কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ৮

অষ্টম অধ্যায়

খুটখুট একটানা হয়ে চলেছে আওয়াজটা। কোনও বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই, যেন একটা ঘড়ির কাঁটা এগোতে চেয়েও এগোতে না পেরে কেবল এগোনোর ইচ্ছা প্রকাশ করে চলেছে। কোনও একটা অদৃশ্য টান তাকে নিজের নিয়মে চলতে দিচ্ছে না।

ঘুম ভেঙে বিছানার উপর উঠে বসে সায়ন। রাত বেশ গভীর হয়েছে। কিন্তু তাও ওর নার্ভগুলো সজাগ হয়ে উঠছে। কেবলই মনে হচ্ছে কেউ একটা ডেকে চলেছে ওকে। এই ঘরের কোথাও থেকে। আয়নার দিক থেকে, না হয় জানলার দিক থেকে।

ওর ঘরের ভেতর শীতলতা স্বাভাবিকের থেকে একটু বেড়ে উঠে। হঠাৎ একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল সায়ন। ঘরে সবুজ রঙের নাইট ল্যাম্প জ্বলছিল। আপাতত তার রং বদলে নীল হয়ে গেছে। তাহলে কি মাঝরাতে নিজে থেকেই বদলে গেছে আলোটা?

একটু অবাক হল সায়ন। নাইট ল্যাম্পের দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠল! ল্যাম্পটার রং বদলায়নি, বরং সেটা নিভে গেছে। ঘরে যে নীল আলোটা ভরে আছে সেটা কোথা থেকে আসছে তা বুঝতে পারছে না।

হঠাৎই সেই নীল আলোর মধ্যে ও খেয়াল করে বিছানার ঠিক ওর পায়ের নিচে কেউ একটা বসে আছে। একটা নারীমূর্তি! মাথা নিচু করে দুটো হাঁটুর মধ্যে মুখ রেখে ঠিক যেন একটা মৃতদেহকে কেউ বসিয়ে রেখে গেছে। মাথা থেকে নেমে আসা অবিন্যস্ত চুল ওর পা দুটোকে ঢেকে রেখেছে।

সায়ন হঠাৎ খেয়াল করল চাপা একটা কান্নার আওয়াজ আসছে। যেন নারীমূর্তিটা খুব নরম স্বরে কাঁদছে।

‘কে? কে আপনি?’ কাঁপা গলায় চিৎকার করে ওঠে সায়ন। নারীমূর্তির ফোঁপানো থামে না। কান্নার সঙ্গে কয়েকটা ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দ বেরিয়ে আসে, ‘আমি ডাইনি নই! আমি ডাইনি নই…চুল সরিয়ে দেখো…আমি ডাইনি নই!’

সায়ন জানে এই মুহূর্তে বিছানা থেকে উঠে তার কাছে গিয়ে চুল সরানো উচিত হবে না। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য বল যেন বিছানা থেকে টেনে তোলে ওকে। ওর মনে হয় ওর হাতদুটো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।

এক-পা এক-পা করে সেই ক্রন্দনরত নারী মূর্তির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সায়ন। হাতদুটো বাড়িয়ে দেয় ওর চুলের ফাঁকে। খেয়াল করে মেঝের উপর যেখানে মেয়েটার চোখের জল এসে জড়ো হওয়ার কথা সেখানে দলাদলা রক্ত পড়ে আছে। ও হাত দিয়ে মেয়েটার চুল স্পর্শ করে, আর সঙ্গে সঙ্গে একটু আগের সেই খুটখুট আওয়াজটা আগের থেকে আরও বেড়ে ওঠে…

ও মুখ ফিরে তাকায় দরজার দিকে। দরজায় টোকা দিয়ে কেউ ডাকছে। নারীমূর্তির দিকে ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় ও। সেখানে কেউ নেই। জায়গাটা ফাঁকা, নীল আলোর তীব্রতা বেড়ে ওঠে। ও এগিয়ে গিয়ে ছিটকিনিটা খুলে দরজাটা খুলে দেয়।

 দিলুবাবু দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে। ওকে দেখে একটা চওড়া হাসি খেলে যায় তার মুখে, ‘এখনও ঘুমাওনি? কী ব্যাপার বলো তো?’

‘না আসলে আপনার ঘরের আলোটা হঠাৎ বদলে গেছে তাই…’

ঘাড় চুলকালেন দিলুবাবু, ‘ওরকম করে মাঝে মাঝে। তুমি ভয় পেয়ো না।’

‘ভয় পাচ্ছি সেটা আপনাকে কে বলল?’

‘না, এই চারদিকে যা চলছে…যে কেউ যখন তখন খুন হয়ে যাচ্ছে…তা মুখটা দেখতে পেলে?’

‘কোন মুখ বলুন তো?’

‘ওই যে, চুল সরিয়ে যেটা দেখতে যাচ্ছিলে?’

সায়নের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটা শিহরন খেলে যায়। দিলুবাবু কী করে জানতে পারলেন যে ও চুলটা সরাতে যাচ্ছিল?

‘আপনি কী করে…’

‘আরে! তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?’ দিলুবাবু হাসতে হাসতেই খাটের দিকে এগিয়ে যান, ‘বললাম না, ভয় পেয়ো না…ওসব ডাইনি ফাইনি সব গুজব, বুঝলে? আসলে…’

সায়ন কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই আবার দরজায় খটখট শব্দ হয়। আবার কে এল? ও গিয়ে দরজাটা খুলে অবাক হয়ে যায়। দিলুবাবু দাঁড়িয়ে আছে। মুখে একগাল হাসি। পাথরের স্থির মূর্তি যেন।

‘কে এল ভাই সায়ন?’ বিছানার দিক থেকে এসেছে প্রশ্নটা। উত্তর দিতে গিয়েও থমকে যায় সায়ন। যে প্রশ্নটা এসেছে সেটা একটা মেয়েলি গলায়।

‘মুখটা দেখতে পেলে?’ আবার সেই মেয়েলি গলায় প্রশ্ন, ‘এদিকে ঘুরে দেখো তো এরকম মুখ কিনা…’

খুব ধীরে ধীরে পেছন ফেরে সায়ন। এখন বিছানার উপরে আর দিলুবাবু বসে নেই। তার চেহারাটা পাল্টে গেছে একটা নারীমূর্তিতে। সে দুহাত দিয়ে পেট আড়াল করে বসে আছে। সমস্ত মুখ রক্তে লাল হয়ে আছে। তাও যেন সেই নারীমূর্তির মুখে হাসি লেগে রয়েছে।

নীলচে আলোটা এইবার অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। নারীমূর্তির দুটো হাত পেট ছেড়ে উঠে আসে উপরের দিকে। যেন ওকে কাছে আসতে আহ্বান জানাচ্ছে সে। সায়ন অবাক হয়ে দেখে তার পেটটা ফাঁক হয়ে আছে। রক্ত আর নাড়িভুঁড়িতে ভরে আছে সেই ফাঁকটা। সেখান থেকে কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে কী যেন একটা। সেই ফাঁক থেকেই আসছে নীলচে আলোটা। এবার মহিলার হাসিতে শব্দ এসে মেশে…সায়ন হাতদুটোর আরও কাছে এগিয়ে আসে…

আর সঙ্গে সঙ্গে সায়নের ঘুম ভেঙে যায়। কী বীভৎস দুঃস্বপ্ন! ও মুখ তুলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে এতক্ষণে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঘড়ির দিকে তাকায়, সাড়ে চারটে বাজে। মাথাটা ভার হয়ে আসে ওর। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে। মুখের উপর একবার হাত বুলিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। মনটা ভার হয়ে থাকে।

স্বপ্নের সেই অদ্ভুত নারীমূর্তির বলা কয়েকটা ইতস্তত ছেঁড়া ছেঁড়া শব্দ এখনও ওর কানে ভাসছে। শব্দগুলো ঠিক কী তা ওর মনে নেই। কেবল এইটুকু মনে আছে সেগুলো ভীষণ চেনা।

টুকটুক করে আওয়াজ হয় দরজায়। সেটা খুলে সায়ন দেখে কুসুম দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। ওর হাতে একটা আপেল। সেটা কামড়াতে কামড়াতে ঘরের ভিতর ঢুকে আসে সে। আপেল গালে অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে, ‘গুড মন্নিং…’

‘তুই এত ভোরে উঠিস?’ সায়ন বিস্ময় প্রকাশ করে।

‘উঠি না। আজ উঠেছি।’

‘কেন?’

‘আজ বাড়িতে আপেল আছে। কেউ ওঠার আগে খেয়ে নেব।’

সায়ন এই ক’দিনে বুঝেছে মেয়েটা ভীষণ রকমের পেটুক। তবে মনটা ভারি সরল। ওকে দেখলে নিজের মনের ভিতরটাও যেন পরিষ্কার হয়ে যায়। এ বাড়িতে অন্য কোথাও বসে খেতে গেলে অন্য কারও দেখে নেওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই ও সায়নের ঘরে বসেই যাবতীয় খাওয়াদাওয়া সারে।

‘তুমি আপেল খাবে?’ খাওয়া আপেলের একটা দিক ওর দিকে বাড়িয়ে দেয় কুসুম। সায়ন মাথা নাড়ে। তারপর কী যেন ভেবে বলে, ‘হ্যাঁ রে, তুই গঙ্গার মেয়ে মৌলিকে চিনিস?’

‘চিনব না কেন? আমি সবাইকে চিনি।’

‘বাবা! তা কী করে চিনলি?’

‘আমি যাই তো মাঝে মাঝে ওর কাছে। আমাকে খুব ভালোবাসে। মুড়কি খেতে দেয়।’

‘খেতে দেয়! তুই ওদের বাড়ি যাস নাকি?’

‘কেন যাব না? আমি সবার বাড়ি যাই।’

‘গঙ্গাকে দেখেছিস?’

‘না, গঙ্গা কারো সঙ্গে দেখা করে না। মৌলিদিদি বাইরের টেবিলে বসায় আমাকে। তারপর আমি খাই আর দিদি রুগি দেখে। আমাকে মাঝে মাঝে অনেক কিছু শেখায়।’

‘কী শেখায়?’

কুসুম আপেলটা তুলে ধরে। তারপর বলে, ‘মৌলিদিদি বলে এই আপেলের বীজে বিষ থাকে। এই বীজ থেকে বিষ তৈরি করতে হয়। তবে একটা আপেলে হয় না গো, অনেক আপেল লাগে। সেই আপেলের বীজ অনেকগুলো একসঙ্গে নিয়ে…তারপর…’

‘মৌলি তোকে বিষ তৈরি করতে শিখিয়েছে? কেন?’ সায়নের কান গরম হয়ে ওঠে।

‘তা তো জানি না। মৌলিদিদি বলে সব মানুষের মধ্যে বিষ থাকে। শুধু সময়মতো সেই বিষ উগরে দিতে হয়। কোথায়, কখন বিষ উগরাতে হবে সেটা নাকি নিজে থেকেই শিখে যাব…’ কথাগুলো বলে একটু থমকে কী যেন দেখে কুসুম, তারপর বলে, ‘মৌলিদিদি না, মাঝে মাঝে কেমন যেন হয়ে যায়, জানো?’

‘কেমন?’

‘পাল্টে যায়। তখন কারও সঙ্গে কথা বলে না। আমি বেশি কথা বললে রেগে যায় খুব। আমি তখন পালিয়ে আসি।’

একটা আপেল ছেড়ে আর একটা আপেল ধরেছে কুসুম। সায়ন ওর মাথার চুল এলোমেলো করে দেয়। তারপর উঠে বাইরে যাওয়ার জামাকাপড় পরতে পরতে বলে, ‘তোর ক্রিম বিস্কুট আছে আমার ব্যাগে। তবে বেশি খেলে কিন্তু দাঁত পড়ে যাবে। তখন আর কামড়ে আপেল খেতে পারবি না।’

ওকে জামাকাপড় পরতে দেখে কুসুম জিগ্যেস করে, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ এত সকালে?’

সায়ন কাঁধ ঝাঁকায়, ‘দেখি আশেপাশে সুন্দর দেখতে কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা। তোর জন্য নিয়ে আসব।’

‘জেঠু জিগ্যেস করলে কী বলব তাহলে?’

এবার সায়ন হেসে ফেলে। খাওয়ার ব্যাপারে মা আর জেঠুর কাছে নিশ্চয়ই ভীষণ বকাঝকা খায় মেয়েটা। হাত বাড়িয়ে কুসুমের গাল টিপে দেয় ও।

কিছুক্ষণ পর আলনা থেকে জ্যাকেটটা নিয়ে সায়ন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে পড়ে। বাইরে বেরতে কুসুমের অনুপস্থিতিটা টের পায়। মেয়েটা নেই বলে আবার একটা অদ্ভুত অনুভূতি চেপে ধরেছে ওকে। যে ক’দিন এখানে এসে আছে ও তার মধ্যে রোজই মনে হয়েছে রাতে বাইরে থেকে কেউ লক্ষ করে ওকে। কিন্তু ভালো করে বাইরে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পায় না। কেবল চামড়ার উপর একটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টির স্পর্শ—ওর অবচেতন মন ওকে সজাগ করেছে। এও কি এক ধরনের মানসিক খেয়াল? কিন্তু কাল রাতের ওই বিচিত্র ব্যাপারটা? ও নিশ্চিত, ওর ঘরে কিছু একটা ঢুকেছিল কাল। ও জেগে ওঠার ঠিক আগে সংকেত পেয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

কথাটা ভাবতে ভাবতেই নিচে নেমে আসে সায়ন। তারপর খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।

রাস্তাঘাট এখনও ফাঁকা। আর একটু পর থেকেই লোকজন দেখা যাবে রাস্তায়। জ্যাকেটটা ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নেয় সায়ন। তারপর হাঁটতে শুরু করে জঙ্গলের পাশে সেই ঝোপঝাড়ওয়ালা জায়গাটার উদ্দেশে। ওখানেই শিকড় তুলতে আসে মৌলি। কী যেন একটা বলবে বলেছিল ওকে। অন্যদিনের উৎসাহের সঙ্গে আজ একটা বাড়তি কৌতূহল যোগ হয়েছে। দ্রুত পা চালায় সায়ন।

জঙ্গলের লাগোয়া জায়গাটায় পৌঁছে মৌলিকে দেখতে পায় না সায়ন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। এদিক-ওদিক তাকায়, অপেক্ষা করে। মেয়েটার আগের দিন বলা কথাগুলো মনে পড়ে যায়। যতক্ষণ না সূর্য ওঠে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু সূর্য তো উঠে গেছে, ক্রমশ বেলা বাড়তে শুরু করেছে। এত দেরি করছে কেন ও?

সায়নের মনটা খচখচ করতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ঠিক করে একবার বাসুদেবের মাঠে গিয়ে দেখবে সেখানে গিয়ে বসে আছে কিনা। যেরকম মাথা খারাপ মেয়েটার, ওকে না জানিয়ে ওখানে চলে যাওয়াটাও বিচিত্র নয়।

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সেখানে গিয়েও ওকে দেখতে পায় না সায়ন। মাঠের মাঝে মৌলির বিরাট রকেটটা আগের মতোই পড়ে আছে। আড়াআড়ি গ্রিলগুলোর উপর সূর্যের আলো পড়ছে ধীরে ধীরে। একটা কুচকুচে কালো কাক বসে তার উপরে।

এবার গিয়ে সেই ভাঙা লরিটার দরজা খুলে উঁকি মারে সায়ন। না। এখানেও নেই সে। গেল কোথায়?

সায়ন ঠিক করে মৌলির বাড়ি গিয়েই একবার খবর নিয়ে আসবে। বাড়িতে তো যেতেই বলেছিল। মনঃস্থির করে নিয়ে গঙ্গাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় সে।

বাড়িটাকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে থমকে যায় সায়ন। সত্যিই হানাবাড়ি বটে। বাড়ির দোতলা খানিকটা ছড়ানো। সমস্ত বাড়িটার মধ্যে কেমন একটা কালচে ভাব। যেন সূর্যের আলো কৃপণ হাতে প্রবেশ করে ভেতরে। দোতলার অনেকটা অংশ ভাঙা। বাকি যেদিকটা আস্ত আছে সে দিকেও বোধহয় লোকজনের যাতায়াত নেই। সেই দিকের একটা বারান্দা ভাঙা শূন্যে ঝুলে রয়েছে। ভাঙা বারান্দা দিয়ে একটা টেবিল দেখা যাচ্ছে। বোঝা যায় সেটাও বহু যুগ আগেকার।

একতলার বাইরে একটা সরু পাঁচিল। তার গায়ে লাগোয়া একটা বড়সড় দরজা। তার উপরে কিছু লতানে গাছপালা লাগানো। তাছাড়াও দোতলা বাড়ির গোটাটা জুড়েই নানান রকম গুল্ম আর ঝুলন্ত লতাপাতার সার। রাতের অন্ধকারে এ বাড়িখানাকে দেখলে গা ছমছম করা আশ্চর্যের নয়!

গঙ্গার বাড়ির সামনে সকাল থেকে ভিড় জমে যাওটা স্বাভাবিক। আশেপাশে তিন চারটে গ্রাম থেকে মানুষজন আসে চিকিৎসার আশায়। বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে একটু অবাক হয় সায়ন। আজ ভিড় থাকলেও, লাইন নেই। গ্রাম্য লোকজন ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজেদের মধ্যে কী যেন গুনগুন করছে।

ও আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে দেখে বাড়ির বাইরে পাঁচিলের দরজাটা বন্ধ। বিশাল একটা জং ধরা তালা ঝুলছে সেই দরজায়। তার সামনে থেকে থেকে দু-একটা লোক মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি মেরে ফিরে আসছে। তারপর নিজেদের মধ্যে কানাকানি করছে। কেউ কেউ দূর থেকে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে এসেছে। তাদের অনেকে ব্যথায় ককিয়ে উঠছে থেকে থেকে। সম্ভবত চিকিৎসা এখনও শুরু হয়নি। জায়গাটা জুড়ে এক অসুস্থ পরিবেশ।

সায়ন আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সবে মাত্র পাঁচিলের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে আসা একটা লোককে জিগ্যেস করে, ‘দাদা, আজকে এখানে লাইন পড়েনি কেন?

লোকটার মুখ ব্যাজার হয়েছিল, তেমন বিরক্তি প্রকাশ করেই তিনি বলেন, ‘পড়বে কী করে? ভেতরে কেউ আছে নাকি?’

‘কেউ নেই মানে?’

‘দেখতে তো পাচ্ছেন, পাঁচিলের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ! বাড়িতে জনমানুষ নেই মশাই…দুজনেই পালিয়েছে…’

‘পালিয়েছে! সে কী, কখন?’

‘সে আমি কী জানি? আজ সকালে সবাই এসে দেখছে এই অবস্থা। বলুন দেখিনি, তিনমাইল হেঁটে ভোরবেলা লোকে লাইন দিয়েছি, আর এরা…’

সায়ন হতবাক হয়ে যায়। মৌলি না হয় কোনও কারণে বাড়ি ফেরেনি, কিন্তু তার মা তো সচরাচর বাড়ি ছেড়ে নড়ে না। তাহলে? ও নিজেও এগিয়ে যায়। তালার ফাঁক দিয়ে ভিতরে উঁকি মেরে বাইরের উঠোনে একটা ভাঙা টেবিল দেখতে পায়।

দু-একজন লোককে জিগ্যেস করে আরও কিছু জানার চেষ্টা করছিল, এমন সময় ওর পকেটে মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা রিসিভ করতে ওপার থেকে দিলুজেঠুর গলা শোনা যায়, ‘তুমি এই কাকভোরে বেরিয়ে গেছ! আমাকে তো একবার বলে যাবে!’

‘ভাবলাম আপনি ঘুমাচ্ছেন, তাই আর বিরক্ত করিনি…কুসুমকে তো বলে এলাম!’

‘ওর জ্ঞানগম্যি আছে ভেবেছ? না না, এভাবে দুমদাম বেরিয়ে যাবে না। মতিপুর আর আগের মতো নেই। তার উপর আজ ভোর থেকে যা শুনছি…’

‘কী শুনছেন?’

দিলীপ দস্তিদারের গলা একটু খাদে নেমে আসে, ‘তুমি আমার নিজের লোক বলেই বলছি। তবে যা বলছি সেটা আর কাউকে এক্ষুনি বোলো না। লোক জানাজানি হলে দক্ষজজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে!’

‘আমি আর কাকেই বা বলব? হয়েছেটা কী?’

‘কাল রাতে গ্রামের কিছু লোক গঙ্গার মেয়েকে জঙ্গলে ধরে নিয়ে গেছে। রাত থেকে সেখানেই আছে শুনছি। গাছের সঙ্গে বেঁধে পাগলের মতো মারধোর করেছে শুনলাম।’

সায়নের পায়ের তলার মাটি মুহূর্তে বালিতে পরিণত হয়। চোরাবালিতে ডুবে যেতে থাকে ও। কোনরকম ফোনটা শক্ত করে ধরে বলে, ‘ধরে নিয়ে গেছে মানে? কোথায় ধরে নিয়ে গেছে?’

‘জানি না। পুরুতমশাই বললেন মন্দিরের পাশের জঙ্গলে ওদের একটা ডেরা বানিয়েছে। জনা তিরিশেক লোক। আরও নাকি দল বাড়ছে ওদের। সেখানেই বেঁধে রেখেছে। এদিকে পুলিশও কাল রাত থেকে লক্ষ রাখছিল ওর উপর। আমি এদিকে শ্যাম রাখি না কূল রাখি…এরা আমাকে আর শান্তিতে থাকতে দেবে না। বড়সড় একটা কিছু লাগবে এবার!’

সায়ন প্রায় চিৎকার করে ওঠে, ‘কিন্তু মৌলি কী করেছে?’

‘সে আর কে বোঝাবে ওদের? মনে হয় মাকে না পেয়ে মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। ওরা বলছে মা-বেটি দুজনেই নাকি জড়িত আছে এসবে। যেরকম খেপে আছে তাতে এতক্ষণে আরও বড় কিছু করে বসেছে কিনা কে জানে!’

সায়নের দিক থেকে উত্তর না পেয়ে আবার বলেন তিনি, ‘যাক গে, তুমি আর এইসবের মধ্যে থেকো না। ফেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও বাপু। আমার এই ঝঞ্ঝাটের মধ্যে তোমাকে এখানে নিয়ে আসাই ভুল হয়েছে…’

‘এখনও জঙ্গলের ভিতরেই আছে ওরা?’

‘মনে তো হয় তাই। আমি ফোন করছি যাদের চিনি, কাউকে ধরতে পারছি না।’

ফোনটা কেটে দেয় সায়ন। ওর মাথার ভিতরে উন্মাদ রক্তের স্রোত বইতে শুরু করেছে। হাতের আঙুলগুলো মুঠো হয়ে আসছে। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কাল রাত থেকে এই কারণেই ফেরেনি মৌলি। কিন্তু গঙ্গা? সে কোথায় গেল?

সায়ন আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ওখানে উপস্থিত কয়েকজন লোককে জিগ্যেস করে মন্দিরটা কোথায় জেনে নেয়। তারপর ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে শুরু করে সেদিক লক্ষ্য করে।

মিনিট দশেকের মধ্যে মন্দিরের কাছে পৌঁছাতেই কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সায়ন। মন্দিরের বাইরেটা খাঁ-খাঁ করছে। এ সময় এই চত্বর এতটা ফাঁকা থাকার কথা নয়। ওর মন বলে, কিছু একটা ঘটেছে। এবং যেখানে ঘটেছে সেটা এখানে থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

জঙ্গলের ভেতর একটা গুঞ্জনের আওয়াজ শুনতে পায় সায়ন। খুব স্পষ্ট নয়, অনেক লোক একজায়গায় জড় হলে তাদের ছোটছোট আওয়াজ সম্মিলিত হয়ে যেমন বোল ওঠে, সেইরকম।

দ্রুত জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে আসে সে। আওয়াজটা লক্ষ করে দৌড়াতে থাকে। সারিসারি গাছ ঘন হয়ে ওর দৃষ্টি আটকাতে থাকে। কয়েকটা কাঁটা গাছে লেগে হাতের বেশ কিছু জায়গায় চিরে যায়। কিন্তু ওদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না সায়ন। মৌলি কি বেঁচে আছে? এতক্ষণে লোকগুলো…

ওর চোখ ফেটে কান্না আসতে থাকে। গঙ্গাই বা কোথায়? মৌলিকে বাঁচাতে এসেছিল? কিন্তু এতগুলো লোকের মাঝখানে তাকে বাঁচানোটা…

হঠাৎ সায়ন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। জঙ্গল ফুঁড়ে একটা গ্রাম্য লোক বেরিয়ে এসে ওর পথ আগলেছে।

‘ও দাদা, কে আপনি? এখন এদিকে কেন?’ লোকটার চোখমুখে উত্তেজনার স্পষ্ট ছাপ।

সায়ন চোখ তুলে তাকায় তার দিকে। কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে আরেকটা লোক এগিয়ে আসে, ‘আরে এ তো দিলুবাবুর লোক। নতুন এসেছে, কিন্তু এত সকালে এদিকে এসেছেন কেন আপনি?’

‘আপনারা একটা মেয়েকে তুলে এনেছেন এখানে?’ রাগত গনগনে স্বরে বলে সায়ন।

লোকটার মুখে শিরাগুলো কুঞ্চিত হয়। যেন এ প্রশ্নটা ভয়ঙ্কর বিরক্ত করেছে তাকে। অস্থির লাগতে থাকে।

‘এনেছিলাম…’ মাথা দোলায় লোকটা, ‘এখন আর নেই।’

‘নেই মানে?’

লোকটা হাত বাড়িয়ে জঙ্গলের একটা নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে দেয়, ‘জিগ্যেস করছেন যখন কলজের জোর থাকলে আপনি নিজেই গিয়ে দেখে আসুন, নেই মানে কী…’

সময় যেন উন্মাদ হাওয়ার বেগে বইতে থাকে। ওর সামনেটা ছেড়ে দাঁড়ায় লোকটা। সেখান দিয়ে কাঁপা কাঁপা পায়ে দৌড়াতে থাকে সায়ন। বাকি জমাট বেঁধে থাকা দলের লোকজন ওর দিকে একবার সন্দেহের দৃষ্টি হেনে আবার মুখ ঘুরিয়ে নেয়। বোঝা যায় দরকারি কিছু আলোচনা করছে তারা। ওদের মুখে উদ্বেগ আর আশঙ্কার চাপ স্পষ্ট। সায়নের বুক উত্তেজনায় যেন ফেটে যাবে। একটু পরে ঠিক কী দেখতে চলেছে ও নিজেও জানে না। পা’টা ভারী মনে হয়।

কিছুটা এগিয়ে যেতে একটা জায়গায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সায়ন। একটা লম্বা গাছের সঙ্গে একটা দড়ি আলগা করে জড়ানো। যেন টান মেরে কেউ ছিঁড়ে ফেলেছে সেটাকে। বোঝা যায় একটা সময় একটা মানুষ বাঁধা ছিল তাতে।

মানুষ নেই দেখে আশ্বস্ত হওয়ার সময় পায় না সে। তার আগে অন্য একটা জিনিস চোখে পড়েছে। গাছের ঠিক সামনে দুটো মানুষের দেহ পড়ে আছে। তবে মানুষের শরীর বলে চিনতে ভুল হয় সেগুলো। শরীরের দুটো হাত আর দুটো পা আলাদা আলাদা করে যেন মুচড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে কেউ। তারপর পেট চিরে একটা শরীরের নাড়িভুঁড়ির সঙ্গে অন্য শরীরের নাড়িভুঁড়িগুলোকে পেঁচিয়ে দিয়েছে। ওদের শরীরের উপরেই গাছ থেকে দুটো লম্বা দড়ি ঝুলছে। সেই দড়ির ডগায় ঝুলছে ওদের চারটে হাত-পা। বোঝা যায় দড়িদুটোয় একসময় বাঁধা ছিল ওদের দেহ।

সায়ন বুঝতে পারে ঠিক কী ঘটেছিল। হাত-পা একজায়গায় করে তাতে দড়ি বেঁধে পিছমোড়া করে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল লোকদুটোকে। তারপর অসীম শক্তিতে হ্যাঁচকা টানে ধড়টুকু ছিঁড়ে নামানো হয়েছে মাটিতে। এবং গোটা ব্যাপারটা হয়েছে লোকদুটো জীবিত থাকা অবস্থায়। মৃত্যুর পর প্রবল আক্রোশে তাদের নাড়িভুঁড়ি বের করে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আপাতত দুটো শরীর একটা সম্মিলিত মাংসপিণ্ড হয়ে পড়ে রয়েছে।

সায়নের বুকে একটা ধাক্কা লাগে। এমন নৃশংস ও বীভৎস দৃশ্য সে আগে দেখেনি। পিছিয়ে এসে মাটির উপরেই বসে পড়ে সে। দুহাত দিয়ে চোখদুটো ঢেকে ফেলে।

একটু আগের লোকটা এগিয়ে এসে ওর কাঁধ স্পর্শ করে। নরম গলায় বলে, ‘বলেছিলাম না, কলজের জোর দরকার এসব দেখতে গেলে। উঠে আসুন স্যার, আমরা খারাপ লোক নই।’

‘কিন্তু এগুলো কীভাবে…’

মাটিতে পড়ে থাকা দুটো দেহর দিকে আঙুল দিয়ে দেখায় লোকটা, ‘কাল রাতে ওই দুজনকে পাহারায় রেখে আমরা বাইরে বসেছিলাম। আমাদের সঙ্গে কোনও মেয়ে ছিল না, তাই ভোরবেলা কয়েকজন মিলে গ্রাম থেকে মহিলাদের আনতে গেছিলাম। বাকি সবারই অল্প ঘুম পেয়ে গেছিল। হঠাৎ একটা চিৎকারে গণেশের ঘুম ভেঙে যায়। ও গিয়ে দেখে ওই মেয়েটা নেই। আর বাকিটা তো দেখলেন…’

সায়ন কথা বলতে পারে না। বিড়বিড় করে অস্ফুট কিছু শব্দ বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে।

‘এবার বিশ্বাস হল আমাদের কথা? সামান্য জড়িবুটি দিয়ে দুটো রোগ সারিয়ে বছরের পর বছর এই গ্রামে…যাই হোক, আমি দিলুবাবুর মুখে শুনেছি আপনার কথা। আমাদেরকে ক’টা সাহায্য করতে পারবেন?’

‘কী সাহায্য?’

‘ওই মেয়েটার শরীরে কয়েকটা উল্কি পাওয়া গেছে। মোবাইলে সেগুলোর ছবি তুলে রেখেছি আমরা। কিন্তু মানেগুলো জানি না। যদি আপনি কোনওভাবে…’

সায়ন উঠে পড়ে। তারপর পেছন ফিরে হাঁটতে থাকে, ‘সন্ধেবেলা বাড়িতে আসুন, তখন দেখা যাবে।’

কথা শেষ না করেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে যায় ও। মাথার ভেতরে এখনও রক্তাক্ত শরীরদুটোর ছবি উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। এ দৃশ্য ও আগে দেখেছে কেবল বইয়ের পাতায়। একটা বিশেষ বইয়ের পাতায়…।

কিন্তু লোকগুলো কি মিথ্যে কথা বলছে? মৌলিকে ফাঁসানোর জন্য ওরা নিজেরাই নিজেদের লোককে খুন করে। সত্যি কি এত কিছু করতে পারে ওরা?

ওর মাথা কাজ করে না। চোখদুটো বন্ধ হয়ে আসে…