Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.৪

২.৪

উপনয়নের পরে রামাচার্য উচ্চশিক্ষার্থে কাশী যান। কিছু পথ পায়ে হেঁটে, কিছুটা বণিকদের নৌকায় সেই দীর্ঘ যাত্রায় দেড় মাস লেগেছিল। মাঘ মাসে উত্তরের দেশে পৌঁছে অকালবর্ষণের মধ্যে পড়েন। এক সন্ধ্যায় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে, নবীন ব্রাহ্মণ এক বিহারের ভগ্নস্তূপে আশ্রয় নিলেন। চারদিকে পাহাড়প্রমাণ ভাঙা ইট কাঠ পাথর, ক্ষীণ মেঘ-চোঁয়ানো আলোয় দেখে মনে হয় ধ্বংস ঘটেছে অতি সম্প্রতি। কিছুদিন আগেও আশ্চর্য সৌধরাজি দাঁড়িয়েছিল। বিশাল ছড়ানো প্রার্থনাগৃহ, স্তূপ ও চৈত্য, দেয়ালে অপূর্ব চিত্রমালা। পাথরে নির্মিত অগণন মৌচাকের কোষের মতো খুপরি, কিছুদিন আগেও সেখানে বুঝি শ্রমণদের প্রার্থনার গুঞ্জন ধ্বনিত হতো। একটি ইট বাঁধানো প্রাঙ্গণের মাঝখানে অতিকায় গ্রন্থাগার, দেশবিদেশের লিপি ও পুথির বিপুল সম্ভার। সেসবই পুড়ে ছাই হয়েছে, শ্রমণেরা খুন হয়েছে, দেয়ালের ছবি আর খোদাই কারুকাজ নির্মমভাবে নষ্ট করা হয়েছে, প্রার্থনাগৃহের মোটা মোটা থামগুলো হাতি কিংবা ঘোড়া দিয়ে টেনে উৎপাটিত করে উঁচু গম্বুজ ধুলিসাৎ করা হয়েছে। এ যেন এক দুঃস্বপ্নের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপ। ধ্বংসস্তূপের মাঝে বিহ্বল ঘুরতে ঘুরতে রামাচার্য এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী ও তাঁর তরুণ শিষ্যের দেখা পেলেন। তাঁদের পরণে রক্তাভ বসন, মাথা কামানো ভাঙা ইট পাথরের রাশির মাঝে যেন দুই বজ্রাহত পাখি। গ্রামবাসীদের ভিক্ষার দানে টিকে আছেন। বুকে দুর্মর আশা, যে গুটিকয় শ্রমণ হত্যালীলার রাতে পালাতে পেরেছে, তারা একদিন ফিরে আসবে। এই বিহার ফের জেগে উঠবে, তার লুণ্ঠিত গৌরব ফিরে পাবে।

‘এমন দুষ্কর্ম কে করল?’ দরপ খান বিচলিত হন।

‘আপনার মতো এক যোদ্ধা’ রামাচার্য বলেন। ‘আপনারই ধর্মের। আপনি যেদিক থেকে এসেছেন, সেও সেইদিক থেকেই এসেছিল। এবং সেও স্থানীয় রাজাকে পরাস্ত করে বাংলার শাসক হয়ে ওঠে।’

এগারো বছর কাশীর তিনটি টোলে বেদ অধ্যয়ন সমাপ্ত করে সাতগাঁয়ে ফিরে আসেন রামাচার্য। ফেরার পথে কৌতূহলবশে সেই ধ্বংসস্তূপটি দেখতে যান। ততদিনে সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে জঙ্গল, গ্রন্থপোড়া ছাইয়ে সারবান মাটিতে ঘন দুর্ভেদ্য হয়েছে। বন্যজন্তুদের বাসভূমি, কেউ ওদিকে মাড়ায় না। বৃদ্ধ ও তরুণ দুই শ্রমণের খোঁজে ঝোপঝাড় ঠেলে বনের মধ্যে ঢুকে রামাচার্য দেখলেন হাড়গোড় ও দুটি মনুষ্য করোটি।

‘সেই করোটির মুখব্যাদানের অট্টহাসি আমার চোখ খুলে দিল।’ রামাচার্য বলেন দরপ খানকে। ‘স্মৃতিকে লিপিবদ্ধ করে রাখার গুরুত্ব আমি সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম।’

‘কিন্তু লিপি তো নশ্বর। বিহারের পুথিগুলো সব পুড়ে গিয়েছিল, আপনিই বললেন।’

‘সব পুথি নয়। সেই দুঃসহ রাতে গুটিকয় শ্রমণ পালাতে পেরেছিল। তারা কয়েকটি মূল্যবান পুথি নিয়ে যায় হিমালয় পেরিয়ে ভোট দেশে। কিছু কিছু পরবর্তীকালে কাশীতেও এসেছিল। অতিপক্ক ফল যেভাবে কখনো-কখনো বিস্ফোরণে ফেটে যায়, বিহারটি সেভাবে ধ্বংস হয়েছিল। সব বীজ তো আর নষ্ট হয়নি, নষ্ট হয় না। কিন্তু সব কিছুকে একই ছাতের নীচে সঞ্চিত করাটা ছিল মস্ত বড়ো ভুল। সাতগাঁয়ে আমাদের শিক্ষাশ্রমে লিপিকার বিদ্যার্থীরা দূরদূরান্ত থেকে আসে। কেউ কেউ দাক্ষিণাত্য এমনকি অহম রাজ্য থেকেও আসে। তারা যে পুথি নকল করে সেগুলি নিজের নিজের দেশে নিয়ে যায়। এবং সেখানে গিয়ে এইরকম প্রকল্প শুরু করে। এভাবে জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটে। মৌচাকে মক্ষীরানিরা যেমন উড়ে গিয়ে দূরে দূরে নতুন চাক সৃষ্টি করে, অনেকটা সেইরকম।’

রামাচার্য থেমে শ্বাস নিলেন, শাসকের দিকে তাকালেন।–-‘আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অবহিত হলেন।’

‘এবার আপনি দরপ খানের দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনে পাখার মতো মেলে রাখা সূক্ষ্ম কাঠের পাতগুলির দিকে।

‘এই শাহওয়াদ, যেটি নাকি বারোটি গ্রামের নিষ্কর জমির কথা বলছে, এমন এক লিপিতে লেখা যা আমি পড়তে পারি না। তবু আমি আপনার কথা সত্য বলেই ধরে নিচ্ছি। কিন্তু যে লিপিকরদের ভরণপোষণের কথা এখন বললেন, তাদের কাজের প্রমাণ এখনও দেখিনি। আমি দেখতে চাই।’

.

ক্ষিতি-অপ-তেজ-মরুৎ ব্যোমে সৃষ্টি পঞ্চকোণ মহাবিশ্ব ঘিরে এক চক্র, যার পাখিগুলি বিচ্ছুরিত পদ্মাসনে স্থিত এক মানবমূর্তির মস্তক হতে। সেই মূর্তির বুকে আরেকটি মানবমূর্তি, পাশ ফিরে শয়ান, হাতে মাথা রেখে অবলোকন করছেন নিজের নাভি, যা থেকে প্রস্ফুটিত একটি পদ্ম। চক্রের মাঝে মাছ, মেষমুন্ড, তীরধনুক, কাঁকড়া বিছে, কাঁকড়া, সিংহ, ষাঁড় ও অনান্য প্রাণীর উড়ান ঘূর্ণনের বিভ্রম সৃষ্টি করেছে। সমুদ্র ঝিনুকের মতো উজ্জ্বল মসৃণ তালপাতায় এমন অজস্র সূক্ষ্ম রেখাচিত্র, সূচে খোদাই, হলুদ ফিরোজা মরকতমণি আর পোড়ামাটির রঙে বর্ণময়।

অতীব সন্তর্পণে তর্জনি বোলান দরপ খান। পৃথিবীকে কেন্দ্রে রেখে গ্রহ নক্ষত্রের সমাবেশ নিয়ে এক প্রাচীন লোকবিশ্বাসের অস্পষ্ট আভাস পাচ্ছেন তিনি। তাঁর মুখে অভিব্যক্তি লক্ষ করে রামাচার্য প্রসন্ন হলেন। ভেবেচিন্তেই তিনি এই কয়েকটি পুথি নিয়ে এসেছেন।

‘এবার আমি আপনাকে একটি জিনিস দেখাই।’

দরপ খান হাতে তালি দিলেন দুবার। এক খিদমতগার দুহাতে বয়ে নিয়ে এল একটি পশুর শিং। পামির অঞ্চলের আঙালি ভেড়ার শিং, এত বড়ো আকারের রামাচার্য জীবনে দেখেননি। তার ফাঁপা খোল থেকে একটি লম্বা পাকানো বস্তু টেনে বের করলেন খান।

এ কি জমি সংক্রান্ত কোনো ফরমান? তবে কি দিনের পর দিন নৌকা বেয়ে এসে এই ভিনদেশি শাসকের কাছে হত্যে দেবার পরিশ্রম সার্থক হলো? রামাচার্য উদগ্রীব হলেন। কিন্তু বস্তুটি ভাঁজ খুলে ভূমির ওপর মেলে ধরতেই বোঝা গেল এ ভিন্ন কিছু, খুবই প্রাচীন আর মূল্যবান কোনো চিত্র। মাধ্যমটি খুব সম্ভব ভূর্জপত্র, কিংবা ওই ধরনের কোনো গাছের মসৃণ বাকল। তার ওপরে আশমানি রঙে আকীর্ণ রেখাচিত্র। তার জটিল সূক্ষ্ম শিরা উপশিরা যেন এক অতিকায় পত্রপল্লবের আদল সৃষ্টি করেছে। সেই পাতার ওপরে বিচরণশীল পিঁপড়ের সারির মতো ক্ষুদে অক্ষরমালা, রামাচার্য পড়তে পারেন না।

এবারে ব্রাহ্মণের মুখের অভিব্যক্তি দেখে হাসি ফুটল দরপ খানের মুখে। দাড়িতে চিরুনির মতো আঙুল চারিয়ে দিলেন।

‘এটি হলো কিতাব রুজার, তামাম দুনিয়ার মানচিত্র। তবে এইটি নকল, আপনার ওই পুথিটির মতোই। আসল কিতাব রুজার রয়েছে বাগদাদে, রুপোর পাতে খোদাই করা জনাব আল-আদ্রিসির মহান সৃষ্টি।’

এইরকম কোনো কিছু রামাচার্য কোনোদিন কল্পনাও করেননি। এত বড়ো ভূর্জপত্র তিনি কাশীতেও দেখেননি। আলতো তর্জনী বুলিয়ে পরখ করলেন তার ত্বক –বিশুষ্ক, ঠিক যেন মাছের আঁশের মতো। কোনো অনুচ্চারণযোগ্য পশুর চর্ম নয় তো? রামাচার্য চকিতে হাত সরিয়ে নেন।

‘কোন গাছের বাকল এটি?’

‘এটি কোনো গাছের বাকল নয়,’ দরপ খান হেসে বলেন। ‘এ জিনিস বাগদাদে তৈরি হয়, আমরা বলি বাগদাতিকোষ। কেউ কেউ কাগজও বলে।’

‘কাজা?’ রামাচার্য বিস্মিত হন। ‘এ যদি কাজা হয় তাহলে আমি এই বস্তু দেখেছি। কিন্তু এই মাপের?’

শীতের গোড়ায় হাংঝৌ থেকে চীনা বণিকেরা চামড়া, তরোয়াল আর লোহার বাঁট নিয়ে সাতগাঁ বন্দরে আসে। তারা সিন্ধুঘোটক আর জিনসেং-এর শিকড় ছোটো ছোটো কাগজায় মুড়ে নিয়ে আসে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় স্বাস্থ্যহানির প্রতিষেধক সেগুলি, কাগজায় মুড়ে রাখলে সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় তাজা আর শুষ্ক থাকে।

‘সেই কাজা বাঁশের মন্ড থেকে তৈরি হয় শুনেছি, কিন্তু এত বড়ো মাপের আর মসৃণ কখনোই নয়,’ রামাচার্য বলেন। ‘তার ওপর এমন সূক্ষ্ম রেখালিপিও সম্ভব নয়।’

‘গাছের বাকল, পাতা, কাঠের পাত সবই অপার করুণাময় আল-মালিকের দান। কিন্তু বাগদাতিকোষ মানুষের সৃষ্টি, তাই একে ইচ্ছেমত আকার দেওয়া যায়। সমগ্র সৌরমন্ডল তার সব চাঁদ তারা জন্নত জাহান্নম সমেত একটি খণ্ড বাগদাতিকোষে এঁকে নেওয়া যায়। তাকে ঘোড়ার পিঠে বটুয়ায় সহজে বহন করাও যায়। এই কিতাব রুজারের নকলটি আমি দুনিয়ার অন্য প্রাস্ত থেকে বয়ে নিয়ে এসেছি।’

বাংলাদেশে ভূর্জবৃক্ষ নেই, তবে তাল অঢেল জন্মায়। সেই তালের পাতা রোদে শুকিয়ে জলে ভিজিয়ে, তেঁতুল বিচির মাড় লেপে ঝিনুক ঘষে ঘষে পুথি লেখার উপযোগী করে নিতে হয়। একটি পুথি নির্মাণে অসংখ্য পাত লাগে। বাচস্পতি মিশ্রের ন্যায়ের সূত্র উদয়ন পণ্ডিত থেকে জয়ন্ত ভট্ট পর্যন্ত বিভিন্ন শাস্ত্রকারের টীকাটিপ্পনী সমেত লিপিবদ্ধ করলে সেই পুথি এত ভারি হয়ে যায় যে সেটি কোনো বৃদ্ধ পণ্ডিতের পক্ষে রোজ টোলে বহন করে নিয়ে যাওয়া, কিংবা আপদকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তর করা অত্যন্ত কঠিন। তাছাড়া জ্যোতিষবিদ্যার কিছু কিছু চিত্র, কিংবা তন্ত্রের সারণি তালপাতার সরু পরিসরে অঙ্কন করা অসম্ভব, খণ্ডে খণ্ডে ভাগ করে নিয়ে করতে হয়। এবং এর ফলে অপব্যাখ্যার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সর্বোপরি, তালপাতার পুথি উইপোকার প্রিয় খাদ্য।

রামাচার্যের মুখচ্ছবি দেখে তাঁর মনে চিন্তার স্রোত আন্দাজ পাবার চেষ্টা করেন দরপ।

‘এইরকম বাগদাতিকোষ কি আপনার প্রয়োজন? আমার লোক পায়াম নিয়ে নিয়মিত দিল্লি যায়। হুজুরে-আলমের দরবারের সব কাজ ইদানীং এতেই হয়। বাগদাদ বুখারা থেকে নিয়মিত আসে। আপনি যদি চান তো আমি আনিয়ে দিতে পারি।’

‘আমি কৃতার্থ হব!’ রামাচার্য দুই হাত জড়ো করে বলেন। ‘কিন্তু আমার গোষ্ঠীপুরুষেরা মন্দিরের ঘাটে আমার নৌকা ফেরার জন্য অধীর অপেক্ষা করছে। পাখির বাসায় ক্ষুধার্ত শাবকেরা যেমন পক্ষীমাতা ঠোঁটে খাদ্য নিয়ে ফেরার জন্য অপেক্ষা করে সেইরকম। আজ নিয়ে তিনদিন হলো। আমাদের বারোটি গ্রাম ও তার দেবোত্তর জমির কী গতি হলো সেই বার্তা নিয়ে ফেরাটা আমার আশু কর্তব্য।’

দরপের মুখ নিষ্প্রভ হয়। সকালের নির্মল আলোয় নদীপাড়ে বেদজ্ঞ পণ্ডিতের মুখোমুখি জ্ঞানপিপাসু মুহূর্তে রূপান্তরিত হয়ে যান প্রশাসকে। এবং, মি’লেডি, সর্বকালে প্রশাসক আধিকারিক ও তাদের অনুগত করণিকেরা সরকারি দপ্তরে টেবিলের ওধার থেকে যে ভঙ্গিতে বলে, সেভাবেই দরপ খান তাঁর বাম হাতের আঙুলের নখগুলি নিরীক্ষণ করে বলেন

‘আজ নয়, কাল আসুন।’

.

নৃপতি সিংহকে হত্যা করে সাতগাঁয়ে পাকাপাকিভাবে থেকে যাবার পর দরপ খান নতুন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা চালু করেছেন। বহুকাল ধরেই এই অঞ্চলে ছোটো বড়ো নির্বিশেষে প্রতিটি গ্রাম ও তার সংলগ্ন জমির একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক খাজনা চালু ছিল। কোষাগারের আয় বাড়াতে দরপ জমির আয়তন ও মালিকানা অনুসারে কর ধার্য করলেন। এজন্য তিনি দিল্লি থেকে দক্ষ জরিপকার এনে ভাগীরথী আর সরস্বতীর মধ্যবর্তী উর্বর জমি মাপজোক করালেন। কাজটি সহজ নয়। উত্তর ভারতের দোয়াব অঞ্চলের মতো ভূমি এখানে সুস্থিত নয়। ঘন ঘন বন্যায় প্লাবনে নদীর পাড় ভাঙে আর গড়ে, জমি সাকিন বদলায়, আস্ত গ্রাম শিকড় উঠিয়ে স্থানান্তরিত হয়। শীত ও বসন্তের দুটি শুষ্ক ঋতু ব্যেপে মৎস্যভূমির সব জমি পুঙ্খানুপুঙ্খ জরিপ করতে গিয়ে সাতগাঁর এক রহস্যময় ভূস্বামীর খোঁজ মিলল। সেই ব্যক্তি একাই কয়েক হাজার বিঘা জমির ফসল ভোগ করে, কিন্তু এক কানাকড়িও খাজনা দেয় না। ধানে বোঝাই নৌকার সারি তার গৃহাভিমুখে যাচ্ছিল, দরপ খানের আদেশে সান্ত্রীরা গিয়ে আটক করল।

‘সাতগাঁর এই বে-ইমান ঠগ!’ দরপ কুপিত স্বরে রামাচার্যকে বললেন পরদিন। ‘ওকে আমার কাছে ধরে এনে হাজির করতে হবে! না হলে আমিই লোক পাঠিয়ে বেঁধে আনব!’

‘কে সেই ব্যক্তি?’ রামাচার্য বিস্মিত হন।

‘এখানে সবাই তাকে আদিরাম বলে ডাকে।’

মুখমন্ডল আকাশের পানে তুলে উচ্চৈঃস্বরে হাস্য করে উঠলেন রামাচার্য। অট্টহাসির রোল তরঙ্গায়িত হয়ে ছড়িয়ে গেল গাছে পাথরে পাতায়, সকালের শান্ত নদীর বুকে। শিখায় বাঁধা ধুতুরার ফুল নড়ে উঠল মন্দির ঘন্টার মতো। এই প্রশান্ত ব্রাহ্মণের ভেতরে যে এতখানি প্রাণখোলা আমোদ জমে রয়েছে দরপ খান এর আগে টের পাননি।

‘কিন্তু তাঁকে যে কোনোভাবেই আপনার কাছে ধরে আনা যাবে না, যতই সেনা সান্ত্রী পাঠান!’ রামাচার্য হাসির দমক সামলে বললেন। ‘তার কারণ তিনি সর্বত্র বিরাজমান। এবং ওই কয়েক সহস্র বিঘা আর কয়েকটি গ্রামই নয়, এই মহাবিশ্বই তাঁর অধীনে। নৌকায় যে শস্য তাঁর গৃহে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সেই শস্য তাঁর, আকাশের নীচে যেখানে যত শস্য ফলে সেসবই তাঁর। ওই নৌকার ধানে প্রস্তুত অন্ন তাঁকে দুবেলা নিবেদন করা হয় বটে, কিন্তু তিনি একটি দানাও স্পর্শ করেন না। তিনি আপনার কাছে আসতেও পারবেন না। তার কারণ তিনি যে শুধু সর্বত্র বিরাজমান তাই নয়, তিনি ভূমিতে স্থাপিত পাথরের মূর্তিতে বিদ্যমান। খড়ে ছাওয়া কাঠের মন্দিরে তিনি থাকেন।’