Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৩.১

৩.১

লম্বা কাঠের হাতলযুক্ত ব্রোঞ্জের ত্রিভুজাকার সিলটা কাপ্তেনের কেবিনে দেখে রুয়ানো ডে ইনফান্টে জিজ্ঞেস করেছিলেন— ‘এই বস্তুটি কী?’

কাপ্তেন কার্লোস লুজাডো হলদে স্কার্ভি-পচা দাঁত মাড়ি বের করে সজোরে হেসে উঠেছিল। ‘রোসো পাদ্রে! শিগগিরই জানতে পারবে!’

তিনদিন আগে সাও আমারো উত্তমাশা অন্তরীপের বেয়াড়া ঝঞ্জা পেরিয়ে শান্ত আরব সাগরে পড়েছে। কপাল খুব খারাপ না হলে এর পরের যাত্রাপথ মসৃণ। সে কথা ভেবে জাহাজিদের মনে, রুয়ানোর মনেও, ফুরফুরে হাওয়া বইছিল। ব্রোঞ্জের সিলটা আগুনে লাল করে মনুষ্যদেহে চেপে ধরলে কেমন চিড়বিড়ে শব্দ হয় আর চামড়া-পোড়া গন্ধ ওঠে সেটা তখন কল্পনাও করতে পারেননি লাল-চুলো এই যাজক। অথচ এরপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অনেক চেষ্টাতেও কিছুতেই স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারবেন না রাশি রাশি নগ্ন পাছায় ত্রিভুজাকার ছাপ, জেলিয়া নৌকোর খোলে মাছের মতো গাদাগাদি, লোহার খাঁচায় ঠাসা মানুষগুলোকে। কিছুতেই ভুলতে পারবেন না ডজন ডজন জোয়ান নারীপুরুষের দেহনির্গত ঘাম- মুত্র-বিষ্ঠার তীব্র গন্ধ আর বিরতিহীন গোঙানির ধ্বনি, যা খাঁচার মাথায় দাঁড়িয়ে নাবিকেরা লম্বা লাঠি খুঁচিয়ে নিষ্ফল থামানোর চেষ্টা করে, না পেরে হতাশ হয়ে মুত্রত্যাগ করে ওদের গায়ে।

বাদাবনের ভেতর তিন মাস্তুলের কারাভাল সাও আমারো-য় রুয়ানো ডে ইনফান্টের দু-দুটো মৌসম কেটে গেল। দিনের পর দিন একই নারকীয়তার পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে ঈশ্বরে বিশ্বাস টলে গিয়েছিল। কতদিন সকালে যে মনে হয়েছে দাড়ি কামানোর ক্ষুরটা দিয়ে নিজের কন্ঠনালিটা ছিঁড়ে ফেলেন যাতে এই নোনা খাঁড়িতে ঘেরা সবুজ নরকের গোলকধাঁধা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।

তাছাড়া পরিত্রাণের উপায় কী? দুদে সারেঙরাও পথ হারায় যে কুখ্যাত বাদাবনে, সেখানে ডাঙায় নেমে পালানোর চেষ্টা মানে দঁক কাদায় গাছের শ্বাসমূলে রসুইখানায় শুয়োরের মতো গিঁথে মরা। আর নয়তো বাঘ কুমিরের পেটে যাওয়া।

সেটা আর পেরে ওঠেননি রুয়ানো। এদিকে মুক্তিপণ দেবার মতো অর্থও তাঁর ছিল না। দেড় বছর আগে এক জুলাইয়ের সোনালি বিকেলে লিসবন থেকে সাও আমারো যখন ছাড়ল, রুয়ানোর সঙ্গে চামড়ার বাক্সে তিন প্রস্থ ভেস্টমেন্ট, একটি বাঁধানো বাইবেল, প্রার্থনামালা, আরেকটি ছোটো বাক্সে শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম। ওঁর মা ও দুই বোন এসেছিল বিদায় জানাতে। ডেকের ওপর থেকে ওদের হাত নাড়তে নাড়তে, বন্দরের মাথায় রোদে-রাঙানো টালির ছাতগুলো সরে যেতে দেখে রুয়ানো ডে ইনফান্টে মনে মনে ভেবেছিলেন, তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন, এ অগস্ত্য যাত্রা। আর কোনোদিন ফেরা হবে না। কিন্তু সেই যাত্রা যে এমন দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠবে কেই-বা জানত?

সেগোভিয়ায় বংশপরম্পরায় কাঠমিস্ত্রি ডে-ইনফান্টেরা না হিস্পানি না পর্তুগীজ। নিজেদের আইবেরীয় বলে দাবী করত তারা। পনেরো বছর বয়সে রুয়ানো স্থানীয় গির্জার বৃত্তি পেয়ে পড়তে যান জারগোজার ফ্যাকুলতা দে মেদিসিনায়, যা পশ্চিম দুনিয়ার অন্যতম প্রাচীন চিকিৎসা শিক্ষার কেন্দ্র। পোপের বিধানে সেটি তৈরি হয়, নগরের আর্চবিশপ তার আচার্য। সকল বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষানবিশকে ধর্মশিক্ষার পাঠ নিতে হয়। খেতাব অর্জনের পর রুয়ানো ডে ইনফান্টে কিছুকাল পর্তুগীজ উপদ্বীপের ছোটো ছোটো বিভিন্ন শহরে প্র্যাক্টিস জমানোর চেষ্টা করেন। তাঁর মাথায় লাল চুল আর গালা-বার্নিশের ছোপ-লাগা বংশ পরিচয় যে শল্যবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের অনুকূল নয় সেটা ক্রমশ টের পেতে থাকেন। সেই সঙ্গে যুক্ত হলো দুনিয়া দেখার অদম্য কৌতূহল। যে কৌতূহল থেকে জারগোজার ফ্যাকুলতায় শবব্যবচ্ছেদের ঘরে মানবদেহের আন্তর্গঠন দেখে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতেন, তাই শেষ পর্যন্ত রুয়ানোকে টেনে আনল প্রাচ্যের নৌ বাণিজ্যের লাইনে। লিসবনের জাহাজঘাটায় কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে ভারতগামী কারাভালে জাহাজী পাদরির কাজ জুটে গেল।

অ্যাটলান্টিক থেকে বঙ্গোপসাগর এসে পৌঁছতে সাও আমারোর আট মাস লেগে গেল, তারপরে শুরু হল নদীপথে যাত্রা। সাগর ছাড়তে জলের রঙ ক্ৰমশ নীল থেকে শ্যাওলা সবুজ, তারপর মোহনার কাছাকাছি এসে ধূসর বাদামি। তীর দেখতে পাবার আগেই গাঙ্গেয় কাদার রঙ তরল ভূমির বিভ্রম সৃষ্টি করল। তারপরে দেখা দিল নিশ্ছিদ্র বাদাবন। মৌসুমী হাওয়া আর জোয়ারের দ্বিমুখী টানে সেই বাদাবনের যবনিকা সরে গেল, জাহাজটা ঢুকে পড়ল যেন এক সবুজ রাক্ষসের পেটের ভেতর –বায়ুহীন, আর্দ্র, বাতাসে রক্তের নোনা গন্ধ।

এবং রক্ত দেখলেন রুয়ানো ডে ইনফান্টে। সাত বছর শিক্ষানবিশির কালে যত না রক্ত দেখেছেন তার চেয়ে ঢের বেশি দেখলেন, এবং মাত্র দুই মৌসমের মাঝে। সেইসঙ্গে দেখলেন স্বজাতির অবর্ণনীয় নিষ্ঠুরতা। আটটি মাস ও এগারো হাজার নৌমাইল যাত্রার পর জানতে পারলেন কার্লোস লুজাডো সভ্যতার প্রাচীনতম পণ্যের কারবারী। তার লোকেরা বাদাবনের ধারে বসতিগুলোয় ঢুকে সক্ষম নারী পুরুষ এমন কি শিশুও ধরে আনে, আর লুজাডো তাদের খাঁচায় পুরে জাহাজের খোল ভর্তি করে আরাকানের রাজার সঙ্গে অংশীদারি চুক্তিতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে চাটগাঁর দাসবাজারে। ব্যবসাটা চলে পাঁচ মাস, বর্ষার শেষ থেকে গ্রীষ্মের শুরু পর্যন্ত, যতক্ষণ না উপসাগর অশান্ত হয়ে ওঠে। প্রথমে সাও আমারো জলজঙ্গলের দেশে দুর্ভেদ্য অঞ্চলে নোঙর ফেলে স্থানীয় আড়কাঠির সন্ধান করে। তারপর মউলেদের দ্রুতগতি জেলিয়া নৌকা নিয়ে চকিত হানা দেয় নদীর উজানে গ্রামগুলোয়। কুঁড়েঘর গোয়াল শস্যগোলা সাঁকো নৌকা, যা কিছু দাহ্য সামনে পড়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ত্রাসের আবহ সৃষ্টি করে। তারপর শক্ত সবল পুরুষ নারী নির্বিচারে ধরে বেঁধে নৌকায় তোলে। চাষা জোতদার কুমোর কামার মহাজন তাঁতি কেউই বাদ পড়ে না। জাহাজে এনে তোলার পর প্রত্যেকের পোশাক খুলে নগ্ন করা হয়, বয়স লিঙ্গ ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী বাছাই করে বিভিন্ন দলে ভাগ করা হয়। তারপর তাদের পাছায় দেগে দেওয়া হয় কার্লোস লুজাডোর নিজস্ব সিল দিয়ে। এইসময় রুয়ানোর ডাক পড়ে ওদের স্বাস্থ্য যাচাই করার জন্য। একদল শিকলে বাঁধা অসহায় মানুষ, একদিন আগেও যারা ছিল স্বাধীন সমাজবদ্ধ, যেন এক দুঃস্বপ্নের ভেতর জেগে উঠেছে। স্বাস্থ্যপরীক্ষা আর দাগানো শেষ হলে সারিবদ্ধভাবে শেকল ঝনঝনিয়ে তারা হেঁটে যায় আরেকটি বড়ো চারশো টনের জাহাজে, যা তাদের নিয়ে যাবে চাটগাঁয়, এমনকি সুদূর জাঞ্জিবারেও। একাধারে জাহাজী পাদরি ও সার্জেন হিসেবে তাঁর আরেকটি দায়িত্ব ছিল সাও আমারো-র তেইশজন লুঠেরা খুনে ধর্ষক জলদস্যু নাবিকের দেহ ও আত্মার শুশ্রূষা করা।

দু-দুটো মৌসম ধরে ঢের জলকাদা বাদাবন, ঢের পোড়া গ্রাম থেকে উদ্গাত ধোঁয়া ও বিলাপের কুণ্ডলী, ঢের নৌকাবোঝাই শিকলে বাঁধা মানবফসল, ঢের নগ্ন ত্বকে দেগে দেবার চিড়বিড়ে শব্দ, ঢের পোড়া চামড়া আর বিষ্ঠার গন্ধ ছেনে সমুদ্র পথে ইন্ডিয়ায় আসার মূল্য চোকালেন রুয়ানো ডে ইনফান্টে। অবশেষে পরিত্রাণ মিলল। গঙ্গার মোহনা দিয়ে একটি পর্তুগীজ বাণিজ্যতরী লোহার বাঁট নিয়ে উজানপথে যাচ্ছিল, তাতে চড়ে বসলেন। অবসন্ন দেহ মন, বুকের ভেতরটা জলভরা ভিস্তির মতো ভারি। জাহাজটি সন্তর্পণে ডুবো চর এড়িয়ে, দোয়ানিয়া খাঁড়ি পেছনে ফেলে ক্রমশ মিঠে জলে এসে পড়তেই যে তাজা বাতাসটা বাদাবনে হারিয়ে গিয়েছিল, সেটি আবার ফিরে এল। পালগুলো ফুলে উঠল, ক্রমশ দুদিকে পাড়ে দেখা যেতে লাগল আম নারকেলের গাছ, খড়ে ছাওয়া মাটির কুঁড়ে। রুয়ানোর দুচোখের পাতায় ভারি হয়ে নেমে এল মিঠে তন্দ্রা, যাকে এদেশের লোকেরা বলে আবুলি। অনেক মাস পরে গভীর ঘুমে ডুবে গেলেন তিনি।

টানা আড়াই দিন ঘুমিয়ে জেগে উঠলেন যখন, দূরে মৌচাকের গুঞ্জনের মতো নদীবন্দরের কোলাহল, নীল আকাশ ফুঁড়ে উঠেছে অসংখ্য মাস্তুলের জঙ্গল, তাতে নানান দেশের পতাকা উড়ছে, নানান গড়নের ঢাও, কারাভেল আর নৌকা

‘কোথায় এলাম?’ রুয়ানো জিজ্ঞেস করলেন জাহাজের কোয়ার্টার মাস্টারকে। ‘সাতগাঁও।’ জাহাজঘাটার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বগতোক্তির মতো করে বলল কোয়ার্টার মাস্টার। ‘প্রাইমাম এম্পোরিয়াম ইন্ডে!— ‘

মি’লেডি, এক গুমোট কৃষ্ণপক্ষের রাতে পনেরো জন অশ্বারোহী নিয়ে দরপ খান আসার অর্ধ শতকের মধ্যেই শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সাতগাঁর শাসক হয়ে বসলেন। বাংলায় শুরু হলো সুলতানি আমল। দিল্লির মসনদে তখন তুঘলকেরা। মহম্মদ বিন তুঘলকের চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা দখলের চেষ্টা করে। তারপর একে একে অনেকেই। কিন্তু দিল্লি থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে কেউই বাংলাকে পুরোপুরি অধিগত করতে পারেনি, যতদিন না প্রায় আড়াইশো বছর পরে বাদশাহী সৈন্যদের হাতে নিহত হলেন বাংলার শেষ স্বাধীন সুলতান দাউদ খান। সুলতানি আমল শেষ হলো, বাংলা হয়ে পড়ল মোগল সুবার অংশ। তারপরেও অবশ্য সাতগাঁর চোখ-ধাঁধানো জৌলুসে ভাটা পড়েনি। বাণিজ্যের মৌসম জুড়ে নানান দেশের জাহাজ আসে, তাতে বোঝাই হয়ে আসে সোনার বাঁট, মোহর তৈরি হয় সাতগাঁর টাকশালে। স্বাভাবিকভাবেই কোয়ার্টার মাস্টারের চোখের দৃষ্টিতে সম্পদের লালসা দেখলেন রুয়ানো।

কিন্তু জাহাজ থামল না। আরও প্রায় তিন রশি গিয়ে ডানদিকে ঘুরে ঢুকে পড়ল অন্য একটি নদীতে, ভাটিপথে আরও প্রায় তিন রশি নেমে এসে শেষ পর্যন্ত ভিড়ল অস্থায়ী ঘাটায়। বাঁশ আর শালের বল্লায় তৈরি লম্বা সাঁকো উঠে গিয়েছে পাড়ে, গুটিকয় হোগলা পাতার ছাউনি। একচিলতে কেবিনঘরে বসে জাবদা খাতায় জাহাজ ও তার যাত্রীদের নামধাম টুকে রাখছে একজন লোক। তার বুকভর্তি তামাটে রোম, কোমরে আলগা সুতির নিকারবোকার, সিগার-গোঁজা ঠোঁট গভীর বিরক্তিতে বাঁকা।

‘এও কি সাতগাঁও?’ রুয়ানো হাতের চামড়ার ব্যাগটা নামিয়ে শুধোলেন।

‘না হে পাদ্রে!’ লোকটা ওকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল। ‘এ হল পোর্তো পেক্যেনো।

তারপর রুয়ানোর দমে যাওয়া মুখের ভাব ঠাওর করে হঠাৎ আমোদ পেল। ছদ্ম সান্ত্বনার স্বরে যোগ করল— ‘পোর্তো গ্রান্দে যেতে হলে সোজা চলে যাও চাটগাঁও। এ বাপু চাটগাঁও নয় সাতগাঁও নয়। হা হা হা হা! পোর্তো পেক্যেনো! কচি খোকার নুনুর মতো! হা হা হা হা!’