Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৭.৩

৭.৩

শাহি কামানের গোলায় মঠের ক্ষতি হয়েছিল বিস্তর। কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়ে দাড়িয়ে ছিল। সেবার সাইক্লোনে টালির ছাত কড়িবরগা সমেত ধসে পড়ে বাসের অযোগ্য হয়ে পড়ল। পাদরিবাবা তার ভেস্টমেন্ট আর শঙ্করমাছের চাবুক নিয়ে এসে উঠল গির্জার বাগানে বেলেপাথরের বাংলোটায়। এখানেই রুরানো ডে ইনফান্টে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন, আতুরশালায় চিকিৎসা করেছেন। গোয়ার সেই ইহুদি উদ্ভিদবিদের সঙ্গে চিঠি চালাচালি করে বাংলাদেশের গাছগাছড়া নিয়ে দিস্তে দিস্তে নোট লিখেছেন। স্যাডলব্যাগ ভর্তি সেই নোটের তাড়া রাখা আছে আতুরশালার লাগোয়া ফার্মাসিয়ায়। এছাড়া রয়েছে নানা ধরনের কাচের বয়াম, নল, চুল্লি, পাতনযন্ত্র। পাদরিবাবা যাজকবৃত্তিতে ক্রমশই উৎসাহ হারিয়ে সেসবের সদ্ব্যবহার শুরু করল।

মৎস্যভূমির পলিমাটিতে গ্রীষ্মের মরশুমে বাংলোর বাগানে নানান ধরনের ফল হয় অঢেল। আম, জাম, জামরুল, লিচু ও কাঁঠাল হয় প্রচুর পরিমাণে। বাংলোর ফার্মাসিয়ায় চিনেমাটির বড়ো বড়ো পাত্রে সেইসব ফল খামিরে গাঁজিয়ে মদ প্রস্তুত করতে শুরু করে দিল পাদরিবাবা। তার আস্বাদ আঙুরের মদের মতো না হলেও সরেস। তবে পাদরিবাবার অভীষ্ট হলো আমের মদ। কাজটা মোটেই সহজ নয়। আম থেকে আচার আমসত্ত্ব মোরব্বা কাসুন্দি করা যায়, কিন্তু শত চেষ্টাতেও কিছুতেই আর মদ বানানো যায় না। তার কারণগুলো ক্রমশ বুঝতে পারে পাদরিবাবা

১- আমের শাঁসে শর্করার পরিমাণ বেশি, অম্লের অনুপাত কম। ফলত সুরার রাসায়নিক গঠন ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হয়।

২- পাকা আমে সুগন্ধের চরিত্র অন্যান্য বেশিরভাগ ফল, বিশেষ করে আঙুরের মতো নয়, প্রক্রিয়াকরণের পর মদে রূপান্তরিত করলে সুগন্ধ থাকে না।

৩- আমে মিথানলের পরিমাণ বড্ড বেশি। মিথানল খুবই উদ্বায়ী যৌগ, ফলে গাঁজানোর প্রক্রিয়া মসৃণ ও সুস্থির হয় না, মদের গুণাগুণ ব্যাহত হয়, এমনকি ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে।

৪- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমের ঘন আঠালো শাঁস মদের উপযুক্ত স্বচ্ছতা আনে না।

বসন্তের শুরুতে যখন বাতাস আমোদিত হয় আমের বোলের গন্ধে, তখন এমনকি মৌমাছিও আমের থেকে মধু সংগ্রহ করে না। আমের ফুলে রস ঘন আর আঠালো, মৌমাছিরা এড়িয়ে চলে।

পাদরিবাবা হাল ছাড়ে না। কোহল বানাতে শাঁসে মিষ্টত্ববাহী ফ্রুকটোজ আর অম্লের সঠিক অনুপাত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে কলম করতে করতে এক নতুন জাতের আম আবিষ্কার করে ফেলল। আকারে ছোটো, বাঁকানো নীচের দিকে টুকটুকে লাল, কমলা পাতলা শাঁসের এই আম অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল। প্রভু যিশুর বাণী যত না ছড়ালো, তার চেয়ে ঢের বেশি ছড়িয়ে গেল পাদরিবাবার আমের চারা। কিন্তু আমের মদ, যাতে মদের নিজস্ব চেহারা চরিত্র থাকবে আবার আমের স্বাদগন্ধ অটুট থাকবে, কিছুতেই আর হয় না।

বুদ্ধপূর্ণিমায় গাজনের দিন ধর্মতলায় হেসুদাসের কাছে হেনস্থা হবার পর প্রচারে বেরোনো প্রায় বন্ধ করে দিল পাদরিবাবা। এদিকে ফার্মাসিয়ায় অক্লান্ত পরীক্ষা চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় কোহল পেটে গিয়ে দেহটা বেলুনের মতো ফুলে উঠল। যাজকের পালকিতে আর আঁটে না, তেলেঙ্গা বেহারাদুটো ওকে তুলে কোথাও নিয়ে যেতে হিমসিম খেয়ে যায়। এদিকে নিজে শরীর চালনা করতে গেলে আজকাল হাঁপিয়ে ওঠে পাদরিবাবা। কোনোরকমে গির্জায় রবিবারের প্রার্থনাটা সারে আর অনুতাপীর কথা শুনতে পারে। পাপস্বীকারের ছোট্ট খুপরিতেও তার বিশাল বপু আর আঁটে না। ভেস্ট্রিতে তার চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে অনুতপ্তরা ফিসফিস করে বলে চুরি লাম্পট্য ব্যাভিচার ইত্যাদি পাপের খুচরো ফিরিস্তি। রুয়ানোর রুগির বুকের ধুকপুক শোনার কানশিঙা কানে লাগিয়ে ধরে শোনে পাদরিবাবা।

নিয়ম করে পাপস্বীকারে আসে ওলন্দাজডাঙার আগের গভর্নর পিটার ব্রুইয়ের বিধবা সুজানা আনা মারিয়া ভেরক্যেক। চার ঘোড়ার ল্যান্ডো হাঁকিয়ে কটকি তসরের গাউন মসমসিয়ে সে যখন আসে, গির্জার বাতাসে ধূপের গন্ধ ছাপিয়ে উঠে ম’ম করে বিশ্বের প্রাচীনতম ফ্লোরেন্সের প্রোফ্যুমো-ফার্মাসিউতিকা দি সান্তা মারিয়া নোভেলার সুগন্ধী।

পিটার ব্রুইয়ে কাশিমবাজারে রেশমের ব্যবসা করে অনেক টাকা কামিয়েছিল। ব্যুইয়ে ভেদবমি হয়ে মরল, স্বামীর ধনসম্পত্তির মালকিন হলো সুজানা। এদিকে তার আগে থেকেই টমাস ইয়েটস নামে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক লেফটেন্যান্টের সঙ্গে তার আশনাই চলছিল। ব্যুইয়ে ফেঁসে যেতে লেফটেন্যান্ট বাবাজী কোম্পানির পল্টনে বন্দুকবাজি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে ওলন্দাজডাঙায় তার বাংলোয় এসে উঠল, সোরা আর গানপাউডারের ব্যবসা শুরু করল। ধর্মতলায় ভাঙ সিদ্ধির ঠেকে কান পাতলে ব্যুইয়ের ভেদবমি নিয়ে সুজানাকে জড়িয়ে নানান ফিসফাস শোনা যায়।

স্বাভাবিকভাবেই পাদরিবাবার কানে সুজানার ফিসফিসানির তালিকাটা লম্বা, গির্জার দানবাক্সে অনুদানও পড়ে মোটা অঙ্কের। ইংরেজ টমাসকে শেষ পর্যন্ত যখন বিয়ে করল সুজানা, বিয়েটা প্রথমে অ্যাংলিকান চার্চে না হয়ে তার দাবি মেনে এই নসা সেনোরা দো সান্তো রোসারিওর গির্জাতেই হলো। সেবার সুজানার টাকায় গির্জার ভাঙা ছাত মেরামত হলো, নতুন টালি বসল। বিপুল জাকজমকের সেই বিয়েতে সোনার জরি-আঁটা ভেস্টমেন্ট আর টুপিতে সজ্জিত পাদরিবাবাকে দেখাচ্ছিল যেন পোপের মতো।

সুজানা মারা যাবার পর তার জমানো টাকায় রু দ্য বেনারসের ধারে তার কবরের ওপর বিশাল সৌধ হলো। এদিকে গির্জার দানবাক্স আর ভরে না। পালকিবাহকদের নিয়মিত বেতন দিতেও পারে না পাদরিবাবা, উপরন্তু কারণে অকারণে চাবকায়। তবু তারা চিরঅনুগত, শত পিটানি সয়েও কাজ ছেড়ে চলে যায় না। কারণটা স্পষ্ট: পাদরিবাবা নতুন মদ বানিয়ে তাদের ওপর দিয়েই প্ৰথমে পরীক্ষা করে। এবং পেট ভরার খোরাকি জুটুক-না-জুটুক, নিত্য নেশার দ্রব্য ওদের বেঁধে রাখে।

.

মে মাসের এক সন্ধ্যায় তেলেঙ্গা দুটিতে বড়ো বড়ো অ্যাম্ফোরা ভর্তি লিচুর গাঁজানো মদ খেলো ভরপেট। পরদিন সকালে দেখা গেল বাংলোর হাতায় দুজনে দুটি অ্যাম্ফোরা পাশবালিশের মতো জড়িয়ে পড়ে আছে, মুখে অদ্ভুত প্রশান্তি, চিরশাস্তির ঘুমে আচ্ছন্ন, একজনের চোখ খুবলে নিয়েছে ইঁদুর।

এরপর পাদরিবাবা তার বিচিত্র উদ্ভাবনী কৌশল ব্যবহার করল। পাল্কিটার নীচে চাকা লাগিয়ে সামনের ডাঁশার সঙ্গে ঘোড়া জুড়ে দিয়ে এক বিচিত্র গাড়ি বানিয়ে নিল। গ্রীষ্মের অপরাহ্ণে নদীর ধারের মোরাম বিছানো রাস্তায় ভিস্তিওয়ালারা জলছড়া দিয়ে যাবার পর ওই বিচিত্র পালকিগাড়ি চেপে হাওয়া খেতে দেখা যায় ওকে ধর্মতলায় গোবর্ধনের ঠেকে খবরের খ‍ই ফোটে

‘শুনতে পাই আজকাল নাকি পাদরিবাবার ওই জোড়া তেলেঙ্গা মরে ভূত হয়েও গাড়ি টানে?’

‘বটেই তো! আমি পষ্ট চোখে দিকিচি বাপু। জোছনা রাতে পাদরিবাবার পালকি গাড়ি গড়গড়িয়ে চলেছে, সামনে ঘোড়াটা নেই।’

‘আমিও দেখেছি। শুধু দেখেছি নয় শুনেওছি, পালকিগাড়ি যাচ্ছে কিন্তু ঘোড়ার খপ্‌খপ্ নেই। বাতাসে ভাসছে হুমনা-হুমনা-হুমনা…’

‘আমি গাড়িটাকে যেতে দেখিনি, কিন্তু ঘোড়াটাকে দেখেছি—কেরেস্তান গোরস্তানের ঘাস খুঁটে খাচ্ছিল। শিরিষের ডালে পেঁচা ডাকছিল, আকাশে থালার মতোন চাঁদ ছিল।’

‘হুঁ হুঁ বাপু, নেশা যায় না ম’লে!’ সবুজ দুধের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে গোঁফের সর মোছে রসিক।

বাংলোয় পরিচারিকার কাজ করে মেরি ডোম, সে এসে জানায় পাদরিবাবা আজকাল রাতে ঘুমোয় না। আপন মনে বিড়বিড় করে, ফার্মাসিয়ায় শিশি বোতল নিয়ে কালাজাদু করে।

এক দুপুরে ঘোড়ায় টানা পালকিগাড়ি এসে থামল ধর্মতলায়। পাদরিবাবার চোখে বিহ্বল রাত-জাগা দৃষ্টি, হাতে শঙ্করমাছের চাবুকটা নেই। কোনোদিকে না তাকিয়ে গটগট করে সোজা হেঁটে এল গোবর্ধনের ঠেকে।

দোকানের বাইরে ফিরিঙ্গিডাঙার গুটিকয় তরুণ খাটিয়ায় দেহ এলিয়ে ছিল। বটের ঝিরিঝিরি আলোছায়ায় চোখে তাদের পলকা আবুলি। ওদিকে গোবর্ধন বিশ সেরি কড়ার ওপর তালপাতার পাখা নেড়ে দুধ ঘন করছে। পাদরিবাবা দলছুট মেষদের প্রতি ভ্রূক্ষেপও করল না। নেশাড়ুদের মাঝে দুই অ্যাংলিকানের সঙ্গে ধর্ম নিয়ে গোল পাকাতে গেল না, এমনকি হান্স অ্যান্টনির দিকেও রোষষায়িত নেত্রে তাকালো না অন্যান্য দিনের মতো। সোজা গিয়ে টগবগে দুধের কড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আবেগকম্পিত কণ্ঠে ঘোষণা করল, যেভাবে সে রোববার গীর্জার মঞ্চ থেকে ঘোষণা করে–

‘যদি তোরা হোলি কমিউনিয়ানে বিশ্বাস না করিস, যদি না মানিস প্রভু যিশুর মাংস আর রক্ত মদ আর রুটি হয়ে গিয়েছিল, তবে দ্যাখ— কীভাবে অস্তিম বিচারের দিনে ভক্ত থেকে পাপীরা আলাদা হয়ে যাবে! চোখ খুলে দ্যাখ সেই ঐশ্বরিক মির‍্যাকল!’

পাদরিবাবা জোব্বার পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনে লম্বা গলা নীল কাচের শিশি।

‘যেদিন জ্ঞানবৃক্ষের নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের আদি পাপে অমরত্বের অধিকার হারালো মানুষ, যেদিন সে তার বংশধরেদের মৃত্যু ক্ষয় আর পাপের লালসার উত্তরাধিকার দিল, সেইদিন থেকে অন্তিম বিচারের দিনে প্রভু যখন জীবস্মৃত থেকে মৃতদের বিচ্ছিন্ন করবেন, সেইদিন সমাগত! মহাপ্রলয়ে সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই পাপের বোঝা বইবার জন্য তৈরি হ পাপিষ্ঠের দল, যেদিন সব দুষ্টেরা ধ্বংস হবে। প্রভু যিশু এক লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার পুরুষ নারীকে মৃত্যুঘুম থেকে ফের জাগিয়ে তুলবেন, যারা রাজা আর পূরোহিত রূপে প্রভুর আত্মবলিদানের ঐতিহ্য বহন করবে!’

এই পর্যন্ত বলে পাদরিবাবা নীল শিশিটার কর্কের ছিপি খুলে যেভাবে নব্য ধর্মান্তরিতকে বারি সিঞ্চিত করে, সেভাবেই চোখ বুজে, বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ফুটন্ত দুধের ওপর শিশির তরল ঢেলে দিল।

সঙ্গে সঙ্গে এক আশ্চর্য দৈব ঘটনা ঘটে গেল— ফুটন্ত দুধ ছিন্ন হল, স্বচ্ছ সবজেটে জলে সাদা মেঘের মতো, যেন প্রলয়ঙ্কর ঝড়ের আগে, থকথকে পদার্থের ঘূর্ণি শুরু হলো দুধের কড়ায়।

গোবর্ধন কপাল চাপড়ে হাহাকার করল সের দুধ নষ্ট করে দিলে?’

‘এ কী করলে পাদরিবাবা! বিশ

‘আমি কবেই বলেছি পাদরিটার মাথা খারাপ হয়েছে!’ অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি বলল। ‘বিষ খাইয়ে তেলেঙ্গা দুটোকে মেরেছে, এবার এখানে সবাইকে মারার ফিকির করছে।’

কারোর কথায় কর্ণপাত না করে পাদরিবাবা গোবর্ধনের দিকে তাকিয়ে প্রশান্ত হাসি হাসল। জোব্বার গেঁজে থেকে একটি রুপোর সিক্কা ওর হাতে দিল।

বিশ সের দুধের যা দাম, তার কয়েক গুণ অর্থ হস্তগত হতে গোবর্ধন পাদরিবাবার নির্দেশমতো একখণ্ড পরিষ্কার মসলিন এনে তার একটি প্রান্ত দোকানের খুঁটিতে বাঁধল, আরেক প্রান্ত নিজের হাতে টেনে ধরে রইল। পাদরিবাবা বড়ো ডাবু হাতা দিয়ে সেই ছিন্ন দুধের মিশ্রণ তুলে কাপড়ের ভাঁজে ঢালতে লাগল, সবজেটে স্বচ্ছ জলের মতো তরল নীচে গড়িয়ে ঝরে গেল। এরপর পাদরিবাবা বালতির ঠান্ডা জল ঢেলে দিতে দেখা দিল আশ্চর্য সাদা, নরম পশমের মতো এক বস্তু। এক থাবা তুলে পাদরিবাবা ঘোষণা করল

‘এই দ্যাখ, মূঢ়! এই হলো নিষ্পাপ ঈশ্বরানুরাগীর দল, যারা প্রভুর শেষ বিচারের দিন স্বর্গে যাবে!’

‘সাস্তো মোর্দা!’ হান্স অ্যান্টনি বলে উঠল। ‘ওই বস্তুটি হলো ক্যেইজো, কালকুতায় ইংরেজরা যাকে বলে চিজ!’

.

গির্জার ছাত মেরামতের সময় কুমোরপাড়ায় তৈরি টালির সঙ্গে পুরোনো মালাবারের টালির জোড় মেলেনি। জোরে হাওয়া দিলে বিচিত্র ধ্বনি ওঠে। কেউ শোনে বেড়ালের কান্না, পাদরিবাবা শোনে কানশিঙায় মুখ রেখে সুজানা ভেরক্যের্কের অনর্গল পাপের ফিরিস্তি। ভেস্ট্রিতে চেয়ারের পেছনে ঝুঁকে পড়ে যে পাপের কথা সুজানা মরার আগে কবুল করেছে, যে পাপ সে করেছে কিন্তু কবুল করেনি, যে পাপকর্ম সে স্বপ্নে দেখেছে, যে পাপ সে করেনি বা ভাবেনি কিন্তু পাদরিবাবা কল্পনা করেছে, সেইসব পাপস্বীকারের ফিসফাস বাজে টালির ফাঁকে। পাদরিবাবা দুই কানে তুলো গুঁজে চিৎকার করে—

‘নরক! নরক! নরকাগ্নি!’

মাথার ব্যামোটা নিয়ে কারোর মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। বসন্তের শুরুতে উষ্ণ দখিনা বাতাস বইতে শুরু হলো, পাদরিবাবার ব্যামো চড়তে লাগল। সারারাত গির্জায় ম্যাওবেড়ালের কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে, সেটা ছাপিয়ে দূর থেকেও শোনা যায় পাদরিবাবার চিৎকার-

‘শয়তানের কণ্ঠস্বর! কালাজাদুর মন্ত্র!’

অন্ধকারে অন্তর্বাস পরে চাবুক হাতে বাগানে ছুটোছুটি করতে দেখা যায় তাকে, মৃত তেলেঙ্গা অনুচরদের সঙ্গে কথা বলে। কেউ কেউ বলে, ওর ঘোড়াটা রাত্রিবেলা রূপ বদলায়। তাকে চাবুক মারতে তেড়ে যায় পাদরিবাবা, তারপর ক্লান্ত হতাশ বেহুঁশ পড়ে থাকে গোরস্থানে পাথরের ওপর। ক্যাওটপাড়া থেকে মরদদের ডেকে এনে সাতমণি দেহটা উঠিয়ে বাংলোয় আনে মেরি ডোম। কখনো এক বেলা, কখনো আস্ত দিন পাদরিবাবা পড়ে থাকে বিছানায়।

এক বিকেলে সে জেগে উঠে টের পেল তুলোর ডেলা ফুঁড়ে শয়তানের কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে ঢুকছে। শুনশান গির্জায় ঢুকে উঁচু বাঁশের মইটা টেনে এনে বিটুমেনের বালতি হাতে নিজেই টালির ফাঁক মেরামত করতে উঠল পাদরিবাবা। সন্ধ্যাবেলা তার সাপার তৈরি করতে এসে মেরি ডোম দেখে গির্জার দরজা খোলা, বেদীর সামনে পাথরের মেঝেয় চিৎ হয়ে পড়ে আছে সাহেব। তাকে তুলে এনে শোয়ানো হল ফার্মাসিয়ার লম্বা কাঠের টেবিলে।

তিনদিন প্রায় অচৈতন্য হয়ে বেঁচে থাকার পর গুড ফ্রাইডের আগের সোমবার ভেস্পারের সময় পাদরিবাবা মারা গেল। সেই সঙ্গে সাতগাঁর মৎস্যভূমিতে প্রথম খ্রিস্টান অগস্টিনীয় মিশনের কার্যকাল শেষ হলো। যে দুটি স্থায়ী অবদান সে রেখে গেল, যা তাকে অমর করে রাখবে, তার একটি কলম-করা নতুন জাতের আম, আর অন্যটি দুধ কাটিয়ে ছানা। মৎস্যভূমির প্রতিটি আমের বাগানে পোঁতা হবে পাদরি আমের চারা। দুধে অম্ল প্রয়োগ করে ছিন্ন করার এই অশাস্ত্রীয় কাজটি অবশ্য স্থানীয় ব্রাহ্মণ সমাজ মেনে নেবে না।

পাদরিবাবা মারা যাচ্ছে, খবরটা ছড়িয়ে যেতে ধর্মান্তরিত বিধর্মী নির্বিশেষে উতল হলো ক্যাওটপাড়ার মেয়েমরদেরা। হেসুদাসের নেতৃত্বে চাঁদা তুলে অন্ত্যেষ্টির তোড়জোড় শুরু হলো, কারিগরপাড়া থেকে ছুতোর এনে কফিন তৈরি করতে দিল ওরা। এদিকে অস্তিমকালের আচারবিধি পালনের জন্য যাজকাবাসে আর একজনও পাদরি না থাকায় দিনেমারডাঙায় গিয়ে রেভারেন্ড বিল নামে এক ইংরেজকে ধরে আনা হলো। লেজকাটা ঘোড়ায় টানা জীর্ণ উলুরিঝুলুরি এক্কাগাড়ি চালিয়ে এলেন বিল সাহেব।

বিল সাহেব ব্যাপটিস্ট, তাঁর বিশ্বাস মতে তিনি পাদরিবাবার অস্তিম পাপস্বীকার শুনতে রাজি হলেন না। কিন্তু একটি জিনিস তাঁর জিম্মায় নিতে সম্মত হলেন। মুমূর্ষু পাদরিবাবার নির্দেশে হেসুদাস একটি ব্যুরো টেবিলের কবাট খুলে বের করে আনল চামড়ার স্যাডল ব্যাগ, তার ভেতরে হলুদ হয়ে আসা রাশি রাশি কাগজের বান্ডিল। পর্তুগীজ ভাষায় টানা হস্তাক্ষরে লেখা নোট, গাছগাছড়ার অনুপুঙ্খ ড্রয়িং। ক্ষীণ কণ্ঠে পাদরিবাবা জানালো–

‘এ আমার স্বদেশবাসীর সারা জীবনের কাজ। এগুলো তুমি নিয়ে যাও, যদি পারো ছাপানোর ব্যবস্থা কোরো।’

গলায় অন্তিম ঘড়ঘড় ধ্বনি শুরু হলো যখন, রেভারেন্ড বিল একটি টুলে বসে বাইবেল পাঠ করতে লাগলেন। সেখানে হাজির ক্যাওটপাড়ার বাসিন্দারা, যারা পাদরিবাবাকে চিরবিদায় জানাতে আর অন্ত্যেষ্টির যোগাড় করতে এসেছিল, জীবনে প্রথমবার বাংলা ভাষায় বাইবেল পাঠ শুনে হতবাক হলো। রেভারেন্ড বিলের বিচিত্র বাংলা উচ্চারণে, ততোধিক বিচিত্র ভাষায় ২৩ নম্বর স্তব পাঠ— ‘প্রভু আমার মেষপালক, তিনি আমায় মৃত্যুর ছায়া সঘন উপত্যকা দিয়ে সবুজ চারণভূমিতে নিয়ে যান, স্থির জলের কাছে নিয়ে যান, সত্যের পথে নিয়ে যান’ শুনতে শুনতে মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে পাদরিবাবার মুখে বিচিত্র রগড়ের অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। মৃত্যুর পরেও, রেভারেন্ড সাহেব এক্কাগাড়ি খপখপিয়ে চলে যাবার পরেও, রাত গভীর হয়ে ওঠার পরেও, সেই অভিব্যক্তিটা মুখে ফুটে রইল।

রাত জাগার জন্য সন্তপ্তের দলটা তখন টেবিল ঘিরে জড়ো হচ্ছে। মেয়েরা মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে বুক চাপড়ে একঘেয়ে সুরে রুদালি গাইতে গাইতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ওদের দেখলে মনে হবে যেন সত্যিই তারা তাদের নিকট আত্মীয়কে হারিয়েছে, যেন তারা তাদের প্রকৃত পিতাকে হারিয়েছে। এদিকে বাইরে তখন শুরু হয়েছে দুর্যোগ। অন্ধকার আকাশে ঝড়ের তান্ডব আর কেরেস্তান গোরস্তানের ধারে উঁচু উঁচু শিরীষ গাছগুলোর মাথায় মাথায় প্রবল তোলপাড়। বাংলোর পেছনে বাঁশঝাড়ে হাড়-মটমট শব্দ, ভাঙা শার্সি দিয়ে শুকনো পাতা উড়ে এসে ঘরের ভেতর শুরু হলো ঘূর্ণিপাক।

এরই মধ্যে কারা যেন টেবিলের নীচে থেকে বের করে এনেছে চিনেমাটির অ্যাম্ফোরায় গাঁজানো মদ, মরদদের হাতে হাতে ঘুরছে। ওদিকে মেয়েদের দলটা কান্নাকাটি করে মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরে প্রকৃতির তান্ডব, প্রবল শব্দে আম গাছের ডাল ভেঙে পড়ছে, পাদরিবাবার মুখে শোনা শাসানির মতো সেই অন্তিম বিচারের দিন বুঝি সমাগত। এমনকি মৃতের মুখে সেই রগুড়ে হাসিটাও উবে গিয়ে আক্রোশের অভিব্যক্তি ফুটেছে। চোয়াল শক্ত, মুখমন্ডলে নীলচে গোলাপি ছোপ পড়েছে কালসিটের মতো। ভিনিগারের টোকো গন্ধে ভরে উঠেছে ঘরের বাতাস, সুরাপায়ীদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল—

‘চুপ! চুপ! শুনতে পাচ্ছিস?’

ওরা কান পাতল। বাগানে ঝড়ের তান্ডব ছাপিয়ে, গির্জার চুড়োয় বেড়ালের মড়াকান্না ছাপিয়ে, বহুদূর থেকে ভেসে আসছে পরিচিত— ‘হুম্‌না-হুম্‌না’ ধ্বনি। পাশের ঘরে কাঠমিস্ত্রিদের কফিনে পেরেক ঠোকার শব্দটা থেমে যেতে সেটা আরও স্পষ্ট হলো। মেয়েরা ঘুম থেকে জেগে উঠে চোখ রগড়াতে রগড়াতে দেখল, পশ্চিমে বাগানের দিকে বড়ো চার-পান্না ফ্রেঞ্চ উইন্ডোটা হাট হয়ে খুলে গিয়েছে, পালকি বয়ে নিয়ে আসছে দুই তেলেঙ্গা বাহক। মৃত্যুর পর খুব রোগা হয়ে গিয়েছে ওরা, মাথার বাবরি চুল পেকে গিয়ে ভিজে সাদা ছাইয়ের মতো ঘাড়ে লেপ্টে আছে। টেবিলের সামনে এসে পালকি নামালো ওরা, পাদরিবাবার দেহটা তুলে ছইয়ের ভেতর বসার ভঙ্গিতে রাখল। তারপর কাঁধে তুলে নিয়ে ফের— ‘হুম্ম্না-হুম্ম্না’ ধ্বনি দিতে দিতে বাইরে ঝড়ের ভেতর গাছপালার মাথায় থকথকে নীলাভ আলোর হারিয়ে গেল।

সকালের আলো ফোটার পর রেভারেন্ড বিল এক্কা চালিয়ে এলেন। কফিনবন্দি পাদরিবাবাকে, বাবার যা কিছু নশ্বর অবশিষ্টকে, যথাযথ রীতি অনুসারে গোর দিলেন। বাতাসে তখন ভিজে আমপাতার গন্ধ। অনেকটা গভীর করে গর্ত খুঁড়েছিল হেসুদাসেরা।