Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.১০

৩.১০

অগস্টিন দুফের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন গুঁফো গোঁসাই। স্টুডিওয় ছবি তোলার ব্যবসায় লাভের মুখ দেখার পর চিনিকলের মালিক দুফে একটি বায়োস্কোপ যন্ত্র কিনে স্ট্র্যান্ডের ধারে ফ্যাক্টরদের ক্লাবে বিভিন্ন পার্টিতে চলমান ছবি দেখিয়ে মনোরঞ্জন করত। সেই বায়োস্কোপ চালাতেন গুঁফো গোঁসাই। এক ফিয়েস্তার রাতে স্টুডিওয় বিধ্বংসী আগুন লাগল, পুড়ে মারা গেল অগস্টিন দুফে। বায়োস্কোপযন্ত্রটি গুঁফো গোঁসাইয়ের হস্তগত হয়। তিনি সেটি নৌকায় চাপিয়ে ছাড়িগঙ্গার ধারে বিভিন্ন গ্রাম্য মেলায় ঘুরে ঘুরে খোলা আকাশের নীচে বায়োস্কোপ দেখিয়ে উপার্জন করতেন। তখন কলকাতায় জামশেদজী মদন নামে এক পার্শী ব্যাবসায়ী কোম্পানি খুলে বিভিন্ন পৌরাণিক পালার মুভি বানাচ্ছে। গুঁফো গোঁসাইয়ের মেলার বায়োস্কোপে সেইসব রিল ছাড়াও কোয়ার্সভিলে ক্লাবে পাওয়া কিছু কিছু ইংরেজ-বিরোধী ফিল্মও ছিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড, বঙ্গভঙ্গবিরোধী মিছিল, আলিপুর বোমা মামলার তথ্যচিত্র ইত্যাদি। জনসাধারণকে সরকার বাহাদুরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে গুঁফো গোঁসাই, এই অভিযোগে তাকে একদিন মেলা থেকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ, বায়োস্কোপের সরঞ্জাম আর নৌকাটি বাজেয়াপ্ত করল।

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর অনেককাল পরে প্রৌঢ় বয়সে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন গুঁফো গোঁসাই, বাঁটুল সেই বিবাহের সন্তান। রাজবন্দি হয়ে জেলে রয়েছেন গুঁফো (সেখানেই তিনি মারা যাবেন), এদিকে বাঁটুলের মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। উকিল দিয়ে কেস লড়ার মতো সামর্থ্য ছিল না, জমানো টাকাকড়ি নিঃশেষ হবার পর আত্মীয়রাও কিছুদিনের মধ্যেই মুখ ফিরিয়ে নিল। এরই মধ্যে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এসে জুটল হামজা নামে এক কাবুলিওয়ালা।

হামজার কোদালের মতো মুখে মেহেন্দি-রাঙানো দাড়ি, দৈত্যাকার চেহারা। কবে নাকি গুঁফো গোঁসাই নৌকা কেনার জন্য কর্জ করেছিলেন, এখন সে টাকা ফেরৎ চায়। আসল না হোক সুদ চায়। এত বছরে চড়া চক্রবৃদ্ধি হারে সেই সুদের পরিমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুল। দিনেমারডাঙার চটকল বস্তি এলাকায় হামজার ডেরা। বালক বাটুল অসহায়ের মতো দেখে, প্রায়ই সে ভরদুপুরে এসে তাদের দরজায় করাঘাত করে। মাথায় চেক-কাটা পাগড়ি, পরনে ঢোলা সালোয়ার, কুর্তার বোতাম খোলা, নৌকার পাটাতনের মতো বুকে ঘন তামারং রোম, সুনাটানা চোখ নাচিয়ে শিঙার মতো গলায় মাকে বলে— ‘চুদ দেও! চুদ!’

হামজা সুদ চায়, কিন্তু ওভাবেই সে শব্দটি উচ্চারণ করে। প্রতিবার উচ্চারণের সময়ে গলা-অব্দি ঘোমটায় ঢাকা ক্ষীণকায়া নারী কীভাবে শিউরে ওঠে সেটা জেনে- বুঝেই করে। দিনের পর দিন এই অসহনীয় দৃশ্য দেখে দেখে একদিন বাঁটুলের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ছুটে গিয়ে কাবুলিটার কোমরে ধাক্কা দিতে মনে হলো যেন ভারি গয়নার নৌকা, সামান্য দুলেও উঠল না। ভুরু কুঁচকে দুহাত বাড়িয়ে বাঁটুলকে সোলার পুতুলের মতো শূন্যে তুলে তার নিজের মুখের কাছে আনল হামজা, তারপর খ্যাক খ্যাক করে হেসে উৎকট রসুনের গন্ধে ভরা শ্বাসে বাঁটুলকে ভাসিয়ে দিয়ে বলল –‘পুস্‌কি!’

মাটি থেকে দু হাত ওপরে ঝুলন্ত বাঁটুল, বুকের মধ্যে অন্ধ ক্রোধের আগুন জ্বলছে। উন্মুক্ত হয়ে সে বাঁ হাতে হামজার লাল দাড়ি খামচে ধরল, ডান হাতে সর্ব শক্তি দিয়ে ওর দুই চোখে পর পর দুটো ঘুষি চালাল। ওই বেঁটেখাটো চেহারার বালকের হাতে যে এত জোর কাবুলিটা কল্পনাও করতে পারেনি, ছোটোবেলা থেকে বাবার সঙ্গে মেলায় ঘুরে ঘুরে বায়োস্কোপ দেখাতে গিয়ে সে যে দেড়-মনি সীসের ব্যাটারি বয়েছে সেটা জানত না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখে তারাবাজি দেখতে লাগল হামজা, ওকে ছেড়ে দিয়ে হাত দুটো চোখের ওপর চেপে ধরল। বাঁটুল এবার পায়ের নীচে ভূমি পেয়ে ওর কাঁধের উচ্চতায় উরুসন্ধি লক্ষ করে তৃতীয় এবং চতুর্থ ঘুষিটি চালালো। আর্তনাদ করে উঠে হামজা এক হাতে চোখ অন্যহাত দুপায়ের ফাকে চেপে পস্তু ভাষায় দুর্বোধ্য গালি দিতে দিতে টলতে টলতে গলি দিয়ে নিষ্ক্রান্ত হলো।

গোটা সাতগাঁয়ে খবর হলো, গোঁসাইয়ের পো কাবুলি পিটিয়েছে। রাতারাতি ওর নাম হয়ে গেল কাবুলি-খেদা বাঁটুল। এই পড়ে-পাওয়া খ্যাতিতেও মনের মধ্যে কাঁটার মতো বিঁধে রইল আতঙ্ক। পাড়ার লোকেরাও ওকে সতর্ক করল, হামজা ফিরে আসবে। হয়তো এবার দলবল নিয়ে আসবে। কিন্তু ভিটে ছেড়ে মাকে নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যাবার মতো সামর্থ্য বাঁটুলের ছিল না। অগত্যা সে পেশিচর্চা শুরু করল।

সরস্বতীর ধারে বহুকালের পরিত্যক্ত বর্গিব্যাটারি, তার বারুদ ঘরে কামানের গোলার স্তূপ। কামান দাগার প্রয়োজন হয়নি, বর্গিরা নদী পেরিয়ে সাতগাঁর মৎস্যভূমিতে আসেনি। প্রতিদিন ভোরবেলায় কাকপক্ষী ওঠার আগে গিয়ে সেই কামানের গোলা ভেঁজে, ডন বৈঠক দিয়ে হামজা ফেরার সেই ভয়ঙ্কর দিনটার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল বাঁটুল।

এইসময় রোজ সে দেখত নির্জন স্নানের ঘাটে গঙ্গা কবিরাজ এসে আহ্নিক করেন, সারা গায়ে গঙ্গামাটি মেখে বসে থাকেন সূর্যোদয় পর্যন্ত। ছেলেবেলায় উনি বাবার খেলার সাথী ছিলেন, পরে এই অঞ্চলের বিখ্যাত কবিরাজ হবার পরেও সেই কথা ভোলেননি। গুঁফো গোঁসাইয়ের জেল হবার পর খবর পেয়ে ওর মারে কয়েকবার অর্থসাহায্যও করেছেন। প্রতিদিন ওঁকে দূর থেকে দেখে ইচ্ছা হয় গিয়ে প্রণাম করে, বর্তমান দুর্দশার কথা সবিস্তারে জানায়। কিন্তু কিছুতেই আর সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারে না বাঁটুল।

সেদিন মাঝনদীতে ইংরেজ পুলিশের লাল-সাদা ডোরাকাটা স্টিমারটা দেখেই চিনতে পেরেছিল। এইরকমই একটা স্টিমার এসে ওর চোখের সামনেই বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ছাড়িগঙ্গার ধার থেকে। বাঁটুল দেখল, এক সাহেব সার্জেন বন্দুকধারী কনস্টেবল নিয়ে রবারের ভেলায় চেপে ঘাটে এসে গঙ্গারাম চক্রবর্তীকে

যেন পড়ে শোনালো, তারপর সিক্ত বসনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে চলে গেল। ঘাটের সিঁড়িতে ওঁর হরিণচর্মের আসন ও গন্ডারের খড়ের বড়ো কোষাটা পড়েছিল। গুগুলো আদিরামবাটিতে নিয়ে গিয়ে খবরটা দিল সে।

.

সেবার সাতগাঁয় নববর্ষ এল তীব্র বিস্ময় আর বিষাদের আবহে, যার অভিঘাত আদিরামের মন্দিরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কামানের গোলার আঘাতের সঙ্গে তুলনীয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় ব্রাহ্মণদের বিবদমান গোষ্ঠীগুলো একজোট হলো। তার নেতৃত্ব দিলেন গঙ্গারামের ভাইপো রামরাম শাস্ত্রী, ওরফে মশাই। একশো পঁচাশি জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষরিত পিটিশন পাঠানো হলো ভাইসরয়কে। কলকাতার বাংলা ইংরিজি পত্রপত্রিকাগুলোতে লেখা বেরোতে লাগল। হাটে বাজারে, বটতলায় ছাপা কাগজে নানান ধরনের তত্ত্ব উড়ে বেড়ান। অ্যাক্রয়েড ঘোষ যে টেলিপ্যাথি নামক একটি পদ্ধতির সাহায্যে জেলখানা থেকে বার্তা বিনিময় করতেন সেটা সবাই জানত। উনি নিজেই একবার আদালতে সে কথা কবুল করেছিলেন। গুজব রটল, ইংরেজ পুলিশ যন্ত্রের সাহায্যে সেই বেতার তরঙ্গ মেপেছে, এবং এই ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক জগদীশ বোসের হাত রয়েছে। গঙ্গারাম চক্রবর্তীর অবিলম্বে মুক্তি চেয়ে প্রতিদিন ডজন ডজন চিঠি এসে জমা হতে লাগল ভাইসরয়ের দপ্তরে। এরই মধ্যে মশাই টোলের বাড়ির পুথিখানায় উইলিয়াম জোনসের স্বাক্ষরিত বহু পুরোনো তুলোট কাগজে লেখা একটি দস্তাবেজ খুঁজে বের করলেন, যাতে লেখা রয়েছে— সাতগাঁ হলো জ্ঞানচর্চার সার্বভৌম স্থান, এখানকার আবাসিক ব্রাহ্মণদের অনুমতি ছাড়া কোনো মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী বস্তু স্থানান্তর করা যাবে না। উইলিয়াম জোনস ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু এই দস্তাবেজটি তিনি স্বাক্ষর করেছেন সুপ্রিম কোর্টের পিউনি জজ হিসেবে। জ্যাঠামশাইয়ের মুক্তি চেয়ে রাধারাণী শহরের নামজাদা ব্যারিস্টার নিয়োগ করলেন। তাঁরা আদালতে গিয়ে সওয়াল করলেন, গঙ্গারামকে যেভাবে যে অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাতে স্পষ্টতই ভারতীয় দন্ডবিধির অমূল্য সামগ্রী আইন (ইন্ডিয়ান ট্রেজার ট্রোভ অ্যাক্ট) লঙ্ঘিত হয়েছে। সেই আইনে পরিষ্কার বলা আছে— ‘মাটিতে লুক্কায়িত অনন্য যেকোনো কিছু’ (এনিথিং অফ ইউনিক ভ্যালু হিন ইন দ্য সয়েল) লুণ্ঠন করা যাবে না। সেদিন গ্রেপ্তারের সময় গঙ্গারাম মাটির প্রলেপে ঢাকা ছিলেন, এবং সাতগাঁর বিদ্বৎসমাজে তাঁর অনন্য মূল্য সম্পর্কে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই।

তিনটে রাত ফোর্ট উইলিয়ামে কাটানোর পর চৌঠা বৈশাখ গঙ্গারাম চক্রবর্তী মুক্তি পেলেন। মি’লেডি, তার কারণ অমূল্য সামগ্রী আইন কিংবা উইলিয়াম জোনসের সই-করা কাগজ নয়, ভাইসরয়ের দপ্তরে আসা শত শত প্ৰতিবাদপত্রও ঠিক নয়। ব্রিটিশ সরকার ব্রাহ্মণহত্যার আশঙ্কা করেছিল। অনেককাল আগে ব্রাহ্মণ মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসির পর প্রতিপত্তিশালী সাবর্ণ হিন্দু সমাজে কী ধরণের আলোড়ন হয়েছিল, উচ্চবর্ণেরা দলে দলে কলকাতা ছেড়েছিল, সেটা শাসকের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। গ্রেপ্তারের পর থেকে তিন দিন গঙ্গারাম খাবারের একটি দানাও দাঁতে কাটেননি কোনোরূপ প্রতিবাদ থেকে নয়, মানসিক চাপ থেকে তাঁর অস্ত্রাশয়ে প্রদাহ বেড়ে গিয়েছিল।

পুলিশের স্টিমার যখন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে এল, সাতগাঁ ও আশেপাশের ফিরিঙ্গিডাঙার অসংখ্য মানুষ নদীর পাড়ে জড়ো হয়ে গঙ্গারাম চক্রবর্তীকে বীরের অভ্যর্থনা দিল। কিন্তু তাঁর রোগজীর্ণ শরীর এই ধাক্কাটা নিতে পারল না। জ্যৈষ্ঠের তাপবাস্প বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে নিম্নচাপ হয়ে ওঠার আগেই সাতগাঁর শেষ বিখ্যাত রত্ন শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। ভাইপোর ছেলে রামপ্রাণ তাঁর মুখাগ্নি করল।

.

মাথার ওপর বৃক্ষের মতো ছিলেন যে মানুষটি, যাকে সে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত, সেই দাদামশাইয়ের এই লাঞ্ছনা ও মৃত্যু বনলতার কোমল মনে গভীর রেখাপাত করে। সেই চৈত্র রাতের ঘটনার একমাত্র সাক্ষী ছিল সে। গঙ্গারামের নির্দেশে মাঝরাতের রহস্যময় অতিথির জন্য ফলার নিয়ে আসে। ঘুমজড়ানো চোখে দেখেছিল মেটেঘরের মেঝেয় মাদুরের ওপর দাদামশাইয়ের মুখোমুখি বসে আছেন এক পুরুষ, প্রদীপের আলোয় আলোকিত ওঁর মুখে ব্রণর ক্ষতচিহ্ন, চিবুকে পাতলা দাড়ি, মাথার মাঝখানে সিঁথি কাটা বাবরি চুল। বনলতা কাঁসার জামবাটিতে চিড়েদই আর রেকাবিতে পাকা পেঁপে কেটে এনেছিল। উনি সামান্য লজ্জিত ভঙ্গিতে একটি চামচ চাইলেন। এর আগে জীবনে কখনো কাউকে চামচ দিয়ে চিড়েদই খেতে দেখেনি বনলতা, পাকা পেঁপের ফালি একটুও স্পর্শ না করে অদ্ভুত কায়দায় চা দিয়ে খুবলে খেতেও কখনো দেখেনি। গঙ্গারাম গ্রেপ্তারের পর যখন সে সবকিছু জানল, প্রদীপের আলোয় দেখা সেই নিরীহ চেহারার আগন্তুকের সঙ্গে তার অগ্নিঝরা পথে চলার ছবিটা মেলাতে পারেনি।

এগারো বছর পরে সে নিজেও সেই পথে হাঁটবে।

.

বাগবাজারের বাড়িতে আহত বিপ্লবী সহর্ষের আত্মগোপন বনলতা ছাড়াও আরেকজনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল তারিণীচরণ। বিন্দুমাধব মল্লিকের সামনে সেদিন রাধারাণী ওর এই বাড়িতে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে আসার কথা মনে করিয়ে দিতে আত্মসম্মানে ঘা লেগেছিল। যদিও ওর প্রবাস জীবনের খুঁটিনাটি রাধারাণী জেনে যাবার পরেও তারিণীর স্বভাব বদলায়নি। কলকাতার সাহেবপাড়ায় নিত্যনতুন ভোগলালসার চোরাগলিতে উচ্ছৃঙ্খল দিনযাপনের পেছনে প্রচুর অর্থব্যয় হতো। পাঁজি আর চিকিৎসাশাস্ত্রের বই ছাপানোর ব্যবসায় আয় যেমন বেড়েছিল, সংসারে ব্যয়ও কিছু কম বাড়েনি। আমেরিকা থেকে অত্যাধুনিক লাইনোটাইপ যন্ত্র আমদানি করা, সুনির্মলকে লন্ডনে পড়তে পাঠানোর খরচ তো ছিলই, এছাড়া রাধারাণী পাগলরামের ধারা বজায় রেখে ফি বছর দশ বারো জন দুস্থ ছাত্রছাত্রীর ভরণপোষণের ভার নিত। এদিকে ক্রমশই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে তারিণী আদিরাম প্রেসের সুনাম নষ্ট করছে। বিভিন্ন অসাধু মেইল-অর্ডার কারবারিদের থেকে টাকা নিয়ে ভুয়ো জিনিসের বিজ্ঞাপন পাঁজিতে ছেপে দিচ্ছে। বাংলার বিভিন্ন প্রাস্তে প্রতারিত পাঠকদের থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ চিঠি আসতে লাগল। শেষকালে বাধ্য হয়ে রাধারাণী স্বামীর সব ধরনের দায়দায়িত্ব কেড়ে নিল, সরবরাহকারী থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপনদাতাদের সতর্ক করল তারা যেন ওর সঙ্গে কোনোরকম আর্থিক লেনদেন না করে। তারিণীচরণকে সে রোজ কিছু পরিমাণ হাতখরচ দিতে লাগল, যা ওর বিলাসব্যসনের জন্য অতি সামান্য। সেই টাকায় গাড়ি হাঁকিয়ে তেল পুড়িয়ে সঙ্গীস্যাঙাত্ জুটিয়ে পাখি শিকারে যাওয়া যায় না, পার্ক স্ট্রিটে পানশালায় কিংবা ফিরিঙ্গি নাচনিদের বারেও যাওয়া যায় না, এমনকি ফ্লুরিজে রোজ প্রাতরাশ করতেও যাওয়া যায় না। ক্রমে তার চারপাশ থেকে মোসায়েবের দল কর্পূরের মতো উবে যেতে লাগল। তারিণী চৌরঙ্গি অঞ্চলে জাহাজী লস্করদের সস্তা মদের ঠেকে, টেরিটিবাজারে চীনা আফিমখোরদের ডেরায় যাতায়াত শুরু করল। এবং শীঘ্রই সিফিলিস বাঁধিয়ে বসল।

সেটা জানতে পেরে রাধারাণী তাকে নির্বাসন দিল ছাপাখানার লাগোয়া সেই ঘরটায়, যেখানে অনেক বছর আগে তারিণী এই বাড়িতে তার আশ্রিত জীবন শুরু করে। মাঝরাতে মদ্যপ অবস্থায় টলতে টলতে সে দোতলায় উঠে রাধারাণীর বন্ধ দরজায় টোকা দিত— ‘শরীলটা শেতল করার জন্য’।

মি’লেডি, বহু বছর আগে শাকম্ভরী দেবীর জীবনেও এইরকম এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। চাঁদেরডাঙায় শ্বশুরবাড়ি থেকে গঙ্গারাম তাকে উদ্ধার করে আনার পর কিছুকালের মধ্যেই স্বামী মথুরের জটিল নিউরোসিফিলিস ধরা পড়ে, পশ্চিমি চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলা হতো কিউপিডের রোগ। এই রোগের বীজাণু প্রথমে মেরুদন্ডের স্নায়ু ও তারপরে ক্রমশ মস্তিষ্কে ছড়িয়ে গিয়ে সুখের কেন্দ্রগুলোকে অকেজো করে দেয়। এর ফলে লিবিডোর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়, প্রবল যৌনপ্রবৃত্তি জেগে ওঠে। সেই সঙ্গে মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট হতে শুরু করে। মধ্যরাতে মথুর রায় একা একা চাঁদেরডাঙা থেকে ডিঙি নৌকা বেয়ে সাতগাঁয় চলে আসত, আদিরামবাটির পেছনে আমবনে এসে শাকম্ভরীর শোবার ঘর আন্দাজ করে ডাকাডাকি করত। যে দেহটির ওপর তার আইনসিদ্ধ অধিকার রয়েছে, সেটি পাবার জন্য প্রথমে জড়ানো গলায় আস্ফালন করত, তারপর ক্রমশ তা রূপান্তরিত হতো কাতর অনুনয়ে। কামিনী বেলি জুঁই শেফালি হাসনুহানা ইত্যাদি বিভিন্ন রাতে-ফোটা ফুলের নাম ধরে ডাকত সে, যা শুনে মনে হবে বুঝি শাকম্ভরীর মন গলানোর জন্য। কিন্তু আসলে সেসবই কাটুনিডাঙার দেহপোজীবিনীদের নাম, স্মৃতিবিভ্রমে স্ত্রীর নাম ডাকতে গিয়ে ওই নামগুলিই অচেতনে বেরিয়ে আসত মুখ দিয়ে। শাকম্ভরীর মন অবশ্যই তাতে গলত না। তিনি শক্ত করে বুক বেঁধে দরজায় খিল তুলে দিতেন।

রাধারাণীও তাই করল। এবং তার ফলে তারিণী ক্রমশ নিষ্ঠুর হয়ে উঠল, পাশের ঘরে আত্মগোপন করে থাকা আহত সহর্ষের সঙ্গে ওর যৌন সম্পর্কের কুৎসিত ইঙ্গিত করতে লাগল। বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে স্খলিত কণ্ঠস্বর চড়িয়ে বলতে লাগল ―

‘সবই ওকে দিচ্ছ? আমার জন্যে কি কিছুই নেই, রাণী?’

রাধারাণী যখন দরজার ওপাশ থেকে ফিসফিস করে অনুনয় করত–‘কী সব বলছ তুমি? সবাই শুনতে পাচ্ছে! এসব বলে হাতকাটা ছেলেটাকে আর যন্ত্রণা দিও না!’ তখন দ্বিগুণ তেজে তারিণী চিৎকার করত, যাতে একতলায় চাকর কর্মচারী ও আশ্রিতদের কানেও পৌঁছয়–

‘ঠিকই বলছি! ওর হাত নেই তো কী! যে অঙ্গটা তোমার কাজে লাগবে সেটা তো আস্ত আছে না কি?’

দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে রাধারাণীর দিন কাটছিল। এরই মধ্যে বনলতা সহর্ষের সংস্পর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সন্ত্রাসবাদীদের দলে নাম লেখালো। পরে জানা যায়, সে নিয়মিত বেথুন কলেজের কেমিস্ট্রির ল্যাবরেটরি থেকে বোমা তৈরির রাসায়নিক সরিয়ে গোপনে বাইরে পাচার করছিল। এসবই সে করে বাগবাজারের বাড়িতে থেকেই, কিন্তু সেই সময় রাধারাণী নানা দিক থেকে এতটাই বিপর্যস্ত ছিল যে এসব তার নজরে পড়েনি।

নজরে যখন এল ততদিনে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে, বনলতা দলে সর্বসময়ের কর্মী হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। তার কিছুদিনের মধ্যেই ওদের ষড়যন্ত্রের ছক ফাঁস হয়ে গেল, দুজন সন্ত্রাসবাদী চাঁদেরডাঙায় ফরাসী উপনিবেশে সংঘর্ষে নিহত হলো, বনলতা নিখোঁজ হলো। তার অনেক আগেই অবশ্য বিন্দুমাধব সহর্ষকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। পুলিশ বাগবাজারের বাড়িতে চিরুনি তল্লাসি চালিয়েও কিছুই পেল না। ছাপাখানা থেকে যাবতীয় কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে গেল, যদি কোনো সূত্র পাওয়া যায়। কিন্তু পাঁজি আর ডাক্তারি বইয়ের পান্ডুলিপি ও গ্যালি প্রুফ থেকে কিছু পাওয়া গেল না, প্রেস অ্যাক্ট লঙ্ঘন হয়েছে এমন কিছুও পাওয়া গেল না।

এদিকে তারিণীর স্বভাব চরিত্রের অধোগতি অব্যাহত রইল। রাধারাণী শুধু যে ওর যথেচ্ছ টাকা ওড়ানোয় রাশ টেনেছিল তাই নয়, কোনো সুদখোর মহাজন যাতে ধার না দেয় সেই ব্যবস্থাও করেছিল। এবার সে মরীয়া হয়ে ব্ল্যাকমেইল শুরু করল, হুমকি দিতে লাগল টাকা না দিলে সহর্ষকে বাড়িতে আশ্রয় দেবার ব্যাপারটা পুলিশের কাছে গিয়ে ফাঁস করে দেবে, জানিয়ে দেবে বনলতাকে কলকাতায় এনে রেখে রাধারাণী ওকে সন্ত্রাসবাদী হতে ইন্ধন দিয়েছে।

দশহরার দিনে ভোরবেলা আর্মানি ঘাটের কাছে স্নানার্থীরা দেখল ট্রামলাইনে পড়ে আছে একটি মৃতদেহ। তার মাথার পেছনে ঘোড়ার খুরের দাগ, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তার অনেককাল আগেই কলকাতায় বিদ্যুতে টানা ট্রাম হয়েছে। ট্রামওয়ে কোম্পানির শেষ বৃদ্ধ প্রায়ান্ধ কালো রঙের অস্ট্রেলিয়ান ঘোড়াটি তখনও লোকজনের দয়াদাক্ষিণ্যে বেঁচে আছে। রাস্তা থেকে আবর্জনা খুঁটে খায়, ভোরবেলায় রাস্তায় যানবাহন বেরোনোর আগে সে উত্তর কলকাতায় তার পুরোনো চলার রুট ধরে পরিক্রমা করে বেড়ায় প্রেতের মতো। স্থানীয় মানুষের কাছে সে অতি পরিচিত দৃশ্য। তারিণীচরণ লাহিড়ির দেহ সনাক্ত করার পর ময়নাতদন্তে পাঠানো হলো। কিন্তু অতিরিক্ত মদ্যপান করে ট্রামলাইনের ওপর ঘুমিয়ে পড়ার পর ঘোড়াটির খুরের আঘাতে মাথা থেঁতলে যায়, নাকি আগেই কেউ মেরে ওখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল, সেই রহস্যের কোনো কিনারা হলো না।

আদিরাম প্রেসের বাড়িটির ওপর প্রশাসনের নজর ছিলই। ওখানে সন্ত্রাসবাদী লুকিয়ে থাকার খবর পেয়েও পদক্ষেপ নেবার আগেই শেষ মুহূর্তে শিকার হাত থেকে ফসকে যায়। এরপর বনলতার ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

বাগবাজারের বাড়িতে পাগলরামের আমলের ঘোড়ায় টানা রুহাম ছিল। লালবাজার থেকে গোয়েন্দা অফিসাররা এসে তল্লাসি চালিয়ে বাদামি রঙের দশাসই কাঠিয়াওয়াড়ি ঘোড়াটির খুরের ফাঁকে রক্তের চিহ্ন পেল। এমনিতে শহরের রাজপথে বাঁধানো কবল-স্টোনে ঘোড়ার পায়ের নীচে ছোটোখাট ক্ষত কিছু অস্বাভাবিক নয়, তাছাড়া ওই রক্ত ঘোড়াটির নিজের নাকি মানুষের সেটা পরীক্ষা করার মতো প্রযুক্তি তখনও কলকাতায় আসেনি। কিন্তু দুটি ঘটনার পারম্পর্যে পুলিশি সন্দেহের লক্ষ হয়ে উঠল রাধারাণী। বারে বারে থানায় ওকে ডেকে পাঠিয়ে জেরা চলল, খবরের কাগজে এই মৃত্যুর বিষয়ে সবিস্তারে কেচ্ছাকাহিনি লেখা হতে লাগল। সেসব গিলতে লাগল সাতগাঁয়ের মানুষ, ধর্মতলায় নেশাড়ুদের ঠেক সরগরম হলো। পাগলরামের কলকাতায় গিয়ে প্রতিষ্ঠালাভ নিয়ে বহু মানুষের হৃদয়জ্বালা ছিলই, তাতে ঘৃতাহুতি পড়ল। আদিরামবাটির লোকজনও তার বাইরে ছিল না।

ব্যতিক্রম সরোজা। পরিবারেরই একটি শাখার এই কঠিন বিপর্যয়ের দিনে সে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রামপ্রাণকে কিছু না জানিয়ে কলকাতার বাড়িতে আসে, রাধারাণীর পাশে দাঁড়ায়। সুনির্মল ইংল্যান্ড থেকে বাড়িতে ফেরার পর অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হলে সাতগাঁয় ফেরে। রামপ্রাণের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে যায় হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স ও আদিরাম প্রেসে ছাপা মেটিরিয়া মেডিকা পিউরার প্রথম বঙ্গানুবাদ।