সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৬
২.৬
বাপ্পার বুকে পৈতের মতো সেই নীলচে সবুজ দাগটা কৈশোরের আগে পর্যন্ত ছিল। দেখলেই সকলের মনে পড়ত শাকম্ভরী দেবীকে স্বপ্ন দিয়ে গঙ্গারামের আত্মা ফিরে আসার কথা। এই ঘটনা সাতগাঁয়ে নতুন নয়, মি’লেডি, পুনর্জন্ম যে কেবল মানুষের ক্ষেত্রে ঘটেছে এমনও নয়।
অনেককাল আগের কথা মি’লেডি। শিউলি তখন সরোজার পেটে। কলকাতায় গিয়ে বনলতার মর্মান্তিক পরিণতির পর পাগলরামের মেয়ে রাধারাণীর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ পড়েছে তার আগেই। মুখ দেখাদেখি বন্ধ, সাতগাঁর সমাজেও ওরা ব্রাত্য। তবু নিয়ম করে প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় ঠাকুর-চাকর বন্ধুবান্ধব নিয়ে বাবার বানানো ভিলায় ছুটি কাটাতে আসে রাধারাণী। একবার ওরা নিয়ে এল রেডিও, সাতগাঁয়ে প্রথম রেডিও। পিতৃপক্ষের শেষ দিন ভোররাতে এল ডোরাডোর বৈঠকখানা থেকে ভেসে এল শঙ্খধ্বনি, দেবীর আগমনী গান। তারপর মেঘমন্দ্ৰ কণ্ঠে চণ্ডীপুরাণ থেকে পাঠ। আদিরামবাটির ছোটো-বড়ো সকলে ঘুম ভেঙে উঠে উঁকি দিয়ে দেখল এল-ডোরাডোর রঙীন শার্সি আলোকিত, বৈঠকখানার দরোজা খোলা, ভেতরে চেয়ার শতরঞ্চি পাতা হয়েছে।
কিন্তু কেউ সেই বেতার অনুষ্ঠান শুনতে এল না। শুধু তাই নয়, পরদিন রামরাম শাস্ত্রীমশাইয়ের নেতৃত্বে সাতগাঁর কনৌজি ব্রাহ্মণ সমাজ অল ইন্ডিয়া রেডিওর অধিকর্তাকে প্রতিবাদপত্র লিখল। তাঁদের অভিযোগ যে সময়ে এই রেডিও সম্প্রচার করা হয়েছে, তখন পিতৃজাতকের আত্মারা তিল-গঙ্গাজল পেতে দ্যুলোক থেকে ইহলোকে নেমে আসেন। এই বিশেষ দিনটি মর্ত্যভূমিতে তাঁদের মহা আলয়। এমত সময়ে বেতার তরঙ্গে জনৈক বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নামধারী অব্রাহ্মণের কণ্ঠে পুরাণপাঠ তাঁদের যাত্রাপথে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বাংলা, ইংরিজি ও সংস্কৃতে লেখা ১১৮টি চিঠি জমা পড়ল ১ নং গার্সটিন প্লেসের দপ্তরে। সাহেব অধিকর্তা মহিষাসুরমর্দিনী নামে অনুষ্ঠানের সম্প্রচার সাত দিন পিছিয়ে দিলেন। রাধারাণীও আর এল-ডোরাডোয় রেডিও নিয়ে আসেনি।
এই ঘটনার পরের বছর মহালয়ার কাকভোরে টুপ টুপ করে শিশির ঝরছে, ভেতর উঠোনে শোনা গেল–
ওগো আমার আগমনী আলো
জ্বালো প্রদীপ জ্বালো…
পাতলা ঘুমের ভেতর জেগে উঠে শাকম্ভরী দেবীর মনে পড়ল তাঁর শৈশবের কথা।
গানটা ভেসে আসছিল নিমগাছটার উঁচু ডাল থেকে। ছেঁড়া ছেঁড়া, কখনো উচ্চকিত কর্কশ, গানের কথাও কেমন যেন এলোমেলো। বাড়ির সকলে বিছানা ছেড়ে উঠে একে একে জড়ো হলো উঠোনে। ততক্ষণে অন্ধকার ফিকে হয়ে আসছে। গাছের মগডালে দেখা গেল একটি সাদা রঙের পাখি।
‘কাকাতুয়া!’ বসন্ত বলল। ‘কাকাতুয়াটা গান গাইছে!’
‘এ যে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির গলা!’ শাকম্ভরী দেবী উঠোনে এসে বললেন। ‘ফিবছর পুজোদালানে বসে মা দুর্গার আগমনী শুনিয়ে যেত ফিরিঙ্গি সাহেব, ছেলেবেলায় ঠাকুমার মুখে শুনেছি।’ তিনি গুনগুন করলে উঠলেন, ভোরের নিস্তব্ধতার ভেতর অদ্ভুত সুর ফুটল তাঁর গলায়
‘মা তাই শুনে এ ভবের কূলে
দুর্গা দুর্গা বলে বিপদকালে
একবার দুর্গা দুর্গা বলে যে ডাকে তোমায়
তুমি কর তায় ভবসিন্ধু পার…’
‘মা দুর্গা আসছেন, পাখিটা মনে হয় সেই খবর নিয়ে এসেছে,’ বিশু বলল।
‘কিন্তু এটা নীলকণ্ঠ পাখি নয়,’ বসন্ত বলল।
‘নীলকণ্ঠ পাখির কণ্ঠ নীল কেন জানিস নে? মা দুর্গার বর বিষপান করে নীলকণ্ঠ হয়েছিলেন,’ বিশু ব্যাখ্যা করে। ‘এর ঝুঁটির রঙ দেখেছিস?’
‘হলুদ!’ ছোট্ট হেমন্ত মায়ের কোলে উঠে বলল।
‘হ্যাঁ, গন্ধকের রঙ। গন্ধক হল বিষ।’
কোষাকুষি হাতে রামপ্রাণ ঘাটে পিতৃতর্পণ করতে যাচ্ছিল, পাখিটাকে দেখে বলল — ‘কাদের বাড়ির পোষ্য, খাঁচা খোলা পেয়ে উড়ে এসেছে। আলো ফুটলেই উড়ে চলে যাবে।’
‘ও যাবে বলে আসেনি রে পরাণ, ও হল অ্যান্টনি সাহেব! ও থাকবে।’ শাকম্ভরী দেবী প্রত্যয়ের স্বরে বললেন।
সত্যিই তাই হলো। দুর্গাপুজোর পাঁচ দিন ঢাক-কাঁসরের শব্দেও পাখিটা উড়ে গেল না, দশমীর বিসর্জনের পরেও নিমগাছের মগডালে রয়ে গেল। ইতিমধ্যে সরোজা দেখেছে ওর ডানায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ওরই উদ্যোগে গামা আম পাড়ার লগিজাল দিয়ে পেড়ে আনল পাখিটাকে। বসন্ত ওর ইস্কুলের জীববিজ্ঞানের বইয়ে ছবি মিলিয়ে দেখে জানালো পাখিটা জাভাদেশীয় কাকাতুয়া। আকার এবং ঠোঁটের গঠন দেখে বোঝা যায় বয়স হয়েছে। ডানায় ক্ষত সম্ভবত গুলতির গুলি লেগে হয়েছে। হলুদের সঙ্গে বোরিক পাউডার মিশিয়ে ওর পরিচর্যা শুরু করল সরোজা। বাড়ির ছোটোদের, বিশেষ করে হেমন্তর, আবদার মেনে স্থির হলো কাকাতুয়াটাকে পোষা হবে। রামপ্রাণ শর্ত দিল
‘যেদিন ওর মালিক নিতে আসবে এক কথায় দিয়ে দিতে হবে কিন্তু।’
কাকাতুয়াটাকে বাড়িতে রাখার ব্যাপারে শাকম্ভরী দেবীর অসম্মতি ছিল না। ওর মধ্যে হান্স অ্যান্টনি সাহেবের আত্মা পুনর্জন্ম নিয়ে এসেছে, তিনি জানতেন। যদিও সেই পর্তুগীজ ফিরিঙ্গি ছিল জন্মসূত্রে কেরেস্তান, সবাই জানে বাংলায় এসে সে কালীভক্ত হিন্দু হয়ে যায়। গোয়ায় তখন বিধর্মীদের বিরুদ্ধে ইনকুইজিশন চলছে, তামাকের জাহাজে পালিয়ে চাঁদেরডাঙায় আশ্রয় নিল অ্যান্টনি সাহেব। মদ মাংস ছেড়ে দিল, এক হিন্দু রমণীকে বিবাহ করল। মুখে মুখে গান বাঁধতে শিখল, ধর্মতলায় জেলে-হেলে কৈবর্তদের দলে ভিড়ে কবির লড়াই করতে লাগল। দুর্গাপুজোর সময়ে ব্রাহ্মণপাড়ায় এসে দেবীর আগমনী গাওয়ার বায়না পেত। ফিরিঙ্গির ব্যাটা পুজোদালানে বসে গান গাইছে, এই নিয়ে রক্ষণশীলদের দিক থেকে কোনো বাধা আসেনি। হান্স অ্যান্টনি জন্মসূত্রে ক্রিশ্চান হলেও সে ছিল প্রকৃতই দ্বিজ: ইনকুইজিশনের আগুন থেকে পালিয়ে দ্বিতীয় জন্ম পায়। শুধু তাই নয়, গোয়ার বিশপের আদেশে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়, যেমনটা বিধর্মী পলাতকদের ক্ষেত্রে করা হতো। অর্থাৎ কি না তার জীয়ৎশ্রাদ্ধও হয়।
শাকম্ভরী ছোটোবেলায় তাঁর পিতামহ রাজারামের মুখে শুনেছেন রেশমি আচকান পরে, মাথায় লাল পাগড়ি এঁটে সাদা ঘোড়ায় চেপে আসত অ্যান্টনি সাহেব। ভূমির ওপর হাঁটু মুড়ে পদ্মাসনে বসতে পারত না, একপাশে পা ভাঁজ করে বাইজিদের মতো বসতো। একতারা বাজিয়ে গলায় দরদ ঢেলে গান গাইত যখন, ওর বন্ধ চোখের থেকে জলের ধারা নেমে তামারং দাড়িতে ফুটে থাকত শিশিরবিন্দুর মতো।
.
কাকাতুয়াটাকে প্রথমে ভাঁড়ার ঘরের লাগোয়া ঢাকা বারান্দায় বেতের দোলনাটায় রাখা হয়, যে দোলনাটিতে আর কিছুকালের মধ্যেই শোবে শিশু শিউলি। দিন কয়েক পরে, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন দুপুরবেলায় মেয়েবউরা পুজোর যোগাড়ে ব্যস্ত, রান্নাঘরের দাওয়ায় নারকেল কুরছে বামুনদি, সরোজা চালগুঁড়োর আলপনা দিচ্ছে, সহসা শোনা গেল পাখিটার তীক্ষ্ণ স্বর। সবাই হাতের কাজ ফেলে ছুটে এসে দেখল, কোত্থেকে একটা হলদে-কালো ডোরাকাটা হুলো বেড়াল দোলনার কানায় দুই পা দিয়ে পেন্ডুলামের মতো দুলছে, আর কাকাতুয়াটা দড়ি বেয়ে সিলিঙের কড়িতে উঠে গন্ধকরঙা ঝুঁটি পাখার মতো ফুলিয়ে কর্কশ পুরুষালি গলায় চিৎকার করছে—
‘ফ্যদা! গ্যাতো! ফ্যদা-সি!’
পরে জানা যায় ওগুলি পর্তুগিজ ভাষায় অশ্রাব্য গালি। সেই ঘটনার পর, এবং বিশু ঠাকুরের পোষ্য দেবদেবীর প্রসাদী কাটা ফলে কাকাতুয়াটার বিশেষ রুচি প্রত্যক্ষ করার পরে, সকলে ওকে অ্যান্টনি নামেই ডাকে।
আদিরামবাটিতে প্রথম যার নাম ধরে অ্যান্টনি ডাকতে শেখে সে হলো গামা। তারপর একে একে— ‘বামুনদি’,— ‘বিশু’… ক্রমশ ছোটো ছোটো লব্জ শেখে— ‘দুগ্গা দুগ্গা!’ ‘দ্যাখ্ কে এল!’ ‘রাম-রাম-রাম-রাম!’ এরপরে বামুনদির মতো গলা করে গালি দিতে শিখল–‘ড্যাকরা মিনসে!’ ‘মুকে পোকা পড়বে!’ ‘চোখ গেলে দেব!’ এবং আরও পরে শিউলির মতো করে–‘কচু-পোড়া!’
হুলোটা আর আসেনি। অ্যান্টনির দাবীদারও কেউ আসেনি। রামনবমীর মেলায় লোহার দাঁড় কেনা হয়, ভাঁড়ারঘরের বারান্দায় পায়ে শেকল পরিয়ে রাখা হয় ওকে। সেখান থেকে উঠোনে নজর রাখে সে, রান্নাঘরের চালে কাক পায়রা বসলে তাড়া, খিদে পেলে কিংবা বিরক্ত হলে সরোজাকে ডাকে–‘পরাণবউ, ও পরাণবউ!’
.
বাপ্পা যখন সবে এক-পা দু-পা করে হাঁটতে শিখেছে, আদিরামবাটিতে লাল পাথরের মেঝেয় ফাটল গলে পাতালে পড়ে যাবার ভয়ে সারাক্ষণ বড়োদের আঁকড়ে থাকে, কোলে উঠতে চায়, যখন উঠোনে বাগানে কুয়ো ইঁদারার অন্ধকার মুখব্যাদানে ভয়, খিড়কির ওধারে আমবনে শ্যাওলাগন্ধী ছায়ায় ভয়, তখন অ্যান্টনি কাকাতুয়াকে ও খুব ভয় পেত সে। ততদিনে অ্যান্টনি বৃদ্ধ হয়েছে, আর আগমনী গায় না, শুধু বড়োদের লজ নকল করে আর গালি দেয়। চৈত্রমাসে সরোজা ওর গায়ের পোকা মারার জন্য হলুদ জলে চান করাতেন। এর ফলে অ্যান্টনির পালকের রঙ পাকাপাকিভাবে হলদেটে হয়ে যায়, ঝুঁটিটা হয়ে যায় লালচে। সেই ঝুটি নেড়ে, টিকিট পাঞ্চের মতো বাঁকানো ঠোঁট ফাঁক করে যখন তীক্ষ্ণ লাল চোখে তাকাতো, ছোট্ট বাপ্পা ভয় পেয়ে গিয়ে মায়ের বুকে মুখ লুকোত। অথচ অ্যান্টনির থেকে চেহারায় ঢের বড়ো চিন্তামণিকে একেবারেই ভয় করত না। ততদিনে রামপ্রাণ এক্কাগাড়িতে রুগি দেখতে যাওয়া বন্ধ করেছেন, চিন্তামণি আদিরামবাটির ভেতরে ছাড়া থাকত। গামা বাপ্পাকে চিন্তামণির পিঠে বসিয়ে বাগানে ঘোরাতো, ওর একটুও ভয় করত না। তার কারণ চিন্তামণি কথা বলতে পারত না, আর ওর বড়ো চোখদুটো সবসময় ছলছল করত।
তবে আদিরামবাটিতে যা বাপ্পাকে সবচেয়ে বেশি টানত, অ্যান্টনি কিংবা চিন্তামণির থেকে যা কম জীবন্ত নয়, তা হলো আদিরামের মন্দির, মন্দিরের তিন দেয়ালে ৯৬৬টি খোদাই ছবি আর এক দেয়ালে বিস্ফারিত ক্ষতমুখ।
.
মি’লেডি, গঙ্গার জাতক এই মন্দির। হাজার হাজার বছর ধরে যে পলিরেণু বয়ে এসে জমা হয় নদীর বুকে, তাই দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে তার দেহ। প্রতিটি দেহকোষ সুদুর হিমালয় থেকে উত্তর ভারতের উপলভূমির ওপর দিয়ে ভাঙতে ভাঙতে গড়াতে গড়াতে কত আকরিক, ফসিল আর জীবকণার সমন্বয়ে এই বদ্বীপভূমির মুক্তবেণিতে এসে সম্পূর্ণ করেছে তার যাত্রা। তারপর একদিন সূত্রধরের হাতের নরুনে পেয়েছে তার ছাঁদ, কাঠের চুল্লির ভেতর পেয়েছে তার উষ্ণ পীতাভ রঙ। বিভিন্ন ঋতুতে দিনের বিভিন্ন প্রহরে যখন সূর্যের আলো এসে পড়ে তার গায়ে, সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রেখার টান বাঙ্ময় হয়ে ওঠে: পুথি-বগলে ব্রাহ্মণ, তার মুন্ডিত মাথার শিখায় বাঁধা ফুল; বণিক চলেছে, মাথার পেছনে বেতের ছাতাধারী ভৃত্য; মকরমুখী জাহাজ চলেছে সমুদ্রযাত্রায়, ঝরোকা থেকে বিদায় জানাচ্ছে বিষণ্ণ পটল-চেরা চোখের পুরনারী; ওপাশে পত্রপল্লবের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে কামুক নাগর; ফলন্ত কাঁঠাল গাছের ডালে বানর, নীচে ত্রস্ত অভিসারিকার গলায় মুক্তাহার; মিরাদরের নীচে মুখোমুখি বসে পণ্ডিত ও তুর্কী শাসক; নৌকায় একতারা হাতে বাতুল গায়ক; ঘন অরণ্যে গন্ডারের দল; বনরাজির মাঝে পুথি পাঠ করছে বিবাগী পণ্ডিত, পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে এক দীর্ঘকায়া দাসী রমণী, তার পায়ে মল; পেটমোটা ফিরিঙ্গি যাজক, হাতে ক্রশ-আঁকা বাইবেল; নদীর পাড়ে চরকায় সুতো কাটছে কাটুনি তরুণীর দল, নৌকায় বণিক তাদের উন্মুক্ত স্তনে অপাঙ্গে তাকিয়ে গোঁফ চুমরাচ্ছে; শিকলে বাঁধা ক্রীতদাসের দল মাটি খুঁড়ছে, চাবুক হাতে হাবসি; পালতোলা ঢাও-এ চেপে চলেছে একদল জিরাফ; উন্মত্ত ষাঁড়ের পিঠে ব্রাহ্মণের দল, হাতে ত্রিশূল, মাথার শিখা উড়ছে…
ছাজার নীচে প্যানেলগুলোয় মহাকাব্য, পুরাণ আর মঙ্গলকাব্যের দৃশ্যাবলী। সেইসব কাহিনির সঙ্গে শিশুর প্রথম পরিচয় ঘটে পরিবারের কোনো বয়স্ক সদস্যের কোলে চড়ে নিত্য পরিক্রমায়। সেই সঙ্গে জড়িয়ে যায় চলমান জীবনের অকিঞ্চিৎকর দৃশ্যরাজি। যেভাবে প্রতিদিন গঙ্গাস্নানে স্রোতবাহিত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পলিকণা ত্বকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে, গাত্রবর্ণে ক্রমশ সবুজাভ ধুসর ছাপ আনে, সেভাবেই স্মৃতিতে ছুপিয়ে যায় কাহিনিমালা, স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ঘুমের ভেতরে দোচালা মন্দিরটা যেন উলটানো জাহাজের খোলের মতো দুলে দুলে কাহিনিমালার রঙিন সামুদ্রিক গুল্ম টেনে নিয়ে পাড়ি জমায়।
আদিরামবাটিতে এলে রোজ সকালে দাদুর কোলে চেপে শাকম্ভরী দেবীকে দর্শন দিতে যাওয়াটা বাপ্পার নিত্যকর্মের মধ্যে পড়ে। তারপর সন্দেশ চুষতে চুষতে পরের গন্তব্য হলো মন্দির। গর্ভগৃহে ফুল-চন্দনের গন্ধে ভারি আবছায়ায় একা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পাথরের বালক। বাপ্পা হাত জোড় করে তাকে নমো করার পর রামপ্রাণ দুহাতে ওকে তুলে ধরবেন, হাত বাড়িয়ে ঝুলন্ত ঘন্টাটা বাজিয়ে দেবে সে। পাথরের বালকটি রুপোর পাতে মোড়া চোখ মেলে চেয়ে থাকে নিষ্পলক। এরপর বাইরে পরিক্রমা সারার পর, দেয়ালে নির্দিষ্ট থানে কপাল ছোঁয়ানোর পর কত প্রজন্মের কপালের তৈলাক্ত ছোঁয়ায় কয়েকটি নির্দিষ্ট প্যানেলে কারুকাজ ক্ষয়ে মসৃণ হয়েছে দাদু-নাতি চলে আসবে ওষধিবাগানে, নাগকেশরের নীচে বাঁধানো বেদিটায় গিয়ে বসবে। সেখানে তখন পাতার ফাঁক দিয়ে সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে, চারদিকে ছড়িয়ে আছে গোলাপি নাগকেশরের ফুল, তার ওপর মৌমাছি উড়ছে। পাখি ডাকছে, টোলের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে ছাত্রদের কণ্ঠে মুগ্ধবোধ আওড়ানোর ধ্বনি। বাপ্পার মা খুরপি হাতে ঘুরে ঘুরে গাছেদের পরিচর্যা করছে, দাদুর পাশে বসে পায়রাদের খুদ খাওয়াচ্ছে বাপ্পা। পায়রারা নেমে আসছে হাততালির মতো শব্দে, রামপ্রাণ ফতুয়ার পকেট থেকে খুদ নিয়ে বাপ্পার ছোট্ট হাতের তালুতে দিয়ে ডাকছেন–‘আয়! আয়! আয়!’
হাতের সামনে নীলচে ধূসর ধোঁয়ার মতো ডানার ঝটাপটি টুকটুকে লাল পা, লাল চোখ, পাঁশুটে গন্ধ। ভয়ে হাতের খুদ ফেলে দিয়ে সিঁটিয়ে আসে বাপ্পা।
একটা সাদা মতো লোক মায়ের পাশে পাশে ঘুরে বেড়ায়। লোকটা গাছেদের সঙ্গে কথা বলে, উবু হয়ে বসে আঙুল দিয়ে মাটি খোঁড়ে, বীজ পোঁতে, কঞ্চি পুঁতে জড়িয়ে দেয় লতার আকর্ষী। দাদু যেভাবে সামনে ঝুঁকে কান পেতে রুগিদের কথা শোনে, রোগের কথা শোনে, সেভাবেই গাছেদের কথা শোনে লোকটা। তার পরনে সাদা জোব্বা, মাথায় টুপি, সাদা গোঁফ দাড়ি এমনকি ভুরুও সাদা গলায় বিচিত্র আকারের তাবিজ মাদুলি, হাতের আঙুলগুলো লম্বাটে, টানা-টানা ঘুম-ঘুম চোখে সূর্যা আঁকা।
তিনি আলিসাহেব। বড়ো হয়ে বাপ্পা জানবে, ওষধিবাগানের অনেক গাছ আলিসাহেবের হাতে লাগানো। তিনি দেশবিদেশ ঘুরে নিয়ে আসেন। নাগকেশরের বেদিতে দাদুর মুখোমুখি বসে সাদা-নীল চেককাটা রুমালে বীজ, ছাল, শেকড়বাকড় বিছিয়ে নাড়াচাড়া করেন, তাদের গুণাগুণ নিয়ে আলাপচর্চা করেন। সাতগাঁয়ে এলে উত্তরদিকে বসতি ছাড়িয়ে গাজির বাগানে থাকেন আলিসাহেব। আদিরামবাটিতে দাদুর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, কিন্তু বাড়ির ভেতরে পা রাখেন না। ওষধিবাগানের বেড়ার চাবি খুলে দেওয়া হয়, আলিসাহেব বেদিতে বসে অপেক্ষা করেন।
গ্রীষ্মে আলিসাহেব চলে যান হিমালয়ে। একবার বাড়ির ছোটোদের জন্য নিয়ে এলেন এক অদ্ভুত কাঁটাযুক্ত বীজ, যা জলে ফেললে আতশবাজির মতো ফেটে যায়। আলিসাহেবের রেশমি কণ্ঠস্বর, ছোটোদেরও তিনি— ‘আপনি’ সম্বোধন করেন, পশুপাখিদের ভাষা বোঝেন, এবং তাদেরকেও— ‘আপনি’ সম্বোধন করেন। পায়রাগুলো খুদ খেতে নেমে এসে আলিসাহেবের কাধে, কোলে, মাথায় টুপির ওপর এসে বসে। তিনি ওদের হাতে তুলে নেন, পালকের ফাঁকে লম্বা আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দেন।
‘এই যে পাটকিলে রঙেরটিকে দেখছেন, গলায় চুনির গুঁড়ো, ইনি হলেন জালালি কবুতর।’ আলিসাহেব বলেন। ‘হজরত শাহ জালাল সাহেব সেই যেবার কোনিয়া থেকে হিন্দুস্থান এলেন, দিল্লিতে পীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার অতিথি হয়ে ছিলেন তিনি। চলে আসার সময়ে পীর এক জোড়া এই পায়রা উপহার দিয়েছিলেন। বাংলায় এসে হজরত সাহেব পায়রা দুটিকে উড়িয়ে দিলেন। সিলেটে শাহ জালালের আস্তানা থেকে জালালি কবুতর ছড়িয়ে পড়েছে আম বাংলায়।’
