সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.৩
৯.৩
একুশ বছর পূর্ণ হবার আগেই শার্ল লেবো ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মগুলি চাক্ষুষ করে ফেলেছে, ইউরোপীয় ভাষায় যাবতীয় প্রধান সাহিত্য পড়ে ফেলেছে, প্যারিসের সবকটি বিখ্যাত অপেরা দেখেছে, সবকটি বিখ্যাত সালোঁর আড্ডায় যাতায়াত করেছে, এক প্রধানা অপেরা গায়িকার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে আবার ভেসেও উঠেছে, সবকটি মুখ্য বেশ্যালয়ে গিয়েছে এবং সিফিলিস বাঁধিয়েছে। শিল্প সংগ্রাহক জোসেফ লেবো ও তাঁর চেয়ে চল্লিশ বছরের ছোটো এক নারীর হিমেল বিবাহে জাত ফল সে। শার্লের মা ক্যারোলাইনের পরিবারে প্রায় সকলেই ছিল বদ্ধ উন্মাদ ও জড়বুদ্ধি। শৈশবে এক সহৃদয় দম্পতি তাঁকে দত্তক নেন। ওঁরাই জোসেফের সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেন। শার্ল বড়ো হয়েছে এক পুরোনো বেলেপাথরের বাড়িভর্তি রাশি রাশি মূর্ত বিমূর্ত ক্যানভাসে ছবির বিষণ্ণ আবহে, যেখানে প্রায় কখনো সূর্যের আলো ঢুকত না। পিতার মৃত্যুর পর মা বিবাহ করেন এক সেনা অফিসারকে, এবং মূলত সৎপিতার উদ্যোগে উচ্ছন্নে যাওয়া শার্লের চারিত্রিক পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তাকে বাংলায় নির্বাসনে পাঠানোর ব্যবস্থা হয়।
এক ফেব্রুয়ারির ক্ষুরধার সকালে এক ট্রাঙ্ক ভর্তি গ্রীষ্মের পোশাক আর তিন ট্রাঙ্ক ভর্তি সাহিত্যগ্রন্থ নিয়ে শার্ল লেবো যখন সিসিনা নাম্নী জাহাজে চড়ে বসল, মনে মনে সে ফন্দি আঁটছে কীভাবে অপেরা সিজন শুরু হবার আগেই সে পালিয়ে আসবে প্যারিসে। এগারো সপ্তাহ অসহনীয় সমুদ্রযাত্রার পর মিঠে জল আর টাটকা শাকসব্জির জন্য রিউনিয়ান দ্বীপে থামা হলো, শার্লের অদম্য ইচ্ছে হলো সে নীল পাহাড় আর সোনালি বালুবেলার এই মন্থর দ্বীপে অদৃশ্য হয়ে যায়। জাহাজের ব্যাকুল বাশি তাকে ফিরিয়ে আনে।
শান্ত ভারত মহাসাগর পেরিয়ে বঙ্গোপসাগর দিয়ে সিসিনা যখন হুগলি মোহনায় বাদামি কাদাজলে এসে পড়ল, ত্বকে আর্দ্র উষ্ণ বাতাসের স্পর্শ আর দুপাশে গাঢ় সবুজ বাদাবন দেখে শার্লের মনে হলো দমবন্ধ হয়ে আসছে, মনে হলো তার ছায়াটা দেহ থেকে বিযুক্ত হয়ে রিইউনিয়ান দ্বীপে রয়ে গিয়েছে, হয়তো এতদিনে ইউরোপগামী কোনো জাহাজে চড়ে বসছে, এই ছায়াহীন অলীক দেহটা চলেছে এক মরীচিকার পথে যাত্রায়।
মে মাসের দুপুর দুটোর পেতলরঙা সূর্যালোকে নদীপাড়ে প্রাসাদোপম বাড়িগুলোর মাথায় হাড়গিলের ঝাঁক, বাতাসে তামাক, চিটেগুড়, ঘোড়ার গু তামাকপাতা আর পাকের গন্ধ, নেটিভ কুলিদের ঘামের গন্ধ— কলকাতা শহরে এক দন্ডও কাটাতে না চেয়ে শার্ল চারটি ট্রাঙ্ক কুলির মাথায় চাপিয়ে বন্দর-হুগলিগামী ভাড়ার বোটে চেপে বসল। দুই পাড়ে অচেনা গাছগাছালির ফাঁকে খোড়ো চালার কুঁড়ে, ইংরেজ কোম্পানির সেনা ব্যারাকের ছাউনি, বোট যত উত্তরে এগোয় তাপ কমে আসে, মৃদুমন্দ হাওয়া বইতে শুরু হয়। দশ লিগ উজান বেয়ে চলার পর হুগলির বাঁকে দেখা দেয় কোয়ার্সভিল: অর্ধচন্দ্রের আকারে পাড় বরাবর প্রশস্ত প্রোমেনাড, গ্যাসবাতির স্তম্ভ, দোদুল্যমান নারকেলবীথির নীচে লাল টালির চাল দুধসাদা দেয়ালের বাংলোর সারি, গভর্নরের কুঠি, গীর্জার চুড়ো, ঘড়িঘর… জলে প্রতিফলিত সোনালি সূর্যের আলোয় কম্পমান নগরের মরীচিকাটি অবিকল যেন একটি বাঁকানো কোয়ার্স, সদ্য বেকারির চুল্লি থেকে বেরিয়েছে, তার বাদামি-সাদা চিকন গা থেকে ভাপ উঠছে।
‘বিয়াঁভন্যু! বিয়াঁভন্যু! হুগলির ধারে আমাদের ছোট্ট ফ্রান্সে স্বাগতম!’
চারজন গলদঘর্ম নেটিভ বাহকের কাধে সেদান চেয়ারে জাহাজঘাটায় আসা বিশালবপু ব্যক্তিটিকে দেখে চিনে উঠতে শার্লের কয়েক সেকেন্ড লাগল। সাদা পরচুলার ওপর ট্রাইকর্ন টুপি, আঁটোসাটো ব্রিচেসে জড়ানো বিয়ারের পিপের মতো বিশাল বপুটির নীচে হাঁটু-অব্দি মোজা-পরা লিকলিকে দুটি পা মামা অগস্টিন দুফে যেন গত শতাব্দীর কোনো ছবির ক্যানভাস থেকে উঠে এসেছে। জাহাজঘাটায় বাঁশের সাঁকোয় ভাগ্নেকে দুহাত প্রসারিত করে আলিঙ্গনে অভ্যর্থনা করে স্থানীয় নবাবের মতো।
চিনিকলের ধারে বাগান ঘেরা একতলা বাংলো ব্যবস্থা হয়েছে শার্লের জন্য। বাংলোর মোটা দেয়াল, টালির চাল, প্রশস্ত বারান্দায় বাঁশের চিক ফেলা। বাগানের ধার দিয়ে বয়ে গিয়েছে হুগলির খাল। শাল আর শিরিষের সারির আড়ালে উঁচু পাকা সড়ক রু দ্য বেনারস; আদতে ইংরেজদের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডেরই অংশ।
.
‘দু হাজার বছর আগে আলেক্সান্দার লে গ্রাঁ যখন এদিকে বিশ্ববিজয়ে আসেন, তাঁর কমদ্যঁ নেয়ারহোস বাংলায় এসে আবিষ্কার করল এখানে মানুষেরা এক ধরনের ঘাস চিবোয়। ঘাসের নাম স্যাকারাম বারবেরি, তার মিষ্টি রস থেকে তৈরি স্ফটিক চিনদেশে রপ্তানি হতো ওষুধ হিসেবে। চীনেরা নাম দিয়েছিল তাং-শুয়াং, সাদা তুহিন, হীরের মতোই বহুমূল্য ছিল। এই তাং-শুয়াং-এর রহস্য উদ্ধার করতে সম্রাট তায়ঝোং বৌদ্ধ ভিক্ষুর ছদ্মবেশে বাংলায় চর পাঠিয়েছিল। বুদ্ধের বাণীর সঙ্গে এই আশ্চর্য ঘাসজাত স্ফটিক তারা নিয়ে গেল এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, মধ্যযুগে আরবেরা নিয়ে গেল ইউরোপে, সান্তালার নিষিদ্ধ দেশে প্রবেশের ছাড়পত্র ছিল এই মিষ্টি সাদা তুহিন। ভাবতে পারো?’
জ্ঞানচর্চার বিবিধ বিচিত্র বিষয়ে মামার অনুরাগের কথা ছোটোবেলায় মায়ের মুখে শুনেছে শার্ল, কিন্তু অতিকায় ভাটিতে ফুটন্ত রসের বাষ্প, গাঁজানো রসের গন্ধ, আর আখমাড়াইয়ের কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়ে চিনির মতো মামুলি বস্তু নিয়ে এই উত্তেজনা তাকে স্পর্শ করে না। হাতির দাঁতে বাঁধানো ছড়িতে বিপুল দেহের ভার রেখে হেঁটে হেঁটে কলের বিভিন্ন ইউনিট ঘুরিয়ে তার সাম্রাজ্য দেখায় দুফে। খালের ওপর জেটি, আখ বোঝাই নৌকা আসে ক্ষেত থেকে। আখমাড়াইয়ের কলগুলো চলে বলদটানা ঘানিতে, ব্যাগাস নামে যে ছিবড়ে তৈরি হয়ে তাই দিয়েই রসের ভাটিতে জ্বালানি হয়। আখ ছাড়াও বাদাবনের কাঠ আসে, পশুর হাড়-পোড়া কয়লা আসে। বর্ষার শেষ থেকে শীতের মাঝামাঝি পর্যন্ত আখের মরশুম, ওই সময়ে চিনির উৎপাদন বেশি হয়। বাকি সময়ে চিনি স্ফটিক হয়ে ওঠার পর যে গাদ পড়ে থাকে, তাই দিয়ে হয় রাম।
‘বিয়াল্লিশ জন কামিন কাজ করছে।’ দুফে বলে। ‘মাড়াইকলে ভাটিতে মেয়েরা মরদদের পাশে সমান তালে কাজ করে, তাদের মজুরিও এক।’
‘এরা কোথা থেকে আসে?’ শার্ল শুধোয়।
‘এরা খালপাড়ে কামিনবস্তিতে থাকে। বেশিরভাগই ক্রীতদাস বংশোদ্ভুত। আইন করে দাসপ্রথা বন্ধ হয়েছে, এখন নগদ মূল্যে শ্রম কিনতে হয়।’
.
অচেনা উত্তাপ আর এক অস্বচ্ছ ঘোরের ভেতর শার্লের দিন কাটে। দুপুরে চারদিক স্থির, তাপবাষ্পে দোলে, সন্ধ্যার আগে দীর্ঘ সময় গোলাপি কমলা আলোয় ভরে থাকে। মশাদের কয়ার শুরু হয়ে যায়। রাত্রিগুলো ভরে থাকে বাগানে ঝিঁঝিপোকা আর খালের ধারে ব্যাঙের ডাকে। খোলা জানলা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে জোনাকি, মশারিতে জড়িয়ে যায়। সকাল হয় আখ মাড়াইয়ের গন্ধের লোভে আসা মৌমাছির ভনভনানিতে; বাংলোর চালার নীচে মস্ত চাক বানিয়েছে ওরা। সারাদিন মৌমাছির গুঞ্জনের মতো অবিরাম চাকর আয়া চিনিকলের কুলিকামিনদের দুর্বোধ্য কথাবার্তার ধ্বনি, সন্ধ্যার পরে ভেসে আসে রসুইঘরের দিক থেকে। শার্লকে শিখে নিতে হয় ওদের বুলি, আদেশের ভাষা— ‘হারামি!’ ‘বজ্জাত!’ ‘জলদি!’–পাচককে, বেয়ারাকে, মাঝরাতে মাথার ওপর পাঙ্খা থেমে গেলে বারান্দায় পাঙ্খাওয়ালাকে…
কিন্তু গালি দিয়ে আর মেঝেয় জুতো ঠুকে থামানো যায় না মাঝিদের গজল্লা বাংলোর পাঁচিলের নীচে খালের ধারে ওরা নৌকাগুলোকে টেনে আনে মাঝরাতে। ভোরবেলা চিনিকলে ডিউটি বদলের ভোঁ, বলদে টানা কলের ক্যাঁচকোঁচ ধ্বনি, চালকের হ্যাটাধ্বনি, শার্লের ঘুমের ভেতরে চুঁইয়ে ঢুকে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে।
.
চিনির কল ঘুরিয়ে দেখিয়ে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপ, বিকিকিনির হিসাব রক্ষার পদ্ধতি দেখানোর পর শার্লকে তেমন কোনো কাজ দিতে পারেনি দুফে। সকালে একবার গিয়ে আখের আমদানির খতিয়ান নেওয়া আর বিকেলে রোদ পড়লে পাইকারদের নিয়মমাফিক দু-চারটে চিঠিচাপাটি লেখা ছাড়া আর তেমন কোনো দায়িত্ব নেই তার। কামিনদের পরিচালনা করে নেটিভ সর্দারেরাই।
কলকাতা থেকে বোটে চড়ে আসার সময় অপরাহ্ণের আলোয় বিধৌত ধূমায়িত কোয়াসঁর আকারের শহরটিকে দেখে মনে যে বিচিত্র উত্তেজনার সঞ্চার হয়েছিল, সেটা আসলে এক বিভ্রম ছাড়া আর কিছু ছিল না। সেই ব্যাপারটা ক্রমশ স্পষ্ট হয় যখন শার্ল বিকেলের তাপ কমলে মামার দেওয়া ল্যান্ডোয় চেপে স্ট্র্যান্ড ধরে বোয়া- দ্যু-ভয় বের হয়, ওলন্দাজডাঙা আর্মানিডাঙা ছাড়িয়ে চলে যায় বন্দর হুগলির প্রান্তে জলের ওপর ভেঙে পড়া পর্তুগিজ কেল্লার জঙ্গলাকীর্ণ শেষ ভাঙা প্রাচীরে। ইউরোপিয়ান বসতিগুলোয় জীবন নিষ্প্রভ, ক্লান্ত আর ম্রিয়মাণ। জলে প্রতিফলিত আলোয় যে মায়া সৃষ্টি হয়, শার্ল লেবোর সন্ধানী চোখ তার ভেতর থেকে খুঁটে নেয় ক্ষয়ের চিহ্নগুলো দেয়ালে ফাটল চুঁইয়ে আসা বর্ষার জলে শ্যাওলার ছোপ, অযত্নের ঝোপঝাড়, দেয়ালে প্যাস্টেল রং জ্বলে গিয়েছে সূর্যের তেজে। একশো বছরেরও বেশি পরে দুই সদ্য বালক-বালিকা একটি আদ্যিকেলে মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে এই পথ দিয়ে যেতে যেতে যে দৃশ্যাবলীতে খুঁজে নেবে তাদের বাঁধভাঙা আনন্দের উপকরণ, সেগুলি দেখে তরুণ শার্লের লাতিন কোয়ার্টারের বৃদ্ধা দেহপোজীবিনীর কথা মনে পড়ে যায় লোলচর্ম, রুজের পরতের নীচে বলিরেখাময় মুখ, চুলে নকল গোলাপে ধুলো পড়েছে, কলপ জ্বলে গিয়ে দেখা যাচ্ছে রুপোলি শিকড়, দুর্মর আশায় বুক বেঁধে হুগলির পাড়ে অপেক্ষা করছে খরিদ্দারের জন্য।
.
‘বুড়ি বেশ্যা নয় তো কি?’ ট্যাভার্নের কোণে তাঁর নির্দিষ্ট টেবিলে বসে খোনা গলায় ঘোষণা করেন মঁসিয়ে পিয়ের লাহুস, লিজ-দ্য-নর। ‘বুরবক ইংরেজ ছাড়া আর খদ্দেরই বা কই? শিগগিরই ওরা ফিরিঙ্গিডাঙাগুলো কিনে নেবে, কথাবার্তা চলছে।’
ট্যাভার্নে অবিসংবাদী সম্রাট পিয়ের লাহুসের বয়স যে ঠিক কত কেউ জানে না। সোরা আর গানপাউডারের কমিশনেয়ার ছিলেন গত শতাব্দীতে, হুগলির ধারে এই ইউরোপীয় উপনিবেশের উত্থান পতনের কাল দেখে আসছেন এতগুলো বছর ধরে। এখনও তাঁর অজ্ঞাতসারে এই তল্লাটে কোথাও একটি গাছের পাতাও পড়ে না, একটি নথিতেও সই হয় না। ট্যাভার্নে তাঁর নির্দিষ্ট টেবিল থেকে এক অদৃশ্য জাল যেন ছড়িয়ে আছে উত্তরে পোর্তোহাটা থেকে দক্ষিণে কলকাতা পর্যন্ত, তার ওপর স্থির মাকড়শার মতো সদা সতর্ক লাহুস; যদিও টেবিলে হকের মাগে ঝুঁকে পড়া, মাড়-দেওয়া শার্টের কলারের ওপর তাঁর কুঞ্চিত গলা আর প্রায় কেশবিহীন ছোট্ট মাথাটা দেখে এক অতিকায় অ্যালডেব্রা কচ্ছপ বলে মনে হয়। ঔপনিবেশিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য তিনি ফরাসী সরকারের দেওয়া লিজ-দ্য-ন্যর খেতাব পেয়েছেন। বর্তমানে তাঁর প্রধান ভূমিকা হলো কোনো আনকোরা তরুণ কোয়ার্সভিলে পা রাখলে তাকে সঠিকভাবে দীক্ষিত করা; চোখা নেটিভ গালি শেখানো যার বুনিয়াদি পাঠক্রম।
‘দ্যাখ খোকন, এদেশের রস পেতে হলে তোমায় খুব দ্রুত ভাষা আর আদবকায়দা শিখে নিতে হবে,’ শার্লের দিকে ফিরে বলেন লাহুস। ‘আর সেসব শেখার সর্বোত্তম স্থান হলো বিছানা!’
হুঁকোবরদার ফুঁ দিয়ে টিকের আগুন উস্কে তোলে, হুকুমবরদার চট-চাপা বরফের বিছানা থেকে হিমায়িত ক্ল্যারেটের বোতল এনে পাত্রে ঢালে, রসুইঘরে গলদঘর্ম পাচক সাপার বানায়, একটু এদিক-ওদিক হলে মসিয়ে তাঁর টেবিল থেকে খোনা গলায় হাঁক পাড়েন— ‘বাঁশ্যোৎ! গুখোপুত!
তরুণ ফ্যাক্টরেরা চারপাশের টেবিলে বসে তাঁর উপদেশামৃত পান করে। হক কিংবা বিয়ারের মগে চুমুক দিয়ে তারা ট্রেডিং কোম্পানিগুলোর লাভক্ষতির খতিয়ান বিনিময় করে। এরা অনেকে নেটিভ রক্ষিতা পোষে, গোপনে বেআইনি ক্রীতদাসীও রাখে, কেউ কেউ নিয়ম করে কাটুনিডাঙায় যায়। তাপ আর জীবাণুর শিকার হয়ে গোরস্তানে জমি নেবার আগেই চোরা পথে অঢেল টাকা কামিয়ে চম্পট দেবার সুলুক সন্ধান খোঁজে, দেশে ফিরে মেম্বার অব কাউন্সিলদের মতো রাজকীয় অবসর জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখে চলে। এদিকে ট্যাভার্নের বারান্দায় পাস্খাটানাদের দল দেয়ালে হেলান দিয়ে উবু হয়ে বসে দড়ি টানে, বাগানে মালি শুকিয়ে আসা গোলাপের চারা লাগায়, ভিস্তিওয়ালারা স্ট্র্যান্ডে জলছড়া দেয়, ভিজে ধুলোর গন্ধের সঙ্গে ভেসে আসে নদীতে জেলেডিঙি থেকে নেটিভ সুর। তাতে মেশে পিয়ের লাহুসের অনর্গল নাকি সুরের কন্ঠস্বর।
‘দিনেমারগুলো যখন এই মুলুকে প্রথম এল, ওদের না ছিল কবরের মাটি না ছিল মাল খালাসের জেটি। এই কোয়ার্সভিলে জাহাজঘাটা ব্যবহার করত। তারপর মার্কিন দেশে যুদ্ধ শুরু হলো, ব্যাটাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরল।’
‘সোরা আর গানপাউডার বেচে তোমারও ভাগ্য ফিরল, নয় কি?’ অগস্টিন দুফে ফোড়ন কাটে।
‘আমার কথা হচ্ছে না,’ দুফের দিকে হিমশীতল চোখে তাকিয়ে বলেন লাহুস। ‘ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড তখন নিজেদের মধ্যে লড়ছে, ফরাসী প্রাইভেটিয়ারেরা রিইউনিয়ান আর মরিশাসে ইংলিশ বোট দেখলেই হয় কামান দাগছে নয়তো আটক করছে। এদিকে জাহাজী মালের বীমার মাশুল চড়চড় করে চড়েছে প্যারিস লন্ডনের বাজারে। সবাই দিনেমারদের জাহাজে মাল পাঠাতে চায়।’
‘কেন? দিনেমারেরই কেন?’ শার্ল জানতে চায়।
‘দিনেমারেরা তখনও নিরপেক্ষ, যুদ্ধে নেই,’ লাহুস বলেন। ‘ব্যাঙ্ক না থাকায় জন কোম্পানির রাইটাররা রেমিটেন্সের বিল পাঠাতে চায়। দিনেমারডাঙার ফ্যাক্টরগুলো দুহাতে পয়সা কামালো।’
‘হুঁ হুঁ মনে আছে!’ দুফে বলে। ‘মাস গেলে যে ব্যাটার বেতন দুশো টাকা, যার রোজ ক্ল্যারেট পান করার পয়সা জুটত না বলে ধেনো গিলত, সেও তখন আশি টাকা ডজনের শ্যাম্পেন ওড়াচ্ছে!’
‘কিন্তু সে গুড়ে বালি পড়ল যখন ইংরেজদের সঙ্গে ওদের যুদ্ধ লাগল,’ মসিয়ে লাহুস বলেন। ‘ফোর্ট উইলিয়াম থেকে পল্টন এসে দিনেমারডাঙার দখল নিল।’
‘তারপরে দিনেমারডাঙার লালবাতি জ্বলল!’ এক ফ্যাক্টর বলে।
‘লালবাতি, হাতপাখা, খাঁচার চিড়িয়া, চুলে লাল কাগজের গোলাপ… দেখা আছে নাকি খোকনের?’ শার্লের দিকে ফিরে লাল চোখ মেলে বলেন পিয়ের লাহুস লিজ-দ্য-নর, নীচের ঠোঁট লালায় সিক্ত। ‘এখন বুরবক ইংরেজগুলো ওই বুড়ি বেশ্যাকে কটা টাকায় কেনে সেটাই দেখার।’
হলঘরের অন্যপ্রান্তে দরজার পাশে টেবিলে একা বসে সাপার করছিল কলকাতার এক ইংরেজ যুবক, কেউ লক্ষ করেনি। কলা থেকে তৈরি কোয়ার্সভিলের নিজস্ব মদ ব্যোসার পাইকারি দালালি করতে এসেছে সে, ট্যাভার্নে উঠেছে তিনদিন হলো। সে গলা তুলে বলে
‘কলকাতাকে যতই গালাগালি দাও, কলকাতা না থাকলে তোমাদের এই ফিরিঙ্গিডাঙায় একদিনও হাঁড়ি চড়বে না।’
‘তাই নাকি?’ পিয়ের লাহুসের বৃত্ত থেকে এক তরুণ বলে। ‘তাহলে তুমি কেন মরতে এসেছো বাপু?’
‘আমি এসেছি পেটের টানে,’ ইংরেজ যুবক বলে। ‘এখানে না পোষালে অন্যত্র যাব। এ দেশে কি কারবারের অভাব নাকি?’
‘আর তলপেটের টান? কাটুনিডাঙায় পায়ের ধুলো দেওয়া হয়নি বুঝি?’
‘তোমরা দেখি কিছুই খবর রাখো না। কলকাতায় চিৎপুর থেকে কালীঘাট পর্যন্ত যেখানে যত বেশ্যালয় আছে সেখানে প্রতি শুক্রবার স্যানিটারি ইন্সপেক্টার যায়। প্রতিটি বেশ্যার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে, কাপড় তুলে যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করে। নীরোগ থাকলে তবে ঠিক তিন ইঞ্চি ওপরে কর্পোরেশনের সিলমোহর মেরে দিয়ে যায়। খদ্দেররা এসে সিলমোহর আছে কি না দেখে রীতিমতো প্রমোদ কর দিয়ে ছাপানো রসিদ নেয়। হুঁ হুঁ বাপু, এই হলো আমাদের কলকাতা শহর! তোমরা এ জিনিস এখানে চালু করতে পারবে?’
চিনেমাটির পিরিচে উষ্ণ পাঞ্চ নিয়ে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন লিজ-দ্য-ন্য পিয়ের লাহুস, উষ্ণ রামের বাষ্পে ঝিমিয়ে পড়েছিলেন কিংবা ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন গোলিয়াথ মাকড়শার মতো। যুবকটির কথা তাঁর কর্ণকুহরে প্রবেশ করছিল কি না বোঝা যায়নি। আচমকা তিনি চোখ খুলে বললেন—
‘ওহে ছোকরা, তুমি আলেক্সন্ডার দ্যুশালের নাম শুনেছ?’
ইংরেজ যুবক থতমত খেয়ে তাকায় লোলচর্ম বৃদ্ধের দিকে।
‘তুমি কি তাঁর লেখা দে-লা-পন্তিত্যুশঁ-দে-লা-ভ্যিল-দে-পারী বইটা পড়েছ?’ ম্যসিয়ে লাহুস বলেন। ‘পড়নি নিশ্চয়ই? তিনিও একজন ইন্সপেক্টার ছিলেন, প্যারিসের মাটির নীচে বিখ্যাত পয়ঃপ্রণালীর ইন্সপেক্টর। তা এই দ্যুশালে অনেক সমীক্ষা করে একটি গভীর সত্য আবিষ্কার করেন। যেকোনো বড়ো শহরে নর্দমা, কসাইখানা আর আবর্জনার স্তূপ যেমন অপরিহার্য, বেশ্যালয়ও তেমনই। এবং প্রশাসনের কর্তব্য সেগুলিকে অবাধে চলতে দেওয়া। শুধু সুশীল সমাজের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকলেই হবে। সেজন্য যতই বাপু কলকাতা নিয়ে বড়াই করো, ওই শহরের বড়ো বড়ো মুরুব্বিদেরও ফি সপ্তাহে বজরা ঠেলে এই মুলুকে না এলে চলে না, সে সব আমার জানা আছে। জানতে চাও তো নাম ধরে ধরে বলতে পারি। ঠ্যাঙের ফাঁকে সিলমোহর দেখে আর রসিদ নিয়ে আর যাই হোক তাদের তলপেটের ক্ষিদে মেটেনা!’
.
কলকাতায় যৌনব্যবসায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর দলে দলে বিভিন্ন বর্গের বর্ণের পতিতারা কাটুনিডাঙায় এসেছে আস্তানা পেতেছে, সে কথা সত্যি। এ হলো ফিরিঙ্গিডাঙার এজমালি পতিতালয়, কোনো একটি দেশের শাসনাধীন এলাকার বাইরে। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হবার কারণেও সম্প্রতি এই অঞ্চলটির বাড়বাড়ন্ত।
‘বুঝলে শার্ল, দাসপ্রথার একটা ভালো দিক হলো সাম্য!’ নেটিভদের মতো আঙুল দিয়ে কারিতে ভাত মেখে খেতে খেতে দুফে বলে চলে। ‘ক্রীতদাসদের মধ্যে স্বাধীনতা নেই, ভ্রাতৃত্ববোধ আছে কি না জানা নেই, কিন্তু সাম্য আছে। মালিকের চোখে সবাই সমান। কিন্তু যেইমাত্র দাসপ্রথা তুলে দেওয়া হলো, ওদের মধ্যে আবার জাতপাত ফিরে এলো। মজার ব্যাপার হলো, যারা ছিল অচ্ছুৎ, সবচেয়ে নীচু জাত, যারা পায়খানা থেকে মলপাত্র মাথায় বয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা মৃত পশুর ছাল ছাড়িয়ে চামড়া তৈরি করার মতো গায়ে গতরে খেটে কাজ করত, তাদের সমাজে ফিরে যেতে অসুবিধা হলো না। সমস্যা হলো উঁচু জাতের, বিশেষ করে মেয়েদের। ক্রিশ্চান মিশনগুলোয় কনভেন্টে নানদের হাতে পড়ে কেউ কেউ বেঁচে গেল, বাকিদের ঠাঁই হলো কার্টুনিডাঙায়।’
ঝোলাগুড়-মাখা মুড়ির ডেজার্ট খচর মচর করে চিবোতে চিবোতে চোখ বুজে আসে মামা দুফের।–‘খাঁচার পাখি রাতারাতি খাঁচাছাড়া হলে কী হয়, তারা ততদিনে উড়তে ভুলেছে যে। জলের ধারে নতুন বাঁশ খড় দিয়ে গজিয়ে উঠল পরিযায়ী পাখিদের বাসা।’
*
সেবার জুন মাস শেষ হতে চলল কিন্তু বর্ষা এল না। শুরু হলো তাপপ্রবাহ। বিউবনিক প্লেগের রোগীর দেহে স্ফোটকের মতো হুগলি নদীর খাতে জেগে উঠল বালির চর। জাহাজঘাটার কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হবার মতো অবস্থা। এই সময়ে দক্ষিণ থেকে জলভারাতুর মেঘ উড়ে আসে, তার বদলে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে এল বিশুষ্ক মরুবায়ু। বেলা দশটা এগারোটার মধ্যেই কোয়ার্সভিলের পথঘাট শুনশান, পথে গরু কুকুর পাখপাখালির দেখা মেলে না। সাক্ষাৎ মৃত্যু বুঝি কোয়ার্সভিলের শুনশান রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। পথের পাথরে শুকনো ঝরা পাতা হাওয়ায় চলার শব্দ যেন গোরস্থানের শ্বাসধ্বনি। আস্ত্রিকে ডায়ারিয়ায় লোকে পোকামাকড়ের মতো মরছে, গির্জার ঘন্টাধ্বনি যেন আর থামে না পুরুষদের জন্য তিনটি করে তিন বার আর নারীদের জন্য তিনটি করে দুই বার। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দূর থেকে ভেসে আসে সাতগাঁর অসংখ্য মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি। তফাৎ শুধু এই মন্দিরে ঘন্টা বাজে ঈশ্বরের আবুলি ভাঙানোর জন্য, গির্জায় ঘন্টা বাজে মৃত্যুর বার্তা প্রচারের জন্য।
বাংলোর দরজা বন্ধ করে জানলায় খড়খড়ি তুলে বারান্দায় খসখস ঝোলে, তাতে ঘন ঘন জলছড়া দেয় ভিস্তিওয়ালা, ভিজে খসখসের গন্ধে ভরে ওঠে বাংলোর বাতাস। মস্যিঁয়ে দুফে ছায়াচ্ছন্ন বারান্দায় সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বরফ জলে শুয়ে থাকে, দুদিক থেকে দুই ভৃত্য তালপাতার পাখায় বাতাস করে। জলের মধ্যেও ভয়, চর্বির পরতে মোড়া দেহে ঘাম ছোটে।
শার্ল দেখে, এনামেলের চানের গামলায় ভেসে আছে ফ্যাকাসে সাদা শুশুক; চিবুক ঝুলে পড়ে প্রায় বুক ছুঁয়ে ফেলেছে পেলিকানের মতো।
‘মদ খাও আর নাই খাও, দম নিতে তো হবে!’ দুফে বলে। ‘চিনিকলে ভাটিখানার বাতাসে শর্করার বাষ্প ভাসে। সারাদিন ধরে তার শ্বাস পেটে গিয়ে মড়কের কঙ্কালও ফুলে ঢোল হয়ে যায়!’
এদেশে আসার পর প্রথম দিকে জুলি নামে এক ইউরেশীয় রক্ষিতা রেখেছিল অগস্টিন দুফে। জুলির দেহে যৌবনের জোয়ারে পলি জমলে তাকে পরিত্যাগ করে, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। ক্রিসমাসে সন্ত দিবসে নিয়ম করে জুলিকে নতুন পোশাক আর টার্কি পাখি পাঠায়। জুলিও কাটুনিডাঙায় নতুন চিড়িয়া এসে জুটলে ভেট পাঠিয়েছে সাহেবের বিছানায়। কিন্তু ইদানীং চক্ষু দুটি ছাড়া আর কোনো অঙ্গ চালনা করার মতো অবস্থা নেই ম্যসিঁয়ে দুফের। এদিকে বিপুল চর্বির পাহাড়ের ভেতরে পুরুষটি মরেনি। রোজ দুপুরে কলে ভাটিতে পরিদর্শনে গিয়ে হাতের ছড়ি দিয়ে আখ-মাড়াই কলে ভাটিখানায় কামিন মেয়েদের পশ্চাদ্দেশে খোঁচা দেয়, পরনের কাপড় তোলে।
আসামের পাহাড় থেকে আসা কামিনদের এই দলটা এককালে ছিল কলা খামারের ক্রীতদাসী। ওরা হাঁটুর ওপর ভাঁজ করে চৌখুপি কাপড় পরে, মাথায় রুমাল বাঁধে, নৌকা থেকে আখের বোঝা মাথায় করে কলের ভাঁটিতে আনে দিনভর। ওদের একঘেয়ে গানের সুর ভেসে আসে বাংলোয়
ওপারে বান্ধি বাড়ি কলা গাড়ি সারি সারি–
কলার বাগিচা ঘিরি নিল্যাক বাড়িরে
আসিবে পরাণের নাথ কাটমো কলার পাত
বগলৎ বসি বাড়িয়া দেমো ভাতরে
তাপপ্রবাহের কাল শেষ হলে যথা নিয়মে বর্ষা আসে। শরতে মাটিতে টান ধরলে রাশি রাশি আখ আসে ছাড়িগঙ্গার ওপারে বিস্তীর্ণ আখের ক্ষেত থেকে। আখ পেকে উঠলে রীতিমাফিক শুরু হয় বুনো শুয়োরের উপদ্রব। কোয়ার্সভিলের ফ্যাক্টর ও কমিশনেয়াররা সড়কি নিয়ে ঘোড়ায় চেপে শুয়োর শিকারের উৎসবে যায়।
একবার মাত্র গিয়ে শিকারের শখ মিটেছে শার্লের; বীভৎস হিংস্রতা সহ্য করতে পারেনি। সড়কির ফলায় আমূল বিদ্ধ এক গর্ভবতী শুকরীর আর্তনাদ ওকে তাড়া করেছে কয়েক রাত। তার থেকেও অসহনীয় শিকার পার্টিতে শৌখিন ছাতা টুপি দস্তানায় সজ্জিত গুটিকয় ফিরিঙ্গি নারীর চোখে বিচিত্র জান্তব উল্লাস, আর সন্ধ্যায় ভোজের টেবিলের সেই আস্ত ঝলসানো শুকরীর পেট থেকে নটি সুসিদ্ধ সসেজের আকারের ছানা বের হলে তাদের লালাসিক্ত রঙীন ঠোঁটে নারকীয় ঔজ্জ্বল্য।
আর এসবেরই মধ্যে একদিন ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল। ব্রেগ্যে কোম্পানির রুপোর পকেট ঘড়ি, শার্লের মা বিশতম জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন। বিলম্বিত বর্ষার পর বাংলার প্রকৃতির শীতল সজীব রূপ খুলতে রিউনিয়ান ছেড়ে আসার সময়ের সেই অনুভূতিটা পেড়ে ফেলল শার্লকে। যে ছায়াটাকে সে দ্বীপে ছেড়ে এসেছিল, সেটি ইতিমধ্যে ফিরে গিয়েছে তার প্রাণের শহরে।
একদিন ট্যাভার্নে বসে সাতগাঁর এক দক্ষ নেটিভ ঘড়ি সারাইয়ের মিস্ত্রির হদিশ পেল শার্ল। খোঁজ করে গিয়ে ঘড়িটা দিতেই হাতে নিয়ে খুলে এক সেকেন্ডের মধ্যে সেটি ফের চালু করে দিল সে। পারিশ্রমিক দিতে গেলে বলল-–
‘সামান্য একটা এসকেপ হুইল ঘু-ঘুরিয়ে দেবার জন্য আমি কোনো পা- পারিশ্রমিক নিইনা, ঘড়িতে সা-সাড়ে তিন ঘন্টা সময় পিছিয়ে দেবার জন্যেও কিছু নিইনা।’
সাতগাঁর সময়ের থেকে সাড়ে তিনঘন্টা পিছিয়ে চলে প্যারিসের সময়, সেটা আর সেই ব্রাহ্মণ মিস্ত্রিকে বলা হয়নি।
