Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.২

২.২

অনেককাল আগের কথা, মি’লেডি। নৃপতি সিংহ তখন সাতগাঁর রাজা। এক জ্যৈষ্ঠের কৃষ্ণপক্ষের রাতে দিল্লি থেকে এসেছিল ষোলজন অশ্বারোহী, সুলতানের নিজস্ব বাহিনি। উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর দিয়ে রাজমহল পর্যন্ত ঘোড়া ছুটিয়ে এসে গঙ্গাবক্ষে ভেলায় চেপে এসেছিল ওরা। সেকালে এভাবেই সাতগাঁ বন্দর দিয়ে ঘোড়া রপ্তানি হতো মশলাদ্বীপে। কেউ সন্দেহ করেনি। অন্ধকার মধ্যরাতে ওরা অতর্কিতে হামলা চালাল রাজার প্রাসাদে। ইস্পাতের নাল-বাঁধানো চৌষট্টি অশ্বখুরধ্বনিতে জেগে উঠেছিল সাতগাঁবাসী। তারা কেউ এর আগে এমন ইস্পাতের নাল পরানো দীর্ঘকায় ঘোড়া দেখেনি, অর্ধচন্দ্রাকার জিনের ওপর এমন বর্মধারী যোদ্ধা দেখেনি। দলপতিটির কাঁধে ওইরকম বিশাল কুঠারও কখনো দেখেনি কেউ। হাড়-হিম-করা সেই দৃশ্য দেখে খালি-পা প্রাসাদরক্ষীর দল অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজার শয়নকক্ষে ঢুকে তার তিন উপপত্নী, ব্যক্তিগত হিজড়া ও আস্তাবলের বালক সহিসের বাহুডোর থেকে নৃপতিকে হিঁচড়ে টেনে দেউড়িতে নিয়ে এসে কুঠারের এক ঘায়ে শিরশ্ছেদ করল দলপতি স্বয়ং। যারা বাধা দিতে গেল তাদেরও হত্যা করা হলো বল্লমের খোঁচায়। তারপর চলল লুটপাঠ অগ্নিসংযোগ। দাউ দাউ আগুনের আভায় ষোলজন ঘোড়সওয়ার ও তাদের অগনন ছায়ারা প্রাসাদ চত্বরে দাপিয়ে বেড়ালো রাতভর

ভোরের আগে লুটের বোঝা নিয়ে ওরা চলে এল উত্তরের বনে, যেখানে গঙ্গা মুক্তবেণী হয়েছে তিনটি ধারায়। বড়ো বড়ো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় নক্ষত্রে ভরা জ্যৈষ্ঠের আকাশ, চারদিকে জঙ্গলে ছাওয়া ছড়ানো ধ্বংসস্তূপ অন্ধকারে ঢাকা।

‘ভোর হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানেই অপেক্ষা করব,’ দলপতি দরপ খান অনুগামীদের বলল। বনের মাঝে কিছুটা ঘাসজমি দেখে ঘোড়া থেকে নামল। নৃপতির রক্তে মাখা কুঠারটা গিঁথে দিল মাটিতে। গায়ের বর্ম খুলে, জুতো ও শিরস্ত্রাণ খুলে বিধর্মীর রক্ত আর ঘামে ভেজা দেহ এলিয়ে দিলে ঘাসে। চামড়ায় ঠান্ডা বাতাস আর নরম ঘাসের স্পর্শ। দূরে আকাশে তখনও ইতস্তত আগুনের আভা, সমবেত বিলাপের ধ্বনি ভেসে আসছে মৌচাকের গুঞ্জনের মতো। একজন যোদ্ধার কাছে এর চেয়ে অপূর্ব দৃশ্য, এর চেয়ে সুমিষ্ট সঙ্গীত আর কীই-বা আছে?

.

বারো দিন আগে দিল্লিতে খর জ্যৈষ্ঠের দুপুরে দরপ খান শীতল বাওলির ধারে বসেছিল তার প্রিয় কবিবন্ধুর সঙ্গে। এমন সময় সুলতানের দূত এসে হাজির। জঁহাপনা এত্তেলা পাঠিয়েছেন, দরপ খান যেন পত্রপাঠ দেখা করে। দূত প্রথমে তার খোঁজে সেনাছাউনিতে গিয়েছিল, সেখান না পেয়ে হাউজ-খাসের মতো অপ্রত্যাশিত স্থানে দরপকে পেল।

সে কথা হুজুর-এ-আলমের কানে পৌঁছেছিল, দরবারে পৌঁছে দরপ খান সেলাম ঠুকতেই তিনি সভাসদদের দিকে ফিরে ঠোঁট টিপে হাসলেন। ‘এক লস্কর-ই-তুরকান দুপুরবেলায় বাওলির জলে পা ডুবিয়ে বসে শায়েরের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। দেখুন আপনারা, হিন্দুস্থানের আবহাওয়া বাখের পুরুষের মধ্যেও কী রকম পরিবর্তন ঘটাতে পারে। কিন্তু আমার সব সৈন্যরা যদি তরোয়াল ফেলে দিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করে দেয়, তাহলে কী হবে ভাবুন তো?’

সুলতানের ছদ্ম আতঙ্কের মুখভঙ্গী দেখে নাপা হাসি ফোটে আমীর ওমরাহদের মুখে। তারা বুঝে উঠতে পারে না তিনি মজা পেয়েছেন নাকি কুপিত হয়েছেন। মুকুটের আড়ালে মাথাটার ভেতরে কী যে ঘটে চলে সেটা সূর্যা-চর্চিত চোখ আর মিশকালো চাপা দাড়িতে ঢাকা মুখ দেখে বোঝা যায় না।

সুলতান এবার দরপের দিকে সরাসরি তাকালেন। কন্ঠস্বরে রসিকতা মরে গিয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে –

‘দরপ খান, তোমার ধাতু আর্দ্র শায়েরিতে মরচে ধরে যাবার আগে আমি পরখ করে দেখতে চাই রেগিস্তানে তোমার যেসব বীরত্বের গাথা শুনেছি সেসব সত্যি না কি বানানো।’

প্রশস্ত কক্ষের মাঝখানে মাথা নীচু করে দাঁড়ানো এক ব্যক্তির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। ‘এই হতভাগ্যটিকে দেখ!

লোকটির দিকে তাকিয়ে প্রথমেই যেদিকে দরপের চোখ আটকে যায় তা হলো তার দুটি পায়ের পাতা শতচ্ছিন্ন ন্যাকড়া আর চামড়ার পটি জড়ানো, তাতে রক্তের ছোপ। এমন বিশীর্ণ ঝোড়ো ধ্বস্ত চেহারার কাউকে দিল্লিতে কোথাও কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ে না। বেঁটেখাটো, গায়ের রং তামাটে, মুখের গড়নে পুবের দেশের ছাপ। চরম অবসাদের মধ্যেও দুই চোখে আর পাতলা দাড়িতে ঢাকা চোয়ালে ফুটে আছে অদ্ভুত ধারালো প্রত্যয়, যা ভিড়ের মধ্যে তাকে আলাদা করে দেয়।

লোকটির তবকত কিছু কম চমকপ্রদ নয়।

খোদা বক্স পেশায় কৃষিজীবী, সুদূর বাংলার সাতগাঁ থেকে এসেছেন। পবিত্র আসুরার দিন তাঁর সাত বছরের একমাত্র পুত্রের সুন্নৎ অনুষ্ঠান পালন করছিলেন। পর পর তিনটি কন্যা সন্তানের পর দ্বিতীয়া স্ত্রীর গর্ভে প্রথম পুত্র সন্তান, যথাসাধ্য ধুমধাম করেই পালন করছিলেন খোদা বক্স। অনুষ্ঠানের পরদিন একটি গরু জবাই করেন। কিন্তু এমনই কপাল, একটি চিল তারই মাংসখন্ড ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে উড়ে গিয়ে বসে রাজপ্রাসাদের ছাতে। সাতগাঁর রাজা নৃপতি সিংহ গোঁড়া হিন্দু, তদুপরি ক্রোধান্ধ হিসেবে বদনাম আছে। প্রাসাদ অপবিত্র হয়েছে এই খবর কানে যেতেই অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। তৎক্ষণাৎ সেপাই পাঠিয়ে খোদা বক্সকে ধরে আনে, এবং চরমতম শাস্তি দিতে তার সাত বছরের একমাত্র পুত্রের শিরশ্ছেদের হুকুম দেয়।

জ্বলন্ত হৃদয় বুকে চেপে খোদা বক্স লখনৌতি যান বিচারের আশায়। বাংলার শাসক দেখা করেননি। কেনই বা করবেন? হোক না স্বধর্মের লোক, খোদা বক্স এক সামান্য চাষা বই তো নয়। নৃপতি সিংহ বন্দর নগরীর অধীশ্বর, তার খাজনা উপঢৌকনে লখনৌতির কোষাগার ভরে ওঠে। বত্রিশ দিন সেখানে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকে ব্যর্থ হয়ে শেষপর্যন্ত দিল্লির পথ ধরেন খোদা বক্স। সুদীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে এসে পৌঁছেছেন হুজুর-এ-আলমের আম দরবারে। এই কঠিন যাত্রায় তাঁকে তাড়িয়ে এনেছে বুকের মধ্যে দাউ দাউ আগুন আর মাথার ভেতরে অবিরাম শিরাছেঁড়া কন্ঠস্বর— ‘আব্বাজান, বাঁচাও! আব্বাজান, বাঁচাও!’

খোদা বক্সের গলায় আরেকবার পুরো ঘটনার বিবরণ শুনে দরবার নিশ্চুপ, চামরের হুশ হাশ শব্দ শোনা যায়। নৈঃশব্দ্য ভেঙে সুলতান বলেন

‘দরপ খান, তুমি এখনই সাতগাঁয়ে যাবার জন্য তৈরি হও। ওই বিধর্মীটাকে এমন শিক্ষা দাও যাতে এরপর ওদেশে আর কেউ একজনও সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অনুগামীর কেশাগ্র স্পর্শ করতে না পারে!

দরপকে নিজের পছন্দ মতো অস্ত্রশস্ত্র, অশ্ব ও তার আরোহী বেছে নেবার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন সুলতান। নির্দেশ ছিল যতদূর সম্ভব গোপনে কাজ হাসিল করে দিল্লিতে ফিরে আসতে হবে। সর্বমোট ষোলজন অশ্বারোহী যোদ্ধা। সুলতান চাননি বড়োসড়ো সৈন্যদল পাঠিয়ে বাংলার স্বাধীন শাসকের সঙ্গে দিল্লির ফঙ্গবেনে সমঝোতা বিঘ্নিত করতে। কিংবা হয়তো এটি সুচিন্তিত ছক, হয়তো পুত্রহারা পিতার অশ্রুর থেকেও বেশি তাঁকে যা প্ররোচিত করেছিল, তা হলো লখনৌতির নবাবকে দিল্লির সার্বভৌম ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ। রাজনীতি বড়ো জটিল কুহক, মি’লেডি!

তা সে গূঢ় উদ্দেশ্য যাই থাক, খোদা বক্স দিল্লিতে আসার পাঁচ দিনের মাথায়, সূর্য উত্তরায়ণে প্রবেশের ঠিক তিন দিন আগে দরপ খান ও তার অনুগামী পনেরো জন যোদ্ধা উত্তর ভারতের রুক্ষ আতপ্ত ভূমির ওপর দিয়ে ঘোড়া ছোটালো রাতের অন্ধকারে, সূর্যের প্রকোপ থেকে বাঁচতে। ছয়টি রাত্রির পর, পথে উনিশবার ঘোড়া বদলে তারা নদীনালায় কাটাকুটি সবুজ বাংলার সমতলে এসে পড়ল। রাজমহলের পাহাড় পার হয়ে অশ্বব্যবসায়ীর ছদ্মবেশ নিল, নদীতে বাঁশের ভেলায় ঘোড়া ওঠালো।

গোটা অভিযানের পরিকল্পনা ও তার প্রয়োগ ছিল নিখুঁত ছন্দোময়, ঠিক যেন একটি ফারসি দ্বিপদীর মতো। কৃষ্ণপক্ষের নিকষ মধ্যরাতে সাতগাঁর বাসিন্দারা ঘুমের আবুলি কাটিয়ে জেগে ওঠার আগেই তা সমাধা হলো। প্রমাণিত হলো, দরপ খানের ধাতুতে মরচে ধরে যায়নি। যেন তার স্বীকৃতি-স্বরূপ ভোরের আগে পর্যন্ত দূর দিগন্তে ফুটে রইল আগুনের রেশ আর শ্রান্ত বিলাপের ধ্বনি।

.

পুবে অন্ধকার ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। নীলচে আলোয় বনতলে লতাপাতায় ছাওয়া স্থাপত্যের ভগ্নস্তূপ দেখা যায়। বাসাল্ট পাথরের স্তম্ভ খিলানে পাখি হরিণ ডানাওয়ালা ঘোড়া ও অন্যান্য অদ্ভুত জন্তুর আকার, চক্র আর ঘন্টার মোটিফ। কোনো হিন্দু মন্দির নাকি বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ, নাকি এক সৌধের ভেঙে-পড়া টুকরো দিয়ে তৈরি হয়েছিল অপর এক সৌধ, এবং তারপর প্রাকৃতিক ক্ষয়ে ভূপতিত হয়েছে, সেটা বোঝার মতো জ্ঞান দরপ খানের নেই। সে কেবল অনুমান করে এ অতি প্রাচীন ভূমি।

আকাশে শেষ তারাগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। দূরে শিয়ালেরা শেষ প্রহরের ডাক দিল। দরপ বলল—

‘ফজরের সময় হয়ে এসেছে। আমরা এই নদীর পাড়ে প্রার্থনা সেরে ফেরার জন্য তৈরি হব।’

একটু তফাতে ঘোড়াগুলোকে গাছে বেঁধে ঘাসের ওপর এলিয়েছিল ওর সঙ্গীরা। কেউ লুটের মাল বাঁটোয়ারা শুরু করেছিল। দলপতির নির্দেশে উঠে পড়ে নদীর জলে হাতমুখ ধুতে গেল।

ভাঙা পাথরের ঘাট নেমে গিয়েছে জলে, দরপ পা থেকে জুতো খুলে একেবারে নীচের ধাপে গিয়ে বসে। পায়ের ঠিক নীচেই গঙ্গা, যেন ঘুমের ভেতর থেকে একটু একটু করে জাগছে, পলিগন্ধী শ্বাস উঠছে। দিল্লিতেও সুলতানের নগরীর পাশ দিয়ে বইছে নদী। খরতপ্ত গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় যমুনার জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা দরপের প্রিয় শখ। কিন্তু এ নদী ভিন্ন, মনে হয় বুঝি আরও জীবন্ত। বাঁকা জল পাথরের ধাপে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে কথা বলে অজানা ভাষায়।

কী কথা বলে? ভাবতে ভাবতে একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল। তখনই সেই আশ্চর্য ব্যাপারটা ঘটতে শুরু হলো। সতর্ক দরপ লক্ষ করল নদীর দেহত্বক যেন হাঁসফাঁস করে ফুলে উঠছে অব্যক্ত আবেগে, ঘাটের সিঁড়িতে আঘাতের ধ্বনি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ঘুমের ভেতরে অস্ফুট বিড়বিড় করার মতো করে কিছু বলছে। এদিকে মাথার পেছনে গাছগাছালির মাথায় পাখিরাও জাগছে, পুবে পলকা আলোয় রঙ ধরছে ক্রমশ। বহির্বিশ্বে কিছু একটা ঘটছে, দরপ টের পায়। কিছু একটা ঘটছে তার নিজের ভেতরেও। কী যেন নড়ে উঠছে, ফুলে উঠছে, জাগছে। এবারে সত্যিই নদীর জল ফুলে উঠছে, জীবন্ত কবোষ্ণ জল স্পর্শ করছে পায়ের পাতা, আঙুলের ফাঁক দিয়ে বইছে।

উত্তর আফগানিস্তানের বাখ্ প্রদেশে দরপ খানের জন্ম। ছোটোবেলা থেকেই আমু দরিয়া মরুভূমির ওপর দিয়ে বইতে দেখেছে। সমুদ্র জিনিসটা কী সে জানে না। দিনে চারবার সমুদ্র যে জোয়ারে ফুলে ওঠে এবং নদীনালায় বহুদূর পর্যন্ত জল ঢুকে স্রোত ঘুরে যায়, এই প্রাকৃতিক সত্যের কথা সে শোনেনি কখনো। সেদিন অমাবস্যার কোটাল, জোয়ারে তেজ ছিল। মনে হলো এ যেন এক অলৌকিক কাণ্ড—যেন মাথার ওপর আকাশটা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ছে, কিংবা চাঁদ সূর্য বিপরীত দিকে থেকে উঠে মিলিত হচ্ছে মাঝ আকাশে। পা ধুয়ে দিচ্ছে জল, ফজরের প্রহর, পাখি ডাকছে, দ্যাবা পৃথিবী ভরে উঠছে অনাবিল আলোয়। এক অনির্বচনীয় অনুভূতির বিস্ফোরণ ঘটল দরপ খানের ভেতরে, যার অস্তিত্ব সে তার ঊনত্রিশ বছরের জীবনে কখনো টের পায়নি, যে অনুভূতির কথা বলেছিল খসরু, বলেছিল তার মালিক পীর নিজামুদ্দিন, হাউজ-খাসের সুশীতল বাওলির ধারে, গোলাপি পাথরের গায়ে সূর্যের হলকা যখন শত সহস্র টিয়াপাখির মতো চিৎকার করে।

অবশেষে দরপ খান যখন সেই বিস্ফারিত, হাঁটু-অব্দি-ফুলে-ওঠা নদীর মোহ কাটিয়ে হাত মুখ ধুয়ে পাড়ে উঠে এল, ঘাসের ওপর পাতা সাফা চাদরে হাঁটু মুড়ে বসল কিবলার দিকে মুখ করে, তখনও জানে না যে সে আর কোনোদিন দিল্লি ফিরবে না, জানে না যে সে এই দুই নদীর মধ্যবর্তী মৎস্যাকৃতি দোয়াবে জীবনটা কাটিয়ে দেবে, জানে না সে সংস্কৃত শিখবে এবং গঙ্গাকে উদ্দেশ্য করে একটি শ্লোক রচনা করবে, এবং সে জীবনে আর একটিও যুদ্ধ করবে না। তার ওই রক্তমাখা কুঠারের চারপাশে মাটি পাথর হয়ে উঠবে, গাজি নামে পরিচিত হবে সে, এবং এই বনভূমির নাম হবে গাজির বাগান। এখানে সে একটি মসজিদ ও খকা নির্মাণ করবে। মৃত্যুর পর এখানেই গোর দেওয়া হবে তাকে এবং তার পরিবারের অন্যদেরও। বাল্‌ল্খ থেকে শুরু হয়েছিল যে সুদীর্ঘ যাত্রা, সেটি শেষ হবে এই মাটিতে, যেখানে এখন হাঁটু মুড়ে বসে প্রার্থনা করছে সে।

.

সুরধুনি মুনিকন্যে তারয়েঃ পুণ্যবন্তং
স তরতি নিজ পুণ্যেইস্-তত্র কিং তে মহত্ত্বম
যদি তু গতিবিহীনং তারয়েঃ পাপিনং মাং
তদি হ তব মহত্ত্বং তন্মহত্ত্বং মহত্ত্বম্,

হে সুরধুনী গঙ্গা, জহ্নুমুনির কন্যা, যদি তুমি শুধুমাত্র নিজ পুণ্যে পুণ্যবানদেরই উদ্ধার কর তবে আর কীই বা তোমার মহত্ত্ব। যদি তুমি আমার মতো পাপীর গতি কর, তবেই তোমার মহত্ত্ব আমি আবিশ্ব প্রচার করব।

দরপ গাজীর গঙ্গাস্তোত্র উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করেন রামরাম শাস্ত্রী, যাঁকে সকলে সসম্ভ্রমে মশাই বলে ডাকে। এইরকম শ্মশানের জমায়েতে অনেকেই জীবনে প্রথমবার এই স্তোত্র শুনেছে ওঁর মুখে। রথীন-শিউলির বিবাহে কন্যা সম্প্রদান করেছিলেন মশাই, তারপর থেকে বাপ্পার খোকাজেঠু ওঁকে বাজ পণ্ডিত বলত। মশাইয়ের ঘন পাকা ভুরুর নীচে তীক্ষ্ণ চোখ, লম্বাটে মুখে গভীর বলিরেখায় খড়্গোর মতো নাকের ছায়া পড়ে অনেকটা বাজপাখির আদল ফোটে। মাথার ভেতরে ভারি ভারি শাস্ত্র আর বিধানের ভারে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকেন সব সময়। যখন কথা বলেন, ওঁর মুন্ডিত মাথার পেছন দিকে গিঁট-বাঁধা পুরু শিখাটি ছটফট করে কাঠবেড়ালির মতো। টোলের বাড়ি থেকে ভেতরবাড়ির দিকে মশাই হেঁটে এলে দূর থেকে ইট-পাতা উঠোনের ওপর ওঁর ভারি খড়মের খটাস খটাস ধ্বনি শোনা যায়। সকলে সতর্ক হয়ে পড়ে, এমনকি পোষা কাকাতুয়া অ্যান্টনিও ঠোঁটে কুলুপ আঁটে।

সরস্বতীর ধারে শীতের অপরাহ্ণ পড়ে আসে। ঘাটের শেষ সিঁড়িতে তাঁর সহোদরার অন্তর্জলীযাত্রা হচ্ছে, মশাই বসেছেন ঘাটের মাথায় বাঁধানো ছাউনির ভেতর। ওঁকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছে জ্ঞাতিপ্রবীণেরা, সাতগেঁয়ে নৈয়ায়িক ও গ্রহবিপ্রর দল। অস্থিরমতি জরায়ুটিকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দেবার পর শাকম্ভরীর শ্বাসপ্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে, কপালে ফুটে উঠেছে ঘামের বিন্দু। রামপ্রাণ এখনও জলের ধারে উবু হয়ে বসে চোখ বন্ধ করে গভীর মনোযোগে এলানো কাছির মতো কব্জি ধরে নশ্বর দেহযন্ত্রটার ভেতরে কোন গভীর গোপন কুঠুরিতে আত্মাটি ধুকপুক করে চলেছে তার আন্দাজ পাবার চেষ্টা করছেন।

দীর্ঘক্ষণ পরে চোখ খুললেন রামপ্রাণ, ঘাড় ঘুরিয়ে ঘাটের ওপর ছাউনির দিকে উদ্দেশ করে ঘোষণা করলেন— ‘যা বুঝছি নাড়িতে এখনও জোয়ার রয়েছে। আমাদের আজ রাত্তিরটা এখানেই কাটাতে হবে।’

দিনের আলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্য মেঘের আড়ালে। উত্তর দিক থেকে কনকনে হাওয়া শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঠিক কী করা উচিৎ, শাকম্ভরী দেবীকে ওইভাবে জলে ডুবিয়ে রাখাটা ঠিক হবে, নাকি তুলে এনে ছাউনির নীচে রাখাটাই বিধেয়, এই নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে যায়।

প্রবীণদের মধ্যে একটি দল অন্তর্জলীর আচারে ছেদ ঘটানোর বিপক্ষে।

‘কানের কাছে আদিরামের নামজপ চালু রাখ হে, প্রাণবায়ু নিষ্ক্রমণের পথ সুগম হবে। ওটাই এখন দরকার।’

‘দরকার তো কয়েক ফোঁটা অ্যাকোনাইটাম!’ রামপ্রাণ স্বগতোক্তির স্বরে বললেন। ‘কিন্তু পিসিমার সম্মতি ছাড়া আমি সেটা দিতে পারি না।’

পেশাদার গ্রহবিপ্র শিবু চক্কোত্তি শ্মশানে ছাইয়ের ওপর পাটকাঠি দিয়ে আঁক কেটে ঘোষণা করে— ‘মৃগশিরা নক্ষত্র কৃষ্ণা দ্বিতীয়ায় প্রবেশ করার আগে কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’

রামপ্রাণের ছোটো ছেলে হেমন্ত, বাপ্পার হেমন্তমামা, একা দাঁড়িয়েছিল ছাউনির বাইরে। নিজের বাঁ হাতের তালুতে ডান হাতে অস্থির ঘুষি মেরে বলে উঠল— ‘এ হলো ঠান্ডা মাথায় খুন! সাতানব্বুই বছরের বুড়িকে জলে ডুবিয়ে রাখা হচ্ছে যাতে সে ঠান্ডায় জমে মরে যেতে পারে!’

হেমন্তর কথাগুলো মশাইয়ের বৃত্তে পৌঁছয়, কিন্তু সকলেই না-শোনার ভান করে। বাপের মতোই ছেলেটা এক গরুখোর জার্মান সাহেবের মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে কমিউনিস্ট হয়েছিল। তার পর থেকেই আদিরামবাটির এই কালাপাহাড়টিকে সকলে এড়িয়ে চলে।

৭২/ সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা

তবু মনে হল মশাই যেন বিচলিত হলেন, মাথার শিখাটি কেঁপে উঠল। শাস্ত গলায় বললেন— ‘পরাণ যদি বলে এখনও সময় আসেনি, তাহলে আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। ধৈর্য হারালে তো চলবে না। প্রাণবায়ু বড়ো লীলাময়, অন্তিমকাল পর্যন্ত মৃত্যুর সঙ্গে তার খেলা চলতেই থাকে।’

প্রবীণেরা কেউ কেউ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। প্রাণবায়ু মৃত্যুর সঙ্গে লীলাখেলা করে, নাকি মৃত্যু প্রাণবায়ুর সঙ্গে, এই নিয়ে দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা শুরু হয়ে গেল। কবে কার ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, কার শ্বাস উঠেছে দেখে কবিরাজ নিদান দিতে তড়িঘড়ি অন্তর্জলীযাত্রায় নিয়ে আসার পর চেতনা ফিরেছে, তারপর দিন, সপ্তাহ, এমনকি মাসাধিক কাল ধরে এই ছাউনির নীচে চলেছে প্রতীক্ষা, জ্ঞাতিদের মধ্যে পালা করে করে পাহারাদারি, গীতাপাঠ, সেই আলোচনা চলে। একবার কেউ অন্তর্জলীযাত্রায় গেলে তামার পাত্রে ভষ্ম রূপে ছাড়া আর কোনোভাবেই তাকে ফেরানো চলে না, শাস্ত্রের বিধান।

.

অন্য এক শীতের সকালে নদীর বুক থেকে কুয়াশা উঠে ঢেকে দিয়েছে সাতগাঁর মৎস্যভূমি। উত্তরে বনাঞ্চলে নদীর পাড়ে একটি সুদৃশ্য মিরাদর অস্পষ্ট দেখা যায়। তার বাঁশির আকারের থামগুলো ঝাপসা, খিলান-করা ছাতটি মনে হয় যেন কুয়াশায় ভেসে রয়েছে। তার নীচে রোজ এই সময় যে পুরুষমূর্তিটি দেখা যায়, যাঁর পরনে সাদা মসলিন, মাথায় টুপি, হাঁটু মুড়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে থাকেন, তিনিই দরপ খান। ফজরের প্রহর শেষ হয়েছে। সূর্য উঠেছে কিন্তু কুয়াশা গলানোর মতো তার তেজ ফোটেনি। ভাটির দিকে বন্দরে জাহাজের মাস্তুলগুলো দেখা যায় না। এরই মধ্যে নৌকার দাঁড়ের ছপাৎ ছপাৎ শব্দে সচকিত হলেন দরপ খান। একটি ডিঙি নৌকা, তার ওপরে দুজন মানুষ। এদিকেই আসছে।

নদীর ভাঙা ঘাট মেরামত করা হয়েছে। জঙ্গলের কিছুটা অংশ পরিষ্কার করে ভগ্ন বিহার কিংবা মন্দিরের পাথর দিয়ে গড়ে উঠছে উপাসনাগৃহ। এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। দিনের প্রথম প্রার্থনা এই নদীপাড়ে এসেই করেন দরপ খান। কৃষ্ণপক্ষের সেই ভোরের পর একদিনও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

নৌকার যাত্রী এক ব্রাহ্মণ। তাঁর মুণ্ডিত মস্তক, পরনে সোনালি পট্টবস্ত্র, আবরণহীন বুকে বাহুতে কপালে চন্দনের ডোরা। ঘাসের আসনে বসে আছেন। যাত্রী ও মাঝি কারোর হাতেই অস্ত্র নেই, নৌকার গলুই চপেটাঘাতের শব্দে ঘাটে লাগার আগে খুঁটিয়ে দেখে নিলেন দরপ। যাত্রীটি উঠে দাঁড়াল, তার মাথার পেছনে শিখায় সাদা ধুতুরার ফুল বাঁধা। দরপ অপেক্ষা করেন ব্রাহ্মণের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। কিন্তু তিনি ঘাটের সিঁড়িতে নামেন না, সম্ভাষণও জানান না। শুধু চেয়ে থাকেন, চোখে চোখ নিবদ্ধ।

একটু বিস্মিতই হলেন দরপ খান। বিগত কয়েক বছরে তিনি দেখেছেন, এই নদীর দেশের মানুষ শাসকের চোখে কদাপি সরাসরি তাকায় না। কিন্তু আগন্তুকের দৃষ্টিতে স্পর্ধা কিংবা ভক্তির লেশমাত্র নেই। যা রয়েছে তা হলো এক শাস্ত প্রত্যয়, এক আত্মশক্তি যা ঠিক দরপের চেনা নয়, যা অসি কিংবা অশ্বচালনা থেকে আসে না। সকালের নির্মোহ আলোয় স্পষ্ট তাঁর চোখের দীপ্তি, চোয়াল ও ঠোঁটের রেখায় সংকল্প।

সেই ঠোঁটে কথা ফোটার জন্য অপেক্ষা করেন দরপ। ইদানীং তিনি দোভাষী ছাড়াই এই অঞ্চলের মানুষের ভাষায় কথোপকথন চালাতে পারেন। সাতগাঁর ব্যস্ত বন্দরে অহরহ এসে মিশছে বিবিধ ভাষার নদী মগধী, অর্ধ-মাগধী, সৌরসেনী, মহারাষ্ট্রী, পৈশাচী, ঢক্কি, ঢেক্করি থেকে শুরু করে বিবিধ বিচিত্র বুলির ছলাৎছল ঢেউ। শীত শেষ হলে বাণিজ্যবায়ুর সঙ্গে ভেসে আসে আরব, চীনা এমন কি সোয়াহিলিও। কিন্তু এর কোনোটিই ব্যবহার করলেন না ব্রাহ্মণ। তিনি কথা বলেন এমন এক ভাষায় যা দরপ বাংলায় আসার আগে থেকেই জানেন: খাড়ি বোলি।

‘এই পবিত্রভূমির অধিপতি হিসেবে আপনি আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন। আমার নাম রামাচার্য, আমি সাতগাঁর আদি কনৌজি ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত। স্বজাতির প্রতিনিধি হয়ে আপনার কাছে আবেদন নিয়ে এসেছি।’

মিরাদর থেকে দশ হাত নীচে জলের ওপর নৌকা, আগন্তুকের কথা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তবু অজ্ঞাতসারেই দাঁড়িয়ে উঠেছেন দরপ খান। সেটা খেয়াল হতে চকিত অস্বস্তি তাঁকে বিঁধল, রুক্ষ গলায় বলে উঠলেন নয়!’

‘কিন্তু এখন তো প্রজার আবেদন শোনার সময় নয়, এটা তার উপযুক্ত স্থানও বলতে বলতে অনুভব করেন, ফজরের প্রার্থনার স্নিগ্ধ রেশ তাঁর ক্ষণিকের উষ্মা গলিয়ে দিচ্ছে। বলেন—‘যাইহোক, এই সকালবেলায় কী এমন ঘটল যে এক পুরোহিত মন্দিরে ঘন্টা নাড়া ছেড়ে বেরিয়ে এল?’

‘আমরা পুরোহিত বংশ বটে, তবে মন্দিরে বিগ্রহপূজাই আমাদের একমাত্র বৃত্তি নয়,’ রামাচার্য বলেন। ‘আমরা শাস্ত্রপাঠ করি, শিক্ষাশ্রমে অধ্যাপনা করি। এর বাইরে কোনোরূপ জাগতিক বৃত্তি আমাদের বর্ণে নিষিদ্ধ। বারোটি নিষ্কর গ্রাম ও সংলগ্ন কৃষিজমি থেকে আমাদের অন্নসংস্থান হয়। শত শত বছর ধরে এই মৎস্যভূমির শাসকেরা এই ব্যবস্থাকে মান্যতা দিয়েছে। আপনি ব্যতিক্রম, আপনি সেই জমিতে কর চাপিয়েছেন। আমাদের সম্মিলিত আবেদন, আপনি সেই জমি আগের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিন।’

দেহভির নিকটাত্মীয় খাড়ি বোলি। হিন্দুস্থানে এসে দরপ খান দিল্লির পথে সরাইখানায় বাজারে ঘুরে ঘুরে এই ভাষা শিখেছেন। এতদিন পরে পুবের দেশের এক ব্রাহ্মণের কন্ঠে ভাষাটি শুনে বেশ একটু অবাক হন। আরও শুনতে মন চায়।

‘আপনার আর্জি আমি বিবেচনা করব। তবে সে জন্য আপনাকে নৌকা থেকে নেমে পাড়ে উঠে সঠিক আদব মেনে পেশ করতে হবে, যেভাবে প্রজারা শাসকের সামনে এসে করে।’

এই কথা শুনে সন্ত্রস্ত মাঝিটি লাফ দিয়ে হাঁটু জলে নেমে নৌকার গলুইটি ঘাটের ধাপে চেপে ধরে। রামাচার্য ইতস্তত করেন। এই মানুষটির হাতে নররক্ত লেগেছে, তবে আগের শাসকটিও ছিল দুরাচারী লম্পট।

‘আমি সেটা করতে প্রস্তুত, যদি আপনি কথা দেন আমাদের বংশানুক্রমিক অধিকার ফিরিয়ে দেবেন।’

একখন্ড পট্টবস্ত্র-পরা, সম্পূর্ণ নিরস্ত্র মানুষটির তেজ দেখে আমোদ পান দরপ খান।

‘আমি দাঁড়িয়ে আছি ভূমিতে, আপনি জলে। কি করে কথা দেব? আর কি করেই বা বুঝব আপনি সত্য বলছেন? কোনো দলিল কিংবা শাহ্য়াদ সঙ্গে আছে?’

‘কী?’ রামাচার্য উৎকর্ণ হন।

‘পাতায় হোক বা তামায়, কিছু লেখা আছে কি যা ওই জমিতে আপনাদের অধিকার প্রমাণ করে?’

‘প্ৰমাণ?’

মি’লেডি, রামাচার্য হলেন সেই প্রথম পুরুষ যাঁর কাছে লিখিত প্রমাণ চাওয়া হলো, চাইল এক বহিরাগত শাসক!

.

পরদিন একই সময়ে একই স্থানে নৌকা এসে ভিড়ল। রামাচার্যের হাতে একটি মসলিনে জড়ানো পুথি। কাপড়ের ভাঁজ খুলতে বেরিয়ে এল পাতলা কাঠের পাত, তাতে উৎকীর্ণ লিপিতে লেখা সরস্বতী ও ভাগীরথীর মধ্যভাগে বারোটি গ্রাম ও সংলগ্ন ব্রহ্মোত্তর জমি সাতগাঁর আচার্য ব্রাহ্মণদের নিষ্কর অর্পণের প্রত্যয়।

‘রাজাধিরাজ লক্ষ্মণ সেনের সভায় আমার প্রপিতামহ ও তাঁর তিন ভাই দাক্ষিণাত্যের পণ্ডিতদের শাস্ত্রীয় বিতর্ক সভায় পরাস্ত করেন। তারই পুরস্কারস্বরূপ এই দান।’ রামাচার্য ব্যাখ্যা করেন।

পুথির লিপি দরপ খান পড়তে পারেন না, তবে বস্তুটি তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে। পাতগুলি খুবই প্রাচীন, এত পাতলা ও মসৃণ যে উলটোদিকে আলো দেখা যায়। তার ওপরে সূচে লিপি খোদাই করে দীপের কালি ও ভেষজ রঙ ভরে রজন লেপে বন্দি করা হয়েছে। কাঠের ওপর এত সুক্ষ্ম শৈলী তিনি আগে দেখেননি।

‘এমন আরও শাহ্ওয়াদ সংগ্রহে আছে?’

‘অবশ্যই!’ রামাচার্য বলেন। ‘কাঠে, বাকলে, তালপাতায় লেখা পুথি অসংখ্য আছে। তবে আমাদের অধীত বিদ্যার ধারক মাধ্যমটি ভিন্ন।’

‘সেটি কী?’

রামাচার্য নিজের ডান কানে তর্জনি ছোয়ালেন। — ‘স্মৃতি। শ্রুতি। এভাবেই বংশ পরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে চলেছে জ্ঞান, মানুষের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতা ব্যবহার করে।’

‘মানুষের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতা কী?’

‘বাক। অর্থবহ ধ্বনি সৃষ্টি, ধ্বনির মালা গ্রন্থন। অর্থ সেখানে বক্তা ও শ্রোতার পারস্পরিক অঙ্গীকার। যবে থেকে মানুষ স্বভূমি ছেড়ে দূরদূরান্তে গমন আর বাণিজ্য শুরু করল তবে থেকে এই অঙ্গীকার খর্ব হলো। তখনই এল লিপি। আদিম মানুষও গুহার গায়ে, নিজের চামড়ায় আঁক কাটত। কিন্তু লিপি শুষ্ক, বদ্ধ। বাক সেখানে বন্দি, ধ্বনি নির্জীব।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়েন রামাচার্য। ফের বলতে শুরু করেন–

‘কিন্তু সময় বদলায়, মানুষকেও তার সঙ্গে তাল রেখে চলতে হয়। সাতগাঁর শিক্ষাশ্রমে আমরা সব কিছু তালপাতার পুথিতে লিপিবদ্ধ করে রাখার প্রকল্প নিয়েছি। বত্রিশজন ছাত্র ও লিপিকর সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই কাজে ব্রতী। বিগত নয় বছর ধরে চলেছে, এবং এই গতিতে চললে সকল বেদ শাস্ত্র ও বিদ্যার সকল শাখাপ্রশাখা, সকল টীকা টিপ্পনী ও উপসংহার আমার জীবদ্দশার মধ্যে সমাধা হবে বলেই মনে হয়। দূরদূরান্ত থেকে বিদ্যার্থীরা সাতগাঁয়ে অধ্যয়নের জন্য আসে। নিষ্কর জমির আয় থেকেই তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা হয়। মন্দিরে প্রতিদিন বুভুক্ষুরা প্রসাদ পায়, বাঘের দাপটে অনাথ শিশুরা আশ্রয় পায়। এসবের জন্য অর্থের প্রয়োজন। আগেই বলেছি, বর্ণের কারণে আমরা হাতে লাঙল কিংবা তুলাদন্ড তুলে নিতে পারি না। ভূম্যধিপতির সমর্থন আমাদের পাথেয়। আর সেজন্য আপনার কাছে আমাদের নিবেদন, ওই জমিগুলি আগের ব্যবস্থায় ফিরিয়ে দিন।’

শাসকের ভাষায় দীর্ঘ বিবৃতি পেশের পর রামাচার্যকে সামান্য ক্লান্ত দেখায়। অন্যদিকে দরপ খানের চোখেমুখে ঔৎসুক্য।

‘কিন্তু যুগ যুগ ধরে যা শ্রুতি ও স্মৃতিতে রক্ষিত হয়ে এসেছে, সেসব লিপিবদ্ধ করে রাখার কী এমন প্রয়োজন পড়ল?—’  

‘সে দীর্ঘ কাহিনি।’ রামাচার্য মৃদু হেসে বলেন।

‘সকাল এখনও নবীন। দীর্ঘ কাহিনি শোনার মতো সময় আমার হাতে আছে।’

‘সে কাহিনি শুনতে আপনার ভালো না-ও লাগতে পারে।’

‘তবু আমি শুনতে চাই।’