কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১৪

চতুর্দশ অধ্যায়

বুড়ো বটের তলায় তাস খেলতে বসেছিল চারজন। তিনজনের হাতে গাঁজার কলকে। অন্য হাতে আটটা করে তাস। ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে বটতলা।

এই তাসের আসরের নেতা যদুনাথ। খেলায় বরাবর সে-ই জেতে। ফলে তার সাগরেদ করা হয়েছে নিমাইকে। সে নতুন খেলতে শুরু করেছে, তার উপর বুদ্ধিসুদ্ধি একটু কম। স্মৃতিশক্তিও ততটা পাকাপোক্ত নয়। তবে নেশাটা জমেছে ষোল আনা।

ডাইনি আতঙ্কে রাতের দিকে গ্রামের লোকজন তেমন ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। কিন্তু এই চারজনের না বেরিয়ে উপায় নেই। রোজ মাঠেঘাটে কাজ করার পরে তাস খেলা ওদের নেশা। সেইসঙ্গে ভরপুর গাজায় দম। ঘরে বসে যদি বা তাস খেলা চলে, গাঁজা টানা দায়। সকলেরই বাড়িতে বউ বাচ্চা আছে।

তবে আজ সকলেই যেন একটু অন্যমনস্ক। থেকে থেকে পিছন ফিরে দেখছে, রঙের কার্ড ভুলে যাচ্ছে কেউ কেউ।

কার্ডের পাসে একটা উজ্জ্বল হ্যারিকেন রাখা। বটতলার আশেপাশে ওদের চারটে দৈত্যাকৃতি ছায়া তৈরি হয়েছে। সেগুলো যেন মাঝে মধ্যেই জীবন্ত হয়ে ওদের নড়াচড়া ভুলে নিজেরাই খানিক নড়ে উঠছে। সামান্য ডালপালা ভাঙার আওয়াজে ত্রস্ত হয়ে পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে কেউ।

পাকা খেলোয়াড় যদুনাথ আশপাশ থেকে মন ঘুরিয়ে তাসের দিকে তাকায়। ভালো হাতে পড়েছে, গোলাম, চোদ্দো দুটোই মজুত। দুম করে কুড়ি হেঁকে বসে সে।

ভজা পাশ থেকে ‘পাস’ বলতে যাচ্ছিল তার আগেই থেমে গিয়ে খিস্তি করে, ‘আরে কোন শুয়োরের বাচ্চা তাস বেঁটেছে? খেলা হচ্ছে টোয়েন্টিনাইন আর দুরি গুঁজে দিয়েছ?’

‘দুরি আবার কে দিল?’

অন্য দিক থেকে হরেন প্রতিবাদ করে ওঠে, ‘তুই শালা মদের ঘোরে কী না কী দেখেছিস…কই দেখি…’

চারটে কার্ড প্রায় ছিনিয়ে ওর হাত থেকে টেনে নেয় ভজা। তারপর ভালো করে তাকিয়ে দেখে সত্যিই তো। একেবারে ডানদিকে একটা হরতনের দুই ঝলমল করছে।

যদুনাথ এবার তাসটা নিজের হাতে নেয়। নেশা করলেও তার দৃষ্টি এখনও স্বচ্ছ আছে। কার্ডের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকায়। কোথায় দুরি? টেক্কাই আছে তো। লালপান টেক্কা, কিন্তু কার্ডটা হাতে নিয়ে সে থমকে যায়।

আগের দুজনের ভুল দেখার কারণটা সে বুঝতে পেরেছে। গাঁজার ঘোলাটে দৃষ্টিতে তারা একটা ফোঁটার জায়গায় দুটো ফোঁটা দেখেছে, কারণ তাসের উপর এই মুহূর্তে একটা নতুন ফোঁটা যোগ হয়েছে। এবং সেটা তরল। তার নিচের দিকটা সরু হয়ে গড়িয়ে আসার ফলে পান পাতার মতো দেখাচ্ছে!

আঙুল দিয়ে সেই ফোঁটা স্পর্শ করে নাকের কাছে আনতেই কার্ডটা যদুনাথের হাত থেকে খসে পড়ে। ফোঁটাটার রঙ লাল শুধু তাই নয়—সেটা রক্ত!

কিন্তু কার্ডের ওপর কী করে…

ভজা যেখানে বসে আছে তার ঠিক ওপরে একটা ঝাঁকড়া মাথা গাছ। অন্ধকারে কুপকুপ করছে তার মাথাটা। ডালপালার জটা জালে ভরে আছে জায়গাটা। যদু কাঁপা কাঁপা স্বরে ডাক দেয়, ‘ভজা রে, তোর মাথার ওপরে…’

এতক্ষণে ভজা নিজেও লক্ষ করেছে তার পায়ের কাছে কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়ে আছে। অন্তত কিছুক্ষণ ধরে পড়ছে রক্তটা। তার গাঁজার নেশা কেটে যায়। চারজনে এবার ছিটকে এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পড়ে। যদুনাথ থমথমে কাঁপা গলায় ডাক পাড়ে, ‘গাছের মাথায় কে?’

তার উপরে কুয়াশায় জমাট হয়ে আছে। হ্যারিকেনের হলুদ আলো গাছের মাথায় যেতে যেতে ফিকে হয়ে কমলা হয়ে গেছে। প্রাচীন মহাবৃক্ষের মতো রহস্যের ঘন অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে সেখানে। চারজোড়া চোখ সেই অন্ধকারের দিকে স্থির!

চারজনেই বুঝতে পারে এক্ষুনি উপর থেকে কিছু একটা নেমে আসবে। পালাতে চেয়েও পালাতে পারছে না ওরা। বুঝতে পারছে গাছের মাথায় যে আছে তার সঙ্গে গতিতে পেরে ওঠার ক্ষমতা ওদের শরীরে নেই।

কয়েক সেকেন্ড পর কিছু একটা গাছের ডাল থেকে নেমে আসে নিচের দিকে। একটা বাচ্চা ছেলের দুটো পা। ছেলেটার সমস্ত শরীর থেকে টপটপিয়ে রক্ত পড়ছে। যেন আপাদমস্তক রক্তে স্নান করানো হয়েছে ওকে। তবে গায়ে ক্ষত কিংবা মুখে কোনও যন্ত্রণার চিহ্ন নেই।

থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে ওরা চারজন। এমন বিকট একটা মূর্তি ওদের রক্তও জল করে দেয়। তাও যদুনাথ সাহস এনে জিগ্যেস করে, ‘কে তুই? ওখানে কী করছিস?’

মণি হাসে, ‘ওমা! খেলা দেখছিলাম তো। তোমরা ওই নিচে বসে তাস খেলো, আমি দেখি, আমিও তাস খেলতে শিখে গেছি জানো?’

‘কিন্তু তোর সারা গায়ে এত রক্ত!’

‘ধুস…’ মণি হাত নাড়িয়ে একটা ভঙ্গি করে, ‘তোমরা এত ভয় পাচ্ছ কেন? তোমরা রক্ত আগে দেখোনি নাকি?’

‘তুই ওখানে কী করছিস? নিচে নেমে আয় এক্ষুনি…’

‘নামব? নামলে কিন্তু ভয় পাবে তোমরা!’ হঠাৎ করেই একটা ছোট ঝাঁপ মেরে নিচে নেমে আসে মণি। ওর পায়ের ঠিক নিচেই হ্যারিকেন জ্বলছিল। একটু হেসে আচমকাই হ্যারিকেনটায় একটা লাথি মারে সে। একটু দূরে ছিটকে পড়ে সেটা। আর সঙ্গে সঙ্গে গোটা জায়গাটাকে ঘিরে ঘন অন্ধকার নেমে আসে। আলোর একমাত্র উৎসটাও বন্ধ হয়ে যায়।

‘কী ভয় করছে এবার?’

‘সব কাজ কি আলোয় হয় যদুনাথ? কিছু কাজ তো অন্ধকারের জন্য তুলে রাখতে হয়…’ কথাটা সম্ভবত মণিই বলেছে। কিন্তু তার গলাটা বদলে গেছে ঘ্যাসঘেসে অদ্ভুত একটা স্বরে। ঠিক কোন দিক দিয়ে সেটা এসেছে তা বোঝা যাচ্ছে না। ওদের মনে হয় ওদের ঘিরে অনেকগুলো অস্তিত্ব যেন ছুটে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। চাপা হাসির শব্দ আসছে বাতাসে ভেসে। একটু আগে মণির করা প্রশ্নটা এখনও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

বাঁ-পাশ থেকে মচ্‌ করে একটা আওয়াজ এল। যদুনাথ পকেট থেকে দেশলাই বের করে সেদিকে তুলে ধরল। নিমাই তাকিয়ে আছে ওর থেকে। চোখের দৃষ্টি আতঙ্কে ভরা। যদু গলা তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই খেয়াল করল ওর গলার কাছ থেকে অজস্র সরু রক্তের ধারা নামছে। পরক্ষণেই বুঝতে পারল না ওটা গলা নয়, ঘাড়। কেউ এক মোচড়ে নিমাইয়ের মাথাটা পেছনদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

একটা আর্ত চিৎকার করে পিছিয়ে আসে যদু। দেশলাইটা আবার জেলে উপরে তুলে ধরে। আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ভয়টা এখনও দামামার মতো ওর বুকে বাজতে থাকে।

হঠাৎ পায়ের কাছে কীসে যেন হোঁচট খেল যদু। চোখ নামিয়ে নিচে তাকাতে দেখল ভজা পড়ে আছে মাটিতে। তার শরীরের একটা দিক অন্ধকার অন্যদিকে হ্যারিকেনের আলো গিয়ে পড়েছে। চোখ বিস্ফারিত।

ভজার হাত ধরে টানতে গিয়েই থমকে গেল যদু। শরীরটা মাছের মতো মাঝখান থেকে কাটা। একটা হাত, একটা পা, একটা চোখ—নেই।

‘সবাই মরে গেল জেঠু…তুমি একা একা আর কী করবে বলো?’ মণির গলা ভেসে আসে।

যদুনাথ পড়ে গেছে মাটিতে। হ্যারিকেনের অল্প আলোয় ও লক্ষ করে বাচ্চা ছেলেটা একটা মাঝারি পাথর এনে চাপালো ওর বুকের উপর। তারপর আর একটা পাথর, তারপর আরেকটা। ওর নড়াচড়া করার ক্ষমতা নেই। কোথা থেকে যেন একটা নীল আলো আসছে। সেটা ক্রমশ গ্রাস করছে ওকে। সেই সঙ্গে পাথরের ওজন। যদুনাথ বুঝতে পারল জমতে থাকা পাথরের ভার ক্রমশ ওর পাঁজর ফাটিয়ে ফুসফুসটাকে থেঁতো করে দেবে।

* * * *

এই মুহূর্তে সায়নের সামনে সামনে এগিয়ে চলেছে মৌলি। ওর শরীরের প্রায় কোনও অংশই দেখা যাচ্ছে না। গোটাটা ঢেকে আছে একটা হুডিতে। মুখটা অন্ধকারে ঢাকা। তার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে কেবল কপাল বেয়ে নেমে আসা চুল দেখা যাচ্ছে।

‘আমার ভাই অবাক লাগছে, জানিস?’

‘কোনটা?’

‘এই ক’দিন আগে তোর সঙ্গে আমার দেখা হল, আর আজ এমন লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি…’

‘তাই নাকি! একটা মরা মানুষের সঙ্গে কথা বলছিস—সেটা আশ্চর্য নয়?’

‘ওটা নিয়ে আমি এখন ভাবছি না। তুই আমার সামনে আছিস এটাই যথেষ্ট। হয়তো তুই আমার কল্পনা, হয়তো আমি ছাড়া তোকে অন্য কেউ দেখতে পায় না…’

‘যদি দেখতে না পেত তাহলে এই লুকিয়ে থাকার তো দরকার ছিল না আমার, তাই না?’

মাঠের মাঝামাঝি সেই ইলেকট্রিকের পোস্টটার কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। তবে সেটা বেয়ে আজ আর ওপর দিকে ওঠে না ওরা। কোনওরকমে কোমরে ভর দিয়ে একটা রেলিঙের উপরে উঠে বসে সায়ন। মৌলি বসে ঠিক ওর পাশে।

মৌলির শরীরে আগের শক্তি যেন আবার ফিরে এসেছে। আগের থেকে অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে সে। মুখের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে যেন যা চাইছিল, তা আর কিছুক্ষণ পরেই হতে চলেছে। সায়ন জ্যাকেটটা ভালো করে গায়ে জড়াতে জড়াতে বলে, ‘বল, কী বলার ছিল এবার?’

ওর দিকে একটা ফুল এগিয়ে দেয় মৌলি, বলে, ‘এটাই এই এলাকায় শেষ ডাইনির ফুল। আর একটাও নেই, ফুটবেও না…’

‘তাহলে এরপর থেকে আমাকে কী দিবি?’

মৌলি অন্য দিকে চায়, ‘দেওয়ার দরকার পড়বে না। আজকের পর তোর সঙ্গে আমার আর দেখা হবে না।’

‘মানে?’ সায়ন চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এসব কী বলছিস তুই?’

‘বলেছিলাম না আমি চলে যাওয়ার আগে তোকে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাব…’

‘কোথায় চলে যাবি?’

হাত তুলে উপরের দিকে ইউটিলিটি পোলের চুড়োটা দেখায় মৌলি, ‘এই রকেটটা আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে, কবে থেকে অপেক্ষা করে আছি বল তো?’

‘ধুর, তোর এই হেঁয়ালি রাখ, পরিষ্কার করে বলে দে যে আমি কিছু বলতে পারব না।’

সায়ন যে অভিমান করেছে সেটা বুঝতে পারে মৌলি, গলা নরম হয়ে আসে ওর, ‘একটা জায়গায় যেতে হবে আমাকে। আমরা যা শুরু করেছিলাম সেটাকে শেষ করতে হবে।’

‘কী শেষ করার কথা বলছিস তুই? আর তোরা বলতে? তুই আর তোর মা?’

ঘাড় নাড়ায় মৌলি, ‘না, আমার মা খুব সাধারণ একটা মানুষ। আমার জন্ম তার থেকে অনেক অনেক বছর আগে…’

‘তোর জন্ম তোর মায়ের আগে?’ সায়ন একটুক্ষণ কথাটা বোঝার চেষ্টা করে, সব গুলিয়ে যায় ওর। মৌলির হাত চেপে ধরে, ‘দেখ, কার জন্ম কবে, কে কাকে খুন করেছে, কে ডাইনি আর আর কে নয়—আমি জানতে চাই না। আমার এসবে আর কিছু যায় আসে না। আমি তোকে কোথাও যেতে দেব না। দরকার হলে আমরা এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাব…’

সায়নের হাতের উপর একটা হাত রাখে মৌলি, ‘আমরা কোথাও থেকে পালিয়ে যেতে পারব না। আমরা পালাতে পারি না…’ কথাটা বলে ওর থুতনিতে হাত রেখে মুখটা ওর দিকে ফিরিয়ে নেয় মৌলি। অপলকে চেয়ে থাকে ওর চোখের দিকে। যেন বহু যুগের অদেখা আকাঙ্ক্ষা কয়েক সেকেন্ডে মিটিয়ে নিতে চায়।

‘তুই বলেছিলি আমাকে ছেড়ে যাবি না?’ মৌলি সায়নের দিকে কেমন ব্যথা ভরা দৃষ্টিতে তাকায়।

‘চলে গেছি কি?’

‘আমি চলে গেলে, চলে যাবি?’

বিরক্ত হয় সায়ন। ওর হাতদুটো ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘কেউ চলে গেলে অন্যজনের চলে যেতে আর বাধাটা কোথায়? তাছাড়া তুই কে, কোথায় যাবি, কেন যাবি—আমি কিছুই জানি না…’

‘সবকিছু না জানলে যাবি না?’

ওর কাঁধে মাথা রাখে সায়ন। অনেকক্ষণ কিছু কথা বলে না। শেষে একসময় শিশুর মুখে সদ্য ফোটা বুলির মতো শোনা যায়, ‘তুই যেখানে যাবি, আমি চলে যাব তোর সঙ্গে!’

ওর দুটো হাত সায়নের গলা জড়িয়ে ধরে। সায়নও কাছে টেনে নিতে চায় ওকে। এক অদ্ভুত অজানা অন্ধকারের স্রোতে হারিয়ে যায় ওরা। আর সঙ্গে সঙ্গে কিছু উজ্জ্বল আলো এসে পড়ে ওদের দুজনের মুখের উপর। দূর থেকে মানুষের হট্টগোলের শব্দ শোনা যায়।

মৌলি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মুখের উপর আরও বেশিকরে টেনে নেয় হুডিটা। হট্টগোলটা দ্রুত কাছে এসে পড়ে। নিচ থেকে চিৎকার ভেসে আসে, ‘গঙ্গাকে আমাদের হাতে তুলে দিন সায়নবাবু, আপনি যাকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন সে অনেকগুলো মানুষকে খুন করেছে…’

লোকগুলোকে চিনতে পারে সায়ন। এরাই মৌলিকে ধরে নিয়ে গেছিল। প্রভাকরকে দেখতে পায় ও। আজ ওদের দলটা আরও ভারী। আরও বেশি হিংসা ওদের চোখে-মুখে। পুলিশের একটা দল একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের হাতে লাঠি আর বন্দুক দু’ধরনের অস্ত্রই আছে। সায়ন বুঝতে পারে কোনওভাবে ওদের খবর পেয়ে এত অবধি ধাওয়া করে এসেছে ওরা।

‘পালাতে হবে আমাদের…’ হিসহিস করে ওঠে সায়ন।

ওর হাতের উপর একটা হাতের চাপ বেড়ে ওঠে। নষ্ট করার মতো আর কোনও সময় নেই। এক লাফে রেলিং থেকে নিচে নেমে পড়ে দুজনে। সায়ন একবার দূরত্বটা মেপে নেয়। তারপর মৌলির হাত ধরে দৌড়াতে থাকে জঙ্গলের দিকে।

দুটো গুলি ছুটে আসে ওদের দিকে। সেগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। সম্মিলিত জনতার দল ওদের ধাওয়া করে। ইটের টুকরো ছুটে আসে। মাঠে আলোর অন্য কোনও উৎস নেই। কিন্তু মশালের আলোয় প্রায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে জায়গাটা। মৌলির ঠিক পেছনে ওকে ঘিরে দৌড়াতে থাকে সায়ন।

দৌড়োতে দৌড়াতে সায়ন বুঝতে পারে ওর দম কমে আসছে। আর একটু পরেই উল্টে পড়বে মাটির উপরে। একটা গুলি প্রায় ওর জামার হাতা ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। আর একটা গুলি এসে লাগে মৌলির কব্জির কাছে। যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে মৌলি। সায়ন আরও শক্ত করে ধরে ওকে। প্রায় আছাড় খেয়ে পড়তে পড়তে দুজনে ঢুকে যায় জঙ্গলে।

পেছন থেকে চিৎকার শোনা যায়, ‘বুড়ি মাগির নাগর হয়েছিস না? তোরা যেখানেই যা, এখান থেকে পালাতে পারবি না। ধরে তোদের ফেলবই…তারপর তোদের দুটোকে একসঙ্গে…’

জঙ্গলের ভেতর ঢুকে খানিকটা দৌড়ানোর পর ওরা দুজন বুঝতে পারে উত্তেজিত জনতার দলটা আর ওদের ধাওয়া করছে না। সম্ভবত জঙ্গলটাকে ঘিরে ফেলেছে ওরা। যে-কোনও প্রান্ত দিয়ে বের হতে চাইলেই আক্রমণ করবে।

মৌলি একটা পাথরের উপর বসে পড়ে। ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি ঠিক আছেন তো?’

সায়ন হাঁপাতে হাঁপাতেই ওর হাতের ক্ষতটার উপর ঝুঁকে পড়ে, গলগলিয়ে রক্ত বের হচ্ছে সেখান থেকে।

সায়ন বিড়বিড় করে, ‘কারও হেল্প দরকার! এক্ষুনি রক্তটা থামাতে না পারলে…’

‘মরা মানুষ আবার মরে যাবে, তাই তো?’

সায়ন ওর হাতদুটো চেপে ধরে, ‘রক্ত বইছে তোর শরীরে! তোকে অন্য সবাই দেখতে পাচ্ছে, তুই আমার কল্পনা না…’

আশেপাশে তাকিয়ে কী যেন খুঁজতে থাকে মৌলি, ‘এক ধরনের পাতা পাওয়া যায় এখানে। সেটা লাগালে এক্ষুনি রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে…’ মাটির উপর ঝুঁকে সেই পাতাই যেন খুঁজতে থাকে সে।

‘গ্রামের লোকজন গঙ্গার উপরে খেপেছে তো বুঝলাম, কিন্তু পুলিশের দলটা কী করছে বুঝলাম না…’ সায়ন জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলে।

‘একজন খেপিয়েছে একজনকে, সে আর একজনকে—।’

সায়ন উঠে দাঁড়াতেই খেয়াল করে ওর পকেটে মোবাইলটা বাজছে। কে ফোন করল এখন? কলটা কেটে দিতে যাচ্ছিল। তার আগেই নামটা দেখে ও থেমে যায়। সেই সাংবাদিক মেয়েটা ফোন করেছে। কিন্তু সে হঠাৎ অকারণে কেন ফোন করবে ওকে? ও ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা উত্তেজিত গলা শুনতে পায়, ‘মিস্টার মজুমদার, কোথায় আছেন আপনি?’

সায়ন সরাসরি উত্তর দেয় না, ‘গ্রামের অবস্থা ভীষণ খারাপ। গঙ্গাকে পেলেই ওরা…’

‘কিন্তু গঙ্গা ডাইনি নয়, কোনওদিক থেকে হতেই পারে না…’

সায়ন উত্তর দেয় না। মৌলির থেকে একটু দূরে সরে এসেছে ও।

‘আপনি আমাদের একটা সাহায্য করতে পারবেন?’ তনুজার ক্লান্ত গলা ভেসে আসে।

‘কী সাহায্য বলুন…’

‘আমরা এখন যা বলছি সেটা রেকর্ড করে রাখুন। আপনি ছাড়া কেউ আমাদের কথা বুঝতে পারবে না। আমরা জানি না সত্যি খুনগুলো কে করছে। কিন্তু আমাদের ভীষণ বিপদ! কতক্ষণ বাঁচব জানি না, কিন্তু এ কথাগুলো বলে যাওয়ার ভীষণ দরকার…’

‘আপনারা একটু শান্ত হোন, বলুন, আমি শুনছি সব!’

একটা ঢোঁক গেলে তনুজা, ওর গলার স্বরে একটা বদল আসে, ‘কাল রাত থেকে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। রাতে আমরা ছাদে বসে মদ খাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটা ছেলেকে দেখতে পাই মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে। তার সঙ্গেই জঙ্গলের দিকে গেছিলাম আমরা। কিন্তু তারপর থেকে আর কোনও স্মৃতি ছিল না আমাদের। সকালবেলা যখন জ্ঞান ফিরল তখন লজের বিছানায় শুয়ে আছি। তখন ব্যাপারটা নিয়ে অত মাথা ঘামাইনি। কিন্তু তারপর…’

‘তারপর আমরা এক ডাইনির খোঁজে বেলতলায় রাজবাড়িতে গেছিলাম। সেখানের স্মৃতিও কিছু মনে নেই আমাদের। তবে আজকে বিকেলে জানতে পারলাম জমিদারবাড়িতে যিনি থাকতেন তাকে গলা টিপে খুন করেছ কেউ…সঙ্গে তার চাকরকেও…’

‘তো আপনি পুলিশে যান, আমাকে বলছেন কেন?’

‘আপনি বুঝতে পারছেন না। আমরা পুলিশে ফোন করেছিলাম। কিন্তু ওরা সব বিশ্বাস করবে না। তাছাড়া আমাদের মনে হয় ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীর কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি উনি ঠিকঠাক তদন্ত করছেন না।’

‘মানে?’

‘মানে গঙ্গা যে ডাইনি নয়, সেটা প্রমাণ করার অনেকগুলো রাস্তা ওর হাতের সামনেই ছিল। কিন্তু উনি তাতে গা করেননি…’

সায়ন ফোনটা এককান থেকে অন্য কানে নেয়, ‘কিন্তু আপনাদের আমাকে দরকার কেন?’

‘আমাদের মনে হয় মিস্টার মজুমদার…’ ওপাশের গলাটা ইতস্তত করে, ‘আমরাই ওনাদেরকে স্ট্র্যাঙ্গল করেছি…’

‘মানে! এসব কী বলছেন আপনারা!’

‘ঠিকই বলছি…’

‘আপনাদের হঠাৎ এই সব মনে হল কীকরে?’

ফোনটা এবার প্রত্যয়ের হাতে যায়। তার গলা ভেসে আসে ফোনের ওপাশ থেকে, ‘কালকে আমরা যখন বেলতলায় যাই তখন একটা ডকুমেন্ট্রির জন্য ফলি সাউন্ড কালেক্ট করছিলাম আমি। ফলে আমার মোবাইলের রেকর্ডিং বাটনটা অন করে রেখেছিলাম। পরে সেটা অফ করতে ভুলে যাই। কালকে…কালকে সারাদিনের গোটা সময়টাই অডিও রেকর্ডিং হয় তাতে। সেটা শুনে আমরা কিছু কথা জানতে পারি…’

‘কী কথা?’

‘আমার মনে হয় আগের দিন রাতে আমাদের উপর একটা অ্যাটাক হয়েছিল। যে সময়টুকু আমাদের স্মৃতি ছিল না সেই সময়টায় আসলে আমাদের ভেতরে অন্য কিছু ঢুকেছিল…’

গোটা ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় লাগে সায়নের। ও মৌলির দিকে তাকিয়ে দেখে সে হাতে কী যেন একটা ঘষছে।

‘কিন্তু সেটাই বা আপনারা আমাকে বলছেন কেন?’ ও আরও একটু দূরে সরে এসে প্রশ্ন করে।

আবার তনুজার গলা শোনা যায়, ‘বলছি কারণ একটা কথা আপনার জানা দরকার…’

‘কী কথা?’

‘আমরা জানতে পেরেছি কালিপদর যে স্ত্রী ওই জমিদার বাড়িতে জমিদারের ছেলেকে দেখাশোনা করত সে ডাইনি ছিল না। সে ছিল জার্মানি থেকে এ দেশে চলে আসা এক ডাক্তার। তার কাছে ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের হাত থেকে আসা কিছু ওষুধপত্র এবং পুরনো পুঁথি ছিল। তার যা কিছু ম্যাজিক আর রোগ সারানোর ক্ষমতা সেগুলো কিছু প্রাচীন জ্ঞান ছাড়া আর কিছুই না…’

পরের কথাগুলো বলতে একটু সময়ে লাগে তনুজার, ‘কালিপদর বংশধরের ডাইনি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ আদৌ তাদের বংশে উইচক্রাফটের কোনও ইতিহাস নেই। তবে একটা বই আর কিছু অজানা ওষুধপত্র থাকতে পারে গঙ্গার কাছে। সেগুলো আজ আবিষ্কার হলে…’

‘মানে আপনি বলতে চাইছেন এই গ্রামে যে শিশুচুরি আর খুনগুলো করছে সে…’ মৌলির দিকে তাকিয়ে কথাটা শেষ করে না সায়ন। তনুজার গলা শোনা যায়, ‘এ গ্রামে যে সত্যিকারের ডাইনি সে কালিপদর বউয়ের ব্যাপারটা আমাদের জানতে দিতে চায় না। ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের কথা সে জানতে দিতে চায় না। সেজন্যই আমাদের শরীরের মধ্যে ঢুকে…’

ফোনটা ওপাশ থেকে অজানা কারণেই কেটে যায়। মৌলি কাছে এসে চোখ তুলে তাকায় সায়নের দিকে, ‘কার ফোন ছিল?’

‘দরকারি একটা ফোন, সেরকম কিছু নয়…’

মৌলি আর গুরুত্ব না দিয়ে এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে। তারপর বলে, ‘চলুন, এক জায়গায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। সামনে একটা খাদ আছে, সেটা পেছনে রেখে হাঁটতে হবে। কেউ ধাওয়া করলে ওদিকে দৌড়াতে পারব না…’

সামলে কয়েক পা হেঁটে যায় ওরা। খাদের বেশ কিছুটা কাছে এসে পড়ে। জ্যোৎস্নার আলোতে ভেসে যাচ্ছে চরাচর। খাদের ভিতরের অন্ধকার ফিকে হয়েছে সেই আলোতে। দুজনে হাঁটতে থাকে কোনও এক অজানার উদ্দেশে। শীতল বাতাসের স্পর্শ ওদের আরও কাছে এনে দেয়।

ঠিক সেই মুহূর্তে আবার তীব্র আলো এসে পড়ে ওদের গায়ে। গাছের পাতার উপর একদল পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। সেই সঙ্গে একটা চিৎকার, ‘তোদের খাদ ছাড়া আর পালানোর কোনও জায়গা নেই। দেখি তোদের বাঁচাতে কোন ফরিস্তা আসে…’

প্রভাকরের গলা চিনতে পারে সায়ন। এতক্ষণ খ্যাপা নেকড়ের মতো খুঁজতে খুঁজতে কখন ওদের ঘিরে ফেলেছে ওরা বুঝতে পারেনি। সায়ন হাত দিয়ে ঘিরে ফেলে মৌলিকে। বিপদের আশঙ্কায় শরীর স্থির হয়ে আসে। গাছপালার জটাজাল ঠেলে চারটে লোক বেরিয়ে আসে বাইরে।

‘চারদিক থেকে তোদের ঘিরে ফেলেছি আমরা। এখন হয় খাদে ঝাঁপ দে, নাহলে আমাদের কথা শোন…ওই ডাইনিকে আমাদের হাতে তুলে দে, তোকে কিছু বলব না…’

সত্যি আর পালানোর পথ নেই। ওর পিঠের পেছনে মুখ লুকিয়ে আছে মৌলি।

‘শুধু ওই মাগিকে পুড়িয়ে মারব আমরা! ওর মেয়েটাকে খেয়েছি, এবার ওকেও সবাই মিলে ঝলসে খাব! যেমন করে আমাদের বাচ্চাগুলোকে…’

ভীষণ অসহায় লাগে সায়নের। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুঝতে পারে মৌলির হাতটা ওর হাতের মধ্যে কাঁপছে। এই প্রথম মৌলিকে দুর্বল মনে হচ্ছে ওর।

ঠিক এই সময় ও লক্ষ করে মাটির ওপর ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গাটুকুকে ঘিরে একটা দড়ির ফাঁস পড়ে আছে। ফাঁসের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা সোজা নেমে গেছে খাদের গভীরে।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড! তারপরই দড়ির ফাঁসটা ছোট হয়ে জড়িয়ে যায় ওর পায়ে। সবেগে খাদের ভেতরে কেউ যেন টেনে নেয় ওকে। ওর শরীরটা দড়িতে বাঁধা পুতুলের মতো নামতে থাকে খাদ বেয়ে নিচের দিকে।

এই অদ্ভুত অপ্রত্যাশিত দৃশ্যে হকচকিয়ে গেছিল লোকগুলো। সেই সুযোগে ওদের একজনকে ঠেলে দিয়ে দুরন্ত হরিণের মতো কোথায় যেন হারিয়ে যায় মৌলি।

যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে সায়ন। দড়ির টান আবার বেড়ে ওঠে। খাদের গভীরে নেমে যেতে যেতে একটা হ্যাঁচকা টানে থেমে যায় ও।

চোখ খুলে দেখে মাথার উপরে আকাশের তারা টিমটিম করছে। একটা খোলা জায়গার ওপর এনে দড়িটা আটকে দিয়েছে ওকে। চাপা গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে। ও উঠে বসতে যায়, পারে না। পায়ের চোট মারাত্মক! আবার শুয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে শক্ত মাটির ওপর পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়।

মুখ তুলে তাকায় সায়ন। একটা ছায়ামূর্তি এগিয়ে এসেছে ওর দিকে। নিচু হয়ে ওর পা থেকে দড়ির গিঁট খুলতে থাকে। চাঁদের আলোয় ওর মুখটা একবার দেখতে পায় সায়ন। গম্ভীর মুখের মানুষটা ওকে সুরেলা গলায় আশ্বস্ত করে, ‘ভয়ের কিছু নেই…আমি গঙ্গা…’