Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.৭

৩.৭

শাকম্ভরী দেবী যেদিন কাশীযাত্রা করলেন, সেদিন প্রথম বাপ্পা মায়ের কলকাতার দিদার বাড়িতে গেল।

তার আগে ওরা ওর বুড়িদিদাকে বিদায় জানাতে গিয়েছিল হাওড়া স্টেশনে। দিনের বেলায় যে রেলস্টেশনটা মায়ের সঙ্গে সাতগাঁয় প্রবেশের দুয়ার, রাত্রিবেলা সেটা কেমন অচেনা রহস্যময় হয়ে ওঠে আগে কখনো সে জানতে পারেনি। সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দূরপাল্লার ট্রেন, বড়ো বড়ো মালের বোঝা মাথায় নিয়ে ছুটোছুটি করছে লাল জামাপরা কুলির দল, তাদের বুকে চকচকে পেতলের ব্যাজ, মাইকে ঘন ঘন ঘোষণা হচ্ছে ট্রেন ছাড়ার, প্ল্যাটফর্মে মাদুর খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে শুয়ে কত পরিবার, অ্যালুমিনিয়ামের টিফিনকৌটো থেকে খাবার বের করে গোল হয়ে বসে খাচ্ছে, বড়ো ঘড়ির কাঁটাদুটো কেঁপে কেঁপে সরে যাচ্ছে।

জীবনে প্রথমবার এই দৃশ্য দেখে, প্রথমবার সাতগাঁ ছেড়ে বেরিয়ে শাকম্ভরী দেবীর দুই চোখে কুয়াশার মতো ঘোর, শীর্ণ ঘাড়ের ওপর মাথাটা কাঁপছে পাখির ছানার মতো।

অন্তর্জলীযাত্রা থেকে ফিরে মেটেঘরে থাকতে শুরু করার পর শাকম্ভরী দেবী ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিলেন। আগের মতো আর লাঠি হাতে পাড়া পরিক্রমায় বেরোতেন না, লোকজনকে ডেকে অযাচিত উপদেশ বিতরণ করতেন না, তিথি নক্ষত্রের খবর রাখতেন না, চোত-বোশেখে তুলসীমঞ্চের ওপর মেটে হাঁড়িতে জল আছে কি না দেখতেন না, চিন্তামণির জন্য গামা ঘাস কেটে রেখেছে কী না, বড়ি আচারে ভাদ্রের রোদ খাওয়ানো হচ্ছে কী না, বসন্তর কোষ্ঠচলাচলের জন্য কাঁচা বেল পাড়িয়ে রাখা হয়েছে কী না, এসব কিছুই আর দেখতেন না। এককালে তাঁর হাতের রান্নার খ্যাতি ছিল, যজ্ঞিবাড়ির কাজেকম্মে আলুনি কুমড়োর ছক্কা ছানার ডালনা রাঁধার জন্য ডাক পড়ত। অন্তর্জলীযাত্রার আগেও রোজ তিনি নিজের জন্য দিনে একবার গঙ্গাজলে পেতলের সরায় সামান্য তরিতরকারী রান্না করতেন। বাড়ির সবার খাওয়াদাওয়ার পাট চুকতে বিকেল হয়ে এলে এবাড়ি ওবাড়ির বউঝিরা যখন ভিজে চুল পিঠে ছড়িয়ে রান্নাঘরের মেঝেয় খেতে বসতো, যখন ভাত দিয়ে খাবার মতো হেঁসেলে বিশেষ কিছু পড়ে থাকত না, তখন শাকম্ভরী দেবীর হাতে তৈরি সামান্য ছেঁচকি অম্বলে টাকনা দিয়ে দিয়ে কাঁসি-ভরা ভাত উঠে যেত। সরস্বতীর চরে বোনা মুলো রাঙালু বেগুন তেঁতুল আর গুড় দিয়ে তৈরি অম্বলে, সোনামুগের ডালে, মটর ডালের বড়ার ঝালে, কিংবা নিভু নিভু ঘুটের আঁচে বসানো পাঁচমেশালি সব্জির খোসায় কালোজিরে ফোড়ন, কাঁচালঙ্কা আর সরষের তেলের ছিটে দেওয়া বাটি চচ্চড়িতে অমৃতের স্বাদ ফোটাতেন। প্রতিদিন সকালে উঠে রামপ্রাণ সরোজার কাছ থেকে খুচরো টাকা চেয়ে নিয়ে ডকবাজারে চাষিদের নৌকায় আনা টাটকা শাকসব্জি কিনে গামার মাথায় বেতের ধামা চাপিয়ে আনতেন। ভেতর উঠোনে এসে শাকম্ভরীর ঘরের সামনে গিয়ে হাঁক দিতেন— ‘পিসিমা, এসো গো!

বৃদ্ধা দেয়াল ধরে ধরে বেতের ছোটো চুপড়ি নিয়ে এসে ধামায় সবচেয়ে টাটকা আর নধর ভোরের শিশিরমাখা সবজি দুটি-চারটি তুলে নিতেন। ঘরের দাওয়ায় তোলা উনুনে সরা বসিয়ে খুস্তি নাড়তেন যখন, চারদিক গন্ধে ম’ম করত। আপিস যাবার আগে কুয়োতলায় নাইতে এসে বসন্ত হাঁক দিত–

‘আজ কী রাধছ, বুড়ি? মাংস?’

বৃদ্ধা কানের কাছে হাত এনে বলতেন–‘কী বললি?’

বসন্ত আবার চিৎকার করে একই কথা বলত। তিনি শুনতে পেতেন না, ফের জিজ্ঞেস করতেন, বসন্ত আবার বলত। সেই শুনে সকলে হেসে কুটিপাটি হতো।

‘বুড়ি বদ্ধ কালা!’ বসন্ত গায়ে তেল মাখতে মাখতে বলত। ‘যম ডেকে ডেকে হদ্দ হয়ে নিজেই মরে ভূত হয়ে গেছে!’

শাকম্ভরী কানের পেছনে হাতের তালু জড়ো করে বলতেন,— ‘কী বললি?’ কিন্তু যেই সে বলে উঠত,— ‘বুড়ি কবে মরবে গো?’ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিতেন—

‘যদ্দিন এবাড়ির পুরুষমানুষগুলো আমায় স্বপ্নে জানান দিয়ে ফের জন্মাতে আসে, তদ্দিন কি আর আমার মরার জো আছে!’

ন দিন ঘাটে পড়ে থেকে বাড়ি ফেরার পর শাকম্ভরী দেবীর ইন্দ্রিয়গুলো ক্ষীণ হয়ে এল। সারাদিন মেটেঘরের দাওয়ায় পোড়ো পালকিটার পাশে বসে থাকতেন, উঠোনে নিমের ছায়ায় ইটের ফাঁকে আমরুলের চারা বেড়ে ওঠে দেখতেন। সরোজা কাওনভাজা দিয়ে গেলে সারাদিন ধরে আনমনে চিবোতেন, পায়ের কাছে ছড়িয়ে পড়া দানা খুঁটে খেত জালালি কবুতর। মাঝে মাঝে লাঠি ছাড়াই চতুষ্পদের মতো সামনে ঝুঁকে মাটিতে একটি হাত রেখে দেয়াল ধরে ধরে বেরিয়ে পড়তেন উদ্দেশ্যহীন, দুই পায়ের ফাঁকে শিথিল জরায়ুটা ঝুলে এসে প্রায় মাটি ছুঁতো। ক্রমশ সময়ের বোধ হারিয়ে ফেললেন, দিন রাতের যে কোনো সময়ে, এমনকি মাঝরাতেও, ঘুরে বেড়াতে শুরু করলেন সারা বাড়িময়। একদিন সকালে বামুনদি দেখে গোময়ের বদলে চিন্তামণির নাদি মাটিতে মিশিয়ে তুলসীমঞ্চ লেপছেন।

তাঁর পরাণবউ অম্বুবাচির দিন নদী থেকে মান্দাসীকে কুড়িয়ে আনার পর মাঝেমাঝেই রামপ্রাণের কাছে তিনি কাশীবাসী হবার বাসনা ব্যক্ত করতেন। অন্তর্জলীযাত্রায় সজ্ঞানে ইহজগত ছেড়ে যাবার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, তিনি জীবনচক্র থেকেই মুক্তিলাভ চাইলেন যাতে তাঁকে আর কখনো জন্মাতে না হয়, যাতে বংশের পূর্বপুরুষদের তাঁর স্বপ্নের ভেতর দিয়ে আবার ফিরে আসতে না হয় এই হৃতজৌলুস বিষাদময় জনপদে, যার কোনোকিছুই আর আগের মতো নেই –সেই সরস্বতী নদী নেই, সেই দখিনা বাতাস নেই, সেই অনাবিল সূর্যালোক নেই, এমনকি সোনামুগের ডালেও আগের সেই সোয়াদ নেই।

আগেকার দিনে সাতগাঁর প্রবীণেরা নৌকাযোগে কাশী যেতেন। দিনকাল বদলেছে। শাকম্ভরী দেবীর জন্য দুন এক্সপ্রেসে টিকিট কাটা হলো। ওঁকে রেখে আসতে যাবে বিশুঠাকুর, কটা দিন ওর ঊনত্রিশ দেবদেবীর ভার নিল আদিরাম মন্দিরের পুরুতমশাই। প্রায় গোটা একটা শতাব্দী দুই নদীর মধ্যবর্তী মৎস্যভূমিতে জীবন কাটিয়ে শাকম্ভরী দেবী সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন একটি কমলা-সবুজ ডোরাকাটা শতরঞ্চিতে জড়ানো বিছানা আর একটি জলের কুঁজো, খসখসে মোড়া। রেখে যাচ্ছিলেন সারা বাড়ির দেয়াল জুড়ে মেঝে থেকে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় তাঁর একটানা হাতের ছাপ। সেবার দুর্গাপুজোর আগে বাড়ি চুনকামের পর সেই দাগও ঢেকে গেল।

শিউলির কলকাতার দিদা রাধারাণী দেবীর নাতি রনো হাওড়া স্টেশনে এসেছিল ওঁর হয়ে একটি বিদায় উপহার দিতে। সেই প্রথম বাপ্পা রনোকে দেখল। রাত্রিবেলা আলো ঝলমলে হাওড়া স্ট্রেশনে রনোমামার সাদা মার্বেলের মতো ত্বক, মাথাভর্তি কোকড়ানো চুল, গোলাপি ঠোঁট আর কাটা কাটা চোখমুখের সৌন্দর্যে দেবদূতের মতো দেখাচ্ছিল। অনেককাল পরেও বাপ্পার স্পষ্ট মনে থাকবে, সেই সন্ধ্যায় রনোমামার পরনে ছিল ব্রাউন অ্যান্ড পলসন কোম্পানির স্ট্রবেরি কাস্টার্ড রঙের টিশার্ট আর ভ্যানিলা কাস্টার্ড রঙের ট্রাউজার্স। সেদিনই স্টেশন থেকে সোজা ওদের বাড়ি গিয়ে জীবনে প্রথম সেই কাস্টার্ড খাবে সে, এবং জানতে পারবে রনোমামার মা মেমসাহেব।

প্ল্যাটফর্মের পরিবেশে রনোমামাকে এত অন্যরকম দেখাচ্ছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর চারপাশে জমে গেল ভিখিরি শিশুদের জটলা। ড্রাইভারের সঙ্গে এসেছিল সে, হাতে পশমী শালের বাক্স। জন্মচক্র থেকে মোক্ষলাভের আগে কাশীর প্রবল শীতে শাকম্ভরী দেবী যাতে কষ্ট না পান সেই কথা ভেবেই উপহারটি পাঠিয়েছিলেন রাধারাণী। রনো ওঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে বিশু ঠাকুর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল

‘দেখ কে এসেছে! সুনির্মলের ছেলে। কত বড়ো হয়ে গিয়েছে দেখ! আবার তোমার জন্যে শাল এনেছে, ওর ঠাকুমা পাঠিয়েছেন।’

বৃদ্ধা যান্ত্রিক আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ডান হাতটা তুললেন, কিন্তু স্টেশনের কোলাহলে বিশুর কণ্ঠস্বর ওঁর কানে পৌঁছল কী না মুখ দেখে বোঝা গেল না। রনো যখন শালের প্যাকেটটি এগিয়ে দিল, উনি ঠিক গ্রহণও করলেন না প্রত্যাখ্যানও করলেন না, দুটি আঙুল ছোঁয়ালেন কেবল। বিশু প্যাকেটটা রাখল ওঁর কোলের ওপর।

সেইসময় বাপ্পা সদ্য অক্ষর চিনতে শিখছে। অনেককাল পরেও তার মনে থাকবে—প্যাকেটের ওপর লেখা ছিল— ‘কমলালয় স্টোর্স’, আর এক নারীর রেখাচিত্র ছিল সুচিত্রা সেনের মুখের আদলে।

শাকম্ভরীকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে বিশুকা কামরার ভেতর জানলার ধারে বসিয়ে দিল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে শিউলি বাপ্পাকে দুহাতে তুলে ধরল, বৃদ্ধা জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বিশুষ্ক আঙুলে ওঁর মুখমন্ডল স্পর্শ করলেন। কপালে গালে আঙুল বুলিয়ে ব্রেল অক্ষরের মতো বিগত জন্মের লিখন পড়ার চেষ্টা করলেন বলে মনে হলো। কিন্তু পারলেন না। এরপর ট্রেনটা চলতে শুরু করল। শিউলি বাপ্পাকে প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে ঠোঁটের ওপর রুমাল চেপে ধরল, চোখে টলটল করছে জল।

অনেককাল পরে সেই দৃশ্যের প্রতিটি অনুপুঙ্খ যখন স্মৃতিতে ভেসে উঠবে, বাপ্পার মনে হবে সেই চোখের জলে বিষাদের সঙ্গে মিশেছিল কৃতজ্ঞতাও। তার মাত্র কয়েক বছর আগে অন্তর্জলীযাত্রায় যাবার আগে চিরবিদায় জানাবার যে সুযোগ ফস্কে গিয়েছিল টিকিট চেকার অভয় চরণ ঘোষালের জন্য, ভাগ্য সেই সুযোগ করে দিল। জানলায় বৃদ্ধার ভাবলেশহীন মুখ সরে যাচ্ছে, সবুজ পতাকা নাড়ছে গার্ডসাহেব, এদিকে রনোর গোলাপি জামার ঝুল ধরে টানছে এক ভিখিরি শিশু। ওই কামরাটা প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্ত ছেড়ে যাবার ঠিক আগের মুহূর্তে দেখা গেল সেই বিশীর্ণ হাত, জানলা গলিয়ে ফেলে দিল সেই শালের বাক্সটা। সুচিত্রা সেনের মুখ আঁকা বাক্সের ঢাকাটা ছিটকে সরে গেল, মুহূর্তে ভিখারি শিশুদের মধ্যে থেকে একজন ছুটে গিয়ে ছোঁ মেরে তুলে নিল, দলের অন্যেরা ধেয়ে আসার আগেই মিলিয়ে গেল লাল সবুজ সিগন্যালের আলোয় ফর্দাফাই অন্ধকারে। বাপ্পা ঘাড় ফিরিয়ে দেখল রনোমামার মুখমন্ডল গোলাপি হয়ে উঠেছে, ঠিক ওর জামার মতো। হঠাৎ বাপ্পার ভীষণ ভালোবাসতে ইচ্ছে হলো ওকে।

এরপর ওরা রনোদের চামড়ার গদি মোড়া হলুদ স্টুডিবেকারে চড়ে হাওড়া ব্রিজে বাস ট্রাম ঠেলাগাড়ি ছ্যাকরাগাড়ির জটলা ঠেলে ভেসে ভেসে বাগবাজারে ওদের বিশাল বাড়িতে গেল।

তার আগের বছর ক্রিসমাসে শিলং থেকে চিনিকাকা এলে বাবা-মায়ের সঙ্গে পার্ক স্ট্রিটে রেস্তোরাঁয় গিয়ে ফ্রুট কাস্টার্ড খেয়েছে বাপ্পা। সেই স্বপ্নের সুখাদ্য যে বাড়িতেও তৈরি করা যায় সেটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। এছাড়া রনোমামার নিজস্ব ঘরে কাচের শোকেসে ওর সদ্য-ছেড়ে আসা ছেলেবেলার নানান আশ্চর্য বিলিতি খেলনার মধ্যে আস্ত একটি রেলগাড়ি ছিল। তার রুপোলি ইঞ্জিন, লাল কামরার ভেতর ক্ষুদে পুতুল যাত্রীরা বসে আছে। বন্দর-হুগলি থেকে সাতগাঁয় যাবার রেলগাড়িটার থেকেও ঢের বেশি সত্যিকারের, তার কারণ সেই কল্পনায় কোনো খাদ নেই, বাস্তবের বাধা নেই। এছাড়াও ছিল নানান রঙের আকারের অনেকগুলো ক্ষুদে ডিঙ্কি মোটরকার— এত ছোট্ট অথচ এত নিখুঁত আর অনুপুঙ্খ জীবনানুগ, হাতের তালুতে নিলে বুকের ভেতরটা আনন্দে মোচড় দিয়ে ওঠে।

‘এর মধ্যে তোর যেটা খুশি বেছে নিতে পারিস!’ রনোমামা বলল।

‘সেটা আমার হয়ে যাবে?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, সেটা আমি তোকে দিয়ে দেব। তুই বাড়ি নিয়ে যাবি!’

পলসন মাখন রঙের রোলস রয়েস গাড়ি, তার বনেটের ওপর ছোট্ট রুপোলি মাছির মতো পরী। বাপ্পা সেটা হাত তুলে নিয়ে মায়ের দিকে তাকাতেই দেখে শিউলির চোখে সেই চেনা দিব্যি কাটা চাহনি। খেলনাটা নামিয়ে রাখে বাপ্পা।

‘নিবি না? কী হলো? তোর একটাও পছন্দ হলো না?’ রনোমামা বলে।

বাপ্পা মাথা নাড়ে, প্রবল মনোকষ্টে ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। তবে সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না, কারণ এরপর ওর সম্পূর্ণ মনোযোগ গিয়ে পড়ল বড়ো চাকা-লাগানো চেয়ারের মতো গাড়িটায়, যাতে চড়ে বসেছিলেন মায়ের কলকাতার দিদা, রাধারাণী দেবী। ওই গাড়িতে চেপে চাকা ঠেলে ঠেলে চকমিলানো মেঝের ওপর দিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান বিশাল বাড়িটায়, যার প্রতিটি ঘরে নানান শৌখিন ঘর সাজানোর জিনিস, দেয়ালে দেয়ালে রংতুলিতে আঁকা ছবি আর ফোটোগ্রাফ। তাদের মধ্যে একজন কোট-পরা গম্ভীর অভিমানী মুখের বয়স্ক পুরুষের ছবির সামনে বাপ্পাকে নিয়ে এসে হাত জোড় করে প্রণাম করতে বলে শিউলি।

‘উনি তোমার কে হন বলো দিকি?’ চেয়ারগাড়িতে বসেই বৃদ্ধা মিষ্টি করে হেসে জিজ্ঞেস করেন। তারপর নিজেই উত্তরটা বলে দেন। ‘উনি তোমার এক বৃদ্ধ প্রপিতামহ। তার মানে কে হন বল দিকি? বলতে পারলে না তো? তার মানে উনি হলেন তোমার সাতগাঁর দাদুর খুড়দাদু।’

উনি পাগলরাম চক্রবর্তী, আদিরাম প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা। শিউলির নির্দেশে এরপর তাঁর পাশে জড়োসড়ো এক-গা গয়না পরা নারীর ছবিতে— সাদাকালো ছবিতেও যাঁর সিঁথিতে সিঁদুরের মতো লাল দাগ টানা- হাত জোড় করে প্রণাম করার পর, এবং তারপর আরেকজন টুপি আর স্যুট-পরা সুদর্শন পুরুষের ছবিতে প্রণাম করার পর শিউলির নির্দেশ ছাড়াই বাপ্পা লংকোট পরা এক নারীর ছবিতে প্রণাম করতেই খিলখিল করে মুক্তোর মতো দাঁত বের করে— পরে বাপ্পা জেনেছিল দাঁতগুলি নকল— হেসে উঠলেন মায়ের কলকাতার দিদা।

‘ওই ছবিটায় আর কিছুকাল পরে প্রণাম কোরো!’

শিউলি লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে আলতো স্নেহের চাঁটি মারল ছেলের মাথায়। বাপ্পা জানতে পারল ছবিটি ওঁরই, অনেককাল আগে দার্জিলিঙে তোলা। পাশের সুদর্শন পুরুষটি ওঁর প্রয়াত স্বামী।

অসংখ্য মানুষের ফ্রেমে বাঁধানো ছবিগুলোর প্রায় সব কটিই পুরুষের। তাদের কারোর পরনে কোটপ্যান্ট, কারো বা ধুতি-কুর্তা, কারোর একমাথা ঘন চুলদাড়ি, কারোর থুতনিতে বাবুইপাখির বাসার মতো দাড়ি, চোখে ডাঁটিবিহীন তারের চশমা, কারোর মাথাজোড়া টাক, কঠোর চোয়াল, কারোর টাকের ওপর গান্ধীটুপি, এক মেমসাহেবের সঙ্গে রসিকতা করে হেসে কুটিপাটি হচ্ছেন। রনোমামার মেমসাহেব মায়ের কোনো ছবি দেখতে পায়নি বাপ্পা, কিন্তু ওর বাবার ছবি দেখেছিল: কলকাতার রাস্তায় জনসমুদ্রে ভাসমান একটি ট্রাক, তার ওপরে ফুলের মালা গলায় দুই মোটাসোটা সাহেব হাত নাড়ছে, তাদের পাশেই আরও অনেকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রনোমামার বাবা সুনির্মল, তারের ফ্রেমের চশমা পরা এক তরুণ।

অনেককাল পরে সেই বাল্যস্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বাপ্পাদিত্য বুঝতে পারবে সেটি ছিল বুলগানিন ও ক্রুশ্চেভের কলকাতায় আসার ছবি। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় ছবির তরুণটির সঙ্গে বাস্তবের মানুষটির কোনো মিল খুঁজে পেল না সে। বরং ওঁর খড়্গের মতো নাক আর ঘন ভুরু দেখে বাপ্পার মশাইয়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ওঁর নাকটা এতটাই খাড়া আর ভুরু এতটাই ঠেলে ছিল কপালের সামনে, যে মনে হচ্ছিল তার ছায়ায় মুখটাই বুঝি হারিয়ে যেতে বসেছে। তাঁর পরনে ছিল ভেলভেটের ড্রেসিং গাউন, ঠোঁটে জ্বলন্ত পাইপ। দোতলায় ওঁর দেয়ালজোড়া বইয়ে ঠাসা ঘরে গিয়ে প্রণাম করতে যেতে উনি অন্যমনস্কভাবে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের নীচে থেকে পা দুটো বাড়িয়ে দিলেন, পায়ে বাঁকানো গোঁফের মতো চামড়ার চটি, পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে দুটো-তিনটে কথা বললেন শিউলির সঙ্গে। এরপর সেই হলুদ স্টুডিবেকার ওদের পৌঁছে দিয়েছিল কলুটোলা লেনের মুখ পর্যন্ত। বাসায় ফিরে ঘরগুলো কেমন ছোট্ট আর আলোগুলো কেমন ম্রিয়মাণ মনে হচ্ছিল বাপ্পার। শিউলি রথীনকে ভাত বেড়ে দিতে দিতে বলল—

‘ওরা তোমার কথা খুব জিজ্ঞেস করছিল। এরপর একদিন তোমায় ওবাড়িতে নিয়ে যেতে বললেন দিদা।’

‘যে বাড়ির দেয়ালে নাকি কার্ল মার্ক্সের পাশে নেহরুর ছবি ঝোলে সে বাড়িতে যাবার কোনো ইচ্ছে নেই আমার!’ রথীন বলল।

কার্ল মার্কস আর জওহরলাল নেহরু যে ব্যক্তিগতভাবে একে অপরের শত্রু ছিলেন না, এমনকি দুজনে একই সময়কালেরও ছিলেন না, সেটা জানতে বাপ্পাকে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হবে। দেশভাগের প্লাবনে খোলামকুচির মতো ভেসে আসা রথীনের নেহরুর প্রতি বিদ্বেষের কারণ জানতেও।