কুয়াশার ফুল – ১৭
সপ্তদশ অধ্যায়
‘এলিক্সির! সোজা কথায় বলতে গেলে এক ধরনের ওষুধ। এই ওষুধের ব্যাপারটাই ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের জবানবন্দীর মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ!’ গাড়ির পেছনের সিটে বসে আধপোড়া চিঠিগুলো কোলের উপরে খুলে রেখেছিল তনুজা। গাড়ির ভিতরে আলো অল্প, তাই প্রত্যয় নিজের ফোনের আলোটা জ্বেলে রেখেছে।
‘তুই ভেবে দেখ, মহিলা ঠিক কী বলেছিলেন—উনি একজনের সঙ্গে সেক্স করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সে আসেনি, তার বদলে এসেছিল এক ডিমন। মহিলার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের বদলে তাকে ভোগ করল এক দানব। তোর সঙ্গে যদি ঠিক এমনটা হত তাহলে তোর মনের ভিতরে কী হত?’
‘রাগ…’
‘সে যুগের পুরুষের চোখে ডাইনি মানে ছিল মহিলার উন্মাদ যৌনআকাঙ্ক্ষা। মানুষ হোক বা দানব যে-কোনও যৌনসুখেই সে পরিতৃপ্ত। কিন্তু আমরা আজকের আধুনিক মানুষ হয়ে বুঝতে পারি নারীদের ঠিক নিজেদের কল্পনামাফিক সাজিয়ে নিয়েছিল এরা। যাই হোক, ডিমনের সঙ্গে মিলিত হয়ে তোর হবে রাগ। আর দিনের পর দিন সেই একই কাজ করে যেতে যেতে তোর ভিতরে জন্ম নেমে আক্রোশ। বা বলা যায় প্রতিহিংসা। গল্প অনুযায়ী দীর্ঘদিন যৌনাচার করার পর সেই ডিমন মহিলাকে নিয়ে যায় শয়তানের কাছে। শয়তান অর্থাৎ প্রতিশোধস্পৃহা। উন্মাদ রাগ থেকে আর পাঁচটা মানুষের ক্ষতি করার প্রবণতা। এবার আসছি সব থেকে আশ্চর্য জায়গায়। শয়তান তাকে দেয় একটা বিশেষ ওষুধ। যে ওষুধ মহিলাকে পাল্টে দেবে অন্য কিছুতে…এই পাল্টে দেওয়া ব্যাপারটা বলতে কী বোঝাতে চেয়েছে বলে তোর মনে হয়?’
প্রত্যয় কিছুক্ষণ থম হয়ে তাকিয়ে থাকে ওঁর দিকে। তারপর বলে, ‘যেমন মাকড়সা স্পাইডারম্যানকে পাল্টে দিয়েছিল, কুণ্ডলিনী ইয়োগা শক্তিমানকে পাল্টে দিয়েছিল…’
‘এক্ষেত্রে মহিলা ক্ষমতাটা কোনও ম্যানকে নয়, বরং উয়োম্যানকে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পাল্টাতে গেলে এমন একটা শক্তি দরকার যেটা কেবল মেয়েদেরই থাকতে পারে। মানুষের ইতিহাসে কোনওদিন সে ক্ষমতাটা ছেলেরা দখল করতে পারেনি…সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা!’
‘সে আবার কী?’
‘মায়ের ভিতরে জমাট বাঁধা রাগ, আক্রোশ, ঘৃণা সঞ্চারিত হয় সন্তানের মধ্যে। “পাল্টে গিয়ে” মহিলা কী করলেন?’
‘নির্বিচারে শিশু মারতে লাগলেন। মাত্র কয়েক মাসে অন্তত শ খানেক শিশুকে হত্যা করলেন…’
তনুজা এবার চিঠিগুলো সরিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসে, ‘ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের কাছে যে ওষুধ ছিল তা নারীকে নিজের ভেঞ্জনেন্স থেকে একটি দানব জন্ম দিতে সাহায্য করে। শিশুর শরীরে মায়ের রক্ত থাকে, জিন থাকে, এই বিশেষ এলিক্সির বা ওষুধটা তাকে নিজের রাগ সঞ্চারিত করে একটি মনস্টার তৈরি করে। এই গ্রামে যে খুনগুলো হয়েছে সেগুলো গঙ্গা করেনি। করেছে তার সন্তান।’
‘কিন্তু মহিলা এই ওষুধ পেল কোথা থেকে? শয়তানের গল্প তো আর সত্যি না!’
‘না, গল্পটা একেবারেই রূপক! মহিলা শুধু চেয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটা বার্তা রেখে যেতে। এমন এক প্রজন্ম যে ‘কামদ্যোত নারী শয়তানের দ্বারা রেপড হয়েও মজা পায়’ গোছের মিসোজিনিস্ট প্লেজারে বিশ্বাসী নয়। ওষুধটা সে পেয়েছিল কী করে সেটা বলা মুশকিল। তবে সেটার উল্লেখ ইতিহাসের আর কোথাও হয়েছে বলে আমার অন্তত জানা নেই। কালিপদর স্ত্রীর হাত ধরে সে জিনিস এ দেশে আসে। এবং ইভেনচুয়ালি গঙ্গার কাছে। কালিপদর বউ ব্যাপারটায় বিশ্বাস করত কিনা জানি না। তবে গোটা ঘটনাটা সে কালিপদকে বলেছিল। এই যে…’
প্রত্যয়ের দিকে একটা চিঠি এগিয়ে দেয় তনুজা, সেটা হাতে নিয়ে প্রত্যয় দেখে বাংলা লেখা একটা চিঠি। ওয়াল্পারগা হাস্মানিনের ব্যাপারটা নিজের এক বন্ধুকে বিদেশ থেকে চিঠি লিখে জানিয়েছে সে। নিচে তার বউয়ের হাতে থাকা কাগজপত্রে ওষুধের ব্যাপারে কী লেখা আছে তার একটা বিবরণ!
‘কালিপদর বউ নিজে ডাক্তার ছিল। ডাক্তারির অনেক বিদ্যাই সে প্রাচীন পুঁথিপত্র থেকে শিখেছিল। এ ওষুধ যা করবে বলে দাবি করে, সেটা সম্পূর্ণটা বিশ্বাস না করলেও আশ্চর্য কিছু যে তা থেকে পাওয়া যাবে সেকথা সে জানত। গুরুত্ব বুঝে তাই ফেলে দেয়নি জিনিসটা!’
‘গঙ্গা সেটা ব্যবহার করে, তাই তো? কিন্তু ও তো বিয়ে করেনি, ওঁর সন্তান হল কী করে?’
হাত দিয়ে মুখের সামনে থেকে চুল সরায় তনুজা। সঞ্জয় সামনে থেকে ওদের কথা শুনছিল, সে উইন্ডস্ক্রিনে মুখ রেখেই বলল, ‘অল্পবয়সে রেপড হয়েছিল অনেকবার।’
তনুজা জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়, ‘ছোটবেলাতেই সে ওষুধের সন্ধান পায় গঙ্গা। তখনই মনের খেয়ালে সেটা শরীরে নেয় গঙ্গা। সেটা নিলে অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হওয়ার কথা শরীরে। কিছুক্ষণের জন্য হাতের সামনে যা পাবে সেটাই ধ্বংস করে ফেলতে ইচ্ছা করবে। নিজের শরীরই নিজে কামড়ে কামড়ে খেতে ইচ্ছা করবে। তারপর আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে যাবে…’
প্রায় মিনিট দশেক কেটে গেছে। অথচ এইটুকু সময়ই যেন কয়েক ঘণ্টা মনে হচ্ছে ওদের কাছে। অস্বস্তি বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। সায়নকে ফোনে পাচ্ছে না তনুজা। ফোনটা পাশে ফেলে রেখে সে বলে, ‘নিজের ভিতরে একটা মনস্টার বাস করে সেটা অল্প বয়স থেকেই জানত গঙ্গা! তাই সে সমাজের থেকে সরিয়ে নেয় নিজেকে। গঙ্গা জানত যতবার ও আঘাত পাবে, যন্ত্রণা পাবে, যতবার অত্যাচার হবে ওর উপর, ওর ভেতর দানবের ভয়াবহতা বাড়বে…’
‘কিন্তু গঙ্গা চাইলেই তো সেই সন্তান নষ্ট করতে পারত!’
‘চায়নি তাই পারেনি। দানব হোক বা মানুষ, নিজের সন্তানকে আর কেই বা খুন করতে পারে? তাছাড়া নষ্ট না করার জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না। অত্যাচারিত হতে হতে দুনিয়ার সব থেকে নিরীহ মানুষটারও অন্তত একবার “দেখ কেমন লাগে” মনে হতেই পারে!’
‘কিন্তু সে দানব এতদিন ছিল কোথায় তাহলে?’
তনুজা কাঁধ ঝাঁকায়, ‘এটা বলা মুশকিল। তবে কালিপদর বউয়ের চিঠি অনুযায়ী, সন্তান যত মায়ের থেকে দূরে যাবে তত তার শরীরে দানবের উপস্থিতি কমবে। যত কাছে আসবে তত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে সে। বাচ্চা জন্মানোর পরে গঙ্গা হয়ত তাকে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়। এ কাজ যেহেতু সে করত তাই খুব একটা বেগ পেতে হয়নি তাকে। ফলে এতদিন হয়ত গঙ্গার থেকে দূরে ছিল সে…এখন কাছে আসার ফলে…’
‘কিন্তু কে সেটা?’
তনুজা কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই একটা বিকট শব্দ করে গাড়িটা দাঁড়িয়ে যায়। একটা খোলা মাঠের ধারে এসে পড়েছে ওরা। এরপর আর সামনে এগোবে না গাড়ি। জায়গাটা ফাঁকা।
গাড়ি থেকে নেমে আসে তিনজনেই। মাঠের মাঝামাঝি তাকিয়ে ওরা যা দেখতে পায় তাতে ওদের শরীর শিউরে ওঠে। একটা বড় গাছের বেশিরভাগটাই ঝলসে গেছে। প্রাচীন মিনারের মতো ছাই ছাই রঙ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা।
গাছের কাণ্ডের সঙ্গে বাঁধা আছে একটা মানুষ। ঝলসে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো টকটকে লাল হয়ে আছে শরীরটা।
চারপাশে সমস্ত কিছু লন্ডভন্ড হয়ে আছে। পোড়া কাঠ আর চামড়ার গন্ধে ভরে গেছে মাঠটা। আকাশ ঢেকে ফেলেছে জমাট কালো ধোঁয়া। চারিদিকে অল্প অল্প আগুনের ফুলকি উড়ছে। তার ভেতর দিয়ে ওরা তিনজন এগিয়ে যায় গাছটার দিকে।
‘গঙ্গা!’ মুখ দিয়ে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে আসে তনুজার। আলতো হাতে সে স্পর্শ করে পোড়া দেহটা। এখনও গরম। হাত সরিয়ে নেয় তনুজা। আঙুলের স্পর্শে কপালের দিক থেকে একটা ছোট চাঙড় খসে পড়ে। ঠিক যেন কুমোরটুলিতে তৈরি হওয়া মাটির দেবীমূর্তি।
গনগনে লাল শরীরটার দিকে চেয়ে তনুজা ফিসফিস করে বলে, ‘এতদিন দূর থেকে মনে মনে যেমন কল্পনা করত তেমনই বানিয়ে দিল ওরা গঙ্গাকে!’
‘ব্লাডি বাস্টার্ডস!’ বিড়বিড় করে বলে উঠল প্রত্যয়। সঞ্জয়ের চোখও জলে ভিজে এসছে। এই মহিলাকে ওরা সামনে থেকে কখনও দেখেনি। কেবল শুনে এসেছে ওঁর কথা, তাও বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় যেন মুচড়ে উঠল ওদের।
‘আপনারা এখানে কী করে এলেন?’
পেছন থেকে ভেসে আসা পরিচিত গলাটায় ওরা তিনজনেই ফিরে তাকায়। সায়ন মজুমদার দাঁড়িয়ে আছে ওদের ঠিক পেছনে। তার মুখচোখ বিধ্বস্ত। জামার অনেক জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। এখানে ওখানে রক্তের ছোপ।
ওর দিকে ছুটে যায় তনুজা, ‘গঙ্গার সঙ্গে আপনাকেও ওরা মেরেছে, তাই না?’
সায়ন ওপর নিচে মাথা নাড়ায়। তনুজা আবার গঙ্গার পোড়া শরীরটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘সব শেষ হয়ে গেল মিস্টার মজুমদার। আমরা গঙ্গাকে বাঁচাতে পারলাম না। একটা মানুষের রাগ, চিৎকার, যন্ত্রণা, ক্ষোভ, সবকিছু শেষ করে দিল সবাই মিলে কেবল তাকে পুড়িয়ে। অথচ কেউ যদি ওকে বুঝতে পারত…কেউ যদি একটু…’
‘আপনারা যত তাড়াতাড়ি পারেন বাড়ি চলে যান।’ সায়নের কথাগুলো হুকুমের মতো শোনায়, ‘এ গ্রামে যে খুনগুলো হচ্ছে সেগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি এখনও।’
‘তার আর ভয় নেই মিস্টার মজুমদার। এ গ্রামে যে দানব এসেছিল সে গঙ্গার মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গেই চলে গেছে।’
‘মানে? কী বলতে চাইছেন?’ সায়ন মুখ তুলে তাকায় ওদের দিকে। চোখে বিস্মিত দৃষ্টি।
‘গঙ্গার সন্তানই এই খুনগুলো করেছে। তবে সেটা কে তা আমরা এখনও জানি না…’
ওরা চারজন মিলে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সায়ন আগে আগে। ওরা তিনজন পেছনে।
সঞ্জয় এতক্ষণ চুপ করেছিল। সে এবার প্রথম মুখ খোলে, ‘কিন্তু একটা ব্যাপার আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। মৌলিকে যে দুটো লোক পাহারা দিচ্ছিল তাদের যে খুন করে তাদের নামে তো কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল না। তাদেরকে তাহলে খুন করল কেন? আর দ্বিতীয় কথা মৌলির ডেডবডিটা কে ওই বাড়িতে এনে রাখল? তাছাড়া মৌলির যে কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে সেটা কি মাধব ভট্টাচার্য বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলেছিলেন?’
প্রত্যয় তনুজার কাঁধে একটা হাত রাখে, ‘আচ্ছা তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম এ গ্রামে সত্যি একটা দানব আছে, তাহলে সে বেছে বেছে কেবল খারাপ লোকেদের খুন করবে এটা কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে না?’
গঙ্গার দেহর দিকে না চাইতেও চোখে চলে যায় ওদের। তনুজা মাঠেরই একদিকে বসে পড়ে। তারপর সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলে, ‘একবার ভেবে দেখুন মিস্টার মজুমদার। আজ আপনি যা দেখলেন তিরিশ হাজার মানুষকে সেইভাবে মারা হয়েছিল বিনা অপরাধে!’
‘ওটা সরকারি হিসেব। লোকে বলে নব্বই লক্ষ মানুষকে ডাইনি সন্দেহে মারা হয়েছে। আসলে সংখ্যাটা ওর মাঝখানে কোথাও একটা হবে…’ সায়ন নিজের ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে, ‘এরা আসলে সে সময়ে পাগল হয়ে গেছিল অত্যাচারের নেশায়। আপনি সুসানা মার্টিনের নাম শুনেছেন?’
‘না।’
‘সালেম উইচ ট্রায়ালে যে চোদ্দজন মহিলাকে পুড়িয়ে মারা হয় তাদের একজন। সে সময়ে ধারণা ছিল ডাইনিদের স্তন সবসময় দুধ দিতে পারে। তো মোট দুবার তাকে পুরুষ গোয়েন্দাদের সামনে স্তন খুলে দেখাতে হয় সেখান থেকে দুধ বেরিয়ে আসছে কিনা। প্রথমবার গোয়েন্দারা দেখে রায় দেন দুধ বের হচ্ছে না বটে কিন্তু স্তনগ্রন্থি দেখে মনে হচ্ছে যে-কোনও সময় বেরিয়ে আসতে পারে। তাকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়। দ্বিতীয়বার স্তনগ্রন্থি দেখে গোয়েন্দাদের মনে হয় এখনও দুধ বের হচ্ছে না বটে কিন্তু এইমাত্র যেন কাউকে দুধ খাইয়েছেন মহিলা। ব্যাস! পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায় যে মহিলা ডাইনি। অনতিবিলম্বে তার ফাঁসির হুকুম হয়। আজকালকার দিনে কোনও মহিলাকে ঠিক এই বিচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হলে তার মনের অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন!’
‘শুধু অবিচার নয়, রীতিমতো সেক্সুয়াল ট্রমা!’
‘আরও অনেক উপায় ছিল ডাইনি খুঁজে বের করার, শুনবেন? গায়ে ফোঁড়া, ছেলেপুলে দুষ্টুমি করলে হঠাৎ রেগে যাওয়া, ভয় পাওয়া, ভয় না পাওয়া, হঠাৎ করে সুন্দর হয়ে যাওয়া, হঠাৎ করে কুৎসিত হয় যাওয়া, আগুন দেখে সরে না আসা, গরু শুয়োর ভেড়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা…’ একটা অদ্ভুত হাসি ফোটে সায়নের মুখে, ‘গঙ্গার তো তাও সন্দেহের কারণ ছিল কিছু…।
সঞ্জয় আর প্রত্যয় বসে পড়েছে ওদের পাশে। ধীরে ধীরে শীতের হাওয়া এসে লাগছে ওদের গায়ে। শরীর জুড়িয়ে আসছে। ঘুম পায় যেন। কী ভীষণ ক্লান্তি এসে গ্রাস করছে ওদের।
হঠাৎ সায়ন খেয়াল করে ওরা তিনজনেই যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। চোখের পাতা বন্ধ। পেছন ফিরে দেখে মৌলি দাঁড়িয়ে আছে।
‘তুই কী করলি ওদের?’ গর্জে ওঠে সায়ন।
অভয় দেয় মৌলি, ‘ভয় পাবেন না। ঘুমিয়ে পড়েছে শুধু। ঘুম থেকে উঠে কিছু বিশেষ কথা ভুলে যাবে ওরা। একটু পরে আপনিও ভুলে যাবেন।’
‘আমি কিছু ভুলতে চাই না।’ কান্নামাখা গলায় বলে সায়ন, ‘আমি তোর কথা ভুলতে চাই না—!’
‘আমরা সবই ভুলে যাই সায়নবাবু। সব থেকে বেশি যেটা মনে রাখতে চাই সেটাও। শুধু এই যে ভুলে না যেতে চাওয়ার ইচ্ছা—এটাই সব থেকে বেশি দামি। জীবন মানে তো আর কিছু নয়, জন্ম আর মৃত্যুর মাঝে ভুলে না যেতে চাওয়ার মতো কিছু গল্প। আসুন—।’
‘কোথায়?’
‘ওই যে ভুলে না যেতে চাওয়ার মতো কিছু গল্প বলি আপনাকে—।’
* * * *
‘সবই ঠিক আছে…’ দিলুবাবুর ড্রয়িংরুমে বসে অ্যাস্ট্রেতে ছাই ফেলতে ফেলতে ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী বললেন, ‘তাও একটা ব্যাপার কিন্তু থেকেই যাচ্ছে স্যার—’
‘কী ব্যাপার আবার?’
‘ওই নিশিকান্ত মণ্ডলের নাতিটা। ও কিন্তু যা বুঝলাম গ্রামে রাতবিরেতে ঘুরে ঘুরে অনেক কিছুই দেখেছে। শ্যাওড়াপাড়ার যদুনাথ আপনার খাস লোক ছিল, আমরাই কোর্ট থেকে বাঁচিয়ে এনেছিলাম। টগর কালুও কয়েকবার ঘোরাঘুরি করেছে আপনার কাছে। এদের যে ও নিজে চোখে অপরাধ করতে দেখেছে সেটা কিন্তু আমাকে বলেছে! এতদিন কাউকে বলেনি আলাদা কথা, কিন্তু হুট করে বাচ্চা ছেলের মাথায় কী খেয়াল চাপে… রাস্তাঘাটে যদি বলে বেড়ায়…’
মুখ দিয়ে দুশ্চিন্তাসূচক একটা শব্দ করেন দিলুবাবু, ‘এইটা একটা সমস্যা বটে, তো তুমি কী সাজেস্ট করছ?’
ঠোঁট চেপে উত্তর দেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, ‘খুনের জায়গায় ওর পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। বড় মানুষ হলে ফাঁসিয়ে দিয়ে মুখ বন্ধ করিয়ে দিতাম। কিন্তু বাচ্চা ছেলে…পরে না বিপদে পড়তে হয় আপনাকে…’
দিলুবাবু আঙুল দিয়ে সোফার হাতলে তবলা বাজান। মাথার উপর একটা হাত তুলে দিয়ে বলেন, ‘তাহলে তুমি ব্যবস্থা করো কিছু। বিপদ যাতে না আসে তার জন্যই তো তোমার মতো বিপত্তারিণীকে রেখেছি, তাই না?’
এই কথাটায় একটু ঘাবড়ে যান ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। অবিশ্বাসের চোখে উল্টোদিকে তাকান তিনি, ‘কী বলছেন স্যার! অন্য সব কিছু ঠিক আছে, কিন্তু বাচ্চা ছেলে! এখনও আঠেরোও হয়নি।’
‘কেন? নাবালক নিয়ে তোমার ছুঁতমার্গ আছে? আরে ভেবে দেখো, মা-বাপ কেউ নেই, নিশিকান্ত খুব একটা মাথা ঘামায় না ওকে নিয়ে। বনে বাদাড়ে রাতবিরেতে ঘুরে বেড়ায়। বলে দাও গঙ্গা মন্ত্র-তন্ত্র করে ওঁর শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। গঙ্গার ব্যাপারে যা মিথ্যে পারবে এখন চালিয়ে দাও। সাক্ষী দিতে তো আসবে না। আরে, দাও না বাবা একটা ঘাপলা করে দাও—।’
ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী মাথা নাড়ান। প্রস্তাবটা ভালো লাগে তার। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই কুসুম ঘরে ঢোকে। ওর হাতের প্লেটে দুটো চা আর এক প্যাকেট ক্রিম বিস্কুট।
পায়ে পায়ে হেঁটে এসে চায়ের প্লেটটা ওদের মাঝখানের টেবিলে নামিয়ে রাখে কুসুম। তারপর কিছু না বলেই বিস্কুটের প্যাকেটটা তুলে নিয়ে একটু দূরে সোফায় গিয়ে বসে পড়ে। তার হাবভাবে একটা শান্ত সমাহিত ভাব। মনে হয় কিছু নিয়ে যেন গভীর চিন্তায় আছে মেয়েটা।
টেবিল থেকে কাপটা তুলে নিয়ে আয়েশ করে চায়ে চুমুক দেন দিলুবাবু, ‘তবে ব্যাপারটা নিয়ে বেশি দেরি কোরো না। বাচ্চা ছেলের খেয়াল বলে কথা।’
ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীও সোফায় পিট এলিয়ে দিয়ে বড় করে চায়ের কাপে চুমুক দেন, ‘ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি। আপনার জন্য কত পাপের বোঝা যে বইতে হবে—।’
দিলুবাবু খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে সোফায় চাপড় মারেন, ‘আরে, ভগবানের আদালতে পাপপুণ্য বলে কিছু হয় না। স্বর্গে গেলে দেখতে পাবে যেটা ভোটে জেতে সেটাই পুণ্য, যেটা ভোটে হেরে যায় সেটাই পাপ!’
মশকরাটা মনে ধরে ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীর। দুজনেই একসঙ্গে হেসে ওঠেন। হাসতে হাসতেই দিলুবাবুর চোখ পড়ে কুসুমের দিকে। সে বিস্কুটের প্যাকেট খুলে একটার পর একটা বিস্কুট খেয়ে চলেছে। ক্রিম বিস্কুট।
দিলুবাবু কটমট করে তাকান তার দিকে, ‘এই কুসুম, তোকে বারণ করেছিলাম না, এত ক্রিম বিস্কুট না খেতে? দাঁতের পোকা হবে। রেখে দে, রাখ বলছি!’
কুসুম কথাটায় তেমন গা করে না। যেন আদৌ শুনতেই পায়নি কথটা। অন্যমনস্ক ভাবে একটার পর একটা ক্রিম বিস্কুট বের করে খেয়ে চলে সে।
দিলুবাবু গলা তুলে শাসানি দেন ওকে, ‘অলক্ষ্মী মেয়ে কোথাকার! একটাও কথা শুনতে নেই না? ভালোর জন্য বলছি, দেখ আমি উঠে ওখানে গেলে কী করি—একটা চড় মেরে…’
কথাটা বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়েও কাশতে শুরু করেন তিনি। সেই সঙ্গে ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীও। দুজনেরই ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। একটু আগের চুমুক দেওয়া চা-টা যেন গলায় আটকে গিয়ে নিঃশ্বাস নিতে দিচ্ছে না ওদের।
‘কী…চায়ে কী মিশিয়েছিস মাগি?’
নিজেদের গলা চেপে ধরে হাঁপাতে থাকেন দুজনে। সামনে ওদের চা-টা পড়ে থাকে। কুসুমের নিজের হাতে বানানো চা। নির্লিপ্ত মুখে বিস্কুটের প্যাকেট রেখে পকেট থেকে একটা আপেল বের করে কুসুম। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সজোরে একটা কামড় দেয় তাতে। তারপর ভিতর থেকে আপেলের বীজগুলো বের করে পাশে রাখে।
দুটো মানুষ সোফার উপরে বসেই একটু একটু করে ছটফটিয়ে নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে কুসুম। সেদিকে স্থির চোখে চেয়ে থাকতে থাকতেই কামড় বসায় আপেলে!
