Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১১.১

১১.১

প্যারিসে সেন নদীর বুকে ইল সাঁ-লুই থেকে ডাকযোগে পার্সেল এল আদিরামবাটির ঠিকানায়। মঁসিয়ে পাগলরাম চক্রবর্তীকে পাঠিয়েছেন শার্ল লেবো-দুফে, একটি চিঠি ও একটি বই। দুটিই ফরাসী ভাষায় লেখা। বইয়ের নাম Une Fleur En Enfer, আর হাতে-লেখা চিঠির ওপরে পাগলরামের নাম নয়, লেখা আছে–A une Malabaraise। এটুকুই শুধু উদ্ধার করা গেল। যথারীতি পাগলরাম শরণাপন্ন হলো দাদা গঙ্গারামের। গঙ্গারাম শরণাপন্ন হলো তার বাল্যবন্ধু গুঁফো গোঁসাইয়ের। কিছুকাল হল অগস্টিন দুফের বেতনভূক কর্মচারী হয়েছে গুঁফো, সেই একমাত্র এই চিঠির মর্মোদ্ধার করে আনতে পারে।

তামার পাতে সিলভার আয়োডাইড মাখিয়ে সেটিকে পারদের বাষ্পের ওপর ধরলে তাতে অপস্রিয়মাণ আলোছায়ার বিন্যাস ধরে রাখা যায় লুই ডাগের নামে ফ্রান্সের এক থিয়েটারের মঞ্চ স্থপতির এই আশ্চর্য আবিস্কারে সাড়া পড়ে গেল। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র আকাদেমি দ্য সিয়ঁস— ‘উড়ন্ত আলো বন্দি করার’ এই বৈপ্লবিক প্রযুক্তি সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে উন্মুক্ত করে দিল।

সমগ্র নয়, মি’লেডি, গ্রেট ব্রিটেন নয়। ইংরেজদের সঙ্গে তাদের পুরোনো শত্রুতা, তখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কলোনি দখলের রেষারেষি চলেছে। লুই ডাগেরের এই ডাগেরোটাইপ প্রযুক্তি ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে গেলে ফরাসি সরকারের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হলো। আর এই সুযোগের সদব্যবহার করল অগস্টিন দুফে, রু দ্য বেনারসের ধারে খোড়ো চালের লম্বাটে গুদামঘরে ডাগেরোটাইপ স্টুডিও খুলে ফেলল কলকাতার আগেই। তার্পিন তেলের বাষ্পের ভেতরে কর্মেট গাউন আর টুপি টেলকোট পরে বসে তাতানো চুনাপাথরের আলোয় ঘামতে ঘামতে একবারও চোখের পলক না ফেলে দশ ফ্রাঙ্কের বিনিময়ে যুগলে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে গেল ফিরিঙ্গিপাড়ায় সাহেবমেমদের। বছর না ঘুরতেই চিনিকলে মন্দা পুষিয়ে নিতে শুরু করল দুফে।

একা কিংবা যুগলে কাগজে ছাপা অবিকল সাদাকালো প্রতিকৃতি ফ্রেমে বাঁধিয়ে ম্যান্টলপিসের ওপর না রাখলে আজকাল আর বসার ঘরের অঙ্গসজ্জা সম্পূর্ণ হয় না। ছুটির দিনে কলকাতা থেকে বজরায় হাওয়া খেতে খেতে সুবেশ ইংরেজ সাহেব- মেমদেরও ঢল নামে। যৌন পর্যটন, সুরা পর্যটন কিংবা আখের ক্ষেতে সড়কি দিয়ে বুনো শুয়োর গেঁথে পিগ-স্টিকিং খেলার মতো কোয়ার্সভিলের মুক্ত প্রমোদের পরিবেশে অপস্রিয়মাণ সুখের মুহূর্ত আলোক রশ্মির সাহায্যে কাগজে গেঁথে রাখার এও এক অভিনব পর্যটন বই তো কী?

ঘোড়ার পিঠে চড়ে সড়কি হাতে বুনো শুয়োর তাড়া করার ছবি অবশ্য ধরা যায় না এতে। কিন্তু দুপুরের কড়া আলোয় বাইরে খোলা চত্বরে রাস্তায় তেপায়ায় ক্যামেরা বসিয়ে দীর্ঘ এক্সপোজারে তোলা যায় কোয়ার্সভিল ও আশেপাশের ইমারতের ছবি: ঘড়িঘর, সিস্টার্স অফ ক্লুনি কনভেন্ট, হুগলি পাড়ের প্রমোড, ম্যাওবেড়ালের গির্জা ছাড়াও ধর্মতলার প্রাচীন বটবৃক্ষ, বর্গিব্যাটারির মিনার, গড়ের ধ্বংসাবশেষ, আদিরামের মন্দির, গাজির বাগানে দরপ খাঁর মসজিদ, ইত্যাদি। অনেক কাল ধরেই ইংরেজ খুড়ো-ভাইপো টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল, উইলিয়াম হজেস ও অন্যান্যদের আঁকা নিসর্গচিত্র জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু সেই মহার্ঘ্য অ্যাকোয়াটিন্ট ঘরের দেয়ালে ঝোলানোর মতো ট্যাকের জোর আছে কি আর রাইটার-ফ্যাক্টরদের? দুফের তোলা বিখ্যাত স্থাপত্যচিত্র পোস্টকার্ডের আকারে এক সিকিতে বিকোয় কলকাতার চিৎপুরে বটতলার বাজারে। কারবার ফুলে ফেঁপে উঠতে চাঁদেরডাঙার ইংরেজি-জানা বাঙালি যুবক মথুরচন্দ্র রায়কে এজেন্ট করে রেখেছে দুফে। মথুর হল কিংবদন্তীপ্রতিম বানিয়ান বাবু গোকুলচন্দ্র রায়ের বংশধর। এছাড়া স্টুডিওয় কলকব্জা রক্ষণাবেক্ষণ আর সাহেব ছবি তুলতে বেরোলে ক্যামেরা আর তেপায়া ঘাড়ে নিয়ে যাওয়ার সহকারী হিসেবে রেখেছে গুঁফো গোঁসাইকে।

গুঁফোর হাতে শার্লের লেখা চিঠি দেখে অগস্টিন দুফের মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা গেল কেন শার্ল চিঠিটি মামাকে না পাঠিয়ে পাগলরামকে পাঠিয়েছে। দিদিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এদেশে ভাগ্নের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখেনি দুফে। খালের ধারে পছন্দের ঠান্ডা বাংলোটা ছেড়ে দিয়েছে, নিজের শখের ক্যালেশটিও ছেড়ে দিয়েছে, স্বর্ণমুদ্রা খসিয়ে ওর মনোহরা রমণী তুলে এনে দিয়েছে গোরস্থান থেকে। মনে আশা ছিল, এই বিধর্মীর দেশে মামার কবরে প্রথম মাটিটা ফেলবে শার্ল। কিন্তু সে গুড়ে বালি দিয়ে কিছুকাল অলস আফিমখোরের মতো দিনযাপন করল, তারপর আচমকা একদিন কলকাতায় পালিয়ে জাহাজে চড়ে বসল।

গভীর বিরক্তি নিয়েই টানা জড়ানো হস্তাক্ষরে লেখা চিঠিটি পড়ে গুঁফোকে তার তর্জমা শোনালো দুফে। ঠিক চিঠি নয়, ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটি লাইন, গির্জায় পাপস্বীকারের খুপরিতে যেমন লোকে বলে। এবং লেখা হয়েছে এক মালাবারের কন্যার উদ্দেশে, পাগলরামকে নয়। সাতগাঁয়ে ওর ঠিকানায় খামটা এসেছে এই মাত্র। সঙ্গের বইটি কবিতার সংকলন–নরকে এক ফুল।

সাহেবের ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে অপ্রতুল ভাষার ভেতর দিয়ে গুঁফো গোঁসাইয়ের মনে ফুটে উঠল আধোচেনা দৃশ্যকল্প। মনে পড়ল ডোঙা শর্মার কন্ঠে শোনা বহু যুগ আগের সেই আদি বাংলার রহস্যগীতি, বর্গিব্যাটারির সিঁড়িতে বসে শোনা, মনে পড়ল সেইসব কমলা রঙের কাঁচকলাইয়ের গন্ধে ভরা বিকেল, ছলাৎছল জলের শব্দ, ভাঙা ঘাটলায় বাঁধা গুরুদেবের তালডোঙার মৃদু উথালপাথাল বাঘিনীর হৃদয়ের মতো, এক শিঙেল হরিণের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছিল যে।

সাহেবের বাংলোয় আসা যাওয়ার মাঝে গুঁফো বার কয়েক মেয়েটিকে দেখেছে– বেতের ধামায় ফল কিনে আনছে তার মনিবের জন্য, কুয়ো থেকে জল তুলছে, চান সেরে রোদে বসে একমাথা ভিজে চুল শুকোচ্ছে। দাসদাসীদের কোনো নাম থাকে না, সে জানে। বাংলোর আসবাবপত্রের মতোই ওদের কেনাবেচা হয়, এমনকি ভাড়ায় পাওয়া যায়। কোনো কোনো রসিক সাহেব বিছানার দাসীকে স্বদেশে ছেড়ে-আসা স্ত্রী কিংবা প্রেমিকার নাম দিয়ে ডাকে। কেউ কেউ আবার দেশ থেকে সদ্য আগত বন্ধুবান্ধব কিংবা কোম্পানির কর্তাকে ধারও দেয়। দাসপ্রথা বেআইনি হয়েছে, তবে স্থানীয় প্রশাসকেরা এসব দেখেও দেখে না। পন্ডিচেরিতে গভর্নরের নজরদারির বৃত্ত থেকে অনেক দূরে কোয়ার্সভিলের এই ছায়ানগর

‘চিঠিটা পাগলরামকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়নি বটে, কিন্তু আদিরামবাটির ঠিকানায় তো এসেছে।’ গঙ্গারাম সব শুনে বলল। ‘এখন আমাদের দায়িত্ব এটি সেই দাসীর কাছে পৌঁছে দেবার।’

কিন্তু শার্ল দেশে ফিরে যাবার পর সেই ঝি কোন চুলোয় গেল কেউ তার হদিশ রাখেনি? কোয়ার্সভিলে দিন কয়েক ঘোরাঘুরি করে গুঁফো জানালো

‘মাগীর নাম গাঙী। ক্লুনির নানেদের মঠে ওর দিদিমা থাকে। কিন্তু সেই ঝি ওই দিদিমাবুড়ির কাছেও ফিরে যায়নি।’

‘জলে ঘেরা ফিরিঙ্গিডাঙা ছেড়ে কোথায় আর যাবে? ওর খোঁজ ঠিকই মিলবে।’ গঙ্গারাম বলল।

কিন্তু এক সামান্য ক্রীতদাসীকে কীভাবে খুঁজে বের করা যাবে? কীভাবেই বা তার কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে এই বার্তা যে তার প্রাক্তন মনিব তাকে ভোলেনি? গরু হারিয়ে গেল খুঁজে পাওয়া বরং এ তল্লাটে সহজ। গুঁফো গোঁসাই অবশ্য হাল ছাড়বার পাত্র নয়। তার তৎপরতায় ক্রমশই স্পষ্ট হতে লাগল শার্ল লেবোর সেই গাঙী গিয়ে ঠেকেছে সেই ঠিকানায়, যেখানে পরিত্যক্ত ক্রীতদাসী থেকে শুরু করে আস্তাকুঁড়ে-ছুঁড়ে-ফেলা, মৎস্যভূমির জোয়ারে ভেসে যাওয়া, উরুর ধারণক্ষমতা হারিয়ে যায়নি এমন সকল নারীই শেষ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে, যেখানে সব কিসিমের সব জাতের সব গোত্রের জন্য সুনির্দিষ্ট চাহিদা রয়েছে, এবং ক্লুনির সন্ন্যাসিনীদের মঠের মতো যার দরজা কখনোই বন্ধ হয় না; কাটুনিডাঙা।

.

এই রকম স্থানে এলে গুঁফো গোঁসাইয়ের মনোবল যে খুব বেড়ে যায় সেটা অনেককাল আগে ধর্মতলায় গাজন পুর্ণিমার মেলায় চাক্ষুষ করেছে গঙ্গারাম। এখন ওরা আর নবীন কিশোর নয়। কবিরাজ হিসেবে গঙ্গারামের নামডাক হচ্ছে, সাতগাঁর বাইরের লোক তাকে দেখে চিনতে পারে। বুকের মধ্যে সেই চেনা হাতুড়ির ঘা টের পায় সে, ডিঙি বেয়ে মিশন হাউসে যাবার সময়ে যেমন হতো। জলের ওপর বাঁশ-দর্মার বস্তিটা দ্রুত পার হয়ে যাবার সময়ে আড় চোখে তাকালে দেখা যেত ওদের মাচায় নগ্ন পা ঝুলিয়ে বসে হাওয়া খাচ্ছে, হাত আয়নায় রূপচর্চা করছে, একে অপরের মাথার উকুন বাছছে, বেসুরো গলায় গান গাইছে, হাসিঠাট্টা চুলোচুলি করছে।

সকালের আলোয় কাছ থেকে রংবিহীন মুখগুলো ক্লান্ত, ভাঙাচোরা দেখায়। রাতজাগা চোখে কাজল লেপে গিয়েছে, সদ্য ঘুম থেকে ওঠা ঠোঁটের কোণে শুকনো কষ। জলের ধারে উবু হয়ে বসে আলুথালু পোশাকে মুখ ধুচ্ছে কেউ, কেউ কাপড় কাচছে, ঘরের বাইরে তোলা উনুনে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে কষে চুনো মাছ রান্না করছে একজন। ঘরের নীচেই খলবলে জলে, মশারির জাল পেতে ধরেছে মাছ। একদল সদ্য ঘুম থেকে উঠে বসেছে চৌকাঠে, পরনের ঘাগরা উরুর ওপরে তুলে নদীর হাওয়ায় খোঁয়াড়ি ভাঙছে। গুঁফো ও গঙ্গারামকে দেখে একজন মুখের থেকে নিমের দাঁতন বের করে পিচ করে থুতু ফেলে বলে

‘এ যে দেখি জোড়া বাঁউনঠাকুর এয়েচেন গো!’

 পাশের ঝুপড়ি থেকে অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বলে ওঠে–‘বলিস কী লা? সক্কাল সক্কাল? কীসে এত গরম খেলে গা?’

‘তার আমি কী জানি বাপু?’ প্রথম জন ঠোঁট উলটে মুখে ফের নিমের দাঁতন গোঁজে।

‘তোর কাচে এয়েচেন তুই নে না রে মুক্তো, সকালবেলা বামুনসেবা করলে দিনটা পয়া যাবে!

মাছ রান্নার বাষ্পের ওধারে একটি দরমার জানলা সশব্দে খুলে যায়। একটি মুখ, তখনও রাতের প্রসাধনের চিহ্ন লেগে আছে, বলে ওঠে–

‘আমার কাচে এসো গো পোঙিমহায়, জোড়ায় এসো, কানে পৈতে জড়িয়েই এসো! দু সিকে দিও কিন্তু!’

সেই আহ্বান শুনে খিলখিল করে হেসে ওঠে প্রথম দুজন।

গুঁফোর মুখে এখানে এই সাতসকালে আসার উদ্দেশ্য জেনে ঘাগরা-পরা মেয়েটি বলে ওঠে

‘শোনো গো! চিঠি দিতে এয়েচেন এঁয়ারা!’

আরেক প্রস্থ হাসির ফোয়ারা ছোটে। জানলার মেয়েটি বলে,— ‘এখানে সব গোমুখ্যুর ঝাড়! কার বাস্কে ফেলবে গো চিটি? কোন বাস্কো তোমার মনে ধরেছে? ও পোঙিৎ বল না! কত লম্বা গো তোমার চিটি?’

দ্বিতীয়জন এক বয়স্কাকে ডেকে নিয়ে আসে। রূপোর নাকছাবি কানপাশায় সজ্জিত তার মুখে বর্মী ছাপ স্পষ্ট, দশাসই চেহারা। নীল সায়া বিপুল দুই বুকের ওপর তুলে গিঁট বেঁধে কাঁধে হলুদ বিষ্ণুপুরী গামছা জড়িয়েছে। গুঁফোর মুখে গাভীর বর্ণনা শুনে সেই প্রবীণা ওদের নিয়ে আসে কোণের দিকে ঝুপড়িতে। বাঁশের দরজা বন্ধ, শিকল নামিয়ে দরজা খুলে অন্ধকার গর্ভ থেকে বের করে আনে একজোড়া জুতো কালো পেটেন্ট চামড়ার, গোড়ালি-তোলা, পেতলের বকলশ আঁটা, জুতোর ভেতরে সিঁদুর মাখানো কড়ি আর চামড়ায় ছুরির অসংখ্য দাগ। এই জুতোজোড়া যে একদা শার্লের ছিল সেটা আর বলে দিতে হয় না।

‘আর গাঙী?’

বর্মী নারী বুকের গামছা টেনে মুখমন্ডল মুছে জলের দিকে অপাঙ্গে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলে–

‘সে নেইকো। সে গ্যাছে। যে মুড়ো থেকে এয়েছিল সেই মুড়োতেই গ্যাছে।’

.

তিনকড়ির ঘাটে গাঙীর ফুসফুস-ছেঁড়া ডাক শুনতে পায়নি শার্ল, কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেই অশ্ৰুত ডাক তাকে তাড়া করে ফিরবে। সেই আর্ত ডাকের সঙ্গে তার স্মৃতিতে মিশবে আখের ক্ষেতে সড়কিবিদ্ধ গর্ভবর্তী শুকরীর আর্তনাদ, ভোজের টেবিলে যার ঝলসানো পেট থেকে বেরিয়েছিল নটি সুসিদ্ধ শাবক, সুবেশা মাদামদের চোখে ঠোঁটে লালাসিক্ত উল্লাস, বীভৎস নারকীয়তায় মেশা এক বিচিত্র কামরস যা আবুলির মতো ভারি হয়ে বসে চেতনায়। এইসব স্মৃতির অনুভূতিমালা দিয়ে সে সাজিয়ে তুলবে যেভাবে কলোনি-ফেরত স্বদেশবাসীরা সালোঁর দেয়াল ম্যান্টেলপিসের তাক সাজায় এক আশ্চর্য কাব্যভাষার ছিটমহল। একই সময়ে দুইটি স্থানে ও সময়কালে বাঁচার যে বোধে সে বিদ্ধ হয়েছিল কোয়ার্সভিলে এসে, প্যারিসে ফিরে গিয়েও সেটা রয়ে যাবে। মৎস্যভূমির মদালস আবুলি মমার্তের গলিতে পড়ে পাওয়া নারীদের উরুর মাঝে কবরস্থ করবে, বার কয়েক আত্মহত্যার চেষ্টাও করবে। পথেঘাটে সেন নদীর সেতুর নীচে শত শত গাঙীকে হেমন্তে ঝরা মেপল পাতার মতো উড়ে বেড়াতে দেখবে। প্রাচ্যদেশের ক্রীতদাসী, জাহাজে চাপিয়ে দেশে এনে ছেড়ে দিয়েছে, পথকুকুরীর চেয়েও অধম তাদের জীবন। ভিড়ে ঠাসা কামুক মহানগরের অলিতে-গলিতে সরাইখানার পেছনে নাবিক মাতাল ভবঘুরেদের জটলায় খুঁজে বেড়াবে, হাড়কাঁপানো শিলাবৃষ্টি আর তুষারপাতের ভেতর দেখবে একলা মেয়ে গাঙীকে গায়ে তার ফিনফিনে মসলিন, রোগা দুবলা দেহ, হিমকুঞ্চিত ত্বক, নিষ্ঠুর বক্ষবন্ধনী এঁটে বসেছে, অসহায় পথভ্রষ্ট মাথা কুটে মরছে সৌধের পাথরে, উচ্ছিষ্ট খাবার খুঁটে খাচ্ছে, আবিল কুয়াশায় ওর দুখিনী চোখ দুটো, আশ্চর্য বড়ো চোখ দুটো, ঘুমোলেও যার পাতা বন্ধ হয় না, নিষ্ফল খুঁজে মরছে নিস্তরঙ্গ নারকেল বীথির মরীচিকা।

একদিন মমার্তের এক কৃষ্ণাঙ্গ নর্তকীর ভেতরে সে খুঁজে পাবে গাঙীর ছায়া।