Course Content
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য
0/94
সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – পরিমল ভট্টাচার্য

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ৭.২

৭.২

ধর্মতলায় বটের নীচে ধর্মঠাকুরের কচ্ছপাকৃতি পাথর বৌদ্ধ নাকি ধর্মরাজ যমের প্রতীক এই বিষয়ে সাতগাঁর পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। খর গ্রীষ্মের দুপুরে যখন চারদিক তাপবাষ্পে দোলে, ডোবা পুকুর সব শুকিয়ে যায়, তখন এলাকার যত মহিষ বটের ছায়ায় আসে। আসে জটাজুটধারী সাধু সন্ন্যাসী ভেকধারীর দল। তারা দেহে বাণ ফোঁড়ে, শিবনেত্র হয়ে গালবাদ্য বাজায়, গনগনে আগুনের ওপর হাঁটে, একপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাত্রিদিন, ধুনি জ্বেলে আস্তানা গাড়ে। পরিযায়ী সাদা বকের মতো উরস যাত্রায় সুফি আউলের দল এখানে এসে তিষ্ঠোয় কয়েক দিন। বাত-ক্ষ্যাপা বাতুলেরা আসে। যে বাত ভিনদেশি নাবিক বণিকের চোখে আবুলির আঠা পরিয়েছে, এই মৎস্যভূমিতে বেঁধেছে, সেই একই বাত এদের ঘরছাড়া করে। তারা পাগল হয়ে বেরিয়ে পড়ে মনের মানুষের সন্ধানে। কেউ গলায় সোলেমানি পাথরের মালা ঝোলায়, একতারা হাতে নিয়ে পায়ে ঘুঙুর বেঁধে ঘুরে ঘুরে নেচে গান গায়, পাগলের মতো মাথা ঝাঁকায়। অন্য এক দল মধ্যরাতে বটের গভীর ছায়ায় এসে জড়ো হয় অম্বুবাচি তিথিতে, যখন ধরিত্রী রজস্বলা হয়, গোপন অকথ্য ক্রিয়ায় মেতে ওঠে।

দেশে কোম্পানির শাসন শুরু হবার পর, মড়ক মন্বন্তর বাড়তে থাকার পর ধর্মতলার মাহাত্ম্য দূরদূরান্তে ছড়িয়েছে। ভীরু আতুর অন্তেবাসী মানুষ রোগ শোক ও বিবিধ বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের বাসনায় ধর্মঠাকুরের থানে হত্যে দিতে আসে। নদীতে ডুব দিয়ে দন্ডি কেটে আসে। গাছের ঝুরিতে পোড়ামাটির ঘোড়া বেঁধে মানত করে, এলাচদানা ও মন্ডা পুজো দেয়।

.

ধর্মঠাকুরের থান থেকে হাত কয়েক দূরে বটের ঝুরিতে শামিয়ানা বেঁধে গোবর্ধনের দোকান, পুজোর মন্ডা এলাচদানা ছাড়াও ভাঙের গুলি ও শরবৎ পাওয়া যায়। সেই মাদকের লোভে ফিরিঙ্গিডাঙা থেকে আসে ফ্যাক্টর সাহেবদের দল। প্রবাসের নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে তারা প্রচুর নেশা করে। নিয়মিত মহার্ঘ ক্ল্যারেট কিংবা হক কেনার পয়সা থাকে না প্রায়ই, তখন দিশি ধান্যমদ আর তাড়ি পান করে আকণ্ঠ। কিন্তু একটা-দুটো মৌসম এদেশে কাটালেই টের পাওয়া যায় কোহল জাতীয় পানীয় এই উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত নয়। কেরেস্তান গোরস্থানের এলাকা বিস্তৃত হতে থাকে, ম্যাওবেড়ালের গির্জার লাগোয়া রুয়ানো ডে ইনফান্টের বাগানের জমিতে কবরের পাথর গজিয়ে ওঠে।

ভাঙ সিদ্ধির নেশা সম্মোহক— চেতনাবিধুর, নিঃসঙ্গতাহরণ। সেটা সবচেয়ে ভালো মালুম হয় গ্রীষ্মের অনন্ত রৌদ্রের দুপুরগুলোয়। চারদিক খাঁ খাঁ করে, গাছে একটিও পাতা নড়ে না, পাখিরা মুক চিত্রার্পিত। বিজন পথ দিয়ে পাল্কিযোগে নৌকায় ওরা আসে কোয়াসঁভিল থেকে, ওলন্দাজডাঙা থেকে। সিদ্ধি ভাঙ রক্তে অহেতুক উত্তাপ সৃষ্টি করে না মদের মতো, কিন্তু দেহকে বিশুষ্ক করে দেয়। সেজন্য দুধ কিংবা মালাইজাতীয় দ্রব্যের সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা অনুপান হিসেবে নিলে শুকনো অনুভূতিটা কেটে যায়। গোবর্ধনের দোকানে বড়ো বড়ো লোহার কড়ায় দুধ জ্বাল দেওয়া হয় সারাদিন। ঘন দুধে প্রস্তুত ভাঙের শরবত মাটির ছোটো ছোটো অ্যাম্ফোরার আকারে ঘটে পান করে ফিরিঙ্গি সাহেবরা, সিদ্ধি মেশানো ক্ষীরের গুলি কলাপাতায় নিয়ে চাটে।

কোটপ্যান্টুলুন পরা সাহেবদের জন্য গাছতলায় খানকতক দড়ির খাটিয়া পেতে রেখেছে গোবর্ধন। কেউ কেউ মাটিতে বিছানো ঘাসের চাটাইয়ের ওপরেও শুয়ে পড়তে চায়। বটের সবুজ স্নিগ্ধ চাদোয়ার বাইরে খর জ্যৈষ্ঠের তাপজব্দ পৃথিবী মরীচিকার মতো তালীক হয়ে ওঠে তখন। ঢিমে ঘুঁটের আঁচে কড়াইভরা দুধ বুড়বুড়ি কেটে ঘন হয়ে উঠতে থাকে। চোখের পাতায় নামে স্বর্গীয় আবুলির ভার। চাঁদেরডাঙা দিনেমারডাঙা ওলন্দাজডাঙা আর্মানিডাঙার ফিরিঙ্গিরা জাতিগত ও ব্যবসায়িক রেষারেষি ভুলে জগাখিচুড়ি পিজিন ভাষায় জীবনের অর্থ নিয়ে, মৃত্যুর অর্থ নিয়ে দার্শনিক আলোচনায় মাতে। কখনো-সখনো লুকিয়ে এসে যোগ দেয় সাতগাঁয়ের দুটি চারটি সাবর্ণ তরুণ। তারা কেউ গোবর্ধনের ঠেকে গুলির টানে আসে, কেউ বা আসে দেশবিদেশের সংবাদের টানেও, যে টানে তাদের পূর্বপুরুষেরা সাতগাঁ বন্দরের ধারে সরাইখানায় যেত। এদের সংস্রবে থেকে আনকোরা ফিরিঙ্গি বুবক এদেশের আচাররীতি শেখে, ভাষা শেখে, বঙ্গজ গালি শেখে। কাউকে আবার হিদুয়ানির ভূতেও ধরে। তারা কোটপ্যান্টুলুন ছেড়ে মসলিনের ফতুয়া চাপায়, ধুতি ফেরতা দিয়ে লুঙির মতো করে কোমরে জড়ায়, গরমের দুপুরে মাথায় ভিজে গামছার শামলা বাঁধে, শানকিতে আঙুল ডুবিয়ে পাস্তা খেতে শেখে।

ফিরিঙ্গিডাঙার শাসকেরা প্রমাদ গোনে, ফ্যাক্টরদের ক্লাবে গির্জায় উপাসনাগৃহে নিষেধাবলী জারি হয়।

কিন্তু গভর্নর আর পাদরিদের উষর শাসনের রক্তচক্ষুর বাইরেই থেকে যায় ধর্মতলায় গোবর্ধনের ঠেক ঘিরে এক স্বাধীন, সার্বভৌম, ছায়াময়, ভেষজ, চৈতন্যবিধুর মরূদ্যান।

.

এক হিঁদুর বাড়া ফিরিঙ্গি হিদুকে মাঝেসাঝে এখানে দেখা যায়। তার নাম হান্স অ্যান্টনি। জাতিতে পর্তুগীজ কিন্তু নেটিভ সাবর্ণদের মতো বাংলা বলতে পারে সে। ভাষাশিক্ষার শ্রেষ্ঠ পাঠশালা অর্থাৎ কি না বিছানায় শুয়ে বাংলা শিখেছে, এক হিন্দু বিধবাকে বিবাহ করে নিজের ধর্ম ত্যাগ করার পর, যে ধর্মের ইনকুইজিশান তাকে গোয়া থেকে তাড়িয়ে এত দূর এনেছে। ঘন সবজেটে শরবতের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে গোঁফে জিভ বুলিয়ে অ্যান্টনি সাহেব যখন গোয়ার যাজকদের নারকীয় অত্যাচারের কাহিনি শোনায়, নেশার আবুলি ছুটে যায়। কিন্তু সেই যখন আবার মৌতাত জমে উঠলে ভরাট গলায় নিজের বানানো কালী মায়ের ভজন গেয়ে ওঠে, ধর্মান্ধতার বীভৎস রোষানল থেকে পালিয়ে বীভৎসরূপিণী শ্যামার পায়ে সমর্পণের গান, ধর্মতলার বাতাস ভাবে ভারাতুর হয় গর্ভিনীর মতো। গোবর্ধনের চুলায় আগুনের তেজ বাড়ে, সুমিষ্ট দুধের গন্ধে চারদিক ম-ম করে।

বুদ্ধপূর্ণিমার দিন এখানে গাজনের উৎসব। তার তিন দিন আগে থেকে ধর্মতলার পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যায়। হুগলি দিয়ে ভেসে আসা দিনেমারডাঙার কাগজকলের বাঁশের সুবিশাল গাঁটে চড়ে আসে সন্ন্যাসীদের দল। তারা ঘামন্ডি গিরির সময় থেকে আসছে— তাদের কারোর চেহারা ঝুরি-নামানো বটের মতো, ঘন লোমের জটায় লজ্জাস্থান ঢাকা, কারোর গলায় বেতে বোনা বটুয়ায় কালসর্পের দেহধারী আত্মা, যা তারা প্রহরে প্রহরে বের করে জাম-নীল জিভে ছোবল নেয়। তাদের পিছু পিছু আসে ভেকধারী ফকির আউলে বাতুল বাণফোঁড়েরা, স্থানীয় পুণ্যাত্মার দল। তারা ছাড়িগঙ্গার ধারে গ্রামগুলোয় মাধুকরী করে আনে। কুমোরপাড়ার নতুন মাটির হাঁড়িতে ভরে নদীতে ভেসে আসা কাঠ জ্বেলে চৈতন্যধারার জলে ভাত ফোটায়। সরস্বতীতে স্নান করে দন্ডি কেটে এসে ধর্মঠাকুরকে দেহযন্ত্রণার অর্ঘ্য নিবেদন করে। সন্ধ্যার পর কাঁসার থালার মতো চাঁদ ওঠে, ব্যথার নাভিকুন্ড থেকে পাক খেয়ে ওঠে সঙ্গীত। ধর্মমঙ্গলের গাথা, ধর্মরাজের বর ভিক্ষায় লাউসেনের আত্মবলিদানের কাহিনি। গাঁজার কলকে হাতে হাতে ঘোরে। বটের ঝুরির অন্দরে কন্দরে ভিজে মাটির প্রদীপ মিটমিট করে জ্বলে। প্রাকৃত, অর্ধ-মাগধী, সৌরসেনী, পৈশাচী, ঢক্কি, ঢেক্করি ভাষা ও উপভাষায় বিধৌত এই ভূমিতে এক হারানো ধ্বনিবিশ্ব নেমে আসে।

গাজনের দিন সকালে ধর্মতলার ধারে আচমকা ব্যাপক শোরগোল, ভেকধারীরা যে যেদিকে পারে ছুটে পালাচ্ছে। চটকা ভেঙে ছাইয়ের বিছানায় উঠে বসে নাঙ্গা সাধু।

‘ইতনা শোর কাহে? শের নিলা?’

‘শেরের বাবা! পোর্তোহাটার পাদরিবাবা!’ বটের ঝুরি বেয়ে উঁচু ডালে উঠে যেতে যেতে বলে একজন।

বটের ছায়ায় এসে থেমেছে সোনালি ক্রুশ আঁকা যাজকের পালকি। এক হাতে বাইবেল অন্য হাতে লম্বা চামড়ার চাবুক নিয়ে তেড়ে আসছে পাদরিবাবা। ধর্মান্তরিত যাকেই হাতের সামনে পাচ্ছে শপাং শপাং করে চাবুক মারছে আর শাপশাপান্ত করছে।

‘পেকাদোরিস! ঠগবাজের জাত! প্রভুর পথ ছেড়ে এসব কী করছিস তোরা? সব কটা নরকের আগুনে পুড়বি! তোদের কোন্ দেবতা আটকাতে আসে আমি দেখব এবার!’

জোব্বার ওপর ঠেলে ওঠা পিপের মতো পেট, চাঁদিতে টাকের চারপাশে হলদে চুলের ঝালর, ছোপ-ধরা পাংশু চামড়ার পাদরিবাবা। তার দুপাশে দুই ষন্ডামার্কা তেলেঙ্গি পালকি বেহারা। ওদের সঙ্গে নিয়েই হানা দিয়েছে সে ধর্মতলায়। এই শাসানির স্বর এখানে অনেকের চেনা, প্রতি রবিবার ম্যাওবেড়ালের গির্জার ভেতর গমগম করে— পাপপুণ্যের কথা, স্বর্গ আর নরকের কথা, ঈশ্বরের করুণার কথা।

‘প্রভুর বাগানে তোরা কাঁটাগাছেরও অধম, আপেল গাছে কলম করা বিষাক্ত হেমলকের ঝাড়! বিষফল! কাঁটা! কাঁটার ঝোপ! তাও প্রভুর মাথায় মুকুট হবারও যোগ্য নোস!’

নসা সেনোরা দো সাস্তো রোসারিওর নামে নিবেদিত গির্জার লাগোয়া মঠের পাদরিবাবা গোয়া থেকে আসা অগস্টিনীয় যাজকদের শেষ প্রতিনিধি। রুয়ানো ডে ইনফান্টের আমলে বন্দর-হুগলির আশেপাশে যেটুকু যা ধর্মাচরণের আবহ টিকে ছিল, তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। বণিক ফ্যাক্টরের দল সারাটা দিন আরক গিলে বুঁদ হয়ে থাকে, নয়তো ধর্মতলায় গোবর্ধনের ভাঙ-সিদ্ধির ঠেকে এসে পড়ে থাকে। তারা কাটুনিডাঙায় যায়, নেটিভ রক্ষিতা নিয়ে বিধর্মীর জীবন কাটায়; রবিবার গির্জার প্রার্থনায় আসে না; সিয়ামের মোরগ পুষে, জালালি কবুতর পুষে বাজি লড়ে। এদিকে ভেঙে-পড়তে-থাকা মঠ সারাবার জন্য চাঁদা চাইতে গেলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগ জানিয়ে আর অনুদান চেয়ে, তরুণ যাজক চেয়ে, ভেলা গোয়ায় লম্বা লম্বা চিঠি লেখে পাদরিবাবা, করমন্ডল ঘুরে সেই চিঠি যেতে আসতে তার বেতো হাড়ে দুব্বোঘাস গজিয়ে যায়।

গোয়ায় লিসবনে অগস্টিনীয়রা আর এখানকার খ্রিস্টান মিশনের ব্যাপারে তেমন উৎসাহী নয়, বন্দর-হুগলি আর কেবলমাত্র পর্তুগীজদের শহর তো নয়। সেটা ক্রমশ টের পেতে যতোই হতোদ্যম হয়ে পড়ে পাদরিবাবা, ততই হতাশা জমে জমে তার পেট ক্রমশ পিপের মতো স্ফীত হয়, চোখের নীচে স্যুপের বাটির মতো মেদ জমে।

এদিকে ফিরিঙ্গিডাঙার অন্যান্য খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলো দিব্যি চলছে। দিনেমারডাঙায় সম্প্রতি এক ইংরেজ ব্যাপটিস্ট এসেছে। সীসের টাইপ কেটে নেটিভদের ভাষায় বাইবেল ছাপছে তারা। ওদিকে কোয়ার্সভিলে ক্লুনির সন্ন্যাসিনীরা গরীবগুর্বোদের মধ্যে কাজ করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে নেটিভ নারীদের মধ্যে, পাদরিবাবার ভাষায় যারা কি না— ‘নাভিকুণ্ডলী দেখিয়ে কোমরে শাড়ি জড়ায় আর পাথরের যৌনাঙ্গ পুজো করে।’

তাদের মধ্যেও সাধ্যমতো ধর্মান্তকরণের চেষ্টা চালিয়ে যায় পাদরিবাবা। রুয়ানো ডে ইনফান্টের বাগানে বিভিন্ন জাতের কলমের আম গাছ রয়েছে। যেভাবে বুনো টোকো আম ভালো জাতের সঙ্গে কলম করে সুমিষ্ট স্বর্গীয় স্বাদ সৃষ্টি হয়, সেভাবেই বিধর্মীর হৃদয়ে প্রভু যিশুর বাণী মানবতার ফুল ফোটাবে একদিন— এই বিশ্বাস ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে বসেছে পাদরিবাবার মনে। দীক্ষা দিয়ে পবিত্র বারি সিঞ্চনের পরেও যারা বিধর্মীর মতো আচরণ করে, যারা মূর্তিপুজো করে, পাথরে গাছে এমনকি আলুর ভেতরেও দেবতা খুঁজে বের করে, মল-মূত্র-রজ-বীর্য পান করে যারা, যারা খুলির খোরায় ধেনো পান করে, তাদের জন্য জ্বলছে দাউদাউ নরকাগ্নি–পাদরিবাবা বলে।

‘কান পেতে শুনতে পাচ্ছিস পাপিষ্ঠের দল?’

কোনো-কোনোদিন রুয়ানো ডে ইনফান্টের আলমারি হাতড়ে নদীর বুক থেকে খুঁড়ে তোলা প্রাগৈতিহাসিক হাড়ের ফসিল রবিবারের প্রার্থনায় ভক্ত মেষশাবকদের দেখিয়ে বলে—

‘এই দ্যাখ, শয়তানের হাড়! শয়তান আছে! ওৎ পেতে আছে ধূর্ত নেকড়ের মতো, দপদপে কলজে খুবলে আত্মা ছিঁড়ে খাবে!’

কখনো আবার একখণ্ড আখ হাতে নিয়ে দেখিয়ে বলে—

‘ঈশ্বর আছেন জলে স্থলে অন্তরীক্ষে! এমনকি এই সামান্য উদ্ভিদের মধ্যেও! কোনো মৌমাছির সাহায্য ছাড়াই— যে মৌমাছিও কিনা তাঁরই সৃষ্টি— এই সুমিষ্ট রস সৃষ্টি করেছেন! হাঁ কর, হাঁ কর!’

দুহাতে আখ মুচড়ে ফোঁটা ফোঁটা রস ফেলে দেন হাঁটু মুড়ে বসা বিগলিতদের হাঁ মুখে।

ইস্টারে থানকাপড় আর রুটির লোভে ওরা দলে দলে গির্জায় আসে। কিন্তু আবার গাজনের মোচ্ছবেও আসে। ধূর্ত, অকৃতজ্ঞ মিথ্যুক পেকাদোরেসের ঝাড়! পাদরিবাবা শাসায়

‘ধর্মশিক্ষা চুলোয় দিয়ে তোরা এখানে এসে পাথরের ঢেলা পূজিস? গাছের গায়ে ঢিল বাঁধিস? ভয়ঙ্কর পরিণতি অপেক্ষা করছে তোদের জন্য। ভয়ঙ্কর! নরকাগ্নির আঁচ মৃত্যুর পরেই নয়, এই জীবনেই পাবি। গোয়ার বিশপকে চিঠি লিখছি আমি, এখানেও চালু হবে ইনকুইজিশান! পাপী বিধর্মীগুলোকে পিছমোড়া করে বেঁধে রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্ট্র্যাপাডোয় চড়ানো হবে। জ্যান্ত পোড়ানোও হবে, যেমনটা হয় গোয়ায়! আর প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে এসে হিদু মাগী বিয়ে করে কালীভক্ত সেজেছে ওই যে পাষন্ডটা, তার চার হাত পায়ে ঘোড়া বেঁধে চিরে ফেলা হবে। যেমনটা হয় লিসবনে।

পাদরিবাবার মুখে ফেনা উঠে আসে, লাল দাড়ি বেয়ে গড়ায়। আচমকাই চাবুকের নাগালের মধ্যে এসে পড়ে তরুণ হেসুদাস।

হেসুদাসের কষ্টিপাথরে কোঁদা বুকে ফুঁড়েছে ইস্পাতের ফলা, আঙটা, পরনে হলুদে ছোপানো সরু কৌপিন, কপালে সিঁদুরের টিপ, নিশ্বাসে ধেনোর গন্ধ।

‘হেসুদাস, তুইও?’ পাদরিবাবা চাবুক উঁচিয়ে ধরে। ‘রোববার গির্জায় এসেছিলি না তুই?’

‘ছিলুম তো! তাতে কী? মারবে? তো মারো না!’ জবাফুলের মতো লাল চোখে সোজাসুজি তাকিয়ে বলে হেসুদাস। ‘এই দ্যাক বুকে বাণ ফুঁড়েছি! ও চাবুক আর কী করবে?’,

পাদরিবাবার জিভ পাথর হয়ে যায়, থরথর করে কাঁপতে থাকে। হেসুদাস কালো মিসি-ছোপানো দাঁত বের করে গলায় একগুচ্ছ রুদ্রাক্ষের মালার নীচ থেকে পেতলের ক্রুশচিহ্ন বের করে দেখায়।

‘তোমার ঠাকুর বুকে থাক পাদরিবাবা, পাটায় গাঁথা রক্তমাখা কাঁটার মুকুট! বুকে বাণ ফুড়ে হাসছি দ্যাক! না হয় রোববার করে তোমার গিজ্ঞেয় যাই, তাই বলে কি বাপদাদার ধম্মো ছেড়ে দেব? অ্যাঁ, কী বল?’