সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৫.৫
৫.৫
অনাহার! সজল সবুজ ডিহিবাংলার মানুষ এর স্বরূপ এভাবে আগে দেখেনি। ক্ষুধা, যা মানুষখেকো বাঘের মতো হানা দিচ্ছে হাটে মাঠে জনপদে। ইতিমধ্যে ভূস্বামীরা জোতজমি হারানোর ভয়ে রায়তদের নীল, আফিম, পাট, আখ ইত্যাদি অর্থকরী চাষ করতে বাধ্য করেছে। খাদ্যশস্যের সীমিত উৎপাদনে থাবা বসিয়েছে যুদ্ধবাজ কোম্পানির ফৌজের চাহিদা, সাতগাঁর অদূরে হুগলির পূর্বপারে পল্টন থাকার বিশাল ব্যারাক নির্মাণ হয়েছে।
দ্রুত বদলে যেতে-থাকা সময়ের ঢেউ এসে পড়েছে সাতগাঁতেও। দরপ ধার আমলেরও আগে থেকে যেসব নিষ্কর জমিগুলির স্বত্বভোগী ছিল স্থানীয় ব্রাহ্মণেরা, সেগুলিতে চড়া খাজনা বসেছে। এর ফলে টোল চতুষ্পাঠীগুলোয় ছাত্রবৃত্তি বন্ধ হয়েছে। ইংরেজ শাসকের প্রতি সাতগাঁবাসীর বিরূপ মনোভাব ক্রমশ আরও তীব্র হয়েছে। এদিকে এই বিশাল বৈচিত্র্যময় সুবার শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে গেলে এখানকার ভাষা সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সনাতন বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান থাকাটা যে জরুরি সেটা কোম্পানির কর্তারা একের পর এক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে টের পাচ্ছিল। স্থানীয় পণ্ডিতদের সহযোগিতা ছাড়া যে সম্ভব নয় সেটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সেই উদ্দেশ্যেই সাতগাঁর টোল চতুষ্পাঠীগুলির জন্য বার্ষিক অনুদান ও ভাতার প্রস্তাব এল কলকাতা থেকে। ইংরেজদের এই দান গ্রহণ করা উচিৎ কি না এই ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই নৈয়ায়িকেরা দুটি দলে ভাগ হয়ে গেল। আদিরাম মন্দিরের চাতালে যে সভা ডাকা হলো, সেখানে সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজারাম অনুদান গ্রহণের পক্ষে সওয়াল করল:
‘একটি বিষয় বিস্মরণ হলে তো চলবে না। এই যে বিদ্যাচর্চার জন্য সাতগাঁর আজ দেশ জুড়ে সুখ্যাত, সে কিন্তু শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায়। তা সে যত ঘোর অনাচারীই এসে সিংহাসনে বসুক না কেন। ইংরেজরা বর্তমানে দেশের শাসক, সেটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই।’
প্রবীণ পঞ্চানন তর্কচূড়ামণি প্রতিবাদ করলেন। — ‘ আজ আমরা যে মন্দিরের চাতালে বসে সভা করছি, তার গায়ে কিন্তু এখনও কোম্পানির গোলার ক্ষতচিহ্ন। সেই ক্ষত আমাদের সকলের মনেও, কোনো কালে নিরাময় হবার নয়। আজ তোমার পিতৃদেব, সকলের পরমপূজ্য রামাই পণ্ডিত থাকলে কী করতেন সেটা বিবেচনা করে দেখো রাজারাম।’
‘পিতৃদেব সদা স্মরণে আছেন,’ রাজারাম হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল। ‘কিন্তু তিনি ইহজগতে নেই। এই কঠিন সময়ে তিনি থাকলে কী করতেন জানার উপায় নেই। হিংসা শাস্তি চক্রবৎ পরিবর্তন্তে। শাসক আসে শাসক যায়, কখনো তার হাতে রক্তস্নাত কুঠার তো কখনো ওষ্ঠে কাব্যের চরণ। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আমাদের ধর্ম যজন যাজন অধ্যাপন। তার থেকে বিচ্যুত হলে তো চলে না পণ্ডিতমশায়।’
উপস্থিত প্রায় সকলেরই কোম্পানির প্রস্তাব গ্রহণ করার পক্ষে সায় রয়েছে দেখা গেল। কিন্তু বেঁকে বসল রামদেব। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল—‘জ্ঞানের জগৎ স্বাধীন সার্বভৌম বলেই জানি। সেই জ্ঞানকে যদি ক্ষমতাদর্পী শাসকের অনুদাননির্ভর হয়ে উঠতে হয় তাহলে তার স্বাধীনতা মরীচিকা ভিন্ন কিছু নয়।’
‘অবোধের মতো কথা বলিস নে দেবু, রাজারাম ধমকের স্বরে অনুজকে আক্রমণ করল। ‘কত ধানে কত চাল হয়, কত মণ তেলে কত প্রদীপ জ্বলে, সে হিসেব পরিবারে থেকেও তোকে না রাখলে চলে। কিন্তু আমাকে রাখতে হয়।’
‘জ্ঞানের প্রদীপ যেকোনো স্থানে জ্বলতে পারে, তার জন্য পরিবার প্রয়োজন হয় না,’ রামদেব বলে। ‘প্রাচীনকালে অরণ্যবাসী মুনিঋষিরা বেদ উপনিষদ সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁদের শাসকের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হয়নি।’
‘তুই কি তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চাস? এই কলিযুগে?’
‘যদি তাই করি সমস্যা কীসের?’
‘কুষ্মান্ড কোথাকার!’ রাজারাম গর্জন করে ওঠে। ‘প্রাচীনকালের মুনিঋষিদের মতো তুই বায়ু সেবন করে গাছের বাকল পরে প্রাণধারণ করতে পারবি? ব্রাহ্মণকুলে জন্মেছিস, তুই নিজের খাদ্য ফলাতে বস্ত্র বয়ন করতেও পারবি না। পার্থিব স্বাচ্ছন্দ্য নিরাপত্তা ছাড়া জ্ঞানমার্গ অধরা। সেজন্য বর্ণপ্রথার প্রচলন হয়। তাছাড়া বিদ্যাচর্চা পুথিনির্ভর। কত প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে এই আদিরামবাটির পুথিশালা, আমাদের স্বর্গত পিতৃদেব এর জন্য জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। মনে রাখিস এই জ্ঞানভান্ডার শুধু অনন্য নয়, অখন্ড অবিভাজ্যও।’
‘আমার একার প্রাণধারণের জন্য যে কয়েক মুঠো শস্যদানা প্রয়োজন, পরিবার থেকে আমি শুধু সেটুকুই নেব। আর ওই এগারোটি পুথি আমি নেব। সেগুলি যে আমার বিশেষ প্রয়োজন এমন নয়, প্রতিটি স্তবক চরণ আমার স্মৃতিতে উৎকীর্ণ হয়ে গিয়েছে। পুথিগুলি নেব কারণ ওগুলি আমার বিবাহের যৌতুক, আদরিণীর স্মৃতি।’
রাজারাম বিস্ময়াহত হয়ে দেখলেন এই কয়েক বছরে কতখানি বদল ঘটেছে রামদেবের মধ্যে। তার ঠোঁটের রেখায় সংকল্প, চোখের দৃষ্টিতে অচেনা তীক্ষ্ণতা।
আদরিণীর মৃত্যুর পর রামদেবের ভেতরে এক বিচিত্র শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় তিনটি বছর ধরে প্রতি দিন তার জেগে-থাকা প্রহর দ্বিখণ্ডিত ছিল পুথির অর্থ উদ্ধার আর আদরিণীর সেবায়। এখন তাকে দিবারাত্র তাড়া করে ফেরে অন্তিম দিনগুলি, সেই অনাহারক্লিষ্ট মুখে বিস্ফারিত চোখের মণি আর করোটির মুখব্যাদান, মৃত্যুর অবিচ্ছেদ্য মুখোশ। কখনো সেই বিকটের অন্তরাল থেকে ভেসে ওঠে এক নারীর প্রতিচ্ছবি, যাকে সে দেখেছিল সেই বসস্তের ভোরে। মনের বাধা কাটিয়ে সেই প্রতিচ্ছবির কাছে কল্পনাকে সমর্পণ করে রামদেব, তাকে হরিণীর মুক্ত চলন দেয় কাব্যের স্তবকে, ক্রমশ পাঠ অভিজ্ঞতার অন্তর্গত হয়ে ওঠে— ঠিক যেভাবে বাল্যকালে সরস্বতীতে সাঁতার দেবার সময় দেহের অন্তর্গত হয়ে উঠত নদী, তাতে ভেসে যেত মন এই মৎস্যভূমি ছাড়িয়ে, যার প্রান্তসীমার বাইরে কোনোদিন সে জীবনে পা রাখেনি।
একদিন রামদেব স্বপ্নে দেখল চালতা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে সেই নারী কড়ি খুঁজছে। স্বপ্ন এতই তীব্র যে প্রতিটি অনুপুঙ্খ গোচরে এল, যা সেই ভোরের চকিত দর্শনে চোখে পড়েনি, সেই শাড়িটি অপরাজিতা নীল আর পায়ে পেতলের মল মকরমুখী, আর মালসা নেবার জন্য নীচু হল যখন, ঝুলন্ত স্তনে ঘন বাদামী বৃত্ত বিস্ফারিত চোখের মতো। সেই দৃশ্যের অভিঘাতে জেগে উঠে রামদেব আবিষ্কার করল তার কামনা জাগ্রত হয়েছে। ধড়মড়িয়ে শয্যা ছেড়ে উঠে সে আতপ্ত দেহ নদীর জলে স্নিগ্ধ করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। আমবনের ভেতর দিয়ে কিছুদূর যাবার পর আবিষ্কার করল তার পা চলেছে ঘাটের পথ ছেড়ে বনের ভেতর দিকে, যে পথ দিয়ে মেথরানীরা আসে।
ঘন নিশ্চুপ ছায়া, মাথার ওপর পত্রপল্লবের চাঁদোয়া পাতলা হয়ে তারার নীলাভ আলোয় দেখা যায় ফিরিঙ্গিদের কবরখানা। শ্যাওলায় আকীর্ণ সেনোটাফগুলো যেন হারানো সভ্যতার চিহ্ন, মাকড়শা জাল বুনছে আলো ফোটার পর প্রথম মাছি শিকারের জন্য। কিছুটা পথ যেতে দেখা দিল বাদাবনের শেষ খর্বকায় ক্যাওড়া গরাণের চিহ্ন, একদা বাঘ আর গন্ডারের বিচরণভূমি, রুয়ানো ডে ইনফান্টের কারসাজিতে অবলুপ্ত হয়েছে। আরও কিছুদূর যেতে দেখা গেল জলার ধারে বাঁশের মাচায় শর ঘাসে বোনা চালে চালে বসতি, অস্পৃশ্যদের পাড়া।
রামদেব আদিরামবাটির প্রথম পুরুষ যার পদচিহ্ন পড়ল এই পাড়ায়। কিন্তু শেষ পুরুষ সে নয়। তিন প্রজন্ম পরে হেমন্ত আসবে এখানে।
*
চৈত্রসংক্রান্তির দিন গাজির বাগানে প্রবল গোলাগুলির শব্দ। নৌবহর থেকে কোম্পানি ফৌজের তোপধ্বনি সাতগাঁবাসীর চেনা, কিন্তু মনে হলো দুতরফা লড়াই চলছে। সন্ধ্যার পর জানা গেল বৈরী ফকির-সন্নিসিরা টক্কর নিচ্ছে কোম্পানি ফৌজের সঙ্গে। ইতিমধ্যে কলকাতায় নতুন গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস আসার পর নাগা সাধু আর ফকির দরবেশদের নেতৃত্বে গেরিলা বিদ্রোহ শক্ত হাতে দমন হয়েছে। সন্দেহজনক জটাজুটধারী সাধুসন্ত দেখলেই তাদের ফাটকে পোরা হচ্ছে, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পেলে হাটে গাছতলায় বিচারসভা বসিয়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হচ্ছে। মৃতদেহগুলো গাছে ঝুলিয়ে রেখে জনমানসে ভীতির সঞ্চার করাও হচ্ছে। সাধু ফকিরেরা অনেকেই ভেক ছেড়ে চুলদাড়ি কামিয়ে সংসার জীবনে ফিরছে, শীতকালে বিভিন্ন মেলায় হিমালয়ের সাধুসন্তদের সমাগম কমেছে।
এরই মধ্যে দুজন সন্ন্যাসী— এক সাধু আর এক ফকির—বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়িয়েছে, গোপন দল গড়ে সরকারি কোষাগারে লুটপাঠ করেছে, একাধিক ইংরেজ কর্মচারী নিধন করেছে। একজন জুনাপুর আখড়ার ঘামন্ডি গিরি, অন্যজন মাদারি সিলসিলার কামান শাহ। দ্বিতীয়জন এই বিচিত্র নামটি অর্জন করেছে একটি পর্তুগীজ হাতকামানের জন্য, যা দিয়ে সে একাধিকবার কোম্পানির ফৌজকে পর্যুদস্ত করেছে। এই দুজনকে ঘিরে সুরক্ষাবর্মের মতো তৈরি হয়েছে নানান কিংবদন্তী। লোকে বিশ্বাস করে, ঘামন্ডি গিরি ও কামান শাহ অলৌকিক ক্ষমতাবলে ফৌজের গুলিবর্ষণের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, প্রয়োজনে পাখির মতো উড়তে পারে, মাছের মতো জলের গভীরে সাঁতার দিতে পারে।
ভাগীরথীর চরে শরবনে গিরি আর শাহ দলবল নিয়ে লুকিয়ে ছিল, খবর পেয়ে ব্যারাকপুর থেকে ফৌজের কুড়িটি জেলিয়া নৌকা গিয়ে চর ঘিরে ফেলে। সারা রাত গুলির লড়াই চলে, দুপক্ষেই হতাহত হয়, কিন্তু পান্ডাদের ধরা যায়নি। অন্ধকারের ভেতর ঘামন্ডি গিরি ও কামান শাহ জাল ভেদ করে পালিয়ে যায় গাজির বাগানে। তাদের সঙ্গে কতজন অনুচর ছিল জানা যায়নি। কিন্তু পরদিন দুপুরে ত্রিবেণীর মুখ থেকে হুগলি ও সরস্বতীর দুদিকের পাড়ে নাকাবন্দি করে বড়ো জাহাজি কামান থেকে যখন তোপ দাগা শুরু হলো, বনের ভেতর থেকে যেভাবে জবাব আসতে লাগল, তখনই বোঝা গেল দরগা মিরাদরের পাথরের আড়ালে প্রভূত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লুকিয়ে আছে বড়োসড়ো একটি দল।
সারারাত গোলাবর্ষণ চলল। ভোরবেলায় নিস্তব্ধ হয়ে আসতে আট সেপাই নিয়ে ডাঙায় নামল ইংরেজ সার্জেন্ট। ধ্বংসস্তূপের ভেতরে গিয়ে দেখে পাথরের আড়ালে পড়ে আছে সন্ন্যাসী আর ফকিরের দুটি মৃতদেহ, পাশে পড়ে আছে সেই বিখ্যাত হাত কামান আর দুটি ম্যাচলক রাইফেল। বিস্ময়কর সামরিক প্রতিভায় গোলা কার্তুজ সম্পূর্ণ নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত দুজনে সারা রাত ধরে আস্ত একটি ফৌজি পল্টনের টক্কর নিয়েছে। সেদিন বিকেলে ব্যারাকপুর থেকে ফোর্ট উইলিয়ামে পাঠানো রিপোর্টে সে কথা উল্লেখ করল সার্জেন্ট, শেষে লিখল— ‘নীদার ডু দে হ্যাভ উইংস নর ফিনস, দে আর ওনলি আ পেয়ার অফ ইম্যাসিয়েটেড ফকিরস্, গ্রে ওল্ড মেন অফ আনসার্টেন এজ!’
উহাদের না আছে ডানা, না আছে মাছের মতো পাখনা— দুই বিশীর্ণ প্ৰবীণ অস্পষ্ট বয়সের ফকির।
.
ঘটনাস্থল থেকে কয়েকশো ফিট দূরে, বাগানের উত্তর পশ্চিম প্রান্তে রামদেব ও তার নজন শিষ্য সারারাত আশ্রমের ছাউনির ভেতর পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে বিনিদ্র বসে থেকেছে, রামনাম জপ করেছে কেবল। মেদিনীর থরোথরো কম্পন আর মূহুর্মুহু কমলাবর্ণ আকাশে জালালি কবুতরের ওড়াওড়ির ভেতর ওরা অপেক্ষা করেছে কখন আতঙ্কের রাত শেষ হবে।
শেষ বুঝি আর হয় না। তার আগে গোলাবর্ষণ থামল, বনে ঝিঁঝি পোকার কলতান শুরু হলো, তালগাছের মাথায় জোনাকিরা ফিরে এল, ধোঁয়ায় মলিন আকাশে উঠল পান্ডুবর্ণ সংক্রান্তির চাঁদ।
গাজির বাগানে রামদেবের আশ্রম হবার আগে সাতগাঁয়ের সাবর্ণরা কেউ এদিকটায় মাড়াত না। বট পাকুড় নিম তাল ইত্যাদি প্রাচীন গাছের ঘন বন, শিয়াল খট্টাস বেজি গোসাপের বাস। পূর্বদিকে বনের ভেতর দরপ গাজির মসজিদ আর খনকার ধ্বংসাবশেষ লতাপাতায় আকীর্ণ। ভূমিতে ছড়ানো বড়ো বড়ো পাথর, তার গায়ে প্রাচীন মন্দির আর বিহারের মোটিফ খোদাই করা রয়েছে। এদিকটায় আম, কাঁঠাল, নারকেল ও পেয়ারা জাতীয় ফলের গাছ। অনুমান হয়, বহুকাল আগে বিহারের শ্রমণেরা জনপদে ঘুরে মাধুকরীতে যেসব ফল গৃহস্থদের থেকে ভিক্ষা পেত, তাদের বীজ পড়ে তৈরি হয়েছে। ফল পাকলে বনে মানুষ আসে না, আসে কেবল নানান জাতের পাখি। পাখির কলকাকলিতে ভরে থাকে, ঠিক যেমন সাতশো বছর আগে ধ্বনিত হতো তরুণ শ্রমণদের কন্ঠস্বর। তারা এই মৎস্যভূমির হাটে মাঠে বাটে ঘুরে প্রভুর বাণী প্রচার করত আর বর্ষার তিনটে মাস যখন পথঘাট অগম্য হয়ে উঠত, এসে আশ্রয় নিত এই বিহারে। পথে ঘুরে ঘুরে যে বহির্জগত তারা চাক্ষুষ করত তার স্মৃতি, তাদের পূর্বাশ্রমের স্মৃতি, ইন্দ্রিয়জ ব্যসন ও অনুভূতিমালা ধর্মবিশ্বাসের ভেতর জারিত হয়ে কুহক সৃষ্টি হতো, সেসবই লিপিবদ্ধ করত তালের পাতে, এমন এক ভাষায় যা আকরিক রঙের মতো উজ্জ্বল, ঝরনার মতো স্বচ্ছ, সেই ঝরনার জলে সূর্যালোক ঝিরিঝিরি গাছের পাতায় প্রতিফলনের মতো সজীব।
বিদ্যার্থীর দলটা এসে নদীর ধারে বনের কিছু অংশ পরিষ্কার করল। ভাঙা পাথরের ঘাট থেকে বনের মধ্যে ঢোকার একটি প্রাচীন পায়ে-চলা পথ খুঁজে পেল শুকনো পচা পাতার স্তূপ সরিয়ে। ধংসস্তূপ থেকে ইট পাথর বয়ে এনে নিজেরাই কাদামাটি আর বাঁশের দরমা দিয়ে দুটি বাসযোগ্য ছাউনি বানিয়ে নিল। অক্ষয় তৃতীয়ার পর থেকে পাখির কুজনে মিশল ত্বরিতপাদ ও উজানিপাদের কাব্যগীতি, কালিদাসের গভীর চরণ মুক্তবেণীর অবিরাম স্রোতের ধ্বনির সঙ্গে সংলাপ শুরু করল। পোড়-খাওয়া ছেলের দল, প্রায় সকলেই আশেপাশের দুস্থ ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে এসেছে। প্রথম দিকে কিছুটা কৌতূহল আর কিছুটা বিকল্প আশ্রয়ের টানেই এই অভিনব আশ্রমে থাকতে শুরু করল ওরা। আট-দশদিনের মধ্যেই কেউ কেউ ফিরে গেল, আবার নতুন দু-তিনজন এসে যোগ দিল। যতটা না পণ্ডিত রামদেবের প্রথাবহির্ভূত বিদ্যাদানের জাদুতে, ততটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে বন্য মুক্ত পরিবেশের মায়ায় বাঁধা পড়ল তারা।
সনাতন টোল-চতুষ্পাঠীর মতো এখানে কড়া নিয়মের রক্তচক্ষু নেই, শুধুমাত্র ব্রাহ্মণের সাধারণ নিত্যকর্ম ও দুয়েকটি সহজ অনুশাসন মেনে চলতে হয়
১- কারোর কাছে গিয়ে কোনোরূপ ভিক্ষা চাওয়া যাবে না
২- কোনো ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে কোনোরূপ দান গ্রহণ করা যাবে না
৩- আশ্রমের খাদ্য সকলে সমান ভাগ করে খেতে হবে
৪- বনে কোনো পশুপাখির অনিষ্ট করা চলবে না
৫- প্রয়োজনের অতিরিক্ত বনের ফলমূলদি কাঠ আহরণ ও অপচয় করা চলবে না।
প্রতি মঙ্গলবার দুজন কিশোর আদিরামবাটি থেকে রামদেবের প্রাপ্য সিধের চাল, ঘি, আনাজপাতি নিয়ে আসে। তার পরিমাণ সাত-আটজন উঠতি বয়সের ছেলের পেট ভরানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এজন্য তারা নিজেরা বাড়ি থেকে যে যেমন
পারে আনে, এছাড়া বনের ফল কন্দ সংগ্রহ করে। রামদেব সাধারণত আশ্রমের ছাউনির লাগোয়া একটি তালপাতায় বোনা খুপরিতে রাত্রিবাস করেন, দিনে একবার আতপান্ন শাকপাতা ঘি ও সৈন্ধব লবণ সহযোগে ভক্ষণ করেন।
সাতগাঁবাসীরা ওঁর নাম দিয়েছে বুনোরাম। বুনোরাম ও তার বানরবাহিনি। তরুণ বিদ্যার্থীদের মধ্যে তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কোনো কোনো টোলের পণ্ডিত প্রচার করল, বুনোরাম গুপ্ত সহজিয়া বিদ্যা শেখায়, লোকচক্ষুর অন্তরালে তান্ত্রিক অনাচার অভ্যাস করে।
কিন্তু অপপ্রচার করে গাজির বাগানে গুরুকুলের খ্যাতি রোখা গেল না। মুক্তবেণীর স্রোতে ছড়িয়ে পড়ল ভাটির দিকে জনপদে। একদিন তালডোঙায় চেপে এল এক কিশোর। বুনোরাম ঘাটের ওপর পাথরের চাটানে বসে ছন্দের সূত্র ব্যাখ্যা করছিলেন। ডোঙাটি পাড়ে ডুমুর গাছের ডালে বেঁধে উঠে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল ছেলেটি।
‘প্রণাম গুরুদেব, চকমহেশপুর থেকে আপনার পান্ডিত্যের খ্যাতি শুনে আসছি। আমি পিপাসার্ত। আমাকে আপনার পদতলে ঠাঁই দিন।’
বুনোরাম বিস্মিত হয়ে ছেলেটিকে দেখেন। রোদেপোড়া তামাটে রঙ, দোহারা চেহারা, পরনে একটিমাত্র জীর্ণ পট্টবস্ত্র।
‘অধমের নাম ত্রৈলোক্যনাথ শর্মা। আমরা দাক্ষিণাত্য বৈদিক। আমার পিতৃদেব বিষ্ণুমন্দিরে যাজনকার্য করেন।’
ডোঙাটি সে তালের কান্ড থেকে নিজে হাতে কুঁদে বানিয়েছে, এবং রাতভর ভাটায় স্রোতের বিপরীতে টেনে এতদূর এসেছে।
দুস্থ তাঁতি ও কুমোরদের গ্রাম চকমহেশপুরে হতদরিদ্র পুরোহিতের পনেরোটি সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ত্রৈলোক্যনাথ সামান্য অসত্যবচন করেছিল। রাতভর ডিঙি চালনা করে এতদূর তাকে টেনে এনেছে ঠিক জ্ঞানের খিদে নয়, আরও আমূল প্রাথমিক খিদে, যার স্বরূপ এদেশের মানুষ টের পেতে শুরু করেছে কোম্পানির শাসন শুরু হবার পর। বছরে পাঁচ মাস সজনেপাতা সিদ্ধ খেয়ে বড়ো হয়েছে ত্রৈলোক্যনাথ। শৈশবকাল থেকেই সে শুনে এসেছে এই মৎস্যভূমিতে কেউ অনাহারে কাটায় না। সাতগাঁয়ে আসার আগে আশ্রমের ব্যাপারে কিছুই জানত না সে। ডকবাজারে খবর নিয়ে জেনেছে, এখানে থাকলে বিদ্যা ছাড়াও দুবেলা অন্তত খাদ্য জুটবে এটা নিশ্চিত। এবং যদিও সেই খাদ্য প্রায়শই সিদ্ধ সজনে পাতা, তার সঙ্গে আতপান্নও থাকবে।
বহিরাগত বিদ্যার্থীকে আশ্রয় দিতে বুনোরামের অসম্মতি নেই। আবাসিকরাও ত্রৈলোক্যনাথকে সহজে গ্রহণ করল যদিও সে— ‘দোনো’, সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিকদের চোখে নীচু পিড়ির। কিন্তু এখানে থাকতে গেলে যে গুণটি সর্বাগ্রে প্রয়োজন, অর্থাৎ শ্রমে অনুরাগ, সেটি যে ওর পূর্ণমাত্রায় আছে সেটা প্রথম দিনেই বোঝা গেল। এছাড়া আছে সাহস, সাতগাঁর বাইরে বহির্বিশ্বের জ্ঞান, এবং অদম্য চালিকাশক্তি, আক্ষরিক অর্থেই নিজের ভাগ্যের ডোঙা নিজেই চালনা করে বাস্তুভিটে ছেড়ে এতদূর এসেছে। ছেলেদের মুখে মুখে ওর নাম হয়ে গেল ডোঙা শর্মা। ডোঙাটি ওর নিজের হাতে কুঁদে তৈরিই শুধু নয়, যেন ওর একটি অঙ্গ।
এগারো জন বিদ্যার্থী, তাদের মধ্যে পাঁচজন আবাসিক। বাকিরা সকালবেলায় ছাতা পাততাড়ি বগলে নিয়ে সাতগাঁ থেকে পায়ে হেঁটে সরস্বতীর পাড় ধরে আসে, সন্ধ্যার আগে ফিরে যায়। কোনো কোনোদিন কেউ কেউ রাত্রিবাসও করে। তাদের সঙ্গে কোনো পুথিপত্র থাকে না। আশ্রমে অভিনব পাঠ্যক্রমে লিপির সঙ্গে প্রায় কোনোরকম সংস্রব নেই, আর এটা সাতগাঁর পণ্ডিতদের অস্বস্তির একটি মূল কারণ। পারিবারিক টোলে আচার্য থাকাকালীন বুনোরাম নিজে কখনো কোনো টীকা রচনা করেননি, কোনো উপাধিও লাভ করেননি। লিপি বা লেখ সম্পর্কে তাঁর যত সন্দেহ, ততটাই বিতৃষ্ণা সেইসব পণ্ডিতদের সম্পর্কে, যারা পুথির পাত না খুলে নিজের মুখ খুলতে পারে না। বুনোরামের ভাষায়,— ‘পুথি চালনা করে যেন রাখালের পাচনবাড়ি!’ তারপরেই যোগ করেন
‘রাখাল একজনই ছিল বটে মথুরায়, পাচনবাড়ি দিয়ে বাঁশি বানিয়েছিল। কাব্যশাস্ত্র পাঠের লক্ষ্যই তাই, পুথির পাচনবাড়িকে আবৃত্তির ধ্বনিতে বাঁশি বানিয়ে তোলা।’
বিয়েতে যৌতুক পাওয়া এগারোটি পুথি শেষ পর্যন্ত তিনি আশ্রমে আনেননি। সেদিন রাজারামের সঙ্গে উত্তপ্ত বাকবিনিময়ের সময় সদর্পে বলেছিলেন পুথিগুলির প্রতিটি স্তবক চরণ তাঁর স্মৃতিতে উৎকীর্ণ হয়ে গিয়েছে। সেই অহঙ্কার থেকেই আনেননি।
গাজির বাগানে সেই চরণগুলি যখন বারোটি উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারিত হয়, কিছু কিছু চম্পুতে সুর দিয়ে গেয়ে ওঠা হয়, মনে হয় যেন সদ্য পিঞ্জরমুক্ত পাখি ডানা মেলছে তার নিজস্ব আকাশে। অলঙ্কারশাস্ত্রের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুনোরাম ছাত্রদের বলেন–
‘সত্যের যথার্থ রূপ প্রকাশের মধ্যেই সুন্দরের বাস, অহৈতুকী মধুর রস সৃষ্টি করলেই সুন্দর হয় না, শাস্ত্রবিধির নিগড়েও সেই সুন্দর বাঁচে না।’
মুখে মুখে শাস্ত্র ব্যাখ্যা চলে, সংলাপের আকারে।
‘রাজা বিক্রমাদিত্যের সভায় মহাকবি কালিদাস ও বৈয়াকরণ বরোরুচির সেই প্রতিযোগিতার কথা বলেছিলাম, স্মরণে আছে?’
‘আছে গুরুদেব।’ মনু বলে।
‘বল দেখি?’
‘শুকনো গাছের ডাল দেখে প্রবীণ বৈয়াকরণ বললেন— শুষ্কং কাষ্ঠ তিষ্ঠত্যগ্রে! মেঘদূতের কবি বললেন— নীরস তরুবর পুরতো ভাতি।’
‘রাজা কালিদাসের গলায় মুক্তোর হারছড়া পরালেন। কেন পরালেন?’
‘তিনি মধুর ধ্বনি সৃষ্টি করেছেন,’ গণেশ বলে। ‘শুকনো গাছের শাখা রসসিক্ত করেছেন।’
‘অথচ কাব্যকৃতির দৃষ্টিতে যদি আমরা দেখি?’
‘বরোরুচির বর্ণনা ঢের বেশি সুন্দর, গুরুদেব।’ ত্রৈলোক্যনাথ বলে।
‘কেন?’
‘কারণ উহা সত্য।’ ত্রৈলোক্যনাথ উত্তর দেয়। ‘শুষ্কং কাষ্ঠং শব্দমালায় দুইটি শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডে আঘাতের ধ্বনি প্রতীয়মান। তাকে মিছিমিছি রসসিক্ত করার ছলনা এখানে নেই।’
‘যথার্থ! এই যে শুষ্কং-কাষ্ঠং ধ্বনির মধ্যে দিয়ে উপমান ও উপমেয়র বিবাহ ঘটল, এভাবেই’ উত্তেজনায় বুনোরামের কন্ঠস্বর উচ্চকিত হয়ে ওঠে— ‘এভাবেই কাব্য যেখানে সার্থক হয়, যেখানে সত্য ও সুন্দরের মধ্যে বিবাহ ঘটে, সেখানে ভাষা রূপান্তরিত হয়ে যায় পাথরে, ঝঞ্ঝায়, প্রবহমাণ জলে, দাউদাউ অগ্নিশিখায়। সঠিক শব্দচয়ন এবং উচ্চারণের শক্তিতে সেটা সম্ভব। বৈদিক যুগে বনবাসী মুনিঋষিরা এভাবেই পশু মনুষ্যকে পাথর বানিয়ে দিতে পারতেন, বৃষ্টি নামাতে পারতেন, বৃষ্টিভেজা কাষ্ঠখন্ডে অগ্নিসংযোগ করতে পারতেন। এভাবেই কাব্য হয়ে উঠেছে মন্ত্ৰ!’
.
মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে কাব্যপাঠ ও কাব্যগীতির চৌম্বক ধ্বনিমাধুর্য একদিন এক আগন্তুককে টেনে আনল আশ্রমে।
তার আগে বেশ কিছুদিন ধরেই একটি সরু ছয় দাঁড়ির বজরা ত্রিবেণীর উজানে যেতে দেখা যাচ্ছিল। বজরার মাথায় ক্যানভাসের ছাউনি দেওয়া একটি সেদান চেয়ার, তার ওপরে বসে একাকী পুরুষমূর্তি লম্বা গড়গড়ার পাইপ মুখে নিয়ে বই পড়ছেন, নদীপাড় থেকেও দেখা যেত। তাঁর পরনে ঢোলা পাজামা, কুর্তা, মাথায় পাগড়ি আঁটা— প্রাচ্যদেশীয় মানুষের মতো বেশভূষা। কিন্তু বজরায় কোমরবন্ধ-আঁটা আর্দালি হুঁকাবরদার দেখে মনে হয় কোনো উচ্চপদস্থ কোম্পানি কর্তা না হওয়া অসম্ভব। সপ্তাহে দুদিন বজরাটি সকালে কলকাতার দিক থেকে উজান পথে যায়, অপরাহ্ণের পর ফেরে। একদিন বৈকালিক আহ্নিকের পর আশ্রমিকরা ভাঙা ঘাটলায় হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে, বজরা এসে ভিড়ল। দাঁড়িরা লম্বা কাঠের পাটাতন পেতে দিল। তার ওপর দিয়ে পাড়ে হেঁটে এলেন যিনি, তিনি ফিরিঙ্গি সাহেব। তাঁর মাথায় সোনালি চুল পিছনে টেনে ছোট্ট গিঁট বাঁধা, ডিম্বাকৃতি বালকসুলভ মুখে গোল গোল নীল চোখ, সাদা চামড়ায় ন্যাশপাতির মতো রোদে-পোড়া ছিট ছিট দাগ ফুটেছে।
ওঁকে আসতে দেখে ছেলের দল আড়ষ্ট হলো, কেবল ডোঙা শর্মা এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনার ভঙ্গি করে বলল—
‘আপনাকে আমি চিনেছি। আপনি জনাব ইউনুস আক্সফার্দি না?’
সাদা সুগঠিত দাঁত বের করে হেসে উঠলেন ফিরিঙ্গি সাহেব, ভাঙা কিন্তু স্পষ্ট বাংলায় বললেন— ‘তুমি কিছু জানো বটে, বালক! আমি জোনস, অক্সফোর্ডে ডিগ্রি নিয়াছি। আমি ফারসি জানি, আমায় ইউনুস আক্সফার্দি বলে বটে কেউ।’
শুধু ফারসি নয়, জনাব আরবি, হিব্রু, গ্রীক ও লাতিন ভাষাও জানেন। বছর খানেক হলো কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে সুপ্রিম কোর্টের পিউনি জজ হয়ে এসেছেন, তিনি জানালেন। সপ্তাহে দুদিন নবদ্বীপের পণ্ডিতদের কাছে হিন্দু শাস্ত্রীয় বিধান সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে যান।
‘নবদ্বীপ?’ বুনোরাম বলেন।
‘আমি শুনেছি নবদ্বীপের বেদজ্ঞ পণ্ডিতদের সমকক্ষ নৈয়ায়িক সাতগাঁতেও আছেন।’ আক্সফার্দি বলেন। ‘তবে কি না দীর্ঘকাল বাংলার রাজধানী ছিল নবদ্বীপ, ওখানকার পণ্ডিতদের জেন্টু কোড সংক্রান্ত বিশেষ জ্ঞান থাকাটা স্বাভাবিক। সেই কোড সংস্কৃত থেকে ফারসিতে অনুবাদ হয়েছে, তার একুশটি ধারার অসংখ্য জটিল উপধারা রয়েছে।’
বাংলার শাসনভার হাতে নেওয়ার পর কোম্পানির কর্তাদের একটি উপলব্ধি হয়েছে— এই সুপ্রাচীন বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশে ইংল্যান্ডের বিচার কাঠামো যথেষ্ট নয়। ঔপনিবেশিক আইন এ দেশের উপযোগী করে তোলার উদ্দেশ্যেই ইউনুস আক্সফার্দির এই সাপ্তাহিক বজরাযাত্রা।
‘আমি আইনের লোক, কিন্তু ভাষা আমার হৃদয়!’ নিজের বুকে হাত ছুঁইয়ে আক্সফার্দি বুনোরামকে বলেন। ‘এ দেশে আসিবার পর আমি সংস্কৃত শিক্ষা করছি। এ অতি ফ্যাবুলাস ভাষা, কিন্তু শুধুমাত্র পুথিতে আর তোমার মতো ব্রাহ্মণের জিহ্বায় ইহার বাস। আমি সাধারণ মানুষকে এই ভাষায় কথা বলতে শুনি নাই।’
‘তার কারণ লোকে বিশ্বাস করে সংস্কৃত হল দেবভাষা। এই ভাষা সবাইকে শেখানো হয় না।’ বুনোরাম বলেন।
হাতমুখ নেড়ে ছোটো ছোটো বাংলা বাক্যে ইউনুস আক্সফার্দি বুনোরামকে বোঝাতে চেষ্টা করেন তাঁর ভেতরে ক্রমশ জমে উঠতে থাকা বিভ্রান্তির কুয়াশা। যে ভাষায় প্রতিদিন আদালতে সাক্ষীরা পেশকারেরা কথা বলে আর যে ভাষায় শাস্ত্রের বিধানগুলি লেখা, তাদের মাঝে এক অনতিক্রম্য শূন্যতা। এবং সেটি কেবল ভাষাতেই সীমাবদ্ধ নয়, আরও গভীর কিছু। ‘আমি কি কিছু বোঝাতে পারিলাম, পণ্ডিত?’ কথার ফাঁকে ফাঁকে বলেন।
বজরায় কলকাতা থেকে নবদ্বীপ যাতায়াতের পথে এই বনাঞ্চল, যেখানে কিছুকাল আগে দুই কুখ্যাত সন্ন্যাসীর সঙ্গে কোম্পানির ফৌজের লড়াইয়ের চিহ্ন রয়েছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে আধপোড়া গাছের কান্ডে, তারই এক প্রান্ত থেকে সমবেত আবৃত্তির মিঠে ধ্বনি জলের ওপর দিয়ে ভেসে এসে তাঁর স্মৃতিতে ফিরিয়ে এনেছে ছোটোবেলায় ওয়েলশ্-এ পৈতৃক গ্রামে গির্জায় শোনা কয়ারের সঙ্গীত।
‘ইহা কোন ভাষা, পণ্ডিত? কোন পুথি? আমায় দেখাইতে পার কি?’ সাহেব বলেন।
বুনোরাম হাসেন। বহু শতাব্দী আগে ঠিক এই স্থানেই এক শাসক পুথি দেখতে চেয়েছিল। রামাচার্যের গল্প ছোটোবেলায় পিতৃদেবের মুখে শুনেছেন। সে ছিল তুর্কী, এই ব্যক্তি ইংরেজ। সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি ত্বরিতপাদের কয়েকটি চরণ আবৃত্তি করেন।
‘কিছু কি অনুভব হল, সাহেব?’ জিজ্ঞেস করেন বুনোরাম।
আক্সফার্দির চোখের নীল তারায় ধূসর বিন্দু ফুটে ওঠে। তিনি মাথা নাড়েন — ‘অর্থ কিছু বুঝিলাম না, ধ্বনি শুনিয়া মনে হল বনে শুখা পাতার বিছানায় পায়ের শব্দ।’
বুনোরাম ব্যাখ্যা করেন। জঙ্গলে বাঘিনী কস্তুরী হরিণকে তাড়া করছে— হরিণটি শিঙেল পুরুষ, দুজনেরই পূর্ণ যৌবন, ক্ষুধা আর মৃত্যুভয়ের তীব্র দৌড়ে অরণ্যছায়া গুলিয়ে উঠেছে চিত্রল ছোপ আর ডোরায়, ক্রমশ দুজনের মাঝে দূরত্ব কমছে, শ্রান্ত ত্রস্ত হরিণের তিনদিকে জল, শিয়রে মৃত্যু, হাঁফাচ্ছে সে, এদিকে বাঘিনীর উন্মুক্ত দাঁতের থেকে লালা ঝরছে, ঝাঁপ দেবার পূর্ব মুহূর্তে দেহটা সংকুচিত করা মাত্র শিঙেল হরিণ কোমর বাঁকিয়ে পিছনের একটি পা শূন্যে তুলে দিল অসম্ভব নাচের ভঙ্গিমায়, মৃত্যুভয়ে উদ্ভূিত পুরুষ অঙ্গের কস্তুরী গন্ধ চৈতি হাওয়ায় বয়ে এল বাঘিনীর নাসারন্ধ্রে, ক্রমশ তার সংকুচিত দেহ এলিয়ে এল, জিহবা প্রসারিত হল, লেজটি গুটিয়ে এল পিঠের পাশে— সমৰ্পণ!
‘তারপর?’ আক্সফার্দি সাহেবের চোখের নীলে ধূসর বিন্দু চিকচিক করে ওঠে। ‘হরিণ কি বাঘিনীর সহিত ইন্টারকোর্স করিল?’
বুনোরাম মুখমন্ডল আকাশে তুলে হেসে উঠলেন। উদাত্ত প্রাণখোলা হাসি নদীর কলধ্বনিতে, পাতার মর্মরধ্বনিতে মিশে গেল। অপরাহ্ণের আকাশে আলো বুঝি হঠাৎ মায়াবী হয়ে উঠল।
‘কবি তাঁর কাব্য এখানেই শেষ করেছেন। কয়েক শত বছর পরে এই কাব্য যে আবৃত্তি করবে, যে শুনবে, তাদের কল্পনার ভূমিতে যা ইচ্ছা তাই করার স্বাধীনতা তিনি দুই অলীক বন্য প্রাণীকে দিয়েছেন।’
সেদিন বিকেলের পর বুনোরামের আশ্রমে এক নতুন অনাবাসী শিষ্য যোগ হলো।
