সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১২.৭
১২.৭
দিদার সঙ্গে ঘাটে এসে জলে-ডোবা তিন নম্বর সিঁড়িতে দেহটা ভাসাতে শিখেছিল। এতদিনে অনেকটা লম্বা হয়েছে বাপ্পা, এখন পাঁচ কিংবা ছয় নম্বর সিঁড়িতে নেমে দেহটা জলের হাতে ছেড়ে দিলে আগের মতোই নদী জড়িয়ে নেয়, ভাসিয়ে নেয়। বিশ্বস্ত জলচাপ ওপর দিকে ঠেলে তোলে। তখন ঘাড় বাঁকিয়ে মাথাটা ডুবিয়ে দিলে বন্ধ চোখের তারায় সবজে-গোলাপি আলোর বিন্দু নাচে, জিভে তামার মতো স্বাদ ফিরে আসে, কানে ভোঁ ভোঁ করে ক্রিস্টাল রেডিওর স্ট্যাটিক। শত শত কন্ঠস্বরে জলে-জলে বার্তাবিনিময় চলেছে।
হার্লে ডেভিডসনকে নিয়ে যেতে লোহালক্কড়ের ডিপো থেকে যে তিনটি ছেলে এসেছিল, ওরা তিনজনেই নদীতে নামে দুপুরের পর। তখন ঘাটগুলো নির্জন হয়ে আসে। নীল চোখ, সোনালি চুলের ছেলেটার নাম কটা। অন্য দুজন ভুট্টো আর বলা।
কটার মতো বর্গিব্যাটারির উঁচু দেয়াল থেকে জলে হেডিয়াল ঝাঁপ দিতে পারে না বাপ্পা। কিন্তু বলা আর ভুট্টোর পাশে পাশে ভাটার স্রোতে হাত টেনে টান কাটাতে শিখে গেল দিন দুয়েকের মধ্যেই। এরপর যেদিন সে ওদের মতো চিত হয়ে হাত পা দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিয়ে শ্বাস ছেড়ে ভেসে থাকা অভ্যাস করল, মনে হলো এ এক আশ্চর্য। এখন আর দম হারানোর ভয় নেই। এখন সাঁতারে পরের পর ঘাট ছাড়িয়ে যত দূরে খুশি চলে যেতে পারে, হাঁফ ধরে গেলে জলেই ভেসে ভেসে দম নিতে পারে যেন দূর আকাশে স্থির ডানা মেলে ভেসে আছে চিল! হাত পা একটি বারের জন্যেও না নেড়ে, দেহটা স্রোতের হাতে ছেড়ে দিয়ে কচুরিপানার মতো, খড়ের কাঠামোর মতো ভাসতে ভাসতে যেতে পারে। মাথার ওপর বিস্তীর্ণ ব্রোঞ্জরঙা আকাশটা ঘুরছে, ওপর থেকে ঝরছে রুপোরঙা আগুন, নদীর পাড় ঘাট মন্দির গাছ চক্রবাল চর সব কিছু ঘুরে চলেছে। নিজেকে নদীর অংশ বলে মনে হয়। ক্রমশ অচেনা আধোচেনা দেহের মতো তার প্রতিটি খাঁজ ভাঁজ, তার বিবিধ বাঁকা স্রোত, চোরা স্রোত, ডুবো জল-চরা, ঘোল ও ঘুর্ণির ফাঁদগুলো চিনতে শিখে যায় বাপ্পা।
.
একদিন দুপুরে কটা এল না। ভুট্টো বলল–‘কটা দোআঁশলা, জানিস তো?’
‘সেটা আবার কি?’ বাপ্পা বলে।
‘তুই দেখি আচ্ছা গাড়ল! তুই দোআঁশলা মানে জানিস না?’
বাপ্পা জানল দোআঁশলা হলো সে, যার দেহে ফিরিঙ্গি রক্ত বইছে। কটার বাড়ি পোর্তোহাটায় দোআঁশলাদের পাড়ায়। বাবা নেই, মা রয়েছে কেবল। বাবা খাঁটি ফিরিঙ্গি ছিল নাকি দোআঁশলা, সেটা অবশ্য ভুট্টো জানে না।
তাপ্পি-মারা গাড়ির টিউবটা কটা লুকিয়ে রাখে বর্গিব্যাটারির ভেতর। বারুদঘরের পেছনে লানটানার বন, নীচে দিয়ে সরু যেন শিয়াল চলাচলের মতো পথ। কিছুটা এগোলে একটা খিলানের নীচে সিঁড়ির ধাপ নেমেছে। কয়েক পা নেমে পাতালকুঠুরি। কিছু দেখতে পাবার আগে নাকে চিমসানো গন্ধ এসে লাগে, একটানা বিজবিজ -বিজবিজ শব্দ।
দেশলাই জ্বেলে পুরোনো খবরের কাগজে আগুন ধরায় কটা। বাপ্পা দেখে, কটার স্বচ্ছ কাচের মার্বেলের মতো চোখের মণি। ছাত থেকে গাছের জীবন্ত শেকড় নেমেছে। মেঝের একদিক ঢালু হয়ে কালো জল জমে আছে, তার ওপর অসংখ্য পোকা বিজিবিজ শব্দ করছে।
আগুনের আভায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা যায় ছোটো হনুমানমূৰ্তি, হলদে-হয়ে-যাওয়া পোস্টারে মানুষের মুখ। নিউজপ্রিন্টে ছাপা কালি ঝাপসা হয়েছে, মুখগুলো চেনা যায় না। নীচে লাল স্টেনসিলে লেখা:
MOST WANTED! MOST WANTED! MOST WANTED!
.
এখন রোজ দুপুরের পর ভাটা ঘুরে গিয়ে জোয়ার আসে। বাড়িতে লুকিয়ে গামছা আনতে শুরু করেছে বাপ্পা। কটাদের মতো পায়ের হাওয়াই চটিজড়ো গামছার ভেতর দিয়ে গলিয়ে কোমরে বেঁধে নেয়, তারপর জলে নামে।
রূপদাসবাবুর ঘাট থেকে চল্লিশ হাত দূরে সনাতনের ঘোল, মসৃণ স্থির জল, দেখে মনে হবে যেন জলত্বকে শুকিয়ে যাওয়া পোড়া ক্ষত। আরও কিছুদূর ভাটির দিকে যেখানে হুগলির খাল, খাতের মাঝবরাবর বালির চর জেগে থাকে। ওপরে শর ঘাস আর কাশের বন, দু-তিনটে গাব আর গাম্বেল গাছ। শুখা মরশুমে ওপারের গ্রাম থেকে চরুয়ারা গরু মহিষ নিয়ে আসে। এবারে গরমের শুরুতে জল বেড়ে উঠে চরটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে পড়েছে।
চরে মানুষ সমান উঁচু শরের বন, এখন জনমানবহীন। নানান জাতের বক আর মাছশিকারি পাখি গাম্বেল গাছের ডালে বাসা বাঁধে। কটারা সাঁতার দিয়ে চলে যায়, পাখির ডিম চুরি করে এনে ইটভাটায় গরম বালিতে গুঁজে সেঁকে নেয়। বাপ্পার খুব ইচ্ছে একদিন চড়ায় যাবে। কিন্তু মাঝনদীতে স্রোত কেটে অতটা সাঁতরে যাবার মতো দম নেই।
কটার বিচিত্র সৌন্দর্যের মধ্যে এক উদাসীন নিষ্ঠুরতা লক্ষ করে বাপ্পা। সাঁতার কাটতে কাটতে আচমকা ডুব দিয়ে খেলাচ্ছলে পা দুটো টেনে ধরে। নাকে মুখে জল ঢুকে জ্বালা করতে থাকে, দুচোখে ঝিলমিল দেখে বাপ্পা। পরক্ষণেই ওকে ছেড়ে দিয়ে ভুস করে ভেসে ওঠে কটা, হাত দিয়ে মুখের জল মুছে হেসে ওঠে দেবদূতের মতো। মুখ ভর্তি জল ফোয়ারার মতো ছিটিয়ে দেয় বাপ্পার গায়ে।
ত্বকে উষ্ণ জলের স্পর্শ, জলকণায় পলকা রামধনু।
‘তুই শালা শুদ্দুর হয়ে বামুনের পো-র গায়ে এঁটো জল ছিটিয়ে দিলি?’ ভুট্টো দাঁত বের করে বলে।
‘বামুনের পো-কে শুদ্ধ করে দিলাম!’ কটা বলে।
‘শুধু শুদ্দুর নয়, শালা দোআঁশলা!’ বাপ্পা বলে।
‘কী বললি? কী বললি?’ এই বলে লাফ দিয়ে এসে কটা হাসতে হাসতে বাপ্পার দুটো কাঁধ চেপে জলে ডুবিয়ে ধরে, দম বন্ধ হয়ে বুক ফেটে যাবার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ছেড়ে দেয়। অসহনীয় মৃত্যুযন্ত্রণার পর ভেসে উঠে ফের আকাশ দেখে বাপ্পা। সজীব উজ্জ্বল পৃথিবীতে বুক ভরে শ্বাস নেয়। মনে মনে দিব্যি কাটে –কাল থেকে আর আসবো না! আর এদের সঙ্গে মিশবো না।
কিন্তু কী যে অপ্রতিরোধ্য টান দুপুরে চড়া রোদে নদীর ঠান্ডা কাকচক্ষু জলের কী যে নেশা দীর্ঘ দুপুর নরম কাদায় পড়ে থাকার, সর্বাঙ্গে টাটকা পলির লেপ দিয়ে আঘাটায় গড়াগড়ি যাবার। আর তারপর রোদের তাপে চামড়ায় কাদার লেপ যখন ফুটিফাটা হয়েছে, ঘাটের উঁচু রানায় উঠে ছুটে এসে জলে ঝাঁপ দিয়ে নিমেষে গা থেকে কাদা গলে ধুয়ে যাবার।
গান টাওয়ারের ছাতে কড়া রোদ, হাওয়ায় শুষ্ক টান ধরেছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই ভিজে হাফপ্যান্ট সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। বাড়িতে কেউ টেরও পায় না দুপুরের পর বাপ্পা কোথায় যায়।
.
সাঁতার কাটলে রাক্ষসের মতো খিদে পায়, তারপরে পায় ঘুম। ঘুমের ভেতর চরের স্বপ্ন দেখে বাপ্পা। ঘন শরবনের মাঝে জল, ছোটো ছোটো তেচোখো মাছের ঝাঁক ভেসে বেড়াছে, গাম্বেলের নীচু ডালে পানকৌড়ির স্থির ডানা ছাতার মতো দুপাশে ছড়ানো। ঘুম ভাঙে যখন গ্রীষ্মের দীর্ঘ বেলা মরে এসে সন্ধ্যা হয়েছে। মাথার চুলে মিহি সাদা বালি, জলে রোদে হাত পায়ের চামড়া কালচে খসখসে– মনে হয় যেন অন্য কারোর।
আদিরামবাটিতে সন্ধ্যায় জলখাবারের পাট নেই। নতুনবউ কানাইয়ের জন্য শোবার ঘরে স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে ডিম সেদ্ধ করে। বাপ্পা তার ভাগ পায় না, বিশুকা জানে। ওর জন্য প্রসাদী ফল বাতাসা সরিয়ে রাখে। কিন্তু এসব এই বয়সের ছেলেদের মুখে রোচে না। মাঝে মাঝে হিন্দুস্থানির দোকান থেকে গরম আটভাজা কিনে আনে, সন্ধ্যাবেলা পড়তে বসে বাপ্পা কানাই যাতে খেতে পারে।
সন্ধ্যাবেলা বারান্দায় মাদুরে কানাইয়ের পাশে বসে বাবার দেওয়া হোমটাস্কের খাতা খোলে বাপ্পা। কী পড়ল, কতদূর পড়ল, সারা দিনে কী কী করল সেসবের কথা সবিস্তারে চিঠির আকারে লিখে রাখতে বলেছে রথীন। কিন্তু কী লিখবে? ভেবে পায় না বাপ্পা। ওর মনের মধ্যে রয়েছে যে বাবা, আর যে বাবার সঙ্গে ক্বচিৎ দেখা হয়, উত্তরবঙ্গে আসা-যাওয়ার পথে বন্দর-হুগলিতে বাপ্পাকে নিতে-ছাড়তে আসে যে, যেন দুজন ভিন্ন লোক। অনেক দূরে খুব বড়ো আর অচেনা এক ট্রাজেডির ভেতর নিজের দুঃখকে হারিয়ে ফেলতে চাইছে লোকটা।
কলম সরে না, হোমটাস্কের খাতা খোলা থাকে, চোখের সামনে জলের খন্ডদৃশ্য ভাসে। বালবের আলোর বৃত্তে উচ্চিংড়ে মথ ঘুরঘুরে পোকা উড়ে আসে। শীতলপাটির ওপর ঝুঁকে একঘেয়ে গলায় পড়া মুখস্ত করতে থাকে কানাই। সারা সন্ধ্যা ধরে একটাই লাইন দুলে দুলে পড়তে গিয়ে কানাইয়ের চোখ বুজে আসে, পাঁচিলের ওপাশে কুয়োর ব্যাঙের কলতান শুরু হয়, জল ছেটানো শীতলপাটির সোঁদা গন্ধ ওঠে। বাপ্পা হেমন্তমামার দেওয়া বইয়ের পাতা উলটোয়, রঙিন ছবিগুলো দেখে।
পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে কানাই, কষ বেয়ে লালার সুতো চিকচিক করে। রাতে খেতে বসে বলে–
‘তোর কানের পেছনে মাটি লেগে আছে কেন রে বাপ্পাদাদা?’
বিশুকা ভুরু কুঁচকে তাকায়, মুখে কিছু বলে না। পরদিন পুজো সেরে বাপ্পার হাতে ফল-নকুলদানা দিল, আর দিল ওর মায়ের একটা চৌকোনা সাদা-কালো ফোটোগ্রাফ। বিয়ের আগে তোলা ছবি, ঝাপসা হয়ে এসেছে।
‘তোর মায়ের এই ছবিটা খুঁজে পেলাম, তোর কাছে রেখে দে। আমার দিদিটার কোনো ছবি খুঁজে পাইনি জানিস।’ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বিশুকা বলে— ‘তোর বাবা কাছে নেই, এখানে শাসন করার কেউ নেই। তোকে আমি সাঁতার শেখাতে পারিনি। একটা জিনিস জানবি, জীবনটাও একটা সাঁতার। ভাসতে হবে, কিন্তু মাথা উঁচু করে ভাসবি। এই বাড়িটা যেমন তোর মামার বাড়ি, আমারও মামার বাড়ি। আমি তুই কেউ এ-বাড়ির ছেলে নই, এটা যেমন সত্যি তেমনি এটাও সত্যি রামাচার্য থেকে শুরু করে রামাই পণ্ডিতের রক্ত তোর আমার শরীরে বইছে।’
সাঁতার কাটতে যাবার ব্যাপারটা বিশুকা কী করে টের পেয়ে গেল? কাঁপা কাঁপা হাতে ভেলভেটের বটুয়ার ফাঁস খুলে ভেতর থেকে একটি সুলতানি তামার মুদ্রা বের করে বাপ্পার হাতে দেয়—
‘এ হলো আমার বালগোপালের দান, তোকে দিলাম। এইটা সবসময় কাছে রাখবি, তাহলেই যা বললাম সব মনে থাকবে।’
.
আদিরামবাটিতে দিবানিদ্রা এক অবশ্যপালনীয় আচার। মন্দিরে দেবতা আদিরাম, ঠাকুরবাড়ির উনত্রিশ বিগ্রহরাও দুয়ার এঁটে ঘুমোন। যখন অনেক লোকজন ছিল, দুপুর পড়ে এলে দাদু চেম্বার থেকে ফেরার পর বাড়িটা নিজঝুম হয়ে পড়ত। চিন্তামণি চারপায়ে খাড়া হয়ে ঘুমোতো, অ্যান্টনি একটা পা পেটের পালকের মধ্যে গুঁজে ঘুমোতো। এখনও নিম গাছের ডালে কাক চোখ বন্ধ করে ঠোঁট ফাঁক করে ঘুমোয়, এল-ডোরাডোয় পায়রার বকবকম থিতিয়ে আসে। দক্ষিণের বারান্দায় গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটায় টং টং করে তিনটে বাজে, ঝাঁ ঝাঁ রোদে তাপবাস্পে মন্দিরের দোচালা দোলে যেন জলের নীচে ডুবো জাহাজ। তার চাতালে ফাটলে নালসো পিঁপড়ে ছুটোছুটি করে। দোতলায় নতুনবউয়ের রেডিও থেমে যায়, দক্ষিণের ঘরে ক্রিস্টাল রেডিওর ধ্বনি ছাপিয়ে শোনা যায় ধাতব খুট খুট শব্দ। কাজ করে চলেছে হেমন্তমামা।
নদীটা বাপ্পাকে নিশির মতো ডাকে।
.
দুপুরে নদীর বুকে হাওয়া শুরু হয়। টিউবের ওপর দেহটা এলিয়ে দিয়ে বাপ্পা দুপাশে হাত ছড়িয়ে মন্থর ডানার মতো ঝাপটাতে থাকে, কটা ওর উরু দুটো দুহাতে জড়িয়ে ভেসে পেছন দিকে পা ছোঁড়ে। দুজনে মনে হয় যেন একটিই দেহ, এই জলকাদার পৃথিবীতে আর কিছু নেই, কেউ নেই। কখনো টিউবে পা গলিয়ে মুখোমুখি বসে গামছাটা পালের মতো করে দুদিক থেকে ধরে থাকলে উজানে ভেসে যাওয়া যায়। ভাসতে ভাসতে পর পর স্নানের ঘাট ছাড়িয়ে, ব্যাটারিকুঠি ছাড়িয়ে, সুলতানি টাঁকশালের ভগ্নস্তূপ ছাড়িয়ে পর্তুগিজ ফটকের মাথা ছাড়িয়ে ক্রমশ ফসলের ক্ষেত, মাছের জাল, ক্ষেতের কাটা খাল পেরিয়ে গেলে দূরে দেখা যায় গাজির বাগানের সবুজ রেখা। ভাটা পড়লে ফিরতি স্রোতে ফিরে আসে।
ততক্ষণে ঘাটগুলো সম্পূর্ণ নির্জন হয়ে পড়েছে। ছিপ হাতে বসে আছে একলা মানুষ, বিড়ি টানছে। খালের বাঁক ছাড়াতে ছাড়িগঙ্গার দহ, শরতে দুর্গাপুজোর ১০৮ নীল পদ্ম আসত এখান থেকে। বাঁশ পুঁতে জালের ঘের দেওয়া হয়েছে।
‘কর্তা, আছে নাকি?’ বাপ্পা মুখের দুপাশে হাত জড়ো করে চিৎকার করে।
ভ্যারেন্ডার ঝোপে বাঁধা ডিঙি থেকে বাপ-ব্যাটা চোখ সরু করে থাকায়। ছইয়ের গায়ে লাল গামছা মেলা। উত্তর দেয় না।
.
বেলা পড়ে এলে মাটি-কাটা কামিন মেঝেনরা জলে নামে, তাদের কাচা রঙিন শাড়িগুলো সিঁড়িতে পর পর চাঁদোয়ার মতো মেলা। বুকের ওপর শায়া বেঁধে ডুব দেবার সময় ফুলে ওঠে বেলুনের মতো। ওরা খিলখিল করে হাসে, একে অপরের গায়ে জল ছিটোয়, মাথার চুল চুড়ো করে বেঁধে দুহাতে জল সরিয়ে ঘাটের কোল ঘেঁষে সাঁতার কাটে।
সর্বাঙ্গে কাদা মেখে ভুট্টো ছুটে এসে উঁচু রানা থেকে ডিগবাজি খেয়ে জলে ঝাঁপ দেয়, ডুব সাঁতারে কামিনদের মাঝে চলে গিয়ে ভেসে ওঠে শুশুকের মতো। ওরা চিৎকার করে গালি দেয়। পরস্পরকে নগ্নতার আব্রু দিয়ে আড়াল করে, শায়ার রশি দাঁতে চেপে নীচু হয়ে সিঁড়িতে কাপড় আছড়ায়, ঊর্ধ্বাঙ্গ উদোম হয়ে পড়ে।
বর্গিব্যাটারির গানটাওয়ারের আলশের ধারে বসে জলে ডুব দিয়ে কী দৃশ্য দেখেছে তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দেয় ভুট্টো।
‘গুল দিচ্ছিস!’ বাপ্পা বলে। ‘জলের ভেতরে কিছু দেখা যায় না।
‘বিশ্বাস করছিস না? কটাকে জিজ্ঞেস কর।’ ভুট্টো বলে।
‘কটা জলে ডুব দিয়ে ঘাটের সিঁড়ির ফাঁকে কোথায় চিংড়ি বাসা বেঁধে আছে দেখতে পায়,’ বলা বলে।
কটা কিছু বলে না, দেশলাই ঠুকে বিড়ি ধরায়।
ভুট্টো ওর হাফ প্যান্টের বোতাম খুলে নিজের যে অঙ্গটা ধরে টানাটানি করে, সেটা কেরেস্তান গোরস্তানে দেখা তেকোনা টুপি পরা সাহেবটার মতো নয়। কুয়োর শাপগ্রস্ত ব্যাঙের কথা মনে পড়ে বাপ্পার।
‘এক ফোঁটা বীর্য মানে কিন্তু আশি ফোঁটা রক্ত’ বিজ্ঞের মতো বলে বাপ্পা।
‘ধুস! রোজ টেনে না বের করে দিলে ঘুমের মধ্যে ঝরে যায়,’ ভুট্টো বলে।
কিন্তু অনেক টানাটানি করেও কিছুই বের করতে পারে না। হতাশ হয়ে বিড়িতে টান দিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়ার চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে বাপ্পার কাঁধ খামচে ধরে ওর ঠোঁটের ফাঁকে বিড়িটা গুঁজে দিতে চায়।
‘ছাড়! ছাড় আমায়!’
বাপ্পা এক ঝটকায় মুখটা সরিয়ে নিতেই কটা আচমকা এক হাতে ওর চোয়াল চেপে ধরে, অন্য হাতে জ্বলন্ত বিড়িতে টান দিয়ে বাপ্পার ঠোঁটের ওপর ঠোঁট চেপে ধরে মুখের ভেতর ধোঁয়া ভরে দেয়। কাশতে কাশতে বাপ্পা দেখে কটার নীলচে চোখের মণিতে সেই নিষ্ঠুর ঝিলিক। কাশির দমকে চোখে জল আসে, কটা ওর পিঠে চাপড় মারতে যেতে হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেয় বাপ্পা।
তখন সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমে, আকাশে তপ্ত কমলা রং ধরেছে। ওদের মাথায় মিশরীয় মুকুটের মতো মশার স্তম্ভ জাগছে।
*
সাতগাঁইয়াদের কাছে ত্রিবেণীর নীচে সরস্বতীই হলো প্রকৃত গঙ্গা, হুগলি এক অর্বাচীন ফিরিঙ্গি নদী। সরস্বতী মুমূর্ষু, সাতগাঁ বন্দরও মৃত। তাতে কী? একদা বিখ্যাত নদী যেন নিকট জ্ঞাতি, এককালে সুদিন ছিল এখন পড়তি দশা। সারা দিন সে বসে থাকে সদর দরজায় সিঁড়ির ধাপে, ঘোলাটে নিস্পৃহ চোখে রাস্তা দিয়ে অবিরাম জীবনের স্রোত দেখে। শীর্ণ অশক্ত দেহটা যেমন মানুষটা নয়, শীর্ণ মজা খাতে বয়ে চলা ধারাটাও নদী নয়। সে হলো এক স্মৃতির প্রবাহ এত এত প্রাণকে সে বয়েছে এত কাল ধরে, এত গোপন ইচ্ছা, সংকল্প, এত ভোরবেলায় দেখা সুখস্বপ্ন, ফিসফিস করে বলা, এত অভিশাপ আর অসূয়া কাছের দূরের মানুষের প্রতি। এক প্রবহমাণ সংবেদ।
বৈশাখ মাস পড়লে সাতগাঁর মানুষ বুক জলে নেমে নদীপুজো করে, ফল ভাসায়। ফলের লোভে কটাদের দলটা আঘাটায় এসে জুটেছে, কাদা মেখে জলে পড়ে আছে। আম, ফুটি, তরমুজ,পেঁপে ভেসে যাচ্ছে, ঝাঁপিয়ে গিয়ে তুলে আনে। তারপর ভিজে দেহে কাদায় বসে সেই ফল ভক্ষণের মজাই আলাদা। ওদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষিপ্ৰ কটা, সবার আগে সাঁতরে গিয়ে ছোঁ মেরে তুলে আনে ভেসে যাওয়া ফল। বাপ্পা পারে না বলা ভুট্টোদের মতো, কিন্তু কটাকে দেখায় কোনদিকে ভেসে যাচ্ছে কোন ফল। একটা বাতাবি লেবু দেখে চিৎকার করে উঠল—
‘জামবুরা! কটা, ওই দ্যাখ জামবুরা!’
একটা রামপুরিয়া ছুরি কোত্থেকে এনেছে বলা। ডাবের শাঁস কেটে বের করছিল, ভুরু কুঁচকে বাপ্পার দিকে তাকালো।
‘ওটাকে তুই জামবুরা বলিস নাকি?’
বড়ো গোলাকার লেবুটা জামবুরা, বাপ্পা ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছে কলুটোলা লেনে কাকা-জ্যাঠাদের মুখে। এ অঞ্চলে লোকে বাতাবি লেবু বলে মনে ছিল না।
‘তুই বাঙাল নাকি রে?’ বলা বলে।
‘বাঙাল! বাঙাল!’ ভুট্টো খোসাশুদ্ধু শসায় কামড় মেরে বলে। তারপর সুর করে আওড়াতে থাকে
‘বামুনের পো বাঙালের বাচ্চা!
বামুনের পো বাঙালের বাচ্চা!’
‘তোর পাছায় কাটাতারের দাগ আছে? দেখি!’ ভুট্টো বলে।
কটার দেওয়া তরমুজের ভাঙা টুকরোয় মুখ ডুবিয়ে খাচ্ছিল বাপ্পা, মুখ ভর্তি আঠালো লাল রস। থু থু করে বিচি ফেলে বলে–‘সেটা আবার কী? কাঁটাতারের দাগ থাকবে কেন?’
‘বাঙালদের থাকে তো!’ ভুট্টো বলে। ‘হামাগুড়ি দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া গলে এসেছিস না তোরা?’
‘ধ্যাৎ! আমার ওসব নেই!’
‘মিথ্যে কথা!’ আচমকা ফুঁসে ওঠে ভুট্টো। হাতের ডাবটা বলাকে দিয়ে বলে। —’এই ওকে চেপে ধর তো, ওর প্যান্ট খুলে দেখব!’
ভুট্টোর চোখে অন্যরকম চাহনি দেখে কাদার পাড় ছেড়ে উঠে পড়তে যায়, কিন্তু পিচ্ছিল কাদায় বলা কোমর ঘষে সাঁ করে এসে পা বাড়িয়ে দিয়ে কাঁচির মতো লেঙ্গি মারতেই মুখ থুবড়ে পড়ে যায় বাপ্পা। সেই ফাঁকে বলা পেছন থেকে ওর হাঁটু দুটো চেপে ধরে। ভুট্টো এসে ওর প্যান্টের কোমরে ইলাস্টিক খামচে ধরে টেনে নামাতে যেতে চিৎকার করে ওঠে বাপ্পা—‘ছাড়! ছেড়ে দে আমায়! আর কোনোদিন তোদের সঙ্গে মিশব না!’
ওরা দুজনে হেসে ওঠে। বলা আওড়াতে থাকে-
‘বামুনের পো বাঙালের বাচ্চা!’
আমার গলায় পৈতের জন্মদাগ আছে! আমি বর্ডার পার হয়ে আসিনি! চিৎকার করে বলতে গিয়ে বাপ্পার গলা বুজে আসে, চোখ ফেটে জল আসে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসায় দেখতে পায় না পেছন এসে দাঁড়িয়েছে কটা। বলাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ওর হাত থেকে ডাবের খোলাটা টেনে নিয়ে আঘাত করে ভুট্টোর পিঠে, বাপ্পার কাঁধ খামচে করে ওকে টেনে তোলে আঠালো কাদার থেকে। অতর্কিত আঘাতে পিছলে চিৎ হয়ে পড়ে ভুট্টো, বিস্ময়াহত গলায় বলে ওঠে
‘দোআঁশলা খানকির ছেলে! তুই আমায় মারলি?’
কাদায় হাতের চাপড় মেরে হি হি করে হেসে ওঠে বলা, অপেক্ষা করে কটার পরের প্রতিক্রিয়ার জন্য।
কটা কিছুই করে না। ভুট্টোর কথাটা কানে যায়নি এমন ভাব করে বাপ্পার দিকে তাকায়, ঠোঁটে সেই দেবদূতের মতো হাসিটা। বাপ্পার চিবুকে জলের ধারা, ডাবের নরম সাদা শাঁস ছিটকে এসে লেগেছে ওর বুকে। কটা এগিয়ে এসে মাথা নামিয়ে জিভ দিয়ে বাপ্পার বুকে স্তনবৃন্তের ওপর থেকে শাঁস চেটে নেয়।
*
দার্জিলিং থেকে ফিরে সেই যে তিতলি এল, তারপর দু-দুটো শনি-রবিবার চলে গেল। তিতলি হস্টেল থেকে আসেনি। বসন্তমামার কোনো ব্যাপারেই আর হুঁশ নেই। এই মানুষটাও নিজের ভেতরে কেমন গুটিয়ে গিয়েছে, যেন না-বলতে-পারা কথাগুলো পেটের মধ্যে জমতে জমতে ভুঁড়িটা আরও ফুলে উঠেছে। সাস্পেন্ডার বেল্ট ছাড়া ট্রাউজার্স পরতে পারে না আর। সকালে তো বটেই, আজকাল অফিস থেকে ফিরেও গামছা পরে পৈতে কানে জড়িয়ে কুয়োর চারদিকে পায়চারি করে, অন্ধকার নামার পরেও পায়খানায় গিয়ে বসে থাকে।
হেমন্তমামার ঘরের দরজা বন্ধ থাকে সারাদিন। দুপুরে রাতে শানকি চাপা দিয়ে ভাত ওর ঘরের বাইরে জলচৌকিতে রেখে আসে বামুনদিদা। মুখভর্তি গোঁফদাড়ির জঙ্গল, মলিন শতচ্ছিন্ন কোরা ধুতি পরে খুঁটটা গায়ে জড়িয়ে ভূতে-পাওয়ার মতো পায়চারি করে বাগানে, পেছনদিকে শিয়ালকাঁটার জঙ্গলে। রোজ বিকেলে একবার করে চলে যায় ডকবাজারে। নিবারণের দোকানে তার বরাদ্দ এক গ্লাস চা আর কোয়ার্টার পাউন্ড পাঁউরুটি।
দুপুরের পর আবার একটা কালবৈশাখী হলো, কোথাও বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়েছে। নিম গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে উঠোনে। কাল বুদ্ধপূর্ণিমা। বারান্দায় মাদুর পেতে হারিকেন জ্বেলে পড়তে বসেছে কানাই আর বাপ্পা।
কিছুকাল আগেও এইরকম সন্ধ্যাবেলা তালপাখা হাতে উঠোনে এসে বসতো বিশুকা, গল্পের ঝাঁপি খুলত। নিমগাছের মাথায় তারাভর্তি আকাশ, আদিরাম মন্দিরের মাথাটা যেন উলটোনো জাহাজ, ছায়াপথ দিয়ে চলেছে। তার গা ভর্তি পোড়ামাটির পুরাণকথা, কোম্পানির গোলার ক্ষত।
চাঁদের আলোর তেজ বাড়তে ঝিঁঝিপোকারা নিশ্চুপ হয়ে আসে। ধর্মতলার দিক থেকে ভেসে আসছে বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। অন্য একটি শব্দের জন্য উৎকর্ণ হয়ে থাকে বাপ্পা।
‘গাজনের মেলা হচ্ছে, জানিস বাপ্পাদাদা?’ কানাই বই থেকে মুখ তুলে বলে।
‘জানি।’ বাপ্পা বলে।
‘তুই যাবি নাকি?’
‘যেতেও পারি।’
‘ডকবাজারের ওই ছেলেগুলোর সঙ্গে?’
বাপ্পা উত্তর দেবার আগেই সেই প্রতীক্ষিত— ‘ঠং!’ শব্দটা বেজে ওঠে বাইরে গলিতে। ল্যাম্পপোস্টে ইটের টুকরোয় আঘাতের শব্দ। বই গুটিয়ে উঠে পড়ে বাপ্পা।
‘কোথায় যাচ্ছিস রে?’ কানাই জিজ্ঞেস করে।
‘পায়খানায়।’
‘মিথ্যে কথা! আমি জানি তুই কোথায় যাচ্ছিস।’
হারিকেনের আলোয় কানাইয়ের মিশকালো মুখে সাদা দাঁতের পাটি চকচক করে।
অন্ধকারে গলির বাঁকে দাঁড়িয়ে আছে কটা। কপালে কালো ফেট্টি বাঁধা, খালি গায়ে একটা ছাই রঙের সুতির র্যাপার ফেলে রেখেছে।
‘কতক্ষণ?’ বাপ্পা ফিসফিস করে বলে।
কটা উত্তর দেয় না, ইশারায় ওকে অনুসরণ করতে বলে। সরু গলিটার শেষ প্রান্তে চলে আসে ওরা। এদিকটায় বড়ো বড়ো গাছ, চাঁদের আলো ঢোকে না। অন্ধকারে নীচু পাঁচিল টপকায় কটা, বাপ্পার হাত ধরে সাহায্য করে। মাটিতে শুকনো পাতার স্তূপ, পায়ের নীচে মচমচ শব্দে নিজেরাই চমকে ওঠে। চাঁদের আলোছায়ায় ইটের খাদরি করা সরু পথ দেখা যায়। পথটা কিছুদূরে গিয়ে একটা দোতলা বাড়ির পেছনে লোহার ঘোরানো সিঁড়িতে এসে শেষ হয়েছে। বাড়িটার জানলা দরজা আটেঘাটে বন্ধ, কেউ থাকে বলে মনে হয় না। একদিক ফটফটে জ্যোৎস্নায় সাদা, আরেক দিকে ঘন ছায়া। বাতাসে চাঁপাফুলের গন্ধ। ঘোরানো সিঁড়ি উঠেছে দোতলায়, কটা দ্রুত পায়ে ওপরে উঠতে থাকে। ওর কাঁধের দুপাশে র্যাপারের দুই প্রান্ত ঝুলে ওকে অতিকায় বাদুড়ের মতো দেখাচ্ছে।
দোতলায় এসে সিঁড়িটা শেষ হয়েছে একটি দরজায়, ভেতর থেকে বন্ধ। কটা একটা ভাঁজ করা ছুরি বের করে।
‘এটা ভুট্টোর সেই ছুরিটা না?’ বাপ্পা ফিসফিস করে বলে।
কটা উত্তর দেয় না। ছুরির ফলা দরজার ফ্রেমের ফাকে ঢুকিয়ে কান পেতে রাখে দরজায়।
খুট করে একটা শব্দ, তারপরেই দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে স্কাইলাইট গলে আসা চাঁদের আলোয় ঝকঝক করছে শ্বেতপাথরের মেঝে, দেয়ালে সাদা টালি মোড়া, বেসিন কমোড বাথটব। বাথরুম! বাড়িটায় কেউ থাকে না সেটা স্পষ্ট, তবু সন্তর্পণে একটি বিশাল হলঘরে এসে পড়ে ওরা। বাপ্পার বুকের ভেতরে যেন ঢেঁকির পাড় পড়ছে। ঘরের একদিকে বড়ো বড়ো ফ্রেঞ্চ উইন্ডো চাঁদের ছায়ায়, শার্সি দিয়ে আদিরামবাটির একদিক দেখা যায় –মন্দিরের চুড়ো, নাগকেশর গাছে চিক্চিক্ করছে জ্যোৎস্না। প্রতিটি জানলার মাথায় অর্ধচন্দ্রাকার ঝরোকা, নীল কমলা সবুজ ক্ষীণ দ্যুতি এসে পড়েছে মেঝেয়, মোজাইকে ত্রিভুজের নকশা, প্রতিফলিত রঙীন প্রভায় আবছা দেখা যায় সারি সারি কাচের আলমারি। ভেতরে ঠাসা বই, চামড়ায় বাঁধানো, সোনার জলে লেখা অন্ধকারে চিকচিক করছে। দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো ছবির প্রিন্ট: নিসর্গ দৃশ্য, জাপানি উদ্যান, অর্ধনগ্ন নারী।
পিছনে ফেরা এক নারী, চকিতে ঘুরে তাকিয়েছে। তার পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি, কাঁখে কলসি নিয়ে জল থেকে সদ্য উঠেছে, পিঠে ছড়ানো ভিজে কালো চুল, সাদা মসলিন জলে ভিজে কাঠবাদাম রঙের ত্বকে লেপটে গিয়েছে, কোমরের দুপাশে দুটি করে পৃথুল ভাঁজ ও নিতম্বের মধ্যবর্তী ভাঁজ সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে ঘরে ক্ষীণ জ্যোৎস্নার প্রভায়। মনে হয় যেন ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে, চাহনিতে একই সঙ্গে ভয় আর কৌতূহল।
পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে কটা, পিঠের ওপর ওর নগ্ন বুকের স্পর্শ। হাতটা আলতো করে বাপ্পার গলার কাছে রাখে, যেখানে জন্মদাগটা ছিল, এখন নেই। গলার কাছে তর্জনি বুলিয়ে ব্যাপারটা বাপ্পার কাঁধের দুপাশ দিয়ে ফেলতে বিচিত্র ওম গাঢ় হয়ে আসে।
হলঘরের একদিকে মেঝেয় কার্পেট, দেয়ালে বাঘছাল, শিঙেল হরিণের মাথা। মেহগনির টেবিল, টিপয়, ভারি সেক্রেটারিয়েট টেবিল। গদি-আঁটা আরামকেদারার পেছনে দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো এক পুরুষের ছবি। আবছায়ায় দেখা যায় তাঁর মুখ গম্ভীর, ঠোঁটে যেন বিরক্তি আর অভিমানের রেখা। ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে মনে পড়ে হেমন্তমামার মুখ, আর তারপরে বাপ্পা চকিতে আবিষ্কার করে এই ছবি সে আগে দেখেছে।
এতক্ষণ বুঝতে পারেনি, নীচে বাগানের দিকে তাকাতে স্পষ্ট হয়: এল- ডোরাডোর গেট, গেটের মাথায় বোগেনভেলিয়ার ঝাড়, সিমেন্ট বাঁধানো পথ, ফোয়ারা, ঢালাই লোহার কারুকার্য করা বেঞ্চ চাঁদের আলোয় ওপর থেকে সবকিছু ঝুলন সাজানোর মতো দেখায়। এই বাড়ি আগে সে এসেছে, কিন্তু দোতলায় ওঠেনি কখনো।
কটা টেবিলের ওপর থেকে স্ফটিকের দোয়াতদানি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। ওর হাত খামচে ধরে বাপ্পা–
‘আমার গা ছুঁয়ে দিব্যি কাট এই বাড়ির কোনো জিনিসে হাত দিবি না!’
‘কেন রে?’
‘এটা আমার মায়ের কলকাতার দিদার বাড়ি!’
কটা নিঃশব্দে হাসে। লম্বা হলঘরের শেষে হেঁটে গিয়ে অন্য একটা দরজার ছিটকিনি খোলে। চাঁদের ছায়ায় নীচু রেলিংঘেরা বারান্দা, চকমিলানো মেঝে, পাখির পালক ছড়িয়ে আছে।
‘এখানে কারা থাকে বল দিকি?’ কটা বলে।
‘কারা?’
অ্যান্টনি কাকাতুয়ার খোবলানো দেহটা পাওয়া গিয়েছিল এখানে। ছাউনির নীচে অন্ধকার দপদপ করছে। কয়েক পা এগিয়ে কটা কাঁধের র্যাপারটা তুলে ঝাড়া দিতেই টের পাওয়া যায় শেডের নীচে ঝাঁক বেঁধে রয়েছে পায়রা, ঝটাপটি শুরু হয়ে যায়।
রাতকানা পায়রাদের ওড়াউড়ির মাঝে দাঁড়িয়ে কটা–পাখিগুলো চারদিকে উড়ে পড়ছে, দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে, ওর কাঁধে গিয়ে বসছে। হাত দুটো দুদিকে ছড়িয়ে কটা র্যাপারটা তুলে ধরেছে ডানার মতো।
এল-ডোরাডো থেকে ওরা বেরিয়ে এল যখন তখনও বিদ্যুৎহীন পাড়া। দূরে হারিকেনের আলোয় আলোকিত দুয়েকটা জানলা। ধর্মতলার দিকে থেকে কলরোল ভেসে আসছে।
‘আসছিস তো?’
‘জানি না। বাড়িতে একবার মুখটা দেখাতে হবে।’
‘ফিস্টি করব।’
‘ভুট্টো আর বলা? ওরা থাকবে?’
কটা মাথা নাড়ে। –— ‘বিশ নয়া পয়সা আনিস তো, পাউরুটি কিনব। পাউরুটি আর মাংস।’
‘মাংস কে আনবে?’
চাঁদের আলোর নীচে দাঁড়িয়ে হাত দুটো দুপাশে ছড়িয়ে দেয় কটা। র্যাপারটা সরে যেতে ওর নগ্ন বুকে প্রতিটি রেখা দেখা যায়, পাঁজরের খাঁজে পাতলা সোনালি রোম, কোমরে বাঁধা গামছায় দুটো জালালি কবুতর, পা ওপরে মাথা নীচে ঘাড় মটকে ঝুলছে।
‘তবে যে তুই আমায় কথা দিলি কোনো কিছু নিবি না?’
হেসে ওঠে কটা।–‘কথা রেখেছি তো! এগুলো আকাশের জীব, তোর কলকাতার দিদার সম্পত্তি নয়!’
.
রাত্রিবেলা দিদার ঘরে একা শুয়ে বাপ্পা দেখে চাঁদের আলোয় উঠোন ভেসে যাচ্ছে। ধর্মতলার থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ অবিকল যেন জালালি কবুতরের ডানা ঝাপটানির মতো। মনে পড়ে, নাগকেশরের বেদিতে বসে দাদু ডাকছে— ‘আয়! আয়! আয়!’ ফতুয়ার পকেট থেকে খুদ বাপ্পার হাতের মুঠোয় দিচ্ছে, ঠাস ঠাস ধ্বনির ভেতরে টকটকে লাল পা, লাল ঠোঁট, খুদ খুঁটে খাচ্ছে। ঘুম আসে কালো নদীর মতো। দেহটা সেই প্রবাহে মুক্ত করে দিয়ে গলতে গলতে টের পায় হেঁটমুন্ড ঊর্ধ্বপদ হয়ে ভেসে উঠছে, হাতের মুঠি আলগা হয়ে সরে যাচ্ছে দিদার শাড়ির আঁচল। এক নারীর শব, জলের ওপর মুখটা আকাশে তোলা, তারার আলোয় চিকচিক করছে। সম্পূর্ণ নগ্ন দেহে দুই পায়ের ভাঁজে কচুরিপানা, মাথার চারপাশে ঘন চুলে ছোটো ছোটো রুপোলি মাছ ঝাঁক বেঁধে সাঁতার দিচ্ছে। ঘাটে একদল পুরুষ আবক্ষ জলে তর্পণ করছে। তাদের বাঁ কাঁধে গলার পাশে কুপির মতো ভাঁজে রাখা তিল, আঙুলে তুলে তামার কোষায় নিয়ে নদীতে অর্পণ করছে, বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করছে। সব স্পষ্ট দেখা যায় –কালো তিলে মিশে রয়েছে আরশোলার ডিম, বাদামি রঙের। তোলাঘরে মাটির কলসিতে সোম্বচ্ছরের তর্পণের তিল, কবে যে আরশোলা ডিম পেড়েছে কেউ দেখেনি। মান্দাসীও না। আর এখন সে এক পেট খিদের কুয়ো নিয়ে লুকিয়ে কলসির ভেতর হাত ঢুকিয়ে মুঠো মুঠো তিল চিবিয়ে খাচ্ছে। বাপ্পা পেছন থেকে পা টিপে টিপে গিয়ে জিজ্ঞেস করে—
‘মান্দাসী, সত্যিই কি তোকে বাড়ির লোক এসে নিয়ে গেল? তোর কি কিছু হয়েছিল?’
মান্দাসী পেছনে ফিরে মাথা নাড়ে না, দুই চোখের পাতা উল্টে জগন্নাথের চকা আঁখি দেখায় না। শব্দহীন হাসে, আর ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে, আবলুশ কালো উরুর ফাঁক দিয়ে ঝাঁক ঝাঁক ক্ষুদে আরশোলা ফরফর করে উড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। দমচাপা আতঙ্কে চিৎকার করতে গিয়ে মুখ দিয়ে কথা সরে না বাপ্পার। ঘুম ভেঙে দেখে গলার কাছে ঘামে ভিজে উঠেছে। উরুসন্ধিও ভিজে। কোথায় যে রয়েছে, কলুটোলা লেনে নাকি দমদমে নাকি সাতগাঁয়, প্রথমে ঠাওর করতে পারে না। ক্রমশ কানে আসে পায়রার বকবকম, কুয়োর কপিকলে গোঙানির মতো শব্দ, ক্ষীণ ছোটো রেলের বাঁশি। সকাল ছটার প্রথম বন্দর-হুগলি লোকাল ছেড়ে যাচ্ছে।
আম পাকার গন্ধে বাতাসটা ভারি হয়ে আছে, নীল ডুমো মাছির ভোঁ ভোঁ শব্দ। সারারাত ধরে নিমের পাতা ঝরেছে। সকালের আলোয় উঠোনটা ছোটো আর ম্রিয়মাণ দেখায়। বাড়িটা নিজঝুম হয়ে পড়ে আছে, কাউকে দেখা যায় না। রান্নাঘরে বামুনদিদা উনুনে আঁচ দিয়েছে, চালের ওপর চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কুয়োর ধারে কুলুঙ্গি থেকে নিমের দাঁতনকাঠি নিয়ে দক্ষিণের বাগানে যায় বাপ্পা।
গঙ্গামাটি আনতে গিয়ে চোরা কাদায় হারিয়ে গিয়েছিল গামা। বাগানের মাটির ঢিবিটা ক্রমশ ছোটো হয়েও রয়ে গিয়েছে। ওপরে ছেয়ে আসা সবুজ আগাছা বাগানের অন্যান্য আগাছা থেকে আলাদা জাতের। দাঁতনকাঠি হাতে বাপ্পা উঠে আসে। সকালের রোদে মাটির ভাপ উঠছে, নরম লতাপাতার জাজিমে বসে পড়তে পায়ের খোলা অংশ শিশিরে আর্দ্র হয়ে ওঠে।
জড়িবুটির বীজ দূরের দেশ থেকে জাহাজের খোলের মধ্যে চলে এসেছে, মা বলেছিল। জাহাজগুলো কবে মাটি হয়ে গিয়েছে, বীজগুলো মাটির ভেতরে ঘুমিয়েছিল।
বিষাক্ত লতাপাতা আছে কী না কী করে বুঝব বল দিকি?
কী করে, মা? বাপ্পা জিজ্ঞেস করেছিল।
যদি ছাগলে খায়। কথায় বলে না, ছাগলে কী না খায়?
গোবরকুডুনিদের ছাগলগুলো চরতে চরতে কখনো বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ে। শিয়ালকাটার ঝোপে ঢাকা গর্তের মধ্যে পড়ে যায় কখনো, আবার উঠেও পড়ে। ওদের ডাক শুনে আমবনের ভেতর থেকে শিয়াল চলে আসে। মাটির ঢিবিটার ভেতর থেকে কখনো জং-ধরা লোহার গজাল বেরিয়ে আসে। ফিরিঙ্গি বোটের গজাল, দিদা বলেছে। আরবি নৌকোর তক্তা বাঁধা হতো দড়িদড়া দিয়ে। ঝুলনের আগে গামা কোদালের চার কোপে ঢিবির মাথা থেকে সবুজ চাঙড় কেটে নেবে। তার ধার দিয়ে হলুদ বালির প্রোমোড, পোর্সেলিনের গির্জা, ঘড়িঘর, ঝাঁটার কাঠির লাইনের ওপর দেশলাই বাক্সের মার্টিন্স রেল, নীল গামলার সমুদ্রে ঘুরে চলেছে টিনের পটপটি স্টিমার…
খালি গায়ে সবুজের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে নাকে লতাপাতার কষাটে তাজা গন্ধ আসে। দাঁতনকাঠিটা দিয়ে মাটি খুঁচিয়ে দেখে গঙ্গামাটির রং অন্যরকম কালচে, সুগন্ধের ভাপ উঠছে। কানে ভাসে দিদার গলা সেই কোনকালে ফিরিঙ্গিদের গোলায় জায়ফল ভর্তি জাহাজ ডুবে যায়, তখনও আদিরামের পাকা মন্দির হয়নি। এক বছর গঙ্গামাটিতে মিশেছিল জায়ফলের সুগন্ধ, হাতে-মাটি করার পর সারাদিন ভুরভুর করত। বাপ্পা আঙুলে খাবলে তুলে নিয়ে শোঁকে। মাটি হয়ে যাওয়া জায়ফল? মাটিতে শুষে যাওয়া চাঁদের আলো, শিউলি ফুলের গন্ধ, চিনিকাকা যেমন বলেছিল। একটুখানি তুলে জিভে ছোঁয়াতে কষাটে স্বাদ, প্রথমে কটু তারপরে অদ্ভুত চেনা। অনেকটা বাক্সবাদামের মতো, মান্দাসীর তোলা ক্ষুদে বন-টমেটোর মতো অদ্ভুত এক আদিম ধাতব স্বাদ, আঙুলে গুলি পাকিয়ে মুখে পুরে চিবোতে এক বিচিত্র অনুভূতির প্রবাহ, মনে হয় বহুকাল ধরে, বহু বহু জন্ম ধরে এই মাটির স্বাদের কাছে ফিরে আসছে সে। ইতিমধ্যে রোদের রঙ বদলেছে, যেন অন্য কোনো সকালের, ভিন্ন ভিন্ন সকালের, বারান্দায় অ্যান্টনি ডাকছে •— ‘বামুনদি, ও বামুনদি, কানের মাথা খেয়েছিস!’ বাগানে কুয়োর ধারে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে চিন্তামণির গা ঘষে ঘষে চান করাচ্ছে গামা, মেটেঘরের দাওয়ায় আঁচল পেতে ঝিমোচ্ছে দিদা, ঢিমে আঁচে হাঁড়িতে মাংস পেকে উঠছে, শিয়ালকাঁটার হলুদ ফুলে হলুদ প্রজাপতিরা উড়ে আসছে কোনো হারানো আলোর দেশ থেকে, বুকের ভেতরটা অদ্ভুত হালকা হয়ে উঠছে যেন হিমালয়ের সেই কলজে-শিলা।
‘ওখানে কী করছিস, বাপ্পাদাদা?’
তিতলির ডাকে সম্বিৎ ফেরে। কাল কখন হস্টেল থেকে বাড়ি এসেছে, বাপ্পা জানতেও পারেনি। তিতলির বাহুতে বেতের সাজি, বিশুকার পুজোর জন্য ফুল তুলতে এসেছে। সকালবেলায় স্নান সেরেছে, পরনে নীল পাড় সাদা শাড়ি, স্কুলের সাদা ফুলহাতা টিউনিক। সকালের প্রথম আলো এসে পড়েছে ওর মুখে।
*
পরদিন সকালে বাপ্পা সাতগাঁ ছাড়ল।
এবার ভিন্ন পথে। প্রথমে ডকবাজার থেকে রিক্সায় ওলন্দাজডাঙায় হুগলি নদীর খেয়াঘাট, সেখান থেকে লঞ্চে নদী পার হয়ে নৈহাটি। এর আগে অগুন্তিবার বসন্তমামার হার্লে চড়ে হুগলি নদীর পাশ দিয়ে গিয়েছে সে, কিন্তু এর আগে কোনোদিন পার হয়নি। পার হবার সময় লঞ্চের জানলা দিয়ে দেখা যায় ফিরিঙ্গিডাঙার ভিলাগুলো, উত্তরে পর্তুগিজ গড়ের ধ্বংসাবশেষ। এপারে চটকলের চিমনি, মন্দির আর বসতি। নৈহাটি ফেরিঘাটে শালের বল্লায় বাঁধা কাঠের সাঁকো, উঁচু পাড়ে ঝাঁকড়া বটগাছ। সেই গাছের গোড়ায় এক অদ্ভুতদর্শন চারপেয়ে প্রাণীর পায়ে দড়ি বেঁধে নিষ্ঠুর মজায় মেতেছে একদল লোক। প্রাণীটার গায়ে ধূসর কালো লোম, মুখটা ছুঁচলো আর পায়ে বড়ো বড়ো নখ।
‘ভামবেড়াল!’ রেল স্টেশনে যাবার রিকশায় উঠতে প্যাডেলে চাপ দিয়ে বলে ছোকরা রিকশাওয়ালা। ‘ব্যাটা ওই বটগাছের ভেতরে থাকে। রোজ রাতে
ইকবালের দোকানের মুরগি মারে। আজ ফাঁদ পেতে ধরেছে।’
সাতগাঁয় ভামবেড়ালের কথা এত শুনেছে, আমবনে রাতের অন্ধকারে সবুজ চোখ জ্বলতে দেখেছে। কিন্তু প্রাণীটাকে কোনোদিন চোখে দেখেনি। অন্ধকারের জীব, নিঃশব্দচরণ, দিনের আলোয় এতগুলো মানুষের নিষ্ঠুর তামাশার ফাঁদে পড়ে অসহায় বিহ্বল। নারকেল দড়ি বাঁধা পেছনের পা-টা টেনে ল্যাঙচাতে ল্যাঙচাতে গোল হয়ে ঘুরে চলেছে উদভ্রান্তের মতো, মাঝে মাঝে কুন্ডলি পাকিয়ে নিজেরই দেহের মধ্যে সেঁধিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। ধুলো ময়লা লেগেছে লোমে। অজান্তেই বাপ্পার দুচোখ জলে ভরে ওঠে।
উত্তরবঙ্গের ট্রেন থেকে নেমে টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছিল রথীন। পিঠে চামড়ার ছোটো ডাফল ব্যাগ আর ডান হাতে সেই কালো ব্রিফকেসটা। একজন মানুষের প্রয়োজনীয় যা কিছু ধরে গিয়েছে এই দুটো ব্যাগে। এই দুটো ব্যাগ নিয়েই একা একা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দিনের পর দিন কাটিয়েছে সে। বাপ্পা দেখে, বাবার গালে দুদিনের না-কামানো দাড়ি, রোগা হয়ে গিয়েছে। সারাদিন জিপে চালকের পাশের সিটে বসে ট্যুর করার সময় বাঁ হাতটা যে কনুই পর্যন্ত কালো আলাদা করে বোঝা যেত। এখন আর সেটা বোঝা যাচ্ছে না, গোটা দেহের চামড়াই পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। সেখানে কোথাও ওল্ড স্পাইসের গন্ধ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবু ছেলেবেলার মতো গায়ে উঠে চিবুকে নাক ঘষতে সাধ হয় বাপ্পার।
সেসব কিছুই অবশ্য করে না সে। হাতের ব্যাগটা নামিয়ে পাশে রেখে দুহাতে রথীনের কোমর জড়িয়ে ধরে। রথীন আলতো করে ওর চুলে আঙুল চারিয়ে দেয়—ছেলেবেলায় ট্রামের পাদানিতে উঠিয়ে দেবার পর যেমন করত।
‘শিয়ালদার লোকাল ট্রেন আসতে এখনও মিনিট কুড়ি দেরি আছে। চা খাবি? চল। প্ল্যাটফর্মে গিয়ে চা খাই।’
এও এক নতুন। কিছুকাল আগে কফি হাউসে গিয়ে বাবার সঙ্গে কফি খেয়েছে। সেবার বাপ্পা নিয়েছিল লম্বা গেলাসে ফেনা ওঠা কোল্ড কফি, রথীন কালো ইনফিউশান। এবার দুজনের জন্যেই কাপ প্লেটে চা। দুই পুরুষ, দুজনেই ফুল টিকিট কেটে ট্রেনে চড়বে।
চায়ের দোকানটা প্রাচীন, উনুনের ওপর বসানো বিশাল তামার সামোভার হেমন্তমামার দেওয়া রাশিয়ান বইটাতে অবিকল এইরকম সামোভারের ছবি আঁকা রয়েছে। দোকানের দেয়ালে সাদার ওপর লাল রঙে এনামেল-করা বোর্ডে চায়ের গুণাবলী টাঙানো:
চা পানের উপকারিতা
১ – ইহা খাইতে বেশ সুস্বাদু
২ – ইহা জীবনী শক্তির উদ্দীপক
৩ – ইহাতে মাদকতা শক্তি নাই
৪ — ইহা ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, কলেরা, আমাশয়, প্লেগ, অবসাদ ও অন্যান্য রোগের আক্রমণ হইতে রক্ষা করে
৫ – ইহার কোনো অপকারিতা নাই।
দুজনে একসঙ্গে উচ্চারণ করে লেখাটা পড়ে। কাপের চা শেষ করে কাউন্টারে রেখে বাপ্পার দিকে ফিরে রথীন বলে —‘চা পানের সব থেকে বড়ো উপকারিতা কী বল দিকি?’
বাপ্পা কয়েক সেকেন্ড ভাবে, তারপর বলে— ‘ইহার কোনো অপকারিতা নাই।’
হো হো করে হেসে ওঠে রথীন। বাপ্পার কাঁধে বন্ধুসুলভ চাপড় মারে। ‘ঠিক বলেছিস!’
পিতা-পুত্র, দুই পুরুষ, যে যার নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে সামনের দিকে এগোয়।
লোকাল ট্রেনটা শিয়ালদহে ঢোকার কিছুক্ষণ আগে থেকেই ধীরগতি হয়। জানলার বাইরে লাইনের দুপাশে নয়ানজুলির ধারে গোলপাতার ছাউনি পড়েছে। অসংখ্য উলুরিঝুলুরি মানুষ, নরনারী বৃদ্ধ শিশু, বিধ্বস্ত বিহ্বল। ওদের চোখ দেখে বাপ্পার আবার মনে পড়ে নৈহাটির ফেরিঘাটে সেই ভামবেড়ালটাকে। চারিদিকে ছড়ানো পোঁটলাপুঁটলি, মাদুরে জড়ানো বিছানা, টিনের তোরঙ্গ, অ্যালুমিনিয়ামের টোল-খাওয়া হাঁড়িকুড়ি, মাটির কুঁজো। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার আগে ডান দিকে লাল ইঁটের বাড়িটার নীচে নর্দমার ধারে মাদুরের আব্রু দিয়ে সংসার পেতেছে। মাটির তোলা উনুনে ভাত ফুটছে, সিগন্যাল পোস্টে শাড়ির দোলনায় শুয়ে শিশু, ধুলোর ওপর শানকি হাতে শিশু, শিশু কোলে মা, দুজনেরই দুচোখ জয়বাংলায় লাল হয়ে আছে।
*
শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ভর্তি মানুষ যেন চাপ চাপ রক্তের মতো, কোনো অদৃশ্য ক্ষতমুখ দিয়ে ভলকে ভলকে বেরিয়ে এসেছে। কিছুদিনের মধ্যেই সেই ক্ষতের ভেতর থেকে জন্ম নেবে এক নতুন দেশ। আপাতত সেখান থেকে উৎখাত হওয়া, ভিটে-পোড়া মানুষদের ঠাঁই হয়েছে এখানে। এই শহর তাদের কাউকেই ফেরাবে না, যেমন এর আগেও ফেরায়নি।
.
‘সাইলেন্ট চ্যাটারজির’ কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীমহোদয় রথীনের গুণগান করেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রীমহোদয়ের কাছে। রথীন চ্যাটার্জিকে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরে স্পেশাল সেক্রেটারি পদে রাইটার্স বিল্ডিংস-এ নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতিমধ্যে সীমান্তের পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠছে। ত্রাণের জন্য দিল্লির কাছে যে পরিমাণ টাকা চাওয়া হয়েছিল, সেই টাকা যতদিনে এসে পৌঁছল ততদিনে শরণার্থীদের ঢেউ প্লাবনের রূপ নিয়েছে, আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ ও পরিকাঠামোর প্রয়োজন। দেশভাগের সময়ে তৈরি রাজ্যের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরটিকে ফের ঢেলে সাজানো হলো।
পূর্ণ সময়ের সেক্রেটারি হিসেবে বালিগঞ্জে সরকারি আবাসনে কোয়ার্টার পেতে চলেছে রথীন। বাপ্পা ভর্তি হবে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে। কলকাতায় ফিরে দমদম থেকে নতুন কোয়ার্টার দেখতে যাবার আগে ২৩/৩ কলুটোলা লেনে গেল ওরা। সেখানে মিঠু পিসি, তার বর আর ছবি পিসি থাকতে শুরু করেছে।
খবরটা বাপ্পা আগেই জেনেছিল মোমবুচানের কাছে। কিন্তু পুরোনো বাসায় পা রেখে অনুভূতিটা অন্যরকম। দুটো কামরা একেবারে অন্যরকমভাবে সাজিয়ে নিয়েছে মিঠুপিসিরা। পুরোনো যে আসবাবগুলোর সঙ্গে বাপ্পার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেগুলো অন্য সংস্থানে রয়েছে। সরু খাবার টেবিলে অ্যান্টাসিড আর অ্যাকোয়াটাইকোটিসের বোতলগুলো সরে গিয়েছে, সেই জায়গায় জর্দার কৌটো, কাসুন্দি আর তেলে-ডোবানো নাগামরিচের বোতল। বাসের মাথায় নুন-মরিচদানির সাহেব-মেম এক পাশে বসে আছে দুঃখী মুখে। বসার ঘরের কোণে সেই বেতের টিপয়টার ওপরে কালো ভারি টেলিফোনটার জায়গায় কাচের গোল বয়ামে একজোড়া গোল্ড ফিশ।
কলুটোলা লেন থেকে বালিগঞ্জে নতুন কোয়ার্টার দেখতে যাবার পুরো সময়টা বাপ্পার মনে ছেয়ে রইল এক অদ্ভুত খারাপ-লাগা অনুভূতি। কলকাতা শহরের এদিকটা অন্যরকম –ফাঁকা ফাঁকা, চওড়া রাস্তার মধ্যিখান দিয়ে ট্রাম চলেছে, দুপাশে গাছপালা, এল-ডোরাডোর মতো ভিলা প্যাটার্নের বাড়ি।
কোয়ার্টারের কাছেই বিশাল বম্পাস লেক, সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ছায়াবীথি। পিতাপুত্র জলের ধারে বেঞ্চে এসে বসে।
‘এখানে সুইমিং ক্লাব আছে, তোকে ভর্তি করে দেব,’ রথীন বলে। ‘বাবা, ছবিপিসি কি কলুটোলা লেনেই থাকবে? ওদেশে আর ফিরে যাবে না?’ বাপ্পা জিজ্ঞেস করে।
‘তনভীরকে ওরা মেরে ফেলেছে। ওদেশে ছবিপিসির আর কেউ নেই।’
‘আর মিঠুপিসি?’
‘ছবিদি এসে পড়ায় মিঠুর শ্বশুরবাড়িতে খুব অশান্তি হচ্ছে। মিঠু চলে এসেছে। আমি কলুটোলা লেনের স্বত্ব ওদের ছেড়ে দিয়েছি।’
