কুয়াশার ফুল – সায়ক আমান

কুয়াশার ফুল – ১৬

ষোড়শ অধ্যায়

রমাকান্ত গ্রামের পথ ধরে ফিরছিল। অন্যদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হয় ওর। কিন্তু ইদানীং একরকম বউয়ের ঠেলা খেয়ে সন্ধের আগেই বাড়ি চলে আসে। গঙ্গা এখনও ধরা পড়েনি। কখন কার উপর তার করাল দৃষ্টি নেমে আসে কিছুই বলা যায় না।

পুকুরের পাশ দিয়ে সরু রাস্তা। সেই পথ ধরেই হেঁটে আসছিল। হঠাৎ খেয়াল করে পুকুরের একেবারে পাশেই কিছু একটা পড়ে আছে। মুহূর্তে ওর বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। অন্য সময় হলে জিনিসটা ভয়ের কিছু ছিল না। কিন্তু ইদানীং চারদিকে যা চলছে…কিছু কি শুয়ে আছে পুকুরের ধারে? এড়াতে গিয়েও এড়াতে পারে না রমাকান্ত। ইতস্তত করে শেষে কয়েক পা এগিয়ে যায় সেদিকে।

হ্যাঁ, একটা মানুষের দেহ পড়ে আছে পুকুরের ধারে। মানুষটার একটা পা ডুবে রয়েছে পুকুরে। নরম কাদার উপর পড়ে আছে বলে খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না। রমাকান্ত বুঝতে পারে শরীরটা একটা অল্প বয়সি ছেলের।

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে কাছে চলে আসে রমাকান্ত! ছেলেটার চোখে মুখে হাত রাখে। না মরেনি। তবে জ্ঞান হারিয়েছে।

ও বেশ কয়েকবার ঠেলা মারে বাচ্চাটাকে, ‘খোকা, এই খোকা, ওঠ…কে তুই?’

খুব আস্তে আস্তে চোখ খুলে ছেলেটা পিটপিট করে ওর দিকে তাকায়। তারপর বলে, ‘তুমি…তুমি কে?’

লোকটা ওর গালের উপর হাত দেয়। বলে, ‘পুকুরের ধারে শুয়ে আছিস কেন? কী করছিলি এখানে?’

‘কই! আমি তো আসিনি…আমি…’

‘তুই এখানে এলি কী করে সেটা বল আগে!’

ছেলেটা কিছুই বুঝতে পারে না। ফ্যালফেলিয়ে বোকার মতো চেয়ে থাকে ওর দিকে।

‘কাদের বাড়ির ছেলে তুই? ঠিকানা বলতে পারবি?’

এবার ছেলেটার মুখে কথা ফোটে, ‘নিশিকান্ত মণ্ডলের নাতি…’

‘নিশিকান্ত! সে তো মতিপুরে! তুই কি হারিয়ে গেছিলি কোনওভাবে? নাকি কেউ ধরে নিয়ে এসেছে?’

‘কেউ ধরে…’ মনে করার চেষ্টা করে মণি। ওর মাথার ভেতরে সবকিছু সব কেমন ঘেঁটেঘুটে আছে। ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা মনে পড়ছে, আবার ভালো করে মনে করতে গেলেই কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। কেবল থেকে থেকে একটা নীলচে আলো মনে আসছে ওর। কোথায় দেখেছে আলোটা তা কিছুতেই মনে পড়ছে না।

সমস্ত গা জলে ভিজে আছে। শীতের হাওয়ায় ভীষণ অস্বস্তি হয় ওর। রমাকান্তের দিকে চোখ তুলে তাকায়, ‘আমার খুব ভয় করছে…আমি বাড়ি যাব।’

* * * *

মাধব ভট্টাচার্য বসেছিলেন নিজের ঘরে। একতলার ঘর। চারপাশ ভীষণ রকম শান্ত হয়ে আছে। দেওয়ালের এক প্রান্তে ঝুলন্ত একটা পুরনো ঘড়ি খুচখুচ করে এগিয়ে চলেছে।

পুরোহিতমশাইকে ঘিরে বসে আছে চারজন পুলিশ অফিসার। তার পেছনে বসে আছে গুপি। সে একবারও পুরোহিতমশাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। অথচ ঘর থেকে বেরিয়েও যায়নি। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী এতক্ষণ ডানপায়ের উপর বাঁ-পা তুলে বসেছিলেন। এবার বাঁ-পায়ের উপর ডান-পা তুলে বললেন, ‘তাহলে বলুন, কেন খুন করলেন মৌলিকে?’

উত্তর দিতে একটু সময় লাগে মাধব ভট্টাচার্যের, ‘কারণ এই গ্রামে যদি কোনও ডাইনি থেকে থাকে তাহলে সে মৌলি। গঙ্গা নয়…’

‘সেটা আপনি জানলেন কীকরে?’

একটু আগে পুলিশের লোকজন এভিডেন্স কালেক্ট করে নিয়ে গেছে। পুরোহিতমশাইয়ের ঘর থেকে আবিষ্কার হয়েছে একটা রক্তমাখা ছুরি, রক্তের ছাপ লাগা একটা শার্ট প্যান্ট। যে ছুরির ব্লাড স্যাম্পলের সঙ্গে অবিকল মৌলির ব্লাড স্যাম্পেল মিলে গেছে। সেগুলো আপাতত থানায় জমা আছে।

মাধব ভট্টাচার্য হাত দিয়ে কপালের ঘাম মোছেন। তারপর বলেন, ‘গঙ্গাকে আমি ভালোবাসতাম…’

‘সেই জন্যই গঙ্গা কাউকে খুন করেনি?’ সঞ্জয় পাশ থেকে ব্যাঙ্গের স্বরে বলে ওঠে। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী হাত তুলে তাকে ধমক দেন, ‘আহ, ওনাকে ওনার কথা বলতে দাও। যতক্ষণ বলছেন মাঝখানে ইন্টারফেয়ার কোরো না। আপনি বলুন পুরোহিতমশাই, গঙ্গাকে আপনি ভালোবাসতেন—এতে অপরাধের কিছু নেই। কিন্তু ও ডাইনি নয় সেটা কেমন করে জানলেন?’

‘যদি সত্যিই গঙ্গা ডাইনি হত তাহলে এই গ্রামে শিশু চুরি আরও অনেক দিন আগে থেকে শুরু হত, তাই না?’

‘তার তো কোনও মানে নেই! ধরুন পরে গিয়ে ওর মাথার মধ্যে গোলমালটা এসেছে…’

পুরোহিতমশাই টেবিলের উপর একটা চাপড় মারেন। তার গলাটা গনগনে আগুনের মতো ফুঁসছে, ‘গঙ্গার মাথায় কোনও সমস্যা নেই, ওর একমাত্র পাপ ওই মেয়ের জন্ম দেওয়া। ওই মেয়েই ওকে শেষ করে দিয়েছে…’

‘মানে, আপনি বলছেন মৌলি গঙ্গারই মেয়ে? বিয়ে তো করেনি। কোনও গোপন প্রেমিক টেমিক আছে বলছেন?’

‘আমি বলছি না। আমি জানি।’

‘কী করে জানলেন?’

‘নিজের চোখে দেখেছি বলে—।’

‘কী দেখেছেন?’

হাত দিয়ে থুতনিটা ঘষেন পুরোহিতমশাই, ‘গঙ্গার ঘরে একটি লোক আসে। গভীর রাতে, চোরের মতো…’

‘আসে মানে?’

‘মাঝে মাঝেই আসে। এখনও আসে হয়তো। আমি প্রথম দেখেছিলাম বারোবছর আগে। অন্ধকারে গা’ঢাকা দিয়ে আসে। সঙ্গে একটা বড়ো ব্যাগ থাকে। সেই সম্ভবত ওর গোপন প্রেমিক। আমি নিশ্চিত, তারই মেয়ে মৌলি…’

‘গোপন প্রেমিক!’ আঙুল দিয়ে দাড়ি চুলকান ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, ‘গঙ্গার একটা গোপন প্রেমিক আছে সেটা তো এতদিন জানতাম না!’

‘আমি ওর ওপর লক্ষ রাখতাম। অল্পবয়সে আমি মাঝেমধ্যেই গঙ্গার বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়াতাম। জানালা দিয়ে দেখতে পেতাম ওকে। সেরকমই দু-একদিন দেখেছিলাম একটা লোককে গঙ্গার ঘরের ভেতর ঢুকতে। অনেকক্ষণ থাকে। তখন ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে দেয় গঙ্গা। তারপর লোকটা আবার চলে যায়।’

‘মৌলি যে ডাইনি সেটা কী করে বুঝলেন আপনি?’

মাধব ভট্টাচার্যের গলায় একটা অদ্ভুত বিষাদ এসে মেশে। যেন কথাগুলো বলতে একেবারেই ইচ্ছে করছে না তার। তাও নিমের পাচন গেলার মতো করে বলেন, ‘আমি নিজে ওকে দেখেছি ভূতুড়ে কাণ্ড করতে!’

‘কীরকম কাণ্ড?’

কাঁধ ঝাঁকান পুরোহিতমশাই, ‘ও মাঝে মাঝে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে মন্ত্র পড়ে। অজানা ভাষার কোনও মন্ত্র। তখন ওর শরীরের ওই দাগগুলো নীল আলোয় জ্বলতে থাকে। তারপর একটা অদ্ভুত নীলচে বৃত্ত তৈরি হয় ওর সামনে। ঠিক যেন একটা আয়না। তার ভিতরে দেখা যায় ওর মতোই আর একটা মেয়ে বসে আছে। অনেকক্ষণ ধরে জ্বলার পর বৃত্তটা নিভে আসে। যতক্ষণ না নিভে আসে ততক্ষণ ও ওই ভাবেই বসে থাকে। স্থির হয়ে। সাড়াও দেয় না।’

‘এসব নিজের চোখে দেখেছেন আপনি?’

মাথা নাড়েন মাধব ভট্টাচার্য, ‘তাছাড়া ও পশুপাখি বশ করতে পারে। এ গ্রামে যদি কেউ ডাইনি হয়ে থাকে তাহলে সে হল মৌলি, গঙ্গা নয়!’

‘বটে!’ ঘরে উপস্থিত সকলের দিকে এবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, ‘বেশ, সে নাহয় বুঝলাম, কিন্তু মৌলিকে আপনি খুন করলেন কী করে?’

চওড়া হাসি হাসেন মাধব ভট্টাচার্য, ‘আমার ঘর থেকে এত কিছু পেলেন, তাও অনুমান করতে পারলেন না? ছুরি দিয়ে…’

‘কী দিয়ে সেটা জিগ্যেস করিনি। ওকে জঙ্গলের লোকগুলোর হাত থেকে ছাড়িয়ে আনলেন কী করে?’

মাধব ভট্টাচার্য আপত্তি করে ওঠেন, ‘আমি ওকে ছাড়িয়ে আনিনি। তার দরকার পড়েনি। ও নিজেই ভোররাতের দিকে লোকগুলোকে খুন করে জঙ্গল থেকে পালায়। আমাকে প্রভাকররা নিয়ে গেছিল আমার সামনে ওর থেকে স্বীকারোক্তি নিতে। আমার আশঙ্কা হয় অত্যাচারের মুখে ও হয়তো নিজেকে বাঁচাতে নিজের মাকে ফাঁসিয়ে দেবে। আর গঙ্গাও মেয়েকে বাঁচাতে সব দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেবে। আশঙ্কা নিয়েই বাড়ি ফিরেছিলাম। তারপর ভোররাতের দিকে সবে মন্দিরের দিকে যাচ্ছি এমন সময় ও জঙ্গলের ভিতর থেকে ডাকল আমাকে। ও জানত আমি গঙ্গাকে ডাইনি মনে করি না। ফলে আমাকে ভরসা করে। বলে ওকে কিছুক্ষণের জন্য লুকিয়ে রাখতে।’

‘কিছুক্ষণের জন্য কেন? তারপর কোথায় যাবে?’

‘তা জানি না। জিগ্যেস করিনি। তখনই মনঃস্থির করে নিই। এই মেয়ে বেঁচে থাকলে একদিন না একদিন গ্রামের লোক পুড়িয়ে মারবে গঙ্গাকে। বাড়ি ফিরে এসে ছুরিটা নিয়ে আবার জঙ্গলের ভিতরে ঢুকি আমি। তারপর…’

‘সেখানেই বুকে ছুরি মেরে ওকে খুন করেন, তাই তো?’

উপরে নিচে ঘাড় নাড়েন মাধব ভট্টাচার্য।

‘তাহলে ওর বডিটা গঙ্গার বাড়ির ছাদে গেল কী করে?’

‘আমি জানি না…’ আগের সেই বিমর্ষ ভঙ্গিতেই মাথা নাড়েন মাধব ভট্টাচার্য, ‘আমি জানি না কী করে গেল! আমি জঙ্গলেই ফেলে এসেছিলাম। তবে তখনও হয়ত অল্প প্রাণ বাকি ছিল ওর মধ্যে। বুঝতে পেরেছিলাম মিনিটখানেকের মধ্যেই মরে যাবে।’

সঞ্জয়ের দিকে মুখ ফেরালেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, ‘ভারি অদ্ভুত কেস তো! বডি আপনি ফেলে এলেন জঙ্গলে আর মৃতদেহ নিজে উঠে চলে এল নিজের বাড়িতে!’

‘ও ডাইনি, সব কিছু পারে। আমি নিজের চোখে দেখেছি বলে জানি। ওকে আধমরা করে আসাই উচিত হয়নি আমার।’

‘ওকে লোকগুলোর হাত থেকে কে ছাড়িয়েছে সেসব ব্যাপারে কিছু বলেনি আপনাকে?’

‘না, আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম ও গঙ্গার নাম বলেছে কিনা।’

বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, তারপর টেবিল থেকে উঠতে উঠতে বলেন, ‘বেশ, আপাতত লকআপে থাকুন, কাল দেখছি আপনার কী ব্যবস্থা করা যায়। সঞ্জয়, একবার বাইরে এসো তো—।’

সঞ্জয়কে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন অপরেশ গাঙ্গুলী। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে বলেন, ‘কী বুঝছ হে? অবস্থা তো জটিলতর হচ্ছে—।’

‘স্যার, ওই মেয়েটা যে একটু অদ্ভুত সেটা কিন্তু আমারও মনে হয়েছিল। মানে হাবভাব দেখে…’

‘সুন্দরী মেয়েরা একটু অদ্ভুত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কথা হল, সে মরে যাবার পরেও অমন উঁচুতে উঠল কী করে?’

‘ও যদি ডাইনি হয়, তাহলে তো ও সবই পারে স্যার?’

ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে গাঙ্গুলী বললেন, ‘আরে থামো তো। ডাইনি হলে তারও তো একটা নিয়মকানুন থাকবে। ধুর ধুর, সব গুলিয়ে যাচ্ছে আমার! তার উপর কাল রাতে আবার…’

‘রাতে কী?’

‘আমাদের শ্যাওড়াপাড়ার মাঠে আরও চারটে লোককে কে যেন খুন করে রেখে গেছে!’

গাঙ্গুলীর ফোনটা বেজে উঠল। সেটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে দিলুবাবুর গলা শোনা গেল, ‘গাঙ্গুলী, আমি ফিরে এসে শুনলাম, এদিকে একটা ঝামেলা হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি চলে এসো—।’

‘আবার কী হল?’

‘গ্রামের লোক খেপে উঠেছে। ওরা কুকুরের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে গঙ্গাকে। সামনে পেলে যা নয় তাই করতে পারে। আমি সঙ্গে ক’টা পুলিশের লোক ঝুলিয়ে দিলাম…’

‘কিন্তু পুরোহিতমশাই বলছেন গঙ্গা ডাইনি নয়, এখন তো যা মনে হচ্ছে বাচ্চা চুরিগুলোও মৌলি করেছিল। সে তো অলরেডি ডেড!’

‘তুমি পারলে ওদের বোঝাও। আমি তো কিছু কূলকিনারা পাচ্ছি না। ওরা বলছে যা করার দুজন মিলেই করেছে। মৌলি যদি মরে গিয়ে থাকে তাহলে গঙ্গাকেও মরতে হবে।’

ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিলেন গাঙ্গুলী। হঠাৎ কী মনে পড়তে জিগ্যেস করেন, ‘আচ্ছা ভালো কথা, আপনার দোতলায় কে কে থাকে এখন দিলুবাবু?’

‘সায়ন থাকে। কুসুম মাঝে মাঝে যায় ওর কাছে।’

‘সে তো বাচ্চা। বড় কেউ যায় না ওখানে? মহিলা?’

‘উঁহু, প্রথম প্রথম যেত বটে, কিন্তু শুনলাম ইদানীং নাকি ও ঘরে কাউকে ঢুকতে বারণ করেছে সায়ন। কোথাও বেরোলে একেবারে তালা ঝুলিয়ে যায়।’

‘সেকী! কেন?’

‘তা জানি না…আর বলো কেন, এই ছেলেকে নিয়ে হয়েছে মুশকিল! কেন যে আদর করে ডেকে এনেছিলাম। এখন ঘরের ছেলে মানে মানে ঘরে ফিরলে বাঁচি। আমার ভাগ্য ভালো ও এখনও বেঁচে আছে। তুমি যখন ফোন করে ওর পড়ে যাওয়ার খবরটা দিলে আমার তখন ফিরে আসার উপায় ছিল না।’

‘এখন কেমন আছে সে? তেমন কিছু ইনজুরি লক্ষ করেছেন নাকি?’

‘সেসবের সুযোগ আর পেলাম কোথায়? আমি এসে থেকে তার টিঁকিটি খুঁজে পাইনি। জানি না, কোথাও বেরিয়েছে মনে হয়…’

ফোনটা রেখে সঞ্জয়ের দিকে ঘোরেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী, ‘আমি একবার দিলুবাবুর বাড়ি যাচ্ছি। কাল রাতে যে ছেলেটাকে পাওয়া গেছে, তাকে কোনও কনস্টেবলকে দিয়ে পাঠিয়ে দাও। ওর সঙ্গে কিছু কথা বলা দরকার।’

সঞ্জয়কে থানায় পাঠিয়ে বাইকটা দিলুবাবুর বাড়ির দিকে হাঁকিয়ে দেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। কী একটা যেন আন্দাজ করতে পারছেন তিনি। কোথায় কিছু ভুল হয়ে যাচ্ছে।

* * * *

মাঝরাতে থানার দরজায় একরকম ধাক্কা মেরে ঢুকে আসে প্রত্যয় আর তনুজা। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী আপাতত থানায় নেই। নিজের টেবিলে বসে কিছু কাগজপত্র উল্টাচ্ছিল সঞ্জয়। সে মুখ বাড়িয়ে ওদের দেখতে পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ভীষণ উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে ছেলেমেয়ে দুটোকে।

‘কী হয়েছে? আপনারা হঠাৎ!’

‘ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলীর নাম্বারে ফোন করছি। ওনাকে কোথাও পাচ্ছি না।’ তনুজা উদ্বিগ্ন গলায় বলে।

‘উনি বোধহয় একটু দিলীপবাবুর বাড়ি গেছেন। আপনাদের কিছু বলার থাকলে আমাকে বলতে পারেন।’

প্রত্যয় এগিয়ে যায়, ‘গঙ্গাকে খুঁজে পেয়েছেন আপনারা?’

‘না, গ্রামবাসীরা পাগলের মতো খুঁজছে। বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে না।’

ওরা দুজনে এগিয়ে এসে সঞ্জয়ের হাত চেপে ধরে, ‘ওকে বাঁচান, ও ডাইনি হতে পারে না—!’

সঞ্জয় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলে, ‘ডাইনিতে আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু গঙ্গা বাচ্চাগুলোকে যে চুরি করেছে সেটার প্রমাণ আছে আমাদের কাছে।’

সঞ্জয় টেবিলে বসতে ওর টেবিলের উপরে ঝুঁকে পড়ে তনুজা, ‘আচ্ছা, সেই সমীরণ মিত্রের যার সঙ্গে বিয়ে হবার কথা ছিল তাকে ইন্টারোগেট করেছেন আপনারা?’

‘হ্যাঁ, আমি নিজেই করেছিলাম। কিন্তু স্যার বেশি গুরুত্ব দিতে চাননি। ব্যাপারটাকে ফাইনাল রিপোর্ট থেকে একরকম বাদ রাখতে বলেছিলেন।’

কথাটা বলে একটু ইতস্তত করে সঞ্জয়। ক’দিন ধরে যে কথাগুলো মনের ভিতর খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে সেগুলো বলা উচিত হবে কিনা ভেবে দেখে একবার। এরা রিপোর্টার। হয়ত ঠিক করে গুছিয়ে বলতে পারলে বড় নেতামন্ত্রী অবধি…

‘কী বলেছিল সেই মেয়েটি?’ তনুজা জিগ্যেস করে।

কথাটা বলতে গিয়ে একটু থমকায় সঞ্জয়, শেষে বলে, ‘আপনারা একটু থানার বাইরে আসুন—।’

থানার গেটটা পেরিয়েই একটা ছোট সিমেন্টের সিঁড়ি। এদিকটায় বড় একটা কেউ আসে না। তাও সেই সিঁড়ির উপরে বসে চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নেয় সঞ্জয়, তারপর বলে, ‘সে যা বলছে তা তো মারাত্মক! আপনারা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন!’

‘কী বলছে সে?’

‘তার কোনও প্রেমিক-টেমিক আদৌ ছিল না। সমীরণ মিত্রের সঙ্গে সে বিয়ে ভেঙেছিল অন্য কারণে!’

‘কী কারণে?’

‘বিয়ের কয়েকদিন আগে সমীরণ জানায় ওর নাকি একটা মানসিক রোগ আছে। একটু ভয়ঙ্কর গোছের!’

‘কীরকম মানসিক রোগ?’

‘এক থেকে দেড়-দু বছরের বাচ্চাদের উপর একটা সেক্সুয়াল অবসেশন আছে ওর। সেকথাই অকপটে মেয়েটির কাছে স্বীকার করেছিল সে। মেয়েটি ওকে কথা দেয় এ কথা কাউকে জানাবে না। তবে এ কথা জানার পর বিয়ে করতে আর রাজি হয়নি সে। ফলে নিজের প্রেমিক আছে বলে বিয়েটা ভেঙে দেয়।’

‘মানে এও হতে পারে—যে রাতে তিনি ও তার বউ খুন হন সেদিন রাতেও দাদার দেড় বছরের মেয়েকে মলেস্ট করছিলেন তিনি। এবং তাতে তার স্ত্রীরও আপত্তি ছিল না? আচ্ছা, যে চারজনের মৃতদেহ মাঠে পাওয়া গেছে তাদের পরিচয় কী?’

‘ওদের চারজনের নামেই ধর্ষণের মামলা ঝুলছিল। মাসখানেক আগে শ্যাওড়াপাড়ার মাঠে একটি মেয়ের রেপড বডি পাওয়া যায়। একদম ব্রুটাল রেপ। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল চারদিক। ওরা ওই মাঠে বসেই তাস খেলে। লোকে সন্দেহ করে কাজটা ওদেরই। কিন্তু পলিটিক্যাল পাওয়ার আছে, বুঝতেই তো পারছেন…’

তনুজা কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই সঞ্জয় বলে, ‘শুধু তাই না, এছাড়া আর যতগুলো খুন হয়েছে তাদের সবারই কোনও না কোনও ক্রাইমের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। স্যার সবই জানতেন কিন্তু কোনও অ্যাকশন নেননি!’

‘অর্থাৎ সরাসরি অপরাধ করেছে কিন্তু ছাড়া পেয়ে গেছে, এরকম লোকজনকে ধরে ধরে মারা হয়েছে! এবং আপনার স্যার জানতে পেরেছিল বলেই খবরটা পাঁচ কান হতে দেননি। যাতে ডাইনি র‌্যান্ডম কিছু খুন করছে বলে মানুষের কাছে বার্তা যায়…তাই তো?’

সঞ্জয় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। হঠাৎ কী যেন বলতে গিয়েও বলে, ‘কিন্তু গঙ্গার বাড়ি থেকে বাচ্চাদের জামাকাপড় পাওয়া গেছে, যে লোকগুলোর বাড়ি থেকে বাচ্চা তোলা হয়েছে তাদের অর্ধেকের নাম পাওয়া গেছে। গঙ্গা যে বাচ্চাগুলোকে চুরি করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।’

প্রত্যয়ের কপালে ভাঁজ পড়ে, ‘অর্ধেকের নাম পাওয়া গেছে মানে? একেবারে সমান সমান মিলেছে! আর মেলেনির সংখ্যা?’

‘হয়তো এরপর যাদের থেকে চুরি করবে তাদের নাম—।’

‘কিন্তু সংখ্যাটা অর্ধেক কেন? সেটা গন্ডগোল লাগছে না? একটু দেখাতে পারবেন আমাকে নামগুলো?’

সঞ্জয় একটু থতমত খায়। তারপর ভেতর থেকে একটা জেরক্স করা কাগজ বের করে এনে বলে, ‘এই যে, এই নামগুলো মেলেনি…’ কাগজটা ওদের হাতে তুলে দিয়ে ও চুপ করে গেছিল। কয়েক সেকেন্ড পর নিজে থেকেই মুখ খোলে, ‘আপনাদের একটা কথা বলছি, দেখুন যদি মিডিয়ায় যোগাযোগ করে কিছু করতে পারেন। গাঙ্গুলী স্যার কিন্তু কিছু ইনফরমেশন সাপ্রেশ করছেন!’

‘মানে?’

‘মানে যেমন ধরুন এই লিস্টে যে লোকগুলোর বাচ্চা চুরি হয়েছে তাদের সবার মধ্যে একটা কমন ব্যাপার আছে। সেটা একটু ঘেঁটে দেখলেই বোঝা যায়।’

‘কী কমন ব্যাপার?’

‘এরা কেউ বাবা হওয়ার যোগ্যই না। যেমন ধরুন হারু ঘোষ। চোরাই মদের সাপ্লায়ার। আগের পক্ষের বউকে খুন করেছে। নিয়মিত বেশ্যাপাড়ায় যায়। জগন্নাথ সাপুই বউ পেটানোর জন্য অনেকবার পুলিশের বাখান খেয়েছে, প্রভাকর হাসদার একাধিক মেয়েছেলের সঙ্গে সম্পর্ক! এরকম আর কী।’

‘মানে, বাচ্চাগুলো সঙ্গত কারণেই এদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাই তো?’ কথাটা বলে তনুজা। তারপর ও আর প্রত্যয় তাকিয়ে থাকে নামগুলোর দিকে। ওর মাথায় কিছু একটা খেলতে গিয়েও খেলে না। হঠাৎ করে প্রত্যয় প্রায় চিৎকার করে ওঠে, ‘এই, এই নামটা আমার চেনা! পরিচয় আছে আমার সঙ্গে—।’

তনুজা তাকিয়ে দেখে লিস্টের মধ্যে যে নামটা প্রত্যয়ের চোখে পড়েছে সেটা হল—বাণীকুমার বারিক। একটু অড নাম বলেই হয়ত মনে আছে ওর।

‘কে এই লোকটা? চিনলি কী করে?’

প্রত্যয়ের গলকণ্ঠটা ওঠানামা করে, ‘চেনা বলতে ওর মেয়ের বিয়েতে আমি ফটোগ্রাফারের কাজ করেছিলাম। সেই থেকে চেনা। পরে ওদের পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্কও হয়। বারুইপুরে থাকে। অনেকদিন ছেলেমেয়ে হচ্ছিল না ওর মেয়ের। তবে কিছুদিন আগে শুনলাম দাদু হয়েছে!’

‘হঠাৎ করেই?’ তনুজার শরীরটা কেঁপে ওঠে। অদ্ভুত একটা ভাবনা ওর মাথায় খেলে গেছে। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘তোর কাছে নাম্বার আছে?’

‘হ্যাঁ আছে।’

‘ফোন করে এক্ষুনি আমাকে দে।’

‘মানে এখন হঠাৎ করে…’

‘যা বলছি কর।’

প্রত্যয় কথা না বাড়িয়ে লোকটার নাম্বার বের করে ফোন করে। রিং হতে ওপাশ থেকে একটা ভারী গলার স্বর শোনা যায়।

‘হ্যালো হ্যাঁ— আমি প্রত্যয় বলছি, ওই যে ফটোগ্রাফার—’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো। কী ব্যাপার হঠাৎ?

‘আপনি বলেছিলেন কিছুদিন আগেই আপনি দাদু হয়েছেন? আপনার নাতি হয়েছে…’

‘না নাতনি। কেন বলো তো?’

ওর হাত থেকে ফোনটা প্রায় ছিনিয়ে নেয় তনুজা, ‘বাচ্চাটা কি সত্যিই আপনাদের?’

ভদ্রলোকের গলা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়, এই প্রশ্নটা তিনি শুনবেন আশা করেননি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রশ্ন করেন, ‘এসব কথা কে বলেছে তোমাদের?’

‘বাচ্চাটা কেউ দিয়ে গেছিল আপনাদের, তাই না? সঙ্গে সব কাগজপত্র। আপনার মেয়ের বাচ্চা হচ্ছিল না। তাই কেউ যোগাযোগ করেছিল আপনাদের সঙ্গে। তাই তো? ভয় নেই, আমাকে খুলে বলুন। আমি কাউকে কিছু বলব না।’

এবার মানুষটার গলার স্বর নরম হয়ে আসে, বলেন, ‘ওর অনেকদিন ধরেই বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছিল না। আমরা কয়েকবার অ্যাডপ্ট করার কথা ভেবেছিলাম। খোঁজখবরও করছিলাম। কিন্তু একদিন রাতে বাচ্চার কান্না শুনতে পেয়ে দেখি আমাদের দরজার গোড়ায় কে যেন একটা বাচ্চাকে শুইয়ে রেখে গেছে—।’

‘তারপর?’

‘ক’দিন অপেক্ষা করি, পুলিশেও জানাই। কিন্তু লাভ হয় না কিছু। কার বাচ্চা বলুন তো? মানে এমন হঠাৎ করে—’

ফোনটা কেটে দেয় তনুজা। চেয়ার ছেড়ে সটান উঠে পড়ে। তারপর সিঁড়ির সামনেটায় পায়চারি করতে করতে বলে, ‘গঙ্গা বাচ্চা চুরি করত ঠিকই। কিন্তু সেই সব বাড়ি থেকে যাদের বাচ্চা মানুষ করার মতো যোগ্যতা নেই। তারপর সেই বাচ্চা কিছু লোকজনের মাধ্যমে সেসব বাড়িতে দিয়ে আসত যারা যোগ্যতা থাকলেও নিঃসন্তান! বাচ্চাগুলো এই নরকে মানুষ হবার থেকে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে এই আশায়!’

‘হ্যাঁ…’ চিৎকার করে ওঠে সঞ্জয়, ‘পুরোহিতমশাই বলেছেন অন্তত দশ-বারো বছর ধরে একটা লোক আসে ওর বাড়িতে মাঝে মাঝে। মনে হয় তার আসার আগে পরে ও বাচ্চা চুরি করে আর তার হাত দিয়েই পাঠিয়ে দেয় শহরে…’

তনুজা বাকিটা কল্পনা করে নেয়, ‘নিজের সন্তানকে দূরে পাঠাতে গিয়ে এই অদ্ভুত শখটা জন্মায় ওর। হয়ত সন্তানকে জন্ম দিয়ে যে নরক সৃষ্টি করেছিলেন তার প্রায়শ্চিত্ত এভাবেই করতেন!’

কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনও কথা বলতে পারে না। নিঃস্পন্দ বাতাস যেন থমকে চেয়ে থাকে ওদের মুখের দিকে। সঞ্জয়ের ফোনটা বিপবিপ করে বেজে উঠতে ও সেটা একবার চেক করে নেয়। তারপর দু-পা পিছিয়ে যায়, থমথমে গলায় বলে, ‘গঙ্গাকে ধরতে পেরেছে ওরা! মনে হয় মেরে ফেলবে…’

‘তো আপনি এখানে সঙের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’ গর্জে ওঠে তনুজা।

ফোনটা তুলে ধরে মেসেজটা দেখায় সঞ্জয়, ‘ইন্সপেক্টর সাহেব অর্ডার দিলেন যতক্ষণ না পুরো জ্বলে যাচ্ছে ততক্ষণ কিছু না করতে। গঙ্গা মারা গেলে দু-চারজনকে ধরে জেলে ঢোকাতে হবে। তারপর আবার দিন পনেরো পরে ছাড়া পেয়ে যাবে।’

‘রাবিশ!’ দেওয়ালে একটা ঘুষি মারে প্রত্যয়, ‘আমরা এখনও সেই উইচ হান্টের যুগেই পড়ে আছি!’

ওরা দুজনে ছুটে যাচ্ছিল গাড়ির দিকে। সঞ্জয় ওদের পিছু ডাকে। তারপর পকেট থেকে একটা চাবি বের করে এগোতে এগোতে বলে, ‘পুলিশের গাড়িতে উঠুন, একসঙ্গে যাব—।’

আর অপেক্ষা করে না ওরা। বিকট শব্দ করে গ্রাম্য রাস্তার উপর দিয়ে ছুটতে থাকে গাড়িটা।

‘তোকে গঙ্গা ধরে নিয়ে গেছিল?’ দিলুবাবুর বসার ঘরেই বসানো হয়েছে মণিকে। তার উল্টোদিকে সোফায় বসে জিগ্যেস করলেন দিলীপ দস্তিদার। পাশেই বসে আছেন ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলী। ছেলেটাকে আবিষ্কার করার পর থেকেই ওকে নানানরকম প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন দুজনে।

ও তেমনই অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, ‘নাঃ গঙ্গা ধরে নিয়ে যাবে কেন? আমি তো ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম!’

‘কোথায় ঘুরছিলি?’

‘যেমন ঘুরি, ঘুরে ঘুরে কত কী দেখি! কত খারাপ জিনিস! তবে দাদু কাউকে কিছু বলতে মানা করেছে বলে বলি না।’

‘কী দেখেছিস তুই?’

‘ওই যে, যে লোকটা খুন হল…দুটো বাচ্চা ছিল ওর ঘরে…চিৎকার শুনেই আমি আর গুপিদা ছুটে গেছিলাম ওদের বাড়ির দিকে। তারপর…তারপর একটা নীল আলো…’

‘কীসের নীল আলো?’

‘আমি ওই নীল আলোটা দেখতে পেলেই কেমন যেন হয়ে যায় সব। মনে হয় আমার মাথা থেকে সব পড়ে ফেলছে কেউ। আমার মাথার ভিতর ঢুকে পড়ছে! সেই আলোটা ভীষণ শক্তিশালী। অন্যের মাথার দখল নিয়ে তাকে ইচ্ছামতো চালনা করতে পারে!’

দিলুবাবু হাত নেড়ে উড়িয়ে দেন ব্যাপারটা, ‘ওসব আলো ফালোর কথা ভেবে কাজ নেই, একটা ডাইনি মরেছে আর একটা ডাইনি এখন মরছে। আগে যা করেছে করেছে, এখন আর ওসব ভেবে কাজ নেই…’

গাঙ্গুলী ভুরু কুঁচকে মণির দিকে চেয়ে থাকেন, ‘কিন্তু ডাইনি কে ছিল সেটাই বুঝতে পারছি না, গঙ্গা না মৌলি?’

* * * *

উন্মাদ চিৎকারে ভরে গেছিল আকাশ। সেই চিৎকার এতক্ষণে ক্ষীণ হয়ে এসেছে। চোখের সামনে নিজের মাকে পুড়ে যেতে দেখছে সায়ন। একদল উলঙ্গ বর্বর পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে তাকে। সায়ন দুহাতে মৌলির জামা খামচে ধরেছে।

‘গঙ্গা আমার মা হয় কী করে? মা তো…’

‘আপনার মা আপনাকে নিজের কাছে রাখতে পারেনি। আপনি জন্মাবার পর আপনাকে রেখে এসেছিল এমন কোথাও যেখানে চাইলেই আপনার খোঁজ নিতে পারবে।’

‘কীভাবে?’

‘কিছু লোকজন ছিল গঙ্গার। তাদের মারফতই। আপনার মা-বাবা নিঃসন্তান ছিলেন। গঙ্গা খোঁজখবর নিয়েছিল ওনাদের সম্পর্কে। এক রাতের অন্ধকারে আপনার বাড়িতে আপনাকে রেখে আসা হয়েছিল, সকলের অজ্ঞাতে।’

সায়ন এখনও সব হিসেব মেলাতে পারে না। মুখে কী যেন বিড়বিড় করতে থাকে সে। মৌলি এগিয়ে এসে ওর পিঠে একটা হাত রাখে, ‘মা জানত আজ গ্রামের এই লোকগুলো ধরে ফেলবে ওকে, তারপর পুড়িয়ে মারবে। সে জন্যেই আপনাকে একবার চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিল। সারা জীবন তো কাছে পায়নি আপনাকে, ওই কয়েক মুহূর্ত…’

‘সেই জন্যেই ওই ফাঁসটা দিয়ে আমাকে…কিন্তু…’ নিজের মাথার চুল খামচে ধরে মাটিতেই বসে পড়ে সায়ন, ‘আমিই পালাতে দিইনি গঙ্গাকে! আমিই ওকে…’

‘গঙ্গা পালাত না সায়নবাবু। আজ ও ধরা পড়তেই চেয়েছিল।’

‘কিন্তু কেন?’ সায়নের গলায় বিস্ময় আর যন্ত্রণা একসঙ্গে ঝরে পড়ে।

‘ও ধরা না পড়লে, আগুনে না পুড়লে এ গ্রামের ডাইনিরও শেষ হত না যে…’

‘মতিপুরের ডাইনি!’ মাটি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে মৌলির কাঁধ খামচে ধরে সায়ন। চোখ তুলে দৃষ্টি রাখে মেয়েটার উজ্জ্বল হলদে চোখের দিকে। সে চোখকে একটুও ভয় পায় না সায়ন।

‘কে? কে করেছে খুনগুলো? এ গ্রামের ডাইনি কে?’

মৌলির ঠোঁটের কোণে একটা বিচিত্র হাসি খেলে যায়, ‘এ গ্রামের ডাইনি আপনি, সায়নবাবু…’