে যায় না আপনাকে? সে কোল পেতে অপেক্ষা করে…জীবনের গ্লানিতে নিমজ্জিত আপনার ঠোঁটে অনন্ত শান্তির স্তন চেপে ধরে না?’

কোনওরকমে একটা রেলিং চেপে ধরে সায়ন। শনশন করে ভেসে আসা হাওয়ায় ওর শরীর কেঁপে যায়। ওর একটা হাত ধরে আবার মাটির দিকে শরীর ছেড়ে দেয় মৌলি। হাওয়ার চাদর বেয়ে নেমে আসতে থাকে ওদের শরীর। সায়ন অনুভব করে ওর শরীরের সব যন্ত্রণা, একটু আগে ওর মায়ের পুড়ে যাওয়া, মৌলির রক্তাক্ত শরীর, ওর সেই পুরনো বই, পুরনো ঘর পুরনো মা সব কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে মুহূর্তে…

চোখ খুলে সায়ন দেখে ও দাঁড়িয়ে আছে খোলা মাঠের মাঝে। মৌলি ওকে ফেলে হেঁটে এগিয়ে গেছে কিছুদূর। দূর দিগন্ত যেখানে উজ্জ্বল হয়ে আছে সেদিকে ধীর পায়ে হাঁটছে ও। কোথায় যেন যাবার তাড়া আছে ওর। ও ছুটে যায় ওর পেছন পেছন, ‘কোথায় যাচ্ছিস তুই?’

‘আমার তো যাবারই কথা ছিল সায়নবাবু।’

‘কিন্তু আমার কী হবে?’

‘শহরে ফিরে যান। নিজের ঘর, নিজের বাবা, নিজের কাজ আছে। মাকে খুঁজতে হবে না। তিনি একদিন নিজেই এসে ধরা দেবেন। অন্য কিছু আসুক না আসুক, মা আসবেই…’

‘আর তুই?’

মৌলি দুটো হাত রাখে ওর গালে। ভারি মিষ্টি দেখায় ওর মুখটা। চোখদুটো ছলছল করে মেয়েটার, তাও মুখে হাসি টেনে বলে, ‘আমার কথা তো জানতেই পারবেন। ধর্মগ্রন্থ পড়ুন, সমকামে তোল্লা দি, অ্যানাল সেক্স করি, নরকের কড়ায় ভাজাভুজি করি…’

‘না, ওসবে বিশ্বাস করি না আমি…’

মৌলির ছলছলে চোখে অনন্ত প্রাচীন বিশ্বের, সভ্যতার এক চিত্র দেখতে পায় সায়ন। চেনা চেনা লাগে, আবার পরমুহূর্তে হারিয়ে যায় কোথায়। সবটা গুলিয়ে যায় ওর কাছে। ও শুধু চিৎকার করে ওঠে, ‘তুই ভালোবাসিসনি আমায়?’

ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে কোথা থেকে। যেন একটু আগে পুড়ে যাওয়া মানুষটার শরীর শান্ত করে দেওয়ার এক অক্ষম চেষ্টা করছে কেউ। সে বৃষ্টির জলে ভিজতে থাকে ওরা দুজন। ওদের শরীরও যেন শীতল হয়ে আসে।

‘আমি সূর্যোদয় দেখেছি আপনার সঙ্গে। অন্য সব সূর্যের থেকে আলাদা ছিল সেটা। স্পর্শ করেছি আপনাকে, তেমন স্পর্শ আর কোথাও পাইনি আমি, সেদিন রাতে যখন এসে আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন তখন প্রথমবার মনে হয়েছিল ভীষণ ক্লান্ত আমি। সেদিন আমার চোখের দিকে যখন মুগ্ধ হয়ে চেয়েছিলেন তখন মনে হয়েছিল এই শরীরটা সত্যিই আমার। অন্য কারো নয়…যে সাজে কোনওদিন সাজতে পারব না সেই সাজ দেখাতে ইচ্ছা করেছিল আপনাকে। মৃত্যুর সাজ। আর…আর জানেন, আপনি অপেক্ষা করলে ভালো লাগত আমার। রোজ সকালে উঠে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যখন মনে হত কেউ অপেক্ষা করছে আমার জন্য তখন ভালো লাগত আমার ভীষণ। একে কি ভালোবাসা বলে সায়নবাবু?’

বৃষ্টির তেজ এবার দৃশ্য ঢেকে দিতে শুরু করেছে। মৌলি একটু পিছিয়ে যায় ওর শরীর থেকে, তারপর আর একটু। হঠাৎ পেছন ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। দূরে, যেখানে ঘন জঙ্গল কালো হয়ে প্রায় মিশে এসেছে আকাশে গায়ে। সেদিকে ছোট হতে থাকে ওর শরীরটা।

‘আমি যাব তোর সঙ্গে, নিয়ে যা আমাকে…’ সামনের পথ কাদা হয়ে গেছে এর মধ্যে। পা দিলে দেবে যাচ্ছে প্রতিপদে। তারই মধ্যে দিয়ে আছাড় খেতে খেতে দৌড়াতে শুরু করে সায়ন। মৌলি চলে যাচ্ছে! আর কোনওদিন দেখতে পাবে না মৌলিকে। ওর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। বৃষ্টির জলের ছাট এসে ওকে ঢেকে দেয়। চিরকালের মতো প্রকৃতির বুকে মিশে যায় মৌলি…

কাদামাটির উপর আছাড় খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে যায় সায়ন। ওর চোখের জল এসে মিশতে থাকে পোড়া ছাই আর কাদায়। যেন মৃত্যুর পর ওর শরীর মিশছে মাটিতে…

‘মৌলি…যাস না এখানে ফেলে…’ চিৎকার করতে থাকে ও মাটিতে শুয়ে। বারংবার চিৎকার কখন যেন বদলে যায়, ‘মা, আমাকে ছেড়ে যেও না মা গো…।’ মাতৃহারা শিশুর মতো মায়ের শরীর পোড়া ছাই আর কাদামাটি আঁকড়ে ধরে লুটিয়ে পড়ে সায়ন…