কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১২

দ্বাদশ অধ্যায়

গাড়িটা রাজবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াতে দরজা খুলে নেমে এল তনুজা। সেই সঙ্গে প্রত্যয়।

বাইরে বারান্দা গোছের একটা ছোট্ট ছাউনি। সেখানেই গামছা কাঁধে খালি গায়ে একটা দারোয়ান বসেছিল। লোকটা মোটাসোটা। বিরাট জয়ঢাকের মতো একটা ভুঁড়িও আছে। সম্ভবত ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। ওদের দেখতে পেয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এল।

রাজবাড়ি বলতে সামান্যই অবশিষ্ট আছে। আর বছরখানেকের মধ্যেই এ বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে। সরকার থেকেও নির্দেশ এসে গেছে। রাজবংশের যা লোকজন ছিল তাদের কেউই আর বেঁচে নেই। সে সময়ের যিনি নায়েব ছিলেন তার এক বংশধর নাকি এখানে আপাতত থাকেন। তার বয়সও প্রায় আশি ছুঁইছুঁই। তেমনটাই জেনে এসেছে ওরা।

যে লেখকের কাজে ওরা এখানে এসেছে, তাকে ফোন করে বলতে, তিনিই এখানে আসার ব্যবস্থা করে দেন। বোধহয় বুড়ো খানিক টাকাপয়সাও পেয়েছেন তার কাছ থেকে। তাই এত হাসি মুখ আর খাতিরের বন্দোবস্ত।

ওদের দুজনকে একরকম হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেল সে। গামছাটা থেকে অন্য কাঁধে ফেলে বলল, ‘আমার নাম রতন দাস। বাবু অপেক্ষা করছেন আপনাদের জন্য…আসলে এ বাড়ি…’

বাড়ির ছাদ আর দেওয়ালের দুর্দশা নিয়ে বকবক করে যাচ্ছিল রতন দাস। তনুজা প্রথম দিকে কিছুটা শুনছিল। তারপর আর আগ্রহ পায়নি। ওর পূর্বপুরুষের কে যেন এখানে জমিদারবাড়িতে কোতোয়ালের না কীসের কাজ করত, এখন তো আর সেসব চাকরি জোটে না, তাই ও এ বাড়ি দেখাশোনা করে। আরও হাবিজাবি কী সব কথা।

প্রত্যয় প্রসঙ্গে আসে, ‘ভুপেনবাবু দোতলায় আছেন নাকি?’

‘হ্যাঁ উনি দোতলাতেই থাকেন। সচরাচর নিচে খুব একটা আসেন না। তাছাড়া এতগুলো সিঁড়ি ডিঙানোর অভ্যাস নেই কিনা…আরথিটি না কী যেন বলে…’

‘আরথ্রাইটিস, তাহলে একতলায় এনে রাখতে পারেন তো। বিকেলের দিকে একটু আশেপাশে হেঁটেও আসা যায় তাতে…’

‘সে কী আর আমি বলিনি বাবু? তবে বড়বাবুর ওই এক গোঁ, দোতলা থেকে কিছুতেই একতলায় নামবেন না। বাবু বলেছেন একেবারে চোখে তুলসী পাতা দিয়ে তবে নিচে নামবেন।’

রাজবাড়ির ভেতরটা বাইরের থেকে আরও বেশি ভাঙাচোরা। যেন কয়েক শতাব্দীর মাকড়সার ঝুল জড় হয়ে রয়েছে। ভাঙা ইটের স্তূপ থেকে বয়ে আসা রোডে জমাট শ্যাওলার গন্ধ সমস্ত বাড়ি জুড়ে। প্রত্যয় লক্ষ করে এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা ডুমো মশা ওর হাতে আর ঘাড়ে কামড়ে দিয়েছে। ফুলে গেছে জায়গাগুলো।

সিঁড়ি দিয়ে ওরা উপর দিকে উঠতে থাকে। রতনের চেহারার জন্য ওকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বেগ পেতে হয়। অথচ সারাদিনে বেশ কয়েকবার যে উঠতে হয় সেটাও বোঝা যায়। বড়বাবুর উপর রাগ হওয়া বিচিত্র নয়।

দোতলায় উঠে বাঁ দিকের একটা প্যাসেজের দিকে এগিয়ে যান রতন। বেশিরভাগ ঘরে তালা বন্ধ। সেই তালায় পুরু জং লেগেছে। হ্যাঁচকা টান দিলেই বোধ হয় ভেঙে চলে আসবে।

ওরা চেয়ে দেখল এরই মধ্যে একটা ঘরের তালা খোলা। সেই ঘরেই সম্ভবত আছেন উপেনবাবু। সেইটার সামনে গিয়েই গলা তুলে হাঁক পাড়ে রতন, ‘বাবু, ওই ওনারা এসেছে…’

ফিনফিনে কাঁপা গলা শোনা যায়। এককালে গলায় দাপটের অভাব ছিল না। এখন বয়সের জন্য সে দাপট তলানিতে ঠেকেছে, ‘কে এল আবার?’

‘ওই যে যাদের আসার কথা ছিল। আপনি ভুলে গেলেন?’

‘ও! টাকাটা এসে গেছে তো?’

‘আজ্ঞে বাবু, তা সেই সকালেই এসে গেছে।’

কী যেন হিসেব করে লোকটা, তারপর বলে, ‘তাহলে আর দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেন, ভিতরে পাঠিয়ে দে…’

ভেজানো দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে আসে ওরা তিনজনে। বাড়ির যত ভিতরে ওরা ঢুকছে ততই যেন প্রাচীনত্বের ছাপ বেড়ে চলেছে। ঘরে দুটো জানলা। দুটোই খোলা। লোহার গ্রিল ক্ষয়ে ক্ষয়ে সরু হয়ে গেছে। তার ফাঁক দিয়ে আলো এসে কোনওরকমে ভরিয়ে রেখেছে ঘরটা। ঘরে কিছু পুরোনো বইপত্র দুটো টেবিল একটা চেয়ার একটা খাট ছাড়া আর তেমন কোনও আসবাবপত্র নেই। জানলার ঠিক সামনে বিছানার উপর ঝুলন্ত মশারি একদিকে সরানো আছে।

‘নমস্কার ভুপেনবাবু। আমি তনুজা আর ও প্রত্যয়। আমাদের কথাই বলছিলেন…’

ভদ্রলোক পান চিবোচ্ছিলেন, বিছানার তলা থেকে পিকদানিটা বের করে পিক ফেলে আবার নিচে ঢুকিয়ে রাখলেন। তারপর টেবিলের পাশে রাখা দুটো চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘ওই যে ওইখানে বসো। চা খাবে?’

‘এই তো রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চা খেয়ে এলাম। আমাদের আসলে কিছু জিজ্ঞাসা…’

লোকটা হাত তুলে থামিয়ে দিল ওদেরকে, তারপর হাত উল্টে একটা বিশ্রী ভঙ্গি করে বলল, ‘দেখো, জিজ্ঞাসা করবে করো, কিন্তু এ গ্রামের ওইসব ডাইনি-ফাইনির ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না…নিজের চোখে তো কিছু দেখিনি। ছোটবেলায় যা শোনার শুনেছিলাম। কিন্তু সেসব কথা এতদিন কিছু মনেও নেই। আমাকে জিগ্যেস করে কিছু লাভ হবে না।’

‘আপনি তাহলে আমাদের আসতে বললেন কেন?’

‘কেন বললাম?’ ভারিক্কি চালে পান চিবুতে চিবুতে বলেন ভুপেনবাবু, ‘তোমরা যে সিঁড়িটা দিয়ে উঠলে সেটা যে কোনওদিন ভেঙে পড়তে পারে। এ বাড়ির অবস্থা দেখেছ? ক’টা কাঁচা টাকা হাতে পেলে যে দু-তিন বছর বাঁচব একটু আরামে বাঁচতে পারি। একটা দাদুর বয়সি বুড়োর জন্য দয়ামায়া হয় না তোমাদের?’

‘বাঞ্চোত!’ হিসহিসিয়ে বলে ওঠে প্রত্যয়।

‘এটুকু কষ্ট করে তোমরা না হয় এই বুড়োকে শেষ ক’টা…’

প্রত্যয়ের মাথাটা গরম হয়ে যাচ্ছিল। গড়গড় করে বলল, ‘শালা, পুলিশে না ধরলে আজই তোর শেষ দিন করে দিতাম বাঁড়া…’

তনুজার মাথাটা গনগন করছিল। লোকটার বয়স বেশি না হলে এক্ষুনি কষিয়ে একটা চড় মেরে দিত। কিন্তু চেহারার যে অবস্থা একটা চড় খেলে প্রাণ পাখি না মশারির ফাঁক আর জানলার গ্রিল গলে বেরিয়ে যায়। সে কোনওরকমে মাথা ঠান্ডা রাখে।

‘বেশ, দুকাপ চা করে আনতে বলুন। অন্তত তাতেও আপনার পকেট থেকে কিছু খসবে।’

রতনকে ডেকে চা করে আনতে বলেন ভুপেনবাবু তারপর আবার নির্বিঘ্নে পান চিবোতে থাকেন।

তনুজা আলাপ জমানোর চেষ্টা করে, ‘আপনার শরীরের এই অবস্থা যখন তাহলে দোতলায় থাকেন কেন? একতলাটা তো এতটা ভাঙাচোরা নয়…’

‘দোতলায় থাকি বলেই দোতলাটা কিছুটা টিকে আছে। আমি একতলায় নামলে দোতলা বলে আর কিছু থাকবে না।’

‘গোটা বাড়িটাই তো ভাঙা পড়বে ক’দিন পরে। শুধু দোতলা টিকিয়ে রেখে কী লাভ আপনার?’

‘আমি যতদিন ভাঙা পড়ছি না ততদিন এই বাড়িও ভাঙা পড়বে না। আমি চলে গেলে পরে কে কী করবে তা আমার জেনে কাজ নেই।’

প্রত্যয় কী যেন বিড়বিড় করে, তারপর বলে, ‘এই শালাকে খুঁচিয়ে আর লাভ নেই। ফালতু এত দূরে এলাম। ঢ্যামনা বুড়ো কোথাকার!’

‘আহ! তুই চুপ কর।’ আবার বুড়োর দিকে চেয়ে জিগ্যেস করে, ‘আচ্ছা আপনি তাও কবে থেকে এখানে থাকেন?’

‘তা আছি বলতে সেই ছোট থেকেই। তখন থেকেই রাজবাড়ির বংশধররা কমে এসেছে। আগে দোতলার ওই বাঁ দিকটায় থাকতাম। তারপর একে একে রাজবংশ শেষ হয়ে যেতে গোটা বাড়িটা আমরাই দখল করে নিলাম…’

‘আপনি বিয়ে করেননি?’

উপরে নিচে মাথা নাড়ান ভদ্রলোক, ‘করেছিলাম। প্রথম স্ত্রী বছর দুয়েক পরে মারা যায়। আবার বিয়ে করেছিলাম সেটা মাসখানেক পরেই…’ হাত দিয়ে আকশের দিকে ইশারা করলেন ভুপেনবাবু।

প্রত্যয় আবার ফুট কাটে, ‘দাদু আমাদের লেডিকিলার!’

‘আর আপনার মা-বাবা?’ তনুজা জিগ্যেস করে।

‘মা সেই ছোটবেলাতেই মারা গেছে। এই বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে নিচে পড়ে যান। সুইসাইড…’

ওরা খেয়াল করে মায়ের কথা বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের গলার স্বর এই বয়সেও ধরে আসে। অর্থাৎ ওই অল্প বয়সের স্মৃতি এখনও টাটকা আছে।

‘ছোটবেলায় এখানে থাকত বলেই এই তলাটা ছেড়ে নড়তে চায় না।’ তনুজা চাপা গলায় বলে, ‘একে ওই পথেই অ্যাটাক করতে হবে।’

দেওয়ালের দিকে একটা ছবি দেখায় তনুজা, ‘এইটা বুঝি আপনার মা?’

তনুজা তাকিয়ে দেখে ছবিটা যে মহিলার তিনি ভীষণ সুন্দরী। একটা বইয়ের র‌্যাকের সামনে আঁকা হয়েছে ছবিটা। টেবিলের বসে একটা খাতাতে কী যেন লিখছেন।

তনুজা সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘সেকালের মহিলা এমন টেবিলে বসে লেখালিখির ছবি! ওর লেখালিখির শখ ছিল নাকি?’

ভুপেনবাবু খাটের উপরে পা তুলে বসেন, ‘মায়ের শখ ছিল বটে। ওই নিয়েই তো থাকতেন সারাদিন।’

‘বটে…কোনও বই-টই?’

দুপাশে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলেন ভুপেনবাবু, ‘লেখা শেষ হওয়ার আগেই তো মা চলে গেলেন।’

‘কী নিয়ে লিখছিলেন উনি?’

‘এই জমিদার বংশের ইতিহাস। মানে তার নিজের স্বামী, শাশুড়ি আর বাড়ির চাকরবাকরদের মুখে যা শুনেছিলেন। তাই উপন্যাসের মতো লিখছিলেন…’ তনুজাদের মুখে উৎসাহের হাসি ফুটে উঠতে দেখে তিনি নিরস হাসি হাসেন, ‘আপনাদের আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই। সে সব লেখা আমরা নিজেরা পড়েছি। তাতে আপনাদের ডাইনি বাইনি নিয়ে কিছুই লেখা নেই। বারবার বলেছি জমিদারবংশে ডাইনির সঙ্গে কারও কোনও যোগাযোগ ছিল না। সবই পারিবারিক কেচ্ছা কোন্দল…ব্যস!’

‘কেচ্ছা?’ প্রত্যয় জিগ্যেস করে।

‘সেকালের জমিদারবাড়ির বাপ-ছেলেদের কেচ্ছা আর কী, বাইজি নাচানো, উপপত্নী রাখা, আরও আজেবাজে ব্যাপার। চান তো দেখাতে পারি, কিন্তু ও আপনারা জেনে কী করবেন?’

‘বেশ, মানে আপনার থেকে কিছু জানতে পারা যাবে না, তাই তো?’ তনুজা রাগত গলায় জিগ্যেস করে।

ভদ্রলোক একটুও লজ্জিত না হয়ে ঘাড় নেড়ে দেন।

‘চলে আয় প্রত্যয়, উনি সিঁড়িটা মেরামত করুন।’

দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটতে যাচ্ছিল। হঠাৎ পাশ থেকে একটা চাপা ডাক শুনতে পায়, ‘ইয়ে…সার…’

ঘুরে তাকায় তনুজা, লোকটার চোখে-মুখে কেমন যেন চাপা আগ্রহ, ‘কিছু বলবে?’

রতন ইতস্তত করে। কথাটা বলা উচিত হবে কিনা ভাবে বোধহয়, তারপর কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে বলে, ‘আপনারা, ডাইনির ব্যাপার জানতে এসেছেন, কিন্তু বাবু ওসব কথা কিছু বলতে পারবে না। আমি পারব!’

‘তুমি পারবে! কী করে?’

সলজ্জ হাসি হাসে রতন, ‘বললুম না, বাবুরা ছিলেন নায়েব। ওরা টাকাপয়া, খাজনা, বাজার হাট এইসব সামলাতেন। এইসব গায়ে-গতরে ব্যাপার লেঠেলদেরই সামলাতে হত। আমি আমার বাপ-পিতেরোর কাছ থেকে ডাইনির অনেক গল্প শুনেছি। তবে সেসব গল্প কতটা সত্যি আর কত জল তা বলতে পারব না।’

‘যা জানো তাই বললেই হবে।’

‘আসেন, এদিকে আসেন। উনি শুনতে পেলে আবার…’

রতন ওদের দোতলাতেই একটা ছোট ঘরে নিয়ে যায়। একটা দড়ির খাটিয়া রাখা আছে এখানে। তবে পাখা নেই। শীতকাল বলে অসুবিধা হয় না। একটা জানলা খুলে দেয় রতন। একঝাঁক রোদ এসে পড়ে মেঝেতে।

খাটিয়ার ওপর বসে আয়েশ করে একটা বিড়ি ধরায় রতন। বলে, ‘শুনুন তবে। বেলতলা গ্রামে দু-আড়াইশো বছর আগে যে ডাইনির কথা আপনারা বলছেন তার নাম ছিল মায়াদেবী। আমারে দাদুর দাদুর বাবা জমিদারবাড়ির খাস লেঠেল ছিল সেসময়। তিনি এমন কিছু কথা জানতেন যা আর কেউ জানত না…’

‘যেমন? কী কথা?’

‘মায়াদেবীকে তখনকার রাজা অজিতেশ সামন্তই কোথা থেকে খুঁজে পেতে নিয়ে আসেন। সে নাকি ধন্বন্তরি ডাইনি ছিল। সবার সব রোগের উপশম ছিল তার কাছে। বিশেষ করে মেয়েদের রোগনাড়ার অব্যর্থ ওষুধ দিত মায়াদেবী। সে সত্যি ডাইনি ছিল কিনা বলতে পারব না, কিন্তু সে মেয়ে ছিল না…’

‘মানে? পুরুষ?’

মাথা নাড়ে রতন, ‘পুরুষও না, মেয়েও না। ওই যাকে বলে…’

‘ট্রান্সজেন্ডার!…হুম, তারপর?’

‘তো সে মাঝেমাঝে ছেলে আর মাঝে-মাঝে মেয়ে সেজে থাকত। কখনও স্বামীর ভূমিকায় কখনও স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করত। দুজনকে একসঙ্গে কখনও দেখা যেত না। রোগী ছাড়া আর কেউ তাকে তেমন একটা দেখতে পেত না। অবশ্য এ কথা অজিতেশ আর গ্রামের কজন বিশিষ্ট লোক ছাড়া আর কেউ জানত না।’

‘কিন্তু এরকম সেজে থাকার কারণ কী?’

‘কারণ আর কিছু না। সেকালে তো চাইলেই ধন্বন্তরি চিকিৎসক হওয়া যেত না। বিশেষ করে মেয়েমানুষ ডাক্তারি করলে গ্রাম-গঞ্জে ডাইনি অপবাদ রটতে বেশি সময় লাগত না। আবার ব্যাটাছেলে ডাক্তারের কাছে মেয়েরা এসে রোগের কথা বলেই বা কী করে…তাই এই ব্যবস্থা। ডাইনি অপবাদ রটলে পেয়াদা খুঁজতে এসে স্বামীকে খুঁজে পাবে কিন্তু ডাইনিকে পাবে না। এই ছিল ব্যবস্থা। সমস্ত ব্যাপারটা অজিতেশের ইচ্ছেতেই হচ্ছিল, ফলে তেমন কিছু অসুবিধা হয়নি…’

তনুজা এবার প্রত্যয়ের দিকে তাকায়, ‘যতদূর মনে হচ্ছে এ মহিলার কাছে এমন কিছু রোগের ওষুধ ছিল যেগুলো তখনও আবিষ্কার হয়নি। নইলে ডাইনির অপবাদের ভয়টা থাকত না। এখন কথা হল মহিলা এত কিছু জানলেন কী করে?’

রতনের মুখে রঙ লাগে, সে আবার বলতে শুরু করে ‘কিন্তু মায়াদেবী জানতেন না অজিতেশ কত বড় ছুপা রুস্তম! অজিতেশ ততদিনে মায়াদেবীকে হিংসা করতে শুরু করেছে। বেলতলার লোক তার থেকে বেশি সম্মান করে মায়াদেবীকে। সে সাধারণ এক জমিদার, আর মায়াদেবী সাক্ষাৎ ভগবানের দূত। এরই মধ্যে ছেলেদের খোজা করার ওষুধ বেচে তার নামে ডাইনির গুজব রটে। অজিতেশ এই সুযোগে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দিলেন। পাঠানো পেয়াদার দল গিয়ে দেখে স্বামীটি আছে, কিন্তু বউ পালিয়েছে। পেয়াদারা মায়াদেবীর স্বামীকেই হাতের সামনে পেয়ে তুলে আনলেন। গ্রামে রটিয়ে দেওয়া হল দুজনকেই তুলে আনা হয়েছে…’

‘ওদের ছাগলঘর অবধি নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার দাদুর দাদুর বাবার। গ্রামের লোকদের চোখে ধুলো দিয়ে দুজনের নাম করে একজনকেই সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় ছাগলঘরে। লোকে ভাবে দুজন পুড়ছে। কিন্তু আসলে পোড়ে একজন!’

‘এই কারণেই একটা পোড়া দেহ পাওয়া যায়, তাই তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ডাইনিকে পোড়ানোর পর তার ঝলসানো দেহ নিয়ে উৎসব করতে ঘরের ভিতরে ঢোকে গ্রামের লোকেরা। তারা ঝলসানো দেহে ব্যাটাছেলের কাপড় দেখে বুঝতে পারে ডাইনি কোনওভাবে পালিয়েছে…’

সমস্ত ব্যাপারটা মাথার মধ্যে পরিষ্কার হতে একটু সময় লাগে দুজনের। বাইরে থেকে মেঝের উপর এসে পড়া রোদের মধ্যে ধুলোর বিন্দু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তনুজা মন দিয়ে সেদিকে চেয়ে ছিল। নখ দিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে চেয়ারের গায়ে দাগ কাটছিল সে।

‘পোড়ানোর ঠিক পর পরই মায়াদেবীর ঘরে কারা যেন ডাকাতি করে। মনে হয় ওষুধপাতি চুরির করার জন্যই। অন্য কিছুই আর খোয়া যায়নি। মানে আমি যা শুনেছি…’

তনুজা রতনের বাকি কথাগুলো আর খেয়াল করে না। প্রত্যয়ের দিকে চেয়ে ধীরে গলায় সে প্রশ্ন করে, ‘যদি মায়াদেবী এবং মায়াদেবীর স্বামী দুজনেই পুড়ে গিয়ে থাকে তাহলে মতিপুরের ডাইনি কে ছিল?’

প্রত্যয়ও ভাবনায় ডুবে ছিল, সে মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘বোঝাই যাচ্ছে ওর আইডেন্টিটি ব্যাক আপে নিয়ে ইম্পোস্টার হিসেবে এসেছিল কেউ। এবং তাকে সাহায্য করেছিল কালিপদ। অ্যান্ড হু অয়াজ দিস কালিপদ ম্যান?’

‘কী নাম বললেন আপনারা?’ রতন উঠে দাঁড়িয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে তাকিয়েছে ওদের দিকে, ‘কালিপদ? বেলতলা গ্রামের?’

‘এই নামে কাউকে চিনতেন নাকি?’

রতন দাস কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, ‘কালিপদ জমিদারবংশের লোক। অজিতেশ নারায়ণের ভাই। ওই মায়াদেবী মারা যাবার ক’দিন পর থেকেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।’

‘মানে? কেন?’

‘শোনা যায় কীসব নাকি কেচ্ছা ছিল তার…’

‘কেচ্ছা!’ প্রত্যয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কথাটা। ওরা আর সেখানে দাঁড়ায় না। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে ভুপেনবাবুর ঘরে ঢুকে পড়ে। ভদ্রলোক এতক্ষণে অতিথি বিদায় করে আবার বালিশে মাথা দেওয়ার উপক্রম করেছিলেন। ওদের দেখতে পেয়ে বিরক্তই হন, ‘এ কী আপনারা যাননি এখনও!’

‘আপনার মায়ের সেই লেখাপত্র কোথায়?’

একটু হকচকিয়ে যান ভুপেনবাবু, ‘মানে সেসব তো…’ রতনকে হাঁক দেন ভুপেনবাবু, ‘বইয়ের বাক্স খুলে সতেরো নম্বর খাতাটা নিয়ে আন তো…’ তারপর ওদের দিকে ঘুরে বলেন, ‘কিন্তু আপনারা এসেছিলেন ডাইনির খোঁজ করতে! সেসব নিয়ে কী করবেন এখন?’

তনুজা খাটের উপর ওর পাশেই বসে পড়ে বলে, ‘জমিদারবংশের মানে অজিতেশ নারায়ণের ভাই কালিপদ। তার নামে কী কেচ্ছা ছিল?’

এমন আচমকা প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলেন না ভুপেনবাবু, একটু খাবি খেয়ে বলেন, ‘কে…কেচ্ছা বলতে তার বউ ছিল…’

‘এটা কেচ্ছা?’

‘না না, এটা হতে যাবে কেন? বউ ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে সদ্ভাব ছিল না তার।’

‘উপপত্নী ছিল, অন্য নারীতে আসক্ত ছিল, তাই তো?’

ভুপেনবাবু মাথা নামিয়ে ঘাড় নাড়েন। অবসন্ন দেখায় তাকে, ‘সে হলেও তো হত। কিন্তু…কালিপদ পড়াশোনায় ভারি ভালো ছিল। সে সময়ে বিয়ে করে বাড়িতে বউ রেখে বিদেশযাত্রা করে পড়াশোনা করতে। শোনা যায় বউয়ের সঙ্গে প্রথম থেকেই তার সম্পর্ক ভালো ছিল না। বিদেশে গিয়ে তার একটা প্রেম হয়। বিয়েও করে কিনা জানা যায় না। তো দুজনে একইসঙ্গে এখানে ফিরে আসে। প্রথমে দাদা অজিতেশ কিছুতেই মানতে চান না। দুজনকেই বাড়ি থেকে ঘাড়ধাক্কা দেন। পরে মেনেও নেন। কেন মেনে নেন তা অবশ্য জানা যায় না…’

‘কোন দেশে গিয়েছিল জানেন আপনি?’

একটু ভেবে উত্তর দেন ভুপেনবাবু, ‘যদ্দুর মনে পড়ছে জার্মানি।’

তনুজা আর প্রত্যয় একে অপরের দিকে তাকায়। এতক্ষণে রতন খাতাগুলো নিয়ে এসেছে। ভুপেনবাবু সেটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে কী যেন খোঁজেন। বেশিরভাগ পাতাই ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। মহিলা যখন এইসব ইতিহাস ঘেঁটে বের করেছেন তখন অন্তত ঘটনার একশো বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তাও যতটা পারা যায় গুছিয়ে লিখেছেন। ভুপেনবাবু খাতার ফাঁক থেকে বের করে একটা পুরনো চিঠি বের করে ওদের হাতে তুলে দেন। তারপর বলেন, ‘এই যে একটা চিঠি পাওয়া গেছিল। বিদেশ থেকে লেখা কালিপদর চিঠি…জায়গার নামটাও ওখানে লেখা আছে, দেখে নিন।’

বাঁকাবাঁকা অক্ষরে সেখানে লেখা আছে জায়গার নামটা। ‘বাভারিয়া’ থমথমে গলায় শব্দটা উচ্চারণ করে প্রত্যয়, তনুজা বিড়বিড় করে বলে, ‘ওয়াল্পারগা হাস্মানিন…’

‘কালিপদর এই বিদেশি বউয়ের সম্পর্কে কিছু জানা যায় না?’ তনুজা কম্পিত গলায় প্রশ্ন করে।

‘যেতে পারে কিন্তু আমার ঠিক মনে পড়ছে না। কতদিন আগে পড়েছি…’ বৃদ্ধ স্মৃতি হাতড়ানোর চেষ্টা করেন, ‘আবছা আবছা মনে পড়ছে সে পেশায় ছিল ডাক্তার। টুকটাক রোগ সারানোর ক্ষমতা ছিল তার। আসার সময় সঙ্গে অনেক বইপত্র এনেছিল। তবে দেখুন, মাও তো নিজের চোখে দেখেনি। বাড়ির লোকজনের মুখে শুনে যতটা জানা যায় আর কী…’

‘ডাক্তার!’ তনুজা আবার ফিরে এসে চেয়ারে বসে পড়ে। প্রত্যয় ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বলে, ‘কী ভাবছিস তুই?’

কয়েকটা প্রশ্ন ভারি অদ্ভুত, ‘অজিতেশ নারায়ণ হঠাৎ মেয়েটিকে মেনে নিলেন কেন? মায়াদেবীর বাড়িতে চুরি হল কেন?’ কথাটা বলেই আবার গলা তুলে প্রশ্ন করে তনুজা, ‘আচ্ছা ভুপেনবাবু, এই কালিপদর বউ এ গ্রামে আসেন কবে? মায়াদেবী মারা যাবার আগে না পরে?’

এবার উত্তর দিতে দেরি হয় না ভুপেনবাবুর, ‘ঢের আগে…’

ঠোঁটে আঙুল দিয়ে গভীর ভাবনায় ডুব দেয় তনুজা, ‘তাহলে ক্রোনোলজিক্যালি সাজালে—কালিপদ বিদেশ থেকে বউ আনল, মায়াদেবী নামে এক ধন্বন্তরির পসার হল, তার খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে অজিতেশের জমিদার হিসেবে মান বাড়ল। আবার দিনে দিনে মায়াদেবীর ছ’টায় অজিতেশ ঢাকা পড়ে যেতে মায়াদেবীকে সে কায়দা করে খুন করল। তারপর হল তার ঘরে চুরি। তারপর মতিপুরে ডাইনি…যে ডাইনি মুখে কাপড় বেঁধে…আই ফাকিং গট ইট!’ কথাটা বলে লাফিয়ে ওঠে তনুজা।

ভুপেনবাবু হেঁচকি তুলতে তুলতে সামলে নিলেন।

‘আরে, হলটা কী তোর?’

আনন্দে প্রত্যয়ের কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে দেয় তনুজা, ‘ক্যান্ট ইউ সি? কালিপদর বউ একা আসেনি। হয় সে ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের বংশের কেউ, না হয় কোনওভাবে তার সঙ্গে জড়িত কিছু তথ্য বা পুঁথিপত্র হাতে এসেছিল তার। সে পেশায় ছিল ডাক্তার। ফলে এই পুঁথিপত্রর গুরুত্ব সে বুঝতে পারে। প্রেমে পড়ে সে এদেশে চলে আসে। কিন্তু ভাশুর তাকে কিছুতেই মেনে নিতে চায় না। এদিকে ভাশুরকেও এলাকার লোকজন জমিদার বলে মানতে চায় না। সে একটা মাঝামাঝি রফাসূত্র বের করল। পুঁথিপত্রের কিছু জ্ঞান ও ওষুধপত্র সে অজিতেশের ভাড়াটে লোক মায়াদেবীকে ধার দিল। এতে করে জমিদারের কেরামতি বাড়ল। শেষে মায়াদেবী মারা যেতে সে দেখল, এত আশ্চর্য জ্ঞান সব পড়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যেতে চলেছে। তার স্বামী ও সে মিলে ঠিক করল পালিয়ে যাবে। কিন্তু পালিয়ে যাবে কোথায়? একটা আইডেন্টিটি দরকার। খুব সহজ একটা উপায় মাথায় এসে গেল দুজনের। একজন মহিলা গ্রাম থেকে উধাও হয়েছেন যার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। দুজনে মায়াদেবীর ঘর থেকে পুঁথি চুরি করে পালিয়ে গেল। গিয়ে আশ্রয় নিল মতিপুরে…বেলতলার কেউ মতিপুরে ওদের খোঁজ করতে গেল না…’

হাঁ করে সমস্ত ব্যাপারটা শুনছিল প্রত্যয়, ‘কিন্তু আমাদের গুপ্তধনের কী হল তাহলে?’

‘গুপ্তধন, মানে কালিপদর বউয়ের বিদেশ থেকে আনা সেই পুঁথিপত্র। সেগুলো গঙ্গার কাছে এখনও আছে হয়ত। সেগুলো পড়েই চিকিৎসা বিজ্ঞানে এত দখল তার।’

‘তার মানে গঙ্গা ডাইনি হতেই পারে না।’

‘হাতে চুম্বক থাকলেই ম্যাজিক দেখানো যায়। এমনকী চুম্বক কী করে কাজ করে না জেনেও। গঙ্গা হয়ত সেই ম্যাজিকই এতদিন দেখিয়ে আসছে। যতদূর সম্ভব পুঁথিপত্রগুলো ও ওর বাড়ির কোথাও খুঁজে পায়। ওগুলোর গুরুত্ব যদি ও বুঝে থাকে তাহলে এতদিনে সেগুলো যত্ন করে কোথাও রেখে দিয়েছে।’

দুজনে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। দুজনের চোখেই বিদ্যুৎ খেলা করছে। রতন এতক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে দরজায় চা হাতে। হাসিমুখে এগিয়ে এসে চা-টা টেবিলের উপরে রাখে।

‘আপনাদের কোনও উপকার করতে পারলাম না বলে…’ ভুপেনবাবু বিমর্ষ গলায় বলছিলেন।

তনুজা থামিয়ে দেয় তাকে, ‘এতটা উপকার হবে আমরা ভাবতেই পারিনি। যদি কোনওভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারতাম…’

ভুপেনবাবু কিছু বললেন না। কিন্তু ওর অজ্ঞাতে হঠাৎ করেই একটা নীলচে ঝিলিক খেলে গেল দুজনের চোখে। যেন অজানা নীল মেঘ এসে ঢেকে ফেলল ওদের চোখের মণি।

ভুপেনবাবুর দিকে এগিয়ে গেল তনুজা, ‘না, একটা উপকার করতে পারি আপনার।’

‘কী বলো তো?’ ভদ্রলোক হেসে জিগ্যেস করলেন।

‘বলছিলেন না এই দোতলাতেই দেহ রাখার শখ আপনার?’ কথাটা বলেই ওর গলাটা আচমকা চেপে ধরে তনুজা। ককিয়ে উঠে হাত-পা ছুড়তে থাকেন বৃদ্ধ। ওর গলা দিয়ে কেবল একটা গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসে।

এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না রতন। সে ছুটে আসে তার বড়বাবুর দিকে। প্রত্যয় ওর গলাটা টিপে ধরে। দুটো আঙুল দিয়ে দুপাশ ধরে রুদ্ধ করে দেয় টুঁটিটা। ককিয়ে ককিয়ে নিস্তেজ হয়ে আসে দুজনে। একসময় দেহদুটো স্থির হয়ে যায়।

বিছানার উপরে পড়ে থাকা পুরনো চিঠিপত্রগুলো তুলে নেয় ওরা দুজন। সঙ্গে খাতাগুলোও। দুজনের চোখেই এখন নীলচে বিদ্যুতের ঝিলিক।

দেহদুটোকে ঘরের ভিতর ফেলে রেখেই বাইরে বেরিয়ে আসে ওরা।