সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৯.৭
৯.৭
দেশজুড়ে যখন ইতিহাসের বাঁকবদল হচ্ছে, ধর্মতলায় নিত্যনতুন খবর টগবগ করে ফুটছে গোবর্ধনের বিশসেরি দুধের কড়ায়, হুগলিতে ব্রিটিশ নেভির গানবোট টহল দিচ্ছে, কোয়ার্সভিলের ট্যাভার্ন সরগরম, তখন সাতগাঁর পাগলরামের মতোই আরেকজন এই সবকিছু থেকে দূরে এক আশ্চর্য প্রেমের রেশমগুটি বুনে চলেছে এক নারীকে ঘিরে। তার নাম শার্ল লেবো, মি’লেডি।
সেদিন বাংলোয় শার্লের চোখে জুলি ডিলিমা দেখেছিল ফাঁদে-পড়া পাখির চাহনি। শার্ল যদি হয় খাঁচার পাখি, গাঙী তবে বনের পাখি। খাঁচার পাখি আর বনের পাখির মাঝে ভাষার দুর্লঙ্ঘ্য গরাদ, তবু ওরা কাছে আসে, গরাদের দুই দিক থেকে শিস দেয়, ডাকে। খাঁচার পাখি ডানা ঝাপটায়।
বনের পাখি গাঙী, মা-খাকী, ভূমিষ্ঠ হয়ে তার দিদিমার হাতে মানুষ হয়েছে। উমাপেনুর বিশুষ্ক স্তন চুষেছে সে। উমা কোনো নাম নয়, মি’লেডি। মালাবারের ভাষায় উমা মানে হলো বোবা, উমাপেনু বোবা মেয়ে। যে গুটি বসন্তের করাল থাবা তাকে ছুঁয়েছিল, বসতি ছেড়ে পালিয়ে তার ব্রাহ্মণ রক্ষকের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিল বনের ভেতর, সেই মারী শেষ পর্যন্ত সেই ব্রাহ্মণকেও নিল। বেঁচে রইল উমাপেনু, কিন্তু তার মুখগহ্বরে জিভে গুটির স্ফোটক তার কন্ঠস্বর কেড়ে নিল।
কফির খামারে সবাই জানত তাকে উমাপেনু বলে, কিন্তু বোবা নারী খামারের ধারে তালপাতায় ছাওয়া তার গোলাকৃতি কুঁড়েয় একান্তে নাতনির সঙ্গে কথা বলত। নীচু কর্কশ ফ্যাসফেঁসে স্বর শুনে মনে হয় যেন কফির ঝোপে সমুদ্র বাতাস বইছে।
কবরখানার নির্জনে এসে মাটি আর তালপাতা দিয়ে ঠিক ওইরকম কুঁড়ে বানিয়ে নিল সে। ইতিমধ্যে গাঙী বড়ো হচ্ছে, বাঁশের কোড়ের মতো তার স্তন জাগছে খোলা বাতাসে, রোদে। এখানে সন্ধ্যার অন্ধকারে সাত সাহেবের বিবির কবরের আশেপাশে অশরীরীরা নেমে আসে, শিয়ালেরা আসে তাজা কবরের মাটির নীচে শবদেহের লোভে। ক্ষিপ্র পায়ে মাটি খুঁড়ে তোলে তারা, নরমাংসের ক্ষিদেয় মড়মড় করে সেগুন কাঠের কফিন চিবিয়ে বের করে আনে। লম্বা বাঁশের লাঠি হাতে শিয়াল তাড়ায় দুই নারী।
জঠরাগ্নির থেকে কিছু কম তীব্র নয় জঘনাগ্নির জ্বালা। রাত বাড়লে ভিন প্রজাতির শিয়ালেরা এসে জুটবে জীবন্ত কচি মনুষ্যদেহের টানে। পাকুড়ের ছায়ায় গাঢ় অন্ধকারে গোল কুঁড়ের আশেপাশে বাতাসে ভাসবে শিসধ্বনি, ফিসফিস করে ডাকবে। পাকুড়ের পাতায় মর্মরধ্বনি বাঁশের বনে হাড়মটমটির ভেতর উমাপে ঠিক চিনে নেবে কাতর কামনার ডাক, পায়ের পাতার খসখস। ফ্যাসফেঁসে স্বরে বলবে–‘লুকো! লুকো হুই হোথায় গিয়ে!’
আবলুশ-কালো গাঙী অন্ধকারে মিশে গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যাবে কেরেস্তান গোরস্তানে, গম্বুজাকার ওবেলিস্কের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে পড়বে। কামার্ত শ্বাপদ কুঁড়ের ভেতর জমাট অন্ধকারে নখে খুঁড়ে তুলবে জীবন্ত দেহ, অপেক্ষমাণ, তাতে যৌবনের সুডৌল তেজ নেই, কিন্তু সজীব অভিজ্ঞ। গাঙী তখন গুটিশুটি মেরে লুকিয়ে আছে শ্যাওলাকীর্ণ সৌধের পাথরের আড়ালে, দমবন্ধ করে দেখছে পাতার ফাঁকে তারাভর্তি আকাশ, পেঁচার উড়ান, শিয়ালের ধকধকে সবুজ চোখ ঝোপের ভেতর।
সাহেবের বাংলোয় গাঙীর কাজ নির্দিষ্ট, ছকে-বাঁধা: আলতো হাতে মনিবের কল্কেতে তামাক সাজা, কুঁজোয় ঠান্ডা কর্পূরগন্ধী জল ভরে রাখা, সন্ধ্যা নামার আগে মশার হল্লা তাড়ানো। সকালের নরম রোদ যখন ঝিরিঝিরি গান গেয়ে ওঠে রু দ্য বেনারসের ধারে শিরীষের সারিতে, বেতের ধামা কাঁখে নিয়ে পাকা আনারস আর পেঁপে কিনতে বাজারে যায় গাঙী। সারাদিন খালি পায়ে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায় স্বাধীন, বাগানে তেঁতুল গাছের নীচে ঝরে পড়া পাকা তেঁতুল কুড়োয়, তেল-নুন দিয়ে মাখে, অচেনা পুরোনো সুর গুনগুন করে সারাদিন। আর যখন চারদিক লাল করে সন্ধ্যা আসে, আকাশে ছড়িয়ে যায় গোধূলির আঁচল, বারান্দায় ঘাসের মাদুর বিছিয়ে দেহটা এলিয়ে দেয় গাঙী ঊর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন, একমাথা ঘন চুলে দেহ আচ্ছাদিত, মাথার ওপর বিনবিন করছে মশার মুকুট, সেই প্রথম দিনের মতো।
শার্ল নীচু হয়ে অবাক চোখে দেখে, গাঙীর স্বপ্নগুলো অকল্পনীয় রঙের মৌটুসি পাখিদের কাকলি মুখরিত হয়ে আছে। ওর ত্বকে মিঠে পাতা-পোড়া গন্ধের মতো কথাগুলো কীভাবে যে ভাষার গরাদ চুঁইয়ে ঢুকে পড়ছে চেতনায়। সাদা পোর্সেলিনের প্লেটের মতো বড়ো বড়ো চোখ গাভীর, ঘুমোলেও পাতা বন্ধ হয় না, সরু চাঁদের ফালি জেগে থাকে। রেশম গুছির মতো চুলে আঙুল চারিয়ে দিতে বিদ্যুতের স্ট্যাটিক খেলে যায়।
শার্ল বলে–কী পুলক, হে অলকদাম! গলার ওপর দিয়ে ফেনায়িত নেমে এসেছে আলস্যময় ঘ্রাণে মাতাল। অন্ধকারের ভেতর ভরে উঠছে আমার স্মৃতিরাশি এখানে ঘুমিয়ে আছে শ্লথবিলাসী এশিয়া, আফ্রিকার মরুদাহ। তোর কেশদামের গন্ধগহন অরণ্যে, তোর গভীরে সুগন্ধের বনে, আস্ত একটা দূরের পৃথিবী – শূন্য, মুমূর্ষুপ্রায়, তোর সুবাসে ভেসে বেড়ায়। চলে যাবো আমি যেখানে মানুষ আর গাছেরা নিজস্ব রসে আর রৌদ্রে বিবশ হয়ে আছে দীর্ঘ দিন। আমায় বয়ে নিয়ে চল, হে অলকরাশি, তোর আবলুশের সাগরে; পাল আর দাঁড়ি আর মাস্তুলের স্বপ্ন প্রতিধ্বনিত বন্দর। বর্ণ গন্ধ শব্দের ঘন ঝাপটে মেতে উঠছে আমার প্রাণ। তোর বাহুর বিস্তারে বেপথুমান জাহাজের মতো আমি, নেশাতুর মাথাটা ডুবিয়ে দিই এক কালো সমুদ্রে। এই পলকা আদরের ওপর দিয়ে গড়ায় আমার সত্তা, হে উর্বর আবুলি, ঘন নীল চুল, ছায়ার তাঁবু, কুঞ্চিত কেশদামে ব্যগ্র আনন্দে আমি নেশাতুর পান করছি তোর নারকেল তেল, তোর আলকাতরা, তোর কস্তুরি…
অস্পষ্ট ঘুমে দেহটা দুই আচ্ছন্ন হাতের আকুতিতে সমর্পণ করে গাভীর মনে পড়ে কফি খামারের কথা, কুঁড়ের চালে তালের পাতায় ইঁদুরের খুটখুট। কফির শুটি পেকে উঠলে ওরা আসত, ঝাঁকে ঝাঁকে, আর সেই ফ্যাসফেঁসে চেনা গলা তাকে ঘুম পাড়াতো বিচিত্র সুরে গান গেয়ে–
নিসি অন্ধারী মুসা অচারা
অমিঅ ভখঅ মুসা করঅ আহারা
মার রে জোইআ মুসা পবণা
জেঁণ ভুটআ অবনা গবণা
শীতকালে পশ্চিম থেকে ধুনুরির দল যখন খামারে আসত, সারাদিন ধরে এলানো রোদে তুলোর স্তূপ ধুনে তুলত, তখন উমাপেনু ছোট্ট গাঙীকে উরুর ওপর শুইয়ে উষ্ণ তিলের তেল মালিশ করে দিতে দিতে গাইত
তুলা ধুণি ধুণি আঙ্গুরে আসু
আসঁ ধুণি ধুণি নিরবর সেসু
আবার চৈত্রের জ্যোৎস্নারাতে যখন কফির ঝোপগুলো সজীব হয়ে ওঠত, চুড়ির নিক্কন ভেসে আসত পাতার আড়াল থেকে, চাপা হাসির শব্দ আর খামারের কামিনদের পায়ে মলের ঝমঝম, ঘুম আসত না, তখন–
দিবসই বহুড়ী কাগ ডরে ভাঅ
রাতি ভইলে কামরু জাঅ
স্মৃতির আগুনে পোড়ে গাঙী, বিড় বিড় করে দুর্বোধ্য ভাষায়।
শার্ল: আহারে দুলালী, বল দেখি কোন স্বপ্নের বিকার পোড়ায় তোকে আজ? তোর ত্বকের গাঢ় রঙে উন্মাদ আতঙ্কের বিস্ফার। কীই বা তোকে দিতে পারি? আমি ক্লান্ত, নিঃস্ব। আমার যৌবন ছিল শুধু এক আঁধার তুফান, মাঝে মাঝে রৌদ্রের ঝলক এসে পড়েছে বাগানে, কিন্তু বজ্র বিদ্যুতে ধ্বস্ত, গুটিকয় লাল ফল ফলেছে কেবল। এখন আমার হেমন্ত এসেছে। ধারা জলে ভেসে গিয়েছে বাগানের জমি, খানাখন্দ খুলে গিয়েছে কবরের মতো…
গাঙী: আমি একটা পাথরে গড়া স্বপ্ন। আমার এই স্তন দুটো যেখানে তুই মাথা কুটে মরিস সারাক্ষণ, কবিদের বুকে শুধু প্রেম জন্ম দেয়। আমার এই আবলুশরঙা বুকের ভেতরটা যদি তোকে দেখাতে পারতাম– হিম সাদা! রাজহাঁসের মতো অনাবিল! আমি ঘেন্না করি সব চঞ্চলতা, আমি কখনও কাঁদি না, আমি হাসিও না কখনও। আর আমার এই চোখ দুটো, এই বিশাল চোখ দুটো, স্বচ্ছ আয়নার মতো, বাতাসের মতো, সময়ের মতো… এই পোড়া চোখ দেখেছে অনেক কিছু–পথে পথে চলেছে ভবঘুরের দল, পিঠে শিশু সন্ততি, ঝুলন্ত অফুরান স্তন চুষে যাচ্ছে ক্ষিদের জ্বালায়। পায়ে হেঁটে মহিষের গাড়িতে চলেছে, পুরুষেরা হাঁটছে পাশে পাশে, তাদের অস্ত্রগুলো চকচক করছে অন্ধকারে, ছইয়ের নীচে গা এলিয়ে দুঃখী ভিটেহারা চোখে আকাশের দিকে চেয়ে খুঁজে চলেছে মরীচিকার ডেরা। দলটাকে যেতে দেখে পথের ধারে ঝোপেঝাড়ে ঝিঝিপোকার দল কলতান জুড়েছে চৌগুণ। প্রকৃতিদেবী ক্রমশ আরও সবুজ হয়ে উঠছে— পাথরকে গলিয়ে দিচ্ছে ঝরনায়, বালিতে ফোটাচ্ছে ফুল, অনির্দেশ্য অন্ধকারে ফুটে উঠছে পথিকের চেনা দেশ…
শার্ল:
উঠে আয় আমার বুকে, নিঠুরা, নিশ্চেতনা
সোহাগী ব্যাঘ্রী আমার, মদালস জন্তু ওরে
প্রগাঢ় কুন্তলে তোর ডুবিয়ে, ঘন্টা ভরে
চঞ্চল আঙুল আমার— হ’য়ে যাই অন্যমনা
ঘাঘরায় গন্ধ ঝরে, ঝিমঝিম ছড়ায় মনে
সেখানে কবর খোঁড়ে আমার এ-ধিনু মাথা
মৃত সব প্রণয় আমার, বাসি এক মালায় গাঁথা
নিশ্বাস পূর্ণ করে কী মধুর আস্বাদনে
ঘুমোতে চাই যে আমি, যে-ঘুমে ফুরোয় বাঁচা
মরণের মতোই কোমল, তন্দ্রায় অন্তগামী
ক্ষমাহীন লক্ষ চুমোয় তনু তোর ঢাকব আমি-
উজ্জ্বল তামার মতো ও-তনু নতুন, কাঁচা
শুধু তোর শয়ন প’রে আমার এ কান্না ঘুমোয়
খোলা ওই খন্দে ডুবে কিছু বা শান্তি লোটে
বলীয়ান বিস্মরণে ভরা তোর দীপ্ত ঠোঁটে
অবিকল লিথির ধারা ব’য়ে যায় চুমোয়-চুমোয়।
নিয়তির চাকায় বাঁধা, নিরুপায় বাধ্য আমি
নিয়তির শাপেই গাঁথি ইদানীং ফুল্ল মালা;
বাসনা তীব্র যত, যাতনার বাড়ায় জ্বালা-
সবিনয় হায় রে শহীদ, নির্মল নিরয়গামী!
এ-কঠিন তিক্ততারে ডোবাতে করব শোষণ
ধুতুরার নেশায় ভরা গরলের তীব্র ফোটায়
ঐ তোর মোহন স্তনের আগুয়ান দীপ্ত বোঁটায়
কোনোদিন অন্তরে যার হৃদয়ের হয়নি পোষণ।
