Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ১৩.৭

১৩.৭

লাল ইঁটের বাড়িটার বাইরে পোর্টিকোয় অপেক্ষমাণ তেরো-চোদ্দ জনের যৌথ পরিবার। তাদের বেশিরভাগেরই পরনে শালোয়ার-কামিজ আর কুর্তা-পাজামা; পুরুষদের কারোর মাথায় টুপি, মেয়েদের মাথা ওড়নায় ঢাকা। সকলের চোখেমুখে উৎকণ্ঠার ছাপ। দলে প্রবীণতম মুরুব্বি গোছের মানুষটির দাড়ি মেহেন্দি-রাঙানো। সবাইকে পাখি পড়ানোর মতো করে বোঝাচ্ছেন একে অপরের নাম ও পারস্পরিক সম্পর্ক। I♥ NY লেখা কালো টিশার্ট আর জিন্স-পরা এক সুদর্শন যুবকের সামনে দাঁড়িয়ে তার বুকে হাত রেখে এক তরুণীর দিকে ফিরে বলছেন

‘আর এ কেডা? জবাব দাও!’

চোদ্দ-পনের বছরের রোগামত মেয়েটি, পরনে নীল-হলুদ ফুলছাপ সালোয়ার কামিজ আর মাথায় সবুজ ওড়না, নীচু স্বরে বলে,— ‘আজিজ।’

‘অমন মিউমিউ করে না, গলা ছেড়ে কও।

‘আজিজ!’

‘আজিজের বাবা কোনটা?’

‘রাকিবুল হুসেন।’

‘রাকিবুল হুসেন তোমার কে হন?’

‘চাচা।’

‘তাইলে আজিজ তোমার কেডা?’

‘চাচাতো ভাই।’

‘ফের মিউ মিউ করে! গলায় ত্যাজ নাই?’

বোঝা যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পরিবার, অনেককাল পরে একত্র হয়েছে। ইতিমধ্যে পরিবারে নতুন সদস্য যোগ হয়েছে, পুরোনো সদস্য বিয়োগ হয়েছে। একটি শমন সকলকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে টেনে এনে জড়ো করেছে লাল-ইঁটের বাড়িটার সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক পড়বে।

বাপ্পার মনে পড়ে যায় ছোটোবেলায় শ্মশানঘাটে বিশুকা সাতগাঁর পাশ্চাত্য বৈদিক বংশে অশৌচের রাত্রির একক মেপে জ্ঞাতি পুরুষদের চেনাতো, রক্তের সম্পর্কের জটিল জাল। হেমন্তমামার দেহটা যখন চুল্লির ভেতরে পুড়ে ছাই হচ্ছে কানাই পাশে দাঁড়িয়ে বলল–

‘তুই এই লাইনে কেসটা লড়া ছেড়ে দে, বাপ্পাদাদা। সারেন্ডার কর।’

‘সারেন্ডার করব? মানে? কী বলছিস?’ বাপ্পা বলেছিল।

‘হ্যাঁ, নতুন নাগরিকত্ব আইনে আবেদন কর। ফ্রেশ স্টার্ট।’

‘মানে শূন্য থেকে শুরু?’

‘ধরে নে একরকম তাই। সেটা অনেক সোজা হবে। নতুন আইনে তোর নাগরিকত্ব পেতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমি তোর পাশে থাকব।’

.

লাল ইটের বাড়িটায় দোতলার প্রশস্ত করিডোরে সারি দিয়ে পর পর চেম্বার, দরজা বন্ধ। সবুজ ওড়না মাথায় মেয়েটিকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্ডার পুলিশের দুই মহিলা কনস্টেবল টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কনস্টেবল দুজনের হাফ শার্টের নীচে পেশল বাহু, একজনের হাতে শাঁখা নোয়া, দুজনেরই চুল টান টান করে ক্লিপ দিয়ে খোপা বাঁধা। ভাবলেশহীন মুখে ওরা মেয়েটির দুই কাঁধ ধরে টানছে আর সে, আতঙ্কে পাথর, এক বয়স্কা নারীর কুর্তার হাতা খামচে ধরে গোঙানির স্বরে আর্তনাদ করছে— ‘আম্মু! আব্বা! বুয়া! খালা! ফুফা!’ একপাশে দাঁড়িয়ে শাদা শার্ট গুঁজে পরা এক পুরুষ, ক্লিপবোর্ডে কাগজে লেখা পর পর নামের তালিকায় একটি নামের ওপর পেন দিয়ে লাইন টেনে দিল। পরিবারের অন্য সদস্যরা স্থাণুবৎ, আতঙ্কের রেখা গভীর হয়ে কেটে বসেছে তাদের চোখেমুখে।

একতলায় করিডোরে পোর্টিকোয় অসংখ্য জোড়া জোড়া চোখ এই দৃশ্য দেখছে। লাল ইটের বাড়িটায় কর্মব্যস্ততা হঠাৎ যেন থেমে গিয়েছে, নিশ্চুপ হয়ে পড়েছে। কনস্টেবল দুজন খুব সচেতন মেয়েটাকে দুদিক থেকে ধরে সিঁড়ির দিকে টেনে আনছে, কিন্তু দেখে মনে হবে না বলপ্রয়োগ করছে, মনে হবে যেন কোনো নাটকের মহড়া দিচ্ছে। যেন ওরা জানে, মহড়া শেষ হলেই আবার সবকিছু আগের ছন্দে ফিরে যাবে, আবার ফাইল হাতে পিওনদের করিডোরে দ্রুত পদচারণা, আবার কেটলি আর তারের খাঁচায় চায়ের গ্লাস নিয়ে চা-ওয়ালার বালক সহকারীর ছুটোছুটি চলবে। বাতাসে আরেকটু দমচাপা অনিশ্চয়তা জমবে কেবল, কপালে ভুরুর মাঝে ভাঁজগুলো হয়তো থেকে যাবে বিকেল পর্যন্ত।

‘আম্মু! আম্মু! আম্মু!…’

হিজাবে মাথা ঢাকা মহিলাটি থামের মতো স্থির। মেয়েটির চোখ শুকনো, শূন্য, কস বেয়ে লালা গড়াচ্ছে। খানিকক্ষণ ধস্তাধস্তির পর ব্যর্থ হয়ে দুই কনস্টেবল ওর হাতের আঙুলগুলো একটি একটি করে টেনে মহিলাটির কামিজ থেকে ছাড়াতেই ছিটকে মেঝেয় চিৎ হয়ে পড়ল মেয়েটি। সেই সুযোগে তাকে চ্যাঙদোলা করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামাতে থাকে ওরা। মেয়েটার মাথার পেছনে চুলে ধুলো লেগেছে, চোখের পাতা বন্ধ, নিজের আর্ত চিৎকারে নিজেরই কানদুটো যেন বধির হয়েছে, শুধুমাত্র আদিম প্রথম ইন্দ্রিয়ানুভূতি দিয়ে শেষবারের মতো যা কিছু হাতের নাগালে পাচ্ছে মরীয়া আঙুলে আঁকড়ে খামচে ধরে থাকতে চাইছে–আম্মুর কামিজ থেকে হাত থেকে ছাড়িয়ে নেবার পর রেলিং ধরেছে, আবার শাঁখা-নোয়া পরা কনস্টেবলটি একটি একটি করে তার আঙুল ছাড়িয়ে নিয়েছে, তারপরই থামটা দুহাতের বেড় দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে, আবার ছাড়িয়ে দিয়েছে। এভাবে একে একে সিঁড়ির রেলিং, দরজার ফ্রেম, পোর্টিকোয় নোটিস বোর্ডের ফ্রেম, গুলমোহরের কান্ড—ডুবে যাওয়ার আগে অন্ধ হাতে খড়কুটোর মতো একের পর এক ভূমিতে- গাঁথা অনড় বস্তুর থেকে তাকে উপড়ে নিতে নিতে, পোর্টিকোর ওপর দিয়ে টানতে টানতে, মেয়েটির মাথার ওড়না খসে লুটোতে প্রজাপতি- ক্লিপ কনস্টেবলের বুটে জড়িয়ে গিয়ে সে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগেই টাল সামলে নিয়ে FREEDOM CENTER লেখা স্করপিওটার কাছে আসতেই চালক লাফিয়ে নেমে পেছনের দরজাটা খুলে ধরল। কনস্টেবল দুজনে এবার মেয়েটির বগলের নীচে ধরে গাড়ির ভেতরে ঠুসে দিল, নিজেরা ঢুকে দরজা বন্ধ করার আগের মুহূর্তে গালে সপাটে চড় কষালো প্রজাপতি-ক্লিপ। তারপরেই হুস করে বেরিয়ে গেল গাড়িটা।

*

‘কিন্তু আপনি আমায় একটা পোস্টকার্ডে নির্বাসন দিতে পারেন না, মি’লর্ড, বাপ্পাদিত্য বলে উঠল। ‘পোস্টকার্ড কোনো দেশ নয়!— ‘

চেম্বারের স্প্রিং-আঁটা দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকা মাত্র তার হাত-পা হিম হয়ে এসেছিল, আতঙ্কে জিভ ভারি হয়ে ওঠার আগেই বলে ফেলল কথাগুলো। দেখল, ঘরটা আদপেই সিনেমায় দেখা কোর্টরুমের মতো নয়। আধুনিক অফিসে চেম্বার যেমন হয়–দুই সারি চেয়ারের ওপারে চওড়া ডেস্ক, টেলিফোন, ডেস্কটপ মনিটর, তারও ওপারে না, কালো জোব্বা-পরা, গম্ভীর মুখে মোটা ফ্রেমের চশমা, ব্যাকব্রাশ-করা চুল কিংবা সাদা পরচুলা-আঁটা কেউ নয়, যেমনটা সে ভেবেছিল। এমনকি কোনো পুরুষও নয়। একজন নারী! মধ্যবয়সী, ঈষৎ পৃথুলা, পরনে সিল্কের শাড়ি, চুলে খয়েরি রঙ, কপালে বড়ো খয়েরি টিপ, সোনালি চশমার ফ্রেমে বিস্ফারিত দুটো চোখ নিবদ্ধ ওরই ওপর।

নেমপ্লেটে লেখা ছিল Justice R. Y. Gauthama। আর কিছু নয়। হায় রে! কতদিন এই দরজাটার বাইরে ঘোরাঘুরি করেছে সে, দরজার বাইরে সশস্ত্র রক্ষীটিকে মেপেছে। দীর্ঘ, কৃষ্ণকায় সদ্যযুবকটির কদমছাঁট চুল, জিমচর্চিত পেশি, হাতে স্বয়ংক্রিয় এস-এল-আর যেন নাবিকের কোলে পোষা কাপুচিন বাঁদর। সদাসতর্ক, স্থাণু, চোখের পলকও পড়ে না। ইস্পাতকঠিন চোয়ালটা শুধু নড়ে, আর সারাদিনে কয়েকবার আট সেকেন্ডের জন্য (ঘড়িতে মেপে দেখেছে বাপ্পাদিত্য, ঠিক আট সেকেন্ড) তিনকদম এগিয়ে করিডোরে থামের পেছনে মুখ বাড়িয়ে লম্বা করে পিক ফেলে, তারপর আকাশে মুখ তুলে হাঁ করে ঠোঁটের ফাঁকে ঢেলে নেয় শিখর ৫০০০ দুই পাউচ। সেই আট সেকেন্ডের সদ্ব্যবহার করেছে সে, আর এখন মহামান্য হুজুরের মুখোমুখি।

হুজুর, নাকি হুজুরাইন? ওহ, কতদিন ধরে যে এই মুহূর্তটা মনে মনে জপেছে বাপ্পাদিত্য। কথাগুলো নয়। কথাগুলো মুখ ফস্কে বেরিয়ে এল। ঠিক এভাবে শুরু করতে চায়নি, কিন্তু… মুহূর্তের সুযোগ ছিনিয়ে নিষিদ্ধ চেম্বারে ঢোকা, বাইরে করিডোরে ওই দৃশ্য, কোলাহল আর গরমের হলকা থেকে আচমকা এই বাতানুকূল নৈঃশব্দ্য, এবং সর্বোপরি ডেস্কেরও পারে তিনি। বাপ্পাদিত্যর চৈতন্য বিকল হলো।

এখনও সোনালি ফ্রেমে আঁটা ওঁর চোখের দৃষ্টি নিবদ্ধ। প্রাথমিক বিষ্ময়ের ধাক্কা কেটে গিয়ে কৌতূহলের ঝিলিক ফুটেছে কি? সেটা নিভে যাবার আগেই ফের মরীয়া হয়ে ওঠে বাপ্পাদিত্য।

‘একটি পোস্টকার্ড কোনো দেশ নয়, ইওর অনার। সেখানে কাউকে নির্বাসন দেওয়া যায় না।’

‘আপনি ভেতরে ঢুকে এলেন কীভাবে?’

অনুচ্চ, নিস্পৃহ কন্ঠস্বর। কপালে সন্দেহের ভাঁজ ভেলভেটের বড়ো টিপটা ঠেলে তুলেছে। ডেস্কে হাতের সামনে থেকে সবুজ ফাইল ঠেলে সরিয়ে দিলেন।

আহ! একেকটি ফাইল একেকটি জীবন্মুত মানুষের গল্প; রামপ্রাণের চেম্বারে সেই কালো রেক্সিন-বাঁধানো খাতার মতো।

‘একটা কেবল পোস্টকার্ড, ইয়োর অনার! ডাকে এসেছিল আমার বাবার নামে, তাঁর জন্মভিটের ঠিকানা থেকে, আমার জন্মের আগে…’

বাপ্পার জিভ শুকিয়ে আসছে, হাঁটুদুটো যেন জেলির মন্ড, এই উদ্ভট বিপজ্জনক কান্ডটা ঘটিয়ে ফেলার অভিঘাত শরীরে টের পেতে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। পেছন থেকে কাঁধের ওপর সাঁড়াশির মতো থাবাটা এঁটে বসতেও তাই চমকাল না, ওটা প্রত্যাশিতই ছিল। সেই গুটকাখোর রক্ষী! ঠিক সেই মুহূর্তে ডেস্কের ডানদিকের দেয়ালে ফাইল ক্যাবিনেটের পাশ থেকে লাফ দিয়ে উঠল এক ক্ষয়াটে যুবক, ওঁর পি.এ.। এতক্ষণ চোখে পড়েনি।

‘আপনাকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি কে দিয়েছে? অ্যাঁ? কে দিয়েছে?’

খোলা ঠোঁটের ফাঁকে লম্বা কুকুরে দাঁতদুটো আর গোলাপি মাড়ি দেখা যায়। তেড়ে আসছে, ওদিকে কাঁধের ওপর থাবাটা পিছন দিকে টানছে।

তিনি জিভে মৃদু চুক-চুক শব্দ করলেন। দুজনেই থেমে গেল। কাঁধে আঙুলের সাঁড়াশিটা আলগা হয়ে এল। পি.এ. তিন ফুট দূরত্বে এসে থেমে গেল, চোখে আক্রমণাত্মক চাহনিটা নিভে গেল। যদি ওর একটা লেজ থাকত, নির্ঘাৎ এখন সেটা কার্পেটের ওপর আছড়াচ্ছে দেখতে পেত বাপ্পা। বুকে হাতুড়ির শব্দ ছাপিয়ে শুনতে পেল রক্ষীটির ভারি বুট দরজার দিকে সরে যাচ্ছে। টেবিলের ওপারে ওঁর চোখেও পেশাদার অভিব্যক্তি ফুটেছে এখন। কপালে ভাঁজটা নেই।

নৈঃশব্দ্যের ভেতর চাপা এয়ারকন্ডিশনারের ধ্বনি, ডেস্কটপ মনিটরে জরায়ুনীল প্রভায় ডিএনএ-র জোড়াপ্যাঁচ ঘুরে চলেছে অবিরাম।

‘এ.আর.এন. হয়েছে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

বাপ্পা নম্বরটা বলল। পকেটে কাগজের টুকরোটা মিলিয়ে দেখতেও হলো না।

তিনি মাউস নেড়ে ডেস্কটপ জাগালেন, কীবোর্ড টিপতে লাগলেন। ছোটো মোটা চাঁপাকুঁড়ির মতো আঙুল, মধ্যমায় গোমেদ-বসানো আঙটি, আঙুলের ডগায় আবছা হলদে ছোপ। রান্নার হলুদ কি?

‘আরেকবার নম্বরটা বলুন তো?’

আরেকবার বলল, উনি আওড়ালেন –‘ES/276/3943। ঠিক?’

ঠিক না হয়ে পারে, ম্যাডাম? বিগত আড়াই মাস ধরে এই নম্বরটা যে ওর প্রাণভোমরার কৌটো। এখন যদি বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জিকে গিলোটিনে দেওয়া হয়, কাঠের গুঁড়ো ভর্তি ঝুড়ি থেকেও ওর কাটা মাথাটা বলে উঠতে পারবে ES/276/3943!

তিনি মনিটর দেখে একটি কাগজের টুকরোয় কিছু লিখলেন, পি.এ.-র হাতে বাড়িয়ে দিলেন। যুবকটি বাপ্পার দিকে একবারও না তাকিয়ে, রক্ষীটির দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হেনে দরজার দিকে এগোলো। অসহায় বাহুবলী দরজাটা সামান্য ফাঁক করে ধরল। তিনি আঙুল নেড়ে ওকেও বেরিয়ে যেতে বললেন।

চেম্বারে এখন ওরা দুজন। মাঝে দুসারি গদি-আঁটা ভিনাইলের চেয়ার, শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওঁরই দিকে। কিন্তু উনি বসতে বললেন না, হাতের ফাইলটা টেনে নিলেন। বাপ্পাদিত্যকে উনি নিভিয়ে দিলেন, ঠিক যেভাবে সুইচ টিপে আলো নেভায়। উনি জানেন, ওঁর মতো পদাধিকারীরা জানে, কীভাবে সেটা করা যায়।

পায়ের নীচে সবুজ কার্পেট, হিম বাতানুকূল, বাপ্পার মাথায় কুয়াশা পাতলা হয়ে আসে। চেম্বারের দরজার ওপিঠে তপ্ত, কোলাহলময়, টাইপরাইটারের অবিরল ধ্বনি, Freedom Center-এর গাড়ির যাওয়া-আসা, ঘাম আর ছাতাধরা কাগজের গন্ধে ভরা জগতটা থেকে কত দূরে এই নিঃশব্দ নিষ্কলুষ পাইনকাঠের প্যানেলে মোড়া চেম্বার, এই ধাতব সাদা আলো, এই পেতলের টবে এরিকা পাম, বুক কেসে চামড়ায় বাঁধানো আইনের বই, এই ফ্রেমবন্দি সহাস্য প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি, এই ঢাউস পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্র, ডানদিকে আড়াআড়ি রক্তের ধারার মতো মোটা লাল দাগ? এই সব, সব কিছু, সমস্ত খুঁটিনাটি ঠিক যেমনটি বাপ্পাদিত্য কল্পনা করে এসেছে এতগুলো দিন ধরে, আতঙ্কের বিকারের ভেতর। শুধু ডেস্কের ওপ্রান্তে মানুষটি নয়।

.

সামান্য হাঁফাতে হাঁফাতে পি.এ. ফিরল, কপালে ঘাম, হাতে সেই সবুজ ফাইল, যেটি বাপ্পা আবিষ্কার করেছে তিনটি দপ্তরে অনন্ত গোলকধাঁধায় মাথা কোটার পর, ডজন দুয়েক কেরানি আর্দালি বেয়ারার হাতের তালু তৈলাক্ত করার পর। ফাইলটা হাতে নিয়ে তিনি এবার তাকালেন ওর দিকে, যেন সুইচ টিপে ফের অন করলেন, চোখের ইঙ্গিতে বসতে বললেন। ফ্ল্যাপে আঁটা দড়ির ফাঁস খুললেন, ভেতরে কাগজের তাড়ায় সেঁধিয়ে গেল ওঁর বেঁটে চাঁপাকুঁড়ির মতো আঙুল, আবছা হলুদের ছোপ-লাগা–যেন মাছের পেটের থেকে নাড়িভুঁড়ি টেনে পরিষ্কার করছেন। ছবিটা অযাচিতভাবে বাপ্পার মাথায় খেলে গেল।

‘এইটা?’ অস্ত্রের দলা থেকে পিত্ত ছিঁড়ে আনার মতো টেনে বের করলেন পোস্টকার্ডটা। কপালে ফের ভাঁজ পড়ল। পোস্টকার্ডে বাংলায় লেখা একসারি নাম, তিনি পড়তে পারেন না। সঙ্গে ক্লিপ-আঁটা আধিকারিকের নোটে চোখ বোলালেন।

‘এটা দেখে মনে হচ্ছে বংশলতিকা। তাই না?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ! বংশলতিকা বলুন, বংশবৃক্ষ বলুন…শিকড়গুলো ওপরের দিকে, নীচে নেমেছে শাখাপ্রশাখা। আমার বাবার দিকে পাঁচ প্রজন্মের পূর্বজের তালিকা।’

‘এই নোটে স্পষ্ট লেখা আছে, আপনারা অন্ততপক্ষে পাঁচ প্রজন্ম ধরে…’ চশমাটা সামান্য তুলে ফের দেখে নিয়ে বলেন—‘সিলেটে থেকেছেন। এই পোস্টকার্ড তার প্রমাণ!’

‘কিন্তু হুজুর…’ বাপ্পাদিত্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ‘ওই পোস্টকার্ডটা সিলেট থেকে পাঠানো হয়েছিল আমার জন্মের আগে, আমার বাবা-মায়ের বিয়ের সময়। বাবার পাঁচপুরুষের নামের তালিকা বিয়ের আভ্যুদয়িক অনুষ্ঠানে দরকার ছিল। পোস্টকার্ডে কলকাতার ঠিকানা লেখা আছে, দেখুন—২৩/৩ কলুটোলা লেন। আমার বাবা ঈশ্বর রথীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তখন কলকাতায় ওই ঠিকানায় থিতু। আমার মা প্রয়াতা শিউলিরানি চক্রবর্তী ছিলেন সাত গাঁয়ের মেয়ে, যা ইন্ডিয়ার মধ্যেই।’

‘এভিডেন্স কই?’ তিনি কাগজগুলো ফের হাতড়াতে লাগলেন। ‘এই পোস্টকার্ড যেখান থেকে এসেছে, সেই সিলেটে যে আপনি জন্মাননি এখানে কোনো ডকুমেন্টে সে কথা লেখা নেই তো? অন্য কোনো এভিডেন্স নেই।

‘কিন্তু আমি জীবনে কোনোদিন সিলেটে যাইনি, ইওর অনার! আমার জন্ম সাতগাঁয়ে, মামারবাড়িতে। বাড়িতেই প্রসব হয়, পারিবারিক দাই এসে নাড়ি কাটে। জন্মের কোনো পঞ্জীকরণ হয়নি।’

‘এভিডেন্স কই?’ তিনি চশমাটা ঠেলে তুলে সরাসরি তাকালেন।

(উনি উচ্চারণ করলেন— ‘অ্যাভিড্যান্স’! বাপ্পার বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগল)

‘এভিডেন্স?’

তিনি মাথা নাড়েন।

‘মানে যা ঘটেনি তার এভিডেন্স?’

উনি কয়েক সেকেন্ড ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।–‘আপনার কেসটা ডিফেন্ড করছে কে?

‘আমি, মি’লেডি। আমিই ডিফেন্ডেন্ট, আমিই ডিপোনেন্ট।’

(চোখে সূক্ষ্ম কৌতুক ফুটল কি? ‘মি’লেডি’ শব্দটা?)

‘আপনি কী করেন?’

‘আ-আমি একটা কলেজে পড়াই।’

‘কী পড়ান?’

‘সাহিত্য।’

‘দেখুন মিস্টার… চ্যাটার্জি। এখানে সাহিত্য ফলানোর কোনো সুযোগ নেই। উত্তরাধিকারের সুস্পষ্ট এভিডেন্স চাই, ক্লিয়ার-কাট এভিডেন্স অফ সাকসেশান। আপনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তার খন্ডন, পয়েন্ট বাই পয়েন্ট। সম্ভব হলে টেবিলের আকারে। তাতে ইতিহাস থাকবে, ভূগোলও থাকতে পারে। কিন্তু প্লিজ, সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি!’

‘কিন্তু যা ঘটেনি তার এভিডেন্স? মামারবাড়ির আঁতুড়ঘরে আমার জন্ম, বুড়িদাই এসে…’

‘আপনি বলেছেন!’ অধৈর্য হাতে চশমাটা টেনে খুললেন তিনি। ‘এতবার— ‘আমি-আমি’ করবেন না। আর…শুধু মুখে বললে হবে না, দেখান। শো, ডোন্ট টেল!’

.

‘শো, ডোন্ট টেল! শো, ডোন্ট টেল!’ বাপ্পাদিত্যর মাথার ভেতরে কী যে ঘটে গেল। চেম্বারের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার পর ওই সাদা ধাতব আলো, ওই খয়েরি টিপ আর হলুদের ছোপ-লাগা আঙুল, মনিটরের জরায়ু-নীলে পাক খেয়ে চলা ডিএনএ-র জোড়া প্যাঁচ, হিম বাতানুকুল—পাইন কাঠের প্যানেলের আড়ালে আদ্যিকেলে এয়ারকন্ডিশনারের গোঁ গোঁ ধ্বনির মতো মাথার মধ্যে অপ্রতিরোধ্য বাক্যের প্রবাহ শুরু হলো, কান গরম হয়ে উঠল, মেরুদন্ড বেয়ে ঠান্ডা তরল উঠে এল মাথায়।

‘সব কিছু যে দেখানো যায় না, ধর্মাবতার! বছরে ছয় মাস এই বাংলার বুকে বয় যে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু, তা কি দেখানো যায়? কিংবা ধরুন মাটির নীচে হাঁড়িতে কলাপাতা চাপা কাঁচা সিদলের গন্ধ? যায় কি? না, মি’লেডি। যায় না! আর আপনি আমায় ওই পোস্টকার্ডটায় নির্বাসন দিতে পারেন না, তার কারণ পোস্টকার্ডটা যে দেশ থেকে এসেছে সেই দেশটার আর কোনো অস্তিত্বই নেই। তার চেয়ে বরং আপনি আমায় গাঁজানো সিদলের গন্ধে নির্বাসন দিন!’

*

মাঝ রাত্তিরে জেগে ওঠে। অন্ধকারে দেরাজ হাতড়ে বের করে আনে হার্মাদি সিন্দুকের চাবিটা। কবেকার চাবি, কতকাল হেমন্তমামার অস্ত্রের ভেতরে ছিল। গিলে ফেলেছিল কি চায়ে ডোবানো পাউরুটির সঙ্গে? কী আশ্চর্য! তীব্র আগুনের তাপে এতটুকু বেঁকে যায়নি। ওই সিন্দুকটার ভেতরে নিশ্চিতভাবেই ওষধিবাগানের দানপত্রটা আছে, মি’লেডি, ওতে মা ছেলের নাম লেখা রয়েছে, আঙুলের ছাপ রয়েছে, হেমন্তমামার কোডাক ব্রাউনি ক্যামেরায় তোলা ওই ছবিটা, চিঠিপত্র, মশাইয়ের করা ঠিকুজি, একটা টেলিগ্রাম:— ‘REACHING TOMORROW. WILL NAME HIM BAPPADITYA’ –কালচিনি টি এস্টেট পোস্টাপিসের শিলমোহর আর তারিখটা তত ঝাপসা হয়ে যায়নি, পড়া যাবে। সেই টেলিগ্রামের সঙ্গে সাতগাঁ থেকে— ‘BOY BORN LAST NIGHT AT HOME. ALL WELL’ মিলিয়ে পড়লেই রসেটা পাথরের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠবে সেই রহস্যলিপি, মি’লেডি, যে বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জি, সাতগাঁয়ে মাতুলালয়ে যার জন্ম, যে আজীবন এই দেশে বসবাস করেছে (মাঝে কেবলমাত্র একবার দেড় মাসের জন্য বিদেশে গিয়েছে), আজীবন একটি সরকারপোষিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছে, যথা সময়ে আয়কর দিয়েছে, কোনোদিন পুলিশের খাতায় নাম ওঠেনি, এগারজন প্রধানমন্ত্রী ও ছ জন মুখ্যমন্ত্রীর শাসনকাল দেখেছে…

এভিডেন্স চাই! আপনি বলেছেন, মি’লেডি। ক্লিয়ার-কাট এভিডেন্স, রক- সলিড, রসেটা পাথরের মতো, পয়েন্ট বাই পয়েন্ট… শো, ডোন্ট টেল!

কিন্তু— ‘টেলিং’ ছাড়া কীভাবে— ‘শো’ হবে, মি’লেডি? শব্দ দিয়ে বোনা হাওয়ার তাঁতের মতো কাহিনি মৎস্যভূমির বাসিন্দাদের জড়িয়ে থাকে জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত, আঁতুড়ের বাইরে দাওয়ায় উঠোনে রান্নাঘরে চানের ঘাটে চণ্ডীমণ্ডপে বাজারে ধর্মতলায় বটের নীচে শ্মশানে অন্তর্জলীযাত্রায় অপেক্ষার প্রহরে। ম্যাওবেড়ালের গির্জার মাথায় টালি থেকে শুরু করে আদিরাম মন্দিরের দেয়ালে প্যানেল যত না দেখায় তার চেয়ে ঢের বেশি বলে যে।

মি’লেডি, এক হাজার এক রাত ধরে শেহরাজাদও বলেছে, নিজের প্রাণরক্ষার তাগিদেই বলেছে। কিন্তু শেহরাজাদ ছিল সুন্দরী নারী, এক আশ্চর্য কথক। শেহরাজাদ ছিল উচ্চ জাতিকা, তার নামের অর্থই তাই। বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জিও প্রাণরক্ষার তাগিদেই তার কাহিনি বুনে চলেছে, মি’লেডি। কিন্তু সে হারামজাদ তার জন্মের উৎস প্রশ্নচিহ্নের মুখে। তদুপরি সে হিন্দু উচ্চবর্ণ লিঙ্গনির্দিষ্ট পুরুষ। পাতার পর পাতা এতদূর পর্যন্ত তার জীবনকাহিনি শোনার ধৈর্য কি আপনার হবে, মি’লেডি?

হবার কথাও নয়। এত কাল ধরে, এত এত শতাব্দী ধরে এত কথা তারা বলেছে যে সবাই চায় এবারে ক্ষান্ত দিক, চুপ করে থাকুক, আগামী কয়েক শতাব্দী অন্তত। এতকাল ধরে নীরব ছিল যে কন্ঠস্বরগুলো, তাদের বলতে দেওয়া হোক বরং। ঠিকই তো! আর যদি বা বলে, যদি একান্তই বলতে হয়, তাহলে কথাগুলোকে যেন ঘষে ঘষে সরু ফিনফিনে আর ধূসর করে তোলা হয় মামুলি, হাবিজাবি, ঘাচার-ঘোচর। তাতে যেন কক্ষনো জাদুকরী রেলগাড়ি না ছোটে, যেন সোনালি ট্রিমিং-দেওয়া সবুজ কামরা টেনে লাল-কালো ডেল্টা ক্লাস ইঞ্জিন কেরেস্তান- গোরস্তান-কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি দিতে দিতে মাছের আকৃতির দেশে না নিয়ে যায়, যে দেশে যেতে দিব্যি-কাটা গোপনীয়তার পাসপোর্ট লাগে, যে দেশে নদীর পাড়ে কার্টুনি মেয়ের দল কুয়াশা আর ভোরের আলো দিয়ে মসলিন বোনে আরব্য রজনীর মতো।

মি’লেডি, শেহরাজাদ আর সুলতানের তবু ভাষা ছিল এক। এই আপীল এমন এক ভাষায় লিখতে হচ্ছে যা কারোরই মাতৃভাষা নয়। আশা করা যায় আকুতিটুকু অন্তত ভাষার চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে না।

মি’লেডি, evidence শব্দটা আপনি যেভাবে উচ্চারণ করলেন, প্রথম স্বরবর্ণটা টেনে, তৃতীয় সিলেটা তালব্যর নীচে জিভ ঘুরিয়ে জোর দিয়ে,— ‘ড’-টা প্ৰায়— ‘ড়’-এর মতো করে অনেকটা যেন রসমে টাকনা দিচ্ছেন! ঠিক সেই মুহূর্তে বাপ্পাদিত্যের মনে হল আপনাকে চিনতে পেরেছে! ওর বুকের থেকে উষ্ণ আবেগের বাস্পপুঞ্জ দু সারি ভিনাইলের চেয়ার পেরিয়ে ডেস্কের ওপাশে আপনার দিকে বয়ে গেল। আপনিও তাহলে নন-ইংলিশ-মিডিয়াম? এবং খুব যদি ভুল না হয়, বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণ অঞ্চলের?

প্লীজ মি’লেডি, এটাকে কটাক্ষ ভাববেন না। ‘ড্যাড, তোমার প্রতিটা ইংরেজি ভাওয়েলের মধ্যে একটা করে রসগোল্লা পোরা থাকে!’ বাপ্পাদিত্যকে তার ইংলিশ- মিডিয়াম পুত্র সিধু মাঝেমধ্যেই বলে।

দু বছর আগে সিধুর উপহার দেওয়া ল্যাপটপ হাতড়ে ইন্টারনেটে আপনার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছে বাপ্পা। ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামে আপনার প্রোফাইল লক করা, কিন্তু অন্য পথে কিছু তথ্য জেনেছে। আপনার পুরো নাম রুক্মিনী ইয়েরাকুমারী গৌতম, আপনি R Y Gauthama করে নিয়েছেন। গৌতম আপনার গোত্রনাম, পদবী নয়। প্রথমে মনে হয়েছিল আপনার নাম রুক্মিনী ইয়েরাকুমারী, কিন্তু গুগলে সন্ধান করে জানা গেল কোঙ্কন অঞ্চলে ইয়েরাকুমারী নামে একটি তালুক রয়েছে। অর্থাৎ গৌতম যদি হয় গোত্রনাম, তাহলে ইয়েরাকুমারী হল সেই গ্রাম্য তালুকের নাম যেখান থেকে আপনার বংশের উৎপত্তি হয়েছে। ইয়েরাকুমারীতে পরশুরামের প্রাচীন মন্দির রয়েছে, সামুদ্রিক মৎস্যজীবীদের বাস। তাই যদি হয় তাহলে, মি’লেডি, কাঁচা সিদলের গাঁজানো মাছের গন্ধে আশাকরি আপনার বমনোদ্রেক হয়নি। আর কোঙ্কনের কোনো সারস্বত ব্রাহ্মণ পরিবারে যদি আপনার জন্ম হয়, নামের শেষে গোত্রনাম দেখে যেমনটা আন্দাজ হয়, তাহলে কি আপনি পেস্কো-ভেজিটেরিয়ান? আপনার উপকুল নিবাসী পরিবারে মাছকে কি বলা হয় সমুদ্র-ফলম? সাতগাঁয় মৎস্যভূমির ব্রাহ্মণ সমাজেও মাছভক্ষণ শাস্ত্রীয়।

আপনি সৌভাগ্যবতী, মি’লেডি, আপনি আপনার জাত গোত্র হাল সাকিন বয়ে চলেছেন নামের মধ্যে। আর এদিকে দেখুন, বাপ্পাদিত্য রাজকাহিনির নায়কের মতো কল্পিত, অলীক। দুজনের কোনো সাধারণ ভাষা নেই। কিন্তু একটি সাধারণ দেশ তো আছে? সেই দেশটা ভূমিতে যত না আছে ততটাই আছে কল্পনায়, মি’লেডি। সেই দেশটা মনে মনে বয়ে নিয়ে কত সাগর পাহাড় মরুভূমি পেরিয়ে কত মানুষ এসেছে, মৌসুমি বাতাসে পাল তুলে, মধ্যরাতে দিগবিদিক বালিয়াড়ির ওপর কিতাব রুজার দেখে দিক নিরুপণ করে, সূর্যোদয়ের পথ ধরে এসেছে। তারপর মাটি যেখানে ফিরনির মতো রেশমি আর মিঠে, সেখানে থেমেছে। সেই হল বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জির নিজের দেশ।

আর আর্মানিডাঙার খাজা ফানুস আরাথুন? অটোমান তুর্কিরা দখল করার পর কোনো স্বাধীন ভূখন্ডই তো ছিল না যাকে সে বলতে পারে নিজের দেশ।

আর রুয়ানো ডে ইনফান্টে? না-হিস্পানি না-পর্তুগিজ, তার আইবেরিয়া দেশটার কোনো ঠিকানাই তো ছিল না।

মান্দাসীর কি কোনো নিজের দেশ ছিল? কিংবা গাভীর? উরুতে দেগে দেওয়া চিহ্নটাই কি ছিল দেশ?

একটা ঘড়ি টিক টিক করে বেজে চলেছে, একটা বিশাল কালো জাল নিঃশব্দে গুটিয়ে আসছে। আর এই কাহিনি বোনা হয়ে চলেছে অন্ধকার আর নক্ষত্রের আলোর সঙ্গে রাতচরা পাখির ডাক আর বাদুড়ের ডানার ধ্বনি মিশিয়ে, কটকটে ব্যাঙ আর রাতে-ফোটা ফুলের গন্ধ মিশিয়ে, যতক্ষণ না আরব্য রজনীর আতঙ্কের রাত ফিকে হয়ে আসে পুব আকাশে।

বাপ্পা কি আপীল করবে?

যদি প্রত্যাখ্যাত হয়?

তাহলে আবার আপীল, কানাই বলেছে। আবার একটি নতুন তারিখ, নতুন শমন। এভাবেই চলবে, কোনো কিছু স্থির নয়। ফাইলটা চলবে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে, এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে ইজ ইট মুভিং? ইয়েস, ইটস মুভিং গায়ত্রী!–নতুন নতুন নোট যুক্ত হবে। সংখ্যাটা একই থাকবে— ES/276/3943। ফাইল কীভাবে বন্ধ করতে হয় কেউ জানে না।

.

নতুন করে এফিডেবিট জমা দিতে লাল ইটের বাড়িটায় এসে সে দেখল আপনি বদলি হয়ে গিয়েছেন, মি’লেডি। চেম্বারে দরজার পাশে নতুন নেমপ্লেট— Mr. N.K. Dwivedi, IASI

পোর্টিকোয় গাড়ি এসে থামল, বাপ্পাদিত্য তাঁকে দেখল। সাফারি স্যুট-পরা রক্ষীটি একই আছে, হাতে কাপুচিন বানরের মতো এসএলআর-টিও। তিনি গাড়ি থেকে নামতেই মিলিটারি কায়দায় সেলাম ঠুকলো, করিডোরে বিচরণরত পাবলিককে কনুইয়ের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে পথ করে দিল। থামের আড়াল থেকে বাপ্পা চকিতে দেখে নিল তাঁকে। নেমপ্লেটে নামের আগে Mr. ঠোঁটের ওপরেও রয়েছে মোটা কালো, মিলিটারি জেনারেলের কায়দায় দুদিকে পাকানো, কপালে লাল তিলক। কোনোদিকে না তাকিয়ে তিনি একটি কমলা রঙের আইফোনে কথা বলতে বলতে দ্রুত পায়ে চেম্বারে ঢুকে গেলেন। কয়েকটি কথা কানে এল— ‘কাল্ দা সেক্‌ট্রি!’

‘বাট দ্যাট ইজ ফ্যালিউর!’ বাপ্পা দেখতে পেল তাঁর দাঁতে গুটখার ছোপ। (দেহরক্ষীর ব্র্যান্ড কি?

লালবাড়ির নতুন সুলতান। শাহরিয়ারের মতোই অক্ষতযোনি রক্তের খিদে চোখে মুখে ফুটে আছে। কিন্তু কাহিনি শোনার খিদে? তাহলে এই কাহিনির উদ্দিষ্ট শ্রোতা কে, মি’লেডি? আবার কি এক নতুন কাহিনি বুনতে হবে, নতুন ভাষায়? শূন্য থেকে শুরু?

ফুটপাতে এই কাহিনি পেতে শোয়া যাবে? বৃষ্টি পড়লে কাহিনি টাঙিয়ে ছাউনি করা যাবে?

যতদিন না কেসটার ফয়সালা হচ্ছে বাপ্পাদিত্য চ্যাটার্জি তার কসবার বাসায় ফিরবে না। যদি সেখানে ওয়ারেন্ট আসে? শীত চলে যাচ্ছে, এখন রাতে দিব্যি বাইরে শোয়া যাবে। অনেকেই তাই করে। দূরদূরান্ত থেকে শমন পেয়ে আসে, আর ফিরে যায় না। পরিবার পরিজন নিয়ে থেকে যায়, অপেক্ষা করে। এই শহরে খোলা আকাশের নীচে কত মানুষ থাকে। তবু এই জায়গাটা ঢের নিরাপদ, অনেকটা সরকারি হাসপাতাল চত্বরের মতো। হাসপাতালে অবশ্য রোগী থাকে ভেতরে, আত্মীয়েরা বাইরে খোলা চত্বরে। এখানে অভিযুক্ত ও তাদের আত্মীয়েরা একসঙ্গেই থাকে, যতদিন না ফ্রিডম সেন্টারের গাড়ি তাদের মধ্যে কাউকে তুলে নিতে আসে।

এখনও রাতে একটু হিম পড়ে, একটা ছাউনি খুঁজে নিতে হবে। না পেলে মেহগনি গাছের নীচে সিমেন্টের বেঞ্চি দেখে রেখেছে রাতের জন্য। ভোরের দিকে হালকা ঠান্ডা পড়লে জ্যাকেটটা খুলে গায়ে চাপা দিয়ে নেবে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে জ্যাকেটে পাখির গু শুকিয়ে আছে। দিন কয়েকের মধ্যেই চুলদাড়ি বেড়ে যাবে, উস্কোখুস্কো দেখাবে। ফুটপাথের দোকানে খেয়ে পুরোনো অম্লের ব্যাধিটা বাড়বে, পকেটে বিস্কুট কিংবা মুড়ি রাখতে হবে। ঘন্টায় ঘন্টায় জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে খাবলা করে মুড়ি মুখে পুরবে। ঠিক সেই সময় একটি কাঠবেড়ালি মেহগনির ডাল থেকে নেমে আসবে। একটি নির্দিষ্ট কাঠবেড়ালি, ওর সামনের ডান দিকের পায়ে তিনটে আঙুল থাকবে না। এছাড়া লাল নালসো পিঁপড়েরাও পকেটের গুপ্তধন খুঁজে নেবে। ক্রমশ বাপ্পাদিত্যের দেহটায় অভিবাসী হয়ে উঠবে ওরা, সারাক্ষণ গা চুলকোতে হবে। এর মধ্যে একদিন ভোরবেলা ওকে দেখে তিনটে কুকুর তাড়া করবে, প্যান্টের নীচের দিকে খানিকটা ছিঁড়ে নেবে। না, পায়ে দাঁত বসাবে না ওরা। কিন্তু আতঙ্কের চোটে ওর মনেই পড়বে না পকেটে বিস্কুটের কথা। পথের জীব, ওরা তো খাবারের জন্যেই তাড়া করবে, কাহিনির জন্যে তো নয়। টানাটানিতে কেবল প্যান্টের কোমরে বোতাম খসে যাবে। কোনো বেল্ট থাকবে না, এক টুকরো দড়ি খুঁজে নিয়ে বেঁধে নেবে। আর এরপর থেকে পকেটে ইটের টুকরো রাখবে। পথকুকুর তেড়ে এলে বের করে দেখালেই হবে, ছুঁড়তে হবে না। লাল ইটের বাড়ির উলটোদিকে ফুটপাতে পর পর খাবারের দোকান। একদিন এক ভাতের দোকানে ওকে খাবার দিতে অস্বীকার করবে; সেইসময় দোকানের সামনে অনেক লোক খাচ্ছে। পাশেই পেটা পরোটার দোকানের মালিকও দেখে মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নাড়বে। পকেট থেকে টাকা বের করে দেখালে তবে রাজি হবে। কিন্তু দ্বিতীয় বার ডাল চাইতে এত ওপর থেকে কব্জি ঘুরিয়ে হাতা উপুড় করবে যে খানিকটা ডাল ছিটকে পড়বে জ্যাকেটের ওপর। দিন দুয়েকের মধ্যেই হলদেটে ছোপটা শুকিয়ে গিয়ে পাখির গুয়ের ধূসর-সবজের সঙ্গে মিশে অভিবাসী পিঁপড়েদের ভাঁড়ার হয়ে উঠবে। এছাড়া জ্যাকেটটায় হাতার কাছে সাদাটে ছাতা ধরবে, আর কুঁচকির দুপাশে দাদ হবে। এতগুলো প্রজাতির জীবের আশ্রয় হয়ে উঠব সে!

বেঞ্চির মাথায় ওই মেহগনি গাছটার মতো। গাছেদের অবশ্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় গিয়ে মাটিতে শিকড় চারিয়ে দিতে কাগজ লাগে না, বীজ হয়ে উড়ে উড়ে যেতে পারে। পাখিরাও পারে। কুকুর? হ্যাঁ, কুকুরও। গরু? না, গরুদের কাগজ থাকে। লাল ইটের বাড়িটার চত্বরে যে ষাঁড়টাকে দেখা যায় তার নাকি সার্টিফিকেট আছে, খোদ জেলা শাসকের সই করা।

যতই ছাতাধরা পাখির গু আর ডালের ছোপ থাকুক, জ্যাকেটটা খুব কাজে দেবে। এর তিন-তিনটে পকেট, হার্মাদি সিন্দুকের চাবি আর কাগজপত্রের বান্ডিল রাখার পরেও ইটের টুকরো রাখার মতো জায়গা থাকবে। এছাড়া বুকের কাছে চোরা পকেটে টাকাপয়সা, বাসার চাবি, এটিএম কার্ড থাকবে। গরম পড়ে গেলে মাথার নীচে ভাঁজ করে বালিশ বানিয়ে নেওয়া যাবে। এর মধ্যে একদিন জ্যাকেটের নীচে টি-শার্টটা রাস্তার ধারে কলে কেচে ফুটপাতের রেলিঙে মেলে দেবে। বিকেলবেলা তুলতে এসে দেখবে সেটি উধাও। বেনেটন কোম্পানির টি-শার্ট, আলো সেবার দেশে এসে উপহার দিয়েছিল। সে যাক, খালি গায়েই জ্যাকেটটা চাপানো যাবে। ইতিমধ্যে বেশ কিছুটা ওজন কমবে, কাঁধের ওপর জ্যাকেটটা কাকতাড়ুয়ার জামার মতো ঝুলবে। চৈতি হাওয়ায় পাখির ডানার মতো উড়বে। সেই কারণেও পকেটে সারাক্ষণ ইটের টুকরো ভরে রাখতেই হবে, সে কুকুরে তাড়া করুক বা না করুক।

একদিন দুপুরবেলা সেদিন লাল বাড়িটা নিঝুম, বোধহয় রবিবার কাঠবেড়ালিটা হাত থেকে মুড়ি খেতে এসে চমকে উঠে সরে যাবে। চেম্বারে অনুপ্রবেশের পর থেকে মাথার মধ্যে যে অপ্রতিরোধ্য কথার প্রবাহ শুরু হয়েছিল সেটা থামেনি, গলা দিয়ে অনর্গল বের হয়ে চলেছে একটানা–ক্রিস্টাল রেডিওর মতো, চৈতন্যধারার মতো। চারপাশটা চুপচাপ হয়ে পড়লে স্পষ্ট শোনা যাবে।

এটিএম কার্ডটা অচল হয়ে পড়বে। ব্যাঙ্কের হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করতে গিয়ে দেখবে এই নম্বর থেকে ফোনের পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দুটো ঘটনা কাকতালীয় নাকি কোনো যোগ রয়েছে, ভাবার মতো মনের শক্তিও আর থাকবে না। শেষ কবে ফোনটা রিচার্জ করা হয়েছে মনে করতে পারবে না। সিম কার্ড দিয়ে অপরাধী ধরে না পুলিশ? মনে হতেই সিমটা খুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবে। স্যামসাং এস ২০ মডেলের ফোন, ফুটপাতে ফোন সারাইয়ের দোকানে বিক্রি করতে গেলে আপাদমস্তক তাকিয়ে হাস্যকর দাম প্রস্তাব দেবে, কিন্তু নেবার সময়ে ঠিক ফোনের মধ্যে বারকোড স্ক্যানার দিয়ে যাচাই করে নেবে। টাকাগুলো ভেতরের পকেটে রাখতে রাখতে হিসেব করার চেষ্টা করবে ওই টাকায় আরও কদিন দুপুর আর রাতের খাওয়া, পকেটের মজুত মুড়ি বিস্কুট, দিনে দুবার সুলভ শৌচালয় হবে।

এতদিন খোলা আকাশের নীচে থেকে শহরে ঋতুর সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো টের পেতে শুরু করবে। বদলে যেতে থাকা দিনের আলোর রং, হাওয়ার মেজাজ, ভোরের হিম, চামড়ার ওপর জল পড়ে স্মৃতিউদ্রেককারী অনুভূতিগুলো। মাঝরাতে মেহগনির নীচে সিমেন্টের বেঞ্চি থেকে হিঁচড়ে ভ্যানে তুলবে পুলিশ। আবছায়ার ভেতর দেখবে ভিখিরি, ভবঘুরে, পাগল, হিজড়ে, পাতাখোর, বেশ্যা ও রূপান্তরকামীর দল। কোনোরকম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এলোমেলোভাবে তুলেছে। কিংবা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই তুলেছে। ভ্যানের ভেতর কথাবার্তা থেকে জানতে পারবে স্মার্ট সিটি সৌন্দর্যায়নের ড্রাইভ চলেছে, মানব জঞ্জাল ঝেঁটিয়ে তোলা হচ্ছে। চারদিকে দেয়াল উঠছে, কুৎসিত যা কিছু ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাবে একটাই প্রশ্নঃ ভেগ্রান্সি অ্যাক্টে ছন্নছাড়া ভবঘুরে হিসেবে যদি কাউকে চিহ্নিত করা হয়, তাহলেও কি তাকে বেআইনি অভিবাসী বলা যায়? যদি কোনো হোমে পাঠানো হয়, যদি ফ্রিডম সেন্টারে যেতে না হয়, তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় রাষ্ট্র কোনো এক ভাবে গ্রহণ করেছে? তা সে জঞ্জাল রূপেই হোক? তাহলেও কি কাগজ দেখতে চায়? তাহলেও কি ফাটকে ভরার আগে জ্যাকেটের পকেট উপুড় করে সিজার লিস্ট বানানোর সময় বলে–

‘শো, ডোন্ট টেল?’

কিন্তু কীই বা দেখাবে, হুজুর? এইটা সাতগাঁর সুলতানি টাঁকশালের মোহর। এই চাবিটা? এটা সিন্দুকের চাবি। সিন্দুকটা রয়েছে সাতগাঁয়ে, তার মধ্যেই গচ্ছিত রয়েছে যাবতীয় অতীত। এই চাবিটা, সাড়ে পাঁচশো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় অক্ষত এই চাবিটা কি এভিডেন্স হিসেবে দাখিল করা যাবে?

‘শো! ডোন্ট টেল!’

আর কীই বা দেখানো যায়? গলাটা বাড়িয়ে দেওয়া যায় হাঁড়িকাঠের মতো টেবিলের ওপর, বলা যায় এই দেখুন, গলা থেকে বুক অব্দি পৈতের আকারে জন্মদাগটা, আবছা হয়ে এসেছে তবু খুঁটিয়ে নজর করলে এখনও দেখা যাবে: সাতগাঁয় বিগত জন্মের চিহ্ন। কিংবা, টেবিলের দিকে পেছন ফিরিয়ে দড়ির ফাঁসটা খুলে প্যান্ট নামিয়ে দেখুন হুজুর, কোনো কাঁটাতারের দাগ নেই, মাঝখানে নিতম্বের বিভাজনরেখা, দ্বিখন্ডিত ভূমি, নদীবিধৌত সুজলাং সুফলাং শস্যশ্যামলাং…

শো! ডোন্ট টেল!

সেই মেয়েটি, পেছন থেকে দুই কনস্টেবল মায়ের আলিঙ্গন থেকে যাকে খুবলে নিল, মাথায় সবুজ ওড়না সেই মেয়েটি ডুবন্ত মানুষের মতো একের পর এক আঁকড়ে ধরতে চাইছিল আম্মুর জামা, থাম, সিঁড়ির রেলিং, দরজার ফ্রেম, গাছের কান্ড, মাটি, মাটি, মাটি—মরীয়া আঙুলের ডগায় রেলিঙের ঠান্ডা ধাতব স্পর্শ, অমসৃণ দেয়ালের স্পর্শ, গাছের বাকলের স্পর্শ, আর্দ্র মাটির ভেতর দিয়ে মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হবার পরমুহূর্তে, যখনও চোখের পাতা আঠালো জরায়ুরসে বন্ধ, সদ্যফোটা ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের চিৎকার শোনার জন্য তৈরি নয় কান, সেই পিছলে সরে যেতে থাকা আদিম দগদগে স্পর্শানুভূতির দেশ কীভাবে দেখানো যাবে হুজুর? কীভাবেই বা বোঝানো যাবে সেই অনন্য দেশে প্রবেশদ্বারের যে চাবি, সেটা এই চুল্লির আগুন থেকে উদ্ধার হওয়া হার্মাদি সিন্দুকের চাবি নয়, যে সিন্দুকে এক প্রাচীন জনপদের ক্ষয়া অবশেষ জমানো আছে, যেখানে রঙীন ছবির বই নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল এক বালিকা আর বইয়ের পাতা থেকে পাখি প্রজাপতি উড়ে ছুপিয়ে দিয়েছিল তার রুবিয়া ভয়েলের টেপফ্রক, সেই গুটির ভেতর শুঁয়োপোকাকে প্রজাপতি হয়ে উঠতে দেখেছিল যে বালক, অসহ্য সুন্দরের জন্ম দেখে মূর্ছা গিয়েছিল যে, সেই সৌন্দর্য, যা পলকা আলোর মতো লেগে থাকে আলস্য আর ক্ষয়ের ওপর, আলস্য আর ক্ষয়ের মজ্জা থেকে উৎসারিত, যা হৃদয়ঙ্গম করেছিল সাতগাঁ রেল স্টেশনের এক টিকিট চেকার এবং প্যারিস থেকে নির্বাসনে আসা এক তরুণ, যে সৌন্দর্যের চাবি ধাতুনির্মিত নয়, আলিবাবার গুপ্ত গুহাদ্বারের চাবির মতো শব্দে গাঁথাও নয়, বিবাহের যৌতুক এগারোটি পুথির মধ্যে কোথাও লুকিয়ে নেই সূত্রের আকারে, শমং শম শময়তির মতো কোনো সর্বরোগহর মন্ত্রে তাকে ব্যাখ্যা করা যায় না, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তত্ত্বেও বেঁধে ফেলা যায় না, এবং যে লতার সন্ধানে হিমালয়ে গিয়েছিলেন রামপ্রাণ, যার কথা মেটেরিয়া মেডিকায় লেখা নেই, রুয়ানো ডে ইনফান্টের হর্টাস বেঙ্গলেনসিস-এ নেই, যে লতার ওষধি গুণ মানুষকে তিন জন্মের আয়ু দিতে পারে, সেই মরীচিকার সন্ধানে গিয়ে ভুল করেছিলেন আদিরামবাটির শেষ কবিরাজ, তার কারণ তিন জন্মের আয়ু কেবলমাত্র এই এক জন্মেই সম্ভব, এই একটিই জন্ম মানুষের হাতে আছে, এবং সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার, অর্থাৎ যা অসুস্থ করে তাই সারিয়ে তোলে, এর একটিই মাত্র উপমান পৃথিবীতে আছে: তার নাম ভালোবাসা।

***